সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ভদ্রলোক কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ‘আমার বাড়িতে খুব ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে৷’
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার খবরের কাগজ পড়ছিলেন৷ দাঁতে কামড়ানো চুরুট৷ সাদা দাড়িতে একটুকরো ছাই৷ কাগজ থেকে মুখ না তুলে বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আপনি ভুল লোকের কাছে এসেছেন৷’
ভদ্রলোক একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, ‘কেন স্যার?’
‘আমি ভূতের ওঝা নই৷’
‘জানি স্যার, বিলক্ষণ জানি৷’—ভদ্রলোক ব্যস্তভাবে বললেন৷ মুখে কাকুতি-মিনতির ভাব৷
‘আসলে ব্যাপারটা ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছিনে৷ মনের যা অবস্থা, কহতব্য নয় কর্নেলস্যার! তবে আপনি ভূতের ওঝার কথা বললেন না, তা-ও কি না-গিয়েছি? মাঝখান থেকে ওঝা বেচারাই ভূতের হাতে মারা পড়ল৷ তখন—’
‘মারা পড়ল মানে?’ —কর্নেল তাঁর দিকে তাকালেন৷ এতক্ষণে দাড়িতে আটকানো ছাইটুকু খসে পড়ল৷ ফের বললেন, ‘আপনি বলছেন, আপনার বাড়িতে ভূত তাড়াতে এসে ভূতের ওঝাই মারা পড়ল?’
ভদ্রলোক করুণ মুখে বললেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ! সে-রাত্তিরে ছিল অমাবস্যা৷ ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ ওঝার নাম জগা৷ সবাই বলে সিদ্ধ তান্ত্রিক৷ তো জগা ওঝা বলেছিল, অমাবস্যার রাত্তিতে গিয়ে ভূতকে জব্দ করবে৷ পুজো-আচ্চার জন্য যা-যা বলেছিল, সব ফর্দ করে আনিয়েছিলুম৷ তারপর তো সে সামনের বাড়ির সবাইকে দরজা-জানালা বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে পড়তে বলল৷ পেছনের বাগানে সে গেল পুজো করতে৷ ভোরবেলা আমার মেয়ে রিনি রোজকার মতো গৃহদেবতার পুজোর জন্য ফুল তুলতে গিয়েছিল৷ তার চিৎকার-কান্নাকাটি শুনে বাগানে গিয়ে দেখি, জগা ওঝা উপুড় হয়ে পড়ে আছে ধুনির পাশে৷ চিত করে শুইয়ে দিলুম৷ সে এক বীভৎস দৃশ্য কর্নেলস্যার! জগার চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে৷’
‘পুলিশে খবর দিয়েছিলেন?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ পুলিশ এসে তদন্ত করে লাশ মর্গে পাঠিয়েছিল৷ মর্গের রিপোর্টে বলা হয়েছে, হার্ট অ্যাটাক৷ পুলিশের মতে, জগা ছিল বেজায় নেশাখোর লোক৷ হার্ট অ্যাটাক হতেই পারে৷’
‘কিন্তু আপনি বলতে চাইছেন হার্ট অ্যাটাক নয়, ভূতে ওর ঘাড় মটকে দিয়েছিল?’
এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলুম৷ এবার কর্নেলের কথায় ভঙ্গিতে হেসে ফেললুম৷ ভদ্রলোক দুঃখিত মুখে বললেন, ‘ব্যাপারটা হাসি-তামাসা নয়, স্যার! এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিনে৷ সে জন্যই তো ভূতের কথা বলছি৷ ভূতুড়ে ছাড়া এমন উদ্ভুট্টে কাণ্ড-কারখানার আর কী ব্যাখ্যা হয়, বলুন?’
কর্নেল বললেন, ‘কাণ্ড-কারখানাটা কী?’
‘রাতবিরেতে ছাদের ওপর হাঁটাচলার শব্দ, জানালার বাইরে ফিসফিস করে আমার নাম ধরে ডাকাডাকি—’
‘আপনার নামটা এখনও বলেননি!’
‘আজ্ঞে, আমার নাম রামলোচন অধিকারী৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘একেই তা হলে বলে ভূতের মুখে রামনাম!’
রামলোচনবাবু অনিচ্ছাসত্ত্বেও করুণ একটু হাসলেন, ‘সে রকমই দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা৷ আমি স্যার কোনও সাতে-পাঁচে থাকি না৷ কারও সঙ্গে ঝগড়াবিবাদ নেই৷ তাহলে কি আমাকে রাতবিরেতে জ্বালাতন করতে আসবে? তার চেয়ে বড়ো কথা, আমার বাড়ির চারদিকে উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল৷ তার ওপরে প্রায় আড়াই-ফুট কাঁটাতারের বেড়া৷ গেট বন্ধ করে দিলে একটা কুকুরেরও সাধ্যি নেই বাড়িতে ঢোকে৷’
‘আপনার বাড়িতে কুকুর নেই?’
‘আছে স্যার!’—রামলোচনবাবু নড়েচড়ে বসলেন : ‘দু-দুটো অ্যালসেশিয়ান আছে৷ সারারাত সে-দুটো ছাড়া থাকে৷ তা সত্ত্বেও—’
কর্নেল তাঁর কথার ওপর বললেন, ‘যে-রাত্তিরে ভূতের ওঝা মারা পড়ে, সে-রাত্তিরে কুকুরদুটো ছাড়া ছিল না?’
‘আজ্ঞে না৷ কারণ জগা ওঝা নিষেধ করেছিল৷’
কর্নেল চোখ বুজে ইজিচেয়ারে দুলতে দুলতে বললেন, ‘আপনি থাকেন কোথায় রামলোচনবাবু?’
রামলোচনবাবু পাঞ্জাবির বুকপকেট থেকে একটা কার্ড বের করে দিলেন৷ কর্নেল সেটা দেখার পর টেবিলে রেখে দিলেন৷ এমন সময় ষষ্ঠীচরণ কফির ট্রে নিয়ে এল৷ সোফার নিচু টেবিলে ট্রে রেখে সে রামলোচনবাবুর দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টে তাকাতে-তাকাতে চলে গেল৷ ষষ্ঠীর এটা অভ্যাস৷ তার ‘বাবামশাই’-এর ড্রয়িং রুমে অচেনা লোক এলে সে এই চোখে তাকায়৷
কর্নেল বললেন, ‘কফি খান, রামলোচনবাবু!’
ভদ্রলোক কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে বললেন, ‘এর একটা কিনারা করতেই হবে স্যার৷ আমার পিসতুতো দাদা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন৷ তাঁর পরামর্শেই আপনার কাছে এসেছি৷ প্রায় একমাস যাবৎ আমরা এই ভূতুড়ে অত্যাচারে অতিষ্ঠ৷ পুলিশকে বলেছিলুম৷ গ্রাহ্যই করেনি৷ অথচ কাঁহাতক আর সহ্য করা যায়, বলুন?’
‘রাতবিরেতে ছাদে হাঁটাচলা আর জানালার বাইরে ফিসফিস করে আপনাকে ডাকা৷ আর কিছু?’
‘হ্যাঁ স্যার! আরও অনেক কিছু৷ যেমন ধরুন, চাপা বিদঘুটে সব শব্দ৷ খুট খুট ঘস ঘস ক্যাঁচ কোঁচ শন শন...’
‘আপনার কুকুরদুটো কী করে তখন?’
রামলোচনবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আশ্চর্য স্যার! ওরাও যেন আতঙ্কে চুপ করে যায়৷’
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে নিভে-যাওয়া চুরুটটি লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন৷ বললেন, ‘আপনার বাড়িতে কে কে আছেন?’
‘আমি, আমার স্ত্রী, মেয়ে রিনি আর আমার দাদা কমললোচন৷ এ ছাড়া জনা’দুই কাজের লোক আছে৷ তবে দাদাকে নিয়ে এক সমস্যা৷ বছর দুই আগে দাদা হঠাৎ পাগল হয়ে যান৷ মেন্টাল হসপিট্যালে রেখেছিলুম ওঁকে৷ মাসখানেক হল ছেড়ে দিয়েছে৷ কিন্তু পাগলামি একটুও সারেনি৷ তাই শেকল বেঁধে ঘরে আটকে রাখতে হয়৷ ছাড়া থাকলে বাড়ির জিনিসপত্তর ভাঙচুর করা স্বভাব৷’
‘তা হলে দেখা যাচ্ছে, আপনার দাদাকে বাড়ি আনার পর থেকে ভূতের উপদ্রব—’
রামলোচনবাবু চমকে উঠেছিলেন৷ কর্নেলের কথার ওপর বললেন, ‘তাই তো বটে! এটা তো ভেবে দেখিনি! আপনার কি মনে হচ্ছে, দুটোর মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে?’
‘আপনার কী মনে হচ্ছে বলুন?’
রামলোচনবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আপনি বললেন বলে একটা সন্দেহ হচ্ছে৷ দাদা ছোটোবেলা থেকে বাউন্ডুলে স্বভাবের মানুষ৷ নানা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন৷ পাগল হওয়ার পর থেকে একটা কথা প্রায় বিড়বিড় করে বলতেন—এখনও বলেন৷ কথাটা হল, ‘দেব না যা!’ জিজ্ঞেস করলে কিছু খুলে বলেন না৷ খালি ওই এক কথা—দেব না যা...দেব না যা...দেব না যা...’
কর্নেল বললেন, ‘ঠিক আছে৷ আমরা যাচ্ছি ওবেলা৷ স্টেশনে লোক পাঠানোর দরকার নেই৷ নবাবগঞ্জ আমার চেনা জায়গা৷ হ্যাঁ, আমার এই তরুণ বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত৷ কারণ এ-ও যাচ্ছে আমার সঙ্গে৷ জয়ন্ত চৌধুরি৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার সাংবাদিক৷’
রামলোচনবাবু আমাকে নমস্কার করলেন৷ তারপর কর্নেলকে নমস্কার করে বেরিয়ে গেলেন৷ কর্নেল হাঁকলেন—‘যষ্ঠী! দরজা বন্ধ করে দে৷’ তারপর আমার দিকে ঘুরে মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘কী বুঝলে ডার্লিং?’
বললুম, ‘গোড়ায় রহস্য ছিল৷ এখন আর রইল না৷’
‘বলো কী!’
‘হ্যাঁ’! সোজা হিসেব৷ রামলোচনবাবুর দাদা কোনো দেশে গিয়ে কার কোনও দামি জিনিস হাতিয়ে এনেছিলেন৷ যার জিনিস সে এসে কোনও কৌশলে ভয় দেখিয়ে জিনিসটা ফেরত পেতে চাইছে৷ কমললোচনবাবুকে জেরা করবেন৷ বেরিয়ে পড়বে৷’
কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘পাগলকে জেরা! ও কাজটা বরং তুমিই করবে, ডার্লিং! পাগলদের ত্রিসীমানা আমি মাড়াইনে৷ পাগলামিও নাকি সংক্রামক ব্যাধি৷ বিশ্বাস না হয় আজকের কাগজটা দেখো, তোমাদেরই দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে৷ পাঁচের পাতায় আট নম্বর কলম দেখো৷’
বলে কর্নেল আমার দিকে ভাঁজ করা কাগজটা ছুঁড়ে দিলেন৷
কাগজ খুলে পাঁচের পাতার আট নম্বর কলমে একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম৷ বাক্সের ভেতর বড়ো বড়ো হরফে ছাপা আছে একটা অদ্ভুত বিজ্ঞাপন!
সাবধান! সাবধান!! সাবধান...
পাগল হইতে সতত দূরে থাকুন৷
পাগলামি অতি সংক্রামক ব্যাধি৷
সম্প্রতি বিশ্ববিখ্যাত জার্মান ডাক্তার
হ্বের হ্বর্টাবেন ইহা আবিস্কার করিয়াছেন!
কর্নেলের দিকে তাকিয়ে দেখি, চোখ বুজে দাড়িতে আঁচড় কাটছেন৷ দাঁতে কামড়ানো জ্বলন্ত চুরুট থেকে নীল ধোঁয়া পেঁচিয়ে উঠছে৷ বললুম, ‘কোন পাগলের এত পয়সা যে এমন একটা উদ্ভুট্টে বিজ্ঞাপন দিল? সত্যি কর্নেল! আজকাল দেশে পাগলদেরও হাতে প্রচুর পয়সা হয়েছে৷’
‘এবং ছাগলদের হাতেও, জয়ন্ত! ছাগলদের হাতেও প্রচুর পয়সা হয়েছে৷’
অবাক হয়ে বললুম, ‘তার মানে?’
কর্নেল চোখ খুলে বললেন, ‘সরি ডার্লিং, শুধু ছাগলদের বলা ভুল হল৷ রামছাগলদের বলা উচিত৷ যাই হোক৷ তুমি আজ আমার সাথে লাঞ্চ খাবে৷ বাড়ি থেকে এখনই তৈরি হয়ে এসো৷ ততক্ষণে আমি ট্রাংককলে নবাবগঞ্জ থানাকে কন্ট্যাক্ট করি৷ ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানা দরকার৷’
II দুই II
নবাবগঞ্জ স্টেশনে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ পৌঁছলুম আমরা৷ প্ল্যাটফর্মের ভিড়ের ভেতর দু’জনে হাঁটছি, হঠাৎ একজন তাগড়াই গড়নের প্যান্ট-স্পোর্টিং গেঞ্জি পরা ভদ্রলোক কর্নেলের দিকে হাত বাড়িয়ে চাপা স্বরে বললেন, ‘হ্যালো ওল্ড বস!’
কর্নেল সহাস্যে হ্যান্ডশেক করে বললেন, ‘সব ঠিক আছে তো মিঃ আচার্য?’
‘ঠিক থাকবে না!’—ভদ্রলোক হাসলেন, ‘কতদিন পরে আবার আপনার সেবার সুযোগ পেলুম!’
প্ল্যাটফর্মের একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘পরিচয় করিয়ে দিই জয়ন্ত—ইনি সি. আই. ডি. ইন্সপেক্টর মিঃ রমেশ আচার্য! মিঃ আচার্য, আশা করি জয়ন্তের পরিচয় দেওয়ার দরকার হবে না!’
মিঃ আচার্য বললেন, ‘দৈনিক ‘সতসেবক’ আমি রেগুলার পড়ি৷’
আমরা পরস্পরকে নমস্কার করলাম৷ কর্নেল বললেন, ‘আমরা এবার কেটে পড়ব মিঃ আচার্য! যথাসময়ে দেখা হবে৷ শুধু সেই কথাটা জানতে চাই৷ রামলোচনবাবুর বিজনেস পার্টনারের নাম কী ছিল জেনেছেন?’
‘রামজীবন সামন্ত৷ লোকে বলতো বড়ো রামবাবু৷ মাসখানেক আগে তিনি নিখোঁজ হয়ে গেছেন৷’
‘বলেন কী! এ যে একেবারে রামরাম ব্যাপার৷ তবু ভূতটা ভয় পাচ্ছে না৷’
‘ভূত সর্ষের মধ্যেই থাকলে সর্ষে নিয়ে ভূত ভাগানো যায় না কর্নেল৷’
‘আচ্ছা, চলি৷’
গেট পেরিয়ে গিয়ে কর্নেল সাইকেল রিকশা ডাকলেন৷ বললেন, ‘রামলোচন অধিকারীর বাড়ি৷’
ঘিঞ্জি গলি এবং ভিড়ভাট্টার পর মোটামুটি চওড়া একটা রাস্তা৷ তারপরই লোডশেডিং হয়ে গেল৷ তবে সুন্দর জ্যোৎস্নার দেখা পাওয়া গেল৷ চাপা স্বরে বললুম, ‘ব্যাপারটা জানতে ইচ্ছে করছে৷’
কর্নেল বললেন, ‘ফাঁদ পেতে ভূত ধরা হবে, ডার্লিং! ধৈর্য ধরে থাকো৷’
রামলোচনবাবুর বাড়িটা গঞ্জের শেষ দিকে৷ নির্জন জঙ্গলে পরিবেশ৷ জ্যোৎস্নায় বাঁ-দিকে নদীর জল ঝলমল করছিল৷ জিজ্ঞেস করলে কর্নেল বললেন, ‘ভাগীরথী৷ স্থানীয় লোকে গঙ্গাই বলে৷’
রামলোচনবাবু গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ তাঁর হাতে টর্চ৷ একটা লোক লন্ঠন নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল৷ আমাদের দেখে রামলোচনবাবু অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন৷ কর্নেলকে কিছুতেই রিকশার ভাড়া দিতে দিলেন না৷ ভেতরে গিয়ে বললেন, ‘মধু! গেটে তালা দিয়ে আয়!’
লনে হাঁটতে-হাঁটতে কুকুরের গজরানি শুনতে পেলুম৷ তবে মনে হল, নীচের কোনও ঘর থেকে গজরাচ্ছে৷ রামলোচনবাবু বারান্দায় উঠে বললেন, ‘লোডশেডিংয়ের কোনও সময়-অসময় নেই কর্নেলস্যার! একটু অসুবিধে হবে কিছুক্ষণ৷ বরং এই বারান্দায় চেয়ার পেতে দিই৷ বেশ হাওয়া দিচ্ছে! মধু!’
বারান্দায় জ্যোৎস্না পড়েছে৷ মধু নামে সেই লোকটা এসে চেয়ার পেতে দিল৷ লন্ঠনটা একপাশে রাখল৷ কর্নেল বললেন, ‘ওহে মধু৷ লন্ঠনের দম কমিয়ে দাও! জ্যোৎস্নাটা বেশ ভালো লাগছে৷’
রামলোচনবাবু একটু হেসে বললেন, ‘তা লাগারই কথা স্যার! আজ বাদ কাল পূর্ণিমা৷ ও মধু বরং লন্ঠনটা নিয়ে যা৷ আর কফি টফি নিয়ে আয় শিগগির৷ স্যার কফি খেতে ভালবাসেন৷ আমি স্যারদের সঙ্গে গল্পসল্প করি৷’
এইসময় কোথায় ঠুং ঠুং করে আবছা ঘণ্টার শব্দ শোনা গেল৷ বললুম, ‘ও কিসের শব্দ?’
রামলোচনবাবু খি খি করে হেসে বললেন, ‘আজ্ঞে, ছাগলের গলার ঘণ্টা বাজছে৷’
কর্নেল বললেন, ‘রামছাগলের নিশ্চয়ই?’
‘আজ্ঞে৷’ —রামলোচনবাবু টর্চ জ্বেলে লনের শেষদিকটায় আলো ফেললেন৷ দাদার জন্য পুষেছি৷ ডাক্তার বলেছিলেন রামছাগলের দুধ খাওয়াতে৷ খাওয়াচ্ছি৷ তবে কাজ হচ্ছে কই?
টর্চের আলোয় দেখতে পেলুম, তিনদিক-ঘেরা ছোট্ট গ্যারেজের মতো ঘরে একটা প্রকাণ্ড ছাগল বসে জাবর কাটছে৷ আর দুটো ছানা দাঁড়িয়ে আছে তার গা ঘেঁষে৷ বললুম, ‘গলায় ঘণ্টা কেন রামলোচনবাবু?’
‘আমার মেয়ে রিনির শখ৷’ —বলে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন রামলোচনবাবু: ‘ওই! দাদা চ্যাঁচাচ্ছে কেন দেখে আসি৷ বেশ থাকবে৷ থাকতে থাকতে হঠাৎ ওই রকম—’
রামলোচনবাবু চলে গেলেন৷ এতক্ষণে শুনতে পেলুম, ওপরের ঘরে কেউ অদ্ভুত গোঙানো গলায় বলছে—‘দেব না যা! দেব না যা! দেব না যা!’
বললুম, ‘কর্নেল! শুনতে পাচ্ছেন?’
‘পাচ্ছি৷ তবে সাবধান, পাগলামি সংক্রামক ব্যাধি৷ অত কান করে শুনো না! তুমিও পাগল হয়ে যাবে৷’
মধু এল ট্রে নিয়ে৷ তার সঙ্গে একটি ন-দশ বছরের ফুটফুটে মেয়ে৷ তার হাতে লন্ঠন৷ লন্ঠন রেখেই সে দৌড়ে রামছাগলটার কাছে চলে গেল৷ কর্নেল টর্চ বের করে আলো ফেললেন৷ দেখলুম মেয়েটি রামছাগলের ছানাদুটিকে আদর করছে৷ মধু বলল, ‘রিনি! বাবা বকবেন৷ চলে এসো!’
রিনি গ্রাহ্য করল না৷ হঠাৎ দেখি, কর্নেল উঠে যাচ্ছেন ওদিকে৷ মধু বলল, ‘স্যার! আগে খেয়ে-টেয়ে নিন৷ কফি জুড়িয়ে থাকে যে!’
কর্নেল কান দিলেন না৷ মধু ঘর থেকে একটা ছোট্ট টেবিল এনে তার ওপর ট্রে রাখল৷ তারপর চলে গেল৷ কর্নেল রিনির সঙ্গে কথা বলছেন কানে এল৷
‘জেঠু তোমাকে আদর করেন না?’
‘বাবা জেঠুর কাছে কাউকে যেতে দেয় না৷ জেঠুর ঘরে সবসময় তালা আটকানো থাকে৷’
‘জেঠুকে তুমি কখনও দেখোনি?’
‘নাহ৷ মা বলে জেঠুর চেহারা নাকি রাক্ষসের মতো, দেখলে সবাই ভয় পাবে বলে বাবা ঘরে আটকে রেখেছে৷’
রামলোচনবাবুর সাড়া পাওয়া গেল, ‘কর্নেলস্যার ছাগল দেখছেন নাকি? অ্যাই রিনি! চলে আয় বলছি!’
রিনি দৌড়ে চলে এল৷ মনে হল, বাবাকে ভয় করে খুব৷ সে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল৷ কর্নেল এসে বললেন, ‘আপনার রামছাগলটি খুব ভালো জাতের, রামলোচনবাবু! আমারও ইচ্ছে আছে, একটা রামছাগল পুষব৷ রামছাগলের দুধ অত্যন্ত উপকারী শুনেছি৷ গান্ধীজি খেতেন৷’
রামলোচনবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আজ্ঞে৷’
‘তবে দেখা যাচ্ছে, পাগলের সঙ্গে ছাগলের একটা সম্পর্ক আছে৷’
রামলোচনবাবু অনিচ্ছার ভঙ্গিতে একটু হেসে বললেন, ‘আজ্ঞে!’
II তিন II
এখানে লোডশেডিংয়ের উপদ্রব বড্ড বেশি৷ উৎকট গরমে ঘুম ভেঙে গেল৷ বিরক্ত হয়ে বিছানায় উঠে বসলুম৷ আস্তে ডাকলুম, ‘কর্নেল!’ কোনও সাড়া পাওয়া গেল না৷ ওঁর বিছানার মশারি তুলে দেখি, বিছানা খালি৷ দরজা ভেজানো রয়েছে৷ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম৷ জ্যোৎস্না ঝলমল করছে৷ গাছপালায় বাতাসের কতরকম ভূতুড়ে শব্দ৷ কুকুর-দুটো কর্নেল আটকে রাখতে বলেছিলেন৷ তাদের গজরানি শোনা যাচ্ছে মাঝে-মাঝে৷ কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার তো! কর্নেল আমাকে না ডেকে নৈশ অভিযানে বেরিয়ে পড়েছেন৷ অথচ আমাকেও ডাকার কথা ছিল৷ একটু পরে মনে হল ট্রেনজার্নিতে ক্লান্ত বলে ঘুম থেকে ওঠাননি আমাকে৷
বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে রামছাগলটার গলার টুং টুং ঘণ্টা কানে এল৷ তারপর চমকে উঠে দেখলুম, একটা ছায়াকালো মূর্তি সেখান থেকে বেরিয়ে এল৷ বললুম, ‘কে?’
অমনি ছায়ামূর্তিটি ফের ছাগলের ডেরায় ঢুকে পড়ল৷ দ্রুত ঘরে গিয়ে বালিশের পাশ থেকে টর্চ নিয়ে এলুম৷ টর্চের আলো ফেলে তাকে আর দেখতে পেলুম না৷ ছাগলটা তেমনই বসে বসে জাবর কাটছে৷ বাচ্চাদুটোও তেমনই দাঁড়িয়ে আছে৷ এ তো ভারি আশ্চর্য ব্যাপার!
সাহস করে ছাগলের ঘরে গেলুম৷ ঘরটা একসময় মোটরগাড়ির গ্যারেজই ছিল বোঝা গেল৷ ছাগলটার পেছনে কাটাঘাসের স্তূপ৷ লোকটা ঘাসের স্তূপে লুকিয়ে পড়েছে নাকি দেখার জন্য যেই পা বাড়িয়েছি, রামছাগলটা উঠে দাঁড়িয়ে গুঁতোতে এল৷ খাড়া সুঁচলো শিং৷ তক্ষুনি পিছিয়ে এলুম৷
তারপরই কর্নেলের চাপাগলার ডাক শুনলুম, ‘জয়ন্ত! রাতবিরেতে ছাগলের সঙ্গে যুদ্ধ করে লাভ নেই৷’
বারান্দায় কর্নেলের ছায়ামূর্তি দেখা যাচ্ছিল৷ হন্তদন্ত হয়ে কাছে গিয়ে বললুম, ‘একটা লোক! আশ্চর্য ব্যাপার কর্নেল! লোকটা—’
‘লোকটা অদৃশ্য হয়ে গেল তো?’
‘আমার ধারণা, লোকটা ঘাসের পাঁজায় লুকিয়ে আছে৷ রামছাগলটা বড্ড পাজি৷’
‘ছাগলটার অনেক পয়সা আছে৷ বলেছিলুম জয়ন্ত! যখের ধন! সে যখের ধনের প্রহরী৷’
বিরক্ত হয়ে বললুম, ‘হেঁয়ালি ভালো লাগে না৷ এখনই লোকটাকে খুঁজে বের করা উচিত৷’
কর্নেল চূরুট ধরিয়ে হঠাৎ গলা চড়িয়ে বললেন, ‘চমৎকার ফাঁদ পাতা হয়েছিল, ডার্লিং! তুমি বেমক্কা সব ভন্ডুল করে দিলে৷’
বলেই রামছাগলের ডেরার দিকে টর্চের আলো ফেললেন, ‘কই রামলোচনবাবু, বেরিয়ে আসুন৷ ফাঁদ ভন্ডুল হয়ে গেছে এ-রাতের মতো৷’
আমাকে হতভম্ব করে ঘাসের পাঁজা ঠেলে মাথা তুললেন রামলোচন অধিকারী৷ ছাগলটার পাশ দিয়ে বেরিয়ে এলেন জামাকাপড় এবং মাথা ঝাড়তে-ঝাড়তে৷ বারান্দায় উঠে বললেন,‘বাপস কী গরম! দাদার বরাবর ওই পাগলাটে কারবার৷ গ্যারেজের তলায় পাতালঘর তৈরির কোনও মানে হয়?’
পেছনদিকে কেউ বলে উঠল, ‘দেব না যা! দেব না যা! দেব না যা!’
‘সর্বনাশ! দাদার ঘরের দরজা কে খুলে দিলে?’ —বলে রামলোচনবাবু বারান্দা থেকে ঝাঁপ দিলেন৷
টর্চের আলোয় দেখলুম ঝাঁকড়া চুল আর দাড়ি, পরনে নোংরা পোশাক, একটা পিশাচের মতো মানুষ ভয়ঙ্কর মুখভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে ফুলের ঝোপের ভেতর৷ রামলোচনবাবু তাকে টানতে টানতে নিয়ে এলেন৷ বললেন, ‘এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার৷ দাদার শেকল-টেকলও খুলে দিয়েছে কে!’
আবার ওদিক থেকেই কেউ বলে উঠল, ‘আমি খুলে দিয়েছি রামলোচনবাবু!’
‘কে, কে?’
টর্চের আলোয় সি. আই. ডি. ইন্সপেক্টর রমেন আচার্য আর দু’জন কনস্টেবলকে ফুলবাগানের ঝোপঝাড় ঠেলে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল৷ রামলোচনবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন৷ মিঃ আচার্য কাছে এসে বললেন, ‘কর্নেল আপনাকে ফাঁদ পাতার ছলে গ্যারেজের পাতালঘরে পাঠিয়েছিলেন৷ সেই সুযোগে আমি ওপরে গিয়ে আপনার বিজনেস-পার্টনার রামজীবনবাবুকে শেকল খুলে বের করে এনেছিলুম৷’
আমি চমকে উঠে বললুম, ‘ইনি রামজীবনবাবু? তাহলে কমললোচনবাবু—’
মিঃ আচার্য বললেন, ‘কমললোচনবাবুও পাগল হয়েছিলেন ঠিকই৷ তবে তদন্ত করে জেনেছি, তিনি একমাস আগে রাঁচির কাঁকে মেন্টাল হসপিটালে মারা গেছেন৷ কই, মধু কোথায়? বখশিস নেবে তো এসো৷’
এইসময়ে আলো জ্বলে উঠল৷ মধু কাঁচুমাচু মুখে এসে দাঁড়াল৷ রামলোচনবাবু গর্জে উঠলেন, ‘নেমকহারাম বেইমান!’
কনস্টেবলরা রামলোচনবাবুর দু’পাশে গিয়ে দাঁড়াল৷ মধু বলল, ‘আমি নেমকহারাম নই বাবু! সত্যি বলতে কী, বড়োবাবুই আমাকে আড়তে চাকরি দিয়েছিলেন৷ হঠাৎ উনি নিপাত্তা হয়ে গেলেন৷ গতমাসে বাইরে থেকে এসে শুনি, আপনি আপনার পাগল দাদাকে বাড়ি এনেছেন৷ আমাকে দেখতে যেতে দিলেন না৷ একদিন লুকিয়ে দেখে এলুম৷ সর্বনাশ! এ তো বড়োবাবু রামজীবন সামন্তমশাই! তারপর আমার রাগ হল৷ ভূতের ভয় দেখতে শুরু করলুম আপনাকে৷ কুকুর ছেড়ে রাখলে কী হবে? আমাকে তো কুকুর কিছু বলবে না৷ শেষে আপনি জগা ওঝাকে আনলেন৷ নেশাখোর জগার গায়ে টুপটাপ ঢিল ফেললুম৷ ব্যস! ভয়ের চোটে জগা গোঁ-গোঁ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেল৷’
পাগল রামজীবনবাবু বলে উঠলেন, ‘দেব না যা! দেব না যা! দেব না যা!’
মধু বলল, ‘শুনছেন স্যার, কী বলছেন বড়োবাবু? সই দেবেন না বলছেন৷’
মিঃ আচার্যের ইশারায় কনস্টেবলরা রামলোচনবাবুর দুটো হাত ধরে বলল, ‘চলিয়ে বাবু!’
এরপর আর রামলোচনবাবুর বাড়িতে থাকা চলে না৷ আমরা বাকি রাত্তিরটা স্টেশনের ওয়েটিংরুমে কাটাচ্ছিলুম৷ কলকাতা ফেরার ট্রেন ভোর ছ’টা-পাঁচে৷
কর্নেল বললেন, ‘দৈনিক ‘সত্যসেবক’-এ পাগলের বিজ্ঞাপন কাজে লাগল না৷ তবে এ-ও ঠিক, আমি পাগলদের দেখলে এড়িয়ে চলি৷’
বললুম, ‘রহস্যটা কেমন ম্যাড়মেড়ে৷ মোটাবুদ্ধির প্যাঁচ৷’
‘ছাগলাদ্য ঘৃতের মতো ছাগলাদ্য বুদ্ধি আর কী! শুনতে গা ছমছম করে, কাজের বেলায় কিস্যু না! তবে রামলোচন অধিকারীর ভূতের ভয়টা না থাকলে তাঁর ব্যবসার পার্টনার বেচারা বেঘোরে জগা ওঝার মতোই মারা পড়তেন৷ দিনের পর দিন ড্রাগ খাইয়ে...ওঃ! কী সাংঘাতিক ঘটনা! রামজীবনবাবুকে নিরুদ্দিষ্ট রটিয়ে নিজের পাগলদাদা সাজিয়ে তাঁর ব্যবসার অংশীদার রামলোচনবাবু একটা কীর্তি করছিলেন বটে! হঠাৎ মেরে ফেললে পোস্টমর্টেমের হাঙ্গামা হতে পারে ভেবে—যাক গে, চলো দেখি, একটু কফি পাই নাকি৷’
‘রামছাগল আর পাতালঘরের ব্যাপারটা কিন্তু বোঝা গেল না৷’
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, ‘মধু জানিয়েছে, পাতালঘরে নিষিদ্ধ ড্রাগের গুদাম আছে৷ আজ রাতেই পুলিশ তা উদ্ধার করে ফেলবে৷ রামছাগলের শিং-কে পুলিশ ভয় পাবে বলে মনে হয় না৷...’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন