ভূতুড়ে লাশ

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

কালোদৈত্য এবং পোড়োবাড়ির ভূত

মুন লেক দেখে ফেরার পথে সাংঘাতিক ঝড়ের মুখে পড়েছিলাম৷ বরমডিহি ডাকবাংলোর চৌকিদার পই-পই করে বলেছিল, সূর্যাস্তের আগেই যেন ফিরে আসি৷ কারণ বছরের এই সময়টা এ মুলুকে অচানক কালা দেও পাহাড়ের ওপর থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ তার পাল্লায় পড়লে নাকি বাঁচার আশা থাকে না৷ মানুষ তো তুচ্ছ, বাঘের মতো বিরাট জানোয়ারকেও নাকি সেই কালা দেও অর্থাৎ কিনা কালো দৈত্য দু’হাতে তুলে এমন আছাড় মারে যে তার হাড়গোড়-মাংস দলা পাকিয়ে যায়৷

চৌকিদার আরও বলেছিল, চাপা গুড়গুড় শব্দ শুনলেই যেন আমরা মাটিতে শুয়ে পড়ি৷ ওই শব্দটা কালো দৈত্যের আসবার সংকেত৷

শব্দটা আমি শুনেছিলাম; কিন্তু আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার তখন একটা প্রজাপতিকে তাড়া করেছেন৷ তাঁর হাতে প্রজাপতি ধরা জাল৷ ওঁকে শব্দটার কথা বলেছিলামও৷ কিন্তু উনি গ্রাহ্য করেননি৷

প্রজাপতিটা জঙ্গলের ভেতর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর শুনতে পেয়েছিলাম, উনি বিড়বিড় করে বলছেন, ‘‘দোরাইতিস আপোলিনাস! এই তুর্কি ঘোড়সওয়ার এখানে এনেছিল কারা? আশ্চর্য তো!’’

ব্যস্তভাবে বলেছিলাম, ‘‘তুর্কি ঘোড়সওয়ার নয় কর্নেল! ওই শুনুন কালো দৈত্য গর্জন করছে৷ আমাদের এখনই মাটিতে শুয়ে পড়া উচিত৷’’

তারপরই দেখলাম কর্নেলের টুপি এবং প্রজাপতি ধরা জাল উড়ে চলে গেল৷ ওঁর টাক বেরিয়ে পড়ল৷ আর আচম্বিতে প্রচণ্ড হাওয়ার ঝাপটানি প্রথমে আমাকে মাটিতে শুইয়ে দিল; তারপর কর্নেলকেও উপুড় হয়ে পড়তে দেখলাম৷ ভাগ্যিস, জায়গাটা ছিল মোটামুটি ফাঁকা এবং রাস্তার দু’ধারে বড়ো-বড়ো পাথরের চাঁই পড়ে ছিল৷ সেগুলো একেকটা নিশ্চয়ই একশোটা হাতির মতো ওজনদার৷ তাই কালো দৈত্য সেগুলোকে নড়াতে পারছিল না৷ মুহূর্তে গাঢ় অন্ধকার ঢেকে ফেলল আমাদের৷ আর সেই ভয়ঙ্কর শোঁ-শোঁ শনশন শব্দ যেন সত্যিই দৈত্যের শ্বাস-প্রশ্বাস৷ সেই সঙ্গে চোখ-ঝলসানো বিদ্যুতের ঝিলিক৷ কানে তালা ধরে যাচ্ছিল মুহুর্মুহু বজ্র গর্জনে৷ এক পলকের জন্য বিদ্যুতের তীব্র আলোয় দেখলাম, একটা বিশাল গাছ আমাদের ওপর দিয়ে উড়ে গেল৷ তখন বাঁচার আশা ছেড়েই দিলাম৷

কতক্ষণ কালো দৈত্য হামলা চালিয়েছিল, জানি না৷ চোখ বন্ধ করে খুদে গুল্ম আঁকড়ে ধরেছিলাম হয়তো আত্মরক্ষার সহজাত প্রবণতায়৷ এক কালো দৈত্যের পাঁয়তারা যদি বা থামল, শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি৷ সেই বৃষ্টিতে ঠান্ডা যেন হিম-তীক্ষ্ণ সুচ৷ তারপর কর্নেলের সাড়া পেলাম৷ ‘‘জয়ন্ত! উঠে পড়ো৷’’

হামাগুড়ি দিয়ে পাথুরে মাটিতে ওঠার চেষ্টা করছিলাম৷ তখন কর্নেল আমার হাত ধরে ওঠালেন৷ বললেন, ‘‘কুইক! শর্টকাটে বাংলোয় ফেরা দরকার৷’’ তখনও বিদ্যুতের ঝিলিক এবং বজ্র-গর্জনের বিরাম নেই, যদিও ঝড়টা থেমেছে৷ বৃষ্টিটা কিন্তু বেড়েই যাচ্ছিল৷ এবড়ো-খেবড়ো রাস্তার বাঁ-দিকে পাথরগুলোর ফাঁকে কর্নেলকে অনুসরণ করলাম৷ এদিকটায় উঁচু গাছপালা তত নেই৷ ঝোপঝাড় আর নানা সাইজের পাথর পড়ে আছে৷ মনে হচ্ছিল, বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদের এ তল্লাট যেন নখদর্পণে; কিন্তু তাঁর সাদা দাড়ি কোথায় গেল? দাড়ির জায়গায় চাপ-চাপ কাদা!

দু’জনেরই ভিজে জবুথবু অবস্থা৷ কিছুদূর চলার পর একটা পিচ-রাস্তায় পৌঁছুলাম৷ এটাই তা হলে সেই বরমডিহি-জাহানাবাদ রোড৷ রাস্তার দু’দিকে উঁচু গাছ৷ তীব্র বিদ্যুতের ঝিলিক সামান্য দূরে এবং একটা গাছের মাথায় বিকট শব্দে বাজ পড়ল৷ গাছটা দাউদাউ জ্বলে উঠল৷ আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘‘কর্নেল! আমাদের কোনও পাথরের আড়ালে বসে পড়া উচিত৷ বৃষ্টি থামলে বরং...’’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘ওই একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে৷ আমার সঙ্গ ছেড়ো না!’’

বিদ্যুতের ছটায় খানিকটা দূরে উঁচু জায়গার ওপর একটা দোতলা বাড়ি দেখতে পেলাম৷ বাড়িটা পুরোনো এবং জরাজীর্ণ৷ এক সময় সেই বাড়ির বারান্দায় যখন উঠলাম, তখন ধড়ে প্রাণ এল৷ কিন্তু সেই তীক্ষ্ণ বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছিলাম না৷ বারান্দাটা ছোটো৷ কর্নেল দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকতে থাকলেন, ‘‘কে আছে বাড়িতে? শিগগির দরজা খুলুন৷’’

আমি তখনও হাঁপাচ্ছি৷ হাঁসফাস করে বললাম, ‘‘পোড়োবাড়ি মনে হচ্ছে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘না৷ দোতলায় বন্ধ জানালার ফাঁকে আলো দেখেছি৷’’ বলে আবার দরজায় শব্দ করতে থাকলেন৷

বললাম, ‘‘হিন্দিতে বলুন৷ বাড়ির লোকেরা হয়তো বাংলা বোঝে না৷’’

আমাকে অবাক করে কর্নেল বললেন, ‘‘বিদ্যুতের ছটায় নেমপ্লেট পড়েছি৷ এস. এল. মুখার্জি, এম. এ. বি-এল লেখা আছে৷’’

‘‘কোথায় নেমপ্লেট?’’

‘‘ওই দেউড়ির গায়ে৷’’ বলে কর্নেল এতক্ষণে পকেট থেকে খুদে টর্চ বের করে জ্বাললেন৷

সেই আলোয় দেখলাম বারান্দার নীচে একপাশে সত্যিই একটা দেউড়ি এবং তার গায়ে মার্বেলের ফলক আঁটা৷ লেখা আছে ‘সন্ধ্যানীড়’৷ তার তলায় ওই নাম৷ বাড়ির মালিক তাহলে একজন আইনজীবী৷ কিন্তু বাড়িটার এমন জরাজীর্ণ দশা কেন?

কর্নেল এবার দরজায় জোরালো ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘‘দরজা না খুললে ভেঙে ফেলব বলে দিচ্ছি৷ শিগগির দরজা খুলুন৷ আমরা ডাকাত নই, ভদ্রলোক৷’’

এতক্ষণে দরজার ফাটল দিয়ে আলো দেখা গেল৷ তারপর দরজা খুলে গেল৷ একজন প্রৌঢ় শক্তসমর্থ গড়নের লোক লণ্ঠন তুলে বলল, ‘‘আপনারা কোথা থেকে আসছেন স্যার?’’

লোকটার চেহারা, পোশাক এবং কণ্ঠস্বরে বুঝলাম এ বাড়ির সম্ভবত পুরাতন ভৃত্য৷ কর্নেল প্রায় তাকে ঠেলে ভেতরে ঢুকে গেলেন৷ আমিও ঢুকলাম৷ লোকটা একটু হকচকিয়ে গেল৷ কর্নেল এবার একটু হেসে বললেন, ‘‘বাইরের অবস্থা দেখেও কি এ-কথা জিজ্ঞেস করতে আছে? দেখতে পাচ্ছ তো, আমরা কী বিচ্ছিরি ভিজেছি৷ যাই হোক, বৃষ্টিটা থামলেই আমরা চলে যাব৷’’

লোকটা ধাতস্থ হল যেন৷ বলল, ‘‘তা বসুন আজ্ঞে! আমি কর্তাবাবুর কাছে গিয়ে বসি৷ ওনার শরীর হঠাৎ অসুস্থ৷ বাড়িতে আর কেউ নেই যে আপনাদের একটু যত্ন-আত্তি করব৷ বাড়তি একটা আলোও নেই যে—’’

‘‘থাক৷ তুমি তোমার কর্তামশাইয়ের কাছে যাও৷ বৃষ্টি থামলে আমি তোমাকে ডাকব৷ তখন এসে দরজা বন্ধ করবে৷ কী নাম তোমার?’’

‘‘আজ্ঞে ভোলা স্যার!’’

‘‘তোমার কর্তামশাই কি এস. এল. মুখার্জি?’’

‘‘আজ্ঞে৷’’ বলে লোকটা হন্তদন্ত ভেতরের দরজা দিয়ে ঢুকে গেল৷ তারপর তার পায়ের শব্দ ক্রমশ ওপরদিকে মিলিয়ে গেল৷ সিঁড়িটা দরজার কাছাকাছি আছে; কিংবা এ-বাড়িতে সব শব্দই বিভ্রান্তিকর যেন৷ ততক্ষণে ঘরের ভেতরটা দেখে নিয়েছি৷ কয়েকটা আলমারি, একপাশে একটা খালি তক্তাপোশ আর একটা টেবিল ঘিরে চারটে নড়বড়ে চেয়ার৷ দুটো চেয়ারে আমরা বসেছি৷ বুঝলাম, আইনজীবী ভদ্রলোকের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়৷ তিনি বৃদ্ধ এবং অসুস্থ৷ আর কোর্টে যাতায়াতের সামর্থ্য নেই৷ আলমারিগুলো প্রায় শূন্য৷ আইনজীবীদের ঘরের দৃশ্য আমার দেখা আছে৷ অজস্র আলমারিতে ঠাসবন্দি আইনের বই এবং নথি ভর্তি থাকে কিন্তু এই মুখার্জিমশাই বিদেশে-বিভুঁয়ে এমন দুরবস্থায় পড়েছেন যে ওঁকে শেষ পর্যন্ত আইনের বই বেচে খেতে হয়েছে৷ উনি নিশ্চয়ই কর্নেলের মতো চিরকুমার, তাই কর্নেলের প্রিয় পরিচারক ষষ্ঠীচরণের মতো এই ভোলাই তাঁর দেখাশোনা-রান্নাবান্না-কাজকর্ম করে৷

কর্নেল যেন আমার মনের কথা আঁচ করেই হঠাৎ বললেন, ‘‘এই ভদ্রলোক অ্যাডভোকেট ছিলেন৷ কিন্তু যদি ভাবো; পয়সা কামাতে পারেননি, ভুল করবে৷ কারণ এত বড়ো একটা দোতলা বাড়ি করা সহজ কথা নয়, অথচ বাড়িটার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা নেই৷ ভাড়া দিতেও পারতেন৷ দেননি৷ বাড়িটার অবস্থা...’’ বলে উনি ছাদের দিকে টর্চের আলো ফেললেন৷ ‘‘টালিগুলো ফাঁক হয় আছে৷ কড়িবরগার অবস্থা শোচনীয়৷ যে কোনও সময় ছাদ ধসে পড়তেই পারে৷’’

শিউরে উঠলাম৷ ‘‘এসব অলক্ষুণে কথা বলবেন না৷ কালা দেওয়ের হাত থেকে সদ্য প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরেছি!’’

সেই মুহূর্তে ঝুরঝুর করে কোথায় বালি খসে পড়ল৷ কানের ভুল কি না কে জানে, মনে হল; ভোলার পায়ের শব্দ হল মাথার ওপর৷ বললাম, ‘‘কর্নেল৷ এখানে আশ্রয় নেওয়ার চেয়ে দেখছি বৃষ্টিতে ভেজা নিরাপদ ছিল৷’’

কর্নেল টর্চ নিভিয়ে বললেন, ‘‘ওপরের ঘরে হাঁটাচলা করছে কেউ৷’’

ভোলা ছাড়া আর কে?

কর্নেল চুপ করে থাকলেন৷ বাইরের দরজা দিয়ে বিদ্যুতের মূহুর্মুহু আলোয় জোর বৃষ্টি দেখতে পাচ্ছিলাম৷ প্যান্ট-শার্ট ভিজে চবচবে এবং এখন ঘরের ভেতরে ওম পাব কী, বড্ড শীত করছিল৷ একটু পরে আবার ঝুরঝুর করে কিছু ঝরে পড়ল ছাদ থেকে৷ চমকে উঠে বললাম, ‘‘কর্নেল! এ ঘরে বসে থাকা বিপজ্জনক মনে হচ্ছে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আর কোন ঘরে গিয়ে বসবে ভাবছ?’’

‘‘ভেতরে তো আরও ঘর আছে৷ ভোলাকে ডাকুন৷’’

আমার কথা শেষ হতেই ছাদে চাপা শব্দ হল এবং আবার একরাশ চুন-সুরকি ঝরে পড়ল৷ এবার আমাদের সামনেই টেবিলের ওপর৷ ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়ালাম৷

কর্নেল টর্চ ফেলে ছাদটা দেখে বললেন, ‘‘হুঁ৷ ওপরের ঘরে কেউ হাঁটাচলা করলেই এই অবস্থা হয়৷’’ টর্চের আলো তিনি টেবিলে এবং টেবিল থেকে মেঝেয় ফেললেন৷

‘‘দেখছ? কত গুঁড়ো চুন-সুরকি ঝরে পড়ে সারাক্ষণ অথচ ভোলা মেঝে পরিষ্কার করে না৷’’

‘‘কর্নেল! চলুন, ভেতরে যাই৷ দেখি কোনও নিরাপদ জায়গা আছে কি না৷’’

‘‘হুঁ৷ থাকা তো উচিত৷’’

‘‘তাহলে চলুন না! আমার বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে৷’’

‘‘জয়ন্ত! অস্বস্তি আমারও হচ্ছে৷ চলো!’’

বলে কর্নেল ভেতরের দরজা দিয়ে ঢুকলেন৷ ওঁর হাতে টর্চ জ্বলছিল৷ ওঁকে অনুসরণ করে গিয়ে দেখি, একটা বারান্দা এবং তার নীচের উঠোনে জঙ্গল হয়ে আছে৷ বারান্দার শেষদিকে সিঁড়ি৷ সিঁড়ির কাছে পৌঁছে এক পলকের জন্য বিদ্যুতের আলো এবং বৃষ্টির মধ্যে আবছা একটা মূর্তি দেখতে পেলাম৷ বললাম, ‘‘কে?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘কোথায় কে?’’

‘‘উঠোনের জঙ্গলে কাকে যেন দেখলাম৷ শিগগির আলো ফেলুন৷’’

টর্চের আলোয় কাউকে দেখা গেল না৷ কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘তুমি অকারণে ভয় পাচ্ছ জয়ন্ত!’’

আমার মনে এতক্ষণে সন্দেহ জাগল, এই বাড়িটা কোনও পোড়ো এবং ভূতুড়ে বাড়ি নয় তো? ভোলা কি মানুষ? ওর চেহারা যেন কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছিল না?

চাপা ভয়টা তাড়ানোর চেষ্টা করছিলাম; কিন্তু থেকেই গেল৷ সিঁড়িতে যখন কর্নেলের পিছনে উঠছি; তখন প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছে, কেউ ঠান্ডা-হিম হাতে আমার গলা টিপে ধরবে, কিংবা সিঁড়িটাই ভেঙে পড়বে৷

ওপরের জীর্ণ রেলিংঘেরা বারান্দায় পৌঁছে কর্নেল ডাকলেন, ‘‘ভোলা!’’

একটা ঘরের দরজা খুলে গেল এবং আলো দেখতে পেলাম৷ ভোলা সাড়া দিল৷

‘‘বিষ্টি তো এখনও পড়ছে স্যার! বিষ্টির মধ্যে চলে যাবেন কেন?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘তোমার কর্তামশাইয়ের সঙ্গে আলাপ করতে এলাম৷’’

ভোলা আস্তে বলল, ‘‘তা আসুন, কিন্তু উনি ঘুমোচ্ছেন৷ ওষুধ খাইয়ে দিয়েছি৷’’

কর্নেলের সঙ্গে সেই ঘরে ঢুকলাম৷ দেখলাম, একটা তক্তাপোশে নোংরা বিছানায় একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক পাশ ফিরে শুয়ে আছেন৷ তাঁর গায়ে নোংরা-ছেঁড়া একটা চাদর চাপানো৷ ঘরের ভেতর আর কোনও আসবাব নেই৷ দেয়ালের তাকে অনেকগুলো শিশিবোতল-কৌটো এইসব জিনিস৷ ভোলার লণ্ঠনটার অবস্থাও শোচনীয়৷ লণ্ঠনটা যেন অতিকষ্টে সামান্য একটু আলো ওগরাচ্ছে৷

কর্নেল বললেন, ‘‘তোমার কর্তামশাইয়ের চিকিৎসা করছেন কে?’’

‘‘আজ্ঞে বরমডিহি সরকারি হাসপাতালের এক ডাক্তার৷’’

‘‘অসুখটা কী?’’

‘‘ধরা যাচ্ছে না৷ কর্তামশাইয়ের তেমন টাকাকড়িও নেই যে ভালো ডাক্তার দেখাবেন!’’

‘‘ওঁর কোনও আত্মীয়স্বজন নেই?’’

‘‘কলকাতায় আছে৷ এনার ছোটো ভাই, কিন্তু দাদার সঙ্গে বনিবনা নেই৷’’

এই সময় হঠাৎ কোথায় একটা চাপা শব্দ এবং আবছা গোঙানি শোনা গেল৷ কর্নেল এবং আমি দু’জনেই চমকে উঠেছিলাম৷ কর্নেল বললেন, ‘‘ও কিসের শব্দ?’’

ভোলা গম্ভীর মুখে বলল, ‘‘আজ্ঞে, ভয় পাবেন না৷ এ বাড়িতে এরকম অনেক শব্দ হয়!’’

‘‘বলো কী!’’

‘‘হ্যাঁ স্যার৷ প্রথম-প্রথম আমি ভয় পেতাম৷ আর গেরাজ্জি করি না৷’’

‘‘তুমি কি ভূত-প্রেতের কথা বলছ?’’

ভোলা গলা নামিয়ে বলল, ‘‘রাতবিরেতে ওসব কথা থাক স্যার ! আপনি নীচে গিয়ে বসুন৷ বিষ্টি কমে যাচ্ছে মনে হচ্ছে৷’’

কর্নেল টর্চ জ্বেলে অসুস্থ আইনজীবীকে দেখতে চেষ্টা করলেন৷ কিন্তু ভোলা তক্ষুনি আলোর সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘‘আলো ফেলবেন না স্যার! এক্ষুনি চোখে আলো লাগলে হুলুস্থুল বাধাবেন; সামলাতে পারব না৷ দয়া করে আপনারা নিচে গিয়ে বসুন৷ বিষ্টি ছাড়লে চলে যাবেন৷’’

কর্নেলের সঙ্গে নিচের সেই ঘরে যখন ফিরে গেলাম, তখন আমি আতঙ্কে প্রায় হতবুদ্ধি৷ বললাম, ‘‘কর্নেল! বৃষ্টি কমেছে৷ চলুন, কেটে পড়ি৷ এ বাড়ির হালচাল গোলমেলে মনে হচ্ছে৷’’

কর্নেল একটা চেয়ারে বসে বললেন, ‘‘আর মিনিট পনেরো অপেক্ষা করা যাক৷ প্রায় এক কিলোমিটার আমাদের হাঁটতে হবে৷ পথে কোনও যানবাহনের আশা নেই৷ বসো!’’

বসলাম চেয়ার টেনে; কিন্তু চেয়ারটা এবার কেমন বিচ্ছিরি শব্দ করল৷ কর্নেল টর্চের আলোয় ঘড়ি দেখে বললেন, ‘‘মোটে সাড়ে ছ’টা৷ অক্টোবরে সাড়ে-ছ’টা মানে অবশ্য সন্ধ্যা৷ কিন্তু এখানে আবহাওয়ার দরুন মনে হচ্ছে নিশুতি রাত!’’

একটু পরে টুপ-টুপ করে শব্দ হতে থাকল৷ শব্দটা টেবিলের ওপর৷ বললাম, ‘‘কর্নেল! দোতলার ছাদের নিশ্চয়ই ফাটাফুটি অবস্থা৷ সেই জল চুঁইয়ে নিচের ঘরে পড়ছে৷’’

কর্নেল টর্চ জ্বাললেন টেবিলের ওপর৷ অমনি আতঙ্কে গলা শুকিয়ে গেল৷ ছাদ থেকে চুঁইয়ে টুপ-টুপ করে টেবিলে যা পড়ছে তা জল নয়৷ গাঢ় লাল রক্ত!

হ্যাঁ, তাজা রক্ত! কর্নেলের টর্চের আলো ছাদে পৌঁছুল৷ টালির ফাটল দিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে রক্তবিন্দু৷ টেবিলে থকথক করছে রক্ত৷ থরথর করে কেঁপে উঠলাম, অজানা ত্রাসে৷ এ এক বিভীষিকা! কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে চাপা স্বরে বললেন, ‘‘এসো তো দেখি!’’

আবার সিঁড়ি বেয়ে দুরুদুরু বুকে ওপরে গেলাম৷ কর্নেল ডাকলেন, ‘‘ভোলা! ভোলা!’’ কিন্তু কোনও সাড়া এল না৷

সেই ঘরের দরজায় গিয়ে কর্নেল টর্চ জ্বাললেন৷ দরজা খোলা এবং ভেতরের তক্তাপোশে নোংরা বিছানায় কেউ নেই! বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেলাম৷ কর্নেল সেই ঘরের ভেতর ঢুকে বললেন, ‘‘আমরা যে ঘরে ছিলাম, সেটা ওই পাশের ঘরের নিচে৷’’ বলে পাশের ঘরের দরজা ঠেললেন৷

ভেজানো দরজা খুলে গেল৷ তারপর কর্নেলের টর্চের আলোয় দেখলাম, একটা লোক রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেয় পড়ে আছে৷ সে এক বীভৎস দৃশ্য! দেখামাত্র চোখ বন্ধ করলাম৷ এ নিশ্চয়ই কোনও ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখছি!

কর্নেল দেখে নিয়েই বললেন, ‘‘কুইক জয়ন্ত! ভিজতে-ভিজতেই বাংলোয় ফিরতে হবে৷’’ তারপর ব্যস্তভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন৷

কাঁপতে-কাঁপতে বললাম, ‘‘অ্যাডভোকেট ভদ্রলোককে ভোলা মার্ডার করেছে!’’

‘‘না৷ একজন মধ্যবয়সী লোককে জবাই করা হয়েছে৷’’

আর কোনও কথা বলার মতো মনের অবস্থা ছিল না৷ বৃষ্টি কমেছে কিন্তু তখনও ক্রমাগত বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছিল৷ রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল বললেন, ‘‘জায়গাটা চিনতে পারছি৷ এটাকে একসময় বলা হত বাঙালিটোলা৷ বাড়িগুলো একটা করে বাগানবাড়ির মতো৷ দূরে-দূরে ছড়ানো৷ আজকাল এসব বাড়ির মালিকেরা কলকাতায় চলে গেছেন৷ কেয়ারটেকার থাকে৷ বাঙালিরা বেড়াতে এলে এগুলো কেয়ারটেকারই ভাড়া দেয়৷ কিন্তু ওই ‘সন্ধ্যানীড়’ নামে বাড়িটা...’’

কর্নেল হঠাৎ চুপ করলেন৷ হন্তদন্ত হাঁটতে থাকলেন৷

ডাকবাংলোয় পৌঁছুলে আমাদের দেখে চৌকিদার রামভরসা হিন্দিতে বলল, ‘‘হায় রাম! আপনারা ঠিকই কালা দেওয়ের পাল্লায় পড়েছিলেন৷ তবে রামজির কৃপায় যে প্রাণে বেঁচে ফিরতে পেরেছেন, এই যথেষ্ট৷’’

‘‘জলদি কফি!’’ বলে কর্নেল বাথরুমে ঢুকলেন পোশাক বদলাতে৷ একটু পরে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘‘আমি আসছি৷ তুমি পোশাক বদলে ফেলো ডার্লিং!’’

‘‘কোথায় যাচ্ছেন?’’

‘‘কেয়ারটেকারের অফিসে টেলিফোন আছে৷ এখনই থানায় ব্যাপারটা জানানো দরকার৷’’

আমার মাথা এবং প্যান্ট-শার্ট কাদায় মাখামাখি৷ বাথরুমে ঢুকে ঝটপট স্নান করে নিলাম৷ পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ব্যালকনিতে বেতের চেয়ারে বসলাম৷ এতক্ষণে শরীর-মন তাজা৷ সেই হানাবাড়ির দৃশ্যগুলি খুঁটিয়ে স্মরণ করছিলাম৷ যা দেখেছি, তার কোনও মাথামুণ্ডু খুঁজে পাওয়া যায় না৷

এতক্ষণে কর্নেল ফিরলেন৷ রামভরসা কফির ট্রে রেখে গেল৷ জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘থানায় কি জানিয়ে দিলেন ব্যাপারটা?’’

‘‘হুঁ৷’’ বলে কর্নেল কফিতে চুমুক দিলেন৷

‘‘পুলিশ কী বলল?’’

‘‘সন্ধ্যানীড় নাকি একটা পোড়ো বাড়ি৷ বাড়িটা নিয়ে অ্যাডভোকেট শচীন্দ্রলাল মুখার্জি এবং তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই তরুণকুমার মুখার্জির মধ্যে বহু বছর ধরে মামলা চলছে৷ তাই বাড়িটার ওই অবস্থা৷ ওঁরা কলকাতায় থাকেন৷ অসুখে ভুগে কেয়ারটেকার কবে মারা গেছে৷ তার নাম ভোলা ছিল কি না পুলিশ জানে না৷’’

‘‘তাহলে ঘটনাটা রহস্যময়৷ বরং বলা চলে রহস্যময় হত্যাকাণ্ড৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ তবে আমরা হঠাৎ ওখানে গিয়ে পড়ায় হত্যাকারীরা একটা নাটকীয় দৃশ্য তৈরি করেছিল৷’’

‘‘ঠিক বলেছেন৷ সেই ভোলা ব্যাটাচ্ছলের চেহারা মনে পড়ছে৷ কেমন ষণ্ডামার্কা!’’

‘‘লোকটা কিন্তু বাঙালি৷’’

আমরা কিছুক্ষণ এইসব আলোচনা চালিয়ে গেলাম৷ তারপর কর্নেল সেই পলাতক প্রজাপতিটি নিয়ে হা-হুতাশ শুরু করলেন৷

‘‘প্রজাপতির লাতিন নাম ‘দোরাতিস আপোলিনাস’৷ এই প্রজাতির প্রজাপতি এই অঞ্চলে আবিষ্কার করে সত্যিই আমি বিস্মিত হয়েছি জয়ন্ত! এরা মধ্য-এশিয়া, বিশেষ করে তুর্কিভাষী এলাকার বাসিন্দা৷ সম্ভবত মধ্যযুগে কোনও প্রজাপতি-প্রিয় তুর্কি সুলতান এখানে ওদের এনে ছেড়ে দিয়েছিলেন৷ কলকাতা ফিরে বইপত্তর ঘাঁটতে হবে৷’’

আমার মাথায় সন্ধ্যানীড়ের হত্যাকাণ্ড, রক্তারক্তি অবস্থা৷ প্রকৃতিবিদের বকবক কানে নিচ্ছিলাম না৷ বেশ কিছুক্ষণ পরে রামভরসা এসে কর্নেলকে সেলাম দিল৷ ‘‘স্যার! আপনার টেলিফোন!’’

কর্নেল হন্তদন্ত নিচে চলে গেলেন৷

যখন ফিরলেন, তখন মুখ একেবারে গম্ভীর৷ ধপাস করে বসে চোখ বুজে টাকে হাত বুলোতে শুরু করলেন৷ জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘কার ফোন?’’

কর্নেল চোখ বুজে টাকে হাত বুলোতে-বুলোতে বললেন, ‘‘পুলিশ সন্ধ্যানীড়ে জিপ নিয়ে গিয়েছিল৷ তন্নতন্ন খুঁজে কোনও ডেডবডি পায়নি৷ ওপরের ঘরের মেঝেয় এবং নীচের ঘরের টেবিলে এক ফোঁটা রক্তও নেই৷ সিলিঙের সেই টালিটা অবশ্য ভাঙা দেখেছে৷ পুলিশের মতে সেটা স্বাভাবিক৷ পুলিশ অকারণ হয়রানির জন্য আমাকে হুমকি দিল৷’’

রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলাম, ‘‘কর্নেল! আমরা পোড়োবাড়িতে নির্ঘাত ভূতের পাল্লায় পড়েছিলাম!..’’

কালো নোটবই

বরমডিহি থেকে কলকাতা ফেরার পর কিছুদিন সেই ঘটনাটা নিয়ে অনেক থিওরি খাড়া করেছিলাম৷ কিন্তু কোনওটাই যুক্তি দিয়ে দাঁড় করাতে পারছিলাম না; আর কর্নেলকেও তা নিয়ে আর মাথা ঘামাতে দেখিনি৷ তিনি প্রজাপতি সংক্রান্ত বইয়ে মগ্ন ছিলেন৷ কখনও দেখতাম তুর্কিভাষী সুলতানদের ইতিহাসের বইও ঘাঁটছেন৷

আমি দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক৷ অফিসে অজস্র খবরের কাগজ আসে৷ খুঁটিয়ে পড়ি, যদি বরমডিহিতে কোনও খুনখারাপির কিংবা কারও নিরুদ্দেশের খবর চোখে পড়ে৷ কিন্তু তেমন কোনও খবর চোখে পড়ে না৷ দেখতে-দেখতে শীত এসে গেল৷ ঘটনাটা গভীরভাবে তবু মনে গাঁথা রইল৷ দুঃস্বপ্ন দেখতাম কত রাত্রে৷ অবশেষে কর্নেলকে একদিন কথায়-কথায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘অ্যাডভোকেট শচীন্দ্রলাল মুখার্জি বা তাঁর বৈমাত্রেয় ভাইয়ের কলকাতার ঠিকানা জোগাড় করা উচিত ছিল৷ করেননি কেন?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘করেছি৷ ওঁরা বহাল তবিয়তে আছেন এবং মামলা এখন সুপ্রিমকোর্টে উঠেছে৷ শচীন্দ্রবাবু এখন আর প্যাকটিস করেন না৷ তরুণবাবু ব্যবসাবাণিজ্য করেন৷ তিনি মিটমাটের পক্ষপাতী কিন্তু শচীন্দ্রবাবু ভীষণ একগুঁয়ে মানুষ৷ কারণ তাঁর বক্তব্য, তাঁর বাবা মহেন্দ্রলাল ন্যায্য উইল করে তাঁকে বরমডিহির বাড়িটা দিয়ে গেছেন৷ তরুণবাবুর বক্তব্য, উইলটা জাল৷ এতেই শচীন্দ্র বৈমাত্রেয় ভাইয়ের ওপর খুবই ক্ষুব্ধ৷’’

‘‘আপনি কি খুনের ঘটনাটা ওঁদের বলেছেন?’’

‘‘বলেছি৷ দু’জনেরই মতে, ওই এলাকায় খুনখারাপি আকছার হয়৷ বাড়িটা পোড়ো হয়ে গেছে৷ কাজেই সেখানে যে যা খুশি করতেই পারে৷ আর সত্যিই ভোলা নামে শচীন্দ্রবাবুর একজন চাকর ছিল, সে বেঁচে নেই৷

‘‘কিন্তু প্রায় দু’মাস হয়ে গেল৷ কোনও কাগজে বরমডিহির কোনও—’’

কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, ‘‘আজকাল সব খবর কাগজে বেরোয়৷ কাগজের লোক হয়ে এ তোমার জানার কথা৷ তার চেয়ে বড়ো কথা, পুলিশ আমার নাম-ঠিকানা নিয়েছিল; তেমন কিছু ঘটলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করত৷’’

‘‘তাহলে তো ব্যাপারটা সত্যিই ভূতুড়ে বলতে হয়৷’’

এই সময় ডোরবেল বাজল৷ কর্নেলের ভৃত্য ষষ্ঠীচরণ এসে বলল, ‘‘এক ভদ্রলোক এয়েছেন বাবামশাই ! বলছেন, খুব বিপদে পড়ে আপনার সাহায্য নিতে এয়েছেন৷ বললাম, বাবামশাই ব্যস্ত৷ উনি বললেন—’’

চোখ কটমটিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘ডেকে নিয়ে আয়৷...’’

একটু পরে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে কর্নেলকে নমস্কার করে করুণ হাসলেন, ‘‘আপনাকে ডিসটার্ব করার জন্য দুঃখিত, কিন্তু আমার উপায় ছিল না৷ এতদিন ধরে পুলিশ কোনও কিনারা করতে পারল না, অগত্যা আপনার শরণাপন্ন হলাম৷’’

‘‘আপনি বসুন৷’’

ভদ্রলোকের পরনে সাধারণ প্যান্ট-শার্ট৷ কাঁধে একটা কাপড়ের নকশাদার ব্যাগ; কিন্তু ব্যাগটা পুরোনো৷ তাঁর চেহারা রোগা এবং ঢ্যাঙা৷ মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়িগোঁফ৷ সোফার কোনায় তিনি আড়ষ্টভাবে বসে বললেন, ‘‘আমার নাম হরিচরণ গাঙ্গুলি৷ থাকি পাইকপাড়ায়৷ মাসদুয়েক আগে আমার মামাতো ভাই শ্যামসুন্দর হঠাৎ নিখোঁজ তারপর...’’

আমি বলে উঠলাম, ‘‘বরমডিহি...’’ এবং তখনই কর্নেল চোখ কটমট করে আমাকে থামিয়ে দিলেন৷

হরিচরণবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘কী বললেন যেন?’’

কর্নেল যেন কথা ঘুরিয়ে দিতেই বললেন, ‘‘আলাপ করিয়ে দিই৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার রিপোর্টার জয়ন্ত চৌধুরি৷’’

হরিচরণ নমস্কার করলেন৷ ‘‘আপনার কথাও আমাকে মহীবাবু বলেছেন কর্নেলসায়েবের ঠিকানা উনিই আমাকে দিয়েছেন৷ রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার৷ লেকটাউনে থাকেন৷ তা আপনি কী যেন বললেন কথাটা?’’

কর্নেল দ্রুত বললেন, ‘‘সে অন্য কেস৷ আপনি বলুন৷’’

হরিচরণ বললেন, ‘‘জয়ন্তবাবু বরমডিহি বললেন৷ আমার কানে কথাটা পরিষ্কার বিঁধল৷ মানে, আমি স্যার একসময় এক অ্যাডভোকেট ভদ্রলোকের ক্লার্ক ছিলাম৷ তাঁর কিছু বিষয়সম্পত্তি ছিল বরমডিহিতে৷ সেই নিয়ে ভাইয়ে-ভাইয়ে মামলা মোকদ্দমা৷ দুই ভাই-ই সমান গোঁয়ার৷ তাতে পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই৷’’

এবার কর্নেলের চোখ উজ্জ্বল দেখাল৷ আস্তে-আস্তে বললেন, ‘‘আপনি কি শচীন্দ্রলাল মুখার্জির ক্লার্ক ছিলেন?’’

‘‘হ্যাঁ স্যার! তবে সে অনেক বছর আগের কথা৷ উনি ওকালতি থেকে অবসর নিয়েছিলেন৷ আর আমিও বেকার হয়ে গিয়েছিলাম৷ তো একটা কিছু না জোটালে বাঁচি কী করে? অগত্যা...’’

‘‘টাইপিস্টের কাজ শুরু করেছিলেন?’’

হরিচরণ ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন৷ ‘‘আপনি স্যার সত্যিই অন্তর্যামী৷ মহীবাবু যা-যা বলেছিলেন, মিলে যাচ্ছে৷ আপনি কেমন করে জানলেন আমি টাইপিস্টের কাজ করি?’’

‘‘আপনার আঙুল দেখে মনে হল আপনি টাইপিস্ট৷’’ কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘আর বরমডিহির সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ে-ভাইয়ে মামলার খবর কাগজে বেরিয়েছিল৷’’

‘‘আমি স্যার আলিপুর-কোর্ট চত্বরে টাইপরাইটার নিয়ে বসি৷ স্বাধীনভাবে কাজকর্ম করি৷ চলে যায় কোনওরকমে৷’’

‘‘আপনার মামাতো ভাইয়ের ব্যাপারটা বলুন!’’

‘‘শ্যাম ছিল এক নম্বরের বাউণ্ডুলে৷ মধ্যে-মধ্যে আমার কাছে এসে থাকত৷ আবার কিছুদিনের জন্য কোথায় বেপাত্তা হয়ে যেত৷ তাই বছর সাত-আট আগে ও যখন উধাও হয়ে গিয়েছিল, গা করিনি৷ কিন্তু ইদানীং প্রায় ফি-সপ্তায় একটা করে উড়োচিঠি আসতে শুরু করল৷ সব চিঠিতে লাল ডটপেনে লেখা, শ্যামসুন্দরের কালো রঙের নোটবইটা নিয়ে গঙ্গার ধারে আউট্রাম ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকবে৷ আমরা চিনে নেব তোমাকে৷ ওটা পেলে শ্যামসুন্দর প্রাণে বাঁচবে৷’’

হরিচরণ বিষণ্ণমুখে শ্বাস ছেড়ে চুপ করলে কর্নেল বললেন, ‘‘তারপর?’’

‘‘মহীবাবুকে সঙ্গে নিয়ে অগত্যা লালবাজারে গিয়েছিলাম৷ শ্যামের কোনও জিনিসপত্র আমার ঘরে ছিল না৷ তো পুলিশ সাদা পোশাকে দিনকতক ফাঁদ পাতল৷ কিন্তু কেউ আমার কাছে এল না৷ আমি স্যার পুলিশের কথা মতো একটা কালো নোটবই হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম৷ যাই হোক, শেষে পুলিশ বলল, বোগাস! কেউ জোক করছে৷ আর তারপর থেকে পুলিশ আমাকে পাত্তা দিল না৷ কিন্তু তারপর এই চিঠিটা গতকাল ডাকে এসেছে দেখুন!’’

উনি একটা খাম দিলেন কর্নেলকে৷ কর্নেল আগে খামের টিকিটে ডাকঘরের ছাপটা আতসকাচ দিয়ে দেখে নিলেন৷ তারপর চিঠিটা বের করলেন৷ তাঁর কাঁধের পাশ দিয়ে উঁকি দিলাম৷ সাদা কাগজে লালকালিতে লেখা আছে:-

ঘুঘু ধরতে ফাঁদ পেতেছিলে৷ এ বড়ো সেয়ানা ঘুঘু৷ তোমার বদমাইশির জন্য শ্যামকে খতম করে পুঁতে ফেলেছি৷ এবার তোমার পালা৷ আগামী ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে শ্যামের কালো নোটবইটা না পেলে এবার তুমি খতম হয়ে শ্যামের মতোই মাটির তলায় চলে যাবে৷ এবার পুলিশকে জানালে ওটা পাই বা না পাই, তোমার নিস্তার নেই৷ কাজেই সাবধান৷ কোর্ট চত্বরে কোনও একদিন কোনও এক সময়ে কেউ তোমার কাছে টাইপ করাতে গিয়ে বলবে এন বি৷ তুমি তক্ষুনি তার হাতে ওটা দেবে৷ আর তাকে ধরে চ্যাঁচামেচি করলে হার্টে ড্যাগার ঢুকে যাবে৷ বুঝলে বুদ্ধিমান? কেন ঝামেলা করছ? করবেই বা কেন?

কর্নেল চিঠিটা পড়ে বললেন, ‘‘আজ দোসরা ডিসেম্বর৷’’

হরিচরণ ব্যাকুলভাবে বললেন, ‘‘আমি স্যার কোনও কালো নোটবই পাইনি৷ খামোকা আমার ঘাড়ে এ কী বিপদ এসে পড়েছে দেখুন৷ আপনি আমাকে বাঁচান স্যার!’’

কর্নেল চুরুট ধরালেন৷

আমি বললাম, ‘‘লোকটাকে ধরে ফেলতে অসুবিধে কী?’’

হরিচরণ বললেন, ‘‘ধরে না হয় ফেললেন৷ কিন্তু তারপর? তারপর আমার লাইফ-রিস্ক কি না বলুন? সারাক্ষণ তো কেউ আমার বডিগার্ড হয়ে থাকতে পারে না ! তার চেয়ে বড়ো কথা, শ্যামের তেমন কোনও নোটবই সত্যি আমি খুঁজে পাইনি; বিশ্বাস করুন!’’

কর্নেল চিঠিটা আতসকাচে পরীক্ষা করছিলেন৷ বললেন, ‘‘আগের চিঠিগুলো কি আপনি পুলিশকে দিয়েছেন?’’

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার৷ নইলে কিসের বেসিসে পুলিশের সাহায্য চাইব?’’

কর্নেল কিছুক্ষণ চুপচাপ চুরুট টানার পর বললেন, ‘‘পাইকপাড়ায় আপনার নিজের বাড়ি, নাকি ভাড়াবাড়িতে থাকেন?’’

‘‘ভাড়া বাড়ি৷ একখানা মোটে ঘর৷ আমার ফ্যামিলি থাকে মেদিনীপুরের গ্রামে৷’’

‘‘আপনি কত বছর শচীন্দ্রবাবুর ক্লার্কের কাজ করেছেন?’’

‘‘তা বছর-দশেকের বেশি হবে৷’’

‘‘বরমডিহিতে কখনও গেছেন?’’

‘‘একবার গেছি৷’’ হরিচরণ স্মরণ করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘‘বছর আষ্টেক আগে৷ শচীনবাবুর ফ্যামিলির সঙ্গে গিয়েছিলাম৷ খুব সুন্দর জায়গা স্যার! সিন-সিনারি অপূর্ব ! একটা লেক আছে পাহাড়ের মাথায়৷ আধখানা চাঁদের মতো দেখতে; তাই মুন লেক নাম৷’’

‘‘ভোলাকে চিনতেন নিশ্চয়ই?’’

হরিচরণ মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ খুব চিনতাম৷ পরে ভোলাকে শচীনবাবু বরমডিহির বাড়ির কেয়ারটেকার করেছিলেন৷ সে সেখানেই থাকত৷ অসুখবিসুখে মারা যায়৷’’ বলে টাইপিস্ট ভদ্রলোক একটু গম্ভীর হলেন৷ ‘‘তবে ওই বাড়িটা স্যার ভালো নয়৷’’

‘‘কেন ভালো নয়?’’

‘‘বাড়িটার বদনাম ছিল৷ ভূতপ্রেতের ব্যাপার আর কী ! রাতবিরেতে কী সব শব্দ হত৷ আমিও শুনেছি স্যার!’’

‘‘কী শব্দ শুনেছেন?’’

‘‘একটা ঘরে হাঁটাচলার শব্দ৷ গোঙানির শব্দ৷ যেন কেউ... মানে ঠিক বোঝাতে পারব না, মরণাপন্ন মানুষের চাপা আর্তনাদ৷ কিংবা...’’ হরিচরণের মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠল৷

কর্নেল বললেন, ‘‘আচ্ছা হরিচরণবাবু, ওই বাড়িতে আপনি তো ভৌতিক শব্দ শুনেছেন৷ কিছু ভৌতিক ব্যাপার কি দেখেছেন?’’

‘‘দেখেছি স্যার!’’ হরিচরণের মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠল৷ ‘‘সে-বার দিন দশেক ছিলাম ওখানে৷ এক রাত্রে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল৷ কে যেন পাশের ঘরে গোঙাচ্ছে; তো এ শব্দ আগের রাত্রেও শুনেছিলাম৷ তাই সাহস করে উঠে পড়লাম৷ শব্দটা দোতলার একটা ঘর থেকে আসছিল৷ ওই ঘরে পুরোনো আসবাবপত্র ঠাসা ছিল৷ দরজা খুললাম৷ তালা আটকানো ছিল না৷ তো আমার হাতে টর্চ, টর্চ জ্বেলেই দেখি, ওঃ, সে কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য!’’

‘‘কী দৃশ্য?’’

‘‘একটা রক্তমাখা লোক পড়ে গোঙাচ্ছে৷’’

‘‘তারপর?’’

হরিচরণ শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘‘কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! এক পলকের দেখা৷ তারপর দেখি কিছু নেই৷ তক্ষুনি দরজা বন্ধ করে কাঁপতে-কাঁপতে ফিরে এলাম৷ ওঃ!’’

‘‘এ কথা কাউকে বলেছিলেন?’’

‘‘না স্যার! হেসে উড়িয়ে দেবে বা আমাকে ভীতু বলবে বলে কাউকে বলিনি৷ আর উকিলবাবুর যা মেজাজ! ওঁর বাড়িতে ভূতের বদনাম সহ্য করতে পারতেন না৷ বলতেন, সব তরুণের চক্রান্ত! এখন আমি যদি ওঁকে বলি, রাত্রে ওই ঘরে রক্তাক্ত বডি দেখেছি, তাহলে কী হত ভাবুন!’’

আমি উসখুস করছিলাম৷ কর্নেল আমার দিকে চোখ কটমটিয়ে তাকালেন৷ বললেন, ‘‘ঠিক আছে হরিচরণবাবু! আমরা ওবেলা আপনার বাসায় যাব৷ খুঁজে দেখা দরকার, সত্যি শ্যামবাবু আপনার ঘরে কোনও কালো নোটবই রেখে গেছেন কি না৷’’

‘‘আমি খুঁজে দেখেছি স্যার৷ পাইনি; তবে আপনার চোখ৷ আপনি ঠিকই বলেছেন৷ আপনিও খুঁজে দেখবেন৷ তাহলে উঠি স্যার ! আমার প্রাণ আপনার হাতে৷ অনুগ্রহ করে...’’

কর্নেল আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘‘ভাববেন না৷ আমি আপনাকে সাহায্য করব৷ আপনার নাম-ঠিকানাটা লিখে দিয়ে যান৷ বিকেল চারটে-সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা যাব৷’’

হরিচরণ পকেট থেকে একটা ছাপানো নেমকার্ড বের করে দিলেন৷ তারপর নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন৷

কর্নেল কার্ডটা দেখতে-দেখতে বললেন, ‘‘ভদ্রলোক রীতিমতো পেশাদার৷ তলায় ইংরেজিতে লেখা আছে, সবরকম আইন-আদালত সংক্রান্ত দলিলপত্র টাইপ করা হয়৷’’

চাপা উত্তেজনায় অস্থির ছিলাম৷ বললাম, ‘‘এই ভদ্রলোকও রক্তাক্ত বডি দেখেছিলেন৷ আমরাও দেখেছি৷ তারপর পুলিশ গিয়ে কিছু খুঁজে পায়নি৷ এরপরও কি আপনি বলবেন ব্যাপারটা ভৌতিক নয়?’’

কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে একটু হাসলেন৷ ‘‘ভৌতিকই মনে হচ্ছে, তবে কালো রঙের নোটবইটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে৷ আর এই উড়ো চিঠিটার ভাষা লক্ষ্য করেছ?’’

‘‘চিঠিতে কোনও বৈশিষ্ট্য নেই৷ সাদামাঠা চিঠি৷’’

‘‘ঠিক৷ কিন্তু...’’ কর্নেল আবার চিঠিটা পড়লেন৷

পড়ার পর বললেন, ‘‘নাহ৷ ঠিক নয়৷’’ উনি জোরে মাথা নেড়ে বললেন ফের, ‘‘চিঠিটার বৈশিষ্ট্য আছে৷ একেবারে মৌখিক ভাষার চালে লেখা৷ দেখো জয়ন্ত, লিখিত ভাষা এবং মৌখিক ভাষার মধ্যে তফাত আছে৷ সাধারণত আমরা যখন চিঠি লিখি, তখন কলমের ডগায় ভাষার শব্দচয়ন একরকম এবং মুখে কথা বলি যখন, তখন অন্যরকম৷ যাঁরা পেশাদার লোক, তাঁরাও এর ব্যতিক্রম নন৷ এই চিঠিটা যেন চিঠি নয়, মুখোমুখি কথা বলা৷’’

কর্নেল চোখ বুজে গুম হয়ে গেলেন৷ কামড়ানো চুরুটের নীল ধোঁয়া ওঁর টাকের ওপর দিয়ে পেঁচিয়ে উঠল এবং সাদা দাড়িতে এক টুকরো ছাই খসে পড়ল৷

শব্দক্রীড়া এবং অদ্ভুত প্রশ্ন

হরিচরণ গাঙ্গুলির বাসা একটা আঁকাবাঁকা গলির শেষপ্রান্তে৷ পিছনে একটা খাটাল এবং বস্তি এলাকা৷ বাড়িটা দোতলা৷ পাশে একটা ছোট্ট পুকুর৷ পুকুরে কচুরিপানা ভর্তি৷ বিকেলেই মশার প্রচণ্ড উৎপাত৷

যে সময়ের কথা বলছি, তখনও এদিকটায় প্রোমোটারদের নজর পড়েনি৷ দোতলা বাড়িটার আশেপাশে অনেক একতলা বাড়ি৷ কোনওটা পুরোনো, কোনওটা নতুন৷ এ বাড়িটা পুরোনো৷ একতলায় একটা প্রেস, মুদির দোকান, বিস্কুটের দোকান, কয়লার ডিপো এইসব৷

টাইপিস্ট ভদ্রলোক নিচেই অপেক্ষা করছিলেন৷ আমাদের দেখে শশব্যস্তে অভ্যর্থনা করে দোতলায় নিয়ে গেলেন৷ ঘরে সাধারণ আসবাব৷ টেবিলে একটা পোর্টেবল টাইপরাইটার, কভারে ঢাকা৷ অনেক কাগজপত্রও লক্ষ্য করলাম৷ বোঝা গেল, বাড়িতেও টাইপের কাজকর্ম করেন৷

হরিবাবু বন্ধ জানালা দেখিয়ে বললেন, ‘‘বড়ো মশা৷ তাই জানালা বন্ধ করে রাখি৷ এখনই কী উৎপাত দেখুন! এমন সাংঘাতিক মশা স্যার, বিষাক্ত ওষুধ স্প্রে করেও কাজ হয় না৷’’

তিনি ঘরের আলো জ্বেলে দিলেন৷ কর্নেল ঘরের ভেতরটা খুঁটিয়ে দেখছিলেন৷ বললেন, ‘‘শ্যামবাবুর কোনও ফোটো নেই আপনার কাছে?’’

দেয়ালে কয়েকটা বাঁধানো ফোটো ঝুলছিল৷

হরিবাবু বললেন, ‘‘না স্যার, ওগুলো আমার ফ্যামিলির ছবি৷ তবে ওই ছবিটা বরমডিহির মুনলেকের ধারে শচীনবাবুর ফ্যামিলির সঙ্গে তোলা আমার ছবি৷’’

কর্নেল সেই ছবিটার কাছে গেলেন৷ দেখতে-দেখতে বললেন, ‘‘ভোলা নেই এর মধ্যে?’’

‘‘ওই লোকটা ভোলা স্যার!’’

রোগা বেঁটেখাটো একটা লোক একপাশে দাঁড়িয়ে আছে৷ মুখে কাঁচুমাচু হাসি৷ পরনে হাতকাটা ফতুয়া এবং খাটো ধুতি৷ পুরাতন ভৃত্যমার্কা চেহারা৷ আমরা ঝড়বৃষ্টির সন্ধ্যায় যে ভোলাকে দেখেছিলাম, সে শক্তসমর্থ গড়নের; সে এই ছবির ভোলা নয়৷ আর অ্যাডভোকেট ভদ্রলোকের তাগড়াই চেহারা৷ চেহারায় আভিজাত্য ঠিকরে বেরুচ্ছে, যদিও ছবিটা পুরোনো৷ হরিবাবু ভোলার পেছনে৷ পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি৷ প্রায় আট বছর আগে তোলা গ্রুপ ফোটো৷ তবু হরিবাবুকে চেনা যাচ্ছে৷

মোট চারটে ছবি৷ ঝুল জমে আছে৷ আর একটা ছবি রাধাকৃষ্ণের৷ কর্নেল সেটার কাছে গেলে হরিবাবু বললেন, ‘‘শচীনবাবুদের গৃহদেবতার ফোটো স্যার! ওঁদের ভবানীপুরের বাড়ির ঠাকুরঘরে প্রতিষ্ঠিত৷ শচীনবাবুর ইচ্ছে ছিল, শেষ জীবনে বরমডিহিতে গিয়ে কাটাবেন৷ এই বিগ্রহ সেখানে নিয়ে যাবেন৷ কিন্তু বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সঙ্গে মামলা বেধে গেল৷’’

রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহের ছবির নীচের দেওয়ালে সিঁদুরের ছোপ এবং কালো দাগ দেখে বোঝা গেল হরিবাবু ভক্তিমান৷ তিনি নিশ্চয়ই কোর্টে যাওয়ার আগে ধূপ-ধুনো জ্বেলে প্রণাম করে তবে বেরোন৷ কালো দাগগুলো ধূপকাঠিরই হবে৷

কর্নেল বললেন, ‘‘শ্যামবাবু এসে শুতেন কোথায়?’’

‘‘মেঝেয় বিছানা করে দিতাম৷ মশারি কিনতে হয়েছিল ওর জন্য৷ যা মশা!’’

‘‘আপনি আপনার তক্তাপোশের তলা খুঁজেছেন?’’

‘‘তন্নতন্ন খুঁজেছি৷ আপনিও খুঁজে দেখুন৷’’ বলে হরিবাবু টর্চ বের করলেন৷

‘‘থাক৷’’ বলে কর্নেল আবার বিগ্রহের ছবির কাছে গেলেন৷ ছবিটা আন্দাজ ৬ ফুট বাই ৪ ফুট সাইজের ফ্রেমে বাঁধানো৷ বললেন, ‘‘এই ছবিটা নামাবেন একটু?’’

‘‘কে-কেন স্যার?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘আপনি ব্রাহ্মণ৷ এতে পাপ হবে না৷ ছবিটা নামান৷’’

হরিবাবু ছবিটা সাবধানে দেওয়ালের পেরেক থেকে দু’হাতে খুললেন৷ অমনই কালোরঙের ছোট্ট এবং পাতলা একটা নোটবই, ঠকাস করে পড়ে গেল নিচে৷

কর্নেল সেটা দ্রুত কুড়িয়ে নিলেন৷ হবিবাবু চমকে উঠে বললেন, ‘‘অ্যাঁ৷ এ কী!’’

‘‘আপনি সব ছবির ঝুল ঝাড়বেন বা পরিষ্কার করবেন, কিন্তু এটাতে হাত দেবেন না জেনেই শ্যামবাবু নোটবইটা এর আড়ালে লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন৷’’

হরিবাবু ছবিটা কপালে ঠেকিয়ে যথাস্থানে লটকে দিলেন৷ ধপাস করে বিছানায় বসে বললেন, ‘‘শ্যামার কাণ্ড! ওঃ! আগে যদি জানতাম নোটবইটা ওখানেই আছে? তাছাড়া এইটুকু সাইজের নোটবই! আর আমি গঙ্গার ঘাটে বড়ো সাইজের কালো ডায়রি বই নিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম৷ এখন বুঝতে পারছি, বদমাইশ লোকটা দূর থেকে দেখেই টের পেত; ওঃ!’’

উনি কপালে মৃদু থাপ্পড় মারলেন অনুশোচনায়৷ তারপর কেঁদেই ফেললেন৷ ‘‘আমারই বুদ্ধির দোষে শ্যামার প্রাণটা বেঘারে গেছে৷ হায়! হায়! কেন আমি ওখানে খুঁজিনি?’’

কর্নেল সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘‘যা হবার হয়ে গেছে৷ আপনি কীভাবে জানবেন একটা পবিত্র ছবির পেছনে এটা লুকোনো আছে? যাই হোক, আজ আমি এটা নিয়ে যাচ্ছি, আমার দেখা দরকার, এর মধ্যে কী আছে যে কোনও সাংঘাতিক লোকের এটা এতই দরকার এবং বেচারা শ্যামাবাবুকে এর জন্যই প্রাণ হারাতে হল? আপনি কাল সকালে কোর্টে যাওয়ার পথে এটা আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবেন৷ তারপর বলব, কী করা দরকার৷’’

হরিবাবু চোখ মুছে বললেন, ‘‘কিন্তু স্যার! বদমাশটার শাস্তি হবে না? ওকে আপনি ছেড়ে দেবেন?’’

‘‘আপনিই বলেছেন, নোটবই যাকে দেবেন, তাকে ধরে ফেললে আপনি পরে বিপদে পড়তে পারেন৷ আপনার জীবন বিপন্ন হতে পারে৷’’

‘‘না, না৷ ধরবেন না সঙ্গে-সঙ্গে৷ তাকে ফলো করবেন৷’’ হরিবাবু চাপা গলায় বললেন, ‘‘তাছাড়া এ-একটা রীতিমতো রহস্য স্যার৷ এই রহস্যের কিনারা করা কি উচিত নয়? মহীবাবু বলছিলেন, আপনি বিখ্যাত রহস্যভেদী৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘হ্যাঁ, রহস্য আমাকে টানে; তবে সেটা পরের কথা৷ আপনাকে বাঁচিয়েই রহস্য ফাঁস করা উচিত কি না?’’

‘‘আজ্ঞে! ঠিক বলেছেন স্যার ! আমি ছাপোষা মানুষ৷ দেশের বাড়িতে একদঙ্গল পুষ্যি৷...’’

হরিবাবু চা খাওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন৷ কর্নেল মশার উৎপাতের অজুহাত দেখিয়ে চলে এলেন৷ তবে এ-ও সত্যি, বিকেল যত ফুরিয়ে আসছিল, মশার অত্যাচারও তত বাড়ছিল৷ শীতে মশার উপদ্রব এমনিতেই বেড়ে যায়৷ তো এ একটা এঁদো জায়গা৷

ইলিয়ট রোডে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ কর্নেল ষষ্ঠীকে কফি করতে বলে নোটবইটা নিয়ে বসলেন৷ পাতা ওল্টাতে-ওল্টাতে বললেন, ‘‘শ্যামবাবুর ওয়ার্ড-গেম খেলার অভ্যাস ছিল দেখছি৷ হুঁ, ক্রসওয়ার্ড পাজল৷ এ একটা বিচিত্র নেশা, জয়ন্ত! তবে এতে ভাষার শব্দজ্ঞান বাড়ে৷ বাহ! ভদ্রলোক রীতিমতো ইংরেজিতে পাকা ছিলেন৷ বোঝা যাচ্ছে, ইংরেজি পত্রিকায় ক্রসওয়ার্ড পাজল পাঠাতেন৷ অ্যাঁ? এটা তো ভারি অদ্ভুত!’’

কৌতূহলী হয়ে বললাম, ‘‘দেখি! দেখি!’’

কর্নেল খুদে নোটবইটার একটা পাতা দেখালেন৷ তাতে একটা চৌকো ছকে এঁকে ইংরেজি অক্ষর লেখা :-

G R A B

R A R E

A R T E

B E S T

বললাম, ‘‘অসাধারণ! লম্বালম্বি বা পাশাপাশি পড়লেও চারটে প্রায় একই শব্দ৷ গ্যাব, রেয়ার, আর্ট, বেস্ট৷’’ বলেই চমকে উঠলাম৷ ‘‘কর্নেল! কিন্তু এই ইংরেজি শব্দগুলোর মানেতে কী যেন সংকেত আছে?’’

‘‘কী সংকেত?’’

উত্তেজিতভাবে বললাম, ‘‘গ্যাব মানে...জোর করে দখল বা আত্মসাৎ করা৷ রেয়ার মানে...দুর্লভ, দুষ্প্রাপ্য৷ আর্টস...শিল্পকলা৷ সচরাচর চিত্রকলাই বোঝায়৷ বেস্ট...সর্বোত্তম, সর্বোৎকৃষ্ট৷ তাহলে মোটামুটি মানে কী দাঁড়াচ্ছে দেখুন, দুর্লভ এবং সর্বোৎকৃষ্ট চিত্রকলাগুলো আত্মসাৎ করো ! তাই না?’’

ষষ্ঠীচরণ কফি দিয়ে গেল৷ কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন, ‘‘কফি খাও ডার্লিং! নার্ভ আরও চাঙ্গা হবে৷ আরও কিছু মানে বেরুতে পারে৷’’

কফি খেতে-খেতে নোটবইটার আরও পাতা ওল্টাচ্ছিলাম৷ কিন্তু ক্রসওয়ার্ড পাজল ছাড়া আর কিছু নেই৷ আবার ওই পাতাটায় মন দিলাম৷ বললাম ‘‘নাহ৷ এটা নিশ্চয় কোনও প্রাচীন দুর্লভ ছবি হারানোর কেস৷ এর মধ্যে কোনও সংকেত অবশ্যই আছে৷ কিন্তু যে এই নোটবইটা হাতাতে চায়, সম্ভবত সে-ই তার মর্মোদ্ধার করতে পারে৷’’ বলে একটুখানি চিন্তাভাবনা করে নিলাম৷ ‘‘আচ্ছা৷ কর্নেল ! ইংরেজি হরফগুলো যদি সংখ্যার ভিত্তিতে সাজাই...’’

‘‘ডার্লিং! তুমি ওয়ার্ড-গেমের পাল্লায় পড়েছ৷ আজকাল বিদেশে কুইজ খুব চালু৷ সেই কুইজ!’’

ওঁর কথা গ্রাহ্য না করে আঙুল গুনে হিসেব করতে থাকলাম৷ বললাম, ‘‘একটা কাগজ দিন৷ দেখি কী দাঁড়াচ্ছে৷’’

কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা প্যাড বের করে দিলেন৷ আমি হিসেব করে একটা ছক সাজিয়ে ফেললাম ইংরেজি বর্ণমালার সংখ্যার ভিত্তিতে৷ এ-কে ১ ধরে ছকটা সাজালাম৷

৭ ১৮ ১ ২

১৮ ১ ১৮ ৫

১ ১৮ ২০ ৫

২ ৫ ১৯ ২০

কর্নেলকে কাগজটা দেখিয়ে বললাম, ‘‘লম্বালম্বি ধরলে ২৮, ৪২, ৫৮ এবং ৩২ পাচ্ছি৷ পাশাপাশি ধরলেও ২৮, ৪২, ৪৪ এবং ৪৬ পাচ্ছি৷ এবার দেখুন ২৮+৪২+৪৪+ ৪৬ = ১৬০ দাঁড়াচ্ছে৷ আবার ২৮+৪২+ ৫৮+ ৩২ = ১৬০ দাঁড়াচ্ছে৷ কর্নেল ! লম্বালম্বি এবং পাশাপাশি যোগ দিলে দু’দিকেই যোগফল ১৬০৷ এটা নিশ্চয় কোনও সংকেত!’’

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে শুধু বললেন, ‘‘বাহ!’’

আরও উৎসাহী হয়ে বললাম, ‘‘এবার ইংরেজি অক্ষরগুলো দেখা যাক৷ এই ABEGRST ৭টা অক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে৷’’

এই সময় টেলিফোন বাজল৷ কর্নেল বললেন, ‘‘ফোনটা ধরো, জয়ন্ত!’’

টেলিফোন তুলে সাড়া দিতেই কেউ কড়া ধমক দিল, ‘‘এই ব্যাটা বুড়ো ঘুঘু! নোটবইটা কেন নিয়ে এসেছিস? হরিকে ফেরত না দিলে টাক ফুটো করে দেব৷ ব্যাটা ঘুঘু হয়েছ৷ ফাঁদ দেখোনি?’’

তারপর লাইন কেটে গেল৷ টেলিফোন রেখে বললাম, ‘‘হুমকি দিল কেউ৷’’

‘‘কী হুমকি?’’

কথাগুলো বললাম৷ আমার হাত কাঁপছিল৷ কর্নেলকে পুলিশ-মহলে আড়ালে ঠাট্টা করে বুড়ো ঘুঘু বলে৷ লোকটা দেখছি কর্নেলকে বিলক্ষণ চেনে এবং হরিবাবুকে ফলো করে এসেও থাকবে৷ আমাদের গতিবিধির দিকেও নজর রেখেছে৷ শীতের মধ্যে গায়ে ঘাম ঝরা গরম টের পাচ্ছিলাম৷

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘হুঁ৷ রহস্য ঘনীভূত বলা চলে; তবে তোমাকে ওয়ার্ড-গেমের ভূতে পেয়েছে জয়ন্ত ! সাবধান!’’

বললাম, ‘‘১৬০ নাম্বারটা কি কোনও সংকেত বলে মনে হচ্ছে না আপনার?’’

কর্নেল দাড়ি নেড়ে বললেন, ‘‘কে জানে৷’’ তারপর কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ চুরুট টানার পর টেলিফোনের দিকে হাত বাড়ালেন৷ একটা নাম্বার ডায়াল করে বললেন, ‘‘কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি৷ মিঃ মুখার্জিকে দিন না প্লিজ ! মিঃ মুখার্জি? হ্যাঁ৷ আপনার সঙ্গে একটু জরুরি কথা আছে৷ না৷ ফোনে বলা যাবে না৷ মুখোমুখি ঠিক আছে৷ কাল সকালে ৯টায় যাচ্ছি৷ ধন্যবাদ, রাখছি৷’’

কান খাড়া করে শুনছিলাম৷ বললাম, ‘‘মিঃ মুখার্জি মানে কি সেই রিটায়ার্ড অ্যাডভোকেট শচীনবাবু?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ তুমি ইচ্ছে করলে সঙ্গী হতে পারো৷ না কি উড়োফোনের হুমকিতে ভয় পেয়ে গেছ?’’

বললাম ‘‘আপনার সঙ্গে থাকলে যমরাজকেও ভয় পাই না!’’

‘‘কিন্তু তোমার মুখে অস্বস্তির ছাপ!’’

‘‘নাহ৷ ও কিছু নয়৷’’

‘‘তবে ডার্লিং! ওয়ার্ড-গেমের ভূত তোমাকে একটা অঙ্ক উপহার দিয়েছে৷’’

সত্যি ওয়ার্ড-গেমের ভূত আমাকে পেয়ে বসেছিল৷ বাড়ি ফিরে অনেক রাত্রি পর্যন্ত সেই ছকটা নিয়ে অনেক জল্পনা এবং আঁক কষাকষি চলেছিল৷ শেষে ক্লান্ত হয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ সে-রাত্রে ভয়ঙ্কর-ভয়ঙ্কর সব দুঃস্বপ্ন দেখেছিলাম৷ খুনখারাপি, ভূতপ্রেত, আবার কখনও পরীক্ষার হলে বসে অঙ্কের পরীক্ষা দিচ্ছি কিন্তু কিছুতেই অঙ্ক কষতে পারছি না, এইসব দুঃস্বপ্ন৷

সকালে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে শুনলাম, কিছুক্ষণ আগেই হরিবাবু সেই কালো নোটবইটা নিয়ে গেছেন৷ কর্নেল আমার অপেক্ষা করছিলেন৷ আমরা ভবানীপুরে অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবীর বাড়ি রওনা হলাম৷

বাড়িটা কলকাতার আর-সব বনেদি অভিজাত বংশীয়দের বাড়ির মতো বিরাট৷ মস্ত গেট এবং সুদৃশ্য লন৷ চারদিকে উঁচু দেওয়াল ঘেরা আছে৷ মধ্যিখানে পুরোনো আমলের বিলিতি স্থাপত্য৷ বড়ো-বড়ো থাম৷ ফুলবাগানে মর্মর-মূর্তি৷

একটা লোক আমাদের বসার ঘরে অপেক্ষা করতে বলে গেল৷ কর্নেল বললেন, ‘‘শচীনবাবুর চেম্বার ছিল ওপাশের একটা আলাদা বাড়িতে৷ সেটা এখন নার্সিংহোম৷ এক ডাক্তারকে ভাড়া দিয়েছেন৷ শচীনবাবুর ছেলে নেই৷ এক মেয়ে৷ সে স্বামীর কাছে আমেরিকায় থাকে৷’’

ভেতরকার দরজার পর্দা তুলে নাদুস-নুদুস চেহারার এক ভদ্রলোক বেরুলেন৷ তাঁর হাতে একটা ছড়ি৷ কর্নেল নমস্কার করে বললেন, ‘‘আলাপ করিয়ে দিই৷ দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার রিপোর্টার জয়ন্ত চৌধুরি৷’’

শচীনবাবু ভুরু কুঁচকে আমাকে দেখে বললেন, ‘‘খবরের কাগজের লোক সঙ্গে এনেছেন কেন কর্নেল সায়েব? পাবলিসিটি ব্যাপারটা আমি পছন্দ করি না৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘না না৷ ও আমার তরুণ বন্ধু৷ সময় পেলেই আমার সঙ্গী হয়৷’’

‘‘যাক গে৷ বলুন কী ব্যাপার!’’ বলে আইনজীবী বসলেন৷ মনে হল বাতের অসুখে ভুগছেন৷ একটা পা ছড়িয়ে দিলেন৷ গায়ে গলাবন্ধ লম্বা কোট৷ মাথায় মাফলার জড়ানো এবং পরনে পাজামা৷ পায়ে মোজা ও পাম-শু৷

কর্নেল বললেন, ‘‘হরিচরণ গাঙ্গুলি নামে কেউ একসময় আপনার ক্লার্ক ছিলেন?’’

‘‘হরি?’’ আইনজীবী নিষ্পলক চোখে তাকালেন৷ ‘‘হরির আবার কী হল? শুনেছি, সে তো এখন আলিপুর কোর্ট-চত্বরে বসে টাইপ করে৷ ভালোই কামায়৷’’

‘‘মিঃ মুখার্জি! উনি আপনার ক্লার্ক ছিলেন কি না জানতে চাইছি৷’’

‘‘ছিল৷ কিন্তু কেন জানতে চাইছেন?’’

‘‘ওঁকে কি আপনি কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন, নাকি উনি নিজে থেকেই কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন?’’

শচীনবাবু একটু গুম হয়ে থাকার পর বললেন, ‘‘ছাড়িয়ে দিয়েছিলাম৷ প্যাকটিস ছেড়ে দিলেও ওকে রাখতাম৷ অন্য কাজ অনেক ছিল৷ করাতাম! কিন্তু আমার ঠাকুরঘর থেকে বিগ্রহ চুরি গেল৷ যাকে-যাকে সন্দেহ হয়েছিল, হরি তাদের একজন৷’’

‘‘কী বিগ্রহ?’’

‘‘রাধা-কৃষ্ণ৷’’ বলে শচীনবাবু কপালে দু’হাত জোড় করে ঠেকালেন৷ গাঢ় স্বরে ফের বললেন, ‘‘বংশের প্রাচীন বিগ্রহ৷ আমরা পুরুষানুক্রমে বৈষ্ণব৷ পাঁচশো বছরের প্রাচীন বিগ্রহ স্বয়ং শ্রীচৈতন্যের হাত থেকে আমার পূর্বপুরুষ আশীর্বাদ স্বরূপ পেয়েছিলেন৷’’

‘‘কোনও রত্ন ছিল বিগ্রহে?’’

‘‘ছিল৷ বাজারদরের কথা যদি ধরেন, তবে তার দাম তত কিছু নয়৷ কিন্তু যদি ইতিহাস এবং আর্টের প্রশ্ন তোলেন, বলব...ওই বিগ্রহ দুর্লভ৷’’

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘‘রেয়ার আর্ট?’’

শচীনবাবু সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, ‘‘রেয়ার আর্ট কী বলছেন? রেয়ারেস্ট আর্ট!’’

‘‘বেস্ট!’’

‘‘অ্যাঁ?’’ শচীনবাবু রুষ্ট মুখে আমার দিকে তাকালেন৷

কর্নেল দ্রুত বললেন, ‘‘আচ্ছা মিঃ মুখার্জি, আপনারা ব্রাহ্মণ৷ তো আপনি নিজেই পুজো করতেন, নাকি পুজোর জন্য সেবায়েত ঠাকুর রেখেছিলেন?’’

শচীনবাবু অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘‘আমি মশাই কোর্ট-কাছারি করতাম৷ ওকালতি পেশা৷ মিথ্যাকে সত্য, আবার সত্যকে মিথ্যা করা ছিল আমার কারবার৷ আমি স্পষ্ট কথা পছন্দ করি৷ নিজে পুজোর মতো পবিত্র কর্ম করতে সংকোচ হত, তাই ঠাকুর রেখেছিলাম৷ বংশের আরাধ্য বিগ্রহের সেবা-যত্ন, তারপর দোল বা রাসপূর্ণিমা ইত্যাদির বাৎসরিক সব অনুষ্ঠান ঠাকুরমশাই-ই সামলাতেন৷ আমার অত সময়ই বা কোথায়?’’

‘‘বিগ্রহ কীভাবে চুরি গিয়েছিল?’’

‘‘ঠাকুরঘরের তালা ভেঙে চোর ঢুকেছিল৷ ভোরে গঙ্গাস্নান করতে যাওয়ার সময় ঠাকুরমশাই দেখেন দরজার তালা ভাঙা৷ ভেতরে বিগ্রহ নেই৷ পুলিশ এল৷ বাড়ির লোকজন বলতে আমি, আমার স্ত্রী, একমাত্র মেয়ে, এবং কর্মচারী ঝি-চাকর-দারোয়ান এরা৷ পুলিশ জেরা করে চলে গেল৷ সন্দেহ করার মতো কাউকে পায়নি৷ সেই রাত্রে ঠাকুরমশাই মনের দুঃখে আত্মহত্যা করেছিলেন৷’’ শচীনবাবু ভিজে কণ্ঠস্বরে বললেন, ‘‘একটু পাগলাটে সাধক-টাইপ লোক ছিলেন৷ তো হরি যদিও রাত্রে পাইকপাড়ায় নিজের বাসায় থাকত, আমার কেন যেন তার ওপরেও সন্দেহ হয়েছিল৷ এত বছর পরে আর মনে নেই কেন ওকে সন্দেহ করেছিলাম৷’’

‘‘আপনি ওঁর মামাতো ভাই শ্যামসুন্দরকে চিনতেন?’’

‘‘নামটা চেনা ঠেকছে৷ শ্যামসুন্দর বলে...’’ শচীনবাবু কিছুক্ষণ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘হরি মাঝে-মাঝে তার এক আত্মীয়কে এনে চাকরির জন্য সুপারিশ করত মনে পড়ছে৷ সে-ই কি?’’

‘‘আচ্ছা মিঃ মুখার্জি, হরিবাবুর এ বাড়িতে গতিবিধি কি অবাধ ছিল?’’

‘‘তা ছিল৷ আমার কর্মচারীদের আমি নিজের ফ্যামিলির লোক মনে করতাম৷ এখনও করি৷ এখন অবশ্য আর অত লোক নেই৷ দরকারও হয় না৷’’

‘‘হরিবাবু তার সেই আত্মীয়কে নিয়ে এ বাড়ি আসতেন কি?’’

‘‘এসে থাকবে৷ মনে নেই৷’’

‘‘কেন হরিবাবুকে সন্দেহ হয়েছিল, মনে পড়ছে না?’’

শচীনবাবু নড়ে বসলেন৷ ‘‘ও! হ্যাঁ৷ আমার এক কর্মচারী আমার বৈমাত্রেয় ভাই তরুণের বাড়ি থেকে হরিকে বেরুতে দেখেছিল বিগ্রহ চুরির কিছুদিন আগে৷ পুলিশ তরুণকে জেরা করেছিল৷ তরুণ বলেছিল, হ্যাঁ, হরি ওর সেই আত্মীয়ের চাকরির জন্য নাকি গিয়েছিল৷ তবে আজও আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তরুণই বিগ্রহ চুরি করিয়েছিল৷ ওর মতো বদমাইশ আর দুটি নেই৷ দেশবিদেশে ব্যবসা করে৷ বিদেশে ওই বিগ্রহ বেচে বহু টাকা দাম পেয়েছে৷ জানেন? তরুণ দু’নম্বরি ব্যবসা করে৷ নিষিদ্ধ মাদক৷ বুঝলেন? আমি ওকে এবার ধরিয়ে দেব৷ জেল খাটিয়ে ছাড়ব৷’’

‘‘মিঃ মুখার্জি, হরিবাবুর নাকের বাঁ-পাশে কি প্রকাণ্ড জড়ুল ছিল?’’

আইনজীবী হঠাৎ এই প্রশ্নে খাপ্পা হয়ে গেলেন৷ ‘‘আপনি ও মাসে এসে আমার বরমডিহির বাড়ি সম্পর্কে একটা ভূতুড়ে গল্প ফেঁদে গেলেন৷ আজ এসে আবার হাজারটা প্রশ্ন৷’’

‘‘প্লিজ মিঃ মুখার্জি...’’

শচীনবাবু মুখ বিকৃত করে বললেন, ‘‘হরির নাকের পাশের জড়ুল নিয়ে আপনার মাথাব্যথা কেন? হঠাৎ জড়ুলের কথা আসছে কোথা থেকে, বুঝি না৷’’

‘‘তাহলে ছিল?’’

‘‘জড়ুলটা বিচ্ছিরি দেখাত বলে বলতাম, অপারেশন করে নিও৷ নিয়েছে কিনা কে জানে?’’

‘‘অপারেশন করে নিয়েছেন৷’’

‘‘তা হঠাৎ জড়ুল নিয়ে পড়লেন কেন? হরিকে আপনি চিনলেন কী করে?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘আলিপুর কোর্টে আমার এক আত্মীয়ের একটা মামলা চলছে৷ সেই সূত্রে আলাপ হয়েছে হরিবাবুর সঙ্গে৷ টাইপিস্টের কাজ করেন৷ কথায়-কথায় বলছিলেন, আপনার ক্লার্ক ছিলেন৷’’

‘‘আমার নিন্দে করছিল নাকি?’’

‘‘না, না৷ খুব সুখ্যাতি করছিলেন৷’’

আইনজীবীর মুখ দেখে মনে হল, কথাটা বিশ্বাস করলেন না৷ বললেন, ‘‘যাক গে৷ আপনার আসার আসল উদ্দেশ্য কী, এবার খুলে বলুন৷ আমি স্পষ্ট কথা ভালবাসি৷ আপনি কর্নেল সায়েব বলেই এতক্ষণ কথা বলছি৷’’

একজন পরিচারক এতক্ষণে চায়ের ট্রে আনল৷ আইনজীবী খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘‘তোদের চৌদ্দ মাসে বছর! দু’কাপ চা করতেই... নিন কর্নেল সায়েব! চা খান৷ কিছু মনে করবেন না, মাঝে-মাঝে আমার মেজাজ কেমন বিগড়ে যায় আজকাল৷ কীভাবে যে বেঁচে আছি! একে বাঁচা বলে?’’

ভদ্রলোকের কথাবার্তার ভঙ্গি দেখে আমারও মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু কর্নেলের দেখাদেখি চায়ের কাপ হাতে নিতে হল৷ তাছাড়া বিগ্রহ-চুরির ঘটনা সেই কালো নোটবইয়ের ওয়ার্ড-গেমের সঙ্গে জড়িয়ে রহস্য সত্যিই ঘনীভূত হয়ে উঠেছে এবার৷

কর্নেল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘‘আপনার ঠাকুরঘর থেকে ঐতিহাসিক পবিত্র বিগ্রহ চুরি গিয়েছিল৷ পুলিশ তা আজ পর্যন্ত উদ্ধার করে দিতে পারেনি৷ আমার মনে হচ্ছে, বিগ্রহ এখনও বিদেশে পাচার হয়নি; কোথাও তা লুকানো আছে৷ যদি আপনি এই প্রশ্নটার উত্তর সঠিক দেন, তাহলে আমি হয়তো বিগ্রহ উদ্ধার করে দিতে পারব৷’’

শচীনবাবু ভুরু কুঁচকে তাকালেন কর্নেলের দিকে৷ ‘‘আপনি তো নেচারিস্ট৷ আপনার কার্ডে লেখা আছে কথাটা৷ তা আপনি ভেতর-ভেতর গোয়েন্দগিরিও করেন বলে সন্দেহ হচ্ছে?’’

‘‘না মিঃ মুখার্জি৷ আমি মাঝে-মাঝে কোনও রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেলে সেই রহস্য ফাঁস করতে উঠে পড়ে লাগি৷ আমার এ-ও একটা হবি বলতে পারেন৷’’

‘‘বিগ্রহ চুরিতে রহস্য কোথায় মশাই? স্রেফ চুরি৷ ওই তরুণের কীর্তি!’’

‘‘আপনার বরমডিহির বাড়িতে যে-ঘটনার কথা বলেছিলাম, আমার ধারণা তার সঙ্গে আপনার বিগ্রহ চুরির যোগসূত্র আছে৷’’

‘‘অ্যাঁ! বলেন কী?’’

‘‘আপনি আমাকে এবার এই প্রশ্নের উত্তর দিন৷’’

‘‘বলুন!’’

‘‘বিগ্রহ কি আপনি বৈমাত্রেয় ভাই তরুণকে ফাঁসানোর জন্য নিজেই চুরি করে...’’

আইনজীবী ফ্যাঁসফেঁসে গলায় আর্তনাদের সুরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘‘বেরিয়ে যান আপনারা! গেট আউট ফ্রম মাই হাউস! বেরিয়ে যান বলছি! নইলে দারোয়ান ডেকে বের করে দেব৷’’

কর্নেল তুম্বো মুখে উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর হনহন করে বেরিয়ে গেলেন৷ আমি যে ওঁকে অনুসরণ করলাম, তা বলা নিষ্প্রয়োজন৷

জড়ুল এবং বিগ্রহ

রাস্তায় গিয়ে বললাম, ‘‘হঠাৎ উকিল ভদ্রলোককে ওই অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন কেন?’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘গ্যাব-রেয়ার-আর্টস-বেস্ট৷’’

‘‘ভ্যাট! খালি হেঁয়ালি করা অভ্যাস আপনার৷’’

‘‘ওয়ার্ড-গেম ডার্লিং, ওয়ার্ড-গেম!’’

কথা বললে আরও হেঁয়ালি বাড়বে৷ তাই চুপ করে গেলাম৷ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্যাক্সির কাছে গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘আলিপুর কোর্ট৷ যাবেন নাকি?’’

ট্যাক্সি ড্রাইভাররা, বরাবর দেখে আসছি; কর্নেলের কথায় না করে না৷ পাদরিসুলভ চেহারার জন্য, কিংবা বিদেশি সায়েবের দেশি নমুনায় বশীভূত হয় কি না কে জানে!

আলিপুর কোর্ট-চত্বরে নেমে কর্নেল পকেট থেকে হরিবাবুর সেই কার্ডটা বের করে দেখে নিলেন৷ তারপর হাঁটতে শুরু করলেন৷ ভিড়ে ভরা সংকীর্ণ রাস্তা, পাশে একটা ড্রেন৷ একটা ঝাঁকড়া গাছের তলায় তেরপল টাঙানো ছিল৷ সেখানে একটা টেবিল-চেয়ার এবং টেবিলে একটা ছোট্ট টাইপ রাইটার৷ কর্নেল সেখানে দাঁড়ালে এক তরুণ ছুটে এল৷ ‘‘হরিকাকুকে খুঁজছেন স্যার? হোটেলে এক্ষুনি খেতে গেলেন৷ এসে পড়বেন শিগগির৷ একটু ওয়েট করুন৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘তুমি কি হরিবাবুর অ্যাসিস্ট্যান্ট নাকি?’’

‘‘আমি স্যার এখানে সবাইকে হেল্প করি৷’’

‘‘কী হেল্প করো?’’

‘‘হেল্প বোঝেন না স্যার?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘বুঝলাম, কিন্তু ধরো; আমার হঠাৎ এখনই একটা চিঠি লেখানোর দরকার৷ তুমি কি হেল্প করতে পারবে?’’

‘‘ওই তো মাখনদা টাইপ করছে৷ চলুন ওখানে৷’’

‘‘নাহ৷ আমার বাংলায় একটা চিঠি লেখাতে হবে৷’’

‘‘এখানে তো বাংলায় টাইপ হয় না স্যার ! নাকি হয়...দাঁড়ান, জিজ্ঞেস করে আসি৷’’

‘‘হাতের লেখাই চলবে৷ খুলে বলি, তা হলেই বুঝবে৷’’ কর্নেল আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘‘এই ভদ্রলোক অবাঙালি ব্যবসায়ী৷ ইংরেজিও ভালো জানেন না; তা না হলে এঁকে দিয়েই লেখাতাম৷ একটু বুঝিয়ে লিখতে হবে৷ আর এই দেখো, আমার হাতের অসুখ৷ সব সময় খালি কঁপে৷’’

কর্নেলের হাতের কাঁপুনি দেখে আমি হতবাক!

স্মার্ট তরুণটি বলল, ‘‘খামে না পোস্টকার্ডে না ইনল্যান্ডে?’’

কর্নেল কাঁপা-কাঁপা হাতে পকেট থেকে একটা পোস্টকার্ড বের করে দিলেন৷ বললেন, ‘‘আমার কাজের লোক বিষ্ণু দেশে গেছে৷ খুব অসুবিধে হচ্ছে৷ শিগগির আসতে লেখো৷ এমন করে লিখতে হবে যেন চিঠি পেয়েই চলে আসে৷ একটু তাড়াতাড়ি করতে হবে ভাই৷ ওই পোস্ট অফিসে পোস্ট করে চলে যাব৷ ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে রেখেছি৷’’

তরুণটি তক্ষুনি পোস্টকার্ডে দ্রুত কলম চালাল৷ এক মিনিটেই এক পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলল৷ পরে পৃষ্ঠায় আধমিনিট৷ তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, ‘‘এমন লিখলাম স্যার, চিঠি পেয়েই...হুঁ৷ ইতি- আপনার নাম বলুন৷’’

‘‘শিবপদ মজুমদার, ব্যস! আর কিছু না৷ ঠিকানা লেখো- বিষ্টুচরণ ধাড়া৷ গ্রাম আর পোস্ট অফিস গোবিন্দপুর৷ জেলা বর্ধমান৷ পিনকোড জানি না৷’’

পোস্টকার্ড নিয়ে কর্নেল তাকে একটা পাঁচ টাকার নোট দিলেন৷ সে টাকা পকেটস্থ করে বলল, ‘‘হরিকাকু জানতে পারলে রাগ করবে৷ আপনারা কেটে পড়ুন স্যার৷ ওর আসার সময় হয়ে গেল৷’’

‘‘তুমি হরিবাবুকে কিছু বলবে না৷ তা হলেই হল৷’’

‘‘আমার মাথা খারাপ?’’

কর্নেল হন্তদন্ত ড্রেন ডিঙিয়ে চলতে থাকলেন৷ তারপর একটা ট্যাক্সিও পাওয়া গেল৷ ট্যাক্সিতে চেপে বললাম, ‘‘ব্যাপারটা কী?’’

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘‘দৈবাৎ একটা চান্স পেয়ে গেলে ছাড়ি না৷ তবে আমি ঠিক এটাই ভেবে রেখেছিলাম৷ কোর্ট এলাকা বড়ো বিচিত্র, জয়ন্ত৷ কত রকমের পেশার লোক ঘুরে বেড়ায়৷’’

হেঁয়ালি শুনে চুপ করে গেলাম৷ কর্নেল পোস্টকার্ডে মন দিয়েছেন৷

ইলিয়ট রোডের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল বললেন, ‘‘এ বেলা আমার এখানে তোমার লাঞ্চের নেমন্তন্ন৷ বিকেলে দু’জনে একসঙ্গে একবার বেরুব৷ কিন্তু না, কোনও প্রশ্ন কোরো না; শুধু চুপচাপ দেখে যাও৷ কেমন?’’

কর্নেল আমার কাঁধ চাপড়ে দিলেন৷ তারপর টেবিলের ড্রয়ার খুলে হরিবাবুকে লেখা লালকালির সেই চিঠিটা বের করে পোস্টকার্ডের লেখার পাশে রাখলেন৷ হাতে আতসকাচ৷ একটু পরে বললেন, ‘‘ওই ছোকরা দারুণ চৌকস৷ হুমকি দেওয়া চিঠিটা ওর হাতেরই লেখা৷ খামের ঠিকানা অন্য কারও হাতের লেখা৷ যে হরিবাবুকে হুমকি দেওয়া চিঠিটা ওই ছোকরাকে দিয়ে লিখিয়েছে, সে খুব সতর্ক৷ তাই হরিবাবুর ঠিকানাটা নিজের হাতে লিখেছে৷ পুলিশ যদি হাতের লেখা সনাক্ত করে শেষ পর্যন্ত ছোকরাটিকে পাকড়াও করে, বিপদটা ওর ঘাড় দিয়েই যাওয়ার চান্স ছিল৷ কিন্তু শেষমেশ হতটা কী? ছোকরাটির তো ওই ধরনেরই পেশা৷ তবে দেখো জয়ন্ত, ছোকরা বলা মানে গাল দেওয়া৷ ছেলেটি ভালো বাংলা লেখে৷ হয়তো খুব গরিব বলে বেশি লেখাপড়ার চান্স পায়নি কিন্তু চলতি বাংলা চমৎকার আসে ওর হাত দিয়ে৷ ইচ্ছে করলে ছেলেটি লেখক হতে পারত এবং তোমার চেয়ে অনেক ভালো গদ্য লিখত, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই৷’’

গম্ভীর হয়ে বললাম, ‘‘আমি কোনও প্রশ্ন করব না কিন্তু; আপনার নির্দেশ৷’’

‘‘আমিই তোমার হয়ে প্রশ্ন তুলছি৷ ছেলেটি হরিবাবুকে কাকু বলে৷ তাকে হুমকি দেওয়া চিঠি সে লিখল কেন? এর উত্তর হল, চিঠিতে কাকেও সম্ভাষণ করা হয়নি৷ কাজেই চিঠিটা যে হরিবাবুকে লেখা হচ্ছে, ছেলেটি জানত না৷ প্রশ্ন উঠবে, ছেলেটি এমন চিঠি লিখতে রাজি হল কেন? না...ছেলেটি জানে কোর্টের পরিবেশে ক্রিমিন্যালরাও ঘোরাফেরা করে৷ দ্বিতীয়ত, ছেলেটির টাকার দরকার৷ ওই পরিবেশটাই টাকা রোজগারের নানা ধান্দা-সুযোগ সামনে এনে দেয়৷ সেই সুযোগ যারা ওখানে ঘোরাফেরা করে, তারা ছাড়ে না৷ ছেলেটিও ছাড়েনি৷’’

এবার বললাম, ‘‘ছেলেটি আপনার কেসে মূল্যবান সূত্র৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ তবে এখন এই সূত্রের দিকে আমি হাঁটছি না৷’’ কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চুরুট ধরালেন৷ একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘‘তোমার প্রশ্ন ছিল, শচীন্দ্রলাল মুখার্জি নিজের বৈমাত্রেয় ভাইকে চুরির দায়ে ফাঁসানোর জন্য যে বিগ্রহ চুরি করেছিলেন, তা আমি জানলাম কী করে? বিগ্রহ-চুরির কথা আমি জানতাম না৷ তা শোনার পর আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে ওঁর প্রতিক্রিয়া বুঝতে চেয়েছিলাম৷’’

‘‘কী বুঝলেন?’’

‘‘ওঁর ক্ষতস্থানে আঘাত করেছি৷ চিন্তা করো জয়ন্ত ! আফটার অল আমি, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার৷ আমার এই চেহারা এবং ব্যক্তিত্ব...না, হেসো না, তুমি বাস্তবতার দিক থেকে চিন্তা করে দেখো...যতই বদরাগী এবং দুঁদে আইনজীবী হোন কিংবা অভিজাতবংশীয় হোন, কোনও ভদ্রলোক ওই ভঙ্গিতে অভদ্রভাবে আমাকে বেরিয়ে যেতে বা দারোয়ান ডেকে বের করে দেওয়ার কথা তৎক্ষণাৎ মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবেন না৷ তর্ক করতেন ক্রুদ্ধভাবে৷ কিংবা আমাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করতেন৷ কিন্তু আমি কথাটা শেষ না করতেই উনি হিংস্র হয়ে উঠলেন৷ তার মানে, আমার মুখোমুখি আর একমুহূর্ত বসে থাকার ক্ষমতা ওঁর ছিল না৷ আমি সাধারণ মানুষ হলে অন্য কথা ছিল; কিন্তু আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার৷ আমি উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার ছিলাম৷ আমাকে...’’

‘‘হ্যাঁ৷ আপনার কথায় যুক্তি আছে৷’’

‘‘এবার আমার থিওরি হল, শচীনবাবু বিগ্রহ নিজেই চুরি করে কোনও বিশ্বস্ত লোকের হাত দিয়ে তরুণবাবুর বাড়িতে পাচার করেই পুলিশে খবর দিতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু বিশ্বস্ত লোকটির হাত থেকে বিগ্রহ অন্য হাতে চলে যায়৷ কিংবা এমনও হতে পারে সেই লোকটিই বিগ্রহ আত্মসাৎ করে মিথ্যা কথা বলে শচীনবাবুকে৷ ক্রুদ্ধ শচীনবাবু তাকে বরখাস্ত করে তাড়িয়ে দেন৷’’

‘‘হরিবাবু সেই বিশ্বস্ত লোক নন তো?’’

‘‘এক্ষেত্রে সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ বলা চলে৷’’

‘‘কিন্তু দেখা যাচ্ছে হরিবাবুকে কেউ হুমকি দিয়ে শ্যামবাবুর নোটবই চাইছে৷ তার মানে, হরিবাবুর হাত থেকে শ্যামবাবু তা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছিলেন৷ কিন্তু এ পর্যন্ত কোনও কারণে বেচতে পারেননি, লুকিয়ে রেখেছেন৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হুঁ, বলে যাও!’’

‘‘তাহলে নোটবইয়ের ওয়ার্ড-গেমে এমন কোনও সংকেত আছে, যা থেকে শ্যামবাবুর লুকিয়ে রাখা বিগ্রহের খোঁজ মিলবে৷ এবার কিন্তু তৃতীয় একটি পার্টি এসে যাচ্ছে৷’’

‘‘আসছে বটে!’’ কর্নেল হঠাৎ হেসে উঠলেন৷ ‘‘ওয়ার্ড-গেম ছেড়ে এখন আমরা থিওরি-গেম বা তত্ত্ব-ক্রীড়ায় রত হয়েছি৷ বাজে জল্পনা ডার্লিং, বাজে জল্পনা!’’ বলে হাঁক দিলেন, ‘‘ষষ্ঠী! আমরা খেতে বসব৷’’

ষষ্ঠী পর্দার ফাঁকে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘‘সব রেডি বাবামশাই!...’’

খাওয়ার পর ভাতঘুম আমার বহু বছরের অভ্যাস৷ ডিভানে লম্বা হয়েছিলাম৷ কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে একটা গাদা বইয়ের পাতায় মনোনিবেশ করেছিলেন৷ কতক্ষণ পরে কর্নেলের ডাকে উঠে বসলাম৷ সাড়ে তিনটে বাজে৷ শীতের দিনে সাড়ে তিনটে মানে বিকেল৷ ‘‘উঠে পড়ো৷ গরম কফি খেয়ে চাঙ্গা হয়ে নাও৷ একটু পরে বেরুব৷’’

ষষ্ঠী কফির ট্রে রেখে গিয়েছিল৷ কর্নেল কফি তৈরি করে আমাকে দিলেন৷ নিজেরটা তৈরি করে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘‘বরমডিহিতে দেখা সেই তুর্কি ঘোড়সওয়ার সম্পর্কে কিছু তথ্য পেলাম৷’’

‘‘সেই অলক্ষুনে প্রজাপতিটা?’’

‘‘অলক্ষুনে কী বলছ ডার্লিং ! মধ্য-এশিয়ার এই প্রজাতির প্রজাপতি এদেশে আমদানি করেছিলেন স্বয়ং মুগল বাদশাহ জাহাঙ্গির৷ তার একটা চিড়িয়াখানা ছিল৷ ফুল বাগিচায় ওই প্রজাপতি...’’

কর্নেলের কথা শেষ হল না৷ ডোরবেল বাজল৷ একটু পরে ষষ্ঠীর পাশ কাটিয়ে হরিবাবু ঘরে ঢুকলেন৷ ধপাস করে সোফার কোনায় বসে ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললেন, ‘‘নিয়ে গেল স্যার! ওঃ! কী বাঁচা যে বাঁচলাম৷ আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে আজ সকাল-সকাল চলে এলাম কাজ ছেড়ে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘নোটবইটা?’’

‘‘আজ্ঞে! লোকটার চেহারা স্যার একবারে মস্তানমার্কা৷ ‘এন বি এনেছ’ বলামাত্র হাতে তুলে দিলাম৷ চলে গেল৷ সাহস করে মুখ তুলে তাকাতে পারিনি৷ পেছনটা দেখেছি৷ ওঃ! কী বাঁচা বাঁচলাম ঠাকুরই জানেন!’’

কর্নেল হাঁকলেন, ‘‘ষষ্ঠী! একটা পেয়ালা দিয়ে যা৷ গেস্ট এসেছেন৷ একটুখানি কফি খান হরিবাবু! উত্তেজনা দূর হবে৷ নার্ভ চাঙ্গা হবে৷’’

হরিবাবু রুমাল বের করে মুখ মুছলেন৷ ষষ্ঠী একটা পেয়ালা দিয়ে গেল৷ কর্নেল পট থেকে কফি ঢেলে দুধ-চিনি মিশিয়ে ওঁর হাতে তুলে দিলেন৷ হরিবাবু চুমুক দিয়ে বললেন, ‘‘আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ জানাব স্যার!’’

‘‘আচ্ছা হরিবাবু, রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ আপনার হাতছাড়া হয়েছিল কীভাবে?’’

হরিবাবু চমকে উঠলেন৷ গলায় কফি আটকে কাশতে শুরু করলেন৷ চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছিল৷ সামলে নিয়ে বললেন, ‘‘বি-বিগ্রহ স্যার?’’

‘‘হ্যাঁ৷ অ্যাডভোকেট শচীনবাবু আপনাকে বিগ্রহ তরুণবাবুর বাড়িতে কোথাও লুকিয়ে রেখে আসতে বলেছিলেন৷’’ কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘না না৷ লুকোবার কিছু নেই৷ যা হবার তা হয়ে গেছে৷’’

‘‘স্যার! শচীনবাবু আপনাকে তা-ই বলেছেন?’’

‘‘বলেছেন৷ আপনি কফি খেতে-খেতে বলুন৷ উত্তেজিত হবেন না!’’

হরিবাবু কফির পেয়ালা টেবিলে রেখে বললেন, ‘‘রাজায়-রাজায় যুদ্ধ হয় আর উলুখাগড়ার প্রাণ যায়, সেই অবস্থা৷ আমি স্যার অত রাত্রে ছোটোবাবুর বাড়ি ঢোকার সাহস পাইনি৷ এইটুকু দুটো বিগ্রহ বেদিতে আটকানো, ব্যাগে ভরা ছিল৷ রাত্রে বাসায় নিয়ে গিয়ে রেখেছিলাম৷ দিনের বেলা কোনও এক ছলে ছোটোবাবুর বাড়িতে রেখে আসার ইচ্ছে ছিল৷ সেই রাত্রে শ্যামা আমার বাসায় ছিল৷ বদমাশ শ্যামা কী করে টের পেয়েছিল জানি না৷ ভোরবেলা বাথরুমে গেছি৷ তারপর এসে দেখি শ্যামা নেই৷ বিগ্রহও নেই৷’’

‘‘কিন্তু শ্যামবাবুর নোটবইটা বিগ্রহের ছবির পেছনে পাওয়া গেল৷ এর ব্যাখ্যা কী?’’

‘‘সেটাই তো বুঝতে পারছি না স্যার!’’

‘‘আপনি কফি খান৷ আপনার আর ভয় কিসের? নোটবই দিয়েছেন, এবার কফি খান৷’’

হরিবাবু আড়ষ্ট হাতে কফির পেয়ালা তুলে নিলেন৷ তাঁকে নার্ভাস দেখাচ্ছিল৷

কর্নেল বললেন, ‘‘আপনি সকালে গিয়ে শচীনবাবুকে ঘটনাটা জানিয়েছিলেন৷ তাই না?’’

‘‘আজ্ঞে৷ শুনেই উনি আমাকে চড়থাপ্পড় মেরে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন৷ পুলিশে দেবেন বলে শাসাচ্ছিলেন৷ কিন্তু আমি আসল কথা ফাঁস করে দিতে পারি ভেবে অত দূর এগোননি৷’’

‘‘আপনার নাকের বাঁ-পাশের জড়ুলটা কতদিন আগে অপারেশন করেছেন?’’

হরিবাবু চমকে উঠলেন৷ ‘‘জ-জড়ুল সার?’’

‘‘হ্যাঁ৷ জড়ুল৷ শচীনবাবু বলছিলেন, আপনার জড়ুল অপারেশন করাতে বলতেন৷ আপনি নাকি ভয়ে অপারেশন করাননি৷ আপনার সেই বরমডিহির গ্রুপ ফোটোতে জড়ুলটা দেখেছি৷ কবে অপারেশন করালেন?’’

হরিবাবুর নাকের বাঁ-পাশে একটুখানি ক্ষতচিহ্ন দেখতে পেলাম৷ কাল ওটা লক্ষ্যই করিনি৷

হরিবাবু বললেন, ‘‘বছরখানেক আগে স্যার ! মরিয়া হয়ে অপারেশন করিয়েছি৷’’

‘‘ভালো করেছেন৷ বড়ো মোটা জড়ুল ছিল৷ তাই ছবিতে চোখে পড়েছিল৷’’

‘‘হ্যাঁ স্যার! মাঝে-মাঝে ফোঁড়ার মতো টনটন করত৷’’

‘‘কফি খান৷ আর চিন্তা কী?’’ বলে কর্নেল নিজের পেয়ালা শেষ করে চুরুট ধরালেন৷ একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘‘শ্যামবাবুর নোটবইটা আমি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছি৷ নোটবইয়ে বিগ্রহ লুকিয়ে রাখার গোপন সূত্র ছিল৷ আমি তার অর্থ উদ্ধার করেছি৷’’

হরিবাবু আবার চমকে উঠলেন৷ ‘‘কোথায় লুকোনো আছে বুঝতে পেরেছেন?’’

‘‘হুঁ৷ বরমডিহিতে শচীনবাবুর বাড়িতেই লুকোনো আছে৷’’

হরিবাবু তাকিয়ে রইলেন৷ নিষ্পলক চাউনি৷

কর্নেল বললেন, ‘‘জয়ন্ত এবং আমি নোটবইয়ে লেখা ওয়ার্ড-গেম থেকে সূত্র টের পেয়েছি৷ জয়ন্ত, তুমি ওঁকে বুঝিয়ে দাও সূত্রটা৷ তোমার সংখ্যাভিত্তিক হিসেবও দাও৷’’

আমি কর্নেলের কথার লক্ষ্য কী, বুঝতে পারছিলাম না৷ তবু কর্নেল আমার হাতে প্যাড গুঁজে দিলে আমি আগের মতো ইংরেজিতে শ্যামবাবুর গ্যাব-রেয়ার-আর্ট-বেস্ট শব্দগুলো সাজালাম৷ তারপর সংখ্যাগুলোও সাজিয়ে ফেললাম৷ যোগ করে দেখালাম ১৬০ হচ্ছে৷

এবার কর্নেল বললেন, ‘‘শচীনবাবু বলছিলেন, বরমডিহিতে নাকি ওঁর বাড়ি দুইতলায় মোট ২০টা ঘর৷ ১৬০-কে ২০ দিয়ে ভাগ করলে ৮ হয়৷ ৮ নম্বর ঘরের মেঝেয় তাহলে বিগ্রহ পোঁতা আছে৷

হরিবাবু শুকনো হাসি হাসলেন৷ ‘‘আজ্ঞে আমি স্যার ওসব সাতে-পাঁচে নেই৷ শচীনবাবুদের বিগ্রহ৷ ওঁদের বলুন৷ উদ্ধার করে পুজো দিক৷ আমি উঠি স্যার৷ নমস্কার৷’’

হরিবাবু চলে যাওয়ার পর বললাম, ‘‘বেচারাকে খামোকা ভড়কে দেওয়ার কারণ কী? নিরীহ ছাপোষা মানুষ!’’

কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, ‘‘আমার থিওরি যাচাই করে নিলাম৷ শুধু এটাই জানা গেল না, শ্যামবাবু নোটবইটা ওখানে রেখেছিলেন কেন? যদি বিগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কই থাকবে, তা হলে...নাহ ! মাথামুণ্ডু কিছু বোঝা যাচ্ছে না৷’’

‘‘কোথায় বেরুবেন বলছিলেন যে?’’

‘‘বেরুব৷’’ বলে কর্নেল পোশাক বদলাতে ভেতরের ঘরে ঢুকে গেলেন৷

হারাধনের অন্তর্ধান

যে সময়ের কথা বলছি, তখন খবরের কাগজের অফিস থেকে আমি কোনও গাড়ি পাইনি এবং কর্নেল তাঁর লাল রঙের পুরোনো ল্যান্ডরোভার গাড়িটিও বেচে দিয়েছেন৷ তাই কোথাও যেতে হলে ট্রাম-বাস-ট্যাক্সি দু’জনেরই সম্বল৷ তবে আগেই বলেছি, কর্নেলকে কোনও রহস্যময় কারণে কোনও ট্যাক্সি না বলে না৷

ব্র্যাবোর্ন রোডে যেতে-যেতে একখানে ট্যাক্সি থামিয়ে কর্নেল নামলেন৷ তখন বিকেল পৌনে পাঁচটা বাজে৷ শীতের শেষবেলায় এখনই রাস্তার ধারে আলো জ্বলে উঠেছে৷ দোকানপাটেও আলো জ্বলেছে৷ কর্নেল মুখ তুলে সাইনবোর্ডে দেখে নিয়ে বললেন, ‘‘পেয়ে গেছি৷ এসো৷’’

আগেই জিজ্ঞেস করেছি, আমরা কোথায় যাচ্ছি কিন্তু কর্নেল শুধু বলেছেন, ‘‘এসো তো!’’

এতক্ষণে একটা সাত-তলা বাড়ির সিঁড়িতে উঠে বিশাল দরজার পর লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘তরুণ মুখার্জির কোম্পানির অফিসে যাচ্ছি৷’’

পাঁচতলায় করুণাময়ী ট্রেডিং কোম্পানির অফিস৷ বেসরকারি বাণিজ্য সংস্থায় কর্মচারীদের দেখেছি ঘাড় গোঁজ করে কাজ করতে হয়৷ বাঁধা কাজের সময় বলে কিছু থাকে না৷ তখনও পুরোদমে কাজ চলেছে৷ কর্নেল একজন বেয়ারাকে তাঁর নেমকার্ড দিলেন৷ একটু পরে তরুণবাবুর ঘরে আমাদের ডাক পড়ল৷

বৈমাত্রেয় দাদার একেবারে উল্টো স্বভাবের মানুষ তরুণ মুখার্জি৷ বছর তিরিশ-বত্রিশ বয়স৷ ফিটফাট ধোপদুরস্ত পোশাক এবং স্মার্ট চেহারা৷ পরনে স্যুট-টাই৷ মুখে পাইপ৷ ইংরেজিতে সম্ভাষণ এবং করমর্দন করে আমাদের বসতে বললেন৷ দেখলাম, কর্নেল তাঁর পরিচিত৷

তরুণবাবু সহাস্যে বললেন, ‘‘আবার কোথাও ডেডবডি দেখেছেন নাকি কর্নেল সরকার?’’

কর্নেল একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘‘না৷ আমি একটা কথা জানতে এসেছি৷’’

‘‘আর কী কথা?’’

‘‘আপনাদের বংশের বিগ্রহ রাধাকৃষ্ণ সম্পর্কে৷’’

‘‘আমাকে তো দাদা তাঁর বংশের লোক বলে স্বীকারই করেন না৷’’ তরুণবাবুর মুখে হঠাৎ বিকৃতি ফুটে উঠল৷ ‘‘আপনাকে বলেছিলাম, ছাত্রাবস্থায় আমাকে এবং মা-কে ওই ভদ্রলোক আমার পৈতৃক বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন৷ অনেক লড়াই করে আমি এই অবস্থায় পৌঁছেছি৷ আপনাকে এ-ও বলেছিলাম, প্রকাশ্য আদালতে উনি আমার মা-কে আমার বাবার বিবাহিতা স্ত্রী বলে মানতে চাননি৷’’

‘‘প্লিজ মিঃ মুখার্জি! আমি আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে আসিনি৷ আমি ওই বিগ্রহ সম্পর্কে আপনার কাছে কিছু তথ্য জানতে এসেছি৷ কারণ এ ব্যাপারে আপনি আমাকে কিছু জানাননি৷’’

‘‘আপনি জিজ্ঞেস করেননি, তাই বলিনি৷’’

‘‘এখন জিজ্ঞেস করছি৷’’

তরুণবাবু গুম হয়ে বললেন, ‘‘কফি খাবেন, না চা?’’

‘‘কিছু না৷ আপনি বিগ্রহ সম্পর্কে বলুন৷’’

‘‘হরি গাঙ্গুলি নামে দাদার একজন ক্লার্ক ছিল৷ সে—’’

তরুণবাবু থেমে গেলেন৷ কর্নেল বললেন, ‘‘বলুন৷’’

‘‘সে—গোপন করতে চাই না, আমাকে দাদার লিগ্যাল লড়াইয়ের প্ল্যান সম্পর্কে আগাম খবর পাচার করত৷ তাকে টাকা দিতাম৷ তার এক আত্মীয়কে আমার ফার্মে চাকরিও দিয়েছিলাম৷’’

‘‘শ্যামসুন্দর নাম ছিল তার?’’

‘‘আপনি জানেন দেখছি!’’

‘‘জেনেছি৷ আপনি বলুন৷’’

‘‘অনেক বছর আগের কথা৷ হঠাৎ একদিন কাগজে পড়লাম ভবানীপুরে আমাদের পৈতৃক বাড়ি থেকে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ চুরি গেছে৷ মা তখন বেঁচে নেই৷ আমি বিচলিত হয়ে উঠেছিলাম৷ ওই বিগ্রহ নাকি স্বয়ং শ্রীচৈতন্যের আশীর্বাদ—’’

‘‘শুনেছি৷ আপনার দাদার সঙ্গে আমি দেখা করেই আপনার কাছে এসেছি৷’’

‘‘তো ক’দিন পরে হরি এসে একটা সাংঘাতিক কথা বলল৷ দাদা নাকি নিজেই বিগ্রহ চুরি করে আমাকে ফাঁসানোর জন্য তার হাত দিয়ে আমার বাড়িতে পাচার করতে চেয়েছিলেন৷ সেই বিগ্রহ হরির ঘর থেকে চুরি গেছে৷ হরির বাসাতেই শ্যামসুন্দর থাকত৷ সে নাকি পালিয়েছে বিগ্রহ নিয়ে৷’’

‘‘শ্যামবাবু হরিবাবুর বাসায় থাকতেন?’’

‘‘হ্যাঁ৷ শ্যাম সেখানে থেকেই আমার অফিসে কাজ করতে আসত৷ তবে এর সত্য-মিথ্যা জানি না৷’’

‘‘হরিবাবু আমাকে অন্য কথা বলেছেন৷ শ্যামবাবু নাকি বাউন্ডুলে ছিলেন এবং মাঝে-মাঝে ওঁর বাসায় হাজির হতেন!’’

তরুণবাবু রুষ্টমুখে বললেন, ‘‘হরি বড্ড প্যাঁচালো স্বভাবের লোক৷ হবে না কেন? হাড়ে-হাড়ে প্যাঁচালো বুদ্ধির এক আইনকারবারির সঙ্গদোষে সে-ও ওইরকম হয়ে পড়েছিল৷’’

‘‘তারপর কী হল বলুন?’’

‘‘ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হলাম৷ শ্যাম তারপর থেকে উধাও৷ আমার অফিসে আসছে না দেখে বুঝলাম, হরি ঠিক বলেছে৷ তারপর এতগুলো বছর চলে গেল৷ আর শ্যামের পাত্তা নেই৷’’

‘‘হরিবাবু আপনার কাছে আসেন?’’

‘‘নাহ৷ তার সম্পর্কে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই৷ এলেও তার সঙ্গে দেখা করব না৷ বাই-দা-বাই, এখন কোথায় আছে সে? কী করে?’’

‘‘পাইকপাড়ার সেই বাসায় আছেন৷ আলিপুর কোর্ট-চত্বরে স্বাধীনভাবে টাইপিংয়ের কাজ করেন৷’’

তরুণবাবু আস্তে বললেন, ‘‘কিন্তু আপনি আমাদের ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড কেন?’’

‘‘আপনাকে বলেছিলাম, বরমডিহিতে আপনাদের বাড়িতে—’’

‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু বাড়িটার ভূতুড়ে বলে বদনাম আছে৷ আমি যে মামলা লড়ছি, তা নিছক ওই পোড়োবাড়ির জন্য নয়৷ আমার মায়ের সম্মান রক্ষার জন্য৷ এটা আপনার বোঝা উচিত৷’’

‘‘বুঝি মিঃ মুখার্জি! আসলে আমি আগে ওই ভৌতিক রহস্য সম্পর্কে আগ্রহী ছিলাম৷ এবার আমি বিগ্রহ চুরি এবং শ্যামবাবুর অন্তর্ধান সম্পর্কে আগ্রহী৷ আমার ধারণা, এই ঘটনাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র আছে৷’’

তরুণবাবু ঘড়ি দেখে বললেন, ‘‘ওয়েল, কর্নেল সরকার৷ আমার সহযোগিতা পাবেন৷ বিগ্রহ উদ্ধার করলে আমি আপনাকে—’’

আস্তে হাত তুলে কর্নেল বললেন, ‘‘পুরস্কৃত করবেন তো? না মিঃ মুখার্জি ! আমার এই এক স্বভাব৷ রহস্য ফাঁস করা আমার হবি৷ যাই হোক, শ্যামবাবু আপনার কর্মচারী ছিলেন৷ তার কোনও ছবি আপনার অফিসে কি আছে?’’

‘‘থাকা সম্ভব৷ জাস্ট আ মিনিট৷’’ বলে উনি টেবিলের স্যুইচ টিপে বেয়ারাকে ডাকলেন৷ সে এসে সেলাম দিলে, বললেন, ‘‘অবনীবাবুকে ডাকো৷’’

একটু পরে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক চেম্বারে ঢুকে আড়ষ্টভাবে দাঁড়ালেন৷ তরুণবাবু বললেন, ‘‘আচ্ছা অবনীবাবু ! সেই শ্যামসুন্দর, আই মিন, যে ক্লার্ক নিপাত্তা হয়ে গিয়েছিল...’’

অবনীবাবু বললেন, ‘‘শ্যামসুন্দর ভট্টাচার্যের কথা বলছেন কি স্যার?’’

‘‘হ্যাঁ৷ তার কোনও ছবি অফিসে আছে? থাকা তো উচিত৷ পার্সোনেল ডিপার্টমেন্টের ফাইলে খুঁজলে নিশ্চয়ই পাবেন৷ তবে সাত-আট বছর আগের ফাইল ঘাঁটতে হবে৷ সময় লাগবে৷ তাই না?’’

‘‘স্যার! একটা গ্রুপ-ফোটোতে শ্যামবাবুর ছবি আছে মনে হচ্ছে৷’’

‘‘দেখুন তো! এখনই চাই কিন্তু৷ আমি বেরুব৷’’

অবনীবাবু বেরিয়ে গেলেন৷ তারপর দু-মিনিটের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড বাঁধানো গ্রুপ-ফোটো ঝাড়তে-ঝাড়তে ঘরে ঢুকলেন৷ বললেন, ‘‘পেছনের সারিতে দাঁড়ানো বাঁ-দিকের থার্ড ম্যান স্যার!’’

‘‘ওঁকে দেখান৷’’ বলে তরুণবাবু কর্নেলের দিকে আঙুল তুললেন৷

কর্নেল ছবিটা দেখার পর বললেন, ‘‘একটা অনুরোধ মিঃ মুখার্জি! এটা আমার এক রাত্রির জন্য দরকার৷ আপনি আগামীকালই অফিস খোলার সময় ফেরত পাবেন৷ কথা দিচ্ছি৷’’

‘‘কী করবেন ওটা নিয়ে?’’

‘‘আমার ক্যামেরা এবং নিজস্ব ডার্করুম আছে৷ শ্যামবাবুর ছবিটা থেকে একটা পোট্রেট করে নেব৷’’

‘‘কেন বলুন তো?’’

‘‘আপনার পূর্বপুরুষের ঐতিহাসিক বিগ্রহ উদ্ধারের জন্যই শ্যামবাবুর ছবি আমার দরকার৷’’

একটু ইতস্তত করে তরুণবাবু বললেন, ‘‘ঠিক আছে৷ নিয়ে যান৷ অবনীবাবু, ছবিটা ওঁকে কাগজে ভালোভাবে প্যাক করে দিন৷’’

কিছুক্ষণ পরে ছবিটা বগলদাবা করে কর্নেল বেরুলেন৷ রাস্তায় তখন যানবাহনের জ্যাম৷ আলো আরও ঝলমলে হয়েছে৷ এবার আমরা বাসে এসপ্ল্যানেড এবং সেখান থেকে ভিড়েঠাসা ট্রামে চেপে ইলিয়ট রোডে পৌঁছুলাম৷ সারা পথ আমার কিন্তু গা ছমছম করছিল৷ কেউ যেন হঠাৎ ছবিটা কেড়ে পালাবে মনে হচ্ছিল৷ কেন কেড়ে নিয়ে পালাবে, তা অবশ্য বুঝতে পারি না৷ তবে আশঙ্কায় বুক দুরুদুরু কাঁপছিল৷ প্রত্যেকটি যাত্রীর গা ঘেঁষে দাঁড়ানো সন্দেহজনক মনে হচ্ছিল৷

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে ভয়টা কেটে গেল৷ কর্নেল ষষ্ঠীকে কফি করতে বলে ওঁর স্টুডিওতে ঢুকলেন৷ ওখানে ওঁর আরেক হবির নিদর্শন৷ নানা জায়গায় তোলা পাখি-প্রজাপতি-অর্কিড-ক্যাকটাসের ছবি নিজেই ডেভালাপ এবং প্রিন্ট করেন৷ এমনকী, ওঁর একটা পোর্টেবল স্টুডিও আছে বলা চলে৷ কতবার ডেভালাপ ও প্রিন্টের সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে নানা জায়গায় পাড়ি জমান৷ তখন কোনও বাংলোর বাথরুম ওঁর ডার্করুমে পরিণত হয়৷

প্রায় আধঘণ্টা পরে কর্নেল বেরিয়ে এসে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন৷ বললেন, ‘‘খুব পাকা ফোটোগ্রাফারের তোলা ছবি৷ নেগেটিভটা ভালোই আসবে আশা করছি৷ পাসপোর্ট ফোটোর সাইজে ফিগারটা এনেছি৷’’

বললাম, ‘‘আমি ক্লান্ত৷ এবার বাড়ি ফিরতে চাই৷’’

‘‘ঠিক আছে৷ কাল সকালে কিন্তু এসো৷ একটা রহস্য সম্ভবত ফাঁস হবে৷’’

‘‘কোন রহস্য?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘সকালে এলে টের পাবে৷...’’

পরদিন সকালে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে হাজির হয়ে দেখি, উনি কয়েকটা পাসপোর্ট সাইজের ফোটো টেবিলে সাজিয়ে রেখেছেন এবং একটা ছবিতে তুলি বুলোচ্ছেন৷

আমাকে দেখে বললেন, ‘‘অসাধারণ এসেছে৷’’

টেবিলের একটা ফোটো তুলে নিয়ে বললাম, ‘‘এই শ্যামবাবু? চেহারা কিন্তু অমায়িক প্রকৃতির এক যুবকের৷’’

প্রায় ৮ বছর আগের ছবি৷ তবে চেহারায় মানুষের চরিত্রের ছাপ ফোটে কি না তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে৷ আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, সাধারণত ছ্যাঁচড়া প্রকৃতির অপরাধীরা নিজের চেহারায় ইচ্ছে করেই দুর্বৃত্তের ছাপ ফুটিয়ে তোলে৷ কিন্তু তথাকথিত ভদ্রলোক অপরাধীরা চেহারায় ভেতরকার আসল রূপ ফুটতে দেয় না এবং এ বিষয়ে তারা খুব সচেতন৷

পাশের আর একটা ছবি দেখে বললাম, ‘‘এটা আবার কার? যেন চেনা-চেনা মনে হচ্ছে৷’’

‘‘তরুণবাবুর অফিসের এক বেয়ারার৷’’

‘‘কিন্তু একে যেন কোথায় দেখেছি৷ কাল ওই অফিসেই কি?’’

‘‘তা দেখে থাকতে পারো তুমি৷ আমি লক্ষ্য করিনি৷’’

‘‘এর ছবি তুললেন কেন?’’

‘‘কাল তরুণবাবুর অফিসে আমি একে লক্ষ্য না করলেও গ্রুপ ফোটো দেখে আমার চেনা মনে হচ্ছিল৷ তাই এর ছবিটাও তুলেছি৷’’

ছবিটা তুলে নিয়ে দেখতে-দেখতে বললাম, ‘‘আশ্চর্য! একে কোথাও দেখেছি৷ নাহ৷ কাল ওই অফিসে নয়, অন্য কোথাও৷

কর্নেল আস্তে করে বললেন, ‘‘তা হলে আমি নিঃসন্দেহ হলাম৷’’

‘‘কী ব্যাপারে?’’

‘‘তুমি এবং আমি দু’জনেরই যখন চেনা লাগছে, তখন এ সেই লোকটাই বটে৷ তবে ভূত নয়, জলজ্যান্ত মানুষ৷’’

‘‘কর্নেল! বরমডিহির পোড়ো বাড়িতে লণ্ঠন হাতে যে লোকটা নিজেকে ভোলা বলেছিল...’’

কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ এ সেই-ই বটে৷ মানুষের চেহারা চল্লিশের পর পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত খুব একটা বদলায় না৷ তবে নাহ, উত্তেজিত হয়ো না৷ মুখ বুজে থাকো৷ লোকটা এখনও তরুণবাবুর অফিসে কাজ করছে কি না জানা দরকার৷’’

‘‘আপনি শ্যামবাবুর ছবিটা রিটাচ করছেন কেন?’’

‘‘বয়স বাড়াচ্ছি৷ কারণ শ্যামবাবু এই ছবিতে বড়োজোর পঁচিশ বছর-বয়সী যুবক৷ আট বছর পরে তার চেহারাটা কেমন দাঁড়াতে পারে, এক্সপেরিমেন্ট করছি এইটে ছবিতে৷’’

এই সময় টেলিফোন বাজল৷ কর্নেল ছবি এবং তুলি রেখে নিজেই ফোন ধরলেন... ‘হ্যাঁ৷ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি৷...না, না মিঃ মুখার্জি ! আমি রাগ করিনি৷ আপনার অনুতপ্ত হওয়ার কারণ নেই৷...ঠিক আছে৷ অবশ্যই যাব৷...না, না৷ কথা দিচ্ছি৷...এগারোটা থেকে সাড়ে এগারোটার মধ্যে পৌঁছে যাব৷...নাহ! গাড়ি পাঠাতে হবে না৷ ধন্যবাদ! রাখছি৷’’

বললাম, ‘‘অ্যাডভোকেট ভদ্রলোক মনে হল?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘হ্যাঁ!’’

‘‘কর্নেল! সাবধান কিন্তু!’’

‘‘কেন?’’

‘‘আপনি ওঁর বাড়িতে বসে ওঁকে চোর বলেছেন৷ তার প্রতিশোধ নিতে হয়তো এটা একটা ফাঁদ৷’’

কর্নেল স্বভাবসিদ্ধ অট্টহাসি হেসে বললেন, ‘‘ঘুঘু-ধরা ফাঁদ বলতে চাও ! হরিবাবুকে লেখা চিঠিতেও ঘুঘু এবং ফাঁদের কথা ছিল ! এ বড়ো সেয়ানা ঘুঘু৷’’

হাসতে-হাসতে বললাম, ‘‘ভাষাটা কিন্তু কোর্ট-চত্বরের সেই ছোকরার৷’’

‘‘ছোকরা বোলো না ডার্লিং! ওর প্রতিভা আছে৷ আমি ওই প্রতিভাধর ছেলেটির সঙ্গে আবার দেখা করে তাকে পুরস্কৃত করব ভেবে রেখেছি৷’’

কর্নেল ফোটোগুলো গুছিয়ে টেবিলের ড্রয়ারে ঢোকালেন; তারপর পোশাক বদলে এলেন৷ ওঁর হাতে এবার তরুণবাবুর অফিস থেকে আনা সেই প্রকাণ্ড গ্রুপ-ফোটো৷ আগের মতো প্যাকেট করা৷ বললেন, ‘‘চলো! এই ছবিটা কথামতো ফেরত দিতে হবে৷ তারপর যাব শচীনবাবুর বাড়ি৷...’’

ব্র্যাবোর্ন রোডের সেই বাড়িতে যখন পৌঁছুলাম, তখন প্রায় সওয়া দশটা বাজে৷ কর্নেল আমাকে নিচে দাঁড় করিয়ে রেখে লিফটের সামনে লাইন দিলেন৷ বাড়িটাতে অজস্র কোম্পানির অফিস৷ দেখলাম, অনেকে লিফটের লাইন দেখে পাশের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছে৷ হঠাৎ মনে হল, এ সময় যদি দৈবাৎ বরমডিহিতে দেখা সেই ভোলার দেখা পেয়ে যাই, কী করব? জাপটে ধরে হইচই বাধানো কি ঠিক হবে? তবে এ কথা ঠিক, তাকে এখন মুখোমুখি পেলে সোজাসুজি চার্জ করব৷ তাতে ভিড় জমে তো জমুক৷ ব্যাটাচ্ছেলে আমাদের বোকা বানিয়ে ছেড়েছিল!

একটু পরে অবশ্য উত্তেজনাটা চলে গেল৷ কর্নেল নিজস্ব লাইন ধরে এগোচ্ছেন৷ কাজেই আমার চুপচাপ থাকাই উচিত৷

কর্নেল ফিরলেন প্রায় আধঘণ্টা পরে৷ তাঁকে দেখামাত্র আবার উত্তেজনাটা ফিরে এসেছিল৷ ফুটপাতে নেমে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘সেই দু’নম্বর ভোলাকে দেখলেন তরুণবাবুর অফিসে?’’

‘‘নাহ৷ হারাধন কাল বিকেলে নাকি বউয়ের সাংঘাতিক অসুখের খবর পেয়ে বর্ধমানের গ্রামে গেছে৷ বর্ধমান থেকে ট্রাঙ্ককল এসেছিল৷ অবনীবাবু বললেন৷’’

‘‘লোকটার নাম তাহলে হারাধন?’’

‘‘হ্যাঁ৷ হারাধন বাগ৷’’ কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘বাঘ বলা চলে৷ চেহারা দেখে আমার ওইরকম ধারণা হয়েছিল৷’’

‘‘আমারও৷’’

‘‘তবে হাবভাব বেশ অমায়িক ছিল৷ ঠিক পুরাতন ভৃত্যমার্কা৷’’

‘‘কর্নেল! আমার ধারণা, কাল বিকেলে ওই অফিসে আপনাকে ঢুকতে দেখেই ব্যাটাচ্ছেলে কিছু আঁচ করেছিল৷ তাই গা-ঢাকা দিয়েছে৷ আপনার মার্কামারা চেহারা তার মনে থাকারই কথা৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘অবনীবাবুর সঙ্গে কৌশলে কথা বলে জেনেছি, আমি যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে ভোলার কাছে টেলিফোন এসেছিল৷ তবে সত্যি ট্রাঙ্ককল কি না বলা কঠিন৷ মোট কথা, টেলিফোন এসেছিল৷’’

‘‘তরুণবাবুর সঙ্গে দেখা হল?’’

‘‘নাহ৷ উনি আসেন বারোটায়৷’’

হাঁটতে-হাঁটতে বললাম, ‘‘হঠাৎ লোকটা ঠিক এই সময়ই দেশের বাড়িতে গেল? মুখোমুখি তাকে পেলে আপনার সুবিধে হত!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘কিছু হত না৷ অস্বীকার করত৷’’ বলে, ট্যাক্সি ! ট্যাক্সি ! চিৎকার করে উনি প্রায় ঝাঁপিয়ে রাস্তায় গেলেন৷ একটুর জন্য একটা প্রাইভেট কারের ধাক্কা থেকে বেঁচে গেলেন; কিন্তু কথাটা বললেই তো বর্মার জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিংয়ের পুরোনো কথা তুলবেন৷ এরকম কত চুলচেরা হিসেবি ঝাঁপ দিয়ে নাকি জাপানি গুলি থেকে বেঁচেছিলেন...!

হরিবাবুর অন্তর্ধান

ভবানীপুরের অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী শচীন্দ্রলাল মুখার্জি আজ একেবারে উল্টো মানুষ হয়ে গেছেন দেখে অবাক লাগছিল৷ প্রথমে কর্নেলের হাত ধরে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আদর করে পাশে বসালেন৷ তারপর চোখ মুছে বললেন, ‘‘আমি পাপী! মহাপাপী! তাই আমার এই অথর্ব অবস্থা হয়েছে৷ হাজারটা অসুখে ভুগছি৷ ওদিকে গিন্নিও পক্ষাগাতে শয্যাশায়িনী হয়ে আছেন৷ আমার মনের অবস্থা বলার মতো নয় কর্নেল সায়েব!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘বুঝতে পেরেছি৷ পেরেছি বলেই আবার আপনার কাছে আসতে দ্বিধা করিনি৷’’

শচীনবাবু এবার চাপা গলায় বললেন, ‘‘আপনি যে বিচক্ষণ মানুষ, তা আমি প্রথমদিনই টের পেয়েছিলাম৷ আপনি কাল ঠিকই বলেছিলেন৷ কার্যত আমি নিজেই বিগ্রহ চুরি করেছিলাম৷ কিন্তু সেটা যে অমন একটা সাংঘাতিক রিস্কের ব্যাপার, তা আমার মাথায় আসেনি৷ কারণ ক্রোধ মানুষকে অন্ধ করে৷ আমি ভাবতেই পারিনি, হারামজাদা হরি বোকামি করে বসবে৷ আমার প্ল্যানটা ছিল সোজা৷ আফটার অল, তরুণের দেহে আমার বাবার রক্ত আছে৷ তার বাড়িতে একটা রাত্তির গৃহদেবতাকে রাখা যেত৷ তারপর পুলিশ সকালে ওটা উদ্ধার করে দিত৷ তরুণও ফেঁসে যেত৷ কিন্তু হতচ্ছাড়া হরিটা...’’

শচীনবাবু কপালে করাঘাত করলেন৷ কর্নেল বললেন, ‘‘আসলে রিস্কটা আপনি যত তুচ্ছ ভেবেছিলেন, ততটা ছিল না৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু তা তো পরে বুঝেছিলাম৷ তখন ক্রোধান্ধ হয়ে একটা প্ল্যান ছকেছি৷ তখন মনে হয়েছিল, গৃহদেবতা একই পরিবারের এক গৃহ থেকে আর-এক গৃহে যাচ্ছেন৷ সক্কালে আবার ফেরত পাব৷’’

‘‘হরিবাবুর ওপর আপনার বিশ্বাস গভীর ছিল বোঝা যাচ্ছে৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ তা তো ছিলই৷ যদি বলেন এখনও কি নেই? আছে৷ কারণ আমি মানুষ চিনি৷ সারাজীবন আদালতে আসামি জেরা করে কাটিয়েছি৷ ক্রিমিন্যাল দেখলেই ধরতে পারি৷ তাছাড়া হরি একটু সাদাসিধে ধরনের গোবেচারা টাইপের লোক; খুব পরিশ্রমীও বটে৷ সকাল আটটায় কাজে আসত৷ রাত দশটা, কখনও-কখনও রাতে এগারোটা পর্যন্ত থেকে যেত৷ কোনওরকম তঞ্চকতার কাজ করেনি আমার সঙ্গে৷ আমি মানুষ চিনি কর্নেলসায়েব৷’’

মনে মনে বললাম, ঘোড়ার ডিম চেনেন! তরুণবাবুর চর ছিলেন হরিবাবু৷ বিরক্ত হয়ে কর্নেলের দিকে তাকালাম৷ ভাবলাম, হরিবাবুর চরিত্র ফাঁস করে দেবেন শচীনবাবুকে৷ কিন্তু কর্নেল ক্রমাগত দাড়ি নেড়ে সায় দিচ্ছিলেন৷ এবার বললেন, ‘‘হরিবাবু আপনার মতোই সৎ-ব্রাহ্মণ৷ ওঁর ঘরে আপনার গৃহদেবতার ফোটো বাঁধানো আছে দেখেছি!’’

আইনজীবী আবেগে বললেন, ‘‘আমার সব কর্মচারীকে এক কপি করে গৃহদেবতার ফোটো আমিই বাঁধিয়ে দিয়েছিলাম৷’’

‘‘হরিবাবুর ঘর থেকে ওঁর মামাতো ভাই শ্যামসুন্দরবাবু বিগ্রহ চুরি করে পালিয়েছিলেন৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ হরি বলেছিল৷ ওর মুখ দেখে মনে হয়েছিল, সত্যি কথা বলেছে৷’’

‘‘তাহলে ওঁকে বরখাস্ত করেছিলেন কেন?’’

‘‘ওই যে তরুণের বাড়ি গিয়েছিল, সেইজন্য৷ ওর আত্মীয়ের চাকরির চেষ্টায় গিয়েছিল৷ সেটা বিশ্বাস করেছিলাম৷ কিন্তু আমার রাগ হয়েছিল, তরুণকে সাধতে গেল কেন?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘আপনি কাল বলেছিলেন, বিগ্রহ চুরির জন্য যাকে-যাকে সন্দেহ হয়েছিল, তাদের মধ্যে হরিও একজন৷’’

শচীনবাবু কর্নেলের হাত চেপে ধরলেন৷ ভিজে গলায় বললেন, ‘‘কালকের কথা ভুলে যান৷ আজ আমি কনফেস করার জন্য আপনাকে ডেকেছিলাম৷ তাছাড়া একটা কৌতূহলও হয়েছে৷’’

‘‘বলুন মিঃ মুখার্জি৷’’

আইনজীবী আবার চাপা গলায় বললেন, ‘‘প্লিজ কর্নেলসাহেব! গোপন করবেন না৷ তরুণই কি আপনাকে বিগ্রহ উদ্ধারের জন্য ধরেছে? তার মানে, আপনার ক্লায়েন্ট কি তরুণ?’’

‘‘নাহ৷ আমি আপনাকে বলেছি, কোথাও রহস্য দেখলেই তা ফাঁস করা আমার হবি৷’’

‘‘তা করুন৷ কিন্তু আপনার হাতে ধরে বলছি, আমার গৃহদেবতাকে উদ্ধার করে দিন৷’’

‘‘চেষ্টা করব৷ তবে আপনার সহযোগিতা চাই৷’’

‘‘পাবেন৷ সব রকমের সহযোগিতা পাবেন৷’’

ট্রে ভর্তি স্ন্যাক্স, সন্দেশ এবং চায়ের কাপ-প্লেট এনে রাখল কালকের সেই পরিচারক৷ কর্নেল বললেন, ‘‘কিছু মনে করবেন না৷ আমরা ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছি৷ তবে শুধু চা খাব৷’’

‘‘আপনার ইচ্ছে৷’’ বলে শচীনবাবু ছড়িয়ে রাখা বাঁ-পা সোজা করলেন এবং এবার ডান পা ছড়িয়ে দিলেন৷ মুখে কষ্টের ছাপ৷

কর্নেল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘‘বরমডিহির সন্ধ্যানীড়ের চাবি কার কাছে আছে?’’

‘‘বরমডিহির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে৷ সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে তাঁকে মামলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত বাড়ির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে৷ কিন্তু খবর পাই, তিনি কিছুই দেখেন না৷ সরকারি ব্যাপার যা হয় আর কী৷ বাড়িটার নাকি পোড়ো-পোড়ো দশা৷ শুনে কষ্ট হয়৷ কিন্তু কী করব?’’

‘‘বাড়ির নিচের তলায় ক’খানা ঘর?’’

‘‘১০-খানা৷’’

কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘দোতলায়?’’

‘‘দোতলাতেও ১০-খানা৷’’

কর্নেল আমার দিকে তাকালেন৷ বললাম, ‘‘পিওর ম্যাথ৷ বিশুদ্ধ গণিত মনে হচ্ছে৷’’

শচীনবাবু বললেন, ‘‘গণিত? গণিত মানে?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘জয়ন্ত ভালো অঙ্ক কষতে পারে তো ! তাই ও বলতে চায়...’’

শচীনবাবু তাঁর কথার ওপর বললেন, ‘‘বাবা ছিলেন সে-আমলের নামকরা আর্কিটেক্ট৷ বরমডিহিতে যত কোর্ট-কাছারি বা পুরোনো সরকারি বাড়ি আছে, সব ওঁর নকশায় তৈরি৷ জয়ন্তবাবু ঠিক ধরেছেন৷ অঙ্ক কষে বাবা বাড়ির নকশা তৈরি করতেন৷ লক্ষ্য করে থাকবেন, বাড়িটা ইংরেজি এল প্যার্টেনের৷ ওপরে নিচে এল প্যাটার্ন বারান্দা৷ বাবা যে আমার জন্যই বাড়িটা করেছিলেন, তার প্রমাণ, তাঁর জীবদ্দশায় দেউড়িতে আমার নেমপ্লেট লাগানো হয়েছিল৷ এখনও তা অক্ষত আছে৷ তখন তরুণ কোথায়?’’

‘‘ভোলা নামে একজন লোককে সন্ধ্যানীড়ের কেয়ারটেকার রেখেছিলেন৷ তাই না?’’

‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু আপনি যে ভূতপ্রেত দেখেছিলেন...’’

‘‘সে ভোলা নয়৷ আপনি তা আমাকে বলেছিলেন৷’’ কর্নেল চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বললেন, ‘‘ভোলা কত বছর আগে মারা গেছে?’’

‘‘বছর-দুই হয়ে এল প্রায়৷ সুপ্রিম কোর্টে গেল তরুণ, সেই বছর৷’’

‘‘হাইকোর্টে আপনি মামলা জিতেছিলেন?’’’

‘‘হ্যাঁ৷ তরুণ লোয়ার কোর্টে হেরে হাইকোর্ট করেছিল৷ হাইকোর্টে হেরে এখন সুপ্রিম কোর্টে৷ পাজির পা-ঝাড়া ! বংশের কলঙ্ক!’’

‘‘তা হলে মামলা তরুণবাবুই করেছিলেন প্রথমে?’’

‘‘তাকে সন্ধ্যানীড়ে ঢুকতে চাবি দিইনি৷ এতেই বাবুর মেজাজ খাপ্পা৷ তো আমি হলাম নিজেই আইনজ্ঞ৷ আমাকে আইন দেখাচ্ছে!’’

‘‘আজ চলি মিঃ মুখার্জি৷ দরকার মতো যোগাযোগ করব৷ আপনিও করবেন৷’’

কর্নেলের একটা হাত দু’হাতে চেপে ধরে শচীনবাবু বললেন, ‘‘আমিই পাপ করেছিলাম কর্নেলসায়েব! এ তারই শাস্তি৷ আপনি আমার গৃহদেবতাকে উদ্ধার করে দিন৷’’

‘‘বললাম তো! চেষ্টা করব৷...’’

বড়ো রাস্তার মোড়ে গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘এবার আলিপুর কোর্টে যাব৷ ছেলেটিকে পুরস্কৃত করতে হবে৷’’

আমার বৃদ্ধ বন্ধুর খেয়ালের ব্যাপারটা আমার জানা; তাই বাধা দিলাম না৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল৷ কোর্টের দিকে ছুটে চলল৷

ট্যাক্সি থেকে নেমে কর্নেল ট্যাক্সি চালককে বললেন, ‘‘এক মিনিট ভাই৷ এক্ষুনি আসছি৷ জয়ন্ত, তুমি বসে থাকো৷’’

ট্যাক্সি থেকে ড্রেনের ওপারে গাছতলায় হরিবাবুর ডেরা দেখা যাচ্ছিল৷ কিন্তু হরিবাবু নেই৷ হয়তো খেতে গেছেন ভাবছিলাম৷ পরক্ষণে দেখলাম টেবিলে টাইপরাইটার নেই এবং চেয়ারে সেই চৌকস ছোকরা বসে আছে৷

কর্নেল তার কাছে গেলে সে উঠে দাঁড়িয়ে সেলাম দিল৷ তারপর কর্নেলের সঙ্গে তার কথাবার্তা চলতে থাকল৷ এতদূর থেকে শোনা যাচ্ছিল না৷ একটু পরে কর্নেলকে দেখলাম, তার হাতে একটা দশ টাকার নোট গুঁজে দিচ্ছেন৷ ছোকরা রীতিমতো মিলিটারি কায়দায় সেলাম ঠুকল৷ কর্নেল ফিরে এলেন৷

ট্যাক্সিতে বসে কর্নেল বললেন, ‘‘পার্ক স্ট্রিট হয়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিট দিয়ে ইলিয়ট রোড৷’’

ট্যাক্সি ঘুরল৷ জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘হরিবাবু আজ আসেননি নাকি?’’

‘‘নাহ৷ অসুখবিসুখ হয়েছে হয়তো!’’

‘‘ছোকরাটির সঙ্গে—’’

‘‘ও জয়ন্ত! হি ইজ আ জিনিয়াস চ্যাপ৷’’

হাসতে-হাসতে বললাম, ‘‘কী কথা হল জিনিয়াসের সঙ্গে?’’

‘‘নাম-ঠিকানা জেনে নিলাম৷ ওকে একটা স্থায়ী কাজ জুটিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দিলাম৷’’

‘‘এবং দশটা টাকা পুরস্কার দিলেন৷’’

‘‘ওটা ওর পক্ষে নগণ্য৷ ওকে দশ-বিশ হাজার টাকা দেওয়া উচিত ছিল৷ আমার তো অত দেওয়ার মতো অবস্থা নয়৷ পেনশন আর বিদেশি কাগজে প্রজাপতি নিয়ে প্রবন্ধ লিখে রোজগার৷’’

‘‘ব্যাপারটা কী, খুলে বলুন তো?’’

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘‘আজও তোমার লাঞ্চের নেমন্তন্ন৷’’

‘‘সর্বনাশ ! আমাকে অফিস যেতে হবে না? এই সপ্তাহে বিকেলে ডিউটি৷ কাল কামাই করেছি৷’’

‘‘তোমার চিফ অব দা নিউজ ব্যুরোকে টেলিফোনে জানিয়ে দাও, একটা রোমহর্ষক স্টোরির পেছনে দৌড়ুচ্ছ৷ বলো, দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার জন্য এক্সক্লুসিভ স্টোরি৷ রাতারাতি প্রচার-সংখ্যা এক লক্ষ বেড়ে যাবে৷’’

চুপ করে গেলাম৷ এই খামখেয়ালি রহস্যভেদীর পাল্লায় পড়েছি৷ রহস্য ফাঁস না হওয়া পর্যন্ত ছাড়া পাব না৷ তবে এ-ও সত্যি, বরমডিহির পোড়োবাড়ির ভূতুড়ে হত্যাকাণ্ড আমাকেও ধাঁধায় ফেলেছিল৷ ধাঁধার জট না খুললে ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করতে হবে৷ এটাই সমস্যা৷ ভূতের ভয় যতই পাই, ভূতে বিশ্বাস করাটা কেমন বিচ্ছিরি লাগে যেন৷ তাছাড়া আমার মতে, গল্পের ভূতে মজা আছে৷ সত্যিকারের ভূতে মজা কোথায়?...

এদিনও কর্নেলের বাড়ি লাঞ্চ খেয়ে ড্রয়িং রুমের ডিভানে লম্বা হয়েছিলাম৷ কর্নেল কোথায়-কোথায় টেলিফোন করছিলেন এবং চাপা গলায় কথা বলছিলেন, তারপর হঠাৎ ডাকলেন, ‘‘উঠে পড়ো জয়ন্ত! বেরুনো যাক৷’’

ভাতঘুমের রেশ ছিঁড়ে গেল৷ বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘‘ওঃ কর্নেল! খালি ছুটোছুটি আর কথাবার্তা!’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘ছুটোছুটি না করে উপায় কী? আমরা ভূতুড়ে খুনখারাপি দেখে এসেছি৷ হরিবাবুও একই দৃশ্য দেখেছিলেন৷ ছুটোছুটি করে খুনি ভূতটাকে তো ধরতে হবে৷ আর কথাবার্তার কথা বলছ? কথা বলতে-বলতে অনেক কথা বেরিয়ে আসে৷ আসলে আমরা জানি না যে কী জানি৷ তাই অনর্গল কথা বলতে হয়৷ জানা কথাটা এভাবেই মুখ দিয়ে নিজের অজান্তে চলে আসে৷ এই দু’দিনে পুরো একটা ইতিহাস বেরিয়ে এল এবং এক-জোড়া বিগ্রহ!’’

‘‘কিন্তু এবার বেরুবেন কোথায়? নতুন কোনও সূত্র পেয়েছেন নাকি?’’

‘‘নাহ৷ বেচারা হরিবাবুর খবর নেওয়া দরকার৷ কোর্টে যাননি৷ ওঁর পেছনে শত্রু লেগেছিল৷ নোটবইটা পেয়েও যদি সে খুশি না হয়? কিংবা যদি সে দেখে যে এটা সেই নোটবই নয়? হরিবাবুর কী দশা হবে ভাবো!’’

বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল৷ সত্যিই তো ! যদি ওটাই সেই কালো নোটবই না হয়?...

পাইকপাড়ার সেই ঠিকানায় কালকের চেয়ে আজ আগেই পৌঁছুলাম৷ ঝলমলে মিঠে রোদ্দুর খেলছে৷ মশা নেই৷ সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে হরিবাবুর ঘরের সামনে কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন৷ দরজায় তালা ঝুলছে৷

পাশের ঘরের এক ভদ্রমহিলা আমাদের দেখতে পেয়ে বললেন, ‘‘হরিদার কাছে এসেছেন আপনারা? সে তো কাল সন্ধ্যায় দেশের বাড়িতে গেছে৷ বউদির নাকি খুব অসুখ৷ আমাকে বলে গেছে, কেউ তার খোঁজে এলে যেন জানিয়ে দিই৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘কবে ফিরবেন কিছু বলে গেছেন?’’

‘‘ঠিক নেই৷ অসুখ-বিসুখের ব্যাপার৷’’

‘‘ওঁর দেশের ঠিকানা জানেন?’’

‘‘না তো! মেদিনীপুরে কোন গ্রামে যেন৷’’

কর্নেল একটু কাঁচুমাচু মুখ করে বললেন, ‘‘একটা জরুরি কাগজ টাইপ করতে দিয়েছিলাম৷ বড়ো সমস্যায় পড়া গেল দেখছি৷ আচ্ছা, হরিবাবুর কোনও অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকা উচিত৷ তার হাতেও আমার কাগজটা দিয়ে যেতে পারেন৷ তেমন কেউ কি এ ঘরে ওঁর সঙ্গে থাকেন না?’’

ভদ্রমহিলা মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘এ ঘরে হরিদা একা থাকে৷’’

‘‘ওঁর মামাতো ভাই শ্যামসুন্দরবাবু ওঁর সঙ্গে থাকেন শুনেছিলাম৷ তিনি...’’ বলে কর্নেল ভদ্রমহিলাকে হাঠৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘আপনারা কতদিন এখানে আছেন?’’

‘‘অনেকদিন৷ আপনি শ্যামবাবুর কথা বলেছেন? শ্যাম নামে একজন হরিদার কাছে থাকত৷ সে তো অনেক বছর আগের কথা৷ হরিদার কাছে শুনেছিলাম, লোকটা ভালো না৷ মানে, হরিদার টাকাকড়ি চুরি করে পালিয়েছিল৷ আমার কিন্তু লোকটাকে একেবারে পছন্দ হত না৷’’

‘‘আচ্ছা চলি!’’ বলে কর্নেল সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন৷

নিচে নেমে বললাম, ‘‘জাল ভোলা ওরফে হারাধন কাল সন্ধ্যায় বউয়ের অসুখ বলে দেশে চলে গেছে৷ এদিকে হরিবাবুও কাল সন্ধ্যায় বউয়ের অসুখ বলে দেশে চলে গেছেন৷ টাইমিংটা লক্ষ্য করুন কর্নেল! ব্যাপারটা গোলমেলে মনে হচ্ছে৷ দু’জনেই হঠাৎ একই সঙ্গে গা-ঢাকা দিয়েছে যেন৷ কিন্তু কেন?’’

কর্নেল তুম্বো মুখে হাঁটছিলেন৷ আমার প্রশ্নের জবাবে কিছু বললেন না৷

বললাম, ‘‘অবশ্য নেহাত কাকতালীয় ঘটনাও হতে পারে৷ কারও বউয়ের অসুখ হতেই পারে৷ আবার অফিসের কর্মীরা বউয়ের অসুখের কথা না বললে ছুটি পায় না৷...’’

ইলিয়ট রোডে তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কর্নেল যথারীতি ষষ্ঠীকে কফির হুকুম দিয়েছিলেন৷ আজ সন্ধ্যায় শীতের ঈষৎ আমেজ পাওয়া যাচ্ছিল৷ কলকাতায় ডিসেম্বরের গোড়ায় শীতের চেহারা পুরো দেখা যায় না, যদিও বহু লোক গায়ে সোয়েটার-জ্যাকেট চড়ায়৷

কফি খেতে-খেতে কর্নেল হঠাৎ বললেন, ‘‘দুই ভাইয়ের এক ভাই কোনও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আমার কাছে গোপন করছেন৷ শচীনবাবু কিংবা তরুণবাবু, যে কোনও একজন৷ সেই গোপন কথাটা আমি জানতে পারলে এ রহস্য ফাঁস করা সম্ভব৷ কিন্তু প্রশ্ন হল, ওঁরা কি ইচ্ছে করেই গোপন করছেন, নাকি ওঁরা জানেন না ওটা আমার কাছে মূল্যবান সূত্র হতে পারে?’’

জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘গোপন কথাটা কী হতে পারে বলে আপনার ধারণা?’’

‘‘শ্যামবাবুর হত্যাকাণ্ড৷’’

চমকে উঠে বললাম, ‘‘শ্যামবাবুকে খুন করা হয়েছে বলতে চান?’’

‘‘তুমিও দেখেছ জয়ন্ত৷’’

‘‘অ্যাঁ? আমি দেখেছি? কবে? কোথায়?’’

‘‘২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঝড়বৃষ্টির সময় বরমডিহির সন্ধ্যানীড়ে৷’’

‘‘কর্নেল! সেই রক্তাক্ত বডিটা শ্যামবাবুর নাকি?’’

‘‘হ্যাঁ৷ টর্চের আলোয় মুখটা দেখেছিলাম৷ তুমি তো জানো, যে মুখ একবার দেখি, তা আমি ভুলি না৷ তরুণবাবুর অফিসের গ্রুপ-ফোটো থেকে শ্যামবাবুর যে ছবিটা তুলেছি, তা নিঃসন্দেহে সন্ধ্যানীড়ের দোতলার সেই ঘরে টর্চের আলোয় দেখা নিহত লোকটিরই ছবি৷’’

শুকনো গলায় বললাম, ‘‘হরিবাবুকে লেখা উড়োচিঠিতে শ্যামবাবুকে খতম করে পুঁতে ফেলার করা ছিল বটে! সেখানে আমরা জাল ভোলা অর্থাৎ হারাধনকে দেখেছিলাম৷ তা হলে হারাধন...’’

আমার কথার উপর কর্নেল বললেন, ‘‘হারাধন অন্যতম খুনি৷’’

‘‘আর তক্তাপোশে নোংরা বিছানায় অসুস্থ শচীনবাবু সেজে যে-লোকটা শুয়েছিল, সে-ও খুনি৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ আমি টর্চের আলো তার মুখে ফেলার আগেই হারাধন তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়েছিল৷’’

কর্নেল চোখ বুজে ইজিচেয়ারে হেলান দিলেন৷ আমি দৃশ্যটা স্মরণ করছিলাম৷ একটু পরে বললাম, ‘‘আপনার ফোন পেয়ে পুলিশ সেখানে গিয়ে কিছু দেখতে পায়নি৷ অন্তত রক্ত চোখে পড়া উচিত ছিল?’’

কর্নেল চোখ বুজেই বললেন, ‘‘ডাকবাংলো পৌঁছুতে আমাদের সময় লেগেছিল৷ সেই সময়ের মধ্যে বডি সরানো এবং রক্ত ধুয়ে ফেলা সহজ ছিল৷ বিশেষ করে বৃষ্টি হচ্ছিল এবং ছাদ ছিল ফাটা৷ তাই জল দেখে পুলিশের সন্দেহ হওয়ার কথা নয়৷ তা ছাড়া তখন রাত্রিকাল৷’’

‘‘পুলিশেরও লক্ষ্য ছিল একটা লাশ৷ তাই লাশ দেখতে না পেয়ে খাপ্পা হয়ে চলে যায়৷’’

‘‘ঠিক বলেছ৷ পুলিশ আমাকে ফোনে বলছিল, টালি এবং সুরকি ধোয়া জল দেখে আমি নাকি রক্ত ভেরেছি৷ ওই বাড়িটা নাকি ভূতুড়ে৷’’ বলে কর্নেল চোখ খুলে একটু হাসলেন৷ ‘‘পুলিশের আইনে ভূত বলে কিছু নেই কিন্তু পুলিশও তো মানুষ৷ মানুষের মনে ভূতপ্রেতে বিশ্বাস থাকা স্বাভাবিক৷ চিন্তা করো নির্জন এলাকায় একটা পোড়ো জরাজীর্ণ বাড়ি৷ এমন বাড়ি সম্পর্কে ভূতের ভয় ছড়াতেই পারে৷’’

‘‘কর্নেল! হরিবাবুও নাকি একই দৃশ্য দেখেছিলেন!’’

‘‘হুঁ৷’’ বলে কর্নেল টেলিফোন তুলে ডায়াল করতে থাকলেন৷ একটু পরে বললেন, ‘‘মিঃ এস. এল. মুখার্জির সঙ্গে কথা বলতে চাই৷... বলুন, কর্নেল এন. সরকার কথা বলবেন৷ জরুরি কথা৷’’ বলে কর্নেল কাঁধে টেলিফোন আটকে নিভে যাওয়া চুরুট ধরালেন৷ কিছুক্ষণ পরে বললেন ‘‘মিঃ মুখার্জি? আপনাকে একটু বিরক্ত করছি৷ আপনি গৃহদেবতা ফেরত চান... না, না৷ এখনও আমি সন্ধান পাইনি৷ কিন্তু আপনার সহযোগিতা চাইছি৷ হ্যাঁ৷ প্লিজ আমার প্রশ্নের জবাব দিন৷ আশা করি, সঠিক জবাব পাব৷ আচ্ছা, আপনি কি হরিবাবুকে বিগ্রহ উদ্ধার করে দিতে বলেছিলেন?... বলেননি?... হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ তা ঠিক৷... অ্যাঁ? প্লিজ রিপিট৷... অনুতপ্ত হতেই পারেন৷ স্বাভাবিক৷ কিন্তু এ কথাটা আপনি কি ইচ্ছে করেই আমাকে আমাকে জানাননি?... হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ আপনার কাছে তত গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়ার কারণ ছিল না৷... ঠিক৷ আচ্ছা মিঃ মুখার্জি, আর একটা প্রশ্ন৷ শ্যামবাবু, মানে হরিবাবুর সেই আত্মীয় খুন হওয়ার কথা আপনি জানেন?... জানেন না?... হ্যাঁ৷ ওঁর রক্তাক্ত লাশই আমি দেখেছিলাম... জানেন না তাহলে? রাখছি৷’’

বলে কর্নেল টেলিফোন রাখলেন৷ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম৷ বললাম ‘‘কী বললেন?’’

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, ‘‘বরমডিহি৷’’

‘‘তার মানে?’’

‘‘আমরা আজ রাতের ট্রেনে বরমডিহি যাচ্ছি৷ শীতটা ওখানে বড্ড বেশি৷ গরম জামাকাপড় সঙ্গে নেবে৷ চিন্তা কোরো না! দুপুরে পূর্বরেলের পি. আর. ও. কে ফোন করে ফার্স্টক্লাসে দুটো বার্থ রাখতে বলেছি৷ দশটা পঁয়ত্রিশে ট্রেন ছাড়ার কথা৷ তুমি এখনই গিয়ে রেডি হও৷ আমি তোমাকে ট্যাক্সিতে তুলে নিয়ে হাওড়া স্টেশনে যাব৷’’ কর্নেল মিটিমিটি হাসলেন৷ ‘‘আবার ভূত দেখতে পাবে ডার্লিং! পোড়োবাড়ির ভূত৷’’

কর্নেলের হেঁয়ালি

হাড়-কাঁপানো শীতের সকালে বরমডিহি রেলস্টেশনে যখন ট্রেন থেকে নামলাম, তখনও চারদিকে গাঢ় কুয়াশা৷ কয়েক হাত দূরে কিছু দেখা যায় না৷ কর্নেল হনুমানটুপি পরেছেন৷ তাই ওঁর দাড়ি ঢেকে গেছে এবং মুখের খানিকটা মাত্র দেখা যাচ্ছিল৷ সম্ভবত এখন এটাই ওঁর ছদ্মবেশ! একটা ওভারকোটও চাপিয়েছেন গায়ে৷ প্রকাণ্ড শরীর আরও প্রকাণ্ড দেখাচ্ছে৷ পিঠে আটকানো বোঁচকা এবং হাতে স্যুটকেস৷ গলায় ঝুলন্ত বাইনোকুলার ওভারকোটের ভেতর লুকিয়ে আছে৷

আমার মাথায় টুপি এবং আষ্টে-পিষ্টে জড়ানো মাফলার৷ পুরু জ্যাকেটের ভেতরও শীতের ঠান্ডা হিম-থাবা টের পাচ্ছি৷ কর্নেলের পরামর্শে পশমের দস্তানা পরেছি৷ হাতে একটা হালকা সুটকেস৷

বরমডিহি একটা হিল-স্টেশন৷ পাহাড় দু-ভাগ করে রেললাইন চলে গেছে৷ পাড়ের গায়ে জঙ্গল কুয়াশায় ঢাকা৷ অক্টোবরে আমরা এখানকার নিসর্গের অন্য রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম৷ ডিসেম্বরের সকালে এখানকার নিসর্গের অন্য রূপ দেখে আমি ভড়কে গেলাম৷ এর চেয়ে দার্জিলিং-কালিম্পং অনেক আরামদায়ক, যদিও সেখানে বরফ পড়ে৷ এখানে বরফ পড়ে না; কিন্তু এ কী বিচ্ছিরি ঠান্ডা!

কিন্তু এই সাংঘাতিক ঠান্ডার মধ্যেও কী ভিড়! কর্নেল হনুমানটুপির আড়াল থেকে বললেন, ‘‘শীতে মুন লেক ট্যুরিস্টদের বড়ো আকর্ষণ৷ এ সময় কালো দৈত্যের উপদ্রব হয় না৷ তবে ট্যুরিস্টদের বেশিরভাগই বাঙালি৷ পিকনিক করতে আসে আশেপাশের শিল্পাঞ্চল থেকে৷ সব হোটেল, ট্যুরিস্ট লজ, সরকারি বাংলো গিজগিজ করে৷ কলকাতার বাবুদের বাড়িগুলো ভাড়া দিয়ে কেয়ারটেকাররা এ সময় প্রচুর কামিয়ে নেয়৷’’

উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, ‘‘তা হলে এবার আমরা উঠব কোথায়?’’

‘‘তরুণবাবুর বাংলোবাড়িতে৷’’

‘‘তরুণবাবু? কোন তরুণবাবু?’’

‘‘তোমাকে যখন তরুণবাবু বলছি, তখন তোমার বোঝা উচিত এখানে একজন তরুণবাবুই আছেন, যাঁকে তুমিও চেনো৷’’

অবাক হয়ে বললাম, ‘‘শচীনবাবুর ভাই তরুণবাবু? ওঁর এখানে বাংলোবাড়ি আছে নাকি?’’

‘‘থাকা স্বাভাবিক৷ বৈমাত্রেয় দাদা ওঁকে পৈতৃক বাড়িতে ঢুকতে দেননি৷ কাজেই বিত্তবান ছোটোভাই ক্ষোভে, দুঃখে এবং জিদ করেই এখানে সুদৃশ্য বাংলোবাড়ি তৈরি করেছেন৷’’

‘‘কিন্তু তরুণবাবুর সঙ্গে আপনার এ ব্যাপারে কখন কথা হল?’’

‘‘কাল দুপুরে তুমি যখন ঘুমোচ্ছিলে, তখন টেলিফোনে কথা হয়েছে৷’’ কর্নেল হনুমানটুপির আড়ালে হাসলেন এবং চোখে সেই কৌতুকের হাসি জ্বলজ্বল করে উঠল৷ ‘‘দাদাকে টিট করার জন্য তরুণবাবু সব সময় তৈরি৷ কাজেই আমি সেই সুযোগটা নিয়েছি আর কী! এবার দেখা যাক, ঝুলির ভেতর থেকে কার বেড়াল বের হয়৷’’

‘‘আপনি ওঁকেও কি বলেছেন, শ্যামবাবুরই রক্তাক্ত লাশ দেখেছিলেন?’’

‘‘বলেছি৷ তাই শুনেই উনি...যাক৷ এখন এসব কথা নয়৷ যা অবস্থা দেখছি, যানবাহন পাব না৷ পায়ে হেঁটে যেতে হবে৷’’

‘‘বাংলোবাড়িটা কোথায়? কত দূরে?’’

‘‘এখান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার হবে৷ শচীনবাবুর সেই বাড়ির উল্টোদিকে কিছুটা দূরে একটা টিলার মাথায়৷ বাড়িটার নাম হিলটপ ৷ তরুণবাবু জিদ করে আস্ত একটা পাহাড় কিনে ফেলেছিলেন!’’

সেই কনকনে ঠান্ডা এবং কুয়াশায় বাঁ-দিকে নতুন টাউনশিপ এবং বাজার এলাকা ছাড়িয়ে আমরা যে-রাস্তায় মোড় নিলাম, সেটাই বরমডিহি-জাহানাবাদ রোড৷ সৌভাগ্যক্রমে একটা খালি ট্রাক পাওয়া গেল৷ ট্রাকটা একটা কাঠগোলা থেকে সবে স্টার্ট দিয়ে রাস্তায় উঠেছিল৷ ট্রাক ড্রাইভাররাও যে এই মরশুমে বেশ কামিয়ে নেয়, তা বুঝলাম৷ পঞ্চাশ টাকা হেঁকেছিল, তিরিশে রফা হল৷ তখন তিরিশ টাকা অনেক টাকা!

কিন্তু কী আর করা যাবে? কর্নেল যা পারেন, আমার পক্ষে তা সম্ভব নয়৷ মিলিটারির লোক; তার ওপর এই বয়সেও গায়ে সাংঘাতিক জোর৷ এদিকে ওইটুকু হেঁটেই আমি ভিজে বেড়ালছানা হয়ে গেছি৷

কুয়াশার মধ্যে হেডলাইট জ্বেলে ট্রাকটা সাবধানে যাচ্ছিল৷ প্রায় আধঘণ্টা পরে ড্রাইভার বলল, ‘‘হিলটপ বাংলো বোলা? উতারিয়ে৷’’

টাকা মিটিয়ে দু’জনে নামলাম৷ ততক্ষণে কুয়াশা কিছুটা কমেছে৷ সূর্যের চেহারা বিবর্ণ হলুদ থালার মতো এবং মাঝে-মাঝে কুয়াশার প্রবাহ চলেছে৷ ট্রাকটা চলে গেল৷ কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, ‘‘জয়ন্ত! তোমার দুর্ভাগ্য! হাঁটতেই হবে৷’’

‘‘কেন?’’

‘‘মনে হচ্ছে, আধ কিলোমিটার এগিয়ে এসেছি৷ হুঁ! ওই তো মুন লেক যাওয়ার রাস্তা!’’

খাপ্পা হয়ে বললাম, ‘‘ট্রাক ড্রাইভারটা তো মহা পাজি!’’

‘‘নাহ৷ ওর দোষ নেই৷ আমিও তো কুয়াশায় কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না৷ চলো, মুন লেক রোড দিয়ে ঘুরে শর্টকাট করি৷ ওই রাস্তার উত্তরে হিলটপ বাংলো৷ সে-বার বাইনোকুলারে দূর থেকে দেখেছিলাম৷’’ কর্নেল হাঁটতে-হাঁটতে বললেন, ‘‘এসো৷ জগিং করা যাক৷ তা হলে ঠান্ডাটা কেটে যাবে৷ কাম অন!’’

বলে সত্যিই উনি জগিং শুরু করলেন৷ অগত্যা আমিও শুরু করলাম৷ কিন্তু সুটকেস হাতে জগিং বা দৌড়ব্যায়াম সহজ নয়৷ তাতে পাথর, ঝোপঝাড়, উঁচু গাছের জঙ্গল৷ একবার হোঁচট খেয়ে পড়তে-পড়তে সামলে নিলাম৷ দ্বিতীয়বার হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম৷ কর্নেল আমাকে টেনে ওঠালেন৷

কিছুক্ষণের মধ্যেই কুয়াশা মোটামুটি কেটে গেল৷ হিলটপ বাংলো কর্নেলের বাইনোকুলারে ধরা পড়ল৷ তারপর কী করে যে চড়াই বেয়ে বাংলোর গেটে পৌঁছুলাম কে জানে! কর্নেল হয়তো একটা আস্ত চুম্বক৷

কেয়ারটেকার আমাদের দেখে দৌড়ে এলেন৷ ‘‘আপনি কি কর্নেল সায়েব? নমস্কার স্যার৷ সায়েব ট্রাঙ্কল করেছিলেন ওঁর লোকাল ব্রাঞ্চ অফিসে৷ সেখান থেকে কাল সন্ধ্যায় আমাকে খবর দিয়ে গেছে৷ কিন্তু ওখান থেকে স্টেশনে গাড়ি পাঠানোর কথা৷ যায়নি গাড়ি? কী আশ্চর্য! বৈজু! বৈজু! ইধার আও৷’’

একজন লোক দৌড়ে এল৷ কেয়ারটেকারের নির্দেশে সে আমাদের সুটকেস দুটো নিয়ে গেল৷ কর্নেল সহাস্যে বললেন, ‘‘গাড়ি নিশ্চয়ই গিয়েছিল৷ তবে গাড়ি সম্ভবত সাদা দাড়ি খুঁজছিল এবং দাড়ির দর্শন পায়নি; কারণ তা ঢাকা ছিল৷’’

কেয়ারটেকার হেসে ফেললেন৷

সুন্দর সাজানো একটা ঘরে আমাদের নিয়ে গিয়ে তিনি রুম-হিটার চালিয়ে ঘর গরমের ব্যবস্থা করলেন৷ কর্নেল বললেন, ‘‘আপনিই নন্দবাবু?’’

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আমার নাম নন্দকুমার রায়৷ সায়েব কিংবা তাঁর গেস্ট এলে আমি আগাম চলে আসি৷ নইলে বৈজুই সব দেখাশোনা করে৷ বৈজু জুতোসেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, সবেতেই এক্সপার্ট৷ চায়ের ব্যবস্থা করে আসি৷’’

‘‘কফি পেলে ভালো হয়৷ আমি কিন্তু কফিরই ভক্ত৷’’

নন্দবাবু হাসলেন৷ ‘‘কফিও আছে৷ কোনও অসুবিধা নেই স্যার! সায়েবও আসবেন বলেছেন৷ তাই সব ব্যবস্থা করে রেখেছি৷’’

নন্দবাবু চলে গেলে বললাম, ‘‘আপনি ভবিষ্যতে আর দাড়ি ঢাকবেন না৷ ওঃ! আপনি দাড়ি না ঢাকলে এই কষ্টটা পেতাম না৷’’

‘‘ডার্লিং! কথায় আছে না, কেষ্ট পেতে হলে কষ্ট করতে হয়?’’

‘‘কী কেষ্ট পেলেন শুনি?’’

কর্নেল চোখে হেসে বললেন, ‘‘শুধু কেষ্ট নয়, তার সঙ্গিনী রাধাকেও৷’’

‘‘অ্যাঁ?’’

‘‘চেপে যাও, ডার্লিং! স্পিকটি নট৷’’ বলে ওভারকোট এবং হনুমানটুপি খুলে ফেললেন কর্নেল৷ চাপা স্বরে ফের বললেন, ‘‘ট্রাক ড্রাইভারকে বখশিস দেওয়া উচিত৷ আমাকে ঠিক জায়গায় সে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল৷’’

নন্দবাবু এলেন৷ ‘‘কফি এসে যাচ্ছে৷ ব্রেকফাস্ট কখন খাবেন স্যার?’’

ঘড়ি দেখে কর্নেল বললেন, ‘‘এখন সাড়ে আটটা৷ ন-টায় খাব বরং৷’’

‘‘বৈজু আছে৷ কোনও অসুবিধে হবে না৷ আমি একবার বাড়ি ঘুরে বাজার-টাজার করে আসছি৷’’

‘‘আপনি কি বরমডিহির বাসিন্দা?’’

‘‘আজ্ঞে তিনপুরুষের বাসিন্দা৷’’ বলে নন্দবাবু ব্যস্তভাবে বেরিয়ে গেলেন৷ আমি বাথরুমে যাচ্ছিলাম৷ লক্ষ্য করলাম, নন্দবাবু সাইকেল নিয়ে লনে হাঁটছেন৷ বোঝা গেল, ভদ্রলোক যদিও কেয়ারটেকার, এই বাংলোয় আসেন কদাচিৎ৷ সম্ভবত বৈজুই কার্যত কেয়ারটেকারের সব দায়িত্ব পালন করে৷

বাথরুম থেকে ফিরে দেখি, টেবিলে কাপ, ট্রে-তে কফির পট, দুধ, চিনি এবং দুটো মস্ত পেয়ালা৷ প্লেট-ভর্তি নানারকম স্ন্যাক্সও আছে৷ রুম-হিটারের কাছাকাছি বসে আরামে কফি খেতে-খেতে বললাম, ‘‘তা হলে দৈবাৎ বিগ সন্ধান পেয়ে গেছেন?’’

কর্নেল চোখ কটমট করে তাকালেন৷

বললাম, ‘‘সরি! স্পিকটি নট৷’’

কিছুক্ষণ পর বৈজু ট্রে নিতে এল৷ কর্নেল চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘‘আচ্ছা বৈজু! দেখো তো ইধার৷ ইয়ে আদমিকো পহচানতা তুম?’’

কর্নেল পকেট থেকে শ্যামবাবুর ছবি বের করে তাকে দেখালেন৷ বৈজু ঝুঁকে ছবিটা দেখল৷ গম্ভীর মুখে বলল, ‘‘মালুম, কোহি জগাহ পর দেখা৷ লেকিন ইয়াদ নেহি আতা৷’’

‘‘খ্যালসে দেখো, বৈজু!’’

সে মাথা চুলকে বলল ‘‘ইয়াদ নেহি আতা হজুর!’’

‘‘আচ্ছা৷ ইয়ে চার পিকচার দেখো৷’’

কর্নেল পকেট থেকে শ্যামসুন্দরের চারটে রিটাচ করা ছবি টেবিলে সাজালেন৷ এইসব ছবিতে বয়সের ছাপ দেওয়া হয়েছে এবং কোনও ছবিতে গোঁফ, কয়েকরকম ছাঁটের দাড়ি আঁকা৷

বৈজু ঝুঁকে ছবিগুলো দেখছিল৷ চিবুকে দাড়িওয়ালা ছবিটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে একটু হাসল৷ ‘‘ইয়ে তো ওহি আদমি৷’’

‘‘কৌন?’’

‘‘দেড়-দো মাহিনা আগে সাব কা সাথ মুলাকাত করনে আয়া৷’’

‘‘উস টাইম তুমকা সাব হেঁয়া থা?’’

‘‘সাব দো-দিনকে লিয়ে আয়া, হজুর! ফির চলা গেয়া কলকাত্তা৷’’

‘‘ইয়ে আদমি উনহিকা সাথ চলা গেয়া?’’

‘‘নেহি হুজুর! সাব একেলা চলা গেয়া৷ ইয়ে আদমিকা সাথ সাবকা বহত বাতচিত-করার হুয়া৷ সাব ইসকো নিকাল দিয়া ঘরসে৷’’

‘‘দো মাহিনা নেহি! দেড় মাহিনা আগে৷’’

বৈজু একটু হাসল৷ ‘‘হোগা দেড় মাহিনা৷ তো কাহে হামকো ইয়ে সব বাত পুছতা হুজুর?’’

কর্নেল পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট ওর হাতে দিয়ে বললেন, ‘‘বখশিস বৈজু৷ কিসিকো মাত বোলো হাম তুমকো পিকচার দেখায়া কী ইস তরাহ কোই বাত কিয়া৷ সমঝা?’’

‘‘হাঁ হুজুর !’’

সে সেলাম ঠুকে সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে ট্রে নিয়ে বেরিয়ে গেল৷ বললাম, ‘‘তা হলে দেখা যাচ্ছে, তরুণবাবুও আপনাকে অনেক কথা গোপন করছেন! অক্টোবরে শ্যামবাবুর সঙ্গে তরুণবাবুর এখানে দেখা করার কথা ছিল এবং দেখা হয়েছিল৷ সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে৷ সম্ভবত বিগ্রহের দরদাম নিয়ে তর্ক হয়েছিল৷ বেশি দাম চাওয়ায় চটে গিয়ে তরুণবাবু তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন৷ কিন্তু আমার অবাক লাগছে, তরুণবাবু বিগ্রহ-চোরকে তক্ষুনি পুলিশে দেননি৷ কেন? তাঁরও পূর্বপুরুষের অমূল্য সম্পদ ওই বিগ্রহ৷ চোরকে হাতে পেয়ে ছেড়ে দিলেন কেন?’’

কর্নেল চোখ বুজে চরুট টানছিলেন৷ আমার কথাগুলো যেন ওঁর কানে ঢুকল না৷ হঠাৎ চোখ খুলে বেমক্কা হাঁক দিলেন, ‘‘বৈজু! ইধার আও৷’’ বৈজু কিচেনের দিক থেকে সাড়া দিল৷ তারপর তেমনই সন্দিগ্ধ ভঙ্গিতে আড়ষ্টভাবে ঘরে ঢুকে সেলাম দিল৷

কর্নেল বললেন, ‘‘ঔর এক পিকচার দেখো বৈজু!’’

উনি এবার পকেট থেকে জাল ভোলা ওরফে হারাধনের ছবি বের করে দেখালেন৷ বৈজু কঁচুমাচু হেসে বলল, ‘‘হুজুর৷ ইয়ে তো সাবকা সাথ কলকাত্তাসে আয়া৷ সাবকা সাথ চলাভি গেয়া৷ ইস্কা নাম...’’

‘‘হারাধন৷’’

‘‘হাঁ হুজুর! সাবকা নোকর-উকর হোগা৷ লেকিন...’’ বলে সে হাতজোড় করল৷ ‘‘হুজুর! মুঝে মালুম নেহি পড়ে, কাহে আপ ইয়ে সব বাত পুছতা! হাম গরিব আদমি হুজুর! নোকরি চলা যায় তো ভুখসে মর যায়েগা৷’’

কর্নেল আর-একটা দশ টাকার নোট ওর হাতে গুঁজে দিয়ে ওকে আশ্বস্ত করলেন৷ বৈজু আড়ষ্টভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল৷ কর্নেল হিন্দিতে বললেন, ‘‘তোমার সায়েব থাকার সময় কি এখানে কালো দৈত্যের উপদ্রব হয়েছিল?’’

বৈজু বলল, ‘‘হ্যাঁ হুজুর! তার পরদিন সায়েব কলকাতা ফিরে গিয়েছিলেন৷’’

কর্নেল আপন মনে বললেন, ‘‘২৬শে অক্টোবর তরুণবাবু কলকাতা ফিরে যান৷’’

‘‘হুজুর?’’

‘‘কিছু না৷ তুমি এসো বৈজু, চিন্তা কোরো না৷ এসব কথা কেউ জানবে না৷’’

বৈজু চলে গেল৷ কর্নেলকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল৷ বাইনোকুলার হাতে বাইরের বারান্দায় গেলেন উনি৷ বাইরে ততক্ষণে রোদ ফুটেছে৷

একটু পরে বারান্দায় গেলাম৷ দেখলাম লনে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ বাইনোকুলারে কিছু দেখছেন৷ জায়গাটা উঁচু বলে চারদিকে বহু দূর দেখা যাচ্ছে৷ পূর্বদিকে গাছপালার ফাঁকে একটা চওড়া পিচের পথ দেখতে পেলাম৷ তারপরই চোখে পড়ল...হ্যাঁ, ওই তো সেই পোড়ো দোতলা বাড়িটা ! অত দূর থেকে যেন হিংস্র চোখে তাকিয়ে আছে৷ কঙ্কালের মতো ভয়ঙ্কর একটা বাড়ি৷

কর্নেল হঠাৎ ঘুরে একটু হেসে বললেন, ‘‘বাইনোকুলারে ভূতুড়ে বাড়িটা দেখবে নাকি জয়ন্ত?’’

‘‘নাহ! আপনি দেখুন৷’’

‘‘ব্রেকফাস্টের সময় হয়ে এল৷ খেয়ে নিয়ে বেরুব৷ তুমি—’’

ঝটপট বললাম, ‘‘নাহ৷ ঘুমোব৷’’

কর্নেল অট্টহাসি হাসলেন৷ ‘‘তোমার মনে যে প্রশ্নগুলো এসেছে, আমার মনেও এসেছে৷ তবে এখন এ নিয়ে মাথা ঘামানোর অর্থ হয় না৷ তরুণবাবু আসুন, তারপর আশা করি ব্যাখ্যা পেয়ে যাব৷ ওঁর এখানে আসার উদ্দেশ্য আমাকে ব্যাখ্যা দেওয়া এবং বৈমাত্রেয় দাদাকে টিট করা৷ এক ঢিলে দুই পাখি বধ৷ ওয়েট অ্যান্ড সি৷’’

‘‘আপনি বলেছিলেন বিগ্রহের খোঁজ পেয়ে গেছেন৷ কোথায় কীভাবে পেলেন?’’

‘‘সমস্যা হল, জয়ন্ত! কখন আমার মুখ দিয়ে একটা কথা বেরিয়ে যায় এবং তুমি তা নিয়ে বড়ো বেশি চিন্তাভাবনা করে ফেলো! ওটা একটা আইডিয়া৷’’

‘‘আহা, খুলে বলতে অসুবিধা কী?’’

কর্নেল বারান্দায় এসে বেতের চেয়ারে বসলেন৷ আমিও বসলাম৷ কর্নেল বললেন, ‘‘বনজঙ্গল, পাথর, তারপর চড়াই ভেঙে ওঠার সময় বাংলা প্রবচনটা আমার মাথায় এসেছিল: কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে না৷ হ্যাঁ, কষ্ট কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ একবার হোঁচট খেতে দেখলাম তোমাকে৷ দ্বিতীয়বার হোঁচট খেয়ে তুমি পড়ে গেলে৷ তোমাকে টেনে ওঠালাম৷ ওঠাতে গিয়ে আইডিয়াটা মাথায় এল৷’’

উনি থেমে গেলেন হঠাৎ৷ হাঁক দিলেন, ‘‘বৈজু ব্রেকফাস্ট লাও!’’

মাঝে-মাঝে কর্নেলের এইসব হেঁয়ালি ন্যাকামি মনে হয়৷ বিরক্ত হয়ে চুপ করে থাকলাম৷

কর্নেল বললেন, ‘‘যা বলছিলাম৷ কষ্ট করে আরোহণের সময় পদস্খলন হতেই পারে৷ একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে কষ্ট করে মানুষ এগোচ্ছে৷ হঠাৎ পা পিছলে পতন৷ দা আইডিয়া!’’

বৈজু বারান্দার টেবিলে ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল৷

মাখন-টোস্টে কামড় দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘তো যেখানেই কেষ্ট সেখানেই রাধা৷’’

‘‘ওঃ কর্নেল! আপনি বিগ্রহ পেয়ে গেছেন বলছিলেন?’’

‘‘দা আইডিয়া! আইডিয়া যদি সঠিক হয়, তা বাস্তবে কাজে লাগালেই সঠিক প্রাপ্তি৷ যা চাইছি, তা পেয়ে যাবই৷ তোমার পতনের সময় যে আইডিয়া মাথায় এসেছিল, তা সঠিক বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস৷ কাজেই বিগ্রহ পেয়ে গেছি, এটা নিশ্চিত৷ শুধু উদ্ধারের অপেক্ষা মাত্র৷’’

নাহ! আর মুখ খুললে আবার ক্রমাগত হেঁয়ালি শুনতে হবে৷ কাজেই চুপচাপ ব্রেকফাস্টে মন দেওয়াই উচিত৷...

শত্রুপক্ষের কবলে

ট্রেন-জার্নির ধকল এবং প্রচণ্ড শীতের দরুন কর্নেলের সঙ্গে বেরুনোর ইচ্ছে ছিল না৷ কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিলাম৷ কর্নেল সেই তুর্কি প্রজাপতির খোঁজে বেরুচ্ছেন বলে গিয়েছিলেন৷ এই সাংঘাতিক শীতেও নাকি ওই প্রজাতির প্রজাপতি কাবু হয় না৷ ধরতে না পারুন, ক্যামেরায় তার ছবি না তুলে ছাড়বেন না৷

একটা নাগাদ প্রকৃতিবিদ ফিরলেন৷ ততক্ষণে আমি গরম জলে স্নান করে ফিট হয়ে গেছি৷ কর্নেল সপ্তাহে একদিন স্নান করেন৷ আজ তাঁর স্নানের দিন নয়৷ পোশাক বদলে বৈজুকে লাঞ্চ রেডি করতে বললেন৷

জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘তুর্কি ঘোড়সওয়ারের দেখা পেলেন নাকি?’’

‘‘নাহ৷ সারা তল্লাটে পিকনিকবাজদের হুল্লোড়৷ আর মাইক্রোফোনে ফিল্মি গান! মুন লেকের চারদিকেও একই অবস্থা, কালো দৈত্য হানা দিলে খুশি হব৷’’

‘‘সন্ধ্যানীড়ে যাননি?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘একটা উঁচু টিলার মাথায় চড়ে বাইনোকুলারে বাড়িটার ওপর লক্ষ্য রেখেছিলাম কিছুক্ষণ৷ সন্দেহজনক কিছু দেখিনি৷ দেখলে ক্যামেরায় টেলিলেন্স ফিট করে ছবি তুলে নিতাম৷’’

কথাটা সেই মুহূর্তে মাথায় এল৷ বললাম, ‘‘আচ্ছা কর্নেল, ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় আপনার সঙ্গে ক্যামেরা ছিল৷ কিন্তু শ্যামবাবুর লাশের ছবি তোলেননি কেন?’’

‘‘এতদিন পরে কথাটা তুমি জিজ্ঞেস করছ?’’

‘‘খেয়াল হয়নি৷ আপনার কথায় এটা এতদিন পরে মাথায় এল৷’’

কর্নেল আস্তে বললেন, ‘‘তখন ক্যামেরায় আর ফিল্ম ছিল না৷ তুমি তো দেখেছিলে, সেদিন বিকেলে মুন লেকে ফিল্মের রোলটা উজাড় করে ফেলেছিলাম৷ পাখি আর প্রজাপতির অবাধ রাজত্ব তখন৷ কালো দৈত্যের ভয়ে শরৎকালে তল্লাটে তখন ট্যুরিস্ট বা পিকনিকবাজরা পা বাড়ায় না৷’’

ডাইনিং রুমে জোর কৃপাসে পায়ের ধুলো দেওয়ার জন্য ডাকতে এল বৈজু৷ লোকটি অত্যন্ত বিনয়ী এবং সত্যিকার সেবাভক্তিপরায়ণ৷

খাওয়ার সময় এতক্ষণে সাইকেলে চেপে নন্দবাবু এলেন৷ নমস্কার করে বললেন, ‘‘বাজার-টাজার করে দিয়ে গিয়েছিলাম৷ দেখলাম ইনি ঘুমোচ্ছেন৷ ডিসটার্ব করলাম না৷ বৈজু বলল, কর্নেলসায়েব বেরিয়েছেন৷ আপনারা খাওয়া-দাওয়া করুন স্যার৷ আমি চৌহদ্দি ঘুরে দেখি, সব ঠিকঠাক আছে কি না৷ সায়েব বড্ড খুঁতখুঁতে মানুষ৷ লনে একটু কিছু পড়ে থাকলে কিংবা বাগানের গাছপালার তলায় আবর্জনা দেখলে খাপ্পা হন৷ লোক আসছে৷ বিকেলের মধ্যে সব ঝকঝকে তকতকে করে ফেলবে৷’’

খাওয়ার পর ফুলবাগানের মধ্যে একটা গোলাকার খোলামেলা বেদিতে গিয়ে বসলাম দুজনে৷ ততক্ষণে এক ঝাড়ুদারনী এবং একজন লোক এসে গেছে৷ মনে হল, দরকার ছিল না ওদের৷ বৈজু সব ঝকঝকে করেই রেখেছে৷

নন্দবাবু তদারক করছিলেন৷ কর্নেল ডাকলেন, ‘‘আসুন নন্দবাবু! একটু গপ্প করা যাক৷’’

নন্দবাবু কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন৷

কর্নেল বললেন, ‘‘আচ্ছা নন্দবাবু, আপনি শ্যামসুন্দরবাবু নামে কাউকে চেনেন?’’

‘‘শ্যামসুন্দর স্যার?’’

‘‘হ্যাঁ৷ আপনার সায়েবের কলকাতার অফিসে এক সময় চাকরি করতেন ভদ্রলোক৷’’

নন্দবাবু বিকৃত মুখে বললেন, ‘‘এক নম্বরের ধড়িবাজ৷ সায়েবের মুখে শুনেছি, চুরিচামারি করে পালিয়েছিল৷’’

‘‘আপনার সায়েব বলছিলেন গত অক্টোবরে এই বাংলোবাড়িতে সে ওঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল৷’’

‘‘হ্যাঁ স্যার৷ দুপুরে এসেছিল৷ সেই প্রথম ওকে মুখোমুখি দেখেছি৷ খুব ভঁট দেখাচ্ছিল এসে৷’’

‘‘কী ব্যাপারে?’’

নন্দবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, ‘‘সেটা ঠিক বলতে পারব না স্যার! মনে হচ্ছিল খুব ভঁটের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে৷ সায়েব ওকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা এঁটে কথা বলছিলেন৷ আবছা কানে এসেছিল খুব তর্কাতর্কি হচ্ছে৷ তারপর হঠাৎ দরজা খুলে সায়েব ওকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন৷ হুমকি দিয়ে বললেন, ফের যদি আমার সামনে কখনও দেখি, গুলি করে মারব৷ শ্যামসুন্দর চুপচাপ চলে গেল৷’’

‘‘আপনি সায়েবকে জিজ্ঞেস করেননি কিছু?’’

‘‘না স্যার৷ আমি ওঁর কর্মচারী৷ উনি আমার রুজির মালিক৷ তবে সায়েব পরে শুধু বললেন, জানো, নন্দ; এই বদমাইশটা আমার কলকাতার অফিসে ক্লার্ক ছিল৷ খুব বিশ্বাস করতাম ওকে৷ আমার একটা ইমপর্ট্যান্ট ফাইল চুরি করে পালিয়েছিল৷ তো সায়েবের এই কথা শুনে মনে হয়েছিল, শ্যামসুন্দর সায়েবকে ব্ল্যাকমেল করতেই এসেছিল৷ সায়েবের দেশ-বিদেশে ইমপোর্ট-এক্সপোর্টের কারবার আছে৷ বুঝতেই পারছেন, আজকাল এই কারবারে অনেক বে-আইনি কাজকর্ম হয়৷ আমি আদার ব্যাপারী, জাহাজের খবরে আমার কাজ কী?’’

‘‘আপনার সায়েবের সঙ্গে তাঁর বৈমাত্রেয় দাদার এখানকার একটা বাড়ি নিয়ে নাকি মামলা চলছে?’’

‘‘সন্ধ্যানীড় নিয়ে৷ সব জানি৷ এখন মামলা সুপ্রিম কোর্টে উঠেছে৷ তবে স্যার বাড়িটার খুব বদনাম আছে৷ বাড়ি ফেলে রাখলেই ভূতপ্রেতের আখড়া হয়৷ বুঝি না, সায়েবের কেন এত জিদ!’’

‘‘আপনি কখনও ঢুকেছেন ও বাড়িতে?’’

নন্দবাবু হাসলেন৷ ‘‘আমার মাথা খারাপ হয়েছে? দিনদুপুরেই ওই হানাবাড়ির কাছ ঘেঁষে না স্থানীয় লোকেরা৷ তাছাড়া দরজায় তালা বন্ধ৷ আদালতের হাতে৷ বাড়িটার জিম্মা পুলিশ আর ভূত; উভয়কেই মানুষ ভয় করে স্যার!’’

কর্নেল অট্টহাসি হাসলেন৷ ‘‘ঠিক বলেছেন!’’ বলে বাইনোকুলারে সম্ভবত কোনও পাখি দেখতে থাকলেন৷

নন্দবাবু ঝাড়ুদারনীকে তম্বি করতে গেলেন৷ লক্ষ্য করলাম, অনবরত কোনও না-কোনও গাছে হলুদ পাতা খসে পড়ছে৷ শীতের হাওয়া এই উঁচুতে বেশ জোরে বইছে৷ কাজেই বেচারির দোষ কী? একটু পরে নন্দবাবু আবার আমাদের সঙ্গে গল্প করতে এলেন৷ বরমডিহিতে একসময় বাঙালিদের কত রমরমা ছিল, কত দাপট ছিল এবং কোন পুজোয় কত ধুমধাম হত, এইসব নিয়ে বকবক করে চললেন৷

বাইনোকুলার নামিয়ে কর্নেল তাঁর কথা শুনছিলেন৷ বললেন, ‘‘আচ্ছা নন্দবাবু, আপনার সায়েবের দাদা শচীনবাবু...’’

‘‘বৈমাত্রেয় স্যার! সেইজন্যেই তো এই মামলা মোকদ্দমা!’’

‘‘শচীনবাবু আর এখানে আসেন না?’’

‘‘কই, তাঁকে তো অনেক বছর এখানে আসতে দেখি না৷ ওই বাড়িটা নিয়ে মামলা খুব বেশিদিনের নয়৷ কিন্তু আমি তো স্যার, বাড়িটার চেহারা বরাবর একইরকম দেখছি৷ সায়েবের বাবার তৈরি বাড়ি৷ কখনও-সখনও কলকাতা থেকে বড়োসায়েবের লোকজন এসে থাকত দেখেছি৷ কিন্তু ভূতের বদনাম ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি৷’’

‘‘এই বাড়িটা হিলটপ; দেখলাম তিন বছর আগে তৈরি হয়েছে৷ আপনি কি গোড়া থেকেই কেয়ারটেকারের কাজ করছেন?’’

‘‘না স্যার৷ আমি আমার সায়েবের ব্রাঞ্চ অফিসে চাকরি করতাম৷ বছর দুই হয়ে এল, সায়েব আমাকে এই কাজ দিয়েছেন৷’’

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ ‘‘আমরা একটু বেড়িয়ে আসি৷ মিঃ মুখার্জি সম্ভবত সন্ধ্যার আগে পৌঁছুতে পারবেন না৷ আমরা তার আগেই ফিরে আসব৷’’ বলে লনে হাঁটতে থাকলেন৷

ওঁকে অনুসরণ করে বললাম, ‘‘বাপস! কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল৷ আপনিও কিন্তু আজকাল বড্ড বেশি কথা বলেন৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘তোমাকে বলেছিলাম, কথা বলতে-বলতে দরকারি কথা বেরিয়ে আসে৷ মোটামুটি একটা ছবি পাওয়া গেল কি না বলো? তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, কালো দৈত্যের হামলার দিন অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর শ্যামসুন্দর এই বাংলোবাড়িতে এসেছিল এবং তরুণ মুখার্জির সঙ্গে তার কথা-কাটাকাটি হয়েছিল৷ তারপর সেদিনই সন্ধ্যায় সে সন্ধ্যানীড়ের দোতলায় খুন হয়েছিল৷ আমরা দৈবাৎ ওই সময় গিয়ে পড়ায় ঝটপট একটা নাটকের দৃশ্য অভিনীত হয়৷’’

‘‘তা ঠিক৷ তাতে হারাধন অন্যতম অভিনেতা৷ কিন্তু শচীনবাবুর ভূমিকায় কে ছিল?’’

‘‘তুমি নাকি উঠোনের জঙ্গলে একটা ছায়ামূর্তি দেখেছিলে বিদ্যুতের ছটায়?’’

‘‘হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছিলাম৷ সঙ্গে-সঙ্গে আপনাকে বলেছিলাম৷’’

‘‘তাহলে তিনজন ভিলেন, একজন ভিকটিম৷ ভিকটিম শ্যামসুন্দর৷ কাজেই বোঝা যাচ্ছে, সে একটা ফাঁদে পা দিয়েছিল৷’’ কর্নেল গেট থেকে বেরিয়ে বললেন, ‘‘ও সব কথা এখন থাক৷ আমরা প্রকৃতিকে কলুষিত করতে চাই না খুনোখুনির কথা বলে৷ চলো, নিষ্পাপ সৌন্দর্যের মধ্যে কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করি৷’’

প্রকৃতি এখন বেজায় হিংস্র! ভীষণ ঠান্ডা!

কর্নেল চুপচাপ বাঁ-দিকে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকলেন৷ আমরা আজ সকালে এই জঙ্গলের উল্টোদিক হয়ে এসেছি৷ এদিকে পাথর নেই৷ গাছগুলো উঁচু৷ শীতে পাতা ঝরে প্রায় ন্যাড়া হয়ে গেছে এবং ভেতরটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে৷ কিন্তু শুকনো পাতার স্তূপ সর্বত্র৷ পা ফেললেই বিচ্ছিরি শব্দ হচ্ছে৷

কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘এদিকে যাচ্ছিটা কোথায়?’’

‘‘একটা ঝরনা আছে এদিকে৷ ছোট্ট হলেও সুন্দর; তবে টুরিস্ট বা পিকনিকবাজদের ওটা পছন্দসই নয়৷ পাথর আর বালির ওপর দিয়ে ছটফটিয়ে চলা একফালি স্রোত মাত্র৷’’ কর্নেল চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘‘ঝরনার ধারে পাথরের ফাঁকে এক বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস দেখেছি৷ এসব ক্যাকটাস বালি, পাথর এবং জল এই তিনটেই চায়৷ রোদ্দুরও চায় এরা; ওয়াটার ক্যাক্টি বলা হয়৷ সচরাচর মরুদ্যানেই এদের দেখা মেলে৷ তাই আমার অবাক লেগেছে৷’’

ক্রমশ ঢালু হয়ে নেমে গেছে জঙ্গলটা৷ তারপর সতেজ গুল্মলতা চোখে পড়ল পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে৷ আবছা জলের শব্দ কানে এল৷ কিছুক্ষণ পরে ঝরনাটা দেখতে পেলাম৷ সুন্দর ঝরনা তাতে সন্দেহ নেই৷ কিন্তু দু’ধারে ঘন কাঁটাঝোপ৷ কর্নেল কাটাঝোঁপের সমান্তরালে ঝরনার ভাটির দিকে হাঁটছিলেন৷ হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, ‘‘ভুল করছি না তো? দুপুরে দেখে গেছি৷ ছবি তুলেছি৷ তুমি এখানে অপেক্ষা করো৷ আমি খুঁজে দেখি৷’’

বলে কর্নেল কাঁটাঝোপ সাবধানে ফাঁক করে ঝরনার পিচ্ছিল পাথরে অদ্ভুত ভঙ্গিতে পা ফেলতে-ফেলতে অদৃশ্য হলেন৷ বুঝলাম, ওইভাবে চলা আমার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই কর্নেল একা গেলেন৷ মিলিটারির লোক বলে কথা৷

অবশ্য আমিও কিছুদিন মাউন্টেনিয়ারিংয়ে ট্রেনিং নিয়েছিলাম ওঁর পরামর্শে; কিন্তু খবরের কাগজের একজন রিপোর্টারের পক্ষে সেই ট্রেনিং কী কাজে লাগবে ভেবে পুরো কোর্স শেষ করিনি৷

তবে কর্নেলের মতো ওইভাবে পিছল পাথরে নেচে-নেচে চলা সম্ভবত পর্বতারোহীদেরও দুঃসাধ্য৷ সত্যিই যেন ঝরনার সঙ্গে ব্যালে নৃত্য করতে গেলেন৷

গেলেন তো গেলেনই৷ আর ফিরে আসার নাম নেই৷ একবার ডাকলাম, ‘‘কর্নেল!’’

কোনও সাড়া এল না৷ তখন কয়েক পা এগিয়ে গেলাম৷ এখানে মাটিটা ভেজা এবং পাথরের ফাঁকে ঘন সবুজ ঘাস গজিয়েছে৷ বাঁ-দিকে কাটাঝোঁপের নীচে ঝরনা৷ ডানদিকে নিরেট পাথরের পাঁচিল মতো৷

আচমকা সেই পাঁচিল থেকে দুটো লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর৷ এক পলকের জন্য দেখলাম তাদের মুখে রাক্ষসের বা ভয়ঙ্কর কিছুর মুখোশ৷

ভিজে ঘাসে পড়ে গিয়েছিলাম৷ আমার পিঠে বসে একজন ছুরির ডগা ঠেকাল গলায়৷ অন্যজন মুখে টেপ সেঁটে দিল৷ চোখে রুমাল বাঁধল৷ তারপর পিঠমোড়া করে আমার দুটো হাত দড়ি দিয়ে বাঁধল৷ পা দুটোও বেঁধে ফেলল৷ আমি আতঙ্কে হতবুদ্ধি হলেও চেঁচানোর চেষ্টা করিনি; কারণ গলায় ছুরির ডগা৷

ওই অবস্থায় তারা আমাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলল৷ কখনও টের পেলাম চড়াইয়ে উঠছি, কখনও বুঝলাম ঢাল বেয়ে নামছি৷ ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না৷

কতক্ষণ পরে একখানে আমাকে মড়ার মতো নামিয়ে রেখে একজন চাপা স্বরে বলল, ‘‘একটু পরে রাস্তা পেরোতে হবে৷ এখনও পিকনিকওয়ালাদের গাড়ি যাচ্ছে৷’’

‘‘এখানেই শেষ করে দে না খুদে টিকটিকিটাকে৷’’

‘‘নাহ৷ বুড়ো টিকটিকিটার সঙ্গে রফা করতে হলে এটাকে এখনও জ্যান্ত রাখতে হবে৷ ও ব্যাটা এক ঘুঘু৷ মালের হদিশ ও ব্যাটা ঠিকই জানে৷’’

বুঝতে পারলাম, কর্নেলের ওপর আমার বাঁচা-মরা নির্ভর করছে!

বিগ্রহ এবং CL-X

ওরা আমাকে একটা ঘরের মেঝেয় মড়ার মতো চিৎ করে শুইয়ে রেখেছিল৷ চোখের বাঁধন খুলে দিয়েছিল৷ ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর৷ কিছুক্ষণ পরে আমার মাথার দিক থেকে একজন গলায় ছুরির ডগা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘‘এই ব্যাটা! বাঁচতে যদি চাস, ওই ঘুঘু ব্যাটাচ্ছেলেকে একটা চিঠি লেখ৷ যা বলব, লিখবি৷ কই হে? কাগজ কলম দাও, দেরি করা যাবে না৷’’

মাথার দিকে টর্চের আলো জ্বলল৷ পুরোনো জরাজীর্ণ ঘর৷ পলেস্তারা খসে গেছে৷ এটা সেই সন্ধ্যানীড় নয় তো?

খসখস করে কাগজ ছেঁড়ার শব্দ হল৷ তারপর একজন আমাকে কাত করে হাতের বাঁধন খুলে দিল৷ আগের জন তেমনই ভূতুড়ে গলায় বলল, ‘‘কিসের ওপর কাগজ ফেলে লিখবে? নোটবইটা দাও৷ ওটার ওপর লিখুক৷’’

আমার চোখের সামনে ফুলহাতা সোয়েটার পরা একটা হাতে শ্যামসুন্দরের সেই কালো নেটবইটা এবং তারই একটা ছেঁড়া পাতা দেখতে পেলাম৷ বুঝলাম, হরিবাবুর কাছ থেকে এরাই তা হলে নোটবইটা হাতিয়েছিল৷ গলায় ছুরির ডগা এবং মুখে টেপ সাঁটা৷ চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় কী?

‘‘যা বলছি লেখ৷ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বরাবরেষু৷’’

লিখলাম৷ হাতের লেখা জড়িয়ে যাচ্ছিল৷

‘‘এবার লেখ৷ আপনি অত্র পত্রপাঠ মাল মুন লেক রোডের মোড়ে মাইলস্টোনের পিছনে রাখিয়া দিবেন৷ সাবধান! কাহাকেও জানাইবেন না৷ আমি বন্দি হইয়াছি৷ মাল পাইলে আমার প্রাণ বাঁচিবে৷ আপনি পুলিশ কিংবা নিজের জোরে হস্তক্ষেপ করিলে আমার গলা শ্যামসুন্দরের মতো ফাঁক হইয়া যাইবে৷ ইহারা নজর রাখিয়াছে৷ আমার প্রাণরক্ষা করুন৷ ইতি৷ নাম সই কর৷ হ্যাঁ...জয়ন্ত চৌধুরি৷’’

অন্যজন ভূতুড়ে গলায় বলল, ‘‘পুনশ্চ লেখাও৷ টাইম দিতে হবে না?’’

‘‘ঠিক, ঠিক৷ এই ব্যাটা! পুনশ্চ লেখ৷ রাত্রি দশটা পর্যন্ত সময়৷ দশটা বাজিয়া গেলেই আমার গলা ফাঁক৷ হুঁ৷ ফের সই কর৷ তারিখ লেখ৷ গুড ! এই ! এক্ষুনি চলে যাও৷ হিলটপের গেটের সামনে ঢিল চাপা দিয়ে রেখে এসো৷ সাবধান৷ গুড়ি মেরে ঝোপের মধ্যে এগোবে৷ বুঝেছ? তুমি ধরা পড়লে মাল পাব না৷ কিন্তু এ ব্যাটার গলা ফাঁক হবে এই যা!’’

শুনেই আমার মাথা ঘুরে উঠল৷ টর্চ ততক্ষণে নিভে গেছে৷ আবার আমাকে কাত করে হাত দুটো বাঁধল ওরা৷ ছুরির ডগা সরে গেল৷ অন্ধকারে একটা ছায়ামূর্তি দরজা ফাঁক করে বেরিয়ে গেল৷ দরজা আবার বন্ধ হল৷ মাথার কাছের লোকটা হুমকি দিল, ‘‘নড়বে না৷ নড়লেই গলা ফাঁক৷ কারণ চিঠি তো লিখেই দিয়েছ৷ আর তুমি বাঁচলেই বা কী, মরলেই বা কী? তবে খামোকা এই শীতের রাত্তিরে ছুরি চালাতে ইচ্ছে করছে না৷ ইস! হাত দুটো ঠান্ডায় পাথর হয়ে গেছে৷ একটু আগুন জ্বেলে সেঁক দিতে পারলে হত৷ দেখা যাক৷’’

এতক্ষণে গলাটা একটু চেনা মনে হল, যদিও ফিসফিস করে কথা বলছিল সে৷ হারাধন নাকি? কে জানে! চুপ করে পড়ে থাকাই ভালো৷ কর্নেলের পাল্লায় পড়ে এমন ঘটনা যে ঘটেনি, তা নয়; কিন্তু এবার যা বুঝছি, বাঁচার আশা কম৷ কারণ কর্নেল সহজে হার স্বীকার করতে চাইবেন না৷ দুর্ভাবনায় বুকের স্পন্দন বেড়ে গেল৷

মাথার কাছের লোকটা ফস করে দেশলাই জ্বালিয়ে সিগারেট ধরাল৷ যেন ইচ্ছে করেই আমার মুখের দিকে ধোঁয়া ছাড়ছিল সে৷ মুখে টেপ সাঁটা৷ কাশি আসছিল৷ কাশবার চেষ্টা করতেই আবার গলায় ছুরির ডগা৷ ‘‘চুপ ব্যাটা! টুঁ শব্দ করলেই জবাই করব৷’’

সময় কাটছিল না৷ ফাঁসির আসামিদের মনের অবস্থা বুঝি এইরকমই হয়৷ শেষ পর্যন্ত হয়তো তারা আমার মতোই মরিয়া হয়ে ওঠে মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণের জন্য৷

কতক্ষণ পরে বাইরে কোথাও দু’বার কেউ শিস দিল৷ আমার মাথার কাছে বসে থাকা লোকটাও পাল্টা দু’বার শিস দিল৷

তারপর দরজা খুলে একটা ছায়ামূর্তি ঘরে ঢুকল এবং দরজা বন্ধ করল৷ টর্চের আলো জ্বলছিল৷ তাই সেই রাক্ষুসে মুখোশে ঢাকা মুখটা দেখতে পেয়েছিলাম৷ গায়ে ফুলহাতা বেঢপ নীলচে সোয়েটার৷ পরনে নোংরা প্যান্ট কাদায় বিচিত্তির৷

টর্চ নিভে গেল৷ ‘‘পেয়েছ? দিয়েছে ব্যাটা ঘুঘু?’’

‘‘হুঁ:!’’

‘‘এদিকে নিয়ে এসো৷ মালটা দেখি৷’’

আমার নড়া বারণ৷ তবে টের পেলাম আমার মাথার দিকে টর্চ জ্বেলে ওরা মাল পরীক্ষা করছে৷

‘‘এটাই বটে তো?’’

‘‘হুঁউ৷ একই প্যাকেট৷ খুলে দেখে নিয়েছি৷ গয়নাটয়না সব আছে৷’’

‘‘শ্যামা হারামজাদা ট্রেচারি না করলে মারা পড়ত না৷’’

‘‘ছাড়ো! বেরুনো যাক৷’’

‘‘শোনো! এই খুদে টিকটিকিটাকে বরং শেষ করে ফেলো৷’’

‘‘না, না৷ খুনখারাপি করায় রিস্ক আছে৷’’

‘‘শ্যামার মতো ইঁদারায় বডি ফেলে দিলেই হবে৷ তারপর পাথর ফেলে ঢেকে দেব৷ শ্যামার বডি এখনও ইঁদারার তলায় আছে৷ টের পেয়েছে কেউ?’’

‘‘বোকামি হবে বুঝছ না কেন? বুড়ো টিকটিকিকে সে-বার ফাঁকি দেওয়া কঠিন হয়নি৷ এ ব্যাটা ওর কাছের লোক৷ তাছাড়া রক্তটক্ত পড়ে থাকবে৷ তখন বৃষ্টি হচ্ছিল, ইঁদারায় জলও ছিল৷ এখন ইঁদারায় পাথর ভর্তি, রক্ত কিসে লুকোবে? চলো ! এ ব্যাটা এমনিভাবে পড়ে থাক৷’’

ওরা বেরিয়ে গেল৷ দরজা ভেজিয়ে দিয়েই গেল৷

কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হলাম৷ হাতের বাঁধন খোলার চেষ্টা করলাম৷ দ্বিতীয় বারের বাঁধনটা আগের মতো মজবুত ছিল না৷ গিট টানাটানি করে কবজিতে ব্যথা ধরে গেল৷ তারপর অবশেষে খুলে গেল৷ এবার পায়ের বাঁধন খুলে ফেললাম৷ তারপর মুখের টেপ খুলতে সে এক যন্ত্রণা!

ঘুটঘুটে অন্ধকারে সাবধানে পা বাড়িয়ে এবং টলতে-টলতে দেওয়াল হাতড়ে দরজা পেলাম৷ আমার বরাত! দরজা ওরা বাইরে থেকে আটকে দিয়ে যায়নি৷

হাতের যন্ত্রণা তেমন কিছু নয় কিন্তু পায়ে খিল ধরে গেছে৷ বেরিয়ে গিয়ে বারান্দা পেলাম৷ এবার অন্ধকার কিছুটা স্বচ্ছ হয়ে উঠল৷ একটু পরেই জায়গাটা চিনতে পারলাম৷ সন্ধ্যানীড়ের একতলার একটা ঘরে ছিলাম৷

কিন্তু বেরুনোর দরজা বন্ধ৷ অগত্যা উঠোনে নেমে গিয়ে পাঁচিল আঁকড়ে অনেক কষ্টে ওপরে উঠলাম৷ তারপর ঝাঁপ দিলাম৷ যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলাম৷

গাড়ির হেডলাইট লক্ষ্য করে বরমডিহি-জাহানাবাদ রোডে পৌঁছুলাম৷ তারপর উল্টোদিকে হিলটপ বাংলোর আলো চোখে পড়ল৷

বাংলোর গেটে পৌঁছুতে কতক্ষণ সময় লেগেছিল জানি না৷ আমাকে দেখতে পেয়েছিল বৈজু৷ সে দৌড়ে এল৷ তারপর চ্যাঁচামেচি শুরু করল, ‘‘হুজুর৷ কর্নিলসাব! হুজুর৷ ছোটাসাব আয়া!’’

আশ্চর্য! কর্নেলের কোনও সাড়া পেলাম না৷ টলতে-টলতে বারান্দায় উঠলাম৷ তারপর ঘরে ঢুকে দেখলাম, কর্নেল হেলান দিয়ে বসে চুরুট টানছেন৷

উনি মুখ তুলে আমাকে দেখে একটু হাসলেন৷ ‘‘আগে পোশাক বদলাও, ডার্লিং! বাথরুমে গরম জলে হাত-পা-মুখ ধুয়ে নাও৷ একেবারে পোড়োবাড়ির ভূত হয়ে ফিরেছ৷’’ বলে হাঁক দিলেন, ‘‘বৈজু! জলদি কফি লাও৷’’

ক্ষোভে-অভিমানে গুম হয়ে বাথরুমে গেলাম৷ একটু পরে পোশাক বদলে সোফায় বসলাম৷ কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন৷ বৈজু এক পেয়ালা কফি রেখে গেছে৷ কফিপানের দরকার ছিল৷

কর্নেল চোখ বুজেই বললেন, ‘‘একটু রিস্ক ছিল তা অস্বীকার করছি না৷ তবে প্ল্যানমাফিক কাজ হয়েছে৷ তরুণবাবু যে ফাঁদ পেতেছিলেন, তা অনবদ্য৷ ওঁর সহযোগিতা না পেলে শ্যামবাবুর খুনিদের ধরার চান্স ছিল না৷ হ্যাঁ, খুনিরা এতক্ষণ অবশ্যই ধরা পড়ে গেছে৷ প্রতি মুহূর্তে আশা করছি, তরুণবাবুর গাড়ির হর্ন বেজে উঠবে৷’’

এতক্ষণে মুখ খুলতে হল৷ ‘‘আপনার সঙ্গে এই শেষ৷’’

কর্নেল চোখ খুলে হাসলেন৷ ‘‘শেষ কী জয়ন্ত? শুরু বলো!’’

‘‘আশ্চর্য! আপনি আমাকে একলা ফেলে রেখে—’’

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘তরুণবাবুর প্ল্যান!’’

‘‘তার মানে?’’

‘‘তরুণবাবু গত রাত্রে আমাদের সঙ্গে ট্রেনেই এসেছেন৷ এ. সি. কামরায় ছিলেন৷ ওঁর জিপে আসানসোল হয়ে আসার ব্যাপারটা একটা চাল মাত্র৷ তাছাড়া আমার সঙ্গে পরামর্শেরও দরকার ছিল৷ কিন্তু তখনও আমি বিগ্রহ কোথায় আছে জানতাম না৷ আজ সকালে এখানে আসার পথে দৈবাৎ যখন বিগ্রহের সন্ধান পেলাম, তখন আবার নতুন প্ল্যান ছকতে হল৷ চলে গেলাম ওঁর কাছে৷ কথা মতো উনি উঠেছিলেন ওঁর এক বন্ধুর বাড়িতে৷ উনি বললেন, পুরো প্ল্যান সত্যি বদলানো দরকার৷ খুনিদের একবারে হাতেনাতে ধরতে হবে নইলে পুলিশ নিছক সন্দেহক্রমে ওদের ধরার ঝুঁকি নেবে না৷ আদালতে কিছু প্রমাণ করাও কঠিন হবে৷ শ্যামসুন্দরের লাশই তো পাওয়া যায়নি৷ বিগ্রহ ওদের হাতে যাওয়া দরকার, কিন্তু কী ভাবে তা ওদের হাতে যাবে? তখন তরুণবাবু বললেন, জয়ন্তবাবুকে কাজে লাগানো যাক৷ তার আগে বলা দরকার, বিগ্রহ-চোর শ্যামবাবুর খুনিদের একজন কলকাতাতেই তরুণবাবুর সঙ্গে ইদানীং ফোনে যোগাযোগ রাখত৷ সে বলত, বিগ্রহ উদ্ধার করতে পারলে তরুণবাবুকেই সে দেবে৷ তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হবে৷ তরুণবাবু প্রথমে রাজি হননি৷ পরে রাজি হন৷ কেন রাজি হন, বলছি৷ উনি ঠিক করেন, বিগ্রহ পেলে বেনামী চিঠি লিখে ওঁর দাদা শচীনবাবুকে জানাবেন, মামলা মিটমাট করে নিলে বিগ্রহ ফেরত পাবেন৷ আর মামলা মিটমাট করার মানে তরুণবাবুর মা’কে মহেন্দ্রবাবুর বিবাহিতা স্ত্রী বলে স্বীকার করে নেওয়া৷ এখানেই তো তরুণবাবুর যত ক্ষোভ!’’

বললাম, ‘‘কিন্তু আমাকে কাজে লাগানো ব্যাপারটা কী? কী বাঁচা বেঁচেছি, এখনও তো শোনার মর্জি নেই আপনার৷’’

‘‘শুনব খন৷ আগে তুমি ব্যাকগ্রাউন্ডটা শুনে নাও৷ কাল দুপুরে তো তরুণবাবুর সঙ্গে আমার বরমডিহি আসার কথা হয়ে গেছে৷ বিকেলে সেই লোকটা ট্রাঙ্ককল করে তরুণবাবুকে জানায়, বিগ্রহ উদ্ধারের কাজ চলছে৷ তরুণবাবু যেন বরমডিহি চলে আসেন৷ সে তার সঙ্গে এখানে যোগাযোগ রাখবে৷ কিন্তু তরুণবাবু হিলটপে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছেন৷ তাই তাকে বলেন, তিনি বরমডিহি যেতি রাজি৷ রাতের ট্রেনেই যাবেন৷ তবে হিলটপে যোগাযোগ করার ঝুঁকি আছে৷ দৈবাৎ তাঁর দাদা শচীনবাবুর কোনও বন্ধুর চোখে পড়ে গেলে ঝামেলা হবে৷ তার চেয়ে বরং তাঁর সঙ্গে সে যেন রেল স্টেশনেই যোগাযোগ করে৷ লোকটা বলে, তার পরনে থাকবে নীলচে সোয়েটার৷ মাথায় মাংকিক্যাপ৷ চোখে সানগ্লাস৷ মুখে দাড়ি৷’’ কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে ফের বললেন, ‘‘দুপুরে তরুণবাবুর কাছে গিয়ে শুনলাম, দেখা হয়েছে৷ লোকটাকে খুব চেনা মনে হচ্ছিল৷ কিন্তু স্মরণ করতে পারেননি৷ সে ফিসফিস করে কথা বলছিল৷ বিগ্রহ উদ্ধারের কাজ নাকি পুরোদমে চলছে৷ উদ্ধার হলেই সে যোগাযোগ করবে৷ তবে তরুণবাবুর ঠিকানা তার জানা দরকার৷ তরুণবাবু তাকে তাঁর বন্ধুর বাড়ির ঠিকানা দেন এবং দুটো নাগাদ সেখানে দেখা করে কাজ কত দূর এগোল, তা জানাতে বলেন৷ এটা তরুণবাবুর একটা আইডিয়া৷ কারণ লোকটার সঙ্গে আরও কথা বলা দরকার৷ কেন তাকে তাঁর চেনা মনে হয়েছে, এই খটকা দুর করার ইচ্ছে ছিল৷ ইতিমধ্যে আমি গিয়ে সব জানালাম তাঁকে৷ তখন উনি বললেন, লোকটা এলে তাকে এখানে আমার আসার কথা জানাবেন৷ আমিই যে বিগ্রহ উদ্ধার করেছি, তাও জানাবেন৷ আমার হাত থেকে বিগ্রহ উদ্ধারের ফন্দি বাতলাবেন৷ অর্থাৎ তোমাকে ওদের হাতে তুলে দিতে হবে৷’’

কর্নেল সকৌতুকে হাসলেন৷ ‘‘লোকটা এই টোপ গিলবে কি না তরুণবাবুর অবশ্য সন্দেহ ছিল৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সে টোপ গিলেছিল৷ এক সাঙ্যাতকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল৷ বাইনোকুলারে দূর থেকে তোমার দুর্দশা দেখে কষ্ট হচ্ছিল৷ কিন্তু কী আর করা যাবে? ওই সময় ওদের পুলিশ ধরলে বড়োজোর একটা ছিনতাই কেট-টেস হত৷ তোমাকে কিডন্যাপ করার যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখানো যেত না৷ আবার বিগ্রহের প্রসঙ্গ তুললে বিগ্রহ-রহস্য ফাঁস হয়ে যেত৷ শচীনবাবু নিশ্চয়ই এসে নাক গলাতেন৷ অনেক হ্যাপা ছিল না কি? তাঁর অলরেডি পুলিশের কাছে এ বিষয়ে ডায়েরি করা আছে৷’’

‘‘এ-ও কম হ্যাপা গেল না আমার ওপর!’’

‘‘তা একটু থ্রিলিং অভিজ্ঞতা হল৷ মন্দ কী?’’

এইসময় বাইরে হর্ন বাজল৷ কর্নেল নড়ে বসলেন৷ একটু পরে বাংলোর পোর্টিকোতে গাড়ি থামার শব্দ হল৷ তারপর তরুণবাবু ঘরে ঢুকে ধপাস করে বসে বললেন, ‘‘কর্নেল সায়েব৷ শেষ পর্যন্ত প্ল্যান ভেস্তে গেল! এতক্ষণ অপেক্ষা করেও বদমাশটা এল না৷ রাত সাড়ে এগারোটা বাজে৷ আর কী করা যাবে? বিগ্রহ হাতে পেয়েই কেটে পড়েছে ! আমারই বোকামি হয়ে গেল৷’’

কর্নেল হঠাৎ হা-হা করে হেসে উঠলেন৷

তরুণবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘‘হাসছেন যে?’’

‘‘ওটা নকল বিগ্রহ মিঃ মুখার্জি৷’’

‘‘নকল? সে কী!’’

‘‘হ্যাঁ৷ হরিবাবুর বাসায় আপনাদের গৃহদেবতার ছবি দেখে আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছিল৷ জয়ন্ত যেদিন ওয়ার্ড-গেম নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল, সেইদিন ও বাড়ি যাওয়ার পর আমি বৈষ্ণবদের আরাধ্য রাধাকৃষ্ণের প্রাচীন বিগ্রহ সংক্রান্ত বই পড়ছিলাম৷ ষোড়শ শতকে একই ছাঁদের বিগ্রহ তৈরি হত৷ সেই রাত্রে আমার স্নেহভাজন এক ভাস্করকে ফোনে ডেকে পাঠাই৷ তাকে একটি বিগ্রহ পরদিন তৈরি করে দিতে বলি৷ সাধারণ কালো পাথরের বিগ্রহ তৈরি করে নকল অলঙ্কারে সাজিয়ে দিয়েছিল সে৷ আমার স্মৃতি প্রখর৷ কী-কী অলঙ্কার আপনাদের বিগ্রহে ছিল, আমার মনে স্পষ্ট৷ কাজেই নকল প্রাচীন শৈলীর বিগ্রহ তৈরিতে অসুবিধে হয়নি৷ অবশ্য তখনও জানতাম না, কেন এটা করলাম৷ হয়তো ভেবেছিলাম, এটা কোনও কাজে লাগতেও পারে৷ তবে...নাহ৷ সঠিক জানি না৷ ইনটুইশন বলতেও পারেন!’’

তরুণবাবু শুনছিলেন অবাক হয়ে৷ আবার বললেন, ‘‘তা হলে ওটা নকল বিগ্রহ?’’

আমি বললাম, ‘‘খুনি-দুটো বলছিল, একই প্যাকেটে মোড়া আছে৷ প্যাকেট পেলেন কোথায়?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ প্যাকেটটা একই৷ যে প্যাকেটে শচীন্দ্রলাল মুখার্জি...’’

তরুণবাবু তার কথার ওপর বললেন, ‘‘আগে বলুন, আসলটা কি সত্যিই আপনার কাছে আছে?’’

‘‘আছে৷ দেখাচ্ছি৷ তার আগে বলি, কীভাবে ওটার খোঁজ পেলাম৷’’ বলে কর্নেল ঘড়ি দেখলেন৷ ‘‘সংক্ষেপেই বলি৷ শ্যামসুন্দরের নোটবইয়ের ওয়ার্ড-গেম গ্যাব, রেয়ার, আর্টস, বেস্ট শব্দছকের কথা আজ দুপুরে আপনাকে বলেছিলাম৷ জয়ন্ত অক্ষরগুলো সংখ্যায় রূপান্তরিত করে টোটাল ফিগার ১৬০ দেখিয়েছিল৷ জয়ন্ত ইজ রাইট৷ এই সংখ্যাটা সত্যিই একটা সংকেত৷ এটাকে রোমান সংখ্যায় দেখলে হবে সি-১০০, এল-৫০ এবং এক্স-১০৷ তো আজ সকালে কুয়াশার মধ্যে ট্রাক ড্রাইভার আমাদের মুন লেক রোডের মোড়ে নামিয়ে দিয়েছিল৷ জঙ্গল এবং পাথরে ভর্তি চড়াই ভেঙে শর্টকাটে আসার সময় জয়ন্ত একখানে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিল৷ ওকে টেনে তুলতে গিয়ে একটা পাথর চোখে পড়ল৷ পাথরটা ছোট্ট একটা মাইলস্টোনের মতো মাটিতে পোঁতা ছিল৷ ঘাসের মধ্যে ইঞ্চি ছয়েক বেরিয়েছিল৷ ওতেই হোঁচট খেয়েছিল জয়ন্ত৷ চমকে গেলাম৷ পাথরটায় খোদাই করা আছে ‘ই এল এক্স’৷ সন্দেহ চেপে রাখলাম তখনকার মতো৷ দুপুরে আপনার সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় পাথরটা টানাটানি করে উপড়ে ফেললাম৷ এ আমার পক্ষে সহজ কাজ৷ তলায় নাইলনের দড়িতে বাঁধা পলিথিন পেপারে মোড়া একটা প্যাকেট ছিল৷ টেনে তুললাম৷ বাঁধন খুলে পলিথিন পেপারের মোড়ক ছাড়িয়ে আরও একটা মোড়ক দেখলাম৷ সেটা শক্ত খাকি রঙের প্যাকিং পেপার৷ ব্যস! বেরিয়ে পড়ল রাধাকৃষ্ণের যুগল বিগ্রহ৷ ছোট্ট বিগ্রহ৷ ৯ ইঞ্চি বাই ৬ ইঞ্চি সাইজ৷ তবে গয়নাগুলো নেই৷ শ্যামসুন্দর রত্নের লোভ সামলাতে পারেনি৷ বেচে দিয়েছিল নিশ্চয়ই৷’’

বলে কর্নেল তার স্যুটকেস খুলে সাদা পলিথিন পেপারে মোড়া বিগ্রহ বের করলেন৷ মোড়ক খুলতেই কষ্টিপাথরের তৈরি রাধাকৃষ্ণের প্রাচীন বিগ্রহ বেরিয়ে পড়ল৷ তরুণবাবু গৃহদেবতাকে দু’হাতে তুলে মাথায় ঠেকিয়ে তারপর টেবিলে রাখলেন৷ তারপর মৃদুস্বরে বললেন, ‘‘অক্টোবর মাসে শ্যাম টেলিফোনে আমার সঙ্গে এখানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিল৷ এত বছর গা-ঢাকা দিয়ে থাকার পর হঠাৎ তার ফোন এবং হারানো গৃহদেবতা উদ্ধারের গল্প! স্বাভাবিকভাবে আমি আগ্রহ দেখিয়েছিলাম৷ কিন্তু সে এসে এক লক্ষ টাকা ক্যাশ দাবি করল৷ তার স্পর্ধা দেখে রাগ হয়েছিল৷ উপরন্তু সে হুমকি দিতে শুরু করল৷ দাদাকে সে জানিয়ে দেবে আমিই বিগ্রহ চুরি করিয়েছিলাম তাকে দিয়ে৷ সেই বিগ্রহ কোথায় আমি লুকিয়ে রেখেছি, তা-ও নাকি জানিয়ে দেবে৷ দাদা নাকি বরমডিহিতে এসেছেন এবং এক বন্ধুর বাড়িতে আছে৷ বুঝুন তাহলে! আমার মনে হল এটা ব্ল্যাকমেল করার শামিল৷ আমি ওকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলাম৷’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘শ্যামসুন্দর এর পর আপনার দাদার কাছে গিয়ে ফাঁদে পড়েছিল৷ সেদিন ২৫ অক্টোবর৷ তবে এটা ঠিক, শচীনবাবু খুনখারাপি চাননি৷ ওঁর অত্যুৎসাহী সাঙ্গোপাঙ্গ ওকে খুন করে ওর পকেট হাতড়ে কালো একটা নোটবই পেয়েছিল মাত্র৷ যাই হোক, রাত হয়েছে৷ খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়া যাক৷ আপনি কি এখানে থাকবেন, নাকি বন্ধুর বাড়ি ফিরে যাবেন?’’

তরুণবাবু বললেন, ‘‘নাহ৷ আমি ব্রতীনের কাছে বিদায় নিয়ে এসেছি৷ গাড়িটা নিতে সকালে ওর ড্রাইভার আসবে৷...’’

নাটকের তৃতীয় চরিত্র

ঘুম ভেঙেছিল কর্নেলের ডাকে৷ তখন প্রায় দশটা বাজে৷ উনি অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণ থেকে ফিরেছিলেন৷ বাইরে রোদ্দুর ঝলমল করছে৷ তবে দুরে ইতস্তত ঘন কুয়াশা৷ বারান্দায় বসে ব্রেকফাস্ট খেতে-খেতে বললেন, ‘‘তরুণবাবু ওঁর ব্রাঞ্চ অফিসের জিপ নিয়ে কলকাতা রওনা হয়ে গেছেন৷’’

বললাম, ‘‘বিগ্রহ ওঁকে দিয়েছেন নাকি?’’

‘‘কেন দেব না? ওঁদেরই পূর্বপুরুষের ঐতিহাসিক বিগ্রহ৷’’

‘‘আমার আর এখানে থাকতে একেবারে ইচ্ছে করছে না!’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘পায়ের ব্যথা কমেছে?’’

‘‘নাহ৷’’

‘‘তোমাকে নিয়ে গিয়ে দেখাতাম সন্ধ্যানীড়ের কোন ঘরে বন্দি ছিলে৷’’

‘‘দেখতে চাইনে৷’’

‘‘আমি দেখে এসেছি৷ দুটো দড়ি, একটা রুমাল এবং একটুকরো টেপ ওই ঘরে পড়ে ছিল৷ কুড়িয়ে এনেছি৷ স্যুভেনির ডার্লিং! যত্ন করে সাজিয়ে রেখো৷’’

‘‘আপনি রাখবেন৷’’

‘‘দুটো ছেঁড়া মুখোশ উঠোনের জঙ্গলে কুড়িয়ে পেয়েছি৷ ইঁদারায়—’’

‘‘আপনি তো আমার মুখে কিছু শোনেননি এখনও৷’’

‘‘বুঝতে পেরেছি৷ শুনব খন৷ তো যা বলছিলাম৷ ইঁদারায় উঁকি মেরে দেখলাম পাথরে ভর্তি৷ কেমন একটা বিচ্ছিরি গন্ধ৷’’

‘‘শ্যামসুন্দরের লাশ ইঁদারার তলায় আছে৷ ওরা বলাবলি করছিল৷’’

‘‘পুলিশকে জানিয়ে এসেছি৷ পুলিশ ইঁদারা থেকে শ্যামসুন্দরের কঙ্কাল উদ্ধার করতে ব্যস্ত৷’’ কর্নেল ডিমের পোচ চেটেপুটে খেয়ে ফের বললেন, ‘‘তুমি যে-ঘরে ছিলে, তার পাশের একটা ঘরের মেঝে খোঁড়া হয়েছে দেখলাম৷ এল প্যাটার্নের বাড়ি৷ সামনে দাঁড়িয়ে ডানদিক থেকে গুনলে ওটা ৮ নম্বর ঘর৷ আবার বাড়ির ভেতর উঠোনে দাঁড়িয়ে ডান দিক থেকে গুনলে যেটা ৮ নম্বর ঘর, সেটারও মেঝে খোঁড়া দেখতে পেলাম৷’

এক পলকের জন্য কথাটা মাথার ভেতর ঝিলিক দিয়েছিল৷ বললাম, ‘‘৮ নম্বর ঘর! মাই গুডনেস! কর্নেল, আপনি হরিবাবুকে বলেছিলেন না ৮ নম্বর ঘরের মেঝেয় বিগ্রহ পোঁতা আছে?’’

কর্নেল এবার আস্তে-সুস্থে কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘‘হরিচরণ গাঙ্গুলি, কাল তার এবং হারাধনের তোমাকে মড়ার মতো কাঁধে বইতে একটু কষ্ট হয়ে থাকবে৷ আহা! বেচারারা খামোকা কষ্ট করল৷ বিগ্রহ যদি বা হাতাল, তা-ও নকল!’’

উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম৷ ‘‘কিন্তু হরিচরণের থেকে তো অন্য কোনও পার্টি শ্যামসুন্দরের কালো নোটবই ফেরত চেয়েছিল৷’’

‘‘ওটা হরিচরণের চালাকি৷ আলিপুর কোর্ট-চত্বরে সেই ছেলেটি আমাকে বলেছে, হরিচরণই তাকে দিয়ে একটা মাত্র চিঠি লিখিয়েছিল৷ হরিচরণের মুখে শোনা মহীবাবু নামে কোনো রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার এবং আউট্রাম ঘাটে সাদা পোশাকের পুলিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনা স্রেফ গুল৷ মহীবাবু নামটাও তার বানানো৷ আসলে ২৫ অক্টোবর ঝড়বৃষ্টির সময় হারাধন এবং সে শ্যামসুন্দরকে ফাঁদে ফেলে খুন করে তার পোশাক খুঁজে বিগ্রহের সূত্র পেতে চেয়েছিল৷ কালো নোটবইটা পেয়ে যায় শ্যামসুন্দরের পকেটে৷ সাংকেতিক ছকটা নিয়ে মাথা ঘামায়৷ তারপর আমার শরণাপন্ন হয়৷ বাকিটা কলকাতা ফিরে বুঝবে৷ তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট; হরিচরণের নাকে বাঁ-পাশে বেঢপ গড়নের জড়ুল৷ সে যখন সন্ধ্যানীড়ের দোতলায় একটা ঘরে পাশ ফিরে চাঁদর মুড়ি দিয়ে এস. এল. মুখার্জি সেজে শুয়ে ছিল, তখন জড়ুলটা আমি দেখে ফেলেছিলাম৷ তাই কলকাতা ফিরে সে মরিয়া হয়ে জড়ুলটা অপারেশন করিয়েছিল৷’’

‘‘কিন্তু বিদ্যুতের ছটায় উঠোনে আর-একজনকে আমি দেখেছিলাম৷’’

‘‘তাকে কলকাতা ফিরে আবার দেখাব৷’’ কফি শেষ করে কর্নেল চুরুট ধরালেন৷ বললেন, ‘‘হরিচরণ এবং হারাধনের ফোটো পুলিশকে দিয়েছি৷ তারা কোনও না-কোনও সময় ধরা পড়বে৷ তরুণবাবুরও এখানে প্রভাব আছে৷ পুলিশ শ্যামসুন্দরের কঙ্কাল পেলেই এবার অ্যাকশন নেবে৷ কারুর বিরুদ্ধে এতে অভিযোগ করতে গেলে কেউ যে সত্যিই খুন হয়েছে, তা দেখানো দরকার; কাজেই অক্টোবরে যে-অভিযোগ করতে আইনগত বাধা ছিল, এখন আর নেই৷’’

একটু পরে বললাম, ‘‘হরিচরণের ঘরে শ্যামসুন্দরের কালো নোটবই পাওয়ার রহস্য ফাঁস হল তা হলে৷ কিন্তু কর্নেল, হরিচরণ আপনার শরণাপন্ন হল কেন, সন্ধ্যানীড়ে আপনার পেটেন্ট সান্তা ক্লজ মার্কা চেহারা হারাধন এবং তার দেখা৷’’

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, ‘‘দুটো কারণে৷ একটা কারণের কথা আগেই বললাম৷ সাংকেতিক সূত্র কৌশলে জেনে নেওয়া৷ কিংবা ভেবেছিল, আমিই ওকে সেই সূত্রর সাহায্যে বিগ্রহ উদ্ধার করে দেব৷ তবে এটা গৌণ কারণ৷ মুখ্য৷ কারণ হল ওর জড়ুল৷ তার নাকের পাশে জড়ুল নেই, এটা দেখাতে গিয়েছিল৷ অতি বুদ্ধির গলায় দড়ি৷’’

‘‘তার মানে, সে আপনার সবিশেষ পরিচয় ২৫ অক্টোবরের আগে থেকেই জানত?’’

‘‘নাহ৷ সে জনত না৷ পরে জেনেছিল৷ আমি শচীনবাবুর বাড়িতে প্রথম যাওয়ার পরই সে জানতে পারে আমি কে৷ তারপর ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়েছিল৷ কিন্তু যেদিন আমি তাকে জড়ুলের কথা জিজ্ঞেস করলাম, সেদিনই সে গা-ঢাকা দিল এবং বরমডিহিতে চলে এল৷ তাকে সন্ধ্যানীড়ের ৮ নম্বর ঘরের মেঝেয় বিগ্রহ পুঁতে রাখার মিথ্যা সূত্র দিয়েছিলাম৷ তাই গা-ঢাকা দিয়ে সে বিগ্রহ উদ্ধারের ফিকির করেছিল৷ জয়ন্ত! রেলস্টেশনে তরুণবাবুকে এই হরিচরণ দেখা করেছিল৷ ক্লিয়ার?’’

‘‘ক্লিয়ার৷ তবে এখনও কিছু...’’

‘‘বাকিটা কলকাতায় ক্লিয়ার হবে৷’’

আমরা সেদিনই দুপুরের বাসে আসানসোল এবং সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা ফিরেছিলাম৷ কর্নেল বলেছিলেন, সময়মতো আমাকে ডাক দেবেন৷ সেই ডাক পেলাম দু’দিন পরে, সকালবেলায়৷

কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে দেখি, তরুণ মুখার্জি বসে আছেন৷ বেশ হাসিখুশি মুখ৷

কর্নেল বললেন, ‘‘তরুণবাবুর বেনামী চিঠিতে কাজ হয়েছে, জয়ন্ত! শচীনবাবু আমাকে ডেকেছেন৷ এখন আমার ভূমিকা মিলম্যানের৷ দেখা যাক৷ সাড়ে দশটায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট৷ এখন দশটা বাজে৷ বেরুতে হবে৷’’

তরুণবাবু বললেন, ‘‘জয়ন্তবাবু! হরি এবং আমার অফিসের বজ্জাত বেয়ারা হারাধন বরমডিহি রেলস্টেশনেই ধরা পড়েছে৷’’

বললাম, ‘‘সুখবর! কিন্তু মিঃ মুখার্জি, একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না৷ হারাধন তো ২৫ অক্টোবর হিলটপ বাংলোয় আপনার কাছে ছিল৷ সে কী করে—’’

‘‘শুনুন৷ শ্যামসুন্দরকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়ানোর কিছুক্ষণ পর হারাধন বাংলো থেকে বেরিয়ে যায়৷ ফিরেছিল রাত নটা-সাড়ে নটা নাগাদ৷ ফিরে বলল, ঝড়বৃষ্টিতে বাজারে আটকে গিয়েছিল৷ যাই হোক, হারাধন আমাদের গৃহদেবতা চুরি হওয়ার কথা জানত৷ আমার অফিসের সবাই জানে সে কথা৷ কিন্তু হারাধন যে সাংঘাতিক লোক, কেমন করে জানব? হরির সঙ্গে সে, কিংবা হরি তার সঙ্গে যোগাযোগ করে দল বেঁধেছিল আর কী! পুলিশ জেরা করে কথা আদায় করবে৷ তবে আমার ধারণা, সে শ্যামসুন্দরের পিছু নিয়েছিল৷ তারপর শ্যামসুন্দরকে সে হরির কাছে নিয়ে যায়৷ নিশ্চয়ই একটা প্ল্যান ছিল৷’’ বলে ঘড়ি দেখে তিনি বললেন, ‘‘চলুন৷ আপনাদের দাদার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দেব৷...’’

ভবানীপুরে আমাদের নামিয়ে দিয়ে তরুণবাবু চলে গেলেন৷ আমরা প্রাক্তন আইনজীবী শচীনবাবুর বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকলাম৷

শচীনবাবু ব্যস্তভাবে অপেক্ষা করছিলেন৷ আমাদের অভ্যর্থনা করে বসতে বললেন; তাঁর মুখে উদ্বেগের ছাপ৷ পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন৷ বললেন, ‘‘আমার দৃঢ় ধারণা, এটা তরুণেরই একটা ফাঁদ৷’’

কর্নেল চিঠিটা পড়ে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘‘কিন্তু আপনি বিপন্ন মিঃ মুখার্জি৷’’

শচীনবাবু চমকে উঠে বললেন, ‘‘বিপন্ন?’’

‘‘হ্যাঁ৷ শ্যামসুন্দরের লাশ আপনার সন্ধ্যানীড়ের ইঁদারার তলায় পুলিস আবিষ্কার করেছে৷ হরিবাবুকে অ্যারেস্ট করেছে৷ হরিবাবু কবুল করেছেন, খুনের রাত্রে আপনিও বরমডিহিতে ছিলেন৷ এমন কী সন্ধ্যানীড়েই লুকিয়ে ছিলেন৷’’

শচীনবাবু ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘‘ছিলাম৷ হরি বলেছিল, শ্যামা বিগ্রহ ফেরত দিতে চেয়েছে৷ তার বদলে ওকে দশ হাজার টাকা দিতে হবে৷ বিকেলে পাঁচটা নাগাদ শ্যামা নাকি বিগ্রহ নিয়ে আসবে৷’’ শচীনবাবু বিকৃত মুখে ফের বললেন, ‘‘কিন্তু হরি ব্যাটাচ্ছেলে তার এক স্যাঙাতকে নিয়ে যে শ্যামাকে খুন করে ফেলবে, তা কি আমি জানতাম? দোতলার একটা ঘরে অপেক্ষা করছি৷ ওরা শ্যামাকে পাশের ঘরে নিয়ে ঢুকেছে৷ তারপর হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি এসে গেল৷ আমি তো চুপচাপ বসে ইষ্টনাম জপ করছি৷ কতক্ষণ পরে ঝড় থামল, বৃষ্টি থামতে চায় না৷ হঠাৎ পাশের ঘরে ঝগড়া বেধে গেল৷ তারপর আর্তনাদ শুনতে পেলাম৷ আমি উঁকি মেরে টর্চ জ্বেলে দেখি, ওঃ! হরির স্যাঙাত শ্যামার বুকে বসে তার গলায়...ওঃ! কী সাংঘাতিক দৃশ্য! আমি ভয় পেয়ে দিশেহারা হয়ে নেমে গেলাম৷ উঠোনে ইঁদারার পাশে খিড়কির দরজা খুলে পালানোর চেষ্টা করছি৷ সেই সময় বাইরে হাঁকডাক৷ আপনারা এসে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন৷ যাই হোক, অনেক কষ্টে দরজার হুড়কো খুলে বেরুলাম৷ আমার এক ধনী মক্কেলের বাড়িতে উঠেছিলাম৷ তো অনেক রাত্রে হরি গিয়ে বলল, বাধ্য হয়ে শ্যামাকে খুন করেছে৷ তার বডি এমন জায়গায় লুকিয়েছে, কেউ খুঁজে পাবে না৷ তারপর আপনাদের কথা বলল৷ আপনার চেহারার বর্ণনা দিয়ে বলল, এক দাড়িওয়ালা সায়েবের মতো চেহারার ভদ্রলোককে বোকা বানিয়েছে৷ সকালে আপনাকে আমার মক্কেলের বাড়ির দোতলা থেকে দেখলাম, বাইনোকুলারে কী দেখছেন৷ মক্কেলের নাম অরিজিৎ সিংহ৷ তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এই ভদ্রলোককে চেনে কি না৷ অর্থাৎ লোকাল লোক, না টুরিস্ট? অরিজিৎ বলল ওরে বাবা ! উনি তো বিখ্যাত লোক৷ আপনার সবিশেষ পরিচয় পেলাম৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘অরিজিৎ সিংহ আমার পরিচিত৷ বারুইপুর এরিয়ার ওঁর নার্সারি আছে৷ একটা বিদেশি ক্যাকটাস সাপ্লাই করেছিলেন আমাকে৷ তবে বরমডিহিতে ওঁর বাড়ি আছে জানতাম না৷’’

শচীনবাবু রুমালে মুখ মুছে বললেন, ‘‘অরিজিৎ আপনাকে দেখে বেরুতে যাচ্ছিল৷ ওকে বাধা দিলাম৷ সব ঘটনা খুলে বললাম৷ শুনে ও পরামর্শ দিল, আপনি আজই কলকাতা ফিরে যান৷ তো কলকাতা ফেরার ক’দিন পরে আপনি আমার কাছে এলেন৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ আমাকে দেখে আপনার অস্বস্তি আঁচ করেছিলাম৷ তবে আমার দেখার ইচ্ছে ছিল আপনার নাকের পাশে জডুল আছে কি না৷ দেখলাম, নেই৷ তখন বুঝলাম, একটা সাজানো নাটক দেখেছি৷’’

‘‘ঠিক৷ হরির বড্ড প্যাঁচালো বুদ্ধি৷ আপনি ও-বাড়িতে আসার পর আপনার পরিচয় দিয়ে ওকে সাবধান হতে বললাম৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘হরিচরণের বুদ্ধি প্যাঁচালো৷ তবে অতিবুদ্ধি এবং লোভ মানুষকে ঝামেলায় ফেলে৷ জড়ুল অপারেশন করে সে আমার কাছে একটা গল্প ফঁদতে গিয়েছিল৷ তার উদ্দেশ্য ছিল দুটো৷ মুখ্য উদ্দেশ্য, আমি তাকে চিনতে পেরেছি কি না জানা এবং গৌণ উদ্দেশ্য শ্যামসুন্দরের নোটবইয়ে লেখা একটা সাংকেতিক সূত্রের অর্থ বোঝা৷ তার নাকের পাশে ক্ষতচিহ্ন দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল৷ তাই তার কেস আমি নিয়েছিলাম৷’’ কর্নেল চুরুট ধরালেন৷ তারপর ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘‘যাই হোক, আশা করি বুঝতে পেরেছেন শ্যামসুন্দরের খুনের মামলায় আপনি জড়িয়ে পড়েছেন৷ হরির জবানবন্দির সূত্রে পুলিশ যে কোনও সময় আপনার কাছে আসবে৷ তা আমি বলি কী, আপনি মামলা মিটিয়ে নিন৷’’

‘‘মামলা তো তরুণ করেছে৷’’ প্রায় আর্তনাদ করলেন শচীনবাবু৷

‘‘তাতে কী? আপনি তাঁর মা-কে আপনার বাবার বিবাহিতা স্ত্রী বলে স্বীকার করে নিন৷ আমি আপনাদের দুই ভাইকে আমার অ্যাপার্টমেন্টে ডেকে মিটমাট করে দেব৷ তরুণবাবু রাজি৷ আর আপনাদের গৃহদেবতা আমি-ই উদ্ধার করেছি! তা-ও ফেরত পাবেন৷ এরপর আসছে পুলিশের ঝামেলা৷ আপনি পুলিশকে সব কথা খুলে বলবেন৷ আপনি আইনজীবী৷ আপনি রাজসাক্ষী হবেন৷ আমিও আপনাকে সমর্থন করে সাক্ষ্য দেব৷ পুলিশের কিন্তু এ মামলায় আমাকে খুব দরকার৷ আশা করি তা বুঝতে পারছেন৷ বিশেষ করে আমার হাতে ভাইটাল সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে৷’’

কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর শচীনবাবু বললেন, ‘‘আপনি যখন বলছেন, তখন তা-ই হবে৷ কিন্তু আমাদের গৃহদেবতা কী ভাবে আপনি উদ্ধার করলেন?’’

কর্নেল থামলেন৷ শ্যামসুন্দরের নোটবইয়ে লেখা শব্দছক থেকে৷ তবে আমার এই তরুণ সাংবাদিক বন্ধুই সূত্রটা ধরিয়ে দিয়েছিল৷ কর্নেল ঘটনাটা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন৷ শোনার পর শচীনবাবু বললেন, ‘‘গৃহদেবতা কার কাছে আছে?’’

‘‘আমার অ্যাপার্টমেন্টে আজ সন্ধ্যা ৬টায় আসুন৷ তরুণবাবু আসবেন৷ দুই ভাইয়ের সামনে গৃহদেবতা রাখব৷ হ্যাঁ...গৃহদেবতা আপনার এই বাড়ির মন্দিরেই ফিরে আসবেন কারণ মন্দিরটা আপনার পূর্বপুরুষের তৈরি৷’’ বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ ‘‘চলি৷ নাহ, চা-ফা খাব না৷ আজ সন্ধ্যা ৬টায় আমার ঘরে বরং উৎকৃষ্ট কফি খাওয়াব আপনাকে৷’’

রাস্তায় গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘চলো জয়ন্ত৷ আলিপুর কোর্ট-চত্বর হয়ে যাই৷ ছেলেটি...তপন দাশ তার নাম, এই কেসে ভাইটাল সাক্ষী৷ তার সঙ্গে দেখা করে যাওয়া উচিত৷...’’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%