স্কাউণ্ড্রেল রহস্য

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

সেদিন সকালে আমার ফ্রেন্ড-ফিলসফার-গাইড কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ছাদের ‘শূণ্যোদ্যানে’ পৌঁছে দেখি, বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ একটি বিকট চেহারার ক্যাকটাসের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে বিড়বিড় করে আপনমনে কিছু বলছেন৷ আমার সাড়া পেয়ে হঠাৎ ঘুরে বলে উঠলেন, ‘‘স্কাউণ্ড্রেল!’’

আমি তো থ৷ শুধু থ নই, রীতিমতো ক্ষুব্ধ! কয়েক মুহূর্ত ভেবেই পেলুম না, এমন কী অপরাধ করেছি যে আচমকা ‘‘স্কাউণ্ড্রেল’’ গাল খাব? তা ছাড়া এতকাল যাবৎ যাঁর মুখে অহরহ স্নেহ-সম্ভাষণ ‘‘ডার্লিং’’ শুনে অভ্যস্ত, তিনি আমাকে দেখামাত্র ‘‘স্কাউণ্ড্রেল’’ বলে উঠবেন, স্বপ্নেও কল্পনা করিনি৷

গম্ভীর মুখে বললুম, ‘‘বাবামশাই পাগল হয়ে যাচ্ছেন বলে ষষ্ঠী প্রায়ই সন্দেহ করে৷ বোঝা গেল, তার সন্দেহ মিথ্যা নয়৷’’

অমনি প্রকৃতিবিদ উঠে দাঁড়িয়ে এমন অট্টহাসি হাসলেন যে, পাশের নিমগাছ থেকে এক-ঝাঁক কাক তুমুল চ্যাঁচামেচি করতে-করতে উড়ে পালাল৷ তদুপরি ওই হাসির চোটে তাঁর মাথার টুপিটিও খসে পড়ল৷ সকালের ঝলমলে রোদ্দুরে ঝকমক করতে থাকল একটি প্রসিদ্ধ টাক৷

এতে আরও হকচকিয়ে গেলুম৷ সত্যিই তাহলে পাগল হয়ে গেছেন কর্নেল৷ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম৷ দেখলুম, উনি দ্রুত টুপিটি কুড়িয়ে পরলেন এবং একটা নিভে যাওয়া চুরুট লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে আমার দিকে পা বাড়িয়ে ফের বললেন, ‘‘স্কাউণ্ড্রেল!’’ মুখে সেই পাগলাটে হাসি৷

একটু ভয় পেয়ে বললুম, ‘‘কী আশ্চর্য—’’

কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আশ্চর্য তো বটেই৷ সত্যি ডার্লিং, পৃথিবীতে আমেরিকানদের মতো আশ্চর্য মানুষ হয় না৷ সব কিছুতেই ওদের কাজকারবার ভারি আশ্চর্য—না, আশ্চর্য বলা ঠিক নয়, অদ্ভুত! কিম্ভূত! উদ্ভট!’’ কাছে এসে অভ্যাসমতো আমার কাঁধে হাত রেখে ফের বললেন, ‘‘তা না হলে মনমাতানো কোনও সেন্টের ট্রেড-নেম কেউ স্কাউণ্ড্রেল রাখে!’’

বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ গার্ডেনিং জোববার পকেট থেকে একটা সেন্টের শিশি বের করলেন, সেটার মুখে স্প্রে আটকানো৷ আমি বাধা দেবার আগেই আমার শার্টে সেন্টটা স্প্রে করে দিলেন৷ ঝাঁঝালো সুগন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে বললুম, ‘‘কী অদ্ভুত!’’

‘‘হ্যাঁ, অদ্ভুত৷’’ কর্নেল বললেন৷ ‘‘সেটাই তো বলছিলুম তোমাকে৷ সম্প্রতি এই সেন্টটা আমাকে এক পুলিশ-কর্তা উপহার দিয়ে গেলেন৷ কোথায় কোন মার্কেটে ফরেন গুডস উদ্ধারে হানা দিয়েছিলেন—যাই হোক, এটার নাম স্কাউণ্ড্রেল৷’’

কথা বলতে-বলতে আমরা নিচে নেমে ওঁর জাদুঘর-সদৃশ ড্রইংরুমে ঢুকলুম৷ কর্নেল বললেন, ‘‘কিন্তু আসল ব্যাপারটা তোমাকে এখনও বলাই হয়নি৷ যে-ক্যাকটাসটার কাছে বসে ছিলুম, ওটা মেক্সিকোর মরুভূমি থেকে আনা৷ সবে ফুল ফুটেছে৷ আশ্চর্য ব্যাপার, ফুলের গন্ধটা অবিকল এই সেন্টের মতো৷’’

কর্নেল তাঁর গার্ডেনিং-পোশাক বদলাতে গেলেন৷

আমি সোফায় বসে পড়লুম৷ একটু পরে কর্নেল এসে তাঁর ইজি-চেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে এবং সান্তা ক্লজ-দাড়িতে হাত বুলোতে-বুলোতে বললেন, ‘‘প্রকৃতিতে যা নেই, তা মানুষের কল্পনাতেও নেই৷ মানুষ এ-যাবৎ যা কিছু করেছে বা করতে চলেছে, সবই প্রকৃতিতে থাকা জিনিসেরই অনুকরণ৷ কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না, সুন্দর সেন্টের নাম কেন ওরা ‘স্কাউণ্ড্রেল’ রাখল? খুবই রহস্যজনক ব্যাপার৷ এই সেন্ট কি মানুষকে স্বাউণ্ড্রেলে পরিণত করে? দেখা যাক৷’’

বলে আমার দিকে মিটিমিটি চোখে হাসতে থাকলেন৷ ভড়কে গিয়ে বললুম, ‘‘তার মানে, আমাকে আপনি গিনিপিগ করলেন! এই সেন্ট আমাকে স্বাউণ্ড্রেলে পরিণত করে কিনা পরীক্ষা করতে চান? ঠিক আছে৷ আমিও তৈরি৷ কিছুতেই স্কাউণ্ড্রেল হব না৷ সম্প্রতি এক মিনিস্টার আমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার এক রিপোর্টারকে স্কাউণ্ড্রেল বলায় সমস্ত কাগজ তাঁর খবর ছাপা বন্ধ করেছে, জানেন তো?’’

কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, ভোরবেল বাজল৷ ষষ্ঠীচরণ কফি-স্ন্যাক্সের ট্রে রেখে বিরক্ত মুখে দেখতে গেল, কে এসেছে৷

সবে কফিতে চুমুক দিয়েছি, আমারই বয়সী এক যুবক, কেমন বিপর্যন্ত চেহারা, ঘরে ঢুকল এবং আমাদের অবাক করে নাক ডেকে বলে উঠল, ‘‘মাই গড! হরিবল! এখানেও সেই সর্বনেশে স্কাউণ্ড্রেল!’’

কর্নেল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে দেখছিলেন৷ মিষ্টি হেসে বললেন, ‘‘স্কাউণ্ড্রেল কোনও-কোনও ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়, বোঝা যাচ্ছে৷ যাই হোক, আপনি আগে বসুন, ইয়ং ম্যান! সম্ভবত আপনি আমার এই তরুণবন্ধু জয়ন্ত চৌধুরীর মতো রিপোর্টার নন৷ আমিও কোনও মিনিস্টার নই যে আপনাকে ‘স্বাউণ্ড্রেল’ বলব৷ হ্যাঁ, বসুন৷ রিল্যাক্স! তারপর বলুন, কী ঘটেছে৷’’

যুবকটি আমার কাছ থেকে যথেষ্ট দূরত্বে বসল৷ তারপর বলল, ‘‘আমার নাম প্রকাশ সেন৷ থাকি সল্ট লেকে৷ আমি রজার্স কোম্পানির এক্সিকিউটিভ পোস্টে কাজ করি৷ আমার মামা অরিন্দম দাশগুপ্ত সিবিআই অফিসার৷ তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন৷ আপনি তাঁকে চেনেন৷’’

কর্নেল তার দিকে এক পেয়ালা কফি এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘আগে কফিটা খেয়ে ফেলুন৷ কফি ব্রেনকে চাঙ্গা করে৷ আপনাকে খুব ডিস্টার্বড দেখাচ্ছে৷ নিন৷’’

প্রকাশ সেন কফির পেয়ালা নিয়ে চুমুক দিল৷

রজার্স কোম্পানির এক এক্সিকিউটিভ প্রকাশ সেন যে-রহস্যজনক ঘটনাটি বর্ণনা করল, তা হল এই: —

সম্প্রতি প্রকাশ তার কোম্পানির রিসেপসনিস্ট মৃদুলা গুপ্তকে বিয়ে করে৷ ভালোবাসার বিয়ে৷ তারপর দু’জনে ছুটি নিয়ে হাথিয়াগড়ে হনিমুনে যায়৷

হাথিয়াগড় বিহারে ছোটোনাগপুর পাহাড়ি-এলাকার একটা বিউটি-স্পট৷ হাথিয়া নদীর ধারে একটি সুন্দর বাংলোয় তারা ছিল৷ বাংলোটি রজার্স কোম্পানিরই এক পার্টনারের৷ তাঁর নাম সঞ্জয় শর্মা৷ মিঃ শর্মার ছেলে জিতেন্দ্র প্রকাশের বন্ধু৷ জিতেন্দ্রও কোম্পানির এক কর্মকর্তা৷ তারই পরামর্শে প্রকাশ ও মৃদুলা হাথিয়াগড়ে হনিমুনে গিয়েছিল৷

বাংলো বাড়িটি একটি টিলার ওপর৷ চারদিকে সুদৃশ্য বাগান৷ পেছনের দিকে একটি ফোয়ারা৷ ফোয়ারার চারপাশে বৃত্তাকার বেদি এবং কেন্দ্রে একটি স্তম্ভে পাথরের অপ্সরা-মূর্তি৷ অপ্সরা ঈষৎ ঝুঁকে কুম্ভে জল ভরছে এবং কুম্ভ থেকেই বাড়তি জল ঝরে পড়ছে৷ বাংলোয় বিদ্যুৎ আছে৷ কাজেই ফোয়ারাটি বিদ্যুৎচালিত একটি যন্ত্রের সাহায্যে জল ঝরায়৷

বাংলোর কেয়ারটেকার-কাম-মালী স্থানীয় লোক৷ ভগলু৷ কিন্তু তার চেহারা আর চালচলন নোংরা৷ তাই মৃদুলার ওর হাতের রান্না খেতে আপত্তি৷ এদিকে হাথিয়াগড়ে তেমন ভালো হোটেল নেই৷ তা ছাড়া বাংলো থেকে বসতি-বাজার প্রায় মাইলখানেক দূরে৷ প্রকাশ প্রস্তাব দিয়েছিল, নিজেরাই বরং রেঁধে-বেড়ে খাবে৷ পিকনিকের মজাও হবে তাতে৷ কিন্তু মৃদুলা বলেছিল, ‘‘ধুস! বেড়াতে এসে রান্নার ঝামেলার মানে হয় না৷ নেচারের বিউটি এনজয় করব, না গেরস্থালি পাতব? কোনও মানে হয় না৷ বরং ভগলুকে বলা যাক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কোনও রান্নার লোক জোগাড় করে দিক৷’’

প্রকাশ সায় দিয়েছিল৷ ঠিকই তো! হনিমুনে এসে রান্নার ঝামেলার কোনও মানে হয় না৷ মৃদুলা ভগলুকে কথাটা বললে ভগলু কাঁচুমাচু হেসে বলল, ‘‘হাঁ মাইজি! হামি সব পারে, লেকিন চুলহা কাম পারে না৷ উও তো লড়কি লোকের কাম আছে৷ ঠিক হ্যায়, হামার বেটি রঙ্গিয়াকে খবর ভেজছি৷ উও বহৎ পাকা লড়কি আছে৷ জব জব শর্মাসাব আতা, রঙ্গিয়াকো বোলাতা৷ উও উনহিকা সেবা করতি৷’’

কিছুক্ষণের মধ্যে রঙ্গিয়া এসে গেল৷ মৃদুলার বয়সী মেয়ে৷ ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন৷ খুব আলাপী, স্মার্ট মেয়ে৷ দুপুরের রান্নাটা দারুণ রেঁধেছিল৷ মৃদুলা বলল, ‘‘দেখলে তো? এবার যেখানে খুশি নিশ্চিন্তে ছুটোছুটি করে বেড়াব৷ টায়ার্ড হয়ে ফিরে হাতের কাছে চা বা কফি, খিদের মুখে খাবার৷’’

প্রকাশ খুশি হয়েছিল৷ হনিমুনে এসে পাহাড়ি নদী, জঙ্গল, নির্জন প্রকৃতিতে প্রিয়তমা স্ত্রীর হাতে হাত রেখে উদ্দাম ছোটাছুটি— খুবই উপভোগ্য হনিমুন৷ আজকাল আর হাথিয়াগড়ে বুনো জন্তুর ভয় নেই৷ শুক্লপক্ষ চলেছে৷ তাই নদীর ধারে পাথরে বসে অনেকক্ষণ জ্যোৎস্নায় প্রেম-গুঞ্জনের পর নবদম্পতি বাংলোয় ফিরেছিল৷

রাতের খাওয়ার পর কিছুক্ষণ এসে হাত ধরাধরি পায়চারি করার পর দু’জনে ঘরে ফিরল৷ ঘোরাঘুরিতে ক্লান্তির ফলে প্রকাশের ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হয়নি৷

তারপর একসময় কী একটা শব্দে প্রকাশের ঘুম ভেঙে গেল৷ উঁচু পাহাড়ি জায়গা বলে একটু হিম টের পাওয়া যায়৷ পাশে মৃদুলা কুঁকড়ে অন্যপাশে কাত হয়ে ঘুমুচ্ছে৷ পায়ের দিক থেকে বেডকভারটা তুলে তার গায়ে চাপিয়ে দিল প্রকাশ৷ মৃদুলার শরীর থেকে ‘স্কাউণ্ড্রেল’ সেন্টের সৌরভ তাকে আবিষ্ট করল৷

সেই সময় বাইরে চাপা গলায় কাদের কথাবার্তা শুনতে পেল সে৷ উত্তরদিকের জানালাটা খোলা ছিল৷ ওদিকেই ফোয়ারা৷ সে কৌতূহলী হয়ে মশারি থেকে বেরুল এবং উত্তরের জানালায় গেল৷ ফোয়ারার জলের ঝরঝর শব্দটা বন্ধ৷ কিন্তু ওখানে উজ্জ্বল শারদীয় জ্যোৎস্না পড়েছে৷ বেদির ও-ধারে কারা পাশাপাশি বসে চাপা স্বরে কথা বলছে৷

প্রকাশ একটু নাকগলানে স্বভাবের৷ উত্তরে দরজা নেই, দরজা দক্ষিণে গেটের দিকে৷ সে আস্তে দরজা খুলে বেরুল৷ প্রথমে অবাক হল, গেটের আলোটা জ্বলছে না৷ নিশ্চয়ই লোডশেডিং! সে বাংলোর পশ্চিমদিকটা ঘুরে চুপি-চুপি ঝাউ-পাতাবাহার-ক্যাকটাসের ঝোপের আড়াল দিয়ে ফোয়ারার কাছাকাছি গিয়ে বসে পড়ল৷

তারপরই প্রচণ্ড অবাক হয়ে আবিষ্কার করল প্রথমে মৃদুলাকে, পরে জিতেন্দ্রকে৷ সে স্তম্ভিত হয়ে গেল কয়েক-মুহূর্তের জন্য৷ আশ্চর্য ব্যাপার, সে এখনই মৃদুলাকে বিছানায় দেখে এসেছে এবং চাদর টেনে ঢেকে দিয়েছে৷ সে স্বপ্ন দেখছে না তো?

প্রকাশ উত্তেজনায় অস্থির৷ সে মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়াতেই ওরা বুঝি টের পেল৷ চকিতে দু’জনে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে গেল৷ প্রকাশ আড়ষ্ট পায়ে বিহ্বল বিভ্রান্ত মানুষের মতো বাংলোর ঘরে ফিরল৷ দরজা তেমনই ভেজানো৷ ঘরে তেমনই সেন্টের মউমউ সৌরভ৷ প্রথমেই সে দরজা বন্ধ করে দিল৷ তারপর সুইচ টিপল৷ আলো জ্বলল না৷ হিংস্র হাতে সে মশারি তুলল৷ এবার বালিশের পাশ থেকে টর্চ নিয়ে জ্বালল৷

অবাক হয়ে গেল দেখে যে, মৃদুলা তেমনই অন্যপাশে ঘুরে কুঁকড়ে শুয়ে আছে এবং তেমনই বেডকভার চাপানো রয়েছে তার শরীরে৷ তেমনই মউমউ করছে স্কাউণ্ড্রেল!

গোয়েন্দাপ্রবর চোখ বুজে বৃত্তান্তটি শুনছিলেন৷ প্রকাশ চুপ করলে আমি বললুম, ‘‘স্রেফ সাইকলজিক্যাল ব্যাপার৷ আপনি স্বপ্ন দেখছিলেন মিঃ সেন! আপনার অবচেতনায় সম্ভবত আপনার স্ত্রী সম্পর্কে কোনও সন্দেহ—’’

আমাকে থামিয়ে রহস্যভেদী বৃদ্ধ গোয়েন্দা বললেন, ‘‘মিঃ সেন, ঘটনাটি নিশ্চয়ই রহস্যজনক৷ কিন্তু তারপর আপনি কী করেছিলেন, বলুন!’’

প্রকাশ বলল, ‘‘কী করব? পরদিন সকালে শরীর খারাপ করছে বলে কলকাতা ফিরে এলুম৷’’

‘‘আপনার স্ত্রীকে ওই ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলেননি?’’

‘‘না৷ বলব কিসের ভিত্তিতে? তা ছাড়া আই লাভ হার! কখনও জিতেন্দ্রের সঙ্গে তাকে কোথাও দেখিনি৷ রিসেপসনিষ্ট হিসেবে যে-অফিশিয়াল সম্পর্ক, তার বাইরে কিছু ঘটলে আমার চোখে পড়ত৷’’

‘‘পরে আপনি কি বাংলোর কেয়ারটেকারকে জিগ্যেস করেছিলেন, জিতেন্দ্র শর্মা এসেছেন কিনা?’’

‘‘হ্যাঁ, আড়ালে জিগ্যেস করেছিলুম৷ ভগলু বলল, না৷ ছোটোসাব এলে তো পাশের ঘরে উঠতেন৷ সে জানতে পারত৷ ও-ঘরের চাবি তার কাছে৷’’

কর্ণেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘‘হঠাৎ ওভাবে কলকাতা ফেরার কথা শুনে আপনার স্ত্রী কিছু বলেননি?’’

প্রকাশ আনমনে বলল, ‘‘ও খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল আমার শরীর খারাপ শুনে৷ ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য খুব জেদাজেদি করল৷ শেষে—’’ একটু চুপ করে থাকার পর সে ফের বলল, ‘‘মৃদুলা খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল৷ তার আচার-আচরণে এতটুকু সন্দেহ করার মতো কিছু দেখিনি৷’’

আমি ফের বললুম, ‘‘স্বপ্ন! নিছক স্বপ্ন!’’

‘‘অসম্ভব!’’ প্রকাশ জেদ ধরে বলল৷

কর্নেল দাড়ি চুলকে বললেন, ‘‘অবশ্য জয়ন্তের যুক্তি অস্বীকার করা যায় না৷ স্নায়ু বিকার মানুষকে হ্যালুসিনেশানে ভোগায়৷ না, না! আপনি স্নায়ুবিকার-গ্রস্ত, তা বলছি না৷ তবে অবচেতনায় কোনও সন্দেহ থেকে গেলে স্বপ্নে তার প্রকাশ ঘটতেও পারে৷ মিঃ সেন, আমরা সবসময় নিজেদের মন সম্পর্কে সচেতন থাকি না৷ অসচেতনভাবে বহুক্ষেত্রে সন্দেহ আমাদের মনে ঢুকে যায়৷ আপনি সন্দেহ হলে ওই চাকরিটা ছেড়ে দিন এবং আপনার স্ত্রীকেও বলুন চাকরি ছেড়ে দিতে৷ অন্য কোথাও—বাইরে হলেই ভালো হয়, দু’জনে চাকরি খুঁজে—’’

প্রকাশ উত্তেজিত ভাবে বলল, ‘‘আপনি এ রহস্যের কিনারা করবেন না? কত আশা নিয়ে আপনার কাছে ছুটে এলুম!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আমাকে কি আপনি হাথিয়াগড় যেতে বলছেন?’’

প্রকাশ বলল, ‘‘হ্যাঁ৷ সমস্ত খরচ আমার৷ আপনি সরেজমিন তদন্ত করুন৷ মৃদুলাকে নিয়ে আমিও আবার আপনার সঙ্গে সেখানে যাব৷ এর মধ্যে অদ্ভুত রহস্য আছে৷

কর্ণেল একটু হেসে বললেন, ‘‘রহস্য একটু আছে৷ তবে সেটা আপনারা স্বামী-স্ত্রী মিলে সমাধান করে নিন৷ বাকিটা তো ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো শুরু করেছেন৷’’

প্রকাশ অবাক হয়ে বলল, ‘‘তার মানে?’’

‘‘ওই যে বললুম৷ দু’জনে চাকরি ছেড়ে বাইরে দূরে কোথাও চাকরি জোগাড় করে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া করে নিন৷’’

কর্নেলের এই কথা শুনে প্রকাশ সেনের মুখ রাঙা হয়ে গেল—ক্ষোভে৷ সে কোনও কথা না বলে উঠে চলে গেল৷

ষষ্ঠী দরজা বন্ধ করে কফি-স্ন্যাক্সের ট্রে নিয়ে গেল৷ তারপর কর্নেল আমার দিকে তাকিয়ে চোখে ঝিলিক তুলে বললেন, ‘‘কী বুঝলে জয়ন্ত?’’

বললুম, ‘স্বপ্ন৷ আপনিও তো হ্যালুসিনেশনের কথা বললেন৷’’

‘‘হাঁ, বলেছি৷’’ বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ হাই তুলে বললেন, ‘‘কিন্তু ডার্লিং, মিঃ সেন ঠিকই বলেছেন৷ ঘটনাটি স্বপ্নে ঘটেনি৷ সত্যিই ঘটেছিল৷’’

ভীষণ অবাক হয়ে বললুন, ‘‘সে কী! বউকে পাশে দেখে ভদ্রলোক বেরিয়ে গিয়েছিলেন এবং ফিরে এসেও বউকে তেমনই শোওয়া দেখেছিলেন৷’’

‘‘এবং একই স্কাউণ্ড্রেলের গন্ধ!’’

‘‘ঠিক৷ স্কাউণ্ড্রেল সেন্টের গন্ধও পেয়েছিলেন৷’’

‘‘কিন্তু তখন বিদ্যুৎ ছিল না৷’’

‘‘ছিল না বললেন বটে!’’

‘‘বাইরে চাপা কথাবার্তা শুনে বেরিয়ে যাওয়ার সময় পাশে অন্যদিকে ঘুরে শোওয়া স্ত্রীকে দেখেছিলেন এবং গায়ে বেড-কভার দিয়ে ঢেকে দেন৷ কিন্তু তখন টর্চ জ্বালেননি৷’’

‘‘জ্বালাবার দরকার ছিল না৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘ফিরে এসেও একই অবস্থায় স্ত্রীকে শোওয়া দেখলেন এবং টর্চ জ্বালালেন৷’’

বিরক্ত হয়ে বললুম, ‘‘রিপিটেশন ভালো লাগে না৷’’

‘‘ডার্লিং! তুমি রঙ্গিয়ার কথা ভুলে যাচ্ছ৷’’

অমনি চমকে উঠে বললুম, ‘‘মাই গুডনেস! তাহলে মিঃ সেন ঘুমিয়ে পড়ার পর মৃদুলা বেরিয়ে গিয়েছিল৷ রঙ্গিয়াকে শুইয়ে রেখে গিয়েছিল৷ বাইরে চাপা কথাবার্তা শুনে বেরুনোর সময় স্ত্রী ভেবে মিঃ সেন বেডকভারে যাকে ঢেকেছিলেন, সে রঙ্গিয়া৷ কিন্তু কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর কথা আসছে কেন?’’

গোয়েন্দাপ্রবর শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, ‘‘প্রেম মানুষকে অন্ধ করে, ডার্লিং! প্রকাশ সেন নিজেই এ রহস্যের মীমাংসা করতে পারতেন৷ আশা করি, বুঝতে পেরেছ, সবটাই মৃদুলার কারসাজি৷ বোঝা বায়, সে ভগলুর মেয়ের কথা জানত৷ তার মানে আগেও সে ওই বাংলোয় জিতেন্দ্রের সঙ্গে গেছে৷ আর জিতেন্দ্রের পরামর্শেই সে প্রকাশকে বিয়ে করেছে—প্রেমের অভিনয় পর্যন্ত৷ যাই হোক, ডার্লিং! তুমি খবরের কাগজের লোক হয়েও ভুলে যাচ্ছ, রজার্স কোম্পানির বিরুদ্ধে বৈদেশিক মুদ্রা-নিয়ন্ত্রণ আইন ‘ফেরা’ লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে৷ প্রকাশ সেন একজন এক্সিকিউটিভ৷ তার মামা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর একজন বড়ো অফিসার৷ কাজেই তাকে হাতে রাখা দরকার ছিল কোম্পানির৷’’

বলে কর্নেল একটা ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা তুলে অন্তর্দ্বন্ধমূলক প্রতিবেদনের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন৷ এতক্ষণে লাফিয়ে উঠে নড়েচড়ে বসলুম৷ বললুম, ‘‘তাই তো!’’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%