সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
সে-বার অক্টোবরে কর্নেলের সঙ্গে কৈলাসগড়ে গিয়েছিলুম৷ সেখানে আমরা উঠেছিলুম একটা সরকারি ডাকবাংলোতে৷ ডাকবাংলোটা বসতি-এলাকার বাইরে নিঝুম নিরিবিলি একটা টিলার গায়ে৷ চৌকিদারের নাম রামলাল৷ সে আমাদের বলেছিল—আপনারা সবখানে ঘুরে বেড়ান৷ কিন্তু ওই যে দূরের উঁচু কালো রঙের পাহাড়টা দেখছেন, ওই তল্লাটে যেন পা বাড়াবেন না৷
জিগ্যেস করেছিলুম, ‘কেন রামলাল? ওখানে রাক্ষস-খোক্কস আছে, নাকি দত্যি-দানো আছে?’
কথাটা কৌতুকেই বলেছিলুম৷ কিন্তু রামলাল গম্ভীর হয়ে বলেছিল—কর্নেল সাহেবের কথা ভেবেই আমি হুঁশিয়ারি দিচ্ছি৷ কারণ, উনি তো জঙ্গলে ঘুরতে ভালোবাসেন৷ ওখানে ঘন জঙ্গল আছে৷ কিন্তু হুম্বাবাবার পাল্লায় পড়লেই মুশকিল৷
এবার কর্নেল জিগ্যেস করলেন—‘হুম্বাবাবাটা কী, রামলাল?’
রামলাল গম্ভীর মুখে চাপা স্বরে বলল—‘সেটা আদমি আছে না জানোয়ার আছে, কেউ জানে না৷ কিন্তু প্রথমে কানে আসে তার পিলে-চমকানো ডাক৷ কতকটা এইরকম৷’ বলে সে সেই আজগুবি ভূত-প্রেত বা দত্যি-দানোর ডাক শুনিয়ে দিল: ‘হুম—বা! হুম—বা! হু-হুম—বা!’
রামলাল দম নিয়ে বলল—‘এইরকম হাঁকডাক করতে-করতে সে জঙ্গলে ঝড় বইয়ে দেবে! আর সেই ঝড়ের মধ্যে শুকনো পাতা, মাটিতে যা কিছু পড়ে থাকে—সব বাঁই বাঁই করে ঘুরতে থাকে৷ আর আওয়াজ উঠবে—হু-হুম—বা! হু-হুম—বা! হু-হুম—বা!’
এইসময় কর্নেলের বন্ধু প্রতাপ সিংহের বাড়ি থেকে কথামতো দুধ, মাছ ইত্যাদি জিনিস নিয়ে একটা লোক এসে গেল৷ সিংহসাহেবের ইচ্ছে ছিল আমরা দুপুরে তাঁর বাড়িতেই লাঞ্চ করব৷ কিন্তু কর্নেল রাজি হননি৷ কারণ, আজ সারাদিন তিনি সেই দুষ্প্রাপ্য বিরল জাতের নীল প্রজাপতির সন্ধানে ঘোরাঘুরি করবেন৷
রামলাল তখন কিচেনের দিকে চলে গেছে৷ কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে রামলালের দেখানো পশ্চিমদিকের সেই কালো পাহাড়টা খুঁটিয়ে দেখে নিলেন৷ তারপর সহাস্যে বললেন—‘মজার ব্যাপারটা হল, আমি যে প্রজাপতির খোঁজে বেরুব, সেটার ডেরা ওই দিকের একটা নদীর অববাহিকায়৷ নদীর নাম মৌলি৷ মৌলি নদীর অন্য পাড়েই জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়৷ যেখানে নাকি হুম্বা নামে কী একটা থাকে৷ জয়ন্ত, ঝটপট তৈরি হয়ে নাও৷ রামলালকে কোথায় যাচ্ছি, তা বলার দরকার নেই৷’
আমরা এই পুরোনো বাংলোর দোতলায় পূর্ব-দক্ষিণ কোণের বড়ো ঘরটাই নিয়েছিলুম৷ এই ঘর থেকে পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম—তিনটে দিকই দেখা যায়৷
দরজা বন্ধ করে কর্নেল এবং আমি নীচে নেমে গেলুম৷ তারপর দেখলুম, রামলাল সেই লোকটার সঙ্গে কথা বলছে৷ লোকটা আমাদের দেখে সেলাম দিল৷ তারপর বারান্দার দিকে এগিয়ে এসে বলল—‘সিনহাসাব বিকেল চারটেয় আপনাদের চা খেতে ডেকেছেন৷’
কর্নেল বললেন—‘ঠিক আছে, তোমার সাহেবকে বলো, আমরা ঠিক সময়েই তাঁর বাড়িতে হাজির হব৷’
সে আবার সেলাম ঠুকে চলে গেল৷
আমরা যখন বারান্দা থেকে নামছি, রামলাল এসে বলল—‘কর্নেল সাহাব, আমার কথাটা মনে আছে তো? পশ্চিমের পাহাড়ে হুম্বার পাল্লায় যে পড়ে, সে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারে না৷’
কর্নেল হাসলেন না৷ কপট গাম্ভীর্যে বললেন—‘আচ্ছা রামলাল, তুমি যে হুম্বার ডাক শোনালে এটা কি তুমি নিজের কানে কখনো শুনেছ?’
রামলাল বলল—‘না স্যার, মাসতিনেক আগে আপনাদের মতো একজন বাঙালি সাহেবকে নিয়ে সিনহাসাব ওদিকে শিকার করতে গিয়েছিলেন৷ তাঁদের মুখেই শুনেছি, পাহাড়ের পিছন দিকে কোন আমলের এক রাজবাড়ির চিহ্ন আছে৷ সেখানে বড়ো বড়ো অনেকগুলো থামও আছে৷ সেগুলো ভাঙেনি৷ দু’জনে সাহস করে সেখানে গিয়েছিলেন৷ তারপর ওই আজগুবি, ভয়ঙ্কর হাঁক-ডাক শুনে প্রাণ হাতে করে ফিরে আসেন৷ ভাগ্যিস, তখন মৌলি নদীতে জল ছিল না৷’
কর্নেল বললেন—‘ঠিক আছে৷ যদি দৈবাৎ হুম্বার পাল্লায় পড়ি, তাহলে আমরাও পালিয়ে আসব৷ কিন্তু তুমি যে বললে, তার পাল্লায় পড়লে কেউ বাঁচে না৷’
রামলাল বলল—‘হ্যাঁ কর্নেল সাহেব, উনাদের হাতে বন্দুক ছিল, তাই গুলির আওয়াজের ভয় দেখিয়েছিলেন৷ কিন্তু এখানে দেহাতি মানুষের বন্দুক কোথায়? গরিব মানুষ৷ তারা তো বন-জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে, শিকার করতে যায়৷ তারাই মারা পড়ে৷’
কর্নেল আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলেন৷ তাঁর পিঠে আঁটা কিটব্যাগ৷ কিটব্যাগের কোনা দিয়ে প্রজাপতি ধরার জালটা দেখা যাচ্ছিল৷ আর গলা থেকে দিব্যি ক্যামেরা ও বাইনোকুলার ঝুলছিল৷
আমরা বাংলোর পথ পেরিয়ে একটা এবড়ো-খেবড়ো পথে পশ্চিম দিকে হাঁটতে থাকলুম৷ দু’ধারেই পাথুরে লালমাটির মাঠ; এবং সেখানে ইতস্তত ঘন ঝোপঝাড়৷ কোথাও দু-একটা গাছ আর প্রকাণ্ড-প্রকাণ্ড কালো পাথর পড়ে আছে৷ এই পথটা দিয়ে লোকেরা তত হাঁটা-চলা করে না বলে মনে হল৷
প্রায় আধঘণ্টা চলার পর ঝোপ এবং পাথরের চাঁইগুলো ঘন হয়ে উঠল৷ কর্নেল একখানে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পকেট থেকে ভাঁজ করা ম্যাপ বের করলেন৷ তারপর বললেন—‘আমাদের এবার বাঁ-দিকে এগিয়ে যেতে হবে৷ তাহলেই মৌলি নদীর কাছে পৌঁছোনো সহজ হবে৷ নদীর দু’দিকে ঘন ঝোপঝাড় আছে৷ আর সেইসব ঝোপে প্রচুর ফুল ফোটে৷ সিনহাসাহেব আমাকে খবর দিয়েছিলেন, নদীর এপারেই তিনি এক-ঝাঁক নীল প্রজাপতি দেখতে পেয়েছিলেন৷ প্রজাপতিগুলো আকারে তেমন বড়ো নয় কিন্তু তাদের ডানা দুটো হালকা নীল৷ কোনো ঝোপের মাথায় বসে থাকলে মনে হবে কোনো নীল রঙের ফুল ফুটে আছে৷ এই প্রজাতির কথা আমি বইয়ে পড়েছিলাম৷ কিন্তু এবার যদি ভাগ্যে থাকে, অন্তত ছবি তুলতে পারব৷’ বলে, পা বাড়িয়ে তিনি একটু থেমে দাঁড়িয়ে বললেন—‘তুমি তোমার পকেটের রিভলভারে ছ’টা বুলেট ভরে নিয়েছ তো?
‘অন্য কিছু না হোক; ভালুক, বুনো শুয়োর অথবা এক ধরনের হিংস্র নেকড়ের উপদ্রব আছে৷ মানুষকে দেখলেই তারা হামলা করে৷ অতএব সবসময় চারদিক দেখে, কান সতর্ক রেখে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে৷’
আকাশে কখনো টুকরো-টুকরো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে এবং ছায়া দিচ্ছে৷ কখনো প্রচণ্ড রোদে শরীর জ্বলে যাচ্ছে৷ ক্রমশ ঝোপঝাড়গুলোর উচ্চতা কমতে থাকল৷ এবার কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিকে দেখছিলেন এবং নিঃশব্দে পা ফেলছিলেন৷ মিনিট পনেরো-কুড়ির মধ্যে আমাদের কানে জলের শব্দ ভেসে এল৷ তারপর কিছুক্ষণের মধ্যেই পাহাড়ি নদী মৌলিকে দেখতে পেলুম৷ জলের রঙ গাঢ় হলদে এবং নদীর বুকে বড়ো বড়ো পাথর জেগে আছে৷ সে-জন্যই জল অদ্ভুত শব্দ করে বয়ে যাচ্ছে৷ এবং নদীর ধারে একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন—‘আমাদের বাইনোকুলার অত্যন্ত শক্তিশালী—তা তো তুমি জানো৷ প্রায় একমাইল দূর অব্দি খুঁটিয়ে সবকিছু দেখা যায়, তা তো জানো৷ অথচ কই সেই নীল প্রজাপতি?’
বললুম—‘আপনার বন্ধু সিনহাসাব আপনাকে প্রজাপতির লোভ দেখিয়ে ডেকেছিলেন৷ কিন্তু আমার ধারণা, তিনি রামলাল যে-হুম্বার কথা বলেছিল, তার বিরুদ্ধে অভিযানে নামবার জন্যই সম্ভবত আপনাকে ডেকেছিলেন৷ আজ কোনো কারণে হয়তো তিনি বেরোননি৷ বিকেলে চায়ের আসরে হয়তো কথাটা তিনি জানাবেন এবং অভিযানের প্ল্যান তৈরি করবেন৷’
কর্নেল বাইনোকুলারে ডানদিকে প্রজাপতি খুঁজছিলেন৷ হঠাৎ বললেন—‘কী আশ্চর্য! এখানে একটা পুরোনো লোহার ব্রিজ আছে, তা তো আমাকে কেউ বলেননি৷ ম্যাপটা দেখি তো৷ ম্যাপে কী আঁকা আছে!’
তারপর বললেন—‘ম্যাপটার ডানদিক আমি খুঁটিয়ে দেখিনি৷ দেখছি, পাহাড়ের উপরে এক রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আছে৷ অনেক উঁচু, প্রকাণ্ড সব পাথরের থাম দাঁড়িয়ে আছে৷ আচ্ছা চলো তো, ওই ব্রিজের কাছে এগিয়ে যাই৷’
ডানদিকে জঙ্গল এবং পাথরের ভিতর দিয়ে সাবধানে কিছুদূর এগিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলুম—এবড়ো-খেবড়ো রাস্তাটা বোধহয় হারিয়ে গেছে৷ কিন্তু হারায়নি৷ আমরা ভুল পথে এসেছিলুম৷ এতক্ষণে ঘুরপথে বাঁ-দিকে নদীর উপর, একটা গাড়ি যাওয়ার মতো চওড়া ব্রিজ দেখতে পেলুম৷ ব্রিজের দু’পাশে মরচে ধরা৷ আর পাটাতনে চওড়া কাঠ সাজানো৷ লোহার পাত দিয়ে সেগুলো গাঁথা আছে৷ তবে বেশিরভাগ জায়গায় ভেঙে গেছে৷ তাই এই ব্রিজ পেরিয়ে যেতে হলে খুব সাবধান হওয়া দরকার৷ ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ওপারটা কর্নেল বাইনোকুলারে দেখছিলেন৷ বললেন—‘জয়ন্ত, নীল প্রজাপতির খোঁজ পেয়ে গেছি৷ সাবধানে এগিয়ে এসো৷’
ব্রিজের কাঠে পা ফেলতেই মচমচ শব্দ করছিল৷ ভেঙে পড়বে না তো! কিন্তু ততক্ষণে কর্নেল ব্রিজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন৷ তারপর তিনি নীচে নেমে প্রজাপতি ধরার জালটা বের করলেন এবং গুড়ি মেরে এগিয়ে গেলেন৷ আমি ব্রিজের শেষ প্রান্তে গিয়ে তাঁকে আর খুঁজে পেলুম না৷ ডানদিকে টানা ঝোপ-জঙ্গল৷ রোদ উজ্জ্বল হলেও খালি চোখে প্রজাপতি দেখা সম্ভব হত, যদি তারা ওড়াউড়ি করত৷
কিছুক্ষণ পরে ভাবছি কর্নেলকে ডাকব৷ এমন সময় ঝোপের ভিতর থেকে কর্নেলকে মাথা তুলতে দেখলুম৷ তাঁর সামনে এতক্ষণে নীল রঙের এক ঝাঁক প্রজাপতিকে সরে যেতে দেখলুম৷
কর্নেল জাল হাতে এগিয়ে গিয়েও তাদের নাগালে পেলেন না৷ তখন তিনি ক্যামেরায় ছবি তুলতে শুরু করলেন৷
ব্রিজের শেষ দিকটায় একটা ছায়া-ছড়ানো গাছ ছিল৷ তার তলায় গিয়ে একটা পাথরে বসে পড়লুম৷ কর্নেল জালটা গুটিয়ে কিটব্যাগে গুঁজে দিলেন৷ তারপর ক্লান্তভাবে হাসতে-হাসতে আমার কাছে এসে আর-এক টুকরো পাথরে বসলেন৷ তারপর বললেন—‘তাহলে দেখা যাচ্ছে, সিনহা-সাহেব ঠিক খবরই দিয়েছিলেন৷ চলো, এবার ফেরা যাক৷’
আমরা সবে উঠে দাঁড়িয়েছি, এমন সময় কালো পাহাড়ের নীচের দিকে ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গল ভেদ করে একদল বুনো কুকুরকে দৌড়ে যেতে দেখলুম৷ পরক্ষণেই চোখে পড়ল, তারা একটা সম্বর হরিণকে তাড়া করেছে৷ এই জঙ্গলে তাহলে সত্যিই বন্য জন্তু আছে৷
কর্নেলকে কথাটা বলব ভেবেছি, এমন সময় দেখি সে-দিক থেকে জনা চার-পাঁচেক সশস্ত্র আদিবাসী এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল৷ তাদের একজন বলল—‘আপনাদের বন্দুক নেই স্যার? বুনো কুকুরগুলোর হাত থেকে হরিণটার বাঁচার আশা নেই৷ আমরা ওই হরিণটাকে মারব বলেই বসেছিলুম৷ হঠাৎ কোত্থেকে ওই বজ্জাত কুকুরগুলো এসে গেল৷’
অন্য একজন বলল—‘হরিণটার মাংসে আমাদের দু’টো বসতির লোকের ভোজ হয়ে যেত৷’
কর্নেল বললেন—‘তোমরা কুকুরগুলোকে তাড়া করে গেলে না কেন?’
অমনি তাদের মুখে ভয়ের ছাপ পড়ল৷ তারা শুধু বলল—‘সর্বনাশ! ওখানে হুম্বার ডেরা৷’
কথাটা বলেই তারা ব্রিজের উপর দিয়ে হন্তদন্ত চলে গেল৷
কর্নেল আমাকে নিয়ে যখন বাংলোয় ফিরলেন তখন প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে৷ বাংলোর চৌকিদার বলল—‘সিনহাসাবের লোক এসেছিল স্যার৷ আপনাদের জন্য উনি গাড়ি পাঠাবেন৷ আপনারা স্নান করে রেডি হন৷’
কর্নেল সকৌতুকে বললেন—‘রামলাল, আমরা কিন্তু হুম্বার ডেরার কাছাকাছি গিয়েছিলুম৷ ওখানে একটা সম্বর হরিণকে একদল বুনো কুকুর তাড়া করে গেল৷ ক’জন আদিবাসী ওই সম্বরটাকে মারতে এসেছিল৷ দুর্ভাগ্য, ওরা পারেনি৷ ওরা বলল, ওদিকে গেলে আপনারা হুম্বার পাল্লায় পড়বেন৷’
রামলাল মুচকি হেসে বলল—‘ওদের কি পালিয়ে আসতে দেখলেন? নাকি হরিণের লোভে ওরা দৌড়ে গেল?’
কর্নেল বললেন—‘না, ওরাই তো আমায় হুম্বার কথা বলে অন্য পথে চলে গেল৷’
বাংলোর ঘরে ঢুকে জামা-কাপড় বদলে আমি স্নান করে নিলুম৷ বাংলোয় বিদ্যুৎ আছে৷ পাম্প করে জল তোলা যায়৷ তা ছাড়া জল গরম করার জন্য বাথরুমে গিজারও লাগানো আছে৷ বেজায় ঠান্ডা জল৷ একটু গরম জল মিশিয়ে তবেই স্নান করা গেল৷
কর্নেলের তো মিলিটারি জীবনের অভ্যাস৷ মাসে তিন-চারদিন স্নান করেন৷ উনি ঠান্ডা লাগবার ভয়ে স্নান করলেন না৷
একটু পরেই নীচে গাড়ির শব্দ শোনা গেল৷ রামলাল উপরে এসে বলল—‘স্যার, সিনহাসাব গাড়ি পাঠিয়েছেন৷’
‘চলো, আমরা যাচ্ছি৷’ বলে কর্নেল বাথরুমে প্যান্ট-শার্ট বদলে নিলেন৷ তারপর কিছুটা ভদ্রস্থ পোশাকে বেরুলেন৷
নীচে কালো রঙের একটা অ্যামবাসাডার গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল৷ গাড়ির ড্রাইভার আমাদের চেনা৷ তার নাম অনিল৷ সেই-ই আমাদের স্টেশন থেকে এই বাংলোয় ভোরবেলা পৌঁছে দিয়েছিল৷ সে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল—‘সেই নীল প্রজাপতি কি দেখতে পেলেন স্যার?’
কর্নেল বললেন—‘নাহ, ওরা বড্ড চতুর! তোমার সাহেব ঠিকই বলেছিলেন৷’
আমরা যেখান দিয়ে যাচ্ছিলুম, সেটা পুরোনো আমলের বাঙালিটোলা৷ দুই দিকে উঁচু জায়গার উপর গাছপালার ফাঁকে একতলা বাংলো বা দোতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল৷ সবই জরাজীর্ণ অবস্থা৷ একটু পরেই বাঁ-দিকে ঘুরে নিউ টাউনশিপ এলাকায় পৌঁছুলুম৷ সেখানে একটি টিলার গায়ে প্রতাপ সিংহের বাড়ি৷ তাঁর পৈতৃক বাড়ি শুনেছি, কৈলাসগড়ের ভিতর দিকে৷ উনি এখানে একতলা সুদৃশ্য বাংলোবাড়ি বানিয়ে বাস করছেন৷ চারদিকে ফুলের বাগান, কতরকমের ক্যাকটাস৷ শুধু গাড়িটাই যা পুরোনো৷
আমাদের গাড়ি বাংলোর লনে ঢুকলে একটু কৌতুক করে বললুম—‘মিঃ সিনহা, আপনার এই বাড়ির সঙ্গে আপনার পুরোনো মডেলের গাড়ি মানায় না৷ আপনি একটা নতুন মডেলের গাড়ি কিনুন৷’
সিনহাসাব বললেন—‘আপনি তো জানেন না৷ ওটা গাড়ি নয়, ওটা একেবারে চন্দ্রযান৷ পশ্চিমের পাহাড়ে ওই যে ব্রিজ নিশ্চয়ই দেখেছেন৷ এই গাড়ি নিয়ে আমি কতবার ব্রিজ পেরিয়ে শিকারে গেছি৷’
ডাইনিং রুমে খাবার আয়োজন করা হয়েছিল৷ খাওয়া-দাওয়ার পর খোলা বারান্দায় বসে কর্নেল চুরুট ধরালেন৷ তারপর বললেন—‘আপনি বলেছিলেন, সেই আজগুবি ভূত-প্রেত বা জন্তুটার নাম নাকি হু-হুম্বা৷ কিন্তু রামলাল আর জঙ্গলের ওখানে দেখা আদিবাসীরা আমাদের বলল, ওটার নাম হুম্বা৷’
মিঃ সিনহা বললেন—‘যারা হুম্বা বলছে, তারা ওই প্রাণীটাকে দেখেনি বা তার ডাকও শোনেনি৷ আমি এক আদিবাসী সর্দারের মুখে শুনেছি, সে দলবল নিয়ে বুনো শুয়োর মারতে গিয়ে এই অদ্ভুত প্রাণীটার পাল্লায় পড়েছিল৷ তার প্রথম গর্জনটা হুম্বা হলেও পরেরগুলো হু-হুম্বা৷’ বলেই তিনি সকৌতুকে হম্বা, হু-হুম্বা, হু-হুম্বা বলে ডাক শুনিয়ে দিলেন৷ তারপর বললেন—‘ঘণ্টাখানেক পরেই আমরা রওনা দেব৷ জোরালো টর্চ থাকবে সঙ্গে৷ আমি রাইফেল ও একটা শটগানও নেব সঙ্গে৷ তা ছাড়া একটা লোডেড রিভলভারও পকেটে থাকবে৷ আমার কাজের লোক এতোয়ারি বলছিল, বরং এক-ডজন হাতবোমা নিয়ে গেলে খুব কাজের হত৷ সে নাকি শুনেছে, ক’মাস আগে দুই শিকারি হাতবোমা নিয়ে গিয়েছিলেন৷ ওই হাতবোমা ফাটিয়ে হু-হুম্বাকে ভয় দেখিয়ে ওঁরা প্রাণে বেঁচেছিলেন৷ কিন্তু এখন সেই সময় নেই৷ কর্নেল রেডি হয়ে যান৷ জয়ন্তবাবু তৈরি হন৷ আমি রেডি হয়ে আসছি৷’
কিছুক্ষণ পরেই আমরা বেরিয়ে পড়লুম৷ দেখলুম, সিনহাসাব পায়ে হান্টিং বুট পরেছেন৷ অনিল ড্রাইভার গাড়ি বের করল৷
আমি জিগ্যেস করলুম—‘গাড়ি নিয়ে জঙ্গলে যাবেন নাকি?’
সিনহাসাহেব একটু হেসে বললেন—‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত৷ আমাদের গাড়ি ব্রিজের নীচ অব্দিই যাবে৷ ওখানেই অনিল অপেক্ষা করবে৷ ভাববেন না, অনিলও নিরস্ত্র নয়৷ এই শটগানটা অনিলের জন্যই নিলাম৷’
তিনি বসলেন সামনের সিটে৷ কর্নেল ও আমি ব্যাক সিটে৷ গাড়ি বাংলোর পাশের রাস্তা দিয়ে উঠে একটু দাঁড়াল৷ সিনহাসাহেব বললেন—‘আপনাদের বাংলো থেকে কি কিছু নিয়ে আসা দরকার?’
কর্নেল বললেন—‘ওই যাঃ, আমি চুরুটের বাক্সটা নিয়ে আসি৷’ বলে তিনি হন্তদন্ত—বাংলোয় ঢুকলেন৷ সিনহাসাব হেসে উঠলেন৷
আমি বললুম—‘আমি বুঝতে পারছি না, এটা একটা ডেঞ্জারাস অপারেশন৷ কর্নেল কি চুপচাপ চুরুট খাওয়ার সময় পাবেন!’
সিনহাসাহেব বললেন—‘আপনি ওঁর নিত্যসঙ্গী৷ কিন্তু বছর পাঁচেক আগে আমি ও কর্নেল পাখি দেখতে গেছিলুম৷ ফিরে আসার পথে আমার অন্তত দুটো বুনো হাঁস মারার কথা মনে হল৷ বন্যপ্রাণী হত্যা নিষিদ্ধ আইন চালু আছে জেনেও আমার অভ্যাস বন্ধ হয়নি৷ আমি পক্ষীনিবাস থেকে একটু তফাতে লেকের মতো একটা জায়গায় কর্নেলকে নিয়ে গেলুম৷ তাঁকে গাছের ছায়ায় বসিয়ে আমি ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে হাঁস মারতে গেলুম৷ আমার দুর্ভাগ্য, ঘণ্টাখানেকের পর মাত্র দুটো হাঁস মারতে পারলুম৷ তারা জলেই পড়েছিল৷ তবে জলের মধ্যে শোলাগাছের ভেতর৷ ঝোপ থেকে একটা লম্বা ডাল কেটে হাঁস দুটোকে টেনে নিয়ে কর্নেলের কাছে ফিরলুম৷ কী আশ্চর্য, উনি এই একঘণ্টায় গোটা চার-পাঁচ চুরুট শেষ করেছেন৷ অবাক হয়ে গেলুম৷ বললেন—আর হাঁস মারবেন নাকি৷ তার দরকার নেই৷ আমার চুরুট ফুরিয়ে গেছে! ...এখন চলুন৷ দেখুন কী অবস্থা৷’
কর্নেল ফিরে এলে আমাদের গাড়ি ওই জঙ্গলের পাথুরে পথে দিব্যি এগিয়ে যাচ্ছিল৷ সামনে সোজা ওই পথ ধরে যাচ্ছিলুম, এক জায়গায় অনিল ড্রাইভার ডানদিকে ঘুরে গেল৷ সেখানে অন্য পথ পাওয়া গেল৷ এটাকে পথ বলা যায় না৷ তবে চলাচল করে পথের চেহারা পেয়েছে৷
কুড়ি মিনিটের মধ্যে আমরা সেই ব্রিজের ধারে পৌঁছুলুম৷ আমরা গাড়ি থেকে নামার পর অনিল গাড়িটা একটা উঁচু ঝোপের পাশে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় ঢুকিয়ে দিল৷ তারপর পিছন দিকটায় কয়েকটা ঝোপ কেটে ঢাকা দিল৷ যাতে গাড়িটা দেখা না যায়৷ গাড়িটা লুকিয়ে রাখার কারণ জিগ্যেস করলে অনিল বলল—‘শুনেছি হুম্বা না হু-হুম্বা-র বড্ড রাগ কালো জিনিসের উপর৷’
সিনহাসাহেব মুচকি হেসে বললেন—‘সবই শোনা কথা! তুমি তো শুনেছ মানকো হারামের কাছে৷ সাঁওতালদের মধ্যে সে খুব সাহসী বটে, কিন্তু গুল-গল্পের রাজা৷’
অনিল শটগানটা নিয়ে ব্রিজ পেরিয়ে গিয়ে সেই গাছের ছায়ায় পাথরের উপর বসে বলল—‘আপনারা যান৷ আমি এই বন্দুকে গুলি পুরে বসে আছি৷ ব্যাটাচ্ছেলে হু-হুম্বা এলে ওর নাক লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ব৷ নাককে সব পালোয়ানই ভয় পায়৷’
সিনহাসাব তাকে চাপা গলায় সতর্ক করে দিয়ে পা বাড়ালেন৷ তাঁর পিছনে কর্নেল৷ মাঝেসাঝে তিনি বাইনোকুলার তুলে দু’পাশে দেখে নিচ্ছিলেন৷ এখন আর তাঁর প্রজাপতি ধরার সময় নয়৷ জঙ্গলের ভিতরে এবার ক্রমশ চড়াই শুরু হয়েছে৷ ধাপে-ধাপে পাথর পড়ে আছে এবং তার ফাঁকে উঁচু গাছের ঘন জঙ্গল গজিয়েছে৷ আমার হিসেবে প্রায় একশো ফুট ওঠার পর পাহাড়ের ওপাশে ঢালু মাটির রাস্তা দেখা গেল৷ সাবধানে পা টিপে-টিপে এবং গাছগুলো এক হাতে ধরে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ গজ আমরা হেঁটে গেলুম৷ এরপর আবার ওঠা শুরু হল৷ উঠতে অসুবিধা হচ্ছিল না৷ কারণ, কোথাও সমতল লালমাটি, কোথাও ধাপকাটা পাথর৷
সিনহাসাহেব হঠাৎ দাঁড়িয়ে বললেন—‘কর্নেল, আপনার বাইনোকুলারটা দিন৷ আমি বাইনোকুলার আনিনি আপনার কাছে একটা আছে দেখে৷’
বলে তিনি কর্নেলের বাইনোকুলারে খুঁটিয়ে কীসব দেখে নিয়ে বললেন— ‘আমাদের এবার ওপাশের ঢাল দিয়ে বেশ কিছুটা এগোতে হবে৷ তারপরই আপনাদের একটা সেরা আশ্চর্য কীর্তি দেখাব৷ মানুষ কী না পারে! এই পাহাড়ের ধারেই আমার পূর্বপুরুষ রাজত্ব করতেন৷ এইখানেই তাঁদের প্রাসাদ আর কেল্লাবাড়ি ছিল৷ পশ্চিমে লক্ষ্য করুন, মাইলের পর মাইল সমতল মাঠ৷ ওইদিকে জমি চাষ করত সে-আমলের চাষিরা৷ মুঘলদের আক্রমণে সব ধ্বংস হয়ে যায়৷ আমার প্রপিতামহ দুর্জয় সিনহা এখান থেকে চলে যান কৈলাসগড়ে৷’
এবার আমরা পাহাড়ের একেবারে শীর্ষে পৌঁছেছি, তা বোঝা গেল৷ অনুমান করলুম, মৌলি নদী থেকে এদিকটা প্রায় তিনশো, সাড়ে তিনশো ফুট উঁচু৷ এটাকে পাহাড় বলার কারণ পাথর ও জঙ্গল৷ তা ছাড়া এর দৈর্ঘ্য৷ সামনে যতদূর চোখ যায় ততদূর জঙ্গল পাথরের মুকুট পরে এগিয়ে গেছে৷ তা ছাড়া পাহাড়টা একটা পাঁচিলের মতো৷ আর মিনিট পনেরো পরেই তিনজনে বসে পড়লুম৷ কী আশ্চর্য দৃশ্য! ডানদিকে নীচে মোটা-মোটা কালো পাথরের থামগুলো দাঁড়িয়ে আছে৷ এক-একটা প্রায় তিরিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু৷ থামগুলোর তলার লাইন কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষ৷ সেখানেও জঙ্গল গজিয়ে আছে৷
এবার সিনহাসাব বললেন—‘আর কিছুদূর এগিয়ে যেতে হবে৷ ওদিকটায় কেল্লাবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আছে৷ আমি শুনেছি, ওখানেই কোনো একটা ঘর বেছে নিয়ে ভূত-প্রেত বা অদ্ভুত জন্তুটা বাস করে৷’
আমরা আরও কিছুদূর এগিয়ে যেখানে বসলুম, সেখানে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ৷ তার নীচে একটা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ৷
মিঃ সিনহা বললেন—‘আমরা বহু-বার এখানে এসে এই ধ্বংসাবশেষ থেকে বিগ্রহ খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছি৷ পারিনি৷ শুনেছি, ওখানে পার্বতী দেবীর বিগ্রহ ছিল৷ পার্বতী আমাদের কুলদেবতা৷’
বলে তিনি তাঁর উদ্দেশে প্রণাম করে বললেন—‘এখানে বসে একটু বিশ্রাম করা যাক৷ তারপর সেই হুম্বা কী করে, দেখা যাক৷ আমরা তো এখন তার ডেরার কাছাকাছি এসেছি৷’
কর্নেল সবে চুরুট ধরিয়েছেন এবং মিঃ সিনহা রাইফেলটা তাঁর ঊরুর উপর রেখে একটা গাছে ঠেস দিয়েছেন৷ আমাদের বসার জায়গায় মসৃণ পাথর৷ এইসময় হঠাৎ একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল৷ এতক্ষণ বাতাস বইছিল না৷ চারদিক স্তব্ধ ছিল৷ মাঝেমাঝে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল৷ এবার আচম্বিতে সোঁ সোঁ শব্দ—তারপর শব্দটা শন শন করতে-করতে একটা আশ্চর্য ঝড়ের আকার নিল৷ আমাদের নীচের দিকের গাছপালা প্রচণ্ড বেগে দুলতে শুরু করল৷ তারপর সেটা ডানদিকে এগিয়ে গিয়ে সেই স্থানগুলোর চারপাশে ঘুরতে-ঘুরতে ভয়ংকর ঝড়ের রূপ নিল৷ আর সেইসময় সেই ঝড়ের মধ্যে মেঘের গর্জন শোনা গেল—হুম-বা৷ হু-হুম্বা! তারপর আরও ভয়াবহ গর্জন হু-হুম্বা, হু-হুম্বা!
আমরা তিনজনে হতচকিত হয়ে বসে রইলুম৷ কর্নেলের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, চুরুটটা পাশে রেখে বাইনোকুলারে ডানদিকে কিছু একটা লক্ষ্য করার চেষ্টা করছেন৷
এই গর্জন আর ঝড় কতক্ষণ চলেছিল, আমি হিসেব করিনি৷ পরে মিঃ সিনহা বলেছিলেন, সাড়ে তিন মিনিট থেকে চার মিনিট৷
তবে একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিলুম, ওই জান্তব গর্জনটা ছিল প্রতিধ্বনিময়৷ একটা খালি ঘরের মধ্যে কেউ চিৎকার করলে যেমন তার চিৎকারের সঙ্গে প্রতিধ্বনি মিশে যায়, এও তেমনই৷
তারপর দেখলুম, কর্নেল বাইনোকুলার চোখ থেকে নামিয়ে মৃদুকণ্ঠে বললেন—‘মিঃ সিনহা, আমাদের একটু ঝুঁকি নিতেই হবে৷ আপনি রাইফেল রেডি করুন৷ সন্দেহজনক কিছু দেখলেই গুলি করবেন৷ আর জয়ন্ত, তুমিও তোমার আর্মস রেডি করে রাখো৷’
আমার কিন্তু ভয় হচ্ছিল৷ এই অত্যোদ্ভুত ঘটনা কোনো অশরীরীর কাজ বলে মনে হয়েছে৷ কোনো মানুষ বা জন্তু এর পেছনে নেই৷ এতকাল পরে কর্নেল কি অশরীরী প্রেতাত্মার সঙ্গে লড়াই করতে যাচ্ছেন? শুনেছি, ওদের গায়ে নাকি আঘাতই লাগে না৷
ততক্ষণে কর্নেল কয়েক হাত এগিয়ে ডানদিকে যেখানে পা রাখলেন সেদিকটা দেখে অবাক হলুম৷ কোন প্রাচীনকালে কেউ যেন এখান থেকে কোনাকুনি পাথরের সিঁড়ি তৈরি করে রেখেছে৷ সিঁড়ির ধাপগুলো অন্তত ফুট চারেক চওড়া৷ কোনো ধাপই মসৃণ নয়৷ —জায়গায় জায়গায় ধাপে ফাটল ধরেছে৷ আর সেই ফাটল দিয়ে ঝোপ গজিয়েছে৷ নীচে অবধি সিঁড়িটার অবস্থা বোঝা যাচ্ছিল না৷
মিঃ সিনহা চাপা স্বরে বললেন—‘এই সিঁড়ির কথা আমি আমার ঠাকুর্দার কাছে শুনেছিলাম৷ তাহলে দেখা যাচ্ছে বংশপরম্পরায় শোনা কথায় ভুল নেই৷ কিন্তু কর্নেল, খুব সাবধানে পা ফেলবেন৷ এই সিঁড়ির নীচে নাকি একটা গভীর খাদ বা সুড়ঙ্গ আছে৷ আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে না, সুড়ঙ্গ নাকি গভীর খাদ৷ তাই আপনি বাইনোকুলারে লক্ষ্য রেখে এগোন৷ এখানে আমরা পশ্চিম আকাশের সূর্য থেকে যথেষ্ট রোদ পাচ্ছি৷’
ধাপের পর ধাপে পা ফেলে এবং বাঁ-হাতে ঝোপের ডাল আঁকড়ে ধরে অনন্তকাল ধরে নেমে চলেছি৷ খুব ধীরে নামছিলুম বলে বোধহয় এইরকম একটা অনুভূতি জেগে উঠছিল৷ মাঝে-মাঝে পিছু ফিরে দেখে নিচ্ছিলুম, কেউ আমাদের অনুসরণ করছে কি না৷ কারণ, সে অতর্কিতে ধাক্কা দিলে আমাদের কী অবস্থা ঘটবে বোঝা যাচ্ছে না৷ হয়তো অনন্ত পাতালে তলিয়ে যাব৷ নীচের দিকে আবছা আঁধার৷ কারণ, সূর্য এখন দূর পশ্চিমের কালো পাহাড়ের আড়ালে চলে গেছে৷
কর্নেল পকেট থেকে টর্চ বের করে বললেন—‘আপনারাও হাতে টর্চ নিন৷ দরকার হলে জ্বালবেন৷ শুধু আমি টর্চ জ্বেলে পা ফেলব৷ আপনারা আমাকে সাবধানে অনুসরণ করবেন৷’
প্রায় কুড়ি মিনিট পরে কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন—‘নীচে একটা ইঁদারার মতো গর্তে জল দেখতে পাচ্ছি৷ তার ওধারে একটা ভেঙে পড়া ঘরের দেয়াল৷ এবার আমরা সিঁড়ি ছেড়ে ডানদিকে নামছি৷ ঝোপগুলো আঁকড়ে ধরে নামবেন কিন্তু৷’
ফুট দশেক নীচে পাথরে বাঁধানো গোলাকার জলাধার বা ইঁদারা দেখতে পেয়েছিলুম৷ সেটাকে এড়িয়ে কর্নেল পাঁচিলটার কাছে পৌঁছোলেন৷ তারপর গুড়ি মেরে বসে ঘুরে ঠোঁটে আঙুল রাখলেন৷ তার মানে আমাদের বিন্দুমাত্র শব্দ করা চলবে না৷ এটা একটা ফাটল ধরা মেঝে৷ আশ্চর্য, মেঝেটা যেন মার্বেল পাথরের৷ সামনে ঘরেরই আর একটা দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে৷ সেটাও মার্বেল পাথরের বলে মনে হল৷ পিছনের দেয়ালটা সম্ভবত ঝড়-বৃষ্টির চাপে অথবা কোনো কারণে ক্ষয়ে গেছে এবং ঘন শ্যাওলা ও গুল্ম গজিয়ে আছে৷ সামনের দেয়ালের ভাঙা অংশ সরিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি সামনে একটা প্রকাণ্ড গোলাকার স্তূপ৷ বৌদ্ধদের স্তূপের মতো৷ সেটা কালো পাথরের৷ স্তূপটা গুল্ম লতাপাতায় ঢাকা৷ সামনের দিকে আন্দাজ ফুট ছয়েক লম্বা আর ফুট চারেক চওড়া একটা দরজা৷ সেই দরজার উপর লতাপাতার ঝালর নেমে এসেছে৷
কর্নেলের ডান হাতে রিভলভার, বাঁ-হাতে টর্চ৷ ঝালর সরিয়ে ভিতরে আলো ফেললেন৷ তারপরই স্তূপের ভিতর গুলি না ছুঁড়ে মাথার উপর একটা গুলি ছুঁড়লেন৷ অমনি স্তূপের অন্যদিকে একটা সরসর খড়খড় শব্দ শোনা গেল৷ মিঃ সিনহা উৎসাহের চোটে সেই দিকটা লক্ষ্য করে রাইফেলের গুলি ছুঁড়লেন৷ কিন্তু কোনো জন্তুর আর্তনাদ শোনা গেল না৷ সামনের গাছপালা এবং ঝোপঝাড়গুলোর মধ্য দিয়ে একটা কিছু যেন পালিয়ে যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছিল৷ মিঃ সিনহা স্তূপের ডানপাশ দিয়ে এগুতে যাচ্ছিলেন৷ কর্নেল তাঁকে নিষেধ করে বললেন—‘না, আপনি অকারণ বুলেট খরচ করবেন না মিঃ সিনহা৷’
মিঃ সিনহা বললেন—‘কিন্তু জানোয়ারটা যে পালিয়ে গেল!’
কর্নেল বললেন—‘এক মিনিট৷ আমি কিটব্যাগ থেকে জঙ্গল-কাটা ছোরাটা বের করি৷’
তিনি জাঙ্গল-নাইফ বের করে স্তূপের দরজায় ঝুলন্ত লতাগুলো পরিষ্কার করে কেটে ফেললেন৷ তারপর ভিতরে টর্চের আলো জ্বেলে বললেন—‘এ তো দেখছি রীতিমতো আমাদের মতোই মানুষের গোপন ডেরা৷’
তিনি ভিতরে ঢুকতেই আমরাও ঢুকে পড়লাম৷ দেখলুম ভেতরটা একেবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন৷ এককোণে একটা খাটিয়ায় বিছানা পাতা৷ অন্যপাশে রান্নার আসবাবপত্র আর একটা কুঁজোতে জল ভরা৷ একটা কেরোসিন কুকারও দেখা গেল৷ এবং সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিস, একপাশে একটা ব্যাটারি এবং তার সঙ্গে কী-একটা যন্ত্র ফিট করা আছে৷
মিঃ সিনহা হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ বললেন—‘আশ্চর্য, বড়োই আশ্চর্য কর্নেল সাহেব! আমরা কার ডেরায় হাজির হয়েছি জানেন? জগা পাগলার৷ স্কুলে সায়েন্স পড়াত৷ মাঝে-মাঝে আজগুবি কীর্তি দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিত৷ তারপর নিজের একমাত্র ছেলের উপর কী এক্সপেরিমেন্ট চালাতে গিয়ে তাকে মেরে ফেলেছিল৷ ছেলেটার মা নেই৷ পুলিশ জগন্নাথ মুখুজ্জেকে অ্যারেস্ট করতে এসে দেখেছিল, তার ঘরে কেউ নেই৷’
কর্নেল জিগ্যেস করলেন—‘এটা কতদিন আগের কথা?’
মিঃ সিনহা বললেন—‘তা প্রায় বছর সাত-আটেক হবে৷ আমরা জানতুম জগা পালিয়ে গেছে৷ তবে এক আদিবাসী বুড়ো আমাকে বলেছিল, পশ্চিমের পাহাড়ের জঙ্গলের ভিতর জগন্নাথ মুখুজ্জেকে নাকি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে৷ লোকটার সাড়া পেয়ে সে উধাও হয়ে যায়৷ তার কথা কেউ বিশ্বাস করেনি৷ আমাদের ধারণা ছিল, সে আরও বদ্ধ পাগল হয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে বেড়াচ্ছে... তবে হ্যাঁ, ওকে সবাই জগা পাগলা বলে ঠাট্টা করলেও মনে-মনে জানতুম, লোকটি প্রতিভাবান৷ সুযোগ পেলেই সে একজন বড়ো বিজ্ঞানী হতে পারত৷’
কর্নেল কথাগুলি শোনার পর সেই ব্যাটারিচালিত যন্ত্রটার কাছে এগিয়ে গিয়ে একটা বোতাম টিপে দিলেন৷ অমনি আমাদের কানে তালা ধরানো গর্জন শুরু হল—হুম্বা—হু-হুম্বা—হু-হুম্বা!
আমি আর সিনহাসাহেব দুই কানে আঙুল দিয়েছিলুম৷ কিন্তু কর্নেলের মিলিটারি কান৷ কত ভয়ংকর কামান গর্জন শুনেছেন যুদ্ধক্ষেত্রে৷ কাজেই এই আওয়াজ তো তাদের কাছে নস্যি৷ উপরন্তু তিনি যন্ত্রটার লাল বোতামটা দ্বিতীয়বার টিপে দিলেন৷ অমনি গর্জনটা আরও বাড়ল—হুম্বা-হুহুম-বা—হুহুম-বা, হুম্বা-হু-হুম্বা-হু-হুম্বা-হুম্বা-হু-হুম্বা৷
মিঃ সিনহা মনে-মনে চটে গিয়েছিলেন৷ তিনি লাল বোতামটার পাশে কালো বোতামটা টিপে দিলেন৷ আর তখনই গর্জন থেমে গেল৷ বোঝা গেল মিঃ সিনহা যথেষ্ট বুদ্ধিমান কারণ গর্জনটা একেবারে থেমে গেল৷
সব তো হল৷ কিন্তু সেই অদ্ভুত ঝড়টা কীভাবে তৈরি করেন বিজ্ঞানী মশাই? আর সেই ঝড়ে গাছপালা, পাতা সব কাঁপতে থাকে ও উড়তে থাকে কীভাবে, সেটা জানা দরকার৷ কর্নেল এবং মিঃ সিনহা টর্চের আলো জ্বেলে যন্ত্রটা পরীক্ষা করতে থাকলেন৷ এ সময়ে তিনজনেই যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে ছিলুম৷ হঠাৎ স্তূপের ওপাশে লতাপাতার ঝালর সরিয়ে একটা রোগা-পটকা চেহারার অসম্ভব ফ্যাকাশে রঙের লোক দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল—‘এই পদ!’
হঠাৎ সিনহা চমকে উঠেছিলেন৷ এবার সেই লোকটাকে দেখে হো হো করে হেসে উঠলেন৷ ‘আরে জগা যে—এসো জগা ভায়া৷ এভাবে যে তোমার দর্শন পাব, ভাবতে পারিনি৷ আমরা তোমার ঘরে বে-আইনিভাবে ঢুকেছি বটে৷ তবে তত কিছু ক্ষতি করিনি৷ তোমার এই মজার যন্ত্রটিকে পরীক্ষা করতে গিয়ে আমাদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেছে৷’
বিজ্ঞানী ভদ্রলোকের গায়ে একটা হাতাকাটা ফতুয়া৷ পরনে ছেঁড়া ফুলপ্যান্ট৷ খালি পা৷ তার খাড়া নাকের নীচে সাদা গোঁফ-দাড়ি৷ মাথার চুলও সাদা, এলোমেলো৷ নাকের ডগায় একটা চশমা৷ তিনি মাথার উপর কী একটা টিপে দিতেই ঘরের ভিতরটা আলো হয়ে গেল৷
তারপর পাগলা বিজ্ঞানী কর্নেলের দিকে তাকিয়ে তেমনই দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললেন—‘এটা নাকি সেই টিকটিকি৷ কলকাতা থেকে এনেছ সবাই চাঁদা তুলে৷ আর সেই খবর প্রচার করার জন্য ওই ছোকরা সাংবাদিককে ভাড়া করে এনেছ৷ হুঁ হুঁ বাবা, সব খবর রাখি৷’
মিঃ সিনহা বললেন—‘ছিঃ ছিঃ, জগা ভায়া, অতিথিদের অপমান করতে নেই৷ উনি সারা ভারতের পরিচিত প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার৷ তাঁর এই বন্ধু বিশিষ্ট সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী৷ দৈনিক সত্যসেবকের সাংবাদিক৷’
বিজ্ঞানীমশায়ের মুখে হঠাৎ অদ্ভুত হাসি চলকে উঠল৷ বললেন—‘তাহলে তো তোমাদের ক্ষমা করা যায়৷ কারণ, আমি মানকোকে দিয়ে গোপনে কৈলাসগড় থেকে দৈনিক সত্যসেবক এনে পড়ি৷ বাংলা আমার মাতৃভাষা৷ বাংলা না পড়লে কষ্ট হয়৷ তা এসে পড়েছ যখন বসো৷ বসো৷ একটা মাত্র চেয়ার৷ কর্নেল সাহেব আপনি চেয়ারটাতে বসুন৷ আর আপনি যে ঘন ঘন কফি খান, সে খবরও রাখি৷’ আর আমার দিকে আঙুল তুলে বললেন—‘এই ছোকরা লেখে ভালো৷’
মিঃ সিনহা ও আমাকে বিছানায় বসিয়ে কুকারে কেটলি চাপিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেন৷ তারপর বিছানার তলা থেকে তিনটে গেলাস বের করলেন৷ বললেন—‘আমি এক-ডজন গেলাস কিনেছিলাম আমার কাজকম্মের জন্য৷ কাজ হয়ে গেছে৷ গ্লাসগুলো টাটকা আছে৷ আপনারা স্বচ্ছন্দে এতে করে কফি খেতে পারেন৷ কর্নেল সাহেবের কথা পড়ে-পড়ে কফি আমিও খাওয়া শুরু করেছি৷ আমাকে তো রাত্রি জাগতে হয়৷’
—‘কেন, আপনার তো এই জঙ্গলে ভয় হবার কথা নয়৷’ কর্নেল সকৌতুকে বললেন৷ ‘আপনার ভয়ে তো সব জন্তু-জানোয়ার পালিয়ে যাবে৷’
বিজ্ঞানী হাসলেন শুনে৷ খিকখিক করে হেসে দুধ গরম করে কফিতে চিনি ও দুধ মিশিয়ে কফি পরিবেশন করলেন৷ বললেন—‘কর্নেল সাহেবের বাড়িতে একজন কফি করে, তার কী যেন নাম?’
কর্নেল বললেন—‘আপনি তার মতো যদি কফি করা শিখতে চান তবে মানকো হারামকে বলবেন, কলকাতা গিয়ে যেন শিখে আসে৷ সে শিখিয়ে দেবে৷’
বিজ্ঞানী জগন্নাথ মুখুজ্জে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, ‘না, এই বুড়ো বয়সে আর কফি করা শিখব না৷ আপনার ওই ষষ্ঠীচরণ এসে সব জেনে বাইরে বলে দেবে৷’
আমরা বললাম—‘না, কাউকেই কিছু বলবে না৷ চিন্তা নেই৷’
বিজ্ঞানী করজোড়ে বললেন—‘আপনাদের মিনতি করছি, আমার কথা কাউকে বলবেন না যেন! তাহলে আমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে না৷’
কর্নেল বললেন—‘আপনার ইচ্ছাটা কী মিঃ মুখার্জি?’
বিজ্ঞানীমশাই কাঁচুমাচু মুখে বললেন—‘আমাকে মিস্টার-টিস্টার বলবেন না৷ আমি জগা পাগলা৷ তবে ইচ্ছের কথা যখন জিগ্যেস করছেন তখন একটু আভাস দিই৷ খুলে বলব না৷’
কথাটা বলে তিনি কিছুক্ষণ চোখ বুজে নীচের মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ তারপর অতি কষ্টে বললেন, ‘আমার বুদ্ধির দোষে যাকে হারিয়েছিলাম, তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য এই গোপন জায়গায় ল্যাবরেটরি তৈরি করতে চাই৷ এটা ল্যাবের প্রথম ধাপ৷ তারপর ধীরে-ধীরে করব৷ কিন্তু টাকার অভাব৷ কতকগুলো জিনিস কিনে আনতে হবে৷’
মিঃ সিনহা বললেন—‘যত টাকা লাগে আমি তোমাকে দেব৷ বলো তো আমি এক সপ্তাহের মধ্যে টাকা এনে গোপনে এসে তোমাকে দিয়ে যাব৷ কিন্তু বলো তো, তুমি কী করতে চাও?’
বিজ্ঞানীমশাই মুখে হাত চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন৷ পরে বোঝা গেল, তিনি যে ছেলেকে হারিয়েছেন, তাকে ফিরিয়ে আনতে চান৷ কিন্তু সে কি সম্ভব?
কর্নেলের দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁর মুখে একটা উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে৷ তিনি বললেন—‘আধুনিক যুগে কোনো কিছুই অসম্ভব নয় মিঃ মুখার্জি৷ কৃত্রিম কোষ তৈরি করে ল্যাবে জীববিজ্ঞানীরা অনেক কিছু সৃষ্টি করতে পারছেন৷ আণবিক জীববিজ্ঞানী ওয়াটসন বলেছেন—এরপর আমি ল্যাবে মানুষ তৈরি করব৷’
বিজ্ঞানীমশাই বললেন—‘জানি, আমার কাছে জীববিজ্ঞানীদের অনেক বই আছে৷ তবে সেগুলো আমি বাইরে একটা গোপন ঘর আবিষ্কার করেছি, সেখানে রেখে দিয়েছি৷ সেটাকে আমার পড়ার ঘর বলতে পারেন৷’
মিঃ সিনহা সহাস্যে বললেন—‘লোকে তোমাকে জগা পাগলা বলে ঠাট্টা করত৷ কিন্তু আমি অন্তত জানতাম তোমার মধ্যে একজন প্রতিভাধর মানুষ আছে৷ এখন বোঝা যাচ্ছে গোপনে কাজ করার জন্য নিজেকে আড়াল করতে তুমি হুম্বা—হুহুম-বা’র মতো দানব শব্দ তৈরি করেছ৷ কিন্তু ঝড় তৈরির রহস্য দেখাও৷’
বিজ্ঞানীমশাই বললেন—‘ব্যাপারটা তত কিছু কঠিন না৷ এই চারিদিকের গাছপালা, জঙ্গল থেকে আমি কৃত্রিম উপায়ে রাতের দিকে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস সংগ্রহ করি৷ সেগুলো স্তূপের পাশে একটা প্রাচীন সুড়ঙ্গের মধ্যে জমিয়ে রাখি৷ তার মুখে একটা পাইপ লাগানো আছে৷ এই দ্যাখো—বলে তিনি ব্যাটারির পাশে মোটরগাড়ির ব্রেকের মতো উঁচু হয়ে থাকা একটা লোহার প্যাডেলে চাপ দিলেন৷ বার কতক চাপ দেওয়ার ফলেই বাইরে একটা তুমুল আলোড়ন উঠল—সোঁ সোঁ, শন শন শব্দ৷ শব্দটা ক্রমশ দূরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল৷ বিজ্ঞানী আর একটা প্যাডেল চেপে বললেন—এসবের আয়োজন বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে৷ পদ, তোমার ভাগ্য ভালো যে স্বনামধন্য প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও রহস্যভেদী কর্নেল সাহেবকে সঙ্গে পেয়েছ৷ না হলে আমার এ কাজের রহস্য ভেদ করা কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না৷’
মিঃ সিনহা বললেন—‘তুমি আমাকে ‘পদ’ বলে ডাকছ—এটা আমার ছেলেবেলার ডাকনাম৷ তোমাকে ‘জগা’ বলে ডাকছি—সেও তোমার ছেলেবেলার ডাকনাম৷ আমি প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার এই ডেরার খবর কেউ জানবে না৷ বলো, কত টাকা লাগবে? মানকো হারাম বিশ্বাসী লোক বলেই জানি৷ আমি তার হাত দিয়েই টাকা পাঠাব৷ আর তোমার ইচ্ছে হলে তাকে দিয়ে খবর পাঠাবে, তাহলে আমি আসব৷ তোমার ইচ্ছে না হলে আমি আসব না৷ খবর দিলেই হবে৷’
বিজ্ঞানীমশাই বললেন—‘কৈলাস গড়ে আমার পৈতৃক ভিটেটা আছে না দখল হয়ে গেছে? মানকু বলছিল, কারা নাকি ওখানে ক্লাব করবে?’
মিঃ সিনহা বললেন—‘কাউকেই ক্লাব করতে দেব না৷ আমি তোমার ওই জায়গাটা নিয়ে অন্য কিছু করব৷ ধরো, আর একটা প্রাইমারি স্কুল! তোমাকে আমি শিগগির হাজার পঁচিশেক টাকা পাঠিয়ে দেব৷ তোমার ওই জায়গার দাম কমপক্ষে এখন এক লাখ টাকা৷ তুমি চিন্তা কোরো না ভায়া৷’
কর্নেল বললেন—‘মনে হচ্ছে বাইরে অন্ধকার হয়ে গেছে৷ এবার আমাদের যাওয়া উচিত৷’
বিজ্ঞানীমশাই বললেন—‘চলুন, আমি আপনাদের খুব সহজ রাস্তা দিয়ে ব্রিজের কাছে পৌঁছে দেব৷ ভয় পাবেন না৷ ওটা একটা সুড়ঙ্গ পথ৷ ভবিষ্যতে এলে মানকুকে জানিয়ে দেবেন৷ তারপর সে আপনাদের ওই পথেই নিয়ে আসবে৷ কারণ, আপনারা নিজে থেকে সুড়ঙ্গের পথটা খুঁজে পাবেন না৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন