চাঁদের পাথর

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

রত্নাকর বিষয়ীর ডাইরি

রুহা নদী যেখানে কঠিন শিলা থেকে আচমকা একশো ফুট ঝাঁপ দিয়ে জলপ্রপাত সৃষ্টি করেছে, তার নিচে এক গভীর জলাশয়৷ জলটা খুব স্বচ্ছ৷ প্রচুর মাছের আনাগোনা দেখা যায়৷

সেই জলাশয়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করে নিরাশমনে বাংলোয় ফিরছিলুম৷ মোটামুটি সমতল একটা বিশাল উপত্যকা পেরিয়ে টিলার গায়ে অবস্থিত বাংলোয় পৌঁছুনো যায়৷ উপত্যকা জুড়ে ঝোপজঙ্গল আর অসংখ্য নানা গড়নের পাথর ছড়িয়ে রয়েছে৷ পথ বলতে কিছু নেই৷ উপত্যকার শেষপ্রান্ত ঘিরে উঁচু পাহাড়৷ তার আড়ালে সূর্য অস্ত গেছে৷ ক্রমশ দিনের আলোটুকু ফুরিয়ে আসছিল৷ উপত্যকার মাঝামাঝি পৌঁছে দেখলুম, ডানদিকে প্রকাণ্ড চাঁদ উঁকি দিয়েছে৷

কিন্তু এরই মধ্যে উপত্যকা জুড়ে কুয়াশা জমে উঠেছে৷ হেমন্তকাল৷ কুয়াশার প্রাদুর্ভাব স্বাভাবিক৷ সদ্য ওঠা চাঁদের আলো কুয়াশার জন্য ম্রিয়মাণ দেখাচ্ছিল৷ পাথরের আড়ালে কোথাও একটা পাখি হঠাৎ ডেকে উঠে তেমনই হঠাৎ চুপ করল৷ এবার টর্চ জ্বালতে হল৷

বাংলোয় বিদ্যুৎ নেই৷ এতক্ষণে একটা আলোর বিন্দু চোখে পড়লে বুঝতে পারলুম, মঙ্গলরাম চৌকিদার লণ্ঠন জ্বেলে বারান্দার মাথায় ঝুলিয়ে দিল৷ সেই আলো লক্ষ্য করে হাঁটতে থাকলুম৷ এতক্ষণে মনে পড়ল, মঙ্গলরাম আমাকে পইপই করে নিষেধ করেছিল, যেন দিনের আলো থাকতে থাকতে বাংলোয় ফিরি৷ কারণ রুহা উপত্যকায় নাকি খুব ভূতের উপদ্রব৷

আমি ভূত বিশ্বাস করি না৷ কিন্তু এই জনহীন উপত্যকায় সন্ধ্যাবেলায় একলা যেতে যেতে গা ছমছম করছিল, একথা সত্যি৷ বারবার টর্চের আলোয় চারদিক দেখে নিচ্ছিলুম৷

কিছুক্ষণ পরে বাঁ-দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলুম৷ জ্যোৎস্নায় খানিকটা দূরে একটুকরো কুয়াশা আলাদাভাবে ভেসে আছে৷ সেই কুয়াশার গায়ে অর্ধবৃত্তাকার একটা যেন রামধনু৷

সূর্যের আলোর মতো চাঁদের আলোও রামধনু সৃষ্টি করে শুনেছি৷ কিন্তু এ কি সেই দুর্লভ দৃশ্য? থমকে দাঁড়িয়ে গেলুম৷

রামধনুটা খুবই ছোট্ট৷ কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, সেটা চাকার মতো বনবন করে ঘুরছে৷ ঘুরতে ঘুরতে রঙবেরঙের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে পড়ছে৷ তারপর কানে এল চাপা একটা শিস দেওয়ার শব্দ৷ সম্ভবত ওই অদ্ভুত রামধনুর আবর্তনের সঙ্গে শব্দটার সম্পর্ক আছে৷ কারণ ক্রমশ আবর্তনের গতি কমে এল, তখন শিসের শব্দও ক্ষীণতর হতে থাকল৷ একটু পরে সেই আজব রামধনুর রঙ গাঢ় সবুজ হয়ে গেল৷ শিসের শব্দও আর শোনা গেল না৷ তারপর সবুজ অর্ধবৃত্তটা ফিকে হতে হতে মিলিয়ে গেল৷ শুধু ভেসে রইল জ্যোৎস্নায় একটুকরো সাদা কুয়াশা৷

ব্যাপারটা আর যাই হোক, ভূতুড়ে কিছু নয়৷ রূহা উপত্যকায় সম্ভবত আমি এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটতে দেখলুম৷

বাংলোয় ফিরে দেখি, মঙ্গলরাম উদ্বিগ্নমুখে দাঁড়িয়ে আছে৷ উত্তেজিত ভাবে সে বলে উঠল, ‘‘দেওতার কৃপায় জোর বেঁচে গেছেন হুজুর! আমি ভাবছিলুম, আর আপনার রক্ষা নেই৷’’

একটু হেসে বললুম, ‘‘তাহলে দেখতেই পাচ্ছ মঙ্গলরাম, তোমাদের ভূতটা আমার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি৷’’

মঙ্গলরাম জিভ কেটে মাথা নেড়ে বলল, ‘‘অমন কথা বলবেন না হুজুর! রুহার মাঠে এখন যা দেখে এলেন, তা খুব সাংঘাতিক ব্যাপার৷ বারো বছর অন্তর জিনিসটা দেখা যায় ঠিক পূর্ণিমার রাতে৷ আজ পূর্ণিমা৷ ওই শুনুন, যেখানে যত বস্তি আছে, ঢাক-ঢোল বাজতে শুরু করছে৷’’

কান করে শুনি, সত্যি তাই৷ দূরে যেখানে-যেখানে আদিবাসীদের বস্তি আছে, সেখানে মশালের আলো দেখা যাচ্ছে আর ঢাক-ঢোলের বাজনা শুরু হয়েছে৷ জিগ্যেস করলুম, ‘‘এর কারণ কী মঙ্গলরাম?’’

‘‘ওরা ভয় পেয়েছে হুজুর৷ তাই দেওতার পুজোর জোগাড় করেছে৷ কারণ এবার রুহা এলাকায় সাংঘাতিক বিপদের দিন ঘনিয়ে এল৷ কমপক্ষে একটা মাস বিপদের ভয়ে কাটাতে হবে আমাদের৷ তারপর অপদেওতা পালিয়ে গেলে বিপদ কাটবে৷’’

‘‘কিসের বিপদ?’’

‘‘এখন কিছুদিন কেউ আর রুজি-রোজগারে বেরুতে পারবে না৷ যদি কেউ সাহস করে জঙ্গলে কাঠ আনতে বা নদীতে মাছ ধরতে যায়, সে আর ফিরবে না৷ একেবারে নিখোঁজ হয়ে যাবে চিরকালের মতো৷ গরিব মানুষ ওরা৷ রুখাশুখা মাটিতে কেউ-কেউ একটু চাষবাসও করে৷ কিন্তু জমিতে যাবে কী সাহসে? বস্তি থেকে বেরুলেই বিপদ৷ ওই অপদেওতার পাল্লায় পড়বে৷’’

ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকল না৷ রুহা উপত্যকায় বারো বছর অন্তর এমন অদ্ভুত ঘটনা ঘটে৷ মধ্যপ্রদেশে আমি দশ বছর ধরে আছি, আমার কানে আসেনি৷ রায়পুরে আমার হেডকোয়ার্টার৷ সরকারের খনিসংক্রান্ত দফতরের আমি অধিকর্তা৷ রুহা উপত্যকায় এই প্রথম এসেছি৷ উদ্দেশ্য—নিছক ছুটি কাটানো৷ আমার ছিপ ফেলে মাছ ধরার হবি আছে৷ রুহা জলপ্রপাতের কথাও শুনেছিলুম৷ কিন্তু এমন অদ্ভুত ঘটনার কথা তো শুনিনি!

অবশ্য রুহা এলাকা খুব দুর্গম এবং প্রত্যন্ত৷ প্রকৃতি-বিলাসী এক ফরাসি ১৮৮০ সালে এই বাংলোটা তৈরি করে বাস করতেন৷ টিলার মাথায় তাঁর কবর আছে৷ বহুকাল বাংলোটা পড়ে থাকার পর বছর তিনেক আগে বনদফতর মেরামত করেছে৷ মাঝেমাঝে কদাচিৎ কেউ আসে৷ রায়পুর থেকে বাসে তিরিশ মাইল দূরত্ব পেরিয়ে কর্ণগড়৷ সেখান থেকে আর গাড়ি চলার মতো রাস্তা নেই৷ বনজঙ্গল পাহাড় ভেঙে আরও মাইল পনেরো পায়ে হেঁটে এলে তবে রুহায় পৌঁছুনো যায়৷

কোথাও ভ্রমণের জন্য গেলে আমার একা যাওয়াই অভ্যাস৷ কারণ আজীবন স্বাবলম্বী আমি৷ সঙ্গে কেউ থাকলে বরং সমস্যার সৃষ্টি হয়৷ আত্মনির্ভরতা কমে যায়৷

কিন্তু মঙ্গলরাম চৌকিদারের কাছে ওই সব কথা শোনার পর—বিশেষ করে আজব এক দৃশ্য এই চর্মচক্ষে নিজেও প্রত্যক্ষ করেছি, আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল৷ মনে হচ্ছিল যদি সত্যি কোনো বিপদ ঘটে, ওই রোগা দুর্বল গড়নের লোকটির কোনো সাহায্য পাব না৷ সঙ্গে একটা রাইফেল অবশ্য আছে৷ জানি না, অপদেওতার সঙ্গে লড়াই বাধলে এই অস্ত্র কতটা কাজ দেবে!

কাল রাতে ভালো ঘুম হয়নি৷ একবার যেন নিচের উপত্যকায় আর্তনাদ শুনেছিলুম৷ রাইফেল নিয়ে সাহস করে বেরিয়েছিলুমও৷ জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছিল চারদিক৷ সারা উপত্যকা কুয়াশায় ঢাকা৷ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আর কোনো শব্দ শুনিনি৷ কিন্তু ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল৷ তাই ঘরে ঢুকে দরজা এঁটে শুয়ে পড়েছিলুম৷

সকালে গেলুম সেই জায়গাটা দেখতে৷ ঠিক কোথায় আজব রামধনু দেখেছিলুম, খুঁজে বের করা কঠিন৷ তবে মনে হল, একটা পিরামিডের মতো তিনকোণা ফুট পনেরো উঁচু কালো ব্যাসল্ট পাথরের মাথায় সম্ভবত ব্যাপারটা ঘটেছিল৷

পাথরটার মধ্যে অন্য কোনো বিশেষত্ব চোখে পড়ল না৷ নিরেট একটা পিরামিড যেন৷ আশেপাশে প্রচুর টুকরো-পাথর ছড়িয়ে আছে৷ পরীক্ষা করে সন্দেহ হল, সেগুলোতে প্রচুর সিলিকন ডাইঅক্সাইড আছে৷ ল্যাবরেটরিতে বিশ্লেষণ করার আগেই আমি বলতে পারি, এতে আছে পটাসিয়াম, রুবিডিয়াম, বেরিয়াম, জির্কোনিয়াম এইসব জিনিস৷ এক্স-রে ডিটেক্টরে পরীক্ষা করে দেখা উচিত, এগুলো থেকে কোনো রশ্মি নির্গত হতে পারে কিনা৷ কিছু পাথর কুড়িয়ে ব্যাগে ভরে নিলুম৷

আশেপাশে দৃষ্টি রেখে সতর্কভাবে ঘণ্টাখানেক ঘোরাঘুরি করলুম৷ তারপর চললুম রুহা প্রপাতের সেই জলাশয়ে৷ আশা করলুম, আজ অন্তত একটা মাছ ছিপে গাঁথতে পারব৷

কিছুটা চলার পর চমকে উঠে দেখলুম, একখানে পাথরের ওপর অনেকটা রক্ত৷ রক্তগুলো জমাট বেঁধে গেছে৷ রাতের সেই আর্তনাদের কথা মনে পড়ল৷ শিউরে উঠলুম৷ এ কিসের রক্ত?

রক্তটা দেখার পর অস্বস্তি বেড়ে গিয়েছিল৷ প্রপাতের সেই জলাশয়ে ছিপ ফেললুম বটে, ফাতনার দিকে মন দেওয়া দুঃসাধ্য হচ্ছিল৷ ঘণ্টা দুই পরে যদি বা একটা মাছ বঁড়শিতে বিঁধল, তাকে জল থেকে ওঠাতে গিয়ে পাথরের খাঁজে আটকে গেল৷ তারপর বঁড়শি খুলে গেল তার মুখ থেকে৷

তিতিবিরক্ত হয়ে পাইপ ধরাতে যাচ্ছি, হঠাৎ প্রপাতের মাথায় ঝোপঝাড় এবং পাথরের ফাঁকে একপলকের জন্য চোখের কোণা দিয়ে একটা নড়াচড়া দেখতে পেলুম৷ কিন্তু মুখ ঘুরিয়ে কয়েক মিনিট তাকিয়ে থেকে তেমন কিছু চোখে পড়ল না৷ চোখের ভুল নয়তো?

পাইপ ধরিয়ে গুলিভরা রাইফেলটা হাতের কাছে রেখে ফের বঁড়শিতে টোপ গাঁথলুম৷ ঠিক জায়গায় ফেলার পর পাইপ টানতে টানতে প্রপাতের মাথার ওপর সেই ঝোপটার দিকে লক্ষ্য রাখলুম৷

একটু পরে ঝোপটা সত্যি নড়ল৷ সঙ্গে সঙ্গে রাইফেলে হাত রাখলুম৷ কিন্তু তারপর অবাক হয়ে দেখি, পাথর ও ঝোপের ফাঁকে একটা মুখ ভেসে উঠেছে৷ মুখটা মানুষেরই৷ কিন্তু ওই মুখে কী একটা অস্বাভাবিকতা আছে৷ দূরত্ব একশো গজের বেশি নয় এবং সূর্যের উজ্জ্বল আলো পড়েছে৷ বেলা প্রায় দশটা বাজে৷ তাই মুখের সবটাই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল৷ নিষ্পলক দুটো চোখের চাউনি দেখে মনে হচ্ছিল যেন মৃত মানুষের মুখ৷ মাথায় একরাশ কালো চুল৷ এ কার মুখ? এভাবে উঁকি দিচ্ছে কেন?

রাইফেল তাক করে চেঁচিয়ে বললুম, ‘‘কে তুমি? এখানে নেমে না এলে গুলি ছুঁড়ব৷’’

জলপ্রপাতের গর্জনের ভেতর আমার কথাগুলো মিলিয়ে গেল৷ মুখটাও সরে গেল পাথরের আড়ালে, তখন খাপ্পা হয়ে রাইফেল নিয়ে উঠে দাঁড়ালুম৷ তারপর ধাপে ধাপে পাথর বেয়ে প্রপাতের মাথায় চলে গেলুম হাঁফাতে হাঁফাতে৷

প্রপাতের মাথায় রুহা নদীর প্রসার ফুট বিশেকের বেশি নয়৷ দু’ধারে পাথরের খাড়া দেয়াল৷ যেখানে মুখটা দেখেছিলুম, সেখানে কেউ নেই৷ ওদিকটা মোটামুটি পরিষ্কার জায়গা৷ ঝোপগুলো ফুট তিনেকের বেশি উঁচু নয়৷ পাথরগুলোও নিচু৷ কেউ লুকিয়ে থাকলে চোখে না পড়ে পারত না৷

এদিক-ওদিক খুঁজে লোকটাকে দেখতে পেলুম না৷ তখন মনে হল, লোকটা পাগল নয় তো? বনজঙ্গল আর জনহীন পাহাড়ি এলাকায় পাগল কেন বেড়াতে আসবে জানি না, তবে এমন করে উঁকি মেরে লুকিয়ে পড়াটা পাগলের কাণ্ড ছাড়া আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? বিশেষ করে তার মুখে একটা অস্বাভাবিকতা তো স্পষ্ট দেখেছি৷

এইসব ভেবে ছিপের কাছে ফিরে এলুম৷ কিন্তু এত অস্বস্তির মধ্যে একাগ্রতা আনা খুবই কঠিন৷ প্রতিটি খ্যাঁচ নিষ্ফল হল৷ আরও আধঘণ্টা জলের ধারে কাটিয়ে বাংলোর দিকে রওনা হলুম৷

যেখানে রক্ত দেখে গিয়েছিলুন, সেখানে এসে থমকে দাঁড়াতে হল৷ পাথরের ওপরে সেই রক্তের বদলে চাপচাপ সবুজ কী তরল পদার্থ রোদে ঝলমল করছে৷ এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার! রক্তের রঙ বদলানোর কথা নয়৷ তাহলে কি রক্ত নয়, লাল রঙের কোনো তরল পার্থ লেগে ছিল পাথরটাতে?

জিনিসটা পরীক্ষা করতেই হয়৷ ছিপ আর ব্যাগটা রেখে, বাঁ-হাতে ঝোপ থেকে একটা শুকনো কাঠি ভেঙে নিলুম৷ সতর্কতার জন্য রাইফেলটা ডান হাতে রইল৷ কাঠি দিয়ে সবুজ তরলপদার্থটা ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলুম, আঠার মতো চিটচিটে৷

কিন্তু তারপরই দেখি, কাঠিটা দপ করে জ্বলে উঠল৷ সর্বনাশ! এ তাহলে কোনো মারাত্মক অ্যাসিড—নাইট্রিক অ্যাসিড জাতীয়৷ কাঠিটার ডগায় যতটুকু জায়গা সবুজ জিনিসটা লেগেছে, সবটাই পুড়ে গেল৷

আগাগোড়া বড়ো রহস্যময়! মাথামুণ্ডু কিছু খুঁজে পেলুম না৷ জীবনে বিস্তর বনজঙ্গল পাহাড় এবং দুর্গম জায়গায় গেছি৷ কিন্তু স্বীকার করব, রুহা উপত্যকায় যা ঘটল, তার এক ভগ্নাংশও ঘটতে দেখিনি৷

প্রথমত ওই আজব রামধনু, দ্বিতীয়ত শিসের শব্দ৷ তৃতীয়ত, রাতের মর্মান্তিক এক আর্তনাদ৷ চতুর্থত, প্রপাতের মাথায় ঝোপের ভেতর অস্বাভাবিক একটা মুখ৷ পঞ্চমত, এই রঙ-বদলানো অ্যাসিড জাতীয় তরল পদার্থ৷

পরস্পরের মধ্যে আপাতদৃষ্টে সম্পর্কহীন৷ অথচ মনে হচ্ছে, ভেতরে কোথাও একটা সম্পর্ক আছে৷ যা ঘটতে দেখেছি, সবই যেন বিশেষ একটি সূত্র থেকে বিভিন্নভাবে ঘটেছে৷ কিন্তু কী সেই সূত্র?

তা ছাড়া বারো বছর অন্তর নাকি কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ওই আজব রামধনু দেখা যায় রুহা উপত্যকায় এবং বেশ কিছুদিন ধরে এলাকার আদিবাসীরা সন্ত্রস্ত থাকে৷ তাদের কেউ কেউ নিখোঁজ হয়ে যায়৷ তারা একে অপদেবতার আবির্ভাব ভেবে দেবতার কাছে পুজো দেয়৷ মঙ্গলরামের এই হল বিবরণ৷

বাংলোয় ফিরে যখন মঙ্গলরামকে আজকের অভিজ্ঞতার কথা বললুম, তখন সে আরও ভয় পেয়ে গেল৷ বলল, ‘‘হুজুর! আপনার ওপর অপদেওতার নজর পড়েছে মনে হচ্ছে৷ আপনি আর এখানে থাকবেন না৷ আমিও আর এ-বাংলোয় থাকব না ঠিক করেছি৷ আপনার খাতিরে এখনও এখানে আছি৷ আপনি না গেলেও আমি চলে যাব হুজুর! দূরের গ্রামে আত্মীয়-বাড়ি গিয়ে থাকব একটা মাস৷ পরের পূর্ণিমায় অপদেওতা চলে যাবে৷ তখন ফিরে আসব৷’’

মঙ্গলরামকে কিছুতেই নিবৃত্ত করতে পারলুম না৷ আমার খাওয়া হলে সে বাসনকোসন তৈজসপত্র সামলে রেখে চলে গেল৷ বাংলোয় ঘর বলতে একটাই৷ লাগোয়া কিচেন এবং টয়লেট আছে৷ পেছন দিকে আরেকটা ছোট্ট ঘর অছে, যেখানে চৌকিদার থাকে৷ ওখানে একটা ইঁদারা আছে৷ জলটা ভালোই৷ আসলে এটা একটা প্রস্রবণ৷ তাই ইঁদারার একপাশে গর্ত করা আছে৷ সেখান দিয়ে বাড়তি জল ঝরনার মতো বেরুচ্ছে এবং সরু ড্রেন হয়ে টিলার গায়ে এক সুন্দর ফুলবাগিচার ভেতর দিয়ে নিচের জমিতে পড়ছে৷ তাই টিলার নিচে ওদিকটায় ঘন জঙ্গল গজিয়ে রয়েছে৷ শুনেছি, জঙ্গলের ওধারে একটা খাল আছে; সব জল শেষ পর্যন্ত সেই খালে গিয়ে পড়ছে৷

আমার কাছে বাংলোর ডুপ্লিকেট চাবি রইল৷ কিন্তু মঙ্গলরাম না থাকলে খাওয়াদাওয়ার কী ব্যবস্থা করব, জানি না৷ কিচেনে কিছু চা, চিনি, সামান্য কিছু আটা, যৎকিঞ্চিৎ ঘি, মশলাপাতি, গোটাকতক শুঁটকো আলু, আর মাত্র একটা ডিম দেখে হতাশ হলুম৷ আদিবাসীদের বস্তি অনেকটা দূরে৷ সেখান থেকে খাদ্যদ্রব্য যদি বা আনা যায়, বিক্রি করার মতো উদ্বৃত্ত খাদ্য তাদের কি আছে? বড়ো সমস্যায় পড়া গেল! রুহা উপত্যকার রহস্য উদঘাটনের খুব ইচ্ছা৷ কিন্তু পরিস্থিতি প্রতিকূল৷

বিকেলে চুপচাপ বসে থাকতে ইচ্ছে করছিল না৷ ভাবলুম, দেখি যদি কোনো পাখি মারতে পারি, কিংবা দৈবাৎ একটা হরিণ, তাহলে খাদ্যের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া যাবে৷ হরিণের মাংস কীভাবে টাটকা রেখে ক’দিন খাওয়া যায়, সে-প্রক্রিয়া আমার জানা আছে৷ আপাততঃ একটা পাখি পেলে রাতের খাওয়াটা মন্দ জমবে না৷

রাইফেলে পাখি মারারও সমস্যা আছে৷ রাইফেলের গুলিতে পাখির শরীর ঝাঁঝরা হয়ে স্রেফ উবে যাবার চান্স৷ তবে পাখির মাথাটা যদি উড়িয়ে দেওয়া যায়৷ অথবা পায়ের কাছে গুলি করে পাখিকে অজ্ঞান করে দেওয়া যায়৷

এইসব ফন্দি এঁটে পেছনের সেই জঙ্গলে নেমে গেলুম৷ কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! রাতারাতি সব পাখি যেন এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে৷ ঘোরাঘুরি করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলুম৷ সূর্য ডুবে গেছে দূরের পাহাড়ের আড়ালে৷ ইঁদারার একটু নিচে ফুলবাগানে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি, সেই সময় ভিজে মাটির ওপর টাটকা পায়ের ছাপ দেখতে পেলুম৷ ছাপগুলো খালি পায়ের এবং এত স্পষ্ট যে চোখে না পড়ে পারে না৷ চৌকিদারের পায়ের ছাপ নয়, তা জানি৷ কারণ এখান দিয়ে যাবার সময় ছাপগুলো ছিল না আমার তা স্পষ্ট মনে আছে৷ আমি যাওয়ার পর নিশ্চয়ই কোনো আদিবাসী এসেছিল৷

এই ভেবে বরং উৎসাহ পেলুম৷ হন্তদন্ত হয়ে বাংলোর সামনের দিকে এসে লোকটাকে খুঁজলুম৷ কিন্তু কেউ নেই৷ দরজায় তেমনই তালা আটকানো আছে৷ চৌকিদারের ঘরও বন্ধ৷ দরজায় তালা ঝুলছে৷

তাহলে কে এসেছিল?

নিশ্চয়ই কেউ কোনো কারণে এসেছিল৷ কাউকে না দেখে চলে গেছে৷ আমি কিচেনে গিয়ে শুকনো লকড়ি জ্বেলে চা তৈরি করলুম৷ স্বাবলম্বী স্বভাবের জন্য এসব কাজে আমার কোনো অসুবিধা হয়নি৷ বরং ভালোই পারি৷ যেটুকু দুধ আছে, তাতে সকালের চা-ও হয়ে যাবে৷ চিনি কিছুটা কম পড়তে পারে৷ তাতে ক্ষতি নেই৷ লনে চেয়ার পেতে বসে চা খেতে খেতে অন্ধকার ঘনিয়ে এল৷ বারান্দায় লণ্ঠন জ্বেলে রেখেছি৷ কিছুক্ষণ পরে চাঁদ উঠতে দেখলুম৷ উপত্যকায় ঘন কুয়াশা জমেছে৷ শীত শীত করছিল৷ আমার হাতের কাছে রাইফেল রেখেই বসেছিলুম৷ রাইফেলটা কাঁধে নিয়ে সবে উঠে দাঁড়িয়েছি ঘরে যাব বলে, সেই সময় বাংলোর পশ্চিমে টিলার চূড়ায় সেই ফরাসি ভদ্রলোকের কবরের ওখানে কেউ হা-হা করে বিকট হেসে উঠল৷

সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠে রাইফেল তাক করলুম৷ কবরের কাছে একটা ক্ষয়াখর্বুটে গাছ আছে৷ সেই গাছের ওধারে খোলামেলায় আবছা একটা মূর্তি দেখা যাচ্ছিল৷

ট্রিগারে চাপ দিতে গিয়ে মনে পড়ল, রুহাপ্রপাতের ওপর সে অস্বাভাবিক মুখের কথা৷ হাত সরিয়ে নিলুম৷ আমার ধারণা সম্ভবত সঠিক৷ যেভাবেই হোক, এখানে একজন পাগল ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ওই হাসি যে পাগলের, তাতে ভুল নেই৷ একটুর জন্য নরহত্যার পাপ করে বসেছিলুম আর কী!

পা টিপে টিপে বাংলোর গা ঘেঁষে এগিয়ে গেলুম৷ এখানে-ওখানে কিছু পাথর পড়ে রয়েছে৷ পাথরের আড়ালে গুড়ি মেরে, ঢাল বেয়ে চূড়ার দিকে উঠতে শুরু করলুম৷ লোকটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে৷ শেষ পাথরটার কাছে যেই গেছি, সে আমাকে দেখতে পেয়ে হনহন করে ওপাশে এগিয়ে গেল৷ আমি চেঁচিয়ে বললুম, ‘‘না দাঁড়ালে গুলি ছুঁড়ব কিন্তু? যেই হও, তুমি দাঁড়াও—আমি যাচ্ছি৷’’

তাকে ভয় দেখানোর জন্য আকাশ লক্ষ্য করে গুলিও ছুঁড়লুম৷ কিন্তু ওদিকের ঢাল বেয়ে সে দৌড়ে পালিয়ে গেল৷

রাইফেলের গুলির আওয়াজ উপত্যকা পেরিয়ে গিয়ে চারদিকের পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকল৷ আমি সাদা পাথরের কবরটার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ফিরে এলুম৷ পাগলই বটে৷...

এখন রাত প্রায় এগারোটা৷ লন্ঠনের আলোয় বসে আজও সারাদিনের ঘটনার আনুপূর্বিক বিবরণ লিখলুম৷ রুহা উপত্যকার রামধনু-রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে যদি আমার বরাতে কিছু ঘটে, এই বিবরণ কাজে লাগতে পারে তদন্তকারীদের৷

লিখতে ভুলেছি, ঘণ্টা খানেক আগে নিচের উপত্যকায় আবার কাল রাতের মতো সেই অমানুষিক আর্তনাদ শুনেছি৷ এ রাতটা যদি নিরাপদে কাটে, সকালে আবার তদন্ত করতে বেরুব৷...

জয়ন্ত চৌধুরির বিবরণ

অক্টোবর মাসের এক উজ্জ্বল সকালে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ড্রয়িংরুমে তাঁরই নির্দেশে রত্নাকর বিষয়ী নামে এক অচেনা ভদ্রলোকের নোটবইয়ে লেখা এই বিবরণ পড়ে শোনাচ্ছিলুম৷ পড়া শেষ হলে আমার বিজ্ঞ বন্ধু তাঁর ঋষিতুল্য সাদা দাড়িতে অভ্যাসমতো আঙুলের চিরুনি টানতে টানতে অস্ফুটস্বরে শুধু ‘‘হুম’’ কথাটি উচ্চারণ করে চোখ বুজে রইলেন৷

একটু পরে ষষ্ঠিচরণ কফি রেখে গেল৷ কফির পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বললুম, ‘‘এই নোটবই পেলেন কোথায়?’’

কর্নেল যেন ধ্যান ভেঙে সোজা হয়ে বসলেন৷ তারপর কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে বললেন, ‘‘একটু অপেক্ষা করলেই সব জানতে পারবে, ডার্লিং! আপাতত বলো, এই ঘটনা সম্পর্কে তোমার কী ধারণা হল?’’

ঝটপট বললুম, ‘‘স্রেফ গুল৷ কেউ আপনাকে ধাপ্পা দিয়ে রুহা উপত্যকায় নিয়ে যেতে চাইছে৷ আপনার তো শত্রুর শেষ নেই৷ বিশেষ করে মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে সে-বার দুর্জয় সিং নামে সেই শয়তানচূড়ামণিকে যা ঢিট করেছিলেন, এ তারই কোনো ফাঁদ৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘দুর্জয় সিং এখনও জেলে৷ কিন্তু তোমার এই ঘটনাকে গুল মনে হচ্ছে কেন?’’

‘‘বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে৷’’

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে উঠে গিয়ে ঘরের কোনার দিকের টেবিলে কী একটা করলেন৷ ক্লিক আওয়াজ হল৷ তারপর ফিরে এসে বসে বললেন, ‘‘ওটার কথা ভুলেই গিয়েছিলুম৷ আর একটু হলে আগুন ধরে যেত!’’

‘‘কিসে?’’

‘‘রে-ডিটেক্টর যন্ত্রে৷ রুহা উপত্যকা থেকে কুড়িয়ে আনা একটুকরো পাথর নিয়ে পরীক্ষা করছি কাল থেকে—কোনো রশ্মি বেরোয় নাকি৷ পাথরটাতে অবশ্য কার্বনেসিয়াম কমড্রাইট আছে৷ ফ্যাটি অ্যাসিডও আছে৷ কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে, ওটা উল্কা-পাথর৷ কারণ...’

কথায় বাধা পড়ল৷ যষ্টিচরণ এসে বলল, ‘‘কালকের সেই ছেলেটি এয়েছে বাবামশাই৷ ওনাকে নিয়ে আসব এখানে?’’

‘‘ছেলেটি’’ তাকে নিয়ে আসার অপেক্ষা করল না৷ সটান ঘরে ঢুকে মিষ্টি হেসে বলে উঠল, ‘‘কর্নেলদাদু, আমি এসে গেছি!’’

কর্নেল সস্নেহে তাকে সোফায় বসিয়ে তার কাঁধে হাত রাখলেন৷ ‘‘জয়ন্ত, পরিচয় করিয়ে দিই৷ এ হল সুপ্রতিম—নিজেকে বলে প্রীতম৷ আর প্রীতম, তুমি দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার স্পেশাল রিপোর্টার জয়ন্ত চৌধুরিকে দেখতে চেয়েছিলে৷ এই সেই জয়ন্ত৷’’

প্রীতম আমার দিকে তাকাল৷ ওর বয়স বারো-তেরো বছরের বেশি নয়৷ ভারি মিষ্টি চেহারা৷ একটু রোগা গড়ন৷ কিন্তু ওর চেহারায় প্রাণচাঞ্চল্য ঝলমল করছিল৷ অবাক চোখে আমাকে দেখার পর সে কর্নেলের দিকে ঘুরে বলল, ‘‘সত্যি?’’

কর্নেল ওকে আদর করতে করতে বললেন, ‘‘তোমার সন্দেহের কারণ কী?’’

প্রীতম হাসল৷ ‘‘আপনাকে জয়ন্তদা বলব?’’

ওর ভঙ্গি দেখে হাসতে হাসতে বললুম, ‘‘নিশ্চয়ই বলবে৷’’

‘‘আচ্ছা জয়ন্তদা, আপনি কর্নেলদাদুকে ঘুঘুমশাই কেন বলেন? ভ্যাট! ঘুঘু একটা বিশ্রি কথা!’’

‘‘ঠিক আছে৷ আর বলব না৷ কিন্তু তুমি বুঝি কর্নেলের কীর্তিকলাপ পড়ো-টড়ো?’’

‘‘খুব পড়ি৷ এই তো কিছুদিন আগে পড়লুম ‘অলক্ষ্মীর গয়না’৷ দারুণ জমেছিল৷ কিন্তু গয়নাটা কোথায় আছে, শেষ পর্যন্ত আর জানতেই পারলুম না৷ বলুন না জয়ন্তদা, গয়নাটা কোথায় লুকোনো ছিল?’’

কর্নেল আবার তাঁর যন্ত্রটার কাছে ফিরে গেলেন৷ আবার ‘ক্লিক’ করে আওয়াজ হল৷ প্রীতমের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখলুম, উনি একটা নীলরঙের প্লেট তুলে কী দেখছেন৷

প্রীতমকে আমার ভালো লাগছিল৷ ছেলেটি সপ্রতিভ এবং বুদ্ধিমান৷ একথা-ওকথার পর তাকে প্রশ্ন করে জেনে নিলুম, ক্লাস সেভেনের ছাত্র সে৷ এখন ছুটি চলছে পুজোর৷ বাড়িতে আছে তার বাবা মা আর দিদি রমিতা—সে কলেজের ছাত্রী৷ থাকে সুকিয়া স্ট্রিটে৷

প্রীতম বড়ো চঞ্চলও৷ আমার প্রশ্ন এড়িয়ে বারবার কর্নেলের নানা কীর্তিকলাপের কথা তুলছিল৷ টোরা-দ্বীপের ঘোড়ামুখো মানুষ কর্নেল দেখেছেন, আমি কেন দেখিনি, তাই নিয়ে আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল৷ এক ফাঁকে তাকে জিগ্যেস করলুম—আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতো, ‘‘আচ্ছা প্রীতম, রত্নাকর বিষয়ী তোমার কে হন?’’

সঙ্গে-সঙ্গে প্রীতম কেমন মুষড়ে পড়ল৷ আমার দিকে একটু তাকিয়ে থাকার পর আস্তে বলল, ‘‘আমার দাদামশাই৷’’

তাহলে যা ভেবেছিলুম, তা ঠিক৷ বললুম, ‘‘কর্নেলকে এই নোটবইটা তুমিই দিয়েছ তাহলে?’’

প্রীতম বলল, ‘‘হ্যাঁ৷ কাল ওপরের ঘরে একটা পুরোনো বাকসো হাতড়াতে গিয়ে এটা পেয়েছিলুম৷ তারপর বুঝলেন জয়ন্তদা? ছাদে গিয়ে লুকিয়ে সব পড়ে ফেললুম৷ আপনি পড়েছেন জয়ন্তদা?’’

‘‘হুঁ, পড়েছি৷’

‘‘দারুণ অ্যাডভেঞ্চার না?’’

‘‘হ্যাঁ—সাংঘাতিক৷ তা তুমি বুঝি সঙ্গে সঙ্গে কর্নেলের কাছে চলে এলে এটা নিয়ে? ঠিকানা পেলে কোথায়?’’

প্রীতম একটু হাসল৷ ‘‘আমার ছোটোমামা পুলিশ অফিসার যে! আমি কিন্তু ছোটোমামাকে আসল কথাটা বলিনি৷ ছোটোমামা ভাবলেন, আমি কর্নেলের কথা কাগজে পড়েছি৷ তাই জানতে চাইছি৷’’

‘‘তুমি খুব বুদ্ধিমান ছেলে৷ বড়ো হয়ে তুমি কর্নেলের চাইতে বড়ো ঘুঘুমশাই...’’ বলেই আমি জিভ কাটলুম ‘‘সরি’’ বলে৷

প্রীতম খিলখিল করে হেসে উঠল৷ ‘‘তখন আমিও কর্নেলদাদুর মতো আপনাকে ডার্লিং বলব কিন্তু!’’

‘‘ততদিনে আমিও যে কর্নেলের চেয়ে বুড়ো হয়ে যাব! বুড়োমানুষকে তুমি ডার্লিং বলবে কী করে?’’

কর্নেল কাছে এসে বললেন, ‘‘ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না৷ আচ্ছা প্রীতম, তোমার দাদামশাইয়ের বাকসে মোটে এই একটা পাথর পেয়েছ? খুঁজে দেখেছ আর নেই?’’

প্রীতম মাথা দোলাল৷ ‘‘না কর্নেলদাদু! আর তো পাইনি৷’’

কর্নেল বসলেন৷ ষষ্ঠিচরণ প্লেটে প্রীতমের জন্য সন্দেহ রেখে গেল৷ প্রীতম খাওয়ার ব্যাপারে বড্ড লাজুক৷ কর্নেল পীড়াপীড়ি করার পর সে খেল৷ তারপর কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘‘ভূ-বিজ্ঞানী ডক্টর রত্নাকর বিষয়ী প্রীতমের দাদামশাই৷ বুঝলে জয়ন্ত? খুব খামখেয়ালী মানুষ ছিলেন বলে আমার ধারণা৷ প্রীতম ওঁকে দেখেনি৷ কাল রাতে আমি প্রীতমের বাবা স্মরজিৎবাবুকে ফোন করেছিলুম৷ প্রীতমের কথা ওঁকে বলিনি৷’’

একটু হেসে প্রীতমকে আশ্বস্ত করে কর্নেল ফের বললেন, ‘‘যাই হোক৷ স্মরজিৎবাবু শেষ পর্যন্ত খুব উৎসাহ দেখালেন৷ রুহা উপত্যকায় ওঁর শ্বশুরমশাইয়ের নিখোঁজ হয়ে যাওয়াটা এখনও রহস্য হয়ে আছে৷ আমাকে অনুরোধ করলেন, যদি এ ব্যাপারে কিছু করতে পারি৷ অবশ্য ডঃ বিষয়ীকে আর সশরীরে পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না৷ কারণ উনি নিখোঁজ হন ১৯৩২ সালের ৩১ অক্টোবর৷ এটা হল ১৯৮০ সাল৷ আজ ২৮ অক্টোবর৷ আটচল্লিশ বছরের ব্যবধান৷ তখন ডঃ বিষয়ীর বয়স ছিল বেয়াল্লিশ৷ যদিও নব্বই বছর বয়স নিয়েও কোনো-কোনো মানুষ বেঁচে থাকে, এক্ষেত্রে আমরা সে-আশাটা ছেড়েই দিচ্ছি৷’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘উনি নিখোঁজ হলে সরকার থেকে তদন্ত হয়নি?’’

‘‘স্মরজিৎবাবুর স্ত্রী—প্রীতমের মা বললেন, দায়সারা গোছের একটা তদন্ত হয়েছিল৷ তখন রুহা এলাকা খুব দুর্গম৷ তাই ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত চাপা পড়ে যায়৷ পুলিশ রিপোর্ট দিয়েছিল, হিংস্র-জন্তুর কবলে মৃত্যু বলে৷ বাংলোয় ওঁর জিনিসপত্র সব ঠিকঠাক ছিল৷ সেগুলো পুলিশ নিয়ে এসেছিল৷’’

‘‘এই নোটবইটা কেউ পড়েনি?’’

‘‘না পড়ার কারণ নেই৷ কিন্তু ও নিয়ে মাথা ঘামায়নি কেউ৷’’

‘‘ওঁর রাইফেলটা পাওয়া যায়নি?’’

‘‘না৷ বোঝাই যায়, ৩০ অক্টোবর রাতে ডাইরিতে সব লিখে রাখেন৷ তারপর সম্ভবত সকালে আবার উপত্যকায় বেরিয়ে যান৷ তারপর আর ফেরেননি৷’’

‘‘আপনি কি ভাবছেন, এতকাল পরে সেই রহস্য উদ্ধারে নামবেন?’

কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন৷ প্রীতমের মুখে প্রচণ্ড উত্তেজনা লক্ষ্য করলুম৷ সে কর্নেলের দিকে বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে রইল৷ একমিনিট পরে চোখ খুলে কর্নেল বললেন, ‘‘ওটা একটা উল্কা-পাথরই বটে৷ ১৯৫০ সালে কেন্টাকি প্রদেশের মুরে শহরের কাছে একটা প্রকাণ্ড উল্কা-পাথর পড়েছিল৷ ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অস্ট্রেলিয়ার মার্চিসনে একটা উল্কাপাথর পড়ে বিস্ফোরণ ঘটেছিল৷ ১৯৭১ সাল নাগাদ বিজ্ঞানীরা টুকরোগুলো বিশ্লেষণ করে আঠারো রকমের অ্যামিনো অ্যাসিডের সন্ধান পান৷ প্রাণীর শরীরে টিসুর মধ্যে এসব উপাদান আছে৷’’

আমার প্রশ্নটার পুনরাবৃত্তি করলুম, ‘‘যাবেন কি রুহা উপত্যকায়?’’

কর্নেল হাসলেন৷ তারপর হাঁক দিলেন, ‘‘ষষ্ঠী! ষষ্ঠিচরণ!’’

ষষ্ঠিচরণ পর্দা তুলে উঁকি দিয়ে বলল, ‘‘ডাকছেন বাবামশাই?’’

‘‘ওহে ষষ্ঠী! তুমি তো তিথিনক্ষত্রের খোঁজখবর রাখো৷ পূর্ণিমা কবে বলতে পারো?’’

ষষ্ঠিচরণ একগাল হেসে বলল, ‘‘আজ্ঞে আজ অষ্টমী বাবামশাই৷ তাহলে পুন্নিমে হচ্ছে গে... নওমী, দশুমী, একাদশী, দাওদশী, তেরোদশী...’’

সে আঙুল গুনে হিসেব করছিল৷ কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘বুঝেছি৷’’ তারপর কিছুক্ষণ পায়চারি করার পর আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘‘বারো বছর অন্তর রুহা উপত্যকায় কার্তিক মাসের পূর্ণিমায় আজব রামধনু দেখা যায়৷ ১৯৩২ সালে ডঃ বিষয়ী দেখেছিলেন৷ আটচল্লিশ বছর পরে তাহলে সামনের পূর্ণিমায় আবার দেখা যাবে৷ জয়ন্ত, আমরা আগামীকাল রওনা হতে চাই৷’’

প্রীতম চোখ পিটপিট করে বলল, ‘‘আমিও যাব, কর্নেলদাদু!’’

কর্নেল তার কাঁধে মৃদু থাপ্পড় মেরে কোনার দিকের টেবিলটার কাছে গেলেন৷ আবার ‘ক্লিক’ করে আওয়াজ হল৷ ঝুঁকে বসে রইলেন সেখানে৷

প্রীতম মুখে কাকুতি ফুটিয়ে বলল, ‘‘জয়ন্তদা, আমি যাব না?’’

হাসতে হাসতে বললুম, ‘‘পাগল! তুমি এতটুকু ছেলে! ছাপা হরফে কর্নেলের অ্যাডভেঞ্চার পড়েছ৷ ভাবছ, না জানি কী মজার ব্যাপার!’’

প্রীতম আমার হাত খিমচে ধরে বলল, ‘‘আমি কখনও রায়পুরে দাদামশাইয়ের বাড়িতে যাইনি বুঝি?’’

‘‘আহা! রায়পুর থেকে রুহা বহুদূরে যে৷ খুব দুর্গম জায়গা৷’’

‘‘হোক! আমি যাব৷’’ বলে সে আমার হাতে আরও জোরে খিমচি কাটতে থাকল৷

ছাড়িয়ে নিয়ে বললুম, ‘‘আচ্ছা, আচ্ছা! সে হবে’খন৷ কিন্তু আমার হাতের কী অবস্থা করেছ দেখো তো দস্যি ছেলে!’’

প্রীতম বলল, ‘‘যাব বলেছি, যাব৷’’ ক্ষোভে তার দু’চোখে জলের ফোঁটা দেখে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম৷

অভিশপ্ত উপত্যকা

রায়পুরে ডঃ বিষয়ীর বাংলো-বাড়িটা খালি পড়ে আছে৷ বছরে একবার করে স্মরজিৎবাবু সপরিবারে সেখানে যান৷ বাড়িটা দেখাশোনার জন্য বলভদ্র সিং নামে তাগড়াই চেহারার একজন কেয়ারটেকার আছে৷ আমাদের কোনো অসুবিধে হল না৷ কলকাতা থেকে টেলিগ্রাম করে তাকে আমাদের যাওয়ার কথা স্মরজিৎবাবু জানিয়েছিলেন৷

কিন্তু রুহা যাব শুনে সে অবাক হয়ে বলল, ‘‘শুনেছি সে বড়ো ভয়ানক জায়গা স্যার! তা ছাড়া কর্ণগড়ের পর আর রাস্তাঘাট নেই৷ পায়ে হেঁটে যেতে হবে৷ পাহাড় আর জঙ্গল শুধু৷’

কর্নেল বললেন, ‘রুহা কেউ যায় না বুঝি?’’

‘‘না স্যার৷ ওখানে শুনেছি খুব ভূতের উপদ্রব৷’’

‘‘কেন? রুহা জলপ্রপাত দেখতে যায় না কেউ?’’

বলভদ্র গম্ভীর হয়ে বলল, ‘‘বাবার কাছে শুনেছি, একটা জলপ্রপাত ছিল বটে৷ কিন্তু ভূতেরা সেটা নষ্ট করে দিয়েছে৷ একেবারে নাকি শুখা হয়ে গেছে৷ রুহা নদী ভয় পেয়ে অন্যদিকে ঘুরে গিয়ে বইছে৷ রুহা খুব খারাপ জায়গা স্যার! ওখানে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না৷ এ বাড়ির মালিক ছিলেন যিনি, তাঁর কথা কি শোনেননি স্যার?’’

বুঝলুম, লোকটি দেখতে তাগড়াই হলে কী হবে৷ ভীষণ ভীতু আর সরল৷ রাজ্যের ভূত ওর মগজে ঢুকে বসে আছে৷

কর্নেল বললেন, ‘‘তুমি বিশ্রাম করো জয়ন্ত৷ আমি একটু ঘুরে আসি৷’’

কর্নেল বেরিয়ে গেলেন৷ আমি বলভদ্রের সঙ্গে গল্প করতে থাকলুম৷ বলভদ্র রুহা উপত্যকার ভূতপ্রেতের অনেক তাজ্জব ঘটনা শুনিয়ে বলল, ‘‘ওখানে সরকারী লোকেরা সে-বার খনির খোঁজে গিয়েছিল৷ তিনটে রাত কোনোক্রমে কাটিয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসে তারা৷ রুহা যাবেন না স্যার৷ তা ছাড়া ওখানে গিয়ে থাকবেন কোথায়?’’

বললুম, ‘‘কেন! ফরেস্টবাংলো আছে শুনেছি৷’’

বলভদ্র হতাশভাবে মাথা দুলিয়ে বলল, ‘‘সে-বাংলোয় কেউ যায় না৷ ফরেস্ট দফতরে আমার মাসতুতো ভাই গণেশরাম চাকরি করে৷ বলেন তো, তাকে ডেকে আনছি৷ তার মুখেই সব শুনবেন৷’’

‘‘রুহা এলাকায় তো আদিবাসীরা আছে৷ তারা ভয় পায় না?’’

‘‘গণেশরামের কাছে শুনেছি, রুহা তল্লাটে চারদিকে দশ মাইলের মধ্যে কেউ বাস করে না৷ না রে আগের জমানায় ওখানে বস্তি করেছিল, সবাই দূরে গিয়ে ফের বস্তি করেছে৷ আমার বয়স কম-সে কম তিরিশ-বত্রিশ হল স্যার৷ রুহায় কেউ বাস করে বলে শুনিনি৷ আমার বাবার আমলে লোকেরা রুহা ছেড়ে চলে গেছে৷’’

কর্নেল ফিরে এসে যা বললেন, তাতে বুঝতে পারলুম, লোকটা ততকিছু মিথ্যা বলেনি—ভূতের কথা অবশ্য আলাদা৷

কর্নেলের চেনাজানা লোক এবং বন্ধুবান্ধব সর্বত্র৷ ফরেস্ট দফতরের কর্তা রঘুবীর শর্মার কাছে গিয়ে রুহা উপত্যকার খবর নিয়েছেন৷ পুরোনো আমলের বাংলোটা আছে এবং একজন চৌকিদারও বহাল রয়েছে৷ তবে সে থাকে কর্ণগড়ে৷ ফরেস্ট অফিসাররা দৈবাৎ কেউ রুহা গেলে কর্ণগড় থেকে তাকে ডেকে নিয়ে যান৷ কর্ণগড় থেকে সঙ্গে করে খাবার-দাবার নিয়ে যেতে হয়৷ কেউ কিন্তু বাংলোয় রাত কাটানোর ভরসা পান না৷

আমাদের ভরসার কথা, রঘুবীর শর্মা একটা জিপগাড়ি দিতে চেয়েছেন৷ কর্ণগড় থেকে রাস্তা দুর্গম৷ কিন্তু জিপে করে পৌঁছানো যায়, যদিও পদে পদে দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার চান্স প্রবল৷ জিপটা আমাদের পৌঁছে দিয়ে চলে আসবে৷

এ-কথা শুনে একটু হতাশ হয়ে বললুম, ‘‘ফিরব কী-ভাবে তাহলে?’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘ডার্লিং! মানুষ দ্বিপদ প্রাণী৷ এই দুটো পা দিয়ে অনেক পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে প্রাচীন যুগের অভিযাত্রীরা সারা পৃথিবী ঘুরেছেন৷ আমরা পায়ে হেঁটেই রুহা যেতুম৷ নেহাত মিঃ শর্মা জিপ দিতে চাইলেন৷ না নিলে দুঃখিত হতেন৷ তাই ওঁর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারলুম না৷ তা ছাড়া ভেবে দেখলুম, সঙ্গে অন্তত এক সপ্তাহের মতো খাবার-দাবার নিয়ে যাওয়া দরকার৷’’

‘‘চৌকিদার আমাদের সঙ্গে এতদিন থাকতে চাইবে তো?’’

‘‘দেখা থাক৷’’ কর্নেল অন্যমনস্কভাবে জবাব দিলেন৷ একটু পরে ফের মুচকি হেসে বললেন, ‘‘তুমি কি ভাবছ, আমি রাঁধুনি হিসেবে আনাড়ি? কেন ডার্লিং? সে-বার নেপালে ডমরুনাথ পাহাড়ের বাংলোয় তোমাকে রান্না করে খাওয়াইনি?’’

পরদিন সকালে ফরেস্ট দফতরের জিপে আমরা কর্ণগড় রওনা হলুম৷ কর্ণগড়ে পৌঁছে চৌকিদারের খোঁজ করলুম৷ লোকটা বলভদ্রের চেয়েও ভিতু আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন৷ বাংলোর চাবি দিয়ে বউয়ের অসুখ বলে কেটে পড়ল৷ ড্রাইভার কুঞ্জলাল হাসতে হাসতে বলল, ‘‘মুকুন্দ দিনদুপুরে ভূত দেখে অজ্ঞান হয়ে যায় স্যার৷ গত মাসে শর্মাসায়েব রুহা গিয়ে মুকুন্দের অবস্থা দেখে সেদিনই ফিরে এসেছিলেন৷’’

কুঞ্জলাল সাহসী ও পরিশ্রমী লোক৷ কর্ণগড় বাজার থেকে এক সপ্তাহের উপযোগী খাদ্যদ্রব্য, এমনকী এক টিন কেরোসিন, দু’টো হ্যারিকেন এবং একটা স্টোভ কেনা হল তার সাহায্যে৷ আয়োজন দেখে আমি অবাক৷ এতকাল কর্নেলের সঙ্গে কত বেহদ্দ জায়গায় গেছি৷ সাংঘাতিক অ্যাডভেঞ্চারে গিয়ে প্রাণ নিয়ে টানাটানি হয়েছে কতবার৷ কিন্তু খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে কখনও এমন এলাহি আয়োজন করতে হয়নি৷ এ যেন মঙ্গল গ্রহে পাড়ি দেওয়ার আয়োজন!

জিপের পেছনে জিনিসপত্র বোঝাই করে কুঞ্জলাল কী যেন ভাবতে লাগল৷ তারপর হঠাং ‘‘আসছি’’ বলে চলে গেল৷ কর্নেল ওর তারিফ করে বললেন, ‘‘কুঞ্জলাল আমাদের সঙ্গে থাকলে খুব ভালো হত৷ ওর তাই ইচ্ছেও ছিল৷ কিন্তু উপায় নেই৷ ওকে আজই ফিরে আসতে হবে৷ শর্মাসায়েব কাল ভোরে বস্তার এলাকার জঙ্গলে যাবেন৷ সেখানকার আদিবাসীদের সঙ্গে বন-দপ্তরের লোকেদের গণ্ডগোল চলছে৷’’

কুঞ্জলাল শিগগির ফিরে এল৷ ওর সঙ্গে একটা লোকের মাথায় একটা বোঁচকা৷ বোঁচকাটা জিপের ভেতর তুলে দিয়ে সে বলল, ‘‘তাঁবু স্যার৷ আমার দাদা রঙ্গলালের কাঠগোলা আছে এখানে৷ জঙ্গলে কাঠ কাটা হয় যখন, তখন দাদাকে তাঁবু করে থাকতে হয়৷ রুহা বাংলোয় যদি অসুবিধা হয় আপনাদের, খালের ধারে তাঁবু করে থাকতে পারবেন৷ খালের জলটা খুব পরিষ্কার৷ বাংলোর পেছনে দেখবেন ইঁদারার ভেতর থেকে ঝরনার জল বেরুচ্ছে৷ সেই জল গিয়ে খালে পড়েছে৷’’

ডঃ বিষয়ীর নোটবইতে এই ঝরনা বা প্রস্রবণের কথা আছে৷ হাসতে হাসতে বললুম, ‘‘খাবার ফুরিয়ে গেলেও অসুবিধে নেই৷ স্রেফ বিশুদ্ধ জল খেয়ে কাটানো যাবে৷’’

কুঞ্জলাল ঘড়ি দেখে তাগিদ দিল৷ ‘‘বারোটা বাজে প্রায়৷ যা খচ্চর রাস্তা, পনেরো মাইল যেতে তিন-চার ঘণ্টা লেগে যাবে৷ আবার আমাকে ফিরতে হবে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে৷ উঠে পড়ুন স্যার৷’’

প্রথমে মাইল তিনেক কাঁচা সংকীর্ণ রাস্তা৷ তারপর জঙ্গল যত ঘন হল, তত রাস্তার চিহ্ন উধাও হতে থাকল৷ তার ওপর পাহাড়ি এলাকা৷ বারবার জিপ থামিয়ে পাথর সরিয়ে তবে এগোনো যাচ্ছিল৷ কোথাও আদিবাসীরা গাছ কেটে ডালপালা ফেলে রেখেছে৷ সেগুলো না সরিয়ে যাবার উপায় নেই৷

একখানে ছোট্ট একটা নদী পড়ল৷ নদীর বুকে সোনালি আর পাথরের ফাঁকে ঝিরঝির করে একফালি স্রোত বয়ে যাচ্ছে৷ কর্নেল ঝুঁকে আছেন৷ চোখে বাইনোকুলার৷ মাঝে-মাঝে আপনমনে কী যেন আওড়াচ্ছেন৷ নিশ্চয়ই কোনো পাখির বৈজ্ঞানিক নাম৷ কখনও বাচ্চা ছেলের মতো চেচিয়ে উঠছেন, ‘‘অপূর্ব! দারুণ!’’ কী দেখছেন কে জানে৷

এরপর সত্যিকার দুর্গমতা শুরু হল৷ রাস্তা বলতে কিছু নজরে পড়ছিল না৷ একধারে গভীর খাদ, অন্যধারে খাড়া পাথরের দেয়াল৷ সংকীর্ণ যেটুকু জায়গা আছে, তাতে খালি পাথর আর পাথর! কুঞ্জলাল শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরে আছে৷ চোয়াল আঁটো হয়ে গেছে তার৷ লড়াই করার ভঙ্গিতে সেইসব পাথরের ওপর দিয়ে যেভাবে জিপটাকে নিয়ে যাচ্ছে, মনে হল এ যেন সার্কাসের বিপজ্জনক একটা খেলা!

পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামবার পর সে মুখের ঘাম মুছে বলল, ‘‘যাক গে৷ সবচেয়ে কঠিন জায়গাটা পেরুনো গেল৷ এবার আর তত অসুবিধে হবে না৷’’

আবার গভীর জঙ্গল শুরু হল৷ একখানে হাতির পালের সদ্যভাঙা ডালপালা চোখে পড়ল৷ কুঞ্জলাল বলল, ‘‘রাইফেল রেডি রাখুন স্যার৷ দরকার হলে আওয়াজ করে হাতির পাল-কে ভয় দেখাতে হবে৷ নইলে বিপদ৷’’

পেছন থেকে রাইফেলটা বের করে গুলি ভরে তৈরি থাকলুম৷ কিন্তু হাতির পাল আমাদের সামনে এল না৷ জিপের শব্দ ছাপিয়ে জঙ্গলের ভেতর তাদের হাঁকডাক কানে আসছিল৷ মড়মড় শব্দে ডাল ভাঙছিল তারা৷ কর্নেল বললেন, ‘‘ওদের দিক থেকে বাতাস বইছে৷ তাই আমাদের গন্ধ পাচ্ছে না৷ হাতির ঘ্রাণশক্তি খুব প্রখর৷’’

বললুম, ‘‘এসব জঙ্গলে বাঘ নেই?’’

কুঞ্জলাল বলল, ‘‘কী বলছেন স্যার! এখানকার জঙ্গলে দুনিয়ার সেরা জাতের বাঘ আছে৷’’

‘‘আমাদের সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গলের চেয়েও?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘জয়ন্ত! রেওয়ার জঙ্গলে সাদা বাঘ আছে জানো তো? আলিপুর চিড়িয়াখানায় সেই সাদা বাঘ নিশ্চয়ই দেখেছ৷ রেওয়ার মহারাজা উপহার দিয়েছিলেন৷ রেওয়া এখান থেকে বেশি দূরে নয়৷’’

কুঞ্জলাল গম্ভীর হয়ে বলল, ‘‘কালো বাঘও আছে স্যার৷ এই জঙ্গলে আছে৷ আমি নিজের চোখে দেখেছি৷’’

আমরা দু’জনেই অবাক হলুম ওর কথা শুনে৷ কর্নেল বললেন, ‘‘যেটা দেখেছিলে, সেটা ভালুক নয়তো কুঞ্জলাল!’’

কুঞ্জলাল বলল, ‘‘না স্যার! ভালুক আমি চিনি না? দশ বছর জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করছি৷’’

ওকে আমরা ঘাঁটালুম না৷ এই দুর্গম রাস্তায় দৈবাৎ তার হাতের স্টিয়ারিং একটু এদিকওদিক হলে আর রক্ষা থাকবে না৷ ওর কালো বাঘ দেখার গল্পটা উপভোগ করলুম বরং৷ জঙ্গল ফুরিয়ে এল৷ তারপর চোখে পড়ল এক বিস্তীর্ণ খোলামেলা এলাকা৷ দূরে ধোঁয়ার মতো উচু পাহাড় তিনদিক ঘিরে৷ প্রান্তর বলার চেয়ে মরুভূমি বলাই উচিত৷ রুক্ষ মাটির ওপর ছোটো-বড়ো অসংখ্য পাথর ছড়িয়ে রয়েছে৷ মাঝে মাঝে ন্যাড়া কালো শিলা মন্দির বা গির্জার মতো দাঁড়িয়ে আছে৷ কুঞ্জলাল বলল, ‘‘রুহা এসে গেলুম স্যার!’’

কর্নেল অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলেন৷ বললেন, ‘এ যে দেখছি অবিকল অ্যামেরিকার আরিজোনা অঞ্চলের মতো৷ ভারতে এমন জায়গা থাকতে পারে ভাবিনি৷’

কোন প্রাগৈতিহাসিক যুগে যেন দেব-দানবরা এখানে পাথর নিয়ে যুদ্ধ করেছিল৷ ঝোপজঙ্গল বলতে কিছুই চোখে পড়ছিল না৷ কদাচিৎ দু’একটা ক্ষয়াখর্বটে গাছ পাথরের ফাঁকে মাথা তুলেছে৷ কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে খুঁটিয়ে দেখছিলেন৷ মোটামুটি সমতল মাঠের ওপর দিয়ে ধুলো উড়িয়ে আমাদের জিপটা এবার দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল৷

আমাদের ডানদিকে যেখানে রুহা উপত্যকা শেষ হয়েছে, সেখানে ঘন জঙ্গল ক্রমশ পাহাড়ের দিকে উঠে গেছে৷ সবুজ ওড়নার মতো পাহাড়কে ঢেকে রেখেছে৷ সেখানে একটা টিলার গায়ে জরাজীর্ণ একটা বাড়ি দেখিয়ে কুঞ্জলাল বলল, ‘‘ওই সেই বাংলো স্যার৷’’

টিলার উত্তরদিকটা খুবই ঢালু৷ জিপ স্বচ্ছন্দে বাংলোর সামনে পৌঁছে গেল৷ পাথরের ইঁদারাটা দেখতে পেলুম৷ ইঁদারার পাঁচিলের একখানে চওড়া গর্ত৷ সেখান থেকে জল বেরিয়ে যাছে৷ পাথরে বাঁধানো ড্রেন বেয়ে নিচে গিয়ে পড়ছে৷ সেখানে একটা ডোবা হয়ে গেছে৷ এই ডোবাটার কথা ডঃ বিষয়ীর বর্ণনায় নেই৷ তার মানে এটা পরবর্তী সময়ে হয়েছে৷

বাংলোটা পাথরের ইট দিয়ে তৈরি৷ দেখতে অনেকটা ছোট্ট দুর্গের মতো৷ দেখে কেমন গা ছমছম করছিল৷ পোড়ো বাংলো তো একেই বলে৷

কুঞ্জলাল কাজের লোক৷ আধঘন্টার মধ্যে বাংলোর একমাত্র ঘরটাকে সাফ করে ফেলল৷ কিচেন এবং বাথরুমও ধুয়ে দিল ইঁদারার জল এনে৷ তারপর জিনিসপত্র সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়ে বলল, ‘‘চারটে বাজতে চলল৷ এবার তাহলে আসি স্যার৷’’

ওকে চা এবং কিছু স্ন্যাকস না খাইয়ে ছাড়লেন না কর্নেল৷ স্টোভ জ্বেলে নিজেই চা করে ফেললেন৷ কুঞ্জলাল খাবার আগে বলে গেল, সে দৈবাৎ ওদিকের জঙ্গলে এলে খোঁজখবর নিয়ে যাবে৷ টিলার ঢাল বেয়ে ওর জিপটা যতদূর গেল, তাকিয়ে রইলুম৷ তারপর মনে হল, সভ্যতার সঙ্গে যোগাযোগটুকু এতক্ষণে হারিয়ে গেল৷ ঘরে ঢুকে দেখলুম, লোহার খাটটা মরচে ধরে ভেঙে পড়েছে৷ কাজেই মেঝেয় বিছানা করতে হবে আমাদের৷ মেঝে পাথরের এবং কোথাও ফাটল ধরেনি৷ চেয়ার টেবিলগুলো নড়বড়ে৷ দু’জনে এইসব গেরস্থালি গুছিয়ে নিলুম৷ তারপর লনে গিয়ে চেয়ার পেতে বসলুম৷ কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে বিস্তীর্ণ উপত্যকা দেখতে থাকলেন৷

লনের অবস্থা অবশ্য শোচনীয়৷ ঘাস আর আগাছায় ভর্তি৷ কালই সব সাফ করে ফেলতে হবে৷ সাপ আছে কিনা কে জানে!

কর্নেল কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন, ‘‘আশ্চর্য জয়ন্ত! এমন নিষ্প্রাণ জায়গা কোথাও দেখা যায় না৷ ক্রমশ যেন রুহা উপত্যকা থেকে সজীব যা কিছু, সবই নিঃশেষ হতে চলেছে৷ একটা পাখি দূরের কথা, পোকামাকড়ও যেন নেই৷ ডঃ বিষয়ী যা লিখেছেন, এ যে দেখছি তার চেয়েও রহস্যময়৷’’

‘‘কী রহস্যময়?’’

‘‘কেন রুহা উপত্যকা থেকে ক্রমশ প্রাণের চিহ্ন মুছে যাচ্ছে?’’

বেলা পড়ে এসেছে৷ বাংলোর পেছনের দিকে নিচের জঙ্গলে পাখির ডাক শুনতে কান পাতলুম৷ কিন্তু সব কেমন চুপচাপ৷ বললুম, ‘‘সত্যি বলেছেন৷ এ যেন একটা অভিশপ্ত জায়গা৷’’

এই টিলাটা উপত্যকার উত্তরদিকের শেষ প্রান্তে৷ তাই আমাদের সামনে দক্ষিণ পশ্চিম ও পূর্বদিকে সারা উপত্যকা চোখে পড়ছিল৷ খালি পাথর আর পাথর, কোথাও রুক্ষ অনুর্বর মাটি, যেন এক কবরখানা৷ কর্নেল আবার বাইনোকুলারে চোখ রেখে দেখতে দেখতে বললেন, ‘‘মনে হচ্ছে ওটাই সেই পিরামিড গড়নের পাথর৷ পাথরটা কালো রঙের৷ ব্যাসল্ট রক সম্ভবত৷ আশেপাশে প্রচুর রঙীন পাথর দেখতে পাচ্ছি৷ কোনো-কোনোটার গড়ন আদিম মানুষের তৈরি বর্শার মতো৷ জয়ন্ত, রুহা উপত্যকার সঙ্গে চাঁদের ভূপ্রকৃতির কিছুটা মিল আছে যেন৷ আরে! ওটা আবার কী?’’

চমকে উঠে বললুম, ‘‘কী?’’

‘‘হয়তো চোখের ভুল৷’’

অধীর হয়ে বললুম, ‘‘আহা! দেখলেন কী তাই বলুন?’’

কর্নেল এগিয়ে গিয়ে আরও ভালো করে দেখতে দেখতে বললেন, ‘‘কে যেন একটা পাথরের ওপর শুয়ে আছে৷ নাকি ওটাও একটা পাথর?’’ তারপর বাইনোকুলার রেখে হাসতে হাসতে ফিরে এলেন৷ ‘‘ডার্লিং! আমাদের সাবধান হওয়া দরকার৷ কারণ এই অভিশপ্ত উপত্যকায় হয়তো এবার আমরা সত্যি ভূত দেখতে শুরু করব৷’’

সূর্য দূরের বিশাল পাহাড়ের নিচে চলে গেলে উপত্যকায় কুয়াশা জমতে থাকল৷ কিছুক্ষণের মধ্যে একাদশীর চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ল৷ জ্যোৎস্নায় আর কুয়াশায় রহস্যময় হয়ে উঠল রুহা উপত্যকা৷ কর্নেল উঠে বললেন, ‘‘লণ্ঠন জ্বালানো উচিত এবার৷ চলো জয়ন্ত, লণ্ঠন জ্বেলে রাতের রান্নায় মন দেওয়া যাক৷’’

সবুজ গিরগিটি

একে তো নতুন জায়গায় আমার ভালো ঘুম হয় না৷ তাতে এমন এক অভিশপ্ত জায়গার পোড়ো বাংলো! আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুর কথা আলাদা৷ উনি যেখানে-সেখানে শুয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে পারেন৷ গুলিভরা রাইফেল আর টর্চ পাশে রেখে শুয়ে ছিলুম৷ রুহা অভিশপ্ত হোক, এই একটা ব্যাপারে রুহার প্রশংসা করা যায়, এখানে মশার বালাই নেই৷ কর্নেল শোয়ার সময় রসিকতা করে বলছিলেন, ‘‘রুহার অপদেবতা মশা-মাছির নিকেশ করেছে, এ জন্য তার পুজো দেওয়া উচিত, ডার্লিং! মশারি খাটানোর ঝক্কি পোহাতে হবে বলে মনে হচ্ছে না৷’’

শুয়ে সেই কথাটাই ভাবছিলুম৷ কী সাংঘাতিক সেই রহস্য যে এখানে মশাও ঘেঁষতে পারে না! মশাও যাকে ভয় পায়, সে কে? জানালাগুলো সতর্কতার জন্য বন্ধ করে দিতে হয়েছে৷ কিন্তু বাইরে থেকে কেউ ঠেললেই ভেঙে পড়বে এমন অবস্থা৷ বনদফতর এই বাংলোটাকে কবে খরচের খাতায় ফেলে দিয়েছে সম্ভবত৷ মেরামতের কোনো চিহ্ন চোখে পড়ল না৷ নেহাত খেয়ালে কোনো কর্তাব্যক্তি এসে কিছুক্ষণ থেকে যান৷ রাত কাটানোর ভরসা পান না৷ তাই এমন অবহেলা৷

কখন একটু তন্দ্রার ঘোর এসেছিল, হঠাৎ কী একটা শব্দে সেটা কেটে গেল৷ কিচেনের ভেতর খসখস শব্দ হচ্ছে যেন৷ সঙ্গে সঙ্গে টর্চ আর রাইফেল নিয়ে উঠে বসলুম৷ অমনি শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল৷

ভুল শুনেছি ভেবে আবার শুয়ে পড়লুম৷ কিন্তু মিনিট দু-তিন পরে আবার সেই শব্দ৷ কর্নেলের নাক সমানে ডাকছে৷ একবার ভাবলুম, ওঁকে ডাকি৷ কিন্তু এই সামান্য ব্যাপারের জন্য ওঁর ঘুম ভাঙিয়ে নিজের ভয় পাওয়াটা জানিয়ে দেওয়ার মানে হয় না৷ পা টিপেটিপে এগিয়ে কিচেনের দরজা খুলেই টর্চের স্যুইচ টিপলুম৷

অমনি চোখে পড়ল, কিচেনের ওপাশের জানলার একটা পাট খোলা এবং সেই খোলা জায়গা দিয়ে একটা হাত—শুধু একটা লিকলিকে হাত সাঁৎ করে বেরিয়ে গেল৷

তার চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, হাতটা সবুজ৷ গাঢ় ঝকমকে সবুজ৷

চোখের ভুল হতেই পারে না৷ টর্চের আলো উজ্জ্বল এবং জানালাটা মাত্র হাত পাঁচেক দূরে৷

হাতটা মানুষের হতে পারে না৷ কারণ মানুষের গায়ের রঙ সবুজ হবে কেন? আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেছি৷ তারপর কর্নেলের ডাকে সম্বিৎ ফিরল৷ ‘‘কী হয়েছে, জয়ন্ত?’’

দম আটকানো গলায় বললুম, ‘‘অসম্ভব কর্নেল! একটা সবুজ হাত!’’

কর্নেল বিছানা থেকে উঠে এলেন৷ ‘‘সবুজ হাত! কোথায় দেখলে?’’

‘‘এই জানালায়৷’’

কর্নেল জানালা খুলে উঁকি দিয়ে বললেন, ‘‘ভুল দেখোনি তো?’’

‘‘অসম্ভব! স্পষ্ট দেখেছি৷ খসখস শব্দ শুনে এসে দেখি...’’

কর্নেল আমার কথায় বাধা দিয়ে বললেন, ‘‘হুঁ, এই দেখো চোরের কীর্তি৷ পাঁউরুটি চুরি করতে চাইছিল৷ জানালার কাছে এগুলো রাখা ঠিক হয়নি৷’’

পাঁউরুটিগুলো কিটব্যাগের ভেতর রাখা আছে৷ কিটব্যাগটার একটা দিক চিরে ফেলেছে সবুজ হাতওয়ালা চোর চূড়ামণি৷ কিটব্যাগটা নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে রেখে জানালাটা ভালো করে আটকে দিলেন কর্নেল৷ তারপর নিজের টর্চ নিয়ে বেরুলেন৷

বাংলোর চারপাশ ঘুরে এসে বললেন, ‘‘সবুজ হাত হোক—আর নাই হোক, ইঁদারার কাছে ভিজে ঘাসের ওপর তার পায়ের ছাপ দেখলুম! সুতরাং এই চোরমশাই মানুষ৷ কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ৷ শুয়ে পড়ো ডার্লিং! এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই৷’’

আমার আর ঘুম এলই না৷ কর্নেল আবার অভ্যাসমতো নাক ডাকিয়ে অবাধে ঘুমোতে থাকলেন৷ আমি কান পেতে পড়ে রইলুম৷

কতক্ষণ এভাবে কেটে গেল৷ তারপর আবার কানে এল, কিচেনের জানালায় মচমচ শব্দ হচ্ছে৷ মরিয়া হয়ে উঠে পড়লুম৷ এবারে ঘরের দরজা নিঃশব্দে খুলে বারান্দায় গেলুম৷ তারপর বারান্দার শেষপ্রান্তে গিয়ে পেছনদিকে উঁকি মেরে দেখি, জ্যোৎস্নায় আবছা কালো এক মূর্তি কিচেনের জানালা ভাঙার চেষ্টা করছে৷

টর্চ জ্বেলে চেঁচিয়ে উঠলুম, ‘‘তবে রে ব্যাটা!’’

মূর্তিটা থমকে দাঁড়িয়ে গেল৷ আমিও দাঁড়িয়ে গেলুম তাকে দেখে৷ কারণ যাকে মানুষ ভেবেছিলুম, সে আদৌ মানুষ নয়৷ মানুষের সমান গড়নের একটা সবুজ গিরগিটি জাতীয় প্রাণী৷ সে মানুষের মতো দু’পায়ে দাঁড়াতে পারে৷ লেজও আছে৷ এক মুহূর্তে মাত্র৷ তারপর রাইফেল তুলে তাক করলুম৷

কিন্তু গুলি ছোঁড়ার সুযোগ পেলুম না৷ আজব গিরগিটিটা বিদ্যুতের মতো মিলিয়ে গেল চোখের সামনে থেকে৷ তারপর ঘর থেকে কর্নেলের আওয়াজ এল—‘‘জয়ন্ত! জয়ন্ত!’’

দৌড়ে গিয়ে ব্যাপারটা বললুম৷ কর্নেল বললেন, ‘‘ঠিক আছে৷ ভূত যখন নয়, তখন আর তোমার দুর্ভাবনার কারণ নেই৷ শুয়ে পড়ো৷ সকালে গিরগিটিটার খোঁজে বেরিয়ে পড়া যাবে৷’’

‘‘কিন্তু কর্নেল, গিরগিটিটার চোখ দুটো যেন অবিকল মানুষের মতো!’’

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘এ ধরনের গিরগিটি দক্ষিণ আমেরিকার রুক্ষ এলাকায় প্রচুর দেখা যায়৷ ভারতেও আছে দেখা যাচ্ছে এবং সে-আবিষ্কারের গৌরব তোমারই রইল৷ নাও, শুয়ে পড়ো৷’’

কর্নেলের পরিহাসে আমার অস্বস্তি ঘুচল না৷ সারাটা রাত যেভাবে কাটল, বলার নয়৷ তবে সেই বীভৎস প্রাণীটি আর জালাতে আসেনি৷ নিশ্চয়ই ভয় পেয়েছে সে৷

বিস্ময়কর আগন্তুক

সকালে কর্নেল ইঁদারার কাছে ভিজে ঘাসের ওপর পায়ের ছাপগুলো ভালো করে পরীক্ষা করে বললেন, ‘‘রাতে এগুলো মানুষের পায়ের ছাপ বলে ভুল করেছিলুম৷ কিন্তু দেখো জয়ন্ত, গিরগিটি জাতীয় প্রাণীর পক্ষে মানুষের মতো দু’পায়ে হাঁটা দেখে অবাক লাগছে৷ প্রাগৈতিহাসিক যুগে ডাইনোসররা ছিল এদেরই পূর্বপুরুষ৷ তারা অনেকসময় দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারত৷ আমাদের এই রুটিচোর না হয় তাদের একটি ক্ষুদে সংস্করণ হয়ে দু’পায়ে আনাগোনা করে; কিন্তু সে মানুষের মতো দুটো হাত ব্যবহার করতে পারে৷ এটাই আশ্চর্য!’’

বাংলোর পশ্চিমে ঢালু হয়ে উঠে গেছে টিলা৷ চূড়ার ওপর গিয়ে সেই ফরাসি সায়েবের কবর দেখলুম আমরা৷ ফলকটা ভেঙেচুরে গেছে৷ কষ্ট করে পড়া গেল নামটা৷ ফ্রেমেতে জোরা৷ জন্ম ১৮৩০ খ্রিঃ মৃত্যু ১৮৯০ খ্রিঃ৷ কবর থেকে কয়েকগজ দূরে একটা শুকনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে৷ গাছটার দিকে তাকিয়ে চোখে পড়ল, গুঁড়িতে কী যেন খোদাই করা আছে৷

কাছে গিয়ে চমকে উঠলাম৷ ‘‘কর্নেল! কর্নেল! দেখে যান৷ এখানে কেউ একটা গিরগিটি জাতীয় প্রাণী এঁকে রেখেছে৷’’

কর্নেল কবরের কাছে বসে কী একটা করছিলেন৷ উঠে এসে ছবিটা দেখে বললেন, ‘‘বোঝা যাচ্ছে, আমরা ছাড়াও কেউ এই আজব গিরগিটি দেখতে পেয়েছিল রুহা উপত্যকায়৷’’

‘‘কিন্তু গাছের গুঁড়িতে খোদাই করে রাখার কারণ কী?’’

কর্নেল শুকনো গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বললেন, ‘‘গাছটা যখন বেঁচে ছিল, তখন ছবিটা কেউ খোদাই করেছিল৷ সম্ভবত এটা রুনী গাছ৷ বিন্ধ্য পর্বতমালায় এদের কদাচিৎ দেখা যায়৷ এদের আয়ু দীর্ঘ৷ মনে হচ্ছে, জোরা সায়েব এটা বাইরে থেকে এনে পুঁতেছিলেন৷ এমনও হতে পারে, ডঃ বিষয়ী ওই ছবিটা খোদাই করেছিলেন৷’’

‘‘কেন?’’

‘‘অন্যদের সতর্ক করে দেওয়ার জন্য৷ তা ছাড়া আর কী কারণ থাকতে পারে?’’

‘‘কিন্তু ওঁর ডায়রিতে গিরগিটির কথা লেখা নেই!’’

‘‘ডায়রি শেষ লিখেছিলেন ৩০ অক্টোবর রাতে৷ পরদিন কোনো সময় প্রাণীটার পাল্লায় পড়ে থাকবেন৷ ওঁর কাছে রাইফেল ছিল৷ তখনকার মতো বেঁচে যান এবং ছবিটা খোদাই করেন৷’’ বলে কর্নেল একটু হাসলেন৷ ‘‘সবই নিছক অনুমান৷ যাই হোক, আমি এবার উপত্যকায় নামতে চাই৷ না—তোমাকে বাংলোর প্রহরী হয়ে থাকতে হবে ডার্লিং! খাদ্যলোভী বিদঘুটে জীবটি আবার হানা দিতে পারে৷ আর যাই চুরি করুক সে, খাদ্যদ্রব্য চুরি করলে আমাদের সমস্যায় পড়তে হবে৷’’

আমার অসমসাহসী সঙ্গীকে টিলার ঢাল বেয়ে নেমে যেতে দেখে একটু লোভ হল৷ রহস্যময় রূহা উপত্যকায় আমারও ঘোরাঘুরি করার লোভ ছিল৷

বাংলোয় ফিরে বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলুম৷ কর্নেলের নীলচে টুপিটি নীচের উপত্যকায় পাথরের ফাঁকে দেখা যাচ্ছিল৷ একটু পরে মিলিয়ে গেল৷

কতক্ষণ আর চুপচাপ বসে থাকা যায়? পেছনদিকে ইঁদারা-প্রস্রবণের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম৷ বাতাস বইছে ধীরে৷ সামান্য দূরে সবুজ বনে ঢাকা পাহাড় ক্রমশ উঁচু হতে হতে বিশাল পাঁচিলের মতো মাথা তুলেছে৷ কিন্তু এই বাংলোর সীমানা থেকে এক অবিশ্বাস্য রুক্ষ মরু অঞ্চল যেন৷ অসম্ভব স্তব্ধতা এখানে৷ পাখি নেই, প্রজাপতি নেই, পোকামাকড় নেই—কোনো প্রাণী নেই৷ নিষ্প্রাণ পরিব্যাপ্ত রুক্ষতা হাতের তালুর মতো শূন্য৷ কার অভিশাপে এই শূন্যতা? রুহা নদীর প্রপাতও নাকি শুকিয়ে গেছে৷ কার বিষাক্ত নিঃশ্বাস যেন উপত্যকার অন্তস্থল থেকে এসে প্রাণের চিহ্নটুকু নিঃশেষ করে ফেলছে দিনে-দিনে৷

শুধু ওই বিচিত্র সবুজ গিরগিটিকে যেন কোনো অভিশাপ স্পর্শ করতে পারেনি৷ একমাত্র সেই জীবিত এই অভিশপ্ত উপত্যকায়৷

অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম৷ হঠাৎ চোখ গেল পশ্চিমদিকে চূড়ার ওপর জোরাসায়েবের কবরের দিকে৷ ওখান থেকে অনেকগুলো বড়ো-বড়ো পাথর ধাপের মতো নেমে এসেছে বাংলোর দিকে৷ পাথরগুলোর তলায় হলুদ ঘাসের জঙ্গল৷ সেখানে একপলকের জন্য গিরিগিটিটার মুখ দেখতে পেলুম৷ কী বীভৎস ওই মুখ৷

রাইফেল তাক করে রইলুম৷ দ্বিতীয়বার দেখামাত্র গুলি ছুঁড়ব৷ কিন্তু আর তার পাত্তা নেই৷ কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার পর সতর্কভাবে বাংলোর পেছন দিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলুম৷ একটা উঁচু পাথরে দাঁড়িয়ে তাকে খুঁজছিলুম৷ তারপর চোখে পড়ল, আন্দাজ তিরিশ গজ ওপরে দুটো পাথরের ফাঁকে গিরগিটিটা গুড়ি মেরে নেমে আসছে সাপের মতো৷

সঙ্গে সঙ্গে ট্রিগারে চাপ দিলুম৷ রাইফেলের গর্জন ছড়িয়ে পড়ল উপত্যকা জুড়ে৷ গিরগিটিটা লাফ দিয়ে সরে গেল পাথরের আড়ালে৷ হাতির চিৎকারের মতো একটা বিকট চিৎকারও কানে এল৷ ধাপ-বন্দি পাথরের ওপর দিয়ে উঠে গেলুম ঝটপট৷ কিন্তু তাকে দেখতে পেলুম না৷ যেখানে গুলি করেছিলুম, সেখানে পৌঁছে দেখি, পাথরের ওপর খানিকটা লাল রক্ত৷

তাহলে প্রাণীটাকে গুলি লেগেছে৷ চূড়ার চারপাশ তন্নতন্ন খুঁজে তার পাত্তা পেলুম না৷ তখন নেমে এলুম বাংলোয়৷

কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ফিরলেন হন্তদন্ত হয়ে৷ গুলির শব্দ এবং প্রাণীটার বিকট চিৎকার শুনতে পেয়েছিলেন৷ সব শুনে বললেন, ‘‘আশা করি, ওর যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে৷ আর খাদ্য চুরি করতে আসবে না৷’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘আপনার তদন্তের ফলাফাল কী? গিয়েছিলেন পিরামিড পাথরটার কাছে?’’

কর্নেল কিটব্যাগ থেকে দু’টুকরো বর্শার ফলার মতো রঙীন পাথর বের করে বললেন, ‘‘এই পাথর দুটো পরীক্ষা করতে হবে৷ পিরামিড পাথরটা ভেঙে একটা টুকরো নিয়ে আসব ভেবেছিলুম৷ অসম্ভব৷ ভীষণ শক্ত—ইস্পাতের মতো৷ তবে ওটা ব্যাসল্টরকই বটে৷’’

‘‘অত শক্ত ব্যাসল্ট রক?’’

‘‘হ্যাঁ, সেটাই আশ্চর্য৷’’ কর্নেল ব্যাগটা ঘরে রেখে এলেন৷ তরল পদার্থে ভরা একটা শিশি আর একটা চৌকো কাচ ওঁর হাতে৷ বললেন, ‘‘চলো তো৷ কোথায় রক্ত পড়েছে দেখি৷ রক্তটা পরীক্ষা করব৷’’

জোরাসায়েবের কবরের ফুট পনেরো-কুড়ি নিচে যে পাথরের ওপর রক্ত পড়ে ছিল, সেখানে গিয়ে দু’জনেই চমকে উঠলুম৷ লাল রক্তটা সবুজ হয়ে গেছে৷

উত্তেজিতভাবে বললুম, ‘‘তাহলে ডঃ বিষয়ী ওই অদ্ভুত গিরগিটির রক্তই দেখেছিলেন!’’

কর্নেল খানিকটা শুকনো ঘাস ছিঁড়ে সবুজ রক্তে ছোঁয়াতেই ঘাসগুলো দপ করে জ্বলে উঠল৷ কর্নেল বললেন, ‘‘সর্বনাশ! প্রাণীটার গায়ে রক্তের বদলে সাংঘাতিক অ্যাসিড আছে দেখছি৷’’

সাবধানে কাচের ওপর একটু সবুজ রক্ত নিয়ে কর্নেল শিশির তরল পদার্থটা কয়েক ফোঁটা ঢেলে দিলেন৷ অমনি সবুজ রক্ত ফেনিয়ে উঠল৷ তারপর রামধনুর মতো বিচিত্র রঙ ফুটে উঠল কাঁচের ওপর৷

আমরা বাংলোয় ফিরে এলুম৷ কর্নেলের মুখ অস্বাভাবিক গম্ভীর৷

দুপুরের খাদ্য মন্দ হল না৷ মাখন সহযোগে খিচুড়ি আর সেদ্ধ ডিম৷ খাওয়ার পর বরাবর আমার ভাতঘুমের অভ্যাস৷ কিন্তু কর্নেল ঘুমুতে দিলেন না৷ বললেন, ‘‘চলো জয়ন্ত৷ বাংলো পাহারা দেবার বোধ করি আর দরকার হবে না আপাতত৷ চোর জব্দ হয়েছে৷ ভুলেও এদিকে পা বাড়াবে না মনে হচ্ছে৷ আমরা দু’জনে গিয়ে চেষ্টা করে দেখি, পিরামিড পাথরটার একটুখানি নমুনা আনতে পারি নাকি৷’’...

তিনকোণা প্রকাণ্ড পাথরটা মাটিতে সামান্য কাত হয়ে আছে৷ আশেপাশে টুকরো-টুকরো অসংখ্য রঙীন পাথর ছড়িয়ে রয়েছে৷ কর্নেল নিচের দিকে ছেনি চেপে ধরলেন৷ আমি যথাসাধ্য জোরে হাতুড়ি ঠুকতে থাকলুম৷ কিন্তু প্রতিবার হাতুড়ি ঠুকছি আর আওয়াজে কানে তালা ধরে যাচ্ছে৷ পাথরটা যেন ভীষণ আর্তনাদ করছে অথবা তার প্রতিবাদ জানাচ্ছে৷ এক চিলতেও ভাঙা গেল না কিন্তু৷ এ যেন সত্যি ইস্পাত৷ আগুনের ফুলকি ঠিকরে পড়ছে প্রতি আঘাতে৷ একটু পরে কর্নেল আমাকে থামিয়ে বললেন, ‘‘নাঃ৷ অসম্ভব৷ পাথরটা কালো দেখাচ্ছে বটে, কিন্তু এটা হয়তো ব্যাসল্টরক নয়৷ তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে, এর ভেতরটা ফাঁপা৷

‘‘কেমন করে বুঝলেন!’’

‘‘আওয়াজে৷’’ বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ ‘‘চলো জয়ন্ত, বরং শুকনো প্রপাতটা দেখে আসি৷’’

আমরা পাথরের ভেতর সাবধানে পা ফেলে দক্ষিণে এগিয়ে চললুম৷ মাঝে মাঝে খানিকটা করে খোলামেলা ফাঁকা জায়গা৷ রুক্ষ ধূসর কাঁকড়ে ভরা মাটি৷ মন্দির বা গীর্জার গড়নের উঁচু লাল বা কালো পাথর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কোথাও৷ প্রপাতের কাছাকাছি গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘আশা করি, বাংলোয় গিরগিটির আবির্ভাব আর ঘটবে না৷ তবু একবার দেখে নিই৷’’

একটা উঁচু পাথরে উঠে উনি চোখে বাইনোকুলার রেখে উত্তরদিকে টিলার ওপর বাংলোটা দেখতে থাকলেন৷ দেখতে দেখতে হঠাৎ বললেন, ‘‘আরে! কী কাণ্ড!’’

‘‘কী? গিরগিটিটা লুঠপাঠ জুড়েছে বুঝি?’’

‘‘না৷ কারা বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷’’

‘‘বলেন কী! মানুষ?’’

‘‘মানুষ৷ কিন্তু...’’ কর্নেল হেসে উঠলেন৷ ‘‘দেখেছ কাণ্ড? ছেলেটা সত্যি জিনিয়াস!’’

‘‘ছেলেটা? কোন ছেলেটা?’’

‘‘আবার কে? প্রীতম৷’’

আমি অবাক হয়ে বললুম, ‘‘প্রীতম! প্রীতম এখানে কীভাবে আসবে?’’

‘‘বেচারা বলভদ্র!’’ কর্নেল হাসতে হাসতে পাথর থেকে নামলেন৷ ‘‘বলভদ্রের মতো ভীতু গোবেচারাকে এই ভয়ংকর রুহা উপত্যকায় আসতে বাধ্য করেছে যে, সে সত্যি জিনিয়াস জয়ন্ত! চলো, চলো! নিশ্চয়ই ওরা ক্ষিদের চোটে কাহিল হয়ে পড়েছে৷’’

কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে চলতে থাকলেন৷ অবাক হয়ে ভাবছিলুম, কর্ণপুর পর্যন্ত যদি বা বাসে আসা ওদের পক্ষে সহজ, পনেরো মাইল দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল পেরিয়ে ওরা এখানে এল কীভাবে? জঙ্গলে জন্তুজানোয়ার আছে৷ তা ছাড়া পথ চিনল কেমন করে?

আমাদের দেখে প্রীতম চেঁচিয়ে উঠল দু’হাত তুলে৷ ‘‘আমি এসে গেছি কর্নেলদাদু! জয়ন্তদা! আমি এসেছি৷’’

বলভদ্র কাঁচুমাচু মুখে হেসে বলল, ‘‘খোকাবাবু বরাবর এইরকম স্যার! আপনারা গেলেন—তারপর এসে গেল আচমকা৷ তো আমি কী করি বলুন? কর্ণগড় তক এসে কাঠগোলায় খোঁজখবর করলুম৷ একটা ট্রাক পেয়ে গেলুম৷ রোহিণী নদীর ধারে আমাদের নামিয়ে দিয়ে কাঠ বোঝাই করল৷ আমরা পায়দল চলে এলুম৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ভাগ্যিস পথ হারিয়ে ফেলোনি৷ তাহলে বিপদে পড়তে৷’’

বলভদ্র গাল চুলকে বলল, ‘‘রুহা আমি চিনি স্যার৷’’

‘‘সে কী বলভদ্র! আমাদের তো সে কথা বলোনি?’’

বলভদ্র হাসল৷ ‘‘আমাকে আসতে বলবেন, সেই ভয়ে বলিনি৷ এ বড়ো ভয়ংকর জায়গা স্যার৷ পাঁচ বছর আগে মাচি সিং আর রুদ্রপ্রসাদের সঙ্গে এসেছিলুম৷’’

‘‘তাই বুঝি? কেন এসেছিলে?’’

বলভদ্র গম্ভীর হয়ে চাপা গলায় বলল, ‘‘শুনেছিলুম, রুহাতে সোনাদানা কুড়িয়ে পাওয়া যায়৷ কিন্তু সোনাদানা পাওয়া তো দূরের কথা, নিজের প্রাণটা কোনোরকমে বাঁচিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলুম৷ মাচি সিং আর রুদ্রপ্রসাদ পালাতে পারেনি৷ অপদেওতার হাতে মারা পড়েছিল৷ পরে সব কথা বলব’খন৷ সে বড়ো ভয়ংকর ঘটনা!’’

প্রীতম আমার হাতে খিমচি কেটে বলল, ‘‘আমি বুঝি আসতে পারি না ভেবেছিলেন? এবার?’’

বলভদ্রের কাহিনি

তাহলে বলভদ্র সিংকে যতটা ভীতু ও গোবেচারা ভেবেছিলুম, ততটা সে মোটেও নয়৷ তাকে পেয়ে সুবিধেও হল৷ রান্নাবান্নার ঝামেলাটা সে নিজে থেকে নিল নিজের কাঁধে৷ প্রীতম আসার আগে বুদ্ধি করে চিঠি লিখে এসেছে বাড়িতে, আমাদের সঙ্গে সে রায়পুরে যাচ্ছে৷ রায়পুর তার চেনা জায়গা৷ তাই তার বাবা-মায়ের তত চিন্তার কারণ থাকবে না৷

রাতে খাওয়াদাওয়ার পর বলভদ্র তার অসমাপ্ত কাহিনিটা বলল৷ ‘‘স্যার৷ আর তিনদিনের দিন পূর্ণিমা৷ রুহার অপদেওতা ওই পূর্ণিমার রাতে মাথায় রঙবেরঙের মুকুট পরে দেখা দেবে৷ তখন নাকি বিস্তর সোনাদানা মণিমুক্তো ছড়াবে সে৷ সেই লোভে অনেক দুষ্টলোক আগে থেকে রুহা এসে লুকিয়ে থাকে৷ বারোবছর আগে মাচি সিং-রা প্রথম এসেছিল৷ মাচি সিংয়ের কাছে শুনেছি, সে-বার ওরা নাকি অনেক মণিমুক্তো কুড়িয়েছিল৷ কিন্তু বখরা নিয়ে ঝগড়া বাধে৷ খুনোখুনি হয়৷ মাচি সিংয়ের কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছিল, সে মণিমুক্তোগুলো কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল৷ সঙ্গীদের খুন করে একলা নিয়ে কেটে পড়ত৷ ঠিক কী ঘটেছিল, জানি না৷ মাচি সিং খুলে কিছু বলেনি৷ আমার ধারণা, মাচি সিং লুকোনো ধনরত্নগুলো আর খুঁজে পায়নি৷ সে আসলে একজন ডাকাত৷ পরে কোথাও ডাকাতি করে ধরা পড়েছিল৷ তারপর তার জেল হয়৷ জেল থেকে বেরিয়ে সে রুদ্রপ্রসাদ সিং আর আমাকে মিথ্যে বলে রুহা নিয়ে এসেছিল৷ তার আসল মতলব ছিল, আমাদের সাহায্যে লুকোনো ধনরত্ন উদ্ধার৷ কিন্তু অপদেওতার ধন খুঁজে পাওয়া কি সহজ কথা? পেলেও নিয়ে যাওয়া কঠিন৷ প্রাণটাই চলে যায়৷’’

ওর কথা শেষ হলে প্রীতম বলল, ‘‘বলভদ্রদা, তুমি বলছিলে রুহা বাংলোয় অনেক ভূত আছে৷ ভূত না দেখাতে পারলে দেখবে তোমায় কী করি৷’’

বলভদ্র হাসল৷ ‘‘তুমি খোকাবাবু কি না৷ তাই ভূত তোমার সামনে আসবে না৷’’

‘‘কেন আসবে না শুনি?’’

‘‘তুমি ভয় পাবে যে!’’

প্রীতম বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে বসে বলল, ‘‘কই আসুক না ভূত, দেখি! দাদামশাইয়ের রাইফেলে গুলি ছিল না বলেই তো ভূত ওঁকে মেরে ফেলেছিল৷’’

কর্নেল ওকে কাতুকুতু দিয়ে শুইয়ে দিলেন৷ বরাবর দেখেছি, কর্নেলের মধ্যে যেন একটা বাচ্চা ছেলে আছে৷ একটু পরে শুনি, প্রীতমকে মজার ভূতের গল্প বলছেন চাপা গলায়৷ আজ আর এ বাংলোয় একটুও অস্বস্তি লাগছিল না আমার৷ কিছুক্ষণ পরে ক্লান্ত প্রীতম ঘুমিয়ে পড়লে কর্নেল আন্তে ডাকলেন আমাকে৷ ‘‘জয়ন্ত, ঘুমুলে নাকি?’’

‘‘না৷ বলুন৷’’

‘‘প্রীতমকে নিয়ে সমস্যা হবে৷ কারণ বিপদ যে কখন কোনদিক থেকে আসবে, বুঝতে পারছি না৷ তা ছাড়া যা চঞ্চল আর সাহসী ছেলে, কী করে বসবে, কে জানে! ওকে তোমার দায়িত্বে দিচ্ছি জয়ন্ত৷’’

‘‘ঠিক আছে৷ আমি ওকে সবসময় সঙ্গে রাখব৷’’

বলভদ্র কান করে শুনছিল৷ বলল, ‘‘খোকাবাবুর ভার আমার, কর্নেল স্যার! আপনি ভাববেন না৷ ওর এখানে আসার জন্য আমিই আসলে দায়ী৷ আমি আসতে না চাইলে খোকাবাবু কান্নাকাটি করত বটে৷ আমি আসতে চাইলাম বলেই তো ওর আসা হল৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘বলভদ্র! তুমি কি ডাকাত মাচি সিংয়ের লুকোনো ধনরত্ব খুঁজে পাবে ভেবেছ?’’

বলভদ্র বলল, ‘‘কর্নেলস্যার সাহস দেন তো বলি৷’’

‘‘স্বচ্ছন্দে বলতে পারো বলভদ্র!’’

বলভদ্র ফিসফিস করে বলল, ‘‘আপনারা যখন রুহা আসবেন বললেন, তখন ভেতর-ভেতর আমার খুব লোভ হয়েছিল, আপনাদের সঙ্গে আসি৷ কিন্তু সাহস পাইনি কেন জানেন? মাচি সিংয়ের সাগরেদ বাচ্চু সিংয়ের ভয়ে৷ বাচ্চু সিং রুহার কাছে কোন জঙ্গলে পাঁচবছর ধরে আস্তানা করে আছে জানতুম৷ সে তার সর্দারের ধনরত্নগুলো খুঁজে বের করার তালে ছিল৷ মাচি সিং তাকে ফাঁকি দিয়ে রুদ্রপ্রসাদ আর আমাকে নিয়ে এসেছিল এখানে৷ তাই আমার ওপর বাচ্চু সিংয়ের খুব রাগ৷ এ তল্লাটে আমাকে দেখলে সে গুলি করে মারত৷’’

‘‘কিন্তু শেষ পর্যন্ত এলে তো!’’

বলভদ্র একটু হেসে বলল, ‘‘আপনারা রওনা হয়ে গেলে বাচ্চু সিংয়ের বউয়ের কাছে গিয়েছিলুম৷ ওর বউ থাকে রায়পুরের রেলকলোনিতে তার দাদার কাছে৷ তার দাদা রেলের লোক৷ তো মেয়েটা আমাকে দেখে কাঁদতে লাগল৷ বলল, ওর মরদ জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল৷ ওর দলের লোক বেইমানি করে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে৷ আদালতে বাচ্চুর নামে খুন আর ডাকাতির মামলা ঝুলছে৷ বড়ো সাজা হয়ে যাবে৷’’

‘‘তারপর তুমি কী করলে?’’

‘‘বাচ্চুর বউয়ের কথা শুনে পস্তানি হল৷ আগে যদি খবরটা পেতুম, আপনাদের সঙ্গে চলে আসতুম৷ সারারাত আমার ঘুম হল না—যাব কী যাব না ভেবে৷ শেষে ঠিক করলুম, যাব৷ সকালে হঠাৎ দেখি, কলকাতা থেকে খোকাবাবু এসে হাজির৷’’

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘‘আচ্ছা বলভদ্র, মাচি সিং তোমাকে বলেছিল কি কোথায় ধনরত্নগুলো লুকিয়ে রেখেছে?

‘‘কোথায় রেখেছে, তা যদি বলতেই পারবে—তাহলে আমাদের ডাকা কেন?’’ বলভদ্র আবার ফিসফিস করে বলল, ‘‘শুধু বলেছিল, একটা পাথরে তিনটে চিহ্ন দিয়ে রেখেছে৷ কিন্তু দিনভর ঢুঁড়ে পাথরটা খুঁজে পাওয়া গেল না৷ সন্ধ্যাবেলা আমরা তিনজনে রাত কাটানোর জন্য এই বাংলোর দিকে আসছি, আচমকা যেন পাগলাহাতি চেঁচিয়ে উঠল৷ সে কী ভয়ংকর চ্যাঁচানি স্যার৷ আমি ভাবলুম বুনো হাতিই বটে! পাথরের আড়ালে লুকিয়ে গেলুম৷ মাচি সিং আর রুদ্রপ্রসাদের হাতে বন্দুক ছিল৷ ওরা বন্দুক থেকে গুলি ছুঁড়ল৷ তারপর কী হল কে জানে! দু’জনের গোঙানি শুনতে পেলুম৷ অমনি আমি দিশেহারা হয়ে যেদিকে চোখ যায়, দৌড়তে শুরু করলুম৷ কী কষ্টে যে সেই রাতে জঙ্গলে গাছের ডালে কাটিয়েছি, বলার নয়৷ তারপর আর রুহার নাম করতুম না৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘পাথরে তিনটে চিহ্ন! কী চিহ্ন মাচি সিং কি বলেছিল?’’

‘‘বলেছিল৷ ভোজালির কোপে তিনটে ঢ্যারা খোদাই করে রেখেছিল নাকি৷’’

‘‘তিনটে ঢ্যারা?’’

‘‘হ্যাঁ, স্যার৷’’ বলে বলভদ্র খিকখিক করে হাসল৷ ‘‘আমি ভেবেছিলুম আপনারা ধনরত্ব কুড়োতে রুহা আসছেন৷ পরদিন খোকাবাবুর কাছে সব কথা জানতে পারলুম৷’’

কর্নেল চুপ করে কী যেন ভাবতে লাগলেন৷ কাল রাতে ঘুম হয়নি আমার৷ তাই ঘুমে চোখের পাতা জড়িয়ে আসছিল এবার৷...

প্রীতমের আবিষ্কার

সকালে কর্নেল বলভদ্রকে সঙ্গে নিয়ে সম্ভবত ডাকাত মাচি সিংয়ের গুপ্তধনের খোঁজেই বেরুলেন৷ বলভদ্র বল্লম এনেছিল সঙ্গে৷ সেটা কাঁধে নিয়ে যেভাবে হাঁটছিল, মনে হল গুপ্তধন না নিয়ে আর ফিরবে না৷

নিচের উপত্যকায় পাথরের জঙ্গলে দু’জনকে অদৃশ্য হতে দেখে আজানা ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠল৷ বলভদ্র বুনো হাতির হিংস্র গর্জনের মতো যে বিকট গর্জন শুনেছিল এবং মাচি সিং আর রুদ্রপ্রসাদকে যার কবলে মারা পড়তে হয়েছিল, সে কী জানোয়ার হতে পারে ভেবে পাচ্ছিলুম না৷ কর্নেলের কাছে অবশ্য রিভলবার আছে৷ কিন্তু তাই দিয়ে কি আত্মরক্ষা করা যাবে?

প্রীতমের কথা ভুলে গিয়েছিলুম৷ হঠাৎ খেয়াল হলে দেখলুম, সে নেই৷ ব্যস্ত হয়ে ডাকলুম, ‘‘প্রীতম! প্রীতম!’’

কোত্থেকে ভূতুড়ে গলায় নাকি স্বরে কেউ বলে উঠল, ‘‘হুঁ হুঁ হুঁ! মুঁণ্ডু চিঁবিয়ে খাবো!’’

এমন চমকে উঠেছিলুম, বলার নয়৷ অমনি বাংলোর পশ্চিমে উঁচুতে পাথরের ওপর ভেসে উঠল প্রীতমের মুখোশপরা মূর্তি৷ ছেলেটা সত্যি বড়ো দুরন্ত৷ তাকে তাড়া করে ধরার ভঙ্গিতে দৌড়ে গেলুম৷ প্রীতম জোরা সায়েবের কবরের দিকে উঠতে শুরু করল৷

ওপরে গিয়ে সে শুকনো গাছটার গুঁড়ি বেয়ে উঠে পড়ল৷ বললুম, ‘‘নেমে এসো শিগগির! ভেঙে পড়তে পারে৷’’

প্রীতম গুঁড়ির ওপর একটা ডালে বসে দুলতে দুলতে বলল, ‘‘আঁমি গেঁছো ভুঁত! জঁয়ন্তদাকে ধঁরব৷’’

বিরক্ত হয়ে বললুম, ‘‘আঃ! কী হচ্ছে প্রীতম! নেমে এসো বলছি৷’’

প্রীতম গ্রাহ্য করল না৷ ওর মুখে রাক্ষসের মুখোশ৷ নিচের উপত্যকার দিকে ঘুরে বলল, ‘‘কর্নেলদাদু আর বলভদ্রদাকে দেখতে পাচ্ছি জয়ন্তদা! এখন যদি চুপটি করে গিয়ে ওদের ভয় দেখাই, কী মজা হয় বলুন তো?’’

‘‘মজা দারুণ হয়৷ কর্নেলের রিভলবারের গুলি আর বলভদ্রের বল্লমের খোঁচা খাওয়া যায়৷’’

প্রীতম হাসতে হাসতে বলল, ‘‘রায়পুরে দাদামশাইয়ের বাড়ির পেছনে বাগান দেখেছেন তো জয়ন্তদা? আমি প্রত্যেকটা গাছে চড়তে পারি৷’’

‘‘তুমি বাহাদুর ছেলে! এবার নেমে এসো৷’’

‘‘আপনি গাছে চড়তে পারেন না জয়ন্তদা?’’

‘‘নিশ্চয়ই পারি৷ কিন্তু এ গাছটায় ভূত আছে৷ ঘাড় মটকে দেবে৷ তুমি নেমে এসো৷’’

প্রীতম গুঁড়ি বেয়ে নেমে এল৷ তারপর ওপাশের ঢাল বেয়ে দৌড়ে নামতে থাকল৷ ছেলেটাকে নিয়ে সত্যি ঝামেলা হল দেখছি৷ চ্যাঁচামেচি করেও লাভ হল না৷ ওর পিছন-পিছন আমাকেও দৌড়তে হল৷ নিচে মোটামুটি সমতল একটা ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে সে থমকে দাঁড়াল৷ তারপর মুখোশ খুলে ফেলল৷

কাছে গিয়ে রাগ করে বললুম, ‘‘এমন করলে কিন্তু তোমাকে সোজা রায়পুরে রেখে আসব৷’’

প্রীতম সামনের দিকে তাকিয়ে কী দেখছিল৷ আমার কথা তার কানে গেল না৷ তার দৃষ্টিতে বিস্ময় ফুটে উঠতে দেখছিলুম৷ তার চোখ বড়ো হয়ে উঠেছিল৷

জিগ্যেস করলুম, ‘‘কী দেখছ অমন করে?’’

প্রীতম উত্তেজিতভাবে বলল, ‘‘জয়ন্তদা! জয়ন্তদা! একটা কংকাল!’’

‘‘কংকাল! কোথায়?’’

প্রীতম আমার হাত ধরে সামনের দিকে দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা একটা লাল পাথরের কাছে নিয়ে গেল৷ এবার চোখে পড়ল কংকালটা৷

মানুষেরই কংকাল৷ ছেঁড়া দলাপাকানো কাপড়ও চোখে পড়ল—লোকটার পোশাক৷ কেউ এখানে শুয়ে বুঝি শান্তভাবে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছিল৷ মৃত্যু এসে তাকে শান্তি দিয়েছে৷ রুহা উপত্যকায় তার মৃতদেহ খেয়ে ফেলার জন্য কোনো প্রাণীও আসেনি৷ কংকালটা আস্ত আছে৷

দেখে মনে হল বহু বছরের পুরোনো কংকাল৷ হাড়ের জোড়গুলো আলাদা হয়ে গেছে৷ হাতের রঙ ধূসর৷ তারপর চোখে পড়ল, তার বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলে কী একটা আটকে আছে৷

একটা মোটা আংটি৷ আংটিটা কালো হয়ে গেছে৷ হাত বাড়িয়ে সেটা খুলে নিলুম৷ আঙুলের হাড় গুঁড়ো হয়ে গেল ছোঁয়া লেগে৷ প্রীতম দম আটকানো গলায় বলল, ‘‘ছ্যা ছ্যা৷ মড়া ছুঁলেন জয়ন্তদা?’’

আংটিটা ঘষতেই অস্পষ্ট তিনটি ইংরিজি হরফ ফুটে উঠল৷ এন, এম, এস৷

প্রীতম বলল, ‘‘জয়ন্তদা! কংকালটা যদি এখন নাচতে শুরু করে, দারুণ হয় কিন্তু!’’ তারপর সে ওটার মাথার পাশ দিয়ে লাল পাথরের দেয়ালের কাছে চলে গেল৷

বললুম, ‘‘এসো প্রীতম৷ বাংলোয় ফেরা যাক৷’’

প্রীতম ঝুঁকে কী দেখছিল৷ বলল, ‘‘জয়ন্তদা এখানে কী লেখা আছে দেখুন তো?’’

মড়ার খুলির হাতখানেক দূরে লাল পাথরটার নিচে কয়েক লাইন ইংরেজি কথা অস্পষ্টভাবে খোদাই করা আছে৷ অনেক কষ্টে পড়া গেল৷

"Discoverd Moon Rock in Ruha 29.10.20. N. M. S."

আমি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, ‘‘চাঁদের পাথর আবিষ্কার! ১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর! একী অদ্ভুত কথা! কে এই এন, এম, এস?’’

প্রীতম অবাক হয়ে বলল, ‘‘চাঁদের পাথর? এই কংকালটা আবিষ্কার করেছিল? যাঃ৷’’

একটু হেসে বললুম, ‘‘প্রীতম! এই কংকাল একদিন মানুষেরই ছিল৷ তার নাম ছিল এন এম এস—তার মানে, নামের আদ্যাক্ষর৷ কিন্তু এ ব্যাপারটা আবিষ্কারের গৌরব তোমারই প্রাপ্য প্রীতম৷’’

আমরা বাংলোয় ফিরে এলুম৷ কিছুক্ষণ পরে কর্নেল ও বলভদ্রও ফিরে এলেন৷ কর্নেল বললেন, ‘‘আজ বলভদ্রের দৌলতে অনেক কংকাল এখানে-ওখানে পড়ে থাকতে দেখলুম৷ বলভদ্র যে এলাকায় নিয়ে গিয়েছিল, সেদিকে যাবার কথা আমি ভাবিনি৷ পাথরের জঙ্গলে একা ঢোকাও নিরাপদ ছিল না৷ যাই হোক, বোঝা গেল যে রুহায় মণিমুক্তোর খোঁজে বিস্তর লোকে এসেছে আর বেঘোরে মারা পড়েছে৷ কিন্তু আশ্চর্য জয়ন্ত, তাদের কংকালগুলো আস্ত আছে! তার মানে, শকুন-শেয়াল-হায়েনা বা মৃতদেহ খায়, এমন কোনো প্রাণী রুহা উপত্যকার ধারে-কাছে আসতে সাহস পায় না৷ কেন সাহস পায় না, তার আসল কারণ সম্ভবত সেই সবুজ প্রকাণ্ড গিরগিটিটা৷ আশ্চর্য আরও জয়ন্ত, ওই বিদঘুটে জীবটিকে পৃথিবীর বলে মনে হয় না—কারণ তার গায়ে রক্তের বদলে সাংঘাতিক এ্যাসিড আছে৷ নিশ্চয়ই ওটা অন্য কোনো গ্রহের জীব৷’’

আংটিটা এগিয়ে দিয়ে বললুম, ‘‘আমরাও একটা কংকাল দেখেছি এবং আশ্চর্য একটা জিনিসও আবিষ্কার করেছি৷ এই দেখুন৷’’

কর্নেল আংটিটা দেখেই চমকে উঠে বললেন, ‘‘এন, এম, এস! জ্যোতির্বিজ্ঞানী নরেন্দ্রমোহন সেহগাল! জয়ন্ত, সত্যি এ একটা বিরাট আবিষ্কার৷ অধ্যাপক সেহগালের অন্তর্ধান-রহস্য তাহলে এতকাল পরে জানা গেল!’’

হঠাৎ হামলা

বলভদ্র কিচেনে রান্না করছিল৷ বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে কর্নেল জ্যোতির্বিজ্ঞানী সেহগালের কথা বলছিলেন৷ আমি ও প্রীতম কান করে শুনছিলুম৷

‘‘অধ্যাপক নরেন্দ্রমোহন সেহগাল এই শতকের গোড়ার দিকে একটা মতবাদ প্রচার করেন৷ তা হল : প্রায় চারশো কোটি বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীর প্রচণ্ড আকর্ষণে চাঁদের আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত বহু পাথর ছিটকে এসে পৃথিবীর বুকে পড়েছিল৷ উদ্ভট বলে বিজ্ঞানীরা এ-কথা উড়িয়ে দেন৷ অধ্যাপক সেহগাল তখন প্রমাণ খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন৷ তারপর আর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি৷ এতদিনে দেখা যাচ্ছে, উনি রুহা উপত্যকায় এসে মারা যান৷ ভাবতে কষ্ট হয়, এখানে উনি সত্যি-সত্যি চাঁদের পাথর আবিষ্কার করেছিলেন৷ কিন্তু আর সভ্য-সমাজে ফিরে যেতে পারেননি৷ জয়ন্ত, বুঝতে পারছ কোন পাথরটা উনি আবিষ্কার করেছিলেন?’’

‘‘সেই পিরামিড পাথরটা কি?’’

‘‘ঠিক তাই৷ তবে শুধু ওটাই নয়, আশেপাশে যে রঙীন পাথরগুলো আমরা দেখেছি, সেগুলোও চাঁদের পাথর৷ ডঃ বিষয়ীর বাকসো থেকে যে পাথরটা প্রীতম আমাকে দিয়েছে, সেটার মধ্যে আমি কার্বনেসিয়াম কনড্রাইট পেয়েছি৷ জয়ন্ত, জৈব কোষের মধ্যে এ জিনিস থাকে৷ কাজেই বোঝা যায়, চাঁদে প্রাণের বিকাশের সব সম্ভাবনা ছিল৷ কিন্তু কোনো কারণে— হয়তো মারাত্মক মহাজাগতিক রশ্মির আঘাতে চাঁদ নিষ্প্রাণ হয়ে গিয়েছিল৷ অথচ পৃথিবী ছিল প্রাণের অনুকূল৷ তাই চাঁদের যে পাথর পৃথিবীতে ছিটকে এসে পড়েছিল, তার মধ্যে জৈব পদার্থকণিকা থাকায় পৃথিবীর অনুকূল পরিবেশে তা থেকে প্রাণের বিকাশ সম্ভব৷’’

‘‘তাহলে কি ওই সবুজ গিরগিটিটা...’’

কর্নেল আমার কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘‘এখানে আসার আগে পটাসিয়াম-আর্গন পরীক্ষা পদ্ধতির সাহায্যে ডঃ বিষয়ীর সংগৃহীত পাথরটার বয়স নির্ণয় করিয়েছিলুম বিজ্ঞান-কলেজের ল্যাবরেটরিতে৷ পাথরটা তরল অবস্থা থেকে কঠিন অবস্থায় পৌঁছেছে প্রায় চারশো কোটি বছর আগে৷ কাজেই রুহা উপত্যকায় পড়ার পর কমপক্ষে সাড়ে তিনশো কোটি বছরে জৈবকণা থেকে এই বিরাটকায় গিরগিটি জাতীয় প্রাণীর উদ্ভব বিবর্তনবাদ অনুসারে মোটেও অস্বাভাবিক নয়৷ ভেবে দেখো জয়ন্ত, পৃথিবীর বয়সও আনুমানিক ৪৬০ কোটি বছর৷ পৃথিবীর অনুকূল পরিবেশই মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর উদ্ভব ঘটিয়েছে৷ সেক্ষেত্রে চাঁদের ওই সামান্য কিছু টুকরো পাথর থেকে গিরগিটি জাতীয় প্রাণীর উদ্ভব প্রকৃতিতে খুব সাধারণ ঘটনা৷’’

প্রীতম গম্ভীর হয়ে শুনছিল৷ এবার বলল, ‘‘কর্নেলদাদু! কংকাল ভদ্রলোক চাঁদের পাথর আবিষ্কার করে গেছেন৷ তারিখ লেখা আছে ২৯. ১০. ২০৷’’

‘কংকাল ভদ্রলোক’ শুনে আমি ও কর্নেল হেসে ফেললুম৷ তারপর কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ প্রীতম৷ অধ্যাপক সেহগাল সম্ভবত ওইদিন চাঁদের পাথরের ওপর সেই রামধনু দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর মতবাদ নির্ভুল৷’’

আমার মাথায় একটা কথা ভেসে উঠল৷ বললুম, ‘‘আচ্ছা কর্নেল, তাহলে কি অধ্যাপক সেহগাল রুহা উপত্যকায় থেকে গিয়েছিলেন আবার রামধনু দেখার জন্য?’’

‘‘তাই মনে হচ্ছে৷’’ কর্নেল সায় দিয়ে বললেন৷

‘‘তাহলে কি ডঃ বিষয়ী ১৯৩২ সালে ওঁকেই দেখে ছিলেন জলপ্রপাতের ওপারে?’’

‘‘সম্ভবত৷’’

‘‘আমার মনে হয় অধ্যাপক সেহগাল কোনো কারণে পাগল হয়ে গিয়েছিলেন৷’’

‘‘পাগল হওয়া স্বাভাবিক, জয়ন্ত৷ স্পষ্ট বোঝা যায়, উনি রাতের পর রাত আবার সেই রামধনু দেখার জন্য রুহায় কাটাচ্ছেন৷ অথচ দেখতে পাচ্ছেন না৷ প্রতিভাধর বিজ্ঞানীরা এমনিতেই খেয়ালী এবং জেদি প্রকৃতির মানুষ৷ বারো বছর পরে আবার তিনি যখন রামধনু দেখলেন, তখন উনি অপ্রকৃতিস্থ৷ কারণ খাওয়াদাওয়া জোটেনি৷ ঘুমোতে পারেননি৷ প্রতীক্ষা আর প্রতীক্ষা—রাতের পর রাত!’’

প্রীতম বলল, ‘‘কর্নেলদাদু, কংকাল ভদ্রলোক নিশ্চয়ই গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছিলেন! তাই না?’’

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘তুমি বুঝি গুপ্তধন আবিষ্কার করতেই এসেছ?’’

‘‘হুঁউ৷ দাদামশাই খুঁজে পাননি৷ আমি নিশ্চয়ই পাব৷’’

আমি বললুম, ‘‘আচ্ছা কর্নেল, বলভদ্র বলছিল, অপদেবতা যখন রঙীন মুকুট পরে দেখা দেয়, অর্থাৎ চাঁদের পাথরের ওপর রামধনু দেখা যায়, তখন ধনরত্ন মণিমুক্তো কুড়িয়ে পাওয়া যায় এখানে৷ মাচি সিং-রা নাকি পেয়েছিল সত্যি-সত্যি৷ ব্যাপারটা কী মনে হয় আপনার?’’

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘‘ধনরত্ন মণিমুক্তো বললে৷ মুক্তোটা বাদ দিয়ে বলো, ডার্লিং! কারণ মুক্তো হয় সমুদ্রের তলায় ঝিনুকের পেটে৷ শুধু রত্ন বা মণি বলতে পারো৷ আমার ধারণা, চাঁদের পাথরে পূর্ণিমার রাতে যে রশ্মি ঠিকরে বেরোয়, তার প্রভাবে কিছু পাথরে কেমিক্যাল পরিবর্তন ঘটে৷ সেগুলো সম্ভবত মূল্যবান পাথরে পরিণত হয়৷ চুনী-পান্না বৈদূর্যমণি, এইসব মূল্যবান পাথর কেমিক্যাল বিক্রিয়ার ফলেই সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীতে৷ কাজেই মাচি সিং কিছু দামী পাথর কুড়িয়ে পেয়েছিল, সন্দেহ কী তাতে?’’

প্রীতম দূরের দিকে তাকিয়ে ছিল৷ হঠাৎ বলল, ‘‘কর্নেলদাদু, আপনার বাইনোকুলারটা দিন না!’’

কর্নেলের বাইনোকুলার নিয়ে সে বারান্দা থেকে নেমে লনে চলে গেল৷ কিছুক্ষণ চোখে দূরবীণ যন্ত্রটা রেখে কী দেখতে দেখতে চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘কর্নেলদাদু! জয়ন্তদা! দেখে যান!’’

বললুম, ‘‘কী প্রীতম?’’

‘‘তিনটে মানুষ!’’

কর্নেল ব্যস্তভাবে তার কাছে গিয়ে বাইনোকুলারটা নিলেন৷ দেখতে থাকলেন৷ আমি কৌতূহলী হয়ে ওঁদের কাছে গেলুম৷ কর্নেল বললেন, ‘‘লোকগুলোর মতলব কী? ওদের কাছে রাইফেল আছে দেখছি৷ বাইনোকুলারে আমাদের দেখছে৷’’

বলেই আচমকা কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘‘শুয়ে পড়ো জয়ন্ত!’’ সেই সঙ্গে প্রীতমকে হ্যাঁচকা টানে মাটিতে শুইয়ে দিলেন৷ নিজেও উপুড় হয়ে পড়লেন৷

অমনি প্রচণ্ড শব্দ শুনলুম কানের কাছে৷ ওরা গুলি ছুঁড়েছে৷ আমি শুয়ে পড়তে পড়তে আবার গুলির শব্দ হল৷ এবার গুলিটা আমাদের পেছনে বাংলোর বারান্দার থামে গিয়ে লাগল৷ একরাশ পলেস্তারা ঝরে পড়ল৷ তারপর আবার গুলির শব্দ হল৷ আবার৷

কর্নেল চেঁচিয়ে বললেন, ‘‘বলভদ্র! বেরিও না৷ কারা গুলি ছুঁড়ছে৷ জয়ন্ত, গুড়ি মেরে বাংলোয় গিয়ে তোমার রাইফেল নিয়ে এসো৷ সাবধান৷’’

কর্নেল ও প্রীতম শুকনো ঘাসের ভেতর উপুড় হয়ে রইল৷ আমি সাপের মতো মাটিতে দু’হাত ভর করে গুড়ি মেরে বাংলোর বারান্দায় গেলুম৷ একলাফে থামের আড়াল দিয়ে ঘরে ঢুকলুম৷ গুলির শব্দ থেমে গেছে ততক্ষণে৷

ঝটপট রাইফেলে গুলি ভরে বারান্দায় থামের আড়ালে বসে পড়লুম৷ তারপর আন্দাজে গুলি ছুঁড়লুম দু’বার৷ কর্নেল ওখান থেকে চেঁচিয়ে বললেন, ‘‘ব্যাস! আর গুলি খরচ কোরো না জয়ন্ত৷ ওদের রাইফেল দূরপাল্লার৷ অতদূরে তোমার গুলি পৌঁছুবেনা৷ ওরা জানুক, আমরা নিরস্ত্র নই৷’’

বলভদ্র হতবাক হয়ে ঘরের জানালায় উঁকি দিচ্ছিল৷ বলল, ‘‘সবে শুরু৷ পূর্ণিমার দিন যত ঘনিয়ে আসবে, তত রাজ্যের ডাকু-বদমাস ধনরত্ন কুড়োতে এখানে এসে ওত পাতবে৷ দেখবেন, নিজেদের মধ্যে ওরা খুনোখুনি করবে৷ লোভ বড়ো খারাপ জিনিস, স্যার!’’

একটু পরে কর্নেল ও প্রীতম গুড়ি মেরে বাংলোয় ফিরে এলেন৷ প্রীতমের মুখে করুণ হাসি৷ বললুম, ‘‘কী প্রীতম? এবার কেমন লাগছে অ্যাডভেঞ্চার?’’

প্রীতম বলল, ‘‘আমার একটা বন্দুক নেই যে! নইলে ওদের দেখিয়ে দিতুম!’’

কর্নেল থামের আড়ালে হাঁটু দুমড়ে বসে বাইনোকুলারে চোখ রেখে বললেন, ‘‘ওরা বুঝেছে আমরাও নিরস্ত্র নই৷ তাই এগিয়ে আসার চেষ্টা করল না আর৷ পাথরের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে৷’’

আমরা ঘরে ঢুকলুম৷ কর্নেলের মুখ গম্ভীর৷ বলভদ্রও রাগে অস্থির৷ বলল, ‘‘ভাববেন না কর্নেলস্যার৷ ডাকু ঢিট করার কৌশল আমি জানি৷ খাওয়াদাওয়া করে নিন৷ তারপর কর্নেলস্যার আর আমি বেরুব৷ চুপিচুপি পাথরের আড়াল দিয়ে এগিয়ে ব্যাটাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব৷’’

কর্নেল গলার ভেতর বললেন, ‘‘একটা কিছু করতেই হবে৷ নইলে আমাদের এ অভিযান ব্যর্থ হয়ে যাবে৷’’...

প্রীতম নিখোঁজ

আমাদের এবার খুব সতর্ক থাকতে হচ্ছিল৷ বন্দুকবাজ ডাকুরা নিশ্চয়ই ভেবেছে, আমরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী৷ রুহা উপত্যকায় হীরে-চুনী-পান্না কুড়োবার লোভেই যেন এসেছি ওদের মতো৷ তাই ওরা আমাদের খতম করতে চাইবে৷

সন্ধ্যায় জ্যোৎস্না উঠলে কর্নেল আর বলভদ্র চুপিচুপি বেরিয়ে গেলেন৷ বুঝতে পারছিলুম না, অমন সশস্ত্র তিন ডাকুকে কীভাবে ওঁরা শায়েস্তা করবেন৷ কর্নেলের রিভলবার আছে৷ আর বলভদ্রের সম্বল মোটে একটা বল্লম৷ উৎকণ্ঠায় অধীর হয়ে বসে রইলুম৷

প্রীতমের কিন্তু গ্রাহ্য নেই৷ সে ভেবেছে, দারুণ মজার ব্যাপার চলেছে৷ আমার বারণ না মেনে বারবার দরজা খুলে উঁকি দিচ্ছিল আর বলছিল, ‘‘জয়ন্তদা, ভূত!’’ শেষে ওকে জোর করে চেয়ারে বসিয়ে দিলুম৷ তখন সে হ্যারিকেনের দম কমিয়ে-বাড়িয়ে আরেক খেলা শুরু করল৷ যখন আলো কমছে, তখন সে ফিসফিস করে বলছে, ‘‘ভূত জয়ন্তদা!’ তারপর হি-হি করে হাসছে৷ এই করতে গিয়ে আলোটা নিভিয়ে ফেলল সে৷

রাগ করে বললুম, ‘‘এবার সত্যি ভূত এসে তোমার ঘাড় মটকাক!’’

‘‘জয়ন্তদা, দেশলাই জ্বালুন না!’’

‘‘কক্ষনো না৷ থাকো তুমি অন্ধকারে বসে৷’’

‘‘তাহলে জানলা খুলে দেব কিন্তু!’’

‘‘না৷’’

সে উঠে গিয়ে জানালা টানাটানি করতে থাকল৷ সতর্কতার জন্য জানালাগুলো শক্ত করে আটকানো হয়েছে৷ খুলতে না পেরে অন্ধকারে ঠাহর করে সে দরজায় গেল৷ তারপর দরজা হাট করে খুলে দিল৷ দস্যি ছেলেটা সত্যি একটা বিপদ বাধাবে দেখছি!

বাইরে চাঁদের আলো ঝলমল করছে৷ নিচের উপত্যকা জুড়ে কুয়াশা জমেছে৷ প্রীতম বাইরে গিয়ে বলল, ‘‘জয়ন্তদা৷ আসুন না আমরা বাইরে বসি৷’’

সত্যি বলতে কী, বদ্ধ ঘরে বসে থাকতে আমারও ইচ্ছে করছিল না৷ রাইফেল আর টর্চ নিয়ে বেরিয়ে বললুম, ‘‘সত্যি তুমি বিপদ না বাধিয়ে ছাড়বে না দেখছি, প্রীতম!’’

‘‘কিসের বিপদ জয়ন্তদা?’’

‘‘ডাকুরা গুলি ছুঁড়বে জানো না? তখনকার কথা মনে নেই?’’

‘‘কর্নেলদাদুরা এতক্ষণ ওদের জব্দ করে ফেলেছেন!’’

‘‘পারবেন কি? ওরা সাংঘাতিক লোক!’’

প্রীতম চাপা গলায় বলল, ‘‘ও জয়ন্তদা, আপনাকে তো বলাই হয়নি৷ বলভদ্রদাও ডাকাত ছিল জানেন?’’

‘‘তাই বুঝি?’’

‘‘হ্যাঁ৷ বলভদ্রদা একসময় ডাকাত ছিল৷ জেলে থাকার সময় ওর বউ অসুখে ভুগে মারা গিয়েছিল৷ জেল থেকে ফিরে মনের দুঃখে তাই ডাকাতি ছেড়ে দিয়েছিল৷ রায়পুর স্টেশনে প্যাসেঞ্জারদের লাগেজ বইত আর যা পয়সা পেত, তাই দিয়ে খাওয়া-পরা চালাত৷ বাবা দাদামশাইয়ের বাড়ি দেখাশোনার জন্য লোক খুঁজছিলেন তো৷ বলভদ্রদাকে পেয়ে গেলেন৷’’

‘‘হ্যাঁ—মাচি সিংদের সঙ্গে ওর সম্পর্কের কথা শুনে আমারও তাই সন্দেহ হয়েছিল৷’’

প্রীতম হাসল৷ ‘‘যতবার রায়পুরে এসেছি, বলভদ্রদা ডাকাতের গল্প শুনিয়েছে আমাকে৷ কী দারুণ সব গল্প৷ জয়ন্তদা, চম্বলের ডাকাতদের গল্প পড়েননি আপনি?’’

‘‘হুঁউ৷ চম্বল তো এই মধ্যপ্রদেশেই৷’’

‘‘বলভদ্রদা চম্বলের এক ডাকাত ছিল জানেন তো?’’

‘‘বলো কী প্রীতম!’’

প্রীতম ফের চাপা গলায় বলল, ‘‘ওকে কিন্তু এসব কথা বলবেন না জয়ন্তদা! বলভদ্রদা আমাকে এসব কথা আর কাউকে বলতে বারণ করেছিল৷’’

‘‘ঠিক আছে, বলব না৷ কিন্তু প্রীতম, ওকে তোমার ভয় করে না?’’

প্রীতম হাসতে হাসতে বলল, ‘‘ভ্যাট! যখন ডাকাত ছিল, তখন ছিল৷ এখন তো বলভদ্রদা ডাকাতদেরই দু’চোখে দেখতে পারে না৷ ও কত ডাকাতকে ধরিয়ে দেয় বাগে পেলে৷ এখন ও ডাকাতদের খুব ঘেন্না করে৷ সেইজন্যেই তো কর্নেলদাদুকে নিয়ে...’’

কথাবার্তার মধ্যে চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছিলুম৷ হঠাৎ কানে এল, সে রাতের মতো বাংলোর পেছনে কোথাও মচমচ শব্দ হচ্ছে৷ সঙ্গে সঙ্গে প্রীতমকে থামিয়ে দিয়ে দৌড়ে বারান্দার শেষ প্রান্তে চলে গেলুম৷ প্রীতম হকচকিয়ে গিয়েছিল৷ জিগ্যেস করল, ‘‘কী জয়ন্তদা? কোথায় যাচ্ছেন অমন করে?’’

টর্চ জ্বালতেই দেখলুম, সেই সবুজ রঙের প্রকাণ্ড গিরগিটিটা আবার কিচেনের জানালা ভাঙার চেষ্টা করছে মানুষের মতো দু’পায়ে দাঁড়িয়ে৷ ওর প্রকাণ্ড লেজটা মাটিতে নড়াচড়া করছে৷

টর্চের আলোয় দুটো নীল চোখ জ্বলে উঠেছে৷ চোখ দুটো অবিকল যেন মানুষের৷

সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল তাক করলুম৷ কিন্তু গিরগিটিটা সে-রাতের মতো ভড়কে গিয়ে পালানোর চেষ্টা করল না৷ লেজটা মাটিতে আছাড় মেরে বিরাট গর্জন করে উঠল—বুনো হাতির মতো সেই হিংস্র গর্জন!

গর্জন করেই সে তেড়ে এল৷ ট্রিগারে চাপ দিলুম৷ গুলি বেরিয়ে গেল রাইফেল থেকে৷ কিন্তু বিদঘুটে প্রাণীটা আজ যেন মরিয়া হয়েই এসেছে৷ এক হাতে টর্চ থাকায় গুলিটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হল৷ এভাবে গুলি করাও কঠিন৷ গুলি বেরুলে রাইফেল নড়ে গিয়ে পেছনে ধাক্কা মারে৷ তাই রাইফেল শক্ত করে দু’হাতে ধরতে হয় এবং কাঁধে বাঁটটা চেপে রাখতে হয়৷ এক্ষেত্রে সেভাবে রাইফেল ধরা ছিল না৷ তাই শুধু লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া নয়, হাত থেকে ছিটকে পড়ল রাইফেলটা৷

হিংস্র প্রাণীটা তখন আমার কাছাকাছি চলে এসেছে৷ টর্চ ফেলে দিয়ে রাইফেল কুড়িয়ে নিলুম৷ তারপর বাকি চারটে গুলি শেষ করে ফেললুম৷

সবুজ গিরগিটিটা আছড়ে পড়েছিল৷ মুহুর্মুহু গর্জন করছিল৷ তারপর সে নিস্পন্দ হয়ে গেল৷

এতক্ষণে খেয়াল হল প্রীতমের কথা৷ ডাকলুম, ‘‘প্রীতম! প্রীতম! দেখে যাও!’’

কিন্তু প্রীতমের সাড়া এল না৷

ছেলেটা কি ভয়ে চুপ করে আছে৷ ঘাসের ওপর থেকে টর্চটা কুড়িয়ে নিয়ে বাংলোর বারান্দায় গেলুম৷ প্রীতম তাহলে ঘরে ঢুকেছে আলো জ্বালতে৷ বুদ্ধিমান ছেলের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক৷

কিন্তু ঘর তেমনি অন্ধকার৷ গলা চড়িয়ে ডাকলুম, ‘‘প্রীতম৷ প্রীতম! কোথায় তুমি?’’

কোনো সাড়া না পেয়ে ভীষণ চমকে গেলুম৷ ঘরের ভেতরটা টর্চ জ্বেলে দেখে নিলুম, প্রীতম নেই৷ কিচেনের ভেতরেও নেই৷ আশ্চর্য তো! ও কি আমার সঙ্গে দুষ্টুমি করে লুকোচুরি খেলতে চাইছে?

আবার বাইরে বেরিয়ে বাংলোর চারপাশে খুঁজলুম৷ কোথাও প্রীতম নেই৷ চিৎকার করে ডাকতে থাকলুম, ‘‘প্রীতম! প্রীতম!’’

সাড়া এল না৷ আতঙ্কে দুর্ভাবনায় অস্থির হয়ে বারান্দায় ফিরে এলুম৷ সত্যি যদি ওর কোনো বিপদ হয়ে থাকে, কর্নেল ও বলভদ্রের সামনে কোন মুখে দাঁড়াব! আমার ওপর প্রীতমের দায়িত্ব ছিল৷ যাবার সময়ও কর্নেল পইপই করে বলে গেছেন, ‘‘বড়ো চঞ্চল ছেলে৷ ওকে আটকে রাখবে৷’’

আরও কয়েকবার ডাকাডাকি করেও সাড়া পেলুম না৷ হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে হ্যারিকেন জ্বেলে টেবিলে রেখে কিটব্যাগ থেকে গুলি বের করলুম৷ দু’পকেটে প্রচুর গুলি বোঝাই করে রাইফেলে গুলি ভরে নিলুম পাঁচটা৷ তারপর বাইরে এসে বারান্দায় টর্চের আলো ফেলতেই চোখে পড়ল, প্রীতমের একপাটি চপ্পল পড়ে রয়েছে৷

বুঝতে পারলুম, কেউ ওত পেতে বসেছিল কোথাও৷

লনে আরেকপাটি চপ্পল খুঁজে পাওয়া গেল৷ চপ্পলটা কুড়িয়েছি, এমন সময় কর্নেলের সাড়া পেলুম৷ নিচের ঢাল বেয়ে বলভদ্র আর কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে আসছেন৷ ‘‘জয়ন্ত! জয়ন্ত! কী হয়েছে? গুলি ছুঁড়ছিলে কেন?’’

অতিকষ্টে বললুম, ‘‘প্রীতম নেই! কেউ বা কারা তাকে ধরে নিয়ে গেছে৷

বলভদ্র আর্তনাদ করে উঠল, ‘‘খোকাবাবু!’’...

মধ্যরাতের শোকমিছিল

জ্যোৎস্না ও কুয়াশায় রুহা উপত্যকাকে মনে হচ্ছিল রহস্যময় এক ভয়ংকরের বাসভূমি! আমরা তিনজনে বেরিয়ে পড়লুম প্রীতমের খোঁজে৷ ছোটো-বড়ো নানা গড়নের পাথর, কোথাও ফাঁকা রুক্ষ মাটি, কোথাও একটা পাথরের দেয়াল, কিংবা গম্বুজের আকৃতি নিরেট পাথর—নিষ্প্রাণ অভিশপ্ত উপত্যকার ভেতর আমরা সাবধানে হাঁটছিলুম৷ কর্নেল টর্চ ফেলে মাটিতে চিহ্ন খুঁজছিলেন৷ একখানে খানিকটা জায়গায় বালি দেখা গেল৷ বালির ওপর আলো ফেলে কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ—ঠিক পথেই চলেছি৷ এই দেখো জয়ন্ত, এখানে পায়ের ছাপ বেশ দেবে গেছে৷ প্রীতমকে বয়ে নিয়ে গেছে যে, সে একজন মানুষই৷ বাংলোর টিলার ঢালে অস্পষ্ট ছাপ দেখেছি৷ এখানে ছাপটা স্পষ্ট৷’’

আমার প্রাজ্ঞ বন্ধুর চোখের দৃষ্টিশক্তি আলাদা৷ এতক্ষণ ভাবছিলুম, আমরা বুঝি লক্ষ্যহীনভাবে হাঁটছি৷ কিন্তু তা নয়৷ কর্নেলের হাবভাবে এতক্ষণে বুঝতে পারলুম, উনি চিহ্ন খুঁজেই অনুসরণ করছেন৷

বালি-ভরা জমিটার শেষদিকে গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘প্রীতমকে যে ধরে নিয়ে গেছে, তার পায়ে জুতো নেই৷ পায়ের ছাপের দৈর্ঘ্যে বোঝা যাচ্ছে, তার পা-দুটো অস্বাভাবিক লম্বা৷ একটা ছাপ থেকে অন্যপায়ের ছাপের যা দূরত্ব, তাতে বোঝা যায়, সে অন্তত সাড়ে ছ’ ফুট উঁচু মানুষ৷’’

বলভদ্র বলল, ‘‘তাহলে বাচ্চুসিংয়ের সঙ্গীদের কেউ নয়৷’’ ওই তিনজনের কেউ অত লম্বা নয়৷

জিগ্যেস করলুম, ‘‘ওই তিন ডাকু কি বাচ্চুসিংয়ের সঙ্গী?’’

‘‘হ্যাঁ স্যার৷’’

‘‘তুমি কি ওদের দেখেছ?’’

বলভদ্র বলল, ‘‘কিছুক্ষণ আগে কর্নেল স্যার আর আমি ওদের আস্তানার কাছে গিয়ে ওত পেতেছিলুম৷ ওরা পাথরের আড়ালে আগুন জ্বেলে রুটি সেঁকছিল৷ সেই আগুন চোখে পড়েছিল আমাদের৷ তো আচমকা বাংলোর দিকে অনেকবার গুলির আওয়াজ হল৷ তখন আমরা ভাবলুম, কিছু বিপদ হয়েছে আপনাদের৷ তাই বাংলোর দিকে দৌড়ে গেলুম৷ তবে তিন ডাকু হারামজাদাও চমকে গেছে দেখলুম৷ গুলির প্রথম আওয়াজটা শুনে ওরা আগুন নিভিয়ে দিয়েছিল৷ একজন বলল, পুলিশ নাকি? আরেকজন বলল, হতেও পারে৷’’

কর্নেল ডাকলেন, ‘‘এসো জয়ন্ত! মনে হচ্ছে, লোকটা প্রীতমকে চাঁদের পাথরের ওদিকেই নিয়ে গেছে৷’’

কিছুটা এগিয়ে একখানে কর্নেল ফের গুড়ি মেরে বসলেন৷ টর্চের আলোতে মাটি পরীক্ষা করতে করতে বললেন, ‘‘এখানে বিশ্রাম নিয়েছিল লোকটা৷ কাঁকর সরিয়ে বসেছে৷ হুঁ, লোকটার ধূমপানের অভ্যাস আছে৷ এই দেখো, পোড়া দেশলাই কাঠি পড়ে আছে৷’’ তারপর একটুকরো ছাই আঙুলে ঘষে দেখে বললেন, ‘‘মনে হচ্ছে দিশি তামাকের ছাই৷ সিগারেটের ছাই খুব নরম আর সহজে গুঁড়িয়ে যায়৷ বিড়ির ছাই একটু জমাট বাঁধে বটে, কিন্তু টুকরোগুলো ছোট্ট হয়৷ আদিবাসীরা শালপাতায় তামাক জড়িয়ে চুরুটের মতো টানে৷ তাকে বলে চুটি৷ এ লোকটা চুটি টেনেছে৷ তার মানে এ একজন আদিবাসী৷’’

বললুম, ‘‘চুরুটের ছাই নয়তো? আদিবাসীরা তো শুনেছি প্রাণ গেলেও রুহা উপত্যকার কাছ ঘেঁষে না৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘চুরুটের ছাই খসখসে আর শক্ত হলেও এমন লম্বা হয় না৷’’

বলভদ্র কান করে শুনছিল৷ চমকখাওয়া গলায় বলল, ‘‘স্যার! এ তাহলে সেই চন্ডুলাল নয় তো?’’

‘‘কে চন্ডুলাল বলভদ্র?’’

‘‘ওদিকে জঙ্গলের ভেতর ঝাকরপালি নামে একটা বস্তি আছে৷ ওরা স্রেফ জংলি স্যার৷ ওদের ওঝার নাম চন্ডুলাল৷ পাঁচবছর আগে এখানে মাচি সিংয়ের সঙ্গে চন্ডুলালকে দেখেছিলুম৷ আমাদের দেখে সে লুকিয়ে গিয়েছিল৷ স্যার, ঝাকরপালির জংলিরা শুনেছি এখনও মানুষ খায়৷ চন্ডুলাল ওদের দেবতার থানে মানুষ বলি দেয়৷ সেই বলি-দেওয়া মানুষের মাংস ওরা সেদ্ধ করে খায়৷ সেইজন্যে পুলিশ চন্ডুলালকে পেলেই গ্রেফতার করবে৷ চন্ডুলাল তাই রুহায় এসে লুকিয়ে থাকে৷’’

বললুম, ‘‘এদেশে ক্যানিব্যাল? অসম্ভব! বিশ্বাস করি না৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘জয়ন্ত, তুমি কাগজের লোক হয়েও খবর রাখো না৷ গত মাসে কাগজেই বেরিয়েছিল, মধ্যপ্রদেশের দুর্গম জঙ্গলে এখনও ক্যানিব্যাল বা নরমাংসভোজী আদিম একটা গোষ্ঠী আছে৷ সরকার তাদের সভ্য করার জন্য চেষ্টা করছেন৷ পারছেন না৷ চন্ডুলাল তাহলে তাদেরই ওঝা—ইংরিজিতে যাদের বলা হয় উইচডক্টর৷ সব আদিম জনগোষ্ঠীতে একজন করে ওঝা থাকার নিয়ম৷ তবে জয়ন্ত, সেদিন তাহলে এই লোকটাকেই পাথরে শুয়ে থাকতে দেখেছিলুম৷’’

বলভদ্র ব্যাকুলভাবে বলল, ‘‘চন্ডুলালের হাতে খোকা-বাবুর আর রক্ষা নেই৷ কর্নেলস্যার৷ খুঁজে দেখুন, কোন পথে গেছে শয়তানটা৷ আমি ওকে দেখামাত্র ওর বুকে এই বল্লমটা বিঁধিয়ে দেব৷’’

শক্ত মাটি৷ কর্নেল তন্নতন্ন করে লোকটার পায়ের ছাপ খুঁজে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করলেন কিছুক্ষণ৷ তারপর হতাশ হয়ে বললেন, ‘‘তাই তো! দিন হলে অসুবিধেয় পড়তুম না৷ আমার চোখ এড়িয়ে লোকটা কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারত না৷ তাকে খুঁজে বের করতুমই৷ কিন্তু টর্চের আলোয় সঠিক চিহ্ন চোখে পড়া মুশকিল৷’’

চারদিকে নিঃঝুম কবরখানা যেন৷ বেশ হিম পড়েছে৷ কুয়াশা ঘন হয়েছে চারপাশে৷ চাঁদটা আকাশের মাঝামাঝি এসে যেন অবাক হয়ে আমাদের দেখছে৷ কর্নেল আরও কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে বললেন, ‘‘না৷ লোকটা যেন বেমালুম উবে গেছে৷’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘সেই পিরামিডপাথরটা কতদূরে?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘বোঝা যাচ্ছে না ঠিক৷ তবে..... এক মিনিট৷’’ পশ্চিমে ঘুরে কী দেখতে দেখতে ফের বললেন, ‘‘কাছে একটা গির্জার মতো লাল রঙের উঁচু পাথর আছে৷ ওইটে কী?’’

‘‘চলুন না৷ ওদিকে গিয়ে দেখি৷’’

গির্জাপাথরই বটে৷ সেখানে গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ—ওই দেখো, চাঁদের পাথর৷’’

পিরামিডের মতো তিনকোনা ফুট-পনেরো উঁচু পাথরটার কাছে গেলুম তিনজনে৷ তারপর কর্নেল আমাদের অবাক করে পাথরটার ওপর কান চেপে রেখে দাঁড়ালেন৷ ‘‘জয়ন্ত! বলভদ্র! শোনো! পাথরটার ভেতর খুব চাপা কিসের শব্দ শোনা বাচ্ছে!’’

‘‘বলেন কী!’’ বলে আমি কান পাতলুম পাথরটার ওপর৷ আমার গা শিউরে উঠল; বহু দূরে ট্রেনের হইসলের যেমন শব্দ হয়, তেমনি একটা চাপা দূরের শব্দ৷

বলভদ্র শুনেই ছিটকে সরে গিয়ে বলল, ‘‘অপদেওতার ঘুম ভাঙছে স্যার৷ দু’রাত পরেই সেই পূর্ণিমা৷ তাই সে জেগে উঠছে৷ আর এখানে থাকা ঠিক নয়৷’’

প্রীতমের অনুসন্ধান এ রাতে নিষ্ফল জেনে আমরা হতাশা ও দুর্ভাবনা নিয়ে বাংলোয় ফিরে গেলুম৷ পেছনদিকে টর্চের আলো ফেলে দেখলুম, মৃত অতিকায় গিরগিটিটা তেমনই পড়ে আছে৷

লণ্ঠনের আলোয় আমরা তিনজন বিষণ্ণভাবে বসে রইলুম৷ এ রাতে খাওয়ার কথা আমাদের মাথায় ছিল না৷ হতভাগ্য ছেলেটার কথা ভেবে অস্থির হচ্ছিলুম তিনজনেই৷ বলভদ্র প্রীতমকে ছোট্টটি থেকে দেখে আসছে৷ সে তাকে খুব স্নেহ করে৷ রায়পুরে বেড়াতে এলে প্রীতম তাকে নিয়ে কোথায়-কোথায় ঘুরত, বলভদ্র সেই সব গল্প শোনাচ্ছিল আমাদের৷ ছেলেটা বরাবর একটু চঞ্চল এবং দস্যি-স্বভাবের৷

কিন্তু যদি সে চন্ডুলালের কবলে পড়ে থাকে, সে-জন্য তার কোনো দোষ তো নেই৷ এই ভেবে আমার খুব খারাপ লাগছিল৷ তা ছাড়া বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সে৷ একভাই এবং এক বোন৷ তার বরাতে কিছু ঘটলে স্মরজিৎবাবুকে কী জবাব দেব আমরা জানি না৷...

হঠাৎ নিঝুম রাতের স্তব্ধতা ভেঙে গেল মুহুর্মুহ গর্জনে—যেন একপাল বুনো হাতি ক্ষেপে গিয়ে বিকট গর্জন করে উঠল৷ কর্নেল চমকে উঠে বললেন, ‘‘ও কী!’’

বারান্দায় বেরিয়ে গেলুম আমরা৷ নিচের উপত্যকা থেকে যেন একদল ভয়ংকর প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী গর্জন করতে করতে বাংলোর দিকে উঠে আসছে৷

খুব দ্রুত তারা এগিয়ে আসছিল৷ সামনের ঢালে চাঁদের আলোয় তাদের দেখা গেল৷ একপাল প্রকাণ্ড গিরগিটি দু’পায়ে এগিয়ে আসছে৷ তাদের লেজ প্রচণ্ড শব্দে আঘাত করছে মাটিকে৷ মাটি কাঁপছে৷ ভূমিকম্প শুরু হয়েছে যেন৷ গর্জনে কানে তালা ধরে যাচ্ছে৷ তারা বুঝি প্রতিশোধ নিতে আসছে, তাদের একজনকে হত্যা করেছি বলে৷ আমি রাইফেল তুলতেই কর্নেল বাধা দিলেন৷ ‘‘তুমি কি পাগল হয়েছ জয়ন্ত? শিগগির চলো, ওপাশে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়ি৷’’ তারপর আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন৷ বলভদ্রও অনুসরণ করল৷

পশ্চিমে চূড়ার দিকে পাথরের আড়ালে আমরা বসে পড়লুম৷ প্রাণীগুলো কিন্তু বাংলোয় ঢুকল না৷ তারা গর্জন করতে করতে এবং লেজের আঘাতে মাটি কাঁপাতে কাঁপাতে বাংলোর পূর্বদিক ঘুরে পেছনে চলে গেল৷ আমরা উঁচুতে এবং জ্যোৎস্নাও বেশ উজ্জ্বল—ওদের গতিবিধি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলুম৷

এবার ওরা যা করল, তাতে খুব অবাক হয়ে গেলুম৷

সেই মৃত স্বজনকে ওরা ধরাধরি করে বয়ে নিয়ে চলল কয়েকজন৷ বাকি প্রাণীগুলো এবার লেজ আছড়াতে আছড়াতে বাংলোয় ঢুকল৷

বাংলোর ভেতর হুলুস্থুল চলতে থাকল কিছুক্ষণ৷ কর্নেল চাপা গলায় বললেন, ‘‘সর্বনাশ! ওরা আমাদের জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে!’’

বাংলোটা পাথরের না হলে এতক্ষণ ভেঙে চুরমার হয়ে যেত৷ কয়েক মিনিট ধরে ধ্বংসকাণ্ড চালিয়ে ওদের হাঁকডাক থেমে গেল৷ তারপর ওরা বাংলো থেকে বেরিয়ে শবযাত্রীদের সঙ্গে যোগ দিল৷ শোকমিছিল বলে মনে হচ্ছিল৷ এবার ওদের চিৎকারে যেন করুণ কান্না শোনা গেল৷ বুকভাঙা কান্নার শব্দে রুহা উপত্যকার জ্যোৎস্না রাত্রিটা ওরা করুণ করে ফেলল৷

আমার অনুশোচনা জাগল এতক্ষণে৷ কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে৷ আর কিছু করার নেই৷ শোকমিছিল নিচের উপত্যকায় ক্রমশ দূরের দিকে বিলাপ করতে করতে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ তখন আমরা দৌড়ে বাংলোয় গেলুম৷

ঘরের ভেতর একেবারে তছনছ হয়ে গেছে৷ কিচেনের ভেতর খাদ্যদ্রব্য ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে রয়েছে৷ কিন্তু আশ্চর্য ওরা কোনো খাদ্য নিয়ে যায়নি৷ অথচ মৃত সরীসৃপটা তো খাদ্যের জন্যই হানা দিয়েছিল৷

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, ‘‘জীবনে বহু অদ্ভুত-অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে দেখেছি, জয়ন্ত! কিন্তু মধ্যপ্রদেশের রুহা উপত্যকায় যা ঘটতে দেখছি, তা সত্যি বিস্ময়কর! এখানে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হল৷’’

শর্মার আবির্ভাব

বাংলোর পেছনে ইঁদারা প্রস্রবণের কাছে যেখানে নিহত গিরগিটিটা পড়ে ছিল, সকালে সেখানে গিয়ে দেখেছি অনেকটা জায়গা জুড়ে ঘাসগুলো পুড়ে গেছে৷ অ্যাসিড-রক্তের দাহিকাশক্তি এত তীব্র!

আজ প্রায় সারাটা দিন আমরা তিনজনে সারা উপত্যকা তন্নতন্ন খুঁজে বেড়িয়েছি৷ কিন্তু প্রীতমের কোনো খোঁজ পাইনি৷ ওঝা চন্ডুলালেরও গতিবিধির চিহ্ন নতুন করে আবিষ্কার করা যায়নি৷ চাঁদের পাথরের ওখানে কোথাও লুকিয়ে থাকার মতো গুহা বা গোপন জায়গা নেই৷

আর সেই ডাকাত তিনজনই বা গেল কোথায়?

বিদঘুটে গিরগিটি-জাতীয় প্রাণীগুলোর যে কোথায় আস্তানা, তা-ও এক রহস্য!

আমরা শুকনো প্রপাতের কাছে গিয়ে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া খাদ্যদ্রব্যে ক্ষিদে মিটিয়ে নিলুম৷ শুকনো প্রপাতের মাথার ওপর একটা বিশাল গর্তে স্বচ্ছ জল ছিল৷ সেই জলে তৃষ্ণা মিটিয়ে নিলুম৷ পাথরের এই ডোবাটা একসময় নদীর অংশ ছিল৷ নদী অনেকটা দূরে বাঁক নিয়ে অন্যপথে বইছে৷ বলভদ্র বলল, ‘‘ডাকুরা এই জলটা ব্যবহার করেছে৷ এই দেখুন, এখানে বসে ওরা সিগারেট খেয়েছে৷’’

কর্নেল প্রপাতের মাথায় একটা পাথরের দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে কী দেখছিলেন৷ বললেন, ‘‘জয়ন্ত, দেখে যাও৷’’

কাছে গিয়ে দেখলুম, কালো পাথরের ওপর একটা গিরগিটি খোদাই করে রেখেছে কেউ৷ জোরা সায়েবের কবরের কাছে শুকনো রুনী গাছের গুঁড়িতে যেমনটি দেখেছি৷ কিন্তু নিচে লেখা আছে বড়ো হরফে এন এম এস৷ এ তাহলে সেই বিজ্ঞানী নরেন্দ্রমোহন সেহগালের আঁকা৷

গিরগিটিটার পাশে আরও কী যেন খোদাই করা আছে—অথবা পাথরের গায়ে ক্ষয়ের চিহ্ন, ঠিক বুঝতে পারছিলুম না৷ কর্নেল পকেট থেকে আতস কাচ বের করে সেখানটা পরীক্ষা করতে থাকলেন৷ ওঁর মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল৷ বললেন, ‘‘পিরামিড পাথরটা আঁকা আছে দেখছি৷ তার তিনদিকে ছটা বোঝাবার জন্য কতকগুলো আঁক কাটা রয়েছে৷’’...

বিকেল পর্যন্ত আমরা উপত্যকা চক্কর দিয়ে বেড়ালুম৷ সন্ধ্যার একটু আগে বাংলোয় ফিরলুম৷ ইঁদারা থেকে জল আনতে গিয়েছিল৷ বলভদ্র প্রস্রবণের ফিরে এসে বলল, ‘‘উত্তরের পাহাড়ে একটা আলো দেখলুম৷ একটু পরে আলোটা নিভে গেল৷’’ এ নিয়ে মাথা ঘামানোর অর্থ ছিল না৷ প্রীতমের জন্য আমাদের মনের অবস্থা শোচনীয়৷ বারান্দায় বসে চুপচাপ চা খাচ্ছিলুম৷ পুব-দক্ষিণ-পশ্চিমে নিচের উপত্যকায় জ্যোৎস্না আর কুয়াশার খেলা চলছে৷ সেই সময় চাপা গরগর শব্দ শুনে তিনজনেই চমকে উঠেছিলুম৷ তারপর কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘জিপের শব্দ মনে হচ্ছে!’’

জিপের শব্দ শোনা যাচ্ছিল বাংলোর উত্তর-পূর্ব দিকে৷ মোটরগাড়ির দুটো হেডলাইট একবার জ্বলে উঠছে, একবার নিভিয়ে যাচ্ছে যেন৷ আসলে জঙ্গল ও পাথরের আড়াল থাকায় এমন হচ্ছিল৷

মোটর গাড়িটা বাংলোর পেছনের ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করল৷ আমরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ গাড়িটা আমাদের সামনে এসে থেমে গেল৷ তারপর ভারী গলায় কে বলে উঠল, ‘‘হ্যাল্লো কর্নেল!’’

কর্নেল প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘‘মিঃ শর্মা নাকি?’’

একজন লম্বা চওড়া প্রকাণ্ড ভদ্রলোক জিপ থেকে নেমে হ্যান্ডশেক করলেন কর্নেলের সঙ্গে৷ তারপর কুঞ্জলাল ড্রাইভারকে নামতে দেখলুম৷ কুঞ্জলাল সেলাম দিয়ে বলল, ‘‘সব ঠিক আছে তো স্যার?’’

বললুম, ‘‘না কুঞ্জলাল৷ সবকিছু ঠিক নেই৷’’

বনদপ্তরের চিফ কনজার্ভেটর রঘুবীর শর্মা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘‘মিঃ চৌধুরি, রুহা উপত্যকায় কিছুই ঠিক থাকে না বলে আপনাদের খোঁজে না এসে পারলুম না৷ তা ছাড়া সেই আজব রামধনু দেখার ইচ্ছেও ছিল৷ যদিও এখনও আমি ব্যাপারটা বিশ্বাস করি না৷’’

বাংলোর বারান্দায় গিয়ে বসলুম আমরা৷ বলভদ্র ও কুঞ্জলাল নিচু গলায় কথা বলতে বলতে কিচেনে গেল৷ শর্মাসায়েব প্রচুর খাদ্যদ্রব্য এনেছেন৷ রাইফেল আর প্রচুর গুলিও আছে৷ আমরা এবার নিরাপদ বোধ করছিলুম৷

প্রীতমের ব্যাপারটা শুনে মিঃ শর্মা চিন্তিত মুখে বললেন, ‘‘যদি সেই শয়তান জংলি ওঝা ছেলেটাকে চুরি করে থাকে, তাহলে সত্যি ভাবনার কথা৷ শুনেছি সে নরবলি দিয়ে প্রসাদ হিসেবে নরমাংস খায়৷ ওর পেছনে পুলিশের হুলিয়া আছে৷ তাই ব্যাটা এখানে লুকিয়ে থাকে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আমার ধারণা, কাল সন্ধ্যায় পূর্ণিমার চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যদি রামধনু দেখা যায়, চন্ডুলালকে রামধনুটার কাছাকাছি কোথাও পেয়ে যাব৷ ও নিশ্চয়ই প্রীতমকে অপদেবতার উদ্দেশে বলি দেবার মতলব করেছে৷ ওই সময়ই সে বলি দেবে বলে মনে হচ্ছে৷’’

রঘুবীর শর্মা খাপ্পা হয়ে বললেন, ‘‘নিকুচি করেছে শয়তানটার! কুঞ্জলাল, কুঞ্জলাল! শুনে যাও তো৷’’

কুঞ্জলাল এসে বলল, ‘‘বলুন স্যার!’’

‘‘কাল ভোরে তুমি কর্ণগড়ে ফিরে যাও৷ আমি সেখানকার পুলিশ অফিসারকে একটা চিঠি দেব৷ তুমি চিঠিটা পৌঁছে দিয়েই চলে আসবে৷’’ বলে রঘুবীর শর্মা কর্নেলের দিকে ঘুরলেন৷ ‘‘পুলিশ আসলে ঝুঁকি নিতে চায় না৷ নইলে রুহা উপত্যকায় এত ডাকাত আর নরখাদক বদমাশ নিরাপদে লুকিয়ে থাকতে পারে? আজকাল চাঁদে মানুষ যাচ্ছে৷ আর রুহা উপত্যকা তো পৃথিবীতেই৷’’

এ-রাতে কোনো উপদ্রব ঘটল না৷ শুধু শেষ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে উপত্যকার দিকে যেন একটা চিৎকার শুনলুম—অথবা মানুষের আর্তনাদ৷ আবার শোনার জন্য কান পেতে রইলুম৷ কিন্তু শুনতে পেলুম না৷

ডঃ বিষয়ীও এমন আর্তনাদ বা চিৎকার শুনেছিলেন৷ সেও কি ওঁর কানের ভুল?

ভোরে কুঞ্জলাল জিপ নিয়ে চলে গেল কর্ণগড়ের দিকে৷ কর্নেল একা কখন নিচের উপত্যকায় গিয়েছিলেন৷ ফিরে এসে বললেন, ‘‘ডাকাত তিনজনকে পরশুদিন বাইনোকুলারে খুঁটিয়ে দেখেছিলুম৷ এইমাত্র একটা লোকের মৃতদেহ দেখে এলুম, সে তাদেরই একজন৷’’

রঘুবীর শর্মা উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘‘সর্বনাশ! নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করে মরেছে নাকি?’’

‘‘মনে হল না৷ কোন প্রচণ্ড শক্তিশালী দৈত্য যেন লোকটাকে পাথরে আছাড় মেরে গুঁড়ো করে ফেলেছে৷ তার রাইফেলটা ভেঙেচুরে পড়ে আছে৷’’

আমি বললুম, ‘‘কর্নেল৷ লোকটা সবুজ গিরগিটিদের পাল্লায় পড়েনি তো?’’

কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘‘হয়তো তাই৷ তা ছাড়া আর কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷ জয়ন্ত, তুমি তো বটেই—আমরা সবাই গতরাতে জোর বেঁচে গেছি!’’

অপরূপ রামধনু

সূর্য দূরের পাহাড়ের পেছনে নেমে গেলে আমরা বেরিয়ে পড়লুম চাঁদের পাথরের দিকে৷ আজ সেই কার্তিক পূর্ণিমা৷ কুঞ্জলাল ড্রাইভার বিকেলে ফিরে এসেছে৷ সন্ধ্যার মধ্যে পুলিশ-বাহিনী এসে যাবে৷ আমার মনে হচ্ছিল, শর্মা এটা বাড়াবাড়ি করলেন৷ পুলিশের কোনো দরকার ছিল না৷ আমাদের কাছে এখন দুটো রাইফেল আর একটা রিভলবার৷ বলভদ্রের বল্লম আর কুঞ্জলালের হাতে একটা লাঠি আছে৷ দু’জন ডাকাত আর ওই নরখাদক চন্ডুলালকে সায়েস্তা করার পক্ষে এসবই যথেষ্ট৷

রুহা উপত্যকা ধূসর আলায় ঢাকা৷ পিরামিড পাথরের দিকে আমরা সাবধানে এগিয়ে যাচ্ছিলুম৷ পাথরের আড়ালে গুড়ি মেরে শিকার-সন্ধানীর মতো—চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে৷

কিছুদূর এগিয়ে গির্জার গড়নের বিশাল লাল পাথরের স্তূপের পেছনে পৌঁছুলুম৷ কর্নেল ইশারায় সবাইকে এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে বসতে বললেন৷

আমি আর কুঞ্জলাল দুটো পাথরের মাঝখানে নজর রেখে বসলাম৷ হাত তিরিশেক তফাতে পিরামিড গড়নের সেই ত্রিকোণ চাঁদের-পাথরের চূড়াটা সামান্য বেঁকে আছে পূর্বদিকে৷ মিনিট পাঁচেক পরে কানে এল চাপা শিসের শব্দ৷ উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠলুম৷ চাঁদের পাথরের যেন ঘুম ভেঙে গেছে৷ ক্রমশ জেগে উঠছে৷ আর ওই ক্ষীণ শিসের শব্দ কি তার ঘুমভাঙার গান?

তারপর দেখলুম চাঁদের পাথর ঘিরে একটা কুয়াশা উঠেছে টুপির মতো অর্ধবৃত্তাকার৷

হঠাৎ কেউ হা-হা করে হেসে উঠল!

এখনও জ্যোৎস্না ফোটেনি৷ গোধূলির ধূসর আলো থমথম করছে৷ সেই অস্পষ্ট আলোয় চাঁদের পাথরের কাছে একটা মূর্তি ফুটে উঠল৷ হাসিটা তারই৷

লোকটা অর্ধনগ্ন৷ কোমরে একফালি কৌপিন৷ গলায় একগুচ্ছ পাথরের মালা৷ তার একহাতে একটা প্রকাণ্ড খড়্গের মতো অস্ত্র৷ তার মাথায় জটার মতো একরাশ চুল৷ সে হাসি থামিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় কী বলে উঠল৷

তারপর দেখি, দুটো লোক কী একটা বয়ে নিয়ে এল ওপাশের পাথরের স্তূপের আড়াল থেকে৷ জিনিসটা নামিয়ে দিতেই সেটা নড়াচড়া করতে থাকল৷ তারপর ক্ষীণ গোঙানির শব্দ শুনতে পেলুম৷

সঙ্গে-সঙ্গে বুঝতে পারলুম, ওটা প্রীতম! তাকে ওরা বলি দিতে এনেছে৷ রাইফেল তুলে কর্নেলের সংকেতের অপেক্ষা করছি, এমন সময় লোকদুটোর হাতে রাইফেল দেখে ভড়কে গেলুম৷ সর্বনাশ! এরা দেখছি সেই তিনজন ডাকাতের বাকি দু’জন! তারা রাইফেল তাক করে পাহারা দিচ্ছে৷ কুঞ্জলাল ফিসফিস করে বলল, ‘‘ওই সেই জংলি ওঝা চন্ডুলাল৷’’

চন্ডুলাল হা-হা করে আবার অট্টহাসি হেসে পূর্ণিমার চাঁদটার দিকে অস্ত্রটা নেড়ে মন্ত্র আওড়াতে থাকল৷

এদিকে কিসের শব্দ বাড়ছে৷ চাঁদের পাথরের ওপর কুয়াশার রঙটা ক্রমশ সবুজ হয়ে আসছে৷ তারপর এক বর্ণনাতীত দৃশ্য দেখলুম৷ অর্ধবৃত্তাকার সবুজ কুয়াশার ভেতর রামধনুর সাতটা রঙ ফুটে উঠছে৷ মহাপুরুষ ও দেবদেবীর মাথার তিনদিকে যেমন চিত্রশিল্পীরা জ্যোর্তিবলয় এঁকে দেন, চাঁদের পাথরের তিনদিকে তেমনই একটা অপরূপ বর্ণচ্ছটা জেগে উঠল৷ তারপর সেই বর্ণচ্ছটা চাকার মতো বনবন করে ঘুরতে থাকল৷ শিসের শব্দ তীব্রতর হতে থাকল৷ চন্ডুলালের লাফালাফি শুরু হল৷ সে এবার অস্ত্রটা নিয়ে প্রীতমের চারপাশে নাচতে নাচতে মন্ত্র পড়তে থাকল৷

কর্নেল কেন এখনও সংকেত করছেন না কে জানে! যে কোনো মুহূর্তে জংলিটা প্রীতমের গলায় কোপ বসিয়ে দিতে পারে৷ আমি অস্থির হয়ে উঠলুম৷ কুঞ্জলালও লাঠিটা বাগিয়ে ধরেছে৷

তারপর ঘটল একেবারে অভাবিত ঘটনা!

চাঁদের পাথরের দু’পাশ থেকে যেন মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল একপাল অতিকায় গিরগিটি৷ তাঁরা চাঁদের পাথরকে বেড় দিয়ে ধরল চারদিক থেকে৷ তাদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল৷ তারা নিঃশব্দে পাথরটার ওপর সেঁটে রইল দু’পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে৷ শিসের শব্দ আরও জোরালো হয়ে উঠল৷ রামধনু-চাকাটা আরও জোরে বনবন করে ঘুরতে থাকল৷ আর নানা রঙের স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে পড়তে থাকল৷

চন্ডুলাল থমকে দাঁড়িয়ে গেছে ওই দৃশ্য দেখে৷ ডাকাত-দু’জনও যেন ভড়কে গিয়ে একটু তফাতে সরে এসেছে৷

আচম্বিতে চাঁদের পাথর থেকে ছিটকে সরে এল একটা দানব গিরগিটি৷ কানে তালা ধরানো বিকট গর্জন করে সে লেজের বাড়ি মারল ডাকাতদুটোকে৷

চন্ডুলাল একলাফে এসে পড়ল আমাদের সামনে৷ তার হাতের খাঁড়াটা ঝনঝন শব্দে পড়ে গেল একটা পাথরের ওপর৷

অমনি কুঞ্জলাল তার দুই ঠ্যাঙে লাঠির বাড়ি মারল৷ চন্ডুলাল পড়ে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠল৷ গিরগিটিটা সঙ্গে সঙ্গে এদিকে ঘুরল৷ তারপর লেজ বাড়িয়ে চন্ডুলালকে লেজে জড়িয়ে প্রচণ্ড জোরে আছাড় মারল৷ মনে হল, চন্ডুলালের শরীর গুঁড়ো হয়ে গেল৷

সেই সময় কর্নেলের চিৎকার শুনলুম৷ ‘‘পালিয়ে এসো সবাই৷ আর এখানে থেকো না কেউ!’’

পাথরের স্তূপের আড়ালে আমরা দৌড়তে শুরু করলুম৷ কিছুদূরে গিয়ে চেঁচিয়ে ডাকলুম, ‘‘কর্নেল! কর্নেল!’’

কাছেই কর্নেলের সাড়া এল৷ ‘‘এখানে চলে এসো জয়ন্ত৷’’

খোলা জায়গায় বালির ওপর কর্নেল, রঘুবীর শর্মা আর বলভদ্রকে দেখতে পেলুম৷ হাঁফাতে হাঁফাতে বললুম, ‘‘প্রীতম! প্রীতম যে পড়ে রইল ওখানে!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ওকে আমরা নিয়ে এসেছি৷’’

বলভদ্রের কাঁধে প্রীতমকে দেখে আশ্বস্ত হলুম৷ আজব রামধনুটা এখন ক্রমশ রঙ হারিয়ে ফেলছে৷ শিসের শব্দ কমে আসছে৷ সারা উপত্যকা জুড়ে চাপ-চাপ কুয়াশা এসে জমছে৷ সেই কুয়াশার পর্দার ভেতর সামান্য দূরে ঘন সবুজ অর্ধবৃত্তাকার একটা জিনিস ভেসে রয়েছে৷

কর্নেল বললেন, ‘‘বলভদ্র! কুঞ্জলাল! তোমরা প্রীতমকে নিয়ে বাংলোয় ফিরে যাও৷ প্রীতম অজ্ঞান হয়ে আছে৷ ওর জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা কোরো তোমরা৷ আমরা একটু পরে যাচ্ছি৷’’

অচৈতন্য প্রীতমকে কাঁধে বয়ে নিয়ে চলল বলভদ্র৷ কুঞ্জলাল তাকে অনুসরণ করল৷

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর কর্নেল বললেন, ‘‘এবার আসুন মিঃ শর্মা! আমরা আড়াল থেকে দেখি, চাঁদের প্রাণীগুলো এখন কী করছে৷’’

আমরা তিনজনে আবার গুড়ি মেরে নিঃশব্দে এগিয়ে চললুম চাঁদরের পাথরের দিকে৷

স্বদেশ যাত্রা

এখন আর চাঁদের পাথর ঘিরে সেই অপরূপ রামধনু নেই৷ শিসের শব্দও শোনা যাচ্ছে না৷ পিরামিড-পাথরটার গায়ে দুটো হাত রেখে মানুষের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে দু’পায়ে অতিকায় ডাইনোসরের মতো একদল গিরগিটি৷ জ্যোৎস্নায় তাদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল৷ তাদের চোখগুলো নীল৷ ঝকমক করছিল জ্যোৎস্নায়৷ তাদের লেজগুলো শান্তভাবে ছড়িয়ে ছিল মাটিতে৷

তারপর তারা একসঙ্গে অদ্ভুত একটা চাপা কান্নার শব্দ করতে লাগল৷ সে-রাতে মৃত স্বজনকে বয়ে নিয়ে যাবার সময় তাদের ঠিক এরকম সুরে বিলাপ করতে শুনেছিলুম৷

এ যে সম্মিলিত কণ্ঠে মর্মান্তিক বিলাপ, তাতে কোনো ভুল নেই৷ এমন সমবেত শোকসঙ্গীত জীবনে কখনও শুনিনি৷ এ কি নির্বাসিতের বেদনার গাথা—ওরা সুর ধরে গাইছে?

হেমন্তের জ্যোৎস্না আর কুয়াশায় আচ্ছন্ন রুহা উপত্যকার নৈঃশব্দ্য খানখান হয়ে যাচ্ছিল চান্দ্র প্রাণীদের তীব্র তীক্ষ্ণ শোকসঙ্গীতে৷

তারপর যা দেখলুম, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলুম না৷

দূরের ঝড়ের মতো শনশন শব্দের সঙ্গে ত্রিকোণ কালো পাথরটা নড়ে উঠল৷ শনশন শব্দটা বাড়তে থাকল৷ তারপর পাথরটা মাটিছাড়া হয়ে ধীরে মহাকাশযানের মতো উঠতে শুরু করল৷

রঘুবীর শর্মা উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘‘ওটা কি স্পেসশিপ?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘কে জানে!’’

পিরামিড পাথরটা আঁকড়ে ধরে আছে গিরগিটিগুলো৷ আর সেটা ক্রমশ আকাশের কোনাকুনি উড়ে চলেছে৷ রুদ্ধশ্বাসে বললুম, ‘‘ওরা কি আবার চাঁদে ফিরে যাচ্ছে?’’

কর্নেল শান্তভাবে আবার বললেন, ‘‘কে জানে!’’

দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশে কালো বিন্দুর মতো মিলিয়ে গেল চাঁদের পাথর সেই আজব প্রাণীদের নিয়ে৷ রুহা উপত্যকা আবার নিঃঝুম হয়ে গেল আগের মতো৷

কর্নেল এগিয়ে গেলেন কয়েক-পা৷ তারপর বললেন, ‘‘দেখে যান মিঃ শর্মা! জয়ন্ত দেখে যাও!’’

যেখানে পাথরটা ছিল, তার চারপাশে দিনের বেলায় যে রঙীন পাথরগুলো দেখেছিলুম, সেগুলো লাল নীল হলুদ সবুজ নানা রঙে ঝলমল করছে৷ বললুম, ‘‘আশ্চর্য তো!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ জয়ন্ত! আশ্চর্য তো বটেই৷ কিন্তু তুমি কি ভাবছ এগুলো কিংবদন্তিখ্যাত রুহা উপত্যকার সেই মণিমাণিক্য? না ডার্লিং! এগুলো উল্কাপাথরই বটে৷ তবে এই ঝলমলানি খুব সাময়িক৷ চাঁদের পাথরের বিস্ময়কর রশ্মিকণার প্রভাবে এগুলো উজ্জ্বল হয়ে আলো ছড়াচ্ছে৷ কিছুক্ষণের মধ্যে এগুলো আবার যা ছিল, তাই হয়ে যাবে৷ লোকে ভাবত এই পাথরগুলো বুঝি মূল্যবান হীরে-চুনী-পান্না৷ মাচি সিং ডাকাতও তাই ভেবেছিল৷ একগাদা পাথর থলেয় ভরে লুকিয়ে রেখেছিল৷ কিন্তু সেগুলো নিছক কার্বনেসিয়াম কনড্ডাটেভরা সাধারণ উল্কাপাথর ছাড়া আর কিছু নয়৷’’

‘‘আপনি কি মাচি সিংয়ের লুকোনো গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছেন?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘হ্যাঁ৷ তিনটে ক্রশ আঁকা পাথরের তলায় গর্ত করে পোঁতা ছিল৷ বলভদ্র বেচারা শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা দেখে খুব নিরাশ হয়ে পড়েছিল৷ তাই মনের দুঃখে কথাটা তোমাকে বলেনি৷’’

রঘুবীর শর্মা বললেন, ‘‘যাই বলুন, প্রকৃতির রহস্যের কোনো শেষ নেই!’’

কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, ‘‘চলুন, বাংলোয় ফেরা যাক৷ প্রীতমের কাহিনি শুনতে ইচ্ছে করছে৷ ছেলেটার অ্যাডভেঞ্চারের খুব সাধ ছিল৷ ভালো করেই মিটে গেছে সেটা৷’’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%