সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
আমার ছাদের বাগানটিকে বন্ধুরা ঠাট্টা করে ‘শূন্যোদ্যান’ বলে থাকেন৷ সকাল-বিকেল দু’বেলা গিয়ে পরিচর্যা করি! ক’দিন আগে এক বিশেষজ্ঞ বন্ধুর পরামর্শে ফিলোক্যাকটাসের টবটিকে নামিয়ে এনে ড্রয়িং রুমের জানালায় রেখেছিলুম৷ এই প্রজাতিকে বলা হয় এপিফাইলাম হাইব্রিডাম৷ অবিশ্বাস্য সুন্দর ফুল উপহার দিয়েছে৷ দু’থাক উজ্জ্বল লাল লম্বাটে পাপড়ি৷ মধ্যিখানে একগুচ্ছ শিষের মতো পরাগ৷ আবার পরাগের মাথায় খুদে তারার মতো ফুল৷ ভাবা যায় না! ফুলের ভেতর ফুল৷
সকালে শূন্যোদ্যান থেকে নেমে কফি খেয়ে জানালার ধারে ফুলটিকে দেখতে গেলুম৷ সেই সময় চোখে পড়ল, নীচের রাস্তার ওধারে ফুটপাত থেকে একটি যুবক তেতলায় আমার অ্যাপার্টমেন্টের দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে৷
চোখে চোখ পড়তেই সে দু’হাত জোড় করে নমস্কার করল৷ কাতর চাহনি৷ তারপর সে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করতে থাকল৷ কেমন একটা ছটফটানি লক্ষ্য করছিলুম৷ পরনে যেমন-তেমন হাওয়াই শার্ট আর প্যান্ট৷ পায়ে রবারের স্যান্ডেল৷ বুঝতে পারলুম, দরোয়ান তাকে এই অ্যাপার্টমেন্ট হাউসে ঢুকতে দেয়নি৷ ষষ্ঠীকে ডেকে বললুম, ‘‘ওকে নিয়ে আয়৷’’
ষষ্ঠী উঁকি মেরে দেখে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘‘দেখে কেমন যেন লাগছে, বাবামশাই! আজকাল যাকে-তাকে ঘরে ঢোকালেই ডেঞ্জার৷’’
চোখ কটমটিয়ে তাকালে সে বেরিয়ে গেল৷ ইজিচেয়ারে বসে খবরের কাগজ টেনে নিলুম৷ কাগজের খবর আজকাল আর পড়তে ইচ্ছে করে না৷ রাজনীতি নিয়ে সেই কচকচানি খাড়া-বড়ি-থোড় থোড়-বড়ি-খাড়া৷ তাই বিজ্ঞাপন পড়ি৷ সত্যি বলতে কী, বিজ্ঞাপনের মতো মজাদার জিনিস আর কিছু নেই৷ বিশেষ করে ‘নিরুদ্দিষ্ট’ কলমটি চমকপ্রদ৷ কোনও ফোটোগ্রাফের তলায় ‘খোকা ফিরে এসো, মা শয্যাশায়ী৷’ কোনওটার তলায় নাম-ধাম, নিরুদ্দিষ্ট হওয়ার তারিখ, ‘ছিটগ্রস্ত’ বা ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’...
একটি ফটোর তলায় লেখা—
‘এর নাম সুরঞ্জন দাশ৷ আলফা ট্রেডিং কোম্পানির আড়াই লাখ টাকা তছরুপ করে পালিয়ে গিয়েছে৷ কেউ কোথাও একে দেখলে নিকটবর্তী থানায় অথবা কোম্পানির অফিসে জানান৷ ধরে দিলে পুরস্কৃত করা হবে৷ অনুমত্যানুসারে—শিবকুমার মান্না, ম্যাঃ আঃ টেঃ কোং, ২৭০/৫ বি জঃ নেঃ রোড, কল-১৭৷’
সুন্দর স্মার্ট চেহারা৷ চোখে চশমা৷ বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি৷ বয়স-তিরিশ-বত্রিশের বেশি নয় মনে হচ্ছে৷ টাকা তছরুপ করে পালায় যারা, তাদের অবশ্য এমন সভ্যভব্য মার্জিত চেহারা হবে না তার মানে নেই৷ এ পর্যন্ত যত অপরাধী দেখেছি, তাদের অনেকেরই চেহারা বেশ সভ্যভব্য৷ তবে আমার হাতে ধরা-পড়া অপরাধীরা উঁচুতলার মানুষ, এই যা!
কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিলুম৷ আজকাল আর অপরাধ-সংক্রান্ত-রহস্য আমাকে টানে-না৷ প্রকৃতি-রহস্য নিয়েই আছি৷ চুরুট নিভে গিয়েছিল৷ জ্বেলে নিয়ে আবার ফুলটার কাছে গেলুম৷ ষষ্ঠী এত দেরি করছে কেন? বড্ড ফোঁপরদালাল হয়ে গেছে দেখছি৷
প্রায় দশ মিনিট পরে ষষ্ঠী সেই যুবকটিকে নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ বললুম, ‘‘এতক্ষণ কী করছিলি হতভাগা?’’
ষষ্ঠী বিজ্ঞের ভঙ্গিতে বলল, ‘‘জিজ্ঞেসা-টিজ্ঞেসা না করে যাকে-তাকে হুট করে ঘরে আনা যায়? আপনিই কতবার বকেছেন আমাকে৷’’
যুবকটি আমার পা জড়িয়ে ধরতে এল৷ সেইসঙ্গে হাঁউমাউ করে কান্না৷ ‘‘আমাকে বাঁচান স্যার! আমি বড্ড বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি৷’’
ষষ্ঠীকে চলে যেতে ইশারা করলুম৷ তারপর যুবকটিকে বললুম, ‘‘হইচই কান্নাকাটি এসব আমি পছন্দ করি না৷ তুমি আগে বসো৷ তারপর বলো, কী হয়েছে৷’’
চোখের জল মুছে একটু শান্ত হয়ে সে যা বলল, শুনে চমকে উঠলুম৷
তার নাম তপনকুমার ঘড়াই৷ বাড়ি মেদিনীপুর জেলার একটা গ্রামে৷ খুব গরিব ঘরের ছেলে সে৷ মাধ্যমিক পাশ করে টাকার অভাবে পড়াশোনা এগোয়নি৷ কিছুদিন আগে ‘দৈনিক সত্যসেবক’ পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেখে সে চিঠি লিখেছিল৷ বিজ্ঞাপনে বক্স নম্বর দিয়ে ‘কাজের লোক’ চাওয়া হয়েছিল৷ বেকারির জ্বালা বড়ো জ্বালা৷ তাই মাসে দু’শো টাকা মাইনের এই তুচ্ছ চাকরি তার কাছে যথেষ্ট৷ ২৭ নং নকুড়বাবু লেনে তার মনিব ভদ্রলোকের বাস৷ ছাদের একটি ঘরে তিনি থাকতেন৷ কাজে যোগ দেওয়ার পর মনিব তাকে অগ্রিম মাইনে দিয়ে দেন৷ তার কোনও বাক্স-প্যাঁটরা নেই দেখে তিনি একটি বড়ো ট্রাঙ্ক কিনে দেন৷ দিন সাতেক পরে মনিব সি. আর. সেন তাকে আরও কিছু টাকা দিয়ে বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে আসতে বলেন৷ সে বাড়ি গিয়েছিল৷ গতকাল বিকেলের ট্রেনে সে ফিরে আসে৷ হাওড়া স্টেশনে নেমে সে দেখে, ভিড় করে একদল পুলিশ প্ল্যাটফর্মে একটি বাক্স ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে৷ লোকের কাছে জানা যায়, ওর ভেতর একটি মৃতদেহ টুকরো-টুকরো অবস্থায় পাওয়া গেছে৷ সে কৌতূহলবশত উঁকি মেরে দেখেই চমকে ওঠে৷ এ তো তারই সেই ট্রাঙ্ক! মনিব ট্রাঙ্কের ওপর তার নাম-ঠিকানা লিখিয়ে নিয়ে উপহার দিয়েছিলেন৷ সে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে মনিবের বাসায় আসে৷ কিন্তু মনিবের ঘরে অন্য এক ভাড়াটে৷ বাড়ির মালিক বলেন, সি. আর. সেন বাসা বদলেছেন৷ তবে ঠিকানা দিয়ে যাননি৷
তপন বুঝতে পারে, এবার পুলিশ তাকে খুঁজবে৷ কারণ ট্রাঙ্কের ওপর তারই নাম-ঠিকানা লেখা৷ সে কী করবে, বুঝতে পারে না৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকায় আমার অসংখ্য কীর্তিকলাপ সে পড়েছে৷ আমার স্নেহভাজন তরুণ সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর লেখা রোমাঞ্চকর সব রিপোর্ট৷ জয়ন্ত এখন কাশ্মীরের হাঙ্গামার খবর আনতে গিয়েছে৷ তপন আত্মীয় বলে পরিচয় দিয়ে জয়ন্তের ঠিকানা পত্রিকার অফিসে জোগাড় করেছে৷ এর পর জয়ন্তের বাড়ির লোকের কাছে আমার ঠিকানা জোগাড় করতে তার অসুবিধে হয়নি৷ কিন্তু এ-বাড়ির দরোয়ান তাকে ঢুকতে দেয়নি৷—
শোনার পর তপনকে বললুম, ‘‘সি. আর. সেনের পুরো নাম কী?’’
তপন বলল, ‘‘জানি না সার! মাত্র এক সপ্তাহ ওঁর কাছে ছিলুম৷ সায়েবসুবোর মতো কেতা৷ ঘরখানা বেশ সাজানো-গোছানো৷ তবে ফার্নিচার বেশি ছিল না৷ সেনসায়েব কেরোসিনকুকারে নিজেই রান্না-বান্না করতেন৷ আমি সাহায্য করতুম৷ বাজার করে এনে দিতুম৷ টুকরো-টাকরা ফাইফরমাশ খাটতুম৷ খুব অমায়িক মানুষ মনে হত৷’’
‘‘কোনও লোক আসত না ওঁর ঘরে?’’
‘‘না সার! রোজ সকাল সাড়ে ন’টায় খেয়েদেয়ে বেরিয়ে যেতেন৷ ফিরতেন সন্ধ্যা ছ’টা-সাড়ে ছ’টায়৷ ঘরে থাকতে বলতেন৷ কারও সঙ্গে মিশতে বারণ করতেন৷’’
‘‘সেনসায়েবের চেহারার বর্ণনা দাও৷’’
‘‘আন্দাজ বত্রিশ-ছত্রিশের মধ্যে বয়স৷ আমার চেয়ে ময়লা গায়ের রং৷ মাথায়ও উঁচু৷ শক্তসমর্থ গড়ন৷ কোঁকড়া একরাশ চুল ছিল মাথায়৷ কেতাদুরস্ত গোঁফ-দাড়ি ছিল মুখে৷ নাকের গড়ন প্যাঁচার ঠোঁটের মতো সার!’’
তপনের কণ্ঠস্বরে তিক্ততার ভাব৷ তবে তার বর্ণনা শুনে ধারণা হল ছেলেটি বুদ্ধিমান এবং পর্যবেক্ষণক্ষমতা আছে৷ বললুম, ‘‘সেনসায়েব কবে বাসা ছেড়ে গেছেন, বাড়ির মালিক বলেননি?’’
‘‘বললেন গত পরশু সকালে৷ সেদিন রোববার ছিল৷ আগের রাত্তিরে ওঁকে বলে রেখেছিলেন সেনসায়েব৷’’
‘‘তুমি কবে দেশে গিয়েছিলে?’’
‘‘গত শুক্রবার৷’’
‘‘সেনসায়েবের অফিস কোথায় ছিল জানো?’’
‘‘না সার! জিজ্ঞেস করিনি৷ তা ছাড়া মাত্র এক সপ্তাহ ছিলুম৷ সুযোগ পাইনি জানার৷’’
চোখ বুজে চুরুট টানতে থাকলুম৷ ট্রাঙ্কের বডিটা সেনসায়েবের নয় তো? তপনই তাকে খুন করে বাঁচার জন্যে গল্প ফাঁদতে আসেনি তো? টাকাপয়সার লোভে কাজের লোকেরা আজকাল এ-ধরনের কাজ করছে৷ প্রায়ই কাগজে খবর বেরোয়৷ এমন তো হতেই পারে, তড়িঘড়ি নিজের নাম লেখা ট্রাঙ্কে মনিবের বডি পাচার করে পরে খেয়াল হয়েছে ট্রাঙ্কে তার নাম লেখা আছে!
চোখ খুলে বললুম, ‘‘টেলিফোন ছিল তোমার সায়েবের?’’
তপন বলল, ‘‘না সার! দোতলায় বাড়িওয়ালা থাকেন৷ তাঁর ফোন আছে৷ মাঝে-মাঝে সেনসায়েবের ফোন আসত৷ বাড়িওয়ালা খবর পাঠাতেন৷ সেনসায়েব ঘরে না থাকার সময় বারকতক ফোন আমিও গিয়ে ধরেছি৷ বলেছি, সায়েব নেই৷ কিছু বলতে হবে? জবাব এসেছে, বলবেন ঘোষবাবু ফোন করেছিলেন৷ প্রত্যেকবার সার ঘোষবাবুর ফোন৷ সেনসায়েবকে বললে উনি বলেছেন, ঠিক আছে৷’’
‘‘বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের নাম কী? ফোন নম্বরটা জানো?’’
‘‘আসল নাম জানি না৷ ঘেঁটুবাবু বলতে শুনেছি৷ ফোন নম্বর তো লক্ষ্য করিনি সার!’’
‘‘ঠিকানা ২৭ নং নকুড়বাবু লেন বললে৷ কোথায় সেটা?’’
‘‘শ্যামবাজার এরিয়ায়৷ ঘিঞ্জি গলি একটা৷’’
উঠে দাঁড়িয়ে বললুম, ‘‘চলো৷ বাড়িটা দেখিয়ে দেবে৷’’
তপনের মুখ অমনই বিবর্ণ হয়ে গেল৷ হাত জোড় করে বলল, ‘‘আপনার পায়ে পড়ি সার৷ আমাকে ওখানে নিয়ে যাবেন না৷ এতক্ষণ হয়তো পুলিশ...’’
তাকে থামিয়ে ধমকের ভঙ্গিতে বললুম, ‘‘পুলিশের জানার কথা নয় তুমি ও-বাড়িতে কাজ করতে৷’’
সে হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘‘কিছু বলা যায় না সার! আমকে ফাঁসানোর জন্য সেনসাহেব হয়তো...’’
‘‘ঠিক আছে৷ তুমি আমাকে গলিটা চিনিয়ে দেবে শুধু৷ চলো!’’
তপন অনিচ্ছা-অনিচ্ছা করে উঠে দাঁড়াল৷ মনে হল যেন তাকে ফাঁসিকাঠে ঝোলানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷
তপনের নির্দেশমতো একটা গলির মুখে আমার গাড়ি পৌঁছলে বললুম, ‘‘তুমি গাড়িতে বসে থাকো৷ আমি আসছি৷’’
আসলে গলিটা বড্ড বেশি ঘিঞ্জি৷ গাড়ি ঢোকানোর অসুবিধে আছে৷ রিকশ ঠেলা মানুষজনের গিজগিজে ভিড়৷ এঞ্জিন বন্ধ করে চাবি এঁটে নেমে গেলুম৷ তপন ভয় পাওয়া মুখে কুঁকড়ে বসে রইল৷
২৭ নং বাড়িটা আসলে পুরোনো দোতলা৷ ছাদে একটা নতুন ঘর করা হয়েছে৷ বাড়িওয়ালা আমাকে দেখে একটু ভড়কে গেলেন যেন৷ এজন্য আমার সাদা দাড়ি, টুপি, ‘ক্রিসমাসের সান্তাক্লস’ চেহারা (জয়ন্তের ভাষায়) এবং কিঞ্চিত বিদেশি ছাপ (এ-ও জয়ন্তের মতামত) হয়তো দায়ী৷ নমস্কার করে বললেন, ‘‘বলুন সার!’’
‘‘আমি সেনসায়েবের সঙ্গে দেখা করতে চাই৷’’
‘‘উনি তো গত রোববার ঘর ছেড়ে দিয়ে চলে গেছেন৷ নতুন বাসার ঠিকানা দিয়ে যাননি৷’’ বাড়িওয়ালা একটু ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘‘অদ্ভুত মানুষ, সার৷ শনিবার সন্ধ্যায় বললেন ঘর ছেড়ে দেবেন শিগগির৷ চুক্তি অনুসারে অ্যাডভান্স ফেরত পাবেন না৷ যাই হোক, রোববার সকালে ছাদে গিয়ে দেখি, ঘর হাট করে খোলা৷ ভেতরে কিচ্ছু নেই৷ ভোরবেলা কখন চলে গেছেন, টেরও পাইনি৷’’
‘‘নীচের সদর দরজায় তালা দেওয়া ছিল না ভেতর থেকে?’’
‘‘না সার! দরকার হয় না তালা দেওয়ার৷ সিঁড়িটা সোজা ছাদে উঠে গেছে৷ এখানে আমার দরজা৷ এটা বন্ধ থাকলেই আমার সেফটি৷ এই যে দেখছেন কোলাপসিবল গেট৷’’
‘‘সেনসায়েব কি একা থাকতেন?’’
‘‘হ্যাঁ, একা৷ তবে কিছুদিন একজন সারভেন্ট রেখেছিলেন৷ কী যেন নামটা—তপু না তপন৷ গতকাল সন্ধ্যায় সে দেশ থেকে ফিরে এসে অবাক৷ ছুটিতে গিয়েছিল৷ আমাকে তার সায়েবের ঠিকানা চাইল৷ তো...’’
‘‘আপনি জানেন সে ছুটিতে গিয়েছিল?’’
‘‘অত কিছু জানি না সার৷ তবে দু-তিনদিন তার সাড়া পাইনি৷ গতকাল সন্ধ্যায় সে এসে বলল, ছুটিতে দেশে গিয়েছিল৷ অদ্ভুত ব্যাপার, সেনসায়েব নাকি তাকেও কিছু জানাননি৷’’ বাড়িওয়ালা এবার সন্দিগ্ধভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কী ব্যাপার বলুন তো?’’
‘‘শনিবার রাতে ছাদে কোনও শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন?’’
বাড়িওয়ালা ভড়কে গিয়ে বললেন, ‘‘না তো! আপনি—আপনি কে সার?’’
অগত্যা আমার নেম-কার্ডটি ওঁকে দিলুম৷ উনি খুঁটিয়ে পড়ার পর আরও ভড়কে গিয়ে বললেন, ‘‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না৷ আপনি মিলিটারি অফিসার৷ কর্নেল৷ কিন্তু...’’
‘‘আমি অবশ্য রিটায়ার্ড কর্নেল৷ তবে আপনার ভয় পাওয়ার কারণ নেই৷’’ বলে রাশভারী চালে হাসলুম৷ ‘‘আমি কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর পক্ষ থেকে একটা কেসের তদন্তে এসেছি৷’’
ভদ্রলোক আরও ভড়কে গেলেন৷ কাঁপা-কাঁপা গলায় বললেন, ‘‘আমি কিছু জানি না সার! বিশ্বাস করুন৷’’
‘‘আপনি ঘোষবাবুকে চেনেন?’’
‘‘ঘোষবাবু? ঘোষবাবু...ও! হ্যাঁ সার! তাঁকে দেখিনি কখনও৷ তবে প্রায় সেনসায়েবকে ফোন করতেন৷ বলতেন, সেনসায়েবকে ডেকে দিন৷ নাম জিজ্ঞেস করলে বলতেন, বলুন, ঘোষবাবু ডাকছেন৷’’
‘‘কী কথাবার্তা হত ফোনে? মানে, কী নিয়ে কথাবার্তা হত বলে আপনার ধারণা?’’
একটু ভেবে নিয়ে ঘেঁটুবাবু বললেন, ‘‘আমার অনুমান, টাকাকড়ির দেনা-পাওনা নিয়ে৷ কারণ সেনসায়েব বলতেন, পার্টি সামনের সপ্তায় পুরোটাই মিটিয়ে দেবে৷ ইনস্টলমেন্টের প্রশ্ন নেই৷’’
‘‘ইনস্টলমেন্ট?’’
‘‘হ্যাঁ সার! ‘ফ্ল্যাট’ কথাটাও শুনেছি মনে পড়েছে৷ আমার ধারণা, ফ্ল্যাট কেনার ব্যাপারে কথা হত৷ সেনসায়েবকে একবার জিজ্ঞেসও করেছিলুম৷ উনি বলেছিলেন, ওঁর এক বন্ধু ফ্ল্যাট কিনতে চান৷ একজন বিশ্বাসী প্রোমোটার দেখে দিতে বলেছেন৷ ওঁর কথায় মনে হয়েছিল, ওই ঘোষবাবুই প্রোমোটার কিংবা প্রোমোটারের লোক৷’’
‘‘শনিবার সন্ধ্যায় বা রাতে সেনসায়েবের ঘরে কেউ এসেছিল কি না লক্ষ্য করেছিলেন?’’
ঘেঁটুবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘‘আমি আর আমার গিন্নি হরিসভায় গিয়েছিলুম সন্ধ্যাবেলা৷ কাজের মেয়েটিকে বাড়ি যেতে বলে এই দরজায় তালা এঁটে বেরিয়েছিলুম৷ বাড়িতে আর কেউ থাকে না৷ একমাত্র ছেলে খড়্গপুরে এঞ্জিনিয়ারিং পড়ে৷ সে মাসে কদাচিৎ একবার আসে৷ তো ফিরতে রাত প্রায় এগারোটা হয়েছিল৷ নীচের দরজায় কলিং বেল আছে৷ সেনসায়েব দরজা খুলে দিয়েছিলেন৷’’
‘‘আপনার স্ত্রীর সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই৷’’
ঘেঁটুবাবু বিব্রতভাবে বললেন, ‘‘গিন্নি সার আজ সক্কালে বেহালা গেছে বোনের বাড়ি৷’’
‘‘ঠিকানা দিন৷’’
‘‘ঠি—ঠিকানা তো জানি না সার! আমি ওদের বাড়ি কখনও যাইনি৷ আপনি বরং ও-বেলা ফোনে জেনে নেবেন ফিরেছে কি না৷ আমার ফোন নম্বর লিখে নিন৷’’
ফোন নম্বর লিখে নিয়ে চলে এলুম৷ ভদ্রলোক কাকতাড়ুয়ার মতো দাঁড়িয়ে রইলেন৷
গাড়ির দিকে যেতে-যেতে এবার সন্দেহের কাঁটা ঘেঁটুবাবুর দিকে ঘুরল৷ সেনসায়েব কি নিজের জন্যই ফ্ল্যাট কিনেছিলেন এবং টাকা সংগ্রহ করেছিলেন?
টের পেয়ে ঘেঁটুবাবুই কি তাঁকে...
কিচ্ছু অসম্ভব নয়৷ ভদ্রলোকের চেহারা শক্তসমর্থ৷ কথাবার্তায় কেমন যেন তৈরি-করা ছাঁদ৷ তা ছাড়া অমন ভড়কে যাওয়া আমাকে দেখামাত্রই! কেন?
গাড়ির কাছে এসে দেখি, গাড়িতে তপন নেই৷ এদিকে-ওদিকে তাকে খুঁজলুম, কোথাও দেখতে পেলুম না৷ একটা জটিল রহস্যে জড়িয়ে পড়লুম দেখছি! তপনের হঠাৎ গা-ঢাকা দেওয়ার কারণ কী?...
বাড়ি ফিরে ডি. সি. ডি. ডি. অর্থাৎ ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ‘ডেপুটি কমিশনার’ আমার বিশেষ স্নেহভাজন বন্ধু অরিজিৎ লাহিড়িকে রিং করলুম৷ অরিজিৎ বলল, ‘‘হাই ওল্ড বস! এখনই আপনার কথা ভাবছিলুম৷’’
‘‘ভাবার কি কোনও বিশেষ কারণ আছে, ডার্লিং?’’
‘‘বেলা এগারোটায় আপনার রিং করার কোনও কারণ থাকলে আমারও আছে৷’’
হাসতে হাসতে বললুম, ‘‘তা হলে তোমারটা আগে শুনি৷’’
‘‘নাহ৷ আপনিই যখন রিং করেছেন, তখন...’’
‘‘গতকাল সন্ধ্যায় হাওড়া স্টেশনে ট্রাঙ্কে একটা বডি পাওয়া গেছে৷’’
‘‘মাই গড! দ্যাটস দ্য পয়েন্ট৷ জেরবার হয়ে গেছি একেবারে, তাই ভাবছিলুম দাড়িওয়ালা মুশকিল আসানের কাছে যাবো নাকি৷ এনিওয়ে, বলুন৷’’
‘‘বডি শনাক্ত করা গেছে?’’
‘‘গেছে বলেই তো দায়টা এসে পড়েছে কলকাতা পুলিশের ঘাড়ে৷ খুনি তাড়াহুড়ো করেছিল বড্ড৷ বডির বুকপকেটে রক্তমাখা কয়েকটা নেম-কার্ড পাওয়া গেছে৷ মর্গের রিপোর্ট বলছে পটাসিয়াম সাইনায়েডে মৃত্যু৷ তারপর বডি টুকরো-টুকরো করে ট্রাঙ্কে ঢোকানো হয়৷ ট্রাঙ্কের ওপর নাম লেখা আছে...’’
‘‘তপনকুমার ঘড়াই৷’’
অরিজিতের অস্ফুট আর্তনাদ শোনা গেল, ‘‘স্ট্রোকে মারা পড়ব৷ প্লি-ই-জ কর্নেল!’’
‘‘আশা করি তপনের ঠিকানায় পুলিশ রওনা দিয়েছে?’’
‘‘অফ কোর্স৷ কিন্তু আপনি আমায় অগাধ জলে ফেলে দিয়েছেন৷’’
‘‘বডি কি সি. আর. সেন নামে কারও?’’
অরিজিতের হাসি ভেসে এল৷ ‘‘এবার কিন্তু হেরে গেলেন৷ ডেডবডি সুরঞ্জন দাশ নামে এক ভদ্রলোকের৷’’
এবার আমার চমকাবার পালা৷ ‘‘অরিজিৎ! আজই কাগজে তাঁর ছবি বেরিয়েছে৷ আড়াই লক্ষ টাকা তছরুপ করে পালিয়েছিলেন কোম্পানি থেকে৷’’
‘‘ইয়া! ইউ আর ড্যাম রাইট, কর্নেল! আমার থিওরি, টাকাগুলো চোরের ওপর বাটপাড়ি করে নিয়ে কেউ ওঁকে খুন করেছে৷ যাই হোক, সি. আর. সেন কে?’’
‘‘তপনের মনিব৷ হুঁ, পুরোটা আগে তোমার শোনা দরকার৷’’ সংক্ষেপে সব বললুম৷ তারপর বললুম, ‘‘তুমি এখনই ২৭ নং নকুড়বাবু লেনে বাড়িওয়ালা ঘেঁটুবাবুর কাছে যাও৷ জেরা করো৷ মনে হচ্ছে, উনি কিছু গোপন করেছেন আমাকে৷ ওখান থেকে সোজা আমার কাছে চলে আসবে৷’’
এলোমেলো চিন্তায় সময় কাটছিল৷ লাঞ্চের জন্য তৈরি হচ্ছি, অরিজিৎ এল৷ বলল, ‘‘ঘেঁটুবাবু জেরার চোটে স্বীকার করেছেন, রবিবার সকালে ছাদে গিয়ে ঘরের দরজা ভেজানো দেখেছিলেন৷ নেহাত একটু আড্ডা দেওয়ার জন্য ডাকাডাকি করেন৷ সাড়া না পেয়ে দরজা ঠেলে খোলেন৷ ঘর খালি৷ মেঝেয় চাপ-চাপ জমাট রক্ত৷ খুনখারাপিতে জড়িয়ে পড়ার ভয়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে ঘর ধুয়ে সাফ করেন৷ আজকাল ভাড়াটের অভাব হয় না৷ সোমবার বিকেলের মধ্যে পাড়ার এক মুদি ভদ্রলোককে ঘরটি ভাড়া দিয়েছেন৷ খুনের প্রমাণ লোপও অপরাধ৷ কাজেই ঘেঁটুবাবু হাজতে৷ তাঁর স্ত্রীর খোঁজেও পুলিশ গেছে৷ গ্রেফতার করা হবে৷’’
‘‘তোমাকে ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছে ডার্লিং৷ এসো, লাঞ্চে বসা যাক৷’’
অরিজিৎ হাসল৷ ‘‘ভাগে কম পড়বে, বস!’’
ষষ্ঠীচরণ একগাল হেসে বলল, ‘‘আজ্ঞে না! বাবামশাই আপনার কথা বলে রেখেছিলেন৷’’
খেতে বসে বললুম, ‘‘তপন পালিয়ে গেল কেন, এ একটা রহস্য৷ না কি সে কোনও বিপদে পড়ল?’’
অরিজিৎ বলল, ‘‘আপনার তপনচন্দ্রই মার্ডারার৷ নিজের দোষ ঢাকতে আপনার কাছে এসেছিল৷ পাছে ঘেঁটুবাবু দৈবাৎ ওকে শনিবার সন্ধ্যায় দেখে থাকতে পারেন, এই ভেবে সে গা-ঢাকা দিয়েছে৷’’
‘‘অরিজিৎ, ঘেঁটুবাবুকে কাগজে ছাপানো সুরঞ্জনবাবুর ছবিটি দেখানো উচিত৷ এমনও তো হতে পারে, তিনিই সি. আর. সেন নামে ওঁর ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন৷ ফ্ল্যাট কেনার জন্যই টাকা চুরি করেছিলেন কোম্পানি থেকে৷ সেই টাকাই ওঁর মৃত্যুর কারণ—খুনি যেই হোক?’’
‘‘সুরঞ্জনের ছবি ঘেঁটুবাবুকে দেখানো উচিত, এটুকু বুদ্ধি আমার আছে, কর্নেল! আপনার কাছে সব কথা শোনার পর স্বভাবত এমন একটা পয়েন্ট মাথায় আসতে বাধ্য৷ ঘেঁটুবাবু বললেন, না৷ ইনি সি. আর. সেন নন৷ এঁকে উনি কখনও দেখেননি বা চেনেন না৷’’
একটু ভেবে বললুম, ‘‘তা হলে সি. আর. সেন সুরঞ্জন দাশকে চিনত, এতে কোনও ভুল নেই৷’’
অরিজিৎ সায় দিয়ে বলল, ‘‘দ্যাটস রাইট৷ এখন কথা হল, কে এই সি. আর. সেন? তাই না?’’
‘‘তুমি ওই কোম্পানিতে গিয়ে খোঁজ নাও, সি. আর. সেন নামে কোনও কর্মচারী আছেন কিনা৷’’
‘‘ওঃ কর্নেল! আমি শিশু নই৷ খোঁজ অলরেডি নিয়েছি৷ কোম্পানিতে ও-নামে কেউ নেই৷’’
খাওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ আলোচনা হল৷ তারপর অরিজিৎ চলে গেল৷
চুরুট টানতে-টানতে মাথায় একটা আইডিয়া এল৷ খবরের কাগজে আলফা ট্রেডিং কোম্পানির ফোন নম্বর দেওয়া ছিল৷ ফোনে সাড়া এলে বললুম, ‘‘মিঃ শিবকুমার মান্নাকে চাই৷’’
একটু পরে কেউ ভরাট গলায় বলল, ‘‘বলুন৷’’
‘‘মিঃ মান্না?’’
‘‘ইয়া৷’’
‘‘আচ্ছা, মিঃ মান্না, আপনার কোম্পানিতে সি. আর. সেন নামে...’’
‘‘সরি! ও নামে কেউ নেই৷ কে বলছেন আপনি?’’
‘‘সে কী! ঘোষবাবু যে আমাকে বললেন...’’
‘‘কী বলেছেন ঘোষবাবু?’’
গলার স্বর বদলে গেছে এবার৷ চমক চাপা রেখে বললুম, ‘‘সেনসায়েব যে-ফ্ল্যাটটা কিনেছেন, তা নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছে৷ ঘোষবাবু সেনসায়েবকে খবর দিতে বললেন আমাকে৷’’
প্রায় আধ মিনিট পরে মিঃ মান্না বললেন, ‘‘কী ঝামেলা?’’
‘‘জমিটা নাকি অন্য লোকের৷ সেই ভদ্রলোক কেস করবেন বলে শাসিয়েছিলেন৷’’
‘‘আই সি! ঠিক আছে৷’’
লাইন কেটে গেল৷ তখনই অরিজিৎ লাহিড়িকে রিং করে জানিয়ে দিলুম, আমি যাচ্ছি৷ ঘেঁটুবাবুকে নিয়ে এক জায়গায় যেতে হবে৷ খুব জরুরি ব্যাপার৷ সে যেন তৈরি থাকে৷
লালবাজার পুলিশ হেড কোয়ার্টার্স থেকে অরিজিৎ, কয়েকজন পুলিশ অফিসার ও কনস্টেবল এবং হাজত থেকে প্রায় আধমরা ঘেঁটুবাবুকে নিয়ে আলফা ট্রেডিং কোম্পানিতে পৌঁছলুম৷ ২৭০/৫/বি চৌরঙ্গি রোডের একটি গলির ভেতর পুরোনো বাড়ি৷ তিনতলায় কোম্পানির অফিস৷
পুলিশ-বাহিনী করিডোরে রইল৷ অরিজিৎ, ঘেঁটুবাবু এবং আমি অফিসে ঢুকে ম্যানেজারের খোঁজ করলুম৷ ঘরসুদ্ধু লোক ছানাবড়া চোখে তাকিয়ে রইল৷ একজন কর্মচারী ম্যানেজারের চেম্বার দেখিয়ে দিল৷ আমরা ঢুকলে ম্যানেজার শিবকুমার মান্না ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন৷ কিন্তু তপনের বর্ণনার সঙ্গে তত মিলছে না তো! চুল কোঁকড়া নয়৷ টাক আছে৷ গোঁফ-দাড়ি নেই৷ তবে নাকটা বাঁকা এবং ঘোরালো৷ গায়ের রং ময়লাই বটে৷ বললুম, ‘‘দেখুন তো ঘেঁটুবাবু, এঁকে চেনেন নাকি?’’
ঘেঁটুবাবু দেখতে-দেখতে প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, ‘‘চিনতে পেরেছি! মাথার চুল দেখে গিন্নি ঠিকই সন্দেহ করত, সেনসায়েব পরচুলো পরে থাকে৷’’
শিবকুমার মান্না এতক্ষণে উঠে দাঁড়িয়ে তর্জন-গর্জন জুড়ে দিলেন৷ ‘‘কী বলছেন মশাই?’’
অমনই ঘেঁটুবাবু আরও চ্যাঁচামেচি করে বললেন, ‘‘সেনসায়েবের গলা! সেনসায়েবের গলা!’’
শিবকুমার মান্না ওরফে সি. আর. সেনকে গ্রেফতার করা হল৷ কোম্পানির মালিক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন৷ তাঁকে বললুম, ‘‘আপনার ম্যানেজারই আড়াই লাখ টাকা চুরি করেন গত শনিবার৷ সুরঞ্জনবাবুর কাঁধে দোষ চাপানোর জন্যে তাঁকে সেই রাত্রে খেতে নেমন্তন্ন করেন৷ বিষ খাইয়ে মেরে ট্রাঙ্কে তাঁর বডি পাচার করেন৷ রবিবার ছুটি ছিল৷ সোমবার চুরিটা ধরা পড়ে৷ সুরঞ্জন অনুপস্থিত৷ কাজেই তার কাঁধে দোষ চাপাতে কাগজে বিজ্ঞাপন দেন মান্নাসায়েব৷ কারণ তিনিই জানেন, সুরঞ্জন যে টাকা মেরে পালাননি, তা জানাতে ফিরে আসার কোনও চান্স নেই৷ তিনি মৃত৷ অতএব তাঁর কাঁধে চুরির দায় বহাল রইল অনন্তকাল৷ আর দৈবাৎ বডি শনাক্ত হলে খুনের দায় যাতে তাঁর কাজের লোকের ঘাড়ে পড়ে, সে-ব্যবস্থা আগে থাকতে করে রেখেছিলেন মান্নাসায়েব৷ একটা ফ্ল্যাট কেনার জন্যে এই কুকীর্তি৷’’
ঘেঁটুবাবু উঃ আঃ করে কপাল চাপড়াতে থাকলেন৷ অরিজিৎ বলল, অসাধারণ মোডাস অপারেন্ডি এবং অসাধারণ আপনার রহস্যভেদ-পদ্ধতি, কর্নেল!’’
বললুম, ‘‘রহস্যের চাবিকাঠিটি কিন্তু একটি কথা; ‘ঘোষবাবু’৷ মোডাস অপারেন্ডিটা মাথায় রেখে মান্না সায়েবকে রিং করলুম৷ ব্যস, কাজে লেগে গেল৷ কিন্তু তপনের অন্তর্ধান রহস্যের কিনারা এখনও হল না!’’
অরিজিৎ বলল, ‘‘দেখা যাক৷ খুঁজে বের করে ফেলব দেখবেন৷’’
তপনের জন্যে উদ্বেগ রয়ে গেল৷
পরদিন সকালের কাগজে খবরটা বড়ো আকারে বেরোল৷ শূন্যোদ্যান থেকে নেমে জানালার ধারে ফিলোক্যাকটাসটিকে দেখতে গিয়ে লক্ষ্য করলুম, নীচের ফুটপাতে তপন! চোখে চোখ পড়লে কালকের মতো ভঙ্গি করল৷ ষষ্ঠীকে ডাকতে পাঠালুম৷
তপন এসে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলল, ‘‘পালিয়েছিলুম সার! আপনি চলে যাওয়ার পর পুলিশের একটা গাড়ি এসে আপনার গাড়ির কাছে যেই থেমেছে, আমি ভাবলাম...’’
‘‘তুমি ভাবলে তোমাকে ধরতে এসেছে! বোকা কোথাকার!’’ বলে ষষ্ঠীকে ডাকলুম৷ ‘‘একে কিছু খাইয়ে দে৷ মুখ দেখে মনে হচ্ছে, পেটে কিছু পড়েনি৷’’
ছেলেটির চোখ কৃতজ্ঞতায় ছলছল করে উঠল৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন