হোহেনহুম্বার গুপ্তধন

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে. কে. হালদার অর্থাৎ আমাদের প্রিয় ‘হালদারমশাই’ খবরের কাগজ পড়ছিলেন৷ হঠাৎ তিনি খি খি করে হেসে উঠে বললেন, —কী কাণ্ড!

জিজ্ঞেস করলুম, —কী ব্যাপার হালদারমশাই?

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, —বিজ্ঞাপনের পাতায় পোলাপানের ছড়া লিখছে৷

—কী ছড়া?

হালদারমশাই কিছু বলার আগেই কর্নেল বলে উঠলেন, —বিজ্ঞাপনের পাতায় যা ছাপা হয়, তার জন্য কিন্তু পয়সা লাগে৷ জয়ন্ত অবশ্য সাংবাদিক৷ ওদের দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার বিজ্ঞাপনের রেট আজকাল কত চড়া, তা ওর জানার কথা নয়৷ আমার হিসেবে বোল্ড হরফে ছাপা ওই দু’লাইন ছাপতে অন্তত শ’পাঁচেক টাকা লাগার কথা৷

হালদারমশাই তাকিয়ে ছিলেন৷ অবাক হয়ে বললেন, —পাঁচশো টাকা খরচ করছে ছড়া ছাপার জন্য? ক্যান?

কর্নেল হাসলেন৷ —সত্যসেবক পত্রিকার শিশুবিভাগ আছে৷ প্রতি রবিবার তার জন্য আধপাতা বরাদ্দ৷ ওখানে ছড়া ছাপা হলে ছড়ালেখক পয়সা পেতেন৷ তা না করে বিজ্ঞাপনে ছড়া ছেপেছেন৷ এতে আপনার কি অবাক লাগছে না হালদারমশাই?

প্রাইভেট ডিটেকটিভ হঠাৎ নড়ে বসলেন৷ দ্রুত এক টিপ নস্যি নিয়ে আবার কাগজটার দিকে ঝুঁকে পড়লেন৷ বিড়বিড় করে আওড়ালেন:

‘‘ক’য়ে কানা খ’য়ে খোঁড়া

গ’য়ে গাধা ঘ’য়ে ঘোড়া৷’’

আমি উঁকি মেরে বিজ্ঞাপনের পাতায় ‘চোখে পড়ার মতো’ এই ছড়াটা দেখে নিলুম৷ বললুম,—কোনও পাগলের কাজ৷ শিশুবিভাগে তার ছড়া ছাপেনি বলেই পয়সা খরচ করে ছেপেছে৷

হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন, —তা হইলে নিজের নাম দেয় নাই ক্যান? বলে তিনি কর্নেলের দিকে তাকালেন৷ —কর্নেলস্যার! আমার ক্যামন য্যান মিসটিরিয়াস ঠেকতাছে৷

কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বললেন, —আপনি ঠিক ধরেছেন হালদারমশাই৷

গোয়েন্দাপ্রবরের গোঁফের ডগা উত্তেজনার চোটে তিরতির করে কাঁপছিল৷ সোজা হয়ে বসে তিনি বললেন, —এই ছড়া কাগজে ছাপাইয়া কেউ কারে কোনও গোপন কথা জানাইতে চায়৷

—ঠিক৷ ধরা যাক, এক্স এবং ওয়াই দু’জন লোক৷ এক্স-ওয়াইয়ের মধ্যে পরস্পর যোগাযোগ নেই৷ ছড়াটা যোগাযোগ ঘটিয়ে দেবে৷

দু’জনের এইসব কথাবার্তা শুনে আমার হাসি পাচ্ছিল৷ বললুম, —তা হলে ছড়া কেন? এক্স সোজা বিজ্ঞাপন দিলেই পারত: ওয়াই, তুমি যেখানেই থাকো, আমাকে দেখা করো৷ এ ধরনের হারানো-প্রাপ্তি-নিরুদ্দেশ-সংক্রান্ত কত বিজ্ঞাপন কাগজে বের হয়!

হালদারমশাই বললেন, —জয়ন্তবাবু৷ কর্নেলস্যারের কথাটা আপনি বোঝেন নাই৷ যোগাযোগ মানে, এক্স ওয়াইরে একটা গোপন খবর দিতে চায়৷ সেই খবর আছে ছড়ায়৷

বিরক্ত হয়ে বললুম, —রোববারের সকালের আড্ডাটা মাঠে মারা গেল৷ কে কী উদ্ভট ছড়া লিখেছে, তার মধ্যেও রহস্যের গন্ধ!

বৃদ্ধ প্রকৃতিবিজ্ঞানী চোখ খুলে মিটিমিটি হেসে বললেন, —আর গন্ধ নয় জয়ন্ত! শব্দ!

একটু অবাক হয়ে বললুম, —শব্দ? কোথায় শব্দ?

—সিঁড়িতে৷ শুনতে পাচ্ছ না দোতলায় লিণ্ডাদের কুকুরটা চ্যাঁচামেচি করছে? নতুন কোনও লোকের সাড়া পেলেই কুকুরটা চ্যাঁচায়৷ ব্যস! কুকুরটা চুপ করল৷ তার মানে কেউ তিনতলায় উঠে আসছে৷

তারপরই ডোর-বেল বাজল৷ কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন, —ষষ্ঠী!

একটু পরে একজন বেঁটে নাদুস-নুদুস গড়নের মধ্যবয়সী ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে বললেন, —নমস্কার কর্নেলসায়েব! আমি ঘনশ্যাম মজুমদার৷ কাল কপালীগড় থেকে আপনাকে টেলিফোন করেছিলুম৷

কর্নেল বললেন, —বসুন ঘনশ্যামবাবু৷ আলাপ করিয়ে দিই৷ ইনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদার৷ রিটায়ার্ড পুলিশ ইন্সপেক্টর৷ গণেশ অ্যাভেনিউতে এঁর ডিটেকটিভ এজেন্সি আছে৷ আর—জয়ন্ত চৌধুরি৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার সুখ্যাত ক্রাইম-রিপোর্টার৷

ঘনশ্যামবাবু আমাদের নমস্কার করে বললেন, —আমার পরিচয় দেবার মতো কিছু নেই৷ কপালীগড় রাজবাড়ির কেয়ারটেকার৷

বলে তিনি অর্থপূর্ণ দৃষ্টে কর্নেলের দিকে তাকালেন৷ কর্নেল বললেন,—আপনি যা বলার স্বচ্ছন্দে বলুন ঘনশ্যামবাবু! মিঃ হালদার এবং জয়ন্ত দু’জনেই আমার সহযোগী৷ এদের কাছে আমার কোনও কথা গোপন থাকে না৷ দু’জনকে নিয়েই আমাকে চলতে হয়৷

ঘনশ্যাম মজুমদার একটু ইতস্তত করে বললেন,—আপনি তো কপালীগড় গেছেন বলেছিলেন৷

—-গিয়েছিলুম৷ তবে প্রায় বছর তিনেক আগে৷ কপালীর ঝিলের জলটুঙ্গিতে বিরলপ্রজাতির সারসের খোঁজ দিয়েছিলেন প্রণবেশ সিংহ৷ তো—

ঘনশ্যামবাবু তাঁর কথার ওপর বলে উঠলেন, —সিংসায়েবের পরামর্শেই আপনাকে টেলিফোন করেছিলুম, তা বলেছি৷ ঘটনা এখনও কেউ জানে না৷ প্রাণের দায়ে সিংসায়েবের শরণাপন্ন হয়েছিলুম৷ উনি আমাকে ছোটো ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন৷ ওঁর ছোটোভাই পরমেশ ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সহপাঠী৷ হতভাগ্য পরমেশ ঝিলের জঙ্গলে দাদার বন্দুক নিয়ে শিকার করতে গিয়ে সাপের কামড়ে মারা গিয়েছিল৷

—জানি৷ আপনি এবার ঘটনাটা বলুন৷

ষষ্ঠীচরণ অতিথি-অভ্যাগতের জন্য সবসময় কফির ব্যবস্থা রেডি রাখে৷ সে ট্রে-তে কফি আর স্ন্যাক্স রেখে গেল৷ কর্নেলের কথায় ঘনশ্যামবাবু কফির পেয়ালা তুলে নিলেন৷ তারপর তিনি চাপা স্বরে বললেন, —রাজবাড়িতে একটা প্রাইভেট মিউজিয়াম আছে৷

—হ্যাঁ৷ মিঃ সিংহ আমাকে কথাটা বলেছিলেন৷ কিন্তু আমার হাতে একটুও সময় ছিল না৷ শিগগির কলকাতা ফিরতে হয়েছিল৷

—মিউজিয়ামটা বর্তমান কুমারবাহাদুরদের প্রপিতামহের আমলে প্রথম গড়া হয়৷ ছোটো কুমারবাহাদুর গণেন্দ্রনাথ আমেরিকায় পড়াশুনো করে সেখানেই চাকুরি করতেন৷ ওঁর কোম্পানির ব্রাঞ্চ ছিল নানা দেশে৷ গত বছর উনি চাকুরি ছেড়ে বাড়ি ফিরেছিলেন৷ উনিই মিউজিয়ামে রাখার মতো কয়েকটা জিনিস সঙ্গে এনেছিলেন৷ জিনিসটা তাঁরই৷

কর্নেল চোখ বুজে শুনছিলেন৷ এবার চোখ খুলে বললেন, —জিনিস্টা চুরি গেছে এই তো?

ঘনশ্যামবাবু গলার ভেতরে বললেন, —আজ্ঞে হ্যাঁ৷ দোষটা আমারই৷ আমি একটুখানি সতর্ক থাকলে ওটা চুরি যেত না৷

—জিনিসটা কী?

—একটা সোনার মোহর মনে হবে দেখলে! কিন্তু ছোটো কুমারবাহাদুর বলেছিলেন, ওটা একটা সিল৷ ওতে দুর্বোধ্য কী সব আঁকিবুকি আছে৷ গণেন্দ্রনাথ একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন৷ মুখস্থ থাকে না৷ মিউজিয়ামের রেজিস্টারে ওটার নাম্বার ১২৩৷ নামটা লিখে এনেছি৷

বলে ঘনশ্যামবাবু পকেট থেকে একটা ভাঁজ-করা কাগজ কর্নেলকে দিলেন৷ কর্নেল সেটার ভাঁজ খুলে বললেন, —অদ্ভুত নাম তো! সম্রাট হোহেনহুম্বার সিল৷

ঘনশ্যামবাবু বললেন, —নিয়ম হল, সপ্তাহের শেষদিন শনিবার আমাকে রেজিস্টার খুলে প্রত্যেকটি জিনিস মিলিয়ে দেখতে হয়৷ কাল ছিল শনিবার৷ সকাল ন’টায় যথারীতি মিউজিয়ামে ঢুকেছিলুম৷ হ্যাঁ—একটা কথা বলার দরকার৷ আমাকে রাজবাড়ির ভেতর থেকে একটা গোপন পথে মিউজিয়ামে একলা ঢুকতে হয়৷ আমার বাবা-ঠাকুরদারও একই কাজ ছিল৷ কোনও দিন কিছু হারায়নি৷ তাই আমাকে কুমারবাহাদুরদের অবিশ্বাসের প্রশ্ন ওঠে না৷ তো কাল কী খেয়াল হল, উল্টো দিক থেকে—তার মানে, শেষ নম্বর থেকে মেলাতে শুরু করলুম৷ ১২৩ নং থেকে ১২৯ নং আইটেম ছোটো কুমারবাহাদুরের সংগ্রহ৷ মেলাতে গিয়ে দেখি ১২৩ নং আইটেম নেই৷

—সম্রাট হোহেনহুম্বার সিল?

—আজ্ঞে হ্যাঁ৷ ওটা রাখা ছিল কাচের আলমারিতে৷ সেই আলমারির চাবি আমার কাছে থাকে৷ জিনিসটা নেই দেখে তক্ষুনি চাবি ঢুকিয়ে আলমারি খুলতে গেলুম৷ অমনি টের পেলুম, আলমারির তালা খোলা আছে!

—আর কিছু চুরি যায়নি?

—না৷ শুধু ওই সিলটা উধাও৷

—মিউজিয়ামের দরজা ক’টা?

—দুটো৷ একটা বাইরের দিকে৷ সেটা ভেতর থেকে শক্তভাবে আটকানো৷ তার ওধারে হলঘর৷ অন্য দরজাটা—যেটা দিয়ে আমি ঢুকি সেটার তালা তিনটে৷ খুব মজবুত তালা৷

—আপনি বাইরের দিকের দরজাটা পরীক্ষা করেছিলেন?

—হ্যাঁ৷ যেমন ছিল, তেমনই আটকানো৷

—জানালা ক’টা?

—মিউজিয়ামে কোনও জানালা নেই৷

—আপনি ছাড়া আর কে ঢোকেন মিউজিয়ামে৷ মানে—আর কার কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে?

—বড়ো কুমারবাহাদুর আর মেজো কুমারবাহাদুরের কাছে৷ ছোটো কুমারবাহাদুর বিদেশে থাকার সময় রাজাবাহাদুর যতীন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়৷ তাই তাঁকে চাবি দেওয়া হয়নি শুনেছি৷

—শুধু শুনেছেন?

ঘনশ্যামবাবু একটু চমকে উঠে বললেন, —আজ্ঞে —আমাকে এসব পারিবারিক কথা বলা হয়নি৷ তবে আমার ধারণা, তিন ছেলের জন্য তিনটি চাবি রেখে যাওয়া উচিত ছিল রাজাবাহাদুরের৷ আর কেয়ারটেকারের জন্য আলাদা চাবি তো নেই৷ ছিলও না৷ বড়ো কুমারবাহাদুর তাঁর চাবি দিতেন কেয়ারটেকারকে৷ আর আমি কেয়ারটেকার বহাল হওয়ার পর উনি প্রতি শনিবার আমাকে চাবি আর রেজিস্টার বই দেন৷

—উনি কোনও শনিবার আপনার সঙ্গে কিংবা অন্য কোনও দিন একা মিউজিয়ামে কি ঢোকেন?

—না৷ উনি যে জন্মান্ধ!

—জন্মান্ধ?

—আজ্ঞে হ্যাঁ৷

—মেজো কুমারবাহাদুর ঢোকেন নিশ্চয়ই?

—আজ্ঞে কখনও-সখনও ঢুকতেন৷ কিন্তু দু’বছর আগে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে ওঁর দুটো পা কেটে বাদ দিতে হয়েছে৷ হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন বটে, কিন্তু মিউজিয়ামে ঢুকতে হলে একটা ঘরের মেঝের তলায় সিঁড়ি বেয়ে নেমে সুড়ঙ্গপথে মিউজিয়ামের দরজায় যেতে আবার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে; উনি তাই একতলার ঘরে থাকেন৷ বড়ো কুমারবাবুও তা-ই৷ দুই ভাই একতলায় থাকেন৷

—ওঁদের নাম কী?

—বড়ো কুমারবাহাদুরের নাম কনকেন্দ্রনাথ, —মেজো’র নাম খগেন্দ্রনাথ৷

এবার আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, —ক’য়ে কানা খ’য়ে খোঁড়া৷

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে আমার দিকে তাকালেন৷ হালদারমশাইও ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন৷ কিন্তু থেমে গিয়ে নস্যি নিলেন৷ লক্ষ্য করলুম, —তাঁর গোঁফের ডগা তিরতির করে কাঁপছে৷ অর্থাৎ ভীষণ উত্তেজিত৷

ঘনশ্যাম মজুমদার তখনই আমার দিকে তাকিয়েছিলেন কিন্তু কিছু বললেন না৷ কর্নেল চুরুটের ছাই তাঁর সাদা দাড়ি থেকে ঝেড়ে বললেন,—মিঃ সিংহকে তো ঘটনাটা আপনি জানিয়েছেন৷ এই চুরির ব্যাপারে তাঁর কী ধারণা?

—সিংসায়েব বললেন, —তাঁর মাথায় কিছু ঢুকছে না৷ মিউজিয়ামে অনেক দামি ধনরত্নও আছে৷ সেগুলো না নিয়ে চোর কেন একটা সামান্য সিল চুরি করল, এটা খুব রহস্যজনক৷ এ রহস্যের সূত্র আছে গণেন্দ্রনাথের কাছে৷ কিন্তু তাঁকে চুরির ঘটনা জানালে আমাকেই ঝামেলায় পড়তে হবে৷ এই বলে উনি আপনার নাম ঠিকানা দিলেন৷ আমি তখনই আপনাকে টেলিফোন করেছিলুম৷

কর্নেল চোখ বুজে অভ্যাসমতো টাকে হাত বুলোতে থাকলেন৷ এই সুযোগে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই বললেন,—আপনারে একটা কথা জিগাই ঘনশ্যামবাবু৷

ঘনশ্যামবাবু বললেন, —বলুন৷

—কুমারবাহাদুর এখন হইলেন গিয়া মোট তিনজন৷ ওনাগো পোলা কার কয়জন?

—পোলা—মানে ছেলের কথা বলছেন? আজ্ঞে না স্যার! বড়ো কুমারবাহাদুর বিয়েই করেননি৷ মেজো কুমারবাহাদুর বিয়ে করেছিলেন৷ কিন্তু সন্তানাদি নেই৷ তাঁর স্ত্রী একই গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন৷ আর ছোটো কুমারবাহাদুর আমেরিকায় মেমসায়েবকে বিয়ে করেছিলেন৷ বনিবনা হয়নি৷ ডিভোর্স হয়েছিল৷

—এসব কথা কার থেইক্যা জানলেন?

গোয়েন্দাপ্রবরের প্রশ্নে প্রাক্তন পুলিশের দারোগার মেজাজ ঠিকরে পড়েছিল৷ ঘনশ্যামবাবু একটু ভড়কে গিয়ে বললেন, —আজ্ঞে, আমি তো রাজবাড়ির লোক৷ ওঁর দাদাদের কাছে শুনেছিলুম৷

—আর উনি বিবাহ করেন নাই?

—না৷ খামখেয়ালি মানুষ৷ কপালীগড়ে মন টিকছে না৷ আবার বিদেশে চলে যাবেন বলছিলেন৷

—আপনি বিবাহ করছেন?

—আজ্ঞে হ্যাঁ৷ ঘনশ্যামবাবু এক নিঃশ্বাসে জানিয়ে দিলেন,—আমার দুই মেয়ে৷ তাদের বিয়ে হয়ে গেছে৷ একটি ছেলে আছে৷ দশ বছর বয়স৷ স্কুলে পড়ে৷

প্রাইভেট ডিটেকটিভ আরও কিছু প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে বললেন, —আচ্ছা৷ ঠিক আছে ঘনশ্যামবাবু! আপনি মিঃ সিংহকে গিয়ে জানিয়ে দিন, আমি যাচ্ছি৷ কবে যাচ্ছি, এ-মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না৷ কপালীগড় গিয়ে ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করব৷ আপনি বরং এক কাজ করুন৷ প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদারকে আত্মীয় সাজিয়ে সঙ্গে নিয়ে যান৷ কী হালদারমশাই? আপত্তি আছে?

হালদারমশাই হাসলেন৷ —আপত্তি কিসের? আপনি কইলে আগুনে ঝাঁপ দিমু৷

ঘনশ্যামবাবু ঘড়ি দেখে বললেন, —হাওড়া স্টেশনে একটা-পাঁচে ট্রেন৷ আমি সোজা স্টেশন থেকে এসেছি৷ কলকাতায় আমার চেনা জানা তেমন কেউ নেই৷ মিঃ হালদার যদি দয়া করে আমার সঙ্গে যান, পথেই কোনও হোটেলে দু’জনে খেয়ে নেব৷

হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, —আমারে রেডি হইতে হব না? আমার জন্য চিন্তা করবেন না৷ আপনি এনকোয়ারির কাছে আমার জন্য ওয়েট করবেন৷ ঠিক টাইমে যামু৷

বলেই তিনি সবেগে বেরিয়ে গেলেন৷ ঘনশ্যামবাবু কাঁচুমাচু হেসে বললেন, —আত্মীয় বলার একটু অসুবিধে আছে কর্নেলসায়েব৷

কর্নেল হাসলেন, —হ্যাঁ, হালদারমশাইয়ের ভাষা৷ আপনি ঘটি, উনি বাঙাল৷ কিন্তু এটা কোনও সমস্যা নয়৷ বন্ধু বলে পরিচয় দেবেন৷ স্টেশনে গিয়ে সম্পর্কটা আগে ওঁর সঙ্গে ঠিক করে নেবেন৷ আর একটা কথা৷ উনি একটু হঠকারী স্বভাবের মানুষ৷ বেগতিক দেখলে ওঁকে সামলাতে হবে৷

ঘনশ্যাম মজুমদার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, —প্রাইভেট ডিটেকটিভের কথা আমি যে ভাবিনি, তা নয়৷ আজকাল প্রাইভেট এজেন্সির বিজ্ঞাপন প্রায়ই ছাপা হয়৷ কিন্তু আমি ছাপোষা সামান্য মানুষ৷ সাধ্যে কুলোবে না বলেই বাধ্য হয়ে সিংসায়েবের শরণ নিয়েছিলুম৷ নিয়ে দেখছি ভালোই করেছিলুম৷...

কপালীগড় রাজবাড়ির কেয়ারটেকার ঘনশ্যাম মজুমদার কর্নেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চলে গেলেন৷ তারপর বললুম, —আপনি তখন চোখ কটমটিয়ে আমাকে বাধা দিলেন বটে, কিন্তু এ যে দেখছি সত্যিই ক’য়ে কানা খ’য়ে খোঁড়া৷ আবার গ-ঘও আছে৷ গ’য়ে গাধা বলা হয়েছে ছড়াতে৷ কিন্তু গ’য়ে ছোটোকুমার গণেন্দ্রনাথ৷ ঘ’য়ে ঘনশ্যাম মজুমদার৷

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —ক’য়ে কনকেন্দ্র এবং খ’য়ে খগেন্দ্রও বটে৷ ক খ গ ঘ রহস্য!

—কিন্তু এসবের সঙ্গে কোন সম্রাট হোহেনহুম্বাটুম্বা—

—হোহেনহুম্বা৷ এক মিনিট৷ এনসাইক্লোপিডিয়া অব হিস্টরির এইচ খণ্ডটা দেখে নিই৷

কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের জাদুঘরসদৃশ এই বিশাল ড্রয়িং রুমে বইয়েরও অভাব নেই৷ পাখি-প্রজাপতি-কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে অর্কিড-ক্যাকটাস-ফুল এবং বিজ্ঞান-প্রত্নতত্ত্ব ইতিহাস৷ শুধু বই৷ নানা বিষয়ের বইয়ে আলমারিগুলো ঠাসা৷

কিছুক্ষণ পরে উনি একটা প্রকাণ্ড বই খুলে পড়তে থাকলেন৷ পড়ার পর বললেন, —সম্রাট হোহেনহুম্বা৷ খ্রিস্টীয় আঠারো শতকে প্রশান্ত মহাসাগরে ইউহোনো দ্বীপের সম্রাট৷ ইস্টার আইল্যান্ডের দক্ষিণে ছোট্ট এই দ্বীপের নাম এখনও বদলায়নি৷ ইংলিশ অভিযাত্রী টমাস কুকের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি মারা যান৷ দ্বীপবাসীরা নাকি নরখাদক ছিল৷ এখন ইউহোনো মার্কিনদের দখলে আছে৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিনরা দ্বীপটা দখল করেছিল৷ এখন তাদের সামরিক ঘাঁটি৷ কর্নেল আবার পড়তে শুরু করলেন৷ তারপর মুখ তুলে বললেন,—গুপ্তধন! হোহেনহুম্বার গুপ্তধন! তন্নতন্ন খুঁজেও আজও তার সন্ধান মেলেনি৷ তাই গুজব বলা হয়েছে৷

চমকে উঠে বললুম, —কর্নেল! তা হলে কি গণেন্দ্রনাথের পাওয়া ওই সিলে সেই গুপ্তধনের কোনও সূত্র আছে?

কর্নেল কিছু বলার আগেই টেলিফোন বেজে উঠল৷...

II দুই II

‘গুপ্তধন’ কথাটাতে কেমন যেন একটা গা-ছমছম করা রহস্য জড়িয়ে আছে৷ তাই একটু উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলুম৷ এমন একটা সময়ে টেলিফোনের শব্দ বেজায় বিরক্তিকর৷ কর্নেল সেই প্রকাণ্ড এনসাইক্লোপিডিয়ার পাতায় আবার দৃষ্টি রেখে বললেন, —ফোনটা ধরো জয়ন্ত৷

রিসিভার তুলে সাড়া দিতেই কার কর্কশ কণ্ঠস্বর এসে কানে বিঁধল৷ —অ্যাই হতচ্ছাড়া বুড়ো!

খাপ্পা হয়ে বললুম, —হতচ্ছাড়া বুড়ো মানে? তোমার স্পর্ধা তো কম নয়৷ কে তুমি?

—বুঝেছি৷ তুমি বুড়োর টিকটিকির লেজ সেই রিপোর্টার ছোকরা! জানো তো? টিকটিকির লেজ টানলেই খুলে যায়?

—শাট আপ! টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকেই তোমার নাম্বার জেনে পুলিশকে বলছি৷

কর্নেল হাত বাড়িয়ে আমার হাত থেকে রিসিভার ছিনিয়ে নিয়ে বললেন, —টেলিফোনে ঝগড়াঝাঁটি করা ঠিক নয়৷ হ্যাঁ—আমিই সেই হতচ্ছাড়া বুড়ো৷ বলুন ব্রাদার, কী বলতে চান?.....কপালীগড়ে যেতে নিষেধ করছেন? বেশ তো! কথাটা সোজাসুজি বললেই হয়৷... কী সর্বনাশ! আমার টাক ফুটো করে দেবেন? আমার টাক কী দোষ করল? ছি ছি! কী সব অলক্ষুণে কথাবার্তা!... আহা! টিকটিকি বলবেন না ব্রাদার! আপনি কি জানেন টিকটিকি কথাটা এসেছে ডিটেকটিভ থেকে? আমি মোটেও ডিটেকটিভ নই৷...আচ্ছা, আচ্ছা৷ চুপ করলুম৷ বলুন৷...ঠিক আছে৷ আমি নাক না গলালে আপনার যদি কোনো লাভ হয়, গলাব না৷ কিন্তু লাভটা কী, তা একটু খুলে বলুন৷ বলবেন না? ...মানে, কোনও গুপ্তধনের ব্যাপার নয় তো? ...বলবেন না? সর্বনাশ! হ্যালো৷! হ্যালো! হ্যালো!

কর্নেল রিসিভার রেখে হাসতে হাসতে বললেন, —লোকটা রসিকতা বোঝে না! অথচ রসিকতা করতে চায়৷

বললুম, —রসিকতা কী বলছেন? আপনাকে হতচ্ছাড়া বুড়ো বললো! টিকটিকি বললো৷ আমাকে টিকটিকির লেজ বললো! এগুলো তো গ্রেফ গালাগালি!

কর্নেল এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, —কপালীগড় রাজবাড়ির মিউজিয়াম থেকে চুরিকরা সেই সিলটা এখনও যথাস্থানে পৌঁছয়নি৷

—কীসে বুঝলেন?

—টেলিফোনে উড়ো হুমকিতে৷

—একটু খুলে বলুন!

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে ফের ধোঁয়া ছাড়লেন৷ তারপর বললেন,—তুমি চিন্তা করলেই বুঝতে পারবে৷

একটু ভেবে নিয়ে বললুম, —আমার মনে হচ্ছে, চোর অন্য কারও জন্য সিলটা চুরি করেছে৷ কিন্তু সিলটা যে-কোনও কারণে হোক, তার কাছে পৌঁছে দিতে পারেনি৷ এই তো?

—ঠিক ধরেছ৷ সিলটা যার কাজে লাগবে—তা সে যে কাজেই লাগুক, সে ওটা পেয়ে গেলে আমাকে হুমকি দেবার দরকার হত না৷

—আপনি টেলিফোনে লোকটাকে গুপ্তধনের কথা বললেন৷ তখন সে কী বলল?

কর্নেল একটু হাসলেন৷ বললো, —গুপ্তধন না তোমার মুণ্ডু৷ তারপর বললো,—তোমার টাক আর দাড়িসুদ্ধ মুণ্ডু উড়িয়ে দেব৷ বলেই লাইন কেটে দিল৷

বলে তিনি টেবিল থেকে সেই ইংরেজি বিশ্বকোষ টেনে নিলেন৷ আবার ইউহানো দ্বীপের সম্রাট হোহেনহুম্বার বিবরণে মন দিলেন৷

এই সময় হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপনে ছাপানো অদ্ভুত ছড়াটার কথা৷ খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে ছড়াটার দিকে তাকিয়ে রইলুম৷ বোল্ড টাইপে ওটা চোখে পড়ার মতো জায়গায় ছাপানো হয়েছে৷ তলায় খুদে টাইপে যথারীতি ‘বিজ্ঞাপন’ শব্দটাও আছে৷ কর্নেল সকৌতকে বলেছিলেন, ‘ক-খ-গ-ঘ রহস্য’৷ সত্যিই কি এর সঙ্গে কপালীগড় রাজবাড়ির পারিবারিক জাদুঘর থেকে গণেন্দ্রনাথের সংগৃহীত সিলটা চুরি যাওয়ার সম্পর্ক আছে?

কেয়ারটেকার ঘনশ্যামবাবু গতকাল শনিবারে জানতে পারেন, সিলটা নেই৷ এদিকে বিজ্ঞাপনটা ছাপা হয়েছে আজ রবিবারে৷ এই রবিবারে আমাদের পত্রিকায় কোনও বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে চাইলে তা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নেওয়া হয়৷ বিশেষ জায়গা, যাকে বিজ্ঞাপন বিভাগের লোকেরা বলে স্পেশাল পজিশন, সেখানে কিছু ছাপতে হলে বেশি টাকা লাগে!

তো সে যা-ই হোক, সিল চুরির সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে বিজ্ঞাপনটা গত বৃহস্পতিবারের মধ্যেই দিতে হয়েছে এবং ঘনশ্যামবাবু যেহেতু প্রতি শনিবার রাজবাড়ির জাদুঘরের জিনিসপত্র চেক করেন, তাই ধরে নেওয়া যায়, সিলটা গত বৃহস্পতিবারের মধ্যেই চুরি হয়েছে৷

এদিকে কিছুক্ষণ আগে টেলিফোনে হুমকি শুনে কর্নেলের সিদ্ধান্ত হল সিলটা চোর এখনও যথাস্থানে পৌঁছে দিতে পারেনি৷ কেন পারেনি, তার অজস্র কারণ থাকতে পারে৷ তবে এ থেকে আমার সিদ্ধান্ত হল, সিলটা যে হাতাতে চায়, তারই দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই ছড়াটা সিল-চোর খবরের কাগজে সংকেত হিসেবে ছেপেছে৷

এবার মনে মনে অঙ্ক কষতে শুরু করলুম৷ ধরা যাক, সিল-চোর ‘এক্স’ এবং যে সিলটা চায়, সে ‘ওয়াই’৷ বিজ্ঞাপন দেওয়ার অর্থ হল, এক্স ওয়াইকে খুঁজে পায়নি— তা সে যে কারণেই হোক৷

জয়ন্ত! —কর্নেলের ডাকে আমার সম্বিৎ ফিরল৷ —জয়ন্ত তুমি ছড়াটার গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়েছ মনে হচ্ছে?

একটু হেসে বললুম, —হ্যাঁ৷ আমি আপনার মতো একটা অঙ্ক কষছিলুম৷

—সে তো বোঝা-ই যাচ্ছিল৷ সম্রাট হোহেনহুম্বার সিলটা দেখতে দেখতে তোমার দিকে চোখ পড়েছিল৷ দেখছিলুম, তুমি খবরের কাগজে ছাপানো অদ্ভুত ছড়াটার দিকে তাকিয়ে আছ৷

চমকে উঠে বললুম, —সম্রাট হোহেনহুম্বার সিল? কোথায়?

—এই এনসাইক্লোপিডিয়ার পাতায়৷

কর্নেল এনসাইক্লোপিডিয়ার পাতায় একটা গোলাকার সিলের দু’পিঠের ছবি দেখালেন৷ ঝুঁকে পড়ে দেখলুম, মূল সিলের সাদা-কালো দুটো ফোটো পাশাপাশি ছাপা আছে৷ এক পিঠে অজানা লিপিতে কী সব লেখা আছে৷ অন্য পিঠে একটা মুকুট এবং তার তলায় একটু ত্রিভুজ খোদাই করা আছে৷ ত্রিভুজটা অবিকল পিরামিডের মতো৷ সেটার শীর্ষে ডানদিকে চন্দ্রকলার মতো একটা চিহ্ন৷

কর্নেল বললেন, —আরও লক্ষ্য করো৷ সিলের ফোটো দুটোর তলায় লেখা আছে : ইউহোনো স্টেট মিউজিয়াম৷

নড়ে বসলুম, —কী আশ্চর্য! তাহলে কপালীগড়ের গণেন্দ্রনাথ সিলটা কি ওখান থেকেই চুরি করে এনেছিলেন?

—আপাতদৃষ্টে তা মনে হতেই পারে! ঘনশ্যামবাবু বলছিলেন, ছোটোকুমারবাহাদুর আমেরিকায় ছিলেন৷ কোনও কোম্পানিতে চাকরি করতেন৷ ইউহোনো দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি যেমন আছে, তেমনই স্থানীয় অধিবাসীদের ঘরবাড়িও আছে৷ তারা খ্রিস্টান হলেও পূর্বপুরুষের ধর্মের কিছু কিছু আচার অনুষ্ঠান মেনে চলে৷ তাদের শাসন করার জন্য একজন চিফ বা প্রধান আছেন৷ তাঁকে নিযুক্ত করেন মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জেনারেল৷ বাংলায় বলা হয় সর্বাধিনায়ক৷ সেই চিফ অবশ্য স্থানীয় অধিবাসী৷ আর একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি কয়েকটা কলকারখানা আছে৷

উত্তেজনায় অস্থির হয়ে বললুম, —কর্নেল৷ তা হলে গণেন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই ওখানে কোনও কারখানায় চাকরি করতে গিয়েছিলেন!

সম্ভবত তা-ই৷ —বলে কর্নেল এনসাইক্লোপিডিয়া বইটা আলমারিতে রাখতে গেলেন৷ তারপর ফিরে এসে ইজিচেয়ারে বসে বললেন—কোনও ঘটনার সঙ্গে নিজেকে জড়াতে গেলে আগে সেটার ব্যাকগ্রাউন্ড মোটামুটি জানা দরকার৷

বললুম, —তা তো পাওয়া গেল৷

তা কিছুটা গেল অবশ্য৷—কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন,—এবার তোমার অঙ্কটা শোনা যাক৷

আমি আমার ‘এক্স-ওয়াই’, টেলিফোনে হুমকি এবং ছড়ার ব্যাকগ্রাউন্ডে কষা অঙ্কটা জানিয়ে দিলুম৷ কর্নেল মনোযোগ সহকারে শুনে গেলেন৷ কোনও মন্তব্য করলেন না৷ তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করতে থাকলেন৷

একটু পরে সাড়া এলে কর্নেল বললেন, —মিঃ অধিকারী?

...কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি৷...না, না৷ তেমন সিরিয়াস কিছু নয়৷ আজ তো আপনার কিউরিয়ো শপ বন্ধ৷ তাই ভাবছিলুম, বিকেলে একবার আপনার কাছে যাব৷ আপনি বিকেলে ফ্রি আছেন তো? ... ধরুন, তিনটে থেকে চারটে মধ্যে৷... না মিঃ অধিকারী! আপনার এতটুকু উদ্বেগের কারণ নেই৷ জাস্ট একটু গল্পগুজব এবং... ঠিক আছে৷ তা হলে সাড়ে তিনটে৷

কর্নেল রিসিভার রেখে দেওয়ালঘড়ি দেখলেন৷ সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে৷ বললুম,— মিঃ অধিকারীর কিউরিয়ো শপে আপনার সঙ্গে একবার গিয়েছিলুম৷ ভদ্রলোকের হাবভাব দেখে আমার ভালো লাগেনি৷ যেন গভীর জলের মাছ৷

কর্নেল হাসলেন৷—প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র নিয়ে যাঁরা কারবার করেন, তাঁদের চালাক-চতুর না হলে চলে না৷ মিঃ অধিকারীকে তুমি গভীর জলের মাছ বলছ৷ হ্যাঁ—এই উপমাটা ওঁর ক্ষেত্রে লাগসই৷ তবে তোমার মনে পড়তে পারে, উনি আভাস না দিলে কর্ণপুর রাজবাড়ির চুরি যাওয়া সূর্যদেবের মূর্তি উদ্ধার করা যেত না৷ আসলে মিঃ অধিকারী আমাকে তাঁর ব্যবসার খাতিরেই সন্তুষ্ট রাখতে চান৷ একটা সাংঘাতিক বিপদ থেকে ওঁকে বাঁচিয়েছিলুম৷—

—এবার কি ওঁর কাছে কপালীগড় রাজবাড়ির জাদুঘর থেকে চুরি যাওয়া—-

কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, —ওসব কথা এখন থাক৷ ও নিয়ে যত ভাববে, গোলকধাঁধায় আটকে পড়বে৷ আপাতত একটা কাজ করা যাক৷ এনসাইক্লোপিডিয়ার পাতায় ছাপানো সম্রাট হোহেনহুম্বার সিলের ফোটো দুটো বরং জেরক্স করে আনি৷ এ বাড়ির উল্টোদিকে নতুন একটা জেরক্স শপ হয়েছে৷

‘আমি তাহলে এবার কেটে পড়ি৷’

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে ধমকের ভঙ্গিতে বললেন, —আমার এখানে আজ তোমার লাঞ্চের নেমন্তন্ন৷

হেসে বললুম৷ —তার মানে আমাকে আপনার লেজ হয়ে ঘুরতে হবে?

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, —তা হবে৷ তবে টেলিফোনে হুমকি দেওয়া লোকটা এত শিগগির তোমাকে ধরে টানাটানি করবে বলে মনে হয় না৷ কাজেই তোমার খসে পড়ার ভয় নেই৷...

বিকেল তিনটেয় কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলুম৷ ওল্ড ওয়ার্লড কিউরিয়ো শপ-এর মালিক দিবাকর অধিকারীর বাড়ি আমি চিনতুম না৷ কর্নেলের নির্দেশমতো গাড়ি চালিয়ে ভবানীপুর এলাকার একটা গলির মুখে পৌঁছেছিলুম৷

কর্নেল সেখানেই আমাকে গাড়ি লক করে রাখতে বললেন৷ তারপর তাঁকে অনুসরণ করলুম৷ গলির দু’ধারে পুরনো আমলের বনেদি বাড়ি৷ একটা বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কর্নেল আস্তে বললেন, —মিঃ অধিকারীর বাড়িটাও অনেক প্রত্নমূর্তিতে সাজানো৷ তবে সবই নকল৷

ভেতরে চওড়া লন এবং ফুলবাগান দেখা যাচ্ছিল৷ তার মধ্যে এখানে-ওখানে সাজানো বিচিত্র সব ভাস্কর্য৷ কর্নেলকে দেখে দারোয়ান সেলাম ঠুকে গেটের একটা পাশ খুলে দিল৷ বুঝলুম, বাড়িতে ঢোকার ব্যাপারে কড়াকড়ি আছে৷ কোথাও কুকুরের গর্জন কানে ভেসে এল৷

নুড়িবিছানো লনে এগিয়ে যেতেই গাড়িবারান্দার ওপর মিঃ অধিকারীকে দেখতে পেলুম৷ তিনি সেখান থেকেই নমস্কার করে বললেন, —আসুন কর্নেলসায়েব৷

নিচের তলায় বনেদি রীতিতে সাজানো বসার ঘর৷ অজস্র ভাস্কর্য আর চিনেমাটির প্রকাণ্ড ফুলদানি চোখে পড়ল৷ ওপরতলা থেকে এঁকেবেঁকে সিঁড়ি এসে নেমেছে এ ঘরে৷ একটা লোক আমাদের সেলাম ঠুকে বসতে বললো৷ একটু পরে সিঁড়ি দিয়ে হাসিমুখে নেমে এলেন মিঃ অধিকারী৷ তাঁর সঙ্গে প্রকাণ্ড একটা কালোরঙের অ্যালশেসিয়ান কুকুর গর্জন করতে করতে নেমে আসছিল৷ মিঃ অধিকারী বললেন, —শম্ভু! জনিকে ওপরে বেঁধে রেখে আয়৷ আর ভোলাকে সায়েবদের জন্য কফি আনতে বল৷

শম্ভু কুকুরটাকে চাপা গলায় ধমক দিতে দিতে দোতলায় নিয়ে গেল৷ মিঃ অধিকারী সোফায় আমাদের মুখোমুখি বসে সহাস্যে বললেন,—জয়ন্তবাবুও এসেছেন দেখছি৷ কিন্তু খবরের কাগজে সম্প্রতি তো তেমন কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার খবর পড়িনি!

কর্নেল বললেন, —আপনার ওল্ড ওয়ার্লডে সম্প্রতি ইন্টারেস্টিং কোনও জিনিস কি এসেছে?

দিবাকর অধিকারী হাসিমুখে বললেন, —ইন্টারেস্টিং বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন জানি না৷ তবে গত সপ্তাহে একজন অস্ট্রেলিয়ান সায়েব সেখানকার আদিম অধিবাসীদের তৈরি দুটো মুখোশ বেচে গেছেন৷ আপনি তো জানেন, আমি খুঁটিয়ে পরীক্ষা না করে কিছু কিনি না৷ আমাকে এ-জন্য প্রচুর বইপত্তর জোগাড় করতে হয়৷ অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীসংক্রান্ত একটা বইয়ের পাতা খুঁজে সেই মুখোশের ছবি বের করেছি৷ মিলিয়ে দেখে তবে কিনেছি৷

কর্নেল তাঁর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন৷ আমার কান ঝালাপালা হচ্ছিল৷ ইতিমধ্যে কফি এবং স্ন্যাকস এসে গেল৷ কফি খেতে খেতে কর্নেল অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের পলিনেশিয়ার নানা দ্বীপে পৌঁছে গেলেন৷ তারপর ইস্টার আইল্যান্ডের রহস্যময় প্রকাণ্ড সব পাথরের মূর্তি ছুঁয়ে ইউহোনো দ্বীপে এসে পড়লেন৷

মিঃ অধিকারী বললেন, —আপনি তো সামরিক অফিসার ছিলেন৷ ওসব এলাকার অনেক খবর আপনার জানা৷ ওখানে অজস্র দ্বীপে বিচিত্র সব মানুষের বাস৷ সংগ্রহযোগ্য অনেক জিনিস পাওয়া যায় শুনেছি৷

—ইউহোনো দ্বীপের সম্রাট হোহেনহম্বার নাম শোনেননি?

আমার চোখের ভুলও হতে পারে, মিঃ অধিকারী যেন একটু চমকে উঠলেন৷ তারপরই তিনি হাসতে হাসতে বললেন, —কী বিদঘুটে নাম!

—হোহেনহুম্বা আঠারো শতকে মারা যান৷ আমার পরিচিত এক মার্কিন ভদ্রলোক সম্প্রতি এসেছিলেন৷ তাঁর মুখে হোহেনহুম্বার গুপ্তধনের অদ্ভুত কিছু গল্প শুনলুম৷

—বোগাস! গুপ্তধন শুধু গল্পে পাওয়া যায়৷

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, —তা ঠিক৷ তবে গুপ্তধনে বিশ্বাস করে হন্যে হওয়া মানুষের সংখ্যা কিন্তু কম নয়৷ মার্কিন ভদ্রলোক আমাকে একটা বই দেখালেন৷ তাতে সম্রাট হোহেনহুম্বার একটা সিলমোহরের ছবি আছে৷ ছবিতে নাকি গুপ্তধনের ঠিকানা সংকেতে খোদাই করা আছে৷

মিঃ অধিকারী পাইপে তামাক ভরতে ভরতে বাঁকা মুখে বললেন,—সিলমোহরের ছবি দেখেই কি ভদ্রলোক আপনাকে তাঁর অভিযানের সঙ্গী করতে চাইছিলেন?

—না, না৷ উনি নিছক একজন ট্যুরিস্ট৷ তবে কথায় কথায় বললেন,—দ্বীপের জাদুঘর থেকে সেই সিলটা নাকি চুরি গেছে৷

পাইপে আগুন ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে দিবাকর অধিকারী বললেন, —আমাকে কেউ তেমন কোনও সিলমোহর বিক্রি করতে আসেনি৷

কর্নেল হাসলেন৷ আমি তা বলিনি মিঃ অধিকারী! কোথায় সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরের ইউহোনো দ্বীপ, কোথায় কলকাতা! তা ছাড়া ওই দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে৷

মিঃ অধিকারী গম্ভীর মুখে বললেন, —এসব জিনিস যারা চোরাচালান করে, তাদের কাছে দূরত্ব কোনও ব্যাপারই নয়৷ তবে এ-কথা ঠিক, আমাকে প্রমাণ দিয়ে এমন কোনো সিল কেউ বেচতে চাইলে আমি তা কিনব৷ কারণ সেটাই আমার কারবার৷ এখন আপনি যদি বলেন, এই সিলচুরির কেস আপনি হাতে নিয়েছেন, তা হলে অবশ্যই আমার সাহায্য পাবেন৷ কারণ আমাকে একবার আপনি সাংঘাতিক বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিলেন, আমি তা ভুলিনি৷

কর্নেল বললেন,—দেখুন মিঃ অধিকারী, যে সিলে গুপ্তধনের হদিস দেওয়া আছে, তা আপনার কাছে কেউ বেচতে আসবে কেন?

এবার মিঃ অধিকারী হেসে ফেললেন৷ —আসবে৷ গুপ্তধন হাতাতে পারলেও আসবে, না পারলেও আসবে৷ কারণ এসব ঐতিহাসিক সিলমোহরের নিজস্ব একটা মূল্য আছে৷ অবশ্য একটা কথা আছে এখানে৷ সেই লোকটা যদি কলকাতার হয় এবং আমার কারবারের কথা জানে, তাহলেই সে বেচতে আসবে৷ আপনি কি মনে করেন, সিলচোর কলকাতার লোক?

—মিঃ অধিকারী! নানা দেশে আপনার এজেন্ট আছে৷ তাই না?

—নানা দেশে আমার মতো কিউরিয়ো কারবারিও আছে কর্নেলসায়েব৷

কর্নেল হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন৷—না! আপনাকে কথা দিয়ে পরাস্ত করা কঠিন৷

দিবাকর অধিকারীও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন৷ বললেন, —আপনি কি আমাকে পরাস্ত করতেই এসেছিলেন?

—না, না৷ এ কী বলছেন৷ ওটা নেহাত কথার কথা৷ আপনার সঙ্গে লড়তে আসার প্রশ্ন ওঠে না৷

বলে কর্নেল পা বাড়ালেন৷ মিঃ অধিকারী তাঁকে অনুসরণ করে বললেন, —আপনি একজন রিটায়ার্ড কর্নেল৷ একসময় লড়াই করা ছিল আপনার পেশা৷ অবসরজীবনে সেটা নেশায় দাঁড়িয়েছে৷ অপরাধীদের সঙ্গে আপনি লড়ে যাচ্ছেন৷ আপনার বর্তমান লড়াই এমন একজন অপরাধীর সঙ্গে, যে আমার প্রশ্রয় পাবে বলে আপনার ধারণা৷ তাই না?

সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন,—আপনি বুদ্ধিমান, মিঃ অধিকারী৷

এবার দিবাকর অধিকারী আমাকে চমকে দিয়ে এবং অবাক করে বললেন, —কর্নেলসায়েব! কপালীগড় রাজবাড়ির জাদুঘরের একটা সিল চুরি গেছে, তা আমি জানি এবং সিলটা কেনার প্রস্তাবও আমি টেলিফোনে পেয়েছি৷ হ্যাঁ—আপনি সেই সিলটার কথাই একটু আগে আমাকে বলছিলেন৷ আপনি আমাকে ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছিলুম, আপনি এই কেসটা হাতে নিয়েছেন৷ সিলটা নিয়ে গতকাল লোকটার আসার কথা ছিল৷ আসেনি৷ আজ সকালে সে টেলিফোনে বললো, —ওটা সে হারিয়ে ফেলেছে৷ খুঁজে পেলেই আবার যোগাযোগ করবে৷

কর্নেল কথাগুলো চুপচাপ শুনে হাঁটতে শুরু করলেন গেটের দিকে৷...

II তিন II

মার্চে যখন কলকাতায় ফুল স্পিডে ফ্যান চালাতে হয়, কপালীগড়ে তখনও ঠান্ডাহিম শীতের উপদ্রব৷ কর্নেল কেন আমাকে শীতের পোশাক সঙ্গে নিতে বলেছিলেন, শেষরাতে ট্রেন থেকে নেমে তা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছিলুম৷

গত রাতেই কর্নেল প্রণবেশ সিংহকে টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, তিনি যাচ্ছেন৷ নিঝুম রেলস্টেশনে একজন তাগড়াই চেহারার উর্দিপরা গুঁফো লোক বেঞ্চে বসে ছিল৷ কর্নেলকে দেখামাত্র সে উঠে দাঁড়িয়ে খট করে জুতোর শব্দ তুলে মিলিটারি স্যালুট ঢুকল৷ কর্নেল বললেন,—কী আশ্চর্য! সিকান্দার তুমি এখনই এসে গেছ দেখছি!

সিকান্দার হাসিমুখে বলল, —সিনহাসাব বললেন কর্নিলসাব প্যাসেঞ্জার ট্রেনে আসবেন৷ বহুত তকলিফ হবে৷ তাই চলে আসলাম৷ ট্রেন রাইট টাইমে আসল৷

বলে সে অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে আমাদের নিয়ে গেল৷ গেটে টিকিট দেখার জন্য কেউ ছিল না৷ আমরা দু’জন ছাড়া কোনও যাত্রী নামতে দেখিনি৷ ছোট্টো স্টেশন৷ গেটের পর কয়েকধাপ সিঁড়ি৷ তারপর একটা চত্বর৷ তার দু’ধারে দোকানপাটের ঝাঁপ বন্ধ৷ অনেকগুলো সাইকেল রিকশো একপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে৷ কিন্তু রিকশচালকদের দেখতে পেলুম না৷ অবশ্য কুয়াশায় আলোগুলো ম্রিয়মাণ৷

ক্রিমরঙা অ্যাম্বাসাডার আমাদের নিয়ে চলতে শুরু করল৷ রাস্তার অবস্থা শোচনীয়৷ সিকান্দার কর্নেলের সঙ্গে কথা বলছিল৷ তার মতে, দেশের অবস্থাও এই রাস্তাটির মতো৷ চোর-জোচ্চোর-ঠক-বেইমানের সংখ্যা বাড়ছে৷ কাকেও বিশ্বাস করা যায় না৷

ঘন কুয়াশার মধ্যে এই খানাখন্দে ভরা রাস্তায় গাড়ি চলানো দেখে বুঝতে পারছিলুম, সিকান্দার দক্ষ ড্রাইভার৷ তার সেলাম ঠোকার ভঙ্গি দেখে অনুমান করেছিলুম, সে একসময় মিলিটারিতে ছিল৷

প্রায় আধঘণ্টা পরে একটা ছোটো নদীর ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়ার সময় কর্নেল বললেন, —কপালী নদীতে এখনও কানায়-কানায় জল৷ কী ব্যাপার সিকান্দার?

সিকান্দার বললো, —ওয়াটারড্যামের কাজ খতম হয়েছে কর্নিলসার—

‘তাহলে ঝিলের অবস্থা কী?’

সিকান্দার হাসল৷ ঝিল আর নেই৷

—সর্বনাশ! জলটুঙ্গি ছিল তিনটে৷ ডুবে গেছে নাকি?

—না সার! বহত উঁচা টুঙ্গি৷ টুঙ্গিতে জঙ্গল যেমন দেখেছিলেন, তেমন আছে৷ সবকিছু ঠিক আছে৷

জলটুঙ্গির পাখি-প্রজাপতি আর পরগাছার খবর নিতে থাকলেন কর্নেল৷ সিকান্দার তাঁকে নিরাশ করছিল না৷ এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করলুম, —আর কতদূর?

জবাব দিল সিকান্দার৷ —আর তিন কিলোমিটার সার৷ ওয়াটারড্যাম হয়ে কপালীগড় দূর হয়ে গেছে৷ লেকিন, এবার সার, রাস্তা খুব ভালো হবে দেখবেন!

কিছুক্ষণ পরে মসৃণ রাস্তা, দু’ধারে গাছ এবং লাইটপোস্ট এসে গেল৷ তারপর বাঁ-দিকে আবার খারাপ রাস্তায় এগিয়ে দু’ধারে নতুন-পুরনো একতলা বা দোতলা বাড়ি চোখে পড়ল৷ কর্নেল বললেন, —কপালীগড় মাত্র তিনবছরে এত বদলে গেছে দেখছি!

—হাঁ কর্নিলসাব! কত মুলুক থেকে বেওয়সায়ি লোক এসেছে৷ বলে সিকান্দার সংকীর্ণ গলিতে ঢুকল৷ গলির পর অনেকখানি ফাঁকা জায়গা ভোরের কুয়াশা-মেশা আলোয় আবছা দেখা যাচ্ছিল৷ তারপর একটা বাড়ির গেটের সামনে সিকান্দার হর্ন দিতেই দারোয়ান বেরিয়ে সেলাম দিল এবং গেট খুলল৷ দোতলা বাড়ির পোর্টিকোর শীর্ষে আলো জ্বলছিল৷ গাড়ি ফুলবাগান ঘুরে নুড়িবিছানো পথে এগিয়ে পোর্টিকোর তলায় দাঁড়াল৷

আমরা গাড়ি থেকে নামতেই সিঁড়ির মাথায় বারান্দা থেকে গম্ভীর স্বরে কেউ বললেন,—মর্নিং কর্নেলসায়েব!

কর্নেলের বয়সী এক সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক ছড়ি-হাতে গাউন পরে দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ এগিয়ে এসে কর্নেলের সঙ্গে সহাস্যে করমর্দন করে তিনি বললেন, —ওই নচ্ছার প্যাসেঞ্জার ট্রেনে আসছেন শুনে আমি উদ্বিগ্ন হয়েছিলুম৷ মাঝেমাঝে এই ট্রেনটা কপালীগড় পৌঁছয় না৷

কর্নেল আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিলেন৷ প্রণবেশ সিংহ আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, —আপনার সাংবাদিক বন্ধু এমন তরুণ, তা কল্পনা করিনি৷ আমি একে তুমি বলব৷

বললুম, —বললে খুশি হব মিঃ সিংহ!

যে ঘরে ঢুকলুম, সেটা হলঘর এবং অনেক জীবজন্তু স্টকড করা আছে৷ একটা বাঘও আছে৷ মিঃ সিনহা যে শিকারি ছিলেন, তা বোঝা গেল৷ কাঠের সিঁড়িতে গালিচা পাতা৷ দোতলায় টানা বারান্দার শেষপ্রান্তে একটা চমৎকার সাজানো ঘরে আমরা ঢুকলুম৷

দু’পাশে দুটো খাট৷ একপাশে সোফাসেট৷ আমাদের জিনিসপত্র সিকান্দার দিয়ে গেল৷ কর্নেল বললেন,—আপনিও কি সিকান্দারের মতো রাত্রি জেগে অপেক্ষা করছিলেন?

প্রণবেশ সিংহ বললেন, —মোটেও না৷ আপনি জানেন, আমি পাঁচটায় উঠি৷ তারপর মর্নিং ওয়াক করি৷ তবে আজ আর বেরুচ্ছি না৷

কর্নেল বললেন, —ঘনশ্যামবাবু ফিরে এসে আপনার সঙ্গে দেখা করেছেন?

হ্যাঁ৷ বেচারা খুব বিপদে পড়েছে৷ ছোটকু —মানে গণেন্দ্রের যা মেজাজ, সে জানতে পারলে হয়তো ওর—যাক গে যথাসময়ে ওসব কথা হবে৷ আপনি তো জানেন, রায়রাজাদের সঙ্গে আমাদের পুরুষানুক্রম অহি-নকুল সম্পর্ক৷ বড়কু—মানে কনকেন্দ্র জন্মান্ধ মানুষ৷ সে কোনও ঝামেলায় থাকে না৷ ঠ্যাং-কাটা মেজকু খগেন্দ্র ভীষণ কুচুটে৷ মিঃ সিংহ একটু চুপ করে থাকার পর এবার চাপা স্বরে বললেন, —কাল মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে ওয়াটারড্যামের ধারে সেচবাংলোয় দূর থেকে একজন সায়েবকে দেখলুম৷ সেচ অফিসে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তার নাম চার্লস জেরিসন৷ অ্যামেরিকান এবং নদীবিশেষজ্ঞ৷ সরকারি আমন্ত্রণে এসেছে৷ তা আসতেই পারে৷ কিন্তু আমার একটু খটকা লেগেছে৷

কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, —কেন?

—কাল বিকেলে সায়েব রাজবাড়ি দেখতে এসেছিল৷ দারোয়ান সায়েবকে ঢুকতে দেয়নি৷ এদিকে সন্ধ্যা ৭টার বাসে গণেন্দ্রকে চাপতে দেখা গেছে৷ বলে মিঃ সিংহ মিটিমিটি হাসতে থাকলেন৷

—আপনার বিশ্বস্ত সূত্রের খবর?

—হ্যাঁ৷ আমার পুরাতন ভৃত্য গোকুলকে তো চেনেন৷ গোকুলের সঙ্গে রাজবাড়ির দারোয়ানের খুব ভাব৷ গোকুলই বাসস্ট্যান্ডের ওখানে কী কাজে গিয়েছিল৷ সে ছোটকুকে বর্ধমানের বাসে চাপতে দেখেছে৷ এদিকে কলকাতা থেকে ফিরে ঘনশ্যাম আমাকে দেখা করতে এসেছিল৷ সে-ও বলল,—ছোটো কুমারবাহাদুর বাইরে গেছেন৷ কোথায় যাচ্ছেন, তা কাকেও বলে যাননি৷

—তাহলে ঘনশ্যামবাবু আপাতত নিরাপদ৷

—হ্যাঁ৷ কিন্তু ছোটকু খেয়ালি লোক৷ হঠাৎ ফিরে আসতেও পারে— তবে গোপনে৷ অর্থাৎ আমার ধারণা, জেরিসনসায়েব ছোটকুর পরিচিত৷ সেই সিলটার ব্যাপারে—

প্রণবেশ সিংহ চুপ করলেন৷ একটা লোক এসে গেল ট্রে নিয়ে৷ কর্নেলকে করজোড়ে প্রণাম করে বলল, —ভালো আছেন সার?

কর্নেল বললেন, —গোকুল! কপালীগড়কে তিনবছরেই তোমরা এমন বদলে দিয়েছ, চেনা যায় না৷

গোকুল বললো,—গবরমেন্টের মাথায় কখন কী বুদ্ধি ভর করে! ড্যাম না হয় করল৷ কিন্তু তিন-তিনখানা সাঁওতাল গ্রাম আর হাজার-হাজার বিঘে জমি তলিয়ে গেল! কিছু বুঝি না সার!

মিঃ সিংহ বললেন, —তিন্নি উঠেছে? ওদের স্কুলে আজ সকালে কী ফাংশন হবে৷ না উঠলে ওকে ওঠা গিয়ে৷ সুপর্ণাকে তিন্নি গ্রাহ্য করে না৷

গোকুল চলে গেল৷

বুঝলুম, প্রণবেশ সিংহের প্রয়াত ভাই পরমেশের স্ত্রীর নাম সুপর্ণা এবং ভাইঝির নাম তিন্নি৷ পরমেশ ঝিলের জঙ্গলে শিকার করতে গিয়ে বিষাক্ত সাপের কামড়ে মারা যান৷ কর্নেলের বাড়িতেই এ-কথা শুনেছি৷ কিন্তু প্রণবেশ সিংহ কি কর্নেলের মতো চিরকুমার?

কর্নেল কফি শেষ করে চুরুট ধরালেন৷ মিঃ সিংহ কফি শেষ করে পকেট থেকে পাইপ বের করলেন৷ বললেন, —জয়ন্ত! তুমি কি স্মোক করো না? নাকি আমার সামনে— না, না! তুমি ইচ্ছে করলে স্মোক করতে পারো! আমি ওসব সেকেলে প্রথা মানি না৷

বললুম, —না৷ আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি৷

কর্নেল বললেন, —ক্যান্সারের ভয়ে নয়৷ জয়ন্ত মার্কিন লাইফস্টাইল পছন্দ করে৷

ওঁরা দু’জনে হেসে উঠলেন৷ ততক্ষণে বাইরে উজ্জ্বল রোদ ফুটেছে৷ এবার কানে এল, পাখিদের ডাকাডাকি৷ মিঃ সিংহ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,—আপাতত বিশ্রাম করুন৷ আমি আসছি৷

উনি যাবার সময় আলো নিভিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন৷ আমি কাছের খাটে বিছানায় বসে বললুম, —মিঃ সিংহের স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নেই?

কর্নেল বললেন, —মিসেস সিংহ অনেক বছর আগে মারা গেছেন৷ তারপর উনি আর বিয়ে করেননি৷

—মিঃ সিংহ শিকারি ছিলেন মনে হল৷

—শুধু শিকারি নয়, রীতিমতো অ্যাডভেঞ্চারার ছিলেন৷ বহু দেশ ঘুরেছেন৷

—ছোটো কুমারবাহাদুর—মানে গণেন্দ্রনাথের মতো?

—নাঃ৷ গণেন্দ্রনাথ তো চাকরি বা ব্যবসাসূত্রে বিদেশে ঘুরেছেন৷

—এবং ইউহোনো দ্বীপের স্টেট মিউজিয়াম থেকে সম্রাট হোহেনহুম্বার সিল চুরি করে পালিয়ে এসেছেন৷ এদিকে সিলের খোঁজে জনৈক চার্লস জেরিসন এসে হাজির দেখে গণেন্দ্রনাথ উধাও!

কর্নেল হাসলেন৷ —এখনই অঙ্ক কষে ফেললে? জয়ন্ত! অঙ্কটা সম্ভবত অত সহজ নয়৷ বেশ জটিল৷ কিউরিয়ো শপের মালিক দিবাকর অধিকারীর কথা ভুলে যেয়ো না৷

বলে তিনি বাইনোকুলার হাতে নিয়ে পশ্চিমের দরজা খুলে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ উঠে দাঁড়িয়ে দেখে নিলুম, ওদিকে বিস্তীর্ণ জলাধার এবং তার মধ্যে জঙ্গলে ঢাকা উঁচু দ্বীপের মতো জলটুঙ্গি আছে৷ জুতো খুলে বিছানায় শুয়ে পড়লুম৷

একটু পরে কর্নেল ডাকলেন৷ —জয়ন্ত! হালদারমশাইয়ের কাণ্ড দেখে যাও৷

বললুম, —সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে কোথাও ধুনি জ্বেলে বসে আছেন বুঝি?

—না৷ সেচবাংলোর লনে দাঁড়িয়ে সেই মার্কিন সায়েবের সঙ্গে কথা বলছেন৷

কথাটা শুনেই বিছানা থেকে উঠে ব্যালকনিতে গেলুম৷ বললুম,—কই? কোথায়?

—অন্তত এক কিলোমিটার দূরে৷ কাজেই খালি চোখে দেখতে পাবে না৷

কর্নেল তাঁর বাইনোকুলার দিলেন৷ অমনি দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে জলাধারের তীরে উঁচু ঢিবির উপর সেচবাংলোটা দেখতে পেলুম৷ গোয়েন্দাপ্রবর ঢ্যাঙা মানুষ৷ কিন্তু সায়েব তাঁর চেয়েও ঢ্যাঙা৷ সায়েবকে অঙ্গভঙ্গি করে তিনি কিছু বোঝাচ্ছেন৷ বললুম,—এই সাত সকালে হালদারমশাই সেচবাংলোয় গিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছেন৷ আমার কিন্তু অস্বস্তি হচ্ছে৷

কর্নেল আমার হাত থেকে বাইনোকুলার নিয়ে বললেন, —বোঝা যাচ্ছে, হালদারমশাই এসেই খবর পেয়েছেন, এক সায়েবকে রাজবাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি৷ তাই তাঁর খটকা লেগেছিল৷ হুঁ—হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, সায়েব হালদারমশাইয়ের প্রতি খুশি৷...কী অবাক! দু’জনে পিছনের গেট দিয়ে নামছেন৷... মাই গুডনেস! দু’জনে ছোট্ট বোটে চাপলেন৷ রোয়িং করতে চান! বাঃ!

বললুম, —ভুলে যাবেন না কর্নেল! হালদারমশাই পূর্ববঙ্গের মানুষ৷ সাঁতার কাটা আর নৌকো চালানো দুয়েতেই এক্সপার্ট৷

—ঠিক৷ কিন্তু মনে হচ্ছে, নিছক রোয়িং নয়৷ ওঁদের গন্তব্য সামনেকার জলটুঙ্গি৷ —কর্নেল বাইনোকুলারে দেখতে দেখতে বললেন, —জয়ন্ত ওই জলটুঙ্গিগুলো আসলে প্রাচীন আমলের একটা বিশাল দুর্গের তিনটুকরো ধ্বংসাবশেষ৷

অবাক হয়ে বললুম, —বলেন কী!

—হ্যাঁ৷ ওগুলোর নিচে যে ঝিল দেখেছিলুম, তা আসলে গড়খাই৷ এখন জলাধারের জলে সব একাকার৷... হ্যাঁ৷ হালদারমশাই সম্ভবত এখানে এসে এসব খবর নিয়েছেন৷ তাই সায়েবকে ঐতিহাসিক দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখাতে চান... ঠিক তা-ই৷ নৌকো জলটুঙ্গির কাছাকাছি হচ্ছে৷

বলে কর্নেল আরও কিছুক্ষণ দেখার পর ঘরে ঢুকলেন৷ সোফায় বসে বললেন, —হালদারমশাই হঠকারী স্বভাবের মানুষ হলেও বুদ্ধিমান৷ পুলিশের চাকরির শেষদিকে গোয়েন্দা দফতরে ছিলেন৷ কাজেই ওঁর সম্পর্কে তোমার অস্বস্তির কারণ নেই৷...

দশটায় নিচের তলায় ডাইনিং-রুমে ব্রেকফাস্ট করতে গেলুম৷ প্রণবেশ কর্নেলকে বললেন,— সুপর্ণা মেয়েকে নিয়ে স্কুলের ফাংশনে গেছে৷ আপনি এসেছেন শুনে আহ্লাদে আটখানা৷ কিন্তু তিন্নি উঠতে দেরি করেছিল৷ তাই সাত-তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেছে৷ তিন্নির আপনাকে দেখলে মনে পড়তে পারে৷ আপনি যখন এসেছিলেন, ও তখন তিনবছরের বাচ্চা৷

এইসব কথাবার্তার মধ্যে ব্রেকফাস্ট চলছিল৷ লক্ষ্য করলুম, কর্নেল হালদারমশাইয়ের প্রসঙ্গ তুললেন না৷ খাওয়ার পর আমরা সুদৃশ্য লনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলুম৷ তখন সাইকেলে চেপে ঘনশ্যাম মজুমদার এলেন৷ তাঁর আসবার ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল, এ বাড়িতে তিনি গোপনে আসেন৷

কাছে এসে কর্নেল ও আমাকে তিনি নমস্কার করে বিমর্ষ মুখে একটু হেসে বললেন, —আপাতত ছোটো কুমারবাহাদুরের হাত থেকে রেহাই পেয়েছি৷ উনি বাইরে গেছেন৷ এদিকে কাল বিকেলে নাকি এক সায়েব—

কর্নেল তাঁকে থামিয়ে বললেন, —সে-খবর পেয়ে গেছি৷ আপনার সেই বন্ধুর খবর কী?

—একেবারে পাগল যাকে বলে৷ ভোরবেলা কিছু না বলে কোথায় বেরিয়েছেন কে জানে!

বলে ঘনশ্যামবাবু কণ্ঠস্বর চাপা করলেন৷ —মেজকুমারবাহাদুর কালকের একটা খবরের কাগজে অদ্ভুত একটা ছড়া পড়ে কে জানে কেন, খুর খাপ্পা৷ আমাকে বলছিলেন, এটা বারীন ছেপেছে৷ ছড়াটা দেখে আমারও মনে পড়ে গেল৷ রাজবাড়িতে এক কর্মচারী থাকতেন৷ তাঁর নাম ছিল ব্রজেন মিত্তির৷ তাঁর ছেলে বারীন৷ মিত্তিরমশাই মারা গেছেন৷ বারীন আর তার মাকে মেজকুমারবাহাদুর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন৷ বারীন এটা-ওটা চুরি করে বেচে দিত৷ তো বারীনই ছড়াটা বানিয়েছিল৷

প্রণবেশ হাসতে হাসতে বললেন, ক-য়ে কানা, খ-য়ে খোঁড়া৷ গ-য়ে গাধা ঘ-য়ে ঘোড়া! সেই ছড়া বারীন খবরের কাগজে ছেপেছে নাকি?

ঘনশ্যামবাবু পকেট থেকে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার বিজ্ঞাপনের পাতার একটা কাটিং বের করে তাঁকে দেখালেন৷ প্রণবেশ বললেন, —নাম দেয়নি দেখছি! কিন্তু এটা পয়সা খরচ করে কাগজে ছাপার মানে কী?

—সেটাই তো বুঝতে পারছি না!

কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, —বারীনবাবু এখন কোথায় থাকেন?

—বাউন্ডুলে উড়নচণ্ডী৷ কখন কোথায় থাকে, তার কিছু ঠিক নেই৷ বাজারপাড়ায় একটা ছোট্ট বাড়ি করেছে৷ জুতোর দোকান খুলেছিল৷ এখন আর সেই দোকান নেই৷ ওর খুব বদনাম আছে সার! প্রায়ই পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে যায়৷ আবার দিব্যি ছেড়েও দেয়৷ কিছু বুঝি না৷

প্রণবেশ বললেন, —না বোঝার কী আছে ঘনশ্যাম? বারীনের গার্জেন বারীন নিজেই৷ এখানকার বজ্জাত ছোকরারা ওর সাগরেদি করে৷

ঘনশ্যামবাবু আস্তে বললেন, —গতরাত্তিরে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে৷ মিঃ হালদার—

—মিঃ হালদার মানে?

কর্নেল এতক্ষণে প্রণবেশ সিংহকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাইয়ের পরিচয় দিয়ে ঘনশ্যামবাবুর সঙ্গে তাঁর কপালীগড়ে আসার কথা জানিয়ে দিলেন৷ তারপর আজ সকালে সেচবাংলো থেকে মার্কিনসায়েবের সঙ্গে তাঁর বোটে চেপে জলটুঙ্গি যাত্রার কথাও বললেন৷ প্রণবেশ কথাগুলো শোনার পর বললেন, —কর্নেলসায়েব তাহলে ঠিক কাজই করেছেন৷ একজন প্রাক্তন পুলিশ অফিসারের এ ধরনের কেসে প্রচুর অভিজ্ঞতা থাকে৷ যাই হোক, গতরাত্রে কী অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, বলো ঘনশ্যাম৷

ঘনশ্যামবাবু বললেন, —ঘটনাটা আমি স্বচক্ষে দেখিনি৷ মিঃ হালদার দেখেছিলেন৷ আজ ভোরে তিনিই আমাকে বলেছেন৷ রাত দুটো-আড়াইটের সময় নাকি কী একটা শব্দে মিঃ হালদারের ঘুম ভেঙে যায়৷ তিনি ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতে পান, হলঘর থেকে ডানদিকের দরজা খুলে বেরিয়ে আসছেন বড়ো কুমারবাহাদুর৷ তাঁর হাতে সবসময় একটা মোটা ছড়ি থাকে৷ জন্মান্ধ হলেও নিজেদের বাড়ির মধ্যে ছড়ির সাহায্যে তিনি চলাফেরা করতে পারেন৷ তবে খুব কদাচিৎ৷ কিন্তু কথাটা শুনে আমার অবাক লেগেছে৷ ওই দরজায় তালা আঁটা থাকে৷ তালা খুলে হলঘরে উনি অত রাত্রে ঢুকেছিলেন কেন? মিঃ হালদার দেখেছেন, তালা এঁটে উনি বারান্দা দিয়ে চলে গেলেন৷

কর্নেল বললেন, —হলঘরের পেছনের ঘরটাই তো মিউজিয়াম৷

—আজ্ঞে হ্যাঁ৷ মিউজিয়ামের ভিতর থেকে হলঘরে ঢোকা যায়৷ কিন্তু হলঘর থেকে মিউজিয়ামে ঢোকা যায় না৷ ভিতর থেকে শক্ত কাঠের হুড়কো আটকানো আছে৷

প্রণবেশ সিংহ বললেন,—ঘনশ্যাম! তুমি কোনও উপায়ে কর্নেলসায়েবকে রাজবাড়ি ঢোকাতে পারো?

—তা পারি৷ কর্নেলসায়েবের পরিচয় বড়ো কুমারবাহাদুর আর মেজো কুমারবাহাদুরকে বলে—

—ঘনশ্যাম! তুমি ওইসব বাহাদুর-টুর ছাড়ো তো!

আজ্ঞে অভ্যাস! —বলে ঘনশ্যামবাবু সাইকেলটা ঘোরালেন৷ বলে গেলেন, —কথা বলে খবর দেব৷

কর্নেল বললেন, —মিঃ সিংহ! আমরা কিছুক্ষণ ওয়াটারড্যামের ওদিকে ঘুরে আসি৷

নাক-বরাবর সিধে গাছপালা ঝোপঝাড় ঢাকা অনেকটা জায়গার পর রুক্ষ মাটি ক্রমশ উঁচু হয়ে উঠেছে৷ উঁচু জায়গায় ওঠার পর একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে কর্নেল বাইনোকুলারে সামনেকার জলটুঙ্গিটা দেখতে দেখতে বললেন, —কী ব্যাপার? সায়েব একা বোট চালিয়ে ফিরে আসছে৷ হালদারমশাইকে দেখছি না৷ —বলে তিনি বাইনোকুলার নামিয়ে হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন৷ বললেন, —জেলে বস্তিতে যেতে হবে৷ শিগগির এসো!

II চার II

জেলেবস্তি থেকে সেচবাংলো দেখা যাচ্ছিল না৷ মাঝখানে সেই জলটুঙ্গিটা বাংলোকে আড়াল করেছে৷ একটা নৌকো ভাড়া করে জলটুঙ্গিতে পৌঁছুতে প্রায় আধঘণ্টা সময় লাগল৷ কারণ আমরা উত্তর থেকে দক্ষিণে ভেসে যাচ্ছিলুম এবং বাতাস বইছিল দক্ষিণ দিক থেকে৷ বিস্তীর্ণ ড্যামে প্রচণ্ড ঢেউ উঠছিল৷ প্রৌঢ় জেলের নাম আকলু৷ সে কর্নেলের চেনা লোক৷ কপালীগড়ে ঝিলে-জঙ্গলে কর্নেল সে-বার এই আকলুকে সঙ্গী করে অনেক ঘুরেছিলেন, আকলু কর্নেলের সঙ্গে সেইসব কথা বলছিল৷ কর্নেল কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে বাইনোকুলারে জলটুঙ্গিটা দেখে নিচ্ছিলেন৷

আকলু একটা ফাঁকা জায়গা বেছে নিয়ে নৌকো ভিড়িয়েছিল৷ জলটুঙ্গিটা ঘন ঝোপঝাড় আর উঁচু নিচু গাছপালায় ঠাসা৷ একটা গাছের গুঁড়িতে নৌকার কাছি বেঁধে সে আমাকে নামতে সাহায্য করল৷ কর্নেল আগেই নেমেছিলেন৷ এখানে কিছুটা ফাঁকা জায়গা ঘন ঘাসে ঢাকা৷ আকলু আমাদের সাপ সম্পর্কে সাবধান করে দিল৷ সে বলল, —চারদিকে অনেক শুকনো জায়গাও জলে তলিয়ে যাওয়ার জন্য সব সাপ জলটুঙ্গিতে এসে জুটেছে৷

কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, —তুমি কি এই জলটুঙ্গিতে ইদানীং এসেছ আকলু?

আকলু বলল, —আমি আসিনি৷ তবে কপালীগড়ের অনেকে? চুরি করে এখানে গাছ কাটতে আসে৷ তাদের মুখে সাপের কথা শুনেছি স্যার৷ আপনারা বরং দুটো লম্বা ডাল কেটে লাঠি তৈরি করে নিন৷ সামনে আর দু’পাশে ঠুকতে ঠুকতে পা ফেলবেন৷ আমার নৌকোয় একটা দা আছে৷

বলেই সে নৌকো থেকে লম্বা দা এনে দুটো লাঠির মতো ডাল কেটে দিল৷ কর্নেল আমাকে বললেন, —আমার কিটব্যাগে জঙ্গেল-নাইফ আছে৷ ডাল কেটে লাঠি তৈরি করতেই হত৷ আকলু সেই কাজটা করে দিল৷

কথাটা কানে গেলে আকলু একটু হেসে বলল, —আপনি জলটুঙ্গিতে আসবেন শুনেই আমি সঙ্গে দা নিয়েছিলুম৷ আমার ঘরে বাঁশের লাঠি আছে কিন্তু তার চেয়ে টাটকা কাটা গাছের ডালের লাঠির ওজন বেশি৷ যত সাংঘাতিক সাপ হোক, এই ওজনদার লাঠির একটি ঘায়ে নেতিয়ে পড়বে৷

—ঠিক আছে৷ আমরা শিগগির ফিরব৷ তুমি এখানে অপেক্ষা করো৷ যদি দৈবাৎ কেউ এসে তোমার নৌকো ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করে, তা হলে চিৎকার করে আমাকে ডাকবে৷

আকলু কথাটা শুনে অবাক হয়েছিল৷ সে বলল, —কেন একথা বলছেন স্যার?

কর্নেল হাসলেন৷ সাবধানের মার নেই—কথায় বলে না? তা ছাড়া কপালীগড়ের বারীন মিত্তিরের কোনও জলটুঙ্গিতে ঘাঁটি থাকতেও পারে৷ সে কেমন লোক, তা তুমি নিশ্চয়ই জানো!

আকলু দু’হাতে লম্বা ধারালো দায়ের মুঠো চেপে ধরল বললো,—মিত্তিরবাবুকে আমি ভয় করি না স্যার! এলে নরবলি দেব মা কপালীর চরণে!

কর্নেল ঘাসের ভেতর লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এগিয়ে চললেন৷ অসমতল মাটিতে ঘন ঝোপজঙ্গল গজিয়েছে৷ কোথাও-কোথাও কাটা গাছের গুঁড়ি দেখে বুঝতে পারলুম আকলু ঠিকই বলছিল৷ কিছুটা চলার পর কর্নেল ডাকলেন, —হালদারমশাই! হালদারমশাই!

কিন্তু কোনও সাড়া এল না৷ জলটুঙ্গিটা ততবেশি চওড়া নয়৷ সামনে এগিয়ে জঙ্গলের ফাঁকে জল দেখা গেল৷ এবার কর্নেল বললেন, —তুমি ডাইনে এগিয়ে যাও৷ হালদারমশাইকে ডাকবে৷ আমি বাঁদিকে এগিয়ে যাচ্ছি৷ আমিও ওঁকে ডাকব৷

ডাইনে সাবধানে এগিয়ে চললুম৷ জলটুঙ্গির গাছে-গাছে কতরকম পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল৷ কর্নেলের মন এখন পাখির দিকে নেই৷ তাঁর ডাকাডাকি শুনতে পাচ্ছিলুম৷ আমিও ডাকছিলুম, —হালদারমশাই! হালদারমশাই!

তারপর দেখলুম, সামনে একটা ঝোপ খুব নড়ছে৷ সতর্ক হয়ে পকেট থেকে আমার লাইসেন্সড রিভলভার বের করে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলুম৷ ঝোপটার ডানদিক ঘুরে কয়েক পা গিয়ে থমকে দাঁড়ালুম৷

গোয়েন্দাপ্রবর উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন৷ তাঁর দুই হাত এবং দুই পা বাঁধা৷ মাঝে মাঝে কাত হবার চেষ্টা করছেন৷ কিন্তু পারছেন না৷ কারণ পিঠমোড়া করে বাঁধা তাঁর হাতের দড়ির একটা প্রান্ত ঝোপের ভেতর একটা কাটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে শক্তভাবে আটকানো আছে৷ পায়ে মোজা এবং বুটজুতো ধুলোয় ধূসর৷ খুব পা ছুড়েছিলেন বোঝা গেল৷

কিন্তু তিনি যে আমাদের ডাকে সাড়া দিতে পারছেন না, তার কারণ তার মুখে চওড়া টেপ আটা আছে৷

অবশ্য তাঁকে আবিষ্কার করেই আমি কর্নেলকে চিৎকার করে ডেকে উঠেছিলুম৷ কর্নেল এসে পড়ার আগেই আমি হালদারমশাইয়ের হাতের বাঁধন খুলে পায়ের বাঁধন খুলে ফেলেছিলুম৷ হালদারমশাই উঠে বসে মুখের টেপ টানাটানি করছিলেন৷ গোঁফের সঙ্গে টেপ এঁটে যাওয়ার জন্য এই বিপত্তি৷ তবে তিনি ঠোঁট ফাঁক করতে পেরেছেন৷ অতিকষ্টে তিনি বললেন, —জল খামু৷ গলা ব্যাবাক শুকনা লাগে৷

কর্নেল এসে পড়েছেন ততক্ষণে৷ পিঠে আঁটা কিটব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে হালদারমশাইকে জল খাওয়ালেন৷ তারপর হালদারমশাই আচমকা উঠে ওদিকের ঝোপের আড়ালে চলে গেলেন৷

আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলুম৷ হালদারমশাই কি পাগল হয়ে গেছেন? কর্নেল কয়েক-পা বাড়িয়ে উঁকি মেরে দেখে মুচকি হেসে বললেন, —ড্যামের জলে টেপটা ছাড়াচ্ছেন৷ ওঁর মুখ-হাত ধোয়াও দরকার৷ জামাপ্যান্টের ময়লা সময়মতো পরিষ্কার করে নেবেন৷

একটু পরে গোয়েন্দাপ্রবর ফিরে এসে ধপাস করে বসলেন৷ তারপর জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, —সঙ্গে ফায়ারআর্মস লই নাই৷ ভুল করছিলাম৷

কর্নেল বললেন, —এখানে আর থাকা উচিত নয়৷ চলুন৷ যেতে যেতে সব শুনব৷

হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, —আপনারা আইলেন কিসে?

—একটা জেলে নৌকাতে৷

আকলু হালদারমশাইকে দেখে অবাক হয়েছিল৷ সে বলল,—ইনি এই জলটুঙ্গিতে কী করছিলেন?

কর্নেল বললেন, —ইনি রাজবাড়ির ঘনশ্যামবাবুর বন্ধু৷ সেচবাংলোর নৌকোয় এক সায়েবের সঙ্গে এই জলটুঙ্গিতে এসেছিলেন৷ তারপর সায়েব এঁকে একা জঙ্গলে রেখে বাংলোয় ফিরে গেছেন৷ আমি দূর থেকে এই বাইনোকুলারে ব্যাপারটা দেখে একটু ভাবনায় পড়েছিলুম৷

আকলু নৌকোর কাছি খুলে হালে এসে বসল৷ তারপর বলল, —তা ভাবনার কথা তো বটেই৷ কাল সন্ধ্যায় আমি বাজারের কাছে ওই সায়েবকে বারীন মিত্তিরের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলুম৷ বারীন মিত্তির একটা মোটরসাইকেল কিনেছে৷ মোটরসাইকেলের পেছনে সায়েবকে চাপিয়ে কোথায় নিয়ে গেল৷

হালদারমশাই একটা বৈঠা তুলে নিয়েছেন ততক্ষণে৷ তিনি বৈঠা বাইতে বাইতে বললেন,—হঃ! সেচবাংলোর নিচের রাস্তায় কাল সন্ধ্যায় সায়েবেরে একজনের মোটরসাইকেল থেক্যা নামতে দেখছিলাম৷ তার আগেই রাজবাড়ির সামনে সায়েবের লগে আমার আলাপ৷ জানতাম না সে—

কর্নেল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, —ও সব কথা এখন থাক হালদারমশাই৷ আর আপনি কষ্ট করে বৈঠা না টেনে চুপচাপ বসে থাকুন৷ নৌকো বাতাসের গতিপথে যাচ্ছে৷ আমরা এখনই ঘাটে পৌঁছে যাব৷

আকলু হালদারমশাইকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিল৷ বলল, —সায়েব আপনাকে জলটুঙ্গিতে কেন ডেকে এনেছিল স্যার?

হালদারমশাই বললেন, —সায়েব কইল, চলেন৷ ড্যামে রোয়িং করি৷ ক্যান কী—আমি তারে কইছিলাম, নদীর দ্যাশে আমার জন্ম৷ জল দেখলেই আমার আনন্দ হয়৷ আর রোয়িংয়ের কথা কইতাছেন? পোলাপান বয়স থেক্যা আমার রোয়িং করার অভ্যাস আছে৷

কর্নেল বললেন, —প্লিজ হালদারমশাই৷ ওসব কথা এখন থাক৷

আকলু গম্ভীর মুখে বলল, —খোকা মিত্তিরের সঙ্গে যার ভাব, সে সায়েবই হোক, আর লাট-বেলাটই হোক, কখনও ভালো লোক নয়৷

জিজ্ঞেস করলুম, —আকলু! বারীন মিত্তিরের ডাকনাম তা হলে খোকা মিত্তির?

—আজ্ঞে হ্যাঁ৷ সাংঘাতিক লোক৷

আকলু খোকা মিত্তিরের বদমাইসির সাংঘাতিক কিছু গল্প শোনাল৷ তার গল্প শেষ হওয়ার আগেই নৌকো জেলেবস্তির ঘাটে ভিড়ল৷

কর্নেল আকলুকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে বললেন,—আকলু! তুমি যেন এসব কথা নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনা কোরো না৷

আকলু করজোড়ে মাথা নুইয়ে প্রণাম করে বললো, —আপনি সিঙ্গিমশাইয়ের বন্ধু৷ আর সিঙ্গিমশাইয়ের দয়ায় আমরা বেঁচে আছি৷ এই ড্যামে নৌকো বাওয়া কিংবা মাছ ধরা গবরমেন্ট বন্ধ করে দিয়েছিলেন৷ শেষে সিঙ্গিমশাই আমাদের হয়ে লড়াই করেছিলেন৷ আমরা সমবায় সমিতি করেছি৷ ওই দেখুন সাইনবোর্ড৷

দেখলুম, গাছপালার ফাঁকে উঁচুতে একটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে,—কপালীগড় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি৷ আকলু আমাকে এবং হালদারমশাইকেও করজোড়ে প্রণাম করল৷ তারপর সে কর্নেলকে বলল, —যখনই আমাকে স্যারের দরকার হবে, গোকুলকে দিয়ে খবর পাঠাবেন৷

জেলেবস্তি পেরিয়ে কিছুদূর চলার পর সেচবাংলো চোখে পড়ল৷ কর্নেল হঠাৎ থেমে বাইনোকুলারে ওদিকটা দেখতে দেখতে বললেন, —চার্লস জেরিসনেরও বাইনোকুলার আছে৷ তবে সে বাইনোকুলারে জলটুঙ্গিটা দেখছে৷ হঠাৎ কর্নেল চাপা কণ্ঠস্বরে বলে উঠলেন, —চলো৷ নিচের দিকে নেমে যাই৷ ঝোপঝাড়ের আড়ালে গেলে ব্যাটাচ্ছেলে আমাদের দেখতে পাবে না৷

তাঁকে অনুসরণ করে ঢালু জায়গা দিয়ে নেমে আমরা এক পোড়ো জমিতে গেলুম৷ তারপর কর্নেল বললেন, —সেচবাংলোর সেই রোয়িং বোটে চেপে দুটো লোক জলটুঙ্গিটার দিকে যাচ্ছে৷ আমি খোকা মিত্তিরকে কখনও দেখিনি৷ তবে আমার সন্দেহ, ওদের একজন সম্ভবত খোকা মিত্তির৷

চমকে উঠেছিলুম কথাটা শুনে৷ বললুম, —ওরা জলটুঙ্গিতে কেন যাচ্ছে?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —হাত-পা বাঁধা হালদারমশাইকে বলি দিতে৷

গোয়েন্দাপ্রবর গর্জন করলেন, —অগো আমি ছাডুম না! এখনই রাজবাড়ি গিয়া আমার ফায়ার আর্মস লইয়া তিন শয়তানেরে গুলি করুম৷ অগো লাস ড্যামে ভাসব৷

কর্নেল তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, —হালদারমশাই! ভুলে যাবেন না যে, আপনি এখন আর পুলিশ অফিসার নন৷ প্রাইভেট ডিটেকটিভ৷ আপনার কাজ নরহত্যা নয়৷ চলুন, ওই বাগানে গিয়ে ঘাসের ওপর বসে আপনার কথা শুনব৷

গোয়েন্দাপ্রবর শ্বাস ছেড়ে বললেন, —হঃ৷ বড্ড টায়ার্ড৷ চলেন৷ এট্টু রেস্ট লই৷

এটা একটা আমবাগান৷ কর্নেলের কাছে জানা গেলে, এই বাগানের মালিক প্রণবেশ সিংহ৷ এখন মার্চে আমগাছগুলিতে মুকুল এসে গেছে৷ বাতাসে ভাসছে মিঠে গন্ধ৷ পাখ-পাখালির ডাক শোনা যাচ্ছে৷ শাস্ত নির্জন নিরিবিলি পরিবেশ৷ কর্নেল এবার চুরুট ধরিয়ে বললেন, —বলুন হালদারমশাই৷

হালদারমশাই যা বললেন, তা সংক্ষেপে এই:—

গতকাল বিকেলে চার্লস জেরিসন রাজবাড়িতে জাদুঘর দেখতে এসেছিল৷ কিন্তু তাকে দারোয়ান ছোটেলাল ভেতরে ঢুকতে দেয়নি৷ কেন দেয়নি তা হালদারমশাই জানতেন৷ গণেন্দ্র ছোটেলালকে নিষেধ করে রেখেছিল৷ সেই সময় হালদারমশাই আড়ি পেতে কথাটা শুনেছিলেন৷ এতে তাঁর খটকা লেগেছিল৷ কারণ তিনি ঘনশ্যামবাবুর কাছে শুনেছিলেন, গণ্যমান্য লোকে জাদুঘর দেখতে এলে তাঁদের খাতির করে জাদুঘর দেখানো হয়৷ মেজো কুমারবাহাদুর হুইলচেয়ারে হলঘরে তাঁদের নিয়ে যান এবং ঘনশ্যামবাবু ভেতর থেকে জাদুঘরের কপাট খুলে আলো জ্বেলে দেন৷ ছোটো কুমারবাহাদুর গণেন্দ্র ফিরে আসার পরও কতজনকে জাদুঘর দেখানো হয়েছে৷

কিন্তু এই সায়েবকে ঢুকতে না দেওয়ায় হালদারমশাই সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠেন৷ তিনি সায়েবকে অনুসরণ করেন৷ তারপর তার সঙ্গে যেচে পড়ে আলাপ করেন৷ হালদারমশাই এই ঐতিহাসিক এলাকার ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে নিজের পরিচয় দেন! তাঁর নিজস্ব ইংরেজিতে বানিয়ে বানিয়ে অনেক অদ্ভুত ঐতিহাসিক গল্প শোনান৷ তারপর রাজবাড়ির জাদুঘরে কী-সব ঐতিহাসিক প্রত্নদ্রব্য আছে, তারও কাল্পনিক বিবরণ দেন৷ সায়েব খুব আগ্রহের সঙ্গে শুনছিল৷ শেষে হালদারমশাই চুপিচুপি সায়েবকে গণেন্দ্রের ইউহোনোদ্বীপ থেকে নিয়ে আসা সম্রাট হোহেনহুম্বার সিলের কথা বলেন৷ সায়েব জানতে চায়, সিলটা দেখতে কেমন? ঘনশ্যামবাবুর কাছে সিলটার বিবরণ শুনে নিয়েছিলেন হালদারমশাই৷ তাই একটা ত্রিভুজ এবং চাঁদের বর্ণনা দেন৷ তখন সায়েব তাঁকে বলে, ওই সিলটা যদি হালদারমশাই কোনও কৌশলে হাতিয়ে আনতে পারেন, সায়েব তাকে অনেক টাকা বখশিস দেবে৷ হালদারমশাই বলেন, কয়েকদিন সময় লাগবে৷ এই সময় মোটরসাইকেলে চেপে একটা যণ্ডামার্কা লোক সেখানে এসে পড়ে৷ হালদারমশাই তখনই কেটে পড়েন৷

এখন তাঁর মনে হচ্ছে, সেই যণ্ডামার্কা লোকটাই সায়েবকে জানিয়েছিল, এখানে কোনও ট্যুরিস্টগাইড নেই৷ এই কারণেই সম্ভবত সায়েবের সন্দেহ হয়েছিল, হালদারমশাই রাজবাড়ির বা পুলিশের চর৷ যাই হোক, তখন হালদারমশাইয়ের মাথায় এসব কথা আসেনি৷

তাই হালদারমশাই আজ সকালে সেচবাংলোয় সায়েবের সঙ্গে দেখা করতে যান৷ সায়েব তাঁকে বুঝতে দেয়নি কিছু৷ কথায়-কথায় সায়েব তাঁকে বলে, ওই জলটুঙ্গিগুলো তো পুরনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষে৷ গাইড মিঃ হালদার যদি তাকে সামনের জলটুঙ্গিতে নিয়ে যান, সে তাঁকে বখশিস দেবে৷ সেচবাংলোর রোয়িং বোটে চেপে ওখানে যাওয়া যায়৷ হালদারমশাই তখনও কল্পনাও করেননি, সায়েব কী উদ্দেশ্যে ওখানে যেতে চাইছে৷

যাই হোক, জলটুঙ্গিতে পৌঁছে হালদারমশাই নানারকম কাল্পনিক পুরোনো গল্প বলতে শুরু করেন৷ একটু পরে সেই ঝোপটার কাছে গিয়ে সায়েব হঠাৎ ‘স্নেক! স্নেক!’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে৷ গোয়েন্দাপ্রবর সাপ শুনেই চমকে উঠে পিছু হটেছিলেন৷ অমনই সায়েব পিছন থেকে তাঁর দুটো হাত ধরে ফেলে তাঁর পিঠে হাঁটুর চাপ দেয়৷ উনি উপুড় হয়ে পড়ে যান৷ সায়েবের গায়ের জোর প্রচণ্ড৷ সে তাঁর পিঠে বসে প্রথমে দুটো হাত বেঁধে ফেলে গাছের কাটা গুঁড়ির সঙ্গে আটকে দিয়ে পা-দুটোও বেঁধে ফেলে৷ নাইলনের দু-টুকরো মোটা দড়ি হালদারমশাইকে কাবু করে ফেলেছিল৷ তারপর শয়তান সাদা চামড়ার লোকটা তাঁর মুখে টেপ সেঁটে দিয়ে চলে যায়৷ এর ফলে হালদারমশাই একেবারে অসহায় হয়ে পড়েন৷ কিছুক্ষণ পরে সত্যি একটা সাপ তাঁর মাথার পাশ দিয়ে চলে যায়৷ তখন তিনি শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ করে পাথরের মতো নিষ্পন্দ হয়ে থাকেন৷ কারণ একটু নড়লেই সাপটা তাঁকে ছোবল দিত৷...

এই শোচনীয় ঘটনার বিবরণ দিয়ে হালদারমশাই আবার জল খেলেন৷ তারপর হঠাৎ খাপ্পা হয়ে বললেন, —মশায়! চৌতিরিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি৷ কিন্তু এমন বিপদে কখনও পড়ি নাই! ওই সাদা চামড়ার শয়তানেরে আমি সহজে ছাড়ুম না৷

কর্নেল বললেন,—এবার উঠে পড়া যাক৷ চলুন! আগে মিঃ সিংহের বাড়ি গিয়ে কফি খেয়ে চাঙ্গা হবেন৷ তারপর কী করা যায়, চিন্তাভাবনা করতে হবে৷ চার্লস জেরিসনের প্রকৃত পরিচয় জানবার চেষ্টা করা দরকার৷ দেরি করলে লোকটা গা-ঢাকা দেবে৷

নির্জন পথে যেতে যেতে বললুম, —ভাবতেই আমার শরীর শিউরে উঠছে৷ হালদারমশাইকে ওইভাবে নির্জন জলটুঙ্গিতে ফেলে রেখে শয়তান জেরিসন খোকা মিত্তিরকে খবর দিয়ে ডেকে এনেছিল৷ এতক্ষণ খোকা মিত্তির হালদারমশাইকে খুন করে মাটিতে পুঁতে ফেলত!

হালদারমশাই শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে শুধু বললেন, —হঃ!

কর্নেল বললেন, —আমি জয়ন্তকে বলেছিলুম, হালদারমশাই বিচক্ষণ মানুষ৷ নিজেকে বাঁচাতে উনি পারবেন৷ কিন্তু হালদারমশাইয়ের একটা ভুল হয়েছিল!

গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, —কী ভুল?

কর্নেল হাসলেন৷ —না এটা ভুল হয়তো নয়৷ আসলে আমাদের অবচেতনায় সাদা চামড়ার লোকেদের প্রতি একটা অদ্ভুত মোহ থেকে গেছে৷ সেই মোহ থেকে আমরা সায়েবকে সুসভ্য মানুষ মনে করি৷ ওরা যে কোনও অন্যায় করতে পারে, এটা ভাবতে পারি না৷ বর্বরতায় ওরা যে আমাদের চেয়ে কত সাংঘাতিক, তা আমার সামরিক জীবনে আমি দেখেছি৷

হালদারমশাই সখেদে বললেন, —ঠিক কইছেন! আমার সাবধান হওয়ার দরকার ছিল৷...

প্রণবেশ সিংহ দোতলার বারান্দা থেকে আমাদের দেখে নেমে এলেন, তারপর হালদারমশাইকে দেখে বললেন, —কে ইনি? এঁকে এমন দেখাচ্ছে কেন?

কর্নেল হালদারমশাইয়ের পরিচয় দিয়ে বললেন, —চলুন! ওপরে গিয়ে সব বলছি৷...

দোতলায় গেস্টরুমে ঢুকে মিঃ সিংহ গোকুলকে ডেকে কফি আনতে বললেন৷ তারপর কর্নেল ওঁকে হালদারমশাইয়ের শোচনীয় ও সাংঘাতিক ঘটনা শোনালেন৷ তারপর সায়েবের সঙ্গে হালদারমশাইয়ের আলাপের কথা এবং সম্রাট হোহেনহুম্বার সিল চুরিতে প্ররোচনার কথাও কর্নেল মিঃ সিংহকে বললেন৷

মিঃ সিংহ ঘটনা শুনে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন৷ তিনি বললেন, —আমি এখনই টেলিফোনে পুলিশকে বলছি, অবিলম্বে ওই সাদা চামড়ার শয়তানটাকে যেন গ্রেফতার করে৷

কর্নেল বললেন, —একটু ধৈর্য ধরুন মিঃ সিংহ! চার্লস জেরিসন মার্কিন নাগরিক এবং সরকারের সেচ বিভাগ নিশ্চয়ই কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতি অনুসারে তাকে এনেছে৷ এক্ষেত্রে শুধু হালদারমশাইকে জলটুঙ্গিতে নিয়ে গিয়ে বেঁধে রাখা ছাড়া তার বিরুদ্ধে প্রমাণ করার মতো কোনও কেস আমাদের হাতে নেই৷ সে পুলিশকে বলবে, দুর্গের ধ্বংসাবশেষ দেখানোর অছিলায় হালদারমশাই তাকে নিয়ে গিয়ে ছুরি-টুরি দেখিয়ে টাকাকড়ি ছিনতাই করার চেষ্টা করেছিলেন৷ তাই ওঁকে সায়েব ধরাশায়ী করে বেঁধে রেখে পালিয়ে এসেছিল!

মিঃ সিংহ ঠোঁট কামড়ে ধরে চুপচাপ বসে রইলেন৷ একটু পরে গোকুল কফি দিতে এসে বলল, —ঘনশ্যামবাবু আবার এসেছেন৷

মিঃ সিংহ বললেন, —ওঁকে এখানে নিয়ে আয়৷

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘনশ্যাম মজুমদার এলেন৷ ব্যস্তভাবে ঘরে ঢুকে তিনি বললেন, —ছোটো কুমারবাহাদুর বর্ধমান থেকে টেলিফোনে আমাকে বললেন, জাদুঘরের যে চাবিটা তাঁকে বড়ো কুমারবাহাদুর দিয়েছিলেন, সেটা উনি ঠাকুরবাড়িতে মন্দিরের উত্তরদিকের কুলুঙ্গিতে মাটির প্রদীপের পিছনে লুকিয়ে রেখে এসেছেন৷ ওই চাবি দিয়ে গোপনে জাদুঘরে ঢুকে আমি যেন সম্রাট হোহেনহুম্বার সিলটা নিয়ে বর্ধমানে আজ কিংবা কাল সকালে দেখা করি৷ সিলটা ওঁর দরকার৷ বর্ধমানে উনি তাঁর পিসতুতো দাদার বাড়িতে আছেন৷ সে-বাড়ি আমার চেনা৷ কিন্তু আমি এখন কী করি ভেবে পাচ্ছিনা৷ সিলটা তো নেই৷

মিঃ সিংহ কর্নেলের দিকে তাকালেন৷ কর্নেল বললেন, —আপনি কি চাবিটা খুঁজে পেয়েছেন?

ঘনশ্যামবাবু বললেন, —পেয়েছি৷ এই দেখুন৷

কর্নেল বললেন, —আপনার বন্ধু হালদারমশাই পরে যাবেন৷ আপাতত চাবি আপনি সাবধানে রেখে দিন৷ আর একটা কথা৷ বড়ো কুমারবাহাদুর এবং মেজো কুমারবাহাদুরকে আমার এই নেমকার্ড দেখিয়ে বলুন, আমি রাজবাড়ির জাদুঘর দেখতে চাই৷ যদি ওঁরা আমাকে জাদুঘর দেখার অনুমতি না দেন, তা হলে আজ রাত্রে আমি যাতে রাজবাড়িতে ঢুকতে পারি, তার ব্যবস্থা করে আমাকে জানাবেন৷

ঘনশ্যামবাবু কর্নেলের নেমকার্ডটা পকেটে ভরে উদ্বিগ্ন মুখে চলে গেলেন৷...

II পাঁচ II

বেলা দেড়টা নাগাদ খাওয়াদাওয়া সেরে যথারীতি আমি বিছানায় গড়িয়ে পড়েছিলুম৷ কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন৷ হালদারমশাই চেয়ারে হেলান দিয়ে ঝিমোচ্ছিলেন৷ ট্রেন-জার্নির ধকল আর হালদারমশাইকে জলটুঙ্গি থেকে উদ্ধার করার ঘটনা আমাকে খুব ক্লান্ত করেছিল৷ কখন ঘুম এসে গিয়েছিল৷

সেই ঘুম ভেঙেছিল গোকুলের ডাকে৷ সে চা এনেছিল৷ দেওয়াল ঘড়িতে দেখলুম চারটে বেজে গেছে৷ চায়ের কাপপ্লেট নিয়ে গোকুলকে জিজ্ঞেস করলুম, —কর্নেলসায়েব কোথায়?

গোকুল বললো,—নিচে কর্তামশাই আর ছোটো বউদিমণির সঙ্গে গল্প করছেন৷

সে চলে যাওয়ার পর পশ্চিমের ব্যালকনিতে গিয়ে ওয়াটারড্যাম দেখতে দেখতে চা-পান করব ভেবেছিলুম৷ কিন্তু ওদিকে চোখধাঁধানো রোদের ছটা বিস্তীর্ণ জলাধারকে আড়াল করেছে যেন৷ দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে বসলুম৷ সেই সময় চোখে পড়ল, নিচে সবুজ ঘাসের লনে কর্নেল, মিঃ সিংহ এবং এক মহিলা চেয়ারে বসে কথা বলছেন৷ একটু তফাতে একটি ছোট্ট মেয়ে আপনমনে স্কিপিং করছে৷ বুঝলুম, মহিলাটি মিঃ সিংহের ভ্রাতৃবধূ সুপর্ণা৷ আর ছোট্ট মেয়েটি তাঁর কন্যা তিন্নি৷

চা খাওয়ার পর নিচে গেলুম৷ মিঃ সিংহ তাঁর বিধবা ভ্রাতৃবধূ সুপর্ণাদেবীর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলেন৷ একটু পরে সুপর্ণা তাঁর মেয়েকে ডেকে দোতলায় নিয়ে গেলেন৷ কর্নেল আমাকে বললেন, —আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে, জয়ন্ত৷

বললুম, —হয়েছে৷ কিন্তু হালদারমশাই কোথায়?

কর্নেল হাসলেন৷ —পুলিশ অফিসাররা রিটায়ার করলেও সম্ভবত মনে-মনে পুলিশ অফিসার থেকে যান৷ তাই হালদারমশাই দ্রুত ফিট হয়ে উঠেছিলেন৷ তা ছাড়া ওঁর ফায়ারআর্মস রাজবাড়িতে ঘনশ্যামবাবুর কোয়ার্টারে আছে৷ তাই তাঁকে আটকানো যায়নি৷ পোশাক বদলানোর দরকারও অবশ্য ছিল৷

মিঃ সিংহ বললেন, —ভদ্রলোক শিগগির ফিরে আসবেন বলে গেলেন৷ কিন্তু এখনও ফিরছেন না৷ গোকুলকে পাঠিয়ে খবর নেওয়া উচিত৷ কী বলেন?

কর্নেল গেটের দিকে ঘুরে বললেন, —গোকুলকে পাঠানোর দরকার হবে না৷ হালদারমশাই এসে গেছেন৷

গেটের একাংশ খোলা ছিল৷ দেখলুম গোয়েন্দাপ্রবর সবেগে এগিয়ে আসছেন৷ তাঁর কাঁধে ব্যাগ৷ আমাদের কাছে এসে খালি চেয়ারটাতে বসে তিনি বললেন, —কী কাণ্ড! কী য্যান কথাটা? রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়! দাদা-ভাইয়ে ভীষণ কলহ বাধছিল৷ ঘনশ্যামবাবু দৌড়াইয়া গেছিলেন৷ অমনই দুই ভাইয়ের রাগ পড়ল তাঁর উপরে৷ দুইজনেই কয়, ঘনারই যত দোষ৷ কী ব্যাপার, বুঝলাম না৷ রাজবাড়িতে ভীম নামে একজন কাজের লোক ফ্যামিলি লইয়া থাকে৷ সেই ভীম যাইয়া ঘনশ্যামবাবুরে রক্ষা করল৷

কর্নেল বললেন, —রক্ষা করল মানে?

—কইতে ভুলছি৷ হুইলচেয়ারে যিনি ঘোরেন, তাঁর চেয়ারের পাশে বন্দুক থাকে৷ বন্দুক উঠাইয়া তিনি ঘনশ্যামবাবুরে গুলি করেন আর কী! আমিও দৌড়াইয়া গিছলাম৷ তবে ভীম ওনারে শান্ত করল৷

সিঃ সিংহ বললেন, —কিন্তু দুই রাজপুত্তুরের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল কী নিয়ে?

হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, —মিউজিয়াম কথাটা দুইজনের মুখেই শুনছি৷ কাইল রাত্তিরে বড়োভাই মিউজিয়ামে ঢুকছিলেন নাকি৷ মেজোভাই তা ট্যার পাইছেন৷

কর্নেল বললেন, —আপনি তো গতরাত্রে কনকেন্দ্রকে বাইরের হলঘরে ঢুকতে দেখেছিলেন৷

হঃ! —হালদারমশাই একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন, —কেমন একটা চাপা ঘরঘর ঘসঘস শব্দও শুনছিলাম৷

মিঃ সিংহ বললেন, —ঘনশ্যামকে ওঁরা কী বলছিলেন?

গোয়েন্দাপ্রবর ফের চাপাস্বরে বললেন, —ঘনশ্যামবাবু সন্ধ্যার সময় আইবেন৷ ওনার কাছে সব শুনবেন৷ আমি কিছু বুঝি নাই৷ তবে ওই ভীম বুঝছে৷

মিঃ সিংহ কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন, —ভীম লোকটা ভালো নয়৷ ওর বউ কিন্তু অন্য রকম৷ তা ছাড়া দূরসম্পর্কে —গোকুলের বোন হয়৷ গোকুল যথাসময়ে আসল খবর এনে দেবে৷

হালদারমশাই বললেন, গোকুলের পৈতা দেখছি৷ ভীমেরও পৈতা দেখছি!

—হ্যাঁ৷ এ অঞ্চলে রান্নার কাজ এখনও ব্রাহ্মণরাই করেন৷ অবশ্য যাঁরা গরিব, তাঁরাই৷ রান্না ছাড়া গৃহদেবতার পুজোও করেন৷

এই সময় গোকুল কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে এনে রাখল৷ কর্নেল সহাস্যে বললেন, —গোকুলকে আপনি ‘তুই’ বলবেন না মিঃ সিংহ! ব্রহ্মশাপ লাগবে৷

গোকুল হাসতে হাসতে চলে গেল৷ মিঃ সিংহ বললেন, —গোকুলকে আমি সত্যি বলতে কি, এইটুকু থেকে আশ্রয় দিয়েছি৷ ও আমার ছেলের মতো৷ ওকে মোটামুটি লেখাপড়াও শিখিয়েছি৷

এইসব কথাবার্তার মধ্যে একসময় বাড়িতে আলো জ্বলে উঠল৷ আরও কিছুক্ষণ পর ঘনশ্যাম মজুমদার এলেন৷ কর্নেল বললেন, —চলুন৷ ওপরে যাওয়া যাক...

দোতলার গেস্টরুমে গিয়ে ঘনশ্যামবাবু যে ঘটনা শোনালেন, তা সংক্ষেপে এই:—

গতরাত্রে কনকেন্দ্র চুপিচুপি হলঘরে ঢুকেছিলেন এবং ভীম তা দেখেছিল৷ ধূর্ত ভীমই সম্ভবত সে-কথা খগেন্দ্রকে জানিয়ে থাকবে৷ খগেন্দ্র সেই নিয়ে প্রশ্ন করায় কনকেন্দ্র কী কারণে খুব চটে যান৷ খগেন্দ্রের সন্দেহ, তাঁর জন্মান্ধ দাদা লুকিয়ে মিউজিয়ামে ঢুকে মূল্যবান কোনও ঐতিহাসিক জিনিস হাতাতে গিয়েছিলেন৷ জিনিসটা তাঁর ছোটোভাই গণেন্দ্রের সংগৃহীত৷ কারণ গণেন্দ্র নাকি মেজদা খগেন্দ্রকে গোপনে বলেছিলেন, তাঁর সংগৃহীত ৭টি দুর্লভ এবং মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শনের লোভে এক সায়েব কপালীগড়ে এসেছে৷ সায়েবকে যেন মিউজিয়াম না দেখানো হয়৷ খগেন্দ্র তাই সেই মার্কিন চার্লস জেরিসনকে বাড়ি ঢুকতে দেননি৷ দারোয়ান ছোটেলালকে বলে রেখেছিলেন কথাটা৷ ঘনশ্যামবাবুর ধারণা, সেই সায়েব সম্ভবত গোপনে কনকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন৷ গতকাল গণেন্দ্র বর্ধমান গেছেন৷ এই সুযোগে কনকেন্দ্র তার সংগৃহীত জিনিসগুলো হাতানোর জন্যই নাকি মিউজিয়ামে ঢুকেছিলেন৷ আজ বিকেলে কনকেন্দ্র আবার হলঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন৷ তখনই খগেন্দ্র তাঁকে বাধা দেন৷ তারপর দু’জনে প্রচণ্ড বচসা বেধে যায়৷ থামাতে গেলে উল্টে ঘনশ্যামবাবুর উপর দু’জনের রাগ এসে পড়ে৷ খগেন্দ্রের মতে, ঘনশ্যামবাবুর যোগসাজশেই গণেন্দ্রের সংগৃহীত জিনিস কনকেন্দ্র সেই সায়েবকে বেচতে চেয়েছিলেন৷ আর কনকেন্দ্রের মতে, ঘনশ্যামবাবুই তাঁর নামে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন খগেন্দ্রের কাছে৷ এই অবস্থায় ঘনশ্যামবাবু পড়েছেন বিপদে৷ কারণ গণেন্দ্র কাল ফিরে এসে দেখবেন, মিউজিয়ামে তাঁর সংগৃহীত সিলটা নেই৷ তারপর তাঁর চাকরি যাবে৷ রাজবাড়ি থেকে তাঁকে সপরিবারে চলে যেতে হবে৷

আরও একটা গণ্ডগোলের সূত্র হালদারমশাইকে নিয়ে৷ ঘনশ্যামবাবু বন্ধু বলে একজন পূর্ববঙ্গীয় ভদ্রলোককে কী উদ্দেশ্যে বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন? দুই ভাই এ প্রশ্নও তুলেছেন৷ তাই বেগতিক দেখে ঘনশ্যামবাবু হালদারমশাইকে রাজবাড়ি থেকে চলে যেতে বলেছেন৷

এবার হালদারমশাই বিরসমুখে বললেন, —আমার অসুবিধা নাই৷ হোটেলে গিয়া থাকব৷

প্রণবেশ সিংহ বললেন, —হোটেলে কেন? আপনি আমার বাড়িতে থাকবেন৷ তবে যা বুঝলুম, ঘনশ্যামের মাথার ওপর সত্যি একটা বিপদের খাঁড়া ঝুলছে৷ এদিকে কর্নেলসায়েবেকেও আর রাজবাড়ির মিউজিয়াম পরিদর্শনের সুযোগ ওরা দেবে না৷

ঘনশ্যামবাবু জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন, —বিনা দোষে দণ্ডভোগ৷ আমি এখন কী করি আপনারা বলুন! —আমি একা মানুষ হলে চিন্তার কারণ ছিল না৷ আমি যে এবার ভেসে যাব! আমার স্ত্রী-পুত্রের কী হবে?

কর্নেল চুরুট টানতে টানতে চোখ বুজে কথা শুনছিলেন৷ মিঃ সিংহ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন৷ তাঁর আগেই কর্নেল চোখ খুলে বললেন, —একটা কথা ঘনশ্যামবাবু!

ঘনশ্যাম মজুমদার বললেন, —বলুন স্যার৷

—গণেন্দ্রনারায়ণ মোট ৭টা জিনিস মিউজিয়ামে রেখেছেন৷ —১২৩ নম্বর হল সেই ব্রোঞ্জের সিল৷ বাকিগুলো কী?

ঘনশ্যামবাবু আঙুলের গিরে গুনতে গুনতে মুখস্থ কথার ভঙ্গিতে বললেন,—১২৪নং আইটেম একটা রঙবেরঙের পাথরের মালা৷ পাপুয়াদ্বীপের আদিবাসীদের মালা৷ ১২৫ নং আইটেম একটা মরচেধরা বাঁকা ছোরা৷

ইউহোনো দ্বীপের একটা ধ্বংসস্তূপে সেটা পাওয়া গিয়েছিল৷ ১২৬ নং আইটেম একটা ফুটখানেক লম্বা গোল কাঠের নল৷ ব্যাস তিন ইঞ্চি৷ দুইমুখেই গালার সিলকরা আছে৷ ১২৭ নং আইটেম একটা মাটির কলসির মুখের অংশ৷ রঙবেরঙের নকশা আঁকা আছে৷ সেই ধ্বংসস্তূপে পাওয়া গিয়েছিল৷ ১২৮ নং আইটেম একটা সাদাকালো পালক বসানো ব্রোঞ্জের মুকুট৷ ইউহোনো দ্বীপের আদিবাসীদের উৎসবে ওই মুকুট পরে মেয়েরা নাচে৷ ১২৯ নং আইটেম ইঞ্চি ছয়েক লম্বা ইঞ্চি তিনেক চওড়া কালো পাথরের ফলক৷ তাতে অজানা ভাষায় চার লাইন কিছু লেখা আছে৷ এটাও ছোটো কুমারবাহাদুর ইউহোনো দ্বীপের একটা ধ্বংসস্তূপে পেয়েছিলেন৷

কর্নেল বললেন, —সব জিনিসের বিবরণ পেলুম৷ শুধু ১২৬ নং বাদে৷

—গোল কাঠের নলটার তো? ঘনশ্যামবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, —ঠিক বলেছেন স্যার! ওটার ডেসক্রিপশনের জায়গা খালি রাখতে বলেছিলেন ছোটো কুমারবাহাদুর৷ ওটা কী, তা উনি নাকি নিজেও জানেন না৷ পরে তাঁর ডায়রি দেখে বলবেন৷

—তাঁর সেই ডায়রি বই কি আপনি দেখেছেন?

—আজ্ঞে না৷

—এবার একটা প্রশ্ন৷ বড়ো কুমারবাহাদুর গতরাত্রে হলঘরে ঢুকেছিলেন৷ কিন্তু ওই ঘর থেকে তো মিউজিয়ামে ঢোকা যাবে না৷ কারণ আপনিই বলেছেন, মিউজিয়ামের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ৷ মেজকুমারবাহাদুর এ কথা নিশ্চয়ই জানেন৷ তাই না?

—নিশ্চয়ই জানেন৷

—তা হলে কেন মেজো কুমারবাহাদুর দাদার বিরুদ্ধে হলঘর দিয়ে মিউজিয়ামে ঢুকে কোনও জিনিস চুরির অভিযোগ করলেন?

ঘনশ্যামবাবু কর্নেলের দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে ছিলেন৷ এবার তিনি চাপা স্বরে বললেন, —কথাটা আমার মাথায় ছিল না৷ আপনিই মনে পড়িয়ে দিলেন৷ বারীন—মানে খোকা মিত্তিরের বাবা ব্রজেনবাবু আগে রাজ এস্টেটের কর্মচারী ছিলেন৷ তাঁর কাছে শুনেছিলুম, হলঘর থেকে মিউজিয়ামে ঢোকার জন্য নাকি গোপন একটা দরজা আছে৷ সেটা আমি খুঁজে পাইনি৷ হলঘরের যে দেওয়াল মিউজিয়ামের দিকে, সেখানে বই আর দেশি-বিদেশি পুতুল, তা ছাড়া নানারকম কারুকার্যকরা পুরোনো সব ঢাল-তরোয়াল ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্রের আলমারি আছে৷

—মিউজিয়ামের ভেতর সেই দেওয়ালের গায়েও কি আলমারি আছে?

—আছে৷ প্রকাণ্ড কয়েকটা বিদেশি অয়েলপেন্টিংও দেয়ালে আটকানো আছে৷

—ঘর পরিষ্কার করে কে?

—ভীম ওপর-ওপর ধুলোময়লা ঝেড়ে পরিষ্কার করে৷ আমি সুপারভাইজ করি৷

কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টে ঘনশ্যামবাবুর দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলেন৷ এবার বললেন, —পুরোনো আমলে সব দেশেই রাজা-মহারাজা, লর্ড বা ব্যারনদের বাড়িতে কোনও-কোনও ঘরের দেওয়ালে গুপ্ত দরজা তৈরির প্রথা ছিল৷ নির্দিষ্ট কোনও জায়গায় চাপ দিলে দেওয়ালের একাংশ ফাঁক হয়ে যেত৷ কিন্তু জায়গাটা এমন কৌশলে পলেস্তারা করা থাকত যে দেখে কিছু বোঝা যেত না৷ সেই দেওয়ালে জ্যামিতিক নকশাও আঁকা থাকত৷

ঘনশ্যামবাবু আস্তে বললেন, —তেমন কিছু আমার চোখে পড়েনি৷

কথাটা বলে তিনি মিঃ সিংহের দিকে বিমর্ষ মুখে তাকালেন৷ মিঃ সিংহ বললেন, —তুমি বলবে, —গণেন্দ্র কোথা থেকে কার কী চুরি করে এনেছে৷ সেইজন্য কেন্দ্রীয় তদস্ত ব্যুরো থেকে অফিসাররা এসেছেন৷ তুমি জোর দিয়ে বলবে, এক্ষুনি থানায় গিয়ে সব ফাঁস করে দেব৷

হালদারমশাই সায় দিয়ে বললেন, —হঃ৷ ঠিক এই কথা কইয়া দিবেন৷

আমি হাসতে হাসতে বললুম, —দরকার হলে কর্নেল সি বি আই অফিসার হবেন৷ আর আপনি তো আছেন৷ সঙ্গে আমিও থাকছি৷

মিঃ সিংহও হেসে ফেললেন৷ —তিনজন সি বি আই অফিসারের টিম৷ কর্নেলকে দেখলেই খগেন্দ্র আর গণেন্দ্র ভিরমি খাবে৷ দৃশ্যটা স্পষ্ট কল্পনা করা যায়৷ মেজো-ছোজো তোতলাচ্ছে৷ আর বড়ো বারবার বলছে, ‘কী হয়েছে? কী হয়েছে?’ অন্ধ মানুষ৷ কিন্তু কনকেন্দ্র সব টের পায়৷ ঘনশ্যাম! তুমি নির্ভয়ে থাকো৷

কর্নেল বললেন, —মিউজিয়ামে আজ রাত্রে কি কোনওভাবে আমার ঢোকার ব্যবস্থা করা যায় না ঘনশ্যামবাবু? ওই ঘরের চাবি তো এখন আপনার কাছে আছে৷

ঘনশ্যামবাবু একটু ভেবে নিয়ে বললেন, —দারোয়ান ছোটেলাল আমাকে ভক্তিশ্রদ্ধা করে৷ তার কিন্তু রাতের দিকে গাঁজা-ভাং খাওয়ার অভ্যাস আছে৷ এদিকে ভীম তার দোসর৷ আমি গিয়ে ছোটেলালকে যদি বলি, ভীমকে ভাংয়ের সঙ্গে আফিম মিশিয়ে খাওয়াবে, ছোটেলাল আমার কথা মানবে৷ কারণ জানতে চাইলে বলব, ভীম আজ রাতে মেজো কুমারবাহাদুরের হুকুমে খুন করতে আসবে৷

কর্নেল হাসলেন৷ —তারপর?

—রাত বারোটায় আপনারা যাবেন৷ বাড়ির মেনস্যুইচ অফ করে দেব৷ খিড়কির দরজা দিয়ে আপনাদের ঢোকাব৷ লোডশেডিং তো প্রতিরাত্রে হয়৷

—না৷ মেনস্যুইচ অফ করবেন না৷ বরং বাইরের আলোগুলো নিভিয়ে দেবেন৷ কারণ ফ্যান বন্ধ হলে কনকেন্দ্র খগেন্দ্রের ঘুম ভেঙে যেতে পারে৷

মিঃ সিংহ আবার হেসে উঠলেন৷ —কর্নেলসায়েব! এই মার্চ মাসে এখনও রাতের দিকে খুব হিম পড়ে৷ কুয়াশায় সবকিছু ঢেকে যায়৷ এ ঘরে ফ্যান চলছে না, তা লক্ষ্য করেছেন কি?

কর্নেল বললেন, —মাই গুডনেস! আমি জয়ন্তকে শীতের পোশাক আনতে বলেছিলুম৷ আর আমিই— নাঃ! সম্রাট হোহেনহুম্বার গুপ্তধনের লোভেই যেন আমার মাথা বিগড়ে গেছে!

হালদারমশাই বললেন,—গুপ্তধন? এখানে গুপ্তধন? কোন সম্রাটের নাম কইলেন য্যান?

—হোহেনহুম্বা৷

প্রাইভেট ডিটেকটিভ বিড়বিড় করে নামটা উচ্চারণের চেষ্টার পর বললেন, —আপনি কইছিলেন, নাকি ঘনশ্যামবাবু কইছিলেন সে তো প্রশাস্ত মহাসাগরের কোন দ্বীপে—

তাঁকে থামিয়ে দিয়ে কর্নেল বললেন, —এখন দ্বীপের কথা নয়৷ ঘনশ্যামবাবু! আজ রাত বারোটা নাগাদ আমরা বেরুব৷ তবে নাঃ—মেইন স্যুইচ অফ করবেন না৷ তাতে অসুবিধে হবে৷ জাদুঘরটা টর্চের আলোয় দেখে কিছু বুঝতে পারব না৷ এবার বলুন, আপনি কোথায় অপেক্ষা করবেন?

ঘনশ্যামবাবু চাপা স্বরে বললেন, —একটা নিরাপদ পথ আছে৷ রাজবাড়ির পূর্বে মন্দিরের কাছে জঙ্গল আছে৷ জঙ্গলটা পেরিয়ে পশ্চিমে একটা ধ্বংসস্তূপের কাছে গিয়ে টর্চ জ্বেলে ইশারা দেবেন৷ আমি রাজবাড়ির পিছনের দরজা খুলে অপেক্ষা করব৷ মেইন স্যুইচ অফ না করে বরং বাইরের আলোগুলো নিভিয়ে রাখব৷

—রাত বারোটায় তো?

—হ্যাঁ৷ ওটাই নিরাপদ সময়৷ বলে ঘনশ্যাম মজুমদার গম্ভীরমুখে উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর মিঃ সিংহের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টে একবার তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন৷

দেখলুম, মিঃ সিংহও উঠে গেলেন৷ সম্ভবত ঘনশ্যামবাবুর সঙ্গে কোনও ব্যাপারে কথা বলতেই গেলেন৷

একটু পরে তিনি ফিরে এলেন৷ তাঁর পিছনে গোকুল কফির ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ গোকুল চলে গেলে মিঃ সিংহ বললেন, —আমি একটা আশঙ্কা করছি৷ থোকা মিত্তির যদি দৈবাৎ ব্যাপারটা টের পায়, দলবল নিয়ে আপনাদের ওপর হামলা করতে পারে৷

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, —সে টের পাবে, এমন কোনও চান্স আছে কি?

—চান্স একটা আছে৷ কনকেন্দ্রের সঙ্গে যদি সেই সিলটার ব্যাপারে খোকা মিত্তিরের যোগাযোগ হয়ে থাকে এবং —কনকেন্দ্রই যদি সিলটা হাতিয়ে থাকে—

কর্নেল দ্রুত বললেন, —কনকেন্দ্র তো গতরাত্রে হলঘরে ঢুকেছিলেন আর সিলটা চুরি গেছে তার আগে—অর্থাৎ শনিবারের আগে কোনও এক সময়ে৷

—আমার ধারণা, কনকেন্দ্র সিলটা আগেই চুরি করে হলঘরে কোথাও লুকিয়ে রাখতে গিয়েছিল৷ তার উদ্দেশ্য ছিল, চার্লস জেরিসনকে মিউজিয়াম দেখানোর ছলে হলঘরেই সিলটা বেচবে৷ কনকেন্দ্র জন্মান্ধ৷ কিন্তু তার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রচুর টাকাকড়ি পেলে এবং বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসা করাতে পারলে হয়তো দৃষ্টিশক্তি পাবে৷ একথা আমি ঘনশ্যামের কাছেই শুনেছিলুম৷ তাই মনে হচ্ছে, চার্লস জেরিসন তেমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে৷

—তাহলে মেজ খগেন্দ্রই ছোটোভাই গণেন্দ্রের কথামতো জেরিসনকে রাজবাড়ি ঢুকতে দেননি?

মিঃ সিংহ একটু হেসে বললেন, —আপনি যেমন অঙ্ক কষেন, আমারও তেমনি অভ্যাস আছে৷

—কিন্তু খোকা মিত্তিরের সঙ্গে কনকেন্দ্র কীভাবে যোগাযোগ করতে পারেন?

—সহজে৷ টেলিফোনে৷ খোকা জেরিসনের সঙ্গে দেখা করতে সেচবাংলোয় যায়৷ সেখান থেকে টেলিফোনে কনকেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব৷ এখন কথা হচ্ছে, আজ মিঃ হালদারকে নিয়ে যে-ঘটনা ঘটেছে, তাতে জেরিসনের যত শিগগির সম্ভব, এখান থেকে পালানো দরকার৷ তাই না? ঠিক এ কারণেই আমার সন্দেহ, আজ রাতে খগেন্দ্র ঘুমিয়ে পড়লে খোকা মিত্তির চার্লস জেরিসনকে নিয়ে কনকেন্দ্রের সাহায্যে গোপনে রাজবাড়িতে ঢুকতে পারে৷ কথাটা আপনি একটু ভেবে দেখুন৷

কর্নেল তুম্বো মুখে কফি খেতে থাকলেন৷ হালদারমশাইয়ের গোঁফের ডগা উত্তেজনায় কাঁপতে থাকল৷

II ছয় II

রাত দশটা নাগাদ খাওয়া সেরে আমরা সময় গুনছিলুম৷ আর দু’ঘণ্টা পরে যে-অভিযান শুরু হবে, তা কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে কে জানে!

প্রণবেশ সিংহের নির্দেশে গোকুল আমাদের ঘরেই একটা ক্যাম্পখাটে হালদারমশাইয়ের জন্য বিছানা পেতে দিয়েছিল৷ মিঃ সিংহ বললেন,—কর্নেলসায়েব! আমার এখন মনে হচ্ছে, তখন টেলিফোনে আপনি ডি আই জি সায়েবকে মিঃ হালদারের সাংঘাতিক দুর্দশার কথাটা জানালে পারতেন৷ তা হলে ডি আই জি বজ্জাত চার্লস জেরিসনের বিরুদ্ধে কপালীগড় থানাকে কড়া ব্যবস্থা নিতে বলতেন৷ বেগতিক দেখে খোকা ব্যাটাছেলে গা-ঢাকা দিত৷ আপনারাও নিরাপদে রাজবাড়িতে হানা দিতে পারতেন৷

কর্নেল বললেন, —খুলে কিছু না বললেও আভাস দিয়েছি, ওই সরকারি অতিথি এবং নদীবিশেষজ্ঞ লোকটি অন্য মতলবে এখানে এসেছে৷ তবে জেরিসনকে গ্রেফতার করার ঝামেলা আছে৷ কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের অনুরোধে মার্কিন দূতাবাস মারফত তাকে পাঠানো হয়েছে৷ কূটনৈতিক রীতিনীতি একটা জটিল ব্যাপার৷

—কী আশ্চর্য! লোকটা এখানে মানুষ খুন করলেও কি তাকে গ্রেফতার করা যাবে না?

কর্নেল হাসলেন৷ —তা যাবে৷ তবে সে তো এখনও খুনখারাপি করেনি৷

হালদারমশাই ফুঁসে উঠলেন—ক্যান? আমারে সে বাঁধছিল৷ আপনারা উদ্ধার না করলে সে খুন করত৷

—করেনি যখন, তখন চেপে যান৷ জেরিসন দলবলসহ আবার জলটুঙ্গিতে গিয়ে আপনাকে খুঁজে পায়নি৷ এতেই সে আঁচ করে ফেলেছে, এখানে তার আসবার উদ্দেশ্য সহজে সফল হবে না৷ অর্থাৎ তার একটা প্রতিপক্ষ এখানে তৈরি আছে৷

চাপাম্বরে কথা হচ্ছিল৷ আমি বললুম, —আপনি ডি আই জি-কে কখন ফোন করলেন?

—তুমি যখন ঘুমোচ্ছিলে! এ ভদ্রলোক তোমার চেনা৷ অশোক দত্ত৷ মিঃ দত্তের সঙ্গে পুলিশ সুপার রমেশ শর্মাও আগামীকাল দুপুরের মধ্যে কপালীগড়ে আসছেন৷

অবাক হয়ে বললুম—একটু সিল উদ্ধারের জন্য এত বড়ো আয়োজন? বরং সম্রাট হোহেনহুম্বার গুপ্তধন উদ্ধারের ঘটনা হলে কথা ছিল! কোথায় প্রশান্ত মহাসাগরে ইউহোনো দ্বীপ, আর কোথায় কপালীগড়!

হালদারমশাই সহাস্যে বললেন, —চাইর বৎসর আগে আপনাগো লগে কোকোদ্বীপে গিছলাম৷ হঃ! বডি মাইনষের, মাথা ঘোড়ার৷ কী ক্কাণ্ড! কর্নেলস্যার! ইউহোনো দ্বীপ কি সেই এলাকায়?

কর্নেল বললেন, —না৷ আরও দূরে৷ তবে ওই দ্বীপে পৌঁছুতে হলে মার্কিন বিমানবাহিনীর প্লেন দরকার৷ দ্বীপটার চারদিকে উঁচু খাড়া পাঁচিলের মতো পাহাড়৷ জাহাজে ওখানে পৌঁছুনো যায় না৷

মার্কিন বিমানবাহিনীর প্লেনের কথা শুনে গোয়েন্দাপ্রবর নিরাশ হয়ে বললেন, —অগো প্লেন কি পাওয়া যাবে?

এইসময় গোকুল এসে বললো, —কর্তামশাই! আপনার টেলিফোন৷ বউদিমণি আপনাকে ডাকছেন৷

মিঃ সিংহ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন৷ কর্নেল দেওয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, —এখনও প্রায় দেড়ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে৷ জয়ন্ত— হালদারমশাই— সঙ্গে টর্চ আর আগ্নেয়াস্ত্র নিতে ভুলবেন না৷

হালদারমশাই বললেন, —আমি রেডি৷ বলে হঠাৎ তিনি আপনমনে হেসে উঠলেন৷

বললুম, —কী ব্যাপার হালদারমশাই?

—একখান ছড়া বাঁধছে : ক-এ কানা খ-এ খোঁড়া / গ-এ গাধা ঘ-এ ঘোড়া৷ গণেন্দ্ররে গাধা কইছে৷ কিন্তু ঘনশ্যামবাবুরে ঘোড়া কইল ক্যান? কোকোম্বীপে মাইনষের ঘোড়ামুখ দেখছিলাম৷ ঘনশ্যামবাবুর মাথা মাইনষেরই মাথা৷ ঘোড়ার না৷ ক খ গ ঘ! খোকা মিত্তির এই ছড়াখান আবার কাগজে ছাপছে৷ ক্যান? কারে কী জানান দিছে সে? কখগঘ! চাইরখান স্যুইচ য্যান!

কর্নেল তাঁর দিকে তাকালেন৷ —হালদারমশাই! আপনাকে ধন্যবাদ৷

অবাক প্রাইভেট ডিটেকটিভ বললেন, —ধন্যবাদ ক্যান কর্নেলস্যার?

—চারটে সুইচের জন্য৷

আমি আর হালদারমশাই অবাক হয়ে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলুম৷ চারটে স্যুইচ মানে কী? কর্নেল হেলান দিয়ে চোখ বুজে চুরুট টানতে থাকলেন৷

কিছুক্ষণ পরে প্রণবেশ সিংহ ফিরে এসে বললেন, —বারীনের কী স্পর্ধা! আমাকে হুমকি দিয়ে টেলিফোনে বলল, —সে নাকি খবর পেয়েছে যে, আমি তাকে জব্দ করার জন্য পুলিশের উপরমহলে খবর দিয়েছি৷ তাই পুলিশকর্তারা আমার বাড়িতে ছদ্মবেশী ডিটেকটিভ পাঠিয়েছেন৷ শয়তানটা আমাকে শাসিয়ে বললো, —তার কোনও ক্ষতি হলে সে আমার ভ্রাতুষ্পুত্রী তিন্নিকে কিডন্যাপ করবে৷

__________________________________

লেখকের 'কোকোদ্বীপের বিভীষিকা' দ্রষ্টব্য।

কর্নেল বললেন, —আপনি কী বললেন ওকে?

মিঃ সিংহ উত্তেজিতভাবে বললেন, —আমাকে কথা বলার সুযোগ দিল না শয়তানটা৷ কর্নেলসায়েব! তিন্নিকে কিডন্যাপ করার হুমকি যে দিয়েছে, তাকে আমি আজ রাতেই কুকুরের মতো গুলি করে মারব৷ আমি এখনই বেরুচ্ছি৷ কপালীগড়ে এই সিংহের থাবা কী মারাত্মক, তা লোকেরা জানে৷

বলে তিনি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন৷ কর্নেল উঠে তাঁকে অনুসরণ করলেন৷ হালদারমশাই এবং আমি হতবাক হয়ে বসে রইলুম৷ এই অভাবিত ঘটনার ফলে আমাদের আজ রাতের অভিযান হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে৷

একটু পরে হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন,—ফিগারখান দ্যাখলেন৷ এক্কেরে লায়ন হইয়া গেছে৷ আমি এখানে আইয়া শুনছি, মিং সিংহরে সবাই সমীহ কইরা চলে৷ ওনার নাকি যে কথা, সে-ই কাম৷ খোকা মিত্তিররে যদি উনি গুলি কইরা মারেন, আমার বিশ্বাস, ওনার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে কারুর সাহস হইব না৷

কর্নেল এলেন কিছুক্ষণ পরে৷ একটু বললেন, —ক্রুদ্ধ সিংহকে আটকাতে পারলুম না৷ নির্বোধ বজ্জাতটা ওঁর মনের কোমল জায়গায় আঘাত করেছে৷ রাইফেল হাতে শিকারির মতো বেরিয়ে গেলেন৷ সুপর্ণা—আশ্চর্য ব্যাপার, ওঁকে বাধা দিল না৷ আমাকে বলল,—খোকা মিত্তিরকে উনি খুঁজে পাবেন না৷ আমিও সুপর্ণার সঙ্গে একমত৷ ব্যর্থ হয়ে মিঃ সিংহ ঘুরে আসবেন৷

বললুম, —তা হলে উনি না ফিরে আসা পর্যন্ত আমাদের বেরুনো হবে না?

—নাঃ! ঠিক বারোটায় আমরা রাজবাড়ির পিছনে পৌঁছব৷ মিঃ সিংহ তার মধ্যে আসুন বা না আসুন৷

—খোকা মিত্তিরের নাকি দলবল আছে৷ মিঃ সিংহ এই হঠকারিতা না করলেই পারতেন! উল্টে মিঃ সিংহের কোনও ক্ষতি হলে—

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, —এ ব্যাপারে আমরা অসহায় জয়ন্ত! আমাদের কিছু করার নেই৷ অবশ্য একটা কথা বলা যায়, একজন অভিজ্ঞ শিকারি নিজেকে বাঁচিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে জানেন৷...

রাত এগারোটা পঞ্চাশে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলুম৷ গোকুল আর দারোয়ানকে মিঃ সিংহ বলে রেখেছিলেন৷ গোকুল অন্ধকার রাস্তায় আমাদের কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে এসেছিল৷ সে মিঃ সিংহের জন্য উদ্বিগ্ন৷ তাই দ্রুত বাড়ি ফিরে গিয়েছিল৷

রাস্তাটা পূর্বে বাঁক নিয়ে অন্ধকারে মিশে গেছে৷ এদিকে কোনও বসতি নেই৷ কর্নেল সাবধানে টর্চের আলো একবার জ্বেলেই দক্ষিণে উঁচু জমিতে ঘন ঝোপঝাড়ের দিকে এগিয়ে গেলেন৷ একটু পরে পায়ের কাছে আবার আলো ফেললেন৷ এটা একটা সংকীর্ণ পায়েচলা পথ৷ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে অন্ধকারে আবছা দেখা গেল, আমাদের ডাইনে উঁচু পাঁচিল৷ এবং সামনে একটু দূরে আকাশের গায়ে মন্দিরের চূড়া অস্পষ্ট ফুটে উঠেছে৷ আরও একটু এগিয়ে ডানদিকে পাঁচিলের পাশে ধ্বংসস্তূপ দেখা গেল৷ সেটা পেরিয়ে কর্নেল পায়ের কাছে টর্চের আলো ফেলতেই ডাইনে কেউ এক সেকেন্ডের জন্য টর্চের আলো জ্বালল! তারপর ঘনশ্যামবাবুর সাড়া পাওয়া গেল৷ তিনি ফিসফিস করে বললেন, —জুতোর শব্দও যেন না শোনা যায়৷ সাবধানে আসুন৷

খিড়কির দরজা নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিলেন ঘনশ্যামবাবু! রাজবাড়ির ভেতরটা জঙ্গল হয়ে আছে৷ পশ্চিমে শেষপ্রান্তে উঁচুতে একটা আলো জ্বলছে৷ ওদিকে সদর দেউড়ি অর্থাৎ গেট দেখা যাচ্ছিল৷ ডাইনে সিঁড়ি বেয়ে আমরা উঁচু বারান্দায় উঠলুম৷ টানা বারান্দা এবং থামের সারি৷ টর্চ না জ্বেলেই যতটা সম্ভব নিঃশব্দে ঘনশ্যামবাবু একটা ঘরের তালা খুললেন৷ তারপর তাঁকে অনুসরণ করে আমরা ভেতরে ঢুকলুম৷ এই দরজাটাও ভেজিয়ে দিয়ে ঘনশ্যামবাবু টর্চের আলো জ্বাললেন৷ দেখলুম, এই ঘরটা পুরনো আসবাব আর আবর্জনায় ঠাসা৷ একপাশে সংকীর্ণ খালি জায়গা দিয়ে এগিয়ে বাঁ-দিকে ঘুরে আবার একটা দরজার তালা খুললেন ঘনশ্যামবাবু৷ এবার দেখলুম, মেঝের ডাইনে দেওয়াল ঘেঁসে সিঁড়ি নেমে গেছে৷ বাঁ-দিকে কয়েকটা বইয়ের আলমারি আর চেয়ার-টেবিল৷ সিঁড়ির ওপরটা দু’দিকে কাঠের রেলিঙে ঘেরা৷

সিঁড়ি নেমে গিয়ে আবার উঠেছে৷ তালা আঁটা একটা ঘরের সামনে ছোট্ট চত্বর৷ সেখানে দাঁড়িয়ে ঘনশ্যামবাবু আবার একটা তালা খুলে ফিসফিস করে বললেন, —এটাই মিউজিয়াম৷

মিউজিয়াম ঘরটা বেশ বড়ো৷ ঘনশ্যামবাবু এগিয়ে গিয়ে স্যুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলেন৷ অবাক হয়ে দেখলুম, চারপাশে দেওয়াল ঘেঁসে আলমারির সারি৷ মধ্যিখানে লম্বা টেবিলের ওপর কফিনের মতো কাঁচের ঢাকনা এবং বিচিত্র সব জিনিস সাজানো আছে৷ প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র, মৃৎপাত্র, দেবদেবীদের ছোটো-ছোটো ব্রোঞ্জের মূর্তি, রঙিন পুঁতি বা পাথরের মালা, অজস্র মুখোশ, জীবাশ্ম, জীর্ণ তালপাতার পুঁথি—এইসব অজস্র ঐতিহাসিক নিদর্শন!

কর্নেল ঘনশ্যামবাবুর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কিছু বললেন৷ তখন ঘনশ্যামবাবু সামনে এগিয়ে একটা টেবিলের ওপর কাচের লম্বা বাকসো দেখালেন৷ কর্নেলের ইঙ্গিতে তিনি তালা খুললে কর্নেল পালিশ করা একটা গোল এবং বেশ মোটা কাঠ তুলে নিলেন৷ সেটার দু’দিকেই গালা সিল করা আছে৷ জিনিসটার গায়ে অজানা লিপিও খোদাই করা আছে৷ বুঝলুম, এটাই ১২৬ নং আইটেম এবং গণেন্দ্রের সংগৃহীত৷ ১২৩ নং আইটেম ব্রোঞ্জের ডিম্বাকৃতি ফলকটা নেই, যার ছবি কর্নেলের বাড়িতে দেখেছিলুম৷

ঘনশ্যামবাবু আপত্তি করছিলেন, তা ওঁর ভাবভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছিল৷ কিন্তু কর্নেল গোল কাঠটা বের করে তাঁর পিঠে আঁটা কিটব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলেন৷ ঘনশ্যামবাবু কর্নেলকে কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছেন, সেইসময় সামনে; কাছেই কোথাও চাপা ঘসঘস ঘরঘর অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল৷ অমনই ঘনশ্যামবাবুকে টেনে কর্নেল উল্টোদিকে একটা আলমারি এবং টেবিলের নিচে নিয়ে গিয়ে গুড়ি মেরে বসলেন৷ আমরাও তাঁদের পাশে গিয়ে বসে পড়লুম৷ দেখলুম, হালদারমশাইয়ের হাতে রিভলভার তৈরি৷ দেখাদেখি আমিও রিভলভার বের করলুম৷ কর্নেল চোখ টিপ ঠোঁটে আঙুল রেখে ইঙ্গিতে আমাদের চুপ করে থাকতে নির্দেশ দিলেন৷

মধ্যরাতে এ এক ভয়ঙ্কর মুহূর্ত! প্রতিটি সেকেন্ড দুঃসহ প্রতীক্ষায় কাটছে৷ কারণ ওই শব্দ কীসের এবং এরপর কী ঘটবে, জানি না৷ এই সময় হালদারমশাই কর্নেলকে আঙুল তুলে এ ঘরের উজ্জ্বল বালবটা দেখালেন৷ বুঝলুম, আলো নিভিয়ে দেওয়া উচিত ছিল৷ তবে আমরা যেখানে গুড়ি মেরে বসে আছি, আলো থাকলেও ঘরে কেউ ঢুকলে দেখতে পাবে না৷ কিন্তু শব্দটা কীসের?

প্রায় মিনিট দুই পরে শব্দটা থেমে গেল৷ টেবিলের সারির তলা দিয়ে দেখলুম সামনের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা কোনো রাজ-রাজড়ার প্রতিকৃতির তলায় একটা ছোট্ট অংশ কপাটের মতো খুলে গেছে৷ অংশটা প্রায় ফুট তিনেক চওড়া এবং ফুট তিনেক লম্বা৷ কর্নেলের মুখে গুপ্ত দরজার কথা শুনছিলুম৷ এই তাহলে সেই গুপ্ত দরজা৷

এরপর ওই সুড়ঙ্গের মতো ছোট্ট দরজা দিয়ে প্রথমে একটা মাথা বেরুল৷ মাথার চুল সাদা৷ তারপর গুড়ি মেরে যে লোকটি এ ঘরে ঢুকে সোজা হয়ে দাঁড়াল, তার গায়ে ছাইরঙা আলখাল্লার মতো গাউন এবং চোখে কালো চশমা৷ হাতে একটা মোটা ছড়ি৷ ছড়িটা সামনে এপাশে-ওপাশে বাড়িয়ে সে কয়েক পা এগোলে তৎক্ষণাৎ বুঝলুম, ইনিই জন্মান্ধ বড়ো কুমারবাহাদুর কনকেন্দ্র নারায়ণ রায়৷

কনকেন্দ্র মুখ তুলে এদিক-ওদিক ঘুরে কী যেন দেখার চেষ্টা করছিলেন৷ কিন্তু তিনি তো জন্মান্ধ; ছড়ির ডগা একটা টেবিলের ওপর কাচের বাকসে ঠেকিয়ে এগিয়ে এলেন৷ গাউনের পকেট থেকে তিনি চাবির গোছা বের করে ছোট্ট তালাটা খুলতে গিয়ে যেন চমকে গেলেন৷ স্থির দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বললেন, —কে খুলল? নিশ্চয়ই খগেনের কাজ৷ ট্রেচারাস! স্কাউন্ড্রেল! দেখাচ্ছি মজা৷

কনকেন্দ্র কথাগুলো ফিসফিস করে শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলার পর কাচের একদিক তুলে ধরলেন৷ তারপর ছড়িটা ডানপাশে ঠেকিয়ে রেখে ভেতরে হাত ভরলেন৷ তিনি কিছু খুঁজছিলেন৷ খুঁজতে খুঁজতে আবার শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে ক্রুদ্ধভঙ্গিতে বললেন, —খগেন হাতিয়েছে৷ আসল জিনিসটাই হাতিয়েছে৷ ওকে আমি গুলি করে মারব৷

আরও কয়েকবার এপাশে-ওপাশে হাত বাড়িয়ে খোঁজাখুঁজির পর কনকেন্দ্র কাচের ঢাকনাটা বন্ধ করে ছোট্ট তালাটা চাবি দিয়ে আটকে দিলেন৷ এই সময় লক্ষ্য করলুম, তাঁর হাত কাঁপছে৷ ছড়িটা হাতে নিয়ে ভয়ার্ত জন্তুর মতো গুড়ি মেরে সেই গুপ্ত দরজার ভেতর দিয়ে চলে গেলেন৷ তারপর আবার ঘসঘস ঘরঘর শব্দ হতে থাকল এবং গুপ্ত দরজার কপাট দেওয়ালের সঙ্গে মিশে গেল৷

এবার কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে চাপাম্বরে ঘনশ্যামবাবুকে বললেন, —উনি হলঘর থেকে বেরুনোর আগেই আমাদের বেরুতে হবে৷ কুইক! আলো নিভিয়ে দিন৷

আলো নিভিয়ে যে-পথে এসেছিলুম, সেই পথে আমরা টর্চের আলো ফেলে বেরিয়ে গেলুম৷ ঘনশ্যামবাবু একটার পর একটা দরজায় তালা এঁটে বারান্দায় এলে কর্নেল তাঁকে অনুসরণ করতে বললেন৷ যতদূর সম্ভব নিঃশব্দে আমরা প্রাঙ্গণের আগাছার ঝোপে লুকিয়ে রইলুম৷

তারপর পশ্চিমপ্রান্তে আবছা আলোতে কণকেন্দ্রকে বারান্দার নিচের লন দিয়ে আসতে দেখা গেল৷ বুঝতে পারছিলুম, জন্মান্ধ হলেও রাজবাড়ির সব কিছু তাঁর নখদর্পণে৷ আমাদের সামনে দিয়ে তিনি চলে গেলেন৷ কিছুক্ষণ পর ঘনশ্যামবাবু উঠে দাঁড়িয়ে কর্নেলকে চাপাম্বরে বললেন, —উনি মন্দিরের দিকে চলেছেন মনে হচ্ছে৷

কর্নেল বেরিয়ে গিয়ে ডানদিকের ফাঁকা ঘাসে ঢাকা লনে একটা গাছের আড়ালে গেলেন৷ ঘনশ্যামবাবু চাপাম্বরে বললেন, —মন্দিরে কেন যাচ্ছেন বড়ো কুমারবাহাদুর৷ কিছু বোঝা যাচ্ছে না৷

কর্নেল বললেন, —আসুন৷ দেখা যাক, কেন উনি মন্দিরে যাচ্ছেন!

মন্দিরে যাওয়ার দরজা খোলা৷ আমার মনে হল, কনকেন্দ্র যেন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন৷ তাঁর দরকারি জিনিসটা না পেয়ে তাঁর বুদ্ধিশুদ্ধি যেন গুলিয়ে গেছে৷ তাই কি উনি গৃহদেবতার শরণ নিতে চলেছেন?

রাজবাড়ির পশ্চিমে দোতলার শীর্ষে যে আলোটা জ্বলছিল, তার ছটা এতদূরে এসে পড়েছে৷ সেই আবছা আলোয় দু’ধারে ঝোপঝাড় এবং একটা সংকীর্ণ রাস্তা দেখা যাচ্ছিল৷ কনকেন্দ্র সেই পথে এগিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷

কর্নেল গুড়ি মেরে সেই পথে এগিয়ে গেলেন৷ আমরা তাঁকে অনুসরণ করলুম৷ ঘনশ্যামবাবু কর্নেলের পাশে গিয়ে তাঁকে কিছু বললেন৷ তখন কর্নেল ডানদিকে ঘুরে একটা ধ্বংসস্তূপের পাশে গেলেন৷ সেখান থেকে মন্দিরের ছোট্ট প্রাঙ্গণ অস্পষ্টভাবে দেখা গেল৷ কনকেন্দ্র সেখানে দাঁড়িয়ে শিস দিচ্ছিলেন৷

এ তো অদ্ভুত ব্যাপার! কেন শিস দিচ্ছেন উনি? মিনিট পাঁচেক পরে মন্দিরের পাশ দিয়ে কেউ এসে টর্চের আলো ফেলে কনকেন্দ্রকে এবং চারপাশ দেখে নিল৷ তারপর টর্চ নিভিয়ে সে চাপাম্বরে বললো, —বড়োকুমারবাহাদুর! মালটা কই?

কনকেন্দ্র স্খলিত কণ্ঠস্বরে বললেন, —ভকতরামকে তার আড়তে ফোন করেছিলুম৷ সে বলল, —পার্টি এখনও তাকে টাকা পৌঁছে দেয়নি৷ কাল দেবে বলেছে৷

—ভকতরাম আপনার বিশ্বাসী লোক৷ কিন্তু সে মিথ্যা বলেছে৷ আজ সন্ধ্যাবেলায় সায়েব ভকতরামকে টাকা দিয়ে ইরিগেশন বাংলোয় অপেক্ষা করছে৷ মালটা পেলেই সায়েব ভোরের ট্রেনে চলে যাবে৷

—তা হলে ভকতরামকে এখানে টাকা নিয়ে আসতে বলো৷ আমি অপেক্ষা করছি৷

—আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?

—দেখো খোকা! তুমি অনেকবার অবিশ্বাসের কাজ করেছ বলেই তোমাকে বাধ্য হয়ে রাজবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলুম৷ আমার স্পষ্ট কথা৷ ভকতরামকে ডেকে নিয়ে এসো৷

বুঝলুম এই সেই দুর্বৃত্ত বারীন মিত্তির বা খোকা গুণ্ডা! সে এবার খাপ্পা হয়ে বলল, —সম্মান রাখব না বলে দিচ্ছি৷ সায়েব প্রথমে যে-মালটা চেয়েছিল, দেবেন বলেও তা দিলেন না৷ বললেন, হারিয়ে গেছে৷ সায়েব বলল,—ঠিক আছে৷ ওটার দরকার নেই৷ অন্য মালটা পেলেই চলবে৷ মালটা ঝাড়ুন৷ আমার সময় নেই৷

কনকেন্দ্র কান্নাজাড়ানো গলায় বললেন, —বিশ্বাস করো বাবা অন্ধকে৷ এটাও হারিয়ে গেছে৷

খোকা মিত্তির গর্জন করল হিংস্র জন্তুর মতো৷ —ওরে শালা ক-এ কানা৷ মালটা দেবে বলে আমাকে রাত দুপুরে এখানে ডাকলে৷ এখন সিঙ্গি ব্যাটাচ্ছেলের পরামর্শে আমাকে ডোবাতে চাও৷ সায়েবের কাছে আমার অনেক মালকড়ি পাওনা৷ আগে তোমাকে মন্দিরে বলি দিই৷ তারপর সিঙ্গিশালার ব্যবস্থা হবে৷

সে কনকেন্দ্রের গলা টিপে ধরেছে, অমনি কর্নেল টর্চের আলো ফেললেন৷ দেখলুম, খোকা মিত্তিরের মাথায় মাফলার জড়ানো এবং পরনে প্যান্ট-গেঞ্জি৷ তার হাতে একটা ধারালো চকচকে ছোরা৷ টর্চের আলোতে সে হকচকিয়ে গিয়েছিল৷ সেই মুহূর্তে গুলির শব্দ শুনলুম৷ খোকা মিত্তির নেতিয়ে পড়ে গেল৷ মাথা থেকে রক্ত গড়াতে থাকল৷

অন্ধ কনকেন্দ্র ছড়ির সাহায্যে রাজবাড়ির দিকে টলতে টলতে এগিয়ে গেলেন৷ কর্নেল টর্চের আলো নিভিয়ে বললেন, —আমরা ফিরে যাচ্ছি ঘনশ্যামবাবু৷ আপনি যে-দরজা খুলে আমাদের ঢুকিয়েছিলেন, সেখান দিয়ে চলে যান৷ কনকেন্দ্র যেন টের না পান৷ মুখ বুজে থাকবেন৷

হালদারমশাই বললেন, —হালারে গুলি করে মারল কেডা? তারপর আপন মনে বললেন, আশ্চইর্য!

II সাত II

প্রণবেশ সিংহের বাড়ির গেটে গোকুল উদ্বিগ্নমুখে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল৷ সে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করল, তার কর্তামশাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে কিনা৷ কর্নেল বললেন, —দেখা হয়নি৷ তবে তাঁর জন্য চিন্তার কারণ নেই৷

এই বাড়ির পরিবেশ গাছপালায় ঘেরা এবং দিনের বেলাতেও নির্জন থাকে৷ তাই আমাদের গতিবিধি কারও চোখে পড়ার কথা নয়৷ দোতলার গেস্টরুমে গিয়ে আমি বললুম, —কর্নেল৷ গুলিটা যে পিস্তল বা রিভলভারের নয়, এতে আমি নিশ্চিত৷ শব্দটা রাইফেলের গুলির মতো৷

কর্নেল বললেন, —মুখ বুজে থাকো৷ দুর্বৃত্ত খোকা মিত্তির সম্পর্কে কোনও কথা নয়৷ এমন কি, মিঃ সিংহ ফিরে এলে তাঁকেও কোনও প্রশ্ন করবে না৷

হালদারমশাই এক টিপ নস্যি নিয়ে বললেন, —ঠিক সময়ে থোকা হারামজাদারে কেউ গুলি না করলে অন্ধ ভদ্রলোকেরে সে খুন করত৷ তবে আমি রেডি ছিলাম৷ কেউ অরে গুলি না করলে আমি গুলি করতাম৷

কর্নেল বললেন, —আর কোনও কথা নয়৷ পোশাক বদলে শুয়ে পড়া যাক৷

বললুম, —মিঃ সিংহের জন্য অপেক্ষা করা উচিত?

—না৷ দরজা বন্ধ করে আমরা শুয়ে পড়তে চাই৷ মিঃ সিংহকে নিয়ে মাথাব্যথার কারণ নেই৷

অগত্যা কর্নেলের নির্দেশ মেনে পোশাক বদলে শুয়ে পড়তে হল৷ তবে লক্ষ্য করলুম, কর্নেল কোণের টেবিলে কিটব্যাগ থেকে সেই মোটা প্রায় আট ইঞ্চি লম্বা কাঠের নলটা বের করে রাখলেন৷ ঘরের আলো নিভিয়ে তিনি টেবিল-ল্যাম্প জ্বেলে চেয়ারে বসলেন৷ তাঁর হাতে আতসকাচ দেখতে পেলুম৷ আমাদের দিকে তাঁর পিঠ—তাই তিনি কী করছেন, দেখতে পাচ্ছিলুম না৷

অমন একটা সাংঘাতিক ও শোচনীয় ঘটনার পর প্রচণ্ড উত্তেজনা থিতিয়ে আসতে সময় লাগছিল৷ তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি৷

সকালে ঘুম ভেঙেছিল গোকুলের ডাকে৷ তার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট৷ বললুম, —কর্নেল বেরিয়েছেন বুঝি?

গোকুল বলল, —আজ্ঞে হ্যাঁ৷ উনি, কর্তামশাই আর হালদারসায়েব ড্যামের দিকে গেছেন৷

—আচ্ছা গোকুল, তোমার কর্তামশাই গতরাতে কখন ফিরে এসেছিলেন?

—শেষ রাতে৷ চারটে সওয়া-চারটে হবে৷ বলে গোকুল চলে গেল৷

মনে হল, সে আমার কোনও প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে চায় না৷ পশ্চিমের ব্যালকনিতে গিয়ে বাসিমুখে চা খেতে খেতে ড্যামের জলে কুয়াশার পর্দা ছিঁড়ে কয়েকটা জেলেডিঙি মাছ ধরে বেড়াচ্ছে৷ কর্নেলকে কোথাও দেখতে পেলুম না৷ হালদারমশাইকেও না৷ শুধু প্রণবেশ সিংহকে দেখতে পেলুম, জেলেবস্তি থেকে বেরিয়ে আসছেন৷ তাঁর হাতে একটা ছড়ি৷ একটু পরে তিনি ডানদিকে আমবাগানের ভেতর অদৃশ্য হলেন৷

সাতটা বেজে গেছে৷ বাথরুমে গিয়ে প্রাতঃকৃত্য সেরে আসার পর দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে বসলুম৷ সেই সময় দেখলুম, ঘনশ্যাম মজুমদার হন্তদন্ত আসছেন৷

তিনি দোতলায় আমাকে দেখতে পেয়েছিলেন৷ ব্যস্তভাবে এসে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কর্নেল সায়েব কোথায়?

বললুম, —মর্নিংওয়াকে গেছেন৷ রাজবাড়ির খবর বলুন৷ পুলিশ খোকা মিত্তিরের ডেডবডি তুলে নিয়ে গেছে?

ঘনশ্যামবাবু আমার পাশে ধপাস করে বললেন—আশ্চর্য ব্যাপার জয়ন্তবাবু! ভোরে উঠে মন্দিরের কাছে উঁকি মেরে দেখি, কোনও ডেডবডি নেই৷ একটু সাহস করে এগিয়ে গেলুম৷ খোকা মিত্তির যেখানে পড়েছিল, সেখানে একফোঁটা রক্তের চিহ্ন পর্যন্ত নেই! আমার ধারণা, যে ওকে গুলি করে মেরেছিল, সে-ই ওর ডেডবডি তুলে নিয়ে গিয়ে গুম করেছে৷

—বড়ো কুমারবাহাদুরের খবর বলুন৷

—বারান্দায় এসে চুপিচুপি মেজকুমারবাহাদুরের সঙ্গে কী সব আলোচনা করছেন৷

—মন্দিরে পুজোআচ্চা করে কে?

—আবার কে? ভীমপদ ভটচায৷ কিন্তু ভীম এখনও হয়তো বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেনি৷ ভাঙের সঙ্গে ছোটেলাল হয়তো সত্যি আফিম মিশিয়ে দিয়েছিল৷ ওর কিছু একটা হলে কেলেংকারি৷ মরে যাবে না তো?

—তার বউ কী বলছে?

—লক্ষ্মীঠাকরুন জানে তার স্বামী গাঁজাভাঙ খায়৷ বিছানা থেকে ওঠাতে গেলে মারতে আসে৷ তাই সে ওকে ঘাঁটায় না৷ তবে মেজকুমারবাহাদূর ডাকাডাকি করলে ভীম ভটচায আর ভীম থাকে না৷

এইসব কথা বলতে বলতে নিচে গেটে মিঃ সিংহকে ঢুকতে দেখলুম৷ ঘনশ্যামবাবুও ওঁকে দেখে উঠে গেলেন৷ আমি ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি, খোকা মিত্তিরের লাশ তুলে নিয়ে গিয়ে কোথায় পুঁতে ফেলতে প্রণবেশ সিংহের কোনও সমস্যা হয়নি৷ কিন্তু এভাবে তাঁর মতো মানুষ নরহত্যা করতে পারেন ভেবে আমার অস্বস্তি হচ্ছিল৷ আমার নীতিবোধে আঘাত লাগছিল৷

পরক্ষণে ভাবছিলুম, মিঃ সিংহের মৃত ভাইয়ের মেয়ে ওই ফুটফুটে চঞ্চল তিন্নিকে কিডন্যাপ করার ক্ষমতা খোকা মিত্তিরের ছিল৷ তাছাড়া সে-ও তো একজন অন্ধ মানুষকে খুন করতে ছোরা তুলেছিল৷

কর্নেল এবং হালদারমশাই এসে গেলেন এতক্ষণে৷ দু’জনেই গম্ভীর৷ কর্নেল আমাকে অভ্যাসমতো আস্তে ‘মর্নিং’ সম্ভাষণ করে ঘরে ঢুকলেন৷ হালদারমশাই আমার পাশে বসে বললেন, —রাত্রে ভালো ঘুম হয় নাই৷ আপনি তো বেশ ঘুমাইতেছিলেন!

বললুম, —একটু আগে ঘনশ্যামবাবুর মুখে শুনলুম, মন্দিরের সামনে থেকে খোকা মিত্তিরের লাশ একেবারে উধাও হয়ে গেছে৷ একফোঁটা রক্তও পড়ে নেই৷

গোয়েন্দাপ্রবর চাপাস্বরে বললেন, —কর্নেলস্যার যা কইছিলেন, তা ঠিক৷ খোকা গুন্ডারে কেউ গুম করলে কপালীগড়ের মাইনষেরা নাকি খুশি হইয়া পূজা-মানত দিবে৷ পুলিশও খুশি হইয়া ভাববে, তাদের কাজটা যে করল তারে বখশিস দেওনের দরকার৷ ঘনশ্যামবাবুর লগে আইয়া আমি ওই শয়তানটার অনেক কুকীর্তির কথা শুনছি৷ হালায় এক ডজন মার্ডার করছে৷ এর ভয়ে কেউ সাক্ষী হইতে চায় না৷

বলে তিনি সটান উঠলেন এবং ঘরে গিয়ে ঢুকলেন৷ একটু পরে গোকুল কফি আর স্ন্যাক্সের ট্রে নিয়ে এল৷ সে ঘরে ঢুকে টেবিলে ট্রে রেখে বলল, —কর্তামশাই একটু পরে আসছেন স্যার৷ ঘনাবাবু এসে ওঁর সঙ্গে কথা বলছেন৷

কফি খেতে খেতে কর্নেলকে বললুম, —ঘনশ্যামবাবু বলছিলেন, খোকাগুন্ডার ডেডবডি—

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, —জয়ন্ত! কাল রাত্রে যা কিছু দেখেছ, ভুলে যাও৷

—ভুলে যাওয়া শক্ত কর্নেল৷ কেউ গুলিটা ছুঁড়তে একটু দেরি করলে—

কর্নেল আবার আমার কথার ওপর বললেন, —দুটো ডেডবডি দেখতে পেতে৷ কাজেই ওটা নিয়ে মুখ না খোলাই দরকার৷

চুপ করে থাকলুম৷ কফি শেষ করে কর্নেল চুরুট ধরিয়েছেন, এমন সময় গোকুল ব্যস্তভাবে এসে কর্নেলকে বললো,—স্যার! আপনার টেলিফোন৷

কর্নেল তার সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন৷ হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন, —মিঃ সিংহ কইছিলেন, উনি ইরিগেশন বাংলোয় মর্নিংয়ে ফোন করছিলেন৷ সেই সায়েব ভোর ছ’টায় ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টের জিপে স্টেশনে গেছে৷ বর্ধমান থেক্যা দিল্লি যাইব৷ সেখানে গিয়ে রিপোর্ট লিখব৷ ক্যান? এখানে বইয়া রিপোর্ট লেখনের কথা৷ হঠাৎ য্যান পলাইয়া গেল৷ সায়েবেরে বাগে পাইলাম না৷ পাইলে অরে দ্যাখাইয়া দিতাম—

বলে তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন৷ গোঁফের ডগা তির তির করে কাঁপতে থাকল৷ কারণ উনি দাঁতে দাঁত ঘষছিলেন৷ বুঝতে পারছিলুম, চার্লস জেরিসনের ওপর থেকে তাঁর রাগ সহজে পড়বে না৷ প্রতিশোধস্পৃহা তাঁর মন থেকে মুছে যাবে না৷ কিন্তু তাঁকে আর পাবেন কোথায় হালদারমশাই?

কর্নেল ফিরে এসে সহাস্যে বললেন, —হালদারমশাই৷ আপনার অনুমান ঠিক৷ ওই সায়েব সত্যিকার চার্লস জেরিসন নন৷

ডি আই জি মিঃ দত্ত ফোনে খবর দিলেন, কলকাতার মার্কিন কনসাল জেনারেল পুলিশকে জানিয়েছিলেন, আসল চার্লস জেরিসনকে গুরুতর আহত অবস্থায় কলকাতার একটা হোটেলে উদ্ধার করা হয়েছে৷ কলকাতা থেকে স্বরাষ্ট্রসচিব এখানকার সেচবিভাগের ইঞ্জিনিয়ারের কাছে জাল জেরিসনের খবর পেয়ে মিঃ দত্তকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, এখনই জালিয়াতটাকে যেন গ্রেফতার করা হয়৷

হালদারমশাই সোজা হয়ে বসে কথাগুলো শুনছিলেন৷ বললেন, —তারপর? তারপর?

—মিঃ দত্তের নির্দেশে কপালীগড় থানার পুলিশ স্টেশনে ধাওয়া করে তাকে গ্রেফতার করেছে৷ সে বেগতিক দেখে পালিয়ে যাচ্ছিল৷

—এখন সে কোথায়?

—ট্রেনে তাকে বর্ধমানে নিয়ে গেছে পুলিশ৷ তারপর তাকে কলকাতায় পাঠানো হবে৷

গোয়েন্দাপ্রবর সরোষে নিজের ঊরুতে থাপ্পড় মেরে বললেন,—কলকাতায় গিয়া দেখব’খন৷ জামিনে ছাড়া পাইলেই অরে আমি পাঁওদুইখান বাইন্ধ্যা উপরে লটকাইমু৷

কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, —আর একটা খবর আছে হালদারমশাই!

—কন কর্নেলস্যার৷

—রাজবাড়ির ছোটোকুমারবাহাদুর অর্থাৎ গণেন্দ্র ইউহোনো দ্বীপ থেকে গোপনে অমূল্য কিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন চুরি করে এনেছিলেন৷ দ্বীপের আদিবাসীদের রাজা তা টের পান৷ সেখানকার মার্কিন জেনারেলের কাছে তিনি নালিশ করেছিলেন৷ সংক্ষেপে বলছি৷ মার্কিন সরকারের অনুরোধে ভারত সরকার কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোকে নির্দেশ দেন, গণেন্দ্রনারায়ণ রায়কে খুঁজে বের করতে হবে৷

আমি বললুম, —এত সব কাণ্ড ঘটেছে?

—ঘটবেই৷ পৃথিবীটা তো আগের মতো আর বড়ো নেই৷ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিতে পৃথিবী ছোটো হয়ে গেছে৷ যাই হোক, মিঃ দত্ত গতরাতে বর্ধমানে গণেন্দ্রকে পাকড়াও করেছেন৷ গণেন্দ্র তাঁর পিসতুতো দাদার বাড়িতে ছিলেন৷

—ওখানে গণেন্দ্র আছেন, কী করে মিঃ দত্ত জানতে পারলেন?

—খুব সহজে৷ কপালীগড়ের পুলিশকে মিঃ দত্ত তাঁকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিলেন৷ স্থানীয় পুলিশের ইনফরমার জানিয়েছিল, গণেন্দ্র বর্ধমানে কোথায় আছেন৷ যাই হোক, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো৷ ডি আই জি মিঃ অশোক দত্ত, এস পি রমেশ শর্মা আসামিকে নিয়ে সদলবলে এখানে আসছেন৷

আমি একটু পরিহাসের ভঙ্গিতে বললুম —তা হলে দেখা যাচ্ছে, প্রখ্যাত রহস্যভেদী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এই কেসে কোনও কাজেই লাগলেন না৷ সব কাজ সরকারি পর্যায়ে পুলিশই করে দিল৷ হ্যাঁ—একটা কাজ অবশ্য তিনি করেছেন৷ হালদারমশাইকে জলটুঙ্গি থেকে উদ্ধার করেছেন৷

কর্নেল হাসলেন৷ —বোঝা যাচ্ছে, জয়ন্ত আশা করেছিল; কপালীগড় রাজবাড়ি থেকে সেই সিলটা হাতিয়ে আমি ইউহোনো দ্বীপে সম্রাট হোহেনহুম্বার গুপ্তধন উদ্ধারে বেরিয়ে পড়ব!

বললুম, —তা একটু আশা ছিল৷ তবে ঘনশ্যাম মজুমদার আপনার কাছে ওই সিলটা উদ্ধার করে দেওয়ার জন্যই গিয়েছিলেন৷ আপনি এই আসল কাজটা করতেই তো ব্যর্থ হয়েছেন৷

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, —জয়ন্ত! তুমি সাংবাদিক৷ বরাবর তোমাকে বলে আসছি, প্রকৃত সাংবাদিক হতে গেলে পর্যবেক্ষণশক্তিকে শাণিত করার দরকার হয়৷ তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি অর্জন না করলে চলে না৷ হ্যাঁ—তুমি দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকায় রঙ চড়িয়ে প্রতিবেদন লেখো৷ পাঠকরা তা গোগ্রাসে গিলে খায়৷ কিন্তু তুমি বাস্তব অবস্থায় তত চক্ষুষ্মান নও!

—তার মানে?

—কালরাত্রে রাজবাড়ির মিউজিয়ামে ঢুকে তোমার চোখ আর মন আটকে গিয়েছিল আশ্চর্য সব ঐতিহাসিক নিদর্শনের সঙ্গে৷ তারপর গুপ্তদরজার ঘসঘস-ঘরঘর অদ্ভুত শব্দটা শুনে তুমি ভয় পেয়েছিলে৷ তাই লক্ষ্য করোনি, গণেন্দ্রের সংগৃহীত জিনিসগুলো আমি একটু ঝুঁকে দেখার সময় বাঁ পায়ের জুতোর তলায় কী আছে টের পেয়েই ডান হাত নামিয়ে একটা জিনিস কুড়িয়ে নিয়েছিলুম৷ হালদারমশাই আর তুমি তখন জাদুঘর দর্শনে মগ্ন৷ তারপর ঘনশ্যামবাবু আমার নির্দেশে কাচের বাকসের তালা খুলছিলেন৷ তিনিও টের পাননি, আমি কী কুড়িয়ে নিলুম৷

হালদারমশাই বলে উঠলেন, —কী? কী?

কর্নেলের জ্যাকেটের ভেতর থেকে ব্রোঞ্জের ডিম্বাকৃতি একটা জিনিস বের করে দেখালেন৷ তারপর আবার সেটা যথাস্থানে ঢুকিয়ে রাখলেন৷

বললুম, —কী আশ্চর্য! সেই হারিয়ে যাওয়া সিলটা মনে হচ্ছে!

—হ্যাঁ৷ এর ছবি তুমি দেখেছ৷

—কিন্তু ওটা মিউজিয়ামের মেঝেয় পড়ল কী করে?

কর্নেল হাসলেন৷ —অঙ্কটা খুব সোজা জয়ন্ত! অন্ধ কনকেন্দ্র ওটা কোনো এক সময় বের করে নিয়েছিলেন৷ তারপর সম্ভবত তাড়াহুড়ো করে কাচের বাকসোর তালা আঁটতে গিয়ে ওটা তাঁর হাত থেকে গড়িয়ে পড়েছিল৷ কিন্তু পড়েছিল টেবিলের ডানদিকের একটা পায়ার কাছে ছেঁড়া গালিচার ফাঁকে৷ তাই ব্যস্ততার মধ্যে তাঁর মতো অন্ধ মানুষের পক্ষে ওটা খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না৷ আমার জুতো ওটার ওপর দৈবাৎ না পড়লেও আমি ওটা আবিষ্কার করে ফেলতুম৷ কারণ আমার থিওরি ছিল এইরকমই৷ কনকেন্দ্রের হাত ফসকে ওটা নিশ্চয়ই পড়ে গেছে৷

বিস্মিত গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, —আপনি জুতার নিচে কী আছে ট্যার পান?

—পাই হালদারমশাই! সামরিক জীবনে জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে হয়েছিল আমাকে৷ বছরের পর বছর জঙ্গলে জুতোসুদ্ধ পা ফেলার সময় কোথায় পা ফেলছি, তা অনুভব করার শক্তি অর্জন করেছিলুম৷ জঙ্গলে সৈনিকদের এভাবেই জানতে হয়, কোথাও মাইন পোঁতা আছে কিংবা কোথাও বুবি ট্র্যাপ বা লুকানো ফাঁদ আছে কিনা৷

এই সময় গোকুল এসে বলল, —স্যার! ব্রেকফাস্ট রেডি৷ আপনারা আসুন৷

নিচের ডাইনিং হলের সামনে প্রণবেশ সিংহ দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ মুখটা গম্ভীর৷ তিনি বললেন, —আমি একটু পরে অল্প কিছু খেয়ে নেব৷ শরীরটা ভালো নয়৷ আপনারা খেয়ে নিন৷

কর্নেল বললেন, —সুপর্ণা কি তিন্নিকে স্কুলে দিতে গেছে৷

মিঃ সিংহ হাসবার চেষ্টা করে বললেন, —হ্যাঁ৷ নিরাপদেই গেছে৷ ও ফিরলে সিকান্দার আপনাদের থানায় নিয়ে যাবে৷ তারপর যেখানে ইচ্ছা, ঘুরুন৷ সিকান্দারকে বলে রেখেছি৷

প্রণবেশ সিংহের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছিলুম৷ দুর্ধর্ষ এক শিকারি তাঁর নিপুণ লক্ষ্যভেদী রাইফেলে মানুষরূপী এক হিংস্র জন্তুকে গুলি করে মেরেছেন এবং তার ফলে পিতৃহারা এক বালিকার জীবন নিরাপদ হয়েছে৷ তবু মানবিক সংস্কারে তিনি নিজের হঠকারিতাকে যেন মেনে নিতে পারছেন না৷ আত্মদ্বন্দ্বে ভুগছেন৷ আর এ-ও ঠিক যে, খোকাগুন্ডার লাশ কোথাও চিরকালের মতো গুম না করে তাঁর উপায় ছিল না! পুলিশ মর্গের রিপোর্টে রাইফেলের বুলেটনেলের তথ্য পেয়ে প্রথমে মিঃ সিংহকেই সন্দেহ করত৷ কারণ মিঃ সিংহ শিকারি এবং তাঁর কাছে রাইফেল আছে৷...

কর্নেল আমাকে আর হালদারমশাইকে পইপই করে নিষেধ করেছিলেন, সম্রাট হোহেনহুম্বার সিল ও সেই মোটা কাঠের নলটার কথা যেন কারও সামনে মুখ ফসকে না বলি৷

সওয়া দশটা নাগাদ কপালীগড় থানা থেকে ফোনে জানানো হয়েছিল, ডি আই জি অশোক দত্ত এবং পুলিশ সুপার রমেশ শর্মা সদলবলে পৌঁছে গেছেন৷ আমরা তিনজনে তখনই মিঃ সিংহের গাড়িতে বেরিয়ে পড়েছিলুম৷ সিকান্দার আমাদের দশ মিনিটের মধ্যেই থানায় পৌঁছে দিয়েছিল৷ থানা কপালীগড়ের নিউ টাউনশিপ এলাকায়৷ ওদিকটা পরিচ্ছন্ন এবং রাস্তা পার্ক সরকারি-বেসরকারি অফিস থাকায় মানুষজনের ভিড়ও আছে৷ থানার গেটের সামনে আমাদের নামিয়ে দিয়ে সিকান্দার রাস্তার ধারে গাছের ছায়ায় গাড়ি পার্ক করতে গেল৷

সামনে লনে দাঁড়িয়ে ডি আই জি একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথা বলছিলেন৷ কর্নেলকে দেখে তিনি সহাস্যে বললেন, —গুড মর্নিং কর্নেল সরকার৷ আরে! জয়ন্তবাবুও আছেন দেখছি৷ হ্যাঁ—চমকপ্রদ একখানা স্টোরি আপনি অবশ্যই পাবেন৷

কর্নেল হালদারমশাইয়ের সঙ্গে মিঃ দত্তের পরিচয় করিয়ে দিলেন৷ মিঃ দত্ত বললেন, —হ্যাঁ৷ আমি মিঃ হালদার সম্পর্কে খবর রাখি৷

গোয়েন্দাপ্রবর কৃতার্থ হয়ে বললেন, —কর্নেলস্যারের কাছে আপনার কথা শুনছি স্যার!

মিঃ দত্ত সকৌতুকে বললেন, —আপনি তো রিটায়ার করার আগে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে ছিলেন৷ কাজেই কপালীগড় রাজবাড়ির মিউজিয়াম-রহস্যের কিছু ক্লু পেয়ে গেছেন?

হালদারমশাই গদগদভাবে বললেন, —তা পাইছি স্যার!

—অন্তত একটা বলুন!

কর্নেলের কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে ভড়কে গিয়ে হালদারমশাই বললেন, —পাইছি, মানে কর্নেলস্যারের কাছে শুনছি! জয়ন্তবাবুগো কাগজে কে একখান ছড়া ছাপছিল—

কর্নেল দ্রুত বললেন, —ক’য়ে কানা খ’য়ে খোঁড়া/গ’য়ে গাধা ঘ’য়ে ঘোড়া৷

মিঃ দত্ত অবাক হয়ে বললেন,—বলেন কী! এর মানে?

—মানে রাজবাড়িতে গিয়ে বুঝিয়ে দেব৷ আপাতত আমি ছোটো কুমারবাহাদুর গণেন্দ্রনারায়ণ রায়কে একবার চর্মচক্ষে দর্শন করতে চাই৷

থানার অফিসার-ইন-চার্জের নাম ভবেশ আচার্য৷ তাঁর ঘরে এস পি মিঃ রমেশ শর্মা বসে ছিলেন৷ আমাদের দেখে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন৷ কর্নেলের সঙ্গে করমর্দন করে তিনি বসলেন৷ তারপর মিঃ দত্তের নির্দেশে দু’জন কনস্টেবল একজন ভদ্রলোককে নিয়ে এল৷ বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশের বেশি নয়৷ শক্তসমর্থ গড়ন৷ ফর্সা রঙ৷ কিন্তু মুখে রুক্ষতা আছে৷ গোঁফ আছে৷ মাথায় একরাশ এলোমেলো চুল৷ চোখদুটি লাল হয়ে আছে৷ কিন্তু দৃষ্টি নিষ্পলক৷

কর্নেল তাঁকে বললেন, —আপনি ছোটোকুমারবাহাদুর গণেন্দ্রনারায়ণ রায়?

—আপনি কে?

—আপনার হিতৈষী৷

—আমার হিতৈষীর দরকার নেই৷ পুলিশ বিনা কারণে আমাকে ধরে এনেছে৷ আমি বারবার বলছি, আমাদের মিউজিয়ামে ইউহোনো দ্বীপের যে-কয়েকটি জিনিস এনে রেখেছি, তাতে কারও আইনত অধিকার নেই৷

কর্নেল বললেন, —মিঃ দত্ত৷ চলুন! আমরা এঁকে নিয়ে রাজবাড়ি যাই৷..

II আট II

রাজবাড়ির কাছে গিয়ে দেখি, ইতিমধ্যে কখন পুলিশ গিয়ে চারদিক ঘিরে ফেলেছে৷ গেটের সামনে একটা পুলিশভ্যান দাঁড়িয়ে আছে৷ নিরাপদ দূরত্বে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে কপালীগড়ের কৌতূহলী লোকজন৷ দুটো জিপে পুলিশকর্তারা এবং মিঃ সিংহের গাড়িতে আমরা গিয়ে পৌঁছুলুম৷ দেখলুম, ঘনশ্যাম মজুমদার, তাঁর স্ত্রী, আর রোগাটে গড়নের একটা লোক লনের পাশে একটা বকুলগাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে৷ বারান্দায় হুইলচেয়ারে শীর্ণকায় উজ্জ্বল ফর্সা রঙের এক ভদ্রলোক বসে ছিলেন৷ বুঝলুম, উনিই মেজকুমারবাহাদুর খগেন্দ্রনারায়ণ রায়৷ পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে ছোটোভাই গণেন্দ্রকে দেখে তিনি প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, —গুনু! এত পুলিশ কেন? কী করেছিস তুই? ঘনাবাবু বলছিল, তুই নাকি কোত্থেকে কী সব চুরি করে এনেছিস? আমি বিশ্বাস করি না! এই ঘনশ্যাম৷ তুমি তো বাড়ির কেয়ারটেকার৷ তুমি চুপ করে গেলে কেন এবার?

কর্নেল বললেন, —বড়ো কুমারবাহাদুরকে একটু ডাকুন ঘনশ্যামবাবু৷

ঘনশ্যামবাবু বললেন, —ওঁর শরীর খারাপ৷ ঘরে শুয়ে আছেন, স্যার৷

এবার গণেন্দ্র বললেন, —এই ঘনাবাবু! মিউজিয়ামের চাবি কোথায়? তোমাকে ফোন করে বলেছিলুম, আমার চাবির গোছা নিজের কাছে রাখবে৷ চাবি দাও! মিউজিয়ামে গিয়ে এঁদের দেখাতে চাই, আমি কী বেআইনি জিনিস এনে রেখেছি!

ঘনশ্যামবাবু বললেন, —মন্দিরে কোথায় আপনি চাবি লুকিয়ে রেখেছিলেন, আমি তা খুঁজে পাইনি৷

বুঝলুম, কর্নেলের পরামর্শেই ঘনশ্যামবাবু একথা বলছেন৷ গণেন্দ্র বললেন, —আমার সঙ্গে আপনারা আসুন, আমি মন্দির থেকে চাবি নিয়ে আসি৷

মিঃ দত্ত বললেন, —আপনার বড়দা বা মেজদার কাছে আরেক সেট চাবি থাকা উচিত৷

খগেন্দ্র হাত নেড়ে বললেন, —আমি খোঁড়া মানুষ৷ আমি চাবি নিয়ে কী করব? মিউজিয়ামে ঢুকতে হলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে হয়৷

কর্নেল বললেন, —মেজো কুমারবাহাদুর৷ আপনার জানার কথা, ওই হলঘর দিয়েও সেখানে ঢোকা যায়৷ তাই না?

—না মিউজিয়ামের দরজা ওদিকে ভেতর থেকে আটকানো আছে৷

—মেজো কুমারবাহাদুর৷ আপনি নিশ্চয় এই ছড়াটা জানেন? ক’য়ে কানা খ’য়ে খোঁড়া—

তাঁর কথার ওপর খগেন্দ্র প্রায় গর্জন করে বলে উঠলেন, —আমাদের কর্মচারী ব্রজেন মিত্তিরের সুপুত্র গুন্ডা-বদমাশ বারীন—খোকা! খোকা ওই ছড়া বানিয়ে আমাদের ভেংচি কাটত৷ তাই তাকে বাড়ি থেকে ছোটোবেলায় বের করে দিয়েছিলুম৷

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —আপনারা তিনভাই-ই জানেন ওই ছড়াতে কী আছে? হলঘরটা অন্তত খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন৷

খগেন্দ্র হকচকিয়ে গিয়েছিলেন৷ বললেন,— হলঘরের তালার চাবি আমার কাছে নেই৷

—আপনার দাদার কাছে আছে৷ আপনিই এনে দিন৷

—দাদাকে ডিসটার্ব করতে পারব না৷ আপনারা তালা ভেঙে ঢুকে দেখুন, ও-ঘর থেকে মিউজিয়ামে ঢোকা যায় নাকি৷

মিঃ দত্ত বললেন, —কর্নেল সরকার! উনি যখন বলছেন, তখন গণেন্দ্রবাবুকে নিয়ে আমরা মন্দিরে যাই৷ ইনি চাবি আনলে যে-দরজা দিয়ে মিউজিয়ামে ঢোকা যায়, আমরা সেখান দিয়ে ঢুকব৷

কর্নেল যেন ইচ্ছে করেই গলা চড়িয়ে বললেন, —গণেন্দ্রবাবুর ফাঁদে পা দেবেন না মিঃ দত্ত! আপনার পুলিশ ফোর্সের মধ্যে তালা ভাঙার জন্য এক্সপার্ট হ্যান্ড নিশ্চয়ই আছে৷ তালা ভাঙতে বলুন!

অমনি একটা ঘর খুলে গেল৷ জন্মান্ধ কনকেন্দ্র ছড়ি হাতে বেরিয়ে বারান্দায় এসে বললেন, —দয়া করে আপনারা তালা ভাঙবেন না৷ আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি ওটা৷ আমি হলঘর খুলে দিচ্ছি৷ আপনারা ঢুকে দেখুন, হলঘর থেকে মিউজিয়ামে ঢোকা যাবে না৷

বলে তিনি ছড়ির সাহায্যে বারান্দা দিয়ে এগিয়ে পশ্চিমে ঘুরে একটা বিশাল কপাটে আঁটা তালা খুলে দিলেন৷ ওদিকে গাড়িবারান্দা আছে৷ পুলিশ অফিসারদের কয়েকজন গণেন্দ্রকে নিয়ে সেখানে গেলেন৷ আমরা হলঘরে ঢুকলুম৷ প্রশস্ত এই ঘরে কপালীগড়ের রাজবংশের কয়েকটি প্রকাণ্ড ছবি দেওয়ালে টাঙানো আছে৷ মেঝেতে বিবর্ণ কার্পেট পাতা আছে৷ সেকেলে আসবাবপত্রে সাজানো এই ঘরে কী একটা গন্ধ পেলুম—হয়তো প্রাচীন ইতিহাসের গন্ধ৷

কনকেন্দ্র স্যুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিয়ে একটা বন্ধ দরজা দেখিয়ে বললেন, —ওপাশে মিউজিয়াম৷ দেখুন আপনারা, এঘর থেকে ও ঘরে কী ভাবে যাবেন!

কর্নেল এগিয়ে গেলেন ডানদিকে৷ কোণার কার্পেট একটু সরিয়ে বললেন, —বড়ো কুমারবাহাদুর৷ কলকাতার কাগজে একটা ছড়া ছাপিয়ে ব্রজেন মিত্তিরের ছেলে কুখ্যাত গুন্ডা খোকা মিত্তির সম্ভবত গণেন্দ্রকে ব্ল্যাকমেল করতে চেয়েছিল৷ কারণ ওই ছড়াতে একটা গুপ্তদরজার সূত্র লুকিয়ে আছে৷ আমার সঙ্গী প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে কে হালদার বলেছিলেন, ছড়াতে ক-খ-গ-ঘ— এই চারটি সূত্র যেন লুকিয়ে আছে৷ ঠিক ধরেছিলেন উনি৷ মিঃ দত্ত! মিঃ শর্মা! এই দেখুন, কার্পেটের তলায় দেওয়ালের কাছে চারটি বাংলা অক্ষর ক-খ-গ-ঘ,অবিকল একেকটা মোটা নাটের মতো একটা উঁচু হয়ে আছে৷ আমি ক এবং গয়ের ওপর এক পা রাখলুম৷ এবার খ এবং ঘয়ের ওপর আরেক পা রেখে চাপ দিচ্ছি৷ শুনুন! একটা অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে!

অবাক হয়ে দেখলুম, ঘসঘস ঘরঘর চাপা শব্দ হচ্ছে এবং কোণার দিকে দেওয়ালের নিচের ফুট তিনেক লম্বা আর অনুরূপ চওড়া অংশ ডানদিকে বেরিয়ে আসছে কপাটের মতো৷ কর্নেল বললেন, —আমি এই গুপ্ত দরজা দিয়ে ঢুকে মিউজিয়ামের ওই দরজাটা ভেতর থেকে খুলে দিচ্ছি৷

একটু পরে বন্ধ দরজা খুলে গেল৷ পুলিশকর্তারা ঢুকলেন৷ তারপর আমি ও হালদারমশাই ঢুকলুম৷ গত রাতে এই মিউজিয়াম দেখেছি৷ শুধু আশ্চর্য ব্যাপার, গণেন্দ্রের ইউহোনা দ্বীপ থেকে সংগৃহীত জিনিসগুলোর মধ্যে কোনও ফাঁক নেই৷ সেই সিল আর মোটা কাঠের নলটা কর্নেলের কাছে আছে৷ মোট ৭টা জিনিসের মধ্যে দুটো না থাকলে সেখানে জায়গা খালি থাকার কথা৷ কিন্তু কেউ কখন চুপিচুপি ঢুকে বাকি পাঁচটা জিনিসকে স্বাভাবিক ব্যবধানে সাজিয়ে রেখেছে৷

গণেন্দ্র টেবিলের ওপর কফিনের গড়ন কাঁচের বাকসের দিকে ঝুঁকে কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন৷ কিন্তু কিছু বললেন না৷ তাঁর চোখে যুগপৎ বিস্ময় ক্রোধ আর হতাশার চিহ্ন আমি লক্ষ্য করলুম৷ একটু পরে তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে একটু হেসে বললেন, —এগুলো আইনসম্মত ভাবে আমার সংগ্রহ৷ আপনারা যে-জিনিস চুরি করে আনার কথা বলছেন, তা এ ঘরে আছে কিনা খুঁজে দেখুন৷

বুঝলুম, গণেন্দ্র আপাতত খুশি হলেও টের পেয়েছেন আসল জিনিস-দুটিই নেই৷ তাঁর সন্দেহ যে বেচারা ঘনশ্যাম মজুমদারের ওপর হবে, তা যুক্তিসঙ্গত বইকী৷

ডি আই জি অশোক দত্ত রুষ্টমুখে বললেন, —আমরা রাজবাড়ি এবং মন্দির সব তন্নতন্ন খুঁজে দেখতে চাই৷ জাল চার্লস জেরিসন অর্থাৎ কুখ্যাত মাফিয়া-ডন বিল গ্রাহামের মুখে জেনেছি, তাকে টেক্কা দিয়ে কপালীগড়ের গণেন্দ্রনারায়ণ রায় ইউহোনো আদিবাসী-জাদুঘর থেকে দুটো অমূল্য ঐতিহাসিক জিনিস চুরি করে পালিয়ে এসেছে৷ সম্রাট হোহেনহুম্বার সিল এবং তাঁর একটা অমূল্য সম্পদ৷ দুটোর ছবিই মার্কিন কনসাল জেনারেল আমাকে দিয়েছেন৷

কর্নেলকে তিনি সবার চোখের আড়লে ছবিদুটো দেখালেন৷ কর্নেল একটু হেসে বললেন,—এবার আমার কাজ শেষ৷ আপনারা আপনাদের কাজ চালিয়ে যান৷

মিঃ দত্ত বললেন, —আপনি থাকবেন না?

—আমি ওয়াটারড্যামের একটা জলটুঙ্গিতে একটা বিদেশি ফ্লেমিঙ্গো দেখেছি৷ দলছুট পাখিটা সম্পর্কে আমার উদ্বেগ আছে৷ কারণ সামনে গ্রীষ্ম৷

ডি আই জি সহাস্যে বললেন, —ঠিক আছে৷ উইশ ইউ গুডলাক৷ পরে যোগাযোগ করব৷

কর্নেলের সঙ্গে আমি ও হালদারমশাই বেরিয়ে এলুম৷ হলঘরের বাইরে গিয়ে ঘনশ্যামবাবুর সঙ্গে দেখা হল৷ কর্নেল তাঁকে বললেন, —সারা বাড়ি সার্চ হবে৷ আপনার এবং ভীমপদর ঘরও সম্ভবত সার্চ হবে৷ চিন্তা করবেন না৷ সময়মতো গিয়ে দেখা করবেন৷ চলি!

ঘনশ্যামবাবু উদ্বিগ্নমুখে দাঁড়িয়ে রইলেন৷...

প্রণবেশ সিংহের বাড়ি যেতে যেতে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করেছিলুম,—আপনি বললেন, মিত্তির ওই অদ্ভুত ছড়া খবরের কাগজে ছেপে গণেন্দ্রকে ব্ল্যাকমেল করতে চেয়েছিল৷ এটা বোঝা যাচ্ছে না৷

কর্নেল বলেছিলেন, —খুব সহজ ব্যাপার৷ বারীন বা খোকা বহুল প্রচারিত কাগজ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকায় ছড়াটা ছেপেছিল৷ ঘনশ্যামবাবুর কাছে জেনেছি, মেজ খগেন্দ্রের কাগজ পড়ার অভ্যাস আছে৷ তিনি জনপ্রিয় ওই দৈনিক পত্রিকাটি রাখেন৷ কাজেই ছড়াটা দেখামাত্র তিনি চমকে উঠবেন৷ ছোটোভাই এবং দাদাকেও জানাবেন৷ ওতে ‘ক-খ-গ-ঘ’ আছে এবং খোকা ওই গুপ্ত দরজার কথা জানে, এই ভেবেই তিনভাই সন্ত্রস্ত হয়ে উঠবেন৷ কিন্তু ছড়াটি ছাপতে দেওয়ার পরই মাফিয়া-ডন বিল গ্রাহাম এসে পড়ে এবং স্বভাবত সে এখানকার দুর্বৃত্তদের সম্পর্কে খবর নেয়৷ খোকাকে সে পেয়ে যায়৷ গণেন্দ্র গ্রাহামকে চেনে৷ তার অপকর্মের সঙ্গী ছিল গ্রাহাম৷ কাজেই গণেন্দ্র ভয় পেয়ে বর্ধমানে চলে যায়৷ গণেন্দ্র জানত, ওই নলের মধ্যেই সম্রাট হোহেনহুম্বার গুপ্তধন আছে৷ আবার আমিও জানতুম৷ তাই ওটা মিউজিয়াম থেকে হাতিয়েছিলুম৷

—বলেন কী? আপনি কী করে জানলেন যে ওটার মধ্যে গুপ্তধন আছে?

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, —কাঠের নলের ওপর ইউহোনো দ্বীপের লিপি ছাড়াও রোমান লিপি আছে৷ ইংরেজি রোমানলিপিতে লেখা হয়৷ কাজেই আমি তা পড়তে পেরেছি৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ওই দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি করা হয়েছিল৷ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে ঘাঁটি তৈরির জন্য একখানে মাটি খোঁড়া হয়েছিল৷ মেজর রবার্ট স্টিলার মাটির তলা থেকে এই কাঠের নলটা আবিষ্কার করেন৷ তিনি ইউহোনো দ্বীপের লিপি পড়তে পারতেন৷ তিনি সেই লিপির অনুবাদ করে ইংরেজিতে লেখেন ‘The Treasure of the Emperor Hohenhumba’ এবং তিনিই সিল ভেঙে ভেতরে ছাই ঠাসা আছে দেখতে পান৷ আসলে সম্রাটের চিতাভস্ম ওই দ্বীপের আদিবাসীদের কাছে অমূল্য সম্পদ৷ যাই হোক, এই থেকে মার্কিন সেনা এবং কর্মচারীদের মধ্যে সম্রাট হোহেনহুম্বার গুপ্তধনের গুজব রটে যায়৷ তারপর দেশবিদেশে সেই গুজর ছড়িয়ে পড়ে৷

—আশ্চর্য! এ সব তথ্য আপনি কি শুধু নলটার গায়ে পেয়েছেন?

—না জয়ন্ত! এখানে আসবার আগে আমি সেই ইংরেজি ইতিহাসের বিশ্বকোষে এইসব তথ্য পড়েছিলুম৷ গণেন্দ্র বা মাফিয়া-ডন বিল গ্রাহাম কেমন করে জানবে? তারা ‘ট্রেজার’ আক্ষরিক অর্থে গুপ্তধনই ভেবেছিল৷

—আপনি জিনিসদুটো কাছে রেখেছেন৷ আমার অস্বস্তি হচ্ছে৷

—তোমার অস্বস্তির কারণ নেই৷ আমি যথাসময়ে ঐতিহাসিক নিদর্শন দুটি মিঃ দত্তের হাতে তুলে দিয়ে বলব, আমি এগুলো উদ্ধার করেছি৷ দেখো, জয়ন্ত! এই কেসে আমার কিছু কৃতিত্ব না দেখাতে পারলে চলে? কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এই নামটার খ্যাতি আমাকে বজায় রাখতে হবে না?

বলে কর্নেল তাঁর বিখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন৷ হালদারমশাই বললেন,—ঠিক কইছেন৷

গাড়ি সিংহ ভবনের গেটে ঢুকছিল৷ দেখলুম, প্রণবেশ সিংহ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন৷ যাক! তা হলে উনি মানসিক গ্লানি কাটিয়ে উঠেছেন৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%