ধূমগড়ে ধুন্ধুমার

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

এক

ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে ধপাস করে সোফায় বসে বললেন, ‘‘এক গ্লাস জল!’’

তাঁর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম৷ মুখের গড়নে কেমন একটা অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ছিল৷ কপালে একটা ছোট্ট আব, নাকের ওপর কাটা দাগ৷ আর নাকটাও কেমন থ্যাবড়া আর বাঁকা-চোরা৷ যেন কবে কোনো হিংস্র জন্তু থাবা মেরেছিল মুখে৷

কর্নেল নীলাদ্রি সরকার অবশ্য নির্বিকার৷ ওঁর পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক৷ এই বৃষ্টিসন্ধ্যায় যদি কবর থেকে স্রেফ মড়া উঠে এসে এমন করে ঘরে ঢুকে এক গ্লাস জল চায়, উনি একটুও চঞ্চল হবেন না৷ সাদা দাড়িতে নির্বিকার ভঙ্গিতে হাত বুলোতে থাকবেন৷

ভৃত্য ষষ্ঠিচরণকে ইশারা করলে সে সঙ্গে সঙ্গে জল এনে দিল৷ ভদ্রলোক এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে জল শেষ করে প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করলেন৷ তারপর মুখ মুছে বললেন, ‘‘উঃ! গলা-বুক একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল৷ আর একটু হলেই দম বেরিয়ে যেত!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আশা করি, কোনো গুন্ডা-বদমাশ আপনাকে তাড়া করেনি?’’

‘‘না৷’’ বলে ভদ্রলোক করুণ মুখে একটু হাসবার চেষ্টা করলেন৷ ‘‘তবে এও একরকম তাড়া করাই বলতে পারেন৷ আসলে আমার বুদ্ধিসুদ্ধি গুলিয়ে গেছে৷ আজ বিকেল থেকে যে সব ঘটনা ঘটেছে, তাতে আমি যেন একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মধ্যে ঢুকে গেছি৷ কিছুতেই এই দুঃস্বপ্নটা ভাঙছে না৷’’

কর্নেল ভুরু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, ‘‘আগে আপনার নামটা বলুন, শুনি৷’’

‘‘নাম? নাম তো একটা ছিল৷ কিন্তু এখন সেই নামের লোকটার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পারছিনে৷ স্যার, সত্যি বলতে কী, আমার মধ্যে আর আমি নেই৷’’

ভদ্রলোক পাগল নির্ঘাৎ! এমন বৃষ্টির সন্ধ্যায় কর্নেলের ড্রইংরুমে একজন পাগলই ঢুকে পড়েছে৷ কর্নেল কীভাবে তাকে সামলান, দেখা যাক৷ একটা পত্রিকা তুলে পড়ার ভান করতে থাকলুম৷ ওদের দু’জনের মধ্যে এইসব কথাবার্তা চলতে থাকল:

‘‘আপনার মধ্যে আর আপনি নেই বলছেন?’’

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আজ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি একেবারে অন্য একজন হয়ে গেছি৷’’

‘‘হুঁ৷ কে ছিলেন আপনি?’’

‘‘হরিশ সাঁতরা৷ ইলেকট্রিকিশিয়ান৷ থাকতুম ১১/৩/এ যদুগোপাল লেনে৷’’

‘‘এখন কে হয়েছেন?’’

‘‘কুমারবাহাদুর অজিতেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরি৷’’

‘‘বলেন কী! আপনার নতুন ঠিকানা?’’

‘‘ধূমগড়, জেলা সিংভূম, বিহার৷ অবশ্য এখনও সেখানে যাইনি৷’’

‘‘কেমন করে জানলেন, আপনিই অজিতেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরি এবং আপনার ঠিকানা ধূমগড়?’’

‘‘আমাকে বলা হয়েছে৷ তা ছাড়া কুমারবাহাদুরের ছবিও দেখানো হয়েছে৷ তাই দেখে বুঝতে পেরেছি, আমি আর হরিশ সাঁতরা নই, কুমারবাহাদুর৷’’

‘‘কে বলেছে আপনাকে?’’

‘‘মুনলাইট হোটেলের দু’জন লোক৷’’

‘‘হোটেলে কেন গিয়েছিলেন?’’

‘‘আহা! সেটাই তো বুঝতে পারছি না! হরিশ সাঁতরা সামান্য ইলেকট্রিশিয়ান৷ সে কেন অতবড়ো পাঁচতারা মার্কা হোটেলে গেল? সবচেয়ে ভালো স্যুট বুক করে সেখানে রাজার হালে রইল! স্যার, এ একটা সুস্বপ্ন বলে মনে হলেও রীতিমতো দুঃস্বপ্ন৷’’

‘‘হোটেলে কেন গিয়েছিলেন, মনে নেই?’’

‘‘আজ্ঞে না৷ যতদূর মনে পড়েছে, আমি চৌরঙ্গীতে বাস ধরার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলুম৷ হুঁ, তখন রাত প্রায় ন’টা৷ হঠাৎ দুটো লোক এসে আমাকে বলল, কথা আছে৷ তারপর কী হয়েছিল মনে নেই৷ আজ বিকেলে ঘুম ভেঙে উঠে দেখি, আমি সুন্দর একটা ঘরে নরম বিছানায় শুয়ে আছি৷ খুব অবাক হয়ে গেলুম৷ তারপর যেই আয়নায় চোখ পড়ল, ভীষণ চমকে গেলুম৷ এ কী! আয়নার ভেতর যাকে দেখছি, সে তো আমি নই৷ আমার চেহারা মোটেও তো এরকম ছিল না৷ স্বপ্ন ভেবে চিমটি কাটলুম নিজের গায়ে৷ শেষে ডাকাডাকি শুরু করলুম৷ তখন নেই লোকদুটো ঘরে ঢুকে বলল, কী হয়েছে কুমার বাহাদুর? ওদের বোঝাবার চেষ্টা করলুম যে আমি হরিশ সাঁতরা, ইলেকট্রিশিয়ান৷ কিন্তু ওরা কিছুতেই তা মানতে চাইল না৷ তারপর যখন বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি, তখন একজন ছুরি, অন্যজন পিস্তল বের করে শাসিয়ে বলল, ওদের কথামতো না চললে আমাকে মেরে ফেলবে৷ প্রাণের ভয়ে চুপ করে রইলুম৷ ওরা বলল, আমাকে আজই রাত বারোটার ট্রেনে ধূমগড় রওনা হতে হবে৷ তারপর সেখানে পৌঁছে যা যা করতে হবে, ওরা সব বুঝিয়ে দেবে৷’’

‘‘তারপর কী হল?’’

‘‘ওরা আমাকে ট্রেনের এয়ার কন্ডিশনড ক্লাসের একটা টিকিট দিল৷ বলল, হাওড়া স্টেশনে দেখা হবে ওদের সঙ্গে৷ আর এই ছবিটা দিল—দেখাচ্ছি৷ দেখলেই বুঝবেন, আমার এখনকার চেহারার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে৷’’

আড়চোখে ছবিটা দেখলুম৷ এই ভদ্রলোকেরই ছবি৷ তবে পরনের পোশাকটা অন্যরকম, এই যা৷ ছবির কুমার বাহাদুর দামী বিলিতি পোশাক পরে রয়েছেন৷ আর এঁর পরনে সাধারণ প্যান্টশার্ট৷ হুঁ, তাহলে এই হল সেই সুকুমার রায় কথিত: ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল৷’

কর্নেল ছবিটা দেখে বললেন, ‘‘আপনার এখনকার চেহারার সঙ্গে আপনার আগেকার চেহারা মিলছে না?’’

‘‘একেবারেই মিলছে না৷ আমার কপালে মোটেও আব ছিল না৷ নাকের পাশে কাটা দাগ ছিল না৷ তা ছাড়া এমন বিচ্ছিরি থ্যাবড়া নাকও আমার ছিল না৷’ বলে হরিশ সাঁতরা অথবা কুমার বাহাদুর পকেট থেকে একটা ভাঁজকরা খাম বের করে কর্নেলের হাতে দিলেন৷ এবার এটা পড়ে দেখুন৷ লোকদুটো আমাকে এই খামটা দিয়ে বলেছে, এর ভেতর ধূমগড়ের কুমার বাহাদুরের জীবনী আছে৷ আর অনেক তথ্য আছে, যা আমার জানা নাকি খুবই দরকার৷’’

খাম খুলে ভাঁজ করা কয়েক পাতা কাগজ বের করলেন কর্নেল৷ দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘‘হুঁ৷ বুঝতে পারছি, ওরা আপনাকে কুমার বাহাদুর করে ধূমগড় রাজবাড়িতে ঢোকাতে চায়৷ দু বছর আগে কুমার বাহাদুর জঙ্গলে শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হন৷ এরপর ওরা ঘটনাটা চমৎকার সাজিয়েছে৷ মুখে বাঘের থাবায় তিনি জ্ঞান হারান৷ তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যান এক সন্ন্যাসী৷ চিকিৎসা করে ক্ষত সারিয়ে দেন৷ কিন্তু কুমার বাহাদুরের স্মৃতি লোপ পায়৷ অবশেষে এতকাল পরে স্মৃতি একটুখানি ফিরে এসেছে এবং তিনি বাড়ি ফিরছেন৷ চমৎকার!’’

আমি এতক্ষণে মুখ খুললুম৷ ‘‘তাহলে আসলে আপনি হরিশ সাঁতরাই?’’

‘‘আলবাৎ আমি হরিশ সাঁতরা৷ আমার বাবার নাম মদনমোহন সাঁতরা৷’’

‘‘আপনার বাড়িতে কে আছে?’’

‘‘কেউ নেই৷ আমি একা থাকি৷’’

‘‘বাড়ি ফিরলেন না কেন?’’

‘‘প্রথমে হোটেল থেকে কেটে পড়ে যদুগোপাল লেনেই তো গিসলুম৷ গিয়ে পড়লুম গণ্ডগোলে৷ ঘরে তালাবন্ধ ছিল৷ ভেঙে ঢুকতে গেলুম তো লোকেরা আমাকে চোর ভেবে তাড়া করল৷ ভবানীপুর থানায় গিয়ে ঢুকলুম প্রাণের দায়ে৷ কিন্তু পুলিশ আমাকে পাগল ভেবে মাথায় গাঁট্টা মেরে বের করে দিল৷ রাস্তায় গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল, এই তো গতকাল হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটের চন্দ্রকান্তবাবুর নতুন বাড়িতে ওয়্যারিংয়ের কাজ করেছি৷ খুব সদাশয় ভদ্রলোক৷ ওঁর কাছে গিয়ে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললুম৷ প্রমাণও দিলুম যে আমি সেই হরিশ সাঁতরা ছাড়া আর কেউ নই৷ আগের দিন কীভাবে ইলেকট্রিক ওয়্যারিংয়ের কাজ করেছি কী সব কথাবর্তা হয়েছে, কতটাকা পেয়েছি—এসব খুঁটিয়ে বললুম৷ তখন উনি ধাঁধায় পড়ে গেলেন৷ বললেন একটা কিছু গুরুতর গণ্ডগোল ঘটেছে৷ আপনি এক কাজ করুন, এলিয়ট রোডে কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের কাছে গিয়ে সব খুলে বলুন৷’’

কর্নেল তাঁর ঝকমকে সাদা দাড়ি থেকে বৃষ্টিসন্ধ্যায় আশ্রিত একটা লালরঙের পোকা বের করে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে ফেলে দিলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘রাতারাতি আপনার চেহারা হয়তো বদলে যায়নি হরিশবাবু৷ হুঁ, আজকাল প্ল্যাস্টিক সার্জারি করে চেহারা বদলে দেওয়া কঠিন নয় কিন্তু তা সময় সাপেক্ষ৷ আমার ধারণা, আপনি লোকদুটোর পাল্লায় পড়েছিলেন বেশ কিছুকাল আগে, গতকাল নয়৷’’

হরিশবাবু বললেন, ‘‘চন্দ্রকান্তবাবু তাই বললেন বটে৷ উনি বললেন, ওঁর ঘরে ওয়্যারিংয়ের কাজ হয়েছে ২৪ জুন৷ আর আজ হল ১১ আগস্ট৷ কিন্তু আমার খালি মনে হচ্ছে, এই তো গতকাল ওঁর বাড়ির কাজ শেষ করে নিউমার্কেটে এলুম একটা কাজে৷ কাজ শেষ হতে রাত সাড়ে আটটা বেজে গেল৷ তখন চৌরঙ্গীতে বাস ধরার জন্য—’’

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘হরিশবাবু! বড়োরকমের একটা প্লাস্টিক সার্জারি হলে ঘা শুকোতেও সময় লাগে৷ যাই হোক, আপনার মুখটা আমি পরীক্ষা করতে চাই৷’’

হরিশ সাঁতরা মুখ এগিয়ে আনলেন৷ কর্নেল একটা আতসকাচ দিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পর বললেন, ‘‘হুঁ—ঠিকই ধরেছি৷ আপনার মুখের চেহারার সঙ্গে সম্ভবত ধূমগড়ের কুমার বাহাদুরের কিছুটা মিল ছিল৷ আপনার শরীরের গড়ন এবং অন্যান্য অংশ নিশ্চয়ই অবিকল ওঁর মতো৷ তাই শুধু মুখে অপারেশন করেছে ওরা৷ ঠিক আপনার মতোই একজনকে খুঁজছিল৷’’

হরিশবাবু কাঁদো-কাঁদো হয়ে বললেন, ‘‘আবার প্ল্যাস্টিক সার্জারি করে আমার আগের চেহারা ফিরিয়ে আনা যায় না?’’

‘‘যায়৷ যদি আপনার আগের চেহারার ছবি থাকে, তাই দেখে ডাক্তার সেটা করতেও পারেন৷ কিন্তু প্ল্যাস্টিক সার্জারি প্রচুর টাকার ব্যাপার৷’’

‘‘তাহলে আমার কী হবে?’’

‘‘দেখুন হরিশবাবু, আপনি যাদের খপ্পরে পড়ে গেছেন, বুঝতে পারছি তারা সামান্য লোক নয়৷ তা ছাড়া আপনাকে প্রাণের ভয়ও দেখিয়েছে ওরা৷ যদি ওদের কথামতো না চলেন, ওরা আপনাকে মেরে ফেলতে দ্বিধা করবে না৷’’

হরিশবাবু আরও মুষড়ে পড়ে বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ তা তো বুঝতেই পারছি৷’’

‘‘আপনি ওদের কথামতো কাজ করুন আপাতত৷’’

হরিশবাবু আঁতকে ওঠার ভঙ্গি করে বললেন, ‘‘সর্বনাশ! আমি সামান্য এক ইলেকট্রিশিয়ান৷ ধূমগড়ের রাজপুত্তুর হতে গিয়ে পদে-পদে ধরা পড়ে যাব যে!’’

‘‘ধরা পড়ার প্রশ্ন ওঠে না হরিশবাবু! কুমারবাহাদুরের স্মৃতিভ্রংশ হওয়া স্বাভাবিক বলেই ধরে নেবেন রাজবাড়ির লোকেরা৷ তা ছাড়া আপনাকে ওঁর জীবনী এবং আরও সব খবরাখবর এই খামের ভেতর দেওয়া হয়েছে৷ ভাববেন না, চালিয়ে যান লোকদুটোর কথামতো৷’’

‘‘কিন্তু আমার বিবেকে যে বাধছে, স্যার!’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘বাধলেও উপায় কী হরিশবাবু? আপাতত আর তো আপনি হরিশ সাঁতরা নন৷ কেউ আপনাকে হরিশ সাঁতরা বলে স্বীকার করবে না৷’’

হরিশবাবু কর্নেলের হাত চেপে ধরে বললেন, ‘‘চন্দ্রকান্তবাবুর কাছে আপনার কীর্তির কথা কিছু কিছু শুনে এলুম স্যার! আপনি সব পারেন৷ দয়া করে আমাকে বাঁচান৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘বাঁচাতে চাই বলেই তো বলছি হরিশবাবু, আপনি আজ রাত বারোটার ট্রেনে ধূমগড় চলে যান৷’’

‘‘তারপর?’’

‘‘লোকদুটোর কথামতো কাজ করতে থাকুন৷’’

হরিশবাবু হতাশভাবে বললেন, ‘‘তারপর?’’

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘চিন্তা করবেন না৷ একই ট্রেনে আমরা যাচ্ছি ধূমগড়ে৷ কী বলো জয়ন্ত?’’

কর্নেল আমার দিকে তাকালে আমি সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলুম৷ হরিশবাবু আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘‘আপনি কে স্যার?’’

জবাবটা কর্নেল দিলেন৷ ‘‘হরিশবাবু, আমার এই তরুণ বন্ধুর নাম জয়ন্ত চৌধুরি৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার স্পেশাল রিপোর্টার৷’’

হরিশবাবু একটু ভরসা পেলেন যেন৷ বললেন ‘‘আপনি কাগজের লোক? তাহলে আর আমার চিন্তা নেই৷ কাগজে সব কথা ফাঁস করে দেবেন৷ সরকারের টনক নড়বে৷ খবরের কাগজে আসল কথাটা রটে গেলে সে ধুন্দুমার কাণ্ড ঘটবে!’’

কর্নেল আর হেসেও বললেন৷ ‘‘আপাতত ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটবে ধূমগড়ে৷’’

‘‘কেন স্যার? কেন স্যার?’’

‘‘ঘটবে না? দু’বছর পরে নিখোঁজ কুমার বাহাদুর ধূমগড় রাজবাড়িতে বহাল তবিয়তে ফিরে এসেছেন৷ হিড়িক পড়ে যাবে না?’’

হরিশবাবু করুণ মুখে শুধু একটু হাসলেন৷

দুই

হাওড়া স্টেশনে লোক দুটোকে ভালো করে দেখে নিয়েছিলুম৷ এয়ারকন্ডিশন ক্যুপের সামনে ওরা দাঁড়িয়ে ছিল৷ দু’জনেরই বেশ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা৷ তবে একজন বেশ মোটাসোটা, অপরজন তার তুলনায় একটু রোগা বলা চলে৷ হরিশবাবুর অপেক্ষা করছিল ওরা৷ উনি পৌঁছতেই ওরা কামরায় উঠে গেল৷ দু’জনের মুখেই হাসি৷

আমরা উঠেছিলুম পাশের ক্যুপে৷ ধূমগড় স্টেশনে ট্রেন পৌঁছলো ভোর ছ’টা নাগাদ৷ স্টেশনটা ছোটো৷ চারিদিকে টিলাপাহাড়৷ বঙ্গ-ওড়িশ্যা সীমান্তের এই জনপদটা একসময় নাকি খুব সমৃদ্ধ ছিল৷ স্বাধীনতার যুগে দেশীয় রাজাদের রাজত্ব গেছে৷ তাই আর আগের মতো জেল্লা নেই৷ স্টেশন থেকে একটা টিলার নিচে পুরোনো বিশাল বাড়ি দেখিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘ওটাই ধূমগড় রাজবাড়ি৷’’

দেখে মনে হচ্ছিল হানাবাড়ি৷ কিন্তু তারপর অবাক হয়ে দেখলুম, সেই ক্যুপ থেকে হরিশবাবু আর লোকদুটো বেরুল বটে, কিন্তু তারা রীতিমতো বেশ বদলে নিয়েছে৷ সেজেছে গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী, অন্যজন তার চেলা৷ হরিশবাবু কাঁচুমাচু মুখে পা ফেলছিলেন তাদের সঙ্গে৷

কর্নেল বলেছিলেন, ধুন্ধুমার পড়ে যাবে৷ তার সূচনা দেখতে পেলুম৷ যাত্রী নেমেছিল খুব কম৷ প্ল্যাটফর্মে বিশেষ ভিড় নেই৷ তবে তাদের মধ্যেই কিছু কিছু লোক থমকে দাঁড়িয়ে হরিশবাবুকে দেখছিল৷ স্টেশন থেকে বেরিয়ে কর্নেল একটা এক্কাগাড়ি ডাকলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘ডাকবাংলোয় যাব৷’’

আমাদের এক্কাগাড়িটা চলতে শুরু করেছে, সেইসময় আশেপাশে লোকজনের মধ্যে চাঞ্চল্য লক্ষ্য করলুম৷ কে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘কুমারবাহাদুর কী জয়!’’ তারপর হরিশবাবুদের ঘিরে ভিড় জমতে শুরু হল৷ বাজার থেকে লোকেরা হইচই করে দৌড়ে যাচ্ছে৷ বাঁকের মুখে যেতে যেতে এক্কাওয়ালাও ব্যাপারটা টের পেয়ে ঘোড়াটার রাশ টেনে ধরল৷ তারপর পিছন ফিরে দেখতে দেখতে বিকট চেঁচিয়ে উঠলো, ‘‘কুমারবাহাদুর কী জয়!’’

সেইসঙ্গে এক্কা থেকে লাফ দিয়ে সে দৌড়াতে লাগল৷ গাড়িটা থেমে রইল৷ হরিশবাবুকে ঘিরে ফেলেছে লোকেরা৷ কর্নেল বাইনোকুলার চোখে রেখে ব্যাপারটা উপভোগ করতে থাকলেন৷ একটু পরে দেখি, ‘কুমারবাহাদুর’ এবং ‘সন্ন্যাসী ও তার চেলার’ একটা মিছিল এগিয়ে আসছে৷ মুহুর্মুহু জয়ধ্বনি দিচ্ছে লোকেরা, ‘‘কুমারবাহাদুর কী জয়!’’

মিছিলটা আমাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় ‘কুমারবাহাদুর’ করুণ হেসে আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে গেলেন৷

এক্কাওলা ফিরে এল নাচতে নাচতে৷ তারপর খোট্টাই বুলিতে বলল, ‘‘সাধুজির দয়ায় এতকাল পরে কুমারবাহাদুর ফিরে এলেন৷ আজ আমাদের বড়ো আনন্দের দিন৷’’

গাড়ি চলতে শুরু করলে কর্নেল বললেন, ‘‘কী ব্যাপার বলো তো ভাই?’’

এক্কাওলা গোঁফে তা দিয়ে ঘোড়াটার পিঠে ছিপটি মেরে বলল, ‘‘স্যার, ওই যে সাধুবাবা আর ওনার ভক্তবাবাজির সঙ্গে যাঁকে দেখলেন, উনি আমাদের ধূমগড়ের রাজাবাহাদুরের একমাত্র ভাই কুমারবাহাদুর অজিতেন্দ্র চৌধুরি৷ রাজাবাহাদুরের কোনো সন্তানাদি নেই৷ ভাইকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, তো সেই ভাই দু’বছর আগে ধূমলপানির জঙ্গলে শিকারে গিয়ে আর ফিরে আসেননি৷ অনেক খোঁজা হয়েছিল৷ শেষে জঙ্গলের ভেতর ঝর্নার ধারে ওনার কাপড়চোপড়ের একটু অংশ আর খানিকটা রক্ত দেখতে পাওয়া গিয়েছিল৷ তাই সবাই ধরে নিয়েছিল, ওনাকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে৷’’

‘‘কুমারবাহাদুরকে তুমি চিনতে পারলে?’’

এক্কাওলা গোঁফে আবার তা দিয়ে বলল, ‘‘আমি চিনব না? বলেন কী স্যার? ওনাদের বাড়িতেই তো আমি জীবন কাটিয়েছি বলতে গেলে৷ রাজবাড়িতে বিস্তর ঘোড়া ছিল৷ আমি ছিলুম সহিশ৷ শেষে রাজাবাহাদুরের অবস্থা পড়ে এল৷ অনেক ঘোড়া বিক্রি করে দিলেন৷ বাকিগুলো অসুখবিসুখে মারা পড়ল, আমারও চাকরি রইল না৷ শেষে এই এক্কাগাড়ি চালাতে এলুম৷’’

‘‘রাজবাড়িতে রাজাবাহাদুর ছাড়া আর কারা থাকেন?’’

‘‘রাজাবাহাদুর বুড়ো হয়েছেন৷ রানিমাও বেঁচে নেই৷ থাকার মধ্যে আর আছেন এস্টেটের ম্যানেজার ভোম্বোলবাবু৷ আগের মতো তত লোকজন আর নেই৷ খাঁ খাঁ পুরী৷’’

সামনে মিছিল৷ দু’ধারের বস্তী থেকে ক্রমশ লোকেরা বেরিয়ে মিছিলে যোগ দিচ্ছিল৷ আমাদের এক্কাগাড়ি মিছিলের পেছন-পেছন আস্তে এগোচ্ছিল৷ এক্কাওলা ধূমগড় রাজবাড়ির চোদ্দপুরুষের কাহিনি শোনাতে থাকল৷ আমি ভালো করে শুনছিলুম না৷ কিন্তু কর্নেল খুব মন দিয়ে শুনছিলেন আর মাঝে মাঝে বাইনেকুলারে চোখ রেখে সম্ভবত পাখি বা প্রজাপতি দেখছিলেন৷

প্রকাণ্ড একটা জঞ্জালভর্তি টিলাপাহাড়ের নিচে রাজবাড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল আমাদের এক্কাগাড়ি৷ মিছিলটা জরাজীর্ণ দেউড়ি দিয়ে রাজবাড়িতে ঢুকল৷

একটা ছোট্ট নদীর ধারে-ধারে এগিয়ে কাঠের সাঁকো পেরিয়ে এক্কা থামল ডাকবাংলোর গেটে৷ কর্নেল গতরাতেই ট্রাঙ্ককলে জেলাকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বাংলোটা বুক করে রেখেছেন৷ বাংলোর চৌকিদার সেলাম বাজিয়ে বলল, ‘‘এইমাত্র একজন পুলিশ অফিসার এসে বলে গেলেন, আপনারা আসবেন৷ আমি তখন থেকে পথ তাকাচ্ছি৷’’

চৌকিদার লোকটি সজ্জনপ্রকৃতির৷ যেমন অমায়িক, তেমনি বিনয়ী৷ সে আমাদের অল্পসল্প বোঁচকা-বুঁচকি বয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে গেল৷ বাংলো একেবারে টিলার মাথায়৷ গেট থেকে সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়৷ এক্কাওলাকে ভাড়া ও বখশিশ দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘‘তোমার নামটা কী ভাই?’’

এক্কাওলা বলল, ‘‘স্যার, আমার নাম দুখিয়া৷ যখনই কোথাও যাত্রার দরকার হবে, চৌকিদার ভগুয়াকে দিয়ে খবর দেবেন৷ ভগুয়া আমার মাসতুতো দাদা৷’’

ধাপ ভেঙে উঠে আমি হাঁফছিলুম৷ কর্নেল এই বৃদ্ধ বয়সেও পাহাড় চড়তে কত পটু, তা বহুবার দেখেছি৷ উনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইনোকুলার চোখে রেখে বললেন, ‘‘এখানে থেকে রাজবাড়ির ভেতরটা দেখা যাচ্ছে৷ সত্যি ধুন্ধুমার পড়ে গেছে দেখছি৷ তুমি দেখবে নাকি ডার্লিং?’’

বললুম, ‘‘ইচ্ছে করছে না৷ অন্তত গরম-গরম চা কিংবা কফি পেটে না গেলে আমি মারা পড়ব মনে হচ্ছে৷’’

একটু পরে চৌকিদার ভগুয়া ট্রে-তে করে চায়ের পট এনে বারান্দার টেবিলে রেখে গেল৷ কর্নেল তখনও বাইনোকুলারে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছেন৷ চা খেতে ডাকলে বাইনোকুলার নামিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘সন্ন্যাসী আর তার চেলার খাতির যদি দেখতে জয়ন্ত! মনে হচ্ছে, রাজবাড়িতে ওদের আস্তানা হয়ে গেল পাকাপাকিভাবে৷ দেখা যাক, ব্যপারটা কতদূর গড়ায়৷’’

তিন

কতদূর গড়িয়েছে, সেটা জানা গেল সন্ধ্যা নাগাদ৷

বাইরে কোথাও এলে যা হয়৷ কর্নেল তো সারাটা দিন ক্যামেরা, বাইনোকুলার আর প্রজাপতি ধরা জাল নিয়ে কোথায়-কোথায় টো-টো করে ঘোরেন৷ আমার আর ধকল পোষায় না৷ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখি চুপচাপ এক জায়গায় বসে৷ নয়তো শুয়ে শুয়ে গোয়েন্দা উপন্যাস পড়ি৷ আমার বৃদ্ধ সঙ্গীটিও এক ঘুঘুগোয়েন্দা, কিন্তু জলজ্যান্ত গোয়েন্দার চেয়ে বইয়ের গোয়েন্দাই আমাকে বেশি টানে৷

সন্ধ্যার মুখে বাংলোর টিলার নিচে ছোট্ট নদীর ওপর কাঠের সাঁকোতে একলা দাঁড়িয়ে ছিলুম৷ কর্নেল আবার বিকেলে বেরিয়ে ছিলেন৷ এতক্ষণে ফিরতে দেখলুম৷ বললুম, ‘‘খবর বলুন৷’’

কর্নেল সাঁকোর রেলিঙে হেলান দিয়ে চুরুট ধরালেন৷ ধোঁয়া উড়িয়ে বললেন, ‘‘আমার দুর্ভাগ্য ডার্লিং৷ ওড়িশা-সীমান্তে বহু জায়গায় এই প্রজাপতিগুলো দেখা যায়৷ হলুদ ডানার ওপর কালো-কালো ফুটকি৷ শুঁড়ের রঙ আমার দাড়ির চেয়েও ফুটফুটে শাদা৷ পেটের তলাটা ঝকমকে লাল দেখতে, একেবারে রাজপুত্তরটি৷ কিন্তু কী বিচ্ছু! কী ধুরন্ধর! ওঃ! আমাকে ওরা ক্রমাগত ফাঁকি দিয়ে চলেছে৷’’

একটু বিরক্ত হয়ে বললুম, ‘‘আহা! আমি হরিশবাবুর খবর জানতে চাইছি৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘হরিশবাবুর খবর কুমারবাহাদুরের মুখেই বরং শোনো জয়ন্ত৷’’

‘‘তাঁকে পাচ্ছি কোথায়?’’

‘‘ওই তো!’’

চমকে উঠে দেখি, নিচে নদীর বুকে প্রকাণ্ড সব পাথরের আড়াল থেকে গুড়ি মেরে উঠে আসছে কেউ৷ আবছা আঁধারে এতক্ষণ সেটা লক্ষ্যই করিনি৷ নিচের পাথর থেকে সাঁকোর রেলিঙ গলিয়ে উঠে পড়লেন সত্যি সত্যি হরিশ সাঁতরা ওরফে ধূমগড়ের ‘কুমারবাহাদুর’৷

সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, ভদ্রলোক ইলেকট্রিসিয়ান৷ মই বেয়ে ওঠা বা এ-ধরনের সার্কাসসুলভ কসরতে উনি অভ্যন্ত৷ চাপা গলায় বললেন, ‘‘বেরুনো কঠিন, এক ফাঁকে বেরিয়ে পড়ে নিচের পাথরগুলোর আড়ালে বসে অন্ধকারের অপেক্ষায় ছিলুম৷ অন্ধকার হলেই আপনাদের বাংলোয় গিয়ে দেখা করতুম৷ যাক গে, ভালোই হল৷ ঝটপট কথাটা বলে নিয়ে এখনই ফিরতে হবে! ভবা আর গজু টের পেলেই পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেবে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ভবা আর গজু?’’

‘‘আজ্ঞে৷ ওরা পরস্পরকে ওই বলে ডাকাডাকি করে৷’’

‘‘খবর বলুন হরিশবাবু৷’’

হরিশবাবুর পরনে এখন দস্তুরমতো চুস্ত পাজামা আর কাজকরা সিল্কের পাঞ্জাবি, কুমারবাহাদুর বনে গেছেন সত্যি সত্যি৷ এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন, ‘‘রাজাবাহাদুর তো প্রায় শয্যাশায়ী ছিলেন৷ আমাকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেকেটে সে এক এলাহি কাণ্ড করে ফেললেন৷ যাই হোক, আছি ভালোই—রাজার হালেই আছি, যদিও মনে হল রাজবাড়ির ভাঁড়ারের অবস্থা তত ভালো নয়৷’’

‘‘কেউ সন্দেহ করছে না?’’

‘‘করছে না বলেই মনে হল৷’’ হরিশবাবু ফিক করে হাসলেন৷ এই যে বাঘের কামড়ে মুণ্ডু বিগড়ে গেছে—তাই স্মৃতিভ্রংশ৷ ভোম্বোলবাবু বলে একজন আছেন৷ তিনিই দেখাশোনা করেন৷ ভোম্বোলবাবু মেনে নিয়েছেন, কাজেই আর অসুবিধে নেই৷ কিন্তু—’’

ওঁকে থামতে দেখে কর্নেল বললেন, ‘‘কিন্তু কী?’’

হরিশবাবু ফিসফিস করে বললেন, ‘‘ভবা আর গজু বলছে, আজ রাতের মধ্যেই জিনিসটা হাতিয়ে কেটে পড়তে হবে৷’’

‘‘জিনিসটা কী?’’

‘‘একটা হাতির মাথা৷’’

‘‘হাতির মাথা! তার মানে?’’

‘‘রাজাবাহাদুরের দেয়ালে নাকি গোপন গর্ত আছে৷ তার ভেতর আছে নাকি একটা হাতির মাথা৷’’

‘‘ভবা আর গজু বলেছে?’’

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ, বলেছে: রাজাবাহাদুরকে বলতে হবে, দাদা অনেকদিন হাতির মাথাটা দেখিনি৷ দেখতে ইচ্ছে করছে৷ তারপর রাজাবাহাদুর ওটা বের করে নিশ্চয়ই দেখাবেন৷ তখন দেয়ালের গুপ্ত স্থানটা দেখে রাখতে হবে এবং ভবা আর গজুকে জানাতে হবে৷’’

‘‘কী করবেন ভাবছেন?’’

‘‘সেটাই তো জিজ্ঞেস করতে এলুম স্যার৷’’ হরিশবাবু আবার এদিক-ওদিক তাকালেন৷ দেরি হয়ে যাচ্ছে৷ ভবা-গজু ভোম্বোলবাবুর সঙ্গে শাস্ত্র আলোচনা করছিল, সেই ফাঁকে কেটে পড়েছিলুম৷ শিগগির বলুন স্যার, কী করব?’’

‘‘ঠিক আছে আপনি রাজাবাহাদুরের কাছে গিয়ে হাতির মাথাটা দেখতে চাইবেন৷’’

‘‘বড়ো ভয় করছে, স্যার৷’’

‘‘ভয় কিসের?’’

‘‘রাজাবাহাদুর যদি কোনো সন্দেহ করেন?’’

‘‘কেন সন্দেহ করবেন ভাবছেন? উনি তো আপনাকে ভাই বলে মেনেই নিয়েছেন৷’’

‘‘তবু বলা যায় না৷ দুপুরে খাওয়ার সময় হঠাৎ রাজাবাহাদুর বললেন—আমার ডান হাতের কড়ে আঙুলটা নাকি অস্বাভাবিক রকমের ছোট্ট ছিল৷ বললুম সন্ন্যাসীর ওষুধ খেয়ে কড়ে আঙুলটা এমন হয়ে গেছে; তাহলেও কিন্তু মুখ দেখে মনে হল উনি যেন কথাটা বিশ্বাস করলেন না৷’’

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘গিয়ে বলে দেখুন তো কী হয় তারপর চুপিচুপি—যত রাত হোক আমাকে খবর দিয়ে যাবেন৷’’

এইসময় হঠাৎ অন্ধকারে কেউ হেঁড়ে গলায় বলে উঠল, ‘‘ব্যোম ভোলা শঙ্কর৷ হর হর মহাদেব৷ ভোলে যাবা কী জয়!’’

অমনি হরিশবাবু রেলিং গলিয়ে নেমে গেলেন নদীতে৷ একটু.পরে রাস্তায় আবছা একটা মূর্তি ফুটে উঠল৷ কর্নেল চাপা গলায় বললেন, ‘‘ভবা কিংবা গজু৷ জয়ন্ত ওকে ফলো করে দেখা যাক, কোথায় যাচ্ছে৷’’

রাস্তার দু’ধারে ঝোপঝাড় আর গাছপালা থাকায় লোকটাকে অনুসরণ করতে অসুবিধা হচ্ছিল না৷ রাস্তাটা উৎরাইয়ে উঠে গেছে ক্রমশ৷ তারপর বাঁক নিয়ে রাজবাড়ির পেছনের টিলার ওপাশটা দিয়ে চলে গেছে৷ বাঁকে পৌঁছে লোকটা আবার হাঁক দিল, ‘‘ব্যোম ভোলা শংকর হর হর মহাদেও৷ ভোলে বাবা কী জয়!’’ আমরা একটা ঝোপের আড়ালে দাঁড়ালুম৷ এতক্ষণে নদীর ওপারে একটা টিলা ডিঙিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে৷ আবছা জ্যোছনায় লোকটাকে মোটামুটি দেখা গেল এতক্ষণে৷ সেই সন্ন্যাসীবেশী বদমাশটাই বটে৷ রাস্তার ধারে প্রকাণ্ড একটা পাথরের ওপর বসে পড়ল সে৷

একটু পরে দূরে খটখট গড়গড় অদ্ভুত একটা শব্দ শোনা গেল৷ তারপর দেখি, একটা এক্কাগাড়ি আসছে উল্টোদিক থেকে৷ গাড়িটা এসেই হঠাৎ থেমে গেল পাথরটার কাছে৷ তারপর টর্চের আলো পড়ল৷ ‘সন্ন্যাসী’ দু’হাতে মুখ ঢেকে বলল, ‘‘আঃ! কী হচ্ছে?’’

এক্কা থেকে লাফ দিয়ে নেমে এল প্যান্টশার্ট পরা একটা লোক৷ টর্চ নিভিয়ে হি হি করে হেসে বলল, ‘‘চেনাই যাচ্ছে না ভবতারণ! কী দারুণ সেজেছ মাইরি৷’’

তারপর এক্কাওলার দিকে ঘুরে বলল সে, ‘‘দুখিয়া, তুই যা তাহলে৷’’

দুখিয়া! আমরা যার এক্কায় এসেছি স্টেশন থেকে? খুব চমকে উঠেছিলুম৷ দুখিয়া বলল, ‘‘বকশিশ দিলেন না কিন্তু সেই কতদূর থেকে আপনাকে নিয়ে এলুম বলুন৷ যাবার সময় কিন্তু একটাও প্যাসেঞ্জার পাইনি জানেন? খালি সাধুবাবার খাতিরে৷’’

আগন্তুক বলল, ‘‘দুখিয়া, কপাল ফিরলে মোটা টাকা বকশিশ দেব তোকে৷ ভাবিস না! এখন যা!’’

দুখিয়া বিরক্ত হয়ে ঘোড়ার পিঠে ছিপটি মেরে বলল, ‘‘কতদিন ধরে খালি কপাল দেখিয়েই চলেছেন আমাকে৷ ঠিক আছে৷’’

এক্কাগাড়িটা জ্যোছনার ভেতর অদ্ভুত শব্দ করতে করতে মিলিয়ে গেল৷

ভবতারণ বলল, ‘‘খবর বলো রামহরি৷’’

রামহরি বলল, ‘‘বলছি৷ কিন্তু দুখিয়া ব্যাটা খুব ত্যাঁদড়বাজি করছে, লক্ষ্য করলে?’’

‘‘হুঁ৷ একটা কিছু সন্দেহ করেছে ব্যাটা৷ বিকেলে গজুকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিলুম, ঠনঠনিয়া থেকে তোমাকে আনতে হবে৷ গজুকে বলেছে, বাবুজিকে আবার এনে কোনো লাভ হবে না৷ টিকটিকি ঘুরে বেড়াচ্ছে নাকি৷ অথচ আমি ভালোই জানি, আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ৷ আসলে আমাদের ব্ল্যাকমেল করার তালে আছে দুখিয়া৷ নইলে হঠাৎ টিকটিকির কথা বলবে কেন?’’

‘‘তেমন বুঝলে, দাও না ব্যাটাকে খতম করে৷’’

‘‘দেখা যাক৷’’

রামহরি পাথরে বসে সিগারেট ধরাল৷ তারপর চাপা গলায় বলল, ‘এখানে বসা কি ঠিক হচ্ছে? হঠাৎ পুলিশের গাড়ি এসে পড়লে তোমার কোনো ভয় হয়তো নেই, আমি যে ধরা পড়ে যাব৷’’

‘‘ঠিক বলেছ৷ চলো, বরং মন্দিরে গিয়ে বসা যাক৷’’

যেখানে ওত পেতেছি, তার পেছনে টিলাপাহাড় আগাগোড়া জঙ্গলে ভর্তি৷ কিন্তু ওদের অনুসরণ করে গিয়ে দেখলুম, সরু একফালি রাস্তা এঁকে বেঁকে টিলার গা বেয়ে উঠেছে৷ টিলার মাথায় একটা মন্দির৷ প্রকাণ্ড গাছের ছায়া পড়েছে মন্দিরের ওপর৷ ছায়াটা নিরেট নয়৷ কুচি-কুচি জোৎস্নায় চকরা-বকরা হয়ে আছে৷ জনহীন ছোট্ট মন্দিরের বারান্দায় ওরা পা ঝুলিয়ে বসল৷ আমরা গাছের গুঁড়ির আড়ালে চুপটি করে বসে রইলুম৷

ভবতারণ বলল, ‘‘রাজাবাহাদুর মেনে নিয়েছেন আমাদের মক্কেলকে৷’’

‘‘ভোম্বোলকাকা সন্দেহ করেননি তো?’’

‘‘নাঃ৷ তবে করলেও কিছু যায়-আসেনা৷ আজ রাতেই মালটা আমরা হাতিয়ে কেটে পড়ব৷’’

‘‘বলো কী ভবতারণ! এতটা এগিয়েছে?’’

‘‘হ্যাঁ৷ আমাদের মক্কেল রাতে খাওয়ার সময় রাজাবাহাদুরের কাছে কথাটা তুলবে৷ তারপর দেয়ালের সেই গুপ্তস্থানটা দেখে নিয়ে সময় মতো আমাদের খবর দেবে৷ আমি আর গজু রাত তিনটে নাগাদ গিয়ে হানা দেব৷’’

‘‘ঢুকবে কী করে?’’

‘‘মক্কেল দরজা খুলে রাখবে৷ ওকে সেইমতো সব নির্দেশ দিয়ে রাখব৷’’

‘‘বেঁগড়বাজি করবে না লোকটা?’’

ভবতারণ হাসল খি খি করে৷ ‘‘করলেই মরবে৷ না—না, আমাদের কিছু করতে হবে না’৷ জাল কুমার বাহাদুর সেজেছে বলে পুলিশই ওকে তক্তাপেটা করবে যে!’’

রামহরি বলল, ‘‘এদিকে আমার হয়েছে জ্বালা৷ ঢনঢনিয়ায় আর কতদিন লুকিয়ে থাকব? সবসময় ধরাপড়ার ভয়৷ জেল পালানো আসামীর বেশিদিন এক জায়গায় থাকা উচিত নয়৷ তা ছাড়া ওই দুখিয়া ব্যাটাছেলের ভাবগতিক ভালো ঠেকল না আজ৷’’

‘‘ওসব কথা থাক৷ আসল কথাটা বলো৷’’

‘‘গোপালবাবুর সঙ্গে কথা তো হয়েই আছে৷ সাত লাখ দাম দিতে রাজি উনি৷’’

‘‘ধুস! মাত্র সাত লাখ?’’ ভবতারণ হতাশ ভঙ্গিতে বলল, ‘‘প্ল্যাস্টিক সার্জারিতেই খরচ হয়েছে লাখ খানেক টাকা৷ তার ওপর হোটেল খরচ, ডাক্তারের দেখাশুনার ফি, এসব নিয়ে হাজার পঞ্চাশ৷ সাত লাখ দাম হলে লাভ থাকছে সাড়ে পাঁচ লাখ৷ আমি, গজু আর তুমি তাহলে পাচ্ছি কত, হিসেব করো!’’

রামহরি বিড়বিড় করে বলল, ‘‘মাথা পিছু পৌনে দু লাখের কিছু বেশি৷

রামহরির দাঁত জ্যোৎস্না পড়ে চকচকে করল৷ ‘‘হুঁ, প্রত্যেকের কোটিপতি হওয়া উচিত ছিল৷’’

‘‘ছিল বইকী৷ গোপালবাবু ওটা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রকে বেচলে কমপক্ষে দশ কোটি টাকা দাম পাবেন৷’’

‘‘জিনিসটা কি সত্যি এত দামী মনে করছ?’’

‘‘দেখো রামহরি৷ আমি সায়েন্সের ছাত্র ছিলুম৷ ওটা নিছক হাতির মাথা নয়৷ ওটা এক আশ্চর্য ধাতু৷ আমার ধারণা, ওই ধাতু দিয়ে এ-যুগে অন্তত একশোটা মহাকাশ যানের কাঠামো তৈরি করা যাবে৷ কেন জানো? ধাতুটা অসম্ভব শক্তিশালী আর ওজনে হাল্কা৷ রাজাবাহাদুরের ঠাকুর্দার যে ডায়রি তুমি চুরি করে আমাকে দিয়েছিলে, তাতেই ওই ধাতুর গুণাগুণ বর্ণনা করা আছে৷ মাত্র এক বর্গইঞ্চির ওই ধাতুকে পিটিয়ে নাকি একটা প্রকাণ্ড বাসের দুর্ভেদ্য বডি তৈরি করা যায়৷ একটুকরো কাঠেরও নাকি দরকার হবে না৷’’

‘‘রাজাবাহাদুরের ঠাকুর্দা তাই লিখে গেছেন বুঝি?’’

‘‘হ্যাঁ৷ তুমিও পড়ে দেখতে পারো৷’’

‘‘মাথা খারাপ? ওই অলক্ষুণে ডায়রি চুরি করতে গিয়েই আমি না ফেঁসে গিয়েছিলুম; মিছিমিছি টাকা চুরির দায়ে আমাকে জেলে ঢোকানো হল৷ ভোম্বোলকাকার সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে গেল চিরকালের মতো৷ এখনও বরাতে কী আছে, কে জানে!’’

ভবতারণ বললে, ‘‘আর দুঃখ কোরো না ভাই রামহরি! টাকা পেলে তুমি বিদেশে পালিয়ে যেও৷’’

‘‘তাই যাব৷’’

‘‘এবার স্পষ্ট কথা বলি শোনো৷ গোপালবাবুকে আমরা বেচব না৷ কলকাতায় নিয়ে গিয়ে নতুন কোনো পার্টি খুঁজে দেখব৷ এ জিনিসের খদ্দেরের অভাব হবে না৷’’

‘‘গোপালবাবু—’’

বাধা দিয়ে উঠে দাঁড়াল ভবতারণ৷ বলল, ‘‘ছাড়ো গোপালবাবুকে৷ এসো, রাজবাড়ির পেছনের কোনো ঘরে লুকিয়ে থাকবে তুমি৷ সময় হলে আমি ‘ব্যোম ভোলা শংকর’ বলে হাঁক দেব৷ তুমি আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে৷’’

মন্দিরের ওপাশে ঝোপঝাড় ভেঙে ওরা টিলা বেয়ে নামতে থাকল৷ কর্নেল চাপা গলায় বললেন, ‘‘এখন ওদের সঙ্গে জঙ্গলে ঢুকে লাভ নেই, জয়ন্ত৷ বাংলোয় ফেরা দরকার৷ হরিশবাবু কখন এসে যাবেন, বলা যায় না৷’’

আমরা যে পথে এসেছিলুম, সেই পথে ফিরে চললুম বাংলোর দিকে৷

চার

‘‘তাহলে ব্যাপারটা মোটামুটি স্পষ্ট হল৷ কী বলেন কর্নেল?’’

কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন৷ আমার কথা শুনে সেই অবস্থাতেই আস্তে শুধু বললেন, ‘‘হুঁ:!’’

তারপর হঠাৎ সোজা হয়ে বসে ডাকলেন, ‘‘ভগুয়া! ভগুয়া! একবারটি এদিকে এসো তো৷’’

ভগুয়া কিচেনে রান্না করছিল৷ সাড়া দিয়ে দৌড়ে এসে বলল, ‘‘কফি ঠিকমতো তৈরি হয়নি স্যার?’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘না, না৷ খাসা কফি করেছ তুমি, আমার ষষ্ঠীচরণটার চেয়েও খাসা!’’

বললুম, ‘‘ফিরে গিয়ে ষষ্ঠীকে কথাটা বলব!’’

কর্নেল জিভ কেটে, মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘উঁহু! বোলো না ডার্লিং! তাহলে কেলেঙ্কারি হবে৷ হ্যাঁ—শোনো ভগুয়া, তোমার রান্না কতদূর?’’

‘‘রান্না শেষ হয়ে গেছে স্যার৷’’

‘‘ঠিক আছে৷ বসো তাহলে, গল্প করা যাক৷’’

‘‘এক মিনিট স্যার!’’ বলে সে তেমনই দৌড়ে কিচেনের দরজা বন্ধ করে দিয়ে ফিরে এল৷ মেঝেয় বসে পড়ল৷

কর্নেল বললেন, ‘‘তুমি তো ধূমগড়ের লোক, ভগুয়া!’’

‘‘হ্যাঁ স্যার৷ আমরা অনেকপুরুষ ধরে এখানকার বাসিন্দা৷’’

‘‘রামহরিবাবু বলে কাউকে চেনো কি?’’

ভগুয়ার মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল৷ ‘‘খুব চিনতুম৷ সে তো চোর স্যার৷ রাজবাড়িতে থাকত তার কাকার কাছে৷ কাকার নাম হল ভোম্বলবাবু৷ রাজবাড়ির উনি ম্যানেজার৷ তো রামহরিবাবুর কথা আর জিগ্যেস করবেন না৷ ওর জ্বালায় আমরা অস্থির ছিলুম৷ যাকে-তাকে ধরে খামোকা মারধর করত৷’’

‘‘রামহরিবাবুর নাকি চুরির দায়ে জেল হয়েছিল?’’

‘‘হ্যাঁ স্যার৷ দুপুর রাতে রাজাবাহাদুরের ঘরে ঢুকে কী সব চুরি করেছিল নাকি৷ হাতে-নাতে ধরা পড়ে জেল হয়েছিল৷ তারপর শুনেছি জেল ভেঙে পালিয়েছে৷’’

‘‘এক্কাগাড়ি চালায়—ওই দুখিয়া, তোমার বুঝি মাসতুতো ভাই?’’

‘‘আজ্ঞে৷’’

‘‘দুখিয়াও তো রাজবাড়িতে থাকত৷’’

‘‘হ্যাঁ, তবে দুখিরাও কম লোক নয় স্যার! মাসতুতো ভাই হলে কী হবে? খুব বজ্জাত যদি না হত, চাকরি যায় রাজবাড়ি থেকে?’’

‘‘কী করেছিল সে?’’

‘‘ও তো রামবাবুর স্যাঙাত ছিল—বুঝলেন না? অবশ্য সবই শোনা কথা৷ রাজাবাহাদুরের ঘরের পেছনে মই লাগিয়ে রামবাবু জানালায় উঠেছিল৷ নিচে দাঁড়িয়ে নাকি পাহারা দিচ্ছিল দুখিয়া৷ রামবাবু জানালার রড সরিয়ে ঢুকে একটা করে জিনিস এগিয়ে দিচ্ছিল, আর দুখিয়া সেটা ধরে নিচ্ছিল৷ রাজাবাহাদুর জেগে রামবাবুকে ধরে ফেললেন৷ চেঁচামেচি হুলুস্থুল কাণ্ড৷ দুখিয়া বেগতিক বুঝে পালাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু ভোম্বোলবাবু ওকে দেখতে পেয়েছিলেন যে! আমি গিয়ে ওঁকে হাতে পায়ে ধরে মিটিয়ে নিই৷ কিন্তু ভোম্বোলবাবু নিজের ভাইপো রামবাবুকে বাঁচাতে পারেননি৷ রাজাবাহাদুর ভীষণ কড়া লোক৷ হাতেনাতে যাকে ধরেছেন, তাকে ছাড়বেন কেন?’’

বুঝলাম রামহরি আসলে রাজাবাহাদুরের ঠাকুর্দার ডায়রিটা চুরি করতেই গিয়েছিল এবং ধরা পড়ার মুখে সেটা জানালা গলিয়ে ফেলে দিয়েছিল, দুখিয়া সেটা হাতিয়ে ভবতারণকে দিয়ে থাকবে৷

এসব ভেবেই ওঁদের ফাঁকে প্রশ্ন করলুম, ‘‘আচ্ছা ভগুয়া, ভবতারণ বলে কাউকে তুমি চেনো নাকি?’’

ভগুয়া বলল, ‘‘ভবতারণ বলে ধূমগড়ে তো কোনো লোক নেই স্যার! থাকলেও আমি চিনি বলে মনে হচ্ছে না৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘শুনেছ তো ভগুয়া, কুমারবাহাদুর এতদিন পরে ফিরে এসেছেন?’’

ভগুয়া নড়ে চড়ে বসল৷ বুঝলুম, সে কুমারবাহাদুরের রোমাঞ্চকর কাহিনিটা খুব জম্পেশ করে শোনাবে৷ সে বলল, ‘‘কুমারবাহাদুর ছিলেন ওনার দাদা রাজাবাহাদুরের চেয়ে তেজি লোক৷ বনজঙ্গলেই ঘুরে বেড়াতেন দেখেছি৷ নাম-করা শিকারি ছিলেন৷ বছর দুই আগে—’’

ভগুয়ার গল্পে বাধা পড়ল৷ বারান্দায় জুতোর শব্দ হল, তারপর ভারী গলায় বাইরে থেকে কেউ বলল, ‘‘আসতে পারি কর্নেল?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘রাঘববাবু নাকি?’’

এক পেল্লায় চেহারার পুলিশ অফিসার ঢুকে নমস্কার করে হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘সারাটা দিন আজ আমার যা গেছে, কহতব্য নয়৷ এক দাগী আসামি পাকড়াও করতে গিয়ে সারা ধূমলপানির জঙ্গল চষে ফেলতে হয়েছে৷ যাই হোক, কোনো অসুবিধে হয়নি তো?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘একটুও না৷ ভোরবেলায় আপনার থানার এক অফিসার এসে চৌকিদারকে বলে গিয়েছিলেন৷’’

তারপর আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন৷ ইনিই তাহলে ধূমগড় থানার অফিসার-ইন-চার্জ রাঘবেন্দ্র বর্মা৷ গতরাতে এঁকেই ফোন করেছিলেন কর্নেল৷ ভগুয়া চৌকিদার আবার একদফা কফি এনে দিল৷ ওঁদের কথাবার্তায় বুঝলুম, কর্নেল ও উনি পরস্পরের বিশেষ পরিচিত৷ এর আগে ছিলেন হাতিয়াগড়ে৷ সেখানে কর্নেল একটা ফার্মের কুমড়োলেতে প্রজাপতি ধরতে গিয়ে একটা কুমড়োর ভেতর বিপজ্জনক বিস্ফোরক পদার্থ আবিষ্কার করেছিলেন নাকি৷ কাছের একটা বিদ্যুৎকেন্দ্রে অন্তর্ঘাত করার উদ্দেশ্যেই কারা ওটা লুকিয়ে রেখেছিল৷ ধরা পড়েছিল চক্রান্তকারীরা৷

এইসব গল্পের পর রাঘববাবু আর কর্নেল বাইরে গেলেন৷ লনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দু’জনে চুপিচুপি কীসব কথাবার্তা হল৷ তারপর কর্নেল একা ফিরে এলেন৷ বললেন, ‘‘হ্যাঁ—ভগুয়া এবার তাহলে কুমার বাহাদুরের গল্পটা বলো!’’

কিন্তু ভগুয়া কুমারবাহাদুরের গল্পটা বলার জন্য আগ্রহ দেখাল না৷ তার মুখে উত্তেজনা লক্ষ্য করলুম৷ সে বলল, ‘‘কুমারবাহাদুর সাধুবাবার দয়ায় ফিরে এসেছেন৷ আগের মতো চেহারা আর নেই দেখলুম৷’’ তারপর একটু হাসবার চেষ্টা করল সে৷ ‘‘যদি হুকুম দেন তো একটা কথা জিগ্যেস করি স্যার!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘নিশ্চয়ই জিগ্যেস করবে!’’

ভগুয়া চাপা গলায় বলল, ‘‘আমার কেমন যেন খটকা লাগছে স্যার!’’

‘‘কী খটকা?’’

‘‘আপনারা পুলিশ, সেটা আমার গোড়াতেই সন্দেহ হয়েছিল৷ এখন তো জেনেই ফেললুম, তাই বটে৷’’

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘আরে না না! আমরা পুলিশ নই৷ তুমি ভুল করছো ভগুয়া!’’

ভগুয়া বলল, ‘‘স্যার আমি বুঝতে পেরেছি—দুখিয়া আবার কিছু গণ্ডগোল বাধিয়েছে৷ রামহরিবাবুর সঙ্গে ওর বরাবর খুব ভাব ছিল৷ এদিকে রামহরিবাবু জেল থেকে পালিয়েছে৷ সে নিশ্চয়ই দুখিয়ার সঙ্গে জুটে আবার রাজবাড়িতে কী একটা করে ফেলেছে৷’’

‘‘করলে তো জানতে পারতে৷ ধূমগড়ের সবাই জেনে যেত৷’’

ভগুয়া আবার চাপা স্বরে বলল, ‘‘খুলে বলি স্যার৷ দুখিয়া সেদিন কথায় মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল, রামহরিবাবু কোথায় লুকিয়ে আছে, সে জানে৷ আমি ওকে থাপ্পড় তুলে বললুম, খবর্দার দুখিয়া! রামহরিবাবুর সঙ্গে আবার যদি ভাব করেছ তো তোমাকে মেরে শেষ করে দেব৷ দুখিয়া হাত ধরে কাকুতি মিনতি করে বলল, কাউকে যেন কথাটা না বলি৷’’

সে হঠাৎ পর্দা তুলে দেখে এল কেউ শুনছে নাকি৷ তারপর আরও চাপা গলায় বলল, ‘‘যদি রামহরিবাবুকে ধরতে চান, এখনই ঢনঢনিয়া চলে যান স্যার৷ সে ওখানে একটা কাঠগোলায় লুকিয়ে আছে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘দুখিয়া তাই বলে ফেলেছিল বুঝি?’’

‘হ্যাঁ স্যার! কিন্তু দোহাই আপনাদের, দুখিয়া বেচারাকে যেন ধরবেন না৷ আসলে ও ভীষণ বোকা৷ ওকে সাদাসিদে বোকা লোক পেয়ে—তা ছাড়া ভীষণ গরিবও বটে৷ যে যা বলে, তাই করে বসে৷ এই দেখুন না, মাঝেমাঝে ওর বউ আমার কাছেই টাকা চাইতে আসে৷ ঘরে একদঙ্গল পুষ্যি৷ আর ওই যে এক্কাগাড়িটা দেখছেন, ওটা আমিই ওকে দিয়েছি৷ কিন্তু প্যাসেঞ্জার জোটে না ধূমগড় স্টেশনে৷ ছোট্ট স্টেশন৷ দুখিয়ার তেমন রোজগারই হয় না স্যার৷’’

কর্নেলের কাছে প্রতিশ্রুতি করে ভগুয়া ছাড়ল৷ ওর কথা বিশ্বাস করা যায়৷ কারণ আমরা কিছুক্ষণ আগে রাস্তার বাঁকে ওর সঙ্গে রামহরির কথাবার্তা শুনে বুঝেছি, মূল চক্রান্তের সঙ্গে ওর কোনো যোগ নেই৷ নেহাত বখশিশের লোভে সে রামহরিকে আনতে গিয়েছিল৷ এক্কাগাড়ি নিয়ে জেল পালানো রামহরির পায়ে হেঁটে বা বাসে চেপে আসার অসুবিধে আছে৷ দুখিয়ার এক্কাগাড়ি সে-কারণে ওর পক্ষে নিরাপদ৷ টাপরের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকবে৷

আমরা ন’টার মধ্যে রাতের খাওয়া সেরে নিলুম৷ ভগুয়া আবার দুখিয়ার জন্য প্রতিশ্রুতি আদায় করে বাড়ি চলে গেল৷ ভোরবেলা আসবে সে৷

বারান্দায় বসে আমরা গল্প করছিলুম৷ চাঁদটা ঝলমলে জ্যোৎস্না ছড়াচ্ছে৷ কোথায় রাতের পাখি ডেকে উঠছে মাঝেমাঝে৷ শেয়ালের ডাকও শোনা গেল৷ তারপর হন্তদন্ত হয়ে এসে পড়লেন হরিশবাবু৷

ওঁকে নিয়ে আমরা ঘরে ঢুকলুম৷ হরিশবাবুর মুখ উত্তেজনায় থমথম করছে৷ চাপা স্বরে বললেন, ‘‘কেলেঙ্কারি হয়েছে!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘কী কেলেঙ্কারি হল হরিশবাবু?’’

‘‘খেতে বসে কথায়-কথায় যেই রাজাবাহাদুরকে বলেছি, ‘আচ্ছা দাদা আমাদের সেই হাতির মাথাটা আছে তো?’ অমনি রাজাবাহাদুর চোখ কটমট করে তাকালেন৷ আমার পিলে চমকে উঠল৷ আমি আমতা-আমতা করে বললুম, ‘না—মানে এমনি জিগ্যেস করছি৷ একটু দেখতে ইচ্ছে করছে আর কী! সঙ্গে সঙ্গে রাজাবাহাদুর একেবারে অগ্নিমূর্তি হয়ে বললেন, ‘অজু! তুমি কি অজু, না তার ভূত?’ আমি তো একেবারে থ৷’’

আমি হেসে ফেললুম৷ কর্নেল কিন্তু গম্ভীর৷ আস্তে বললেন ‘‘তারপর?’’

হরিশবাবু রুমালে মুখের ঘাম মুছে বললেন, ‘‘একটু পরে রাজাবাহাদুর নরম হয়ে বললেন, ও! তোমার স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে, সে-কথা ভুলে গিয়েছিলুম৷ তা না হলে হাতির মাথাটা দেখতে চাইবেই বা কেন? গতিক বুঝে কাঁদোকাঁদো মুখ করে বললুম, কিছু তো বুঝতে পারছি না দাদা৷ বুঝিয়ে বলুন না আমাকে৷ তখন রাজাবাহাদুর বললেন, ‘‘একদিন তুমি হাতির মাথাটা দেখতে চেয়েছিলে৷ আমি তোমাকে দেখিয়ে ছিলুম৷ আর সেইদিনই মা মারা গেলেন৷ তখন দু’জনেই প্রতিজ্ঞা করলুম, ওই অভিশপ্ত জিনিসটা জঙ্গলের লেকে ফেলে দিয়ে আসব৷ সেদিনই রাত দুপুরে দু’জনে চুপিচুপি গিয়ে ওটা ফেলে দিয়ে এলুম৷’ শুনে আমার অবস্থা শোচনীয়৷ ভবা-গজু তো এ-কথা বিশ্বাস করতে চাইবে না৷’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘বিশ্বাস আমিও করছি না হরিশবাবু৷’’

হরিশবাবু হাঁ করে তাকালেন৷

‘‘হ্যাঁ৷ রাজাবাহাদুর যে কোনো কারণেই হোক, আপনাকে মিথ্যা বলেছেন৷’’

আমি অবাক হয়ে বললুম, ‘‘কেমন করে বুঝলেন?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ধূমলপানির জঙ্গলে কস্মিনকালে কোনো লেক নেই৷ একটা ঝরনা আছে৷ ঝরনার জলটা পাথরে আছড়ে পড়ে সূক্ষ্ম জলকণা ছড়িয়ে যায় এবং দেখে মনে হয় ধোঁয়া উঠছে৷ তাই থেকে ঝরনাটার নাম ধূমলপানি৷ জঙ্গলটাকেও লোকে ওই নামে ডাকে৷ আজ দুপুর বেলাটা চক্কর দিয়ে ঘুরেছি৷ আধিবাসীদের সঙ্গে আলাপ করেছি৷ হ্যাঁ, ধূমলপানি শুনে আমিও লেকের কথাই ভেবেছিলুম৷ কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলুম, ওই ঝরনাটাই ও-নামের উৎস৷ তা ছাড়া শুধু ওই জঙ্গল এলাকা কেন, আশেপাশে বহুদূর পর্যন্ত লেক দূরের কথা, পুকুর পর্যন্ত নেই৷ কারণ মাটিটা একেবারে পাথুরে৷ নেহাত ওই ঝরনাটার জন্য একটা জঙ্গল গজিয়েছে ওখানে৷ নইলে চারিদিকে ধু-ধু ন্যাড়া পাহাড় আর মাঠ-ঘাট৷ এই যে নদীটা ধূমগড়ের গা ঘেঁসে বয়ে যাচ্ছে, সেটা এসেছে ওই ঝরনা থেকেই৷’’

শুনতে শুনতে হরিশবাবু ভীষণ ভড়কে গেলেন৷ বললেন, ‘‘সর্বনাশ! তাহলে আমাকে রাজাবাহাদুর জাল বলে ধরে ফেলেছেন দেখছি৷’’

আমি বললুম, ‘‘ঝরনার ওখানে ডোবা নেই? সেই ডোবায় ফেলে আসতেও পারেন৷’’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘না জয়ন্ত৷ আসলে কোনো কারণে রাজাবাহাদুরের মনে সন্দেহ জন্মেছে৷ তার মানে এই নয় যে উনি একেবারে জাল বলে সাব্যস্ত করেছেন ওঁকে৷ তাহলে তো পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দিতেন৷ শুধু বোঝা যায়, রাজাবাহাদুর একটু দ্বিধায় পড়েছেন৷ তাই গোপন তথ্য ফাঁস করতে চাইছেন না৷’’

বললুম, ‘‘বুদ্ধিমান লোক তাহলে৷’’

হরিশবাবু বললেন, ‘‘ভীষণ বুদ্ধিমান৷ হাড়ে হাড়ে বুদ্ধি৷ সারাক্ষণ জেরায় আমি জেরবার হচ্ছি৷ স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে বলায় রক্ষে৷ যা জিগ্যেস করেন, বলি—কই মনে পড়ছেনা তো৷ তারপর আরও এক কাণ্ড! দুপুরবেলা হঠাৎ আমার কপালের আবটা খামচে ধরে এক হ্যাঁচকা টান! উঁহুহু করে উঠেছিলুম যন্ত্রণায়৷ আর একটু হলেই উপড়ে যেত৷’’

আমরা দু’জনে হাসতে লাগলুম৷ হরিশবাবু বললেন, ‘‘অপনারা হাসছেন সার৷ আমি যে মারা যেতে বসেছি৷ ইচ্ছে করছে, পালিয়ে যাই৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘না, না৷ পালিয়ে গেলে বিপদে পড়বেন৷ ভবা-গজু সাংঘাতিক লোক৷ ঠিক খুঁজে বের করবে আপনাকে৷ বরং এক কাজ করুন৷’’

‘‘বলুন স্যার৷’’

‘‘আপনি আমাদের যা যা বললেন, সব বলুন ভবা আর গজুকে৷ তারপর ওরা যা বলে, তাই করুন৷’’

‘‘এবার যে রাজবাড়ি ঢুকতে বড়ো ভয় করছে স্যার!’’

‘‘আপাতত ভয়ের কারণ নেই আপনার৷’’ কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ ‘‘চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি৷ আর জয়ন্ত, আমার ফিরতে একটু দেরি হবে৷ থানায় গিয়ে রাঘববাবুকে বারণ করে আসতে হবে৷ ওঁরা দলবল নিয়ে এসে অকারণ হয়রান হবেন৷’’

কর্নেল বেরিয়ে গেলেন হরিশবাবুকে নিয়ে৷ আমি ভালো করে দরজা এঁটে শুয়ে পড়লাম৷ টেবিল ল্যাম্পের আলোয় গোয়েন্দা উপন্যাস পড়া ছাড়া আর কী করা যায়!

পাঁচ

ভোরবেলা কখন কর্নেল অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণে গিয়েছিলেন, টের পাইনি৷ ফিরে এলেন টুপিতে মাকড়সার জাল, দাড়িতে শুকনো হলুদ পাতা, আর ছাইরঙা জ্যাকেটে কাদার ছিটে নিয়ে৷ প্রজাপতি-ধরা জালটা শিশিরে ভিজে গিয়েছিল৷ বারান্দার রোদে শুকোতে দিলেন৷ কিটব্যাগ, কাঁধ থেকে নামিয়ে একটা সচ্ছিদ্র কাচের ইয়া মোটা শিশি বের করলেন৷ তার ভেতর হলুদ ডানায় কালো ফুটকিওলা একটা প্রজাপতি দেখে বুঝলাম, একদিনে সাফল্য অর্জন করেছেন৷ তাই মুখ হাসিতে ঝলমল করছে৷

ব্রেকফাস্টের টেবিলে শিশিটা রেখে বললেন, ‘‘রাত্তিরটা বিফলে গেলেও সকালটা আজ আমাকে জয়ের আনন্দ দিয়েছে ডার্লিং৷’’

বললাম, ‘‘সে তো দেখতেই পাচ্ছি৷ কিন্তু হরিশবাবুর খবর কী?’’

‘‘বরং রামহরির খবর জিগ্যেস করতে পারো৷’’

‘‘কী হয়েছে রামহরির? ধরা পড়েছে নাকি?’’

‘‘না৷ দেখে এলুম, রাজবাড়ির পেছনে টিলার মাথায় সেই শিবমন্দিরে মুখ চূণ করে বসে আছে৷’’

‘‘কাল সন্ধ্যায় যে-মন্দিরে আমরা ওদের ফলো করে গিয়েছিলুম?’’

‘‘হ্যাঁ৷ তবে আমি কাছে যাইনি, বাইনোকুলারে দেখেছিলুম৷’’

‘‘তারপর?’’

‘‘তারপর আর কী? ওখানেই ওকে লুকিয়ে থাকতে হবে মনে হচ্ছে৷ কারণ রাস্তাঘাটে নামলেই ধরা পড়ার চান্স আছে৷’’

‘‘কেন? খবর দিলে দুখিয়ার এক্কাগাড়ি এসে যাবে, ওকে ঢনঢনিয়ার সেই কাঠগোলায় পৌঁছে দেবে৷’’

‘‘ভগুয়া ওর মাসতুতো ভাইকে কাল বাড়িতে নিশ্চয়ই খুব শাসিয়েছে৷ কাজেই রামহরি আপাতত মন্দিরবাসী৷ একটু আগে দেখলুম, গজু মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছে৷ থালায় পুজোর ফুলের খুব ঘটা৷ ফুলের তলায় ব্রেকফাস্ট না থেকে পারে না৷ ঘটিতে গঙ্গাজলের বদলে চা আছে, হলফ করে বলা যায়৷’’

কর্নেল দ্রুত ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে বাইরে গেলেন৷ সবুজ রঙের সূক্ষ্ম ছোট্ট জালটা উল্টে দিয়ে ফিরলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘চলো ডার্লিং! আমরা রাজাবাহাদুরের সঙ্গে আলাপ করে আসি৷’’

অবাক হবে বললুম, ‘‘ভবা-গজু সন্দেহ করবে যে৷’’

‘‘সন্দেহ করে তো করুক৷ তবে সন্দেহ করার কারণ তো নেই৷ এসো, বেরুনো যাক!’’

বাংলোর সিঁড়ি বেয়ে নেমে কাঠের সাঁকোতে পৌঁছতেই দেখি, সাধুর চেলাবেশী গজু হনহন করে আসছে রাস্তা দিয়ে৷ থালাটা বুকের কাছে, ঘটিটা সমেত ঠং ঠং করে বাজাতে বাজাতেই আসছিল সে৷ আমাদের দেখতে পেয়েই থালা আর ঘটিটা চিত করে রাখল৷ তখন দেখলুম গোটাকতক প্রসাদী ফুল রয়েছে৷ বুঝলুম, এটা অনভ্যাসের ত্রুটি৷ কিছু ফুল বেলপাতা নিশ্চয়ই গড়িয়ে পড়েছে রাস্তায়৷

আমরা চোখ ফিরিয়ে নিচের নদী দেখতে থাকলুম৷ গজু একটু তফাত গিয়ে বিড়বিড় করে ‘ব্যোম শংকর’ আওড়াতে আওড়াতে চলে গেল৷

একটু দেরি করে রাজবাড়িতে ভাঙাচোরা দেউড়িতে পৌঁছলুম আমরা৷ সত্যি একেবারে হানাবাড়ির অবস্থা৷ দেউড়ির ভেতর ঢুকে কাউকে দেখতে পেলুম না৷ প্রাঙ্গণে জঙ্গল গজিয়ে গেছে৷ দু’ধারে একতলা ঘরগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে৷ সামনের গাড়িবারান্দার আগাপাছতলা বুগানভিলিয়ায় ঢাকা৷ কোথাও কোনো লোকজন নেই৷

গাড়িবারান্দার ভেতরে সিঁড়ির মাথায় প্রকাণ্ড দরজা৷ সেটা বন্ধ আছে৷ সেখানে কপাটের ফাঁকে একটা মোটা দড়ি ঝুলছে৷ কর্নেল দড়িটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিলেন৷ ভেতরে ঘণ্টা বাজল ঢঙ ঢঙ করে৷ একটু পরে ক্যাঁ—অ্যাঁ—চ বিকট শব্দে খুলে একজন গাব্দামোটা ভদ্রলোক বেরুলেন৷

কর্নেল নমস্কার করে বললেন, ‘‘আমরা এসেছি কলকাতা থেকে৷ ওপাশের ডাকবাংলোয় উঠেছি৷ আমাদের বিশেষ ইচ্ছা, রাজাবাহাদুরের সঙ্গে একটু আলাপ করি৷’’

ভদ্রলোক বললেন, ‘‘বেশ তো! ভেতরে আসুন৷’’

ঘরটা একটা হলঘর৷ জীর্ণ আসবাবে সাজানো৷ দিনদুপুরে অন্ধকার ছমছম করছে৷ আমরা বসলে উনি জিগ্যেস করলেন, ‘‘আপনাদের নাম এবং পরিচয় জিগ্যেস করবেন রাজাবাহাদুর৷ কী বলব?’’

কর্নেল পকেট থেকে নিজের নাম ও পরিচয় লেখা কার্ডটা দিলেন৷ দেখাদেখি আমার কার্ডটাও দিলুম৷ ভত্রলোক আমার কার্ডটা বিশেষ দেখলেন না খুঁটিয়ে৷ কিন্তু কর্নেলের কার্ডটা দেখতে দেখতে ওঁর মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল৷ আস্তে বললেন, ‘‘প্রাইভেট ডিটেকটিভ আপনি? আশ্চর্য তো!’’

কর্নেল মৃদু হেসে বললেন, ‘‘আশ্চর্য কেন ভোম্বোলবাবু?’’

ভদ্রলোক আরও অবাক হয়ে বললেন, ‘‘আমাকে আপনি চেনেন?’’

‘‘চিনতুম না, এখন চিনলুম৷’’

‘‘কেমন করে?’’

‘‘খুব সহজে৷ রাজবাড়ি দেখাশোনার জন্য মাত্র একজন লোকই আছেন শুনেছি৷ তাঁর নাম ভোম্বোলবাবু৷’’

ভোম্বোলবাবু হাসলেন৷ ‘‘আপনি তাহলে সব জেনেশুনেই এসছেন৷

‘‘তা এসেছি বলতে পারেন৷’’

ভোম্বোলবাবু খুব খুশি হয়েছেন মনে হল৷ বললেন, ‘‘আমার আসল নাম অম্বিকাপ্রসাদ হাজরা৷ লোকে আমার ডাক নামটাই পছন্দ করে৷ যাই হোক, মেঘ না চাইতে জল হয়েছে৷ আমায় একটু আগে রাজাবাহাদুর বলছিলেন, কলকাতা গিয়ে কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভের সঙ্গে কথা বলতে৷ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে—’’

কর্নেল কথা কেড়ে বললেন, ‘‘নিখোঁজ কুমারবাহাদুরের আবির্ভাব ঘটেছে৷’’

‘‘কী আশ্চর্য! তাহলে তো আপনি সবই জানেন!’’

‘‘জানি৷ যাই হোক, আপনি রাজাবাহাদুরকে খবর দিন৷’’

রাজাবাহাদুরের আসতে দেরি হল না৷ লাঠিতে ভর দিয়ে ভোম্বোলবাবুর সাহায্যে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলেন, খুবই বুড়োমানুষ বলা চলে৷ পরনে সাদাসিদে পাজামা-পাঞ্জাবি৷ নমস্কার করে বললেন, ‘‘কী যে আনন্দ হচ্ছে, বলার নয়৷ ওপরেই ডেকে পাঠাতুম কিন্তু আমার ঘরে ইলেকট্রিক ওয়্যারিং হচ্ছে নতুন করে৷’’

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, ‘‘কুমারবাহাদুর ফিরে এসে ওইসবে মন দিয়েছেন বুঝি?’’

রাজাবাহাদুরও হাসলেন৷ ‘‘হ্যাঁ—ঠিকই ধরেছেন৷’’

‘‘আশা করি, আপনার ঘরে কোনো বিশ্বস্ত লোককে রেখে এসেছেন?’’

‘‘তা আর বলতে? আমার পুরোনো চাকর আছে৷ মহাধূর্ত সে!’’ রাজাবাহাদুর খি খি করে হাসলেন৷ তারপর কর্নেলের কার্ডটায় চোখ বুঝিয়ে ফের বললেন, ‘‘আমার বরাত, বুঝলেন তো? মঙ্গলময়ের কৃপা৷ তাই ঠিক সময়ে আপনাকে পাঠিয়েছেন৷ ময়ূরভঞ্জের রাজপরিবারের সঙ্গে আমাদের আত্মীয় সম্পর্ক৷ বছর সাতেক আগে ওখানে আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল৷ আপনি ভুলে গেছেন৷ আমার মনে আছে৷’’

‘‘আমি ভুলিনি রাজাবাহাদুর৷ তবে একটু দেরিতে মনে পড়েছে, এই যা!’’

রাজাবাহাদুর অভিমান দেখিয়ে বললেন, ‘‘ভোলেননি, তাই আমার বাড়ি না এসে ডাকবাংলোয় উঠেছেন! গরিব হয়ে গেছি অবশ্য৷ কিন্তু মানী লোকদের মান রাখার ক্ষমতাটুকু তো আছে৷’’

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন ‘‘ওখানে থাকায় আমার সুবিধে আছে৷ যাই হোক, ভোম্বলবাবুর কাছে শুনলুম; আপনি নাকি ওঁকে কলকাতা পাঠাতে চাইছিলেন কোনো প্রাইভেট ডিটেকটিভের কাছে?’’

রাজাবাহাদুর ভোম্বলবাবুকে আমাদের আপ্যায়নের জন্য ইশারা করলেন৷ ভোম্বলবাবু দ্রুত চলে গেলেন৷ তারপর রাজাবাহাদুর চাপা গলায় বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ আপনারই কাছে পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল আসলে৷ ঠিকানাটা তো জানা নেই, সে-জন্য কথাটা তুলেই চেপে গিয়েছিলুম৷ হঠাৎ ভোম্বল আপনার কার্ডটা নিয়ে গেল, অমনি মনে হল স্বপ্ন দেখছি নাকি? এ যে দেখছি ইচ্ছে-বর হয়ে গেল! ইচ্ছে করার সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তি!’’

রাজাবাহাদুর আবার খি খি করে হাসলেন৷ হরিশ সাঁতরা এঁকে তেজি লোক বলেছিলেন৷ আমার মোটেও তেমন মনে হল না৷ বৃদ্ধরা অনেকে শিশু হয়ে যান৷ ইনিও তাই যেন৷

কর্নেল বললেন ‘‘কুমার বাহাদুরকে কেন সন্দেহ হচ্ছে আপনার?’’

রাজাবাহাদুর এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন ‘‘ওর হাতের একটা কড়ে আঙুল বেজায় ছোটো ছিল৷ এই হলো একনম্বর৷ দু-নম্বর ওর গলা৷ বাঘের থাবায় খুব জখম হয়েছিল স্বীকার করছি৷ কিন্তু গলায় স্বর বদলাবে অতটা৷ তিন-নম্বর ওর হাঁটার ভঙ্গি৷ যেন নড়চড় করে হাঁটছে—কাঠির মতো ঠ্যাং৷ অজুর পায়ের গড়ন ছিল মজবুত৷ বাঘে কি ঠ্যাঙের মাংসও কামড়ে খেয়েছিল? হ্যাঁ উরুতে চিহ্ন আছে খানিকটা৷ বাঘের খাবার দাগ হতেও পারে৷ কিন্তু হাঁটুর নিচেটা তারপর পায়ের পাতা—’’

রাজাবাহাদুর কর্নেলের কাছে মুখ নিয়ে গেলেন এবার৷ ‘‘কাল রাত্তিরে খেতে বসে হঠাৎ হাতির মাথার কথা তুলল৷ তখন সন্দেহটা বেড়ে গেল৷’’

‘‘কেন?’’

রাজাবাহাদুর চাপা গলায় বললেন ‘‘দেয়ালের কান আছে৷ বরং সব কথা লিখে আপনার হাতে-হাতে দিচ্ছি৷ কাগজ-কলম আনতে বলি ভোম্বলকে৷’’

একটু পরে চা-সন্দেশ এসে গেল৷ ভোম্বলবাবু নিজেই বয়ে আনলেন দেখে বুঝলুম, সেই মধু ছাড়া আর এসব কাজের লোক নেই রাজবাড়িতে৷

রাজবাহাদুরের হুকুমে ভোম্বলবাবু কাগজ কলম এনে দিলেন৷ আমার চা খেতে খেতে লেখা হয়ে গেল৷ কাগজটা কর্নেলের হাতে নিঃশব্দে গুঁজে দিলেন রাজাবাহাদুর৷

ভোম্বলবাবু বললেন, ‘‘আমি ওপরে যাই রাজাবাহাদুর৷ আপনি কথা বলুন৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ গিয়ে নজর রাখো৷ সময়মতো ডাকব তোমাকে৷’’

ভোম্বলবাবু যাওয়ার পর কর্নেল বললেন ‘‘সাধুবাবারা কোথায় আছেন?’’

রাজাবাহাদুর বললেন, ‘‘পেছনদিকের ঠাকুরবাড়িতে৷ চলে যাব-যাব করছেন ওঁরা অথচ যাচ্ছেন না৷ ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে এখানেই পাকাপাকি ডেরা পেতেছেন৷ কিন্তু বলা তো যায় না আপনারা এবার কেটে পড়ুন! যদি সত্যিসত্যি ও অজুই হয়—আমার ভুল হতেও তো পারে, সাধুবাবাদের প্রতি সেটা অকৃতজ্ঞতা হবে কি না বলুন?’’

‘‘তার মানে আপনি এখনও নিঃসংশয় হতে পারেননি?’’

‘‘ঠিক ধরেছেন৷ ও প্রকৃত অজু কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হবার জন্যই আপনার কথা ভেবেছিলুম৷ আপনাকে পেয়েছি৷ এবার আপনি আমাকে নিশ্চিত করুন, ও সত্যি অজু নাকি জাল? জাল হলে কী করব জানেন?’’ রাজাবাহাদুর বাঁকা মুখে বললেন, ‘‘ওর কপালের আবটা উপড়ে নেব আগে৷ আর ওই সাধু দুটোর মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে গাধায় চড়িয়ে ধূমগড়ে চক্কর দেওয়াব৷ গাধার অভাব নেই৷ রামু ধোপাকে বললেই পেয়ে যাব৷’’

কর্নেল হাসলেন: ‘‘ধূমগড়ে ধুন্ধুমার ঘটিয়ে ছাড়বেন বলছেন?’’

‘‘ধুন্ধুমার? হুঁউ ধুন্ধুমার! ঘটাব তাহলে৷’’

‘‘আচ্ছা রাজাবাহাদুর, ওঁর মুখের গড়ন অবিকল কুমার বাহাদুরের মতো?’’

‘‘হ্যাঁ৷ সেটাই তো হয়েছে সমস্যা৷ ওর হাসি, চাউনি, নাক-মুখ, চোখ, কপালের আব—সবেতেই ও অজু৷ নাকটা বাঘের থাবায় দুমড়েছে সামান্য৷ তাহলেও চেনা যায়৷ ওটা অজুরই নাক৷’’

‘‘স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে শুনলুম?’’

‘‘আপনি গোয়েন্দাদের রাজা৷ আপনার সবই জানা থাকবে, তাতে অবাক হচ্ছিনা৷’’ বলে রাজাবাহাদুর এবার শান্ত হয়ে মিটিমিটি হাসলেন: ‘‘আপনি হঠাৎ এসে পড়েননি, তাও বুঝতে পেরেছি৷ কিছু গন্ধ শুঁকেই এসেছেন কিন্তু গন্ধটা কিসের জানতে ইচ্ছে করছে যে!’’

‘‘আপনার মতো আমিও গণ্ডগোলে পড়ে এখানে ছুটে এসেছি কুমারবাহাদুরের পেছন-পেছন৷’’

‘‘বলেন কী? তাহলে ওরা কলকাতা থেকে এসেছে?’’

‘‘হ্যাঁ৷ তা না হলে আমার চোখে পড়বে কীভাবে?’’

‘‘কর্নেল, খুলে বলুন প্লিজ!’’ রাজাবাহাদুর শিশুর ভঙ্গিতে বললেন৷

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ‘‘একটু ধৈর্য ধরুন রাজাবাহাদুর৷ সব বলব আপনাকে৷ আমরা আপাতত উঠি৷’’

রাজাবাহাদুর একটু নিরাশ হয়ে বললেন, ‘‘আচ্ছা৷’’

রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে কর্নেলকে বললুম ‘‘সবই তো তো আমাদের জানা৷ রাজাবাহাদুরকে সবটা খুলে বলে বদমাসদের ধরিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত৷’’

কর্নেল বললেন, ‘ডার্লিং৷ ভুলে যেও না, হরিশবাবু সম্পূর্ণ নির্দোষ৷ ব্যাপারটা ফাঁস করে দিলে হরিশবাবুকে যদুগোপাল লেনের ইলেকট্রিশিয়ান প্রমাণ করাই যাবে না৷ বাঁচানোও যাবে না আইনের হাত থেকে৷ আগে হরিশবাবুকে নিরাপদ করা দরকার৷ সে-জন্যই হরিশবাবুর এখন রাজবাড়িতে থাকা দরকার৷’’

বুঝতে পেরে বললুম, ‘‘ঠিক ঠিক৷ হরিশবাবুকে দিয়ে ওদের ফাঁদে ফেলতে হবে৷’’

ছয়

কাঠের সাঁকোর কাছে এসে কর্নেল হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর কান পেতে কী শুনতে, ঝটপট বাইনোকুলার তুলে চোখে রাখলেন৷ বিড়বিড় করে দুর্বোধ্য কিছু আওড়ালেনও৷ জিগ্যেস করলুম, ‘‘কী ব্যাপার?’’

কিন্তু জবাব না দিয়ে বাইনোকুলারে চোখ রেখে নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো রাস্তায় হনহনিয়ে চলতে থাকলেন৷ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম৷ নিশ্চয়ই কোনো বিরল প্রজাতির পাখি দেখেছেন৷ একটু পরেই রাস্তার ধারের ঝোপঝাড় ভেঙে ওঁকে এগিয়ে যেতে দেখলুম৷ তারপর শুধু টুপিটা দেখা গেল৷

তারপর বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷

এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না৷ আস্তেসুস্থে পা ফেলে বাংলোয় ফিরে এলুম৷ রাজাবাহাদুরের দেওয়া কাগজটাতে ‘হাতির মাথা’ অথবা সেই বিস্ময়কর ধাতুর খবর আছে৷ সেটা জানবার জন্য মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল৷ কিন্তু আপাতত আর জানা যাচ্ছে না—অন্তত যতক্ষণ না ওই খেয়ালী বৃদ্ধ ফিরে আসছেন৷

বারোটা অব্দি ছটফটানি চলল আমার৷ তবু ওঁর ফেরার নাম নেই৷ তখন একটু উদ্বেগ জেগে উঠল৷ ওঁর কাছে মূল্যবান একটা তথ্য আছে৷ যে দিকে ওঁকে যেতে দেখেছি, সেদিকেই টিলার মাথায় শিবমন্দিরে রামহরি নাকি লুকিয়ে আছে৷ কোনো বিপদে পড়েননি তো কর্নেল?

অমন করে প্রজাপতির পেছনে সারাদিন উনি টো-টো ঘুরে বেড়ান, এটা নতুন কোনো ব্যাপার নয়৷ কিন্তু রাজাবাহাদুরের লেখা কাগজটা ওঁর পকেটে৷ রাজাবাহাদুর যখন হলঘরে বসে আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন ভবা বা গজু আড়াল থেকে যদি কান পেতে থাকে, তাহলে তো বিলক্ষণ টের পেয়েছে সব৷

এসব কথা যত ভাবলুম, তত উদ্বেগ বাড়তে লাগল৷ বেলা একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর আর চুপচাপ বসে থাকতে পারলুম না৷ বেরিয়ে পড়লুম বাংলো থেকে৷

কর্নেলকে যে-দিকে যেতে দেখেছি, সেইদিকে ঝোপঝাড় ভেঙে এগিয়ে চললুম৷ যা ভেবেছিলাম তাই বটে৷ মন্দিরের টিলার দিকেই গেছেন কর্নেল৷ তার প্রমাণ ঝোপে আটকে থাকা ওঁর ধূসররঙের টুপিটা৷

টুপিটা কখন মাথা থেকে পড়ে গেছে, খেয়ালই করেননি৷ এভাবে কতবার কত জায়গায় ওঁর টুপি পড়ে যাওয়ার ব্যাপার আমি জানি—দেখেছি৷ কাছে থাকলে আমিই কুড়িয়ে দিয়েছি৷ কিংবা চেঁচিয়ে বলেছি ‘‘টুপি! টুপি!’’ তখন কর্নেলের খেয়াল হয়েছে৷ অনেক সময় নিজেই হারানো টুপি খুঁজতে বেরিয়ে গেছেন৷ টুপিটা তুলে নিয়ে এগিয়ে চললুম৷ টিলার এদিকটায় বড়ো বড়ো পাথর আর তার ফাঁকে জঙ্গল গজিয়ে রয়েছে৷ এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে কোথাও পাত্তা পেলুম না৷ তখন টিলায় উঠতে শুরু করলুম৷ দরদর করে ঘাম ঝরছিল৷ রোদ্দুরটা বড্ড কড়া৷ তার ওপর টিলার এদিকটা খাড়া৷ পাথরের চাঙড়গুলো ধাপের মতো উঠে গেছে৷ একটু পা স্লিপ করলেই নিচে পড়ে ছাতু হবার ভয় আছে৷

মন্দিরের কাছাকাছি পর্যন্ত উঠে নিচের দিকে রাজবাড়ি আর ওপাশে ঢেউ খেলানো ন্যাড়া মাঠ চোখে পড়ল৷ ঘুরে অন্যদিকটা দেখতে গিয়েই চমকে উঠলুম৷ মন্দিরের ওপর প্রকাণ্ড বটগাছটা রাতে দেখে গেছি৷

বটগাছটায় অসংখ্য ঝুরি নেমেছে৷ তার ফাঁক দিয়ে কাদের দেখা যাচ্ছে৷ একটা পাথরের আড়ালে বসে পড়লুম সঙ্গে সঙ্গে৷

মন্দিরের চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে সন্ন্যাসীবেশী ভবা আর গজু, আর বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে রয়েছে সেই রামহরি৷ তিনজনেরই মুখ বেজায় গম্ভীর৷

রামহরি ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘‘আমি বলি কী, যা হবার হয়েছে৷ খামোকা খুনোখুনি করে আর লাভ নেই৷ বুড়োকে ছেড়ে দাও ভবতারণ৷’’

ভবা বা ভবতারণ দাঁতমুখ খিচিয়ে বলল, ‘‘ছেড়ে দেব, আর আমাদের ও ছেড়ে কথা কইবে? এ ঘুঘুর ঘুঘু মহাঘুঘুকে তুমি চেনো না, তাই বলছ৷’’

গজু বলল, ‘‘দেড় লাখের ওপর খরচ হয়েছে৷ খামোকা গচ্চা৷ অন্তত বুড়োকে নরবলি দিলে আর কিছু না হোক, গায়ের ঝালটা তো মিটবে৷’’

রামহরি বলল, ‘‘আহা, তুমি বুঝতে পারছ না গজানন! বুড়োর দোষটা কী? বরং বুড়োর কাছে কাগজটা পাওয়া গেল বলেই তো জানা গেল হাতির মাথাটা—’’

ভবতারণ খেঁকিয়ে উঠল, ‘‘নরবলি দিতে হলে তোমাকেও দেওয়া উচিত৷ তুমিই খামোকা একগাদা খচ্চা করালে!’’

রামহরি বলল, ‘‘আমি কি মিথ্যা বলেছিলুম? ছিল না হাতির মাথা?’’

গজানন বলল, ‘‘আর দেরি করে লাভ নেই৷ ভবা, ঝটপট কাজ শেষ করো, ট্রেন ধরতে হবে৷’’

ভবতারণ বাঁকা মুখ করে বলল, ‘‘দেড়লাখ টাকা উসুল করতে হলে আবার কোনো ব্যাংকে গিয়ে ডাকাতি করতে হবে৷ কাজটা আর আমার আদপে ভাল্লাগে না৷ তা ছাড়া আজকাল ব্যাংক ডাকাতি করাটা খুব রিস্কি হয়ে গেছে৷ পাবলিকও খেপে গেছে, বুঝলে না?’’

রামহরি বলল, ‘‘ধূমগড়ে তত পাবলিকের ভয়টা নেই৷ সে-জন্যেই তো বলছিলুম, তোমাদের টাকাটাও উসুল হবে, আমারও কিছু হাতে আসবে—দুটো দিন থেকে. খোঁজখবর নিয়ে এখানকার ব্যাংকেই চড়াও হওয়া যাক৷ কী বলো গজানন?’’

গজানন নকল দাড়ি চুলকে ফিক করে হাসল৷ ‘‘আমার আপত্তি নেই৷ এ কাজটা আমি ভালোই পারি৷ ভবা, রামহরিদা ঠিকই বলেছে.৷’’

ভবতারণ তুঙ্গো মুখে বলল, ‘‘রাজবাড়ির খাবার যে আর পেটে সইছে না৷ রাজবাড়ি না কচু! কী খায় মাইরি!’’

রামহরি ব্যাখ্যা করে হাসল৷ ‘‘জেলের চেয়ে অনেক ভালো৷ জেলে দিনকতক আমি খেয়েছি, তোমরা হলে বমি করে ফেলতে৷’’

গজানন দাঁত বের করে বলল, ‘‘আমরা বুঝি খাইনি? তুমি তো দিনকতক৷ আমি খেয়েছি তিনবছর৷ আর ভবা? ভবা তো বলতে গেলে জেলের ভাত খেয়েই মানুষ৷’’

ভবতারণ ধমকাল৷ ‘‘হাসি-টাসি এখন ভাল্লাগে না৷ ভাবতে দাও৷’’

সে ধুপ করে চত্বরে বসে পড়ল৷ তারপর ট্যাঁক থেকে সিগারেট নিল৷ রামহরিও নেমে এল বারান্দা থেকে৷ খোলা বারান্দাটুকুতে রোদ্দুরে এসে গেছে এখন৷ তিনজনে চুপচাপ বসে সিগরেট টানতে লাগল৷

ততক্ষণে আমার গলা শুকিয়ে গেছে৷ রাগেও থরথর করে কাঁপছি৷ কর্নেলকে এরা কোথাও বন্দি করে রেখেছে৷ ঠিক—যা ভেবেছিলুম, তাই ঘটে গেছে কর্নেলের বরাতে৷ রাজবাড়িতে ওত পেতে ওরা সব কথা শুনেছে৷ তারপর আমাদের দিকে লক্ষ্য রেখেছে এবং কর্নেল একটা পাখি দেখতে এই এই টিলার দিকে আসার পর ওরা পেছন থেকে ওঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে৷ আর পকেট থেকে সেই কাগজটা বের করে নিয়ে পড়ার পর ওরা জেনেছে, ‘হাতির মাথা’ আর পাওয়ার কোনো আশা নেই৷

আমার এখন খুব ধৈর্য আর সাহস দরকার৷ গুলিভরা রিভলবারটা বের করে তৈরি হয়ে আছি৷ কোথায় কর্নেলকে বন্দি করে রেখেছে, সেটাই চোখে পড়ছে না৷ পড়লে এতক্ষণ ঝাঁপিয়ে পড়তুম৷

কিন্তু কাছাকাছি কোথাও রেখেছে, সেটাও ঠিক৷ বলি দিতে চাইছে যখন, তখন বোঝা যাচ্ছে বন্দিকে ওরা হাতের নাগালেই রেখেছে৷

সিগারেট টানতে টানতে হঠাৎ গজানন পেছন ফিরে তাকাল৷ তারপর ‘সর্বনাশ!’ বলে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ ভবতারণ ও রামহরিও ঘুরে তাকাল এবং তারাও ‘আরে!’ বলে উঠে দাঁড়াল৷

ওদের পেছনেই একটা ঝুরি৷ ঝুরিটার দিকে এতক্ষণে চোখ গেল আমার৷ ঝুরিটার গোড়ায় একগুচ্ছের কাটা ছেঁড়া মোটা-মোটা লতা রয়েছে৷ পড়ে আছে একটা গেরুয়া কাপড়ও৷

ভবতারণ প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘গজু!’’

গজানন ভড়কে গিয়ে বলল, ‘‘আমি তো নজর রেখেছিলুম, বুড়ো মাইরি যাদুমন্ত্র জানে৷’’

রামহরি ভয় পাওয়া গলায় বলল, ‘‘তাহলে কী হবে? বুড়ো টিকটিকিটা গিয়ে যদি থানায় সব জানিয়ে দেয়!’’

ভবতারণ দাঁত খিচিয়ে বলল, ‘‘তুমিই তো সাধুগিরি ফলিয়ে ছেড়ে দিতে বলছিলে!’’

রামহরি বলল, ‘‘মন থেকে কি বলছিলুম? এখন যত দোষ নন্দ ঘোষ৷ বাঁধলে যখন তখন শক্ত করে বাঁধলে না কেন?’’

গজানন বলল, ‘‘বেঁধেছিলুম তো! তা ছাড়া মাথায় পাথরের ঘা মেরে অজ্ঞান করে দিয়েছিলুম না? জ্ঞান ফিরে পেয়েই পালিয়েছে! কিন্তু বাঁধন কাটল কিসে?’’ বলে সে ছেঁড়া লতাগুলো কুড়িয়ে পরখ করল৷ তারপর গেরুয়া কাপড়টা তুলে নিয়ে ফের বলল, ‘‘লুকানো ছুরি টুরি নিশ্চয়ই ছিল৷ বডি সার্চ করে পাইনি কিন্তু৷ ইশ! এ যে দেখছি সত্যি মহাঘুঘু!’’

ভবতারণ ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘‘সব বরবাদ হয়ে গেল৷ কিন্তু আর এখানে একসেকেন্ড থাকা ঠিক নয়৷ এক কাজ করা যাক! রামহরি চলো, আমরা ঢনঢনিয়ায় তোমার বন্ধুর কাঠ-গোলায় চলে যাই৷’’

রামহরি বলল, ‘‘মাথা খারাপ? দিনদুপুরে আমি যাব কেমন করে? দুখিয়াকে খবর দাও৷ এক্কাগাড়িটা আনুক৷’’

গজানন আঁতকে উঠল৷ ‘‘বাঃ! বেশ বলেছ৷ আমি গিয়ে পুলিশের পাল্লায় পড়ি আর কী!’’

ভবতারণ বলল, ‘‘এক কাজ করা যাক৷ সাধুর পোশাকটা তোমাকে দিই রামহরি! আমরা দু’জনে আমাদের আসল পোষাক পরে নিই৷ গজু ব্যাগ খুলে প্যান্টশার্ট বের করো ঝটপট!

ভবা-গজু জটাজুট খুলে ফেলল৷ গেরুয়া কাপড় খুলে প্যান্টশার্ট পরে ভদ্রলোক সাজল৷ তারপর রামহরিকে সাধুবাবা সাজিয়ে দিল৷ ভবা বলল, ‘‘নাও একবার বুলি প্যাকটিশ করে নাও৷ ব্যোম ভোলা! হর হর মহাদেও, ভোলে বাবা কী জয়!’’

রামহরি মিনমিনে গলায় বুলিটা আওড়াল৷ তখন ভবা ধমক দিয়ে বলল, ‘‘আরও জোরে! আরও জোরে!’’

রামহরি যথাসাধ্য জোর দিয়ে চেরা গলায় চেঁচাল, ‘‘ব্যোম ভোলা শঙ্কর! হর হর মহাদেব! ভোলে বাবা কী জয়!’’

তারপর তিনজনে হন্তদন্ত ওপাশের সেই সরু রাস্তাটা ধরে টিলা বেয়ে নামতে থাকল৷ হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালুম৷ কতক্ষণ দম বন্ধ করা উত্তেজনার পর এই হাসির সুযোগ না পেলে হার্টফেল করে নির্ঘাৎ মারা পড়তুম৷

মন্দিরের চত্বরে গিয়ে আবার হো হো করে হেসে ফেললুম৷

অমনি মন্দিরের আড়াল থেকে কেউ বলে উঠল, ‘‘যত হাসি কান্না, বলে গেছেন রামশন্না! ডার্লিং! গুলিভরা রিভলবার হাতে নিয়ে অমন করে হাসা বিপজ্জনক!’’

গোয়েন্দা প্রবরকে দেখে অবশ্য অবাক হলুম না৷ অবাক হলুম, ওঁর প্রকাণ্ড টাকটি রক্তাক্ত নয় দেখে৷ টাকে পাথরের ঘা মারলে ক্ষত হওয়া স্বাভাবিক৷ ওঁর ওই প্রশস্ত টাকটি কি পাথর?

কাছে এসে বললেন, ‘‘হাসি অবশ্য আমারও পাচ্ছিল৷ তোমার হাতে রিভলবার যেভাবে কাঁপছিল, মনে হচ্ছিল এক্ষুনি হাত থেকে পড়ে যাবে! যাই হোক, তুমি যে প্রচণ্ড ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছ, এতে আমি খুশি হয়েছি ডার্লিং!’’

একটু রাগ দেখিয়ে বললুম, ‘‘আপনার সাবধান হওয়া উচিত ছিল! কী রকম সাংঘাতিক একটা ফাঁড়া গেল আপনার, ভাবুন তো একবার!’’

কর্নেল হেঁট হয়ে এক টুকরো দলা-পাকানো কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে বললেন, ‘‘ওরা রাজাবাহাদুরের কাগজটা রাগ করে ফেলে গেছে, দেখছি৷ যাকগে চলো৷ বাংলোয় ফেরা যাক৷’’

রাস্তায় নেমে কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বললেন ‘‘তিনজনে হনহন করে ঢনঢনিয়ার দিকে চলেছে৷ কাঠগোলায় গিয়ে লুকিয়ে থাকবে৷’’

‘‘ওরা গোল্লায় যাক! আপনি এত অসাবধান, ভাবতেও পারিনি!’’

কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘‘লালঘুঘু আজকাল বিরল হয়ে এসেছে৷ হঠাৎ ডাক শুনেই আমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ডার্লিং!’’

হাঁটতে হাঁটতে বললুম, ‘‘আপনার জ্ঞান না ফিরলে ওরা এতক্ষণ মুণ্ডুটি কেটে ফেলত জানেন?’

কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘বিলক্ষণ জানি৷ তবে অজ্ঞান আমি মোটেও হইনি৷ ভান করে পড়ে গিয়েছিলুম৷ দু’জনে মিলে আমাকে টিলার মাথায় তুলে নিয়ে যেতে অন্তত দুটো ঘণ্টা সময় লেগেছিল৷ শেষে রামহরিকেও ডেকে আনতে হল৷ আমি ওদের দৌড়টা দেখছিলুম৷’’

‘‘হাতির মাথাটা কী করেছেন রাজাবাহাদুর?’’

‘‘মাসখানেক আগে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান মন্ত্রকে খবর পাঠিয়েছিলেন৷ তাঁরা এসে নিয়ে গেছেন৷ কাজেই ভবা-গজু-রামহরির কপাল চাপড়ানো ছাড়া উপায় নেই৷’’

বাংলোয় ফিরে দেখি, হরিশবাবু এসে অপেক্ষা করেছেন৷ ভগুয়া ‘কুমারবাহাদুরকে’ দেখে তটস্থ৷ বেলা দুটো বাজে প্রায়৷ হরিশবাবু কিছু বলার চেষ্টা করতেই কর্নেল সহাস্যে বললেন, ‘‘একটু ধৈর্য ধরুন, প্লিজ৷ ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে৷ খাবার আগে আর কোনো কথা নয়৷’’

হরিশবাবু মনমরা হয়ে বসে রইলেন৷ জিগ্যেস করলুম, ‘‘আপনার খাওয়া হয়েছে তো?’’ জবাবে উনি শুধু মাথাটা দোলালেন৷

স্নান-খাওয়ার পর কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘‘রাজাবাহাদুরের ঘরের ইলেকট্রিক ওয়্যারিংয়ের কাজ কি শেষ হয়েছে হরিশবাবু?’’

হরিশবাবু একটু হাসলেন৷ ‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু এদিকে এক কাণ্ড৷ ভবা-গজু...’’

‘‘রাজবাড়ি থেকে চলে গেছে তো?’’ কর্নেল চোখ বুজে ধোঁয়া উড়িয়ে দিলেন ফুঁ দিয়ে৷ ‘‘আজ রাত্তিরেই ঢনঢনিয়া কাঠগোলায় পুলিশ ওদের পাকড়াও করবে৷ আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন৷’’

‘‘কিন্তু আমার কী হবে?’’

‘‘আবার হরিশবাবু হতে চান—এই তো?’’

‘‘চাইব না? আপনি হলে কী করতেন?’’

হরিশবাবুর কাঁদো-কাঁদো মুখ দেখে মায়া হচ্ছিল৷ সত্যি তো! অন্যের চেহারা নিয়ে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয়? বললুম, ‘‘আচ্ছা কর্নেল, যে ডাক্তারকে দিয়ে ওরা প্লাস্টিক সার্জারি করিয়েছিল, তাঁকে খুঁজে বের করে—’’

হরিশবাবু আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘খুঁজে বের করতে হবে না৷ আমি ওঁর নাম-ঠিকানা পেয়ে গেছি৷’’

কর্নেল সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘‘পেয়ে গেছেন? কীভাবে পেলেন!

হরিশবাবু পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিয়ে বললেন, ‘‘যে ডাক্তার পয়সার লোভে আমার এমন সর্বনাশ করেছে, তাকে খুঁজে বের করার কথা কি ভাবিনি? তাই রাজবাড়ির ঠাকুরবাড়িতে ভোরবেলা গিয়ে ওত পেতে ছিলুম৷ গজু ঘটিহাতে খিড়কি দিয়ে বেরুল, তারপর বেরুল ভবা৷ অমনি ওদের আস্তানায় গিয়ে ঢুকলুম৷ সাধুর ঝোলার ভেতর দেখি দিব্যি একটা ছোট্ট কিটব্যাগ রয়েছে৷ তার ভেতর খুঁজে পেলুম একটা নোটবই৷ নোট বইয়ের ভেতর এই মেমোটা ছিল৷ পড়ে দেখুন৷’’

কর্নেল পড়ে দেখছিলেন৷ বললেন, ‘‘হুঁ একগাদা ওষুধের প্রেসক্রিপশান৷’’ অরপর উঠে গিয়ে আতসকাচটা নিয়ে এলেন ব্যাগ থেকে৷ ‘‘রবারস্ট্যাম্পটা বড্ড অস্পষ্ট৷’’ বলে আতসকাচ দিয়ে দেখতে দেখতে নড়ে উঠলেন কর্নেল৷’’ আরে! এ তো দেখছি সেই পাগলা ডাক্তার অমরেশ রায়৷ মেডিকেল বোর্ড ওঁর পাগলামি দেখে লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছিলেন৷ অথচ রীতিমতো প্রতিভাধর চিকিৎসা-বিজ্ঞানী ছিলেন ভদ্রলোক৷ সম্ভবত গোপনে উনি আবার কাজে নেমেছেন৷ তোমার মনে পড়তে পারে জয়ন্ত৷ বছর তিনেক আগে ওঁর উদ্ভুট্টে ক্রিয়াকলাপ নিয়ে খুব হইচই উঠেছিল৷ মানুষের ধড়ে বাঁদরের মুণ্ডু জোড়া দেবার চেষ্টা, কুকুরের ঠ্যাঙে বেড়ালের ঠ্যাঙ বসানো—এইসব অদ্ভুত-অদ্ভূত কাণ্ড করতেন৷ সফল হননি বিশেষ৷ তারপর ভদ্রমহিলার নাকে প্ল্যাস্টিক সার্জারি করতে গিয়ে তাঁকে মেরেই ফেলে ছিলেন৷ আদালতে ওঁকে পাগল সাব্যস্ত করে পাগলা-গারদে পাঠিয়েছিল৷ যাই হোক, উনি পাগল-গারদ থেকে ছাড়া পেয়ে তাহলে আবার এক্সপেরিমেন্ট শুরু করেছেন৷

হাসতে হাসতে বললুম, ‘‘তাহলে আর আপনার চিন্তার কারণ নেই, হরিশবাবু!’’

হরিশবাবু বললেন ‘‘নেই—আবার আছেও!’’

‘‘কেন?’’

‘‘অত টাকা কোথায় পাব?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ভাববেন না হরিশবাবু৷ সব ঠিক হয়ে যাবে৷ আপাতত কলকাতা গিয়ে আপনাকে আপনার আগের চেহারার ফোটো জোগাড় করতে হবে৷ আছে তো? না থাকলেই কেলেঙ্কারি৷’’

হরিশবাবু বললেন, ‘‘আলবাৎ আছে৷ কিন্তু আমার বাসায় ঢুকতে পারলে তবে তো পাব?’’

‘‘ঢুকিয়ে দেব আপনাকে৷’’ কর্নেল আশ্বস্ত করলেন হরিশবাবুকে৷

* * *

সেদিন রাতেই ঢনঢনিয়া কাঠগোলায় তিন বদমাশ ধরা পড়েছিল৷ ভোরের ট্রেনে আমরা হরিশবাবুকে নিয়ে কলকাতা ফিরেছিলুম৷ পাগলা চিকিৎসা-বিজ্ঞানী অমরেশ রায় খুব ভড়কে গিয়েছিলেন কর্নেলের শাসানিতে৷ শেষে বলেছিলেন, ‘‘কথা দিচ্ছি, আর কখনো উদোকে বুধো বানাব না৷ আর আর এই ভদ্রলোকের আগের চেহারা ফিরিয়ে দেবার কথা বলছেন তো? দিচ্ছি৷ ওঁর ঊরু থেকে মাংস কেটে মুখের যেখানে-যেখানে জোড়াতাড়া দিয়েছি, অপারেশন করে বাদ দিলেই আগের চেহারা বেরিয়ে আসবে৷ এ একটা কাজ নাকি?’’

এর দিন সাতেক পরে কর্নেলের ড্রয়িংরুমে আড্ডা দিচ্ছি, শুঁটকো চেহারার ভদ্রলোক এসে ফিক করে হেসে বললেন, ‘‘আমি কে বলুন তো?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আশা করি, এবার আপনার মধ্যে আপনি ফিরে এসেছেন!’’

এতক্ষণে টের পেলুম, ইনিই হরিশ সাঁতরা ইলেকট্রিশিয়ান, কপালে আবের জায়গায় কালচে ছোপ৷ বাড়তি মাংস চেঁছে তুলে ফেলেছেন অমরেশ ডাক্তার৷ কুমারবাহাদুরকে হটিয়ে বেরিয়ে এসেছেন আদত হরিশবাবু৷ টিকোলো নাক, বসা চোয়াল৷ কর্মী মানুষের চেহারা৷

কিন্তু অভ্যাস যাবে কোথায়? মুখ তুলে কর্নেলের ঘরের বিদ্যুতের তারগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন৷ ‘‘ছ্যা ছ্যা! কোন মান্ধাতার আমলের ওয়্যারিং স্যার? নিশ্চয় গাদা-গাদা বিল ওঠে৷ কারেন্ট লিক করে—বুঝলেন না? ধূমগড়ের রাজাবাদুরের ঘরে ঢুকেই দেখেছিলুম, একই অবস্থা! যা করে দিয়ে এসেছি, বিশবচ্ছর নিশ্চিন্ত৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘রাজাবাহাদুর আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছেন হরিশবাবু! কাল ওঁর চিঠি পেলুম৷ লিখেছেন, ওকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করে৷ ভাই না হোক, ভাইয়ের মতো অবিকল ওর মুখখানা৷’’

বললুম, ‘‘আর তো সে মুখখানা নেই৷ এখন গেলে কি খুশি হবেন রাজাবাহাদুর?’’

হরিশবাবু বললেন, ‘‘উনি বড়ো ভালোমানুষ৷ যাব বইকী৷ এবার গিয়ে ওঁর বাকি ঘরগুলো রিওয়্যারিং করে দিয়ে আসব৷ কর্নেল স্যার, আমার এই ব্যাগটা রইল৷ এক্ষুনি আসছি৷’’

বুঝলুম, কর্নেলের ড্রইংরুমের জন্য নতুন তার আনতে গেলেন ইলেকট্রিশিয়ান হরিশ সাঁতরা৷ ভাবতে অবাক লাগে, সেদিন ইনিই ‘কুমারবাহাদুর’ হয়ে ধূমগড়ে একেবারে ধুন্ধুমার বাধিয়েছিলেন!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%