সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
আচমকা অদ্ভুত শব্দ করতে-করতে আমাদের গাড়িটা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল৷ গেল তো গেলই৷ অনেক চেষ্টা করেও তার গোঁ ছাড়াতে পারলুম না৷ ঘড়ি দেখলুম৷ পাঁচটা কুড়ি৷ গ্রীষ্মের বিকেল৷ এক পাশে ধু-ধু ফাঁকা মাঠ, অন্য পাশে ছোটো-বড়ো গাছের জঙ্গল৷ সামনে সাঁকো৷ একটা ছোটো নদী দেখা যাচ্ছিল৷ তার ওপারে পাঁচিল-ঘেরা কারখানার মতো বাড়ি৷ কারখানা নিশ্চয়ই নয়৷ হয়তো ফার্ম হাউস৷ শুকনো মুখে সঙ্গীটির দিকে তাকালুম৷ উনি অভ্যাস মতো চোখে বাইনোকুলার রেখে জঙ্গলের দিকে কিছু দেখছেন৷ পাখি ছাড়া আর কী? ওঁর ওই এক বাতিক৷
বললুম—মাই ডিয়ার ওলড ম্যান, দয়া করে একবার এ-দিকে নজর দেবেন কি?
ওঁর যেন কানেই ঢুকল না কথা৷ এমন কী গাড়িটাও যে চরমভাবে বিগড়ে গেছে, তা-ও যেন টের পাচ্ছেন না৷ বাইনোকুলারে চোখ রেখে পিঠ সোজা করে বসেছেন৷ নিশ্চয়ই দুর্লভ কিছু নজরে পড়েছে৷
—এই যে স্যার, শুনছেন? আমরা থেমে গেছি৷
কাকে কী বলছি! বুড়ো মানুষ৷ নির্ঘাৎ বাহাত্তুরে ধরেছে৷ আপশোস হতে লাগল, বারবার জেনেশুনে একই ভুল করে আসছি৷ ওঁর মতো পাগল-ছাগল মানুষের পাল্লায় পড়ে কতবার কতভাবে হন্যে হয়েছি, সংখ্যা নেই৷ অথচ বড়ো জাদুকর এই কর্নেল নীলাদ্রি সরকার—একবার মিঠে গলায় ডার্লিং ডেকে ফেললেই আমি বশ হয়ে যাই৷
আসছি দুমকা থেকে রামপুরহাটের দিকে৷ গাড়িটা ল্যান্ডমাস্টার৷ যাবার সময় একটুও গোলমাল করেনি৷ কিন্তু ফেরার পথে সেই দুপুর থেকে বার তিনেক ঝামেলা বাধিয়েছে৷ এর ফলে দেড় ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে৷ এতক্ষণ রামপুরহাটে সরকারী বাংলোয় পৌঁছে বিশ্রাম নেবার কথা৷ আগামীকাল সকালে কলকাতা রওনা হতেই হবে৷ খবরের কাগজে রিপোর্টারের চাকরি করি৷ আজ রাতেই রামপুরহাট থেকে টেলিগ্রামে একটা সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট পাঠানোর কথা আছে৷ দুমকায় কয়েক লক্ষ আদিবাসীর এক রাজনৈতিক সম্মেলন হয়ে গেল৷ খুব উত্তেজনা ছড়াচ্ছে আদিবাসী আন্দোলন৷ পৃথক রাজ্যের দাবি উঠেছে৷ এখানে-ওখানে প্রায়ই কিছু সংঘর্ষ ঘটছে৷
গিয়েছিলুম সম্মেলনের কভারেজে৷ অথচ আমার বরাত! গিয়েই দেখি কোত্থেকে বেমক্কা সেখানে উপস্থিত রয়েছেন প্রখ্যাত বুড়ো ঘুঘু এই কর্নেল৷ পুলিশ সুপার ওঁর স্নেহভাজন বন্ধু৷ সেই সুবাদে আতিথ্য নিয়ে জঙ্গলে-জঙ্গলে দুর্লভ জাতের পাখি আর পোকামাকড় দেখে বেড়িয়েছেন৷ আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরেছিলেন৷ ‘হ্যালো সুইটহার্ট! তোমার সঙ্গেই কলকাতা ফেরা যাক তাহলে!’
ওঁকে দেখেই ভেবেছিলুম, ব্যাস, এই হ’ল আর কী! যেখানে এই বুড়ো ঘুঘু, সেখানেই তো খুনখারাপি—সুতরাং গোয়েন্দাগিরি! এবার চাকরিটা আর বাঁচানো যাবে না৷ কিন্তু ভাগ্য ভালো, খুনখারাপির গোয়েন্দাগিরিতে ওঁর আবির্ভাব হয়নি৷ এসেছেন নিছক ভ্রমণে৷ যাই হোক, একা বোকার মতো চুপচাপ কলকাতা ফেরার চেয়ে একজন সঙ্গী পাওয়া গেল৷ বিশেষ করে, কর্নেলের মতো সঙ্গী যে হয় না—তা অস্বীকার করব না৷
পথে তিনবার গাড়ি বিগড়ানোতে মনে একটা অস্বস্তি জাগছিল৷ কেন, তা বলা কঠিন৷ এই চতুর্থবার যখন বিগড়োল, এবং সন্ধ্যার মুখোমুখি—এখন সেই অস্বস্তি বেড়ে গেল৷ মনে হ’ল, এই বুড়োর ভাগ্যদেবতা যিনি—তাঁরই কারচুপিতে আমি ববাবর যেমন জড়িয়ে যাই, এবারও যাব৷ ভাবলুম, ওঁকে এড়িয়ে একা ফেরাই ভালো ছিল৷ তাহলে নিশ্চয়ই গাড়ি এমন বদমাইসি করত না৷
আফশোসে বিরক্তিতে এসব ভাবছি, হঠাৎ দেখি উনি উঠলেন৷ চোখে বাইনোকুলার তেমনই লাগানো—দরজা খুলে নামলেন৷ এবং কোনো কথা না বলে দিব্যি হনহন করে ব্রিজের দিকে এগোলেন৷ ক্ষেপে গিয়ে ডাকতে ঠোঁট ফাঁক করেই বুজিয়ে দিলুম৷ পাগল-ছাগল লোকটার কাণ্ড দেখতে থাকলুম৷ নিশির ডাকে যেমন নাকি লোকে বেরিয়ে পড়ে, তেমনই সম্মোহিতের মতো নাক-বরাবর জঙ্গল ঠেলে চলেছেন৷ কোনো দুর্লভ জাতের পাখি দেখেছেন নাকি!
কর্নেল অদৃশ্য হলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নামলুম৷ যথারীতি ইঞ্জিনের ঢাকনা তুলে গণ্ডগোলের কারণ খুঁজতে ব্যস্ত হলুম৷
এক ঘণ্টারও বেশি নানান চেষ্টাতেও কিছু হল না৷ রাস্তায় কোনো লোক নেই যে ঠেলতে বলব৷ অগত্যা এগিয়ে গেলুম নদীর ওপারে সেই খামারবাড়িটার দিকে৷ ওখানে গেলে নিশ্চয়ই সাহায্য পাব৷
কর্নেলের কথা মন থেকে মুছে ব্রিজ পেরিয়ে গেলুম৷ দু’শো গজ দূরে ফার্মের গেটটা দেখা গেল৷ সাইনবোর্ডে লেখা আছে ভূমিলক্ষ্মী ফার্ম হাউস (প্রাইভেট) লিমিটেড৷ কেন্দুহাটি, বীরভূম ৷ কাছাকাছি কোনো গ্রাম দেখা গেল না৷ ফার্মটা একেবারে একলা হয়ে আছে৷ পূর্বে-দক্ষিণে অনেকটা জমিতে বেড়া দিয়ে চাষবাস করা হচ্ছে৷ বাড়ির এলাকাও বিশাল৷ পশ্চিমে নদী এবং জঙ্গল৷ উত্তরে রাস্তা, রাস্তার উত্তরে দিগন্ত-বিস্তৃত মাঠ৷
গেটে কোনো লোক নেই কিন্তু খোলা আছে৷ ভিতরে সবজিখেত আর ফুলবাগিচা৷ মধ্যে চমৎকার একফালি রাস্তা৷ ভেতরে ঢুকে পড়লুম৷ সামনে একতলা কয়েকটা ঘর, বাঁ-দিকে গুদামঘর ও টিনের শেড৷ অনেক কৃষিযন্ত্র দেখা গেল৷ রীতিমতো মেকানাইজড কৃষির ব্যবস্থা আছে তাহলে৷ ডান দিকে তাকাতেই এক বিচিত্র দৃশ্য চোখে পড়ল৷
পাঁচিলের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং মহামান্য কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এবং টুপি খুলে নিচের কোনোকিছুর প্রতি যেন হুকুম জারি করছেন৷ ভীষণ নাড়ছেন টুপিটা৷ মাঝে-মাঝে নাচের ভঙ্গিতেও কী সব করছেন৷ বাতাস বইছে জোর৷ উনি কিছু বলছেন—কিছু শোনা যাচ্ছে না স্পষ্ট৷
ব্যাপারটা দেখে তো আমি হতভম্ব! সব রাগ, বিরক্তি পলকে ঘুচে গিয়ে বেদম হাসি পেল৷ হো-হো করে হেসে উঠলুম৷ চেঁচিয়ে বললুম—হ্যালো ওল্ড ফেলার! সার্কাস দেখাচ্ছেন কাকে?
এবার উনি আমাকে দেখতে পেলেন৷ পেয়েই টুপিসুদ্ধ হাত নেড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন—গো ব্যাক, গো ব্যাক জয়ন্ত! সাবধান!
হাসতে হাসতে ওঁর দিকে এগোলুম৷—ব্রিলিয়ান্ট কর্নেল! আপনি সার্কাসেও খেলোয়াড় ছিলেন, বলেননি তো এতদিন!
কর্নেল আবার চেঁচিয়ে উঠলেন—জয়ন্ত! এগিও না—এগিও না!
আমার সামনে কিছু সবজিঝাড় ও মাচান৷ তার ও-ধারে সেই পাঁচিল৷ ওঁর কথা গ্রাহ্য না করে এগোলুম৷ তারপর কর্নেলের দিকে তাকিয়ে হাততালি দিয়ে হাসতে হাসতে বললুম—সাবাস কর্নেল! জোর জমেছে৷
কথা শেষ হতে না হতে আচমকা সামনে মাচানের ওপাশে একটা জান্তব গর্জন শোনা গেল—গাঁক গাঁ—আঁ—ক! তারপরই দেখি, একটা প্রকাণ্ড সাদা ষাঁড় ভয়ঙ্কর শিং-দুটো কাত করে ঝোপ ঠেলে আমার দিকে এগিয়ে আসছে৷
যেই দেখা, দিশেহারা হয়ে একলাফে কী ভাবে সেই পাঁচিলে উঠে পড়লুম, জানি না৷ কর্নেল আমার কাছে এগিয়ে এলেন৷ ষাঁড়টা ততক্ষণে আমাদের নিচে৷ শিং নেড়ে গাঁক-গাঁক করছে৷
এই সময় একটা লোক বেরিয়ে এল ওপাশের ঘর থেকে! ব্যাপারটা তার চোখে পড়তেই সে দাঁড়িয়ে গেল৷ তারপর ব্যস্ত হয়ে ডাকাডাকি শুরু করল৷ আরও জনা তিন-চার লোক বেরিয়ে এল৷ একজন চেঁচিয়ে বলল—টুপি! টুপি! আপনার লাল টুপিটা লুকিয়ে ফেলুন!
এতক্ষণে ষাঁড়টার রাগের কারণ বোঝা গেল! কর্নেল অপ্রস্তুত হয়ে তক্ষুনি ওঁর লাল টুপিটা পকেটে লুকিয়ে ফেললেন৷ লোকগুলো ষাঁড়টাকে বশ মানাতে ব্যস্ত হ’ল৷
আজকাল গ্রামাঞ্চলে অনেক জায়গায় কী এলাহি কারবার হচ্ছে, ভাবা যায় না! খবরের কাগজের চাকরির সুবাদে এরকমের ফার্ম দেখা ছিল৷ তবে ভূমিলক্ষ্মী ফার্ম তেমন বড়ো প্রজেক্ট নয়৷ মাঝারি ধরনের একটা কমপোজিট ইউনিট এবং নিছক প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ৷ মালিকের নাম হেমেন্দ্রভূষণ নায়েক৷ শক্তসমর্থ প্রৌঢ় মানুষটি খুবই অমায়িক৷ ঠাকুরদার আমলে জমিদারি ছিল৷ বাবা ছিলেন জোতদার৷ উনিও তাই—তবে প্রচলিত অর্থে নয়, চাষবাসের সঙ্গে আছে ফিশারি আর ডেয়ারি৷ তিরিশটা দুধেল ভালো জাতের গোরু আছে৷ দৈনিক গড়ে পাঁচ-সাত মণ দুধ হয়৷ ভোরবেলা নিজের স্টেশনওয়াগানে রামপুরহাট থেকে রেলে কলকাতা চালান দেন৷ কথায়-কথায় অসুবিধাগুলো জানালেন—রিপোর্টার সামনে পেলে যা হয়৷ ব্যাঙ্কের দেনা শোধ করা যাচ্ছে না৷ সেচ-ব্যবস্থার দিকে সরকার আদৌ মন দিচ্ছেন না, শুধু বক্তৃতাই সার৷ তার ওপর মফস্বলের বিদ্যুৎ বিভ্রাট তো লেগেই আছে৷ ঘনঘন লোডশেডিং হয়৷ ফার্মে লোকসানের অঙ্ক ফুলে ফেঁপে উঠছে দিনে-দিনে৷
কর্নেল উসখুস করছিলেন অনেকক্ষণ থেকে৷ উনি একটু থামতেই বললেন—আপনার ষাঁড়টা খুব রসিক মনে হচ্ছে হেমেন্দ্রবাবু!
হো-হো করে হাসলেন হেমেন্দ্র—রসিক? মোটেও না স্যার! ব্যাটা যত বদরাগী, তত খুনে! খুব ভালো জাতের ষাঁড় হলে কী হবে? অচেনা লোক দেখলেই গোঁজ উপড়ে আগড় ভেঙে তাড়া করবে৷ এই ক’মাসে তিন-তিনটে লোককে জখম করেছে৷
আমি বললুম—লাল রঙ ওর চক্ষুশূল৷ তাই না হেমেন্দ্রবাবু?
কর্নেল বলে উঠলেন—জয়ন্ত, তুমি স্পেনের ষাঁড়ের লড়াই সম্পর্কে হেমিংওয়ের বই পড়ে দেখো৷ লডুয়েদের বলে মাতাদোর৷ তাদের হাতে থাকে লাল কাপড় আর একটা তরোয়াল৷ লাল কাপড় দেখিয়ে ষাঁড়কে ক্ষেপিয়ে দেয়৷ তারপর...
হেমেন্দ্র বাধা দিয়ে বললেন—স্পেন বলুন, বাংলাদেশ বলুন, ষাঁড় ইজ ষাঁড়! আর লাল কাপড় বলছেন! এই যে, এই দেখুন না—আজ দুপুরবেলা আমার কী দশা করেছে! মনিব বলেও খাতির করে না ব্যাটা৷ যেই আদর করতে গেছি, অমনি শিং মেরে বসল৷ ভাগ্যিস পাঞ্জাবি ছিল গায়ে, খানিকটা কাপড়ের ওপর দিয়ে গেল৷ নয়ত ভুঁড়ি ফেঁসে যেত! যাই বলুন স্যার, ষাঁড় ইজ ষাঁড়৷ লাল কাপড় কোনো কথা নয়৷
উনি হাসতে-হাসতে ওঁর সাদা টেরিকটনের পাঞ্জাবির নিচের দিকটা দেখালেন৷ নিচে ঝুলের জায়গায় পকেটের কাছে দু ইঞ্চিটাক লম্বা এক ইঞ্চি চওড়া ফাঁক৷ ষাঁড়ের শিঙে উড়ে গেছে৷ কর্নেলের নির্ঘাৎ ভীমরতি ধরেছে৷ উনি একেবারে মুখটা এগিয়ে সেই ফাঁকটা দেখে নিলেন এবং আঙুলে ফাঁকটা পরখও করলেন—যেন সত্যি না মিথ্যে, তাই দেখছেন৷ হেমেন্দ্রবাবু বললেন—পাঞ্জাবিটা পুরোনো৷ ওর দোষ নেই৷ একটুতেই ফরফর করে ছিঁড়ে যায়৷ এই দেখছেন না? বুকের কাছে কেমন ফেটেফুটে গেছে!
আমার অবাক লাগল৷ পাড়াগাঁয়ে মানুষ এখনও কত সরল আর সাদাসিধে! এতবড়ো ফার্মের মালিক, অথচ তার জন্য এতটুকু দেমাক বা সাজগোজের ঘটা নেই৷ ছেঁড়া জামা পরেই কাটাচ্ছেন৷
কর্নেল হঠাৎ বললেন—আপনার দেখছি পান খাবার অভ্যেস আছে!
হেমেন্দ্রবাবু যেন চমকে উঠলেন!—পান? না তো! বলেই নিজের জামাটা বুকের কাছে দেখে নিয়েই আবার হো-হো করে হাসলেন৷—ও হ্যাঁ৷ মানে—মাঝে মাঝে খাই৷ কদাচিৎ!
আমি হাসতে-হাসতে বললুম—একটু আগেও খেয়েছেন কিন্তু৷
নিজের জিভ বের করে আত্মভোলা মানুষটি দেখে নিলেন৷ তারপর আবার সেই প্রাণখোলা হাসি৷— কী কাণ্ড! খেয়ালই নেই! তাও বটে৷ দুপুরে এক পানখোর এসেছিল৷ কেন্দুহাটির নরহরিদা৷ তার কাছেই শখ করে একটা খিলি নিয়েছিলুম৷ দেখছেন কাণ্ড! জামাটা কী বিচ্ছিরি হয়ে গেছে! পাঁচু! ও পাঁচু!
ডাক শুনে একটা লোক এল৷ উনি জামাটা খুলে ওকে দিয়ে বললেন—এটা কেচে দে তো বাবা! এক্ষুনি কেচে দে৷
পাঁচু বলল—এই সন্ধেবেলা কেচে কী হবে গো? কাল সকালে দেবো’খন৷
হেমেন্দ্র তক্ষুনি রেগে বললেন—সকাল হতে হতে আর দাগ উঠবে? যা— এক্ষুনি কেচে ফ্যাল৷...তারপর কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন—তাহলে আপনার কথাই সত্যি, স্যার৷ পানের লাল রং দেখেই ব্যাটা তখন ক্ষেপে গিয়েছিল আমার ওপর৷ ঠিকই বলেছেন আপনি৷...
এইভাবে আমাদের কথাবার্তা চলতে থাকল৷ একসময় হেমেন্দ্রবাবুর মিস্ত্রি এসে জানাল, আমার গাড়িটা ঠিক হয়েছে৷ শুনে উঠে দাঁড়ালুম৷ বললুম—তাহলে অসংখ্য ধন্যবাদ হেমেন্দ্রবাবু৷ চলি৷ আসুন কর্নেল!
কর্নেল কী যেন ভাবছিলেন—মুখটা গম্ভীর৷ বললেন—যাবে?
—হ্যাঁ৷ কাল সকালের মধ্যে কলকাতা পৌঁছতেই হবে৷
কর্নেল হেমেন্দ্রবাবুর দিকে ঘুরে বললেন—ইয়ে, হেমেন্দ্রবাবু! নদীর ওদিকে বেশ জঙ্গল দেখলুম৷ নানা জাতের পাখির আড্ডা৷ আমার আবার পাখি দেখার প্রচণ্ড বাতিক৷ তাই ভাবছিলুম...
হেমেন্দ্রবাবু নীরস কণ্ঠস্বরে বললেন—পাখি? পাখি দেখবেন? পাড়াগেঁয়ে পাখি সব—আপনারা শহুরে মানুষ, ভালো লাগবে? তা ছাড়া স্যার, এই মাঠের মধ্যে চাষাভুষো হয়ে থাকি৷ আপনাদের অনেক কষ্ট হবে হয়তো৷
স্পষ্ট বুঝলুম হেমেন্দ্রবাবুর পক্ষে ঝামেলা হবে, যদি আমরা থাকি৷ ঝামেলা তো নিশ্চয়ই৷ এমন অতিথিদের জন্যে বিছানাপত্র, ঘর ইত্যাদির সুব্যবস্থা তো চাই৷ অথচ কর্নেল যেন মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে চান৷ অদ্ভুত বেহায়া লোক তো! এমন স্বভাব কখনও দেখিনি কর্নেলের! খুব বিরক্ত হয়ে বললুম—পাখি দেখতে হলে ক্যাম্প-ট্যাম্প সঙ্গে নিয়ে আসবেন কর্নেল৷ এখন ওঠা যাক৷ রাত বেড়ে যাচ্ছে৷
কর্নেল বেহায়া হয়ে বললেন—আরে, তুমি হেমেন্দ্রবাবুকে অমন অভব্য ভাবছ কেন? আমাদের দেশের মানুষ খুব অতিথিবৎসল সজ্জন৷ হেমেন্দ্রবাবু, কোনোরকম ব্যস্ত বা উদ্বিগ্ন হবার দরকার নেই৷ আমরা খোলা ওই বারান্দায় শোব৷ সঙ্গে কিছু খাবার আছে—আপনার অসুবিধা হবে না!
হেমেন্দ্রবাবু হন্তদন্ত হয়ে জিভ কেটে বললেন—আ ছি ছি! আমি কি তাই বলছি? আপনাদের মতো মানুষ পাওয়া ভাগ্যের কথা! ওরে পাঁচু! হারাধন! মকবুল!
উনি ব্যস্তভাবে ডাকাডাকি করতে করতে বেরিয়ে গেলেন৷ আমি রাগে বিরক্তিতে ফুঁসে উঠলুম৷ চাপা গলায় বললুম—আপনার নির্ঘাৎ ভীমরতি ধরেছে, কর্নেল! ছিঃ? এমনিভাবে যেচে পড়ে থাকার কোনো মানে হয়? আর কখনো আপনার সঙ্গে কোথাও যাব না৷
কর্নেল যেন ধ্যানে বসে চোখ বুজেছেন৷ আমার কথা শেষ হলে চোখ খুলে বললেন—তুমি কি কিছু বলছ জয়ন্ত?
—না৷ কিচ্ছু বলিনি৷
বুড়ো মৃদু হাসলেন৷—বৎস জয়ন্ত, ফার্মহাউসে রাত কাটানোর মধ্যে যে-রোমাঞ্চ আছে, যে থ্রিল অ্যান্ড সাসপেন্স আছে—তা তুমি এ যাবৎ কোথাও পাওনি৷ আই প্রমিস অ্যান্ড অ্যাসিওর ইউ৷
কিসের প্রতিজ্ঞা এবং প্রতিশ্রুতি তা আর জিগ্যেসও করলুম না, এত বেশি রেগে গেলুম৷ কর্নেল ততক্ষণে আবার চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়েছেন৷ উঃ৷ এই পাগলের হাত থেকে কী ভাবে উদ্ধার পাব কে জানে!
পাশাপাশি দুটো ঘর৷ পেছনের ঘরটায় দুটো খাটিয়া ছিল৷ নিশ্চয়ই পাঁচুরা শোয়৷ সেখানে মোটামুটি রকমের বিছানায় দু’জনে শুয়ে পড়লুম, তখন রাত সাড়ে দশটা৷ জানলাগুলো খোলা৷ কোনো ঘরেই ফ্যান নেই৷ হেমেন্দ্রবাবু বিলাসী মানুষ নন৷ মিটমিটে বাল্বটা নিভিয়ে দিলুম৷ কর্নেলের নাক ডাকতে শুনলুম সঙ্গে-সঙ্গে৷ আশ্চর্য তো! এমন করে ঘুমোতে কখনও দেখিনি৷ গরমে আমার ঘুম এল না৷ জানলার বাইরে গেটের বাল্বটা অল্প আলো দিচ্ছিল৷ সেদিকে তাকিয়ে এলোমেলো ভাবছিলুম৷
গতকাল বিকেলে ব্রিজের কাছে গাড়ি খারাপ হওয়ার পর থেকেই কর্নেলের আচরণ কেমন অস্বাভাবিক লাগছে৷ ভূতগ্রস্তের মতো বাইনোকুলার চোখে রেখে জঙ্গলে ঢুকে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে পড়ছিল৷ আমার কথায় কানই দিলেন না—কেমন নাক-বরাবর হেঁটে চলে গেলেন৷ তারপর দেখলুম, ফার্মের পাঁচিলে উঠে পড়েছেন ষাঁড়ের তাড়া খেয়ে৷ ষাঁড়ের পাল্লায় পড়তে গেলেন কেন হঠাৎ? ষাঁড়টা তো ফার্মের মধ্যেই ছিল৷ কেন ঢুকলেন ফার্মে? কোনো বিরল জাতের পাখিকে অনুসরণ করেই কি?
হ্যাঁ, তাই সম্ভব৷ তাই যেচে পড়ে থাকতে চাইলেন ফার্মে৷ তার মানে কালও আমার বেরনো হচ্ছে না৷ নিশ্চয়ই সেই দুর্লভ পাখির খোঁজ করবেন সকাল থেকে৷ খুব ঝামেলা করছে বুড়ো! এবার কোনোমতে কলকাতা ফিরলে আর ওঁর নাগালের মধ্যে যাব না৷...
ভাবতে-ভাবতে কখন ঘুমিয়ে গেছি৷ তারপর যখন ঘুম ভাঙল, চোখ খুলে দেখি প্রচণ্ড অন্ধকার৷ জানালা দিয়ে গেটের আলোটা আসছে না৷ নিশ্চয়ই লোডশেডিং৷
কর্নেলের নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলুম না৷ তাহলে উনিও জেগে আছেন৷ চাপা গলায় ডাকলুম—কর্নেল, জেগে আছেন নাকি?
কোনো সাড়া নেই৷ আরও তিনবার ডেকে সাড়া না পেয়ে উঠলুম৷ ওঁর বিছানায় হাত বাড়িয়ে টের পেলুম, বুড়ো নেই৷ তাহলে নৈশ ভ্রমণে বেরিয়েছেন! এমন উৎকট শখ উনি ছাড়া কারও থাকতে পারেনা৷
খুব গরম লাগছিল৷ সিগারেট ধরিয়ে যতক্ষণ না সেটা শেষ হল, চুপচাপ বসে থাকলুম খাটিয়ায়৷ তখনও কর্নেলের কোনো সাড়াশব্দ নেই৷ ঘড়ি দেখলুম৷ রাত দুটো-পাঁচ৷ তারপর দরজার দিকে তাকিয়ে দেখি, দরজা খোলা৷ বারান্দায় গেলুম৷ কয়েক মিনিট অপেক্ষা করেও কর্নেলের পাত্তা নেই৷ ল্যাট্রিনটা বাগানের কোণার দিকে রয়েছে৷ সেদিকে তাকিয়ে কাকেও দেখলুম না৷ আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘরে ফিরে এলুম৷ বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আবার সিগারেট ধরালুম৷ সিগারেটটার আধখানা পুড়েছে, হঠাৎ বাইরে কোথাও কর্নেলের ভয়ার্ত চিৎকার শোনা গেল—হেমেন্দ্রবাবু! জয়ন্ত৷ হেল্প! হেল্প!
তক্ষুনি চেঁচিয়ে সাড়া দিলুম—কর্নেল৷ কর্নেল! কী হয়েছে?
তারপর মনে পড়ল, আমার কিটব্যাগে একটা টর্চ আছে৷ টর্চটা বের করে দৌড়ে বাইরে বেরোলুম৷ বাগানের পশ্চিমদিকে টর্চের আলো জ্বেলেছে কে৷ সেই আলোয় দেখলুম, কর্নেল আবার সেই পাঁচিলে দাঁড়িয়ে প্রচণ্ড নাচছেন এবং চীৎকার করে যাচ্ছেন৷
আমার টর্চের আলো মুহূর্তে যা দেখবার দেখিয়ে দিল৷ সেই ষাঁড়টা! শিং নেড়ে পাঁচিলের নিচে লম্ফঝম্প করছে৷ শিঙে পাঁচিলটাকে গুঁতোচ্ছে৷ সামনের দু’পায়ে মাটি আঁচড়াচ্ছে৷ রাগব, নাকি হাসব ভেবে পেলুম না৷ রাত দুপুরে কর্নেল আবার সেই একই ব্যাপার কেন ঘটিয়ে বসলেন, এটাই বড্ড অদ্ভুত!
হেমেন্দ্রবাবুর লোকেরা ততক্ষণে হেরিকেন জ্বেলে এনেছে৷ হেমেন্দ্রবাবুর হাতে টর্চ৷ উনি চেঁচাচ্ছেন—ভূষণ! ফাঁস নিয়ে এসো! ফাঁস!
বিকেলের মতোই ষাঁড়টাকে ক’জনে কায়দা করে ফেলল৷ তারপর টানতে টানতে আগড় গলিয়ে বেড়ার মধ্যে ঢোকাল৷ তখন কর্নেল লাফ দিয়ে নামলেন৷ নেমেই বললেন—হেমেন্দ্রবাবু— আপনার মেন স্যুইচ পরীক্ষা করে দেখুন তো শিগগির!
হেমেন্দ্রবাবু হাসতে হাসতে বললেন—দেখব কী! এ তো সব সময় হচ্ছে৷ লোডশেডিং৷ কিন্তু স্যার, আপনি কীভাবে এখন রামুর পাল্লায় পড়লেন?
সেই সঙ্গে আমি বললুম—এখন অন্ধকারে লাল টুপিও দেখা যায় না৷ তা ছাড়া এখন লালটুপি আপনার পরার কথাও নয়৷
কর্নেল কোনো জবাব না দিয়ে হনহন করে এগোচ্ছিলেন৷ ওঁর মুখটা কেমন গম্ভীর৷ হেমেন্দ্রবাবু ও আমি ওঁকে অনুসরণ করলুম৷ বারান্দায় এগিয়ে যেতে যেতে কর্নেল একখানে দাঁড়ালেন৷ বললেন—হুম! এখানেই তো মিটার-বোর্ড ছিল মনে হচ্ছে৷
হেমেন্দ্রবাবু বললেন—হ্যাঁ স্যার৷ ওই যে, কোণায়৷ কিন্তু...
কর্নেল মেন-স্যুইচের কাছে গিয়ে অস্ফুটে বললেন—মাই গুডনেস!
তারপরই আলো জ্বলে উঠল গেটে৷ হেমেন্দ্রবাবু অবাক হয়ে বললেন—সে কী! মেন-স্যুইচ অফ করেছিল কে?
কর্নেল কথা বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছেন, হঠাৎ ষাঁড়ের বেড়ার দিক থেকে হেমেন্দ্রবাবুর লোকেরা উত্তেজিত স্বরে চেঁচিয়ে উঠল—বাবু! বাবু! শিগগির এখানে আসুন, শিগগির!
এবার সবার আগে কর্নেলকে দৌড়তে দেখলুম৷ বাগানের একাংশে বেড়া, বেড়ার মধ্যে ষাঁড়ের খোঁয়াড়৷ ষাঁড়টা পোয়ালের গাদায় মুখ ঢুকিয়ে ভোজনে ব্যস্ত৷ আর হেরিকেনের আলোয় লোকগুলো কিছু ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে৷
গিয়ে যা দেখলুম, স্তম্ভিত হয়ে গেলুম! একটা মধ্যবয়স্ক লোক চিত হয়ে পড়ে আছে৷ তার পরনে ময়লা ধুতি, গায়ে ফতুয়া মতো জামা৷ তার বুকে কলজের কাছটায় চাপচাপ রক্ত৷ হেমেন্দ্র চেঁচিয়ে উঠলেন—নরহরিদা! এ যে নরহরিদা! সর্বনাশ! মারা গেছে নাকি?
কর্নেল হাঁটু দুমড়ে লোকটাকে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে বললেন—অনেকক্ষণ আগে মারা গেছে! কিন্তু.. ইনি এখানে কোত্থেকে এলেন?
হেমেন্দ্রবাবু প্রায় হাউমাউ করে কেঁদে বললেন—এ হবে আমি জানতুম! ওই অলক্ষুণে বদমাশ ষাঁড় খুনখারাপি না করে ছাড়বে না—ঠিক বলেছিলুম! বাবা চণ্ডী! দ্যাখতো, ওর শিঙে রক্তটক্ত লেগে আছে নাকি৷
টর্চ ফেললুম আমি৷ হ্যাঁ—ষাঁড়টার ডান শিঙে রক্ত থকথক করছে৷ কর্নেল বললেন—কী সর্বনাশ! হেমেন্দ্রবাবু, ইনি নিশ্চয়ই আপনার কোনো কর্মচারী?
হেমেন্দ্রবাবু বললেন—না স্যার৷ উনি কেন্দুহাটির নরহরি দাশমশাই৷ খুব বড়ো ব্যবসায়ী৷ রামপুরহাটেও ওর কাঁসা-পেতলের কারবার আছে৷ ইদানীং এই মাঠে অনেকটা জমি কিনেছিলেন নরহরিদা৷ আমার মতোই ফার্ম করার ইচ্ছে ছিল৷ ছেলেরা লায়েক হয়ে ব্যবসা দেখছে৷ উনি নিজে ফার্ম দেখবেন, এই ছিল মতলব৷ তার ওপর সম্প্রতি বিহারে হিরণপুরের গোহাটা থেকে এক গাই গোরু কিনেছিলেন৷ কে ওঁর মাথায় ঢুকিয়ে দিল কে জানে, আমার মতো ডেয়ারি খুললে খুব পয়সা হবে৷ তাই আমার কাছে ক’দিন ধরে খুব যাতায়াত করছিলেন৷
কর্নেল বললেন— কিন্তু এখানে ষাঁড়ের খোঁয়াড়ে রাতদুপুরে...
বাধা দিয়ে হেমেন্দ্রবাবু বললেন—বলছি স্যার৷ বড্ড একগুঁয়ে মানুষ নরহরিদা৷ যখন মাথায় ডেয়ারি ঢুকেছে, তখন রক্ষে নেই৷ ওদিকে হাড়কিপটে—বড্ড কৃপণ, বুঝলেন? দুটো গোরু থেকেই কয়েকশো গোরুর স্বপ্ন এসেছে মাথায়৷ তাই একটা ভালোজাতের ষাঁড় চাই৷ আমার ষাঁড়টা বেজায় পছন্দ৷ সবসময় এসে সাধাসাধি করছিলেন, ষাঁড়টা যেন ওঁকে বেচে দিই৷ কেন দেব, বলুন স্যার? শখ করে কিনেছি৷
কর্নেল বললেন—হুম! কিন্তু রাতদুপুরে ষাঁড়ের খোঁয়াড়ে...
হেমেন্দ্রবাবু ফের বাধা দিয়ে বললেন—সার, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু—কথায় বলে৷ নিশ্চয়ই উনি ষাঁড়টা চুরির মতলবে এসেছিলেন৷ তা ছাড়া আর কী কারণ থাকতে পারে?
কর্নেল মাথা নেড়ে বললেন—উঁহু! চুরি করলে তো ধরা পড়ে যাবেন! ষাঁড় চুরি করা কি সম্ভব?
হেমেন্দ্রবাবু ব্যস্তভাবে বললেন—ঠিক বুঝতে পারলেন না স্যার! একেবারে চুরি নয়৷ ষাঁড়টা নিয়ে গিয়ে একটা দিন লুকিয়ে রাখতেন এবং তাতেই ওঁর গোরু-দুটো প্রেগন্যান্ট হ’ত! ভালো জাতের দুধেল গোরুর জন্ম হ’ত!
—সে তো আপনাকে অনুরোধ করলেই হ’ত!
—হ’ত না স্যার! অন প্রিন্সিপল, আমি বাইরের কোনো গোরুর জন্য ষাঁড় তো দিতুম না৷ উনি অবশ্য আমাকে তা-ও অনুরোধ করেছিলেন৷ দেব কেন বলুন? একে তো কমপিটিশান—তার ওপর আমার ষাঁড়, আমি নগদ পাঁচ হাজার টাকায় কিনেছি৷ এটা প্রেসটিজেরও ব্যাপার কিনা! তা ছাড়া এক জনকে দিতে হলে আরও সবাই চাইবে৷ আমি তো স্যার দেশসুদ্ধ ভালো গোরু প্রোডিউস করার দায়িত্ব নিইনি৷ সরকারের সে-ব্যবস্থা আছে৷ সবাই সরকারের কাছে যাক৷ ব্লক আপিসে যাক৷ ...বলে হেমেন্দ্রবাবু আচমকা ভেঙে পড়লেন৷—ও নরহরিদা! এ তুমি কী করলে?
কেন্দুহাটি থানার পুলিশ অফিসার হিতেন গুপ্ত জিপে চেপে সদলবলে এলেন সকাল আটটায়৷ ষাঁড়ের শিঙের গুঁতোয় মৃত্যু—সুতরাং দুর্ঘটনার একটা সাধারণ তদন্ত ছাড়া আর কীই বা হবে! হিতেনবাবু হেমেন্দ্রবাবুকে একচোট শাসাতে ভুললেন না৷ —তিনটে জখম, তারপর এই ডেথ৷ ওই খুনে ষাঁড় আপনি শিগগির বিদেয় করুন মশাই৷ নাহলে ভীষণ বিপদে পড়বেন৷
হেমেন্দ্রবাবু অনুনয়-বিনয় করে দারোগাবাবুকে শান্ত করলেন৷ আড়ালে ডেকেও নিয়ে গেলেন৷ তার মানে যা বোঝার, সবাই বুঝল৷ নরহরিবাবুর মৃত্যুর জন্য ক্ষতিপুরণ দিতেও চাইলেন৷ কিন্তু নবহরিবাবুর ছেলেরা তা নেবে কেন? তাদের অঢেল পয়সা আছে৷ ক্ষতিপূরণ নেওয়াটা অপমানজনক৷ তা ছাড়া এ তো লজ্জার কথাও বটে৷ বাবা ষাঁড় চুরি করতে এসেছিল৷ খিটকেল কি কম হবে? তিন ছেলের মধ্যে ছোটো ভীষণ রাগী৷ সে শাসাল৷ আজই ষাঁড়টাকে গুলি না করে জলগ্রহণ করবে না৷ হেমেন্দ্রবাবু করজোড়ে ক্ষমা চাইতে থাকলেন৷
গ্রাম থেকে অনেক মাতব্বর লোকেরা এসেছিলেন৷ তাঁরা মধ্যস্থ হয়ে সব মীমাংসা করে দিলেন৷ নরহরিবাবুর নিয়তি—তা না হলে অমন মানুষ রাতদুপুরে ষাঁড় চুরিই বা করতে আসবেন কেন? নিশির ডাকে বেচারাকে ঘর ছাড়া করেছিল৷ কেউ কেউ জনান্তিকে বলল—পিঁপড়ের পাছা থেকে গুড় তুলে খায়, এমন কিপটে লোক৷ পয়সার লোভ বড্ড৷ তাই ষাঁড় চুরি করতে এসেছিল৷
লাশ যথারীতি মর্গে গেল৷ দারোগাবাবু কর্নেলকে পাত্তাই দিলেন না৷ কর্নেল গতিক বুঝে কাঁচুমাচু মুখে সরে এলেন৷ আমি ব্যাপারটা দেখে খুব হাসলুম৷
বেলা তখন সাড়ে দশটা৷ সব চুকে গেছে৷ দারোগা লাশ নিয়ে চলে গেছেন৷ ভিড় সরেছে৷ কর্নেল একটা শিরীষ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ফার্মের একটা লোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন৷ আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললুম—আর কী? এবার বেরোনা যাক!
কর্নেল আমার হাত ধরে টানলেন৷ লোকটা চলে গেল৷ একটু এগিয়ে এক জায়গায় দাঁড়ালেন কর্নেল৷ তারপর বললেন—জয়ন্ত কি খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছ?
—নিশ্চয়ই৷ আপনার মতো বাহাত্তুরে ধরেনি তো আমাকে৷
—জয়ন্ত, জয়ন্ত! তুমি রাগ করছ৷ কিন্তু বাহাত্তুরে হয়তো তোমাকেই ধরেছে৷
—মোটেও না৷ আসলে আপনার মাথায় গোয়েন্দাপোকা কামড়াচ্ছে৷ স্রেফ দুর্ঘটনাকেও আপনি মেনে নিতে পারছেন না৷ কারণ, আপনার স্বভাব শকুন যেমন মড়া দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমনি আপনিও...
—জয়ন্ত, জয়ন্ত! আমাকে শকুন বলছ?
—বলব৷ একশো-বার বলব৷
—হ্যাঁ, আমি শকুনই বটে৷ আমার চোখে শকুনের দৃষ্টিশক্তি আছে ডার্লিং!
—অস্বীকার করছি না৷
—তাই তো, কাল বিকেলে কেন আমি তোমার গাড়ি বিগড়ানো দেখেও দেখলুম না? কেন আমি শকুনের মতো নদীর ধারে জঙ্গলের দিকে চলে গেলুম? তোমার কথার কোনো জবাব না দিয়েই কেন চলতে থাকলুম?
—নির্ঘাৎ চরে মড়া দেখেছিলেন?
—ঠিক বলেছো, জয়ন্ত৷ তবে মড়া তখনও দেখিনি, শুধু গন্ধ টের পেয়েছিলুম৷ টনক নড়েছিল৷
চমকে উঠে বললুম—তার মানে?
—মড়ার গন্ধ—দ্যাট ইজ ডেডবডি! মার্ডার! কর্নেল হাসলেন৷—আচ্ছা জয়ন্ত, গতকাল বিকেলে তুমি ষাঁড়টা দেখেছিলে, গতরাতে দেখেছ, এবং আজ সকালেও দেখেছ৷ কোনো অদ্ভুত কিছু চোখে পড়েনি৷
—না তো!
—ষাঁড়ের শিঙে বিকেলে কোনো পেতলের ছুঁচলো ডগাওয়ালা টুপি পরানো ছিল না৷ অথচ রাতে যখন ষাঁড়টা দেখলুম, তখন টুপি পরানো আছে৷ তাতে রক্ত লেগে আছে৷
বাধা দিয়ে বললুম—তাই তো বটে!
—তার মানে সন্ধ্যার পর কোনো একসময় শিঙে ছুঁচলো টুপি পরানো হয়েছিল৷
—কিন্তু হঠাৎ অমন তীক্ষ্ণ ধারালো টুপি পরানো হ’ল কেন?
কর্নেল সে-প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন—জয়ন্ত, কাল রাতে আমি জেগে ছিলুম৷ নাক ডাকানোটা নেহাৎ কৌশল৷ ঘুমোনো সম্ভব ছিল না, জয়ন্ত৷ আমি একটা কথা ভাবছিলুম, যে- ডেডবডির গন্ধ পেয়ে নদীর চরে গিয়েছিলুম, সেটা দেখার অপেক্ষায় ছিলুম৷
—তার মানে? ডেডবডির কথা কেন ভাবছিলেন? তখন ডেডবডি কোথায়?
—কাল বিকেলে নদীর চরে একজনকে চুপি চুপি বালি সরাতে দেখছিলুম৷ বাইনোকুলারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, সে কিছু একটা পুঁতছে৷ তাই দৌড়ে সেদিকে এগোলুম৷ যেতে যেতে লোকটা কাজ শেষ করে পালায়৷ তখন খুঁজতে খুঁজতে আবিষ্কার করলুম, লোকটা বালিতে একটা লোহার গোঁজ লুকিয়ে রেখে গেল৷ দেড়ফুট লম্বা, একইঞ্চি মোটা গোঁজ—যা দিয়ে গোরু বাঁধা খুঁটি হয়৷ গোঁজের ডগায় টাটকা রক্ত দেখে এমনি টের পেলুম, কী ঘটেছে৷
—বলেন কী!
—স্পষ্ট জানলুম, এটা একটা মার্ডার উইপন৷ অথচ জঙ্গলে ঢুকে বা চরে কোথাও ডেডবডি পেলুম না৷ তখন বোঝো আমার মনের অবস্থা! এখানে এই ফার্ম ছাড়া কোনো বসতি নেই৷ তাই সন্দেহক্রমে ঢুকে পড়লুম ফার্মে৷ ঢুকেই পড়ে গেলুম ষাঁড়ের পাল্লায়৷
—তাহলে আপনি সে-জন্যেই যেচে পড়ে থাকতে চাইলেন?
—হ্যাঁ জয়ন্ত৷ ডেডবডিটা আবিষ্কার করা জরুরি ছিল৷ তবে ষাঁড়টা প্রথমে দেখেই আমার কেমন সন্দেহ হয়েছিল৷ খুনের পদ্ধতি অর্থাৎ এ্যালিবাই কী ধরনের হবে, সঙ্গে সঙ্গে আঁচ করে নিয়েছিলুম৷ তারপর হেমেন্দ্রবাবুর জামায় পানের দাগ দেখলুম৷ অথচ উনি মুখ ফসকে বলে ফেললেন, পান খান না৷ তখন সব স্পষ্ট হ’ল৷
—তাহলে ওগুলো কি রক্তের দাগ?
—হ্যাঁ৷ আর ওই জামা ছেঁড়ার ব্যাপারটা ষাঁড়ের শিঙে ঘটেনি৷ ...বলে কর্নেল পকেট থেকে একটা সাদা কাপড়ের ছোট্ট টুকরো বের করলেন৷ —এই সেই টুকরো৷ এটা নরহরিবাবুর হাতের মুঠোয় ছিল৷ কাল রাতে লাশ পরীক্ষার সময় এটা ওঁর মুঠোয় পেয়ে গিয়েছিলুম৷ তার মানে, খুব ধস্তাধস্তি হয়েছিল খুনের সময়৷ হেমেন্দ্রবাবুর জামাটা কত জায়গায় ছেঁড়া দেখেছ, আশা করি এখনও ভোলোনি!
শুনতে শুনতে আমি স্তম্ভিত! এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললুম—কিন্তু এত সব প্রমাণ পেয়েও পুলিশকে কিছু বললেন না?
কর্নেল দুঃখিত মুখে বললেন—বলেও লাভ হ’ত না জয়ন্ত৷ দারোগা ভদ্রলোক সৎ মানুষ নন৷ উল্টে আমাদেরই হয়রান করতেন৷ মাঝখান থেকে কোনো প্রমাণই কাজে লাগাবার সুযোগ পেতুম না৷ দুর্নীতিবাজ অফিসার হলে যা হবার, তাই হ’ত৷ এই কাপড়ের টুকরো, লোহার গোঁজ—সবকিছু লোপাট হয়ে যেত৷ তার চেয়ে আমি এখনই রামপুরহাট পুলিশ সুপারের কাছে যেতে চাই৷ গাড়ি বের করো৷ শিগগির!
গাড়ি বের করলুম৷ হেমেন্দ্রবাবুর কাছে বিদায় নিলুম৷ এবার উনি কিছুতেই আসতে দেবেন না৷ অনেক সাধাসাধি করলেন৷ মনে মনে বললুম—শয়তানের কাজ চুকে গেছে৷ এখন আমাদের উপস্থিতি তো আর বাধা সৃষ্টি করবে না৷
পথে আসতে আসতে বললুম—গতরাতে কেন বেরিয়েছিলেন বলেননি কিন্তু!
কর্নেল জবাব দিলেন—একটা লাশ কখন ষাঁড়ের খোঁয়াড়ে ঢোকানো হবে, তাই দেখতে৷ কিন্তু আমার উপস্থিতি টের পেয়ে গেল ব্যাটা৷ অমনি ষাঁড়টাকে আগড়ের বাইরে ঠেলে দিল৷ ষাঁড়টা বদমেজাজী সন্দেহ নেই৷ তক্ষুনি তেড়ে এল৷
—মেন-স্যুইচ অফ করাটা নিশ্চয়ই চোখে পড়েছিল আপনার?
—হ্যাঁ৷ হঠাৎ গেটের আলো নিভলেই আমি বেরিয়ে পড়েছিলুম৷ টের পেয়েছিলুম, লাশটা এবার আমার অজ্ঞাত কোনো গুপ্তস্থান থেকে আনা হচ্ছে৷
কতক্ষণ চুপচাপ থাকার পর জিগ্যেস করলুম—কিন্তু মোটিভ কী খুনের?
কর্নেল একটু হাসলেন৷ —নরহরিবাবুর ছেলেদের কথাবার্তা কান পেতে শোনোনি? বিশেষ করে ছোটো ছেলেটার কথা! মহাজনী কারবার ছিল নরহরিবাবুর৷ তাই অনুমান করছি, হেমেন্দ্রবাবুর কাছে অনেক টাকা সুদে-আসলে নিশ্চয়ই পাওনা হয়েছিল৷ অথচ এসব কারবার গ্রামাঞ্চলে কোনোরকম খাতা কলমে হয়-টয় না৷ বিশেষ করে এক সময়ে জমিদার বংশের লোক হেমেন্দ্রবাবু৷ মুখের কথায় মহাজন টাকা দেয়৷ হেমেন্দ্রবাবুর প্ল্যান ছিল, টাকা চাইতে এলেই খুন করবেন এবং ষাঁড়ের ওপর দায়টা চাপাবেন৷ খুব সহজ পদ্ধতি!
হেসে বললুম—ব্যাটা হেমেন্দ্রবাবু টেরও পাচ্ছে না যে কী ঘটতে চলেছে!
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন—নরহরিবাবুও টের পাননি যে কী ঘটতে চলেছে! এই হয়, জয়ন্ত৷ যে খুন করে আর যে খুন হয়, তারা যেন কিছুক্ষণের জন্য বড্ড নিঃসাড় হয়ে পড়ে৷ মানুষের বোধবুদ্ধির এই নিঃসাড় বা ফ্রিজিং অবস্থার মধ্যেই শয়তানের আবির্ভাব ঘটে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন