কালো সারসের পিছনে

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

এক

কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়৷ সন্ধ্যা হয়েছিল বটে কিন্তু বাঘের দেখা নেই৷ আচমকা শুরু হয়েছিল ঝড়, তারপর মুহুর্মুহু বজ্রপাত এবং প্রচণ্ড বৃষ্টি৷ কী একটা নদীর ব্রিজ পেরিয়ে আমার ফিয়াট গাড়ি সবে উৎরাইয়ে নেমেছে, সেইসময় এই আকস্মিক উপদ্রব৷

একটা বট গাছের আড়ালে গাড়ি থামিয়েছি৷ বাঁ-দিক থেকে আমার বৃদ্ধ বন্ধু বললেন, ‘‘জয়ন্ত, এসব সময়ে গাছের তলা মোটেই নিরাপদ নয়৷’’

বললুম, ‘‘আপনার জন্যেই ওই বিপদটা বাঁধল৷ পথে এক বন্ধুর বাড়ি ঘণ্টাতিনেক আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট না করলে আমরা এতক্ষণে বিজয়গড় পৌঁছে যেতাম৷’’

কথাটা বলার সঙ্গে-সঙ্গেই সামনের একটা বিশাল অর্জুন গাছের মাথার ওপর চোখ-ধাঁধানো আলো এবং কান-ফাটানো বজ্রপাতের শব্দ৷ গাছের মাথা দাউ-দাউ করে জ্বলতে থাকল৷ অমনি বুঝতে পারলুম কর্নেল ঠিকই বলেছেন৷ এই বটতলায় গাড়ি থামিয়ে ঝড়-বৃষ্টি থেকে নিজেদের আড়াল করতে পারছি বটে, কিন্তু দৈবাৎ আকাশের দেবতা এই গাছটা লক্ষ্য করে একটা ব্রহ্মাস্ত্র ছুঁড়লেই কী অবস্থা হবে, তা ভেবে শিউরে উঠলুম!

ততক্ষণে কর্নেল গাড়ির বাঁ-দিক খুলে নিচে নেমেছেন৷ তিনি ব্যস্তভাবে বললেন, ‘‘জয়ন্ত নেমে পড়ো৷ গাড়ি এখানেই লক করা থাক৷ ডানদিকের গাছপালার আড়ালে একটা দোতলা বাড়ি দেখতে পেলুম৷’’

তাঁর কথা মতো গাড়ি থেকে নেমে লক করার পর বললুম, ‘‘কিন্তু সঙ্গে তো রেনকোট নেই, দু’জনেই ভিজে কাকভেজা হয়ে যাব৷’’

কর্নেল কোনও কথা না বলে আমার এক হাত ধরে জগিং-এর ভঙ্গিতে পিচ-রাস্তা পেরিয়ে ওপারে গেলেন, তারপর সঙ্কীর্ণ একটা মোরাম-রাস্তা দিয়ে এগিয়ে দেখলুম; রাস্তার ধারে একটা পুরোনো আমলের দোতলা প্রকাণ্ড বাড়ি৷ বাড়িটার বারান্দায় উঠে বৃষ্টির হাত থেকে কিছুটা বাঁচা গেল৷ আসলে যতটা ভিজব আশঙ্কা করেছিলুম, ততটা না ভেজার কারণ দু-ধারের ঘন গাছপালা৷

কর্নেল দরজার কড়া নেড়ে ডাকছিলেন, ‘‘কে আছেন? দরজা খুলুন৷’’

কিন্তু কয়েকবার ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া পাওয়া গেল না৷ ততক্ষণে অন্ধকার ঘন হয়েছে৷ শুধু বিদ্যুতের আলোতে দেখতে পাচ্ছি, বাড়িটার সামনে একটা আমবাগান৷

একটু পরে কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, ‘‘মনে হচ্ছে বাড়িতে কোনও লোক বাস করে না৷’’

আমি বললুম, ‘‘পোড়োবাড়িতে এই সন্ধেবেলায় যদি ভূতের হাতে এক কাপ চা বা কফি খাওয়া যেত!’’

আমার কথা শেষ হওয়া মাত্র এতক্ষণে চোখে পড়ল, আমবাগানের ভিতর থেকে টর্চের আলো জ্বেলে কেউ আসছে৷

বাগানের শেষ প্রান্তের রাস্তার কাছে এসে পৌঁছুতেই কর্নেল আকারে খুদে কিন্তু খুব জোরালো আলোর টর্চ থেকে আলো ফেললেন৷ অমনি লোকটা হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘কে ওখানে?’’

কর্নেলের টর্চের আলোয় দেখে নিয়েছি লোকটার পরনে রেনকোট, মাথায় টুপি এবং কাঁধের ওপর রাখা একটা বন্দুক৷

কর্নেল এবার অমায়িক কণ্ঠস্বরে বললেন, ‘‘দেখতেই তো পাচ্ছেন, আমরা আপনার মতোই মানুষ৷ ঝড়বৃষ্টির জন্য এখানে আশ্রয় নিয়েছি৷’’

বন্দুকওলা ভদ্রলোক লম্বা পায়ে রাস্তাটা পেরিয়ে বারান্দায় উঠলেন৷ তারপর হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, ‘‘আরে কী আশ্চর্য! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? যে কর্নেলসাহেবকে কতবার সেধেছি পলাশতলিতে আমার কুটিরে একবার পায়ের ধুলো দিতে, কিন্তু আজ অবধি তার সম্ভাবনা দেখিনি; আর হঠাৎ কিনা এই দুর্যোগে স্বয়ং তিনিই আমার বাড়ির বারান্দায় এসে হাজির!’’

কর্নেল তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, এবং হ্যান্ডসেক করার পর একটু হেসে বললেন, ‘‘এ তো বড়ো আশ্চর্য যোগাযোগ মিস্টার ব্যানার্জি! তা আপনি বন্দুক হাতে আমবাগানের ভেতর কোথায় গিয়েছিলেন? এই অক্টোবর মাসে তো বাগানে আম ফলার কথা নয়! কাজেই আম-চোরও পা বাড়াবে না৷’’

ভদ্রলোক বললেন, ‘‘কথা পরে হবে, আগে ভেতরে চলুন৷’’ বলে তিনি বাজখাঁই গলায় হাঁক দিলেন, ‘‘এই হোরে, হোরে!’’

আমাকে অবাক করে এতক্ষণে দরজা খুলে গেল এবং লণ্ঠন-হাতে একটা কালো কুচকুচে রোগাপটকা গড়নের লোক আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘এনারাই বুঝি তখন থেকে ডাকাডাকি করছিলেন?’’

মিস্টার ব্যানার্জি নামের ভদ্রলোক তেমনি হেঁড়ে গলায় ধমক দিয়ে বললেন, ‘‘ওঁরা ডাকাডাকি করছিলেন, অথচ তুই দরজা খুলিসনি কেন?’’

লোকটি কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘‘আজ্ঞে বড়োবাবু, আপনিই তো বলে গিয়েছিলেন অচেনা কেউ ডাকলে খবরদার দরজা খুলবি নে৷’’

ভদ্রলোক আবার হো-হো করে হেসে বললেন, ‘‘বুঝেছি, তোর কোনও দোষ নেই৷ আসুন কর্নেলসাহেব, ভেতরে আসুন৷ কাল থেকে এলাকায় বিদ্যুৎ নেই৷ ট্রান্সফরমারে বাজ পড়েছিল৷ কাল সন্ধ্যার দিকেও কতকটা এইরকম ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল৷ আপনারা বসুন৷’’

বলে তিনি টর্চের আলোয় বসার জায়গা দেখিয়ে দিলেন৷ তারপর হাঁক দিলেন, ‘‘অ্যাই হরিপদ, চিনে লণ্ঠনটা জ্বেলে নিয়ে আয়৷’’

টর্চের আলোয় ততক্ষণে দেখে নিয়েছি, এটা একটা প্রশস্ত হলঘরের মাপে বড়ো ঘর, ঘর ভর্তি পুরোনো আসবাবপত্র৷ দেওয়ালে বড়ো-বড়ো পেন্টিং আর দেওয়াল ঘেঁষে কয়েকটা বই-ভরা আলমারি৷ তাহলে কর্নেলের পরিচিত এই মিস্টার ব্যানার্জি একজন বনেদি পরিবারের লোক৷ কিন্তু এমন একটা জঙ্গুলে জায়গায় তাঁর পূর্বপুরুষ কেন এই বাড়ি তৈরি করেছিলেন, বোঝা যায় না৷ সেকেলে সোফায় বসে কর্নেল বললেন, ‘‘অকারণ টর্চের ব্যাটারি খরচ করে লাভ নেই৷ আলাপ করিয়ে দিই মিস্টার ব্যানার্জি, আমার এই তরুণ সঙ্গী দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী৷ আর জয়ন্ত, ইনি আমার পুরোনো বন্ধু মিস্টার সত্যকাম ব্যানার্জি৷’’

হরিপদ এতক্ষণে আলো নিয়ে এল৷ চিনা লণ্ঠনটিও আভিজাত্যের প্রতীক৷ এ ধরনের লণ্ঠন কলকাতার রাজবংশধরদের বাড়িতেই দেখেছি৷ এদিকে হরিপদর চেহারা আলোয় দেখে এবার মনে হচ্ছিল মাথায় খুঁটিয়ে কাটা সাদা চুল, আর সাদা পুরু গোঁফ৷ দেখে লোকটির বয়স অনুমান করা কঠিন৷ মিস্টার ব্যানার্জি তাকে বললেন, ‘‘হাঁ করে তাকিয়ে কী দেখছিস? ওঁরা আমার মাননীয় অতিথি৷ বুঝলি হোরে, উনি যে-সে লোক নন৷ উনি হলেন মিলিটারির একজন মস্ত বড়ো অফিসার কর্নেলসাহেব৷ উনি ঘন-ঘন কফি খান৷ কিন্তু তোর কিচেনে বোধ হয় কফি নেই৷’’

কর্নেল দ্রুত বললেন, ‘‘কফি থাক মিস্টার ব্যানার্জি৷ চা-ই যথেষ্ট৷’’

হরিপদ করজোড়ে নমস্কার করে ভেতরে চলে গেল৷

মিস্টার ব্যানার্জি কর্নেলের মুখোমুখি বসে বন্দুকটা চেয়ারের পাশে ঠেস দিয়ে রেখেছিলেন৷ তিনি বললেন, ‘‘সত্যি, আমি কল্পনাও করতে পারছি না, আমার এই নির্জন ডেরায় ঝড়বৃষ্টির মধ্যে অযাচিতভাবে আপনি এসে পড়বেন৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হাইওয়েতে বটতলায় জয়ন্তের গাড়িটা লক করা আছে৷’’

মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘থাক৷ বৃষ্টি একটু কমলে জয়ন্তবাবু গাড়িটা এখানে নিয়ে আসবেন৷ গেট খুলে দেব, ভিতরে গাড়ি রাখার জায়গা আছে৷’’

কর্নেল বিব্রতভাবে বললেন, ‘‘আসলে আমরা যাচ্ছিলুম বিজয়গড়...৷’’

মিস্টার ব্যানার্জি তাঁর কথার ওপর বলে উঠলেন, ‘‘ও হোঃ, সেই হাড়কেপ্পন, আমার চেয়েও বদমেজাজি অলকেশ সোমের বাড়ি? আবার বুঝি সে কোনও ঝামেলায় পড়েছে?’’

কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, ‘‘না মিস্টার ব্যানার্জি, ওদিকের কালুখালির বিলে নাকি বিশেষ এক প্রজাতির সারস এসেছে৷ এই সারসগুলোর গায়ের রং কালো, ঠোঁট গাঢ় লাল, মাথার ঝুঁটিও লাল, আর পা-দুটো যেমন অস্বাভাবিক লম্বা তেমনি লাল৷ শুধু বুকের দিকটা সাদা৷’’

মিস্টার ব্যানার্জি আগের মতো হো-হো করে হেসে উঠলেন, ‘‘কী সর্বনাশ! কালো সারস দেখার জন্যে আপনি এতদূরে পাড়ি জমিয়েছেন? তবে একটা কথা বলি শুনুন৷ ওই সোম যে শুধু আপনাকে কালো সারসের খবর দিয়ে কাছে ডেকেছে, আমার কিন্তু এ-কথা বিশ্বাস হচ্ছে না৷ সোমের কোনও মতলব নিশ্চয়ই আছে৷’’

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘কীসের মতলব?’’

মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘চা-ফা খান, তারপর বলছি৷’’ বলে তিনি বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে বৃষ্টির অবস্থা দেখে ফিরে এলেন৷ বললেন, ‘‘বৃষ্টি কমে এসেছে৷ জয়ন্তবাবু গাড়ির জন্যে যেন চিন্তা করবেন না৷ এই সত্যকামের সত্যের জোর এমনই যে এই তল্লাটে আমি যখন এসে পড়ি, তখন বজ্জাত লোকেরা তল্লাট ছেড়ে পালিয়ে যায়৷’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘তাহলে কি আপনি এখানে মাঝে-মাঝে এসে থাকেন?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আমার মনে পড়ছে আপনার সঙ্গে যখন কলকাতায় শেষবার দেখা হয় আপনি বলেছিলেন একটা নদীর ধারে জঙ্গলের ভেতর আপনার ঠাকুরদার বাগানবাড়ি ছিল৷ সেখানে আপনি মাঝে-মাঝে গিয়ে থাকেন৷’’

এই সময়েই হরিপদ একটা ট্রে-তে চায়ের পট, তিনটে কাপ-প্লেট আর দুটো প্লেটে চানাচুর আর আলুভাজা নিয়ে এল৷ সেন্টার-টেবিলে ট্রে রেখে সে বলল, ‘‘বড়োবাবু, চণ্ডী নিশ্চয়ই বিজয়গড়ে বাসের জন্য বসে আছে৷ বাস তো সেই রাত আটটার আগে ছাড়বে না৷ সাহেবদের জন্যে রান্নাবান্না চণ্ডী না এলে তো হবে না৷’’

কর্নেল চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘‘না হরিপদ, এ-রাতে আমাদের বিজয়গড়ে নেমন্তন্ন আছে৷ সেখান থেকে ফেরার পথে তোমার হাতের রান্না খেয়ে যাব৷’’

মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘বিজয়গড় এখনও ছ’কিলোমিটার দূরে৷ আজ যে প্রচণ্ড ঝড় হল তাতে হাইওয়েতে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে রাস্তা আটকে যেতে পারে৷’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘ব্যারিকেড দেখলে বরং আপনার এখানে ফিরে এসে আশ্রয় নেব৷ কিন্তু তেমন কিছু হলে বাসও তো আসবে না৷ হরিপদ চণ্ডীর কথা বলে গেল, সেও তো আসতে পারবে না৷’’

মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আপনি চণ্ডীকে চেনেন না৷ বাস আটকে গেলে সে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরবে৷ তাকে বাজার করতে পাঠিয়েছিলুম, কারণ বিকেলের দিকে বিজয়গড়ে মাছের বাজার বসে৷ কালুখালির ঝিল থেকে মাছ ধরে মেছো-মেছুনিরা বিকেলের বাজারে এসে ভিড় করে৷’’

এইসব কথা বলতে-বলতে চা খাওয়া শেষ হয়ে গেল৷ কর্নেল চুরুট ধরালেন৷ তারপর বাইরের দরজার দিকে টর্চের আলো ফেলে বললেন, ‘‘ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেছে৷ আমরা এবার উঠি মিস্টার ব্যানার্জি৷’’

মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘সোম আপনার প্রতীক্ষায় এতক্ষণ ছটফট করছে৷ যাবেন যখন যান; আপনাদের গাড়ি অবধি এগিয়ে দিয়ে আসি৷ যেতে-যেতে সোমের সাম্প্রতিক ঝামেলার কথা বলা যাবে৷’’

বলে তিনি ঘুরে বাজখাঁই হাঁক দিলেন, ‘‘এই হোরে, দরজাটা বন্ধ করে দে৷ আমি আসছি৷’’

আমরা বারান্দা থেকে নিচে নামলুম৷ হরিপদকে দেখলুম বারান্দায় হ্যারিকেন হাতে নিয়ে কেমন অবাক চোখে সম্ভবত কর্নেলকে দেখছে৷

ঝড়বৃষ্টি থেমে গেলেও সঙ্কীর্ণ রাস্তাটার দু’ধারের গাছ থেকে বিচ্ছিরি জল পড়ছিল৷ গাড়ির কাছে ফিরে স্বস্তি হল দেখে যে গাড়িটা কেউ নিয়ে পালায়নি৷ লক খুলে গাড়ির ভিতরে বসলুম৷ দেখলুম কর্নেলের একটা হাত ধরে মিস্টার ব্যানার্জি চাপা স্বরে তাঁকে কিছু বলছেন৷ তারপর কর্নেল গাড়ির সামনের সিটে আমার বাঁ-দিকে উঠে বসলেন৷ গাড়িতে স্টার্ট দিলুম৷ তখন মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘কর্নেলসাহেব, ফেরার সময় কিন্তু আপনাকে এই বাঘা ব্যানার্জির এলাকা দিয়ে যেতে হবে৷ জানেন তো এখানকার লোকে আমাকে আড়ালে বাঘা বাঁড়ুজ্যে বলে থাকে৷’’

গাড়ির শব্দে তাঁর অট্টহাসি হারিয়ে গেল৷

যেতে-যেতে জিগ্যেস করলুম, ‘‘আচ্ছা কর্নেল, এ-ভদ্রলোক সম্পর্কে আপনি কতখানি জানেন?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘সত্যকাম ব্যানার্জির সঙ্গে বছর-চারেক আগে কলকাতার হোটেল কন্টিনেন্টালে আলাপ৷ রুদ্রপুরের জমিদার বংশের এক ভদ্রলোক তাঁর মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে পার্টি দিয়েছিলেন৷ সেখানে বিজয়গড়ের অলকেশ সোম মিস্টার ব্যানার্জির সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেন৷ ভদ্রলোক একটু চড়া গলায় কথা বললেও বেশ হাসিখুশি মেজাজের মানুষ৷ ইনিও জমিদার বংশের লোক৷ আমাকে তাঁর ঠাকুরদার এই বাড়িটার কথা বলেছিলেন৷ এলাকায় একটা নদী আছে, তার ওপারে ঘন জঙ্গল৷ উনি আমাকে সেই জঙ্গলে বিরল প্রজাতির অর্কিড আর প্রজাপতির কথা বলেছিলেন৷ কিন্তু সে-কথা ভুলেই গিয়েছিলুম৷’’

বলেই কর্নেল হঠাৎ তাঁর প্রখ্যাত অট্টহাসিটি হাসলেন, ‘‘কথায় বলে না, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয়৷ আমরা একেবারে বাঘা বাঁড়ুজ্যের পাল্লায় পড়ে গেলুম৷’’

বললুম, ‘‘কর্নেল আমি কিন্তু ব্রিজ থেকে নামার সময়েই ঝড়ের পাল্লায় পড়ে ঠিক ওই বাংলা প্রবচনটি মনে-মনে আউড়েছিলুম; যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধে হয়৷’’

এই সময়েই দূরে সারবদ্ধ গাছপালার ফাঁক দিয়ে এক-জোড়া হেডলাইটের আলো দেখা যাচ্ছিল৷ কর্নেল তা লক্ষ্য করে বললেন, ‘‘চিয়ার আপ জয়ন্ত৷ মনে হচ্ছে রাত আটটার বাসটা আসছে৷ কাজেই পথে গাছের ডাল কোথাও ভেঙে পড়েনি৷’’

কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাস আমাদের পাশ কাটিয়ে প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে গেল৷ তারপর বললুম, ‘‘বাঘা বাঁড়ুজ্যে চুপি-চুপি মিস্টার সোম সম্পর্কে আপনার কানে কী ফুসমন্তর দিচ্ছিলেন, জানাতে আপত্তি আছে?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘না৷ সম্প্রতি বিজয়গড়ে বাংলাদেশ থেকে আসা কিছু চোরাই জিনিসপত্র ধরা পড়েছে৷ মিস্টার সোমের এক আত্মীয় নাকি এ-ব্যাপারে জড়িয়ে গেছেন৷’’

বললুম, ‘‘আমার কিন্তু আপনার ওই বাঘা বন্ধুর ব্যাপার-স্যাপার দেখে একটা খটকা লেগেছে৷ উনি সন্ধ্যাবেলায় প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির মধ্যে বন্দুক নিয়ে আমবাগানের ভিতরে কেন গিয়েছিলেন?’’

কর্নেল হাসলেন, ‘‘তা তুমি ওঁকে জিগ্যেস করলে না কেন?’’

‘‘সেটা অজ্ঞতা হত৷ কিন্তু ব্যাপারটা কি আপনার মনেও কোনও প্রশ্ন জাগায়নি?’’

কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘‘সব সময়েই সব কিছুতে সন্দেহপ্রবণ হলে অকারণে ঝামেলায় জড়িয়ে যেতে হয়৷ ঝড়বৃষ্টির মধ্যে রেনকোট পরে টর্চ আর বন্দুক নিয়ে একটা আমবাগানের ভেতর বাঘা বাঁড়ুজ্যে যদি সত্যিই কিছু কুকর্ম করে থাকেন তো সময়-মতো আমাদের কানে আসবে৷’’

একটু ইতস্তত করে আমি বললুম, ‘‘আমি কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি৷ টর্চের আলোয় ওঁর গামবুটের তলায়...’’

হঠাৎ আমি থেমে গেলুম৷ কর্নেল আমার কথার ওপর বলে উঠলেন, ‘‘কাদার সঙ্গে একটুখানি লালচে রং আমিও দেখেছি৷ তুমি যদি বলো ওটা রক্তের ছোপ, অর্থাৎ মিস্টার ব্যানার্জি কাউকে খুন করে কিংবা নিজের অজান্তে রক্ত মাড়িয়ে বাড়ি ফিরছিলেন, তাহলে যতক্ষণ না ঘটনাটা প্রকাশ পাচ্ছে ততক্ষণ শুধু আমরা দু’জনই সাক্ষী থাকছি৷ কাজেই ব্যাপারটা একেবারে চেপে যাও৷’’

কিছুক্ষণ পরে দূরে আলোর অজস্র ফুটকি দেখতে পেয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘‘ওটাই কি বিজয়গড়?’’

কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু জয়ন্ত, তুমি আমাকে সত্যিই ভাবিয়ে তুললে দেখছি৷ কাদামাখা লাল ছোপগুলো...নাঃ, আপাতত এ নিয়ে আর চিন্তা নয়৷’’ বলে কর্নেল হেলান দিয়ে চোখ বুজে চুরুট টানতে থাকলেন৷

দুই

অলকেশ সোম কর্নেলের জন্য সত্যিই ব্যগ্র প্রতীক্ষায় ছিলেন৷ তিনিও যে একজন বনেদি, বিত্তবান পরিবারের মানুষ তা বোঝা যাচ্ছিল৷ যদিও তাঁর বাড়িটির গড়নে বিদেশি স্থাপত্যের আদল আছে৷ বাড়ির চারদিকে দেশি-বিদেশি গাছপালা আর ফুলের বাগান৷ বিদ্যুতের উজ্জ্বল আলোয় বৃষ্টিভেজা রাতের প্রকৃতি ঝকমক করছিল৷ বুঝতে পেরেছিলুম মিস্টার সোম-এর রুচি আধুনিক৷ প্রশস্ত ড্রইংরুমের সোফায় বসে কর্নেল এবং মিস্টার সোম কিছুক্ষণ কালুখালির ঝিলের আগন্তুক কালো সারসের কথা আলোচনা করছিলেন৷ কফির স্বাদে টের পেয়েছিলুম, মিস্টার সোম কর্নেলের মতোই কফির ভক্ত৷ মানুষটির গড়ন ছিপছিপে, মাথা-ভরতি কাঁচাপাকা চুল, গোঁফদাড়ি একেবারে পরিষ্কার করে কামানো৷ পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি৷ আর তাঁর হাতের কালো ছড়িটি কোলের ওপর রাখা ছিল৷

পলাশতলির সত্যকাম ব্যানার্জির কথা শুনে মিস্টার সোম একটু গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, ‘‘এলাকার লোকে তাকে বলে বাঘা বাঁড়ুজ্যে৷ তিরিশ বছর আগে পলাশতলির নদীর ওপারের জঙ্গলে সতু একটা বাঘ মেরেছিল৷ সেই থেকে তার এই নামডাক৷ আমার সঙ্গে যদি তার সম্পর্কের কথা বলেন, তাহলে বলব আমরা দু’জনে পরস্পরের বন্ধু বটে, কিন্তু স্বার্থের প্রশ্ন এলে সতু একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায়৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘একটা ব্যাপার ঠিক বোঝা যাচ্ছে না৷ আমরা যখন বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচতে তাঁর বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলুম, তখন তিনি সামনের রাস্তার ওপরে একটা আমবাগানের ভেতর থেকে বন্দুক কাঁধে নিয়ে আসছিলেন৷ প্রশ্নটা আমি তুললেও তিনি এড়িয়ে গেলেন৷ প্রচণ্ড দুর্যোগের মধ্যে ওভাবে রেনকোট পরে বেরুনোর কারণ কী থাকতে পারে?’’

মিস্টার সোম হাসতে-হাসতে বললেন, ‘‘সতুর কিছু উৎকট বাতিক আছে৷ তার ওই প্রায় পোড়োবাড়িতে ধনরত্ন নেই যে চোর-ডাকাতরা লুঠ করতে আসবে৷ কিন্তু বাড়ির আনাচে-কানাচে কোথাও সন্দেহজনক কিছু টের পেলেই সে বন্দুক হাতে বেরিয়ে পড়ে৷ আমি নিজের চোখে দেখেছি; গত মার্চ মাসে কলকাতা থেকে ফেরার পথে ভাবলুম সতুর সঙ্গে একবার দেখা করে যাই৷ তখন রাত প্রায় ন’টা-সওয়া ন’টা হবে৷ দু’জনে বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে গল্প করছি, হঠাৎ সতু আমাকে অবাক করে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল৷ তারপর বন্দুক আর টর্চ-হাতে একলাফে বারান্দা থেকে নামল, তারপর রাস্তা ধরে প্রায় দৌড়তে থাকল৷ আমি হতবাক হয়ে বসে আছি তো আছিই৷ ভাবছি তখনই কেটে পড়ি, কারণ ইতিমধ্যে হরিপদ এসে দাঁড়িয়েছিল৷ সে বলল, বড়োবাবু বন্দুক নিয়ে বেরিয়েছেন তো, কখন ফিরবেন তা বলা কঠিন৷ হরিপদ অবশ্য তামাশা করেই বলছিল কথাটা৷ ওকে জিগ্যেস করলুম, তোমার বড়োবাবু কি প্রত্যেক রাতে এমনি করে বেরিয়ে পড়েন?

‘‘হরিপদ চাপাস্বরে মিটিমিটি হেসে বলল, প্রায়ই এইরকম করেন৷ কেন যে করেন কে জানে! গতরাতে বড়োবাবু ঠিক এমনি করে বেরিয়েছিলেন৷ ফিরেছিলেন প্রায় ঘণ্টাদুয়েক পরে৷ বাতিক বাবুমশায় বাতিক! যতদিন যাচ্ছে বড়োবাবুর হালচাল দেখে আমার বড্ড ভয় হচ্ছে৷’’

কর্নেল বলেছিলেন, ‘‘তা আপনার এ-ব্যাপারে কী ধারণা?’’

মিস্টার সোম বলেছিলেন, ‘‘ব্যাপারটা আমিও খুব ভেবেছি৷ ওকে একবার জিগ্যেসও করেছিলুম৷ ও শুধু বাঁকা হেসে বলেছিল, আমার বাড়িতে গুপ্তধন আছে ভেবে রাতবিরেতে কারা এসে ওত পাতে৷ পাতলে কী হবে, আমার চোখ বাঘের চোখ, আমার কান বাঘের কান৷’’

বলে মিস্টার সোম হেসে উঠেছিলেন৷ কর্নেল জিগ্যেস করেছিলেন, ‘‘মিস্টার ব্যানার্জি যখন কলকাতায় থাকেন, তখন তো চোর-ডাকাতরা অনায়াসে গুপ্তধন থাকলে তা হাতাতে পারে৷’’

‘‘না৷ আপনি তো চণ্ডীকে দেখেননি৷ চণ্ডীচরণও এক বাঘ-মানুষ৷ শুনেছি ওর কাছে নাকি চোরাই রিভলভার না পিস্তল কী একটা আছে৷ তবে চণ্ডীর তার মনিবের মতো কোনও বাতিক নেই৷’’

এইসব কথাবার্তার পর রাত দশটায় পাশের ডাইনিং রুমে খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা মিস্টার সোমের সঙ্গে গেস্টরুম, অর্থাৎ আমাদের থাকার ঘরে গিয়েছিলুম৷ ঘরটা একতলায় পূর্ব-দক্ষিণ দিকে৷ দু-ধারে দুটো খাটে বিছানা পাতা আছে, এবং স্ট্যান্ডে মশারি গোটানো আছে৷ বুঝতে পেরেছিলুম, এখানে মশার উপদ্রব আছে৷ কর্নেল পোশাক বদলে ঘরের উজ্জ্বল আলো নিভিয়ে এবং টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে কী একটা বই পড়তে শুরু করেছিলেন৷ এবং একবার আমার দিকে ঘুরে বলেছিলেন, ‘‘শুয়ে পড়ো জয়ন্ত৷ মশারি ভালো করে গুঁজে নিও৷ আবহাওয়া আরামদায়ক৷ ফ্যানের স্পিড কি একটু কমিয়ে দেব?’’

বলেছিলুম, ‘‘না থাক৷ ঠান্ডা লাগলে বেডকভার গায়ে চাপিয়ে নেব৷’’

ঘুম আসার আগে আমার মাথায় বাঘা বাঁড়ুজ্যের গামবুটের তলায় লেগে থাকা লাল রঙটা ক্রমশ ভয়াল হয়ে উঠছে দেখে ভেড়ার পাল গুনতে শুরু করেছিলুম৷ ঘুম না এলে ভেড়ার পালের দিকে মন দিতে হয়; এটা কর্নেলেরই মুখে শোনা কথা৷

সকালে ঘুম ভেঙে গেল কার ডাকাডাকিতে৷ তাকিয়ে দেখি বেঁটে গাবদা-গোবদা চেহারার একটা লোক চায়ের কাপ-প্লেট হাতে নিয়ে বিনীতভাবে ডাকছে, ‘‘বাবুমশায়, উঠে পড়ুন৷ চা এনেছি৷’’

উঠে বসে মশারি ফাঁক করে চায়ের কাপ-প্লেট নিলুম৷ জিগ্যেস করলুম, ‘‘তোমার নাম কী?’’

লোকটা তেমনই বিনীতভাবে বলল, ‘‘আমার নাম আজ্ঞে নাদু, ভালো নাম আজ্ঞে নন্দ৷ কিন্তু কর্তামশাই আমাকে নাদু বলেই ডাকেন৷’’

একটু হেসে বললুম, ‘‘তা নাদু, তুমি একটু কষ্ট করে এই মশারিটা গুটিয়ে ওপরে তুলে দেবে?’’

নাদু মশারিটাকে পরিপাটি গুছিয়ে খাটের মাথায় তুলে দিল৷ তারপর বলল, ‘‘কর্তামশাই আর কর্নেলসাহেব ভোরবেলা কালুখালি ঝিলের দিকে গেছেন৷’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘কর্নেলসাহেবকে কি তুমি চেনো?’’

নাদু সহাস্যে বলল, ‘‘তা আজ্ঞে চিনি বই কী৷ এই তো উনি গতবছরও এসেছিলেন৷’’

সেইসময় ভিতর থেকে কোনও মেয়ে ডাকছিল, ‘‘নাদুদা! ও নাদুদা! বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে৷ দুধ দুইবে কখন?’’

নাদু তখনই চলে গেল৷

বাড়িতে আর কে-কে আছে, তা তার কাছে জানার ইচ্ছে ছিল৷ কিন্তু কী আর করা যাবে? তারিয়ে-তারিয়ে বেড-টি খেতে-খেতে বুঝতে পারলুম, কর্নেলই আমার জন্য বেড-টি’র ব্যবস্থা করতে বলে গেছেন৷

কিছুক্ষণ পরে সংলগ্ন বাথরুমে প্রাতঃকৃত্যের পর জানলার পরদাগুলো সরিয়ে দিলুম৷ তারপর বাইরের দিকের দরজা খুলে বারান্দায় যেতেই দেখি সামনের বারান্দার নিচেই নুড়ি-বিছানো লনের দু-পাশে রঙবেরঙের ফুলের মেলা বসেছে৷ এ দিকটা পূর্ব৷ পাঁচিলের ধারে কয়েকটা গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে বারান্দায় পড়েছে৷ আমার ইচ্ছে হল, নুড়ি-বিছানো লন দিয়ে হেঁটে গিয়ে পাঁচিলের দরজাটা খুলি৷ কিন্তু একটু দ্বিধা হচ্ছিল৷ গেস্টরুমে আমার বোঁচকার মধ্যে রিভলভার আর কাট্রিজের বাক্স রেখেছি৷

ঠিক সেই সময়েই নাদু বারান্দা ঘুরে এদিকে এল৷ তাকে জিগ্যেস করলুম, ‘‘ওই দরজাটা খুলে বাইরে যাওয়া যায়?’’

সে একলাফে বারান্দা থেকে নেমে গিয়ে সটান দরজাটা খুলে দিল৷ তারপর একগাল হেসে বলল, ‘‘এটা পুকুর আজ্ঞে৷ ইচ্ছে হলে চলে যান৷ সিঁড়ি-বাঁধানো ঘাট আছে৷ ওখানে বসলে ভালো লাগবে আজ্ঞে৷’’

বেরিয়ে গিয়ে দেখি সত্যিই একটা মাঝারি গড়নের পুকুর৷ তার টলটলে স্বচ্ছ জলে অজস্র পদ্ম ফুটে আছে৷ পুকুরটার তিন পাড় কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা৷ তিন পাড়েই নানাধরনের সবজি-খেত৷ ঘাটের মাথায় দাঁড়িয়ে চোখে পড়ল, বিস্তীর্ণ ধানখেতের ওপর হালকা কুয়াশা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে৷ মিস্টার সোমের বাড়িটা তাহলে বিজয়গড়ের একেবারে শেষ প্রান্তে৷

কিছুক্ষণ পরে সালোয়ার-কামিজ পরা এবং গলায় ওড়না-জড়ানো একজন কিশোরী দরজা দিয়ে বেরিয়ে আমাকে দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল৷ একটু হেসে বললুম, ‘‘কী নাম তোমার?’’

সে একটু সলজ্জ ভাবে বলল, ‘‘আমি দীপা৷’’

‘‘মিস্টার সোম তোমার কে হন?’’

‘‘ঠাকুরদা৷’’

‘‘তোমার বাবার নাম কী? তিনি কি বাড়িতে আছেন?’’

‘‘আমার বাবার নাম অনুপম সোম৷ বাবা তো এখানে থাকেন না৷ আমিও থাকি না৷ বাবা চাকরি করেন৷ আমার মা সুজাতাও চাকরি করেন৷ বাবা ইঞ্জিনিয়ার, মা স্কুলের দিদিমণি৷ আমি কলকাতায় বাবা-মার কাছে থাকি৷’’

দীপার জড়তা কেটে গেল৷ সে ঘাটের সিঁড়ির ওপর এসে দাঁড়াল৷ কথায়-কথায় জানতে পারলুম, দীপা ইলেভেন ক্লাশের ছাত্রী৷ মায়ের স্কুলেই পড়াশোনা করে৷ পুজোর ছুটিতে ঠাকুরদার বাড়ি বেড়াতে এসেছে৷ মা এখনও এ-বাড়িতে আছে কিন্তু তার ইঞ্জিনিয়ার বাবার তো ছুটি নেই, তাই তিনি চলে গেছেন৷

এরপর সে হঠাৎ কর্নেলের প্রসঙ্গ তুলল, ‘‘আপনি তো কর্নেলদাদুর সঙ্গে এসেছেন৷’’

‘‘তুমি কর্নেলকে চেনো?’’

দীপা চোখ বড়ো করে বলল, ‘‘চিনব না? ঠাকুরদা কলকাতায় গেলেই আমাকে নিয়ে কর্নেলদাদুর বাড়িতে যান৷ কর্নেলদাদুর ড্রইংরুমটা যেন জাদুঘর৷ তাই না?’’

একটু হেসে বললুম, ‘‘তুমি ঠিকই বলেছ৷ তুমি কর্নেল সম্পর্কে আর কী জানো?’’

দীপা বলল, ‘‘কর্নেলদাদু আমার ঠাকুরদার মতোই পাখি, প্রজাপতি, অর্কিড, ক্যাকটাস;এইসব খুব ভালোবাসেন৷ এখানে উনি এবার আপনাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন৷ কিন্তু আপনি ওদের সঙ্গে ঝিলে পাখি দেখতে যাননি যে?’’

একটু হেসে বললুম, ‘‘পাখি আমি দূর থেকে দেখতে ভালোবাসি৷’’

দীপা হঠাৎ একটু চঞ্চল হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘‘ওঃ, মনে পড়েছে৷ কাল রাত্তিরে মায়ের কাছে শুনেছি আপনি একজন সাংবাদিক৷ তাই না?’’

‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু তোমার মা আমার নাম বলেননি তোমাকে?’’

দীপা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘‘বলেছেন৷ আমি ভুলে গেছি৷’’

বললুম, ‘‘আমার নাম জয়ন্ত চৌধুরী৷’’

দীপা একটু হেসে বলল, ‘‘হ্যাঁ৷ আপনি জয়ন্তবাবু৷ জানেন, মা আপনার সব লেখা খুঁটিয়ে পড়ে৷ ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে; কর্নেলদাদু নাকি একজন ডিটেকটিভ৷ মা বলছিল, কর্নেলদাদু সঙ্গে থাকেন বলে আপনি সেই সব রহস্য-রোমাঞ্চ আপনার কাগজে লেখেন৷ জানেন, মা আপনিও এসেছেন শুনে খুব খুশি৷ আমাকে বলল, তুমি গিয়ে ওঁর সঙ্গে আলাপ করে এসো৷’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘তোমার মা এলেন না যে?’’

দীপা মৃদুস্বরে বলল, ‘‘ক’দিন থেকে মায়ের শরীর ভালো নেই, জ্বর হয়েছে৷ এখানে তো ভালো ডাক্তার নেই, তাই বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না৷ মা বলেছে আপনার সঙ্গে আলাপ করবে৷ কিন্তু আপনাকে একটু কষ্ট করে দোতলায় যেতে হবে৷’’

হাসতে-হাসতে বললুম, ‘‘তাই বলো! তোমার মা আমাকে দেখতে চেয়েছেন?’’

দীপা খুশি হয়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ৷ আপনি কি এখন যেতে পারবেন?’’

একটু ভেবে নিয়ে বললুম, ‘‘কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলো৷ তোমার কর্নেলদাদু ফিরলে তখন আমি যাব৷’’

দীপা তখনই চলে গেল৷ ভাবলুম, যাক! তাহলে এখানে অন্তত এসে আমার লেখার একজন পাঠিকা পাওয়া গেল৷

তারপরই দেখলুম পূর্বে কাঁটাতারের বেড়ার একটা অংশ দরজার মতো খুলে গেল, এবং ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে পুকুরপাড়ে ঢুকলেন কর্নেল এবং মিস্টার সোম৷ তাঁরা কাছে এলে বললুম, ‘‘মর্নিং কর্নেল, মর্নিং মিস্টার সোম৷ আপনারা নিশ্চয়ই কালো সারসের দর্শন পেয়েছেন, আর কর্নেলও তাদের ছবি তুলতে পেরেছেন?’’

দু’জনেই ব্যাজার মুখে বললেন, ‘‘নাঃ!’’ তারপর মিস্টার সোম সোজা বাড়িতে ঢুকে গেলেন, আর কর্নেল ঘাটের মাথায় দাঁড়িয়ে আস্তে বললেন, ‘‘জয়ন্ত, কাল থেকে আমার যেন একটা দুঃসময় চলেছে৷’’

তাঁর হাবভাব লক্ষ্য করে বললুম, ‘‘আবার কি আপনি কোথাও কালো সারসের বদলে রক্তের ছোপ দেখে এলেন?’’

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, ‘‘কালুখালির ঝিলের কাছে শুধু রক্ত নয়, আস্ত একটা রক্তাক্ত ডেডবডি দেখে এলুম৷ সেখানে লোকের ভিড় ছিল৷ পুলিশের কাছে খবর পাঠানো হয়েছে৷ কিন্তু আমরা বেলা আটটা অবধি অপেক্ষা করেও পুলিশের পাত্তা নেই৷ কালুখালি গ্রামের চৌকিদার লাশটা পাহারা দিচ্ছে৷’’

অবাক হয়ে কথাগুলো শুনছিলুম৷ বললুম, ‘‘একটু ডিটেলস-এ বলুন না৷’’

কর্নেল তেমনি চাপাস্বরে বললেন, ‘‘লাশটা একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোকের বলেই মনে হল৷ কারণ তাঁর পরনে প্যান্ট-শার্ট, জুতো আছে৷ আপাতদৃষ্টে আমার মনে হয়েছে ভদ্রলোকের বুকে দুটো গুলি করা হয়েছে৷ তারপর একটা ছেঁড়া তেরপলে জড়িয়ে কারা ঝিল থেকে প্রায় কুড়ি মিটার দূরে ঝোপের মধ্যে লাশটা ফেলে পালিয়েছে৷’’

‘‘পালিয়েছে মানে?’’

‘‘তা ছাড়া কী বলব? সম্ভবত একদল জেলে ঝিল থেকে উঠে আসছিল, কিংবা কালুখালির গ্রামের কোনও জেলের দল রাতের বেলায় মাছ ধরতে যাচ্ছিল৷ তেমন কিছু না হলে লাশটা যারা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের নিশ্চয়ই মতলব ছিল ঝিলের ঘন খাদের তলায় ওটা লুকিয়ে রেখে আসবে; যাতে ঘটনাটা চাউর হতে দেরি হয়৷ অর্থাৎ তারা হাতে কিছুটা সময় চেয়েছিল৷’’

বললুম, ‘‘খুনটা কি গতরাতে হয়েছে বলে মনে হল?’’

‘‘সম্ভবত বিকেলের দিকে অথবা সন্ধ্যায় ঝড়বৃষ্টির সময়ে ভদ্রলোককে খুন করা হয়েছে৷ চোখে দেখে যতটুকু মনে হল, বডিতে রায়গর মর্টিস শুরু হয়ে গেছে৷ কিন্তু আমার এই এক দুর্ভাগ্য জয়ন্ত; যেখানেই যাবে, তুমি লক্ষ্য করে থাকবে কেউ যেন আমার সামনে একটা রক্তাক্ত ডেডবডি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে৷’’

এবার হঠাৎ আমার চমক জাগল৷ বললুম, ‘‘কর্নেল, কাল সন্ধ্যারাতের পলাশতলিতে মিস্টার ব্যানার্জির গামবুটের তলায় কাদার সঙ্গে তাহলে আমরা রক্তই দেখেছিলুম৷’’

কর্নেল কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছেন এই সময় দীপা এসে তাড়া দিল, ‘‘কর্নেলদাদু, ঠাকুরদা বললেন; আপনাদের কফি রেডি৷ শিগগির আসুন৷’’

‘‘চলো৷’’ বলে কর্নেল ঘুরে পা বাড়ালেন৷ আমি তাঁকে অনুসরণ করলুম৷ এই সুন্দর প্রকৃতির মধ্যে আসার পর আবার একটা রক্তারক্তি ব্যাপার আমার মনকে ক্লিষ্ট করে ফেলেছিল৷

দীপা কর্নেলের একটা হাত ধরে হাসতে-হাসতে বলল, ‘‘জানেন কর্নেলদাদু, ঠাকুরদাকে যেই জিগ্যেস করেছি, কালো সারস দেখতে পেয়েছ? অমনি ঠাকুরদা তুম্ব মুখে বলল, কালো সারস-এর দর্শন পাওয়া কি সোজা কথা? ঠাকুরদাকে বললুম, কেন? তোমার আর কর্নেলদাদুর দু’জনেরই তো বাইনোকুলার আছে৷ ঠাকুরদাটা কেন যে হঠাৎ রেগে যায় বুঝি না৷ বলল, কর্নেল সাহেবকে ডেকে নিয়ে আয়, কফি জুড়িয়ে যাচ্ছে৷’’

তিন

আমরা গেস্টরুমে ঢুকে দেখলুম, মিস্টার সোম সোফায় বসে আছেন৷ মুখটা গম্ভীর৷ সেন্টার টেবিলে তিনটে কাপ-প্লেট, কফির পট আর স্ন্যাক্সের প্লেট রাখা আছে৷

কর্নেল টুপি খুলে টেবিলে রাখলেন৷ তারপর পিঠে আঁটা কিটব্যাগ খুললেন এবং গলা থেকে ঝুলন্ত বাইনোকুলার আর ক্যামেরা খুলে পাশের উঁচু টেবিলে রাখলেন৷

কফিতে চুমুক দিয়ে মিস্টার সোম বললেন, ‘‘আমাদের বিজয়গড় থানায় ফোন করেছিলুম৷ ডিউটি অফিসার বললেন, খবর পেয়ে ও সি. পুলিশ-ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে রওনা হয়ে গেছেন৷’’

কর্নেল কফি খেতে-খেতে হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ‘‘আপনি কি সত্যিই ভদ্রলোককে চিনতে পারেননি?’’

মিস্টার সোম তাঁর দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘‘চিনতে পারিনি, সেটা ঠিকই তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ভদ্রলোক সম্ভবত বিজয়গড়ের বাসিন্দা৷ আসলে এই সমৃদ্ধ গ্রামটা ক্রমশ শহর হয়ে উঠছে৷ ব্যবসা-বাণিজ্যও বেড়েছে৷ তার ফলে বাইরে থেকে অনেকে এখানে এসে বাড়ি করেছেন৷ অবশ্য বেশিরভাগই ব্যবসায়ী৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘যে রাস্তাটার ধারে আমরা বডিটা দেখে এলুম, সেটা কালুখালি গ্রাম পেরিয়ে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে বলতে পারেন?’’

মিস্টার সোম যেন একটু চমকে উঠলেন, ‘‘রাস্তাটা পলাশতলিতে ঢুকে বাঘা বাঁড়ুজ্যের বাড়ির পাশ দিয়ে হাইওয়েতে মিশেছে৷ আপনি বলছিলেন, বাঘাবাবুকে কাঁধে বন্দুক নিয়ে ঝড়বৃষ্টির সময় আমবাগানের ভেতর থেকে আসতে দেখেছেন৷ আমার মনে একটা খটকা লেগেছে৷ কফি খেয়ে নিন, তারপর বলছি৷’’

এবার চুপচাপ কফি খাওয়ার পর কর্নেল চুরুট ধরালেন৷ তারপর একটু হেসে বললেন, ‘‘সত্যকাম ব্যানার্জি, অর্থাৎ আপনার বন্ধু সতুবাবুর সঙ্গে কি এখানকার কোনও লোকের শত্রুতা আছে?’’

মিস্টার সোম হাসলেন না৷ গম্ভীরমুখে এবং চাপাস্বরে বললেন, ‘‘সতু ইদানীং বিজয়গড়ে এসে একটা কিছু করার তালে আছে৷ এখানে একটা ব্যবসা খুব লাভজনক৷ তা হল মাছের আড়তদারি৷’’

‘‘তিনি কি এ নিয়ে আপনার সঙ্গে কোনও কথাবার্তা বলেছেন?’’

‘‘বলেছেন৷ কিন্তু এখানকার একচেটিয়া মাছের কারবারি হল সুদর্শন সিংহ৷ লোকে বলে, সুদো শিঙি৷ হ্যাঁ, সিংহী মানে শিঙি মাছ অর্থেই বলছি৷ ওর হাতে গুন্ডা-মস্তান কম নেই৷ সতুকে আমি খুলেই বলেছি, জমিদার বাপের ছেলে তুমি, একে তো মাছের কারবারে হাতে গন্ধ হবে; তার ওপর ওই শিঙির কাঁটা৷ খামোকা এ-ব্যবসা করে ঝামেলায় পড়া ঠিক হবে না৷’’

কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘‘আমি যতটা জানি, মিস্টার ব্যানার্জির ব্যবসা করার কোনও দরকার নেই৷ ওঁর পিতৃদেব যে সম্পদ রেখে গেছেন, তাতে কয়েক পুরুষ হেসে-খেলে চলে যাবে৷ আর ব্যবসা করতে হলে মাছের ব্যবসাই বা কেন? এবং বিজয়গড়েই বা কেন? উনি তো কলকাতায় ভদ্রগোছের একটা কারবার খুলতেই পারেন৷’’

মিস্টার সোম সায় দিয়ে বললেন, ‘‘ঠিক এই কথাটাই আমি সতুকে বলেছি৷ কিন্তু সতুর মতলব বোঝা বড়ো কঠিন৷ আপনি হয়তো টের পেয়েছেন, লোকটা খেয়ালি স্বভাবের৷ কিন্তু তার চেয়ে বড়ো কথা, এ-এলাকায় এলেই সতু অনেক সময় লোকের সঙ্গে পায়ে-পা দিয়ে ঝগড়া করে৷ আক্ষরিক অর্থে নয়, আমি বলতে চাইছি সতু এই এলাকার অনেক লোককে চটিয়ে রেখেছে৷’’

কর্নেল চুপচাপ চুরুট টানতে থাকলেন৷ আমি বললুম, ‘‘কে একজন খুন হয়ে রাস্তার ধারে পড়ে আছে, তা নিয়ে মাথাব্যথা না করে কালো সারস দেখতে যাওয়াই কি উচিত না?’’

কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, মিস্টার সোম বলে উঠলেন, ‘‘জয়ন্তবাবু ঠিক বলেছেন৷ আসলে রক্তাক্ত লাশটা দেখার পর আমার কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল৷ তাই আমি কর্নেলকে এ-বেলার মতো ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি৷’’

কর্নেল তাঁর দিকে না তাকিয়েই বললেন, ‘‘ব্রেকফাস্টটা করার পর আমি বেরুব ভাবছি৷ আপনি গাইড না হলে আমার তো খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার অবস্থা হবে৷ বাইনোকুলারে দেখেছি ঝিলের মধ্যে জায়গায়-জায়গায় জলটুঙি আছে৷ কোন জলটুঙির জঙ্গলে আপনি আবিষ্কার করেছেন, আমাকে কে দেখিয়ে দেবে?’’

মিস্টার সোম ঠোঁট কামড়ে ধরে কী ভাবছিলেন৷ কর্নেলের কথা শুনে বললেন, ‘‘আমার এখন ওই ওখানে যাওয়ার একটু ঝুঁকি আছে৷ আপনাকে খুলেই বলছি৷ আমার এক পিসতুতো ভাই সুবিমল, বাজারে ইলেকট্রনিক গুডস-এর ব্যবসা করে৷ সম্প্রতি তার কোনও শত্রু পুলিশের কানে একটা বাজে কথা তুলেছে৷ ওর গোডাউনে নাকি স্মাগলড জিনিসপত্র আছে৷ বাংলাদেশের বর্ডার এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়, কাজেই পুলিশ সম্প্রতি ওর গোডাউনে হানা দিয়েছিল৷ তেমন কিছু পায়নি, কিন্তু ওই যে কথায় বলে, বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ৷ এখানে একজন এনফোর্সমেন্ট-এর ইনসপেক্টর এসেছেন৷ এই লোকটা বড্ড হ্যারাস করছে সুবিমলকে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘কিন্তু আপনি এখন আমার সঙ্গে ঝিলের দিকে গেলে আপনার ঝুঁকিটা কী?’’

মিস্টার সোম বাঁকা মুখে বললেন, ‘‘সুবিমলের শত্রুপক্ষের কেউ আমাকে ওখানে দেখলে ওই বদমেজাজি ইনসপেক্টরের কানে তুলতে পারে৷ তারপর বললেই হল, আমি সুবিমলের চোরা কারবারের সঙ্গে জড়িত৷ কালুখালির ঝিল পেরিয়েই তো বর্ডার থেকে চোরাচালানি জিনিস আসে৷’’

কর্নেল হেসে ফেললেন, ‘‘মাই গুডনেস! তাহলে এতক্ষণে বোঝা গেল আপনি ওই খুনোখুনির ব্যাপারটা চোরাচালান চক্রের লোকদের কাজ ভেবেই ভয় পেয়ে চলে এলেন৷’’

মিস্টার সোম হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ‘‘অতটা না হলেও, সুবিমলের ব্যাপারটা নিয়ে আমি তখন থেকে প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ভুগছি৷’’

নাদু এসে কফির ট্রে তুলে নিল, এবং বিনীতভাবে জিগ্যেস করল, ‘‘কর্নেল সাহেবরা কখন ব্রেকফাস্ট করবেন আজকে?’’

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, ‘‘ঠিক দশটায়৷ তারপর আমি আর জয়ন্তই বরং বেরুব৷ মিস্টার সোম শুধু আমাকে একটা রাফ ম্যাপ এঁকে দেবেন৷ তা থেকে যেন আমি হদিশ পাই, ঠিক কোন জলটুঙিতে আপনি কালো সারস দেখেছিলেন৷’’

নাদু চলে গেল৷ মিস্টার সোম হাত বাড়িয়ে উঁচু টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা প্যাড আর কলম বের করলেন৷ তারপর একটা ম্যাপ আঁকতে থাকলেন৷ আঁকার পর বললেন, ‘‘এই যে জলটুঙিটা এঁকেছি দেখছেন, ওটা সোজাসুজি নৌকোয় গেলে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে৷ কিন্তু একটু সাবধানে যাবেন, আমি লক্ষ্য করেছি; ওই সারসগুলো খুব ধূর্ত৷ কেউ তাদের লক্ষ্য করছে টের পেলেই গাছের আড়ালে গা ঢাকা দেবে৷’’

আমি জিগ্যেস করলুম, ‘‘ওখানে নৌকো ভাড়া পাওয়া যায়?’’

‘‘যায়৷ দিনের বেলাতে জেলেরা মাছ ধরে না তাই বাঁধের নিচে দেখবেন অনেক নৌকো বাঁধা আছে৷ যাকে বলবেন, সেই যেতে চাইবে৷ আর কর্নেলসাহেবকে দেখলে তো কথাই নেই, ওঁকে সাহেব ভেবে সবাই সাধাসাধি করবে৷ তবে একটা কথা বলে দিচ্ছি, ঘণ্টায় দশ টাকার বেশি এক পয়সাও দেবেন না৷ ওটা ওদের পক্ষে আশাতীত পাওনা৷’’

কর্নেলের হাতে ম্যাপটা গুঁজে দিয়ে মিস্টার সোম চলে গেলেন৷ আমি চাপাস্বরে বললুম, ‘‘কর্নেল, মিস্টার অলকেশ সোম যে আপনাকে কালো সারস দেখতে ডেকেছেন, এই ডাকার আড়ালে আমার মনে হচ্ছে ওঁর অন্য কিছু উদ্দেশ্যও আছে৷’’

কর্নেল চোখ বুজে সোফায় হেলান দিয়ে বললেন, ‘‘থাকতেই পারে৷ আর এই কথাটা শুধু তুমি বলছ না, তোমার মনে পড়তে পারে কাল সন্ধ্যায় ব্যানার্জিও বলছিলেন৷ যাই হোক, আমার সামনে একটা লাশ কেউ ছুঁড়ে ফেলেছে৷ এটা একটা চ্যালেঞ্জ জয়ন্ত৷ সত্যিই একটা চ্যালেঞ্জ৷’’

অবাক হয়ে বললুম, ‘‘কী আশ্চর্য! আপনি এসেছেন পাখি-টাখি দেখতে, কেউ কি আগে-ভাগে জানত যে আপনি ঠিক ওই পথেই পাখি দেখতে যাবেন? তাই সে একটা রক্তাক্ত লাশ ছুঁড়ে ফেলে আপনাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে৷ কর্নেল! আমার মনে হচ্ছে আপনাকে পাগলামিতে পেয়ে বসেছে৷’’

কর্নেল আস্তে বললেন, ‘‘জয়ন্ত, অলোকেশ সোম আমার এখানে আসার কথা তাঁর বন্ধুদের বা জানাশোনা লোকেদের কাছেও বলতে পারেন৷ প্রথম যে-বার এসেছিলুম, সে-বার তো আমাকে দেখতে এবং আলাপ করতে এখানকার অনেক ভদ্রলোক এসে জুটেছিলেন৷ সে এক বিরক্তিকর ব্যাপার৷ আমি অন্তত বার-তিনেক আসার পর ওঁদের কৌতূহল সম্ভবত মিটে গেছে৷’’

বলে কর্নেল অ্যাশট্রে-তে জ্বলন্ত চুরুটটা ঘষে নেভালেন৷ তারপর বাথরুমে গিয়ে ঢুকলেন৷ একটু পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে তিনি বললেন, ‘‘যাওয়ার সময় শিশিরে পথ যথেচ্ছ ভিজিয়ে দিয়েছিল; ফেরার পথে অবশ্য তা শুকিয়ে গেছে৷ কিন্তু আমার প্যান্টটা নোংরা করে দিয়েছে৷ আমি শুধু প্যান্টটা বদল করব৷ আর তুমি রাতের পোশাক বদলে নাও; সঙ্গে বুট এনেছ তো?’’

বললুম, ‘‘আপনার পরামর্শে যে স্লিপার কিনেছিলুম, সেটা এনেছি৷ আপনার হান্টিং বুটের চেয়েও এই জুতোগুলোর সুকতালা অনেক মজবুত৷’’

আমাদের সাজগোজ হয়ে যাওয়ার পর কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, ‘‘সঙ্গে তোমার ফায়ার আর্মসটাও লোড করে নেবে৷’’

একটু হেসে বললুম, ‘‘আমাদের প্রাইভেট ডিকেটটিভ হালদারমশাইয়ের মতো আমাকেও কি কারোর মাথার ওপর গুলি ছুঁড়ে ভয় দেখাতে হবে?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘কিছু বলা যায় না৷ তোমাকে বরাবর বলে আসছি জয়ন্ত, প্রকৃতি-জগতে ঢুকতে হলে নিজেকে একটু তৈরি করে নিতে হয়৷ কারণ প্রকৃতি আজকাল দুর্বৃত্তদের গোপন আস্তানা হয়ে উঠেছে৷ মিস্টার সোম বলছিলেন, ঝিলের ওইসব জলটুঙিতে জেলেরাও পা বাড়াতে ভয় পায়৷ সাপের ভয় তো আছেই, বুনো শুয়োর বা হিংস্র কোনও প্রাণীও থাকা সম্ভব৷ তবে আমি বাইনোকুলারে দেখে নিয়েছি সামনের একটা জলটুঙিতে একটা জেলে-নৌকো দাঁড় করানো ছিল, আর খানিকটা ফাঁকা জায়গায় কুঁড়ে ঘর করে কয়েকজন লোক, সম্ভবত তারা জেলে, উনুন জ্বেলে রান্নাবান্না করছিল৷’’

কিছুক্ষণের মধ্যে নাদু আর একটি ফ্রক পরা মেয়ে ট্রে-তে ব্রেকফাস্ট নিয়ে এল৷ কর্নেল বললেন, ‘‘আরে এলাহি কাণ্ড করেছ যে! এত লুচি খাবে কে?’’

ফ্রক পরা মেয়েটি চলে গেল৷ নাদু একগাল হেসে বলল, ‘‘সঙ্গে এসেছিল, ওটা আমার মেয়ে কর্নেল সাহেব৷ কিছুদিন হল কর্তামশাইয়ের হুকুমে ওকে এ-বাড়িতে কাজে লাগিয়েছি৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘এই এতটুকু বয়সে ওকে কাজে না লাগিয়ে স্কুলে লেখাপড়া শিখতে দাওনি কেন?’’

‘‘দিয়েছিলুম আজ্ঞে! দু-দুবছর ফেল মারলে৷ মেয়ের তো পড়াশোনায় মনই নেই! কী আর করি বলুন৷’’

ব্রেকফাস্টের পর আমরা দু’জনে পুকুরঘাটের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলুম৷ নাদু ভেতর থেকে দরজা আটকে দিল৷ পুকুরপাড় ধরে এগিয়ে কাঁটাতারের দরজাটা খুলে আমরা ধানখেতের ভিতর দিয়ে আলপথে হাঁটতে থাকলুম৷ শেষ অক্টোবরের সূর্য প্রখর রোদ ছড়াচ্ছিল৷ ভাগ্যিস বুদ্ধি করে মাথায় টুপি পরে নিয়েছিলুম৷ আলপথে কিছুদূর চলার পর একটা বাঁধ দেখতে পেলুম৷ বাঁধটার দু-ধারে ঘন-ঘন গাছ লাগানো হয়েছে৷ কিন্তু এখনও তাদের ছায়া দেওয়ার মতো বয়স হয়নি৷ বাঁধ ধরে মিনিট কুড়ি চলার পর একটা কাঁচা রাস্তায় পৌঁছুলুম৷ কর্নেল বললেন, ‘‘এই রাস্তাটা ডান দিকে ওই কালুখালি বসতির পর একটু চওড়া হয়েছে এবং সেখান থেকে মোরাম বিছানো হয়েছে৷’’

বলে কর্নেল হঠাৎ ডানদিকে ঘুরলেন৷ তারপর পথের ধারে ঝুঁকে পড়ে কী একটা জিনিস কুড়িয়ে নিলেন৷

জিগ্যেস করলুম, ‘‘কী ওটা?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘একটা পলা-বসানো রূপোর আংটি৷’’

অবাক হয়ে বললুম, ‘‘বলেন কী? ওখানে আংটিটা পড়ল কী করে?’’

কর্নেল এবার পুবদিকে ঘুরে হাঁটতে-হাঁটতে বললেন, ‘‘যার এ আংটি, সে জ্যোতিষে বিশ্বাস করে৷ কিন্তু প্রশ্ন হল, সে নিশ্চয়ই স্বেচ্ছায় আঙুল থেকে আংটি খুলে ছুঁড়ে ফেলেনি৷ যেভাবেই হোক এটা তার আঙুল থেকে পড়ে গেছে৷ কিংবা এমনও হতে পারে, কারও সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি বেধেছিল৷’’

বলেই কর্নেল হেসে উঠলেন, ‘‘আমরা যাচ্ছি দুর্লভ প্রজাতির কালো সারস দেখতে, আর হঠাৎ কিনা পথের ওপর ঝিলিক দিয়ে আমাকে ডাকল একটা পলা-বসানো রূপোর আংটি৷ জয়ন্ত, আমি এখন ভাবছি এ আংটির নিশ্চয়ই কোনও মাহাত্ম্য আছে৷’’

সকৌতুকে বললুম, ‘‘তাহলে ওটা আপনার আঙুলে পরে নিন৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘নাঃ, আমার আঙুলে এটা দেখতে পেলে যার আংটি হারিয়েছে সে যদি এসে চার্জ করে? বরং এটা আমার প্যান্টের পকেটেই থাক৷’’

এই সময়েই আমার চোখে পড়ল রাস্তার মাটিতে মোটরগাড়ির টায়ারের দাগ৷ বললুম, ‘‘কর্নেল, পুলিশের গাড়ির চাকার দাগ লক্ষ্য করেছেন?’’

‘‘তুমি বুদ্ধিমান৷ এই রাস্তায় এখন পুলিশের গাড়ি ছাড়া আর কোনও গাড়ির আসার কথা নয়৷’’

সামনে রাস্তাটা ডানদিকে একটু বেঁকেছে, সেখানে গিয়ে কর্নেল বাইনোকুলারে সামনেটা দেখে নিয়ে বললেন, ‘‘নাঃ, পুলিশের গাড়ি লাশ তুলে নিয়ে চলে গেছে৷ ওখানে আর কোনও লোক নেই৷’’

যেখানে কর্নেল আর মিস্টার সোম রক্তাক্ত লাশটা দেখেছিলেন, সেখানে পৌঁছতে প্রায় মিনিট-পনেরো লাগল৷ সেখানে একটা ঝাঁকড়া অশ্বত্থ গাছ দাঁড়িয়ে আছে৷ তার তলায় ঘন ঝোপঝাড়৷ কর্নেল বললেন, ‘‘ওই দ্যাখো জয়ন্ত, ঝোপগুলো এখনও দুমড়ে-মুচড়ে বিধ্বস্ত হয়ে আছে৷ হ্যাঁ, একটু রক্তের ছোপও দেখা যাচ্ছে৷’’

রক্ত দেখার ইচ্ছে আমার ছিল না৷ বললুম, ‘‘এখানে গোয়েন্দাগিরি না করে চলুন আমরা কালো সারসের খোঁজে এগিয়ে যাই৷’’

‘‘...এক মিনিট জয়ন্ত!’’ বলে কর্নেল সেই বিধ্বস্ত ঝোপের পাশ দিয়ে নিচের দিকে ঘন ঘাসের ভিতর ঝুঁকে পড়লেন৷ তারপর আপনমনে বলে উঠলেন, ‘‘ও মাই গড ! এখানে দেখছি আর-একটা আংটি৷ এটা রূপোর নয়, সোনার বলেই মনে হচ্ছে৷ আর...এক মিনিট৷’’ কর্নেল দ্রুত প্যান্টের পকেট থেকে আতসকাচ বের করে আংটিটা পরীক্ষার পর বললেন, ‘‘আমি জহুরী নই, কিন্তু আমার ধারণা এই আংটিতে যে রত্ন বসানো আছে, তা ক্যাটস আই; অর্থাৎ, বৈদূর্যমণি৷ জয়ন্ত, এটাই আশ্চর্য৷ দ্বিতীয় আংটিটাও কেন পুলিশের চোখে ঝিলিক না ছুঁড়ে আমার চোখে ছুঁড়ল, বুঝতে পারছি না৷’’

তিনি দ্বিতীয় আংটিটাও প্যান্টের পকেটে ঢোকালেন৷ তারপর পা বাড়ালেন৷ আমার মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছিল, কিন্তু কর্নেল এবার জোরে পা ফেলে হাঁটছিলেন৷ কিছুক্ষণ পরে রাস্তাটা শেষ হল একটা উঁচু বাঁধের নিচে৷ বাঁধে উঠে দাঁড়াতেই চোখ ঝলসে গেল, দিগন্ত-বিস্তৃত জলাশয়ে রৌদ্রের তীব্র প্রতিফলনে৷ বাঁধের নিচে সার-সার অনেক নৌকো বাঁধা ছিল৷ কর্নেলকে দেখে নৌকো থেকে লোকগুলো চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘আসুন, সাহেব৷’’

তারা যেন আমাদের জন্যই প্রতীক্ষা করছিল, এমনই তাদের হাবভাব৷

চার

কর্নেল যে নৌকোটা বেছে নিয়েছিলেন, তার মালিকের নাম প্রহ্লাদ৷ বয়েসে সে কর্নেলের মতোই বুড়ো৷ আমরা যখন নৌকোয় চেপেছি, তখন অন্য লোকেরা হাসি-তামাশা করে বলছিল, ‘‘প্রেহ্লাদখুড়োর নৌকোয় সাহেব, দেখবেন খুড়ো আপনাদের জলে ডুবিয়ে মারবে৷’’

হাল ধরে দাঁড়িয়ে প্রহ্লাদ ভেংচি কেটে বলেছিল, ‘‘ওরে, এই কালুখালির ঝিলে আমার জন্ম৷ বাবার সঙ্গে এই নৌকোয় এ-পর্যন্ত কত হাজার কুইন্টল মাছ ধরেছি তার হিসেব নিবি তো বিজয়গড়ের আড়তদার বাবুর কাছে যা৷’’

সামনের দিকে বসে বৈঠা টানছিল এক বলিষ্ঠ গড়নের যুবক৷ আমি ছইয়ের নিচে বসেছিলুম৷ কর্নেল ছইয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে সেই জলটুঙিটি সম্ভবত খুঁজছিলেন৷ তাঁর বাঁ-হাতে মিস্টার সোমের এঁকে দেওয়া মানচিত্র৷ ঝিলের জল স্বচ্ছ এবং কাজলকালো৷ কিছুদূর যাওয়ার পর ঢেউয়ে নৌকো দুলতে শুরু করেছিল৷ আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল৷ কর্নেল প্রহ্লাদখুড়োকে কেন জিগ্যেস করছেন না কোন জলটুঙিতে কালো সারস এসেছে? অগত্যা আমি কনেলকে বললুম, ‘‘কর্নেল, আমরা কোন জলটুঙিতে যাচ্ছি, এবং কেন যাচ্ছি খুড়োকে তা বলে দিন৷’’

কর্নেল কিছু বলার আগেই যুবকটি বলল, ‘‘আজ্ঞে স্যার, আপনারা পাখি দেখতে যাচ্ছেন তো? কালো-কালো প্রকাণ্ড সব পাখি৷ লাল টুকটুকে ঠোঁট, আর লম্বা-লম্বা লাল পা!’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘বাঃ তুমি তো ঠিক ধরেছ৷ তোমার নাম কী?’’

‘‘আজ্ঞে স্যার, আমার নাম নরেন্দ্র৷ আপনি জিগ্যেস করছেন, আমি কেমন করে জানলুম? বিজয়গড়ের সোমবাবুর সঙ্গে আমি ওই সাহেবকেও দেখেছি৷ আমাদেরই নৌকোতে চেপে ওনারা সে-বার পাখি দেখতে বেরিয়েছিলেন৷’’

এবার কর্নেল-এর হাসি শোনা গেল৷ তিনি বললেন, ‘‘নরেন্দ্রর তাহলে মনে আছে সে-কথা৷ কিন্তু তোমার বাবা তো সে-বার ছিলেন না৷’’

নরেন্দ্র বলল, ‘‘সাহেব, উনি আমার বাবা নন, খুড়ো৷ আপনি যে-বার গিয়েছিলেন, সে-বার এই নৌকোরই হালে ছিল আমার বাবা৷ বাবা ক’মাস আগে মারা গেছেন৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘যে পাখিগুলোর কথা তুমি বললে, সেগুলো সোমবাবু দেখে গেছেন৷ তিনি কার নৌকোয় গিয়েছিলেন?’’

‘‘আজ্ঞে স্যার, তারাপদর নৌকোয়৷ তবে আমি কী করে কালো পাখিগুলো দেখেছি, সে কথা শুনুন৷’’

বলে সে পিছনের দিকে ঘুরে আঙুল তুলে অনেক দূরে ঝাপসা একটা জলটুঙি দেখিয়ে দিল৷ তারপর ইনিয়ে-বিনিয়ে খুড়ো-ভাইপো মিলে সেখানে মাছ ধরতে যাওয়া এবং কালো সারস দেখার বিবরণ দিল৷

কর্নেল বললেন, ‘‘তাহলে তুমিই খুড়োকে বলো আমাদের সেই জলটুঙিটার কাছে নিয়ে যেতে৷’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘কেন, ম্যাপ দেখে আপনি বুঝতে পারছেন না? তা ছাড়া আপনার বাইনোকুলার তো আছেই৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ম্যাপে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না৷ তা ছাড়া সামনে কোনাকুনি সূর্যের ছটা জলে পড়েছে বলে বাইনোকুলারে স্পষ্ট কিছু দেখতে পাচ্ছি না৷’’

নরেন্দ্র তার খুড়োকে চেঁচিয়ে বলল, ‘‘খুড়ো, সাহেবরা কালো শামুক-খোলের মতো লম্বা পাখিগুলো দেখতে যাচ্ছেন৷ তুমি নৌকোর মুখটা একটু কোনাকুনি করো৷’’

এখন বাতাসের শব্দ আর জলের ছলাত-ছলাত শব্দ মিলে এমন অবস্থা হয়েছে যে চেঁচিয়ে না বললে কর্নেলও আমার কথা শুনতে পাবেন না৷ আমি হতাশভাবে নরেন্দ্রকে বললুম, ‘‘আর কতক্ষণ লাগবে হে?’’

সে বলল, ‘‘তা আজ্ঞে আধঘণ্টা তো লাগবেই৷ বাতাস যে উল্টো দিক থেকে বইছে৷’’

কিছুক্ষণ পরে কর্নেল হঠাৎ হাঁটু মুড়ে আমার পাশে বসে পড়লেন৷ তারপর চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘‘ওহে নরেন্দ্র, আমাদের সামনা-সামনি একটু বাঁ-দিকে যে জলটুঙিটা দেখা যাচ্ছে, সেখানে একটা নৌকো বাঁধা আছে দেখছি৷ নৌকোটা মাঝধরা নৌকো বলে মনে হচ্ছে না৷ দেখো তো তুমি চিনতে পারো কিনা! ওটা কার নৌকো?’’

নরেন্দ্র ঘুরে দেখে নেওয়ার পর একটু হেসে বলল, ‘‘আজ্ঞে ওটা রায়বাবুদের পানসি নৌকো৷’’

‘‘রায়বাবু কে? কোথায় বাড়ি তাঁর?’’

‘‘আজ্ঞে বিজয়গড়ের শ্যামলবাবুর শখের পানসি ওটা৷ মাঝে-মাঝে রায়বাবু বন্দুক নিয়ে ঝিলে হাঁস মারতে আসেন৷’’

‘‘সে কী! এখনকার আইনে পাখি বা জন্তু-জানোয়ার মারা নিষিদ্ধ৷ এমন বেআইনি কাজ করলে পুলিশও রায়বাবুকে গ্রেপ্তার করতে পারে৷’’

নরেন্দ্র বাঁকা হেসে বলল, ‘‘সাহেব, এই জল-জঙ্গলের দেশে আইন আর বে-আইন! কত শিকারি এসে বুনো হাঁস মেরে নিয়ে যায়৷ তবে এখন হাঁসের সিজিন নয়; আর কিছুদিন পরে রোদের তেজ কমলেই সারা ঝিলে বুনো হাঁসের মেলা বসে যাবে৷’’

কর্নেল বাইনোকুলারে সেই নৌকোটা দেখছিলেন৷ একটু পরে বললেন, ‘‘জয়ন্ত, সম্ভবত আমি ভুল দেখলুম না৷ ওই নৌকো থেকে জলটুঙিতে বন্দুক হাতে ঢুকে গেলেন যিনি, তিনি অবশ্যই পলাশতলির বাঘা বাঁড়ুজ্যে৷’’

বলে কর্নেল হেসে উঠলেন৷

নরেন্দ্রর কানে কথাটা গিয়েছিল৷ সে বলল, ‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ সাহেব, রায়বাবুর শখের পানসিতে মাঝে-মাঝে পলাশতলির বাঘাবাবুও থাকেন৷ আপনি ঠিকই দেখেছেন আজ্ঞে৷’’

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘বাঘাবাবুও কি বুনো হাঁস মারতে আসেন?’’

‘‘আজ্ঞে তা আসেন বই কী! শ্যমলবাবু আর বাঘাবাবু দু’জনেই বন্দুকবাজ৷’’

কর্নেল কিছুক্ষণ চুপচাপ চুরুট টানার পর বললেন, ‘‘নরেন্দ্র, তোমার খুড়োকে বলো; আমাদের নৌকো যেন ওই পানসির কাছে নিয়ে যায়৷’’

নরেন্দ্র বেজার মুখে বলল, ‘‘যাবেন তো চলুন, তবে ওঁরা দু’জনে লোক ভালো নয়৷’’

‘‘কেন?’’

‘‘আজ্ঞে সাহেব, গত বছর এমনি সময় ওনারা একটা জলটুঙিতে পানসি বেঁধেছিলেন৷ কলকাতা থেকে সে-বার দু’জন বাবুমশাই আপনার মতোই লম্বা যন্ত্র আর ক্যামেরা নিয়ে আমাদের নৌকো ভাড়া করেছিলেন৷ রায়বাবুর পানসি নৌকো দেখে ওনারা সেই জলটুঙিতে যেতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু একটু দূরে থেকে আমাদের নৌকো দেখামাত্র বাঘাবাবু বন্দুক তুলে বাঘের মতো হাঁক ছেড়েছিলেন, খবরদার ও দিকে যেন নৌকো না আসে৷ কলকাতার বাবুরা ভয় পেয়ে বলেছিলেন, দরকার নেই ঝামেলায় গিয়ে বরং আমরা অন্য জলটুঙির দিকে যাই৷’’

কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, ‘‘বাঘাবাবু আমার চেনা মানুষ৷ বন্ধুও বলতে পারো৷ তোমার খুড়োকে বলো, আমরা ওই পানসির কাছে যাব৷’’

নরেন্দ্র তার খুড়োকে চেঁচিয়ে কথাটা বলে দিল৷ কিন্তু আমাদের কানে এল, প্রহ্লাদখুড়ো চেঁচিয়ে না-না করছে৷

তখন কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে খুড়োকে বললেন, ‘‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই খুড়ো৷ পলাশতলির বাঘা বাঁড়ুজ্যে আমার বন্ধু৷’’

নৌকোর গতি পানসির দিকে ঘুরল৷ আমাদের নৌকো যখন জলটুঙিটা থেকে আনুমানিক তিরিশ মিটার দূরে, তখন একজন প্যান্ট-শার্ট এবং গামবুট পরা গাবদা-গোবদা চেহারার ভদ্রলোক বন্দুক-হাতে উঠে দাঁড়িয়ে যেন গর্জন করলেন, ‘‘এখানে নয়, এখানে নয়৷ এখানে এলে মাথা ফুটো করে দেব৷’’

বলে তিনি কাঁধে বন্দুকের কুঁদো রেখে নল আমাদের নৌকোর দিকে তাক করলেন৷ তখন কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে তেমনই বাজখাঁই গলায় বলে উঠলেন, ‘‘আমরা আপনার কাছেই যাচ্ছি৷ কারণ আপনার সঙ্গী যে ভদ্রলোক একটু আগে জঙ্গলে ঢুকেছেন, তিনি আমার বন্ধু মিস্টার সত্যকাম ব্যানার্জি৷’’

ততক্ষণে আমি কর্নেলের পাশে উঠে দাঁড়িয়েছি৷ পানসির রায়বাবু বন্দুকের নল নামিয়ে কী বললেন শোনা গেল না৷ কিন্তু তখনই জঙ্গলের ভিতর থেকে কাঁধে বন্দুক নিয়ে দৌড়ে এলেন সত্যকাম ব্যানার্জি, ওরফে বাঘা বাঁড়ুজ্যে৷ তিনি একটা গাছের পাশে দাঁড়িয়ে সহাস্যে বলে উঠলেন, ‘‘ওয়েলকাম, ওয়েলকাম, কর্নেলসাহেব৷ আসলে আমার বন্ধু শ্যামলেন্দু আপনাকে দেখেও চিনতে পারেনি৷’’

আমাদের নৌকো ততক্ষণে পানসির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে৷ শ্যামলেন্দু রায় জিভ কেটে বিব্রতমুখে বললেন, ‘‘স্যরি, আই অ্যাম ভেরি সরি কর্নেলসাহেব৷ আপনি যে বিজয়গড়ে এসেছেন এবং দুর্লভ প্রজাতির কালো সারস দেখতে এই ঝিলে আসতে পারেন, সতু আমাকে তা বলেছে৷ কিন্তু আসলে আমি আপনার নাম শুনলেও চোখে কখনও দেখিনি৷ সতু আপনার চেহারার বর্ণনা দেয়নি৷’’

তাকে থামিয়ে মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘শ্যামলেন্দু, তুমি শুধু পানসি চেপে ফুর্তি করেই ঘুরে বেড়াও৷ ডাঙায় তোমার বাহন মারুতি গাড়ি, আর জলে এই পানসি৷ আমার আশ্চর্য লাগছে, কর্নেলসাহেব বিজয়গড় এবং কালুখালির ঝিলে এই প্রথম আগন্তুক নন৷ গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবারই এখানে এসেছেন৷’’

শ্যামলেন্দু রায় আবার জিভ কেটে বললেন, ‘‘স্যরি, ভেরি স্যরি৷ আমি কানে শুনেছি আপনার কথা৷ আমাদের বিজয়গড়ে অলকেশ সোমের মতো আপনিও যে একজন নেচারোলজিস্ট, সে-কথা অবশ্য সতু আমাকে এখানে আসার পথে বলছিল৷’’

কর্নেলের নির্দেশে নরেন্দ্র নৌকোর গলুইয়ের সঙ্গে বাঁধা মোটা দড়িটা জলটুঙিতে নেমে একটা গাছের গোড়ায় টেনে বাঁধল৷ তারপরে কর্নেলকে নামতে সাহায্য করার জন্য সে হাত বাড়াল৷ কিন্তু কর্নেল একলাফে তার কাছে পৌঁছে গেলেন৷

মিস্টার ব্যানার্জি গতকাল সন্ধ্যার মতো হো-হো করে হেসে বললেন, ‘‘এবার সচক্ষে দেখলে তো শ্যামলেন্দু, কর্নেল সাহেবকে৷’’

শ্যামলেন্দু রায় মুখে বিস্ময় ফুটিয়ে বললেন, ‘‘ওহে সতু, লোকে তোমাকে আড়ালে বাঘাবাবু বলে৷ এ বয়েসেও চোখের সামনে যা দেখলুম, তা হল সত্যিকারের বাঘের ঝাঁপ৷’’

আমি ফোড়ন কাটলুম, ‘‘মিলিটারি বাঘের ঝাঁপ মিস্টার রায়৷’’

আমি তখনও নৌকো থেকে নামিনি৷ মিস্টার ব্যানার্জি তাঁর বন্দুকের কুঁদো আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘চলে আসুন জয়ন্তবাবু৷’’

আমি কর্নেলের মতো ঝাঁপ না দিয়ে সাবধানে পাড়ে উঠে গেলুম৷

কর্নেল বললেন, ‘‘মিস্টার ব্যানার্জিকে এখানে দেখব আশা করিনি৷ কারণ কাল সন্ধ্যায় ঝড়বৃষ্টির সময় যখন আপনার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলুম, তখন আপনি বলেননি যে মাঝে-মাঝে আপনিও এই ঝিলে বেড়াতে আসেন৷’’

মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আজ ভোরবেলা হঠাৎ শ্যামলেন্দু গিয়ে হাজির৷ সে বলল জেলেদের মুখে শুনেছে, এখনই কিছু বুনো হাঁসের ঝাঁক ঝিলে এসে গেছে৷ তা আপনি যাই বলুন কর্নেলসাহেব, যা কিছু নিষিদ্ধ, তার প্রতি আমার আগ্রহ বেশি৷ আজকাল শিকার-টিকার বেআইনি৷ কিন্তু অভ্যাস যাবে কোথায়? চুপিচুপি বলছি, এই শ্যামলেন্দুকে দেখছেন; সে-ও আইন ভাঙতে ওস্তাদ৷ সে বলল, তার এই পানসি নৌকোটা আগের বছরের মতোই কালুখালি গাঁয়ের নিচের জলায় রাখা আছে৷ ঝাড়পোঁছ করতে লোক পাঠিয়ে সে আমাকে নিতে এসেছে৷

‘‘কিন্তু কী সর্বনাশ ! কালুখালিতে তার গাড়ি একজন জেলের বাড়ির উঠোনে রেখে আমরা দু’জনে পানসির দিকে এগোচ্ছি, হঠাৎ পিছনে ঘরবাড়ি আর গাছপালার আড়ালে রাস্তা দিয়ে একটা পুলিশ ভ্যান আর একটা পুলিশের জিপগাড়ি চলে গেল৷ রঘুজেলের বউকে জিগ্যেস করলুম পুলিশ কেন রে? কী হয়েছে তোদের গ্রামে? রঘুর বউ বলল, একটা মানুষকে কারা খুন করে নাকি রাস্তায় ফেলে দিয়ে গেছে৷ তাকে জিগ্যেস করলুম যাকে খুন করেছে, তাকে কি তোরা কেউ চিনতে পেরেছিস? বউটি বলল, আজ্ঞে না বাবুমশায়৷ সবাই বলছে খুন হয়েছে একজন আপনাদেরই মতো ভদ্রলোক৷ আমি ব্যাপারটা দেখতে যেতে চাইলুম কিন্তু ওই শ্যামলেন্দু বড্ড ভীতু৷ সে বলল, ফুর্তি করতে বেরিয়ে ঝামেলায় পড়া ঠিক নয়৷’’

শ্যামলেন্দু বললেন, ‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ, কর্নেলসাহেব৷ ঝামেলা বলে না, খুনখারাপি আমি সহ্যই করতে পারি না৷’’

এতক্ষণে নরেন্দ্র বলে উঠল, ‘‘বাবুমশায়রা, এখানে কিন্তু বড্ড ছিনে জোঁকের উপদ্রব৷’’

বলে সে নগ্ন পা থেকে কয়েকটা জোঁক ছাড়িয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একলাফে তাদের নৌকোয় গেল৷

মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছে ছেলেটা৷ আমার পায়ে অবশ্য গামবুট আছে৷ আসুন পানসিতে বসবার চমৎকার ব্যবস্থা আছে৷ সেখানে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়া যাবে৷ তারপর কালো সারসের খোঁজে যাবেন৷’’

শ্যামলেন্দু বললেন, ‘‘আমার সঙ্গে স্টোভ আর চায়ের সরঞ্জাম আছে৷’’

বলে তিনি হাল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা হাফপ্যান্ট এবং গেঞ্জি পরা লোকটির উদ্দেশে বললেন, ‘‘ও মধু, আমাদের একবার চা খাওয়া৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ক্ষমা করবেন মিস্টার রায়, আমার হাতে সময় কম৷ আমি কালো সারসের দর্শন পাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে আছি৷ হঠাৎ বাইনোকুলারে মিস্টার ব্যানার্জিকে দেখতে পেয়েই আমি এখানে এসে পড়েছি৷’’

এই সময়েই পায়ে গামবুট এবং প্যান্ট-টি সার্ট পরা আমরা বয়সি এক যুবক জঙ্গলের ভিতর থেকে দৌড়ে এল৷ সে বলতে-বলতে আসছিল, ‘‘সতুকাকু, সতুকাকু, এখন হাঁসগুলো খুব কাছাকছি এসে পড়েছে৷’’

তারপর সে আমাদের দেখে থমকে দাঁড়াল৷

মিস্টার ব্যানার্জি বললেন, ‘‘আমাকে ক্ষমা করবেন কর্নেলসাহেব, এত কষ্ট করে যখন এসেই পড়েছি, তখন আইনভঙ্গ করে কয়েকটা বুনো হাঁস না নিয়ে যাব না৷’’ বলে তিনি যুবকটিকে অনুসরণ করলেন৷

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘ওই ছেলেটি কে মিস্টার রায়?’’

শ্যামলেন্দু বললেন, ‘‘ওই আমার ভাগ্নে৷ ওর নাম প্রতীক মজুমদার৷ বিজয়গড় কলেজেই পড়াশোনা করে৷ কিন্তু বড্ড ডানপিটে ছেলে৷ এইসব দুর্গম জল-জঙ্গলে, ও আমার ডানহাত বলতে পারেন৷’’

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘আমরা এবার চলি মিস্টার রায়৷ আপনি হয়তো শুনে থাকবেন, আমরা উঠেছি আমার বন্ধু অলোকেশ সোমের বাড়িতে৷’’

শ্যামলেন্দু আমার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘‘এঁর পরিচয় তো পেলুম না৷’’

‘‘আমার এই তরুণ বন্ধুর নাম জয়ন্ত চৌধুরী৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার সাংবাদিক৷’’

আমরা পরস্পর নমস্কার বিনিময় করলুম৷ ততক্ষণে নরেন্দ্র তাদের নৌকোটা পানসির সামনের দিকে এনেছে৷ কর্নেল এবং তাঁর পিছনে আমি পা-বাড়িয়েই নৌকোয় উঠলুম৷ অবশ্য আমাকে নরেন্দ্র ধরে না ফেললে টাল সামলাতে না পেরে জলে তলিয়ে যাওয়ার চান্স ছিল৷

আমাদের নৌকো এবার দক্ষিণমুখী হল৷ জলটুঙির পর আবার কিছুটা ফাঁকা৷ উত্তাল হয়ে উঠেছে ঝিলের জল৷ কারণ, ক্রমশ বাতাস বেড়েছে৷ কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘আচ্ছা নরেন্দ্র, আজ ভোরে তোমাদের গ্রামের কাছাকাছি রাস্তার ওপর খুন হয়ে যে-লোকটি পড়ে ছিল, তাকে তুমি দেখেছ?’’

নরেন্দ্র বলল, ‘‘দেখেছি সাহেব৷ ভয়ে কাউকে বলিনি৷ উনি বিজয়গড়ের সিংহীমশায়ের জামাই৷’’

পাঁচ

নরেন্দ্রর কথাটা শুনে আমি চমকে উঠেছিলুম৷ কর্নেলকে বলেছিলুম, ‘‘মিস্টার সোম মাছের আড়তদার এক সিংহী মশাইয়ের কথা বলছিলেন৷ সে ভদ্রলোক নাকি নিজেই শিঙি মাছ৷ কাঁটা ফোটালে যন্ত্রণায় ছটফট করতে হবে৷’’

কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে আমার দিকে চোখ কটমটিয়ে বলেছিলেন, ‘‘ফিরে গিয়ে শিঙি মাছের ঝোল খাবে৷ মুখটি বুজে থাকো৷’’

প্রায় আধঘণ্টা চলার পর নৌকো সেই জলটুঙিটার সামনে এসেছিল৷ বৈঠা ফেলে নরেন্দ্র মুখ ঘুরিয়ে জলটুঙিটা দেখতে-দেখতে বলেছিল, ‘‘ওই লম্বা-ঠেঙে কালো পাখিগুলো বড্ড চালাক, সাহেব৷ মানুষ দেখলেই গাছের ডগা থেকে পাতার আড়ালে লুকিয়ে যায়৷’’

নৌকোর হাল থেকে প্রহ্লাদখুড়ো বলেছিল, ‘‘অ্যাই নরেন্দ্র, বৈঠেতে বস৷ বড্ড ঢেউ দিচ্ছে৷’’

আমি লক্ষ্য করেছিলুম, কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে রেখে তাঁর ক্যামেরায় দ্রুত টেলিলেন্স পরিয়ে নিয়েছিলেন৷ তারপর উনি ক্যামেরা তাক করেছিলেন৷ জলটুঙি থেকে দূরত্ব তখন প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ মিটার৷ বার-দুয়েক শাটার টেপার ক্লিক শব্দ শুনেছিলুম৷ তারপর কর্নেল বলে উঠেছিলেন, ‘‘আর সুযোগ দিল না৷ সত্যিই ওরা বড়ো ধূর্ত৷’’

তারপর তিনি ঘড়ি দেখে নিয়ে নরেন্দ্রকে বলেছিলেন, ‘‘এবেলা আর জলটুঙিতে যাচ্ছি না৷ তোমার খুড়োকে বলো আমরা সোজা ফিরে যাব৷’’

ফেরার সময় অবশ্য বাতাস পিছনে ছিল, তাই বাঁধে পৌঁছুতে সময় লেগেছিল মোটে একঘণ্টা৷ একটা বেজে গেছে৷ একটানা নৌকোয় অতক্ষণ কাটানোর পর আমার একঘেয়ে লাগছিল৷ কর্নেল কারও সাহায্য না নিয়ে পাড়ে উঠেছিলেন৷ আমাকে অবশ্য নরেন্দ্র হাত ধরে ডাঙায় উঠিয়েছিল৷ তারপর প্রহ্লাদখুড়োকে টাকা মিটিয়ে এবং খুড়ো-ভাইপো দু’জনকে আরও দশ টাকা বকশিস দিয়ে কর্নেল পা বাড়িয়েছিলেন৷ ফেরার পথে কর্নেলকে জিগ্যেস করেছিলুম, ‘‘পানসি নৌকোটাকে ফেরার সময় দেখতে পাইনি৷ আপনি কি দেখেছেন?’’

কর্নেল বলেছিলেন, ‘‘বাইনোকুলার থাকার এই একটা সুবিধে৷ আড়ালের জিনিসও ধরা দিতে বাধ্য৷ হ্যাঁ;পানসিটা আমি দেখেছি৷ ওটা সেই জলটুঙির উত্তরে গা-ঢাকা দিয়েছিল৷ সম্ভবত রায়বাবু আর বাঘাবাবু দুই বন্ধুতে ওখানেই হাঁসের মাংস দিয়ে পিকনিক করবেন৷’’

আমি বলেছিলুম, ‘‘রায়বাবুর ভাগনেটিকে কিন্তু দুঃসাহসী বলা যায়৷ অমন ছিনে জোঁক আর সাপের ভয় তুচ্ছ করে দিব্বি ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে৷’’

কর্নেলকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল৷ আমার কথার ওপর কোনও মন্তব্য না করে তিনি কয়েক মিনিটের জন্য একবার যেখানে থেমেছিলেন; সেখানেই কাঁচা রাস্তার ধারে, ঝোপের ওপর সিংহীবাবুর হতভাগ্য জামাইয়ের রক্তাক্ত লাশ পড়ে ছিল৷ তবে নাঃ, কর্নেল আর কোনও আংটি খুঁজে পাননি৷

অলকেশ সোমের বাড়ি পৌঁছুতে প্রায় দেড়টা বেজে গিয়েছিল৷ তিনি পুকুরপাড়েই দাঁড়িয়ে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন৷ আমাদের দেখেই তিনি ব্যস্তভাবে জিগ্যেস করেছিলেন, ‘‘কর্নেলসাহেব, সাকসেসফুল তো?’’

কর্নেল মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘‘অন্তত দুটো ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছি৷ এইসঙ্গে আপনাকে বলা দরকার মনে করছি, আপনার বন্ধু বাঘা বাঁড়ুজ্যে বিজয়গড়ের শ্যামল রায়ের শখের পানসিতে চেপে একটা জলটুঙিতে বুনো হাঁস মারার তালে আছেন৷’’

সোম বললেন, ‘‘বুঝেছি৷ আবার ওই বজ্জাত রায়বাবু কালুখালির ঝিলে পাখিদের উত্যক্ত করতে গেছে৷ আপনাদের দেখে কাছে ডেকেছিল নাকি?’’

‘‘হ্যাঁ৷ প্রথমে বন্দুক তাক করে কাছে ডেকেছিলেন৷’’

মিস্টার সোম চমকে উঠেছিলেন৷ রুষ্ট-মুখে বলেছিলেন, ‘‘আপনাকে দেখেও বজ্জাতটা ওইরকম বদমাইশি করেছিল? অচেনা লোক দেখলেই এটা ওর স্বভাব৷ কিছুতেই পানসির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেবে না৷’’

‘‘আমাদের অবশ্য শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট খাতিরই করেছেন৷ কারণ আপনার বন্ধু সতুবাবু আমাদের দেখতে পেয়েছিলেন৷’’

‘‘ওদের পানসিতে চেপেছিলেন নাকি?’’

‘‘হ্যাঁ৷ চেপেছিলুম৷ রায়বাবু চা-পানে আপ্যায়িত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হাতে সময় কম, তাই ওখান থেকে কেটে পড়েছিলুম৷’’

আমি বলেছিলুম, ‘‘কর্নেল, রায়বাবুর ভাগনের কথা বললেন না?’’

মিস্টার সোম বলেছিলেন, ‘‘বলার দরকার নেই, আমি বুঝে গেছি৷ কারণ রায়বাবুর সন্তানাদি নেই৷ তাই ভাগনেকে বাড়িতে রেখেছেন, এবং বজ্জাতির তালিমও সম্ভবত দিচ্ছেন৷’’

সেই গেস্ট-রুমে ঢোকার পর মিস্টার সোম বলেছিলেন, ‘‘কর্নেল সাহেবের স্বভাবের কথা জানি৷ উনি মাসে চারবার স্নান করেন৷ তা জয়ন্তবাবু, আপনি যদি ইচ্ছে করেন, আমার পদ্মপুকুরের জল আপনাকে প্রচুর আরাম দেবে৷’’

কিন্তু আমার অসময়ে পুকুরের জলে স্নান করার ইচ্ছে ছিল না৷ কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা পাশের ডাইনিংরুমে গিয়ে লাঞ্চ সেরে নিয়েছিলুম৷ মিস্টার সোমের পৌত্রী দীপা আমাদের নিজের হাতে পরিবেশন করেছিল৷ তারপর বলেছিল, ‘‘জয়ন্তকাকু, আপনি কিন্তু মায়ের সঙ্গে একবার দেখা না করে আর কোথাও বেরুবেন না৷ এখনই যেতে বলছি না৷ কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নিন, তারপর যাবেন৷’’

জিগ্যেস করেছিলুম, ‘‘তোমার মায়ের জ্বর ছেড়েছে?’’

দীপা হেসে উঠেছিল, ‘‘ছাড়বে না! কর্নেলদাদু তো আছেনই, তাঁর সঙ্গে আপনি এসেছেন শুনেই মায়ের জ্বর গতরাত থেকেই কমতে শুরু করেছিল৷ এখন দিব্বি সুস্থ৷’’

খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা গেস্ট-রুমে এসেছি, এমন সময় নাদু এসে খবর দিল কর্তামশাইয়ের টেলিফোন এসেছে৷

মিস্টার সোম সম্ভবত কিছু গম্ভীর আলোচনার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, তাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘‘কার ফোন রে নাদু? বলে দে আমি এখন ঘুমোচ্ছি৷’’

নাদু কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘‘আজ্ঞে, থানা থেকে ফোন এসেছে৷’’

কথাটা শুনেই মিস্টার সোম ব্যস্তভাবে উঠে গেলেন৷

নাদু তাঁর পিছনে যাচ্ছিল৷ কিন্তু কর্নেল তাকে ডাকলেন, ‘‘নাদু, এখানে এসো৷ তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে৷’’

নাদু কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল৷ তার মুখে উদ্বেগের ছাপ লক্ষ্য করলুম৷ সে ঘরের মেঝেয় হাঁটু মুড়ে বসল৷

কর্নেল তাকে চাপাস্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘‘কালুখালির রাস্তায় একটা লাশ পাওয়া গেছে, শুনেছ তো?’’

নাদু আস্তে বলল, ‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ, কর্নেলসাহেব৷ খবরটা বিজয়গড়ে কে না শুনেছে?’’

‘‘লাশটা কার, তা কি কেউ বলছে?’’

নাদু এরপর উঁকি মেরে ভেতরের দরজা দিয়ে কেউ আসছে কিনা দেখে নিল৷ তারপর ফিসফিস করে ভয়ার্ত মুখে বলল, ‘‘শুনছি লাশটা নাকি সিংহীমশাইয়ের জামাইয়ের৷ সিংহীমশাই এখানকার মাছের আড়তদার৷ ওনার জামাই রঞ্জনবাবু তাঁর আড়ত থেকে লরি বোঝাই করে মাছ নিয়ে যান কলকাতার বাজারে৷ কিন্তু সে খুন হয়েছে নিজের দোষে৷’’

কর্নেল তেমনই চাপাস্বরে বললেন, ‘‘এ ব্যাপারে যদি কিছু জানো, তুমি আমার কাছে নিশ্চিন্তে খুলে বলতে পারো নাদু৷ আমি কারও কানে তুলব না৷’’

নাদু আর-একবার ঘুরে বাড়ির ভেতরটা দেখে নিয়ে তেমনি ফিসফিস করে বলল, ‘‘রঞ্জনবাবু তার মাছ বোঝাই লরির তলায় আমার কর্তামশাইয়ের পিসতুতো ভাই সুবিমলবাবুর চোরাই মাল লুকিয়ে নিয়ে যেত৷ তার শ্বশুর সিংহীমশাই এসব জানতেন না৷’’

নাদু হঠাৎ চুপ করল, কারণ মিস্টার সোম হস্তদন্ত এসে ঘরে ঢুকলেন৷ নাদুকে তিনি বললেন, ‘‘একবার ওপরে গিয়ে দ্যাখ তো সুজাতা তোকে ডাকছে৷’’

নাদু চলে গেল৷ কর্নেল বললেন, ‘‘থানা থেকে কে ফোন করেছিলেন মিস্টার সোম?’’

মিস্টার সোম সোফায় বসে একটু চুপ করে থাকার পর হতাশভাবে মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘আর আমি সুবিমলকে নিয়ে পারছি না৷ থানা থেকে ও. সি. ফোন করে বললেন, পলাশতলির কাছে হাইওয়েতে; পুলিশ সিংহীমশাইয়ের মাছের লরি আটক করেছিল৷ এটা কাল বিকেলে ঝড়বৃষ্টি আসার আগের ঘটনা৷ সিংহীমশাইয়ের মাছ কলকাতায় নিয়ে যায় তাঁর জামাই রঞ্জন বোস৷ রঞ্জন বেগতিক দেখে লরি থেকে নেমে পালিয়ে যায়৷ ওই তল্লাটে জঙ্গল আর আমবাগান প্রচুর৷ এদিকে পুলিশ লরি তল্লাশ করে তলার দিক থেকে কয়েকটা জাপানি ইলেকট্রিক গুডস খুঁজে পায়৷ ও. সি. আমাকে বললেন, তিনি আমার খাতিরে সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন উদোর পিণ্ডি যেন বুধোর ঘাড়ে চাপাবেন না৷ কারণ এই চোরাই মাল যে সুবিমলবাবুর কাছে কেনা বা তাঁরই পাঠানো, সে প্রমাণ আপাতত আমাদের হাতে নেই৷’’

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘ও.সি. নবারুণ বসাক আপনাকে কি সুবিমলবাবুকে সতর্ক করে দিতে বললেন?’’

মিস্টার সোম উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু আপনি ও.সি.-র নাম কোন সূত্রে জেনেছেন?’’

কর্নেল একটু থেমে বললেন, ‘‘আমার এই একটা বেয়াড়া অভ্যেস মিস্টার সোম৷ কলকাতা থেকে আমি যখনই বাইরে কোথাও যাই, যাওয়ার আগে সে-এলাকার পুলিশ-কর্তাদের জানিয়ে রাখি৷ কারণ আপনি তো আমার কিছু-কিছু কীর্তিকলাপের কথা নিশ্চয়ই জানেন৷’’

এবার মিস্টার সোমের মুখ থেকে উদ্বেগের ছাপ মুছে গেল ৷ তিনি হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ‘‘আপনার কীর্তিকলাপ আর জয়ন্তবাবুর তাই নিয়ে লেখা রোমাঞ্চকর রিপোর্টাজ পড়ে আমার বউমা আপনাদের দু’জনেরই ভক্ত, তা তো আপনি জানেন৷ বউমা এতদিন জয়ন্তবাবুকে এ-বাড়িতে দেখেনি৷ সে জয়ন্তবাবু এসেছেন শুনে—’’

কর্নেল তাঁর কথার উপরে বললেন, ‘‘জানি৷ ও কথা থাক৷ আপনি এখন বলুন, ও. সি. নবারুণকে কি আপনি আমার কথা বলেছেন?’’

মিস্টার সোম বললেন, ‘‘আমার তা বলার আগেই ও.সি. মিস্টার বসাক জানতে চাইলেন কর্নেলসাহেব পৌঁছেছেন কিনা৷ আমি তাঁকে বললুম, হ্যাঁ৷ গতরাত্রেই তিনি এসেছেন৷ আমার বাড়িতেই উঠেছেন৷ কারণ কর্নেলসাহেব আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু৷ যাই হোক, আমার সৌভাগ্যের কথা বলছি না, বলছি সুবিমলের সৌভাগ্যের কথা৷ এইসময় আপনি এসে পড়ায় সুবিমল ঝামেলা থেকে হয়তো রেহাই পাবে৷’’

কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, ‘‘সিংহীমশাইয়ের জামাই রঞ্জন বোসকে কি আপনি কখনও দেখেননি?’’

‘‘হয়তো দেখে থাকব, মনে পড়ছে না৷ কিন্তু বিজয়গড়ে অনেকে বলছে কালুখালিতে রাস্তার ধারে যে রক্তাক্ত লাশটা আমরা দেখেছিলুম, সেটা নাকি রঞ্জন বোসেরই লাশ৷’’

কর্নেল চোখ বুজে চুরুট টানছিলেন৷ আবার একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ আপনি লাশটা চিনতে পারেননি, কিন্তু জেলেদের অনেকেই চিনতে পেরেছে৷ ওটা রঞ্জনবাবুরই লাশ৷’’

মিস্টার সোমের মুখে আবার উদ্বেগের ছাপ ফিরে এল৷ তিনি বললেন, ‘‘কিন্তু আমি ভেবে পাচ্ছি না, রঞ্জনকে কে খুন করে তার লাশ ঝিলের জলে লুকোতে নিয়ে যাচ্ছিল৷ আমার খুব অবাক লাগছে৷ কে বা কারা ওকে খুন করতে পারে এবং তাকে খুনের উদ্দেশ্যই বা কী, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না৷’’

কর্নেল চোখ বন্ধ রেখেই বললেন, ‘‘সিংহীমশাই, অর্থাৎ সুদর্শন সিংহের এ-ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া কী, তা কি জানতে পেরেছেন?’’

‘‘হ্যাঁ৷ প্রতিক্রিয়া তো ভীষণই হবে৷ সে এলাকার দুর্বৃত্তদের একজন সর্দার৷ আর তার জামাই কিনা ওইভাবে খুন হয়ে যাবে? শুনলুম সিংহী তার বিষাক্ত কাঁটা তাক করে ছুটে বেড়াচ্ছে৷ আমার ধারণা আর কেউ কিছু না জানলেও সিংহী নিশ্চয়ই এই খুনের উদ্দেশ্য জানে৷’’

এই সময় নাদু এসে বলল, ‘‘কর্তামশাই, বউঠাকরান বললেন, একটু বাজারে যেতে হবে৷’’

‘‘বাজারে; কেন?’’

‘‘আজ্ঞে উনি লিস্টি করে দিয়েছেন৷ টাকাও দিয়েছেন৷ আমি এখনই বাজার থেকে আসছি৷’’

নাদু চলে গেল৷ তারপর কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন৷ এবং চোখ খুলে বললেন, ‘‘জয়ন্ত, তুমি কিছুক্ষণ ভাতঘুম দিয়ে নাও৷ তারপর তোমার ভক্ত পাঠিকার কাছে আশা করি দীপাই তোমাকে নিয়ে যাবে৷ আমি আর মিস্টার সোম একটু বেরুচ্ছি৷ ফিরতে দেরি হলেও তুমি নিঃসঙ্গ বোধ করবে না৷ তোমার পাঠিকা এবং তাঁর কন্যা তোমায় সঙ্গ দেবে৷ কী বলেন মিস্টার সোম?’’

মিস্টার সোম অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটু হেসে বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আপনি একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন জয়ন্তবাবু৷ দীপাকে বলে যাচ্ছি, সে ঠিক সময়ে এসে আপনাকে ঘুম থেকে ওঠাবে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘এবং দীপার হাতে থাকবে চায়ের কাপ-প্লেট৷’’

কিছুক্ষণ পরে দু’জনে বেরিয়ে গেলেন৷ আমি বিছানায় লম্বা হয়েছিলুম৷ দরজার কাছে দীপাকে দেখামাত্র চোখ বুজে ঘুমের ভান করলুম৷ চোখের ফাঁক দিয়ে দেখলুম, দীপা চলে গেল৷

তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে, আমার এই বিচ্ছিরি অভ্যেস৷ ঘুম ভাঙল দীপার ডাকে৷ তার হাতে সত্যিই চায়ের কাপ-প্লেট৷ সে মিষ্টি হেসে বলল, ‘‘মা আমাকে বলেছে জয়ন্তকাকুর হাতে কাপ-প্লেট দিবি নে যেন৷ উনি চায়ের কাপ-প্লেট ফলো করে আমার কাছে আসবেন আর আসলে এখানে বসে চা খাবেন৷’’

দীপা বড়ো অদ্ভুত মেয়ে৷ কিন্তু কী আর করা যাবে, তাকে অনুসরণ করে দোতলায় যেতে হল৷ তারপর চওড়া বারান্দায় দেখলুম ইজিচেয়ারে এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন৷ তাঁকে রুগ্ন দেখাচ্ছিল, কিন্তু তাঁর মুখে স্নিগ্ধ হাসি৷ কাছেই বেতের টেবিল এবং চেয়ার পাতা ছিল৷ দীপার মা মৃদু হেসে বললেন, ‘‘বসুন জয়ন্তবাবু৷ আপনাকে আমি মুখোমুখি দেখিনি, আমার শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে কর্নেলসাহেবের বন্ধুত্ব আছে৷ তাই যখন কর্নেলসাহেব এসেছেন, দৈবাৎ আমি এখানে থাকলে তাঁকে অনুরোধ করেছি, এবার এলে তিনি যেন আপনাকে সঙ্গে নিয়ে আসেন৷’’

দীপা টেবিলে চায়ের কাপ-প্লেট রাখল৷ তারপর আমি একটা চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বললুম, ‘‘তোমার পারমিশন নিলুম না দীপা৷ তুমি বলছিলে, মায়ের সামনে বসে চা খাবেন৷’’

সুজাতাদেবী বললেন, ‘‘কী আশ্চর্য! আমি তো এমন কিছু বলিনি৷ বলেছি তোর জয়ন্তকাকুর চা খাওয়া শেষ হলে আমার কাছে ডেকে নিয়ে আসবি৷’’

এই সময়েই সিঁড়ি বেয়ে হন্তদন্ত হয়ে এসে পড়ল নাদু৷ সে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘‘সিংহীমশাইয়ের চ্যালারা রায়বাবুর বাড়িতে বোমা মারতে গিয়েছিল৷ রায়বাবু ধূর্ত লোক৷ বাইরে থেকে ফিরেই পুলিশকে খবর দিয়ে রেখেছিল৷ তাই হাঙ্গামাটা আর বাধল না৷’’

ছয়

সুজাতাদেবীর সঙ্গে গল্প করছিলুম৷ নাদুর কথায় তিনি আমল দেননি৷ বলেছিলেন, ‘‘বিজয়গড়ে এসব কোনও নতুন ব্যাপার নয়৷ সুদর্শন সিংহ আর শ্যামল রায়-এর মধ্যে কী নিয়ে যে এত ঝামেলা হয়, কেউ খুলে বলতে পারে না৷ আমার শ্বশুরমশাইও মুখ খোলেন না৷’’

ততক্ষণে আলো জ্বলে উঠেছে৷ দীপা তার মা-কে তাড়া দিয়েছিল, ‘‘আর বারান্দায় থেকো না৷ ঠান্ডা লেগে আবার জ্বর আসবে৷’’

কিন্তু ভদ্রমহিলা কর্নেলের এবং আমার গল্প শুনতে এত আগ্রহী যে মেয়েকে পাত্তা দিচ্ছিলেন না৷ ভাগ্যিস সেই সময় নিচে মিস্টার সোমের সাড়া পাওয়া গেল৷ তিনি নাদুকে বলছিলেন, ‘‘শিগগির কফির ব্যবস্থা কর৷’’

এই সুযোগটা নিলুম৷ বললুম, ‘‘আমি গিয়ে দেখি, কর্নেল এখানকার একটা খুন-খারাপি নিয়ে নাক গলিয়েছেন৷ গিয়ে দেখি তিনি কতদূর এগোতে পেরেছেন৷’’

সুজাতাদেবী চাপা-স্বরে বললেন, ‘‘এবার আমার সৌভাগ্য যে আমার সামনেই কর্নেল আর আপনি একটা রোমহর্ষক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন৷ প্লিজ জয়ন্তবাবু, আমাকে আপনাদের কীর্তিকলাপ একটু-একটু করে জানাবেন৷’’

সিঁড়ি বেয়ে নিচে এলুম, তারপর দেখলুম কর্নেল গেস্টরুমের সামনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিস্টার সোমের সঙ্গে চুপি-চুপি কী কথা বলছেন৷ আমাকে দেখে মিস্টার সোম সহাস্যে বললেন, ‘‘জয়ন্তবাবু কি বউমাকে গল্প শোনাচ্ছিলেন?’’

বললুম, ‘‘হ্যাঁ৷ কী আর করব? কর্নেল আমাকে ফেলে গেলেন৷ একেবারে একা হয়ে পড়েছিলুম৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে গেলে তোমার ভাতঘুম নষ্ট হত, তা ছাড়া অকারণ উত্তেজনায় ব্যতিব্যস্ত থাকতে৷’’

কথাটা বলে তিনি পরদা তুলে গেস্টরুমে ঢুকলেন৷ নাদু ঘরের আলো জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিল৷ কর্নেল সোফায় বসে মাথার টুপি খুলে টেবিলে রাখলেন৷ তারপর টাকে হাত বুলোতে থাকলেন৷

মিস্টার সোম বললেন, ‘‘আমি এখনই আসছি৷’’

তারপর তিনি ভিতরে গেলেন৷ আমি কর্নেলের কাছাকাছি বসে জিগ্যেস করলুম, ‘‘নাদু বলছিল সিংহীবাবুর লোকেরা রায়বাবুর বাড়িতে বোমাবাজি করতে এসেছিল৷ বুদ্ধিমান রায়বাবু যেন টের পেয়েই পুলিশকে খবর দিয়ে রেখেছিল৷ তাই তেমন কিছু ঘটেনি৷ তো আপনি নিশ্চয়ই থানায় বসে খবরটা পেয়েছিলেন?’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু তুমি রায়বাবুকে বুদ্ধিমান বললে কেন?’’

‘‘বাঃ বুদ্ধিমান না হলে তিনি কি ব্যাপারটা আগেভাগে আঁচ করতে পারতেন?’’

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘‘কিন্তু রায়বাবুকে বুদ্ধিমান হতে হল কেন, তা কি ভেবে দেখেছ?’’

চমকে উঠে বললুম, ‘‘না তো! বুদ্ধিমান কথাটা আমার মুখ দিয়ে কেন যেন এসে গেল৷ তা ছাড়া নাদু খবরটা দিয়ে তখন বলছিল, রায়বাবু খুব ধূর্ত লোক৷’’

কর্নেল চাপাস্বরে বললেন, ‘‘কিন্তু মজার কথাটা ওই, রায়বাবু কালুখালির ঝিলে বাঘ-সিংহের মুখোমুখি হওয়ার আগেই নাকি থানায় জানিয়ে রেখেছিলেন, সিংহীবাবুর লোকেরা তাঁর বাড়িতে হানা দিতে পারে৷ এবং সেই খবরটা তিনি সিংহীবাবুর দলের একটা লোকের কাছ থেকেই জানতে পেরেছেন৷ ও.সি. আমাকে এইসব কথা জানানোর পর বলছিলেন, সিংহীমশায়ের পোষ্য দুর্বৃত্তদের মধ্যে ভানু নামে একটা লোক আছে৷ তাকে এলাকার লোকেরা একসময় গব্বর সিং বলে ডাকত৷ নবারুণ বসাক এখানে ও.সি. হয়ে আসার পর ওই গব্বর নামটা লোকের মন থেকে মুছে দিয়েছে৷ নবারুণ আমাকে বলল, সিংহীবাবু ভানুকে দলের নেতৃত্ব আর দেন না বলেই, ভানু তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ৷ কাজেই সে গোপনে রায়বাবুর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখে৷’’

আমি হেসে ফেললুম৷ ‘‘ডবল এজেন্ট বলুন৷’’

কর্নেল সায় দিলে বললেন, ‘‘ঠিক বলেছ, ডবল এজেন্ট৷ কিন্তু তার চেয়েও চমকপ্রদ খবর নবারুণের কাছে পেলুম৷ ভানু আজ সারাদিন নাকি কালুখালির ঝিলে রায়বাবুর সঙ্গী হয়ে কাটিয়েছে৷’’

বললুম, ‘‘কিন্তু তাকে তো আমরা পানসি নৌকোয় দেখিনি৷’’

কর্নেল আস্তে বললেন, ‘‘সে জলটুঙির জঙ্গলের আড়ালে ছিল৷ পুলিশ খবরটা পেয়েছে জেলেদের সূত্রে৷’’

‘‘অর্থাৎ জেলেদের মধ্যে তাহলে পুলিশের সোর্স আছে৷’’

‘‘থাকা স্বাভাবিক; কারণ ঝিলের ওদিকেই বর্ডার এলাকা৷ চোরাচালানের খবরা-খবর জেলেদের জানার কথা সবার আগে৷’’

এই সময় নাদু কফি আর স্ন্যাকস ট্রে-তে করে নিয়ে এল৷ মিস্টার সোম ঘরে ঢুকে বললেন, ‘‘কফি খান কর্নেলসাহেব৷ আপনার স্নেহভাজন ও.সি. মিস্টার নবারুণ বসাকের ঘরে কফি খেয়ে আমার জিভ এখনও জ্বালা করছে৷ ওঃ! একেই বলে পুলিশের কফি!’’ মিস্টার সোম তাঁর কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে হেসে উঠলেন৷

কর্নেল বললেন, ‘‘পুলিশের কফিটা সম্ভবত থানার লাগোয়া কোনও চায়ের দোকান থেকে তৈরি৷ কাজেই এর জন্য নবারুণকে কোনও দোষ দেওয়া যায় না৷’’

মিস্টার সোম জিভ কেটে বললেন, ‘‘আহা, আমি কি তাই বলেছি? এতক্ষণে আমার মন-মেজাজ অনেকটা হালকা হয়ে উঠেছে৷ শেষ পর্যন্ত খুনের দায়ে সিংহীবাবু আমার পিসতুতো ভাই সুবিমলকে ফাঁসিয়ে দেবে বলে খুব উদ্বিগ্ন ছিলুম৷ কিন্তু কর্নেলসাহেব—একটা কথা বোঝা যাচ্ছে না, সিংহীর জামাই বেচারা রঞ্জনকে কে বা কারা কী উদ্দেশ্যে খুন করল৷ ধরা যাক এর পেছনে রায়বাবুর হাত আছে; কিন্তু সে শ্বশুরকে না মেরে জামাইকে মারবে কেন?’’

আমি জিগ্যেস করলুম, ‘‘কিন্তু রায়বাবুর সঙ্গে সিংহীবাবুর বিবাদের কারণটা কী?’’

মিস্টার সোম বললেন, ‘‘বিবাদটা আসলে পৌর-রাজনীতি নিয়ে৷ সুদর্শন সিংহী বিজয়গড় পুরসভার হর্তা-কর্তা হতে চেয়েছিল৷ কিন্তু গতবছর পুরভোটে রায়বাবুর কাছে সে হেরে যায়৷ শ্যামলেন্দু রায় এখন পুরসভার চেয়ারম্যান৷ কাজেই বুঝতেই পারছেন, সিংহীর মন থেকে এখনও রাগ যায়নি৷’’

আমি অবাক হয়ে বললুম, ‘‘কথাটা শুনে আমার মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে৷ কালুখালির ঝিলে পানসি থেকে কর্নেলের দিকে যে লোকটা বন্দুক তাক করেছিল, সে কিনা বিজয়গড়ের পৌরসভার চেয়ারম্যান?’’

কর্নেল আমার দিকে চোখ কটমটিয়ে বললেন, ‘‘কী আশ্চর্য! তুমি তিলকে তাল করছ জয়ন্ত৷ রায়বাবু যে বন্দুক তাক করেছিলেন, ওটা তাঁর নিছক কৌতুক৷ তারপর তো আমাদের কীভাবে আপ্যায়ন করলেন, তা তুমি দেখেছ৷’’

এইসব কথাবার্তার মধ্যে কফি খাওয়ার পর্ব শেষ হল৷ কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘‘মিস্টার সোম, আমি এবার কথামতো সুদর্শন সিংহের সঙ্গে দেখা করতে যাব৷ আপনি তো তাঁর মুখোমুখি হতে চান না৷ শুধু একটা সাহায্য আপনার কাছে আমি চাইছি৷ যাওয়ার আগে ভদ্রলোককে একবার ফোন করতে চাই৷’’

মিস্টার সোম বললেন, ‘‘তাতে আমার আপত্তি নেই৷ ফোন করে যাওয়াই উচিত৷ সিংহীর জামাই খুন হয়েছে, তার মাথার ঠিক নেই৷ নেহাত ও.সি. মিস্টার বসাক তখন থানা থেকে ফোন করে আপনার সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দিলেন, তাই সে আপনার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছে৷ আসুন, ভিতরের ঘরে ফোন আছে৷’’

তাঁর সঙ্গে কর্নেল ভিতরে গেলেন৷ নাদু বাইরেই যেন ওত পেতে ছিল৷ সে কফির কাপ-প্লেট নিয়ে যাওয়ার জন্য ঘরে ঢুকল৷ তারপর সে ফিস-ফিস করে বলল, ‘‘বাবুমশাই, কর্নেলসাহেব যে এই রাতবিরেতে সিংহীর কাছে যাচ্ছেন, এটা আমার ভালো মনে হচ্ছে না৷ রায়বাবুরও হাতে বজ্জাত লোকজন আছে৷’’

বললুম, ‘‘নাদু, কর্নেলসাহেব মিলিটারির লোক, তা জানো তো? সারা জীবন যুদ্ধ করে কাটিয়েছেন৷’’

নাদু দ্বিধার সঙ্গে বলল, ‘‘তা শুনেছি আজ্ঞে৷ কিন্তু আমার ভয় ওই গব্বর সিং, মানে ভানুকে৷ লোকটা এখন দু-পক্ষেই ঘোরাঘুরি করে৷’’

কথাটা বলেই সে বেরিয়ে গেল৷ কারণ বারান্দায় মিস্টার সোম এবং কর্নেলের জুতোর শব্দ শোনা যাচ্ছিল৷ কিন্তু ভানু কেন কর্নেলের ক্ষতি করতে আসবে, বোঝা গেল না৷

কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন, ‘‘জয়ন্ত, পোশাক বদলে রেডি হয়ে নাও৷ সঙ্গে তোমার ইয়েটা নিতে ভুলবে না৷’’

‘ইয়ে’টা যে কী, তা তখনই বুঝতে পারলুম৷ হ্যাঁ, এমন পরিবেশে সশস্ত্র থাকাই উচিত৷

একটু পরে আমরা বেরুলুম৷ মিস্টার সোম কর্নেলকে পইপই করে সতর্ক করে দিলেন৷

সদর দরজার বাইরে গিয়ে দেখি একটা সাইকেল রিকশা দাঁড়িয়ে আছে৷ বোঝা গেল, মিস্টার সোম তাঁর কোনও লোককে দিয়ে রিকশাটার ব্যবস্থা করেছেন৷

বাইরের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট থেকে যে-আলো ছড়াচ্ছে, তা তত বেশি উজ্জ্বল নয়৷ আলোটা ঘিরে পোকামাকড় থিক-থিক করছে৷ আমরা সাইকেল রিকশায় উঠে বসলুম৷ মিস্টার সোম রিকশাওয়ালাকে বললেন, ‘‘মকবুল, সিংহীবাবুর বাড়িতে সাহেবদের পৌঁছে দিয়ে তুই অপেক্ষা করবি বাবা৷ ওঁদের দেরি হতেও পারে৷ তুই যেন চলে যাবি না৷’’

রিকশাওয়ালা মকবুল বলল, ‘‘বাবুমশায়, এই সাহেবকে আমি আপনার বাড়িতে আগেও দেখেছি৷ সাহেব আমার রিকশায় একবার চেপেও ছিলেন৷ আপনি চিন্তা করবেন না৷’’

রাস্তা খনাখন্দে ভরা৷ গাড়িতে এসেছিলুম বলে বুঝতে পারিনি৷ কিছুদূর এগিয়ে রিকশা বাঁ-দিকে ঘুরল৷ এই রাস্তাটা ভালো৷ দূরে প্রচুর আলো দেখা যাচ্ছিল৷ ওটা নিশ্চয়ই বাজার এলাকা৷ সেখানে পৌঁছুনোর আগেই মকবুল ডানদিকে একটা গলি-রাস্তার ভেতর ঢুকে রিকশা দাঁড় করাল৷ সে বলল, ‘‘এই যে স্যার, ডানদিকে এই যে দেউড়ি দেখছেন, ওটাই সিংহীবাবুর বাড়ি৷’’

রিকশা থেকে নেমে চোখে পড়ল, পুরোনো দেউড়ির মাথায় উজ্জ্বল আলো জ্বলছে৷ গেটের রেলিংয়ের দু-ধারে দু’জন লোক দাঁড়িয়ে আছে৷ কর্নেলকে গেটের সামনে দেখেই একজন ধুতি-পাঞ্জাবি পরা রোগাটে গড়নের ভদ্রলোক বারান্দা থেকে বললেন, ‘‘পঞ্চা, সাহেবরা এসেছেন, গেট খুলে দে৷’’

এরপর লন পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঁচু বারান্দায় উঠে গেলুম৷ সেই ভদ্রলোক কর্নেলের একটা হাত দু-হাতে জড়িয়ে ধরে কান্না জড়ানো গলায় বললেন, ‘‘আসুন কর্নেলসাহেব৷ আপনি অলকেশ সোমের বাড়ি এর আগেও এসেছেন শুনেছি৷ এবার এসেছেন হয়তো আমার ভাগ্যের জোরে৷’’

বুঝতে পারলুম ইনিই সেই বিষাক্ত শিঙি মাছ, অর্থাৎ সুদর্শন সিংহী৷ একচেটিয়া মাছের কারবারি৷ এঁর হাতে নাকি এক দঙ্গল গুন্ডা-মস্তান আছে৷ অথচ ভদ্রলোককে দেখে সেসব কথা কিছুই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছিল না৷

আমাদের দু’জনকে তিনি ঘরে নিয়ে গেলেন৷ মফস্বলের বনেদি ভদ্রলোকদের বসার ঘর যেমন হয়, এ-ঘরটাও তেমনি৷ সেকাল এবং একালের সহাবস্থান৷ আমাদের সোফায় বসিয়ে সুদর্শনবাবু চোখের জল মুছে বললেন, ‘‘আমাদের নতুন ও.সি. নবারুণবাবু খুব তেজি পুলিশ অফিসার৷ তা ছাড়া তিনি পক্ষপাতদুষ্ট মানুষ নন৷ বয়েস কম হলে কী হবে, ইনিই আমাকে টেলিফোনে আপনার বিশেষ পরিচয় দিয়েছেন৷ কর্নেলসাহেব, এলাকায় আমার অনেক দুর্নাম আপনি শুনতে পাবেন৷ আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন এলাকার জমিদারদের দেওয়ান৷ সেই বংশের ছেলে হয়ে আমি মাছের ব্যবসা করে হাত নোংরা করছি৷ এতেই যেন আমার মহাপাপ হয়ে গেছে৷ আসলে কী জানেন, ছোটোবেলা থেকে কালুখালির ঝিলে বাবার সঙ্গে নৌকোয় ঘুরে বেড়াতুম৷ বাবা ছিলেন শিকারি, কিন্তু আমি শুধু অবাক হয়ে জেলেদের মাছ ধরা দেখতুম৷ তখনকার মতো ঝিলে আর মাছ তত বেশি পাওয়া যায় না৷ কিন্তু কেন যে আমাকে মাছের নেশা পেল, আমি জানি না৷

‘‘যাই হোক, কর্নেলসাহেব; আমার সন্তান বলতে একটি মাত্র মেয়ে৷ তাই আমার জামাই রঞ্জন ছিল আমার উত্তরাধিকারী৷ আমার জামাই রঞ্জন আর ওই দুর্বৃত্ত শ্যামল রায়ের ভাগনের মধ্যে কোনও তুলনা হয় না৷ ওর ভাগনের বয়স কম হলে কী হবে, মামার সব দোষ সে ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছে৷ কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না রঞ্জনকে কেন খুন হতে হল৷ মর্গের রিপোর্টের খবর জানতে পেরেছি৷ ডাক্তারবাবুর মতে নাকি রঞ্জনের বুকে যে গুলিদুটো ছোঁড়া হয়েছিল, তা রিভলভারের৷ আমার সন্দেহ—’’

কর্নেল তাঁর কথার উপরে বললেন, ‘‘আমাকে প্রথমে একটা প্রশ্নের জবাব দিন৷ আপনার জামাইয়ের কি জ্যোতিষে বিশ্বাস ছিল?’’

সুদর্শনবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, ‘‘কেন বলুন তো?’’

‘‘রঞ্জনবাবু কি আঙুলে ধাতু-রত্নের আংটি পরতেন?’’

সুদর্শনবাবু নড়ে বসলেন৷ ‘‘ও হ্যাঁ৷ রঞ্জনের হাতের আঙুলে অনেক দামি রত্নের আংটি ছিল৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আপনার সন্দেহের কথা বলছিলেন৷ কাকে আপনার সন্দেহ হয় এবার বলতে পারেন৷’’

সুদর্শনবাবু একটু ভেবে নিয়ে চাপা-স্বরে বললেন, ‘‘আমার সন্দেহ, ওই শয়তান শ্যামলই ভাড়াটে খুনি দিয়ে রঞ্জনকে খুন করেছে৷ তারপর তার ডেডবডি বয়ে নিয়ে ঝিলের জলের তলায় লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিল৷ আমার হাতে খবর আছে কর্নেলসাহেব, আজ ভোরবেলা থেকে সন্ধ্যা অবধি শ্যামল তার পানসি নিয়ে ঝিলের জলে ফুর্তি করে বেড়িয়েছে৷ তার সঙ্গে জুটেছিল পলাশতলির জমিদারদের বংশধর, সেও এক দুর্বৃত্ত; তার নাম সত্যকাম ব্যানার্জি৷ এই সতুর সঙ্গে আমার কিন্তু কোনও বিবাদ নেই৷ কারণ আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন তার পূর্বপুরুষদেরই দেওয়ান৷ কিন্তু এই সতু ইদানীং শ্যামলের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় শুনেছি৷ জেলেরা আমাকে বলেছে, আজ শ্যামলের পানসিতে তার ভাগনে আর সতুও ছিল৷’’

কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন, ‘‘এবং আরও একজন ছিল৷ আমি কোন সূত্রে তার নাম জেনেছি, তা আপনাকে বলছি না; কিন্তু লোকটা আপনারই একজন অনুচর৷’’

সুদর্শনবাবু শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘‘তার নাম জানতে পেরেছেন?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আপনি অনুমান করুন বরং৷’’

সিংহীবাবু চোখ বুজে, ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘‘তার নাম কি ভানু?’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ লোকে তাকে নাকি একসময় গব্বর সিং বলত৷ তবে প্লিজ সুদর্শনবাবু, আপনি যেন এ-কথা কারুর কাছে বলবেন না৷ আমার ধারণা আগামীকালই আপনার জামাইয়ের খুনিদের আমি চিনে ফেলব৷’’

সাত

কথাটা বলে কর্নেল উঠে দাঁড়িয়েছিলেন৷ কিন্তু সুদর্শনবাবু ব্যস্তভাবে বললেন, ‘‘আপনি আসবেন বলে একটু কফি-টফির ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ তা ছাড়া আমারও যেন আরও বলার কথা ছিল৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘এইমাত্র কফি খেয়ে বেরিয়েছি৷’’

সুদর্শনবাবু বললেন, ‘‘তাহলে অন্তত একটু মিষ্টিমুখ করে যান৷ বুঝতেই পারছেন আমার বাড়িতে এখন কী অবস্থা চলেছে৷’’

কর্নেল অগত্যা বসলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘আমরা দু’জনেই মিষ্টি খাই নে৷ আপনি প্লিজ কী বলার কথা আছে তা বলতে পারেন৷’’

সুদর্শনবাবু কর্নেলের দিকে একটু ঝুঁকে চাপা-স্বরে বললেন, ‘‘আমার জামাই রঞ্জন একটা ফাঁদে পা দিয়েছিল৷ খুলেই বলি৷ তার মাছের লরির তলায় পুলিশ কিছু চোরাই বিদেশি ইলেকট্রনিক গুডস পেয়েছে৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন, রঞ্জন আমার অজান্তে মাছের লরির তলায় ওইসব জিনিস পাচার করবে; এটা অসম্ভব৷ আপনার বন্ধু সোমবাবুর পিসতুতো ভাই সুবিমল এসব জিনিসের কারবার করে৷ কিন্তু তারও সাহস হবে না রঞ্জনকে চোরাই মাল পাচারে রাজি করানোর৷ তা হলে কী করে ওই জিনিসগুলো রঞ্জনের লরির তলায় ঢুকল, আমি বুঝতে পারছিলুম না৷ অবশেষে আমার এক কর্মচারী, তার নাম দীননাথ; আমরা তাকে দীনু বলে ডাকি৷ সেই দীনু আমাকে আজ বলেছে, বজ্জাত রায়বাবুর কোনও লোক লরির ড্রাইভারকে হাত করে জিনিসগুলো তলায় রেখেছিল৷ রঞ্জন তো আর লরির তলায় কী আছে দেখেনি৷ লরির তলায় কলাপাতা বিছানো থাকে৷ তার ওপর মাছের টুকরি বোঝাই করা হয়৷ তারপর দেখুন, সেই কথাটা আবার পুলিশের কানে পাচার হয়েছিল৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আপনি বলতে চাইছেন, রায়বাবুই রঞ্জন এবং আপনাকে বিপদে ফেলার জন্য ড্রাইভারকে হাত করে এই কাজটা করেছিল?’’

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আমার আড়তে কথাটা কীভাবে রটেছিল জানি না, আমার কর্মচারী আর কিছু লোকজন তাই রাগের চোটে রায়বাবুর বাড়িতে হামলা চালাতে গিয়েছিল৷’’

‘‘এবং রায়বাবু তা জানতেন বলেই আগেভাগে পুলিশকে জানিয়ে রেখেছিলেন যে তাঁর বাড়িতে হামলা হতে পারে—এই তো?’’

সুদর্শন সিংহ জোর দিয়ে বললেন, ‘‘আপনি ব্যাপারটা ঠিক ধরেছেন৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘কিন্তু পুলিশের হামলার সময় রঞ্জনবাবু লরি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন শুনেছি৷ তারপরই নাকি কেউ বা কারা তাঁকে খুন করেছিল৷’’

সুদর্শনবাবু উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘‘কর্নেলসাহেব, আপনি জ্ঞানী মানুষ৷ এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, রঞ্জনকে একটা ফাঁদে ফেলে খুন করা হয়েছে৷ আমার বিশ্বাস, শয়তান শ্যামল এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিল৷ বেআইনি মাল রাখার দায়ে আমিও ধরা পড়ব, আর রঞ্জনকে প্রাণে মেরে আমাকেও অকেজো করে দেবে৷ আমার দুর্ভাগ্য—সে সফল হয়েছে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘তাহলে একটা কথা জানতে চাইছি৷ আশা করি খুলে বলবেন৷’’

‘‘নিশ্চয়ই বলব৷’’

‘‘আপনার জামাই খুন হয়েছেন পলাশতলিতে৷ আপনার কি সন্দেহ হয় যে সতু ব্যানার্জিরও এই ঘটনার পিছনে কোনও হাত আছে?’’

সুদর্শনবাবু জোরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘সতু ব্যানার্জির গায়ে জমিদারি রক্তের ধারা বয়ে যাচ্ছে৷ শ্যামল রায়ের সঙ্গে তার বন্ধুতার কারণ আমি জানি৷ ঝিলের জলে বুনো হাঁস শিকার করার স্বভাব তার হয়নি৷ তা ছাড়া সে খেয়ালি মানুষ৷ তবু সে আর যাই করুক; আমার জামাইয়ের গায়ে কেউ হাত দিক, এটা সে চাইবে না৷’’

কর্নেল এবার মৃদুস্বরে বললেন, ‘‘আপনার জামাই লরি থেকে ঝাঁপ দিয়ে যে-জঙ্গলে ঢুকেছিলেন, তার লাগোয়া মিস্টার ব্যানার্জির আমবাগান৷ আজ সকালে পুলিশ সেই আমবাগানের শেষপ্রান্তে একটা ছোট্ট মাটির ঘরে ঢুকেছিল৷ ওই ঘরে আমের মরশুমে একজন পাহারাদারকে রাখা হয়৷ ঘরের ভেতর বাঁশের মাচা আছে৷ সেই মাচার ওপর পুলিশ রক্তের দাগ দেখতে পেয়েছে৷ তার মানে আপনার জামাই ওই ঘরেই লুকোতে গিয়েছিলেন৷’’

কর্নেলের কথার ওপর সুদর্শনবাবু বললেন, ‘‘কর্নেলসাহেব, এমন কী হতে পারে না যে রঞ্জনের খুনিরা আগে থেকেই ওই ঘরে বা তার কাছাকাছি কোথাও অপেক্ষা করছিল? কারণ পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে হলে রঞ্জনকে ওখানেই কোথাও গা-ঢাকা দিতে হত৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আপনার অনুমান ঠিক৷ খুনিরা জানত, রঞ্জনের গা-ঢাকা দেওয়ার মতো ওই একটাই নিরাপদ জায়গা ছিল৷ হ্যাঁ, একটা কথা, মিস্টার ব্যানার্জির সঙ্গে আপনার জামাইয়ের কি পরিচয় ছিল?’’

‘‘তত বেশি না থাকলেও, মোটামুটি চেনাজানা ছিল৷’’

ইতিমধ্যে একটি লোক ট্রে-তে সাজিয়ে দু-প্লেট মিষ্টান্ন এনে দিল৷ কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘আমি আগেই বলেছি, আমরা সন্দেশ একদম খাই না৷ ডাক্তারের নিষেধ আছে৷ যাই হোক, আমি চলি৷ আপনাকে বলেছি, আগামীকালই আশা করি আপনার জামাইয়ের খুনিদের আমি চিনে ফেলতে পারব৷’’

সুদর্শনবাবু বললেন, ‘‘ভগবান আপনার মঙ্গল করবেন৷’’

আমরা গেট পেরিয়ে এসে দেখি রিকশাওলা মকবুল আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে৷ আমরা তার রিকশায় উঠে বসলুম৷ মকবুল জিগ্যেস করল, ‘‘সাহেবরা কি সোমবাবুর বাড়িতে ফিরবেন?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ তবে যেতে-যেতে তোমার সঙ্গে দু-একটা কথা বলতে চাই৷’’

মকবুল তার হাসিমুখটা ঘুরিয়ে একবার আমাদের দেখাল৷ তারপর রিকশার গতি কমিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘‘সাহেব, আপনি সিংহীমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাবেন শুনেই আমার সন্দেহ হয়েছিল, ওনার জামাইয়ের কথা শুনতেই আপনারা যাচ্ছেন৷ আমি খুব গরিব মানুষ স্যার৷ যদি কথাটা পাঁচকান না করেন, তাহলে বলতে পারি৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘তুমি নির্ভয়ে বলো মকবুল৷ তোমাকে আমি বকশিশ দেব৷’’

মকবুল তেমনই চাপাস্বরে বলল, ‘‘ভানু বলে একজন সাংঘাতিক গুণ্ডা আছে স্যার৷ সে এতদিন সিংহীমশাইয়ের চ্যালা ছিল৷ কিন্তু আমার কানে এসেছে যে সিংহীমশাইয়ের শত্রুপক্ষ রায়বাবুর কাছেও ইদানীং যাওয়া-আসা করে সে৷ গতকাল দুপুরবেলায় যখন মাছের লরির ড্রাইভার মাধব তার গ্যারেজ থেকে লরি বের করবে বলে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন আমার হঠাৎ চোখে পড়েছিল ভানু আর একটা অচেনা লোক লরির পিছন দিকে কলাপাতা বিছোচ্ছে৷ আমি রিকশার সিটে বসে ছিলাম, তাই দেখে সেই সময়ই আমার সন্দেহ হয়েছিল কলাপাতার নিচে কিছু প্যাকেট বোঝাই করা হয়েছে৷’’

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘তুমি কি জিনিসগুলো দেখতে পেয়েছিলে?’’

মকবুল বলল, ‘‘তা দেখাই বলতে পারেন, কারণ কলাপাতাগুলো উঁচু-নিচু হয়ে ছিল৷ ভানু আর সেই লোকটা মিলে কলাপাতাগুলো যখন সমান করার চেষ্টা করছিল, তখন আমি তো স্যার মোটে হাত দশ-পনেরো দূরে ছিলুম৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ভানুর সঙ্গে যে অচেনা লোকটা ছিল, তাকে তুমি আবার দেখলে চিনতে পারবে?’’

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ, নিশ্চয়ই চিনতে পারব, কারণ ভানুর চেয়ে সে যণ্ডাগণ্ডা৷ মাথায় বড়ো-বড়ো চুল৷ ভানু তো সব সময় খাকি হাফপ্যান্ট পরে থাকে৷ আর সেই লোকটার পরনে ছিল ফুলপ্যান্ট৷’’

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘তুমি রঞ্জনবাবুকে কাছ থেকে নিশ্চয়ই দেখেছ?’’

মকবুল উত্তেজিতভাবে বলল, ‘‘কাছ থেকে দেখব কী স্যার, তিনি তো আমার খুব চেনাজানা লোক৷ আমার রিকশায় চেপে কতদিন তিনি পিরের থানেও সিন্নি চড়াতে গেছেন৷ খুব ভক্ত মানুষ ছিলেন স্যার৷ তেমনি সাদাসিধে, আর কেমন যেন সব সময় আনমনা৷’’

‘‘এবার শেষ কথা, মকবুল৷ রঞ্জনবাবুর হাতের আঙুলে তুমি কতগুলো আংটি দেখেছ?’’

মকবুল হাসল৷ ‘‘হ্যাঁ, তাও বটে স্যার৷ দু’হাতের আঙুলেই অনেক আংটি পরতেন৷ তাতে আমার অনুমান, অনেক দামি রত্ন বসানো ছিল৷ রোদ্দুরে বা আলোয় উনি হাত নাড়লে চোখ ধাঁধিয়ে যেত ছটায়৷’’

ততক্ষণে আমরা মিস্টার সোমের বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছি৷ দেখলুম মিস্টার সোম বাইরের ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন৷ গেট অবধি স্পষ্ট সবকিছু দেখা যাচ্ছে, আলো এত উজ্জ্বল৷ মকবুলকে বিদায় দিয়ে কর্নেল চাপা-স্বরে বললেন, ‘‘আমার ধারণা ছিল, ভয়ের রঙ অন্ধকার৷ এখানে এসে আবিষ্কার করলুম ভয়ের রঙ উজ্জ্বল৷’’

কর্নেলের কথা শুনে হাসি পেয়েছিল৷ কিন্তু ততক্ষণে মিস্টার সোম আমাদের দেখতে পেয়ে বারান্দা থেকে লনে নেমেছেন৷ তিনি উত্তেজিতভাবে চাপা-স্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘‘কথা হল সিংহীর সঙ্গে?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ভদ্রলোকের সম্পর্কে আপনি যা বলছিলেন কিংবা এখানকার লোকের যা ধারণা, আমার কিন্তু তেমন সাংঘাতিক কিছু মনে হল না৷’’

মিস্টার সোম বাঁকা হেসে বললেন, ‘‘ওর দু’রকম রূপ আছে৷ আপনি তো বিষাক্ত কাঁটাওলা শিঙিকে দেখেননি৷ যাকে দেখে এলেন, সে একেবারে জেন্টলম্যান৷’’

বারান্দা দিয়ে আমরা গেস্টরুমে গেলুম৷ মিস্টার সোম জিগ্যেস করলেন, ‘‘সিংহীবাড়িতে কফি-টফি খেয়েছেন নাকি?’’

কর্নেল কে জানে কেন, পরিহাসের মেজাজে ছিলেন৷ মুচকি হেসে বললেন, ‘‘না৷ শিঙি মাছের ঝোল খেয়ে এলুম৷’’

‘‘অ্যাঁ বলেন কী?’’ বলে মিস্টার সোম নিঃশব্দে হেসে ফেললেন৷ তারপর বললেন, ‘‘তা হলে নাদুকে আর-এক রাউন্ড কফি করতে বলি?’’

‘‘হ্যাঁ, বলতে পারেন৷’’

মিস্টার সোম দরজার কাছে গিয়ে হাঁক দিলেন, ‘‘ও নাদু, সাহেবরা ফিরেছেন৷ শিগগির কফির ব্যবস্থা কর৷’’

তিনি ফিরে এসে কর্নেলের মুখোমুখি বসলেন৷ কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘আচ্ছা মিস্টার সোম, পলাশতলির মিস্টার ব্যানার্জি তো আপনার বন্ধু৷ আপনি তাঁর বাড়িতে গেছেন৷ তাই আপনাকে জিগ্যেস করছি, পলাশতলির ওই জমিদার বাড়িতে চণ্ডী নামে একটা লোক থাকে৷ তাকে আপনার চেনার কথা৷’’

মিস্টার সোম চোখ বড়ো করে বললেন, ‘‘ওরে বাবা ! চণ্ডী ! সে তো বাঘা বাঁড়ুজ্যের চেয়েও এক-কাঠি সরেস৷’’

‘‘একটু খুলে বলুন৷’’

‘‘চণ্ডীর নাম পুলিশের খাতায় না থাকতে পারে, কিন্তু এ তল্লাটের লোকেরা জানে চণ্ডী একজন সাংঘাতিক মানুষ৷’’

‘‘কী অর্থে সাংঘাতিক?’’

মিস্টার সোম সহাস্যে বললেন, ‘‘বাঘা বাঁড়ুজ্যে যদি হুকুম করেন তো সে প্রকাশ্যে মানুষের মুণ্ডু কেটে আনতে পারে৷ ওর অসাধ্য কিছু নেই৷ কিন্তু হঠাৎ চণ্ডীর কথা কেন কর্নেলসাহেব?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘তেমন কোনও কারণ নেই৷ আসবার পথে ঝড়বৃষ্টির সময় মিস্টার ব্যানার্জির মুখে চণ্ডীর নাম শুনেছিলুম৷ সে তখন আপনাদের এই বিজয়গড়ে কেনাকাটা করতে এসেছিল৷’’

মিস্টার সোম একটু চমকে উঠে বললেন, ‘‘ও হ্যাঁ, আমি বাজারে দেখেছিলুম বটে৷’’

এই সময় নাদু ট্রে-তে কফির পেয়ালা সাজিয়ে নিয়ে এল৷ আমরা কফি পানে মন দিলুম৷ নাদু দাঁড়িয়ে আছে দেখে মিস্টার সোম বললেন, ‘‘কী হল? কিছু বলবি নাকি?’’

আমার ধারণা—সম্ভবত নাদু কিছু বলত৷ কিন্তু সে চুপচাপ চলে গেল৷

কফি খাওয়ার পর কর্নেল বললেন, ‘‘আমি একবার থানায় নবারুণকে ফোন করব৷’’

মিস্টার সোম উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘আসুন৷’’

দু’জনে বেরিয়ে যাওয়ার পর, নাদু কোথায় যেন ঘাপটি পেতে ছিল, সে ঘরের ভিতরে ঢুকে ফিসফিস করে বলল, ‘‘বাবুমশায়, আমার ছোটোভাই তারক একটু আগে এসেছিল৷ সে আমাকে চুপিচুপি বলে গেল, কিছুক্ষণ আগে বাজারে একটা চায়ের দোকানে ভানু চা খাচ্ছিল৷ কথায়-কথায় ভানু চা-ওলা জগনকে বলেছিল, বাঘা বাঁড়ুজ্যের পোষা বাঘ আমার সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করেছে৷ বিজয়গড়ে যদি এবার তাকে পাই, তা হলে খুলি ফুটো করে দেব৷ কর্নেল সাহেবকে এই কথাটা যেন আপনি অবশ্য করে বলবেন৷ কারণ আমার কর্তামশাই তো দেখছেন বড্ড ভীতু মানুষ৷ আমি এইসব খুনোখুনির সাতে-পাঁচে আছি শুনলে উনি আমাকে ঘাড়-ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেবেন৷’’

জিগ্যেস করলুম, ‘‘আচ্ছা নাদু, একটা কথার জবাব দাও তো৷ সিংহীমশাইয়ের জামাই রঞ্জনবাবুর জন্য তোমার মনে যেন কষ্ট হয়েছে...তাই না?’’

নাদু আস্তে বলল, ‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন৷ আমাকে দেখলেই মিষ্টি হেসে কথাবার্তা বলতেন৷ আমি একজন চাকর-বাকর মানুষ স্যার৷ তবু রঞ্জনবাবু আমাকে কক্ষণও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন না৷ সিংহীমশাই বজ্জাত হতে পারেন, কিন্তু তাঁর জামাই যেমন, তেমনই তাঁর মেয়ে চন্দনাও খুব ভালো৷ রাস্তাঘাটে দেখা হলেই কথা না বলে ছাড়ত না৷’’

বারান্দায় কর্নেলদের পায়ের শব্দ শুনে নাদু ঘর থেকে ট্রে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল৷ আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছিলুম, নাদুর চোখের কোণায় জলের ফোঁটা টল-টল করছে৷ রঞ্জনকে আমি দেখিনি বা চিনি না, কিন্তু শোচনীয়ভাবে নিহত কোনও মানুষের জন্য অন্য কোনও মানুষের চোখে যদি জলের ফোঁটা দেখতে পাই, আমার মনটা কেমন করে ওঠে৷

কর্নেল ঘরে ঢুকে বসলেন৷ তারপর চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘‘জয়ন্ত, কাল সকাল সাতটায় তোমাকে কষ্ট করে উঠতে হবে; কারণ এই নাটকের শেষ দৃশ্যের পরদা আমি কালই তুলতে চাই৷’’

মিস্টার সোমকে কেমন যেন বিব্রত দেখাচ্ছিল৷ তিনি বললেন, ‘‘আমি শুধু একটা কথা ভাবছি৷ আপনারা আমার অতিথি৷ তা ছাড়া আপনি এসেছিলেন কালুখালির ঝিলে দুর্লভ প্রজাতির কালা সারস দেখতে৷ এখন আপনি যদি সিংহীবাবুর জামাইয়ের খুনিদের ধরিয়ে দেন, তাহলে আমার কোনও ক্ষতি হবে কিনা এই ভাবনা আমার মাথায় ঢুকেছে৷’’

কর্নেল সহাস্যে বললেন, ‘‘মোটেও না৷ রহস্যের পরদা আপনাদের বিজয়গড়ে তুলব না৷ যদি তা তুলতে পারি তবে অন্যত্র৷ তা ছাড়া আপনার চিন্তার কোনও কারণ নেই৷ আপনি তো এসব ব্যাপারে আমার সঙ্গে কোথাও যাতায়াত করছেন না৷’’

মিস্টার সোম ‘আসছি’ বলে বেরিয়ে গেলেন৷ আমি বললুম, ‘‘আপনি রহস্যের পরদাটা কি কালুখালির ঝিলে কোনও জলটুঙিতে তুলবেন?’’

কর্নেল চোখ বুজে চুপচাপ চুরুট টানতে থাকলেন৷ আমি জানি, কোনও ঘটনার চরম পর্যায়ে পৌঁছলে কর্নেল একেবারে ধ্যানস্থ হয়ে যান৷

আট

পরদিন কর্নেল ভোরবেলায় জোর করে ঘুম থেকে ওঠালেন৷ বললেন, ‘‘শিগগির তৈরি হয়ে নাও৷ আমরা ঠিক সাতটায় বেরুব৷’’

সেদিন রাতে ভালো ঘুম হয়নি৷ কিন্তু উপায় ছিল না৷ প্রাতঃকৃত্য সেরে পোশাক বদলে তৈরি হলুম৷ অবশ্য তখন সাড়ে-ছ’টা বাজে৷

কর্নেল বললেন, ‘‘ব্যাগেজ গুছিয়ে নাও৷ আমার সবকিছু গুছিয়ে নিয়েছি৷ সম্ভবত এখানে আর ফিরব না৷’’

কর্নেলের কথায় অবাক হয়েছিলুম৷ মাত্র একটা খুনোখুনির জন্য আমার প্রকৃতি-বিজ্ঞানী বন্ধু কালুখালির ঝিলে কালো সারসের মায়া ছেড়ে চলে যাবেন, বিশ্বাস হচ্ছিল না৷ মোটে তো দু’বার ক্যামেরায় কালো সারসের দুটি ছবি তুলেছেন৷

কথাটা জিগ্যেস করতে যাচ্ছি, মিস্টার সোম এসে গেলেন৷ তাঁকে দেখে বুঝলুম, তিনিও খুব ভোরে উঠেছেন৷ তিনি বললেন, ‘‘নাদু এখনই কফি নিয়ে আসছে৷ কিন্তু এ কী ব্যাপার? আপনারা জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলেছেন?’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘এখানে হয়তো আর এবারের মতো ফিরে আসা হবে না৷ কালো সারসের দুটো ছবি তুলেছি৷ জানি না কেমন হয়েছে৷ তবে ওরা ঝিলের জলটুঙি ছেড়ে সম্ভবত হিমালয়ের কোলে ফিরবে না৷ কারণ ঝিলে তাদের খাদ্যের অভাব নেই৷’’

সেই সময় নাদু ট্রে-তে কফি আর স্ন্যাক্স নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ ট্রে সেন্টার টেবিলে রেখে সে-ও অবাক হয়ে বলল, ‘‘সাহেবরা কি চলে যাচ্ছেন?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আপাতত যাচ্ছি৷ তবে আবার ফিরে আসব৷ কারণ শীতের সময় কালুখালির ঝিলে অনেক অজানা পাখির মেলা বসে থাকে৷’’

মিস্টার সোম বললেন, ‘‘তুই নিজের কাজ দেখ গিয়ে৷’’

নাদু তখনই চলে গেল৷ তারপর মিস্টার সোম চাপা-স্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘‘আপনাদের সঙ্গে যেতে ইচ্ছে করছে৷ কারণ স্পষ্ট বুঝতে পারছি, আজই সিংহীর জামাই-এর খুনিকে নিশ্চয়ই আপনি ধরিয়ে দেবেন৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘মিস্টার সোম, আপনার পক্ষে আমাদের সঙ্গী হওয়ার ভীষণ ঝুঁকি আছে৷ কারণ খুনের পেছনে যে বা যারাই থাক, তারা এই এলাকার লোক৷ আপনিও এখানে বাস করেন৷ আমাদের সঙ্গে আপনাকে দেখলে প্রতিপক্ষ ভাববে আপনিও তাদের শত্রু৷’’

মিস্টার সোম কথাটা বুঝতে পেরে বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ আপনি ঠিকই বলেছেন৷ তবে কথা কী, আমার মনে এখনই তীব্র কৌতূহল জেগেছে৷ খুনি কে বা কারা আপনি নিশ্চয়ই জেনে গেছেন৷ আমাকে একটু আভাষ দিলে কোনও অসুবিধা হবে?’’

কর্নেল হাসলেন, ‘‘মিস্টার সোম, খুনির বা খুনিদের ছায়ামূর্তি আঁচ করেছি মাত্র৷ কাজেই এখনও সঠিকভাবে কিছুই বলা সম্ভব নয়৷ আমার অঙ্কে ভুল থাকতেও পারে৷ তবে আপনি ঘরে বসেই ও.সি. নবারুণ বসাককে সন্ধ্যার দিকে ফোন করে খবর নিতে পারেন৷’’

কফি দ্রুত শেষ করে কর্নেল চুরুট ধরালেন৷ তারপর তাঁর কিটব্যাগটা পিঠে এঁটে নিলেন৷ আমি আমার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিলুম৷ তারপর বললুম, ‘‘দীপা কি এখন উঠেছে?’’

মিস্টার সোম বললেন, ‘‘না৷ তাকে আমি কিছুই বলিনি৷ সে পুজোর ছুটিতে এখানে এলে বেঘোরে আটটা অবধি ঘুমোয়৷’’

বললুম, ‘‘দীপার মা-কে বলবেন, ওঁদের কলকাতার বাড়িতে আমি অবশ্যই যাব৷’’

কর্নেল তাঁর প্রকাণ্ড ব্যাগটা হাতে তুলে ভিতরের দরজা দিয়ে বারান্দায় গেলেন৷ মিস্টার সোম হাঁ-হাঁ করে উঠেছিলেন৷ বললেন, ‘‘ওটা নাদু তুলে দেবে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘থাক৷ এটা সামান্য ব্যাপার৷’’

বাইরের গ্যারেজে মিস্টার সোমের গাড়ির পাশে আমার ফিয়াট গাড়িটা দাঁড় করানো ছিল৷ মিস্টার সোম নিজেই গ্যারেজের চাবি খুলে দিলেন৷ তারপর আমার গাড়ি বের করলুম৷ গেটে দারোয়ান ছিল, সে স্যালুট ঠুকল৷ কর্নেল গাড়িতে বসে পিছু ফিরে মিস্টার সোমের উদ্দেশে হাত নাড়লেন৷ রাস্তায় গিয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘‘এবার আমরা কোথায় যাচ্ছি?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি৷’’

কিছুটা এগিয়ে ডান দিকে টাউনশিপ চোখে পড়ল৷ কর্নেলের নির্দেশে টাউনশিপের ভেতর দিয়ে এগিয়ে ডাইনে ঘুরেই থানার সাইনবোর্ড চোখে পড়ল৷

গেটের সামনে পুলিশের একটা জিপ দাঁড়িয়ে ছিল৷ পাশে ঝকঝকে-স্মার্ট চেহারার এক যুবক পুলিশের উর্দি পরে দাঁড়িয়েছিলেন৷ তাঁর হাতে একটা বেটন৷ কর্নেলকে দেখে তিনি করজোড়ে নমস্কার করে মৃদু হেসে বললেন, ‘‘একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় সাতটা৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আমার পাশের এই ড্রাইভারটি কে, তা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ নবারুণ?’’

এই তাহলে ও.সি. নবারুণ বসাক৷ তিনি আমাকে নমস্কার করে কর্নেলের পাশে গেলেন৷ কর্নেল মৃদুস্বরে জিগ্যেস করলেন, ‘‘খবর ঠিক আছে তো?’’

নবারুণ বসাক বললেন, ‘‘হ্যাঁ বস৷ সবই ঠিকঠাক চলছে৷ এখানকার মালটাকে উঠিয়ে নিয়ে সাব-ইনসপেক্টর প্রবালবাবু নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে যাবেন৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘তা হলে আর দেরি নয়৷ কে আগে যাবে, তুমি না আমরা?’’

মিস্টার বসাক বললেন, ‘‘আপনার মার্কামারা চেহারা গোলমাল বাঁধাতে পারে৷ আমরা আগে যাচ্ছি৷ আপনি বরং একটু দূরত্ব রেখে আসুন৷’’

ও. সি.-র জিপ এগিয়ে গেল৷ লক্ষ্য করলুম, জিপের পিছনে সশস্ত্র কয়েকজন কনস্টেবল বসে আছে৷ ও.সি. ড্রাইভ করছিলেন৷ তাঁর ডানপাশে একজন সাদা পোশাকের লোক বসে ছিল৷ ড্রাইভার হতেও পারে, আবার পুলিশ হতেও পারে৷

মিনিট দশেক আঁকাবাঁকা রাস্তায় চলার পর টাউনশিপ থেকে বেরিয়ে হাইওয়েতে পড়লুম৷ হাইওয়েতে যানবাহনের ভিড় অন্যান্য দিনের মতোই ছিল৷ কিন্তু পুলিশের জিপ দেখে খানিকটা দূরত্ব রেখে অনুসরণ করতে আমার অসুবিধা হচ্ছিল না৷ প্রায় এক কিলোমিটার পরে হাইওয়ে বাঁ-দিকে একটু বাঁক নিয়েছে৷ সেই বাঁকের ডানদিকে সরকারি বনদপ্তরের তৈরি একটা জঙ্গল৷ সেই জঙ্গলের কাছাকাছি গিয়ে পুলিশের জিপটা দাঁড়িয়ে গেল৷ কর্নেল আমাকে নির্দেশ দিলেন, ‘‘এখানেই বাঁ-দিকে একটু অপেক্ষা করো জয়ন্ত৷’’

আমাদের পাশ কাটিয়ে মাঝে-মাঝে মালবোঝাই ট্রাক প্রচণ্ড গর্জন করে চলে যাচ্ছিল৷ একটু পরে লক্ষ্য করলুম, জঙ্গলের প্রান্ত ঘেঁষে একটা পুলিশ-ভ্যান, আর একটা সাদা অ্যামবাসেডর দাঁড়িয়ে ছিল৷ সবার আগে অ্যামবাসেডর, তারপর পুলিশ-ভ্যান৷ শেষে ও. সি-র জিপ আবার চলতে শুরু করল৷ এবার তেমনই দূরত্ব রেখে আমার গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু আমার মাথায় ক্রমশ তীব্র কৌতূহল গরম হাওয়া ছড়াচ্ছে৷ চুপ করে থাকতে না পেরে জিগ্যেস করলুম, ‘‘আয়োজন তো দেখছি বিরাট, কিন্তু আমরা এভাবে কোথায় যাচ্ছি বলতে আর বাধা কীসের?’’

কর্নেল অভ্যাস-মতো চোখে বাইনোকুলার রেখে বাঁ-পাশে প্রসারিত ধানখেত, কখনও ঝোপজঙ্গল আর গাছপালায় সম্ভবত পাখি দেখতে-দেখতে যাচ্ছিলেন৷ আমার কথা শুনে বাইনোকুলার নামিয়ে তিনি বললেন, ‘‘তোমার এতক্ষণে বোঝা উচিত ছিল আমরা কোথায় যেতে পারি৷’’

একটু চমকে উঠে বললুম, ‘‘পলাশতলি? তার মানে বাঘা বাঁড়ুজ্যের বাড়িতে হানা দিতে যাচ্ছে পুলিশ?’’

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘‘তুমি বোঝো সবই, তবে দেরিতে৷’’

‘‘কিন্তু বাঘা বাঁড়ুজ্যে, অর্থাৎ মিস্টার ব্যানার্জির সঙ্গে খুনির সম্পর্ক আছে নাকি? তিনি তো আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনে হয়েছে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ, বন্ধু তো বটেই৷ তবে বন্ধুত্বটা আর থাকবে কিনা বুঝতে পারছি না৷’’

‘‘প্লিজ কর্নেল, হেঁয়ালি করবেন না৷ একটু খুলে বলুন, আমরা কেন ওখানে যাচ্ছি৷’’

‘‘নিশ্চয়ই দেখতে পাবে; তবে একটু কষ্ট করতে হবে৷ কষ্ট না করলে তো কেষ্ট মেলে না৷’’

‘‘কী কষ্ট?’’

‘‘পায়ে হাঁটার কষ্ট৷ চিন্তা কোরো না, তোমার গাড়ি হাইওয়েতে পুলিশের গাড়ির কাছেই থাকবে৷’’

তারপর প্রায় আধ ঘণ্টা এগিয়ে একটু দূর থেকেই চিনতে পারলুম রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রকাণ্ড বটগাছটাকে, যার তলায় ঝড়বৃষ্টির সময় আমাকে গাড়ি দাঁড় করাতে হয়েছিল৷

পুলিশের ভ্যান এবং তার আগে চলা সাদা গাড়িটা বটগাছটার কাছে গিয়ে বাঁ-দিকে মোরাম রাস্তায় উঠল; তারপর গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

ও.সি-র জিপ অতদূর এগিয়ে যায়নি৷ একসার ট্রাকের আড়াল থাকায় টের পাইনি আমার গাড়ির কাছাকাছি বাঁ-পাশের ঘাস আর ঝোপঝাড় ঘেঁষে জিপটি দাঁড়িয়ে আছে৷ তখনই ব্রেক না কষলে দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল৷ গাড়ি থামতেই কর্নেল নেমে গেলেন৷ বললেন, ‘‘জানলার কাচ তুলে দিয়ে গাড়ি লক করে চলে এসো৷’’

বাঁ-দিকে ঘনজঙ্গল, ঝোপঝাড় আর গাছপালা৷ লক্ষ্য করলুম, ও. সি. নবারুণ বসাক আর দু’জন সশস্ত্র কনস্টেবল ঝোপের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন৷ কর্নেল দলটিকে অনুসরণ করলেন৷ রাতের শিশিরে ঝোপঝাড় কাকভেজা হয়ে আছে৷ কিন্তু কী আর করা যাবে, কর্নেলের পিছনে সাবধানে এগিয়ে যাচ্ছিলুম৷ একবার কর্নেল ঘুরে মৃদুস্বরে বললেন, ‘‘তোমার অস্ত্রটাকে রেডি রেখেছ তো?’’

বললুম, ‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু আমাদের কি এখানে গুলির লড়াই করতে হবে?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘জানি না, হয়তো হবে না; কিন্তু সাবধানে থাকা ভালো৷’’

সেই জঙ্গল পেরিয়ে গিয়ে দেখি সামনে একটা আমবাগান৷ অমনি চমকে উঠলুম৷ বললুম, ‘‘এটা কি মিস্টার ব্যানার্জির সেই আমবাগান?’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ কিন্তু এখন মিস্টার ব্যানার্জি আমাদের দেখলে বাঘের মতোই গর্জন করতে পারেন৷’’

তারপরই চোখে পড়ল একটা ছোট্ট মাটির ঘর৷ তার ওপর খড়ের চাল৷ ও.সি. মিস্টার বসাক ঘরটার সামনে গিয়ে রিভলভার তুলে চাপা গর্জন করলেন, ‘‘একটু নড়লেই ঠ্যাং ভেঙে দেব৷ আর হাতের ওই জিনিসটা পায়ের কাছে রাখো৷’’

তাঁর পিছনে দু’জন কনস্টেবলও রাইফেল তাক করে দাঁড়িয়ে গেল৷ কর্নেল এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘‘এই যে শ্রীমান চণ্ডীচরণ! অনেক দিন পরে তোমার দর্শন পেলাম৷ তা এখানে লুকিয়ে বসে আছ কেন?’’

দেখলুম একটা ষণ্ডামার্কা কালো কুচকুচে লোক প্যান্ট আর গেঞ্জি পরে মাচা থেকে সদ্য নেমে দাঁড়িয়েছে৷ তার পায়ের কাছে চকচকে একটা আগ্নেয়াস্ত্র পড়ে আছে৷ ও.সি. তার গলার নিচে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে পড়ে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটা কুড়িয়ে নিলেন৷ তারপর তার গেঞ্জির কলার ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলেন৷

সেই সময় আমাদের মাথার ওপর দিয়ে পরপর দু’বার কেউ গুলি ছুঁড়ল৷ ও.সি. এবার ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে চিৎকার করে বললেন, ‘‘মিস্টার ব্যানার্জি, পুলিশ আপনার আমবাগান এবং বাড়ি ঘিরে রেখেছে৷ আপনি আড়াল থেকে সামনে আসুন৷’’

একটু পরে সার-বাঁধা আমগাছের আড়াল থেকে বন্দুক কাঁধে নিয়ে হাসতে-হাসতে এগিয়ে এলেন বাঘাবাবু ওরফে সত্যকাম ব্যানার্জি৷ তিনি কর্নেলকে সম্ভাষণ করে বললেন, ‘‘মর্নিং কর্নেলসাহেব৷ আপনারা আসবেন, সে-খবর কাল রাতেই পেয়েছিলুম৷ তবে দু-দুটো কার্তুজ খরচ করলুম, সেটা আপনাদের ভয় দেখানোর জন্যে নয়৷ ওটা আমার অভ্যর্থনা৷’’

কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘‘আপনার পোষ্য এই সাংঘাতিক লোকটির ক্রিয়া-কলাপের খবর আপনি কি রাখতেন?’’

সত্যকাম ব্যানার্জি বললেন, ‘‘বিশ্বাস করা না করা আপনাদের ইচ্ছে৷ কিন্তু কাল কালুখালির ঝিলের জলটুঙিতে পিকনিক করার সময় চণ্ডীর গোপন কারবারের খবর পেয়ে খাপ্পা হয়েছিলুম৷ এই বেটাচ্ছেলে যে বিজয়গড়ের এক দুর্বৃত্তের সঙ্গে গোপনে বর্ডার পেরিয়ে আসা বিদেশি জিনিসের কারবার করত, আমি তা কল্পনাও করিনি৷ গতরাত্রে বাড়ি ফিরে ওকে বাড়ি থেকে চড়-থাপ্পড় মেরে ভাগিয়ে দিয়েছিলুম৷ কিন্তু দেখছি সে আমার পাহারাদারের এই ঘরে রাত কাটিয়েছে৷’’

বলে তিনি ঘরের ভিতর উঁকি দিলেন৷ তারপর হো-হো করে হেসে ফেললেন, ‘‘অ্যাঁ, শ্রীমান দেখছি এখানে মশারি আর বিছানা খাটিয়ে শুয়েছিল! আরে মাচার তলায় ওটা কী? একটা ব্রিফকেস মনে হচ্ছে!’’

তিনি ব্রিফকেসটা টেনে বের করলেন৷ তারপর চণ্ডীকে বললেন, ‘‘এই ব্যাটা! এতে কী আছে? চাবি দে দেখি৷’’

ভয়ে-ভয়ে চণ্ডী প্যান্টের পকেট থেকে একগোছা চাবি বের করেছিল৷ ততক্ষণে আরও এক দঙ্গল পুলিশ এবং অফিসার ঘটনাস্থলে এসে গেছেন৷ ও. সি. গম্ভীর মুখে বললেন, ‘‘মিস্টার ব্যানার্জি, চাবি আর ব্রিফকেসটা আমাদের দিন৷’’

সত্যকাম ব্যানার্জি রুষ্টমুখে তাকিয়ে চাবি আর ব্রিফকেস ও. সি.-র পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে বন্দুক কাঁধে তেমনই হনহন করে বাগানের ভিতর দিয়ে চলে গেলেন৷ তাঁকে কেউ বাধা দিল না৷ একজন অফিসার এসে চণ্ডীর দু-হাত পিঠের দিকে টেনে হ্যান্ড-ক্যাফ পরিয়ে দিল৷

ও. সি. ব্রিফকেসের তালা খুলে বললেন, ‘‘কী আছে দেখা যাক এই কাগজটার নিচে৷’’

কাগজটা তুলতেই দেখা গেল ব্রিফকেস ভরতি পাঁচশো টাকার নোটের বান্ডিল৷ ও. সি. বললেন, ‘‘ভাগ্যিস, কর্নেল সাহেবের পরামর্শ মতো আমবাগানটাও ঘিরে রাখার ব্যবস্থা করেছিলুম৷ টের পেয়ে চণ্ডী পালাতে সাহস পায়নি৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘ওর স্যাঙাতকে আশা করি পেয়ে গেছেন৷ আমি তাকে চণ্ডীর মুখোমুখি দাঁড় করাতে চেয়েছিলুম৷’’

ও. সি. বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ তাকে এখনই আনতে বলছি৷ সে আমাদের ভ্যানে আছে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘না৷ এখানে এই জঙ্গলের মধ্যে নয়৷ বরং চলুন আমরা মিস্টার ব্যানার্জির বাড়ির সামনে যাই, উনিও ব্যাপারটা সচক্ষে দেখে মজা পাবেন৷’’

ও.সি. বললেন, ‘‘ঠিক বলেছেন, তাই চলুন৷’’

নয়

আমরা বিরাট পুলিশবাহিনী-সহ সেই মোরাম রাস্তায় পৌঁছেছিলুম৷ তারপর দেখি বারান্দায় একটা ইজিচেয়ারে বসে মিস্টার ব্যানার্জি গম্ভীর মুখে চা খাচ্ছেন৷ বন্দুকটা তাঁর দু-পায়ের ফাঁকে একটু কাত করে রাখা আছে৷ ঘরের দরজা থেকে আমাদের দেখে হরিপদ হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল৷

আমাদের দেখে মিস্টার ব্যানার্জি নির্বিকার মুখে বললেন, ‘‘কর্নেল সাহেবের শুনেছি নাটক করার স্বভাব আছে৷ আবার কী নাটক করবেন এখানে!’’

কর্নেল বললেন, ‘‘আপনিও দেখতে পাবেন৷’’

এবার দেখলুম, মোরাম-রাস্তায় দাঁড় করানো পুলিশ ভ্যান থেকে একটা লোককে নামানো হল৷ তার চেহারাও ষণ্ডামার্কা৷ মুখে পুরু কাঁচা-পাকা গোঁফ৷ গোঁফের দু-দিকটা পাকানো৷ তার পরনেও গেঞ্জি, কিন্তু নিম্নাঙ্গে হাফ-প্যান্ট৷ পায়ে জুতো৷ তার হাত-দুটো অবশ্য খোলা; কিন্তু তার কোমরে দড়ি বাঁধা৷ একজন তাগড়াই চেহারার কনস্টেবল তাকে ধাক্কা দিতে-দিতে আমাদের কাছে নিয়ে এল৷ অমনিই কোমরে দড়ি-বাঁধা লোকটা কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘ব্যাটা চণ্ডে! তোকে সামনে পেলেই মাথার খুলি উড়িয়ে দেব বলে প্রতিজ্ঞা করেছি৷ কিন্তু আমার অস্ত্রটা তো পুলিশ কেড়ে নিয়েছে৷’’

বলে সে চণ্ডীর ওপর ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পুলিশ তার কোমরের দড়ি ধরে হেঁচকা-টান দিয়ে তাকে সরিয়ে আনল৷

কর্নেল সকৌতুকে বললেন, ‘‘ভানু৷ তোমার আরও রাগ হবে, যদি দেখো যে তোমার প্রাণের বন্ধু তোমাকে ভাগ না দিয়ে কী নিয়ে কেটে পড়ার তালে ছিল৷’’

বলে তিনি ব্রিফকেসটা ও.সি.-র হাত থেকে নিয়ে তুলে ধরলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘এতে কত টাকা আছে জানো? পাঁচ লাখ!’’

ভানু প্রায় কেঁদে ফেলার মতো হাউমাউ করে বলে উঠল, ‘‘ওরে বজ্জাত, তুই আমাকে ভাগ না দিয়ে টাকাগুলো নিয়ে কেটে পড়েছিস! নেমকহারাম! তোর জন্য আমি ফাঁদ পেতে সিংহীমশাইয়ের জামাইকে তোর সামনে ফেলেছিলুম!’’

কর্নেল বলে উঠলেন, ‘‘তা হলে দেখা যাচ্ছে মিস্টার ব্যানার্জি, আপনার চণ্ডী বিজয়গড়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু ঝড়বৃষ্টির আগেই শর্টকাটে ফিরে, আপনার আমবাগানে পাহারাদারের ঘরে অপেক্ষা করছিল৷’’

মিস্টার সত্যকাম ব্যানার্জি বললেন, ‘‘কে বলেছে তা আমি বলব না, কিন্তু এই হারামজাদা শয়তানই যে সিংহীর জামাইকে খুন করেছে—দরকার হলে সে সাক্ষী আমি কোর্টে দেব৷’’

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘‘আপনি তো সচক্ষে খুন হওয়া দেখেননি মিস্টার ব্যানার্জি৷’’

বাঘা বাঁড়ুজ্যে বললেন, ‘‘দেখিনি, আবার দেখেছিও বটে; কারণ ঝড়বৃষ্টির একটু আগে দোতলা থেকে আমার কানে গিয়েছিল, আমবাগানের ভিতর পরপর দু’বার গুলির শব্দ হল৷ তাই আমি বন্দুকে গুলি ভরে আমবাগানে ঢুকেছিলুম৷ তারপরই প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছিল৷ আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম, কোথায় কে কাকে গুলি করল দেখার জন্য৷ তারপর পারাহাদারের ঘরের সামনে গিয়েছিলুম৷ প্রচণ্ড ঝড়-বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছিল৷ কাছাকাছি কোথায় বাজও পড়ল৷ কুঁড়েঘরে কাউকে না দেখে আমি ফিরে এসেছিলুম৷ তারপর—’’

কর্নেল তাঁর কথার ওপর বললেন, ‘‘তারপর আপনি আমাদের দেখতে পেয়েছিলেন৷ আমাদের যখন আপনি চা পানে আপ্যায়িত করেছিলেন, আমি লক্ষ্য করেছিলুম আপনার গামবুটের তলায় কাদার সঙ্গে তাজা রক্ত৷’’

‘‘হ্যাঁ৷ ওই হরে আমাকে তা দেখিয়ে দিয়েছিল৷ তখন আমি আবার পাহারাদারের ঘরে গিয়েছিলুম৷ মাচার ওপর রক্তের ছাপ ছিল৷ সামনের মাটিতেও রক্ত ছিল৷ আমি কিছু বুঝতে পারিনি৷ তাই আমার বিজয়গড়ের বন্ধু রায়বাবুকে টেলিফোন করে সব কথা বলেছিলুম৷ সে বলেছিল, পরে কথা হবে৷ কাল ভোরবেলা ঝিলের জলে পানসি ভাসাব৷ জলটুঙিতে পিকনিক করব৷ তুমি তোমার গাড়িতে চেপে ভোর ছ’টার মধ্যে চলে আসবে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ আপনার সঙ্গে আমাদের একটা জলটুঙিতে দেখা হয়েছিল৷ আর সেই জলটুঙিতে আপনি এই ভানুকে আবিষ্কার করেছিলেন৷ ভানু ওখানে কী করছিল, জানতে পেরেছিলেন?’’

‘‘ভানুকে দেখে চমকে উঠেছিলুম৷ সে সিংহীর লোক বলে জানতুম; কিন্তু দেখলুম সে ভেতরে-ভেতরে রায়বাবুর লোক হয়ে উঠেছে৷ তাই তাকে দেখে কোনও প্রশ্ন আমার মনে জাগেনি৷’’

ও.সি. মিস্টার বসাক বললেন, ‘‘কর্নেলসাহেব, এবার এখান থেকে যাওয়া যাক৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘হ্যাঁ৷ তবে আমার এখানেই জানতে ইচ্ছে করছে ভানুর বাড়িতে পকেট-ছেঁড়া কোনও হাফ-প্যান্ট পাওয়া গেছে কি?’’

ও.সি. মৃদু হেসে বললেন, ‘‘হ্যাঁ, পকেট-ছেঁড়া প্যান্টে রক্তের ছোপও আছে৷’’

কর্নেল বললেন, ‘‘রঞ্জনের হাতের আঙুলে মোট চারটে দামি রত্ন-বসানো আংটি ছিল৷ তার মধ্যে একটা মাটির রাস্তায় আর একটা রঞ্জনের লাশের কাছে পড়ে ছিল৷ তা ওহে ভানু, বাকি আংটি দুটো কি প্যান্টের পকেটের ফুটো দিয়ে পড়ে গিয়েছিল?’’

ভানু কিছু বলার আগেই একজন পুলিশ অফিসার বলল, ‘‘না স্যার৷ বাকি আংটি দুটো আমরা ওর বাড়িতে দেওয়ালের কুলঙ্গিতে খুঁজে পেয়েছি৷ একটা আংটিতে হিরে, আর একটাতে পান্না বসানো আছে৷’’

বাঘা বাঁড়ুজ্যে হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ ‘‘কী সর্বনাশ! রঞ্জনকে মারল, তার কারণ নিশ্চয়ই ওই পাঁচ লাখ টাকা ভরা ব্রিফকেসটা৷ ওটা থাকাতেই দুই স্যাঙাত মিলে ফাঁদ পেতেছিল৷ মাছের লরির তলায় চোরাই ইলেকট্রনিক মাল ঢুকিয়ে রেখে একজন খবর দিয়ে রেখেছে পুলিশকে, আর একজন মানে আমার পোষ্য ওই শয়তানটা ওত পেতে অপেক্ষা করছিল, কখন ব্রিফকেস হাতে নিয়ে পালিয়ে এসে তার সামনে পড়বে সিংহীর জামাই! বুঝুন ব্যাপার!’’

তিনি আবার হো-হো করে হাসতে লাগলেন৷ তারপর হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে দুটো কার্তুজ বের করে তাঁর দু-নলা বন্দুকে ভরে তখনই আমবাগানের মাথার ওপর দিয়ে পরপর দুটো গুলি ছুঁড়লেন৷

ও.সি. মিস্টার বসাক চাপা-স্বরে বললেন, ‘‘যা শুনেছিলুম দেখছি সত্যি; ভদ্রলোক নিছক খামখেয়ালি নন, আধ পাগলা!’’

আমরা সদলবলে এগিয়ে গেলুম হাইওয়ের দিকে৷ তখনও ডবল এজেন্ট ভানু কান্নার মতো হাউমাউ করে যেন প্রলাপ বকছিল৷ ‘‘আমাকে এই বজ্জাত চণ্ডে সিংহীমশাইয়ের জামাইয়ের তেরপল জড়ানো লাশটা অতদূর বইয়ে তবে ছাড়ল৷ নিজে টাকাগুলো মেরে ব্যাটা আমাকে বলে কিনা, ওই দামি আংটিগুলো আঙুল থেকে খুলে নে ভানু! ওঃ! এখন আমি কী করব? হায়! হায়! শিঙির কাঁটা খেয়েও ভালো ছিলুম৷ চণ্ডের পাল্লায় পড়ে, ও হো হো হো....’’

এতক্ষণে কর্নেল তাঁর বিখ্যাত অট্টহাসি হেসে বললেন, ‘‘জয়ন্ত! নাটকটা ট্রাজেডি না কমেডি?’’

ও.সি. মিস্টার বসাক বললেন, ‘‘ট্রাজেডি-কমেডি দুই-ই বলতে পারেন!’’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%