সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
এই পাহাড়ি নদীর নাম ‘হাথিয়া’৷ এ নামের কারণ বুঝতে দেরি হল না৷ যতদূর চোখ যায়, উজানে ও ভাটিতে নদীর বুকে অসংখ্য কালো-কালো পাথর ছড়িয়ে রয়েছে৷ হঠাৎ তাকালে মনে হবে, ওপারের জঙ্গল থেকে হাতির পাল নেমেছে৷ হাতি বা হাথী থেকেই হয়তো হাথিয়া৷
কিন্তু জল কোথায়? পাথরের ফাঁকে শুকনো বালি শুধু৷ মার্চ মাসের এই নিরিবিলি বিকেলে শুকনো নদীটাকে বেজায় ভূতুড়ে ঠেকছিল৷ শ্মশান দেখলে যেমন লাগে৷
তবে এখন তো বসন্তকাল৷ তাই দু’তীরের গাছপালা খুব চেকনাই হয়ে হরেকরকম ফুলের রঙ ছেড়েছে৷ পাখপাখালিও ডাকছে৷ হালকা নরম রোদ্দুর এখন গোলাপি রঙ ধরেছে৷ আর আকাশটাও চমৎকার নীল৷
হঠাৎ এক আজব দৃশ্য চোখে পড়ল৷
একটু দূরে নদীর মধ্যে পাথরের খাঁজে-খাঁজে একটা লোক কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ একটা করে ছোট্ট পাথর কুড়িয়ে কী পরখ করছে আর ছুঁড়ে ফেলছে৷ খুব ব্যস্তভাবে এই অদ্ভুত কাজটা করে চলেছে সে৷ মনে পড়ে গেল সেই কবিতার লাইনটা ‘খ্যাপা খাঁজে খুঁজে ফেরে পরশ পাথর৷’
ক্রমশ দেখলুম, সে আরও ব্যস্ত হয়ে উঠেছে৷ পাথর কুড়োচ্ছে আর ছুঁড়ে ফেলছে খালি৷ ব্যাপারটা কী? কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখে মনে হল, লোকটা নিশ্চয়ই পাগল৷
পোশাকে-চেহারায় কিন্তু রীতিমতো ভদ্রলোক বলেই মনে হচ্ছে৷ ঢ্যাঙা শিড়িঙ্গে গড়ন৷ ঢিলেঢালা সার্ট পরনে৷ বেফাঁস টাইও দেখতে পাচ্ছিলুম৷ এমন মানুষ পরশপাথর খুঁজে বেড়াচ্ছে হাথিয়া নদীতে৷ কাজেই বদ্ধ-পাগল ছাড়া কিছু নয়৷
এইসময় অকারণে ডাইনে একবার মুখ ফেরালাম৷ ফের ‘থ’ বনে গেলাম৷
নদীর এই পাড়ে সবুজ ঘাসের জমিতে অনেক ঝোপঝাড় রয়েছে৷ সেখানে দেখি, আরেক ভদ্রলোক হাতে একটা ছোট্ট জাল নিয়ে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছেন৷ হঠাৎ একবার লাফ দিতেই তাঁর টুপিটি পড়ে গেল৷ কিন্তু তাকিয়েও দেখলেন না৷ দৌড়ে গিয়ে ঝোপে ঢুকলেন৷
তাঁর মাথার টাকে রোদ্দুর ঝকমকিয়ে উঠল এবং তাঁর মুখে সাদা দাড়িও দেখা গেছে৷
এর মানেটাই বা কী? হাথিয়াগড়ে এসে ডাইনে-বাঁয়ে পাগল দেখার কথা ভাবিনি৷ তবে রাঁচি নাকি এখান থেকে তত বেশি দূর নয়৷
হুঁ, তাহলে যা ভেবেছি তাই৷ রাঁচির পাগলাগারদ থেকে পাগলরা যেভাবেই হোক বেরিয়ে পড়েছে৷ তা ছাড়া এর মানে হয় না৷ উদ্বিগ্ন হয়ে তক্ষুনি বাংলোর দিকে রওনা দিলুম৷ খবরের কাগজের লোক৷ এমন একটা খবর যখন পাওয়া গেছে, এক্ষুনি কলকাতায় পাঠাবার ব্যবস্থা করা কর্তব্য৷
বাংলো থেকে হাথিয়াগড় বসতি-এলাকার দূরত্ব দু’কিলোমিটার৷ চৌকিদারের সাইকেলে সেখানে গিয়ে ডাকঘরে খবরটা টেলিগ্রাম করে দিলুম৷ কাল দৈনিক সত্যসেবকে বেরুবে৷ বিস্তর বিদ্রোহের খবর তো কাগজে বেরোয়৷ পাগল-বিদ্রোহের খবর এই প্রথম৷ শুধু বিদ্রোহ নয়, গারদ ভেঙে পলায়ন৷
পোস্টমাস্টার ভদ্রলোক আঁতকে উঠে আমার দিকে তাকালেন৷ চোখ টিপে বললাম, ‘‘প্লীজ দাদা, চেপে যান৷ বুঝতেই তো পারছেন, স্কুপ নিউজ...’’
টেলিগ্রাম করে দিয়েই ভদ্রলোক দরজা বন্ধ করে ফেললেন৷ আমি সাবধানে চারদিকে নজর রেখে নিরিবিলি আলো-আঁধারি রাস্তায় কীভাবে যে বাংলোয় ফিরলুম, কহতব্য নয়৷ পাগলকে আমি ভীষণ ভয় পাই৷
একটা টিলার গায়ে এই বাংলো৷ মোটে তিনটে ঘর৷ আর দুটোয় কে বা কারা এসেছেন জানি না৷ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আমার মতো আরও সাংবাদিক আজ হাথিয়াগড়ে এসেছিলেন৷ কিন্তু তাঁরা বিকেলেই ফিরে গেছেন৷ আমি থেকে গেছি৷ দৈবাৎ বাংলোর একটা ঘর খালি ছিল৷ পেয়ে গেছি৷ ফিরব কাল সকালে৷
সাংবাদিকরা এসেছিলেন কেন্দ্রীয় পুরাতত্ত্ব দফতরের ডাকে৷ সম্প্রতি এখানে মাটি খুঁড়ে পুরাতত্ত্ববিদরা খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের একটি বিষ্ণুমন্দির উদ্ধার করেছেন৷ তার প্রতিষ্ঠাতা নাকি একজন গ্রীক-সম্রাট৷
শুধু মন্দির নয়, মন্দিরে একটি খুদে বিষ্ণুমূর্তি রয়েছে৷ সেটা ভারি অদ্ভুত৷ মূর্তিটার কাছে হাত নিয়ে গেলে থরথর করে কাঁপতে থাকে৷ স্বচক্ষে ব্যাপারটা দেখে অবাক হয়েছি৷ রাতেই খবরের বয়ান তৈরি করে ফেলব৷ চৌকিদারকে চা দিতে বলে বারান্দায় বসলুম৷ দিনের আলো দ্রুত কমে আসছে৷
হঠাৎ দেখলুম, বিকেলে নদীর বুকে এবং পাড়ে ছোটাছুটি করে বেড়ানো দুই পাগল পাশাপাশি হৃষ্টমনে কথা বলতে-বলতে এই বাংলোর দিকেই উঠে আসছে৷ তাঁরা লনের ওপাশে গেট খোলামাত্র চোখে পড়ল, একজনের হাতে লাঠি বা ছোট্ট বল্লম, অন্যজনের হাতে একটা পাথর রয়েছে৷ সর্বনাশ! আমাকেই আক্রমণ করতে আসছে না তো?
তক্ষুনি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলুম৷ আগে জানলে বিষ্ণুমন্দিরের খবর আনতে কে এই অখাদ্য জায়গায় ছুটে আসত!
চৌকিদার ডাকছিল, ‘‘স্যার! চায় লিজিয়ে!’’
ভয়ে-ভয়ে বললুম, ‘‘বারান্দায় রাখো, যাচ্ছি৷’’ ভাবলুম, নিশ্চয়ই পাগল-দুটো চলে গেছে৷ নইলে চৌকিদারের ওপর হামলা করত এতক্ষণ৷
বেরিয়ে এলুম৷ চেয়ারে বসে চায়ের কাপে হাত দিয়েছি, সেইসময় ওপাশের ঘর থেকে সেই টাক ও দাড়িওলা পাগলটিকে বেরোতে দেখামাত্র কাপ উলটে গেল৷ বারান্দার আলোটা মৃদু৷ ছানাবড়া চোখে তাকিয়ে আছি তো আছিই৷
তারপর প্রচণ্ড জোরে হেসে উঠলুম৷ ‘‘হ্যাল্লো ওল্ড ডাভ! আপনি!’’
‘‘হ্যাল্লো ডার্লিং!’’
আমাদের প্রখ্যাত ‘ওল্ড ডাভ’ অর্থাৎ বুড়ো ঘুঘু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার সস্নেহে আমার কাঁধে থাপ্পড় মেরে পাশেই বসলেন৷ চা পড়ে গেছে দেখে জিভ-চুকচুক করে চৌকিদারকে ফের চা আনার নির্দেশ দিলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘তুমি যে এসেছ, বিকেলেই শুনেছি৷ তা...’’
কথা কেড়ে বললুম, ‘‘কিন্তু হে প্রাজ্ঞ ঘুঘুমশাই, বিকেলে নদীর ধারে আপনাকে ওই অবস্থায় দেখে চিনতেও পারিনি৷ ভেবেছিলুম, রাঁচির গারদ ভেঙে পালিয়ে এসেছে কেউ৷’’
কর্নেল অট্টহাসি হেসে বললেন, ‘‘প্রজাপতি ধরছিলুম৷ হাথিয়াগড়ে এক বিরল প্রজাতির প্রজাপতি আছে, জানো জয়ন্ত? এদের পাখায় অবিকল যেন চীনা-ড্রাগন আঁকা!’’
চৌকিদার চা দিয়ে গেল৷ চা খেতে-খেতে চাপা গলায় চোখ নাচিয়ে বললুম, ‘‘আমাদের বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবর একজন প্রকৃতিবিদও বটেন, ভুলে গিছলুম৷ যাই হোক, হাথিয়াগড়ে বিষ্ণু-মন্দির বা আজব বিষ্ণুমূর্তি’র সঙ্গে আশা করি আপনার আগমনের কোনো সম্পর্ক নেই?’’
কর্নেল জোরে মাথা দুলিয়ে কেন যেন একটু চড়া গলায় বললেন, ‘‘মোটেও না ডার্লিং! বিশেষ করে এই প্রজাপতির আশ্চর্য গুণ কী জানো? রাতে এদের পাখা থেকে জ্বলজ্বলে আভা ঠিকরে পড়ে৷ যদি দেখতে চাও, আমার ঘরে এসো৷’’
এই সময় দ্বিতীয় ‘পাগলের’ আবির্ভাব ঘটল৷ কর্নেল বললেন, ‘‘জয়ন্ত, আলাপ করিয়ে দিই৷ ইনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্বের প্রখ্যাত অধ্যাপক ডঃ দোলগোবিন্দ ঢোল৷ ডঃ ঢোল, ইনি আমার স্নেহভাজন শ্রীমান জয়ন্ত চৌধুরী৷ কলকাতার দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার সাংবাদিক৷’’
ডঃ ঢোল আমাকে আমল না দিয়ে গম্ভীর মুখে বসলেন৷ তারপর বললেন, ‘‘হ্যাঁ, তখন যা বলছিলুম কর্নেল সরকার৷ হাথিয়া নদীতে যতগুলো ওইরকম পাথর কুড়িয়ে পেয়েছি, সবগুলোতে বিষ্ণুর মুখ আঁকা৷ তাই আমার সিদ্ধান্ত, এ নদীর উজানে কোথাও এক বিশাল মন্দির-গুচ্ছ ছিল, এই মন্দিরটা তারই অংশ৷ তবে ওই বিষ্ণুমূর্তিটা কিন্তু মহাজাগতিক৷’’
কর্নেল বললেন, ‘‘তার মানে?’’
‘‘তার মানে, ওটা মহাকাশের কোনো নক্ষত্রলোক থেকে কীভাবে এসে পড়েছিল৷ অবশ্য শনিগ্রহের চাকার মধ্যে যে খণ্ড-খণ্ড প্রকাণ্ড বস্তুপিণ্ড রয়েছে, সেখান থেকেও আসতে পারে৷’’
কর্নেল বিড়বিড় করে বললেন, ‘‘খন্ড-খণ্ড প্রকাণ্ড বস্তুপিণ্ড!’’
খ্যাক করে হাসলেন ডঃ ঢোল৷ ‘‘ওটা অনুপ্রাস!’’
কর্নেল আমাকে অবাক করে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘‘আচ্ছা ডঃ ঢোল, চ্যবনপ্রাশ আর অনুপ্রাসে কি কোনো সম্পর্ক আছে? মানে, আপনার ঘরে তখন প্রকাণ্ড চ্যবনপ্রাশের কৌটো দেখলুম কিনা!’’
ডঃ ঢোল ‘অ্যা’ বলে কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলেন৷ তারপর হো হো করে হেসে বললেন, ‘‘আপনি মশাই যেন কী! খালি পাখি-প্রজাপতির পেছনে ঘুরেই জীবনটা নষ্ট করলেন৷ সে-জন্যেই তো বলছিলুম, ভাষাটা একটু ভালো করে শিখুন৷’’
বুঝতে পারলুম না, কেন কর্নেল এই পুরাতত্ত্ববিদের কাছে অজ্ঞ মূর্খ সেজে থাকতে চাইছেন! ডঃ ঢোল লম্বা বক্তৃতা শুরু করলেন৷ ইতিমধ্যে চা খাওয়া হয়ে গেল৷ তারপর কর্নেল আমার হাত ধরে ওঁর ঘরে নিয়ে গেলেন৷ আমার মুখে প্রশ্ন ছিল৷ উনি সেটা আঁচ করে ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, ‘‘চুপ! কোনো কথা নয়৷ আর শোনো, রাতে তুমি আমার ঘরেই শোও৷ প্রশ্ন কোরো না৷’’
রহস্যের গন্ধে গা ছমছম করে উঠেছিল৷ তাই ভালো ছেলের মতো চুপ করে গেলুম৷ খাওয়াদাওয়ার পর কর্নেলের ঘরে শুতে এলুম৷ সেইসময় কর্নেল চাপা গলায় বললেন, ‘‘ঘুমিয়ে পোড়ো না কিন্তু৷... না, প্রশ্ন নয়৷ চুপচাপ শুয়ে পড়ো৷’’
কিন্তু ট্রেনজার্নির ক্লান্তি ছিল৷ কখন ঘুমিয়ে গেছি কে জানে৷ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল কী এক হট্টগোলে৷ বাইরে কে কোথায় প্রচণ্ড চেঁচামেচি করছে৷ ঘরে টেবিলল্যাম্প জ্বলছে৷ কর্নেল নেই৷ দরজা ভেজানো রয়েছে৷ বাইরে গিয়ে দেখি, চৌকিদার বল্লম তুলে হাথিয়াগড় জঙ্গলের ভাল্লুকদের মুণ্ডুপাত করছে৷ কর্নেল হাঁটু গেড়ে বসে মূর্ছিত ডঃ ঢোলকে সজ্ঞান করার চেষ্টা করছেন৷
জ্ঞান হলে চোখ খুলেই ডঃ ঢোল বললেন, ‘‘প্রকাণ্ড মুণ্ড!’’
পরে জানা গেল, জানলায় ওই বস্তুটি দেখেছেন৷ মুণ্ডের বড়ো-বড়ো দাঁতও নাকি ছিল৷ চৌকিদার বলল, ‘‘ভালু! ভালু! মাঝে-মাঝে ভালুক আসে বাংলোয়৷’’
ডঃ ঢোল তো কিছুতেই একা ঘরে শোবেন না৷ অগত্যা ওঁকে কর্নেলের ঘরের মেঝেয় বিছানা করে দেওয়া হল৷ দু’ধারে দুটো খাটে আমি ও কর্নেল, মধ্যিখানে নীচে ডঃ ঢোল৷ এমন ভিতু মানুষ কখনো দেখিনি৷
সকালে সেই বিষ্ণুমন্দিরের কাছে গিয়ে অবাক হলুম৷ পুলিসে ঘিরে ফেলেছে জায়গাটা৷ কর্নেল ভোরে কখন বাংলো থেকে বেরিয়ে গেছেন৷ একজন সেপাইকে জিগ্যেস করে শুনলুম, বিষ্ণুমূর্তি চুরি হয়ে গেছে৷ কড়া পাহারার ফাঁক গলে কখন কীভাবে চোর ঢুকেছিল, কে জানে! তক্ষুনি বাংলোয় ফিরে গেলুম৷ কর্নেলকে খবরটা দেওয়া উচিত৷ ধুরন্দর গোয়েন্দা উনি৷ ওঁর নাকের ডগায় এমন ঘটনা ঘটল যে!
ডঃ ঢোলের ঘরের দরজায় তালা৷ কিন্তু কর্নেল ফিরেছেন৷ ওঁর ঘরে ঢুকে দেখি, টেবিলে একটা সছিদ্র জার এবং তাতে প্রজাপতি রয়েছে কয়েকটা৷ মন দিয়ে কী দেখছেন-টেখছেন৷ হন্তদন্ত হয়ে বললুম, ‘‘শুনেছেন কর্নেল? বিষ্ণুমূর্তিটা চুরি গেছে৷’’
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, ‘‘যাক না৷ ক্ষতি কী!’’
‘‘ক্ষতি কী মানে? কী বলছেন আপনি!’’ অবাক হয়ে বললুম৷ ‘‘কয়েক হাজার বছরের পুরোনো প্রত্ন-নিদর্শন! তা ছাড়া এমন আশ্চর্য কম্পমান জীবন্ত একটা ধাতুমূর্তি৷ বিজ্ঞানেও এ একটা বিস্ময়কর ঘটনা নয় কি?’’
কর্নেল বললেন, ‘‘হুম জয়ন্ত, তার চেয়ে আরও বিস্ময়কর ঘটনা দেখার জন্য তোমাকে গত রাতে জেগে থাকতে বলেছিলুম৷ তুমি কিনা বেঘোরে ঘুমিয়ে কাটালে!’’
এ-কথায় দমে গিয়ে ভয়ে-ভয়ে বললুম, ‘‘অ্যাঁ, বলেন কী! গত রাতে কি আর কিছু ঘটেছিল? নিশ্চয়ই সেই প্রকাণ্ড মুণ্ডটা এ-ঘরের জানলায় হামলা করেছিল?’’
‘‘ডার্লিং, তুমি ঠিকই অনুমান করেছ৷’’ বলে বৃদ্ধ গোয়েন্দা-প্রবর চুরুট ধরালেন৷ তারপর জানলার দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে ফের বললেন, ‘‘তা ছাড়া রাঁচির পাগলাগারদ থেকে পাগল পালানোর অনুমানও সত্য৷ তুমি তোমার কাগজে নিছক ভুল খবর পাঠাওনি৷ তবে পলাতক পাগলের সংখ্যা মাত্র এক৷’’
খুশি হয়ে বললুম, ‘‘এবার যদি বলি, সেই প্রকাণ্ড মুণ্ডুটা সেই পলাতক পাগলেরই, তাতে কি ভুল হবে?’’
কর্নেল হাসলেন৷ ‘‘জয়ন্ত, তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি ইদানীং বেজায় খুলেছে দেখে খুব খুশি হলুম৷ তো চলো, এবার এ বুড়োর সঙ্গে হাথিয়াগড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করবে৷ ডার্লিং, বসন্তকালে হাথিয়াগড়ের তুলনা হয় না৷’’
তক্ষুনি মনমরা হয়ে বললুম, ‘‘নিশ্চয়ই কোনো দুর্লভ প্রজাতির পাখির পেছনে বনবাদাড়, পাহাড় টো-টো করে ঘুরিয়ে মারবেন! আমাকে কিন্তু আজই ফিরতে হবে৷’’
কর্নেল সস্নেহে আমার কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিলেন ‘‘মোটেই না, মোটেই না৷’’
কিন্তু বুড়োর পাল্লায় পড়লে এরকম হবে জানা কথা! বাংলো থেকে নেমে গিয়েই শুরু হল ওঁর বিদঘুটে আচরণ৷ নদীর ধার অবধি গেলেন চোখে বাইনাকুলার রেখে এবং আছাড়ও খেলেন প্রচুর৷ তারপর হঠাৎ আমার কাঁধ চেপে বসিয়ে দিলেন৷ নিজেও বসলেন৷ বড়ো একটা পাথরের আড়ালে বসে পড়ার পর বাচ্চা ছেলের মতো হেসে আঙুল তুলে ফিসফিস করে বললেন, ‘‘দেখছ জয়ন্ত, কত খণ্ড-খণ্ড প্রকাণ্ড বস্তুপিণ্ড পড়ে রয়েছে নদীতে!’’
বললুম, ‘‘ডঃ ঢোলের কথাটা আপনাকে পেয়ে বসেছে! কী যেন বলে একে—অনুপ্রাস!’’
‘‘কিন্তু চ্যবনপ্রাশের সঙ্গে এর গূঢ় সম্পর্ক রয়েছে ডার্লিং!’’
হো-হো করে হেসেই ফেলতুম, বুড়ো বাঘের জোরালো থাবার মতো হাতটা আমার মুখে চেপে বললেন, ‘‘চুপ, চুপ! এবার হামাগুড়ি দাও৷ স্টার্ট!’’
উপায় নেই৷ পাথরের আড়ালে হামাগুড়ি দিচ্ছি তো দিচ্ছি৷ এই করে নদীর বুকে অনেকখানি এগিয়ে একখানে থামতে হল৷ কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, ‘‘ওই দ্যাখো!’’
যা দেখলুম, তাতে অবাক হবার কিছু নেই৷ ডঃ ঢোল ঠিক কালকের মতো পাথর কুড়িয়ে পরখ করছেন৷ পুরাতাত্ত্বিকরা যা করেন৷ কিন্তু কর্নেল কি তাই দেখার জন্য এমন লুকোচুরি করছেন?
কর্নেলের দিকে ঘুরেছি, এমন সময় একটা চাপা গর্জন শুনলুম৷ চমকে উঠে দেখি, ডঃ ঢোলের সামনে মাটি ফুঁড়ে যেন একটা লোক গজিয়েছে৷ নোংরা প্যান্টশার্ট পরনে, একমুখ গোঁফদাড়ি, জ্বলজ্বলে চোখ৷ একটা পাথর তুলে সে ডঃ ঢোলকে শাসাচ্ছে৷ কিন্তু লোকটার শরীরের তুলনায় মাথার গড়ন দেখার মতো৷ একটা কাঠির মাথায় ফুটবল বসালে যেমন হয়৷ প্রকাণ্ড মুণ্ডু বটে!
তারপরই যা দেখলাম, আতঙ্কে শিউরে উঠলুম! ডঃ ঢোলের হাতে একটা ছোরা৷ লোকটার দিকে তিনি এগোচ্ছেন, আর লোকটা পিছিয়ে যাচ্ছে৷ দু’চোখে আতঙ্ক৷
তারপর কানে তালা ধরে গেল কর্নেলের গর্জনে, ‘‘খবরদার!’’ এ বুড়োর এমন সিংহমূর্তি কখনও দেখিনি৷ হাতে রিভলভার নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন৷ ডঃ ঢোল ঘুরে দেখেই ছোরা ফেলে দিলেন এবং পালানোর চেষ্টা করলে কর্নেল ফের বাজখাঁই চেঁচিয়ে বললেন, ‘‘নড়লেই মারা পড়বে পশুপতি৷ এক পা এগিও না!’’
পশুপতি! ছিলেন ডঃ দোলগোবিন্দ ঢোল, হয়ে গেল পশুপতি! আমি হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলুম৷ কর্নেল এগিয়ে গিয়ে পশুপতির পায়ের কাছ থেকে কী একটা তুলে নিলেন৷
আরে! এ তো দেখছি একটা মস্তবড়ো চ্যবনপ্রাশের কৌটো! এরপর কর্নেল সেই আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘‘পাথরটা ফেলে দিন ডঃ ঢোল৷ পশুপতি আর আপনার ক্ষতি করতে পারবে না৷’’
আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই!
চ্যবনপ্রাশের কৌটো থেকে খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের বিষ্ণুমূর্তি বেরুল৷ আমাদের এই বুড়োর কেরামতির তুলনা হয় না৷ নকল ডঃ ঢোল অর্থাৎ পশুপতিকে পুলিসের জিম্মায় দিয়ে কর্নেল বাংলোয় ফিরলে জিজ্ঞেস করলুম, ‘‘হাই ওল্ড ডাভ৷ রহস্যটা কী?’’
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে আরামে বসে বললেন, ‘‘এ-রহস্যের রহস্য এখন আর নেই৷ ব্যাপারটা আর কিছু নয়, প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি চুরির ঘটনা৷’’
‘‘আহা, আপনি টের পেলেন কীভাবে?’’
‘‘তিনটি সূত্র থেকে৷ প্রথম সূত্র: ডঃ ঢোল আমার চেনা৷ অথচ এই লোকটা দিব্যি নিজেকে ডঃ ঢোল বলে পরিচয় দিয়েছিল৷ দ্বিতীয় সূত্র: চ্যবনপ্রাশ৷ অতবড়ো কৌটোয় চ্যবনপ্রাশ নিয়ে কেউ বিদেশ-বিভুঁয়ে ঘোরে না৷ তৃতীয় সূত্র: জানলায় প্রকাণ্ড মুণ্ডের আবির্ভাব৷ ডঃ ঢোলের মাথার গড়ন অস্বাভাবিক, সেটা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছ? প্রকাণ্ড মুণ্ড শুনেই বুঝেছিলুম, লোকটা কে৷’’
‘‘তাহলে কি উনিই গতরাতে পশুপতির ঘরের জানলায়...’’
বাধা দিয়ে আমার বৃদ্ধ বন্ধু বললেন, ‘‘হুম! তবে আমি অনুপ্রাস-চ্যবনপ্রাশ নিয়ে রসিকতা করায় ধূর্ত পশুপতি টের পেয়েছিল, আমার কাছে ধরা পড়ে গেছে৷ অবশ্য কাল দুপুরের মধ্যেই এক ফাঁকে মূর্তি চুরি করে এনে বিকেলে সেটা লুকোতে গিয়েছিল নদীতে৷ কিন্তু আমি কাছাকাছি থাকায় পারেনি৷ রাতে নিশ্চয় ফের যেত৷ কিন্তু মানসিক হাসপাতাল থেকে ডঃ ঢোল পালিয়ে এসে এই বাংলোয় রাত কাটানোর জায়গা খুঁজবেন, সে ভাবেওনি৷ আর ডঃ ঢোলও জানলা দিয়ে পশুপতিকে দেখে অবাক৷ বেচারা চৌকিদারের তাড়া খেয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন৷ পশুপতিও ভড়কে গিয়েছিল৷ তবে ডার্লিং, এর আগে একটু, ভূমিকা আছে৷’’
‘‘বলুন, বলুন!’’
‘‘হাথিয়াগড়ে মাটির তলায় প্রাচীন বিষ্ণুমন্দির থাকার সম্ভাবনা ডঃ ঢোল বরাবর বলতেন৷ সম্প্রতি যে মাটি খোঁড়ার কাজ হল, তা ওঁরই চেষ্টায়৷ কিন্তু তার আগেই উনি প্রচণ্ড মানসিক পরিশ্রমে মস্তিষ্ক রোগের পাল্লায় পড়লেন৷ মানসিক হাসপাতালে ওঁকে ভর্তি করানো হল৷ সেই ফাঁকে ওঁর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট পশুপতি ডঃ ঢোল সেজে এখানে চলে এল৷ আজকাল বিদেশে এসব প্রাচীন মূর্তি পাচার হচ্ছে চড়া দরে৷ কাজেই এই মওকায় সে দাঁও মারতে চেয়েছিল৷ ডঃ ঢোলকে পুলিশ যখন-খুশি মন্দিরে ঢুকতে বাধা দেবে কোন সাহসে? তিনিই কিনা এই পুরাতাত্ত্বিক আবিষ্কারের পেছনে৷’’
বলে বৃদ্ধ ঘুঘুমশাই চোখ বুজে কান পেতে কী যেন শুনতে থাকলেন৷ তারপর আচমকা বাইনোকুলারটা টেবিল থেকে নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন৷ বুঝলুম, কী দুর্লভ প্রজাতির পাখির ডাক শুনেছেন! এ বেলার মতো নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে হাথিয়াগড়ের বনবাদাড় আর পাহাড় ভেঙে পাখির পেছন-পেছন ঘুরবেন৷ বুড়ো হাড়ে এত সয়!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন