খামারবাড়িতে হত্যাকাণ্ড

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

এক

আজকাল সমর-বিভাগের অফিসারদের অনেককেই দেখা যায়, রিটায়ার করে চাষবাসে মন দিচ্ছেন৷ দিল্লী থেকে হরিদ্বার যাবার রাস্তায় ‘চিকারি’ নামে একটা গ্রাম পড়ে৷ গ্রাম থেকে তিন কিমি এগোলে একটা ক্যানেল৷ ক্যানেলের পারে চল্লিশ একর জমি নিয়ে মেজর হরগোবিন্দের খামার৷ ইনি অবশ্য সমর-বিভাগে নামকরা ডাক্তার ছিলেন৷ ক’বছর আগে রিটায়ার করে এখানে চাষবাস করছেন৷

পুরো জমিটা কাঠের খুঁটি পুঁতে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা হয়েছে৷ ক্যানেলের সাঁকো পেরিয়ে গেলে সামনেই খামারের গেট৷ গেটের মধ্যে ঢুকলে দেখা যাবে একতলা চারটে ইটের ঘর, টানা বারান্দা৷ আর একটু তফাতে গুদামঘর আর কৃষি-যন্ত্রপাতি রাখার আটচালা৷ মেজর ডাঃ হরগোবিন্দ যান্ত্রিক প্রথায় নিজেই চাষবাস করেন৷ বৃদ্ধ বলে মনেই হয় না, যদিও বয়স পঁয়ষট্টি পেরিয়ে গেছে৷

তাঁর আরেক নেশা সমাজসেবা৷ এলাকার গ্রামে ঘুরে-ঘুরে লোকের অসুখ-বিসুখের চিকিৎসাও করেন৷ খামারের একটা ঘরে ডিসপেন্সারি রয়েছে৷ কম্পাউণ্ডার আছে একজন৷ তার নাম রঘুরামাইয়া৷ চিকারির লোক৷ একজন রাঁধুনী আছে৷ তার নাম নারুলা৷ সে নৈনিতালের বাসিন্দা৷ রাঁধুনী হলেও সব কাজে সে পাকা৷

এ ছাড়া আছে চাষবাসে সাহায্যের জন্যে দু’জন লোক, অমরনাথ আর শিবলু৷ দারোয়ান আছে একজন, তুম্বেরিলাল৷ খামারের দিনরাতের বাসিন্দা বলতে এই পাঁচজন এবং মেজর ডাঃ হরগোবিন্দ নিজে৷

মেজরসায়েবের একমাত্র সন্তান বলতে মেয়ে, ধরিত্রী৷ সে থাকে দিল্লীতে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী৷ মাঝে-মাঝে বাবার কাছে ছুটি কাটাতে আসে৷ মেজরসায়েবের স্ত্রী অনেক আগে মারা গেছেন৷

মার্চের শেষদিকে গম কেটে নেওয়ার পর ধান চাষ করা হয়েছে৷ ভুট্টার ক্ষেতে মানুষ-সমান উঁচু ঝাড় হয়েছে৷ বাইরে ঠিকা মজুরনীরা খামারে এসে মাড়াই করে গম থেকে কুটো সাফ করছে৷ খামারে কাজের ব্যস্ততা এখন৷ মেজরসাহেব খামারের শেষদিকটায় ছোট্ট পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ মাছের পোনা খেলে বেড়াচ্ছে৷ তাঁর পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছে প্রিয় কুকুর রেক্স৷ অতিকায় অ্যালসেশিয়ান৷ সেও মনিবের মতো জলের দিকে তাকিয়ে আছে৷

মেজর হঠাৎ একটু নড়ে উঠলেন৷ ঘড়ি দেখলেন৷ বিকেল চারটে কুড়ি৷ ধরিত্রীর আসার কথা বিকেল চারটের মধ্যেই৷ গাড়ি নিয়েই আসবে সে৷ দেরি হচ্ছে কেন? ঘুরে দূরে—অনেক দূরে হাইওয়ের দিকে তাকালেন৷

এই সময় রেক্স চাপা গরগর শব্দ করে পুকুরের পশ্চিম পাড়ে ভুট্টার ক্ষেতের দিকে দৌড়ল৷ মেজর ডাকলেন—রেক্স৷ রেক্স!

রেক্স গ্রাহ্য করল না৷ ভুট্টার ক্ষেতের ধারে গিয়ে সে অনবরত গরগর করতে লাগল৷ ক্ষেতের ওপাশে কাঁটাতারের বেড়া আছে৷ বেড়ার ওপাশে খানিকটা পাথুরে জমি—ঝোপজঙ্গলে ঢাকা৷ তার ওদিকে একটা জঙ্গলভরা টিলা৷ একসময় চিকারি উপত্যকা সম্পূর্ণ অনাবাদি পড়ে ছিল৷ ক্যানেল হওয়ার পর চাষবাস শুরু হয়েছে কোথাও-কোথাও৷

রেক্স নিশ্চয়ই কোনো জন্তুজানোয়ার দেখেছে৷ মেজরসায়েব আরো কয়েকবার ডেকে তার দিকে পা বাড়ালেন৷ কাছাকাছি কোনো লোক নেই৷

ক্ষেতের ধার দিয়ে রেক্সের পাশে গিয়ে মেজর হরগোবিন্দ বললেন—কী হয়েছে রেক্স? রাগ করছ কার ওপর?

রেক্স ঘুরে একবার তাঁর মুখের দিকে তাকাল৷ তারপর ফের গরগর করতে লাগল৷

মেজরসায়েব ওর গলায় স্নেহের থাপুড় মেরে বললেন—দুষ্টু ছেলে৷ ও কিছু না, কিছু না৷ খরগোশ, নয়তো বনবেড়াল দেখেছ৷ নাকি সাপ দেখতে পাচ্ছ?

তারপর রেক্স একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল৷ দু’পা সামনে তুলে বিদঘুটে একটা শব্দ করে উঠল৷ মেজর হরগোবিন্দ সঙ্গে-সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন—বাস্টার্ড৷ স্কাউন্ড্রেল৷ রোগ!

তারপর বন্দুকের শব্দ শোনা গেল৷ একবার মাত্র৷ মেজরসায়েব পড়ে গেলেন৷ রেক্স লাফ দিয়ে ভুট্টার ক্ষেতে ঢুকল৷ ঢুকেই কিন্তু বেরিয়ে এল তক্ষুনি৷ মনিবের বুক শুঁকতে শুরু করল৷

মেজরসায়েবের চিৎকার শুনতে পেয়েছিল অমরনাথ৷ সে পাম্প চালিয়ে সামান্য দূরে ধানের জমিতে সেচ দিচ্ছিল৷ চিৎকারের পর বন্দুকের শব্দ এবং মেজরসায়েবকে পড়ে যেতে দেখে সে দৌড়ে চলে এল৷

এসে দেখল মেজর হরগোবিন্দের কপালে একটা ছোট্ট ক্ষতচিহ্ন৷ ভুট্টাক্ষেতের ধারে নালায় পড়ে আছেন৷ অমরনাথ বিকট হাঁকডাক করে খামারের লোকজনকে ডাকতে লাগল৷...

পরদিন সকালে এই ঘটনা খবরের কাগজে বেরোয় এবং তখন আমি দিল্লীতে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার একটা এসাইনমেন্টে এসেছি৷ উঠেছি ‘হোটেল রঞ্জিতের’ একটা সিঙ্গল স্যুটে৷ কম খরচে ব্রেকফাস্ট খেতে নীচের কমিউনিটি হলে এসে দেখা হয়েছে সর্বঘটে বিরাজমান আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গে৷ —হ্যালো ওল্ড ঘুঘু৷ সত্যি কী আপনি? নাকি আপনার ছদ্মবেশে কোনো সাংঘাতিক বদমাশকে দেখছি!

কর্নেল হো-হো করে হেসে বললেন—হ্যালো ডার্লিং৷ এসো, এসো৷ তোমারই অপেক্ষা করছিলাম৷

— গতরাতে আমাকে দেখেও আপনি গা-ঢাকা দিয়েছিলেন৷ দুঃখের ভঙ্গি করে বললুম৷ নিন, আড়ি নিন৷

কর্নেল একটা হাত টেনে নিয়ে সস্নেহে বললেন—বৎস জয়ন্ত, যুবকরা যখন মন খুলে আলাপ করছে, তখন সেখানে আমার মতো বৃদ্ধদের নাক না গলানোই ভাল৷ যাক গে, আমি তোমার জন্যেই এখানে ওত পেতে দাঁড়িয়ে ছিলুম৷

কোণার দিকের একটা টেবিলে আমরা বসলুম৷ দিল্লীতে এলেই আমার বরাবর বড্ড নিষ্প্রাণ লাগে সবকিছু৷ কর্নেলকে পেয়ে কী যে ভালো লাগছিল৷ কফি খেতে খেতে এতোল-বেতোল নানান গল্পগাছা চলতে থাকল৷ তারপর বললুম—এ-বেলা আমার কোনো কাজ নেই৷ চলুন, কোথাও বেরিয়ে পড়া যাক৷

কর্নেল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক সেকেন্ড৷ ওঁকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল৷ তারপর বললেন, আমার বরাতটাই এই জয়ন্ত৷ যেখানেই যাই, যেন এক ইটার্নাল মার্ডারার আমার সামনে একটা করে লাশ ফেলে দিয়ে আড়ালে মুখ টিপে হাসে৷

বুঝতে না পেরে বললুম—কেন? এখানে এসেই খুনের পাল্লায় পড়েছেন বুঝি?

—পড়ে গেছি বলতে পারো৷ কর্নেল দুঃখিত মুখে বললেন৷ আজকের কাগজে আশা করি তুমি খবরটা দেখেছো, জয়ন্ত৷

—দেখেছি৷ চিকারি না কোথায়, একটা ফার্মে কে খুন হয়েছে৷ সে তো চল্লিশ কিমি দূরে৷ আপনার সঙ্গে ও কেসের কী সম্পর্ক?

কর্নেল হাসলেন একটু৷

—আমার বরাত জয়ন্ত৷ মেজর ডাঃ হরগোবিন্দ আমার অনেক কালের বন্ধু৷ প্রায়ই লিখতেন চলে আসুন৷ দারুণ জায়গা! এবং সত্যি বলতে কী, গত পরশু ওঁর টেলিগ্রাম পেয়েই প্লেনে কাল সন্ধ্যায় পৌঁছেছি৷ রাতে যাবার সুবিধে করতে পারিনি৷ তারপর তোমাকে দেখলুম৷ ভাবলুম, সকালে জয়ন্তকে ধরে নিয়েই রওনা দেব৷

একটু খটকা লাগল৷ বললুম—টেলিগ্রাম পেয়েই মানে?

কর্নেল চাপা স্বরে বললেন—ভারি অদ্ভুত ব্যাপার৷ টেলিগ্রামে মেজরসায়েব যা লিখেছিলেন, তার মানে: আমার খামারে এলে এক বিচিত্র রহস্যের খোঁজ পেয়ে যাবেন৷ এক্ষুনি চলে আসুন৷ দেরি করলে মজা পাবেন না৷ ফুরিয়ে যাবে৷.... এখন বুঝলে জয়ন্ত? মেজর হরগোবিন্দের মতো রাশভারী মানুষ, সবসময় তাঁকে সিরিয়াস প্রকৃতির দেখেছি—তিনি এমন একটা টেলিগ্রাম করায় কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলুম৷ এ আমার স্বভাব৷ নাকি ইনটুইশান৷ তারপর আজ সকালের কাগজে মেজরসায়েবের হত্যাকাণ্ড দেখেই চমকে উঠেছি৷

— জানি কর্নেল! আপনার মাথার পোকাগুলো রহস্যের গন্ধে কটকট করে কামড়াতে থাকে৷

— তা যাই বলো জয়ন্ত, এখন কিন্তু মেজরসায়েবের রহস্য কথাটা যে নিছক কথার কথা ছিল না, তা আশা করি বুঝতে পারছ৷

— পারছি৷ আপনি তাহলে চিকারি খামারবাড়িতে যাচ্ছেন?

— আলবাত যাচ্ছি৷ এবং তুমিও যাচ্ছ৷

— কিন্তু...

— কোনো কিন্তু নয়, জয়ন্ত৷ বরং তুমি তোমার কাগজের জন্যে একটা বাড়তি স্টোরি পেয়ে যাচ্ছ—আমায় ধন্যবাদ দেওয়া উচিত ডার্লিং.....

একটু পরে আমরা দু’জনে বেরিয়ে পড়লাম৷ হোটেলের রিজার্ভেশন থাকল৷ শীগগির ফেরার ইচ্ছে ছিল আমার৷ তাই সঙ্গে বিশেষ জিনিসপত্র নিলুম না৷ কর্নেল অবশ্য সঙ্গে সব কিছু নিলেন৷ সেই প্রজাপতি ধরা জাল, বাইনোকুলার, কীটপতঙ্গসংক্রান্ত প্রকাণ্ড নোটবইটাও৷ আর ওঁর ক্যামেরার কথা না বললেও চলে৷ অন্ধকারে ছবি তুলতে পারা ওই অত্যদ্ভুত ইলেকট্রনিক ক্যামেরা সব সময় ওঁর গলায় ঝোলে৷

কর্নেল এক বন্ধুর জিপগাড়ি আগে থেকেই ম্যানেজ করে রেখেছিলেন৷ সেই জিপে আমরা রওনা দিলুম৷

দুই

চিকারি খামারবাড়িতে গিয়ে যে-ঘটনা শুনলুম, তা গোড়ায় বলেছি৷ মেজর হরগোবিন্দ প্রভাবশালী লোক ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল৷ খামারবাড়ি পুলিশে ছয়লাপ৷ দিল্লী পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চের রথী-মহারথীরা সেখানে হাজির হয়েছেন৷ সি.আই.ডি ইন্সপেক্টর অজিত লাল সাঠের সঙ্গে কর্নেলের আগেই পরিচয় ছিল৷ তাই পুলিশের দঙ্গলে ঢুকে পড়তে আমাদের অসুবিধে হল না৷ তার ওপর নিহত মেজরসায়েবের মেয়ে ধরিত্রী কর্নেলকে দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল৷ তারপর বুড়োর বুকে মাথা রেখে ‘চাচাজী’ বলে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল৷ আমার মনটা নরম হয়ে গেল৷ হতভাগ্য মেয়েটা পৃথিবীতে একেবারে একা হয়ে গেল৷ হারানো মায়ের অভাব বাবা তাকে বুঝতে দেননি একটুও৷ এবার ওর দুঃখে সান্ত্বনা দেবার আর কেউ রইল না৷ কর্নেল হয়তো ওর বাবার হত্যাকারী ধরিয়ে দিতে পারবেন, এই পর্যন্ত৷ তার বাবাকে তো ফিরিয়ে দিতে পারবেন না৷

কর্নেলের পাশে-পাশে থাকার ফলে পুলিশের তদন্তের ব্যাপারটা আমার কিছুটা লক্ষ্য করার সৌভাগ্য হল৷ মেজরসায়েব পুকুরপাড়ের ঠিক নীচে ভুট্টাক্ষেতের গায়ে ছোট্ট নালায় গুলি খেয়ে পড়ে গিয়েছিলেন, সেখানে আমরা আসার আগেই মোটামুটি তদন্ত হয়ে গেছে৷ ইন্সপেক্টর মিঃ সাঠে কর্নেলকে নিয়ে আবার সেখানে গেলেন৷

পুকুরটা খামারের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে৷ চারকোণা ছোট্ট পুকুর৷ জল পাড়ের কিনারা অব্দি ভরা৷ চারদিকের পাড়ে পেয়ারা, আপেল, পীচ ইত্যাদি ফলের গাছ আছে প্রচুর৷ তবে গাছগুলো ঘন নয় বলে ভেতরে কেউ দাঁড়ালে, বাইরে দূর থেকেও তাকে দেখা যাবে৷

পুকুরের পশ্চিম পাড়ের শেষ প্রান্তে ঢালু তিনহাত চওড়া ঘাসে ভরা জমির নীচে নালা৷ নালাটা দু’হাত চওড়া৷ সেখানে ডানপাশে কাত হয়ে মেজরসায়েব পড়ে ছিলেন৷ গুলিটা লেগেছিল ঠিক কপালের মধ্যিখানে৷ মিঃ সাঠের ধারণা, নালার পশ্চিমে ভুট্টাক্ষেতের ভেতর থেকে আততায়ী গুলি ছুড়েছিল৷ কিন্তু এটাই আশ্চর্য, ভুট্টাক্ষেতের জমিটা ভিজে হওয়া সত্ত্বেও কোথাও কোনো পায়ের ছাপ নেই!

অথচ রেক্স ওই জমির দিকে তাকিয়ে গর্জন করেছিল এবং মেজর গুলি খেয়ে পড়ার পর সে ওই জমির মধ্যে ঢুকেই ফিরে এসেছিল৷ রেক্সের পায়ের দাগে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে৷

রেক্স দু’পা তুলে অদ্ভুত একটা ভঙ্গিই বা করেছিল কেন? মেজরসায়েব কাকে দেখতে পেয়ে কিংবা অনুমান করে গালাগালি করেছিলেন?

গতকাল বিকেল চারটে কুড়িতে ঘটনাটা ঘটেছে এবং এর যে-বিবরণ গোড়ায় দিয়েছি, তা বাবুর্চি নারুলার বর্ণনা থেকে৷ নারুলা ওই সময় নাকি পুকুরের পুবপাড়ে অড়হর ক্ষেতের ধারে দাঁড়িয়ে ছিল এবং সব লক্ষ্য করেছে৷ এমনকী মেজরসায়েব যখন ঘড়ি দেখেন, সেও তার ঘড়িতে সময় দেখেছিল চারটে কুড়ি৷ ধরিত্রীর আসার কথা চারটেয়, তাও সে জানে৷ তার বিবৃতি থেকেই পুলিশ ঘটনাটা ওইভাবে সাজিয়েছে এবং আমি অবিকল সেভাবে বর্ণনা করেছি৷

কিন্তু নারুলা আজ সকালে পুলিশের জেরার চোটেই ওইসব কথা কবুল করেছে৷ তার আগে পর্যন্ত সমস্ত ব্যাপারটা সে চেপে ছিল৷ এমনকী বন্দুকের শব্দ শুনে এবং দূর থেকে মেজরকে পড়ে যেতে দেখে অমরনাথ যখন দৌড়ে যায়, তখনও সে পুকুরপাড়ে অড়হর-ঝোপে দাঁড়িয়ে ছিল৷ কেন? তার জবাবে নারুলা বলেছে—হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলুম স্যার! একেবারে মাথার ঠিক ছিল না৷

পুলিশ জেরা করা অব্দি হতভম্ব হয়ে থাকাটা কাজের কথা নয়৷ বিশেষ করে নারুলা যে ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল, তা দূর থেকে এক মজুরনী কুন্তীর চোখে না পড়লে সে হয়তো সব চেপেই থাকত৷ কেন? নারুলার ওই এক কথা৷ ‘হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলুম স্যার৷ মাথার ঠিক ছিল না৷’

কুস্তীর সাক্ষ্যেই নারুলাকে জেরা করা হয়েছে বোঝা যায়৷ তারপর তথ্য গোপনের অপরাধে তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে৷ কিন্তু আমরা যখন গেছি, তখনও তাকে খামার থেকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হয়নি৷ সরজমিনে আরও জেরা করার জন্য রাখা হয়েছে৷ এদিকে ফোরেন্সিক এক্সপার্টরা তখনও এসে পড়েননি৷....

ভুট্টাক্ষেতের ভেতরে সাবধানে ঢুকে গেলেন কর্নেল এবং মিঃ সাঠে৷ আমি আনমনে হাঁটতে হাঁটতে পুকুরের পশ্চিমপাড়ে এগিয়ে দক্ষিণ পাড়ে গেলুম৷ ওদিকটায় আপেল গাছই বেশি৷ শেষ দিকটায় কাঁটতারের বেড়া আছে৷ এখানে গাছগুলো বেশ ঘন৷ ঝোপের মতো দাঁড়িয়ে আছে৷ যত পাতা, তত ফল৷

সেই সময় চোখে পড়ল, একটা আপেল গাছের তলায় গোড়া ঘেঁষে খানিকটা শুকনো পাতা জড়ো করা রয়েছে৷ এতে অস্বাভাবিক কিছু হয়তো ছিল না, সবগুলো গাছের তলাতেই শুকনো পাতা পড়ে আছে প্রচুর৷ কিন্তু ওই গাছটার গোড়ায় জড়ো করা পাতাগুলো দেখে মনে হল, এভাবে তো আপনা-আপনি পাতাগুলো জড়ো হওয়ার কথা না৷ অথচ ঝাঁটার দাগ নেই৷ মাটিটা শুকনো৷

পাতাগুলোর কাছে হাঁটু দুমড়ে বসে একটা শুকনো কাঠি দিয়ে সরাতে থাকলুম৷ তারপর আঁতকে উঠলুম৷ বেলা প্রায় এগারোটা বাজে, কড়া রোদ্দুর৷ সূর্যের আলো পাতার ফাঁকে এসে পড়েছে এবং ঠিকরে পড়ছে একটা রূপোলি রিভলবারের গায়ে৷

ভালো করে পাতাগুলো যেই সরিয়েছি, আমার পেছনে পায়ের শব্দ শুনলুম৷ শব্দটা শুনে মুখ ঘুরিয়ে দেখতে যাচ্ছি, আচমকা মাথার পেছনে যেন একটা বিশাল পাহাড় এসে পড়ল৷ তীব্র যন্ত্রণা এবং মাথা ঘুরে উঠল৷ তারপর আর কিছু মনে নেই৷...

কতক্ষণ পরে জানি না, কানে এল দূর থেকে কে চেনা গলায় আমাকে ডাকছে, জয়ন্ত! জয়ন্ত! আরও এক মিনিট হয়তো দেরি হল ব্যাপারটা বুঝতে৷ তারপর চোখ খুলে অবাক হয়ে গেলুম৷ আপেল গাছের তলায় শুকনো মাটিতে শুয়ে আছি৷ ধুড়মুড় করে উঠে বসলুম৷ তারপর মনে পড়ল ব্যাপারটা৷ তাকিয়ে দেখি, জড়ো করা পাতার মধ্যে রিভলবারটা নেই!

তিন

খামারবাড়ির একতলার চারটে ঘরের কথা আগেই বলেছি৷ গেটের দিকে শেষ ঘরটা অতিথিদের জন্যে ব্যবহার করা হয়৷ সেই ঘরে আচ্ছন্ন অবস্থায় শুয়ে থেকেছি অর্থাৎ আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে বিকেল অব্দি৷ হয়তো ঘুমিয়েও থাকব৷ দিল্লীর পুলিশের সঙ্গে যে-ডাক্তার ভদ্রলোক এসেছেন, তাঁর নাম ডাঃ নওলকিশোর সিং৷ তিনিই আমাকে ওষুধপত্তর খাইয়েছেন৷ খোঁজখবর নিয়েছেন সব সময়৷ বিকেলে যখন উঠে বসলুম, তখন মাথায় ব্যথা এবং আচ্ছন্নভাবটা আর নেই৷ কিন্তু ব্যান্ডেজটা রয়েছে৷

দেখলুম ঘরে আমি একা৷ জানালার পর্দা সরিয়ে খামারবাড়ির ভেতরটা লক্ষ্য করলুম৷ দূরে কর্নেলকে দেখা গেল৷ তাঁর সুপ্রসিদ্ধ টাকে বিকেলের লালচে রোদ চকচক করছে৷ অনবরত দাড়ি চুলকোচ্ছেন আর মিঃ সাঠের সঙ্গে কথা বলছেন৷ জনাকতক কনস্টেবল পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ খামারের জমিগুলোতে কোথাও কোনো লোক নেই৷ সামনে প্রাঙ্গণে সম্ভবতঃ খামারের কর্মচারীরা মাড়াই করা গমের পাঁজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে৷

পায়ের শব্দ হতেই দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালাম৷ জীবনে এই প্রথম ঠকে শিখেছি৷ কিন্তু না৷ কোনো বেরসিক আততায়ী এক টুকরো পাথর নিয়ে আমার মাথার পিছনে আঘাত করতে ঘরে ঢোকে নি৷ ধরিত্রী এসেছে৷

ধরিত্রী বলল—মিঃ চৌধুরী, এখন শরীর কেমন আপনার?

— আসুন, মিস সিং৷ আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ৷... বলে বিছানায় হেলান দিয়ে বসলুম৷ ধরিত্রী কোণার সোফায় বসল৷ তার সুন্দর মুখে শোকের চিহ্ন স্পষ্ট৷ গাম্ভীর্য থমথম করছে৷ কিন্তু মানসিক দৃঢ়তারও পরিচয় রয়েছে৷

ধরিত্রী বলল—কফি এসে পড়বে এখনই৷ কফিটা খেয়ে নিন৷ আরও চাঙ্গা হয়ে উঠবেন৷

বললুম—আচ্ছা মিস সিং, যদি কিছু মনে না করেন—একটা প্রশ্ন করব৷

ধরিত্রী একটু হাসবার চেষ্টা করে বলল—না, না৷ মনে করার কী আছে? বলুন না৷ —মেজরসায়েব মানে আপনার বাবাকে কে খুন করেছে বলে আপনার ধারণা?

ধরিত্রী এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল—দেখুন মিঃ চৌধুরী, পুলিশও আমাকে এ প্রশ্ন করেছে৷ বলেছি, আমার মাথায় আসছে না৷ বাবার সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল না৷ ছিল না, একথা আমি জোর দিয়েই বলব৷ হয়তো একটু সিরিয়াস টাইপ এবং রাগী বা জেদিও ছিলেন খানিকটা৷ তাই বলে তাঁর সঙ্গে কারো শত্রুতা ছিল না৷ থাকলে নিশ্চয়ই আমি জানতুম৷ বাবা কোনো কথা আমাকে গোপন করতেন না৷

—শুনলুম গতকাল আপনার আসার কথা ছিল চারটে নাগাদ৷ সাড়ে পাঁচটায় এসে পৌঁছেছিলেন!

প্রশ্নটা গোয়েন্দার মতো হয়ে গেল নিশ্চয়ই৷ ধরিত্রী যেন একটু ক্ষুব্ধ হল৷ আমার কাছে গোয়েন্দাদের প্রশ্ন সে হয়তো আশা করেনি৷ গম্ভীর হয়ে বলল—পুলিশের ওই একই কথা৷ এর সঙ্গে বাবার মার্ডারের ঘটনার কী যোগাযোগ আছে, বুঝতে পারছি না৷

একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলুম৷ বললুম—না, না৷ জাস্ট মাথায় এল প্রশ্নটা৷ আপনি তো জানেন, আমি পুলিশ নই৷ শখের গোয়েন্দাও নই৷ খবরের কাগজের রিপোর্টার৷ এ নিছক কৌতূহল, মিস সিং!

ধরিত্রী এ-কথায় আবার একটু হাসল৷ বলল—দিল্লীতে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে আটকে পড়েছিলুম৷ সে-জন্যেই দেড় ঘণ্টা দেরি হয়ে গিয়েছিল৷ এতে কোনো সিরিয়াস ব্যাপার নেই৷

এই সময় যে কফির ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল, তাকে দেখে হাঁ করে রইলুম৷ সেই বাবুর্চি নারুলা! ব্যাপার কী? তাকে ছেড়ে দিল যে পুলিশ?

নারুলা ট্রে রেখে দাঁড়াল৷ ধরিত্রী বলল—ওঁদের ডেকে নিয়ে এসো৷ বলো, কফি রেডি৷

নারুলা চলে গেল৷ বললুম—পুলিশ ওকে অ্যারেস্ট করেছিল৷ ছেড়ে দিল বুঝি?

ধরিত্রী বলল—হাঁ৷ বেচারার ওপর খামোকা সন্দেহ৷ ও খুব ভালোমানুষ৷ নিরীহ প্রকৃতির৷ বাবা ওকে খুব বিশ্বাস করতেন৷ সেই ছেলেবেলা থেকে নারুলা আমাদের ফ্যামিলিতে আছে৷ কোনো সময় এতটুকু অবিশ্বাসের কাজ করেনি৷

— কিন্তু মার্ডারের ঘটনা চোখে দেখেও চেপে রেখেছিল!

— ওটা আপনাদের ব্যাখ্যার ভুল, মিঃ চৌধুরী৷ নারুলা বেচারা বরাবর ওই রকম ভীতু আর বোকা৷... বলে ধরিত্রী উঠে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল৷ কর্নেল, মিঃ সাঠে এবং ডাঃ সিং কথা বলতে-বলতে আসছেন শোনা গেল৷ তাঁদের অভ্যর্থনা করতেই ধরিত্রী এগিয়ে গেল৷

কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন—হ্যাল্লো ডার্লিং৷ আশা করি এখন মগজের আচ্ছন্নতা সম্পূর্ণ কেটে গেছে৷ ডাঃ সিংয়ের চিকিৎসার প্রতি আমার আস্থা প্রচুর৷

কর্নেল হেসে উঠলেন হো-হো করে৷ সবাই হাসলেন৷ সোফায় বসে ডাঃ সিং বললেন—ব্যথা কমেছে তো, মিঃ চৌধুরী?

ঘাড় নাড়লুম৷ মিঃ সাঠে বললেন—তাহলে কফি খেতে-খেতে অসমাপ্ত আলোচনাটা সেরে নেওয়া যাক৷ কী বলেন কর্নেল?

কর্নেল বললেন—স্বচ্ছন্দে৷

ধরিত্রী কফিতে দুধ মিশিয়ে পেয়ালাগুলো প্রত্যেকের হাতে তুলে দিল৷ তারপর নির্দ্বিধায় বিছানায় আমার সামান্য তফাতে পা ঝুলিয়ে বসল৷

ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মিঃ সাঠে বললেন—পয়েন্ট আটত্রিশ ক্যালিবারের রিভলবার থেকে গুলি ছোড়া হয়েছে৷ ফোরেন্সিক এক্সপার্টদের রিপোর্ট এবং মর্গের রিপোর্টও তাই বলছে৷ এদিকে জয়ন্তবাবুও একটা রিভলবার দেখেছিলেন আপেল গাছের গোড়ায়৷ শুকনো পাতার তলায় ঢাকা ছিল৷ এখানে দুটো প্রশ্ন ওঠে৷ এক: রিভলবারের পাল্লার মধ্যে ছিলেন মেজরসায়েব৷ তাহলে নিশ্চয়ই তাকে কাছেই দেখতে পেয়েছিলেন৷ দুই: রিভলবারটা খুনি কাছাকাছি জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিল৷ অকুস্থল থেকে মাত্র পঞ্চাশ-ষাট হাত দূরে৷ সে মার্ডার উইপন নিয়ে যাবার সুযোগ পায়নি৷ কিন্তু সারাটা রাত গেল৷ গতরাতে অন্ধকারও ছিল৷ চাঁদ ওঠে রাত তিনটের পর৷ ওখানে রাতে কোনো পুলিশও ছিল না৷ ডেড-বডি অলরেডি দিল্লী মর্গে পাঠানো হয়েছিল রাত সাড়ে আটটা নাগাদ৷ অথচ রিভলবারটা আজ দুপুর অব্দি কেন ওখানে রইল?...বলে মিঃ সাঠে কর্নেলের মুখের দিকে তাকালেন৷ ফের বললেন—এ ব্যাপারে আপনার ধারণা কী, কর্নেল?

কর্নেল বললেন—গতকাল সন্ধ্যা থেকে আজ দুপুর অব্দি পুলিশের পক্ষ থেকে আশেপাশের জায়গাগুলো ভালো করে খুঁজে দেখার চেষ্টাই হয়নি৷ আগে এই ত্রুটিটা কি আপনি স্বীকার করবেন, মিঃ সাঠে?

মিঃ সাঠে একটু হেসে বললেন—স্বীকার না করার কারণ দেখি না৷ আসলে কী হয়েছিল জানেন কর্নেল? আমরা ধরেই নিয়েছিলুম, গুলি ছোড়া হয়েছে বন্দুক থেকে এবং আততায়ী ভুট্টাক্ষেতের মধ্যে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে টিপ করেছিল৷ আমাদের ভুলের জন্যে দায়ী...

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন—নারুলার স্টেটমেন্ট৷

— ঠিক বলেছেন৷ নারুলা ঘটনাস্থল থেকে আন্দাজ দেড়শো গজ দূরে মেজরসায়েবের একেবারে পিছনে ছিল৷ অড়হর ঝাড়টার কাছে দাঁড়ালে মেজরসায়েবের কাঁধ থেকে মাথাটুকুই দেখা যায়৷ তা ছাড়া তখন নারুলার চোখের সামনে সূর্য৷ তার ভুলই দেখার কথা৷ তার ভুলেই আমাদের ভুল৷

কর্নেল বললেন—দ্যাটস কারেক্ট৷ মেজরসায়েবের কপালের মাঝামাঝি জায়গায় গুলি লেগেছিল৷ অথচ ভুট্টাক্ষেতে কোনো পায়ের দাগ নেই৷ তার মানে আততায়ী ছিল তাঁর দিকে অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে৷ এদিকে মেজরসায়েবের ডান পায়ের জুতোর ডগা নালায় গভীর দাগ ফেলেছে৷ এর একটিই কারণ হতে পারে৷ মুখ ঘুরিয়ে বাঁদিকে তাকিয়ে আততায়ীকে দেখতে পেয়েছিলেন এবং গুলি লাগার সঙ্গে-সঙ্গে ডান পা আগে নালায় পড়ে দেবে যাবার কথা৷ বাঁ-পা নালার গায়ে পড়ে ছিল৷ ঘষটানো দাগ রয়েছে৷

মিঃ সাঠে বললেন—মেজরসায়েবের বাঁ-দিকে বেড়া অব্দি দূরত্ব হচ্ছে মাত্র ষোলো গজের সামান্য বেশি৷ নালাটা বেড়া অব্দি গিয়ে পশ্চিমে ঘুরে ভুট্টাক্ষেতে ঢুকেছে৷ ঘটনাস্থল থেকে সাত গজ দূরে নালার ধারে-ধারে বেড়া পর্যন্ত ঘন অড়হর ঝোপ৷ আততায়ী অড়হর ঝোপেই ছিল ওত পেতে৷ অতএব রেক্সও বাঁ-দিকে ঘুরে তাকে দেখে গরগর করছিল৷ নারুলা এটাও গুলিয়ে ফেলেছে৷

কর্নেল বললেন—রেক্স দু’পা তুলে অদ্ভুত ভঙ্গি করেছিল, মাইন্ড দ্যাট৷

মিঃ সাঠে চিন্তিত মুখে বললেন—ভেরি ইমপর্টান্ট পয়েন্ট৷ খামারের কেউ বলতে পারল না, কিংবা ইচ্ছা করেই বলল না হয়তো, রেক্স কাকে দেখে অমন ভঙ্গি করত!

ধরিত্রী কী বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছে দেখলুম৷ কিন্তু সে চুপ করে গেল৷ ব্যাপারটা শুধু আমারই চোখে পড়ল৷ ডাঃ সিং বললেন—এসব ব্যাপারে আমার জ্ঞানগম্যি বিশেষ নেই৷ তবে একটা কথা মনে হচ্ছে৷

কর্নেল বললেন—বলুন, বলুন!

ডাঃ সিং বললেন—আততায়ী রেক্সের সুপরিচিত৷

মিঃ সাঠে বললেন—সে তো বোঝাই যায়৷ ওটা প্রথমেই আমরা ধরে নিয়েছি, ডাঃ সিং! তা ছাড়া সে মেজরসায়েবেরও খুব চেনা লোক৷ তাকে দেখে তিনি জোরে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন—মানে, বাস্টার্ড ইত্যাদি বলে গাল দিয়েছিলেন৷ এত জোরে যে দেড়শো গজ দূর থেকে নারুলার কানে গিয়েছিল তা৷ তো সে-কথা আপাততঃ থাক৷ গোড়ার কথায় ফিরে যাই৷ কর্নেল, আমার দুটো প্রশ্ন সম্পর্কে আপনার ধারণা কী, জানতে চেয়েছিলুম৷

কর্নেল অভ্যাসমতো দাড়ি চুলকোতে-চুলকোতে বললেন—আততায়ী বাইরে থেকে আসেনি৷ খামারেই ছিল৷ গুলি করার পর রিভলবারটা কয়েক গজ দূরে ডান দিকে অর্থাৎ পূর্বে পুকুরের দক্ষিণপাড়ে আপেল গাছের তলায় লুকিয়ে রেখেছিল এবং ভালোমানুষ সেজে খামারের লোকের সঙ্গে ব্যস্তভাবে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিল৷ এ ছাড়া কী বলা যায়?

— তাহলে সে রিভলবারটা রাতে কোনো এক সময় সরাতে পারত!

— পারেনি, তা বোঝাই যায়৷ কর্নেল একটু হাসলেন৷... ঘটনা ঘটে চারটে কুড়ি নাগাদ৷ পুলিশ আসে সাতটার একটু পরে৷ এই তিন ঘণ্টা লাশের কাছে মজুর-মজুরনী এবং অমরনাথ আর শিবলু ছিল৷ নারুলাও ছিল৷ তাদের চোখ এড়িয়ে ওদিকে অস্ত্র সরাতে যাওয়া সম্ভব ছিল না৷ তারপর পুলিশ এসে তো সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে৷ আপনি এসেছিলেন ক’টায় যেন?

— সাড়ে সাতটায়৷ এসে আমি সবাইকে একে-একে জেরা করার জন্যে ওই বারান্দায় বসিয়ে রেখেছিলুম৷ তারপর সারারাত ওই উঠোনে কনস্টেবল পাহারা ছিল৷ আমিও ওত পেতে বসে ছিলুম পাশের ঘরে৷ যদি কেউ কোনো মতলবে বেরোয়, চোখে পড়তে পারে! কেউ বেরোয় নি৷ বেরুলেই চোখে পড়ত আমার, অথবা সেপাইদের৷

ডাঃ সিং বললেন—ওরা বাইরে বেরুবে ভেবেছিলেন কেন?

বুঝলুম ডাঃ সিং লোকটি একেবারে গবেট৷ আমার হাসি এসে গেল৷ ডাঃ সিং আমার দিকে তাকালে বিব্রত বোধ করলুম৷ বললুম—খুব সঙ্গত প্রশ্ন, ডাঃ সিং৷

মিঃ সাঠে হেসে উঠলেন৷ বললেন—মার্ডার উইপন পাওয়া যায়নি বলেই সবাইকে চোখে চোখে রেখেছিলুম৷

ডাঃ নাছোড়বান্দার মতো প্রশ্ন করলেন—কিন্তু যেই সূর্যদেব উঠলেন, নিশ্চয়ই চোখে-চোখে রাখাটা আর কনটিনিউ করা হল না?

না, লোকটা গবেট নয়৷ আমারই ভুল৷ যুক্তিসঙ্গত মন্তব্য বলা যায়৷ কর্নেল গম্ভীর মুখে বলে উঠলেন—রাইট, রাইট৷

ডাঃ সিং বললেন—অথচ ব্যাটা খুনি দিব্যি জয়ন্তবাবুর মাথায় পাথর ঠুকে অস্ত্রটি হাতিয়ে কেটে পড়ল৷

বিব্রত মুখে মিঃ সাঠে বললেন—মানে, জাস্ট একটুখানি ভুট্টাক্ষেতে ঢুকেছি কর্নেলকে নিয়ে৷ সেই ফাঁকে লোকটা ওখানে হাজির হয়েছে চুপিচুপি৷

হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—আচ্ছা স্যার, শুনলুম মেজরসায়েবের একজন কম্পাউণ্ডার ছিলেন৷ তিনি কোথায়?

মিঃ সাঠে বললেন—ও! রঘুরামাইয়া তো? সে গতকাল দুপুরে ছুটি নিয়ে গ্রামে গিয়েছিল৷ তাকে আজ সকালে ডেকে আনা হয়েছে৷ সন্দেহজনক কিছু পাইনি৷

ডাঃ সিং বললেন—কর্নেলসায়েব বলছেন, খুনি খামারেরই কেউ৷ কিন্তু খামারের কাকে দেখে রেক্স গরগর করবে? কাকে দেখেই পা তুলে অদ্ভুত ভঙ্গি করবে? এবং কেনই বা মেজরসায়েব তাকে দেখে গাল দেবেন?

কর্নেল বললেন—খুব কড়া প্রশ্ন, ডাঃ সিং৷ কিন্তু আপনি যে বললেন, আমি নাকি বলেছি খুনি খামারেরই কেউ—ওটা ভুল শুনেছেন৷ আমি বলেছি, খুনি যেভাবেই হোক খামারেই ছিল৷ তাকে নারুলা, অমরনাথ, শিবালু বা দারোয়ান তুম্বেরিলাল কিংবা মজুর-মজুরনীদের অবশ্যই দেখতে পাওয়া উচিত ছিল৷ অথচ কেউ নাকি দেখতে পায়নি৷ নাকি দেখেও চেপে যাচ্ছে৷

মিঃ সাঠে বললেন—জেরা যথেষ্ট করা হয়েছে৷ তেমন সন্দেহজনক কিছু দেখা যাচ্ছে না ওদের স্টেটমেন্টে৷

কর্নেল বললেন—আমার দৃঢ় বিশ্বাস, খুনি মাঝে-মাঝে খামারে এসেছে৷ গতকালও কোনো এক সময় থেকে সে খামারে ছিল৷ হয়তো আজ দুপুরে জয়ন্তকে অজ্ঞান করে রিভলবার নিয়ে সে কেটে পড়েছে৷... বলেই কর্নেল ঘুরে ধরিত্রীর দিকে প্রশ্ন ছুড়লেন—আচ্ছা ধরিত্রী, তোমার কাকা মিঃ অনন্তরাম এখন তো ক্যানাডায় আছেন, তাই না?

ধরিত্রী ঘাড় নাড়ল৷

—তাঁকে কি খবর দেওয়া হয়েছে?

—হয়েছে৷ ধরিত্রী জবাব দিল৷ জরুরী টেলেক্স পাঠানো হয়েছে গতকাল সন্ধ্যায়৷

কর্নেল একটু ভেবে নিয়ে বললেন—তাহলে আজ রাতে কিংবা আগামীকাল সকালে উনি এসে পড়তে পারেন৷

এই সময় বারান্দায় শেকলে বেঁধে রাখা রেক্সের গরগর আওয়াজ শোনা গেল৷ ধরিত্রী অমনি বাইরে চলে গেল৷ মিঃ সাঠে চিন্তিতভাবে বললেন—তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই৷ খুনি বাইরে থেকে এসেছিল৷ খুন করার পরেও খামারে থেকে গিয়েছিল৷ কারণ মার্ডার উইপনটা যে-কোনো কারণেই হোক, সরাবার সুযোগ পায়নি৷ এই তো আপনার সিদ্ধান্ত, কর্নেল?

কর্নেল বললেন—জাস্ট এ প্রবেবিলিটি, মিঃ সাঠে৷ নিছক সম্ভাবনা৷

আমি বললুম—কিন্তু গুলি করার পর খুনি রিভলবার লুকিয়ে রাখতে গেল কেন? সে তো ওটা নিয়েই তক্ষুনি পালিয়ে যেতে পারত৷ মাঠের ওপাশে পাহাড় এবং জঙ্গল রয়েছে৷

কর্নেল মাথা দুলিয়ে বললেন—দ্যাটস রাইট, জয়ন্ত৷ কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সে তা করেনি৷ খুনের পর রিভলবার লুকিয়েই রেখেছিল৷ অতএব খুনের পিছনে তার আরও উদ্দেশ্য ছিল৷ সেই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যেই তার খামারে থাকার দরকার ছিল৷ অথচ কাছে অস্ত্র রাখার ঝুঁকি আছে৷ কারণ পুলিশ সবাইকে বডি-সার্চ করবে৷ সবার জিনিসপত্রও সার্চ করবে৷ এ রিস্ক সে নেয়নি৷

গুম হয়ে বললুম—তাও বটে৷

চার

সত্যি বলতে কী, গতকাল অদৃশ্য খুনির হাতের একটি মোক্ষম চাঁটি খাওয়ার পর আমার এমন আতঙ্ক হয়েছিল যে ঘর থেকে বেরুতেই ভয় পাচ্ছিলুম৷ রাতটা কোনোরকমে কাটিয়ে দিলুম৷ সকালে কেটে পড়তে পারলে বেঁচে যেতুম৷ কিন্তু কর্নেল আমাকে ছাড়লে তো?

অবশ্য রাতটা ভালোয়-ভালোয় কেটে গেল৷ কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটল না৷ ডাঃ সিং সন্ধ্যার পর দিল্লী ফিরে গেছেন৷ কর্নেল, মিঃ সাঠে এবং অন্যান্য পুলিশ অফিসাররা কী সব গুজগুজ ফিসফিস করছিলেন অনেকটা রাত অব্দি৷ আমি তাতে নাক গলাইনি৷ বিছানায় শুয়ে বই পড়ে কাটিয়েছি৷ অনেক রাতে ঘুম ভেঙে বাইরে রেক্সের গর্জন শুনেছি৷ আর কর্নেলের নাসিকা গর্জন তো ছিলই৷

সকালে কর্নেল বললেন—এসো জয়ন্ত, একটু ঘোরাঘুরি করে আসি৷ কাল থেকে বাইশটি ঘণ্টা তুমি ঘরের মধ্যে কাটাচ্ছ৷ এটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়৷ মগজের জ্যাম ছাড়াতে খোলা হাওয়ায় ঘোরাঘুরি করা দরকার৷

উদ্বিগ্ন হয়ে বললুম—কিন্তু ওই পুকুরপাড়ের হাওয়াটা স্বাস্থ্যকর নয়৷ বরং অন্য কোথাও হাওয়া খেতে যাওয়া যায়৷ অন্ততঃ যেখানে কোনো ঝোপ-জঙ্গল নেই৷

কর্নেল হাসতে-হাসতে আমার হাত ধরে বললেন—আমরা ঝোপ-জঙ্গলে ঢুকব না৷ এসোই না৷ আমাদের জিপটা গ্যারেজ থেকে বের করে এনে দিল অমরনাথ৷ কর্নেল স্টিয়ারিং-এ বসে পড়লেন৷ অমরনাথ নিজের কাজে গেল৷ আমি কর্নেলের ডান পাশে বসলুম৷ আমাদের জিপ গেট দিয়ে বেরিয়ে ক্যানাল ব্রিজ পার হয়ে মাঠের রাস্তায় পড়ল৷ একফালি পিচের এই রাস্তা মেজর হরগোবিন্দের উদ্যমেই তৈরি৷ গতকাল সকালে এই রাস্তা দিয়েই আমরা দিল্লী থেকে এসেছিলুম৷

তিন কিমি দূরে চিকারি গ্রাম৷ ছোট্ট বসতি৷ কিছু দোকানপাটও আছে৷ হরিদ্বারের দিকে যে বড়ো রাস্তাটা গেছে, এই গ্রাম তারই ধারে৷ বড়ো রাস্তায় উঠে ডাইনে ঘুরে গ্রামের শেষ প্রান্তে জিপ থেমে গেল৷ একটা পিপুল গাছের তলায় কতকগুলো ছেলেমেয়ে খেলা করছিল৷ তারা এসে ভিড় করে দাঁড়াল৷ কর্নেল হাসিমুখে পকেট থেকে একগাদা চকলেট বের করে তাদের মধ্যে বিলি করে দিলেন৷

তারপর একজনকে বললেন—ভোমরলালের বাড়িটা কোথায়? ওকে ডেকে দেবে?

সামনে উঁচু-নীচু পাথর ভরতি জায়গায় কুঁড়েঘর রয়েছে অনেকগুলো৷ গবির লোকের বস্তি৷ ছেলেটি একটা ঘর দেখিয়ে দিয়ে বলল—ওই যে! ভোমরলাল খুব বুড়ো হয়ে গেছে সায়েব৷ হাঁটতে পারে না৷

কর্নেল বললেন—ঠিক আছে৷ এসো জয়ন্ত৷

আমরা একটা খোলামেলা বাড়ির উঠানে গিয়ে দাঁড়ালুম৷ জিপ দেখে একটি মেয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল৷ মধ্যবয়সী মেয়ে৷ কর্নেল ওকে বললেন—ভোমরলালজির সঙ্গে দেখা করব, বোন৷

ভয়-পাওয়া গলায় মেয়েটি বলল—আপনারা পুলিশের লোক?

কর্নেল হাসলেন—না বোন৷ আমরা অন্য একটা কাজে এসেছি৷ আমরা পুলিশ হব কোন দুঃখে?

মেয়েটি ঠোঁট কামড়ে ধরে কী যেন ভাবল, তারপর বলল—তাহলে কী কাজ?

কর্নেল চাপা গলায় বললেন—আমরা দিল্লী থেকে এসেছি৷ সরকারের জমিজমা দফতরের লোক৷

শুনেই মেয়েটি চঞ্চল হয়ে উঠল৷ তক্ষুনি গুহার মতো পাথরের ঘরটার মধ্যে উঁকি মেরে কাকেও কিছু বলল৷ তারপর একটা খাটিয়া এনে উঠানের পেয়ারা গাছের তলায় রাখল৷ আমরা বসলুম৷ একটু পরে গুহাঘরের দরজা দিয়ে খটখটে বুড়ো একটা লোক লাঠি ধরে বেরিয়ে এল৷ আমাদের সামনে এসে সেলাম দিল৷ তারপর মাটিতে বসে পড়ল৷ মেয়েটি তার পাশে দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে৷

কর্নেল বললেন—ভোমরলালজি, আপনাকে অসময়ে বিরক্ত করলুম বলে আশা করি কিছু মনে করবেন না৷ কয়েকটা কথা আপনার কাছে জানতে চাই৷

ভোমরলাল বলল—আপনারা দিল্লী থেকে আসছেন?

— হ্যাঁ৷

— সরকারের লোক?

— হ্যাঁ, ভোমরলালজি৷

— জমিজমা দফতরের অফিসার?

— হ্যাঁ৷ আপনার কাছে...

বাধা দিয়ে ভোমরলাল বলল—আমার জমি ফেরত পাব, না পাব, আগে তাই বলুন হুজুর৷

কর্নেল হাসলেন৷ —ফেরত পেতে হলে আগে আমার কথাগুলোর জবাব দিতে হবে ভোমরলালজি৷

— বেশ, বলুন৷

— মেজর হরগোবিন্দ সিং আপনার কত বিঘে জমি কিনেছিলেন?

— কিনেছিলেন? বিলকুল মিথ্যে, স্রেফ ঝুটবাজি৷ ভোমরলাল প্রায় গর্জন করে উঠল৷

— কেন? টাকা দিয়ে আপনার জমি কেনেননি মেজরসায়েব?

জোর মাথা দোলাল ভোমরলাল৷ তারপর বলল—উনি আমাকে রাস্তার ফকির করেছেন হুজুর৷ শুধু আমাকে একা নয়৷ এই চিকারিবস্তির আরও অনেকের জমির জবরদখল করে সবাইকে ফকির করে দিয়েছেন৷ আমরা কত দরখাস্ত করেছিলুম ওপরে৷ কোনো ফল হয়নি৷ তারপর শুনলুম কিনা দিল্লীতে সরকার বদল হয়েছে৷ আবার গতমাসে একখানা আর্জিতে সই করে পাঠিয়েছি৷ আপনারা এতদিনে এনকোয়ারিতে এলেন৷ তো বস্তিতে আরও সবাইকে ডাকুন৷ ডেকে সব শুনুন৷

কর্নেল বললেন—আপাততঃ আপনার কথাই শোনা যাক৷ কত বিঘে জমি ছিল আপনার?

— বারো বিঘে জমি হুজুর৷ আগে তো তেমন কিছু ফলত না৷ বছর তিনেক আগে ক্যানেল হল৷ তারপর সোনাফলা জমি হয়ে গেল৷ কিন্তু চাষ দিতে গিয়ে বাধা পেলুম৷ মেজরসায়েব নাকি জমি সরকারের কাছে বন্দোবস্ত নিয়েছেন কবে৷ অথচ আমরা কত পুরুষ ধরে ওই জমিতে চাষ দিয়েছি৷ খাজনাও দিয়েছি৷ কোনো কসুর ছিল না৷

— একটা কথার জবাব দিন৷ আপনি কি মেজরসায়েবের কাছে কোনো সময় টাকা ধার নিয়েছিলেন?

— আমি? টাকা ধার নিয়েছিলুম? কক্ষনো না, হুজুর৷

— কোনো কাগজে কখনও সই দিয়েছিলেন?

— সই তো, আজ পর্যন্ত কত কাগজে টিপসই দিলুম৷

— না৷ মানে মেজরসায়েবের কাছে কোনো কাগজে টিপসই দিয়েছিলেন কি?

ভোমরলাল একটু ভেবে বলল—হ্যাঁ, দিয়েছিলুম বটে৷ সবাই মিলে দিয়েছিলুম বটে৷ সবাই মিলে দিয়েছিলুম৷ কিন্তু সে তো হাসপাতালের দরখাস্তে হুজুর৷ মেজরসায়েব হরবখত এখানে আনাগোনা করতেন৷ আমাদের নিয়ে মিটিং করতেন৷ বলতেন, গাঁয়ের উন্নতি করতে হবে৷ হাসপাতাল বসাতে হবে৷

কর্নেল বললেন—হুম৷ বুঝেছি৷ আচ্ছা, আপনি যখন টিপসই দেন, তখন গাঁয়ের আরও সবাই সেখানে হাজির ছিল, নাকি একা দিয়েছিলেন?

ভোমরলাল বলল—আমি তখন বস্তির মোড়ল ছিলুম, হুজুর৷ আগে আমার টিপসই নিয়ে গেলেন মেজরসায়েব৷ আপনি যেখানে বসে আছেন, সেখানে উনি বসে একটা কাগজে আমার সই নিলেন৷ তারপর বললেন—বাড়ি বাড়ি ঘুরে সই নিয়ে বেড়াচ্ছি ভোমরলালজি৷ কাকেও পাচ্ছি, কাকেও পাচ্ছি না৷ খুব সময় লেগে যাচ্ছে৷ তো আমি বললুম—হুজুর মেজরসায়েব, আপনি হুকুম দিলে গাঁওবালাদের ডেকে পাঠাতুম৷ একসঙ্গে সবার সই পেতেন৷ উনি বললেন—থাক৷ আমার একটু কষ্ট হচ্ছে, এই তো? তোমরা সবাই কাজের লোক৷ আমিও কাজের লোক৷ আবার কখন আসার সময় পাই কে জানে?...

কর্নেল বললেন—হুম৷ আপনার ছেলেমেয়ে ক’টি, ভোমরলালজি?

— এক ছেলে, দুই মেয়ে হুজুর! বড়ো মেয়ের গাঁয়েই বিয়ে দিয়েছি৷ ওই যে দেখছেন, ওই বাড়িতে৷

— কুন্তী তো? ওকে চিনি৷

ভোমরলাল খুশি হয়ে বলল—আর এই আমার ছোটো মেয়ে যমুনা৷ আমার কাছে থাকে৷ গত বছর বিধবা হয়েছে, হুজুর৷ ছেলেপুলে নেই৷ শাশুড়িটা খুব বদমাশ মেয়ে৷

— তোমার ছেলের নাম কী যেন?

— মদনলাল, হুজুর৷

— হ্যাঁ, মদনলালই বটে৷ সে কী করে?

— ড্রাইভার, হুজুর৷ এই রাস্তায় বাস চালায়৷... বলে ভোমরলাল আরও গম্ভীর হয়ে গেল৷ ফের বলল—ছেলে তার বুড়ো বাবাকে দেখে না হুজুর৷ দেখছেন না, কী অবস্থায় আছি!

— মদনলাল থাকে কোথায়?

— দিল্লীতে৷ সেখানেই বিয়ে করেছে৷ ভালো কামাচ্ছে, হুজুর৷ আমাকে দেখাশোনা করে না৷

ভোমরলালের মেয়ে যমুনা বলে উঠল—ঝুট বোলো না বাবা৷ দাদা দেখাশোনা করে না তো কে করে? তুমি ভারি নেমকহারাম তো? দাদার নিন্দে করছ! জানেন হুজুর, দাদা না থাকলে বাবাকে ভিক্ষে করে খেতে হত? দোষ তো বাবারই৷ দাদা কবে বাবাকে দিল্লীতে নিয়ে গিয়ে রাখতে চেয়েছিল৷ বাবা যাবে না৷ বলে, শহরে থাকতে ভালো লাগে না৷ মাঠঘাটের আদমি কি শহরে গিয়ে থাকতে পারি?

ভোমরলাল বিব্রত হয়ে শুধু মাথা নাড়তে থাকল৷ তারপর বলল—তোর দাদার বউটা যে বড্ড দজ্জাল আওরত৷ আমাকে টাকা দেয় তোর দাদা, তাই শুনে একবার এখানে এসে ঝগড়া করে গেল না? হুজুর, আমার ভালো ছেলেকে ওই মেয়েটাই বিগড়ে দিয়েছে৷

যমুনা বলল—দাদা বিগড়ে যাবার মানুষই না! জানেন হুজুর, রাতবিরেতে গাড়ি থামিয়ে দাদা বাবার খবর নিয়ে যায়৷ কালকেও দুপুরে ওসে দশটা টাকা দিয়ে গেল৷ বলে গেল—আবার সন্ধ্যায় বাস নিয়ে যাবার সময় আসবে৷ বাবার কথা ধরবেন না হুজুর৷ আমার দাদা দেওতার মতো আদমি৷ বাবার মাথাটাই বিগড়ে গেছে৷

রুষ্টা যমুনা ফুঁসতে-ফুঁসতে ঘরে গিয়ে ঢুকল৷ বিব্রত ভোমরলাল শুধু মাথা নাড়তে থাকল৷ কর্নেল বললেন—তাহলে আমরা উঠি, ভোমরলালজি৷

— হুজুর, জমি ফেরত পাব তো?

— দেখা যাক৷... বলে কর্নেল উঠলেন এবং পা বাড়িয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন৷

যমুনা দরজার বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আছে৷ কর্নেল বললেন—যমুনাবোন৷ তোমার সঙ্গে কয়েকটা কথা আছে৷

যমুনা এগিয়ে এসে বলল—বলুন, হুজুর৷

— কুন্তীদিদিকে কি এখন পাওয়া যাবে?

— না হুজুর৷ দিদি মেজরসায়েবের খামারে কাজকর্ম করত এত দিন৷ পরশু রোজ মেজরসায়েব খুন হয়ে গেলেন৷ খামারে এখন কাজ বন্ধ৷ দিদি তাই কাজ খুঁজতে বেরিয়েছে কোথায়৷ ওর স্বামীও সঙ্গে গেছে৷

— আচ্ছা যমুনাবোন, তোমার দাদাকে তো মেজরসায়েব কিছুদিন খামারে কাজ দিয়েছিলেন? ট্রাক্টর চালাত৷ তাই না?

যমুনা ঘাড় নেড়ে বলল—দিয়েছিল দয়া করে৷ তারপর ঝুটমুট চুরির বদনাম দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল৷ খুব শয়তান লোক ছিল মেজরসায়েব৷

— তোমার দাদা কি প্রতিদিন বাস নিয়ে যাওয়া-আসার সময় একবার করে বাবার সঙ্গে দেখা করে যায়? নাকি মাঝে-মাঝে?

— রোজ একবার করে বাস নিয়ে যায়, তারপর ফিরে যায়৷ সকালে দিল্লী থেকে বাস নিয়ে এ রাস্তায় যায়, তখন একবার আসে৷ আবার সন্ধ্যায় ফেরার সময় বাস থামিয়ে একবার আসে৷ রোজ দু’বার! বাবা তবু ছেলের ওপর খাপ্পা৷ বুড়ো হয়ে মাথা বিগড়েছে কিনা৷

— পরশু তোমার দাদা সকালে একবার, সন্ধ্যায় একবার এসেছিল তাহলে?

— পরশু? না, হুজুর৷ আসেনি৷ কাল দুপুরে একবার এসেছিল৷ টাকা দিল৷ বলল, পরশু বুখার হয়েছিল৷ তাই বাস চালায়নি৷ অন্য ড্রাইভার বাস নিয়ে গিয়েছিল৷

— আজ সকালে এসেছিল?

— না, হুজুর৷

— কাল সন্ধ্যায় এসেছিল?

— জি না৷ হয়তো বুখার বেড়েছে, তাই আসেনি৷

— কাল দুপুরে যখন আসে, তখন বাস নিয়ে এসেছিল নাকি?

যমুনা মাথাটা জোরে নাড়ল৷ দুপুরে বাস কোথায়? ওর বাস তো সকালে একবার, সন্ধ্যায় একবার—দুই দফা৷ কাল দুপুরে এসেছিল গায়ে জ্বর নিয়ে৷ চেহারা দেখেই মালুম হচ্ছিল৷ টাকা দিয়ে কুন্তীদিদির বাড়ি গেল৷ তারপর আর দেখিনি দাদাকে৷

কর্নেল বললেন—ঠিক আছে বোন৷ আমরা চলি...

পাঁচ

আমাদের জিপ খামারের দিকে ফিরে আসছিল৷ আমি ব্যাপারটা আঁচ করে ফেলেছি৷ কিন্তু কর্নেলকে দু’একবার প্রশ্ন করতে গেলেই উনি বলেছেন—এই খারাপ রাস্তায় আমাকে অন্যমনস্ক করলে অ্যাকসিডেন্ট ঘটে যেতে পারে ডার্লিং৷ সুতরাং আমাকে স্টিয়ারিং-এর দিকে মনোনিবেশ করতে দাও৷

ক্যানেলের ব্রিজে পৌঁছে জিপ থামালেন কর্নেল৷ তারপর নেমে বললেন—এসো জয়ন্ত, কিছুক্ষণ প্রকৃতির প্রতি মন দেওয়া যাক৷ কী অপূর্ব দৃশ্য চারপাশে! অবলোকন করো বন্ধু৷

আমরা ব্রিজের শেষ প্রান্তে ক্যানেলের পাড়ে একটি শিরিষ গাছের ছায়ায় গেলুম৷ ওখানে একটা পাথর রয়েছে৷ তার ওপর বসে কর্নেল চুরুট ধরালেন৷ কিছুক্ষণ ধূমপান করার পর বললেন—জীবনে এমন বিচিত্র সমস্যায় কখনও পড়িনি জয়ন্ত৷ এ-এক সাংঘাতিক সমস্যা বলতে পারো৷ আমার বিবেক দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে৷

অবাক হয়ে বললুম—তার মানে?

— আমার বিবেকের একটা খণ্ড বলছে, নরহত্যা মহাপাপ৷ আবার অন্য খণ্ড বলছে, মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়াও মহাপাপ৷ আচ্ছা তুমিই বলো তো জয়ন্ত, এ দুই মহাপাপের কোনটাকে ক্ষমা করা যায়, কোনটাকে যায় না?

— যাই বলুন, খুনখারাপি ক্ষমাতীত৷

— কিন্তু মানুষকে প্রবঞ্চনা করে মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়া কি ক্ষমার যোগ্য?

—আহা, সে জন্যে তো আদালত আছে৷

—গরিবের আদালত! সোনার পাথরবাটি জয়ন্ত৷ কর্নেল আবেগপূর্ণ কণ্ঠস্বরে বললেন— ভেবে দেখো ডার্লিং! মেজর হরগোবিন্দ সিং দেশের রাজনৈতিক জরুরী অবস্থার সুযোগ নিয়ে অঢেল খাদ্যশস্য উৎপাদনের ছলে সরকারের ভূমিদফতরকে কাজে লাগিয়ে ছিলেন৷ বিশদফা কর্মসূচীর তকমা এঁটে আমার বন্ধু মেজর হরগোবিন্দ করলেন কী, একদল মানুষকে প্রবঞ্চনা করে ভূমিহীন করে ফেললেন৷ তাদের ওই জমিতে ফসল ফলত খুব সামান্যই৷ কারণ চিকারির ওই সব চাষীর ক্ষমতা ছিল না যে, উন্নত প্রথায় চাষ করার খরচা বহন করে৷ কিংবা বলতে পারো, আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চাষবাসের কৌশল তারা জানতই না৷ সেই অছিলাটা কাজে লাগলেন আমার বন্ধু৷ তাঁকে নির্বোধের মতো সাহায্য করল ভূমিদফতর৷ ভূমিদফতর দেখল, তাদের উন্নত চাষবাস শস্যোৎপাদন বৃদ্ধির কর্মসূচীতে লক্ষ্যপূরণই বড়ো কথা—সেটা যেভাবেই হোক৷ অতএব তারা মেজরসায়েবকে সাহায্য করতে দ্বিধা করল না৷ মাঝখান থেকে অজস্র ছোটো চাষী জমি থেকে উৎখাত হয়ে গেল৷ ক্ষেতমজুরে পরিণত হল তারা৷ কী করুণ দৃশ্য জয়ন্ত! নিজেদের জমিতে তাদের একদিন ক্ষেতমজুর হয়ে কাজ করতে হল৷ তাদের মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছ তো জয়ন্ত?

বললুম—পারছি বৈকী৷

কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট আবার ধরিয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে বললেন—তুমি নিশ্চয়ই হত্যাকারীকে চিনতে পেরেছ, জয়ন্ত?

— ভোমরলালের ছেলে মদনলাল তো?

— ইউ আর অ্যাবসলিউটলি কারেক্ট, মাই ফ্রেণ্ড৷ হ্যাঁ, সে-ই মেজর হরগোবিন্দকে হত্য করেছে৷ প্রতিহিংসা!

— এখনও অনেক ব্যাপার আমার কাছে অস্পষ্ট, কর্নেল!

— মদনলালকে নেহাত বিবেকের বশে হোক, কিংবা বশ মানিয়ে হাতে রাখতেই হোক, মেজর হরগোবিন্দ তাকে খামারে চাকরি দিয়েছিলেন৷ কৃষি যন্ত্রপাতির কাজ শিখিয়েও দিয়েছিলেন৷ মদনলাল ট্রাক্টর চালাতে শিখেছিল৷ তারপর স্বভাবতঃই ড্রাইভিংও শিখে ফেলেছিল৷ কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল, মেজরসায়েবের কাছ থেকে তার বাবা এবং গাঁয়ের আর সব চাষীর টিপসই দেওয়া কাগজগুলো উদ্ধার করা৷ ওগুলো আর কিছুই নয়—ঋণপত্র৷ তমসুক যাকে বলে৷ হাজার হাজার টাকা ঋণের তমসুকে মেজর হরগোবিন্দ ওই হতভাগ্য নিরক্ষরদের সই নিয়েছিলেন৷ যাই হোক, এক রাতে মদনলাল এই খামারের একটা ঘরে আলামরি ভাঙতে গিয়ে ধরা পড়ে৷ তাকে পুলিশে না দিয়ে চাবুক মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়৷ অনেক ঘাটে জল খেয়ে মদনলাল দিল্লীতে বাসড্রাইভারের কাজ জোগাড় করে নেয়৷ কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল প্রতিহিংসা এবং তমসুক উদ্ধার—দুটোই৷ পরশুদিন খেতমজুর ও মজুরনীদের দলে বুড়ো মজুর সেজে সে খামারে কাজ করতে এসেছিল৷ কুন্তী তো বটেই, আর সব মজুর-মজুরনীও ব্যাপারটা জানত৷ তাদের সঙ্গে রীতিমতো পরামর্শ করেই মদনলাল মজুর সেজে খামারে ঢোকে৷ বিকেলে এক ফাঁকে সে পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে গিয়ে মেজরসায়েবকে খুন করে৷ তারপর রিভলবার লুকিয়ে রাখে আপেল গাছের আড়ালে৷ তাড়াতাড়িতে শুকনো পাতা ঢাকা দিয়েছিল৷ কারণ গুলির শব্দ শুনে লোকেরা দৌড়ে আসছে৷ এদিকে তার দ্বিতীয় কাজ বাকী৷ ঋণপত্র উদ্ধার৷ মেজরসায়েবের লাশ নিয়ে সবাই যখন ব্যস্ত, তখন সেই ফাঁকে সে গিয়ে আলমারি ভাঙবার দ্বিতীয় চেষ্টা করবে ভেবেছিল৷ কিন্তু ধূর্ত নারুলার চোখ তার দিকে ছিল৷ নারুলা তাকে চিনতে পেরেছিল৷ তাকে মজুরদের দল থেকে পুকুরপাড়ের দিকে যেতে দেখেই নারুলা অড়হরক্ষেত অব্দি অনুসরণ করেছিল৷ নারুলা চিকারির লোক৷ গাঁয়ের লোকের ভয়েই কথাটা চেপে ছিল! যাই হোক, খামারে ফোন থাকায় পুলিশ এসে পড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে৷ তার আগে মেজরসায়েবের মেয়েও এসে গিয়েছে৷ নারুলার চোখে পড়ায় মদনলাল আলমারি ভাঙবার সুযোগ পায়নি৷ ভেবেছিল, ঠিক আছে, নারুলার সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেবে৷ তারপর তো নারুলা তার কথায় অগত্যা রাজি হয়৷ ও-ঘরের চাবি নারুলার কাছে থাকে৷ আলামারির চাবির হদিসও সে জানে৷ রাতে কাজটা করে ফেলবে মদনলাল৷ কিন্তু পুলিশ এসে গিয়ে সমস্যা দেখা দিল৷ প্রথমে বোকামি করল কুন্তী৷ সে মুখ ফসকে হোক, কিংবা নারুলার কাঁধে দায় চাপাবার জন্যে হোক, নারুলা যে অড়হর ঝোপে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, বলে ফেলল পুলিশকে৷ নারুলাকে গ্রেফতার করল পুলিশ৷ মদনলাল সুযোগ হারাল৷ এদিকে খামারবাড়ি জুড়ে তখন পুলিশ ভরতি৷ মজুর-মজুরনীদের জেরা শুরু হয়েছে৷ সবাইকে আটকানো হয়েছে৷ আমরা এসেও বেচারাদের দেখেছি৷

প্রশ্ন করলুম—তাহলে নারুলা জেরার চোটে সব কবুল করেছে?

কর্নেল বললেন—সবটা নয়৷ খানিকটা৷ সে তো আগেই শুনেছো তুমি! মদনলালের কথা সে বলেনি৷ এদিকে মদনলালকে চিনত নারুলা ছাড়া আরেকজন৷ সে হল কম্পাউন্ডার রঘুরামাইয়া৷ সে ছুটিতে ছিল৷ বাকি কর্মচারীরা এসেছে সম্প্রতি৷ মেজরসায়েব খুব কড়া ধাতের লোক ছিলেন৷ হরদম পুরনো লোক তাড়িয়ে নতুন লোক আনতেন৷ দারোয়ান তুম্বেরিলালও এসেছে গতমাসে৷ আগের দারোয়ানকে তাড়িয়ে দিয়ে তাকে বহাল করা হয়েছিল৷

— মদনলাল তাহলে গতকাল দুপুর অব্দি খামারে ছিল?

— ছিল৷ আমরা এসেও তাকে মজুর-মজুরনীদের সঙ্গে দেখেছি৷ সত্যি বলতে কী, আমার ব্যাপারটা খারাপ লেগেছিল৷ ও বেচারারা গরিব মানুষ৷ খামোকা আটকে রাখার কী মানে হয়? আমিই মিঃ সাঠেকে বললুম, ওদের ছেড়ে দিন৷ জেরা করে যা জানার তা তো জানা হয়েছে, আর আটকে রেখে লাভ কী? তখন ওদের যেতে দেওয়া হল৷

— মদনলাল তাহলে রিভলবারটা নিয়েই কেটে পড়তে পারল?

— পারল বৈকী৷ ওদের বডি সার্চ করা হয়েছিল সেই একবার, পরশু সন্ধ্যায়৷ গতকাল দুপুরে যাবার সময় ওদের আর সার্চ করার কারণ ছিল না৷ কাজেই মদনলাল কেটে পড়ল অস্ত্র নিয়ে৷

— কিন্তু আপনি ভোমরলালের ব্যাপারটা কী ভাবে জানলেন?

কর্নেল একটু হেসে বললেন—মজুর-মজুরনীদের হাবভাব দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল, যেন কী চেপে রেখেছে ওরা৷ কুন্তীর দিকে তাকাতেই সে বিব্রত হয়ে মুখ নামাল৷ তারপর চাপা গলায় বলল—হুজুর৷ আমাদের খামোকা কষ্ট দিচ্ছেন আপনারা৷ উপরওলা যাকে সাজা দেবার দিলেন৷ এখন আমাদের আটকে রেখে কী হবে? বালবাচ্চা ভুখা আছে৷ আমাদের ছেড়ে দিন৷ তো বুজলে জয়ন্ত? ওর ওই ‘‘উপরওলা যাকে সাজা দেবার দিলেন’’ কথাটা কানে বড়ো হয়ে বেজেছিল আমার৷ কৌশলে কথা বলা শুরু করলুম৷ বেরিয়ে এল এই খামারের জমির রহস্য৷ ভোমরলালের নাম জানলুম৷ ওরা চলে যাবার পর মেজরসায়েবের আলমারি হাতড়ে তমসুকগুলো বেরিয়ে পড়ল৷ কিন্তু মদনলালের কথা তখনও জানতে পারিনি৷ যদিও ততক্ষণে আঁচ করেছিলুম যে, এই হত্যাকাণ্ডে প্রতিহিংসার ব্যাপার থাকা খুবই সম্ভব৷ মদনলালের কথা একটু আগে আমরা জানতে পেরেছি, জয়ন্ত৷ তাই না?

— নারুলাকে হঠাৎ গতকাল ছেড়ে দিল কেন পুলিশ?

— নারুলা মদনলালের নাম বলেনি বটে, কিন্তু আমার জেরার মুখে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল, মেজরসায়েব কত লোককে চাকরি দিয়ে চাবুক মেরে তাড়িয়েছেন, হয়তো তারাই কেউ শোধ নিল! ওকে জিগ্যেস করলুম—কাকে চাবুক মেরেছিলেন, নারুলা? নারুলা বলল—একজনকে নয়, হুজুর৷ কতজনকে চাবুক খেতে হয়েছে৷ একজনকে তো আলমারি ভেঙে চুরির দায়ে চাবুক মারা হয়েছিল!... বুঝলে জয়ন্ত? নারুলার সঙ্গে আরও অন্তরঙ্গভাবে কথা বলার জন্যে মিঃ সাঠেকে বললুম, ওকে আটকে না রেখে ছেড়ে দিন৷ ঘরে বন্দি করে রাখা লোকের মানসিক অবস্থা খারাপ থাকে৷ ছেড়ে দিন৷ কিন্তু নজরবন্দি থাক৷ কাজকর্ম করুক৷ খামারের বাইরে যেন না যেতে পারে৷ তাহলে নারুলার সঙ্গে গল্প করে অনেক কিছু জানা যেতে পারে৷ তো তাই করা হল৷ কাল বিকেলে নারুলাকে নিয়ে গল্পস্বল্প করতে-করতে অনেক তথ্য জানতে পারলুম৷ কিন্তু মহা ধড়িবাজ লোক কিছুতেই মদনলালের কথা বলল না৷ তখন নেহাত অনুমানের ভিত্তিতে ব্যাপারটা দাঁড় করালুম৷ এবার বোঝা যাচ্ছে, আমি হ্যান্ড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট৷

মিঃ সাঠে গেট দিয়ে বেরিয়েছেন দেখা গেল৷ কর্নেল চাপা স্বরে বললেন—কিছু ফাঁস করবে না জয়ন্ত৷ আমরা এখনই কেটে পড়ব৷ পুলিশ নারুলাকে আরো জেরা করবে এবং নির্ঘাত বাকিটা সে উগরে দেবেই৷ এক্ষেত্রে আমি দ্বিখণ্ডিত বিবেক নিয়ে মনোকষ্টে ভুগি কেন?

বললুম—কিন্তু মেজর হরগোবিন্দ আপনার বন্ধু ছিলেন, কর্নেল!

—ডার্লিং, এতদিনে সব শোনার পর আমি ওই বন্ধুত্বের জন্য বিব্রত বোধ করেছি৷ তাঁর আত্মা শান্তিলাভ করুক৷... বলে বুকে ক্রস এঁকে কর্নেল পা বাড়ালেন৷

মিঃ সাঠে কাছে এসে বললেন—কর্নেল সরকার! আপনার অপেক্ষা করছিলুম৷ খুনিকে আমরা ধরে ফেলেছি৷ দিল্লী থেকে এইমাত্র ফোনে খবর এল৷ তার কাছে রিভলবারটাও উদ্ধার করা হয়েছে৷ লোকটা কে জানেন? লোকটা...

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন—মদনলাল তো?

অবাক হয়ে মিঃ সাঠে বললেন—আপনি কীভাবে জানলেন? আশ্চর্য তো!

কর্নেল মৃদু হেসে বললেন—আমার প্রতি আপনি এখনও আশ্চর্য শব্দ ব্যবহার করছেন শুনে আমিই আশ্চর্য হচ্ছি৷ এটা গর্ব বলে মনে হবে৷ কিন্তু মাঝে-মাঝে এই গর্ব প্রকাশের সুযোগ পাই বলেই হয়তো আমি গোয়েন্দাগিরি করে বেড়াই৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%