সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ঠিক দুক্কুর বেলা, ভূতে মারে ঢেলা!... এইভাবেই ঢিল পড়ত বাড়িতে...পোড়োবাড়ির জানলায় দেখা যেত একটা রহস্যজনক মুখ—মানুষের মুখ তো নয়ই—কোনো জন্তুরও নয়... মারণমন্ত্র আওড়াত পাগলটা—কিলি কিলি কিলি কিলি...খট খট ভট ভট কট কট...ট্র্যাঁও ট্র্যাঁও হিপিচিকি হিপিচিকি... ক্রুট ক্রুট...গিঃ৷ এইসব সৃষ্টিছাড়া কাণ্ডকারখানা এবং খুনখারাপির মধ্যে আবিৰ্ভূত হলেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার—দেখিয়ে দিলেন গোয়েন্দাগিরির ভেলকি৷
কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের কাছে প্রায়ই নানা জায়গা থেকে লোকেরা এসে ধন্না দেয়৷
চুরি-ডাকাতি, খুনখারাপি, নিরুদ্দেশ কতরকমের ঘটনা যে ঘটে দেশে! বুঝতে পারি, পুলিশের ওপর যেন ভরসা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে লোকের৷ তাই রহস্যভেদী কর্নেলের দোরে ধন্না৷ কিন্তু কর্নেলের ইদানিং অপরাধঘটিত ব্যাপারে মনোযোগ তত নেই৷ প্রকৃতি-রহস্য নিয়ে ডুবে আছেন৷ অর্কিড, ক্যাকটাস, পাখি, প্রজাপতি, পোকামাকড় নিয়ে কীসব গবেষণা করছেন৷ দেশ-বিদেশের কাগজে তাই নিয়ে প্রবন্ধ লিখছেন৷ মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ছেন কাঁধে বোঁচকা, বাইনোকুলার আর সেই অদ্ভুত ক্যামেরা ঝুলিয়ে; যে ক্যামেরায় রাতবিরেতের অন্ধকারেও অদৃশ্য আলোয় ছবি তোলা যায়৷
সেদিন সকালে গিয়ে দেখি, কর্নেলের ড্রইং-রুমে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক মুখ চুন করে বসে আছেন৷ কর্নেল তাঁকে ধমক দিচ্ছেন, ‘কী ভেবেছেন আমাকে? আমি কি ভূতের রোজা? আপনি উঠে পড়ুন৷ আমার সময়ের দাম আছে৷’
ভদ্রলোক কাকুতিমিনতি করে বললেন, ‘আপনি দয়া করে ব্যাপারটা শুনুন, স্যার৷ শুধু ঢিল পড়লে আপনাকে বিরক্ত করতে আসতুম না৷ কাল দুপুরবেলা পোড়োবাড়ির দোতলার জানলায় একপলকের জন্য একটা বিদঘুটে মুখ দেখতে পেয়েছি৷ হলফ করে বলতে পারি, ও-মুখ কোনো মানুষের তো নয়ই, কোনো জন্তুরও নয়৷’
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, ‘ভূতের?’
‘ভূত তো অশরীরী স্যার৷ শুনেছি, কখনো কখনো ভূত মানুষকে দেখা দেয়৷ কখনও কুকুর-বেড়াল বা আমাদের চেনাজানা জন্তু হয়ে, কখনো নাকি মানুষ হয়ে৷ আমার ঠাকুর্দা নাকি কঙ্কালরূপী ভূতও দেখেছিলেন৷ কিন্তু আমি যে মুখটা দেখেছি, তা খুবই রহস্যজনক৷’
কর্নেল একটু শান্ত হয়ে বললেন, ‘কেন রহস্যজনক?’
ভদ্রলোক বললেন, ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবি দেখেছেন তো স্যার? মানুষের মুখগুলো? দেখলে কি মনে হয় না মানুষ অথচ যেন মানুষও নয়, আবার জন্তুও বলা যাবে না—অথচ কেমন জন্তু-জন্তু ভাব—যেন রহস্যময় অন্ধকার জগতের বাসিন্দা! কবি তাকে টেনে এনেছেন দিনের আলোয়৷ ঠিক সেইরকম৷’
‘হুঁ৷’—বলে কর্নেল সোফায় বসলেন এতক্ষণে৷
তারপর বললেন, ‘কী নাম বললেন যেন আপনার?’
‘নন্দদুলাল নস্কর৷’
‘কী করেন?’
‘আজ্ঞে, স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা৷’
‘কী পড়ান?’
‘অঙ্ক৷’
কর্নেল চোখ বুজে নিজের সাদা দাড়িতে কিছুক্ষণ অভ্যাসমতো হাত বুলিয়ে তারপর চোখ খুলে বললেন, ‘ঠিক আছে৷ নাম-ঠিকানাটা এই কাগজে লিখে রেখে যান৷ দেখছি কী করা যায়৷’
নন্দদুলালবাবু নাম ঠিকানা লিখে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর আরেক দফা অনুরোধ জানিয়ে চলে গেলেন৷ কর্নেল ডাকলেন, ‘ষষ্ঠী! তোর কাগুজে দাদাবাবু এসেছে৷ কফি দিয়ে যা!’
এতক্ষণ একপাশে চুপচাপ বসে ব্যাপারটা উপভোগ করছিলুম৷ হাসতে হাসতে বললুম, ‘তাহলে ভৌতিক রহস্যে নাক গলাচ্ছেন শেষ পর্যন্ত? কিন্তু আমার ধারণা, শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়েই ফিরবেন৷’
কর্নেল মৃদু হেসে বললেন, ‘কেন ডার্লিং?’
‘এতে ভূতের ভ-ও নেই৷ শুনলেন না, অঙ্কের মাস্টার৷ দুষ্টু ছাত্ররা অঙ্কে ফেল করে মাস্টারমশাইকে ভয় দেখাচ্ছে৷’
কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর এই জাদুঘর-সদৃশ ড্রইং রুমের কোনায় টেবিলে রাখা ছোট্ট টবের অষ্টাবক্র ক্যাকটাসটার দিকে হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন৷ পকেট থেকে আতসকাচ বের করে ক্যাকটাসটা মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকলেন৷ তারপর ফিরে এসে সহাস্যে সুর ধরে আওড়ালেন:
‘ঠিক দুক্কুর বেলা
ভূতে মারে ঢেলা৷৷’
বললুম, ‘হঠাৎ ভূত নিয়ে রসিকতার কারণ কী বলুন তো কর্নেল?’
কর্নেল বললেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে তখন আমি বর্মার আরাকান অঞ্চলের জঙ্গলে একটা গোপন ঘাঁটিতে ছিলুম৷ চারপাশে ঘন জঙ্গল৷ বাঁশ-খড়ের তৈরি কয়েকটা ঘর৷ ঠিক দুপুর হলেই জঙ্গল থেকে শনশন করে একটা বাতাস উঠত৷ তারপর চালে ঢিল পড়া শুরু হত৷ ব্রিটিশ অফিসার আর সৈনিকরা ভয় পেয়ে দুমদাম এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করত৷ গোপন ঘাঁটিতে এমনটি চলে না৷ জাপানীরা টের পেয়ে যাবে৷ কিন্তু ভূতের আতঙ্ক এমনই জিনিস, সে-সব জ্ঞানগম্যি ওদের থাকত না৷ যাই হোক, তদন্ত করে রহস্যটা ফাঁস হল৷’
ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল৷ চুমুক দিয়ে বললুম, ‘কী ফাঁস হল তাহলে?’
‘জায়গাটা ছিল আসলে একটা শ্মশান৷ আরাকানীরা ওখানে একসময় মড়া পোড়াত৷ ওদের নিয়ম হল—যার মড়া পোড়াচ্ছে, সে যত বছর বেঁচেছে, ঠিক ততগুলো ঢিল ন্যাকড়ায় বেঁধে গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা৷ যুদ্ধের উপদ্রবে এলাকা ছেড়ে তারা চলে গেছে৷ ইতিমধ্যে বৃষ্টি এবং প্রাকৃতিক অন্যান্য কারণে ন্যাকড়া গেছে জীর্ণ হয়ে৷ বাতাস উঠলেই পুঁটলিটা নড়ে আর ঢিলগুলো ছেঁড়াকাটা অংশ দিয়ে ঘরের চালে পড়তে থাকে টুপটাপ করে৷’
কর্নেল হাসতে থাকলেন৷ বললুম, ‘এই অঙ্কের মাস্টার ভদ্রলোকের কেসেও দেখবেন, তেমনই কোনো ব্যাপার আছে৷’
‘দেখা যাক৷’
‘তাহলে সত্যি যাচ্ছেন নাকি ওঁর ওখানে?’
কর্নেল টেবিল থেকে নাম ঠিকানা লেখা চিরকুটটা তুলে বললেন, ‘কল্যাণপুর ঝিলের ধার, আগরপাড়া৷ হুঁ—কলকাতার কাছেই৷ কী, যাবে নাকি জয়ন্ত?’
‘গিয়ে কোনো লাভ হবে কি?’
‘বলা যায় না ডার্লিং! যেখানে দেখিবে ছাই/উড়াইয়া দেখ তাই/পাইলে পাইতে পার অমূল্য রতন৷ তোমাদের দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার জন্য অন্তত এক কলম ভৌতিক রহস্যও পাঠকদের উপহার দিতে পারবে৷ হুঁ—হেডিং দিও : ঠিক দুক্কুর বেলা৷’
‘কখন বেরুচ্ছেন তাহলে?’
‘দুটো-আড়াইটে নাগাদ৷ তুমি দুটোর মধ্যেই চলে এসো৷’...
এদিন ‘সত্যসেবক’ অফিসে একটু সকাল সকাল গেলুম৷ দুপুরে ক্যান্টিনেই খেয়ে নিয়ে নিউজ ডেস্কে আড্ডা দিচ্ছি৷ একটা বাজে প্রায়৷ কর্নেলের ফোন এল৷ বললুম, ‘তাগিদ দেওয়ার দরকার ছিল না৷ ঠিক সময়ে হাজির হতুম৷’
কর্নেল উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘জয়ন্ত! এইমাত্র ফোনে কে আমাকে জানাল, নন্দদুলালবাবু বাড়ি ফেরার সময় বাড়ির কাছেই একটা বাঁশবনে খুন হয়েছেন৷ লোকটাকে কিছু জিগ্যেস করার আগেই ফোন ছেড়ে দিল৷ রসিকতা বলে মনে হল না৷ তুমি এখনই চলে এসো৷’
ফোন রেখেই হন্তদন্ত বেরিয়ে পড়লুম৷
II দুই II
আমরা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছলুম, তখন শীতের বেলা গড়িয়ে গেছে৷ হ্যাঁ—সত্যি খুন হয়েছেন নন্দদুলাল নস্কর৷ পুলিশ এসে লাশ মর্গে নিয়ে গেছে৷ স্থানীয় লোকের কাছে জানা গেল, বাঁশবনের ভেতর দিয়ে পায়েচলা এই পথে শর্টকাটে নন্দবাবুর বাড়ি যাওয়া যায়৷ খোয়াঢাকা রাস্তা দিয়ে একটু ঘুরপথ হয়৷ নন্দবাবু বাঁশবনের রাস্তা ধরেই, তাই যাতায়াত করতেন৷ বাঁশবনটা বেশ বড়ো৷ পায়েচলা রাস্তার ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় তাঁর লাশ পড়ে থাকতে দেখেছিল এক ধোপা৷ ওপাশে কয়েক ঘর ধোপা আছে৷ কৈলাস ধোপা কাপড়ের বোঝা নিয়ে ঝিলের ধার থেকে বাড়ি ফিরছিল এই রাস্তা ধরে৷ সে-ই নন্দবাবুর বাড়িতে খবর দেয়৷ ঝিলটা কল্যাণপুরের পূর্বপ্রান্তে৷ নন্দবাবুর বাড়িটা নিরিবিলি জায়গায়৷ পাশে একটা দোতলা পোড়ো বাড়ি আছে৷ খুব জরাজীর্ণ অবস্থা৷ মালিকদের মধ্যে শরিকি ঝগড়া হাইকোর্টে ঝুলে আছে৷ তাই এ দৃশ্য৷ তাঁরা অবশ্য কলকাতাবাসী এখন৷
বাঁশবনের ভেতর এখনই আলো কমে আবছা আঁধার জমেছে৷ তবু কর্নেল গুড়ি মেরে লাশ পড়ে থাকা জায়গাটা খুঁটিয়ে দেখেছেন৷ তারপর আমরা নন্দবাবুর বাড়িতে গেছি৷
বাড়িতে আছেন ওঁর দিদি প্রভাময়ী, প্রয়াত বড়দার ছেলে রঞ্জন আর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় ধনেশবাবু৷ প্রভাময়ী বৃদ্ধা, কিন্তু শক্তসমর্থ মহিলা৷ রঞ্জনের বয়স একুশ-বাইশের মধ্যে৷ সে এখনো ছাত্র৷ গতকাল কলকাতা থেকে কাকা নন্দবাবুর বাড়ি বেড়াতে এসেছে৷ আর ধনেশবাবুও বৃদ্ধ—কিন্তু বদ্ধ পাগল৷ নন্দবাবু অবিবাহিত ছিলেন৷ ধনেশবাবুকে জ্যাঠামশাই বলতেন৷ ধনেশবাবুর তিনকুলে কেউ নেই৷ তাঁকে ধানবাদ থেকে নিয়ে এসে মাসখানেক হল আশ্রয় দিয়েছিলেন৷ একটা ঘরে তাঁকে কোমরে শেকল বেঁধে রাখা হয়েছে দেখলুম৷ জানলার কাছে বসে তিনি আমাদের খুব ভেংচি কাটতে শুরু করেছেন৷
প্রভাময়ী বললেন, ‘সম্প্রতি ধনজ্যাঠার পাগলামি হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল৷ তাই নন্দ ওঁকে এইভাবে আটকে রাখার ব্যবস্থা করেছিল৷’
রঞ্জনের চোখদুটো লাল হয়ে আছে৷ কর্নেলকে সে জিগ্যেস করল, ‘আপনারা কি থানা থেকে আসছেন?’
কর্নেল মাথা নেড়ে বললেন, ‘না৷ তোমার কাকাবাবু আজ সকালে কলকাতা গিয়েছিলেন আমার কাছে৷ ইদানীং নাকি রোজ দুপুরবেলা ওই পোড়ো বাড়ির দিক থেকে এ-বাড়ির উঠোনে ঢিল পড়ে৷ এ ব্যাপারে আমার সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন৷’
রঞ্জন অবাক হয়ে শুনছিল৷ বলল, ‘হ্যাঁ—ঢিল পড়ছে শুনে আমিও তো এসেছি৷ আজ দুপুরেও প্রচণ্ড ঢিল৷ ওই দেখুন, এখনো পড়ে আছে৷ কিন্তু আপনি—’
কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, ‘তুমি কি পোড়ো বাড়ির ভেতর খুঁজতে গিয়েছিলে ঢিল পড়ার সময়?’
‘হ্যাঁ৷ কাউকে দেখতে পাইনি৷ তন্নতন্ন করে খুঁজেছি৷ পেছনের বাগানটা জঙ্গল হয়ে রয়েছে৷ সেখানেও খুঁজেটুজে বাড়ি ফিরেছি—তার একটু পরে কৈলাস নামে লোকটা এসে খবর দিল, কাকাবাবু বাঁশবনের রাস্তায় পড়ে আছেন৷’
‘তারপর?’
রঞ্জন মৃদুস্বরে জবাব দিল, ‘আমি দৌড়ে গিয়ে কাকাবাবুকে পড়ে থাকতে দেখেই কৈলাসকে পাড়ার ডাক্তারকে খবর দিতে বললুম৷ উনি মারা গেছেন ভাবতেই পারিনি৷ হঠাৎ দেখি, গলায় একটা ছোট্ট তির বিঁধে রয়েছে৷’
‘তির?’—কর্নেল অবাক হয়ে বললেন৷ ‘তির, না অন্য কিছু?’
‘তির৷’—রঞ্জন জোর দিয়ে বলল, ‘গোড়ায় পালক বাঁধা যে! তবে তিরটা মাত্র ইঞ্চি ছয়েকের বেশি লম্বা নয়৷ আমি তিরটা টানতেই বেরিয়ে এল৷ কিন্তু এক ফোঁটা রক্ত বেরুল না৷ ক্ষতের জায়গাটা নীল হয়ে ছিল৷’
‘তিরটা তুমি কী করলে?’
‘তখন আমার অবস্থা বুঝতেই পারছেন৷ তিরটা হাত থেকে পড়ে গেল৷ ভীষণ হাত কাঁপছিল৷ মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কৈলাস, পাড়ার ডাক্তার ভদ্রলোক, আরও কয়েকজন দৌড়ে এলেন৷ দেখতে দেখতে ভিড় জমে গেল৷ ডাক্তার বললেন, মারা গেছেন৷ পুলিশে খবর দিতে হবে৷’
‘আর তিরটা?’
‘ওটার কথা তখন ভুলে গিয়েছিলুম৷ পুলিশ এসে যখন জিগ্যেস-টগ্যেস করল, তখন তিরটার কথা মনে পড়ল৷ কিন্তু আশ্চর্য! আর ওটা খুঁজেই পেলুম না৷ একেবারে নিপাত্তা হয়ে গেছে৷’
‘তিরটা এঁকে দেখাতে পারো?’
রঞ্জন সন্দিগ্ধভাবে বলল, ‘পারি৷ কিন্তু আপনার কাছে কাকাবাবু সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন বলছেন—আপনি কে বলবেন কি?’
কর্নেল পকেট থেকে তাঁর কার্ডটা দিলেন৷ রঞ্জন অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার কথা আমি কাগজে পড়েছি মনে হচ্ছে৷ হ্যাঁ, হ্যাঁ সেই যে বিখ্যাত শিল্পপতি পান্নালাল মতিলালের অন্তর্ধান রহস্যের কথা বেরিয়েছিল ‘সত্যসেবক’ পত্রিকায়—কী আশ্চর্য! আপনি তাহলে সেই গোয়েন্দা কর্নেল?’ —তারপর আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘আর আপনি নিশ্চয়ই সত্যসেবকের স্পেশাল রিপোর্টার জয়ন্ত চৌধুরী?’
এবার আমাদের খাতিরের ঘটা পড়ে গেল৷ এতক্ষণ আমরা উঠোনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলুম৷ বারান্দায় চেয়ার বের করে বসতে দিল রঞ্জন৷ প্রভাময়ীও খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলেন৷ ইতিমধ্যে সন্ধ্যা এসে গেছে৷ আলো জ্বলে উঠেছে৷ ওদিকের ঘরের জানলা থেকে ধনেশবাবু ক্রমাগত ভেংচি কাটছেন আর বিড়বিড় করে কী অনর্গল বকে চলেছেন৷ শীতের সন্ধ্যায় পরিবেশ নিঝুম নিঃশব্দ হয়ে উঠেছে৷ মাঝে মাঝে পাশের প্রকাণ্ড পোড়ো দোতলা বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছি, আর কেমন আতঙ্কে বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠছে আমার!
রঞ্জন তিরটা এঁকে দেখাল একটা কাগজে৷ তিরের ফলাটা কিন্তু মোটা সূচের মতো৷ গোড়ায় স্বাভাবিক তিরের মতো পালকগুচ্ছ৷ কর্নেল কাগজটা পকেটে রেখে বললেন, ‘আচ্ছা রঞ্জন, তখন তোমার কাকাবাবুর ডেডবডির কাছে যে ভিড় জমেছিল, তারা সবাই স্থানীয় লোক কি না তুমি নিশ্চয়ই জানো না?’
‘কিছু লোককে তো চিনিই৷’—রঞ্জন বলল, ‘কারণ আমি প্রায়ই এখানে বেড়াতে আসি৷ ওদিকে একটা ক্লাব আছে৷ ক্লাবের ছেলেদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে৷ তাদের সঙ্গে ঝিলের ওপারে বাগানের ভেতর পিকনিক করি৷ তবে কৈলাস স্থানীয় লোক৷ সে সকলকে চেনে৷’
‘কৈলাসকে একটু ডেকে আনতে পারো?’
‘সে বেশি দূরে থাকে না৷ এখনই ডেকে আনছি৷’—বলে রঞ্জন টর্চ নিয়ে বেরিয়ে গেল৷
কর্নেল প্রভাময়ীকে বললেন, ‘আপনার ভাই নন্দবাবু আমাকে বলেছিলেন, ঢিল পড়ার উপদ্রব শুরু হয়েছে মাসখানেক হবে৷ এ সম্পর্কে আপনি কিছু বলতে পারেন?’
প্রভাময়ী গলা ঝেড়ে চোখ মুছে বললেন, ‘ওই রকমই হবে৷ হ্যাঁ—আজ হল একুশে ডিসেম্বর৷ প্রথম ঢিল পড়েছিল উনিশে নভেম্বর৷ তারিখটা মনে আছে৷ কারণ তার আগের রাত্তিরে ধনজ্যাঠাকে ধানবাদ থেকে নিয়ে এল নন্দ৷’
‘তার আগে ঢিল পড়ত না? মনে করে বলুন৷’
‘না৷’—প্রভাময়ী মাথা নেড়ে বললেন, ‘ওই যে মল্লিকদের পোড়ো বাড়িটা দেখছেন, লোকে কতরকম গুজব ছড়ায়৷ কিন্তু এ-বাড়িতে আমি আজ প্রায় পনেরো বছর কাটাচ্ছি৷ কোনোরকম উৎপাত ঘটেনি৷ রাতবিরেতে ওদিকে তাকালে একটু গা ছমছম অবশ্য করে৷ কিন্তু ভয় পাবার মতো কিচ্ছু দেখিনি এ পর্যন্ত৷’
‘আপনার ধনজ্যাঠা কিরকম জ্যাঠা হন?’
‘খুব দূর সম্পর্কের৷ উনি কোলিয়ারিতে চাকরি করতেন৷ বছর দশেক আগে ওঁর কোয়ার্টারে ডাকাতি হয়৷ উনি তখন ডিউটিতে ছিলেন৷ ডাকাতরা ওঁর স্ত্রী এবং তিন বছরের ছেলেকে খুন করে সব জিনিসপত্র লুঠ করে পালায়৷ সেই থেকে প্রচণ্ড শোকে ওঁর পাগলামির অসুখ শুরু৷ রাঁচির পাগল-হাসপাতালেও ওঁকে রাখা হয়েছিল বছর তিনেক৷ একটু সেরে গিয়েছিল৷ তখন ওখান থেকে ছেড়ে দেয়৷ তারপর বছরখানেক সুস্থ ছিলেন শুনেছি৷ গত বছর থেকে আবার পাগলামি বাড়তে থাকে৷ ধানবাদে আমার এক দেওর থাকে৷ তার চিঠিতে সব জানতে পেরে নন্দ ওঁকে নিয়ে এসেছে৷ নন্দের মনটা ছিল খুব ভালো৷ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত৷ আপদ-বিপদে দৌড়ে যেত৷ অনেককে টাকাকড়ি দিয়েও সাহায্য করত৷ তা ছাড়া, এখানেও খোঁজ নিয়ে দেখুন৷ কল্যাণপুরে তার শত্রু বলে কেউ ছিল না৷ সব ব্যাপারে সে সকলের সঙ্গে থেকেছে৷ বারোয়ারি পুজো-আচ্চা বলুন, কোনো ফাংশান বলুন, সেবা প্রতিষ্ঠান বলুন, সব তাতেই নন্দ প্রাণ দিয়ে খেটেছে৷ কেন? সেদিনই সাধুবাবার আশ্রমের জন্য চাঁদা তুলে বেড়াল বাড়ি বাড়ি৷’
‘সাধুবাবার আশ্রম? কোথায় সেটা?’
‘ওই তো ঝিলের ওধারে!’ প্রভাময়ী কপালে হাত ঠেকিয়ে ভক্তিভরে বললেন৷ ‘সাধুবাবাকে স্টেশন থেকে বলতে গেলে নন্দই ডেকে এনেছিল৷ সে-ই উদ্যোগী হয়ে আশ্রমের জন্য জমি ভিক্ষে করেছিল৷ আশ্রমের ঘরদোর সব হয়ে গেল৷ নন্দ চলে গেল৷’
আবার চোখ মুছলেন প্রভাময়ী৷ কর্নেল কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছেন, ওপাশের ঘরের জানলা থেকে পাগল ধনেশবাবু হঠাৎ খি খি করে হেসে উঠলেন৷ তারপর বললেন, ‘অ্যাই বুড়ো! কাছে আয় না—তোর দাড়ি টেনে দেখি৷ আয়, আয়, কাছে আয়!’
হাত নেড়ে ডাকতে থাকলেন কর্নেলকে৷ হাসির পরিবেশ নয়, বাড়িতে শোক—না হলে হেসে ফেলতুম৷ ধনেশবাবু কর্নেলের চেয়ে আরো বুড়ো৷ তবু কর্নেলকে বুড়ো বলছেন৷ বিশেষ করে কর্নেলের দাড়ি ওঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷ টানাটানি করার ইচ্ছেও হয়েছে৷
আমাকে অবাক করে কর্নেল ওঁর কাছে চলে গেলেন৷ প্রভাময়ী ব্যস্তভাবে বললেন, ‘কাছে যাবেন না৷ সাবধান! গলা টিপে ধরবে৷’
কর্নেল মৃদুস্বরে কী যেন বললেন ধনেশবাবুকে৷ শুনতে পেলুম না৷ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ধনেশবাবুর চেহারা রাক্ষসের মতো হয়ে গেল৷ চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরুতে থাকল৷ দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, ‘মরবি, মরবি ব্যাটা বুড়ো! শিগগির পালিয়ে যা!’ তারপর মারণমন্ত্র পড়ার মতো করে অসংলগ্ন শব্দ আওড়াতে শুরু করলেন—‘কিলি কিলি কিলি কিলি... খট খট ভট ভট কট কট... ট্র্যাঁও ট্র্যাঁও... হিপিচিকি হিপিচিকি... ক্রুট ক্রুট... গিঃ!’
কর্নেল আবার মৃদুস্বরে কী যেন বললেন৷ অমনি পাগল ভদ্রলোক ঘরের ভেতর লম্ফঝম্ফ জুড়ে দিলেন৷ সেইসঙ্গে ওইসব উদ্ভুট্টে শব্দ মুখে!
কর্নেল কিন্তু গম্ভীর মুখে ফিরে এলেন৷ প্রভাময়ী বললেন, ‘বাইরের লোক দেখলে ওইরকম করেন ধনজ্যাঠা৷ তবে খেতে দিলেই সঙ্গে সঙ্গে শান্ত৷ এই দেখুন না৷’
বলে তিনি কিচেন থেকে একটা পাঁউরুটি, খানিকটা ফ্রুটস জ্যাম, আর একবাটি দুধ থালায় সাজিয়ে ও-ঘরের বন্ধ দরজার তলার দিকের একটুকরো কাঠ সরিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন৷ দেখলুম, ধনেশবাবু জানালা থেকে সরে গেছেন৷ আর কোনো সাড়াশব্দ নেই৷
এতক্ষণে রঞ্জন কৈলাস ধোপাকে নিয়ে ফিরে এল৷ কৈলাস কর্নেল ও আমাকে নমস্কার করে বারান্দার মেঝেয় বসল৷ কর্নেল বললেন, ‘কৈলাস, তুমিই তো প্রথম নন্দবাবুকে বাঁশবনের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছিলে?’
কৈলাস বলল, ‘হাঁ স্যার৷ হামি কাপড় লিয়ে আসছিল৷ দেখল কী, মাস্টারবাবু শুয়ে রইছেন৷ তো হামি শোচ করল কী, কেনো মাস্টারবাবু এখেনে শুয়ে রইছেন? তো হামি’—
বোঝা যাচ্ছিল, কৈলাস নেশার আসর থেকে উঠে এসেছে৷ কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, ‘তুমি তখন বাঁশবনের ভেতর কোনো লোককে দেখতে পেয়েছিলে কি?’
কৈলাস জোরে মাথা দোলাল, —‘নাঃ স্যার৷’
‘তোমার চোখ তো তখন নন্দবাবুর দিকে ছিল!’
‘হাঁ—তা ছিল৷ লেকিন’— কৈলাস চোখ বড়ো করে তাকাল হঠাৎ৷
‘বলো কৈলাস!’
‘স্যার!’—সে ভয়ার্ত কণ্ঠস্বরে বলে উঠল, ‘মাস্টারবাবু কেনো শুয়ে রইছেন শোচ করতে করতে হামি ঝিলের নজদিগে তাকিয়েছি, তো মনে হল—হাঁ, সাচ দেখল কী ঝুট দেখল জানি না স্যার, দেখল, কী একটা জঙ্গলের মধ্যে ঘুসে গেল৷ রামজি কি কিরিয়া, উও আদমি না ছে স্যার! বান্দর? নেহি— কভি নেহি! খালি একঠো মুখ দেখলম—স্রিফ একঠো মুখ৷ না বান্দর না আদমি৷ এত্তা বড়া মুখ! বহুত ডর বেজেছিল স্যার৷’
আমার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল৷ ওইরকম মুখের কথা নন্দবাবু সকালে কর্নেলকে বলছিলেন বটে! ওই পোড়ো বাড়িটার দোতলার দেখেছিলেন একপলক৷
কর্নেল বললেন, ‘আচ্ছা কৈলাস, তোমার ডাকে ডাক্তারবাবু আর পাড়ার লোকেরা দৌড়ে গিয়েছিলেন৷ যাঁরা গিয়েছিলেন, সবাইকে নিশ্চয়ই তুমি চেনো? তাদের মধ্যে কোনো অচেনা লোক ছিল কিনা মনে পড়ছে?’
কৈলাস ভাবতে ভাবতে বলল, ‘ওতোটা খেয়াল করিনি স্যার৷ লেকিন—দোঠো একঠো বাহারকা আদমি থাকলেও থাকতে পারে৷ তোখোন তো হামরা বিলকুল—
‘অচেনা লোক ছিল, নাকি ছিল না? ভেবে বলো কৈলাস৷’
কৈলাস মাথা চুলকে বলল, ‘একবার মোনে হয় কী, ছিল৷ আবার মোনে হয় কী, ছিল না৷’
‘ছিল, না ছিল না?’ কর্নেল জেরার ভঙ্গিতে জোরালো করে প্রশ্ন করলেন৷
‘হুঁ’—ছিল৷ ছিল বটে৷’—কৈলাস শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘হাঁ—ডাক্তারবাবু যখন মাস্টারবাবুকে চিৎ করে দিতে বললেন, হামি ভি হাত লাগালাম—তখন সে ভি হাত লাগাল৷ হামি তাকে চিনলম না স্যার৷’
‘চেহারা মনে আছে?’
‘হাঁ—মুখে আপনার মতন দাড়ি ভি ছিল—লেকিন কালো দাড়ি৷ চোখে কালো চশমা ভি ছিল৷’
রঞ্জন বলে উঠল, ‘হ্যাঁ—হ্যাঁ৷ আমারও মনে পড়ছে৷ কিন্তু ডাক্তারবাবু তাকে কী বলে যেন ডাকছিলেন! প্রদীপ—নাকি পীযূষ৷ ‘প’ দিয়ে নাম৷’
‘ঠিক আছে৷ ডাক্তারবাবুর কাছে জানা যাবে৷’ কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ ‘চলো রঞ্জন, ডাক্তারবাবুর কাছে যাওয়া যাক৷’
রঞ্জন বলল, ‘কৈলাস, তুমি ততক্ষণ একটু থাকো পিসিমার কাছে৷’
কৈলাস দেয়ালে হেলান দিয়ে বিড়ি বের করে বলল, ‘হাঁ-হাঁ৷ চলিয়ে যান না৷’
পাগল ধনেশবাবুর খাওয়া শেষ৷ জানলায় এসে বসে আবার বিড়বিড় করছেন৷
II তিন II
ডাক্তারবাবুর নাম অমরেন্দ্র বক্সী৷ প্রবীণ মানুষ৷ বেঁটে, হোঁৎকা, মোটা চেহারা৷ কিন্তু ভারি অমায়িক ও আলাপী৷ কর্নেলের পরিচয় পেয়ে খুব খাতির করে বসালেন৷ বললেন, ‘নন্দর শিক্ষক হিসেবেও খুব সুনাম ছিল৷ তাকে কে এভাবে বিষাক্ত তির ছুঁড়ে মেরে ফেলবে, কল্পনাও করা কঠিন৷’
কর্নেল বললেন, ‘তিরের কথা কি পুলিশের কাছে জেনেছেন ডাক্তারবাবু?’
‘নাঃ৷ এই রঞ্জন বলছিল৷ তিরটি অবশ্য আমি দেখিনি৷ কিন্তু সূক্ষ্ম একটা ক্ষতচিহ্ন ছিল—চারপাশে এক ইঞ্চি নীল ছোপ৷ দেখে মনে হয়েছে, ইনজেকশান করা হয়েছে৷ কাজেই তিরের কথাটা বিশ্বাস হয় না৷’
‘কী বিষ বলে মনে হয় আপনার?’
ডাক্তার বক্সী একটু চিন্তা করে বললেন, ‘বাড়ি ফিরে মেডিকেল বই ঘেঁটেছি খুব৷ এ মুহূর্তে আমার সিদ্ধান্ত, এ বিষ সাংঘাতিক সি এল ও-৫১৷ গাছগাছড়া থেকে পাওয়া যায়৷’
‘কী গাছ থেকে?’
‘এক মিনিট৷ আমার মশাই বইপড়া বিদ্যে৷ বইটা এনে দেখাচ্ছি আপনাকে৷’
ডাক্তার বক্সী র্যাক থেকে প্রকাণ্ড একটা বই আনলেন৷ চিহ্ন-দেওয়া পাতাটা খুলে কর্নেলকে দিলেন৷ কর্নেল পড়ে দেখে বললেন, ‘মাই গুডনেস! এ গাছ তো আমাদের দেশে জন্মায় না৷ এ তো দেখছি, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলে আমাজন নদের অববাহিকার জঙ্গলে পাওয়া যায়৷ রেড ইন্ডিয়ানরা একে বলে ‘নাতেমা’৷ মেডিকেল পরিভাষায় সি এল ও-৫১৷ ওরা তিরে এ বিষ মাখিয়ে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে৷ গায়ে বিঁধলেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু৷ এ বিষ এখানে কে আনল?’
‘সেই তো ভাবছি মশাই!’—ডাক্তার বক্সী উদ্বিগ্ন মুখে বললেন৷ ‘রহস্য বড়ো জটিল৷ নন্দকে মারল কে? কেনই বা মারল? মারল সে আবার কিনা রেড ইন্ডিয়ানদের বিষ মাখানো তির ছুঁড়ে! আমি একথা মাথা ভাঙলেও বিশ্বাস করব না যে রেড ইন্ডিয়ানরা নন্দকে মারবার জন্য সাত সমুদ্দুর-তেরো নদী পেরিয়ে এই কল্যাণপুরে এসে হাজির হয়েছিল!’
‘ঠিকই বলেছেন৷’ —কর্নেল বললেন, ‘আচ্ছা ডাক্তার বক্সী, মুখে দাড়ি চোখে কালো চশমাপরা কে এক ভদ্রলোক, আপনার পরিচিত তিনি, নন্দবাবুর ডেডবডি চিৎ করতে সাহায্য করেছিলেন শুনেছি৷ কে তিনি?’
ডাঃ বক্সী খ্যা খ্যা করে হেসে ফেললেন৷ —‘কী কাণ্ড দেখুন! আরে, ও তো আমার শ্যালক প্রেমাংশু! দাঁড়ান, তাকে ডাকি৷’ —বলে গলা চড়িয়ে ডাকলেন, ‘অ নারাণ! পুঁটেমামাকে ডেকে দে তো বাবা!’
নারাণ বা কেউ ভেতর থেকে সাড়া দিয়ে বলল, ‘পুঁটেমামা একটু আগে মায়ের সঙ্গে আশ্রমে কেত্তন শুনতে গেল!’
ডাঃ বক্সী আরও খানিক খ্যা খ্যা করে হাসলেন ভুঁড়ি নাচিয়ে৷ তারপর বললেন, ‘তা খুন-খারাপি বলে কথা৷ আর আপনি হলেন কিনা ঝানু গোয়েন্দা৷ সবেতেই সন্দেহ হবে বইকী! তবে আমার কাছে লিখে নিন, পুঁটে—মানে আমার শ্যালক প্রেমাংশু আরশোলা দেখে ভয় পায়৷ আর কোথায় পুঁটে, আর কোথায় হল গিয়ে ব্রাজিল৷ জীবনে ও কলকাতার বাইরে যদি পা বাড়িয়ে থাকে তো সে এই কল্যাণপুর—আর হ্যাঁ, একবার ধানবাদ গিয়েছিল বটে আমার সঙ্গে৷’
‘ধানবাদ?’
‘আজ্ঞে৷ ধানবাদে আমার বোনের বাড়ি৷ গত বছর এমনই শীতে খেয়াল হল, একবার নীতু—মানে আমার বোনকে দেখে আসি৷ তো একজন সঙ্গী খুঁজতেই পেয়ে গেলুম পুঁটেকে৷’
‘কী করেন আপনার শ্যালক?’
‘তাহলে হিস্ট্রিটা বলতে হয়৷’ —বলে ডাঃ বক্সী হাঁক দিলেন ফের, ‘অ নারাণ৷ চা হল? কতক্ষণ লাগে চা করতে? এদিকে এনারা শীতে কম্পমান৷’ —আবার একদফা খ্যা খ্যা করে হাসলেন ডাঃ বক্সী৷
কর্নেল বললেন, ‘হ্যাঁ—আপনার শ্যালকবাবুর হিস্ট্রিটা শোনা যাক৷’
‘আমার শ্বশুরমশাই ছিলেন নামকরা লোক৷ নাম শুনে থাকবেন ডঃ গোপালগোবিন্দ রায়ের৷ কলকাতা জাদুঘরের কিউরেটার ছিলেন ব্রিটিশ আমলে৷ রিটায়ার করে চৌরঙ্গী এলাকায় একটা কিউরিও শপ খোলেন৷ রাজ্যের উদ্ভুট্টে সব জিনিস দেশ-বিদেশ থেকে জোগাড় করে বেচতেন৷ বছর দুই আগে তাঁর স্বর্গলাভ হয়েছে৷ সন্তানাদি বলতে আমার স্ত্রী শোভনা আর ওই পুঁটে—প্রেমাংশু৷ পৈতৃক ব্যবসার সে থোড়াই কেয়ার করে৷ যা কিছু দেখাশোনা করে—সব পুরোনো কর্মচারীরা৷ পুরোনো জিনিসপত্র সংগ্রহ করে তারাই৷ পুঁটে ওপর-ওপর ফোঁপর দালালি করে৷ আজকাল আর আগের মতো পণ্যদ্রব্য দোকানে নেই বললেই চলে৷ সবাই তো ডঃ রায় নয়৷ কোনটা কত পুরোনো, কী তার দাম—বুঝবে কে? কোনোক্রমে ঠাট বজায় রেখে চালিয়ে নিচ্ছে৷ দেখেশুনে মনে হয়, পুঁটে কারবার গুটিয়ে ফেলার তালে আছে৷’
‘কী নাম দোকানের?’
‘রায় কিউরিওস৷’—ডাঃ বক্সী আবার হাসতে লাগলেন৷ ‘নাঃ—ব্রাজিল-ট্রাজিলের কোনো জিনিস নেই৷ গিয়ে দেখবেন৷ খালি গোটাকতক চীনেমাটির তৈরি পার্সিয়ান পাত্র, কিছু টেরাকোটা, কয়েকটা পোড়ামাটির মূর্তি—এইসব৷ চুপিচুপি বলি, কিনে ঠকবেন না যেন৷ সব নকল৷’
চা এল৷ সত্যি বড্ড শীত করছিল৷ চা খেতে খেতে ডাঃ বক্সী আবার নন্দবাবুর জন্য শোকপ্রকাশ করলেন৷ কথা প্রসঙ্গে স্থানীয় সমস্যা নিয়ে একদফা বকবক করলেন৷ মল্লিকদের জমিদারির ইতিহাস সংক্ষেপে বর্ণনা করে পোড়োবাড়ি নিয়ে সাত শরিকের মামলায় ফতুর হওয়ার কাহিনি শোনালেন৷ তারপর রোগী দেখার জন্য একটা কল এল, তখন বিদায় নিয়ে উঠে পড়লেন৷ আমরাও বেরিয়ে এলুম৷
নন্দবাবুর বাড়ির কাছে গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘জয়ন্ত, তুমি রঞ্জনের পিসিমার সঙ্গে গপ্পো করো গিয়ে৷ আমি রঞ্জনকে নিয়ে থানা থেকে ঘুরে আসি৷ মর্গ থেকে ডেডবডি সম্ভবত কালকের আগে পাওয়া যাবে না৷ তবে মর্গের ডাক্তারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করব একবার৷’
প্রভাময়ীর সঙ্গে কৈলাস রজক গল্প করছিল৷ আমাকে দেখে সে উঠে পড়ল৷ ‘এই তো বাবুরা এসে গেলেন মাইজি, হামি এখন ছুট্টি লিলো৷’—বলে সে কেটে পড়ল৷ বাইরে তার হেঁড়ে গলার গান শোনা গেল৷ বুঝলুম, ভয়ের চোটেই গান ধরেছে কৈলাস৷
প্রভাময়ী বললেন, ‘ওঁরা কোথায় গেলেন আবার?’
বললুম, ‘থানায়৷ ততক্ষণ আমি থাকছি৷ চিন্তা করবেন না৷’
প্রভাময়ী বললেন, ‘আমি চিন্তার বাইরে চলে গেছি বাবা৷ আমার যেটুকু ভয় ছিল, আজ সেটুকুও ঘুচে গেছে৷’
ওপাশের ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে৷ জানলায় এখন দু-পা বানরের মতো গলিয়ে দু’হাতে রড আঁকড়ে ধরে বসে আছেন ধনেশবাবু৷ ভেংচি কেটে বললেন, ‘কিলিকিলি কিলি কিলি... খট খট ভট ভট কট কট... ট্র্যাঁও ট্র্যাঁও... হিপিচিকি হিপিচিকি... ক্রুট ক্রুট... গিঃ৷’
‘ঘুমোলে তো পাগলামি সেরে যায়! পাগল কখনো ঘুমোয় না৷ ওই যে দেখছ, সারারাত ওইরকম৷’
কোথায় যেন খুট করে একটা শব্দ শুনতে পেলুম৷ শব্দটা উঠোনের ওপাশে পোড়োবাড়িটার দিক থেকেই ভেসে এল যেন৷ তারপর ওদিকে আচমকা প্যাঁচা ডেকে উঠল, ক্র্যাঁও ক্র্যাঁও ক্র্যাঁও!
পাগল ধনেশবাবু খি খি করে হেসে বললেন, ‘আসছে! পালা৷ শিগগির পালিয়ে যা! কিলি কিলি কিলি কিলি... খট খট...’
আবার খুট করে শব্দ৷ একটু ঝুঁকে দ্রুত পোড়োবাড়ির দোতলা লক্ষ্য করে টর্চ জাললুম—কারণ এবার শব্দটা ওপরে মনে হয়েছে৷ নতুন ব্যাটারি৷ উজ্জ্বল এক ঝলক আলো গিয়ে পড়ল ভাঙা জানলায়—দোতলায়৷ এক পলকের জন্য একটা মুখ—হ্যাঁ, নন্দবাবু ঠিক যেমনটি বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের আঁকা সেই জান্তব রহস্যময় মুখটার মতোই—তেমনই ধূসর ও কালোয় আঁকা যেন—জানলায় ভেসে উঠল৷ দুটি নিষ্পলক লম্বাটে চোখ৷ খুব ঠান্ডা—খুব নিষ্প্রভ দুই চোখ, লম্বাটে নাকের ডগার দিকটা ঈষৎ চওড়া—ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল৷ টর্চের বোতামে আমার নিঃসাড় আঙুলও আলগা হয়ে গেল৷ ভেতরটাও হিম হয়ে গেল আমার৷
প্রভাময়ী বললেন, ‘কী হল?’
অতি কষ্টে বললুন, ‘কিছু না৷’
‘কিছু দেখে ভয় পেলে নাকি বাবা?’
সিগারেটের প্যাকেট বের করলুম কাঁপা কাঁপা হাতে৷ লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে বললুম, ‘বেড়াল না কী যেন দেখলুম ও বাড়ির জানলায়৷’
‘হ্যাঁ—একটা বেড়াল ইঁদুর ধরতে আসে ও বাড়িতে৷ মাঝে মাঝে দেখেছি বটে৷’
‘আচ্ছা পিসিমা, আপনি তো একা থেকেছেন কত সময় এ বাড়িতে৷ কিছু দেখতে-টেখতে পাননি?’
‘কোথায়? মল্লিকবাড়ির কথা বলছ তুমি?’
‘হ্যাঁ৷ বাড়িটা তো পোড়ো৷’
‘নাঃ৷ তবে পাড়ার লোককে জিগ্যেস করলে একশো গপ্পো শুনিয়ে দেবে৷ বিশ্বাস কোরো না৷’
‘ধরুন, রাতবিরেতে কোনো শব্দ-টব্দও শোনেননি কখনো?’
মাথা নাড়লেন প্রভাময়ী৷ তারপর বললেন, ‘ফাঁকা বাড়ি৷ দরজা জানলা চুরি করে নিয়ে গেছে যে যেমন সুযোগ পেয়েছে৷ তবে সেসব আমি আসার আগের কথা৷ আমি এসে অব্দি এইরকম দেখছি৷ তবে শব্দ-টব্দের কথা বললে৷ খালি বাড়িতে বাতাস ঢুকলে শব্দ হবে না? তা ছাড়া জঙ্গল হয়ে আছে পেছনের বাগানটা৷ এই অঞ্চলটা দশ বছর আগেও জঙ্গল হয়ে ছিল৷ শেয়াল ডাকত ঝিলের ধারে৷ এখন অনেক ফাঁকা হয়ে গেছে৷ ঘর বাড়ি হয়েছে৷ শেয়ালও আর নেই৷ তবে বেজি, খটাস, সাপটাপ আছে৷ তা ছাড়া ভীষণ চামচিকে আছে ও-বাড়িতে৷ সেইসব শব্দ শোনা যায় বইকী৷’
কথা বলছি এবং শুনছি—সে শুধু সাহস সংগ্রহের জন্য৷ কিন্তু কান পেতে রেখেছি৷ টর্চও রেডি৷ জ্যাকেটের একটা পাশপকেটে একটা অটোমেটিক রিভলবারও আছে৷ তবু ভয়টা ঘুচছে না৷ কথা বাড়াতে বললুম, ‘আচ্ছা পিসিমা, ঢিল পড়ার ব্যাপারটা কী মনে হয় আপনার?’
প্রভাময়ী একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘ঢিল পড়ে ঠিক দুপুর বেলায়৷ মল্লিকবাড়ির দিক থেকে পড়ে৷ ছোটো-ছোটো ঢিল৷ আজ দুপুরেও পড়ছিল৷ চেঁচামেচি করাতে থেমে গেল৷ ওই দেখো না, টর্চ জ্বেলে দেখো—এখনও পড়ে আছে৷ রাগ করে আজ সাফ করিনি উঠোন৷’
টর্চ ভয়ে ভয়ে জ্বেলে কয়েকটা ছোট্ট এক বর্গ ইঞ্চি ইটের টুকরো দেখতে পেলুম৷ বললুম, ‘আপনার কী ধারণা বলুন৷’
প্রভাময়ী বললেন, ‘নন্দ ছিল অঙ্কের মাস্টার৷ যেসব ছাত্র অঙ্কে এবার ফেল করবে ভেবেছে, তারাই লুকিয়ে ঢিল ছুঁড়ে ভয় দেখায়৷’
‘কিন্তু নন্দবাবু তো ছুটে গিয়ে কাউকে দেখতে পেতেন না!’
‘পাবে কী করে? ওদিকে ঘন জঙ্গল হয়ে আছে যে! এ তো বয়স্ক লোক নয় যে দৌড়ে পালাতে আছাড় খাবে৷ কম বয়সী ছেলেপুলে৷’
এইসব কথায় ঘণ্টাখানেক কেটে গেল৷ কিন্তু আর পোড়োবাড়ির দিকে কোনো শব্দ হল না—শুধু প্যাঁচাটা মাঝে মাঝে ডাকছিল৷ তারপর কর্নেল ও রঞ্জন ফিরে এলেন৷
কর্নেল বললেন, ‘এসো জয়ন্ত৷ রাত সাড়ে ন’টা বাজে প্রায়৷ এবার ফেরা দরকার৷’
রঞ্জন কুণ্ঠিত মুখে বলল, ‘থাকার কোনো অসুবিধে ছিল না৷ এত রাতে কষ্ট করে—’
কর্নেল তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আবার শিগগির আসব’খন৷ তোমরা সাবধানে থেকো৷’
এই রাস্তাটা অন্ধকার৷ ঘুরে গিয়ে অন্য রাস্তায় আলো পাওয়া গেল৷ কর্নেলকে পোড়োবাড়ির জানলায় সেই বিভীষিকার কথাটা বললুম৷ কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, ‘খুঁজতে না গিয়ে ভালোই করেছ৷ যাই হোক, কেসটা বেশ গোলমেলে৷ থানার পুলিশ অফিসারদের মতে, সাধুবাবার আশ্রম নিয়ে দলাদলিই এই খুনের কারণ৷ তির-টির বাজে কথা৷ বিষাক্ত ইনজেকশান করেছে শত্রুপক্ষ৷ পাশে যেতে যেতে আচমকা ইনজেকশান করে পালিয়ে গেছে৷’
‘আশ্রম নিয়ে দলাদলি আছে নাকি?’
‘হ্যাঁ৷ আসলে ঝিলের ওপারে যে জমিতে সাধুবাবার আশ্রম হয়েছে, সেটা নাকি জবরদখল৷ জমিটার মালিক রেল দফতর৷ বছর চল্লিশ আগে এখান দিয়ে রেললাইন করার জন্য রেল দফতর বহু জমি দখল করেছিল৷ পরে প্ল্যানটা বাতিল করা হয়৷ ওই যে ঝিলটা আছে, ওটাও রেলের৷ মাটি কেটে লাইন পাতার জন্য জমি উঁচু করা হয়েছিল৷ তাই থেকে ঝিলের উৎপত্তি৷ এখন একটা লোক মাছ চাষের জন্য ইজারা নিয়েছে রেলের কাছে৷ সে আছে আশ্রমের বিপক্ষে৷ কারণ জমিগুলো সেই দখল করছিল৷ নন্দবাবু লিড নিয়ে সেই জমিতে আশ্রমের পতাকা গেড়েছিলেন৷’
‘পুলিশ কি ওই লোকটাকে অ্যারেস্ট করবে নাকি?’
‘অলরেডি করেছে৷ তার নাম হল উদয় হাজরা৷ হাজরাবাবু নাকি ইতিমধ্যে কবুল করেছে, নন্দবাবুকে মারবার মতলব তার ছিল, তবে প্রাণে মারবার মতলব ছিল না৷ কাজেই এ খুনের ব্যাপারে সে কিছু জানে না৷ পুলিশের ব্যাপার, বুঝতেই পারছ— ওই সূত্র থেকে পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে কেস সাজাতে ব্যস্ত হয়েছে৷’
‘আপনার সিদ্ধান্ত কী?’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘কিচ্ছু না৷ আপাতত শীতে আমি হিম৷ মাথার ঘিলুও ঠান্ডা! কাজেই—’
কথা কেড়ে বললুম, ‘কেস সত্যি জটিল৷ রেড ইন্ডিয়ানদের বিষ-মাখানো তির, একটা জান্তব মুখ, পাগল ধনেশবাবু আসার পর ঢিলের উৎপাত, সাধুবাবার আবির্ভাব, ডাক্তার বক্সীর শ্যালক পুঁটেবাবু, তার পৈতৃক কিউরিও শপ, ধানবাদ-যাত্রা, ধনেশবাবুও ধানবাদের লোক, আর তাঁর মুখের ওই কাকাতুয়ার মতন বুলি৷’
কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন হঠাৎ৷ ‘কাকাতুয়ার বুলি বললে, তাই না?’ বলে আবার পা বাড়ালেন৷ তারপর বিড়বিড় করতে থাকলেন আপনমনে, ‘কাকাতুয়া... ব্রাজিল... কিউরিও শপ...’
II চার II
এরপর দুটো দিন আর কর্নেলের পাত্তা নেই৷ কাগজের অফিস থেকে ফোন করেছিলুম৷ কর্নেলের ভৃত্য ষষ্ঠীচরণ বলেছিল, ‘বাবামশাই বেইরেছেন৷ কখন ফিরবেন বলে যাননি৷’ এরপর দু’দিন ধরে বেশ কয়েকবার রিং করেও একই কথা শুনেছি৷
কর্নেলের অবশ্য এমন হুট করে নিপাত্তা হওয়ার অভ্যাস আছে৷ কোথায় চলে যান বিরল প্রজাতির প্রজাপতির খোঁজে প্রজাপতিধরা জাল নিয়ে৷ নয়তো কোনো বিচিত্র অর্কিডের খোঁজে৷ কাজেই অবাক হইনি৷
তিনদিনের দিন সকালে ওঁর ফোন পেলুম৷ ‘হাতে সময় থাকে তো ঝটপট চলে এসো ডার্লিং৷’
গিয়ে দেখি, উনি ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসে দাড়িগুলো একটা-একটা করে টানছেন৷ আঙুলের ফাঁকে চুরুট ধোঁয়াচ্ছে৷ তার মানে, গভীর চিন্তায় মগ্ন৷ কিন্তু পায়ের শব্দেই যেন টের পেয়ে চোখ বুজে বললেন, ‘বসো জয়ন্ত৷’
যতক্ষণ না যষ্ঠী কফি দিয়ে গেল এবং আমি কফির পেয়ালা খালি করে ফেললুম, ততক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকলেন৷ তারপর চোখ খুলে সোজা হয়ে বসে বললেন, ‘চলো৷ বেরিয়ে পড়া যাক৷’
‘কল্যাণপুর গেলে, যেতে রাজি৷’
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘মল্লিকবাড়ির ভয়ঙ্কর ভূতটা তোমার আবার দেখতে ইচ্ছে করছে বটে, কিন্তু সাবধান! এবার সে আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে৷’
হাসতে হাসতে বললুম, ‘ভূত-তাড়ানো মন্ত্র আমি নন্দবাবুর ধনজ্যাঠার কাছে শিখে নিয়েছি৷ কিলিকিলি কিলিকিলি... খট খট ভট ভট কট কট... ট্র্যাঁও ট্র্যাঁও... হিপিচিকি হিপিচিকি... গিঃ!’
‘মুখস্থ করে ফেলেছ দেখছি! ওটার নাম দেওয়া যাক কাকাতুয়ামন্ত্র৷ —বলে কর্নেল পোশাক বদলাতে গেলেন৷
একটু পরে আমরা শেয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে উঠে বসলুম৷ আপ ট্রেনে তত ভিড়ভাট্টা নেই৷ কর্নেল বাইনোকুলার চোখে রেখে পাখি দেখতে দেখতে গেলেন সারা পথ৷ আগরপাড়ায় নেমে সাইকেল রিকশো করে কল্যাণপুরের শেষ দিকে পৌঁছে রিকশো ছেড়ে দিলুম৷ এদিকটা সবসময় নির্জন৷ বাঁশবনটার কাছে গিয়ে দিনদুপুরে আমার গা শিরশির করে উঠল৷
হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল৷ বললুম, ‘আচ্ছা কর্নেল, সেদিন ধনেশবাবুকে চুপিচুপি কী বলছিলেন যে উনি অমন ক্ষেপে গেলেন?’
কর্নেল হাসলেন, ‘তেমন কিছু না৷ আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতো একটা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলুম মাত্র৷ ওঁকে প্রথমবার বললুম, জিনিসটা কোথায় রেখেছেন? অমনি উনি আমাকে ভয় দেখিয়ে বললেন, শিগগির পালিয়ে যা৷ মারা পড়বি৷ দ্বিতীয়বার বললুম, পরের জিনিস লুকিয়ে রাখা কি উচিত হচ্ছে? এবার উনি লাফালাফি শুরু করলেন৷’
অবাক হয়ে বললুম, ‘সে তো দেখছিলুম৷ কিন্তু জিনিস মানে কী? হঠাৎ জিনিসের কথাটা আপনার মাথায় এল কেন?’
কর্নেল বললেন, ‘ওই তো বললুম আন্দাজে ঢিল ছোঁড়া৷ আসলে ওঁর এখানে আসার পর থেকে ভৌতিক উপদ্রব এবং তারপর নন্দবাবুর ওইভাবে মারা পড়ার ঘটনা থেকে আমার মাথায় একটা থিওরি ঘুরছিল৷ কোনো জিনিস—ধরো, কোনো মূল্যবান ধনরত্নই কি এসবের পেছনে আছে? কিংবা কোনো গুপ্তধনের হদিস? সেটা যাই হোক, জিনিস শব্দে তাকে প্রকাশ করাটাই যুক্তিযুক্ত৷ তো দেখলুম, পরীক্ষা সফল হল৷ পাগল ধনেশবাবুর প্রতিক্রিয়া দেখে বোঝা গেল, আমার অনুমান সঠিক৷’
কর্নেলের সঙ্গগুণে আমারও মাঝে মাঝে এসব ব্যাপারে মাথা খুলে যায়৷ বললুম, ‘কর্নেল, আর একটা পয়েন্ট৷ নন্দবাবু মারা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেউ আপনাকে ফোনে খবরটা দিয়েছিল— তাই না? তাহলে বোঝা যাচ্ছে, নন্দবাবুর কোনো হিতৈষীরই কাজ এটা৷ সে কে হতে পরে?
কর্নেল আমার দিকে প্রশংসার চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘হুঁ’—তুমি ঠিকই ধরেছ৷ আগরপাড়া টেলিফোন কেন্দ্রে আমি ব্যাপারটার খোঁজ নিয়েছি৷ কল্যাণপুরের যে টেলিফোন নম্বর থেকে কলকাতায় ওই কলটা বুক করা হয়েছিল, সেই ফোন কার নামে আছে, তাও জানতে পেরেছি৷’
‘কার নামে?’
‘ডাক্তার অমরেন্দ্র বক্সীর৷’
আরও অবাক হয়ে গেলুম৷ বললুম, ‘বলেন কী! তাহলে—’
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘উঁহু৷ ঝটপট কোনো সিদ্ধান্ত করা ঠিক নয় ডার্লিং! ডাঃ বক্সীর ফোন অন্য কেউ ব্যবহার করতেও পারে৷ তা ছাড়া ফোনটা তো সে রাতে ওঁর ডিসপেন্সারিতে ওঁর চেম্বারের ভেতর দেখলুম৷ দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ ফোন পেয়েছিলুম৷ তখনও ডঃ বক্সীর চেম্বারে থাকার কথা৷ ওই সময় রোগী সেজে গিয়ে কেউ ফোন করতেও পারে৷ তদন্ত করলে জানা যাবে৷ সাড়ে বারোটায় আমি ফোন পেয়েছি৷ তার আগে এক্সচেঞ্জে কল বুক করতে একটু সময় লেগেছে৷ অতএব ধরে নিচ্ছি, বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে কেউ ওঁর চেম্বারে ছিল এবং ফোন করেছে৷ অথবা—’
‘অথবা ডাঃ বক্সী নিজেই ফোন করেছিলেন৷’
‘হ্যাঁ—তাও করতে পারেন৷ তবে তদন্ত না করে সত্যে পৌঁছানো যাবে না৷’
বাঁশবনের ভেতর দিয়ে প্রচণ্ড অস্বস্তির মধ্যে হাঁটছিলুম৷ চারদিকে নজর রাখছিলুম৷ প্রতি মুহূর্তে ভয় হচ্ছিল, এখনই হয়তো বিষাক্ত ক্ষুদে তির এসে গলায় বিঁধে যাবে—এবং ঝোপের আড়ালে ভেসে উঠবে কোনো ভূতুড়ে, ভয়ঙ্কর মুখ৷
রঞ্জন সাড়া পেয়েই দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে গেল৷ দিনের আলো বাড়িটাতে ঢোকে না৷ উঠোনের ওপর ডালপালা ছড়িয়ে এসেছে বিশাল বটগাছ৷ গাছটা পেছনে ঝিলের কিনারায় গজিয়েছে৷ ডানদিকে—দক্ষিণে পোড়ো মল্লিকবাড়ি জরাজীর্ণ চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে৷ বাঁ-দিকে—উত্তরে প্রচুর গাছপালা আর ওই বাঁশবনের খানিকটা অংশ সদর রাস্তার পুবদিকটাও দখল করে আছে৷ ঝিলটা পুবে৷ আমরা পশ্চিম থেকে বাড়িতে ঢুকেছি৷ সেদিন সন্ধ্যায় এসে এই পরিবেশ আঁচ করতে পারিনি৷ এখান থেকে দক্ষিণ দিকে মল্লিকবাড়ির পর জঙ্গুলে বাগান, তারপর বসতি এলাকা৷ মিউনিসিপ্যালিটির অন্তৰ্ভূক্ত একটা হাউসিং কলোনি৷
ঠান্ডা হিম একটা একতলা বাড়ি৷ এটাও বেশ পুরোনো৷ দিনের আলোয় পাশের দোতলা পোড়োবাড়িটা দেখে মনে হল, যে কোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে৷ ফাটা দেয়াল ও কার্নিশে গাছ গজিয়ে রয়েছে৷ গরাদহীন ভাঙা জানলা হাঁ করে আছে৷ সম্ভবত এপাশের শেষ জানলাটাতে সেই ভূতুড়ে মুখটা দেখেছিলুম৷
পুবের দিকের ছোট্ট ঘরের জানলায় পাগল ধনেশবাবু গরাদের ভেতর হাত-পা বের করে তেমনি বসে আছেন এবং খি খি করে হাসছেন৷ মাঝে মাঝে কাকাতুয়ামন্ত্র পড়ছেন৷
বাড়িতে অশৌচ চলেছে৷ প্রভাময়ী আগেই খাওয়ার কথা তুলেছেন৷ নিরিমিষ দু’মুঠো মুখে দিতেই হবে আজ৷ সেদিন অমন করে রাতে ফিরে গেলুম—এক কাপ চা-ও খাওয়াতে পারেননি৷ কর্নেল তাঁকে বুঝিয়ে শান্ত করে বললেন, ‘যে জন্যে এলুম, এবার বলি৷ গত দু’দিনে বাড়িতে ঢিল পড়েছিল কি?’
প্রভাময়ী বলার আগে রঞ্জন বলল, ‘প্রচণ্ড পড়েছে৷ গতকাল ক্লাবের ছেলেদের ডেকে এনেছিলুম৷ ওরা ওই পোড়োবাড়ির ভেতর ওত পেতে বসেছিল৷ অথচ আশ্চর্য, ঠিক ঢিল পড়তে শুরু করল৷’
‘কতক্ষণ পড়ল?’
‘প্রায় মিনিটখানেক একটা-দুটো করে৷ তারপর আধমিনিট অন্তর একটা করে৷ মিনিট তিনেক হবে মোট৷’
কর্নেল উঠোনের ওপর বটগাছের ডালপালার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওদিকে কেউ লক্ষ্য রাখোনি নিশ্চয়ই?’
রঞ্জন বলল, ‘ঢিল তো আসে পোড়োবাড়ির দিক থেকে৷’
‘চোখের ভুল হতেও পারে৷ পোড়োবাড়ি এবং ভৌতিক উৎপাত—এই দুটো ধারণা থেকে ওরকম মনে হওয়া স্বাভাবিক৷ কিন্তু অন্যদিক থেকেও পড়তে পারে ঢিল৷’
রঞ্জন স্বীকার করল, ‘হ্যাঁ তাও ঠিক৷ আপনারা এসে ভালোই হয়েছে৷ বারোটা-সাড়ে বারোটা অব্দি থাকলে স্বচক্ষে ব্যাপারটা দেখে যেতে পারবেন৷’
এগারোটা বাজে প্রায়৷ ঘড়ি দেখে কর্নেল বললেন, ‘হুঁ’—এ দু’দিনে আর কিছু ঘটেনি তো?’
প্রভাময়ী বললেন, ‘রঞ্জু, পরশু রাতের ঘটনাটা বল৷’
রঞ্জন বলল, ‘পরশু রাতে—তখন প্রায় দুটো বাজে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল৷ পিসিমা এ ঘরে থাকেন৷ আমি পাশের ঘরে থাকি৷ মনে হল, পিসিমার ঘরেই চাপা গলায় কারা কথা বলছে৷ ভাবলুম তাহলে রাতের ট্রেনে কোনো আত্মীয়স্বজন এসেছে৷ তারপর পিসিমা ডাকলেন৷ দরজা খুলে বললুম, কারা এসেছে পিসিমা? পিসিমা বললেন, আমি তো ভাবছি তোর ঘরেই এসেছে কারা৷ কথা বলছে৷’
কর্নেল বললেন, ‘তারপর কী হল?’
‘দু’জনেই অবাক৷ অথচ চাপা গলায় কথাবার্তা ঠিকই শুনেছি৷’
‘তখন ধনেশবাবু কী—’
বাধা দিয়ে প্রভাময়ী বললেন, ‘ধনজ্যাঠা তেমনই জানলায় বসে ছিলেন৷’
‘উনি কথা বলছিলেন না তো?’
‘না৷ দু’জনের গলার স্বর শুনেছি আমরা৷’—রঞ্জন বলল, ‘কী যেন কথাটা তুমি শুনেছ বললে পিসিমা?’
প্রভাময়ী বললেন, ‘কাকা কাকা করছিল যেন৷’
কর্নেল বললেন, ‘কাকা? ঠিক শুনেছেন?’
‘হ্যাঁ—স্পষ্ট শুনেছি কাকা৷’
কর্নেল হঠাৎ পাগল ধনেশবাবুর কাছে গিয়ে সেদিনকার মতো নিচু গলায় কী একটা বললেন৷ অমনি ধনেশবাবু খি খি করে হাসতে লাগলেন৷ তারপর বললেন, ‘কিলিকিলি কিলিকিলি... খট খট ভট ভট কট কট... ট্র্যাঁও ট্র্যাঁও... হিপিচিকি হিপিচিকি... ক্রুট ক্রুট গিঃ!’
কর্নেল আবার কিছু বললেন৷ তখন ধনেশবাবু দু হাতের বুড়ো আঙুল নেড়ে দিলেন৷
ফিরে এসে কর্নেল প্রভাময়ীকে বললেন, ‘আপনি জানেন কি, ধনেশবাবুর একটা কাকাতুয়া ছিল?’
‘আমি দেখিনি৷ ধানবাদের ওঁর বাড়িতে কখনও যাইনি৷ তবে নন্দের কাছে শুনেছিলুম, ধনজ্যাঠার জিনিসপত্রের ভেতর একটা মরা সাদা কাকাতুয়া ছিল৷ মরা মানে—ওই যে কী বলে, আস্ত পালকশুদ্ধ, চামড়া ছাড়িয়ে ভেতরে খড়কাঠ গুঁজে সাজিয়ে রাখে না দোকানে?’
‘হ্যাঁ—ট্যান করা৷ ট্যাক্সিডার্মি করাও বলা হয়৷ দেখতে অবিকল জ্যান্ত লাগে৷ কিন্তু সেটা কী হল?’
প্রভাময়ী মাথা নাড়লেন৷ ‘জানি না পাগল মানুষের কাণ্ড৷’
‘ওঁর জিনিসপত্র কোথায় আছে?’
‘আমার ঘরে রাখা আছে৷ জিনিসপত্র বলতে একটা সুটকেশ আর কিটব্যাগ৷ দেখাচ্ছি৷’
প্রভাময়ী জিনিস-দুটো বারান্দায় আনা মাত্র ধনেশবাবু ও-ঘরের জানলায় চেঁচামেচি শুরু করলেন—‘হাত দিসনে৷ ছুঁসনে৷ মারা পড়বি৷ কিলিকিলি কিলিকিলি...’
পুরোনো কাপড়চোপড় ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেল না৷ কর্নেল খালি সুটকেশটার ভেতর আতসকাচের সাহায্যে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, ‘হুঁ’—কাকাতুয়াটা এর মধ্যেই ছিল৷ নেই দেখা যাচ্ছে৷’
রঞ্জন অবাক হয়ে বলল, ‘কেমন করে বুঝলেন?’
‘রোঁয়া লেগে আছে৷ খালি চোখে দেখা অবশ্য কঠিন৷’ কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ ‘আমরা একবার ডাঃ বক্সীর কাছ থেকে ঘুরে আসি৷’...
ডাঃ বক্সীর চেম্বারে রোগীদের ভিড় কমে গেছে৷ পা ছড়িয়ে বসে মেডিকেল জার্নালের পাতা ওল্টাচ্ছিলেন৷ আমাদের অভ্যর্থনা করে মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘কী স্যার? কতদূর এগোলেন৷’
কর্নেল বললেন, ‘একটুও না৷ তাই আপনার সাহায্য চাইতে এলুম৷’
‘গ্ল্যাডলি সাহায্য করতে প্রস্তুত, কর্নেল৷’—ডাঃ বক্সী তাঁর কম্পাউণ্ডার ভদ্রলোককে আমাদের আপত্তি সত্ত্বেও কফির জন্য বাড়ির ভেতর পাঠালেন৷ বুঝলুম, তাঁর শ্রীমান নারাণ এখন স্কুলে৷
কর্নেল বললেন, ‘দ্রুত কথাটা সেরে ফেলা যাক৷ আচ্ছা ডাঃ বক্সী, গত একুশে ডিসেম্বর নন্দবাবু মারা যাওয়ার দিন বেলা বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে কি আপনি চেম্বারে উপস্থিত ছিলেন?’
ডাঃ বক্সী চোখে হেসে বললেন, ‘আমিও তাহলে অন্যতম সাসপেক্ট? ভালো—খুব ভালো৷ গোয়েন্দাদের এটাই তো নিয়ম৷ আমি মশাই গোয়েন্দা-কাহিনির বেজায় ভক্ত৷ হ্যাঁ—সেদিন ঠিক বারোটা-তিন মিনিটে আমাকে কৈলাস ধোপা এসে খবর দিল, নন্দবাবু বাঁশবনের ভেতর অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে৷ স্ট্রোক ভেবেই তক্ষুনি ওর সঙ্গে গেলুম৷ এক দঙ্গল রোগী ছিল৷ তারাও দৌড়ে গেল৷ আর আপনার পয়লা নম্বর সাসপেক্ট আমার শ্যালক পুঁটেও৷’
‘ফিরে এলেন ক’টা নাগাদ?’
‘চেম্বারে ঢুকেই ঘড়ি দেখেছিলুম—আমি এসব ব্যপারে খুব পার্টিকুলার৷ তখন একটা-পঞ্চান্ন৷ পুলিশ আসার পর স্টেটমেন্ট দিয়ে তবে ফিরে এসেছিলুম৷’
‘তাহলে ওইসময় চেম্বারে আপনি ছিলেন না দেখা যাচ্ছে৷’
ডাঃ বক্সী খিক খিক করে হাসলেন৷—‘আমিও ছিলুম না, পুঁটেও না৷’
‘আপনার কম্পাউণ্ডারবাবু ছিলেন নিশ্চয়ই?’
‘হুঁ৷ ছিল৷ তার হাতে তখন একগাদা প্রেসক্রিপশান৷’
কম্পাউণ্ডারবাবু ফিরে এলেন৷ কর্নেল তাঁকে বললেন, ‘আসুন, আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে৷’
ডাঃ বক্সী আবার হেসে ভুঁড়ি দোলাতে দোলাতে বললেন, ‘খুব জমেছে৷ সাসপেক্ট নাম্বার থ্রি৷ খগেন, সাবধান বাবা!’
কর্নেল বললেন, ‘আপনার পুরো নামটা কী কম্পাউণ্ডারবাবু?’
কম্পাউণ্ডার ভদ্রলোকের বয়স বছর পঁয়ত্রিশ হবে৷ রোগা, লম্বাটে গড়ন৷ পোড়খাওয়া চেহারা৷ দেখলে মনে হয়, যেন আস্ত মৃত মানুষ৷ খুক করে কেশে নির্বিকার মুখে বললেন, ‘আজ্ঞে খগেন্দ্রচন্দ্র অধিকারী৷’
‘থাকেন কোথায়?’
‘এখানেই৷ দুটো বাড়ির পরে—ঝিলের ধারে৷’
‘ডাক্তার বক্সীর কাছে কতদিন হল?’
খগেনবাবু বিড়বিড় করে হিসেব করে বললেন, ‘তা বছর দশেক হয়ে গেল৷’
‘নন্দবাবু খুন হবার দিন যখন ডাক্তারবাবুকে কৈলাস ডেকে নিয়ে গেল, তখন আপনি তো এ-ঘরে ছিলেন?’
‘পাশের ঘরে—ওই যে পার্টিশনের ওধারে কম্পাউণ্ডিং রুমে৷’
‘এ-ঘরে কেউ ছিলেন?’
‘ডাক্তারবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পরে?’
‘হ্যাঁ’৷
‘নাঃ৷’
‘ডাক্তারবাবু ফিরে আসার আগে কেউ ঢুকেছিলেন? কোনো রোগী?’
‘নাঃ৷ ঢুকলে দেখতে পেতুম৷ পেশেন্টরা তো বাইরের ঘরে অপেক্ষা করে৷’
‘আপনি আগরপাড়া এক্সচেঞ্জে কলকাতার লাইন চেয়ে ফোন করেছিলেন?’
জবাব দিতে দেরি হল৷ কারণ ডাক্তার বক্সী ফোঁস করে উঠলেন সঙ্গে-সঙ্গে৷ ‘দেখছ? এ-জন্যেই ফোনের বিলের অঙ্ক দেখে চোখ ছানাবড়া হয় মাঝে মাঝে! খগেন, উইদাউট পারমিশন ফোন করবে না কোথাও—একশোবার বলেছি না? রোসো, তোমার মাইনের থেকে ট্রাঙ্ককলের খরচা কাটছি এ মাসে!’
খগেনবাবু একটুও উত্তেজিত হলেন না৷ শান্তভাবে বললেন, ‘আমি ফোন করিনি৷’
ডাক্তার বক্সী ধমক দিয়ে বললেন, ‘আলবাৎ করেছ! জানো ইনি মস্ত ডিটেকটিভ? ইনি না জেনেশুনে কক্ষনো বলছেন না৷ তুমি ছাড়া ফোনে হাত দেবার সাধ্যি কারুর নেই৷’
খগেনবাবুর কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করলুম না৷ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন৷ কর্নেল বললেন, ‘ও-কথা থাক৷ আচ্ছা খগেনবাবু, নন্দবাবুর সঙ্গে আপনার কেমন সম্পর্ক ছিল?’
এবার ডাক্তার বক্সীর মুখে আগের মতো হাসি ফুটল৷ মাথা নেড়ে বললেন, ‘হল না! ঢিল ফস্কে গেল৷ নন্দ আর খগেনের গলাগলি ভাব, ছোটোবেলা থেকে৷ খগেন ম্যাট্রিকেই ফেল করে পড়া ছেড়েছিল৷ নন্দ বি এস সি পাস করেছিল৷ কিন্তু তাতে ওদের ভাব ঘোচেনি৷ বুজম ফ্রেণ্ড! অতএব খগেন আর তিন নম্বর সাসপেক্ট হতে পারল না৷’
‘খগেনবাবু, নন্দবাবু আপনার বন্ধু ছিলেন তাহলে?’
খগেনবাবু আস্তে মাথাটা দোলালেন৷
‘ওইদিন খুব সকালে নন্দবাবু কলকাতা গিয়েছিলেন জানেন তো?’
খগেনবাবু তাকালেন ঠান্ডা চোখে৷
‘যাবার আগে আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল?’
খগেনবাবু তেমনই তাকিয়ে রইলেন৷
‘আপনাকে নন্দবাবু নিশ্চয়ই বলেছিলেন, কেন কলকাতা যাচ্ছেন বা কার কাছে যাচ্ছেন?’
খগেনের চোখমুখে একই নির্বিকার ভঙ্গি৷ ডাঃ বক্সী খচে গিয়ে বললেন, ‘মলো ছাই! একেবারে যে বোবা হয়ে গেলে খগেন? —সাসপেক্ট হয়ে যাচ্ছ কিন্তু, সাবধান!’
কর্নেল বললেন, ‘উঠি ডাক্তারবাবু৷ খগেনবাবু, অজস্র ধন্যবাদ৷’
কফির কথাটা কেন যেন ভুলে গেলেন ডাক্তার বক্সী৷ সম্ভবত ট্রাঙ্ককলের বাড়তি খরচ গচ্চা দিতে হবে বলে উত্তেজিত এবং খগেনকে বধ করার জন্য একলা পেতে চাইছিলেন৷
পথেই দেখা হল রঞ্জনের সঙ্গে৷ সে হন্তদন্ত আসছিল৷ বলল, ‘শিগগির আসুন৷ ঢিল পড়া শুরু হয়েছে৷’
আমার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল৷ যদি সেই কিম্ভূত ভয়ঙ্কর মুখটাকে আবার দেখতে পাই এবং সে আমাকে লক্ষ্য করেই ঢিল ছোঁড়ে? পকেটের অটোমেটিক রিভলবারটা ছুঁয়ে সাহস অর্জন করলুম৷
গিয়ে দেখি, প্রভাময়ী কিচেনে রান্নায় ব্যস্ত৷ ঢিল ছোঁড়ার ব্যাপারটা তাঁর গা সওয়া হয়ে গেছে বলে মনে হল৷ ধনেশবাবু জানলার রডের ফাঁকে মুখ চেপে প্যাটপ্যাট করে তাকাচ্ছেন৷ উঠোনে অনেকগুলো ছোট্ট ইটের কুচি পড়ে রয়েছে৷ রঞ্জন হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, ‘এক্ষুনি পড়বে আবার৷ একটু দাঁড়ান!’
বলার সঙ্গে সঙ্গে খুট খুট করে কয়েকটা ঢিল উঠোনে এসে পড়ল৷ আমার তো মনে হল পোড়ো মল্লিকবাড়ি থেকেই পড়ছে৷ কর্নেল চোখে বাইনোকুলার স্থাপন করেছেন সঙ্গে সঙ্গে৷ বটগাছের ডাল থেকে পোড়াবাড়ির ওপর পর্যন্ত দেখছেন বাইনোকুলারটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে— দূরত্ব অনুসারে৷ আবার কয়েকটা ঢিল পড়ল৷ কর্নেলের বাইনোকুলার ঘুরে মাথার ওপর বটের ডালের দিকে স্থির হল৷
তারপর বাইনোকুলার নামিয়ে আগের মতো গলায় ঝুলিয়ে রাখলেন৷ মুখে হাসি ফুটে উঠতে দেখলুম৷ জিগ্যেস করতে যাচ্ছি, উনি হঠাৎ জোরে হাততালি দিলেন বারকতক৷ দৃষ্টি মাথার ওপরকার বটগাছের দিকে৷ হাততালি দিতে দিতে মুখে শব্দও করছিলেন, ‘হুশ! হুশ! যাঃ যাঃ!’
কী একটা ঝটপট শব্দ হল ওপরে৷ তারপর দেখতে পেলুম, একটা ধূসর রঙের পায়রা ডালপালার ভেতর দিয়ে উড়ে গেল৷ কর্নেল অমনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন খিড়কির দরজা দিয়ে৷ ওঁকে অনুসরণ করে ঝিলের ধারে গিয়ে পড়লুম৷ আবার চোখে বাইনোকুলার রেখেছেন৷
কিন্তু আমি খালি চোখেই পায়রাটা দেখতে পাচ্ছিলম৷ চক্কর মেরে ওপরে যাচ্ছে, আবার নেমে আসছে—এই করে ঝিলের ওপারে গাছের ভেতর দিয়ে নেমে গেল৷
রঞ্জন এসে বলল, ‘কী ব্যাপার?’
কর্নেল বাইনোকুলারে ঝিলের ওপারটা দেখছিলেন৷ বললেন, ‘চলো৷ ফেরা যাক৷ ঢিলের রহস্য ফাঁস হয়েছে৷ দেখাচ্ছি চলো৷ তবে রঞ্জন, শিগগির একটা গাছে চড়তে জানা লোক দরকার৷’
রঞ্জন বলল, ‘চলুন৷ কৈলাসের ছেলেকে ডেকে আনছি৷’
বাড়িতে ঢুকে কর্নেল হাসলেন৷ ‘জয়ন্ত, তোমাকে বর্মার আরকানের জঙ্গলে গোপন ঘাঁটিতে ঢিল পড়ার ঘটনা বলেছিলুন, আশা করি মনে আছে৷ এখানেও একই ব্যাপার কতকটা৷’
‘ন্যাকড়ায় ঢিল বেঁধে কেউ ঝুলিয়ে রেখেছে নাকি?’
‘হ্যাঁ৷ ঢিলের প্রকাণ্ড পুঁটলি বলতে পারো৷ খালি চোখেও দেখা যাচ্ছে৷ এই দেখো, ডালপালার আড়ালে ওটা ঝুলছে৷ আর শিক্ষিত পায়রাটাকে রোজ দুপুরে ছেড়ে দেওয়া হয়৷ সে এসে ন্যাকড়া ঠোকর মেরে ছেঁড়ে আর কিছু ঢিল গড়িয়ে নিচের উঠোনে পড়ে৷’
কী আশ্চর্য বুদ্ধি! ‘পায়রাটা তো ঝিলের ওধারে গিয়ে নামল৷’
‘হ্যাঁ, সাধুবাবার আশ্রমে৷’
রঞ্জন কৈলাসের ছেলেকে ডেকে নিয়ে এল৷ কর্নেল তাকে ঢিলবাঁধা পুঁটলিটা দেখিয়ে নামিয়ে আনতে বললেন৷ সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে পুঁটলিটা নামিয়ে নিয়ে বাড়ি ঢুকল৷ প্রভাময়ী অবাক হয়ে বললেন, ‘কিন্তু এর উদ্দেশ্য কী?’
কর্ণেল বললেন, ‘ভূতের ভয় দেখানো৷’
II পাঁচ II
কিন্তু কেন ভূতের ভয় দেখানো, সে-কথা খুলে বললেন না কর্নেল৷ খাওয়ার সময় হয়েছিল৷ প্রভাময়ী আমাদের যত্ন করে খাওয়ালেন৷ তাঁর ধনজ্যাঠাকেও খাবার দিয়ে এলেন দরজার তলা দিয়ে৷ আমরা আঁচিয়ে উঠে দেখি, ধনেশবাবুরও খাওয়া সারা৷ শুনলুম, ঘরের ভেতর জলের বালতি আছে৷ একটা ঘুলঘুলি দিয়ে জল বেরিয়ে যাওয়ার নর্দমাও আছে৷ স্নান, হাতমুখ ধোয়া, খাওয়া—এসব ব্যাপারে ওঁর কোনো পাগলামি নেই৷ নন্দবাবু ঘরের ভেতরেই সব ব্যবস্থা রেখে গেছেন৷ সেইসব বজায় রাখা হয়েছে৷ এখন উনি চিরুণি বের করে চুল আঁচড়াচ্ছিলেন৷ একমুখ খোঁচা খোঁচা গোঁফদাড়ি৷ তাতেও চিরুণি বুলিয়ে চিরুণিটা ট্যাঁকে গুঁজলেন৷ তারপর হঠাৎ ইশারায় আমাকে ডেকে বললেন, ‘অ্যাই পাগল, শুনে যা!’
ভয়ে ভয়ে জানলার কাছে গেলুম৷ তখন চোখ নামিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ রে, তুই পাগল, না আমি পাগল?’
বললুম, ‘আজ্ঞে আমিই পাগল৷’
‘ওই দাড়িওলা বুড়োটা কে রে? খালি আমাকে কাকাতুয়ার কথা জিগ্যেস করে?’
‘উনি একজন বিখ্যাত ডিটেকটিভ৷’
খি খি করে হেসে বললেন, ‘টিকটিকি! মরবে রে, মরবে৷ ওকে তুই বলিস’—বলে ইশারায় আরও কাছে ডেকে ফিসফিস করলেন, ‘বলিস, হিপিচিকি কিলিকিলি ক্রুট ক্রুট গিঃ! বলবি তো? বলিস যেন লক্ষ্মীটি৷’
‘বলব৷’
‘অ্যাই পাগল! গান শুনবি?’
‘হুঁ!’
ধনেশবাবু হেঁড়ে গলায় ছড়ার সুরে গান গাইলেন:
‘যাসনে বাপু একলা
ঠিক দুকুর বেলা
ভূতে মারবে ঢেলা
প্রাণটি নিয়ে পালা, ওরে প্রাণটি নিয়ে পালা’...
তারপর মুখে বাজনা জুড়ে দিলেন: ‘ফিলিকিলি কিলিকিলি... খট ঘট ভট ভট কট কট ... হিপিচিকি হিপিচিকি... ট্র্যাঁও ট্র্যাঁও ক্রুট ক্রুট গিঃ!’
হাসতে হাসতে সরে এলুম এ-ঘরের বারান্দায়৷ কর্নেল ঢিলবাঁধা ন্যাকড়াটা পরীক্ষা করছিলেন৷ সেটা গেরুয়া রঙের৷ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘কর্নেল! সাধুবাবাই কি—’
কর্নেল চোখ কটমটিয়ে তাকাতে থেমে গেলুম৷ রঞ্জন ও প্রভাময়ীও আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ বেগতিক দেখে বললুম, ‘মানে সাধুবাবা প্রেতসিদ্ধ তান্ত্রিক নন তো?’
প্রভাময়ী বললেন, ‘হ্যাঁ৷ মহা সিদ্ধপুরুষ৷’ উনি কপালে হাত ঠেকালেন৷ রঞ্জন মুচকি হাসল শুধু৷ প্রভাময়ী ফের বললেন, ‘আমি স্বচক্ষে দেখেছি, উনি হাত বাড়িয়ে শূন্য থেকে প্রসাদী ফুল পেড়ে বিলোন৷ সেইসব দেখেই তো নন্দের অত ভক্তি হয়েছিল৷ আরও আশ্চর্য ব্যাপার, নন্দকে স্টেশনে দেখামাত্র ডেকে ওর ছেলেবেলার কথা, ধনজ্যাঠার পাগল হওয়ার কথা—সব ঠিকঠাক বলে দিয়েছিলেন৷’
কর্নেল বললেন, ‘আপনার ধনজ্যাঠাকে নিয়ে আসার পর সাধুবাবার সঙ্গে নন্দবাবুর দেখা হয়েছিল তো?’
‘হ্যাঁ৷ ধনজ্যাঠা এলেন ১৮ নভেম্বর রাত্তিরে৷ পরদিন দুপুরে বাড়িতে ঢিল পড়া শুরু হল৷ তার দু’দিন পরে নন্দ কলকাতা যাচ্ছিল৷ আগরপাড়া স্টেশনে সাধুবাবার সঙ্গে দেখা৷ সঙ্গে করে নিয়ে এল৷ সাধুবাবা বাইরের ঘরে এক সপ্তাহ ছিলেন৷ ততদিনে নন্দ পাড়ার ভক্তদের নিয়ে ঝিলের ওপরের জমিতে আশ্রমের ঘর বানিয়ে দিয়েছিল৷’
‘সাধুবাবাকে দেখে আপনার ধনজ্যাঠার পাগলামি বেড়েছিল, না কমেছিল?’
‘খুব বেড়ে গিয়েছিল৷ কিছুতেই সাধুবাবার সামনে তাঁকে বসানো যায়নি৷ আঁচড়ে কামড়ে অস্থির করেছিলেন৷ আর অশ্রাব্য গালাগালির কথা বলতে নেই৷ তখন সাধুবাবাই বললেন, ‘ওঁকে কোমরে শেকল বেঁধে ঘরে বন্দি করে রাখো৷ ওঁকে এক সাংঘাতিক প্রেতে পেয়েছে৷ যে-সে প্রেত নয়, কয়লাখনির প্রেত৷ ওঁকে ঘরবন্দি না করলে তোমাদের মেরে ফেলবেন৷ এ-কথা শুনেই নন্দ ওঁকে অমনি করে—’
কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, ‘তাহলে সাধুবাবার কথাতেই ওঁকে বন্দি রাখা হয়েছে?’
‘সাধুবাবার কথাও বটে, আবার ওঁর পাগলামিও তো ভীষণ বেড়েছিল৷ ভাঙচুর করে বেড়াচ্ছিলেন৷ এমন কী সাধুবাবার দিকে আচমকা বঁটি ছুঁড়ে মেরেছিলেম৷ ভগবান ব্রহ্মহত্যার পাতক থেকে রক্ষা করেছেন৷ বঁটিটা লাগেনি গায়ে৷’
কর্নেল কী বলতে যাচ্ছেন, হঠাৎ কী একটা শোঁ করে এসে প্রভাময়ীর মাথার পাশ দিয়ে ঠকাস করে বারান্দার থামে বিঁধল—কিন্তু বিঁধে রইল না, তক্ষুনি পড়ে গেল৷ খানিকটা পলেস্তারা খসে পড়ল৷ কর্নেল বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে পকেট থেকে রিভলবার বের করে পোড়ো-বাড়ির দোতলার দিকে গুলি ছুঁড়লেন৷ তারপর দৌড়ে গেলেন খিড়কির দরজা খুলে৷
বড়োজোর দু’সেকেন্ডের মধ্যে এটা ঘটে গেল৷ আঁতকে উঠে দেখলুম, একটা ইঞ্চি ছ-সাত লম্বা ছোট্ট পালক বসানো তির পড়ে রয়েছে থামের কাছে৷ রঞ্জন দম আটকানো গলায় বলে উঠল, ‘সর্বনাশ! এই তো সেই তিরটা! কাকাবাবুর গলায় ঠিক এমনই তির বিঁধে থাকতে দেখেছিলুম৷’
সূচের মতো ফলার তিরটা আমি রুমালে জড়িয়ে ফেললুম৷ তারপর আমার রিভলবারটা বের করে দৌড়ে গেলুম কর্নেলের খোঁজে৷ রঞ্জনও আমার পেছনে পেছনে গেল৷ গিয়ে দেখি, কর্নেল ঝোপের আড়ালে বসে হাঁটু গেড়ে৷ এক হাতে রিভলবার, অন্য হাতে চোখে বাইনোকুলারটা ধরে ঝিলের দিকে কী দেখছেন৷
আমাদের সাড়া পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নন্দবাবুর দিদি জোর বেঁচে গেছেন৷ বিষাক্ত তিরের লক্ষ্য ছিলেন উনিই৷ শয়তানটার সাহস এত বেড়ে গেছে যে দিনদুপুরেই হামলা করতে ভয় পায় না—অথবা মরিয়া হয়ে উঠেছে৷ যাই হোক, রঞ্জন, একটা কথা শোনো৷ এখনই তুমি পিসিমাকে নিয়ে কলকাতায় তোমাদের বাড়ি চলে যাও৷ হ্যাঁ—তুমিও নিরাপদ নও৷ এ-বাড়ি আমরা দু’জনে পাহারা দিচ্ছি৷ আজ রাতে না হোক, কাল সন্ধ্যার মধ্যেই শয়তানটাকে ধরে ফেলব৷’
রঞ্জন ভয় পাওয়া গলায় বলল, ‘কিন্তু পাগল ঠাকুর্দা থাকবেন যে?’
‘উনি আমার ফাঁদের টোপ হবেন, রঞ্জন৷ চলো—আমিও তোমার পিসিমাকে বুঝিয়ে বলছি৷’
যেতে যেতে বললুম, ‘যদি পথে বা কলকাতায় গিয়ে ওঁদের কোনো বিপদ হয়?’
কর্নেল জোর গলায় বললেন, ‘হবে না৷ শয়তানটা চাইছে যে এ-বাড়িতে যেন কেউ বাস না করে৷’
‘কেন?’
কর্নেল আমার কথার জবাব দিলেন না৷ বাড়ি ঢুকে প্রভাময়ীর কাছে কথাটা তুললেন৷ অনেক বোঝানোর পর প্রভাময়ী রাজি হলেন৷ তখনই বাড়ির চাবি-টাবি কর্নেলকে বুঝিয়ে দিয়ে রঞ্জনের সঙ্গে উনি রওনা হলেন৷ সঙ্গে কিছু দরকারি জিনিসপত্রও নিয়ে গেলেন৷
পাগল ধনেশবাবু তেমনই জানলার রডের ভেতর দিয়ে দুটো পায়ের খানিকটা গলিয়ে দু হাতে রড আঁকড়ে বসে কিলিকিলি করছিলেন৷ কর্নেল তাঁর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, ‘কী ধনেশবাবু, কাল রাতে সাধুবাবা আপনার কাছে কাকাতুয়া চাইতে এসেছিলেন বুঝি?’
ধনেশবাবু খি খি করে হেসে বললেন, ‘বলব কেন রে বুড়ো? যা—যা৷ পালিয়ে যা, মারা পড়বি৷ হিপিচিকি কিলিকিলি করবে!’
কর্নেল ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘হিপিচিকি কিলিকিলি করবে? সে এখন কোথায়?’
‘খট খট ভট ভট কট কট ট্র্যাঁও ট্র্যাঁও করছে৷ ক্রুট ক্রুট গিঃ৷ ব্যস, খেল খতম!’
কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘এসো জয়ন্ত, আমরা সাধুবাবাকে দর্শন করে আসি৷’
ধনেশবাবু লাফালাফি করে বললেন, ‘যাস নে রে, যাস নে৷ মারা পড়বি! অ্যাই বুড়ো! আবার যায়? যাঃ চ্চলে! আমার কী?’
বাড়ির সব ঘরে তালা দিয়েই গেছেন প্রভাময়ী৷ সদর দরজা কর্নেল ভেতর থেকে বন্ধ করেছেন৷ খিড়কি দিয়ে আমরা বেরলুম৷ ঝিলের ধারে যেতে যেতে হঠাৎ কর্নেল থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর পিছু ফিরে মল্লিকদের পোড়োবাড়ির দিকে তাকিয়ে কী দেখতে লাগলেন৷ বললুম, ‘কী ব্যাপার?’
কর্নেল কাকে ইশারায় ডাকছিলেন এবার৷ দেখলুম, পোড়োবাড়ির ভেতর থেকে কৈলাসের সেই ছেলেটা বেরিয়ে আসছে৷ কাছে এলে কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘ওখানে কী করছিলে তুমি?’
ছেলেটা ফিক করে হেসে হঠাৎ দৌড়ে পালিয়ে গেল ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে৷ কর্নেল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর বললেন, ‘আশ্চর্য তো!’
ঝিলটা বেশ লম্বা৷ অনেকটা ঘুরে আমরা ওপারে গেলুম৷ ওপারটায় জঙ্গল খুব ঘন৷ অনেকটা জঙ্গল অবশ্য সাফ করা হয়েছে৷ একদল ছেলেমেয়ে কাটা ঝোপঝাড় আবর্জনা সাফ করছে৷ আরেকদল মাটি কুপিয়ে সম্ভবত ফুলবাগান তৈরি করছে৷ বড়ো একটা চালাঘরে ভক্ত বসে আছে কয়েকজন৷ সাধুবাবা গাঁজার ছিলিমে টান দিয়ে বললেন, ‘চলা যা কৈলাসমে বাবা হরহর শংকরকা পাশ৷’ দেখলুম, ছিলিমটা বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেল৷
আমি ও কর্নেল সতরঞ্জির একপাশে বসে পড়লুম৷ কর্নেলের দেখাদেখি প্রণামও করতে হল৷ সাধুবাবা আমাদের গ্রাহ্যও করলেন না৷ চোখ বুজে মৃদু-মৃদু ধোঁয়া ছাড়ছেন নাক দিয়ে৷ দাড়ি জটাজুটে সেই ধোঁয়া ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে৷ একটু পরে চোখ খুলে এবং কপালে তুলে শিবের উদ্দেশেই বললেন, ‘ব্যস৷ আভি পরসাদ দিজিয়ে বাবা হরহর শংকর!’
হাত বাড়ালেন এবং অবাক হয়ে দেখলুম, সেই ছিলিম হাতে এসে গেছে শূন্য থেকে৷ টান দিয়ে ফের সুদূর কৈলাস পর্বতে বাবা শংকরকে ছিলিম পাঠিয়ে দিলেন৷ ভক্তরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে!
এ জীবনে কত অদ্ভুত অদ্ভুত ম্যাজিক দেখেছি৷ কিন্তু এমন ম্যাজিক দেখিনি!
হঠাৎ কর্নেল আমাকে চিমটি কেটে উঠে পড়লেন৷ আমিও উঠলুম৷ সাধুবাবা বা তাঁর ভক্তরা আমাদের দেখেও দেখলেন না৷ বুঝলুম, আমাদের চাইতে কত হোমরাচোমরা ভক্তের আনাগোনা শুরু হয়েছে আশ্রমে৷ আমরা কোন ছার৷
কর্নেল একটা বটগাছের তলায় গিয়ে একটু হেসে বললেন, ‘নন্দবাবু সাধুবাবাকে নিশ্চয়ই ভূতুড়ে ঢিলপড়ার কথা বলে থাকবেন৷ সাধুবাবা নাকি প্রেতসিদ্ধ৷ কাজেই ভূতের উৎপাত দমনের প্রতিশ্রুতিও দিয়ে থাকবেন৷ তবে সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকলে সমস্যা কঠিন হয়৷’
‘সাধুবাবাকে এখনো পুলিশে ধরিয়ে দিচ্ছেন না কেন?’
‘ডার্লিং, সাধুবাবা আসল লোক নয়৷ সে একজনের হুকুমে কাজ করছে৷ যতক্ষণ আসল লোকটাকে খুঁজে বের না করতে পারছি, ততক্ষণ সাধুবাবাকে ধরা বিপজ্জনকও৷ কারণ সাধুবাবার গায়ে আগে হাত পড়লে ভক্তদের সে ক্ষেপিয়ে দেবে আমাদের বিরুদ্ধে৷ ভক্তদের মধ্যে প্রভাবশালী লোকও থাকতে পারে৷ পুলিশকে তারা প্রভাবিত করবে৷ মাঝখান থেকে আমি পড়ব আরও সমস্যায়! কাজেই—’
হঠাৎ কর্নেল ঝিলের অন্য পারে নন্দবাবুর বাড়ির দিকে বাইনোকুলারে কী দেখতে থাকলেন৷ তারপর বললেন, ‘আরে! খগেনবাবু ওখানে ঘুরঘুর করছেন কেন? এসো তো দেখি৷’
আমরা এবার ঝিলের অন্যপ্রান্ত ঘুরে ওপারে গেলুম৷ খগেনবাবু আমাদের দেখতে পেয়েই হনহন করে উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করলেন৷ কর্নেল ডাকলেন, ‘খগেনবাবু! খগেনবাবু! শুনুন—শুনুন৷’
খগেনবাবু একবার ঘুরে ঠোঁটে আঙুল রেখে ইশারায় চুপ করতে বলে একটা বাড়িতে ঢুকে পড়লেন৷ আমরা খিড়কির দরজা দিয়ে বাড়ি ঢুকেই চমকে উঠলুম! সেই মুখ! বীভৎস জান্তব অমানুষিক মানুষের ধূসর মুখ৷ শীতের বেলা পড়ে এসেছে৷ বাড়িটার ওপর বটগাছের ঘন ডালপালা থাকায় এমনই ছায়া জমে থাকে সারাক্ষণ৷ এখন আবছা আঁধার বলে মনে হচ্ছিল৷ ধনেশবাবুর ঘরের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট একটা দু’ঠেঙে প্রাণী৷ সে আমাদের দিকে মুখ ঘুরিয়েছে—আমরাও থমকে দাঁড়িয়েছি৷
তারপর রিভলবার বের করে তেড়ে গেলুম৷ সঙ্গে সঙ্গে কর্নেল ‘আঃ, কী করছ জয়ন্ত?’ বলে আমাকে পেছন থেকে ধরে ফেললেন৷ প্রাণীটা ভয় পেয়েছে কি? সে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে৷
আমাকে অবাক করে কর্নেল এগিয়ে গেলেন হাসতে হাসতে৷ তারপর এক ঝটকায় কী একটা টেনে নিলেন—সঙ্গে সঙ্গে দেখি, ওটা একটা মুখোশ এবং মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়েছে কৈলাসের সেই গাছেচড়া ছেলেটা!
সে কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, ‘হামি কুছ নেহি কিয়া সাব! পাগলাবাবুকা সাথ মস্করা করতা থা৷’
কর্নেল বললেন, ‘এটা কোথায় পেলে?’
‘উও মল্লিকদালানকা অন্দর৷’
ছেলেটা এক দৌড়ে পালিয়ে গেল৷ এবার ধনেশবাবুকে খুঁজলুম৷ জানলায় তিনি নেই৷ উঁকি মেরে দেখি, ঘরের কোণায় গুড়ি মেরে লুকিয়ে আছেন৷ বললুম, ‘চলে আসুন ধনেশবাবু! আপনার হিপিচিকি পালিয়ে গেছে৷’
ধনেশবাবু ভয়ার্ত মুখে বললেন, ‘ওরে বাবা! আমি যাব না৷’
কর্নেল এসে মুখোশটা দেখিয়ে বললেন, ‘ভয়ের কারণ নেই ধনেশবাবু৷ এটা একটা মুখোশ৷ এই নিন, আপনিই এটা পরুন৷’
মুখোশটা ফেলে দিলেন জানলা গলিয়ে৷ ধনেশবাবু সেটার দিকে একটু তাকিয়ে থাকার পর নিশ্চিন্ত হয়ে ওটা তুলে নিলেন৷ তারপর খিখি করে হেসে বললেন, ‘আমি পরি?’
‘হ্যাঁ পরুন৷’
ধনেশবাবু মুখোশটা পরে লম্ফঝম্ফ শুরু করলেন৷ আমাদের ভয় দেখানোর ভঙ্গি করতে থাকলেন৷ কর্নেল ততক্ষণে বারান্দার স্যুইচ টিপে আলো জ্বেলেছেন৷ প্রভাময়ীর ঘরে ধনেশবাবুর ঘরের স্যুইচ আছে৷ আলো জ্বালিয়ে দিলেন৷ ধনেশবাবু মুখোশ খুলে বললেন, ‘অ্যাই বুড়ো! দিলি তো মজাটা পণ্ড করে৷ ধুৎ!’
কর্নেল প্রভাময়ীর কাছে সব বুঝে নিয়েছিলেন৷ কিচেনে গিয়ে বললেন, ‘শীতে জমে যাচ্ছি জয়ন্ত! চায়ের দায়িত্বটা তুমি নাও৷ এই দেখো, কুকার আছে৷ জ্বালো৷ চা-চিনি-দুধ সব আছে৷ তিন পেয়ালা চা করে ফেলো ঝটপট৷ ততক্ষণ আমি খিড়কির দরজাটা বন্ধ করে আসি৷’
আমি কেরোসিন কুকার জ্বেলে কেটলি চড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছি, দেখি কর্নেলের সঙ্গে আসছেন খগেনবাবু—খিড়কির দিক থেকে৷ খগেনবাবু এসেই চাপা গলায় বললেন, ‘বেশিক্ষণ থাকব না৷ ডিসপেন্সারিতে যাবার সময় হয়েছে৷ তখন আমি আপনার খোঁজেই আসছিলুম কর্নেল! কিন্তু হঠাৎ চোখে পড়ল, ঝিলের ওপারে সাধুবাবার আশ্রমের নিচে ঝোপের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে পুঁটেবাবু৷ তাই চলে গেলুম৷’
কর্নেল বললেন, ‘বলুন খগেনবাবু, কী বলতে চান!’
খগেনবাবু ফিসফিস করে বললেন, ‘সাধুবাবার আশ্রমে গিয়ে একজন হিপিকে দেখলেন না?’
‘না তো!’
‘হিপিটাকে পরশু থেকে দেখছি, আশ্রমে আছে৷ ওর গতিবিধি সন্দেহজনক৷ আর একটা কথা বলি৷ নন্দ আমাকে বলেছিল, তার কোনো বিপদ হলে আপনাকে তক্ষুনি যেন খবর দিই৷ আপনার ঠিকানা ফোন-গাইড থেকে জোগাড় করেছিল৷ কাজেই ডাক্তারবাবুর ফোন-গাইড থেকে আপনার ফোন নাম্বার নিয়ে আপনাকে ফোন করেছিলুম৷’
‘তা আমি বুঝতে পেরেছিলুম আপনার হাবভাবে৷’
‘নন্দ আমাকে আর-একটা কথা বলেছিল৷ বোকামি করে খাল কেটে ঘরে কুমির ঢুকিয়েছে নাকি৷ মানে—ওই সাধুবাবার কথা৷ খুলে কিছু বলেনি৷ কিন্তু নন্দ যেন টের পেয়েছিল, তার বিপদ ঘটতে পারে৷ ইদানীং শুধু বলত, বাড়িটা বেচে দিতে হবে৷ এখানে আর থাকা যাবে না৷’
কর্নেল হঠাৎ বললেন, ‘আচ্ছা, আপনি জানেন, নন্দবাবুর বাবা কী করতেন?’
‘কোলিয়ারিতে চাকরি করতেন ধানবাদে৷ সেখানেই ওই ধনেশবাবুর সঙ্গে ওঁর বন্ধুত্ব হয়৷ উনি বলতেন বটে দূরসম্পর্কের দাদা, নন্দ আমাকে গোপনে বলেছিল, সম্পর্ক নেই৷ বাবার বন্ধু উনি৷’
‘নন্দবাবুর বাবা কোথায় মারা যান?’
‘ধানবাদেই৷’ খগেনবাবু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন৷ ‘এবার আমি যাই৷ দেরি হলে সন্দেহ করবে৷’
উনি ঝটপট উঠে গেলেন খিড়কির দিকে৷ কর্নেল বললেন, ‘কে সন্দেহ করবে?’
জবাব এল না৷ খগেনবাবু অদৃশ্য ততক্ষণে৷ কর্নেল খিড়কির দরজা বন্ধ করে এসে বললেন, ‘দেখো ডার্লিং, জল ফুটল নাকি৷’...
একটু পরে চা তৈরি হয়ে গেল তিন কাপ৷ কর্নেল এককাপ চা জানলায় ধনেশবাবুকে দিয়ে বললেন, ‘খান ধনেশবাবু!’
ধনেশবাবু খি খি করে হেসে বললেন, ‘বুড়ো তো বড্ড ভালো লোক দেখছি!’—অদ্ভুত চুকচুক শব্দে উনি চা খেতে থাকলেন৷
কর্নেল বারান্দার চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘তাহলে বুঝতে পারছ তো জয়ন্ত, রহস্যের সূত্রপাত ধানবাদে৷ দুই বন্ধু কোলিয়ারিতে চাকরি করতেন৷ একজন মৃত, অন্যজন পাগল৷ কিন্তু সূত্র বলতে একটা স্টাফ করা কাকাতুয়া৷ কী ছিল কাকাতুয়াটার ভেতর লুকোনো? কিছু মূল্যবান জিনিস ছিল—এই বাড়িটার সঙ্গে যার সম্পর্ক আছে৷ কাকাতুয়াটা ধনেশবাবুর স্যুটকেশে ছিল৷ নেই৷ নন্দবাবু সেটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?’
ধনেশবাবু বলে উঠলেন, ‘কিলিকিলি কিলিকিলি... খটখট ভটভট কটকট... হিপিচিকি হিপিচিকি... ট্র্যাঁও ট্র্যাঁও ক্রুট ক্রুট-গিঃ!’
কর্নেল আনমনে বললেন, ‘হিপিচিকি কিলিকিলি!’
বললুম, ‘কর্নেল৷ খগেনবাবু একজন হিপির কথা বললেন না? ধনেশবাবু কি সেই ব্যাপারেই কিছু বলছেন? হিপিচিকি কিলিকিলি করবে৷ হিপি কিল করবে! তার মানে—’
কর্নেল বললেন, ‘জয়ন্ত, তুমি বুদ্ধিমান৷ কাকাতুয়ার ব্যাপারটা তোমার কথাতেই মাথায় ঢুকেছিল৷ যাইহোক, দেখা যাক ব্যাপারটা কোথায় পৌঁছুচ্ছে!’
II ছয় II
‘পরের ধনে পোদ্দারি’ একেই বলে৷ কিচেনে চাল ডাল আলু ডিম ঘি, সবকিছুই ছিল৷ শীতের রাতে খিচুড়ি ডিমভাজা দারুণ জমে গিয়েছিল৷ কিন্তু মনে আতঙ্ক নিয়ে পেটপুরে খাওয়া কঠিন৷ ধনেশবাবুই সাবাড় করেছিলেন আদ্ধেকটা৷ কপাটের তলা দিয়ে আমি সাপ্লাই চালিয়ে গেছি৷
রঞ্জন যে ঘরে ছিল, সেটাই নন্দবাবুর ঘর৷ কর্নেল ও আমি ওই ঘরে প্রকাণ্ড খাটে শুয়ে পড়লুম৷ তার আগে লক্ষ্য করলুম, ধনেশবাবু তেমনই ছেড়াখোঁড়া পাঞ্জাবি গায়ে দিব্যি জানলায় আগের মতো বসে আছেন৷ ওঁর যেন শীতবোধই নেই৷ অথচ ভেতরে খাটিয়া বিছানা কম্বল সবই আছে৷
কর্নেল বললেন, ‘ঘুমিও না জয়ন্ত! এমন আরামে ঘুম আসতেই পারে৷ কিন্তু আমরা খিচুড়ি খেয়ে ঘুমোবার জন্য এখানে আসিনি৷’
চেষ্টা করছিলুম জেগে থাকতে৷ কিন্তু কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কে জানে৷ হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল ধনেশবাবুর চেঁচামেচিতে৷ ‘বাপরে! গেলুম রে!’ করে বিকট চেঁচাচ্ছেন৷ একলাফে উঠে বসে দেখি, কর্নেল ঘরে আলো জ্বেলে দিয়ে দরজা খুলছেন৷ হাতে রিভলবার৷
বেরিয়ে গিয়ে শুনি, ধনেশবাবু জানলায় বসে পেছনে ঘুরে কী দেখছেন, আর ‘বাপরে’ বলে চেঁচিয়ে উঠছেন৷ ওঁর ঘরে সারারাত আলো জ্বলে৷ কর্নেল উঁকি মেরে দেখে বললেন, ‘সর্বনাশ! এ শীতের সময় সাপ কোত্থেকে এল?’ তারপর রিভলবার থেকে গুলি ছুড়লেন জানলার ভেতর দিয়ে৷ নিঝুম রাতে শব্দটা প্রচণ্ড শোনাল৷
কর্নেল বললেন, ‘মারা পড়েছে৷ কিন্তু আরে!’
‘কী কর্নেল ?’
‘ওটা তো দেখছি রবারের সাপ! ঘুলঘুলি দিয়ে কে ঢুকিয়ে দিয়েছে!’
উঁকি মেরে দেখলুম, তাই বটে৷ রিভলবারের গুলিতে সাপের মাথা ফেটে ভেতরকার বাতাস বেরিয়ে গেছে৷ নকল সাপটা ন্যাকড়া হয়ে পড়ে আছে৷
ধনেশবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে সাপটা দেখছিলেন৷ এবার খি খি করে হেসে সাপটাকে তুলে ছিঁড়তে শুরু করলেন৷ মুখে ‘হিপিচিকি কিলিকিলি’ বুলি৷
বাকি রাত আর কিছু ঘটল না৷ ভোরের দিকে ঘুমিয়ে গেছি৷ ঘুম ভেঙে দেখি, কর্নেল অভ্যাসমতো প্রাতঃভ্রমণে গিয়েছিলেন৷ টুপিতে মাকড়সার জাল, দাড়িতে শুকনো কাঠি লেগে রয়েছে৷ ঝোপঝাড়ে ঢুকেছিলেন, বোঝা গেল৷
বললেন, ‘হিপিদর্শন করে এলুম ডার্লিং৷ খগেনবাবু যার কথা বলেছিলেন৷’
‘আশ্রমে গিয়েছিলেন নাকি?’
‘হ্যাঁ৷ ভোরবেলা থেকে একদফা প্রার্থনা হয় দেখলুম৷ এত শীতেও ভক্ত জোটে দেখে অবাক লাগল৷ ডাক্তার বক্সী, তাঁর শ্যালক পুঁটেবাবুও হাজির৷ প্রার্থনা শেষ হলে এক কাণ্ড!’
‘কী?’
কর্নেল হাসলেন৷ ‘ডাঃ বক্সী সাধুবাবার এখন প্রধান পৃষ্ঠপোষক৷ আশ্রমের উদ্যোক্তা৷ হিপি এসে আশ্রমে জুটুক, এ তিনি চান না৷ হিপিটিপি চলবে না৷ সাধুবাবা তাঁকে খুব বোঝালেন৷ কিন্তু ডাঃ বক্সীর এক কথা, হিপি না তাড়ালে এ আশ্রমের পেছনে তিনি বা কল্যাণপুরবাসীরা থাকবেন না৷ তার ফলে উদয় হাজরার লোকেরা দু’দিনেই আশ্রম ভেঙে দেবে৷ সাধুবাবাকে পাততাড়ি গুটিয়ে পালাতে হবে৷ তাই বাবা বললেন, ঠিক হ্যায় বেটা৷ উসকো হাম ভাগা দেতা৷ এই বলে হিপিটাকে বললেন, যা বেটা৷ তু ভাগ যা৷ হিপিটা গজরাতে গজরাতে চলে গেল৷
‘হিপিটা কোন দেশের জানতে পেরেছেন কি?’
‘আমি তার সঙ্গ নিলুম৷ ভাব করার চেষ্টা করলুম৷ কিন্তু প্রথমে পাত্তা দিলে না৷ তখন মোক্ষম অস্ত্রটি ঝাড়লুম৷ বললুম, মিঃ রনি জ্যাকসন! আমি তোমায় চিনি৷ অমনি চমকে গেল৷ বলল, তুমি কে? তখন নিজের পরিচয় দিয়ে বললুম, তুমি আমার সাহায্য পাবে৷ দক্ষিণ আমেরিকার বারবাডোস আইল্যাণ্ডের সরকার ভারত সরকারকে অনুরোধ করেছেন, তাঁদের রানির হারানো মুকুট উদ্ধারের জন্য যেন তাঁদের গোয়েন্দাদের সাহায্য করা হয়৷ ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় তদন্ত-ব্যুরো কিছুকাল চেষ্টা করেও মুকুটের কোনো হদিশ করতে না পেরে আমার শরণ নেন৷ আমিও নানা সূত্রে অনুসন্ধান করে ব্যর্থ হচ্ছিলুম৷ হঠাৎ সেদিন নন্দবাবু গিয়ে হাজির৷ তারপর রঞ্জনের কাছে ওই তিরটার কথা জানতে পেরেই আমার সন্দেহ হয়েছিল৷ এ সেই মুকুটের ব্যাপার নয় তো?’
হাঁ করে শুনছিলুম৷ বললুম, ‘আপনার পেটে পেটে এতসব ব্যাপার ছিল, আমাকে বলেননি৷’
কর্নেল কিচেনের দিকে পা বাড়িয়ে বললেন, ‘বারবাডোসের গোয়েন্দা রনি জ্যাকসনকে মুখোমুখি না দেখা পর্যন্ত আমার কাছে সবটাই সন্দেহের স্তরে ছিল, জয়ন্ত৷ তাই বলিনি তোমাকে৷ কেন্দ্রীয় তদন্ত-ব্যুরো আমাকে রনি জ্যাকসনের কথা বলে রেখেছিলেন, যাতে আমি ওঁকে প্রয়োজনে সাহায্য করি৷ কিন্তু রনি ভেবেছিল, সে নিজেই কাজটা পারবে৷ তবে তার বাহাদুরি আছে, জয়ন্ত৷ সূত্র ধরে খুঁজতে খুঁজতে একেবারে সঠিক জায়গায় এসে পড়েছে৷’
‘রনি গেলেন কোথায়?’
‘ওকে কলকাতায় গ্র্যাণ্ড হোটেলে গিয়ে অপেক্ষা করতে বললুম৷ ও কলকাতা চলে গেল৷’
কর্নেল কিচেনে কুকার জ্বেলে চা করতে ব্যস্ত হলেন৷ আমি বাথরুম সেরে এলুম৷ দেখলুম, ধনেশবাবু জানলায় বসে আপনমনে খিখি করে হাসছেন৷ বললেন, ‘কী রে? চা দিবিনে? খুব যে গুপুরগাপুর করে বেড়াচ্ছিস তোরা৷ হিপিচিকি হিপিচিকি... ক্রুট ক্রুট... গিঃ৷ বুঝলি তো?’
একটু পরে চা পেয়ে খুব খুশি হয়ে চুকচুক করে অদ্ভুত ভঙ্গিতে খেতে লাগলেন৷ তারপর কর্নেলকে ডাকলেন, ‘অ্যাই বুড়ো, শুনে যা৷’
কর্নেল বললেন, ‘কাকাতুয়ার খবর না পেলে কিছু শুনব না ধনেশবাবু৷’
‘যা, যা৷ গঙ্গাধরকেই বলিনি তো তুই কোন লাটের পো রে?’
‘গঙ্গাধর কে ধনেশবাবু? বললে কিন্তু আজ প্রচুর খিচুড়ি খাওয়াব রাতের মতো৷’
‘খিচুড়ি না৷ মাংসভাত৷’
‘বেশ তাই৷ এখনই জয়ন্তকে মাংস আনতে পাঠাচ্ছি৷’
ধনেশবাবু নাক চুলকে বললেন, ‘থাক৷ নন্দর অশৌচ৷ কাল রাত্তিরে ভুল করে ডিম খেয়ে ফেলেছি৷ থাক, আজ নিরিমিষই দে৷’
‘দেব৷ গঙ্গাধর কে?’
ধনেশবাবু চোখ ঘুরিয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে রডের ফাঁকে মুখ চেপে রেখে ফিসফিস করে বললেন, ‘জি ডি রায়৷ আমার মাসতুতো ভাই৷ সাউথ অ্যামেরিকায় রফতানির কারবার ছিল৷ বুঝলি তো? পেল্লায় বড়ো একটা কাকাতুয়া এনেছিল ব্রাজিলের জঙ্গল থেকে৷ কিন্তু মরা কাকাতুয়া৷ এনে আমাকে বললে, ধনদা, এটা লুকিয়ে রাখো৷ ও চলে যাবার দিনকতক পরে আমার বাড়ি ডাকাত ঢুকল৷ আমার স্ত্রী, ছেলে অমু...
ফোঁস ফোঁস করে নাক ঝেড়ে বৃদ্ধ পাগল বললেন ফের, ‘আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না রে৷ কিন্তু প্রাণটা খুব শক্ত৷ বেরোয় না যে৷’
‘তারপর কী হল ধনেশবাবু?’
‘কাকাতুয়াটা খুঁজতেই ঢুকেছিল৷ না পেয়ে ওদের খুন করে ডাকাতগুলো পালিয়েছিল৷ কাকাতুয়াটা আমি নন্দের বাবার কাছে রেখে এসেছিলুম আগের দিন৷ কেন জানিস? ওজনে ভারী দেখে সন্দেহ হয়েছিল৷ পেটের সেলাই খুলে দেখি, ওরে বাবা! মণিমুক্তো বসানো ছোট্ট একটা সোনার মুকুট৷ নন্দের বাবা আমার বন্ধু৷ সে বলল, এক কাজ করো৷ মুকুটটার দাম না জানি কত কোটি টাকা হবে৷ এটা আমরা সামলে দিই৷ তার কথায় লোভে পড়ে গেলুম৷ কাকাতুয়ার পেটে পাথর ভরে আগের মতো সেলাই করে রাখা হল৷ মুকুটটাও রাখতে বললুম নন্দের বাবা ভুজঙ্গকে৷ আমি সাহস পেলুম না৷ তো তারপর আমার বাড়িতে ডাকাতি—তারপর আর জ্ঞানগম্যি ছিল না৷ কিচ্ছু মনে পড়ে না৷’
‘কাকাতুয়াটা আপনার বাড়ি থেকেই কিন্তু নন্দবাবু নিয়ে এসেছিলেন গত মাসে৷’
‘তাহলে ভুজঙ্গ ওটা ফেরত দিয়ে থাকবে আমাকে৷ মনে নেই৷’
‘গঙ্গাধরবাবু আর ওটা নিতে আসেননি?’
‘এলেও আমার খেয়াল নেই৷’
‘বুঝতে পারছি৷ গঙ্গাধরবাবু ওটা নিতে এলেও ফেরত পাননি৷ ফেরত দেবার মতো স্বাভাবিক অবস্থা আপনার ছিল না৷ আপনি তখন সম্ভবত অসুস্থ এবং রাঁচির হাসপাতালে ছিলেন৷’
ধনেশবাবু এতক্ষণ বেশ সুস্থ মানুষের মতো কথাবার্তা বলছিলেন৷ এবার হঠাৎ পাগলামি ভর করল৷ খি খি করে হেসে সেই কাকাতুয়া মন্ত্র আওড়াতে শুরু করলেন৷ ‘রাঁচি’ কথাটা শুনেই বুঝি এ ভাবান্তর৷
কর্নেল পরে এসে বললেন, ‘তাহলে মুকুটটা এই বাড়িতেই কোথায় লুকিয়ে রেখে গিয়েছিলেন নন্দবাবুর বাবা৷ কাকাতুয়াটির পেটে পাথর ভরা হয়েছিল৷ কাজেই কাকাতুয়াটা নন্দবাবু ফেলে দিতেও পারেন৷ কিন্তু মুকুটটা কোথায় লুকোনো আছে, তাঁর বাবা তাঁকে নিশ্চয়ই বলে থাকবেন৷’
বললুম, ‘এই তো খুঁজে দেখার সুযোগ তাহলে৷ আসুন না, খুঁজে দেখি৷’
কর্নেল বললেন, ‘নন্দবাবুর দিদি আমাকে সব চাবি দিয়ে গেছেন৷ খুঁজে দেখার অসুবিধে নেই৷ কিন্তু অমন জিনিস কি ভুজঙ্গবাবু আলমারি বা বাক্সে রাখতে সাহস পাবেন? তাঁর বন্ধুর বাড়ি ডাকাতির কারণ নিশ্চয়ই ওই মুকুট৷ গঙ্গাধরের কোনো শত্রুপক্ষ টের পেয়েছিল বোঝা যাচ্ছে৷ কাজেই বন্ধুর ওই সর্বনাশ দেখার পর জিনিসটা আরও গোপন জায়গায় রাখতে পারেন৷ এখন কথা হচ্ছে, মুকুটটা কোথায় লুকোনো আছে, নন্দবাবুকে তাঁর বাবা বলেছিলেন কিনা৷’
‘নন্দবাবুকে নিশ্চয়ই বলে থাকবেন৷ কারণ নন্দবাবু জানতেন বলেই হয়তো খুন হয়েছেন!’
‘তোমার কথায় যুক্তি আছে৷ কিন্তু একই যুক্তিতে তাহলে তাঁর দিদিও জানেন—তাই তাঁকেও খুন করার জন্য বিষাক্ত তির ছোঁড়া হয়েছিল কাল৷’—কর্নেল মাথা নেড়ে ফের বললেন, ‘না জয়ন্ত! প্রভাময়ী জানলে আমাকে খুলেই বলতেন৷ নন্দবাবু হয়তো মুকুটটার কথা জানতেন, কিন্তু কোথায় আছে তা জানতেন না৷ মনে করে দেখো, খগেনবাবু বলছিলেন, ভুজঙ্গবাবু ধানবাদে মারা যান৷ নন্দবাবু তখন এখানে৷ কাজেই—’
হঠাৎ নড়ে উঠলেন কর্নেল৷ ‘জয়ন্ত, মৃত্যুর আগে কি ভুজঙ্গবাবু চিঠিপত্রে বা নোটবইতে ছেলেকে ইঙ্গিতে মুকুটটার সন্ধান দিয়ে যেতে পারেন না?’
‘খুব পারেন৷’
‘তাহলে এসো, ওঁর চিঠিপত্র বা নোটবই পাওয়া যায় নাকি দেখি৷’...
আমরা সব ঘরের বাক্স-পেঁটরা আলমারি তন্ন তন্ন করে খুঁজলুম৷ ভুজঙ্গবাবুর লেখা একটা পোস্টকার্ড পাওয়া গেল৷ নোটবই পাওয়া গেল একটা৷ কিন্তু নোটবইতে খালি বাজার খরচ লেখা৷ কয়েকটা ঠিকানা লেখা৷ পোস্টকার্ডটায় শুধু কুশল প্রশ্ন৷ বাড়ি মেরামতের কী হল, এইসব৷
কর্নেল এবার দেয়ালের ছবি সরিয়ে পেছনটা খুঁজতে শুরু করলেন৷ পেরেক টেনে দেখলেন৷ কোনো সূত্র পাওয়া গেল না৷ সব যথাস্থানে আগের মতো গুছিয়ে রেখে কর্নেল বারান্দায় বসে চুরুট টানতে থাকলেন৷ চোখ বোজা৷ অভ্যাসমতো দাড়ি একটা একটা করে টানছেন৷ পাগল ধনেশবাবু কাকাতুয়া মন্ত্র পড়ে যাচ্ছেন৷ এই সময় সদর দরজার কড়া নড়ল৷
গিয়ে খুলে দিলুম৷ ডাক্তার অমরেন্দ্র বক্সী নমস্কার করে বললেন, ‘গুড মর্নিং সাংবাদিকমশাই! ডিটেকটিভ কর্নেলসায়েব কই?’— ভেতরে ঢুকে চোখ নাচিয়ে কর্নেলকে বললেন, ‘গুড মর্নিং স্যার! তখন যেন আশ্রমে আপনাকে দেখলুম৷ প্রার্থনা সেরে দেখি, আপনি চলে গেছেন৷ কী? কদ্দূর এগোলেন? নন্দের হত্যারহস্যের কিনারা হল?’
কর্নেল বললেন, ‘আসুন, আসুন ডাঃ বক্সী! এক্ষুনি ভাবছিলুম, আপনার কাছে আড্ডা দিতে যাব৷’
‘কী সৌভাগ্য!’— বসলেন ডাঃ বক্সী৷— ‘তা আপনাদের বুঝি বাড়ি পাহারায় রেখে প্রভাদি কেটে পড়েছেন? অবশ্য পড়ারই কথা৷ রহস্যের পর রহস্য জমে উঠছে৷’—খ্যা খ্যা করে হাসতে লাগলেন৷
ধনেশবাবু তুম্বো মুখ করে ডাক্তারবাবুকে দেখছিলেন৷ হঠাৎ বললেন, ‘এই ডাক্তার না ফাক্তার! একটু ঘুমের ওষুধ দিবি আমাকে? দে না মাইরি! একটু ঘুমুতে পারলে বেঁচে যাই!’
ডাঃ বক্সী একটু হাসলেন৷ ‘আর ওই এক বেচারা! নন্দকে আমি বললুম, ওনাকে গোবরা মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি করে দিয়ে এসো৷ আজ কাল করে ফেলে রাখল৷ দেখি, আমাকেই উদ্যোগী হয়ে তাই করতে হবে৷’
ধনেশবাবু লম্ফঝম্ফ জুড়ে দিলেন৷ ‘ইট মারব বলে দিচ্ছি! আমাকে মেন্টাল হসপিটালে পাঠাবি? আমি কি পাগল? তুই পাগল৷ তোর বাবা পাগল৷ তোর সাতগুষ্টি পাগল!’
ডাঃ বক্সী বললেন, ‘সেয়ানা পাগল৷ বুঝলেন তো? সব বোঝে কিন্তু৷’
কর্নেল বললেন, ‘আপনার শ্যালক ভদ্রলোক কী করছেন?’
ফিক করে হাসলেন ডাঃ বক্সী৷—‘সাসপেক্ট নাম্বার ওয়ান? আছে৷ দিদির বাড়ি এলে সহজে নড়তে চায় না৷ ওদিকে দোকান লাটে উঠছে হয়তো৷ সেসব ব্যাপারে খেয়াল নেই৷’
কর্নেল বললেন, ‘আচ্ছা ডাঃ বক্সী, পুলিশ তো উদয় হাজরাকে গ্রেফতার করেছে খুনের দায়ে৷ আপনার কী ধারণা বলুন এ সম্পর্কে?’
ডাঃ বক্সী গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘সেই কথাটাই তো আপনাকে বলতে এসেছি৷ আপনি আসল লোকটাকে ছেড়ে মিছিমিছি পণ্ডশ্রম করছেন৷ উদয়ই খুন করিয়েছে৷ এখন আমার ভয় হচ্ছে, সে জামিন পেলে বাড়ি ফিরে এবার আমাকেও খতম করবে৷ একটা কথা বলি শুনুন৷ আজকালকার যুগে মশাই ওইসব বিদেশি বিষ জোগাড় করাটা খুব সহজ ব্যাপার৷ স্মাগলাররা বিদেশি ড্রাগ পাচার করে আনছে না, বলুন?’
‘ঠিক বলেছেন!’
‘উদয় স্মাগলারদের কাছে ওই সাংঘাতিক নাতেমা বিষ সি এল ও-৫১ জোগাড় করেছিল৷’
‘কিন্তু তির?’
‘তির-টির আমি দেখিনি৷ রঞ্জন ছেলেমানুষ৷ ওর কল্পনা এটা৷’ ডাঃ বক্সী মাথা নেড়ে বললেন, ‘তির বিঁধলে আমি দেখতে পেতুম না? ইনজেকশান করা হয়েছিল আচমকা৷’
‘পুলিশও তাই বলছে৷ কিন্তু—’
‘ইনজেকশানের নিডলটা একটু মোটা, এই যা৷ শুনলুম মর্গের রিপোর্টেও তাই বলা হয়েছে৷’
‘কিন্তু ডাঃ বক্সী, ইনজেকশান নয়৷ মুখোস পরে ঝোপের আড়াল থেকে ছোট্ট একটা বিষ মাখানো তিরই ছোঁড়া হয়েছিল৷ তিরটা সৌভাগ্যক্রমে আমি উদ্ধার করেছি৷’
‘অ্যাঁ!’ —বলে ডাঃ বক্সী চোখ ছানাবড়া করলেন, ‘কই, দেখি, দেখি!’
কর্নেল ঘর থেকে তাঁর কিটব্যাগ খুলে আমার রুমালে জড়ানো তিরটা নিয়ে এলেন৷ বললেন, ‘ছোঁবেন না৷ বিষ মাখানো আছে৷’
ডাঃ বক্সী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখে বললেন, ‘সর্বনাশ! কিন্তু এত ছোটো তির ছুঁড়ল কী করে? ধনুক যদি ওই মাপের হয়, তাহলে তো দশহাতের বেশি তির পৌঁছুবে না৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘এ তির ধনুক থেকে ছোঁড়া হয় না, ডাঃ বক্সী৷ রেড ইণ্ডিয়ানরা ছোঁড়ে ব্লো-গান থেকে৷ তা হল একটা লম্বা বাঁশের নল৷ তার মাথায় বসিয়ে উল্টোদিকে জোরে ফুঁ দিলে তিরটা বিশ গজ পর্যন্ত জোরে ছুটে যায়৷’
‘কী সর্বনাশ! এই কল্যাণপুরে রেড ইণ্ডিয়ান এসেছে? অসম্ভব মশাই, একেবারে অসম্ভব!’
‘না৷ রেড ইণ্ডিয়ান আসেনি৷ এটা ব্লো-গান থেকেও ছোঁড়া হয়নি৷ ছোঁড়া হয়েছে বিশেষ এক ধরনের পিস্তল থেকে৷ সংরক্ষিত জঙ্গলে জন্তুদের অসুখের চিকিৎসা করতে এ ধরনের পিস্তল বা বন্দুক থেকে ঘুমের ইজেকশান ছোঁড়া হয়, জানেন তো?’
ডাঃ বক্সী আঁতকে উঠে বললেন, ‘ওরে বাবা! তাহলে আমি কী করব? আশ্রমের ব্যাপারে উদয়ের পক্ষের লোকেরা যে আমারও শত্রু হয়ে গেছে৷ কর্নেল, আমায় বাঁচান! আর যে কলে বেরুতেও সাহস হচ্ছে না৷ এখনই বাড়ি ফিরতে ভয় হচ্ছে৷’
কর্নেল ওঁকে সাহস দিয়ে বললেন, ‘আপনার ভয় নেই৷ উদয়বাবু তো এখন পুলিশের হাজতে৷ এখন তাঁর দলের লোকেরা কিছু করতে সাহস পাবে না৷’
ডাঃ বক্সী উঠে পড়লেন৷ তারপর ধুপ ধুপ করে পা ফেলে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে চলে গেলেন৷ আমি এতক্ষণ হাসি চেপে রেখেছিলাম৷ হাসতে হাসতে বললুম, ‘এরকম ভীতু লোক দেখা যায় না তো!’
II সাত II
ডাঃ বক্সী বেরিয়ে যাবার পর কর্নেল হঠাৎ একটু নড়ে উঠলেন৷ তারপর জিভ কেটে কপালে হাত চাপড়ে বললেন, ‘ডার্লিং, সত্যি আমার বাহাত্তুরে ধরেছে এতদিনে৷ নইলে... কী আশ্চর্য!’
হন্তদন্ত ঘরে ঢুকে আবার কী সব খুলে নাড়াচাড়া করে বেরিয়ে এলেন৷ হাতে সেই পোস্টকার্ডটা৷ বললেন, ‘মার্জিনে লেখা এই লাইনটা পড়ে তখন কিছু টের পাইনি৷ ডাক্তার বক্সীকে দেখেই মনে পড়ে গেল৷ নন্দবাবুর বাবা ভুজঙ্গবাবু কার্ডের মার্জিনে ‘পুনশ্চ’ দিয়ে লিখেছেন: গোবিন্দকে জিগ্যেস করে আসবে, কবে সে আসছে আমার এখানে৷ বুঝলে কিছু?’
‘একবর্ণও না৷ গোবিন্দ আবার কে? তার সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক?’
‘জয়ন্ত, ডাঃ বক্সীর শ্বশুরের নাম ছিল ডঃ গোপালগোবিন্দ রায়৷ জাদুঘরের কিউরেটর, বিখ্যাত ঐতিহাসিক এবং চৌরঙ্গীর রয় কিউরিওসের মালিক৷ এরই মধ্যে ভুলে গেলে কথাটা?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ ডাঃ বক্সীই তো বলছিলেন৷’
‘তাহলে বোঝা যাচ্ছে, ডাঃ বক্সীর শ্বশুরমশাইকে গোপনে ভুজঙ্গবাবু মুকুটটা বেচতে চেয়েছিলেন৷ যে কারণেই হোক, ডঃ রায়ের ধানবাদ যাওয়া হয়নি৷ তাঁর মৃত্যুর পর গতবছর তাঁর ছেলে প্রেমাংশু ওরফে পুঁটেবাবু ধানবাদে গিয়েছিলেন—’
‘সে তো ডাঃ বক্সীই নিয়ে গিয়েছিলেন পুঁটেবাবুকে৷ অন্তত ডাঃ বক্সী তাই বলছিলেন৷’
‘যে যাকেই নিয়ে যাক, ডা. রায়ের ছেলের ধানবাদ যাওয়ার ব্যাপারটা কেন যেন জড়িয়ে যাচ্ছে কেসটার সঙ্গে৷’
‘হ্যাঁ; তা ছাড়া পুঁটেবাবুর সন্দেহজনক গতিবিধি৷ একবারও মুখোমুখি তাঁর দর্শন পেলুম না৷ কাল খগেনবাবু বললেন, ঝিলের ওধারে আশ্রমের পেছনের ঝোপে দাঁড়িয়ে ছিলেন৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘এবং বিশেষ করে নন্দবাবুর ডেডবডি পুঁটেবাবু চিত করে দিয়েছিলেন, তারপর রঞ্জন তিরটা আর দেখতে পায়নি৷’
উৎসাহী হয়ে বললুম, ‘তাহলে আর দেরি করা উচিত নয় কর্নেল৷ পুলিশকে বলুন পুঁটেবাবু আর সাধুবাবাকে গ্রেফতার করতে৷ দু’জনেই চক্রান্ত করে—’
আমার কথা শেষ হল না৷ মল্লিকদের পোড়োবাড়ির দোতলা থেকে একটা কালো হুলো বেড়াল মুখে সাদা প্রকাণ্ড কী পাখি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ সেই মুহূর্তে সেই দোতলার ভাঙা জানলায় কৈলাসের ছেলেকে দেখতে পেলুম৷ তার হাতে ইটের টুকরো৷ ‘শালে বিল্লি!’—বলে ইটটা গদাম করে ছুঁড়ল বেড়ালটার দিকে৷ অমনি বেড়ালটা সাদা পাখিটাকে ফেলে দিয়ে খিড়কির দিকের পাঁচিল ডিঙিয়ে পালিয়ে গেল৷
কর্নেল দৌড়ে গিয়ে পাখিটাকে কুড়িয়ে নিলেন৷ বললুম, ‘মুর্গিটা বেঁচে আছে তো?’
কর্নেল বললেন, ‘মুর্গি নয় জয়ন্ত, একটা স্টাফ করা কাকাতুয়া৷’
চমকে উঠলুম৷ ‘কী কাণ্ড! সেই কাকাতুয়াটা নাকি?’
‘আবার কোনটা?’
কৈলাসের ছেলে সদর দরজা দিয়ে দৌড়ে ঢুকে বলল, ‘এ বাবুসাব৷ মেরা চিড়িয়া দিজিয়ে!’
কর্নেল বললেন, ‘এটা কোথায় পেলে বলো তো?’
‘উও বাগানমে পড়া থা৷’
কর্নেল পকেট থেকে একটা পাঁচ টাকার নোট ওকে দিয়ে বললেন, ‘এ মরা চিড়িয়া নিয়ে কী করবে বাপু? একটা জ্যান্ত পাখি কিনে নিও৷’
ছেলেটা খুশি হয়ে নাচতে নাচতে চলে গেল৷ ধনেশবাবু হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন৷ বিকট চেঁচিয়ে বললেন, ‘মিল গেয়া৷ মিল গেয়া! হিপিচিকি হিপিচিকি ব্রুট ব্রুট গিঃ!
কাকাতুয়াটার পেটের দিকের ট্যানকরা চামড়া লম্বালম্বি চেরা৷ সেলাইয়ের চিহ্ন রয়েছে৷ কেউ ছিঁড়ে সেই পাথরগুলো ফেলে দিয়েছে৷
‘নন্দবাবুই কি বিরক্ত হয়ে ফেলে দিয়েছিলেন?’
প্রশ্ন করলুম কর্নেলকে৷
কর্নেল বললেন, ‘বিরক্ত না হয়েও ফেলে দিতে পারেন৷ যাইহোক, এটা ধনেশবাবুকে দিয়ে দেখি, উনি কী বলেন৷’
ধনেশবাবু পাখিটা যত্ন করে নিলেন৷ কিন্তু পরক্ষণে বিকট কেঁদে উঠলেন৷ ‘অলক্ষুণে সর্বনাশা পাখি! তোর জন্যই আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে৷ আমার বউ-ছেলেকে ডাকাতরা—ওঃ! তোকে আমি শেষ করে ফেলব৷’—
বলে পালকগুলো হিংস্রভাবে ছিঁড়তে শুরু করলেন৷ ছিঁড়ে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে ফেললেন৷ তারপর দু’হাতে মুখ ঢেকে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকলেন৷
দশাটা খুব করুণ৷ কর্নেল মুখ ফিরিয়ে চোখের জল মুছলেন৷ তারপর গলা ছেড়ে বললেন, ‘জয়ন্ত তুমি দেখো, কিচেনে কী আছে৷ না থাকলে মোড়ে গিয়ে রিকশো করে বাজারে যাও৷ আজকের দিনটা আর রাতটা আমাদের এ-বাড়িতে কাটাতেই হবে৷’
কিচেনে চাল, ডাল, আলু যথেষ্ট মজুত৷ রান্নায় লেগে গেলুম৷ কর্নেল আমাকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়ে বেরিয়ে গেলেন৷ সদর ও খিড়কির দরজা বন্ধ করে দিয়ে এলুম ভেতর থেকে৷ ধনেশবাবু তখনও মুখ ঢেকে বসে আছেন জানলার ধারে৷
বহুবার কর্নেলের সঙ্গে বন-জঙ্গল-পাহাড়ে গিয়ে বাধ্য হয়ে নিজেদের রেঁধে খেতে হয়েছে৷ তাই রান্নাটা বেশ রপ্ত করে ফেলেছি৷ ভাতটা চড়িয়েছি সবে, এমন সময় সদর দরজায় কড়া নড়ল৷ কর্নেল ফিরলেন ভেবে দরজা খুলে দিলুম৷
সঙ্গে সঙ্গে একটা অচেনা লোক ঢুকে দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল৷ তার হাতে রিভলবার৷ হিসহিস করে বলল, ‘টুঁ’ করলেই মরেছ! চলো, ঘরে ঢোকো!’
দুর্ভাগ্যক্রমে আমার পকেটে তখন রিভলবারটা নেই৷ বিছানায় বালিশের তলায় রাখা আছে৷ কেন যে ছাই কর্নেল যাওয়ার পর সাবধান হইনি!
লোকটা আমাকে প্রভাময়ীর ঘরে ঢুকিয়ে পকেট থেকে একহাতে নাইলনের দড়ি বের করল৷ তারপর আশ্চর্য কৌশলে একহাতে উদ্যত রিভলবার, অন্যহাতে এবং মুখের সাহায্যে একটা ফাঁস তৈরি করল৷ ফাঁসটা সে আমার মাথা গলিয়ে ঢোকাল৷ আমার পেটে রিভলবারের নল ঠেকিয়ে রেখেছে৷ কিছু করার নেই৷ ফাঁসে আমার দু হাত ও ধড়টা টেনে বাঁধল সে৷ তারপর এক ধাক্কায় আমাকে মাটিতে ফেলে দিল৷
এবার সে আমাকে উপুড় করে যথেচ্ছ বেঁধে ফেলল৷ তারপর চিত করে আমার মুখে এক টুকরো টেপ এঁটে দিয়ে চাপা স্বরে বলল, ‘নড়লেই মারা পড়বে৷ সাবধান৷’
দু মিনিটের মধ্যে এটা ঘটে গেল৷ এবার সে ঘরের দরজা বন্ধ করে বাইরে থেকে হাঁসকল টেনে আটকাল৷ নড়ার চেষ্টা করে দেখলুম, অসম্ভব৷ আমাকে আগাগোড়া জড়িয়ে বেঁধেছে—পা পর্যন্ত৷ কর্নেলের অপেক্ষায় পড়ে থাকা ছাড়া উপায় রইল না৷
এরপর বাইরে ধনেশবাবুর চিৎকার শুনতে পেলুম৷ ‘গঙ্গাধর! তোর জন্য আমার এত সর্বনাশ! আয় তোকে দেখাচ্ছি মজা৷’
তাহলে এই সেই গঙ্গাধর রায়? বারবাডোস দ্বীপ থেকে রানির মুকুট চুরি করে এনেছিল এই লোকটাই৷ ধনেশবাবুর মাসতুতো ভাই৷
গঙ্গাধরের চাপা গর্জন শুনলুম৷ ‘জিনিস কোথায়? ঠক! জোচ্চোর! আমার জিনিস কোথায়?’
‘এই দেখ, তোর কাকাতুয়া হারামজাদার দশা! তুই কাছে আয় না, তোকেও আমি ওইরকম ছিঁড়ে ফেলব৷ আয়, কাছে আয়!’
‘হাতে এটা কী দেখছ?’
‘যা, যা৷ পিস্তল-টিস্তল আমি ভয় করি নে৷’
‘আমার জিনিস কোথায়? বলো শিগগির!’
‘হুঁ, সেদিন রাত্তিরে তাহলে তুই এসে আমাকে চুপিচুপি কাকাতুয়া চাইছিলি?’
‘না৷ আমি এই প্রথম আসছি৷’
‘এই নে তোর কাকাতুয়া—খি খি খি খি!’
‘হেসো না৷ তুমি জানো, নন্দ কোথায় লুকিয়ে রেখে গেছে আমার জিনিস৷ বলো শিগগির!’
‘জানি না৷ জানলেও বলতুম না৷ তুই আমার সর্বনাশের মূলে, গঙ্গাধর৷ ওঃ! আমার সোনার সংসার, আমার বউ-ছেলে—ও হো হো!’
‘কান্না রাখো ধনদা! এক মিনিট সময় দিচ্ছি, না বললে—’
হঠাৎ দুমদাম দমাস খটাস দড়বড়, এইসব শব্দ হতে থাকল৷ ধুপ ধুপ করে কেউ দৌড়ে যেন পালিয়ে গেল৷ তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ৷ তারপর ধনেশবাবুর বিকট হাসি শুনতে পেলুম—‘হ্যা হ্যা হ্যা হ্যা! পালিয়ে গেল! গঙ্গু পালিয়ে গেল! দুয়ো!’
খগেনবাবুর মুখ দেখতে পেলুম এ ঘরের জানলায়৷ দেখেই বললেন, ‘কী সর্বনাশ! হাঁসকল টেনে দরজা খুলে আমার বাঁধন খুলে দিলেন৷ মুখের টেপটা গোঁফে বেজায় এঁটে গেছে৷ ইশারায় ওঁকে থামিয়ে বাইরে গেলুম৷ কিচেন থেকে জল নিয়ে ঘষে ঘষে তুলে ফেললুম৷
খগেনবাবু বললেন, ‘আজ জ্বরের ভান করে ডিস্পেন্সারিতে যাইনি৷ আমার বাড়িটা ঝিলের ধারে—আশ্রমের উল্টোদিকে৷ লক্ষ্য রেখেছিলুম৷ হঠাৎ দেখি এই লোকটা আশ্রমের পেছনের ঝোপ দিয়ে বেরিয়ে ঝিলের ধারে ধারে দৌড়ুচ্ছে৷ তারপর লক্ষ্য করলুম, কর্নেল সায়েব আশ্রমের চত্বরে দাঁড়িয়ে আছেন৷ লোকটা কি তাহলে কর্নেলের ভয়েই পালাচ্ছে? কে ও? এইসব ভাবতে ভাবতে দেখি, সে রাস্তা ঘুরে নন্দের বাড়ির দিকে যাচ্ছে৷ তখন বাগানের ভেতর দিয়ে এসে মল্লিকদের দোতলায় উঠলুম৷ উঁকি মেরে দেখি, পিস্তল হাতে নিয়ে ধনজ্যাঠাকে শাসাচ্ছে৷ আর সহ্য হল না৷ ইটপাটকেল ছুঁড়তে শুরু করলুম৷ খগেনবাবু হাসতে হাসতে আরো বললেন, ‘ব্যাটার মাথা ফাটিয়ে দিয়েজি৷ রক্ত বেরুচ্ছে!’
বললুম, ‘ওর নাম গঙ্গাধর রায়৷ ধনেশবাবুর মাসতুতো ভাই৷’
‘তাই বুঝি? কিন্তু লোকটাকে আমার খুব চেনা লাগল৷ কোথায় যেন দেখেছি৷’
‘আশ্রমে নয় তো?’
খগেনবাবু চমকে উঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ৷ জয়ন্তবাবু, এ ব্যাটাই সাধুবাবা৷ নকল দাড়ি পরচুলোর জটা পরে থাকে৷ তাই মুখটা চেনাচেনা লাগছিল৷’
ইতিমধ্যে কর্নেল এসে গেলেন৷ খগেনবাবুকে দেখে বললেন, ‘এই যে খগেনবাবু! কতক্ষণ?’ তারপর উঠোনে ইটপাটকেল দেখে অবাক হয়ে বললেন, ‘সর্বনাশ! আবার ভূতের উৎপাত নাকি?’
সংক্ষেপে ঘটনাটা বললুম৷ বাকিটা খগেনবাবু বললেন৷ কর্নেল আমাকে একটু বকাবকি করলেন৷ সাবধানে থাকতে বলে গিয়েছিলেন, আমি থাকিনি৷
খগেনবাবু বললেন, ‘আর দেরি নয় কর্নেল! এখনই ভণ্ড সাধুকে ধরিয়ে দিন৷ নয় তো আমিই থানায় যাচ্ছি৷’
‘একটু অপেক্ষা করুন, খগেনবাবু! একেবারে ফাঁদে ফেলে এই কেসের সব লোককে আমি ধরিয়ে দিতে চাই৷’
‘সাধুবাবা পালিয়ে যাবে না তো?’
‘না৷ ফাঁদ পাততেই আমি আশ্রমে গিয়েছিলুম৷ সেখান থেকে আরেক জায়গায়৷ যাই হোক, আশা করছি, আজ রাতেই ওরা ফাঁদে পা দেবে৷’
আমি বললুম, ‘খগেনবাবু আমাদের সঙ্গে থাকুন৷ খাওয়াদাওয়া করুন৷ কী বলেন কর্নেল?’
কর্নেল বললেন, ‘খগেনবাবু, তাহলে নেমন্তন্ন গ্রহণ করুন জয়ন্তের৷’
খগেনবাবু বললেন, ‘আপত্তি নেই৷ বাড়িতেও আমি একা থাকি৷ হাত পুড়িয়ে রেঁধে খাই৷’
‘তাহলে জয়ন্তের সঙ্গে লেগে যান৷’...
বিকেলে একবার কর্নেল বেরিয়েছিলেন৷ যথারীতি আমাকে সাবধান করে দিয়ে গিয়েছিলেন৷ তার দরকার ছিল না৷ আমি ঠেকেই শিখেছি৷ তাই সব সময় অস্ত্রটি হাতের নাগালে রেখে খগেনবাবুর সঙ্গে গল্প করে সময় কাটালুম৷ ধনেশবাবু এ-বেলা একটু শান্ত যেন৷ মাঝে মাঝে নিঃশব্দে কাঁদছেন৷ গঙ্গাধরকে দেখেই কি ওঁর স্মৃতি ফিরে আসছে? ছদ্মবেশী সাধুবাবা গঙ্গাধরকে চিনতে পারার কথা নয় ওঁর৷ তখন পাগলামির ঝোঁকটাও বেশি ছিল৷ তাকে এতদিনে পরিচিত চেহারায় দেখে মনে ধাক্কা লেগে গেছে৷ স্মৃতির জট হয়ত খুলে গেছে৷
কর্নেল ফিরলেন ছ’টা নাগাদ৷ তখন শীতের বেলা ফুরিয়ে আঁধার নেমেছে৷ ঝিলের দিকে ঘন কুয়াশা জমেছে৷ আজ শীতটাও যেন বেড়ে গেছে৷ রাতে খগেনবাবু লুচি আলুর দম করে খাওয়ালেন৷ কিন্তু ধনেশবাবু দুপুরে বিশেষ খাননি, রাতে একেবারেই খেলেন না৷ চুপচাপ বসে রইলেন জানলার ধারে৷
নন্দবাবুর ঘরে দেয়ালঘড়িতে ঢং-ঢং করে রাত দশটা বাজল৷ খগেনবাবু আমাদের মুখের দিকে বারবার তাকাচ্ছেন৷ বুঝতে পারছেন না কী ঘটতে চলেছে৷ আমিও কিচ্ছু জানি না৷ কর্নেলের মুখটাও গম্ভীর৷
তারপর আস্তে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন৷ উঁকি মেরে দেখি, ধনেশবাবুর ঘরের তালা খুলে ঘরে ঢুকলেন৷ আঁতকে উঠে ভাবলুম, এই রে! পাগল ভদ্রলোক ওঁর গলা টিপে ধরলেই কেলেঙ্কারি!
কিন্তু আশ্চর্য, কিছু ঘটল না৷ একটু পরে দেখি কর্নেল ওঁর কোমরের শেকল খুলে দিয়েছেন এবং উনি কর্নেলের সঙ্গে বেরিয়ে আসছেন৷ কর্নেল ওঁকে আমাদের ঘরে বসিয়ে রেখে আবার বেরুলেন৷ ওই ঘরে গিয়ে কী সব করে তালা এঁটে বেরিয়ে এলেন৷
খগেনবাবু কী জিগ্যেস করতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, ‘চুপ’৷ তারপর দরজা বন্ধ করে দিলেন৷ আলোও নেভালেন৷ এবার আমার ভয় করতে লাগল৷ ঘরের ভেতর অন্ধকারে এক পাগল! বাইরের অজানা বিপদের চেয়ে এ বিপদটা কি সাংঘাতিক নয়?
সময় যেন থেমে গেছে৷ জানলার সামনে কর্নেল দাঁড়িয়ে আছেন—আবছা দেখতে পাচ্ছি৷ নিঝুম শীতের রাত ছমছম করছে যেন চাপা উত্তেজনায়৷ এগারোটা বাজল একসময়৷ উৎকণ্ঠায় আমি অস্থির৷
তারপর বাইরে ধুপ করে শব্দ হল৷ কে যেন ভারী পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে৷ তারপর চাপা খুটখাট কড়াৎ শব্দ৷ কে যেন তালা ভাঙল কোনো ঘরের৷ আস্তে কপাট খুলে যাওয়ার শব্দ৷
কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, ‘জয়ন্ত! খগেনবাবু! আমার সঙ্গে আসুন৷ সাবধান! আস্তে!’
দরজা নিঃশব্দে খুলে আমরা একে একে বারান্দায় গেলুম৷ ধনেশবাবুর ঘরটা অন্ধকার আজ৷ সেই ঘরের ভেতর চাপা শব্দে কেউ কিছু হাতড়ে বেড়াচ্ছে৷ একবার জানলা দিয়ে ক্ষীণ এক ঝলক আলো জ্বলে নিভে গেল৷ তারপর মাঝে মাঝে জ্বলল এবং নিভল৷ আবছা একটা ওভারকোট পরা মূর্তি ভেসে উঠছিল৷ উঠোনে ঘুরঘুট্টে অন্ধকার৷ একটু পরে উঠোনে নেমে এল লোকটা৷ তার সিল্যুট মূর্তি একটু থামল৷ এতক্ষণ অন্ধকারে আমার দৃষ্টি কিছু স্বচ্ছ হয়েছে৷ হঠাৎ দেখি, লোকটা ওদিকে স্যাঁৎ করে নিঃশব্দে সরে গেল কুয়োতলার কাছে৷ ওখানে একটা বাসকপাতার বেঁটে ঝোপ আছে৷ সেখানে সে অদৃশ্য হয়ে রইল৷
তার গা-ঢাকা দেওয়ার কারণ তখনই বুঝতে পারলুম৷ খিড়কির দিকে ধুপ করে শব্দ হল এবং আরেকটা আবছা মূর্তির উদয় হল৷ দ্বিতীয় লোকটাও প্রথম লোকটার মতো ধনেশবাবুর ঘরের দিকে এগিয়ে গেল৷
এবার কুয়োতলার ঝোপ থেকে প্রথম লোকটা পা টিপে টিপে এগিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল দ্বিতীয় লোকটার ওপর৷ চাপা গর্জন এবং ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল৷ বারান্দা থেকে দু’জনে ধস্তাধস্তি করতে করতে উঠোনে পড়তেই কর্নেল টর্চ জ্বেলে লাফিয়ে পড়লেন নিচে৷
যুদ্ধমান দুই মূর্তি হকচকিয়ে গেল৷ ঠিক সেই মুহূর্তে কিচেন থেকে কয়েকটা টর্চ জ্বলে উঠেছে এবং বুটের শব্দ৷ অবাক হয়ে দেখি, এক দঙ্গল পুলিশ কখন এসে কিচেনের ভেতর ওৎ পেতে বসে ছিল৷ কর্নেলেরই কারসাজি৷
কিন্তু উঠোনের লোকদুটোর একজনকে দেখে আমি হকচকিয়ে গেছি৷
ডাঃ অমরেন্দ্র বক্সী!
অন্যজন সেই গঙ্গাধর রায় ওরফে সাধুবাবা৷
পুলিশ অফিসার অবাক হয়ে বললেন, ‘সর্বনাশ! এর মধ্যে ডাক্তারবাবুও আছেন দেখছি যে!’
দু’জনের হাতে হাতকড়া পরানো হল৷ কর্নেল বললেন, ‘বেনামী চিঠি লিখে দু’জনকে ফাঁদে ফেলেছি৷ বারবাডোস দ্বীপের রানির মুকুটের জন্য দু’জনেই মরিয়া৷ চিঠি পেয়েই চলে এসেছেন৷ ওঁদের পকেট সার্চ করে দেখুন, চিঠি দুটো পেয়ে যাবেন৷’
পাওয়া গেল৷ দুটো চিঠিই হুবহু এক৷ ‘আজ রাত এগারোটায় ধনেশবাবুর ঘরে আসুন৷ বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছি, ওঁর ঘরেই ওঁর বিছানার তলায় মুকুট লুকোনো আছে৷ মুকুট পেলে প্রকাশ্যে দেখা করব৷ তখন বখশিস চাই৷’
কর্নেল বললেন, ‘গঙ্গাধরবাবু ওরফে সাধুবাবার হাতের বিশেষ ধরনের পিস্তলটা এখানেই কোথাও পড়ে গেছে ধস্তাধস্তির সময়৷ খুঁজে দেখতে বলুন সেপাইদের৷ তবে ডাঃ বক্সী সম্ভবত খালি হাতেই এসেছিলেন৷ কারণ ওঁর-পরে-আসা গঙ্গাধরবাবু রেহাই পেতেন না৷ ডাঃ বক্সীর নিশ্চয়ই ভয় ছিল গঙ্গাধরের পিস্তলটার জন্য—কারণ ওটা থেকে বিষাক্ত তির ছোঁড়া যায়৷ তাই অন্ধকারে লাফিয়ে ওঁর ওপর পড়ে ওই সাংঘাতিক অস্ত্রটা আগে হাতাতে চেয়েছিলেন৷ তাই না ডাঃ বক্সী?’
ডাঃ বক্সী মুখ নামিয়ে বললেন, ‘নন্দকে এই ব্যাটাই খুন করেছে৷ আমি কোনো দোষ করিনি৷’
‘করেননি বললে চলবে না ডাঃ বক্সী৷ আপনার বিরুদ্ধে হত্যার অস্ত্র লুকিয়ে ফেলার অভিযোগ আছে৷ সাধুবাবার সঙ্গে চক্রান্তের অভিযোগও আছে৷ শ্বশুরমশাইয়ের কাছে শুনে মুকুটটা কেনার উদ্দেশ্য নিয়েই আপনি ধানবাদ গিয়েছিলেন৷’
‘না৷ পুঁটে তার বাবার কাছে শুনে আমাকে বলেছিল৷ পুঁটের অত টাকা ছিল না৷ তাই আমি টাকা দিয়েই কিনতে গিয়েছিলুম৷ কিন্তু গিয়ে দেখি, ভুজঙ্গ মারা গেছে৷ নন্দ ওখানে শেষকৃত্য করতে উপস্থিত হয়েছে৷ নন্দ মুকুটের কথা জানে না৷ বলতে পারল না কিছু৷’
‘গঙ্গাধরের সঙ্গে আলাপ কিভাবে হল ডাঃ বক্সী?’
‘নন্দই চিনিয়েছিল৷ ওকে নন্দই এনেছিল৷ আমি জানতুম না ওর নাম গঙ্গাধর৷ পরনে সাধুর বেশ৷ পরে একদিন আশ্রমে চুপিচুপি সাধুবেশী বদমাশটা আমাকে সব কথা বলল৷ আমিও লোভের বলে ওকে সাহায্য করতে চাইলুম৷ তবে জিগ্যেস করুন ওকে, মুকুটটা উদ্ধার হলে আমি কিনে নেব বলেছিলুম কিনা৷’
কর্নেল হাসলেন৷ ‘পয়সা দিয়ে কেনায় চেয়ে বিনা পয়সায় পাওয়ার চেষ্টাও তো করেছিলেন!’
ডাঃ বক্সী চুপ করে থাকলেন৷
‘তা না হলে উড়ো চিঠি পেয়ে এভাবে এসে হানা দিতেন না’—কর্নেল পুলিশ অফিসারদের বললেন, ‘এই ঠান্ডায় আর ওঁদের কষ্ট দিয়ে লাভ নেই৷ যথাস্থানে নিয়ে যান৷’
এতক্ষণে পিস্তলটা খুঁজে পাওয়া গেল৷ ছিটকে ইটের পাঁজায় গিয়ে পড়েছিল৷ কর্নেল পরীক্ষা করে বললেন, ‘নাঃ! তির-টির নেই৷ ওই একটা তিরই ছিল৷ সেটা এখন আমার কাছে৷ পিস্তলে বিশেষ ধরনের লম্বা কার্তুজ ভরা আছে দেখছ৷ গঙ্গাধরবাবু দক্ষিণ আমেরিকা থেকে রেড-ইণ্ডিয়ানদের একটা মাত্র তির জোগাড় করে এনেছিলেন৷ সেই রক্ষা৷’
পুলিশবাহিনী বন্দিদের নিয়ে চলে গেলে খগেনবাবু বললেন, ‘কী আশ্চর্য, কী আশ্চর্য! আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ডাক্তারবাবু এর মধ্যে আছেন৷ আমি ভেবেছিলুম ওঁর শ্যালক পুঁটেবাবুই! কী অবাক!’
কর্নেল সদর দরজা বন্ধ করে এসে আলো জ্বেলে বললেন, ‘জয়ন্ত, খুব শীত৷ দেখো এক কাপ করে চা করতে পারো নাকি৷ না না৷ আর ভয় নেই৷ ঢিল পড়লে তো সেই দুপুর বেলা! তবে সাধুবাবা ওরফে গঙ্গাধরের পায়রাটা আজ কৈলাসের ছেলে চুরি করে এনেছে৷’
কিচেন থেকে চা করে এনে দেখি, ধনেশবাবু তেমনই বসে আছেন৷ দু’চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল ঝরছে৷ বুঝলুম, ওঁর পাগলামি সেরে যেতে আর দেরি নেই৷...
কিন্তু মুকুটটা কোথায়? কর্নেল কোনো সন্ধান পাননি তখনও৷
এ রাতে ধনেশবাবু নিজের ঘরে শুতে গিয়েছিলেন৷ খগেনবাবু অত রাতে বাড়ি চলে গেলেন৷ সকালে ধনেশবাবুকে চা দিতে গিয়ে দেখি, উনি বিছানায় একটা ছেঁড়া শিক বের হওয়া ছাতা নিয়ে বসে আছেন৷ খি-খি করে হেসে সেটা একটু খুললেন৷ আমি চমকে উঠলুম৷ একটা প্যাকেট গড়িয়ে পড়ল বিছানার৷
প্যাকেটে কাগজে মোড়া ঝলমলে কী একটা জিনিস৷ ব্যস্তভাবে কর্নেলকে ডাকলুম৷ কর্নেল এসে দেখেই বললেন, ‘বারবাডোস দ্বীপের রানির মুকুট৷ এই হয় জয়ন্ত৷ যার সন্ধানে পৃথিবী তোলপাড় করছ তা হয়ত চোখের সামনেই আছে৷ জুতোর প্যাকেট ভেবে নন্দবাবু বা কেউ লক্ষ্যও করেননি তত৷ ঠিক আছে৷ ওঁকে এখন ঘাঁটিয়ে লাভ নেই৷ তুমি চা খেয়েই কলকাতায় এই ঠিকানায় গিয়ে রঞ্জন আর তার পিসিমাকে এখনই বাড়ি ফিরতে বলো৷ আমি থাকছি৷ রনি জ্যাকসনের এখনই আসার কথা৷’
বলে একটু হাসলেন৷ ‘ঝিলের ওধারে এক জাতের প্রজাপতি দেখলুম৷ দেখি, যদি অন্তত একটাও ধরে নিয়ে যেতে পারি৷’
ধনেশবাবু মাথায় একবার রত্নখচিত ছোট্ট সোনার মুকুট পরার চেষ্টা করেই ঝটপট কাগজে মুড়ে ছাতায় ভরলেন৷ তারপর ছাতাটা খাটিয়ার তলায় লুকিয়ে ফেললেন৷ ভাগ্যিস, কাল রাতে ওটা ডাক্তার বক্সি দেখেননি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন