সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
নভেম্বর মাসে রবিবারের সেই সকালবেলায় কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে নিছক আড্ডার জন্য যদি না হাজির থাকতুম, তাহলে আমার জীবনে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর ও প্রায় অলৌকিক একটি ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতুম৷
অবশ্য কর্নেল সেদিন আমাকে দেখেই মৃদু হেসে বলেছিলেন—ভোরবেলা আমার শূন্যোদ্যানে কাজ করতে করতে হঠাৎ একবার মনে হয়েছিল তোমাকে ডাকি৷ অন্য কারণে নয়, দৈবাৎ যদি তুমি তোমাদের কাগজের কোনো অ্যাসাইনমেন্টে বেরিয়ে গিয়ে থাকতেও পারো৷
বললুম—কলকাতায় থাকলে প্রতি রবিবার যে আপনার এই ডেরাই আমার ডেরা হয়ে উঠবে, এটা তো এতকাল লক্ষ্য করে আসছেন বস৷ দৈবাৎ আমি কোথাও গেলে তো আপনাকে আগেই জানিয়ে যাই৷
কর্নেল তাঁর ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন৷ আমার কথার জবাব তিনি অন্তত মিনিট দশেক পরে দিলেন৷ চুরুটের ছাই ঝেড়ে সোজা হয়ে বসে বললেন—তোমার কথা ঠিক৷ কিন্তু এ-ও ঠিক, আমরা জানি না পরের মুহূর্তে ঠিক কী ঘটবে৷ জয়ন্ত! আমাদের জীবনে কিন্তু এমনও ঘটেছে, বাড়ি থেকে বেরোনোর মুখে আমার প্রোগ্রাম বদলাতে হয়েছে৷ ধরো শ্যামবাজার যাচ্ছি বলে বেরুলুম, গেটের কাছে গিয়েই এমন কিছু ঘটল যে আমাকে ছুটতে হল যাদবপুর৷
একটু হেসে বললুম—হাই ওল্ড বস! আমার কেন যেন মনে হচ্ছে কাল সারা রাত আপনি জটিল কিছু নিয়ে প্রচণ্ড ভেবেছেন৷ তারপর ভোরবেলায় আপনার সাধের বাগান—স্যরি, আপনার শূন্যোদ্যানে গিয়ে ভীষণভাবে দার্শনিক হয়ে উঠেছেন৷
কর্নেল হাসলেন না, যদিও আমি হাসতে হাসতে কথাগুলি বলেছিলুম৷ তিনি কেন জানি না একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন৷ তারপর আত্মমগ্ন অবস্থায় শুধু বললেন—হুঁ! দার্শনিকতা! ভয়ঙ্কর দার্শনিকতা!
আবার হাসতে হাসতে আমার বৃদ্ধ বন্ধুকে চাঙ্গা করার জন্য বললুম—দার্শনিকতা কী করে ভয়ঙ্কর হয় আমি জানি না৷ য়ুনিভার্সিটিতে আমার পাঠ্য ছিল পলিটিক্যাল সায়েন্স৷ কিন্তু কর্নেল, আমার দুর্ভাবনা হচ্ছে প্রথমত ভোরবেলা আমাকে ডাকার কথা, দ্বিতীয়ত আপনার এই সব কথাবার্তায় ঘোরতর হেঁয়ালির গন্ধ পাচ্ছি৷ কী ঘটেছে, খোলাখুলি আমাকে বলতে কি অসুবিধা আছে? নাকি আপনি অভ্যাসমতো ধাপে ধাপে কথার জট ছাড়াবেন?
কর্নেল একটু হাসলেন৷ কিন্তু সে হাসিও যেন অনিচ্ছাকৃত৷ তারপর তিনি হাঁক দিলেন—ষষ্ঠী, আমরা সেকেন্ড রাউন্ড কফি খাব৷
কথাটা বলে তিনি উঠে গেলেন৷ তারপর একটা আলমারির দরজা খুলে একটা কাগজ বের করে নিয়ে এলেন৷ ইজিচেয়ারে বসার পর লক্ষ্য করলুম, ওটা একটা ডাকে পাঠানো খাম৷ আশ্চর্য হলুম৷ ডাকে পাঠানো একটা খাম তিনি এমন যত্ন করে আলমারির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলেন কেন!
ষষ্ঠীচরণ কফি রেখে না যাওয়া পর্যন্ত তিনি চুপ করে ছিলেন৷ আমার কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি৷ এবার বললেন—কফি খাও, স্নায়ু চাঙ্গা করো৷
আমি তাঁর কাছ থেকে বড়োজোর দু’মিটার দূরত্বে সোফার উপর বসে ছিলুম৷ ষষ্ঠী কফির কাপ-প্লেট আমার সামনে সেন্টার টেবিলে রেখে এবং কর্নেলেরটা তাঁর কাছের উঁচু টেবিলে রেখে চলে গেল৷
ইতিমধ্যে কর্নেল খাম থেকে একটা চিঠি এবং টেবিলের ড্রয়ার থেকে তাঁর আতসকাচ বের করে খুঁটিয়ে কিছু লক্ষ্য করছিলেন৷ কফির কাপ তিনি তুলে নিয়ে চুমুক দিলেন৷ তারপর আবার আতসকাচ দিয়ে চিঠিটা লক্ষ্য করতে থাকলেন৷
এদিকে ততক্ষণে আমার ধৈর্য শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে৷ অস্থির হয়ে বললুম— ওঃ বস! আমার চাঙ্গা স্নায়ু আবার ঝিমিয়ে পড়বে৷ ব্যাপারটা এমন কী গুরুতর যে এই দীর্ঘ সময় আপনি আমাকে যেন দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন?
এরপর আরও কয়েক মিনিট কেটে গেল৷ অবশেষে কর্নেল চিঠিটা আমার হাতে দিয়ে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন৷ তারপর কফি পানে মন দিলেন৷
বেশ পুরু কাগজে লেখা চিঠি৷ এটা একটা লেটারহেড৷ ছাপানো হরফে লেখা আছে—ড. অলোকেশ ত্রিপাঠী৷ তার পাশে কতকগুলো ডিগ্রি৷ আমি এগুলোর মাথা-মুন্ডু কিছু বুঝতে পারলুম না৷ বাঁ-দিকে প্যাডের উপর লেখা—Jenome Bhaban. রুদ্রগড়৷ ভায়া রাঁচি৷ বিহার৷ উপরে তারিখ দেওয়া আছে এক সপ্তাহ আগের৷
এরপর ইংরেজিতে লেখা চিঠিটা যা পড়লুম, তার মোটামুটি বাংলা অনুবাদ ঠিক এরকম: !প্রয় কর্নেল,
আমাকে আশা করি আপনার মনে পড়বে৷ বাঙ্গালোরের পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সম্মেলনে আপনার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়েছিল৷ কিন্তু তখন আমি জানতুম না, আপনি সর্ববিদ্যাবিশারদ এবং অবসরপ্রাপ্ত একজন সামরিক অফিসার হয়েও রহস্যময় ঘটনার পিছনে ছুটোছুটি করেন৷ খুলেই বলছি, আমার কলকাতার বন্ধু ড. হিমাংশু বোসের কাছেই কিছুদিন আগে জানতে পারলুম, আমার সমস্যার সুরাহা আপনি করতে পারবেন৷
এবার ঘটনাটা মোটামুটি জানাচ্ছি৷ কারণ যা ঘটছে তার বিবরণ মুখোমুখি দেওয়া এবং আপনারও স্বচক্ষে দেখা ছাড়া বোঝানো সম্ভব নয়৷ আপনি জানেন, আমি একজন জিন-বিজ্ঞানী৷ মার্কিন বিজ্ঞানী ড. ওয়াটসন জিনের ভিতরে ডি. এন. এ-র আণবিক গঠন সম্পর্কে গবেষণা করেই নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন৷ মাস তিনেক আগে আমি আমেরিকায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি৷ তিনি আমাকে লস অ্যাঞ্জেলেসে তাঁর ল্যাবরেটরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন৷ তাঁর গবেষণার নাম Jenome Project. তাঁর কাছে অনেক তথ্য এবং উৎসাহ পেয়েই আমি ফিরে আসি৷ তারপর রুদ্রগড়ে জিন এবং ডি. এন. এ বিষয়ে তাঁর মতোই গবেষণাগার গড়ে তুলি৷
এসব দীর্ঘ প্রসঙ্গ৷ সংক্ষেপে জানাচ্ছি আমার দু’জন অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে৷ এরা খুব বিশ্বাসী এবং আমার কাজকর্ম গোপনে রাখে বলে আমার বিশ্বাস৷ প্রজেক্ট শুরু করার পর আসে আমার প্রথম অ্যাসিস্ট্যান্ট ড. অনিরুদ্ধ রায়৷ দিল্লির ছেলে৷ তার বয়স পঁচিশের বেশি নয়৷ কিন্তু জিন বিজ্ঞানে তার প্রতিভা আছে৷ আমার শিক্ষক-জীবন থেকে সে আমার পরিচিত৷ তাই তাকে আমি আমার কাজে নিয়েছিলুম৷ অন্য অ্যাসিস্ট্যান্ট ড. অনন্যা মুখার্জি৷ তার বয়স ওই পঁচিশের মধ্যেই৷ অনন্যা রুদ্রগড়েরই মেয়ে৷ ওকে আমি বাঙ্গালোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেকে নিয়েছিলুম৷
আমি যে প্রজেক্টটায় হাত দিয়েছি, তা খুবই গোপনীয়৷ এই চিঠিতে ও বিষয়ে কিছু উল্লেখ করতে চাই না৷ এবার কী ঘটেছে, সংক্ষেপে জানাচ্ছি৷ গত মাসের মাঝামাঝি, এক রাত্রে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়৷ তারপর নীচের তলায় অদ্ভুত একটা শোঁ শোঁ শব্দ, ঠিক যেন বাতাসের ঘূর্ণির মতো একটা আলোড়ন টের পাই৷ দোতলায় আমার ঘরের নীচে সারারাত আলো জ্বলে৷ কিন্তু কোথাও আলো নেই৷ এমনকী আমার ঘরে সিলিং ফ্যানটাও বন্ধ হয়ে আছে৷ আমি খোলা জানলা দিয়ে টর্চের আলো ফেলে দেখি, ঘন কালো রঙের একটা গরিলার মতো জন্তু মুখ দিয়ে ওইরকম শব্দ করছে৷ না, হয়তো ভুল বললাম, ওটা গরিলা নয়৷ যেন একরাশ ঘন অন্ধকার, তা এমনই গাঢ় এবং নিরেট যে আলো তার উপর দিয়ে যেন পিছলে যাচ্ছে৷ না, আমি ঠিক বোঝাতে পারব না৷ আমার দোতলার শয়নকক্ষের নীচের তলায় আমার ল্যাবরেটরি৷ ওটা কোনো জন্তুই হোক অথবা জন্তুর গড়নে ঘন জমাট অন্ধকার হোক, ল্যাবের সামনেই যেন ঘুরপাক খাচ্ছে৷ না, আবার ভুল করলাম৷ এ সবই আমার দেখার ভুল হতে পারে৷ কিন্তু আমার টর্চের আলো ওই জান্তব পদার্থটাকে গ্রাহ্যই করছিল না৷ আমি টর্চ নিভিয়ে দিয়ে বিছানার পাশ থেকে রাইফেলটা তুলে নিলুম৷ তারপর নলের ক্লিপে টর্চটা এঁটে দিয়ে নীচে গুলি করলুম৷ এমন সময় বারান্দা থেকে অনিরুদ্ধ চিৎকার করে বলল—স্যার, স্যার! আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনি কী করতে যাচ্ছেন৷ তারপর অনিরুদ্ধ এসে পড়ল৷ আবার সে বলল—আপনি ভুল করছেন স্যার৷ চুপচাপ শুয়ে পড়ুন৷ আমি তাকে জিগ্যেস করলুম—তুমি কি ওই জান্তব অস্তিত্বটাকে দেখতে পাচ্ছ না অনিরুদ্ধ? অনিরুদ্ধ বলল—আপনি দরজাটা খুলে দিন৷ দরজা খুলে দিলে অনিরুদ্ধ আমার ঘরে ঢুকল৷ তারপর সে বলল—শিগগির আমাকে ল্যাবের চাবিটা দিন৷ আমি বিমূঢ় অবস্থায় তার হাতে এক সেট চাবি তুলে দিলুম৷ তারপর রাইফেল আর টর্চটা নিয়ে আমার ঘর বন্ধ করে তাকে অনুসরণ করলুম৷ সিঁড়ি দিয়ে নীচে হলঘরে নেমে বাঁ-দিকে একটা ঘর পেরোলে আমার ল্যাবরেটরি৷ ল্যাবরেটরির দরজা খুলেই টর্চের আলোয় অনিরুদ্ধ বড়ো-বড়ো জার এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে কী একটা করল৷ অমনি শোঁ শোঁ শব্দের আলোড়নটা বন্ধ হয়ে গেল৷ অনিরুদ্ধকে আমি জিগ্যেস করলুম—তোমার কাজের অর্থ আমি খুঁজে পাচ্ছি নে৷ অনিরুদ্ধ কয়েকটা প্রকাণ্ড জারের পাশ দিয়ে আমার কাছে এসে বলল—স্যার, এখনই অনন্যার খোঁজ নেওয়া দরকার৷ অনন্যা দোতলায় যে-ঘরে থাকে, সেই ঘরে চন্দ্রমুখী নামে আমার বৃদ্ধা দিদি থাকেন৷
ইতিমধ্যে ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে৷ এই আলো জ্বলে ওঠাটাই আমাকে অবাক করেছিল৷ নীচের ঘর থেকে ঠাকুরমশাই রঘুবীর মুখুজ্যে আর দারোয়ান দেওকীপ্রসাদ সবাই একসঙ্গে হৈচৈ করছিল৷ বুঝতে পারছিলুম, তারা জানতে চাইছে আমার কোনো ক্ষতি হয়েছে কিনা৷ তাই দোতলায় উঠে রেলিং-এর কাছে গিয়ে আমি তাদের শান্ত করলুম৷ তারপর দেখলুম, অনিরুদ্ধ সোজা এগিয়ে চলেছে৷ আমার ঘর পেরিয়ে দোতলার একটা অংশ বাঁ-দিকে ঘুরেছে৷ অর্থাৎ কতকটা ‘ই’ প্যাটার্নের বাড়ি৷ উল্টোদিকেও ওরকম দুটো ঘর ঘুরে আছে৷ অনিরুদ্ধ অনন্যার ঘরের দরজা ঠেলতেই খুলে গেল৷ আমি চমকে উঠেছিলুম৷ অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে বলল—অনন্যা তো নেই! চন্দ্রমুখীদিদি ঘুমোচ্ছে৷ কথাটা বলেই সে নীচের খাটিয়ায় শুয়ে থাকা চন্দ্রমুখীর পায়ে হাত দিয়ে তাকে ওঠাতে গেল৷ কিন্তু তারপরই সে চমকে উঠে বলল—ও মাই গড! শি ইজ ডেড! আমি চমকে উঠেছিলুম৷ প্রায় এক লাফে এগিয়ে চন্দ্রমুখীর নাড়ি এবং গলার কাছে হাত দিয়ে স্পন্দন বোঝার চেষ্টা করলুম৷ কিন্তু তাঁর শরীর বরফের মতো শীতল৷ অনিরুদ্ধ বলে উঠল—স্যার, ঘটনাটা ভীষণ রহস্যময়৷ আপনি এখনই পুলিশকে খবর দিন৷ আপাতদৃষ্টে চন্দ্রাদির মৃত্যুর কারণ খুঁজে পাচ্ছি না৷ সে যেন ঘুমের ঘোরে হার্টফেল হয়ে মারা গেছে৷ আমি হতচকিত হয়ে জিগ্যেস করলুম—কিন্তু অনন্যা কোথায়?
অনন্যা কোথায় তা জানা গেল রাত তিনটে তিরিশে, পুলিশ আসার পর৷ তাকে বাড়ির পিছন দিকে টেনিস লনের পাশে ঘাসের উপর আবিষ্কার করলুম৷ কিন্তু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! অনন্যা মারা যায়নি৷ সে সংজ্ঞাহীন৷ তখনই রুদ্রগড়েরর থানার ওসি টেলিফোনে সরাসরি হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাবার ব্যবস্থা করলেন৷ আর পুলিশের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্সে চন্দ্রমুখীদির মৃতদেহ পুলিশ নিয়ে গেল৷
যাই হোক, সেদিনই হসপিটালে ভোরবেলায় অনন্যার জ্ঞান ফিরেছিল এবং সে দু’দিন পরে ফিরে আসে৷ প্রতিদিনই আমি ও অনিরুদ্ধ হাসপাতালে তাকে দেখতে যেতুম৷ সে বলত কিছু মনে পড়ছে না৷ বাড়ি ফিরে আসার পর তার পরিচর্যার জন্য দু’জন নার্স রাখা হয়েছিল৷ তাদের একজন দিনে অন্যজন রাত্রে, তার কাছে থাকত৷ আমি এই চিঠি লেখার সময় অনন্যা আমার ঘরে বসে আছে৷ কিন্তু তার শরীর খুব দুর্বল৷ তার চাহনিতে একটা আচ্ছন্ন ভাব৷ কথা বললে মনে হয়, দূর থেকে কথা বলছে৷ অবশেষে সে আমাকে এইটুকু জানিয়েছে—ঘটনার রাত্রে কেউ অবিকল আমার মতো কণ্ঠস্বরে তাকে ডেকেছিল৷ তখন নীচে ওই অদ্ভুত কৃষ্ণকায় দৈত্য নাচছিল আর মুখে শব্দ করছিল৷ অনন্যা ভেবেছিল; কী ঘটছে, সে ব্যাপারে কথা বলার জন্য আমি তাকে ডাকছি৷ তাই সে দরজা খুলে বের হয়৷ বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার বারান্দায় কেউ তার মাথায় হাত রাখে৷ তারপর কী ঘটেছে, সে কিছুতেই স্মরণ করতে পারছে না৷ তার বাবাও ডাক্তার৷ তাঁর বক্তব্য, অনন্যার ছোটোবেলায় ঘুমের ঘোরে অর্থাৎ sleep walking-এর অসুখ ছিল৷ এতদিন পরে আবার সেই রোগে সে আক্রান্ত হয়েছে৷
এইবার বলি, কেন আমি আপনার সাহায্য চাইছি৷ যে লোকটা অনন্যাকে ডেকেছিল, তার পায়ের জুতোর ছাপ পাওয়া গেছে৷ সে পিছন দিকের ভিজে ঘাস আর কাদার উপর পা ফেলে উপরে উঠেছিল৷ এমনকী ল্যাবের দরজা অবধি তার পায়ের জুতোর ছাপ স্পষ্ট৷ পরদিন পাটনা থেকে ফরেনসিক এক্সপার্টরা এসে সেই ছাপ নিয়ে গেছেন৷ এরপর আর আমি কিছু জানাতে চাই না৷ যা জানাবার তা আমি আপনাকে মুখোমুখি জানাব৷ তবে আমার কেন যেন মনে হয়, এই অদ্ভুত ঘটনার সঙ্গে আমার জিনোম প্রজেক্টের কোনো সম্পর্ক আছে৷ কারণ অনিরুদ্ধ যে মেশিনটা অফ করেছিল, সেটা একটা বানরের কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ার জন্য তৈরি৷ কিন্তু যে জান্তব পদার্থটা আমি দেখেছি তার গায়ে রঙ বাঁদরের মতো নয়৷ আর বেশি কিছু বলা অবান্তর৷ আমার বাড়িতে ক’দিনের জন্য পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা হয়েছিল৷ এই ঘটনা সম্পর্কে আমি শুধু গোপনে ড. হিমাংশু বোসকে ফোন করেছিলাম৷ তিনি আপনার ঠিকানা দিয়েছেন৷ আমি নিজে যেতুম কিন্তু এ অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে যাওয়া সঙ্গত নয়৷
ইতি—
অলোকেশ ত্রিপাঠী
চিঠি পড়ার পর আমি কর্নেলকে ফিরিয়ে দিয়ে বললুম—এ তো আরব্য রজনীর গপ্পো বলে মনে হচ্ছে৷ কিন্তু আপনার মনে থাকতে পারে, আমরা একবার কলকাতাতেই এই জিনোম প্রজেক্টের বিজ্ঞানীর সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিলুম৷ তাঁর তৈরি কৃত্রিম মানুষটা আমাদের হালদারমশাইকে সমুদ্রতীরের বালির মধ্যে পুঁতে রেখেছিল৷ অবশ্য রুদ্রগড় শুনেই মনে হচ্ছে রাজারাজড়ার জায়গা, জঙ্গল আর পাহাড়ও আছে৷
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট আবার জ্বেলে বললেন—জয়ন্ত, আমি চিঠিটা পাওয়ার পর গত রাতে কী করেছি তা তুমি ঠিকই অনুমান করেছ৷ কলকাতার সেই জিনোম প্রজেক্টের ঘটনার পর আমি আধুনিক জীববিজ্ঞানের কয়েকটা বই সংগ্রহ করেছিলাম৷ বিশেষ করে নোবেলজয়ী ড. ওয়াটসনের জিনোম প্রজেক্টের কাজকর্ম সম্পর্কে একটি বই কাল সারারাত পড়েছি৷ বুঝতেই পারছ, আমি ছিলুম এক সামরিক অফিসার৷ তারপর হয়ে গেলুম প্রকৃতিবিজ্ঞানী৷ রহস্যভেদটা বাদ দাও৷ প্রকৃতিতেই অনেক রহস্য আছে যার সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি৷ এই জীববিজ্ঞান বিষয়টাই প্রকৃতির সেই রহস্যময় ক্রিয়াকলাপের মধ্যে পড়ে৷
আমি প্রশংসা করে বললুম—না, না, আপনি বিজ্ঞান সম্পর্কেও যে অনেক খোঁজখবর রাখেন, আমি তা অস্বীকার করছি না৷ পরিবেশ বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আপনি ইকোবায়োলজিস্ট হয়ে উঠতেই পারেন৷ কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, রুদ্রগড়ের অ্যাডভেঞ্চারটা খুব বিপজ্জনক হওয়ার সম্ভাবনা৷
কর্নেল বলে উঠলেন—য়ু আর ড্যাম রাইট! যাই হোক, আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে ড. হিমাংশু বোসের কাছে যাব৷ রুদ্রগড় যাওয়ার আগে তাঁর মতামত জেনে নেওয়া খুবই দরকার৷
জিগ্যেস করলুম—এই ভদ্রলোক কোথায় থাকেন?
—যাদবপুরে৷ এক মিনিট৷ ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলে নিই৷ তিনি কী বলেন শোনা যাক!
বলে কর্নেল রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন৷ একটু পরে চাপা স্বরে কীসব কথাবার্তা হল, মাত্র মিটার দুয়েক দূর থেকে তা আমার কানে ঢুকল না৷ কর্নেলের এই ক্ষমতা বরাবর লক্ষ্য করেছি৷ তাই এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না৷
এই ধরনের অ্যাডভেঞ্চারে বেরুলে কর্নেল যেসব প্রস্তুতি নেন, এক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি৷ বিহারের ঊর্ধ্বতন পুলিশকর্তাকে জানানো থেকে শুরু করে রুদ্রগড়ের সরকারি ডাকবাংলোয় থাকার ব্যবস্থা এবং রেলে একটা আলাদা ক্যুপে পর্যন্ত আমাদের দু’জনের জন্য বুকিং করার ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন৷ কেন্দ্রীয় সরকারের বিহারের সি বি আই কর্তাকেও তিনি ট্রাঙ্ককলে রুদ্রগড়ের অভিযানের ব্যাপারটা জানিয়েছিলেন৷ শুধু ড. অলোকেশ ত্রিপাঠীকে তিনি ট্রাঙ্ককল করেননি৷
রাত আটটা চল্লিশে হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন যখন ছাড়ল তখন আমি এই কথাটা তুলেছিলুম—আচ্ছা কর্নেল, আপনার প্রোগ্রামে আমি কোনো সময়েই নাক গলাই না৷ কিন্তু এবার একটা ধাঁধায় পড়েছি৷ আপনি ড. ত্রিপাঠীকে ট্র্যাঙ্ককল করেননি বলেছেন—
আমি আর কিছু বলার আগেই কর্নেল মুচকি হেসে বললেন—আমরা যে রুদ্রগড়ে যাচ্ছি তার খবর উনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ অর্থাৎ আমাদের হালদারমশায়ের মুখেই পেয়ে যাবেন৷
কথাটা শুনে ভীষণ চমকে উঠেছিলুম৷—কী অদ্ভুত! আপনি এর মধ্যে আমাদের হালদারমশাইকেও কখন জুটিয়ে ফেললেন?
—তুমি যখন লাঞ্চের পর আরামে ভাত-ঘুম দিচ্ছিলে, তখনই ব্যাপারটা ঘটে গেছে৷ এমনকী তুমি এমন বেঘোরে ঘুমিয়েছ যে আমার টেলিফোন পেয়েই ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টর মিঃ কে কে হালদার একেবারে সেজেগুজে আমার কাছে হাজির হয়েছিলেন, তা তুমি টেরই পাওনি৷
আমি আবার চমকে উঠেছিলুম৷— কী সর্বনাশ! আমাকে কি আজকে কোনো ঘুমের ওষুধ খাইয়ে—
কর্নেল আমার কথা থামিয়ে সহাস্যে বললেন—নাঃ৷ নভেম্বরে কলকাতার মনোরম আবহাওয়া তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল৷ যাই হোক, হালদারমশাইকে ডেকে পাঠানোর পরই আমি ড. ত্রিপাঠীকে টেলিফোনে জানিয়েছিলুম, বিকেল সাড়ে তিনটেয় হাওড়া-পাটনা দিল্লি এক্সপ্রেসে আমার অগ্রদূত হিসেবে একজন ধুরন্ধর প্রাক্তন পুলিশের গোয়েন্দা যাচ্ছেন৷ তিনি আপনার একজন পূর্বপরিচিত অতিথি হয়েই থাকবেন, যাঁর উদ্দেশ্য হবে রুদ্রগড় পর্যটন৷ জয়ন্ত, আমি ট্রাভেল ডিপার্টমেন্ট থেকে জেনেছি, রুদ্রগড়ে এই শীতের সময় অসংখ্য পর্যটক যান৷ ওদিকে একটা লেক আছে৷ সেটা একটা বিখ্যাত পক্ষীনিবাস৷ চারদিকে খাড়া পাহাড়৷ আসলে ওটা প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটা আগ্নেয়গিরির ক্রেটার যেখানে জল জমেই ওই হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে৷ চারদিকে প্রচুর গাছপালা৷ লেকের মাঝে একটা জলটুঙ্গি আছে৷ রুদ্রগড়ের আরও একটি আকর্ষণ পাতালকালীর মন্দির৷ সেখানে এইসময় মেলা বসে যায়৷ অসংখ্য ভক্ত সিঁড়ি বেয়ে ভূগর্ভে দেবী কালিকাকে দর্শন করে আসে৷ এছাড়াও আরও অনেক কিছু আছে, যথাসময়ে তুমি দেখতে পাবে৷
আমি হাসতে হাসতে বললুম— হালদারমশাই একবার আমাদের সঙ্গে অর্নিথোলজিস্ট অর্থাৎ কিনা পক্ষীবিশারদ সেজে প্রশান্ত মহাসাগরের একটা দ্বীপে পাড়ি জমিয়েছিলেন৷ সে-জন্য তাঁকে একটা বাইনোকুলার পর্যন্ত কিনতে হয়েছিল৷ এবার তিনি কি সেই বেশেই যাচ্ছেন?
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ৷ ওঁর হাতে আমি ড. ত্রিপাঠীকে একটা চিঠি লিখে দিয়েছি৷ অনন্যা বা অনিরুদ্ধ বা বাড়ির কেউ জানবে না যে এই পর্যটক একজন ধুরন্ধর গোয়েন্দা৷ হালদারমশাইকে আমি এই ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ডসহ রীতিমতো একটা কাজের ফিরিস্তি করে দিয়েছি৷ উনি মাঝে মাঝে বাইরে ঘুরবেন আর বাকি সময় আমি যা বলেছি, সেই কাজগুলো করবেন৷
বললুম—আমার মুখ দিয়ে কী সর্বনাশ কথাটা বেরিয়েছিল৷ কর্নেল, কলকাতায় ড. বোসের কাছ থেকে আসার সময় তাঁকে আক্রান্ত হবার ভয় দেখিয়ে এসেছেন৷ হালদারমশাইকে আশা করি, একইভাবে সতর্ক করেছেন৷
কর্নেল বললেন—দেখো জয়ন্ত, হালদারমশাইকে নিয়ে আমরা হাসিঠাট্টা করি, কিন্তু আমরা দু’জনেই জানি, যদিও তিনি একটু হঠকারী স্বভাবের লোক কিন্তু প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও দরকারি তথ্য সংগ্রহে ওঁর জুড়ি নেই৷ বিশেষ করে ভুললে চলবে না, উনি একজন প্রাক্তন ডিটেকটিভ অফিসার এবং তাঁর অভিজ্ঞতাও কম নয়৷
হাসতে হাসতে বললুম—হ্যাঁ, হালদারমশাই তো বলেই থাকেন—মশায়, আমি চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করতাছি—
কর্নেল অট্টহাসি দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিলেন৷ সেই সময় কোনো একটা স্টেশনে ট্রেন থামল৷ কর্নেল দরজা খুলে বললেন—বাঃ! আমরা দেড় ঘণ্টাতেই বর্ধমান এসে গেছি৷ এখানেই আমাদের রাতের খাওয়া খাইয়ে দেবে৷ অতএব তুমি বাথরুমে গিয়ে রগড়ে দু’হাত ধুয়ে নাও৷
বর্ধমানে রাতের খাওয়া শেষ হলে আমি কর্নেলের উল্টোদিকে লোয়ার বার্থে শুয়ে পড়েছিলুম৷ এ রাত্রে আমার কর্নেলের বাড়িতে ভাত-ঘুমের চেয়েও কেন যে আরও গভীর ঘুম এসেছিল, জানি না৷ এই ঘুমের রহস্য আজ অবধি উন্মোচন করতে পারিনি৷ এমন হতে পারে সিনেমায় দেখা সায়েন্স ফিকশনের মতো এমন একটা আজগুবি জিনিস দেখব তার জন্যে সম্ভবত আমার ততকিছু উদ্বেগ জাগেনি, তা সে কর্নেল যতই আমাকে বা ড. বোসকে ভয় দেখান না কেন৷ হ্যাঁ, যে বাড়িতে যাচ্ছি সেটা একটা পুরোনো রাজবাড়ি এবং সেখানে হয়তো একশো বছর আগে একটা দামি বিগ্রহ চুরি গিয়েছিল এবং তার জন্য একটা লাশ পড়েছিল৷ এতকাল পরে সেই ঘটনার সূত্রে যে কিছু ঘটতে পারে, আমার তা মোটেও মনে হয়নি৷ আমি ধরেই নিয়েছিলুম অনন্যা নামে এক সুন্দরী যুবতীকে নিয়ে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক বিজ্ঞানীর মাথা খারাপ হয়ে গেছে এবং তিনি কিছু আজগুবি কাণ্ড ঘটিয়ে নিজের অপরাধ স্খালন করতে চাইছেন৷
অর্থাৎ আমি পুরো ঘটনা সম্পর্কে একটুও গুরুত্ব আরোপ করিনি৷ তাই নিছক পর্যটনে যাওয়ার আনন্দই আমার মনকে হালকা করে রেখেছিল৷ আর একটা বলার কথা, সে বছর জানুয়ারি থেকে এই নভেম্বর অবধি কোনো রহস্যময় ঘটনায় কর্নেল জড়িয়ে পড়েননি৷ বার দুই তিনি কোথায় কোথায় সেমিনারে গিয়েছিলেন আর আমিও বার তিনেক আমার কাগজের অ্যাসাইমেন্টে দেশেরই কয়েক জায়গায় চক্কর মেরেছিলুম৷
এসব কথা বলছি শুধু আমার মনের প্রশান্ত এবং নিশ্চিন্ত ভাবের কথা জানাবার জন্যই৷ যাই হোক, আমার সেই অবাধ ঘুম ভেঙেছিল কর্নেলের টানাটানিতে৷ আমি চোখ খুললে কর্নেল মিটিমিটি হেসে বলেছিলেন—আশা করি, তুমি আমার অগোচরে ড্রাগ-অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়নি৷ তোমার এমন ঘুম সত্যিই আমার কাছে একটা রহস্য!
আমার বৃদ্ধ বন্ধুর এই পরিহাসে সটান উঠে বসে বলেছিলুম—আমি নিজে কোনো ড্রাগ সেবন করিনি৷ আজ দুপুর থেকে আমার মনে হচ্ছে, যে কোনো কারণেই হোক; জলের সঙ্গে বা খাবারের সঙ্গে ড্রাগ মিশিয়ে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখছেন৷
কর্নেল তাঁর বিখ্যাত অট্টহাসি হেসে উঠলেন৷ তারপর বললেন—এসব কথা পরে হবে৷ শিগগির গোছগাছ করে ব্যাগেজ নিয়ে দরজার কাছে চলো৷
ট্রেন রুদ্রগড় স্টেশনে ঢুকতে চলেছে৷ ঘড়ি দেখলুম, ভোর পাঁচটা৷ নেমেই লক্ষ্য করলুম, স্টেশনটা একটা রেলওয়ে জংশন৷ এই ভোরবেলায় অনেকগুলো প্ল্যাটফর্মে লোকজনের ভিড় আছে৷ তার পরেই যা টের পেলুম, তা হল আচম্বিতে শীতের দাপট৷ ততক্ষণে কয়েকজন রেলকুলি কর্নেলকে সেলাম জানিয়ে ব্যর্থ হয়ে চলে গেছে৷
কর্নেল বললেন—তুমি আমার গায়ের এই ওভারকোট আর টুপি কি লক্ষ্য করোনি?
সত্যিই তাই! আমার গায়ে শার্ট আর একটা হাতকাটা সোয়েটার৷ তাড়াতাড়ি প্রকাণ্ড ব্যাগের চেন টেনে বিদেশে কেনা পুরু একটা জ্যাকেট বের করলুম৷ সেটা যখন গায়ে চড়াচ্ছি তখন কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন—তোমাকে চমক দেওয়ার জন্য কিছু করিনি৷ লক্ষ্য করেছি, গত দশ-এগারো মাস তুমি এই বৃদ্ধ রহস্যভেদীর সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ার জন্য তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছ৷ বুদ্ধি জিনিসটা ইস্পাতের ছুরির মতো, কিন্তু অব্যবহারে তাতে মরচে ধরে যায়৷
লক্ষ্য করলুম, আমরা দু’জনেই যখন কথা বলছি, মুখ দিয়ে ভাপ বেরুচ্ছে৷ তার মানে কলকাতার মোলায়েম আবহাওয়া থেকে আমরা এসে পড়েছি যেন তুষারের রাজ্যে৷ না, কোনো তুষারজাতীয় বস্তু বাইরে কোথাও দেখা যাচ্ছিল না৷ কর্নেলকে অনুসরণ করে প্ল্যাটফর্মেই একটা উষ্ণ পানীয়ের দোকানের সামনে গেলুম৷ বরাবরই লক্ষ্য করেছি, কর্নেলের চেহারায় শুধু বিদেশি আদলই নয়, এমন একটা কী আছে যাতে লোকেরা তাঁকে বড্ড বেশি খাতির করে৷ গুঁফো দোকানদার কম্বলে শরীর ঢেকে দু’জন যুবককে দিয়ে চা পরিবেশন করছিল৷ কর্নেলকে দেখেই সে হঠাৎ খাপ্পা মেজাজে হিন্দিতে বলল—দেখতে পাচ্ছিস না কে এসেছেন৷ এই কুর্সি দুটো নিয়ে যা ওখানে৷ আলাদা জায়গায় বসিয়ে দে৷
কর্নেলের তাগড়াই চেহারা দেখে তাঁকে একটা কাঠের চেয়ার এনে দিল এক যুবক৷ তারপর আমার জন্যে একটা নড়বড়ে প্লাস্টিকের চেয়ার এনে দিল৷ কর্নেল যুবকটিকে মৃদু হেসে হিন্দিতে বললেন—তোমাদের সাইনবোর্ডে লেখা আছে কফিও পাওয়া যায়৷ আমাদের দু’জনকে দুটো বড়ো কাপে কফি খাওয়াতে পারো?
দোকানের মালিকের কানে কথাটা পৌঁছে গিয়েছিল৷ কারণ সে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে ছিল৷ এবার সে আসন ছেড়ে কম্বলমুড়ি দিয়েই উঠে দাঁড়াল৷ তারপর একটু হেসে যা বলল তার অর্থ দাঁড়ায়—খুব ফার্স্টক্লাস কফি আমি সাহেবদের জন্য মজুত রাখি স্যার৷ সঙ্গে কি আর কিছু স্ন্যাকস দোবো?
কর্নেল হিন্দিতেই বললেন—একটা করে দুটো নোনতা বিস্কিট৷
সে নিরাশই হল৷ তবে নিজের উদ্যোগেই কফি তৈরিতে মন দিল৷ তার মাথায় পাগড়ির মতো পুরো মাফলার জড়ানো৷ শুধু দুটো চোখ আর খাড়া নাকের তলায় পোল্লাই গোঁফ দেখা যাচ্ছিল৷
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মোটামুটি পানের যোগ্য দু’পেয়ালা কফি সসম্ভ্রমে সে নিজে পরিবেশন করল৷ ইতিমধ্যে একদল যুবক-যুবতী এসে তার দোকানে ভিড় জমাল৷ মনে হল এরা ট্যুরিস্টের একটা দল৷ নিজেদের মধ্যে তারা বাংলায় কথা বলছিল৷ কর্নেল চাপা স্বরে বললেন—কফি খেয়ে কেটে পড়া যাক৷ ওরা আমাকে লক্ষ্য করে কীসব বলছে৷ এই প্রচণ্ড শীতে তা কানে ঢুকছে না৷ তবে বুঝতে পারছি, ওরা আমাকে এই দোকানদারের মতোই বিদেশি ট্যুরিস্ট মনে করছে৷
কফির দাম মিটিয়ে ও বকশিস দিয়ে কর্নেল দ্রুত গেটের দিকে গেলেন৷ তারপর বললেন—ঠিক সাড়ে পাঁচটায় সরকারি ডাকবাংলো থেকে আমাদের জন্য জিপ আসছে৷ নীচের চত্বরে একটু লক্ষ্য রাখতে হবে৷ আমার চেহারার বর্ণনা ড্রাইভার আগেই পেয়ে গেছে এবং তোমার বিবরণও দেওয়া হয়েছে৷ কাজেই চিন্তার কারণ নেই৷
স্টেশনের বাইরে বিশাল জায়গা জুড়ে সাইকেল রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি, প্রাইভেট বাস গিজগিজ করছিল৷ তখনো ঘন কুয়াশা চারদিকে৷ কর্নেল সিঁড়ির শেষ ধাপের একপাশে দাঁড়িয়ে চুরুট টানছিলেন৷ কিছুক্ষণ পরেই পুরু সোয়েটার এবং মাথায় টুপির সঙ্গে মাফলার জড়ানো একটা ছিপছিপে লম্বা লোক এসে কর্নেলের সামনে দাঁড়িয়েই মিলিটারি স্যালুট ঠুকল৷ হ্যাঁ, এ-ও রিটায়ার করা ডিফেন্সের লোক৷ শুনেছে দাড়িঅলা এক কর্নেল সাহেব আসবেন৷ কাজেই কর্নেলের যা প্রাপ্য, তা সে তাঁকে দিতে কসুর করল না৷ দুঃখের বিষয় আমার দিকে সে লক্ষ্যই করল না৷ সহাস্যে বলল—আইয়ে হুজুর কর্নিল সাব৷ ম্যানেজার শম্ভুনাথ পাণ্ডে আমাকে জিপ নিয়ে আসতে বলেছেন৷ এখানে যা ভিড়, আমি বাইরে রেখে এসেছি৷ সে-জন্য গলতি মাপ করবেন স্যার৷
বলে সে ভিড় হঠাতে হঠাতে আমাদের বাইরে নিয়ে গেল৷ ওপাশে একটা টিলা পাহাড়৷ কুয়াশায় আবছা দেখা যাচ্ছে, রাস্তার দু’পাশে কিছু ঘরবাড়িও আছে৷
জিপটা মোটরগাড়ির মতোই৷ অর্থাৎ পিছনে দু’জনের বসার ব্যবস্থা আছে৷ আমাদের প্রকাণ্ড ব্যাগ দুটো ডিকিতে রেখে ড্রাইভার গাড়ির সামনের দিকে এল৷ তারপর বলল—সামনে বসলে খুব শীত লাগবে৷ আপনারা দয়া করে দু’জনে ব্যাকসিটে বসুন৷
কর্নেল আমাকে ডানদিকে ঠেলে দিয়ে বাঁদিকে বসলেন৷ তারপর বললেন—সবই তো তুমি করলে৷ কিন্তু তোমার নামটা তো এখনো বললে না৷
ড্রাইভার মুখ ফিরিয়ে বিনীতভাবে বলল—হুজুর কর্নিল সাব, আমার নাম মকবুল খান৷ আমি দশ বছর ইনফ্রানটিতে ছিলাম৷ তিন বছর হল রিটায়ার করেছি৷ আমার বাড়ি রুদ্রগড়ে৷
কর্নেল বললেন—বাঃ! চলো৷ তবে তাড়াহুড়ো দরকার নেই৷ আস্তে চলো৷ গল্প করতে করতে যাই৷
ড্রাইভার মকবুল খান এ বছর পর্যটনের অবস্থা নিয়ে বকবক করছিল৷ কর্নেল তাকে থামিয়ে জিগ্যেস করলেন—রুদ্রগড় রাজবাড়িতে যে ভদ্রলোক থাকেন, তুমি তাঁকে চেনো?
মকবুল খানকে উত্তেজিত দেখাল৷ সে গাড়ির গতি থামিয়ে বলল—হুজুর কর্নিল সাব, রুদ্রগড়ে খুব গুজব রটে গেছে৷ ওই বাড়িতে ত্রিপাঠী সাহেব থাকেন৷ তো এক হপ্তা আগে ঐ বাড়িতে নাকি দেবী চণ্ডীমাইজির এক চ্যালা ঢুকেছিল৷ আপনি তো দেও বোঝেন স্যার?
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ৷ দেও মানে দৈত্য বা দানব৷ প্রকাণ্ড চেহারা, গায়ের রঙ কুচকুচে কালো৷ তাই না?
মকবুল বলল—জি হাঁ, কর্নেল সাব৷
মকবুল খান গাড়ির গতি আরও একটু কমিয়ে দিল৷ বুঝতে পারলুম, তার গল্প বলার নেশা আছে৷ সে বলল—তো, ওহি দেও কালা দেও আছে৷ রুদ্রগড়ের সবাই জানে, ত্রিপাঠী সাব যে রাজবাড়িতে থাকেন তার পেছনে ঠাকুরবাড়ি আছে৷ সেখানে মন্দিরে চণ্ডীমাইজি থাকত৷ খুব ধুমধাম করে নাকি পুজোও হত৷ আমি আমার ঠাকুর্দা-ঠাকুমার কাছে অনেক গল্প শুনেছি৷
কর্নেল তার কথার উপরে বললেন—হ্যাঁ, তুমি সেই কালা দেও-এর ঘটনাটা বলো৷
মকবুল খান গাড়ির গিয়ার চেঞ্জ করে বলল—এক সপ্তাহ আগে রাত দুপুরে কালা দেও রাজবাড়িতে হানা দিয়েছিল৷ তো, ত্রিপাঠী সাব খুব চালাক লোক আছেন৷ তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি৷ ওই বাড়িতে রান্নার জন্যে যে মেয়েটি ছিল, তার নাম চন্দরমুখী৷ ও ভি বাঙালি ছিল৷ পঁচাশ-পচপন বয়স হবে৷ গায়ে খুব তাকাত ছিল৷ সে কালা দেওটার সঙ্গে লড়তে গিয়ে মারা পড়েছে৷ আর এক বাঙালি মেয়ে ডাক্তার কাছে থাকত৷ চন্দরমুখী তাকে পাহারা দিত৷ কালা দেও চন্দরমুখীকে মেরে মেয়ে ডাক্তারকে তুলে নিয়ে ভেগে যাচ্ছিল৷ তো, ত্রিপাঠী সাহেব নিজেও খুব বড়ো ডাক্তার৷ একসময় হাসপাতালে নোকরি করতেন৷ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে কীসব ডাক্তারি কাম করেন জানি না৷ একজন জওয়ান ডাক্তারও তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট৷ শুনেছি সেই জওয়ান নাকি কালা দেওকে গুলি করে ভাগিয়ে দেয়৷ আর কালা দেও মেয়ে ডাক্তারকে ফেলে ভেগে যায়৷ পরদিন পুলিশ চন্দরমুখীর লাশ নিয়ে যাওয়ার পর রাজবাড়িতে খুব ভিড় হয়েছিল৷ দেওকীপ্রসাদ দারোয়ান মানুষজনকে ওই ঘটনা শুনিয়ে ভাগিয়ে দেয়৷ আর সে বলেছিল, ত্রিপাঠী সাব সেদিনই ঠাকুরবাড়িতে পূজা করবেন, তিনি ব্রাহ্মণ৷ আরও অনেক ব্রাহ্মণ বাইরে থেকে এসে যাগযজ্ঞ করবেন ঠাকুরবাড়িতে৷ গরিব-দুঃখীদের খাওয়ার ব্যবস্থা হবে৷
কর্নেলের মুখে কোনো হাসি দেখছিলুম না৷ তিনি বললেন—তাহলে পরদিন ঠাকুরবাড়িতে যাগযজ্ঞ আর কাঙালি ভোজন হয়েছিল?
ড্রাইভার মকবুল খান একটু নড়ে বলল৷ বলল—জি হ্যাঁ কর্নিল সাব৷ আমার ওই কথাটা মাথায় আসছিল না—কাঙালি ভোজন৷ রাজবাড়ির সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা আছে৷ সেখানেই কাঙালি ভোজন হয়েছিল৷
কর্নেল বললেন—এখন কী অবস্থা বলো৷
মকবুল খান বিকৃতমুখে এবং চাপাস্বরে বলল—হুজুর কর্নিল সাব, ত্রিপাঠী সাহেবের ঠাকুর্দা চণ্ডীমায়ের পুজো করতেন৷ আর রাজা মোহন সিংজি ছিলেন খুব সাদাসিধে মানুষ৷ তাঁকে আমি দেখিনি৷ বুড়া-বুড়িদের মুখে তাঁর কথা শুনেছি৷ সেই মানুষ ত্রিপাঠী সাহেবের ঠাকুর্দাকে নাকি গুলি করে মেরেছিলেন শুনেছি৷ লেকিন সব বুড়া-বুড়িরা বলে, অমন ভালো সাদাসিধা মানুষ কী খুন করতে পারে? চণ্ডীমাইজির পাহারাদার কালা দেও তাঁকে মেরে ফেলেছিল৷ বদনাম হল মোহনজির৷ তিনি ত্রিপাঠীর বাবাকে, শুনেছি; পুরো রাজবাড়ির দলিল রেজেস্ট্রি করে দান করেছিলেন৷ এই কথাটা নিয়ে খুব গুজব আছে৷ কেউ কেউ বলে শুনেছি, মোহন সিংজি ত্রিপাঠী সাহেবের বাবা কমলেশবাবুকে রাজবাড়ি দান করে মিটমাট করেছিলেন৷
—কেন, কোনো পুলিশ কেস হয়েছিল?
একটু চুপ করে থাকার পর মকবুল খান বলল—কী হয়েছিল, সব কথা বোঝা যায় না৷ তখন তো আংরেজ সরকারের আমল৷ রাজা মোহন সিংজীর সঙ্গে পাটনার কালেক্টার এক আংরেজ সাহেবের দোস্তি ছিল৷ এইবার সমঝে নিন৷
কর্নেল একটু হেসে বললেন—বুঝতে পেরেছি৷ সিংজি ত্রিপাঠী সাহেবের ঠাকুর্দাকে খুন করেছেন বলে নিশ্চয়ই তাঁর ছেলে কমলেশবাবু পুলিশ কেস করেছিলেন৷ তুমি ঠিকই বলেছ, ইংরেজ আমলে রাজা-মহারাজাদের খুব খাতির করা হত৷ তাই রাজবাড়ি দান করে রাজা মোহন সিং কেস মিটিয়ে নিয়েছিলেন৷
মকবুল খান তাঁর কথার উপর বলে উঠল—রাজা মোহন সিংজি আসলে চণ্ডীমাইজির পাহারাদার কালা দেওয়ের ভয়ে রুদ্রগড়ে বাস করতে চাননি৷ পুরুত ঠাকুরের কাঁধে রাজবাড়ির দায়িত্ব চাপিয়ে তিনি ভেগে গিয়েছিলেন৷ তাঁর কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না৷ শুনেছি তিনি হিমালয় পাহাড়ে সন্ন্যাসী হয়ে ঘুরে বেড়াতেন৷
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন—তুমি ঠিক বলেছ৷
আমি বললুম—কিন্তু রুদ্রগড় দেখছি স্টেশন থেকে বেশ দূরে৷
কথাটা শুনতে পেয়ে মকবুল বলল—বেশি দূরে নয় স্যার৷ আমরা রুদ্রগড়ের নতুন এলাকা দিয়ে যাচ্ছি৷ এবার বাঁ-দিকে ঘুরে চড়াই-এ উঠলেই আপনি পুরোনো রুদ্রগড় দেখতে পাবেন৷ আর ওই দেখুন, বাঁ-দিকে কালো পাহাড়ের পিছনে আছে সারদা লেক৷ এবার অনেক পাখি এসেছে স্যার৷ এখান থেকে ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে নজর হবে না কিন্তু ওদিকে পাতাল-কালীর মন্দিরের কাছে মেলা বসেছে, তা দেখতে পেতেন৷
চড়াই-এ উঠতে উঠতে আমরা লক্ষ্য করলুম, দু’পাশে ঘন গাছপালার আড়ালে পুরোনো আমলের দোতলা বাড়ি৷ কিন্তু কোনো লোকজন নেই৷ চড়াইয়ের শেষ প্রান্তে পৌঁছে মকবুল বলল—এই যে সিধা রাস্তা, শেষ হয়েছে বাজারের শেষে৷ ওদিকটায় খুব ভিড় আর শেষে ভৈরবী নদী৷ ওদিকটা সমতল বলে নদীর তত স্রোত নেই৷ গত বছর ব্রিজ হয়েছে৷ একেবারে সোজা পাটনা যাওয়া যায়৷
বলে সে ডাইনে জিপ ঘোরাল৷ দু’পাশেই পোড়ো জমিতে ঝোপ-জঙ্গল গজিয়ে আছে৷ কিন্তু রাস্তাটা সংকীর্ণ হলেও মসৃণ পিচে ঢাকা৷
আবার একটু চড়াই শুরু হল৷ তারপর চোখে পড়ল একটা টিলা পাহাড়ের মাথা কেটে সরকারি ডাকবাংলো৷ তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে৷ দোতলা বাড়িটার গায়ে রং পড়লেও তার প্রাচীনতা বোঝা যায়৷ দু’জন তাগড়াই চেহারার লোক গেট খুলে দিল৷ পাঁচিলের উপর কাঁটাতারের বেড়া৷ নানান ফলের বাগান৷ ডান দিকে একতলা সারবন্দি কয়েকটা ঘর দেখলুম৷ সেগুলো নিশ্চয়ই কর্মচারীদের বাসা৷
বাংলোর ম্যানেজার শম্ভুনাথ পাণ্ডে করজোড়ে এগিয়ে এলেন৷ তারপর আমরা গাড়ি থেকে নামলুম৷
কর্নেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার পর আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন ম্যানেজার৷ মুখের হাসি দেখে মনে হল নিপাট ভদ্রলোক৷ একজন উর্দিপরা লোক এগিয়ে এল এবং সে আমাদের দিকে করজোড়ে নমস্কার করে ডিকির কাছে গেল৷ মকবুল আমাদের ব্যাগ দুটো বের করে দিল৷ ম্যানেজার মিঃ পাণ্ডে বললেন—দোতলায় বারো নম্বর ঘরে রাখো৷ তারপর কর্নেলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি আমাদের নিয়ে চললেন৷
—আপনার অনেক গল্প আমি আমাদের পাটনা ট্যুরিস্ট ডিপার্টমেন্টের ডাইরেক্টার মিঃ যাদব শর্মার কাছে গতরাত্রে শুনেছি৷ আপনি শুধু লেপিডপ্টারিস্ট-ই (প্রজাপতি বিশেষজ্ঞ) নন, আপনি একজন অর্নিথোলজিস্টও বটে৷ ঠিক সময়ে এসে গেছেন৷ সারদা লেকে ডিসেম্বরের দিকে যা ভিড় হবে, তাতে ট্যুরিস্টদের ঝামেলা বেড়ে যায়৷ গভর্নমেন্ট থেকে আইন করে দেওয়া হয়েছে যে সারদা লেকে গেটওয়েতে দৈনিক পঞ্চাশজনের বেশি ট্যুরিস্ট যেন না যায়৷ তাছাড়া সে পাখি সম্পর্কে সত্যি আগ্রহী কিনা, সে পরীক্ষাও গেটে নেওয়া হয়৷ তবুও প্রতিদিন একশো-দেড়শো লোক সারদা লেকের চারদিকে পিকনিকে বসে যায়৷ কর্নেল সাব, বুঝতেই পারছেন দিনে দিনে এত বেশি দুর্নীতি বেড়ে গেছে, বলার নয়৷
আমাদের তিনি দোতলার উত্তর-পূর্ব কোণের ঘরে নিয়ে গেলেন৷ তারপর বললেন—দক্ষিণ পূর্বের ছ’নম্বর স্যুইটটা আপনাকে দিতে চেয়েছিলুম৷ কিন্তু শুনলুম আপনি নাকি নর্থের ডাবল স্যুইটটাই চেয়েছেন৷
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ৷ এদিকটায় শীতের উপদ্রব একটু বেশি হবে৷ তবে আমার অনুমান মিলে যাচ্ছে৷ এই জানলা দিয়ে বাইনোকুলারে আমি সব দেখতে পাচ্ছি৷ আবার এদিকে পাতালকালী মন্দিরের মেলাটাও দেখতে পাচ্ছি৷ তার বাঁ-দিকে উঁচু পাহাড়ের ওদিকেই বোধ হয় সারদা লেক৷
মিঃ পাণ্ডে বললেন—হ্যাঁ স্যার৷
কর্নেল বললেন—আর রাজবাড়িটা কোনদিকে?
মিঃ পাণ্ডে সোজা উত্তরে গাছপালার ফাঁক দিয়ে মোটামোটা থামওয়ালা একটা প্রায় ধূসর রঙের বাড়ির দিকে তর্জনী তুললেন৷ কর্নেল বাইনোকুলারে বাড়িটা দেখতে থাকলেন৷ আমি খালি চোখে যেটুকু দেখলুম—কুয়াশা অনেকটা পরিষ্কার; একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে৷ যার মাথার গড়ন ত্রিকোণ এবং থামগুলো প্রকাণ্ড৷ হ্যাঁ, একেই বলে ‘করিন্থিয়ান’ স্ট্রাকচার৷ স্থাপত্যবিদ্যায় আমার জ্ঞান নেই৷ আর কর্নেলের সঙ্গগুণে জানি—পুরোনো দিনের রাজা জমিদাররা নিজেদের বাড়ি সব সময় ইতালির করিন্থের স্থাপত্যের ধাঁচে গড়ে নিতেন৷ প্রজাদের শোষণ করে তাঁদের ভোগবিলাসের অন্ত ছিল না৷
কর্নেল এবং মিঃ পাণ্ডে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন৷ আমার এই ঠান্ডাটা সহ্য হচ্ছিল না৷ কারণ এই বারান্দায় প্রচণ্ড হাওয়া৷ আমি ঘরে ঢুকে দেখলুম, ঘরটা বেশ প্রশস্ত৷ দুটো সিঙ্গল খাট৷ একপাশে একটা সোফাসেট আর সেন্টার টেবিল৷ একটা ওয়ার্ডরোব আছে৷ তাছাড়া আছে একটা ইজিচেয়ার এবং কোণের দিকে টেবিল ল্যাম্প রাখা একটা চওড়া টেবিল৷ তার উল্টোদিকে জানলার কাছে একটা ডাইনিং টেবিল এবং তিনটে চেয়ার৷
যে লোকটা আমাদের ব্যাগেজ এনেছিল, সে ব্যাগেজ রেখে পূর্বের দরজাটা খুলে দিল৷ তারপর পরদা সরিয়ে হাসিমুখে তাকাল৷ দেখলুম একটা ব্যালকনি এবং সেখানে দুটো বেতের চেয়ার৷
লোকটাকে বললাম—তোমার নাম কী?
সে বলল—আমার নাম রঘুবীর স্যার৷ আমি আপনাদের দেখাশোনা করব৷ ওই স্যুইচটা টিপবেন, আমি এসে যাব৷ ম্যানেজার সাব আমাকে বলেছেন, এখন আপনারা কফি খাবেন৷ ন’টায় ব্রেকফাস্ট৷
বলে সে বুকপকেট থেকে নোটবই বের করে দেখে নিল৷ বললুম—বাঃ রঘুবীর, তুমি তো খুব মেথডিক্যাল লোক৷
ভেবেছিলুম সে ইংরেজি বুঝবে না৷ কিন্তু সে জানে৷ একটু হেসে বলল—আমি স্যার বেশি লেখাপড়ার সুযোগ পাইনি৷ তবে মিশনারি স্কুলে ক্লাস টেন অবধি পড়েছিলুম৷ স্কুলটা আমাদের গ্রামের কাছেই৷
বলে সে পূর্বদিকটা দেখিয়ে বলল —ওই যে ওখানে মিশনারিদের একটা সেটলমেন্ট আছে৷ ফাদার জনসন যতদিন ছিলেন, ততদিন আমি প্রাইমারি টিচার ছিলুম৷ ওনার পরে একজন নতুন ফাদার এলেন৷ তাঁর মেজাজ খুব খারাপ৷
তার কথা থেমে গেল৷ কর্নেল এবং মিঃ পাণ্ডে ঘরে ঢুকলেন৷ কর্নেল কিটব্যাগ আর বাইনোকুলার টেবিলে নামিয়ে রেখে সোফায় বসলেন৷
মিঃ পাণ্ডে বললেন—রঘুবীর, তুমি দেখো নিশ্চয়ই এতক্ষণ হট ড্রিঙ্কস রেডি হয়ে গেছে৷ তোমাকে তো আগেই বলেছি কর্নেল সাব বার বার কফি খান৷
সে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে কী জানি কেন একটা স্যালুট ঠুকল৷ তারপর ‘ঠিক হ্যায় স্যার’ বলে বেরিয়ে গেল৷
আমি রঘুবীর সম্পর্কে কিছু বলতে যাচ্ছিলুম৷ কিন্তু কর্নেল সে সুযোগ দিলেন না৷ তিনি বললেন—তাহলে মিঃ পাণ্ডে, আপনার ধারণা সত্যিই ব্যাপারটা অলৌকিক? অর্থাৎ দেবী চণ্ডীর প্রহরী এক দানব মাঝে মাঝে রাজবাড়িতে হানা দেয়?
মিঃ পাণ্ডে বললেন—গুজব শুনেছি৷ তবে গত সপ্তাহের ওই ঘটনার রাত্রে আমি রাইফেলের গুলির শব্দ শুনেছিলুম৷
কর্নেল বললেন—আপনি কি রাইফেল, বন্দুক এবং রিভলবার বা পিস্তলের গুলির শব্দ কোনটা কী ধরনের, তা বুঝতে পারেন?
মিঃ পাণ্ডের মুখে আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তা ফুটে উঠল৷ তিনি নিঃশব্দে হেসে বললেন—আমার বাবা ছিলেন এখানকার নামকরা শিকারি৷ আমার যৌবনে আমি ক্রমাগত শিকারি হাওয়ার চেষ্টা করেছিলুম৷ আমাদের বাড়িতে অনেক আগ্নেয়াস্ত্র ছিল৷ বাল্যকাল থেকে কোনটার কী আওয়াজ, তা আমার শেখা হয়ে গিয়েছিল৷ তারপর সরকার জন্তু-জানোয়ার না মারার হুকুম জারি করলেন৷ তখন থেকে আমি আর হাতে আর্মস তুলিনি৷ তবে এই এলাকায় রিজার্ভ ফরেস্ট আছে৷ সেখানে চোরাশিকাররিরা গোপনে নিজেদের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে৷ তাছাড়া ওই যে বলছিলাম স্যার—দুর্নীতি৷ চারদিকে দুর্নীতির অসুখ৷ এখন সৎ মানুষের টিকে থাকাই কঠিন৷
কর্নেল বললেন—তাহলে সে-রাতে রাজবাড়িতে কেউ রাইফেল থেকে গুলি করেছিল, এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিত?
মিঃ পাণ্ডে গম্ভীর মুখে বললেন—নিশ্চিত৷ তবে কথাটা আমি আপনাকেই বললাম৷ আমি চাই না যে এটা অন্য কারোর কানে যাক৷
এই সময় রঘুবীর দু’প্লেট পকোড়াসহ কফির পট এবং কাপ-প্লেট রেখে গেল৷ মিঃ পাণ্ডের জন্যেও একটা কাপ-প্লেট এসেছিল৷ তিনি একটু হেসে বললেন—আপনার মতো আমারও কফি পানের অভ্যাস আছে৷ তিনি নিজেই কফি ঢেলে তিন কাপ কফি তৈরি করে নিলেন৷
কফি খেতে খেতে কর্নেল বললেন, —তাহলে নিশ্চয়ই রাজবাড়িতে যিনি থাকেন, তাঁর রাইফেল আছে৷ এবং হয়তো তিনি চণ্ডীমাইজির প্রহরী দানবটাকে গুলি করে মারতে চেয়েছিলেন৷
মিঃ পাণ্ডের মুখে নিঃশব্দ হাসি ফুটে উঠল৷ তিনি চাপাস্বরে বললেন—ড. ত্রিপাঠীর সঙ্গে আমার কোনোদিন আলাপের সুযোগ হয়নি৷ কারণ উনি বাইরে খুব কম মেলামেশা করেন৷ সে-রাতে নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছিল, যাতে উনি রাইফেল ব্যবহার করেছিলেন৷
ঠিক এইসময় কর্নেলের ডান দিকে কোনো অদৃশ্য স্থানে টেলিফোন বেজে উঠল৷ আমি চমকে উঠেছিলুম৷ কিন্তু কর্নেল বিন্দুমাত্র অপ্রস্তুত না হয়ে হাত বাড়িয়ে একটা লাল টুকটুকে রিসিভার তুলে নিলেন৷ তারপর সাড়া দিলেন—হ্যাল্লো হালদারমশাই! সব ঠিক আছে তো?...ঠিক নেই? কেন?... আমরা এসে গেছি তা আপনাকে কি কেউ খবর দিয়েছে? নাকি নিজেই খোঁজ নিলেন?...হ্যাঁ নিজের বুদ্ধিতেই কাজ করা স্বাভাবিক৷ তাছাড়া বরাবরই দেখেছি আপনার সময়জ্ঞান নির্ভুল...ঠিক আছে, আপনি অন্যের অজ্ঞাতসারে ওঁকে জানিয়ে দিন আমরা এসে পৌঁছেছি এবং কোথায় আছি৷ আর ওঁকে বুঝিয়ে বলবেন আমাদের এভাবে থাকাটাই আমার কাজের পক্ষে নিরাপদ...আমরা ব্রেকফাস্টের পর ধরুন দশটার মধ্যে পৌঁছাব৷ ওঁকে গোপনে কথাটা জানিয়ে রাখবেন৷ উইশ য়ু গুড লাক৷
মিঃ পাণ্ডে বিস্মিত মুখে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ কর্নেল অবশ্য বাংলায় কথা বলছিলেন৷ তা হলেও মিঃ পাণ্ডে যে বাংলা মোটামুটি বোঝেন তা আগেই টের পেয়েছিলুম৷ তিনি সেইরকম নিঃশব্দে হেসে কর্নেলকে ভাঙা বাংলায় জিগ্যেস করলেন—এখানে কোনো হালদারমশাই এসেছেন? হু ইজ হি?
কর্নেল আগের মতোই ইংরেজিতে বললেন—উনি একজন প্রাক্তন পুলিশ ইনসপেক্টর৷ ওঁর হবি নানা জায়গায় তীর্থদর্শন৷ এখানে পাতালকালীর কথা শুনে উনি বেড়াতে আসবেন, সেটা আমাকে কলকাতাতেই জানিয়েছিলেন৷
মিঃ পাণ্ডে বললেন—উনি কোথায় উঠেছেন?
কর্নেল একটু হেসে বললেন—পুলিশ অফিসারদের হালচাল আপনি জানেন৷ কোন সূত্রে কলকাতায় ড. ত্রিপাঠীর সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়েছিল৷ তাই উনি রাজবাড়িতে উঠেছেন৷ আমি ওঁকে বলেছিলুম, আমাদের সঙ্গে চলে আসুন৷ কিন্তু সারা জীবন পুলিশের চাকরি করে ওঁর মধ্যে কিছু হঠকারী হালচাল জন্মে গেছে৷ তাই উনি আমাদের আগেই এখানে ছুটে এসেছেন৷ আমি অবশ্য ওঁকে বলেছিলাম, সারদা লেকে পাখি দেখতে আমিও যাচ্ছি৷
এই সময় উর্দিপরা একজন কর্মচারী এসে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে হিন্দিতে বলল—পাণ্ডেজি, নীচের অফিসে আপনার টেলিফোন এসেছে৷
পাণ্ডেজি তখনই আমাদেরকে নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন৷
আমি জিগ্যেস করলুম—কর্নেল, হালদারমশাই কোনো ঝামেলায় পড়েননি তো?
কর্নেল মৃদু হেসে বললেন—মনে হল পড়েননি৷ তবে তুমি পূর্বের ব্যালকনিতে গিয়ে গায়ে রোদ নাও৷ আমি আধঘণ্টার জন্য একটু এদিক-ওদিক ঘুরে আসি৷
কর্নেলের সঙ্গে যেখানেই গেছি, লক্ষ্য করেছি; উনি তাঁর থাকার জায়গায় চারপাশটা একটু ঘোরাঘুরি করে দেখে নেন৷ জিগ্যেস করলে উনি বলেছেন—শিকারি জন্তুদের ঠিক এই অভ্যাসটা আছে৷ তারা তাদের ডেরার চারদিকটা ঘোরাঘুরি করে চিনে রাখে৷ এটা ওদের আত্মরক্ষা বা আক্রমণের একটা সহজাত অভ্যেস৷ আমি মানুষ, কিন্তু সামরিক জীবনেও বিশেষ করে গেরিলা ওয়ারফেয়ারের ট্রেনিং-এ ঠিক এই ধরনের চক্কর দেওয়ার ট্রেনিং আমাকে নিতে হয়েছিল৷
ন’টায় ব্রেকফাস্টের পর আমরা দু’জনে নীচে গেলুম৷ মিঃ পাণ্ডে তাঁর অফিসে ছিলেন৷ আমাদের দেখে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন৷
কর্নেল বললেন—আপনি বসুন৷ আমরা একটু বেরুচ্ছি৷ জয়ন্ত খবরের কাগজের লোক৷ ওকে রুদ্রগড়ের হালচাল একটু দেখিয়ে আনি৷
মিঃ পাণ্ডে বললেন—আমাকে আপনার জন্য কী কী ব্যবস্থা করতে হবে, তা উপর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ মকবুল খান জিপ নিয়ে অপেক্ষা করছে৷
কর্নেল বললেন—না, না৷ কোনো নতুন জায়গা খুঁটিয়ে দেখতে হলে পায়ে হেঁটে কিংবা বড়োজোর সাধারণ কোনো যানবাহনে যাতায়াত করা উচিত৷ সাইকেল-রিকশা পেতে অসুবিধা নেই, আমি লক্ষ্য করেছি৷ আমরা আস্তেসুস্থে কখনো হাঁটব, ক্লান্ত হলে রিকশায় চাপব৷ আপনাকে সে-জন্য ভাবতে হবে না৷ আপনি রঘুবীরকে শুধু জানিয়ে রাখুন—
মিঃ পাণ্ডে বলে উঠলেন—আপনি দেড়টায় লাঞ্চ করেন, এটা আমাকে জানানো হয়েছে৷ আমি রঘুবীরকে সেই মতো নির্দেশ দিয়েছি৷ আর সে বাংলোয় থাকলে যতবার খুশি সে কফি সাপ্লাই করবে৷ আর আপনার ডিনার তো রাত দশটায়৷ ঠিক কি না?
কর্নেল হেসে উঠলেন—আচ্ছা একটা কথা—আমার ঘরে যে টেলিফোনটা যায়, সেটা কি ডাইরেক্ট না আপনার এই অফিসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া লাইন?
মিঃ পাণ্ডে বললেন—না কর্নেল সাব৷ উপরের চারটে স্যুইট-ই ভি. আই. পি.-দের জন্য সংরক্ষিত থাকে৷ চারটে লাইনই ডাইরেক্ট লাইন৷ অফিসের লাইনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই৷
আমরা বেরিয়ে এলুম৷ ড্রাইভার মকবুল খান আমাদের দেখে মিলিটারি স্যালুট ঠুকল৷ কিন্তু কর্নেল তাকে নিরাশ করে বললেন—আমরা পায়ে হেঁটে ঘুরব মকবুল৷ যখন দরকার হবে, দূরে কোথাও যাব তখন তুমি গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে যেও৷ এখন আমরা বড়োজোর বাজার এলাকা পর্যন্ত যাব৷
বলে গেটে দারোয়ানের আরও একটা সেলাম পেয়ে বেরিয়ে এলুম৷ এরপর সমতল রাস্তাটা প্রাইভেট রোড৷ এই রাস্তাটা গিয়ে চওড়া মসৃণ হাইওয়েতে পৌঁছেছে৷ ডাইনে ঘুরে আমরা কিছুটা এগিয়েই দেখলুম, রাস্তাটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে৷ মোটামুটি যানবাহনের ভিড় আছে৷ আদিবাসীদেরও লক্ষ্য করলুম৷ তারা দলবেঁধে সম্ভবত মেলায় যাচ্ছে৷ কারণ তাদের সঙ্গে নানা ধরনের হস্তশিল্প লক্ষ্য করলুম৷ উৎরাই-এর পর সমতলে ডানদিকে উঁচু প্রশস্ত জমির উপর আবার একটা প্রাইভেট রোড উঠে গেছে দেখলুম৷
কর্নেল বললেন—জয়ন্ত আমরা কোথায় এসেছি বুঝতে পারছ?
ডানদিকে অর্থাৎ পূর্বে তাকিয়েই দেখলুম প্রায় পঞ্চাশ মিটার দূরে একটা গেট দেখা যাচ্ছে৷ গেটের মাথার দু’দিকে দুটো সিংহের মূর্তি৷ তারপর দু’দিকেই উঁচু পাঁচিল৷ কর্নেলের পিছনে কয়েক পা হেঁটেই বুঝলুম আমরা রুদ্রগড়ের রাজবাড়িতে যাচ্ছি৷
কর্নেল বললেন—তোমাকে একটা কথা বলে নিই৷ তুমি যথারীতি কলকাতার বিখ্যাত বাংলা কাগজ ‘দৈনিক সত্যসেবক’-এর প্রতিনিধি৷ কিন্তু তোমার পক্ষ থেকে যে-ধরনের প্রশ্ন করা অনুচিত, তা করবে না৷
হাসতে হাসতে বললুম—বুঝেছি৷ মুখ বুজে থাকতে হবে৷ তা থাকব৷ আপনার কোনো ব্যাপারে আমি নাক গলাতে যাব কেন? তবে কর্নেল! আগে থেকেই বলে রাখছি৷ আমি তো কোনো জড়পদার্থ নই৷ এমন কোনো ব্যাপার এসে যেতে পারে যখন আমি কৌতূহল দমন করতে পারব না৷
কর্নেল বললেন—দ্যাটস রাইট ডার্লিং৷
আমরা গেটের সামনে পৌঁছেই দেখলুম, একজন বয়স্ক লোক গেটের রেলিঙের ওপাশ থেকে সেলাম ঠুকে হিন্দিতে জিগ্যেস করল—আপনি কি কর্নিল সাব স্যার? কলকাতা থেকে আসছেন?
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ৷ ড. ত্রিপাঠীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি৷
সে গেটের একটা অংশ খুলে দিল৷ আমরা ভিতরে ঢুকে দেখলুম, ‘করিন্থিয়ান’ স্থাপত্যের আশ্চর্য নমুনা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ ডানদিকে এবং বাঁ-দিকে দু’দিকেই একতলা ঘর৷ বাঁদিকের ঘরগুলোতে তালা লাগানো আর ডানদিকে একতলা কয়েকটা ঘরের মধ্যে তিনটে ঘরে তিনটে গাড়ি লক্ষ্য করলুম৷ গাড়ি-বারান্দার ওপর একজন বলিষ্ঠ গড়নের ফর্সা প্রৌঢ় ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন৷ তারপর নমস্কার করে বাংলার বললেন—আসুন কর্নেল সাহেব৷
তারপরই উনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷ ওঁর পরনে পাজামা এবং গায়ে জড়ানো শাল লক্ষ্য করেছিলুম৷ কিন্তু মাথায় কোনো টুপি বা মাফলার ছিল না৷
গাড়ি-বারান্দার তলায় যেতেই একজন আমার বয়সী কিন্তু আমার চেয়ে স্মার্ট এবং ফিল্মস্টারের মতো চেহারার এক যুবক আমাদের নমস্কার করে ঘরে ঢোকাল৷ সে নম্রকণ্ঠে বলল—আমার নাম অনিরুদ্ধ৷ কর্নেল সাহেব সম্ভবত ড. ত্রিপাঠীর কাছে আমার নাম শুনে থাকবেন৷
কর্নেল সহাস্যে বললেন—অবশ্যই শুনেছি৷ আমি তোমাকে কিন্তু তুমিই বলব৷ কারণ এই যে আমার সঙ্গে দেখছ, তোমার লাইনের না হলেও শিক্ষিত বাঙালির কাছে সুপরিচিত৷
অনিরুদ্ধ আমাকে অবাক করে করজোড়ে নমস্কার করে বলল—আপনি জয়ন্ত চৌধুরী! আপনার ‘দৈনিক সত্যসেবক’ পত্রিকার লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে৷
কর্নেল চাপাস্বরে বলে উঠলেন—কী সর্বনাশ! তাহলে অনিরুদ্ধ, তুমি আমাকে—
কর্নেলের কথার উপরে অনিরুদ্ধ বলে উঠল—ড. ত্রিপাঠী আমাকে আপনার কথা বলামাত্র আমি তাঁকে বলেছিলুম, কর্নেল সাহেবকে আমি মুখোমুখি না চিনলেও জানি৷ তিনি শুধু প্রকৃতিবিজ্ঞানী নন, একজন রহস্যভেদীও৷ আমি ট্রাঙ্ককলে জয়ন্তবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে কলকাতা যেতুম এবং কর্নেল সাহেবকে নিয়ে আসতে পারতুম৷ যাই হোক, চলুন উপরে যাই৷
ঘরের ভিতর থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে৷ কর্নেল আগে, তাঁর পেছন অনিরুদ্ধ এবং তার পেছনে আমি৷ সিঁড়িতে উঠতে উঠতে অনিরুদ্ধ একটু চাপা হাসল৷ তারপর বলল—আপনাদের আমি আর অনন্যা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স বলে জোক করতুম৷
কর্নেল সিঁড়িতে থমকে দাঁড়িয়ে মুখ ঘুরিয়ে বললেন—অর্থাৎ যে ভদ্রলোক এ বাড়িতে অতিথি হয়ে এসেছেন, তাঁর পরিচয় তোমরা পেয়ে গেছো৷
অনিরুদ্ধ একটু হেসে বলল—হ্যাঁ৷ হালদারমশাইকে যে কোনোদিন মুখোমুখি দেখতে পাব, ভাবিনি৷ তবে এখানে আসার পর ড. ত্রিপাঠী ওঁর যে পরিচয় দিলেন, তার বাইরে আমরা ড. ত্রিপাঠীকে কিচ্ছু জানাইনি৷
কর্নেল বললেন—তোমরা বুদ্ধিমান অনিরুদ্ধ৷
সিঁড়ির মাথায় ততক্ষণে একটা ছড়ি হাতে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন ড. অলোকেশ ত্রিপাঠী৷ তিনি কর্নেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বললেন—আমাদের এই বিষণ্ণ বাসস্থান আপনার আবির্ভাবে উজ্জ্বল এবং সাহসী হয়ে উঠল৷ আমি অবশ্য উপমা দিয়ে কথা বলতে ভালোবাসি৷ তা আপনি হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন৷ চলুন আমার ঘরে৷ আর অনিরুদ্ধ, ঠাকুরমশাইকে বলে দাও, শিগগির যেন উনি কফি আর কিছু স্ন্যাকস পাঠিয়ে দেন৷
তখন লক্ষ্য করিনি৷ এতক্ষণে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেখলুম, ড. ত্রিপাঠীর মুখে ফেঞ্চকাট সাদা দাড়ি এবং মাথায় একরাশ কাঁচা-পাকা এলোমেলো চুল৷ তিনি বারান্দা দিয়ে এগিয়ে পরদা তুলে দরজার ল্যাচ-কি চাবি দিয়ে খুললেন৷ তারপর আমাদের একটা ঘরের ভিতরে নিয়ে গেলেন৷ মুহূর্তের জন্য আমার মাথার ভিতর একটা কথা ভেসে উঠে মিলিয়ে গেল৷ ড. ত্রিপাঠী সাবধানী মানুষ৷ মাত্র কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়েছিলেন৷ কিন্তু দরজায় চাবি দিতে ভোলেননি৷ এই ধরনের ল্যাচ-কি কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টেও আছে৷ ভিতর থেকে বেরুনো যায়৷ কিন্তু বাইরে থেকে চাবি ছাড়া দরজা খুলে ঢোকা যায় না৷
প্রশস্ত ঘরের পূর্বদিক ঘেঁষে একটা উঁচু পালংকে বিছানা ও কয়েকটা বালিশ৷ দেখেই বুঝলাম, এটা তাঁর শয়নকক্ষ৷ একপাশে লেখার টেবিল-চেয়ার৷ টেবিলে একটা কম্পিউটার দেখলুম৷ দেওয়াল ঘেঁষে চারটে আলমারি বইয়ে ঠাসা৷ দেওয়ালে ইতস্তত কয়েকটা বড়ো ফোটোগ্রাফ৷ ড. ত্রিপাঠী এবং সম্ভবত একদল বিজ্ঞানীর মধ্যে বসে আছেন—কোনও প্রখ্যাত ব্যক্তি৷ —অধিকাংশই ইউরোপীয়৷
কর্নেলের ডাকে ঘুরে দাঁড়ালুম৷ তিনি মৃদু হেসে বললেন—জয়ন্ত! তুমি সাংবাদিক৷ কাজেই ড. ত্রিপাঠীর ক্রিয়াকলাপের পরিচয় খুঁজে দেখছ ছবির মধ্যে৷ ওই দেখো, আরও অনেক ছবি এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের মধ্যে ড. ত্রিপাঠী৷ এখন বসে পড়ো৷ তুমি জানতে চাইলে ড. ত্রিপাঠী ছবিগুলোর খবর তোমাকে বিস্তারিত জানিয়ে দেবেন৷
বিব্রতভাবে একটু হেসে সোফায় বসলুম৷ ড. ত্রিপাঠী কর্নেল ও আমার মুখোমুখি বসে বললেন—জয়ন্তবাবু ওসব ছবির খবর জেনে কী করবেন? আসল খবর তো অন্যত্র৷ হতভাগিনী চন্দ্রমুখী ছিল আমার এই বাড়ির গার্জেন৷ কিছু লেখাপড়া জানত৷ কিন্তু তার দাপট ছিল প্রচণ্ড৷ এ বাড়ির সর্বত্র তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকত সর্বক্ষণ৷ তার অপমৃত্যুতে আমি অসহায় বোধ করছি৷
কর্নেল বললেন—আপনি কি আপনার বিছানার পাশের জানলা দিয়েই সেই অদ্ভুত কালো দানবটিকে দেখতে পেরেছিলেন?
ড. ত্রিপাঠী বললেন—প্রথমে ওই জানলা দিয়েই টর্চের আলো ফেলেছিলাম৷ তারপর ভালো করে দেখার জন্য বিছানা থেকে নেমে গিয়ে ওই যে জানলাটা দেখছেন, ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম৷ যাই হোক আগে আপনি কফি খেয়ে নিন৷ তারপর ওসব কথা হবে৷
সেই সময় একজন বেঁটে রোগা চেহারার ভদ্রলোক ট্রে নিয়ে ঢুকে সাবধানে সেন্টার টেবিলে রাখলেন৷ তারপর আমাদের দু’জনের দিকে আড়চোখে চেয়ে বেরিয়ে গেলেন৷ লক্ষ্য করলুম, এত শীতেও তাঁর গায়ে একটি ফতুয়া আর মাথা থেকে গলা পর্যন্ত জড়ানো মাফলার৷ পরনে খাটো ধুতি৷ বুঝলুম ইনিই সেই ঠাকুরমশাই যিনি বাড়ির রান্নাবান্নার কাজ করেন৷
ড. ত্রিপাঠী দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন—অনিরুদ্ধ, তুমি একবার ল্যাবে গিয়ে দেখো৷ জেদি মেয়েটি আমার কথায় কান দিচ্ছে না৷ ওর নাকি কিচ্ছু হয়নি৷ ওকে ল্যাবের কাজ চালিয়ে যেতেই হবে৷
অনিরুদ্ধ মুখ বাড়িয়ে বলল—শি ইজ অলরাইট স্যার! আমি ল্যাব থেকে বেরিয়েই কর্নেল সাহেবদের আনতে গিয়েছিলুম৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—না, তুমি একটু ওকে চোখে-চোখে রাখো৷ ডাক্তার বলেছেন অনন্যার মনের জোর অসাধারণ, তাহলেও ওর সম্পর্কে আমরা যেন সজাগ থাকি৷
অনিরুদ্ধ চলে গেল৷ কর্নেল পট থেকে দুধ মেশানো কফি পেয়ালায় ঢেলে নিলেন৷ তারপর তিনি পেয়ালায় কফি ঢেলে নিলুম৷ তারপর ড. ত্রিপাঠী বললেন,—আমি মাননীয় গেস্টদের অনারে হাফ কাপ কফি খাব৷ কারণ আমার ইতিমধ্যে দু’পেয়ালা কফি খাওয়া হয়ে গেছে৷
বলে উনি কফিতে পেয়ালার অর্ধেকটা ভরে নিলেন৷ তারপর উঠে গিয়ে দরজার পরদা সরিয়ে বাইরেটা দেখে নিলেন এবং দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে ফিরে এলেন৷ চাপাস্বরে বললেন—আমার যা মানসিক অবস্থা হয়েছে, আমি এখন কাউকেও বিশ্বাস করতে পারছি না!
কর্নেল বললেন—আপনি চিঠিতে চন্দ্রমুখীর কথা লিখেছেন৷ তার ঘরে আপনার ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট অনন্যা থাকত৷ অনন্যা কি নিজের ইচ্ছায় তার কাছে থাকত নাকি চন্দ্রমুখী—
কর্নেলের কথার উপর ড. ত্রিপাঠী বললেন—চিঠিতে সব কথা লেখা যায়নি৷ সে-জন্যই মুখোমুখি কথা বলতে চেয়েছিলুম৷ চন্দ্রমুখী আমার বৈমাত্রেয় দিদি৷ আমার বাবার প্রথম পক্ষের স্ত্রী সুলোচনা সান্যালের মেয়ে চন্দ্রমুখী৷ চন্দ্রমুখীর দশ বছর বয়সে সুলোচনা হার্টফেল করে মারা যান৷ হার্টের অসুখ ওদের জন্মগত বলেই আমার ধারণা৷ আমার বাবা তারপর বিয়ে করেন পাটনায়৷ আমার মা মণিকুন্তলা ছিলেন বাঙালি ভট্টাচার্য পরিবারের মেয়ে৷ হ্যাঁ, আমার বাবার নাম ছিল কমলেশ ত্রিপাঠী৷ বাবা বেশি লেখাপড়ার সুযোগ পাননি৷ কারণ এই রাজবাড়ির অধীনে যেটুকু জমি ছিল, তা ঠাকুর্দার আমলেই বিক্রি হয়ে যায়৷ যাই হোক, বাবা চন্দ্রমুখীর বিয়ে দিয়েছিলেন কলকাতায়৷ কিন্তু মাতাল স্বামীর অত্যাচারে সে পালিয়ে আসে৷ তখন আমি পাটনা কলেজের ছাত্র৷ চন্দ্রমুখীর স্বামী পরে মত্ত অবস্থায় গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়৷ শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে চন্দ্রমুখীকে শুধু টেলিফোনে খবরটা জানানো হয়েছিল৷ স্বামীর সম্পত্তিতে তার অধিকার থাকলেও চন্দ্রমুখী তা দাবি করতে যায়নি৷
কর্নেল বললেন—তাহলে চন্দ্রমুখীই আপনাদের সংসারে গৃহিণী হয়ে ওঠেন৷ তাই তো?
ড. ত্রিপাঠী বললেন—হ্যাঁ৷ এরপর তো আমি নানা জায়গায় পড়াশোনা করেছি৷ কিছুদিন আমেরিকাতেও কাটিয়েছি৷ তখনো বাবা বেঁচে ছিলেন৷ আমি যখন হিউস্টনে জীববিজ্ঞানের অধ্যাপনা করছি, সেই সময় চন্দ্রমুখী বুদ্ধি করে আমাকে আমার এক কলিগের সাহায্যে খবর দেয়, আমার বাবা মারা গেছেন৷ সেই কলিগের নাম ড. বিষ্ণুকান্ত সহায়৷ ড. সহায় তখন রুদ্রগড় কলেজেই পড়াতেন৷ সেই সময় উনি আমেরিকার একটা য়ুনিভার্সিটি থেকে ফেলোশিপ পেয়েছিলেন৷ ওঁর যাবার দিনই আমার বাবার মৃত্যু হয়৷ তাহলে বুঝুন আমার দিদি চন্দ্রমুখী লেখাপড়া কম জানলেও বুদ্ধিমতী ছিল৷ সে ঠিকই খবর রাখত যে ড. সহায় আমেরিকা যাচ্ছেন৷ তাই তাঁর মুখ থেকেই আমি খবরটা পাই৷ তবে তাড়াতাড়ি ফিরতে পারিনি, তাই বাবার মুখাগ্নিও করতে পারিনি, যাই হোক এসব কথা বলে আপনাকে পারিবারিক ইতিহাস শুনিয়ে লাভ নেই৷
কর্নেল বললেন—আপনি চিঠিতে লিখেছিলেন, ঘটনার সময় কেউ গিয়ে চন্দ্রমুখীর ঘরে অনন্যাকে ডেকেছিল৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—অনন্যা সেটাও ঠিক করে বলতে পারছে না৷ মোট কথা, কেউ ডেকেছিল৷ আমি ডাকছি ভেবে সে দরজা খুলে দেয়৷ তারপরই আমার মতো চেহারার কেউ ওর মাথায় হাত রাখে৷
কর্নেল জিগ্যেস করলেন—তখন বারান্দায় আলো ছিল না?
—এটাই আশ্চর্য, হঠাৎ বাড়ির সব আলো নিভে গিয়েছিল৷ কাজেই অনন্যা ভুল দেখেছিল৷ এখন যে দুটি প্রশ্ন আমাকে সবসময় জ্বালিয়ে মারছে তা হল; কে এমন লোক আর তার হাতে কী এমন ছিল যে অনন্যার মাথায় স্পর্শ করতেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন, চন্দ্রমুখীর মতো সতর্ক মহিলার পক্ষেই আগে ঘরের আলো জ্বেলে দরজা খুলতে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল৷ যদি দেখত আলো জ্বলল না, তখন সে হাতে টর্চ নিত এবং আগে ভালো করে জেনে নিয়ে তারপর দরজা খুলত৷
কর্নেল জিগ্যেস করলেন—চন্দ্রমুখী যে হার্টফেল করে মারা গেছেন তা আপনি কখন জানতে পারলেন?
—হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠার পর৷ আমি অনিরুদ্ধকে নিয়ে প্রথমে নীচেয় গিয়েছিলুম৷ অনিরুদ্ধ ল্যাবের একটা মেশিন বন্ধ করে দিয়েছিল৷ লোডশেডিং হয় বলে ওটা সারাক্ষণ ব্যাটারিতে চালু ছিল৷ ওটাতে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া চালু ছিল৷ বাঁদরের কোষ৷ এরপর বাইরেটা দেখে-শুনে আমরা উপরে উঠে আসছি তখন অনিরুদ্ধ বলে উঠেছিল—এমন একটা কাণ্ড হল কিন্তু অনন্যা বেরুল না কেন? হ্যাঁ, আর একটা কথা বলা দরকার৷ আমি সঙ্গে রাইফেল নিয়ে গিয়েছিলুম৷ কেন আমি সঙ্গে রাইফেল রাখি, তার কারণ আপনাকে পরে জানাব৷ আমি আন্দাজেই এক রাউন্ড ফায়ার করেছিলুম৷
কর্নেল বললেন—তারপর আপনারা দোতলায় উঠে যান?
ড. ত্রিপাঠী বললেন— হ্যাঁ, আমার আগেই অনিরুদ্ধ অনন্যার ঘরে গেল৷ আপনি লক্ষ্য করেছেন, বাড়িটার দুটো দিক এল-এর মতো বেঁকে আছে৷
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ, বাড়িটার গঠন ইংরেজির E বর্ণের মতো৷
—ঠিক বলেছেন৷ ড. ত্রিপাঠী জোরে শ্বাস ছাড়লেন৷ তারপর ফের বললেন—তখন আলো জ্বলে উঠেছিল৷ অনিরুদ্ধ ঘরে ঢুকে অনন্যাকে দেখতে পায়নি৷ দেখেছিল আমার দিদি চন্দ্রমুখী মেঝেয় পড়ে আছে৷ শরীর একেবারে নিঃসাড়৷ তখনই আমি হসপিটালে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স পাঠাতে বললুম৷ যদিও পরীক্ষা করে বুঝতে পেরেছিলুম, দিদি মৃত৷
কর্নেল বললেন—এমন তো হতেই পারে, অনন্যা দরজা খোলার পর চন্দ্রমুখী দেবী বিছানা থেকে উঠে ঘটনাটা জানতে চেয়েছিলেন এবং সেই সময়ই হঠাৎ তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়৷
—য়ু আর রাইট কর্নেল সাহেব৷ হসপিটালের ডক্টর ঠিক একই কথা বলেছেন৷ কিন্তু যেহেতু আমি এই ঘটনায় আমার কোনো শত্রুপক্ষের হাত আছে ভেবে পুলিশে ফোন করেছিলুম, কাজেই সেই রাত্রে পুলিশও এসেছিল৷ তারাই আবিষ্কার করে, অনন্যা টেনিস কোর্টের পাশে পড়ে আছে৷ কিছুতেই তার জ্ঞান ফেরানো গেল না৷ তখন পুলিশ হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সে অনন্যাকে হসপিটালে পাঠিয়ে দিয়েছিল৷ ওদিকে দিদির বডিটা তখন মর্গে পাঠাবার ব্যবস্থা পুলিশই করে ফেলেছে৷ কিন্তু তার চেয়ে অবাক কাণ্ড, হসপিটালে পৌঁছবার পরই অনন্যার জ্ঞান ফিরেছিল৷ তবে পরদিন দশটায় অনিরুদ্ধ নিজের গাড়িতে তাকে হসপিটাল থেকে নিয়ে এসেছিল৷ আমি আরও অবাক হয়েছিলুম কারণ অনন্যা বলেছিল—আমাকে কেন হসপিটালে আনা হল৷
কর্নেল বললেন—আপনার শত্রুপক্ষের কথা বললেন৷ এ বিষয়ে আমি একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছি এ বাড়ি ছিল রাজবাড়ি এবং—
ড. ত্রিপাঠী বলে উঠলেন—হ্যাঁ৷ আর আমরা ছিলাম বংশপরম্পরায় এ বাড়ির বিগ্রহ শ্রীচণ্ডীমাইজির পুরোহিত৷ আমার বাবাও ছিলেন পুরোহিত৷ কিন্তু আমি নিজের জেদে পড়াশুনো করে এতদূর পৌঁছতে পেরেছি৷
কর্নেল বললেন—চণ্ডীমাইজির বিগ্রহ চুরি গিয়েছিল৷ এবং সেই রাজাবাহাদুর নাকি আপনার ঠাকুর্দাকে গুলি করে মেরেছিলেন৷
ড. ত্রিপাঠী চমকে উঠে নিষ্পলক দৃষ্টে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ তারপর বললেন— ড. বোস যা আমাকে বলেছিলেন, তা খুবই সত্য৷ আপনি ব্যাকগ্রাউন্ড জেনেই তবে এখানে পৌঁছেছেন!
কর্নেল কফি শেষ করার পর চুরুট ধরালেন৷ ড. অমলেশ ত্রিপাঠী পিছন দিকে হাত বাড়িয়ে বিছানার পাশে রাখা একটা গেল টেবিল থেকে একটা সিগারেটের বাক্স টেনে নিলেন৷ কর্নেল তাঁর সিগারেটে লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে দিলেন৷ ড. ত্রিপাঠী আস্তে বললেন—আমি স্মোকিং ছেড়ে দিয়েছিলাম৷ কিন্তু গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করার পর হার মেনেছি৷
কর্নেল একটু হেসে বললেন—স্মোকিং মানসিক উৎকন্ঠা বা উদ্বেগ; হ্যাঁ, কথাটা হচ্ছে টেনশন, টেনশন দূর করতে স্মোকিংয়ের মতো ওষুধ নেই৷ তো, আপনি বলছিলেন— আমি রাজবাড়ির ব্যাকগ্রাউন্ড কিছুটা জেনেই এসেছি৷ তবে সেটা রুদ্রগড় ডাকবাংলোর ম্যানেজার মিঃ পাণ্ডের কাছে৷ তিনি একটা কথা বলেছেন যেটার উত্তর আপনার কাছে পেয়ে গেছি৷
—কী কথা?
—ঘটনার রাত্রে মিঃ পাণ্ডে নাকি রাইফেলের গুলির আওয়াজ শুনেছিলেন৷ তা ছাড়া তিনি একটা গুজবের কথা বলেছিলেন৷ রাজবাড়িতে কখনো কখনো নাকি হারিয়ে যাওয়া চণ্ডীমাইজির এক অনুচর দানব এসে হানা দেয়৷ মিঃ পাণ্ডের মতে এমনও হতে পারে, দূরের জঙ্গল থেকে কোনো অজানা জন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে এ-বাড়িতে এসে হানা দেয়৷
ড. ত্রিপাঠী চোখ বুজে সিগারেট টানতে টানতে কথাগুলো শুনলেন৷ তারপর বললেন—আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় বাইরে কেটেছে৷ তবে বাবার কাছে শুনেছিলুম, কী একটা সাংঘাতিক জন্তু নাকি ঠাকুরবাড়ির দেওয়াল ডিঙিয়ে একবার ঢোকার চেষ্টা করেছিল৷ বাবা বাড়ির লোকেদের ডেকে হৈ-হুল্লোড় করার পর সেটা পালিয়ে গিয়েছিল৷ তবে বাবা বলেছিলেন, চোখের ভুলও হতে পারে৷ তবে আমি যেন একটা কিংকঙের সাইজের জন্তুকে দেখেছিলুম৷ আমি অবশ্য বাবার কথা বিশ্বাস করিনি৷ বাবা সব ব্যাপারেই একটু বাড়িয়ে বলতেন৷ তা ছাড়া আপনার কাছে বলতে দ্বিধা নেই, বাবা আত্মরক্ষার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে সাধাসাধি করে একটা রাইফেলের লাইসেন্স করিয়েছিলেন৷ আমার বিছানার পাশে সেই রাইফেলটা রাখা আছে৷
কর্নেল বললেন—তাহলে আপনি আপনার বাবার রাইফেলের লাইসেন্স নিজের নামে করিয়েছিলেন৷ কিন্তু আপনি কি ঘটনার আগে অবধি কোনো দানাবাকৃতির জন্তুকে বাড়ির কাছাকাছি কখনো দেখেননি?
ড. ত্রিপাঠী গম্ভীর মুখে বললেন—না৷ তবে বুঝতেই পারছেন, আমি একজন জীববিজ্ঞানী৷ বিশেষ করে জিনোম প্রজেক্ট নিয়েই আমি কাজ করছি৷ ঘটনার রাতে কালো পাথরের গড়নের একটা অস্পষ্ট দানবীয় প্রাণীর অবয়ব দেখে প্রথমেই আমার মনে হয়েছিল যে, আমি যে বিশেষ প্রজাতির বাঁদরের কোষ বিভাজন নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছি এবং এ ব্যাপারে অনেকটা সাফল্যও পেয়েছি; কাজেই হয়তো আমারই ল্যাবে কোনো বিশেষ রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবে কোষ বিভাজন হতে হতে সত্যি অবশেষে একটা দানবিক গড়নের প্রাণী জন্ম নিয়েছে এবং দরজা খুলে বেরিয়ে মুখ দিয়ে ঝড়ের মতো শনশন শব্দ করছে এবং তার শরীরও ঘুরপাক খাচ্ছে৷ আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না৷ আমি ছবি আঁকতে জানি না তবে অনেক গ্রাফ, চার্ট তৈরি করতে পারি, এই পর্যন্ত৷
কিছুক্ষণ পরে নীরবতা ঘনিয়ে এল৷ কর্নেল সোফায় হেলান দিয়ে চুরুট টানছেন৷ ওদিকে ড. ত্রিপাঠী সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে রেখে দু’হাতের আঙুলে আঙুল জড়িয়ে চুপচাপ অ্যাশট্রের দিকে তাকিয়ে আছেন৷ তারপর নীরবতা ভেঙে গেল কর্নেলের কণ্ঠস্বরে—আপনি রাইফেল ছুঁড়েছিলেন, কিন্তু জন্তুটার গায়ে গুলি লাগেনি, সেটা আপনার চিঠি পড়েই বুঝেছিলুম৷ অনিরুদ্ধকে নিয়ে প্রথমে ল্যাবে ঢূকেছিলেন৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—হ্যাঁ৷ তবে আমার মাথা কাছ করছিল না৷ অনিরুদ্ধই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল৷ তারপর সে একটা মেশিন বন্ধ করে দেয়৷ আগেই বলেছি, সেটা ব্যাটারিতে চলে৷ তারপর দরজা খুলে দেখি, কেউ কোথাও নেই৷ তারপর আলো জ্বলে ওঠে৷ এবং পিছনের খোলামেলা বারান্দায় কোনো প্রাণীর পায়ের ছাপ বা গায়ের লোম কিছুই দেখতে পাইনি৷ তখনো জানতুম না অনন্যা কী করছে৷
কর্নেল বললেন—আপাতত এই শেষ৷ আমি আপনার ল্যাবের ভেতরটা এবং ওদিকের দরজার বাইরেটা একটু দেখতে চাই৷ তবে আপনাকে কষ্ট করে সঙ্গ না দিলেও চলবে৷ আপনি অনিরুদ্ধকে ডেকে কথাটা বলে দিন৷
ড. ত্রিপাঠী হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠলেন৷ বললেন—না, আমি আপনাদের নিয়ে যাচ্ছি৷ অনিরুদ্ধ আমাদের সঙ্গে থাকবে৷
কর্নেল বারান্দায় বেরিয়ে বললেন—অনন্যার সঙ্গে কি আজ কথা বলা যাবে?
ড. ত্রিপাঠী বললেন—হ্যাঁ৷ সে নিজেকে সুস্থ ভাবছে এবং কাজও করতে চাইছে৷ কিন্তু তাকে আমি বিশ্রাম নিতে বলেছি৷ সে আমার পাশের ঘরেই আছে৷
কর্নেল বললেন—অনন্যার বাবা-মা বা আত্মীয়রা নিশ্চয়ই এই দুর্ঘটনার খবর পেয়েছিলেন৷ তাঁদের কি রি-অ্যাকশন?
ড. ত্রিপাঠী বললেন—বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে৷ ওর বাবা নিজেও একজন ডাক্তার৷ তাঁর মতে অনন্যাকে কোনো সাইক্রিয়াট্রিক ডাক্তারকে দেখানো উচিত ছিল৷ এমনও হতে পারে নিজের অজান্তে Somnum-buliasm (সোমনাম বুলিয়াজিম) অর্থাৎ Sleep-walking বা ঘুমের মধ্যে হেঁটে-বেড়ানো রোগে সে আক্রান্ত হয়েছে৷ এসব রোগীরা ঘুমের ঘোরে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় এবং কোথাও গিয়ে শুয়ে পড়ে, অজ্ঞান হয়েও যায়৷
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ৷ উনি অত্যন্ত বিচক্ষণ মানুষ, তা বুঝতে পারছি৷ আপনার দিদির হার্ট অ্যাটাক আর অনন্যার ঘুমের ঘোরে দরজা খুলে দেওয়া থেকে শুরু করে বাকি সবটাই ওই ধরনের মানসিক অসুখের ফল হতে পারে৷
অনিরুদ্ধ বারান্দার একটা থামের পাশে রেলিঙে হেলান দিয়ে গেটের দিকে তাকিয়ে ছিল৷ আমাদের সাড়া পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—অনিরুদ্ধ, তুমি আমাদের সঙ্গে এসো৷ সে-রাতের মতো আমরা ল্যাবে ঢুকব৷ যে মেশিনটা তুমি বন্ধ করেছিলে, সেটা কর্নেলকে দেখাব৷
অনিরুদ্ধ সঙ্গে এল৷ নীচের তলায় নেমে ড. ত্রিপাঠী একটা ঘরের ভারী তালা খুললেন৷ আমরা ঘরে ঢুকলে উনি সেটা বন্ধ করে দিলেন৷ হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি উনি আসার সময় নিজের ঘরটা তালাবন্ধ করে এসেছিলেন৷ ঘরের মধ্যে প্রচুর জার৷ কিম্ভূতকিমাকার যন্ত্র৷ মধ্যিখানে খানিকটা জায়গায় কোনো যন্ত্র নেই৷ এই ঘরটার পর একটা পরদা দেখা গেল৷ পরদাটা ড. ত্রিপাঠী সরাতেই দেখলাম সেখানে কোনো কপাট নেই৷ কারণ দু’পাশ দিয়ে দুটো পাইপ ওই ঘরে ঢুকেছে৷ তারপর সব কী অবস্থায় আছে, বুঝতে পারলুম না৷ কিন্তু এই ঘরটায় চারটে বড়ো জারের সঙ্গে কাচের নল যুক্ত করা আছে৷ এবং নানা রঙের রাসায়নিক তরল পদার্থ নলের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করছে৷ আমি এসব কিছুই বুঝলুম না৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—আমাদের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ এই ল্যাবে হয়৷ কোষ বিভাজন থেকে শুরু করে ডি.এন.এ অণুর গড়নের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং আপনি নিশ্চয়ই জানেন, জিনের আকার কতকটা ছড়িয়ে থাকা মালার মতো৷ এবং খালি চোখে তা দেখা সম্ভবই নয়৷ এই জিনের মধ্যে আছে ডি. এন. এ এবং আর. এন. এ—এই দুই রকমের রাসায়নিক পদার্থ৷ ওগুলো কমপিউটারের চার্টের হিসেবে আমরা বুঝতে পারি৷ এই ল্যাবের যন্ত্রগুলো দামি বিদেশি ব্যাটারি দিয়ে চালু রাখতে হয়েছে কারণ এক মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ অফ হলে সব আবার নতুন করে করতে হবে৷ অনিরুদ্ধ, তুমি মেশিনটা দেখিয়ে দাও৷
অনিরুদ্ধ একটা জটিল অষ্টাবক্রর মতো কাচের আধারের এক প্রান্তে একটা স্যুইচ দেখিয়ে বললে—এটা বন্ধ করলে শুধু এই যন্ত্রের কাজ বন্ধ থাকবে৷ কারণ এইটি হচ্ছে জিনোম প্রজেক্টের লাস্ট স্টেপের মেশিন৷ এই যে দেখছেন এটার গায়ে একটা গোলাকার চিহ্ন, প্রজেক্টের কাজ সম্পূর্ণ হলে এখান দিয়ে বেরিয়ে আসবে সেই প্রজাতির বাঁদরের অবিকল নকল একটা জন্তু৷ যদিও আমরা সেই চরম পর্যায় থেকে এখনো অনেক অনেক পেছিয়ে আছি৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে৷ স্টেম-সেল বিষয়ে আপনাকে এ সময় কিছু বোঝাতে চাই না৷ তবে আমরা এক্ষেত্রেও সফল হয়েছি৷
কর্নেল ডানদিকে তাকিয়ে বললেন—ওই দরজাটা সে-রাতে আপনারা খুলে বেরিয়েছিলেন৷ বলে কর্নেল নিজেই এগিয়ে গেলেন৷ কিন্তু অনিরুদ্ধ একটু হেসে বলল—কর্নেল সাহেব, ওটা এমনি খোলা যাবে না৷ ওটা খোলার একটা বিশেষ ব্যবস্থা আছে৷
বলে সে ড. ত্রিপাঠীর দিকে ঘুরল—স্যার আপনি নিজেই দরজাটা খুলে দিন৷
ড. ত্রিপাঠী চাবির গোছা থেকে একটা অদ্ভুত গড়নের চাবি বের করে ডানদিকে ঢুকিয়ে দিলেন৷ তারপর চাবিটা বের করে নিতেই দরজাটা আস্তে আস্তে বাঁ-দিকের দেওয়ালে ঢুকে গিয়েছিল৷ দেখেই বুঝেছিলুম, ওটা লোহা বা ইস্পাতের৷ ওটার চৌকাঠ কাঠের নয়, স্টেনলেস স্টিলের৷ বাইরে থেকে এক ঝলক রোদ এবং বাতাস এসে ঘরে ঢুকল এবং আমার দম-আটকানো ভাবটা দূর হয়ে গেল৷ আমরা সেই দরজার বাইরে গিয়ে দেখলুম, প্রায় ছ’ফুট চওড়া উঁচু বারান্দা বাড়ির পেছন দিকে পুরোটা বিস্তৃত হয়েছে৷ এদিকে সেই করিন্থিয়ান পিলার অর্থাৎ প্রকাণ্ড স্তম্ভগুলো এই বারান্দা থেকেই উঠে দোতলার ছাদ অবধি পৌঁছে গেছে৷ দরজার সামনে কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে নেমে কর্নেল ঘাসের ওপর চোখে বাইনোকুলার এঁটে কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক হাঁটাহাঁটি করলেন৷ তারপর বাঁ-দিকে ঘুরে বললেন—ওটাই বোধহয় আপনাদের ঠাকুরবাড়ি?
ড. ত্রিপাঠী বললেন—হ্যাঁ৷ আপনি কি ওদিকটায় যেতে চান?
কর্নেল বললেন—একটু ঘুরে দেখতে চাই৷
ড. ত্রিপাঠী অনিরুদ্ধকে মৃদুস্বরে কিছু বললেন, আমার কানে এল না৷ অনিরুদ্ধ বাইরে গিয়েই উত্তরে এগিয়ে গেল৷ আমি দেখছিলুম, এদিকেও জেলখানার মতো উঁচু পাঁচিল৷ এবং এতক্ষণে স্পষ্ট বুঝতে পারলুম যে পাঁচিল পাথর দিয়ে গাঁথা৷ কোথাও কোথাও ক্ষয়াটে চিহ্ন চোখে পড়ছিল৷ আর ওদিকে মন্দিরের চূড়ায় ত্রিশূল দেখা যাচ্ছিল৷ আমাদের সামনেই কয়েক হাত এগিয়ে গেলে একটা উঁচু দরজা৷ ড. ত্রিপাঠী এগিয়ে গিয়ে সেই দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ বললেন—এদিকটায় আমি কদাচিৎ আসি৷ ঠাকুরমশাই রোজ পুজো করেন৷ তাঁর কাছেই দরজার চাবি আছে৷
এই দরজাটা কাঠের তৈরি, কিন্তু সুন্দর নকশা খচিত৷ কতকাল পালিশ হয়নি, ধূসর হয়ে আছে৷ এদিকে কর্নেল কিন্তু চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন না৷ বারান্দার নীচে এদিক-ওদিকে আতস কাচ দিয়ে ঘাসের ভিতর কী খুঁজছিলেন, তিনি নিজেই জানেন না৷ তারপর দক্ষিণ দিকটা নির্দেশ করে বললেন—ওইদিকটা টেনিস কোর্ট?
ড. ত্রিপাঠী বললেন—হ্যাঁ৷ অনন্যা কোথায় পড়ে ছিল, আপনি কি এখন দেখতে চান, না পরে দেখবেন? অনিরুদ্ধ ঠাকুরমশায়ের কাছে চাবি আনতে গেছে৷
এই সময় দেখা গেল, অনিরুদ্ধ টেনিস কোর্টের পাশ দিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে৷ তার হাতে একটা রিং-এ কয়েকটা চাবি৷ সে একটু হেসে বলল—ঠাকুরমশাই নিজে অন্য দিনের মতো দরজা খুলতে এলেন না৷ আমি ওঁকে ঠাট্টা করে বললুম—আমার হাতে চাবি অপবিত্র হয়ে যাবে না তো ঠাকুরমশাই? উনি গম্ভীর মুখে বললেন—গঙ্গাজলে ধুয়ে শুদ্ধ করে নেব৷ এখন আমার ওদিকে যাওয়ার সময় নেই৷
অনিরুদ্ধ চাবির গোছাটা ড. ত্রিপাঠীর হাতে দিল৷ ড. ত্রিপাঠী এগিয়ে গিয়ে তালা খুলতেই বুঝলুম তিনি ঠাকুরবাড়ির এদিকে নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে আসেন৷ দরজা খুলে আমরা বেরিয়ে গিয়ে দেখলুম বাঁ-দিকে একটা দীঘির মতো বিশাল পুকুর৷ এখনো কিছু কিছু পদ্মফুল ফুটে আছে কিন্তু পুরোটাই পাতা পচে বিক্ষত দেখাচ্ছে৷ অজস্র পদ্মকুঁড়ি মাথা উঁচু করে আছে৷ এই এলাকাটা নিচু পাঁচিল এবং কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা৷ দীঘিতে বাঁধানো ঘাট আছে৷ আমরা দীঘির দক্ষিণ দিকে ঘুরে দেখলুম, সামনেই বিশাল উঁচু মন্দির৷ মন্দিরের চারদিকে প্রায় ফুট ছয়েক উঁচু সংকীর্ণ বারান্দা৷ নীচে একটা হাঁড়িকাঠ পোঁতা আছে৷ বাঁ-দিকে বেশ কিছুটা প্রশস্ত জমি৷ সেখানে নানা রকম ফুল আর সবজির মাচান৷ মন্দিরের পিছন দিকে এলাকাটা ওইরকম পাঁচিল আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা৷
ড. ত্রিপাঠী মৃদুস্বরে বললেন—কিছু মনে না করেন তো পায়ের জুতো খুলতে বলব৷
কথাটা বলেই তিনি হাসবার চেষ্টা করলেন—আসলে আমরা কেউ অবিশ্বাসী হলেও এ বাড়ির একটা ঐতিহ্য আছে৷ সেটা পালন না করে পারি না৷
কর্নেল তাঁর পায়ের গাবদা জুতো সহজেই খুলে ফেললেন৷ আমিও খুললুম৷ অনিরুদ্ধ পায়ের স্যান্ডেল খুলে বলল—ঘটনার পরদিন আমি পুলিশের সঙ্গে ঠাকুরবাড়িতে ঢোকার সুযোগ পেয়েছিলুম৷ সেই প্রথম আর আজ এই দ্বিতীয়বার এখানে এলুম৷
ড. ত্রিপাঠী হাঁড়িকাঠের পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মন্দিরের দরজা খুললেন৷ তিনি সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন৷ দেখলুম সিঁদুরে সিঁদুরে উজ্জ্বল লাল একটা প্রায় অবয়বহীন মূর্তি৷ তাঁর মাথায় একটা মুকুট বসানো আছে কিন্তু সেটা সোনার বলে মনে হল না৷ পরে অবশ্য অনিরুদ্ধ আমাদের জানিয়েছিল, ওটা নকল সোনা৷
ড. ত্রিপাঠী করজোড়ে প্রণাম করে কর্নেলকে বললেন—এই মূর্তিটা আমার বাবা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷ এটা পাথরের বিগ্রহ এবং এটা নাকি তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়ে ঠাকুরপুকুরের জলের তলায় আবিষ্কার করেন৷ আমি অবশ্য এসব কিছুই দেখিনি৷ শোনা কথা৷ ঠাকুরমশায়ের তখন তরুণ বয়স৷ উনি সবটা জানেন৷
কর্নেল উঁকি মেরে ভেতরটা দেখার পর নেমে গেলেন৷ আমি কী জানি কেন—আজও জানি না, হঠাৎ করজোড়ে প্রণাম করে ফেললুম৷ নেমে আসার পর দেখলুম, অনিরুদ্ধও করজোড়ে প্রণাম করছে৷ মন্দিরে তালা লাগিয়ে তারপর আবার যে-যার জুতো পরে আমরা ঠাকুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলুম৷ পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন—পূব দিকটায় খোলা মাঠ দেখছি৷ আমার ধারণা, রাজাদের আমলে চণ্ডীমাইজির পুজো উপলক্ষে এখানেই মেলা বসত৷
পুকুরের উত্তর দিকে বড়ো বড়ো পাথর, ঝোপঝাড়৷ তারপর একটা প্রায় ন্যাড়া ত্রিকোণ টিলা দাঁড়িয়ে আছে৷ কালো গ্রানাইট শিলা৷ তার কাঁধের কাছে কী একটা গাছ উঠেছে৷ সেই গাছে এক ঝাঁক সারস জাতীয় পাখি বসে আছে৷ কর্নেল দ্রুত পুকুরের পাড় দিয়ে এগিয়ে টেলিলেন্স ফিট করে ছবি তুলতে গেলেন৷
ড. ত্রিপাঠী একটু হেসে বললেন—উনি পক্ষীবিজ্ঞানী, আমি প্রথম পরিচয়ের পর একটুকুই জেনেছিলুম৷ এতদিন পরে মনে হচ্ছে, ওঁর ওই প্রকৃতি বাতিক ছদ্মবেশ ধরার মতো কোনো ব্যাপার নয়৷
আমি বললুম—আপনি যদি প্রকৃতি সংক্রান্ত বিদেশি পত্রিকা পড়েন, বিশেষ করে আমেরিকান ‘নেচার’, মাঝে মাঝে দেখবেন কর্নেল এন সরকারের লেখা সচিত্র প্রবন্ধ৷
অনিরুদ্ধ চুপ করে থাকতে পারল না৷ সে বলল—‘নেচার’ কেন, আরও অনেক পত্রিকায় আমি ওনার প্রবন্ধ পড়েছি৷ উনি একজন লেপিডপ্টারিস্টও বটে৷
ড. ত্রিপাঠী অবাক হয়ে বললেন—তুমি কর্নেল সাহেবকে তাহলে চিনতে?
অনিরুদ্ধ বিব্রত মুখে বলল—চিনতুম মানে নামে জানতাম৷ তা ছাড়া একবার দিল্লিতে আমার ছাত্রজীবনে কর্নেল সাহেবকে একটা বিজ্ঞান বিষয়ক সম্মেলনে বক্তৃতা করতে শুনেছিলাম৷
ড. ত্রিপাঠী হাসবার চেষ্টা করে বললেন—কী অদ্ভুত! তুমি তাহলে কর্নেল সাহেবকে এর আগেও স্বচক্ষে দেখেছ? কিন্তু তুমি কি জানতে, উনি একজন রহস্যসন্ধানী এবং অপরাধ-বিজ্ঞানীও বটে?
—জানতুম না স্যার৷ আপনার মুখে গত সপ্তাহেই শুনেছিলুম, জনৈক কর্নেল সাহেব সে-রাতের রহস্য নিয়ে তদন্ত করতে আসবেন৷ কিন্তু আমি ঘুণাক্ষরের বুঝতে পারিনি যে ইনি সেই কর্নেল সাহেব৷
ততক্ষণে কর্নেল আমাদের কাছে চলে এসেছেন৷ বললেন—দেশি প্রজাতির সারস৷ তবে এদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে৷ কারণ এদের মাংস নাকি খুব সুস্বাদু৷ যাই হোক, চলুন ভেতরে যাওয়া যাক৷ ড. ত্রিপাঠী, আপনি বরং আপনার ল্যাব হয়ে ওপরে চলে যান৷ আমি অনিরুদ্ধকে নিয়ে টেনিস কোর্টটা দেখে আসি৷
একটু দ্বিধান্বিত হয়ে ড. ত্রিপাঠী বললেন—ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি৷ আপনাদের জন্য অপেক্ষা করব৷
কর্নেল বললেন—সম্ভব হলে অনন্যাকে আপনার ঘরে ডেকে পাঠালে ভালো হয়৷ আমার ধারণা, যে-কোনো কারণেই হোক সে আমার সঙ্গে আলাপে তত ব্যগ্র নয়৷
কথাটা বলে তিনি হেসে উঠলেন৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—না, অনন্যা এখন ল্যাবের কাজ করে৷ তবে সে পড়াশোনা নিয়েই কাটায়৷ আমি তাকে কিছু থিয়োরির কাজকর্ম দিয়েছি৷ ওকে যেন ভুল বুঝবেন না৷ আসলে মেয়েটি যাকে বলে কাজপাগলা, সেই টাইপের৷
ড. ত্রিপাঠী বারান্দায় উঠে ল্যাবের দরজা বাইরে থেকে খুলে ভেতরে ঢুকলেন৷ আমরা তিনজনে এগিয়ে চললুম টেনি লনের দিকে৷ বাড়ির দক্ষিণ অংশ অনেকটা ফাঁকা এবং চওড়া৷ পাঁচিলের ধার ধরে সারবন্দি দেবদারু গাছ, ডানদিকে একটা জলের ইঁদারা৷ ইঁদারাটা ঢাকা৷ পাশেই পাম্পঘর৷ টেনিস কোর্টের ডানদিকে সারবদ্ধ ফুলের গাছ৷ সেগুলোর উচ্চতা দু’আড়াই ফুটের বেশি নয়৷ অনিরুদ্ধ আমাদের নিয়ে গেল টেনিস কোর্টের মাঝামাঝি বাঁ-দিকে উঁচু দেওয়ালের কাছাকাছি ঘাসে ঢাকা জায়গায়৷ সে চাপাস্বরে বলল—অনন্যা ঠিক এখানেই ঘাসের ওপর পড়ে ছিল৷
কর্নেল হাঁটু দুমড়ে বসলেন৷ তারপর প্রথমে বাইনোকুলারে পরে আতসকাচ দিয়ে তন্ন তন্ন কীসব খুঁজতে লাগলেন৷ অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল৷ আমি আমার বৃদ্ধ বন্ধুর কাজকর্ম জানি৷ উনি এমন একটা ছোটোখাটো জিনিস খুঁজছেন যা চোখ এড়িয়ে যায়৷ এ নিয়ে মাথা ঘামাতে গেলে আমার মাথা খারাপ হয়ে যাবে৷ তাই চুপ করে দাঁড়িয়ে বিদেশি স্থাপত্যের নিদর্শনের দিকে তাকিয়ে রইলুম৷ দোতলার ওপরে ঘুলঘুলিতে এবং ছাদে যে অসংখ্য পায়রা আছে, তা বুঝতে পারলুম৷ ততক্ষণে প্রায় এগারোটা বেজে গেছে৷ রোদে স্নিগ্ধ উষ্ণতা টের পাচ্ছি৷ অনিরুদ্ধকে চাপাস্বরে জিগ্যেস করলুম—অনন্যা কি সেই ঘরেই থাকেন যে ঘরেই থাকেন যে ঘরে চন্দ্রমুখী মারা গিয়েছিলেন৷
অনিরুদ্ধ তেমনি চাপাস্বরে বলল—না৷ স্যারের বেডরুমের পরের ঘরেই অনন্যা থাকে৷ ওকে দেখাশোনার জন্য প্রায় এক সপ্তাহ ধরে দিনে এবং রাতে দু’জন নার্সের ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ তারা নিছক অনন্যার সঙ্গিনী হিসাবে থাকত৷ কাল থেকে অনন্যা নিজেই তাদের বিদায় দিয়েছে৷ সে আবার আগের মতো কাজ করতে চায়৷
বললুম—অনন্যা তাহলে সাহসী মেয়ে৷ কী বলেন?
অনিরুদ্ধ ঠোঁটের কোণে হেসে বলল—শুধু সাহসীই নয়, ভীষণ জেদি, দুঃসাহসীই বলতে পারেন৷ আমার বিশ্বাস, সে সুযোগ পেলে কর্নেল সাহেবের মতো অ্যাডভেঞ্চারার হয়ে উঠত৷ স্টুডেন্ট লাইফে সে দক্ষ অ্যাথলিট ছিল৷
বললুম—তাহলে সে-রাতে কেউ তাকে নিশ্চয়ই কোনো ওষুধের সাহায্যে অজ্ঞান করে কোনো উদ্দেশ্যে ওখানে নিয়ে গিয়েছিল৷
অনিরুদ্ধ বলল—আপনার কথায় আমার সায় আছে৷ সামবডি প্ল্যানড টু রেপ হার৷
চমকে উঠে বললুম—বলেন কী! আমি তো শুনেছি শি ওয়াজ নট রেপড৷
অনিরুদ্ধ বলল—দ্যাটস ফ্যাক্ট৷ যে কোনো কারণেই হোক, বাড়িতে হৈ-হল্লা শুরু হওয়ায় এবং আলো জ্বলে ওঠায় সে দেবদারু গাছে উঠে পালিয়ে যায়৷
কথাটা বলেই সে তর্জনী তুলে কর্নেলকে দেখাল—পুলিশ মাথা ঘামায়নি, কিন্তু দেখুন— কর্নেল সাহেব একটা গাছের দিকে তাকিয়ে আছেন৷ আমারও চোখে পড়েছিল৷ কিছু কাঁচা পাতা নীচে পড়ে ছিল৷ আমার বিশ্বাস, কর্নেল সাহেব কিছু বুঝতে পেরেছেন৷
লক্ষ্য করলুম, কর্নেল ওখান থেকে এগিয়ে আসছেন৷ সেই সময় আমি আগের মতো চাপাস্বরে জিগ্যেস করলুম—আচ্ছা অনিরুদ্ধবাবু, আপনার বা আমার কথার সূত্রেই প্রশ্নটা উঠে আসছে৷ বাড়ির বাইরে থেকে যদি কেউ ওই অসৎ উদ্দেশ্যই বাড়িতে ঢুকে থাকে তাহলে এ বাড়ির নাড়ি-নক্ষত্র নিশ্চয়ই তার জানা আছে৷ আবার এ বাড়িতে যারা থাকে, তাদের মধ্যেও কেউ এই প্ল্যানটা করে থাকতে পারে৷
অনিরুদ্ধ বলল—এ বাড়িতে দারোয়ান এবং ঠাকুরমশাই ছাড়া রাত কাটাই শুধু আমি৷ ড. ত্রিপাঠীর অফিসিয়াল কাজকর্ম করার জন্য আনন্দপ্রসাদ নামে একজন ভদ্রলোক দশটা-পাঁচটা অফিস করার জন্য যাতায়াত করেন৷ সাংসারিক অন্যান্য কাজকর্ম চন্দ্রমুখী দিদি করতেন৷ এই যে এতসব ফুলের গাছ এবং নানা ধরনের গাছের বাগান দেখছেন এসবই দিদির হাতের কাজ৷ কিন্তু আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তরে শুধু এইটুকুই বলতে পারি, দারোয়ান এবং আনন্দবাবু দু’জনেই বয়সে প্রবীণ৷ দারোয়ানের ছেলে-বউ আছে৷ তারা দু’সপ্তাহ আগে বাপের বাড়ি গেছে৷ সেখান থেকে নাকি কোথায় তীর্থে যাবে৷ এখানে ফিরতে শুনেছি প্রায় মাসখানেক লেগে যাবে৷ দারোয়ান স্যারের হুকুমে আমাদের সঙ্গেই খায়৷ কাজেই আমি এবং অনন্যা দু’জনে এ নিয়ে যখনই সুযোগ পেয়েছি, গোপনে আলোচনা করেছি৷ কিন্তু কে সেই মধ্যরাতের আততায়ী তা খুঁজে বের করতে পারিনি৷ পুলিশও পারেনি৷ শেষ অবধি অনন্যার বাবার মতকেই মেনে নিয়েছি৷
কর্নেল আমাদের কাছে এসে বললেন—লক্ষ্য করছিলুম, দু’জনে গভীরভাবে এই রহস্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলে৷
আমি বলে উঠলুম—হ্যাঁ, মাথা ঘামিয়ে আবিষ্কার করেছি যে আপনি সে-রাতে আগন্তুকের পালানোর পথ খুঁজে পেয়েছেন৷
কর্নেল সহজে অবাক হন না৷ ঠোঁটের কোণে হেসে বললেন—তোমরা দু’জনেই আমার গতিবিধি লক্ষ্য করে এই সিদ্ধান্তে এসেছ৷ হ্যাঁ, আমি তোমাদের সঙ্গে একমত৷ ওখানে দেবদারু গাছটার অনেক পাতা ছিঁড়ে পড়ে ছিল৷ সেগুলো শুকিয়ে ঘাসে মিশে গেছে৷ কিন্তু পাঁচিলের গায়ে দু’তিনটে জায়গায় ঘষটানো দাগ দেখে আমার অনুমান, রাতের আগন্তুক বা আততায়ী যা-ই বলো, সে ওই পথেই এসেছিল এবং একই পথে পালিয়ে গিয়েছিল৷ এখন আমার পাঁচিলের ওদিকটা দেখা দরকার৷ অনিরুদ্ধ তুমি বলো, ওইদিকে যেতে গেলে সদর গেট দিয়ে বেরিয়ে বাড়ির দক্ষিণ দিক ঘুরে ওখানে পৌঁছানো যায় কিনা৷
অনিরুদ্ধ বলল—কোনো অসুবিধা নেই৷ আপনি শুধু একটু অপেক্ষা করুন৷ আমি স্যারকে কথাটা বলে আসি৷ তা না হলে উনি সম্ভবত বিরক্ত হবেন৷
আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলুম—সেকি, বিরক্ত হবেন কেন? কর্নেলকে তো উনি সে-রাতের রহস্য ফাঁস করার জন্যই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন৷
অনিরুদ্ধ একটু হেসে মৃদুস্বরে বলল—স্যারের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে৷ কর্নেল সাহেবের ব্যাপারে উনি বিরক্ত হবেন না৷ কিন্তু ওঁর অজ্ঞাতসারে আমি কর্নেল সাহেবকে সাহায্য করছি কোনো ব্যাপারে, এতে উনি বিরক্ত হতে পারেন৷ ব্যাপারটা আমি পরে সময়মতো বুঝিয়ে বলব৷
অনিরুদ্ধ কথাটা বলে টেনিস লন পার হয়ে পশ্চিমে গাড়ি-বারান্দার দিকে চলে গেল৷ কর্নেলকে অনুসরণ করে আমি লনে গিয়ে দাঁড়ালুম৷ এখানেই রোদের মিষ্টি আদর অনুভব করতে পারছিলুম৷ হঠাৎ ঘুরে দেখলুম, দারোয়ান গেটের পাশে একটা টুলে বসে কার সঙ্গে কথা বলছে৷ সে লোকটা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে৷ নিশ্চয়ই দারোয়ানের কোনো চেনা লোক৷ কিন্তু লোকটার পরনে প্যান্ট-শার্ট এবং শার্টের ওপর চাপানো জ্যাকেট৷ গেটের গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখেই বুঝেছিলুম, তাঁকে ভদ্রলোক বলতেই হয়৷ এবার তিনি এগিয়ে এসে গেটের একটা পাশ নিজেই খুলে ঢুকলেন৷ তারপর বললেন—দেওকীপ্রসাদ, আমার ঘরটা খুলে দাও৷ স্যার টেলিফোনে আমাকে ডেকেছিলেন৷ অফিসে কিছু কাজ আছে৷
বুঝতে পারলুম ইনিই আনন্দপ্রসাদ, অনিরুদ্ধ যাঁর কথা বলছিল৷ প্রায় পৌনে বারোটায় তাঁকে ড. ত্রিপাঠী ফোন করে ডেকেছেন সেটা হয়তো ঠিকই, কিন্তু উনি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে দারোয়ান দেওকীপ্রসাদের সঙ্গে এতক্ষণ কী কথা বলছিলেন!
আনন্দ আমাদের দিকে তাকাতে তাকাতে ডানদিকের খোলা বারান্দায় উঠে একটা ঘরের সামনে দাঁড়ালেন৷ দারোয়ান চাবি খুলে দিলে তিনি ভেতরে গেলেন৷ তারপর দুটো জানলা খুলে গেল৷ দেখলুম আনন্দবাবু চেয়ারে বসে কীসব কাগজপত্র নাড়াচাড়া করছেন কিন্তু বারবার আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন৷ এমনটা স্বাভাবিক; ওঁকে হয়তো ড. ত্রিপাঠী কর্নেল সম্পর্কে কিছু জানাননি৷
এতক্ষণে অনিরুদ্ধ ফিরে এল৷ তারপর হাসিমুখে বলল—না, স্যার আমাকে বললেন যে ওঁর পক্ষে বেশি ঘোরাঘুরি করা এখন অসম্ভব৷ তাই আমাকেই সব দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন৷
আমি বললুম—আপনার স্যারের সেই কর্মচারী আনন্দবাবু এইমাত্র ঘরে ঢুকলেন৷
অনিরুদ্ধ সেদিকে তাকিয়ে বলল—হ্যাঁ কিছুদিন থেকে স্যার আনন্দবাবুকে দশটা-পাঁচটা অফিস করা থেকে রেহাই দিয়েছেন৷ প্রয়োজনে তিনি স্যারের ডাকে আসবেন, কাজকর্ম করবেন৷ কাজের ব্যাপারটা স্যার ওঁকে টেলিফোনে জানিয়ে দেবেন৷ কারণ অফিসে একটা টেলিফোন আছে৷
কর্নেল বললেন—আনন্দবাবুর সঙ্গে পরে একদিন সানন্দে আলাপ করা যাবে জয়ন্ত৷ চলো, এখন পাঁচিলের পেছনে ওই জায়গাটা দেখে নিই৷
গেটের সেই ফোকর দিয়ে বেরুনোর সময় অনিরুদ্ধ বলে গেল—দেওকীপ্রসাদ, গেট বন্ধ কোরো না৷ আমরা এখনই ফিরে আসছি৷
ততক্ষণে দারোয়ান কর্নেলকে যথারীতি স্যালুট ঠুকেছিল৷
বাইরে বেরিয়ে ফাঁকা উঁচু জমি দিয়ে বাড়ির দক্ষিণ দিকে গেলুম৷ ওদিকটায় ইতস্তত কিছু ঝোপ-জঙ্গল আর নানা গড়নের ছোটো-বড়ো পাথর ছড়িয়ে আছে দেখলুম৷
অনিরুদ্ধ বলল—কর্নেল সাহেব লক্ষ্য করলেই বুঝবেন, রাজবাড়ির এদিকে প্রাচীন যুগের সম্ভবত একটা প্রাসাদ ছিল যা পাথরে তৈরি৷ পাথরের টুকরোগুলো দেখুন কী মসৃণ! কোথাও কোথাও কারুকার্যের চিহ্ন৷
কর্নেল হঠাৎ দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে দূরে কিছু দেখতে দেখতে বললেন—এদিকটা দেখছি একেবারেই বসতিহীন রুক্ষ মাঠ৷ ওদিকে একটা খাল আছে মনে হচ্ছে৷
অনিরুদ্ধ বলল—ওটাকে গড়খাই বলা চলে৷ শুনেছি এদিকটায় রাজাদের ক্যাসল বা দুর্গপ্রসাদ বলা চলে, এমন কিছু ছিল৷ এদিকের গড়খাইটা বন্ধ করা হয়েছিল সম্ভবত৷ তার কোনো চিহ্ন নেই৷ ওদিকেরটা আছে৷
আমি জিগ্যেস করলুম—ডানদিকে উঁচু পাঁচিলওয়ালা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে৷ এটা কাদের?
অনিরুদ্ধ বলল—ওটা একসময় কলকাতার এক বাঙালি ভদ্রলোকের হাভেলি ছিল৷ তিনি স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোককে বিক্রি করে দিয়ে গেছেন৷ ভদ্রলোকের নাম দুর্গাশঙ্কর নেহালিয়া৷ উনি মাঝে মাঝে এখানে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ফূর্তি করতে আসেন৷ খানাপিনা নাচগানও হয়৷ বুঝতেই পারছেন, বাইরে কোথা থেকে বাইজিদের আনা হয়৷
কর্নেল হঠাৎ হন্তদন্ত হাঁটতে শুরু করলেন৷ আমরা এগিয়ে গিয়ে ওঁকে সঙ্গ দিলুম৷ বাড়ির দক্ষিণ দিক ঘুরে গিয়ে দেখলুম, কর্নেল সেই দেবদারু গাছটা চিনে রেখেছেন৷ কারণ তিনি পাঁচিলের কাছে গিয়েই থমকে দাঁড়ালেন৷ আমরা তখন ওঁর কাছেই চলে গেছি৷
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ, এটা পুলিশের চোখে পড়া উচিত ছিল৷ কিন্তু পুলিশ অনন্যার বাবা যেহেতু একজন ডাক্তার, তাই তাঁর কথার উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে৷ অনিরুদ্ধ দেখতে পাচ্ছো, পাথরের ফাটল থেকে তিন-চারটে পাথর খসে গেছে৷ এমনি এমনি খসে যায়নি৷
বলে তিনি আতসকাচ নিয়ে খোঁদলটা পরীক্ষা করলেন৷ তারপর বললেন—সে-রাতের আগন্তুক দেওয়ালে ওঠার জন্য তিনটে জায়গায় ফাটলের কিছু অংশ ছাড়িয়ে রেখেছিল৷ এবার পাঁচিলের ওপারে আমি যে ঘষটানো দাগটা দেখেছি তাতে মনে হয় কোনো শক্ত হুক ছুঁড়ে দিয়ে সেটা ওদিকের ফাটলে আটকে গেলে সে শক্ত দড়ি ধরে পাঁচিল দিয়ে উঠেছিল৷ তারপর দেবদারু গাছটা বেয়ে সাবধানে নেমে এসেছিল৷ অবশ্য এখনো পর্যন্ত এটা আমি একটা অঙ্ক হিসেবেই সাজিয়ে রাখলুম৷ যা ভাবছি তেমন কিছু না হতেও পারে৷ তবে এটা ঠিক, এই পাঁচিলে কেউ নিশ্চয়ই উঠেছিল৷
বলে কর্নেল হঠাৎ দূরে বাইনোকুলারে তিনদিক দেখে নিলেন৷ তারপর পা বাড়িয়ে বললেন—না, আমাদের প্রতি কেউ লক্ষ রাখেনি৷ চলো ফেরা যাক৷
আমরা আবার রাজবাড়িতে পৌঁছলুম, তারপর অনিরুদ্ধ আমাদের উপরে নিয়ে গেল৷ বারান্দা ধরে এগিয়ে ড. ত্রিপাঠীর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলল—কর্নেল সাহেব এসে গেছেন স্যার৷
ড. ত্রিপাঠী এগিয়ে এসে পরদা সরিয়ে বললেন—আসুন আসুন৷ কর্নেল সাহেব কি আবার এক রাউন্ড কফি খাবেন?
কর্নেল বললেন—আমি তো লাঞ্চ করব দেড়টা কী দুটোয়৷ কাজেই কফি পেলে খুশিই হব৷ জয়ন্ত খাবে কি না জানি না৷
আমার খুব ক্লান্তি এসেছিল৷ দীর্ঘ ট্রেন জার্নির ধকল৷ তারপর কয়েক ঘণ্টার জন্য কর্নেলের সঙ্গে হাঁটাহাঁটিতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলুম৷ বললুম—হ্যাঁ, খাব৷ কারণ কর্নেল বলেন, কফি নার্ভকে চাঙ্গা করে৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—অনিরুদ্ধ, প্লিজ, তুমি আর-একবার নীচে যাও৷
অনিরুদ্ধ বেরিয়ে গেল৷
আমি সোফায় বসলাম৷ ড. ত্রিপাঠী জানালার কাছ থেকে গিয়ে এসে সোফায় আমাদের মুখোমুখি বসলেন৷
কর্নেল বললেন—ঠাকুরমশায়ের ঘর থেকে স্যুইচ দিয়ে একটা বেলের ব্যবস্থা করলে তো হয়৷
ড. ত্রিপাঠী হেসে উঠলেন৷ তারপর বললেন—আমার এই রঘুবীর মুখুজ্যে নামক ঠাকুরমশাইটি কানে খুব কম শোনেন৷ আমি ওঁকে হিয়ারিং এইড কিনে দিতে চেয়েছিলুম৷ কিন্তু উনি ওসব পছন্দ করেন না৷ বলেছিলেন, এই যন্ত্রে বাইরের কথাবার্তা বা শব্দ আমার কানের পরদা ফাটিয়ে দেবে মনে হচ্ছে৷ তবে আপনি স্যুইচের কথা বলছিলেন৷ ওই দেখুন, বেল; স্যুইচ আছে৷ টিপে কোনো লাভ নেই৷
এই সময় হঠাৎ পরদা তুলে এক রূপবতী যুবতী ঘরে ঢুকল৷ এখানে চুপিচুপি বলে রাখি, অনিরুদ্ধকে দেখার সময় যেমন ফিল্মস্টারের কথা মাথায় এসেছিল, এই যুবতী যে অনন্যা ছাড়া কেউ নয় তা বুঝেই আমি তাকে ফিল্মহিরোইন গড়ে ফেলেছিলুম৷ তবে না, আমি খুব বাড়িয়ে বলছি না৷ এই ধূসর স্থবির ও রহস্যময় রাজবাড়িতে এই যুবক-যুবতী জীবন-যৌবনের অসাধারণ লাবণ্য হয়ে বাড়িটাকেই অর্থপূর্ণ করেছে, এতে আমি নিঃসংশয়৷ কিন্তু হায়, দু’জনেই জিনোম-বিজ্ঞানী৷ প্রাণীদেহে কোষের মধ্যে জিনপুঞ্জের অন্তর্নিহিত ডি. এন. এ-র আণবিক গঠনে তারা কারচুপি ঘটিয়ে প্রকৃতিকে টেক্কা দিতে চায়! এসব কাজ কি এদের মানায়? এ তো বোঝাই যাচ্ছে, সৌন্দর্যের হাতে সৃষ্টি হবে মারাত্মক কদর্য বীভৎসতা!
আমার মস্তিষ্কের আচ্ছন্নতা কেটে গেল তখনই, যখন ড. ত্রিপাঠী শশব্যস্তে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—আরে এ কী! অনন্যা তুমি এভাবে হেঁটে বেড়াচ্ছ কেন?
অনন্যা কর্নেলের কাছাকাছি বসে করজোড়ে নমস্কার করে মৃদু হেসে বলল—কর্নেল সাহেব আর তাঁর ছায়াসঙ্গী জয়ন্ত চৌধুরীকে মুখোমুখি দেখার জন্য ক-ত-ক্ষ-ণ ধরে অপেক্ষা করছি৷ অনিরুদ্ধ আমার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতারণা করছে৷ আর ডাক্তারকাকু! আপনারও কি আমার কথা মনে পড়েনি? প্রতিমুহূর্তে ভাবছি, এই আপনি পরদা তুলে আমার ঘরে নিয়ে আসবেন কর্নেল সাহেবকে!
ড. ত্রিপাঠী হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন৷ বিব্রতমুখে বললেন—কফি খাইয়েই কর্নেল সাহেবদের তোমার ঘরে নিয়ে যেতুম মামণি! আসলে তোমার বিশ্রাম দরকার৷ ডিসটার্ব করতে চাইনি৷ কিন্তু আমার অবাক লাগছে, তুমি কর্নেল সাহেবকে চেনো?
অনন্যা কর্নেলের দিকে ঘুরে শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল—জানি না আমি বাবার কথামতো এখনও Sleep-walking করছি কি না৷
কর্নেল তার কাঁধে হাত রেখে বললেন—না অনন্যা৷ তুমি এখন কঠিন বাস্তবে বন্দি৷
ঠিক তখনই অনিরুদ্ধ নিজের হাতে কফির ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়িয়েছিল৷ তারপরই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল৷—কী আশ্চর্য! আমি অনিকে অসাধারণ একটা চমক দেওয়ার চান্স হারিয়ে ফেললুম৷
অনন্যা কপট চোখ রাঙিয়ে বলল—শাট আপ! তুমি আমার সঙ্গে বিশ্রী খেলা খেলেছ! তারপরই সে কর্নেলের জন্য পেয়ালায় কফি ঢেলে দিতে থাকল—কর্নেল সাহেব বলছেন, আমি Sleep-walking-এ নেই৷ কঠিন বাস্তবে নাকি বন্দি হয়েছি৷
ড. ত্রিপাঠী কী বলতে যাচ্ছিলেন, টেলিফোন বেজে উঠল! তিনি রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে চাপাস্বরে বললেন—বলুন আনন্দবাবু৷...ঠিক আছে৷ আমি এখন অপিসে যেতে পারব না৷ আপনি সই করে খামটা নিন৷ সাবধান! সিল ড্যামেজ হয় না যেন৷ আর আমার ফরে সই করে স্ট্যাম্প মেরে এখনই নিজে ওটা আমাকে দিয়ে যান৷
ততক্ষণে অনন্যা আমার পেয়ালায় কফি ঢেলে আমার হাতে তুলে দিয়েছে৷ তারপর আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল—আমি কল্পনাও করিনি কলকাতার বিখ্যাত দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার এক লেজেন্ডারি সাংবাদিককে মুখোমুখি দেখতে পাব৷ আমি আপনার ফ্যান, জয়ন্তবাবু!
অনিরুদ্ধ বলল—আমাদের সৌভাগ্য অনি! দ্য ফেমাস ট্রায়ো একেবারে মুখোমুখি হাজির৷
অনন্যা বলল—কিন্তু ওই ভদ্রলোক যে হালদারমশাই তা প্রথমে বুঝতে পারিনি৷ কিন্তু তিনি এখন কোথায়?
ড. ত্রিপাঠীকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল৷ তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—এক মিনিট৷ আনন্দের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে আসি৷
তিনি বেরিয়ে গেলে অনিরুদ্ধ চাপাস্বরে বলল—মিঃ হালদার আমাকে বলে গেছেন, পাতালকালীর মন্দির দেখতে যাচ্ছেন৷ আমার ধারণা, তিনি কোনও সূত্র খুঁজে পেয়েছেন৷ মিঃ হালদার—
তাঁর কথা থেমে গেল৷ ড. ত্রিপাঠী একটা মোটা খাম হতে ঘরে ঢুকলেন৷ তারপর খামটা সেই গেল টেবিলে রেখে সোফায় বসলেন৷—অনিরুদ্ধ! মিঃ হালদারের কথা বলছিলে৷ তিনি এখনও ফিরছেন না৷ আমার উদ্বেগ বেড়ে যাচ্ছে৷
কর্নেল একটু হেসে বললেন—তাঁর জন্য উদ্বিগ্ন হবেন না৷ চৌত্রিশ বছরের পুলিশ জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রচুর বুদ্ধি আর শক্তি জোগাবে৷
বলে কফি শেষ করে চুরুট জ্বেলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷—জয়ন্ত! একটু অপেক্ষা করো৷ ড. ত্রিপাঠী! আমি অনন্যার ঘরে গিয়ে তার সঙ্গে মিনিট দশ-পনেরো কথা বলতে চাই৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—বেশ তো! অনি! তুমি ওঁর সঙ্গে যাও৷
কর্নেল বললেন—অনন্যা এখন যে-ঘরে আছে, সে-ঘরে নয়৷ যে-ঘরে আপনার দিদি আর অনন্যা থাকত, সেই ঘরে৷
ড. ত্রিপাঠী হাত বাড়িয়ে বালিশের তলা থেকে রিঙে ঝোলানো একটামাত্র চাবি এগিয়ে দিয়ে বললেন—ও-ঘরের চাবিটা পুলিশের নির্দেশে আমি আলাদা করে রেখেছি৷
চাবিটা নিয়ে কর্নেল বেরুলেন৷ তাঁর পিছনে অনন্যা৷ লক্ষ্য করেছিলুম, কথাটা শোনামাত্র তার মুখে গাঢ় ছায়া পড়েছিল৷ সে ভুরু কুঁচকে আঙুল খুঁটছিল৷ তার আঙুলে যে আংটিটি দেখেছি, তা এক চিলতে হিরে বসানো সোনার আংটি বলেই আমার ধারণা৷
ড. ত্রিপাঠী হাত বাড়িয়ে পিছনের দিক থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা নিলেন৷ তারপর আবার একটা সিগারেট ধরালেন৷ অনিরুদ্ধ বলল—স্যার, আমি লক্ষ্য করছি, আপনি আবার স্মোকিং শুরু করেছেন, কিন্তু বড্ড বেশি৷ আমি বুঝতে পারছি আপনি এখনো যথেষ্ট উদ্বিগ্ন৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—উদ্বেগটা আনন্দবাবু আবার বাড়িয়ে দিয়ে গেলেন৷ ড. হেনরি কোলসন এয়ার-মেলে আমার চিঠির জবাব পাঠিয়েছেন৷ প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছেন তা বুঝতে পেরেছি৷ অজস্র চার্ট আর. ডি. এন এ-র আণবিক গঠন থেকে শুরু করে স্টেম সেল—এইসব নানারকম দুরূহ বিষয়ে উনি পাতার পর পাতা ভর্তি করেছেন৷ না—আনন্দবাবু খামের মুখ খোলেননি৷ আমি টেলিফোনে বলেছিলাম সিল যেন ইনট্যাক্ট থাকে৷ আমাকে খাম দিয়ে চলে যাবার পর এক মিনিটেই সিল খুলে পাতা উল্টে যা বুঝেছি, তা তোমাকে বললাম৷
অনিরুদ্ধ বলল—ওঁর চিঠিতে চোখ বুলিয়ে আপনার ইম্প্রেশন কী?
—আমি যা ভেবেছিলুম, আমার মনে হল উনি সেটা সত্যি বলে ধরে নিয়েছেন৷ এবং থিয়োরিটিকল দিকটা ডিটেলস-এ আলোচনা করে আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন৷ শেষ লাইনে কী লিখেছেন শুনবে? ব্রাভো ড. ত্রিপাঠী৷ আই এক্সপেক্ট দি ইন্টারন্যাশনাল রেকগনিশন হুইচ মে লিড টু—
ড. ত্রিপাঠী অনিচ্ছাকৃত ভঙ্গিতে হেসে উঠলেন৷ অনিরুদ্ধ বলে উঠল—ও মাই গড! ড. কোলসন কি মনে করছেন আপনিও ড. ওয়াটসনের মতো নোবেল ল্যরিয়েট হবেন?
ড. ত্রিপাঠী পিছন দিকে হাত বাড়িয়ে বালিশের পাশে রাখা সেই পুরু লম্বা খামটা টেনে অনিরুদ্ধের হাতে গুঁজে দিলেন৷ তারপর আগের মতোই দ্বিধান্বিত হাসি হেসে বললেন—মুড ভালো থাকলে বলতুম তোমার মুখে ফুল-চন্দন পড়ুক৷ কিন্তু অনিরুদ্ধ, আমরা দু’জনেই এখন পশ্চিমবঙ্গের বহুল প্রচারিত খবরের কাগজের বিখ্যাত সাংবাদিকের সামনে বসে আছি৷ আমাদের সাবধান হওয়া উচিত৷
বলে তিনি আমার দিকে তাকালেন—জয়ন্তবাবু, আপনাকে অনুরোধ করছি আপনি যেন এই নিয়ে কিছু লিখে আমাকে দেশের বৈজ্ঞানিক-সমাজে অপ্রস্তুত করবেন না৷ আসলে অনিরুদ্ধ সব বিষয়েই একটু বাড়াবাড়ি করে৷
তাঁকে আশ্বস্ত করে বললুম—না, আমার মাথার ওপর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার আছেন৷ আপনি চিন্তা করবেন না৷
ড. ত্রিপাঠী হেলান দিয়ে বসে সিগারেট টানতে থাকলেন৷ অনিরুদ্ধ খাম থেকে টাইপ করা একগুচ্ছ কাগজের পাতায় চোখ বুলোতে থাকল৷ তার ঠোঁটের কোণে স্পষ্ট লক্ষ্য করছিলুম জয়ের হাসি৷ প্রায় দশ/বারো পাতার চিঠিতে চোখ বোলানো শেষ করে অনিরুদ্ধ সেটা খামের ভেতর ভরে দিল৷ তারপর চাপাস্বরে বলল—স্যার, আমার মনে হচ্ছে সেরাত্রে আপনি ভুল দেখেননি৷ একটা ছায়ামূর্তির মতো আপনার হাতের সৃষ্টি, দরজা ভেদ করে বেরিয়ে আকার নিয়েছিল৷ মূর্তিটা নেগেটিভ৷ তাই তখনই মুছে গিয়েছিল৷ এরপর আমরা তিনজনে আপনার নেতৃত্বে কাজে নামলে শেষ অবধি ওই ছায়ামূর্তির পজিটিভ অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে৷ তখন সে আর দরজা বা দেওয়াল ফুঁড়ে বাইরে যেতে পারবে না৷ তা ছাড়া তাকে আটকে রাখার ব্যবস্থা তো করাই আছে ল্যাবে৷
এইসব কথা শুনতে শুনতে আমি হতবাক হয়ে পড়েছিলুম৷ ওঁরা কি সেই বানরের ডি. এন. এ থেকে নিজেদের ইচ্ছেমতো একটা প্রাণী তৈরি করতে পারবেন যার আয়তন হবে ফিল্মে দেখা কিংকঙের মতো? পুরোনো আমলের বাড়ি বলে ঘরের ছাদগুলো অনেক উঁচুতে৷ জানলাগুলোও বিশাল৷ তবে ল্যাবের দু’ধারে কোনো জানলা দেখিনি৷ সত্যি বলতে কী, আমি মনে মনে তখন খুবই উত্তেজিত৷ অনিরুদ্ধ খামটা ড. ত্রিপাঠীর হাতে দিয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বলল—আমি কথা দিচ্ছি স্যার, আই উইল ট্রাই মাই বেস্ট, তাতে আমার কোনো ক্ষতি হলেও তা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নই৷ আমার ধারণা অনন্যাও মোটামুটি ফর্মে এসে গেছে৷ কাজেই শিগগিরই আমরা আবার কাজে নামব৷
এই সময় কর্নেল ফিরে এলেন৷ ড. ত্রিপাঠী বললেন—অনন্যা কোথায়?
—আপনার পাশের ঘরে ঢুকে গেল৷ ওর শরীরটা একটু দুর্বল মনে হল৷ হয়তো আমিই ভুল করেছি৷ ও ঘরে ওকে নিয়ে যাওয়া উচিত হয়নি৷ প্লিজ, আপনি ওকে একটু দেখুন৷ আর আমরা এখনই বাংলোয় ফিরে যাব৷
ড. ত্রিপাঠী কথাটা শুনেই উঠে এলেন৷ বললেন—অনিরুদ্ধ তুমি তোমার গাড়িতে ডাকবাংলোয় পৌঁছে দিয়ে এসো৷ ওঁকে কষ্ট করে চড়াই ভাঙতে হবে না৷
কর্নেল সেই চাবিটা ড. ত্রিপাঠীকে ফেরত দিয়ে বললেন—আমি বাংলোয় ফিরে যথাসময়ে আমার ধারণার কথা জানাব৷ তবে প্লিজ ড. ত্রিপাঠী, অনন্যাকে ভাবতে দেবেন না যে সে এখনো পুরো সুস্থা হয়নি৷
অনিরুদ্ধ বলল—বরং ওকে ড. হেনরি কোলসনের চিঠিটা পড়তে দিন স্যার৷
—তুমি ঠিক বলেছ৷ এই বলে ড. ত্রিপাঠী ঘরে ঢুকলেন৷
ততক্ষণে কর্নেল বারান্দা দিয়ে হাঁটতে শুরু করেছেন৷ অনিরুদ্ধ তাঁর পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল৷ বলল—আমি এখনই গাড়ি বের করছি৷
সে সিঁড়ি বেয়ে জোরে নেমে গেল৷ আমি নামতে নামতে কর্নেলকে জিগ্যেস করলুম—বুঝতে পারছি, ঘটনাস্থলে গিয়ে অনন্যা যে শকড হয়ে পড়বে, আপনি বোধহয় ভাবেননি৷
কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন—আমি ভেবেচিন্তেই ওকে ওঘরে নিয়ে গিয়েছিলুম৷ তবে আমার ধারণা এটা খুবই সাময়িক৷ আসলে অনন্যা যদি তার বাবার কথামতো সে রাতে স্লিপ-ওয়াকিং করেও থাকে, তাহলেও সে চন্দ্রমুখী দেবীর মৃত্যুর ধাক্কাটা সামলাতে পারছে না৷ তাকে প্রশ্ন করেই বুঝেছি, তাঁর প্রতি অনন্যার অকৃত্রিম আকর্ষণ ছিল৷ কারণ অনন্যা মাত্র ন’বছর বয়সে মাতৃহারা হয়৷ ঠিক সেই জায়গাটিই চন্দ্রমুখী দেবী পূরণ করতে পেরেছিলেন৷ এর বেশি বলার মতো এখন সুযোগ নেই৷
গাড়ি-বারান্দার নীচেই অনিরুদ্ধ তার গাড়ি নিয়ে তৈরি ছিল৷ দেখলুম, সেই আনন্দবাবু তার সঙ্গে কথা বলছেন৷ কর্নেল এবং আমাকে দেখেই তিনি করজোড়ে নমস্কার করলেন৷
কর্নেল বললেন—চলি আনন্দবাবু৷ আপনার সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ পেলুম না৷ পরে একদিন হবে৷ আপনি তো ড. ত্রিপাঠীর কাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত আছেন, তাই না?
—ঠিক বলেছেন কর্নেল সাহেব৷ আমার বয়স এখন প্রায় বাহান্ন বছর৷ আমার বাবাও এখানে কাজকর্ম করতেন৷ তবে তিনি তত বেশি লেখাপড়া জানতেন না৷
কর্নেল হাত নেড়ে বললেন—ঠিক আছে, পরে সব শুনব৷ চলি আনন্দবাবু৷
দারোয়ান দেওকীপ্রসাদ গেট খুলে দিল৷ আমরা বেরিয়ে গিয়ে প্রাইভেট রোডে পৌঁছলুম৷ প্রায় দুশো মিটার দূরত্ব৷ রাস্তাটা ধীরে নেমে গিয়ে হাইওয়েতে পৌঁছেছে৷ সেখানে গাড়ি ঘোরাতেই হালদারমশায়ের চিৎকার শুনলুম—কর্নেল স্যার, জয়ন্তবাবু একটু দাঁড়ান৷ আমি আইয়া পড়ছি৷
অনিরুদ্ধ তখনই গাড়ি থামিয়ে দিল৷ আমি জানলা দিয়ে দেখলুম, হালদারমশাই একটা সাইকেল-রিকশায়৷ তার ভাড়া মিটিয়ে তিনি আমাদের কাছে এলেন৷ তারপর বললেন, —ঠিক সময় আইয়া পড়ছি৷
কর্নেল বললেন—যদি তেমন কোনো গুরুত্ব না থাকে তাহলে আপনি রাজবাড়িতে খাওয়া-দাওয়া সেরে তিনটে নাগাদ ডাকবাংলোয় যেতে পারেন৷
হালদারমশাই ঘড়ি দেখে বললেন—নাঃ! খাওনের কথা পরে৷ আমি আপনার লগে যামু৷
অনিরুদ্ধ হাসতে হাসতে বলল—আমার বাঁ-দিকে চলে আসুন মিঃ হালদার৷
হালদারমশাই সামনে বাঁ-দিকের সিটে উঠে বসলেন৷ তাঁর কাঁধে সেই চিরকেলে কালো রঙের ব্যাগ, যাতে ছদ্মবেশের সরঞ্জাম থাকে৷ তাঁকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছিল৷ মুখ ঘুরিয়ে কর্নেলকে তিনি বললেন—প্রথমে গিয়েছিলাম পাতালকালীর মন্দিরে৷ তারপর আর-এক খানে৷ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল৷ তাই না গিয়া পারি নাই৷ সেখান থিইক্যা আরও এক জায়গায় গিছলাম৷
কর্নেল বললেন—ঠিক আছে৷ আপনার ব্যস্ততার কারণ নেই৷ ডাকবাংলোয় বসে সব শোনা যাবে৷ তবে আপনার জন্য অনিরুদ্ধ কিন্তু গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে না৷
হালদারমশাই বললেন—না, এক ঘণ্টার আগে কথা শেষ হইব না৷
সরকারি ডাকবাংলোয় আমাদের পৌঁছে দিয়ে অনিরুদ্ধ চলে গেল৷ ম্যানেজার মিঃ পাণ্ডে আমাদের অভ্যর্থনা করে উপরের ঘরে পৌঁছে দিলেন৷ কর্নেল ভদ্রতা করে মিঃ পাণ্ডের সঙ্গে হালদারমশায়ের আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন—ইনি আমাদের একজন বন্ধু৷ দৈবাৎ এখানে এসে দেখা হয়ে গেছে৷ এঁর নাম মিঃ কে কে হালদার৷ প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টর৷ পাতালকালীর মন্দির দেখতে গিয়েছিলেন৷ রুদ্রগড়ে ওঁর এক বন্ধুর বাসায় উঠেছেন৷
হালদারমশাইকে নমস্কার করে মিঃ পাণ্ডে বললেন—আপনি যদি চান, মিঃ হালদারের এ বেলা আপনাদের সঙ্গে লাঞ্চের ব্যবস্থা করতে পারি৷
কথা হচ্ছিল ইংরেজিতে৷ হালদারমশাই ব্যস্তভাবে তাঁর নিজস্ব ভাষায় বলে উঠলেন—না, না আমি এখানে খামু না৷ কর্নেল স্যারের লগে দ্যাখা হইল তাই আইয়া পড়লাম৷
কথাগুলো বলতে বলতেই উনি নিজের ভুল টের পেয়ে এবার ইংরেজিতে বলে উঠলেন—আই শ্যাল হ্যাভ টু গো ব্যাক টু মাই ফ্রেন্ডস হোম৷ আই কেম হিয়ার জাস্ট ফর এ চ্যাট৷
মিঃ পাণ্ডে কথাটা শুনেই একটু হেসে বললেন—প্রায় একটা বাজে৷ কর্নেল সাহেব লাঞ্চ করবেন কখন?
কর্নেল বললেন—দুটোয় খাব৷
মিঃ পাণ্ডে বেরিয়ে যাওয়ার পর হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন—রদ্রগড়ে অনেক বাঙালি দেখলাম৷ অনেক বিহারীও বাংলা জানে৷ এই ম্যানেজার ভদ্রলোক নিশ্চয়ই বাংলা জানেন৷
কর্নেল বললেন—এখানে একসময় বাঙালিটোলা ছিল৷ এখনো অনেক বাঙালি নানা কাজে এখানে থাকেন৷ কাজেই মিঃ পাণ্ডে বাংলা নিশ্চয়ই বোঝেন৷ তবে আপনি যে সাবেক পূর্ব বাংলার মানুষ, তা উনি ধরতে না-ও পারেন৷ যাই হোক, আপনার অভিজ্ঞতা সংক্ষেপে শোনা যাক৷
হালদারমশাই ড. ত্রিপাঠীর প্রশংসা করে বললেন—কোনো অসুবিধা হয় নাই৷ উনি নিজে গাড়ি চালাইয়া স্টেশনে গিছলেন৷ আমি কইছিলাম আমার মাথায় নীল মাফলার জড়ানো থাকবে৷ উনি আমারে দেইখ্যাই চিনছিলেন৷ তবে আমি অবাক হইয়া দেখছিলাম, উনি নিজে গাড়ি ড্রাইভ কইর্যা এসেছিলেন আর ওনার সিটের পাশে রাইফেল খাড়া করা ছিল৷ আইতে আইতে উনিই কইছিলেন আমি এখন সবসময় আর্মস সাথে লইয়্যা ঘুরি৷
কর্নেল বললেন—আপনার ডিটেলস জার্নির খবরে আমার আগ্রহ নেই৷ এখন আসবার পথে আপনি বলছিলেন, দুই জায়গায় আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল৷ সেই ব্যাপারটা আগে বলুন৷ তারপর জানতে চাইব রাজবাড়িতে আপনি কোনো ক্লু খুঁজে পেয়েছেন কিনা৷
হালদারমশাই আগে এক টিপ নস্যি নিলেন৷ তারপর নোংরা রুমালে নাক মুছে চাপাস্বরে বললেন—আগে অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা জানতে চান? আমি ড. ত্রিপাঠীর থেইক্যা অনন্যার বাবা ড. অরুণ মুখার্জির ফোন নাম্বার নিয়ে রেখেছিলাম৷ তারপর পাবলিক বুথ থেকে সকালে ওনারে ফোন করছিলাম৷ উনি বাড়িতে প্র্যাকটিস করেন৷ আমারে সাড়ে নয়টায় যাইতে কইছিলেন৷ আমি তো সাতটায় বার হইয়া বাসে চাইপ্যা পাতালকালীর মন্দিরে গিসলাম৷
আমি সকৌতুক বললুম—এবার নিশ্চয়ই আপনার ধর্মে মতি হয়েছে৷ তাই জাগ্রত পাতালকালীমার পুজো দিতে গিয়েছিলেন৷
অমনিই হালদারমশাই গম্ভীর মুখে এবং আরও চাপা কণ্ঠস্বরে বললেন—রাজবাড়ি এলাকা থেইক্যা একজন আমারে ফলো করত্যাসে, তা ট্যার পাইছিলাম৷ আমি যখন তার আড়ালে যাইবার জন্য বাসে উঠছি সে-ও দেখি বাসে উঠল৷ আমি পাতালকালী মন্দিরের আগেই নাইম্যা পড়লাম৷ সে-ও নামল৷ সেখানে আদিবাসীদের একটা গ্রাম৷ লোকজন বিশেষ ছিল না৷ আমি আপনার কথামতো ক্যামেরা লইয়্যা গিসলাম৷ ক্যামেরা এই ব্যাগের মধ্যে আছে৷ ক্যামেরায় সেই লোকটার ছবি তুলছি আর হালা ড্যাগার লইয়্যা আমার দিকে পাও বাড়াইসে৷ আমার প্যান্টের পকেটে লোডেড রিভলভার ছিল৷ রিভলভার তাগ করছি আর সেই ব্যাটা এক লাফে আদিবাসী বস্তির ভিতর দিয়া ভ্যানিশ হইয়া গেল৷
কর্নেল বললেন—অসাধারণ নাটক হালদারমশাই৷ আমি ঠিক এই রকমই কিছু ভেবেছিলুম৷ তাই আপনাকে খুব সতর্ক হতে বলেছিলাম৷
আমি খুব অবাক হয়ে বললুম—আপনি আমাকেও কথাটা বলেছিলেন৷ আর কলকাতায় ড. হিমাংশু বোসকেও একই কথা বলে এসেছেন৷ কিন্তু কর্নেল আমি বুঝতে পারছি না রাজবাড়ির ঘটনার সঙ্গে এস ধরনের নাটকীয়তা অর্থাৎ রীতিমতো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের যোগাযোগ কেন৷
কর্নেল বললেন—জয়ন্ত, মুখ বুজে থাকো৷ হালদারমশায়ের অভিজ্ঞতা শুনে নিই৷
হালদারমশাই আবার চাপাস্বরে বললেন—একটা সাইকেল-রিকশা মেলার দিক থেইক্যা একজন যাত্রী লইয়্যা ফিরছিল৷ সেই রিকশায় আমি রুদ্রগড়ে ফিরিয়া আইলাম, তারপর ডাঃ মুখার্জির বাড়ি গেলাম৷ উনি ওয়েট করত্যাছিলেন৷ আমি আমার কার্ড দেখাইয়া নিজের পরিচয় দিলাম, আপনার কথাও কইলাম৷ অবাক হইয়া শুনি আপনারা যে আইবেন, তা উনি জানেন৷ আর কেউ না, ওনার মাইয়্যা ওনারে রাজবাড়ির থনে ফোনে জানাইসে৷ ডাঃ মুখার্জি সেই রাত্রের ঘটনা সম্পর্কে কইলেন, তাঁর মাইয়্যা ডাক্তার হইসে৷ তাঁর চাইতেও বড়ো ডাক্তার৷ কিন্তু তার নাকি ছোটোবেলা থেইক্যা স্লিপ ওয়াকিংয়ের অসুখ ছিল৷ কয়েক বৎসর ট্রিটমেন্টের পর অসুখ সাইরা যায়৷ কিন্তু তিনি নিজে ডাক্তার৷ কাজেই জানেন, কখনো কোনো কারণে মনের উদ্বেগ আইলে ওই অসুখ আবার হইতে পারে৷ তাঁর বিশ্বাস, অনন্যার মনে নিশ্চয়ই কোনো কারণে উদ্বেগ বাড়সে৷ তাই আবার ছোটোবেলার মতো নিজেই দরজা খুইল্যা বার হইয়া গিয়াছিল৷
কর্নেল বললেন—এর বেশি কিছু তাঁর কাছে আপনি জানতে পারেননি?
হালদারমশাই বললেন—ডাঃ মুখার্জি হঠাৎ আমারে কইলেন, রাজবাড়ি থেইক্যা কোটি টাকা দামের চণ্ডীমায়ের মূর্তি চুরি গিছল৷ সেই মূর্তি রাজবাড়ির মধ্যে কোথাও লুকানো আছে ভাবিয়া রুদ্রগড়ের রাজার কোনো বংশধর এতদিনে এখানে আইয়্যা পড়ছে৷ তারে কে চিনবে? সেই গুন্ডাদের হেল্প লইয়্যা হানা দিতে পারে৷ ড. ত্রিপাঠীর প্রথমে সে ভয় দেখাইছে৷ এরপর সে কী করবে জানি না৷ তবে কর্নেল সাহেবের কথা শুনছি, আপনিও আইয়া পড়ছেন৷ তখন আমি কইলাম, আপনি আপনার মাইয়্যারে বাড়িতে লইয়্যা আয়েন৷ বিপদ বাধলে তারও কোনো ক্ষতি হইয়া যাইতে পারে৷ ডাঃ মুখার্জি কইলেন ওনার মাইয়্যা খুব জেদি৷ সে ওখানে একটা এমন প্রজেক্ট করছে—
কর্নেল তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন—বুঝেছি৷ এবার বলুন আপনার দ্বিতীয় অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা৷
হালদারমশাই বললেন—ডাঃ মুখার্জি আমারে কইছিলেন, রাজবাড়িতে ড. ত্রিপাঠীর অফিসে এক ভদ্রলোক ক্ল্যারিক্যাল কাম করেন৷ অনন্যার লাগে তিনি শুনছেন, কিছুদিন থেইক্যা অফিস রেগুলার খোলে না৷ ড. ত্রিপাঠীর দরকার হইলে তবে সেই ক্লার্ক আনন্দবাবুর ডাইক্যা পাঠান৷
কর্নেল বললেন—তাহলে আপনি আনন্দবাবুর বাড়ি এলেন?
হালদারমশাই বললেন, ‘হ্যাঁ৷ তখন প্রায় দশটা বাজে৷ আমি কইলাম, আমি ড. ত্রিপাঠীর দূরসম্পর্কের রিলেটিভ৷ এখানে পাতালকালীর মন্দিরে পূজা দিতে আইছি৷ তো, ড. ত্রিপাঠী আমারে কইলেন আপনার লগে কথা বলতে৷ আনন্দবাবু আমারে চা-বিস্কুট খাওয়াইলেন৷ খুব খাতির-যত্ন করলেন৷ তারপর কথায় কথায় আমি সেই রাত্তিরের ঘটনা ওনার কাছে জানতে চাইলাম৷ আ—শ্চর্য কর্নেল স্যার! আনন্দবাবু কইল ত্রিপাঠী সাহেব আপনার রিলেটিভ হইতে পারেন৷ কিন্তু ওনার ঠাকুর্দা রাজবাড়ির বিগ্রহ চুরি করছিলেন৷ সেই বিগ্রহ তিনি বেচবার সুযোগ পান নাই৷ তারই খোঁজে রাজবাড়িতে সেই রাজার বংশের কেউ হানা দিতে আসে৷ শুনছি ড. ত্রিপাঠীর বাবার আমলেও হামলা বাধত৷ চণ্ডীমাইজির পাহারাদার ছিল এক দানব৷ সে নাকি আগেও রাত্রিবেলায় হানা দিছে৷ আনন্দবাবু আরও কইলেন, এসব কথা আপনি ওনারে জানাইতে পারেন৷
কর্নেল জিগ্যেস করলেন—তার মানে আনন্দবাবু জানেন যে তিনি সেই দানবের কথা আপনাকে যদি বলেন এবং আপনি যদি সে কথা ড. ত্রিপাঠীকে জানান, তাহলেও ড. ত্রিপাঠী আনন্দবাবুর কোনো ক্ষতি করবেন না৷ বলে কর্নেল ঘড়ি দেখলেন—ঠিক আছে হালদারমশাই৷ আপনি এখনই ফিরে যান৷ তবে যা শুনলাম, আপনাকে আমি পায়ে হেঁটে যেতে নিষেধ করব৷ মিঃ পাণ্ডে আপনার গাড়ির ব্যবস্থা করে দেবেন৷
হালদারমশাই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর প্যান্ট থেকে রুমালে জড়ানো রিভলভারটি দেখিয়ে বললেন—রিভলভারে এক রাউন্ডও গুলি ছুঁড়ি নাই৷ সেই হালা শুধু এই জিনিসটা দেইখ্যাই পলাইয়া গেছে৷ কাজেই আমি মনে মনে তাদের চ্যালেঞ্জ করছি, কর্নেল স্যার৷ আমি চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি৷
কথাটা বলেই তিনি সবেগে বেরিয়ে গেলেন৷
উষ্ণজলে স্নান করার পর আমার শরীর শক্তি ফিরে পেয়েছিল! কর্নেলের সামরিক জীবনের অভ্যাস৷ এখন শীতকালে কদাচিৎ স্নান করেন৷ খাওয়া-দাওয়ার পর বারান্দায় দু’জনে বসলুম৷ উত্তরের হাওয়া কিছুটা ক্লান্ত যেন৷ কিংবা রোদের তাপে আমারই মনের ভুল৷ কর্নেল চুরুট টানছিলেন৷ আমার চোখে ভাত-ঘুমের টান৷ উঠে গিয়ে কম্বলের তলায় ঢুকব ভাবছি, টেলিফোন বাজল৷ কর্নেল বললেন— টেলিফোন ধরো জয়ন্ত! তুমি কথা বোলো না, আমি বলব৷ হ্যাঁ—শুধু সাড়া দেবে৷ ব্যস৷
রিসিভার কর্নেলের হাতে দিয়েই কম্বলের তলায় ঢুকলুম৷ কর্নেল কয়েকবার ‘কে বলছেন’ জিগ্যেস করে বিরুক্ত হয়ে বললেন—পরিচয় না দিলে লাইন কেটে দেব৷... হ্যাঁ৷ বললুম তো আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার৷ আপনি কে?... ঠিক আছে৷ পরিচয় জানতে চাই না৷ কী বলতে চান, বলুন৷...
এরপর কর্নেল ক্রমাগত ‘হুঁ’ দিতে থাকলেন৷ একসময় বললেন—এই যথেষ্ট৷ আমি আপনার কথা বুঝতে পেরেছি৷ রাজবাড়ির ব্যাপারে নাক গলানো বন্ধ করে সারদা লেকে পাখি দেখতে যাওয়ার পরামর্শ মন্দ নয়৷ ঠিক আছে৷ কিন্তু আপনি কি সত্যি বিশ্বাস করেন, কোটি টাকা দামের গয়নাপরা চণ্ডীমাইজি রাজবাড়িতেই কোথাও লুকানো আছে? ...হ্যাঁ৷ সেটা অসম্ভব নয়৷ কিন্তু...সে কী! অনন্যা...নাহ মশাই! এটা বিশ্বাস করতে পারছি না৷...না, না৷ শুনুন! আপনাকে কেউ মিসলিড করেছে!... ও কে৷ ও কে! আপনার পথে আপনি চলুন৷ আমার পথে আমাকে চলতে দিন৷...শুনুন! দিস ইজ মাই ওয়ার্নিং! আই’ম আ রিটায়ার্ড মিলিটারি অফিসার!....শেষ করতে দিন! সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট আমাকে ক্ষমতা দিয়েছেন, দেশের ও জনগণের স্বার্থে আমি একজন কেন, দরকার হলে একশোজনকে গুলি করে মারতে পারি৷...ইয়া! ...ইয়া! দ্যাটস রাইট! টেক ইট অ্যাজ আ চ্যালেঞ্জ!
রিসিভার রেখে কর্নেল বেরিয়ে গিয়ে রৌদ্রে বসলেন৷ চুরুট নিভে গিয়েছিল৷ দেখতে পেলুম, হাওয়ার আড়ালে লাইটার জ্বেলে চুরুট ধরালেন৷ পা দুটো সামনে বিছিয়ে দিলেন৷
এরপর আর ভাত-ঘুম অসম্ভব৷ কম্বল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসলুম৷ স্বগতোক্তির মতো বললুম—কলকাতায় ড. বোসকে সশস্ত্র হয়ে আসতে বলার অর্থ এতক্ষণে বুঝতে পারলুম৷ আমরাও সশস্ত্র৷ ড. ত্রিপাঠীও দেখে এলুম সশস্ত্র৷ হালদারমশাইও সশস্ত্র৷ যুদ্ধটা কেন বাধবে, তা-ও হয়তো আঁচ করেছি৷ কিন্তু কোথায় বাধবে সেটাই জানি না৷ এমন হতে পারে রাজবাড়ির ভিতরে যেহেতু কোটি টাকার গয়নাপরা বিগ্রহ লুকানো আছে, সেখানেই যুদ্ধটা বাধতে পারে৷
আবার টেলিফোন বেজে উঠল৷ কর্নেল কিছু বলার আগেই উঠে গিয়ে রিসিভার তুলে সাড়া দিলুম৷—ইয়া!
—আমি কর্নেল সাহেবের সঙ্গে কথা বলতে চাই!
কোনও মহিলার কণ্ঠস্বর৷ বললুম—আপনি কে বলছেন?
ঝাঁঝালো উত্তর এল৷—আপনি কে বলছেন? কর্নেল সাহেবকে দিন!
সেই সময় আমার হাত থেকে রিসিভার কর্নেল এসে করায়ত্ত করে বললেন—কর্নেল সরকার বলছি!...ও মাই গড! অনন্যা? তুমি জয়ন্তকে...৷ কর্নেল হেসে উঠলেন৷ —হ্যাঁ তুমি বেচারাকে নার্ভাস করে দিয়েছ সম্ভবত৷... ও কিছু না৷ বলো ডার্লিং !... তোমার খাওয়া হয়েছে?... ঠিক আছে৷ তুমি ড. ত্রিপাঠীকে বলো, তোমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন৷ এখনই তোমার...হ্যাঁ৷ আই ইনসিস্ট অনন্যা ফর ইয়োর সেফটি!... শোনো! তুমি অনিরুদ্ধকে বলো, তোমাকে তার গাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে৷ আর মিঃ হালদারকে সঙ্গে নেবে৷...না, না৷ একটুও দেরি নয়! বাবার কাছে পৌঁছেই তুমি আমাকে রিং করবে৷... ও কে! মেক হেস্ট৷...হ্যাঁ৷ মিঃ হালদারকে আমার নাম করে ডেকে নেবে৷..অনি! যা বলছি, তার অন্যথা যেন না হয়৷
রিসিভার রেখে কর্নেল আবার বারান্দায় গেলেন৷ আমিও গেলুম৷ বললুম—আমি বুঝতে পারিনি অনন্যার কণ্ঠস্বর দু’রকম৷ কিছু ঘটেছে৷ কিন্তু কী ঘটেছে, তা শোনার জন্য আমি উদগ্রীব বস!
কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন—জানি না, ইচ্ছে করেই তুমি নির্বোধ সেজে থাকতে চাও কি না৷ আমার কথাগুলো শুনে তোমার বোঝা উচিত ছিল জয়ন্ত!
হাসতে হাসতে বললুম—আপনার কথাবার্তার মধ্যে ‘বিটুইন দ্য লাইনস’ অনেক কিছু থাকে৷ এনি ওয়ে! আমি বুঝতে পেরেছি, যে-কোনো কারণেই হোক, অনন্যাকে আপনি যত শিগগির হয়, রাজবাড়ি ছেড়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিতে বলছেন৷ আর যে-লোকটির সঙ্গে ঝগড়া করছিলেন, তাকে একবার ‘অনন্যা’-র নাম করে কিছু বলতে চেয়েছিলেন৷ সে শোনেনি৷ সে জানে, চণ্ডীমাইজির গয়না রাজবাড়িতেই লুকোনো আছে এবং সম্ভবত—হ্যাঁ, এটা আমার অংক৷ অনন্যা তার খোঁজ জানে৷ ড. ত্রিপাঠীও হয়তো কোনও সূত্রে জেনেছেন বলে তাকে কাছে রাখতে চান৷ অনন্যা শক্তিমতী৷ সে কোনো কারণে হঠাৎ নার্ভাস হয়ে পড়লেও কিছু গ্রাহ্য করে না৷
—ডার্লিং! এবার তোমার প্রশংসা না করে পারছি না৷ তবে এখন কথা নয়৷ আমার সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ৷ আমি কিছুক্ষণ ভাবতে চাই৷ স্পিকটি নট! কিন্তু ফোন বাজলেই উঠে গিয়ে ধরবে৷ সাবধানে কথা বলবে এবং আমাকে ডাকবে৷
বলে কর্নেল চোখ বুঝলেন৷ দাঁতে কামড়ানো চুরুট থেকে সাদা দাড়িতে একটুকরো ছাই এসে পড়ে ছিল৷ হাওয়ায় উড়ে গেল৷ কিন্তু রোদের আরাম আমাকে ক্রমশ ভাত-ঘুমের দিকে টেনে নিয়ে গেল৷ অবশেষে ঘরে ঢুকে বিছানায় কম্বলের তলায় ঢুকে পড়লুম৷ এসব সময়ে আমি আর সাংবাদিক কিংবা কর্নেলের সহযোগী থাকি না৷ আমার আমি-টা কেউ করতলগত করে৷
ঘুম ভাঙল রঘুবীরের ডাকে৷ তার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট৷ সে বিনীতভাবে বলল—কর্নেল বলে গিয়েছেন, আপনি বিকেল চারটেয় চা খান৷
চা নিয়ে চুমুক দিলুম৷ তাহলে কর্নেল একাই রণক্ষেত্রে গেছেন৷ অভিমান করে লাভ নেই৷ আমার এই বিশ্রাম সত্যি দরকার ছিল৷ রঘুবীর দাঁড়িয়ে ছিল তখনও৷ বললুম—তুমি রঘুবীর৷ আরও একজন রঘুবীর আছেন রাজবাড়িতে৷ তিনি বাঙালি বামুন৷ ঠাকুরবাড়ির পুরোহিত৷ তাঁর সঙ্গে তোমার আলাপ নেই?
—না স্যার! আলাপের সুযোগ পাইনি৷ রাজবাড়ির মন্দিরে গতবছর পুজোর সময় দূর থেকে দেখেছি মাত্র৷ তবে স্যার, গুজব শুনেছি, উনি রান্নাবান্না-পুজো-আচারের দায়িত্বে থাকলেও ওঁর যোগবলে নাকি অলৌকিক শক্তি আছে৷ সংক্ষেপে বলছি, উনি কোনও পালোয়ানকে ছুঁয়ে দিলে সে নেতিয়ে পড়ে যাবে৷ এ নাকি যোগ-সাধনার ফল৷ আমার এক বন্ধু সুশীলের কাছে শুনেছি, কয়েকবছর আগে চিরদিনের প্রথামতো রুদ্রগড়ে ব্যবসায়ীরা পয়লা আষাঢ় কুস্তির আয়োজন করেছিলেন৷ এখনও করেন৷ তবে সে-বছর হঠাৎ রাজবাড়ির ঠাকুরমশাই এক পালোয়ানের টিকি দেখে নাকি জোক করেছিলেন! টিকি রেখে কুস্তি লড়তে এসেছ? প্রতিপক্ষ তোমাকে টিকি ধরে একটানেই হারিয়েই দেবে৷ তাই শুনে খাপ্পা পালোয়ান ঠাকুরমশাইয়ের দিকে তেড়ে আসতেই উনি হাত বাড়িয়ে তার মাথা ছুঁলেন৷ আর ব্যস! পালোয়ান কুপোকাত! একেবারে অজ্ঞান৷ এক ঘড়া জল ঢেলে তার জ্ঞান ফেরে৷
কথাগুলো শুনতে শুনতে আমি বিস্ময় চেপে রাখছিলুম৷ রাজবাড়িতে সেই দুর্ঘটনার রাতে তা হলে রঘুবীর মুখুজ্যেমশাই-ই কি অনন্যার মাথায় হাত রেখে—
চিন্তা থমকে গেল৷ রঘুবীর মুখুজ্যের উদ্দেশ্য কী? মানুষটিকে ন্যালাভোলা সাদাসিধে মনে হয়েছে? তাঁর পক্ষে হঠাৎ এমন করে অনন্যাকে নিয়ে গিয়ে পাঁচিলের ধারে ফেলে রাখার উদ্দেশ্য কী? তাঁর কি কোনও সঙ্গী পাঁচিলের সেই জায়গাটা ডিঙিয়ে এসেছিল এবং অপেক্ষা করছিল? সে অনন্যাকে খুনের ভয় দেখিয়ে জেনে নিত, কোথায় চণ্ডীমাইজিকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে? তারপর ড. ত্রিপাঠীর রাইফেলের গুলির শব্দে ভয় পেয়ে ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গী পাঁচিল ডিঙিয়ে পালিয়ে যায়৷ আর ঠাকুরমশাই হইচইয়ের সঙ্গে যোগ দেন এবং চুপিচুপি ছুটে গিয়ে বাড়ির বিদ্যুতের মেইন স্যুইচ অন করে দেন৷ আলো জ্বলে ওঠে৷
হ্যাঁ৷ হলঘরে ঢোকার জন্য চাবি দরকার৷ এতকাল তিনি রাজবাড়িতে আছেন৷ একটা ডুপ্লিকেট চাবি তৈরি করিয়ে নেওয়ার সুযোগ তাঁর আছে বইকী৷
আমার এই থিওরি অটুট বলে মনে হল৷ কিন্তু কর্নেলকে এখন পাওয়া দরকার৷ রঘুবীর তখনও দাঁড়িয়ে আছে৷ আরও কিছু বলতে চায় ভেবে চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললুম—রঘুবীর মুখুজ্যের এই অলৌকিক শক্তির খবর ড. ত্রিপাঠী নিশ্চয়ই জানেন?
রঘুবীর আস্তে বলল—তিনি জানবেন না কেন? রুদ্রগড়ের সবাই জানে৷
—পুলিশ জানে?
আমার এই অতর্কিত প্রশ্নে চমকে উঠেছিল রঘুবীর৷ একটু পরে বলল—পুলিশ... স্যার! পুলিশ মনে হয়, এ নিয়ে মাথা ঘামায় না! তবে...না স্যার! পুলিশকে কেউ জানালেই বা কী? যোগবলে প্রচণ্ড শক্তি কোথায় কার আছে, তা নিয়ে পুলিশের কী করার আছে?
ওর হাতে খালি কাপ-প্লেট দিয়ে বললুম—ঠিক আছে৷
রঘুবীর বেরিয়ে গিয়ে হঠাৎ ঘুরে বলল—মকবুল খান গাড়ি নিয়ে গেটে ঢুকছে, কর্নেল সায়েবকে দেখছি না৷ হয়তো কর্নেল সায়েবকে কোথাও পৌঁছে দিয়ে এল৷
সে অদৃশ্য হলে প্রথমে বাথরুমে গেলুম৷ ঈষদুষ্ণ জলে মুখ ধুয়ে মনে হল, যথেষ্ট চাঙ্গা হয়েছি৷ এই শীতে চা যথেষ্ট নয়৷
বাথরুম থেকে ফিরে প্যান্ট-শার্ট-সোয়েটার পরে পুরু জ্যাকেট চাপিয়ে মাথায় টুপি ঠেসে দিলুম৷ তারপর টেলিফোনের কাছে গেলুম৷ কিন্তু এখনই ঘরের ভিতর গাঢ় ছায়া৷ হাত বাড়িয়ে স্যুইচ টিপে আলো জ্বেলে দিলুম৷ টেলিফোন গাইডটা চটি বইয়ের মতো৷ তবে রুদ্রগড়ে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা অটোমেটিক, তা জেনে গিয়েছি৷ গাইডের পাতা উল্টে ড. ত্রিপাঠীর নাম্বার খুঁজে বের করলুম৷ নাম্বারটা আমার নোটবইয়ে টুকে নেওয়ার পর ডায়াল করলুম৷ সাড়া পেতে দেরি হল৷ বললুম—আমি জয়ন্ত চৌধুরী বলছি৷ ড. ত্রিপাঠী বলছেন?
—হ্যাঁ৷ বলুন জয়ন্তবাবু!
—কর্নেল কি আপনার কাছে আছেন?
—কর্নেল সাহেব প্রায় এক ঘণ্টা আগে এসেছিলেন৷ উনি অনিরুদ্ধের গাড়িতে বেরিয়েছেন৷ সম্ভবত অনন্যাদের বাড়িতে গিয়েছেন৷ অনন্যার বাবা হঠাৎ অসুস্থ৷ তাকে অনিরুদ্ধ পৌঁছে দিতে গেছে৷ এখনও ফেরেনি৷
—ধন্যবাদ ড. ত্রিপাঠী!
—আপনার কথা জিগ্যেস করেছিলুম৷ আপনি নাকি বাংলোয় ঘুমোচ্ছেন৷ ঘুমোনোর কথা৷ আপনার তো কর্নেল সাহেবের মতো মিলিটারি জীবনের অভ্যাস নেই৷
ড. ত্রিপাঠী হাসছিলেন৷ বললুম—ঠিক বলেছেন ড. ত্রিপাঠী! বাই দা বাই, এই বাংলোয় একটা লোকের কাছে শুনলুম, আপনার ঠাকুরমশাই নাকি যোগ-সাধনার জোরে অলৌকিক শক্তি অর্জন করেছেন?
আবার ড. ত্রিপাঠী হেসে উঠলেন৷—রোগাপটকা দুর্বল মানুষ৷ কিন্তু গলার জোর আছে৷ রেগে গেলে বলেন, এক থাপ্পড়ে পাতালকালীর মন্দিরে পাঠিয়ে দেব৷ এই সব কারণে লোকে মুখুজ্যেমশাইয়ের সঙ্গে জোক করে৷ ওঁকে বলে, নমো করি পালোয়ানমশাই!
আমার কথা শোনার আগেই উনি রিসিভার রেখে দিলেন৷
বাইরে প্রাক-সন্ধ্যার ধূসরতা ঘনিয়ে এসেছে৷ একবার ভাবলুম, ফোন ডাইরেক্টরি থেকে অনন্যার বাবার নাম খুঁজে তাঁকে ফোন করি৷ কারণ কর্নেলের সঙ্গে আমার এখনই দেখা হওয়া খুব দরকার৷ রঘুবীর রাজবাড়ির আর-এক রঘুবীরের সম্পর্কে যা বলে গেল তা ড. ত্রিপাঠী একেবারে উড়িয়ে দিলেন৷ আমার ধারণা, তিনি নিজের কাজকর্ম নিয়ে এত ব্যস্ত থাকেন যে বাইরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কম৷ কিন্তু চন্দ্রমুখী দেবীরও কি বাইরের সঙ্গে তত বেশি যোগাযোগ ছিল না?
একটু পরে আমার মনে হল, রুদ্রগড়ের এই রাজবাড়িটা যেন একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো৷ অবশ্য আনন্দবাবু ড. ত্রিপাঠীর অনেক দিনের কর্মচারী৷ তিনি তো রাজবাড়ির ঠাকুরমশায়ের এই অসাধারণ শক্তির কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন৷ নাকি তিনিও অন্যদের মুখে শুনে ব্যাপারটা স্রেফ কৌতুক বলে ভেবেছেন!
আমি অস্থির৷ টেলিফোনের গাইডবুক খুলতে যাচ্ছি, ঠিক সেই সময় টেলিফোন বেজে উঠল৷ দ্রুত রিসিভার তুলে সাড়া দিলুম৷ তারপর কর্নেলের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—জয়ন্ত, ঠিক সময়ে রঘুবীর চা সার্ভ করেছিল তো?
বললুম—হ্যাঁ৷ কিন্তু সে আমাকে চায়ের সঙ্গে আরও কিছু জিনিস সার্ভ করেছে৷ তা আপনার এখনই জানা দরকার৷ আপনি কোথায় আছেন?
—আমি রুদ্রগড় পুলিশ স্টেশন থেকে ফিরে যাওয়ার পথে একটা ওষুধের দোকান থেকে তোমাকে ফোন করছি৷ শোনো, আমার সঙ্গে হালদারমশাই আছেন৷ বারবার অনিরুদ্ধকে গাড়ি নিয়ে ড্রাইভারি করতে বলা ঠিক হবে না৷ তুমি মিঃ পাণ্ডেকে বলে মকবুল খানের গাড়িতে রাজবাড়িতে চলে এসো৷ সঙ্গে তোমার লোডেড আর্মস নেবে৷
রিসিভার রেখে আমি রিভলভারটা লোড করে পকেটে ঢোকালুম৷ তারপর আমাদের স্যুইটের দরজায় তালা এঁটে নীচে নেমে গেলুম৷ উপরের বাকি তিনটে স্যুইটেই কারা সব এসে গেছেন৷ বেশ হোমরা-চোমরা বলেই মনে হল৷ নীচে নেমে প্রথমে গেলুম মিঃ পাণ্ডের অফিসরুমে৷ তিনি আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন৷—বলুন মিঃ চৌধুরী, আপনার জন্য কী করতে পারি? কর্নেল সাহেব আমাকে বলে গিয়েছেন, আপনার কিছু দরকার হলে যেন সাহায্য করি৷
একটু হেসে বললুম—কর্নেল সাহেব আমাকে রাজবাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছেন৷ এখন সমস্যা হল, আমি অতখানি পথ কিভাবে যাব৷ কারণ উপর থেকেই লক্ষ্য করেছি, আপনার এখান থেকে সদর রাস্তাটা রুদ্রগড়ের দিকে একেবারে অন্ধকার৷ অবশ্য আমার কাছে টর্চ আছে৷
সেই সময়ই মিঃ পাণ্ডের টেবিলে টেলিফোন বেজে উঠল৷ তিনি সাড়া দিয়েই সহাস্যে বললেন—হ্যাঁ কর্নেল সাহেব, জয়ন্তবাবু আমার কাছেই আছেন৷ আপনি না বললেও আমি মকবুলকে বলে আমাদের গাড়িতেই ওঁকে পৌঁছে দিতুম৷ প্লিজ ডোন্ট ওয়ারি৷ যে-কোনো মুহূর্তে আমার পক্ষে সম্ভবপর যে-কোনো সাহায্য আমি করতে তৈরি আছি...আচ্ছা, রাখছি৷
ততক্ষণে আমি তাঁর সামনের চেয়ারে বসে পড়েছিলুম৷ মিঃ পাণ্ডে তাঁর সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ডানদিকে কোনো বোতাম টিপলেন বলে মনে হল৷ একটু পরে রঘুবীর এসে সেলাম দিল৷
মিঃ পাণ্ডে বললেন—তুমি গিয়ে মকবুলকে বলো, গাড়িটা নিয়ে মকবুল যেন পোর্টিকোর নীচে চলে আসে৷ চৌধুরী সাহেব রাজবাড়িতে যাবেন৷ ওঁকে পৌঁছে দিয়েই মকবুলকে চলে আসবে বলবে৷ কারণ সাতটায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব পাতালকালী মন্দিরে যাবেন৷
রঘুবীর বেরিয়ে গেল৷ আমি জিগ্যেস করলুম—এই প্রচণ্ড শীতের মধ্যে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব পাতালকালীর মন্দিরে যাবেন?
মিঃ পাণ্ডে বললেন—যতটুকু বুঝেছি, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ চিরঞ্জীব সিনহার মিসেসেরই সম্ভবত কোনো মানতের ব্যাপার আছে৷ তবে ওখানে তো প্রায় সারারাত মেলা এবং নানারকমের নাচগানের আসর চলবে৷ কাজেই কোনো অসুবিধা নেই৷ উনি এসেই আমাকে পাতালকালীর মন্দিরের হেড অফ দ্য ট্রাস্টি বোর্ডকে ওঁর আসার কথা জানাতে বলেছিলেন৷ সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যেই পুজো দিতে যাবেন, তাও আমি জানিয়ে দিয়েছি৷
গাড়ির চাপা শব্দ ভেসে এল৷ রঘুবীর ঘরের দরজা থেকেই বলল—আসুন স্যার, গাড়ি এসে গেছে৷
মিঃ পাণ্ডেকে ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গেলুম৷ মকবুল খান গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিল৷ আমাকে মিলিটারি স্যালুট ঠুকে পেছনের দরজা খুলে দিল৷ আমি ভিতরে ঢুকে গেলুম৷ কারণ এত পোশাক সত্ত্বেও শীত যেন হাড়ে কামড় বসাচ্ছে৷
মকবুল গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল৷
বদ্ধ গাড়ির ভিতরেও ঠান্ডা বাতাসের উপদ্রব৷ তবে পাঁচ-ছ’মিনিটের জার্নি৷ রাস্তার অন্ধকার অংশ পেরিয়ে গেলুম৷ কিন্তু অজস্র মানুষ পায়ে হেঁটে যাচ্ছে৷ সেই সঙ্গে গাড়ির বিরাম নেই৷ আলোর ছটায় চোখ ঝলসে যাচ্ছে৷ রাজবাড়ির সামনে পৌঁছে প্রাইভেট রোড ধরে রাজবাড়ির গেটে পৌঁছলুম৷ মকবুল মুখ বাড়িয়ে হাঁক দিল—হো দেওকীপরসাদ ভাইয়া!
দারোয়ান দেওকীপ্রসাদ গেট খুলে দিতে দিতে সহাস্যে বলল—আরে মকবুল ভাইয়া! আমি ভাবছিলাম তুমি ডাকবাংলো থেকে অন্য কোনো সাহেবকে নিয়ে পাতালকারীর মন্দিরের মেলায় গেছ৷
মকবুল বলল—যেতে হবে ভাই দেওকীপরসাদ৷ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তাঁর ওয়াইফকে নিয়ে সাতটায় বেরুবেন৷ পাতালকারীর মন্দিরে পুজো দিতে যাবেন৷ আমি ছোটা সাবকে তোমার এখানে পৌঁছে দিয়েই চলে যাব৷
রাজবাড়ির পোর্টিকোর তলায় গাড়ি ঢুকল৷ হলঘরের দরজায় অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে ছিল৷ আমি বেরুতেই সে আস্তে বলল—আসুন জয়ন্তবাবু৷ কর্নেল সাহেব এইমাত্র এসে পৌঁছেছেন৷ মিঃ হালদারও এসেছেন৷ ওঁরা দু’জনে একটা ট্রলি ভাড়া করে এসেছেন৷ খবর পেলে আমি গিয়ে নিয়ে আসতুম৷
বললুম—অনন্যা বাবার বাড়িতেই আছেন?
অনিরুদ্ধ থমকে দাঁড়িয়ে খুব চাপাস্বরে বলল—কর্নেল সাহেবের হাবভাব লক্ষ্য করে—তা ছাড়া উনি আমাকেও কিছু গোপন নির্দেশ দিয়েছেন, এইসব কিছুর ভিত্তিতে আমার মনে হচ্ছে খুব শিগগির একটা কিছু ঘটতে চলেছে৷ আমি জানি, আপনি সশস্ত্র৷ কর্নেল সাহেব আমাকেও জিগ্যেস করেছিলেন আমি কোনো আর্মস সঙ্গে রাখি কিনা৷ আমি রাখি৷ কারণ এই জিনোম প্রকল্পের কিছু বিপজ্জনক দিক আছে৷ ডিটেলস বলার সময় নেই৷ আসলে দৈবাৎ কোনো কৃত্রিম জীবন সৃষ্টি হয়ে বিপদ বাধাতে পারে৷ সে-রাত্রে ভাগ্যিস যে প্রাণীটা গড়ে উঠেবে, তার ছায়ার মতো নেগেটিভ সত্তা দেখা দিয়েছিল৷ আমার বিশ্বাস আমাদের প্রকল্প সফল হবে৷ শুধু অনন্যার একটু কাজ বাকি আছে৷
সিঁড়িতে উঠতে উঠতে আমাদের কথা শেষ হল৷ তারপর দোতলার বারান্দায় উঠে দেখলুম, সেই ঠাকুরমশাই কম্বল মুড়ি দিয়ে আর মাথায় হনুমান টুপি পরে বেরিয়ে আসছেন৷ আমাকে দেখে হেসে বলে গেলেন—আপনার জন্যেও খালি কাপ-প্লেট রাখা আছে৷
অনিরুদ্ধ বারান্দা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে খুব চাপাস্বরে বলল—মিঃ হালদার বলছিলেন, আজ সকালে পাতালকালী মন্দিরে যাবার পথে কে একজন ড্যাগার বের করে তাঁকে স্ট্যাব করতে গিয়েছিল৷
দ্রুত বললুম—জানি৷
—আমার অবাক লাগছে৷ উনি যে প্রাইভেট গোয়েন্দা এবং ড. ত্রিপাঠীর বাড়ির ঘটনায় তাঁকে কলকাতা থেকে আনা হয়েছে, কে জানল? উনি বলছিলেন, কলকাতা থেকেই ট্রেনে তাঁকে লোকটা ফলো করে এসেছিল৷
—জানি৷ আমার ধারণা, এ বাড়ির কেউ এসবের পিছনে আছে৷
অনিরুদ্ধ থমকে দাঁড়িয়ে আস্তে বলল—আছে৷ কিন্তু সে কে, সেটাই স্পষ্ট নয়৷ দেখা যাক, কর্নেল সাহেব শেষাবধি কী করেন৷ আসুন! এবেলা স্যার তাঁর শয়নকক্ষে নয়, পাশের ঘরে আছেন৷ অনন্যা যে-ঘরে ছিল৷
পর্দা তুলে একে-একে দু’জনে ঘরে ঢুকলুম৷ দেখেই বুঝলুম, এটা ড. ত্রিপাঠীর স্টাডি৷ দেওয়ালগুলো বইয়ের আলমারিতে ঢাকা৷ আলমারির মাথাতেও বই-পত্র পত্রিকার স্তূপ৷ পূর্বে একটা জানালার পাশে বিশাল টেবিল এবং গদি-আঁটা দামি চেয়ার৷ টেবিলের একপাশে কয়েকটা কাচের জারে তরল পদার্থে মানুষ বা কোনও প্রাণীর ভ্রূণ ভাসছে৷ সেই চেয়ারটা এদিকে ঘুরিয়ে ড. ত্রিপাঠী বসে আছেন৷ তাঁর ডানদিকে আলমারি ঘেঁষে নিচু ডাবলবেড খাট৷ খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছেন গোয়েন্দাপ্রবর হালদারমশাই৷ কর্নেল একটা ইজিচেয়ার পেয়ে আরামে ঠেস দিয়ে বসে আছেন৷ আমাদের দেখে ড. ত্রিপাঠী একটু হেসে বললেন—জয়ন্তবাবু ওই চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসুন৷ অনিরুদ্ধ! তোমার অপেক্ষায় কফির কাপগুলো হাঁ করে আছে৷
অনিরুদ্ধ পাঁচটা কাপে কফি ঢেলে পরিবেশন করল৷ নিজেরটা নিয়ে সে হালদারমশাইয়ের পাশে বিছানায় বসল৷ কর্নেল এবার সোজা হয়ে বসে কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন—জয়ন্ত শুনলে খুশি হবে, হালদারমশাইকে যে ড্যাগার দেখিয়েছিল, পুলিশ তাকে সহজেই ধরেছে৷ যে আদিবাসী গ্রামের কাছে লোকটা হামলা করেছিল, সেই গ্রামের একটা লোক পুলিশকে তার নাম-ঠিকানা দিয়েছিল৷ কারণ যখন-তখন ওই দুর্বৃত্ত ওদের গ্রামে গিয়ে হাঁড়িয়া খেয়ে মেয়েদের সঙ্গে বজ্জাতি করত৷ পুলিশকে কেউ ভয়ে এতদিন জানাতে পারেনি৷
বললুম—নাম কী? কোথায় থাকে সে?
হালদারমশাই সহাস্যে বললেন—হালার ডাক-নাম...সরি, ভেটকা৷ আসল নাম হইল গিয়া সুরজ সিং৷
অনিরুদ্ধ জিগ্যেস করল—আপনার পিছনে ওকে নিশ্চয়ই কোনও বিগ গাই লাগিয়েছিল?
হালদারমশাই কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বললেন—তা কইতে পারেন৷ তবে মাঝখানে...
কর্নেল বললেন—হালদারমশাই! দেওয়ালের কান আছে৷ চৌত্রিশ বছর পুলিশের চাকরি করেও কি কথাটা ভুলে গেলেন?
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন—হুঃ! অনিরুদ্ধবাবু ঠিক সময় জানতে পারবেন৷
আমি বললুম—অনন্যার বাবা কেমন আছেন?
জবাব দিলেন ড. ত্রিপাঠী৷—বয়স হয়েছে৷ প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন অমিয়বাবু৷ মাঝে মাঝে প্রায়ই নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ তবে একটু আগে কর্নেল সাহেবকে বলছিলুম, মেয়ের সম্পর্কে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে নিজের কাছে রাখতে চান৷ কর্নেল সাহেব আর মিঃ হালদারের পরিচয় কোনও সূত্রে পেয়ে থাকবেন৷ কর্নেল সাহেব আর মিঃ হালদার গিয়ে ওঁর উদ্বেগটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন আর কী!
হালদারমশাই গভীর মুখে বললেন—হাতে ক্যাস লইছি ত্রিপাঠী সাহেব! আমাগো উপায় ছিল না৷
আমি বললুম—আচ্ছা কর্নেল! ডাক্তারবাবু তাঁর মেয়ের স্লিপ-ওয়াকিং সম্পর্কে আপনাকে নিশ্চয়ই জানিয়েছেন?
কর্নেল গলার ভিতরে বললেন—হ্যাঁ৷
হালদারমশাই বললেন—উনি ঠিক কইছেন জয়ন্তবাবু! মনে কোনও কারণে উদ্বেগ বেশি হইয়া গেলে ঘুমের ঘোরে দরজা খুইল্যা বাহির হওনের রোগ আবার দেখা যায়৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—এটা যুক্তিসঙ্গত কারণে আমিও মেনে নিয়েছি৷ সে-রাত্রে স্লিপ-ওয়াকিংয়ের আগে নিশ্চয়ই একটা স্বপ্ন দেখেছিল৷ যেন আমার মতো কেউ তাকে ডেকে দরজা খুলিয়েছে এবং তার মাথায় হাত রেখেছে৷ সাইকিয়াট্রিক, নিউরোলজিস্ট এবং জেনারেল ফিজিশিয়ানদের একটা টিম অনিকে দু’দিন-দু’রাত্রি পরীক্ষার পর বলেছেন, এটা সোমনামবুলিয়াজিম (Somnumbuliaism)-এর কেস৷ পনেরো বছর কেন, কুড়ি বছর পরেও এই অসুখটা ভীষণ উদ্বেগজনিত কারণে ফিরে এসে অ্যাটাক করতে পারে৷
এইসময় হঠাৎ অনিরুদ্ধ উঠে গিয়ে দরজার পরদা তুলে বাইরে গেল৷ আমরা পরস্পরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টে তাকালুম৷ ড. ত্রিপাঠী চেয়ারের পাশ থেকে রাইফেলটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন৷ হালদারমশাই উঠতে যাচ্ছিলেন৷ কর্নেল তাঁকে একটু হেসে বললেন—বসে থাকুন হালদারমশাই৷ বাইরে বড্ড শীত৷
এই সুযোগে আমি চাপাস্বরে জিগ্যেস করলুম—কর্নেল! সেই ড্যাগারওয়ালা ভেটকার গার্জেন কে?
—একটু ধৈর্য ধরো৷ গার্জেন আছে৷ একজন মিডলম্যানও আছে৷ গার্জেনের আদেশে মিডলম্যান ভেটকাকে টাকাকড়ি দিয়ে কলকাতা পাঠিয়েছিল৷
—সে কীভাবে জানল, হালদারমশাই প্রাইভেট ডিটেকটিভ?
—তুমিই চিন্তা করে দেখো৷
একটু ভেবে বললুম—ড. ত্রিপাঠীর ফোন ট্যাপ করলে জানার সম্ভাবনা আছে৷ তা হলে তো সেই গার্জেনকে এ বাড়িরই লোক বলতে হয়৷
কর্নেলের জবাব দেওয়ার সময় ড. ত্রিপাঠী ও অনিরুদ্ধের চাপা কণ্ঠস্বর শোনা গেল৷ তার একটু পরে দু’জনে ঘরে ঢুকলেন৷ হালদারমশাই সদ্য নস্যি নিয়ে রুমালে নাক মুছছিলেন৷ বললেন—কী? ক্কী দ্যাখলেন ত্রিপাঠী সাহেব?
ড. ত্রিপাঠী চুপচাপ গিয়ে নিজের চেয়ারে বসে রাইফেলটা পিঠের কাছে দাঁড় করিয়ে রাখলেন৷ অনিরুদ্ধ বিছানায় বসে একটু হেসে বলল—চণ্ডীমাইজির পাহারাদার সেই দানবও হতে পারে৷ ভেবেছিলুম, চন্দ্রমুখীদির ঘরের তালা ভাঙার চেষ্টা করেছিল৷ বাড়ির ডানদিকে ঘুরে যাওয়া অংশে শেষ ঘর ওটা৷ বিশাল থামগুলোর আড়ালে দৃষ্টি যায় না৷ কিন্তু আমার কানে শব্দটা এসেছিল৷ পায়ের শব্দ শুনেই ড্রেনপাইপ বেয়ে নেমে যেতেও পারে৷ ঠিক বোঝা গেল না৷
হালদারমশাই গুলি গুলি চোখে তাকিয়ে ছিলেন৷ গোঁফের দুই ডগা যথারীতি তিরতির করে কাঁপছিল! বলে উঠলেন—কী কইলেন? কী কইলেন? ড্রেনপাইপ বাইয়্যা লাইম্যা গেল? কে সে?
তাঁকে থামিয়ে বললুম—দানব৷
—দানব? যারে দানো কয়? তো দানোর ভারে ড্রেনপাইপ ভাইঙ্গা পড়নের কথা!
কর্নেল ঠোঁটের কোণে হেসে বললেন—অনিরুদ্ধ! ওঁকে বুঝিয়ে দাও৷ তোমাদের জিনোম-প্রজেক্টে দানোর নেগেটিভ সত্তার কথা! ওটা ছায়ারূপী এবং ইস্পাতের দেওয়ার ভেদ করে যায় গামা রশ্মির মতো! আলফা বিটা গামা! অ্যাটম বোমার ব্যাপারটা নিশ্চয় হালদারমশাই জানেন?
গোয়েন্দাপ্রবর ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বললেন—দানো খেইক্যা অ্যাটম বোমা!
কিছুক্ষণ যাবৎ আমার মনে বাংলোর রঘুবীরের কথাগুলি মাছির মতো ভনভন করছিল৷ রঘুবীর রাজবাড়ির ঠাকুরমশাই রঘুবীর মুখুজ্যে সম্পর্কে যে সব কথা বলেছে, তা মিথ্যা বলে মনে হয়নি৷ বাংলোর রঘুবীরকে সরল-সুবোধ তরুণ বলে বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল৷ সে স্থানীয় সব খবরাখবর রাখে৷ সে কেন আমাকে ঠাকুরমশাই সম্পর্কে নিছক গুজবের কথা বলবে? লক্ষ্য করেছিলুম, সে কথাগুলো সিরিয়াস ভঙ্গিতেই বলছিল৷ এখন সমস্যা হল, কর্নেলের কানে কথাটা কীভাবে পাচার করি? আমি বড্ড ভুল করেছি৷ কর্নেল টেলিফোনে আমাকে ডাকার সময় তাঁকে কথাগুলো জানানোর সুযোগ ছিল৷ কিন্তু কর্নেল সুযোগ দেননি৷ তাহলেও আমি সুযোগ নিতে পারতুম৷
তা ছাড়া এখন রাজবাড়িতে এসে মনে হচ্ছে, টেলিফোনে কর্নেলকে ঠাকুরমশাই সম্পর্কে ওইসব কথা না বলে হয়তো ঠিকই করেছি৷ কারণ কর্নেলের কথা শুনে বুঝতে পেরেছিলুম, ড. ত্রিপাঠীর টেলিফোনে কেউ ট্যাপ করেছিল এবং সে এই রাজবাড়ির লোক ছাড়া বাইরের লোক হতে পারে না৷ কর্নেল ড. ত্রিপাঠীর ফোনের লাইন চেক করেছেন কি না তা-ও বোঝা যাচ্ছে না৷
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন—ড. ত্রিপাঠী! এবার আপনি আনন্দবাবুকে টেলিফোনে ডেকে পাঠান৷ ওঁর অসুস্থ মিসেস বলেছিলেন, পাতালকালীর মন্দিরে তাঁর জন্য পুজো দিতে গেছেন৷ সন্ধ্যা ছ’টা-সাড়ে ছ’টায় ফেরার কথা৷ এখন সাতটা-পনেরো বাজে৷
ড. ত্রিপাঠী টেলিফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন৷ সাড়া পেয়ে বললেন—রাজবাড়ি থেকে বলছি৷ আপনার হাজব্যান্ডকে দিন৷...হ্যাঁ আমি ডাক্তার ত্রিপাঠী৷...ফেরেননি এখনও? আনন্দবাবু কি একা গেছেন?...ঠিক আছে৷ ফিরলে বলবেন, আমি ফোন করেছিলুম৷...না৷ ওঁর এখানে আসবার দরকার নেই৷ এলে আমাকে রিং করতে বলবেন৷ রাখছি৷
রিসিভার রেখে ড. ত্রিপাঠী কর্নেলের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টে তাকালেন৷ কর্নেল চাপাস্বরে বললেন—সন্ধ্যা সাতটায় পুলিশ ফোর্স এসে পূর্ব দিকে পজিশন নেওয়ার কথা৷ ওসি মিঃ রমেশ সিনহা ওদিকেই থাকবেন৷ ওদিকটায় বড়ো-বড়ো পাথরের আড়ালে থাকার সুবিধে আছে৷
—সেই দেবদারু গাছটার কাছে পাঁচিল বেয়েই শয়তানটা আসবে! বলে ড. ত্রিপাঠী বিকৃত মুখে নিজের জোড় বাঁধা দু’হাতের দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ ওঁর এই অভ্যাসটা আজ সকালেও লক্ষ্য করেছিলুম৷ তিনি মৃদুস্বরে কথাটা বলার পর মুখ তুললেন—কর্নেল সাহেব! আমি ওকে দেখামাত্র গুলি করে মারব৷
কর্নেল নিষ্পলক চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন—না ড. ত্রিপাঠী ! পুলিশকে যা কিছু করার তা করতে দেওয়াই ভালো৷ তবে হ্যাঁ, দৈবাৎ আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার অধিকার আমাদের প্রত্যেকের আছে৷
অনিরূদ্ধ আবার হঠাৎ উঠে গিয়ে দরজার পর্দা তুলে দাঁড়িয়ে রইল৷ ড. ত্রিপাঠী তাকে জিগ্যেস করলেন—আবার কি কেউ পাইপ বেয়ে উঠছে? একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি যেন৷
অনিরুদ্ধ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল—নাহ! বাতাসের শব্দ৷ অশোক গাছের একটা ডাল বেড়ে এসেছে৷ কার্নিশে ঘষা খাচ্ছে৷ ডালটা কেটে ফেলা দরকার৷
ড. ত্রিপাঠী বললেন—আমি কিন্তু বড্ড অস্বস্তিতে পড়ে গেছি! কর্নেল সাহেব! আপনি কি আমার শত্রুপক্ষের প্ল্যান সম্পর্কে সিওর?
—সিওরিটির অনুপাত ৯০-১০৷ বলে কর্নেল আবার ঘড়ি দেখলেন৷ উঠে দাঁড়িয়ে ড. ত্রিপাঠীর দিকে এক পা বাড়িয়ে বললেন—অনন্যার জন্য এ-ঘরে টেলিফোনের এক্সটেনশন ছিল৷ ফোনটা কোথায়?
—এই তো! বিছানার মাথার দিকে৷ হাত বাড়ালেই পাবেন৷
কর্নেল বসে পড়লেন৷ তারপর বললেন—ঢাকনা দেওয়া আছে৷ তাই বুঝতে পারিনি৷ আমি আর-একবার আমার ফোর্সকে ফোন করতে চাই৷
তিনি কভার সরিয়ে রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন৷ সাড়া পেয়ে বললেন—কর্নেল সরকার বলছি৷ ড. ত্রিপাঠী অস্বস্তিতে পড়েছেন৷ তুমি টাইমশিড্যুল সম্পর্কে সিওর তো?... সাড়ে সাতটা তো...হ্যাঁ৷ ইউ আর রাইট৷...থ্যাংকস৷
রিসিভার রেখে কর্নেল বললেন—অনিরুদ্ধ! নীচে হলঘরের দরজা তো খোলা৷
অনিরুদ্ধ বলল—হ্যাঁ৷ আপনার কফির তৃষ্ণা মেটাতে ঠাকুরমশাই নিশ্চয়ই আর-এক রাউন্ড কফি আনবেন৷ নাকি গিয়ে তাড়া দেব?
ড. ত্রিপাঠী বললেন—তাই যাও৷ আমি আর কফি খাব না!
অনিরুদ্ধ বেরিয়ে গেল৷ তারপর তার কথা শোনা গেল৷—দেওকীপরসাদ! গেট বন্ধ রাখো৷ কেউ এলে খুলে দেবে৷ দেওকীপরসাদ৷ কোথায় গেলে তুমি? আশ্চর্য লোক তো! দেওকীপরসাদ!
হালদারমশাই বললেন—হইল কী? সাড়া দেয় না ক্যান?
বলেই তিনি উঠে গেলেন৷ অমনই হঠাৎ আলো নিভে গেল৷ কর্নেল টর্চ জ্বালালেন৷ ড. ত্রিপাঠী টর্চ জ্বেলে রাইফেল কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে হাঁক দিলেন—দেওকী-ই-ই!
তারপরই বারান্দায় কেউ আছড়ে পড়ার শব্দের সঙ্গে আরও কিছু ধাতব শব্দ শোনা গেল৷ হালদারমশাই তাঁর টর্চ জ্বেলে রিভলভার বের করে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন৷ কর্নেল উঠে গিয়ে পূবের একটা জানালা খুলে টর্চের আলোয় পুলিশকে সংকেত দেখাতে থাকলেন৷ দেখলুম, তাঁর হাতেও রিভলভার৷ প্রথমে মিনিট দুই হকচকিয়ে যাওয়ার পর বাইরে গুলির শব্দ কানে আসতে হালদারমশাইকে অনুসরণ করলুম৷ কিন্তু কোথায় তিনি? পরদা তুলে টর্চের আলোয় দেখলুম, তিনি উপুড় হয়ে পড়ে আছেন বারান্দায়৷ হাতের টর্চ ছিটকে গিয়ে আলো ছাড়ছে৷ ডান হাতে তাঁর রিভলভার৷ বিপজ্জনকভাবে নলটা তাঁরই ডান কানের দিকে ঘুরে আছে৷ আমি চেঁচিয়ে উঠলুম৷—কর্নেল! কর্নেল!
কর্নেল দ্রুত বারান্দায় এসে টর্চের আলো ফেলে বললেন—এ কী! ড. ত্রিপাঠীও পড়ে আছেন!
এক মুহূর্তের জন্য আমার চোখে পড়েছিল, ডানদিকে বারান্দার বাঁকের ওপাশে কালো প্রকাণ্ড ভালুক অথবা গরিলার মতো জন্তু অদৃশ্য হয়ে গেল৷ শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে আমার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল৷—কর্নেল! কর্নেল! ডানদিকে একটা কালো প্রকাণ্ড জন্তু! ওই দিকে!
কর্নেল টর্চ জ্বেলে রিভলভার তাক করে ধী-রে পা বাড়ালেন৷ চাপাস্বরে বললেন—সাবধান! কাছে যেও না! তোমার মাথায় যেন শয়তানটা হাত ছোঁয়াতে না পারে!
মুহূর্তে মনে পড়ে গেল বাংলোর রঘুবীরের কথা৷ পরক্ষণে বুঝলুম, কর্নেল ব্যাপারটা জেনে গেছেন কোনও সূত্রে৷ তিনি থামের গাঁ ঘেষে এগোচ্ছিলেন৷ আমি তাঁর পিছনে৷ বাঁক ঘুরতেই বারান্দায় জন্তুটাকে দেখতে পেলুম! কর্নেল নিঃশব্দে ডানদিকের ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে এগিয়ে গেলেন৷ আমি তাঁর পেছনে৷ প্রথম ঘর এবং দ্বিতীয় ঘরের দরজা পেরিয়ে গিয়ে কানে এল শেষ ঘরের ভিতরে চাপা ঘসঘস অদ্ভুত শব্দ৷ কর্নেল এগিয়ে গিয়ে ঘরের দরজা টেনে বন্ধ করে দিলেন৷ দরজার হ্যাচকল টেনে দিতেই ভিতর থেকে জোর ধাক্কার শব্দ হতে থাকল৷ দরজার কপটি যেন যে-কোনো মুহূর্তেই ভেঙে পড়বে৷
কর্নেল গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বললেন—ফাঁদে পড়ে গেছ৷ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো বেরুনোর চেষ্টা করলেই রিভলভারের বুলেটে বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাবে৷
সেই সময় আবার আলো জ্বলে উঠল৷ নীচে থেকে কেউ চিৎকার করে বলে উঠল—কর্নেল সরকার! হোয়্যার আর য়ু?
কর্নেল সাড়া দিলেন৷ —দোতলায় চলে আসুন মিঃ সিনহা! নীচে কিছু ফোর্স থাক৷ আপনি একজন অফিসার আর জনা চার আর্মড কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে আসুন! মিঃ সিনহা! নীচের হলঘরের দরজা সম্ভবত বন্ধ৷ বন্ধ থাকলে আমাকে জানাবেন৷ সিঁড়িতে বা কোথাও ড. অনিরুদ্ধ রায়কে দেখতে পাবেন৷ সে নিশ্চয়ই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে৷ উপরের বারান্দায় ড. ত্রিপাঠী এবং মিঃ হালদারকেও দেখবেন, একই অবস্থায় পড়ে আছেন৷ জয়ন্ত! তুমি ওদিকে এগিয়ে যাও৷ ওঁদের বলো, কোনও অফিসারকে ড. ত্রিপাঠীর একতলায় অফিস থেকে হসপিটালে ফোন করতে৷ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে৷
বললুম—কর্নেল! বোঝা যাচ্ছে দারোয়ান দেওকীপ্রসাদও হয়তো অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে৷
কর্নেল ধমক দিলেন৷—যা বললুম, করো?
আমি ভয় পাইনি, এমন নয়৷ উদ্যত রিভলভার হাতে পশ্চিমের বারান্দায় গিয়ে ডাকলুম—মিঃ সিনহা! আমি জয়ন্ত চৌধুরী!
কেউ চেঁচিয়ে বলল—স্যার! দরজা ভিতর থেকে বন্ধ আছে!
বললুম—এক মিনিট! আমি গিয়ে খুলে দিচ্ছি!
সিঁড়ির নীচেই অনিরুদ্ধকে বাঁ-পাশে কাত হয়ে পড়ে থাকতে দেখলুম৷ তার হাতে টর্চটা জ্বলছে৷ তাকে ডিঙিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলুম৷ তারপর বললুম—কর্নেল বলেছেন, একজন পুলিশ অফিসার দারোয়ানের পাশের অফিস ঘরের তালা ভেঙে ঢুকে হসপিটালে যেন ফোন করেন৷ অ্যাম্বুলেন্স দরকার৷ চারজন লোককে অজ্ঞান করে বিপজ্জনক জন্তুটা দোতলার পশ্চিমপ্রান্তে শেষ ঘরটায় ঢুকেছে৷ কর্নেল বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন৷
তখনই আমার পাশ কাটিয়ে তাগড়াই চেহারার একজন অফিসার রিভলভার ও টর্চ হাতে দ্রুত উঠে গেলেন৷ কয়েকজন আর্মড পুলিশের সঙ্গে আমিও উপরে গেলুম৷ উপরের বারান্দায় উঠেই শুনতে পেলুম, ড. ত্রিপাঠীর অফিসের দরজায় তালা ভাঙার শব্দ৷ পুলিশ এ কাজে দক্ষ৷
কর্নেল সেই তাগড়াই চেহারার অফিসারকে দেখে সহাস্যে বললেন—আসুন মিঃ সিনহা! দা ডেভিল ইজ ট্র্যাপড৷
ইনিই তাহলে রুদ্রগড় থানার অফিসার-ইন-চার্জ মিঃ সিনহা৷ তিনি অট্টহাসি হেসে বললেন—দরজা খুলে দিন কর্নেল সরকার! ঠাকুরমশাইকে নমো করি! কিন্তু সাবধান! দূর থেকে ট্যাকল করতে হবে ওকে৷
ঠাকুরমশাই? আমি চমকে উঠেছিলুম৷ পরক্ষণে মনে পড়ল, ঠাকুরমশাই ছাড়া আর কে? রঘুবীর মুখুজ্যের হাতে নাকি অলৌকিক শক্তি আছে৷ চারজনকে অজ্ঞান করে ফেলে রেখেছে৷ আমি কিছু বলার আগেই দেখলুম ঘরের ভিতরে এদিকে পিঠ রেখে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো লোমশ গরিলা৷ মিঃ সিনহা তার মাথার নীচে রিভলভারের নল ঠেকিয়ে বললেন—কর্নেল সরকার! এই জন্তুটার ডান হাতের তালুতে ইলেকট্রিক ব্যাটারিচালিত ‘শকার মেশিন’ আছে৷ ওটা ওর বগলের কাছে সাবধানে হাত দিলেই টের পাবেন৷ এই মেশিনটা ঠাকুরমশাই নিশ্চয়ই পেয়েছে ফাগুলাল ডাকুর কাছে৷ ফাগুলাল ঠ্যাঙে গুলি খেয়ে টেনিস লনের কাছে পড়ে কাতরাচ্ছে৷ ওর গার্জেন আনন্দপ্রসাদ সাব-ইন্সপেক্টর বলবীর পাণ্ডের পাল্লায় পড়ে কুপোকাত৷ ও কে! ও কে কর্নেল সরকার! এবার পিঠের ক্লিপ খুলে রঘবীর মুখুজ্যেকে বের করা যাক!
লোমশ পোশাক থেকে বেরিয়ে পড়লেন ঠাকুরমশাই৷ সত্যিই রোগাভোগা চেহারা—যেমনটি অনুমান করেছিলুম কম্বলঢাকা অবস্থায়৷ এখন মাথায় হনুমান টুপিও নেই৷ মাথা জুড়ে চকচকে মসৃণ টাক৷ চোখ বন্ধ৷
* * *
হাসপাতালে ড. ত্রিপাঠী, হালদারমশাই, অনিরুদ্ধ এবং দারোয়ান দেওকীপ্রসাদের জ্ঞান ফিরতে বেশি দেরি হয়নি৷ কিন্তু সে-রাতের মতো তাঁদের হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল৷ আনন্দপ্রসাদ এবং পুলিশের গুলিতে আহত জনৈক ফাগুলাল ডাকুকে কোমরে দড়ি বেঁধে এবং দুষ্টচক্রের নেতা ঠাকুরমশাই ওরফে রঘুবীর মুখুজ্যের দু’হাত পিঠের দিকে টেনে হাতকড়া পরিয়ে ওসি মিঃ সিনহা চলে যাওয়ার পর কর্নেল এবং আমি ডাকবাংলোয় ফিরেছিলুম৷ তখন রাত প্রায় দশটা৷ পুলিশের গাড়িই আমাদের বাংলোয় পৌঁছে দিয়েছিল৷ কর্নেল আমাকে মুখ বুজে থাকতে বলেছিলেন৷ লক্ষ্য করেছিলুম, ম্যানেজার মিঃ পাণ্ডে কিংবা বাংলোর রঘুবীর রাজবাড়ির ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানে না৷ কারণ বাংলোয় ভি আই পি-দের সেবায় দু’জনেই ব্যস্ত ছিল৷ পৌঁছেই আমরা চুপচাপ রাতের খাওয়া সেরে নিয়েছিলুম৷
দরজা বন্ধ করে কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন৷ আমি সোফায় বসে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে ছিলুম৷ তাঁর চোখ বন্ধ ছিল৷ ঘরে হিটার আছে৷ আরামে দেহ-মন এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে৷ কর্নেল চোখ খুলে আমার দিকে নিঃশব্দে হেসে তাকাতেই বললুম—বাংলোর রঘুবীর আমাকে বিকেলে রাজবাড়ির ঠাকুরমশাইয়ের যোগবলে শক্তি অর্জনের কথা বলেছিল৷ কুস্তির আসরে পালোয়ানরাও নাকি তাঁর হাতের ছোঁয়ায় কুপোকাত হত! আপনাকে বলার চান্স পাইনি অনন্যাকে সেই...
কর্নেল আমার কথার উপর বললেন—ঠাকুরবাবাজি অনন্যার মুখ থেকে একটা গোপন কথা বের করার জন্য তাকে অজ্ঞান করে টেনিস লনে নিয়ে গিয়েছিল৷ তখন আনন্দপ্রসাদ সেখানে লুকিয়ে ছিল৷ ওদিকে ফাগুলাল ওই লোমশ গরিলার পোশাক পরে ড. ত্রিপাঠীর বেডরুমের নীচে দাঁড়িয়ে মুখে অদ্ভুত শব্দ করছিল৷ জিনোম-বিজ্ঞানী ড. ত্রিপাঠী ভেবেছিলেন তাঁরই হাতে গড়া ফ্র্যাংকেন্সটাইন বেরিয়ে পড়েছে৷ হতচকিত হয়ে গুলি ছোঁড়েন৷ ওদিকে ফাগুলাল গুলির শব্দে ভয় পেয়ে পালিয়ে আসে৷ ঠাকুরমশাই ছুটে গিয়ে হলঘরে মেইন স্যুইচ অন করে দেয়৷ তারপর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে বিশাল টেবিলের তলায় লুকিয়ে থাকে৷ ড. ত্রিপাঠী এবং অনিরুদ্ধ ল্যাবে ঢুকে গেলে সে ফের দোতলায় উঠে যায়৷ চন্দ্রমুখীর মৃত্যুর দরকার ছিল৷ কারণ তাঁর মুখ থেকে গুপ্ত খবরটা আদায় করা যেত না, এটা ঠাকুরমশাইয়ের গার্জেন আনন্দ যেমন বুঝত, তেমনি ঠাকুরমশাইও বুঝত৷
বললুম—দরজা খুলে দিয়েছিল অনন্যা৷ তারপর সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে৷ কিন্তু চন্দ্রমুখী দেবী...
কর্নেল বললেন—অনন্যা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ার সময় চন্দ্রমুখীর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল৷ রঘুবীর মুখুজ্জ্যে তা বুঝতে পেরেই তাঁর মাথায় শকার মেশিনের আঘাত করেছিল৷ ভদ্রমহিলার দুর্বল হার্টের কথা সে জানত৷ যাই হোক, দ্বিতীয়বার গিয়ে চন্দ্রমুখীকে পরীক্ষা করে মৃত জানবার পর শয়তানটা পাইপ বেয়ে নেমে যায়৷ তারপর দারোয়ানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে হইচই শুরু করে৷ তার ঘর তো একতলায়৷ কিচেনের পাশে৷ যাই হোক৷ সকালে সব শুনবে৷
—না কর্নেল৷ আমি গোঁ ধরে বললুম—অনন্যা কী গোপন খবর জানত?
কর্নেল চাপাস্বরে বললেন—ড. ত্রিপাঠীর ঠাকুর্দার চুরি করা দামি চণ্ডীমূর্তি লুকানো ছিল চন্দ্রমুখী যে ঘরে শুতেন, সেই ঘরে তাঁর বিছানার পিছনের দেওয়ালে একটা পুরোনো এবং ফ্রেমে বাঁধা প্রকাণ্ড ছবির পিছনে চারকোনা কুলুঙ্গিতে৷ ছবিটা রাজবাড়িরই আরাধ্যা দেবী চণ্ডীমাইজির৷ অনন্যাকে স্নেহ করতেন চন্দ্রমুখী৷ তাঁর মতে এই দামি মূর্তির খোঁজ ড. অলোকেশ ত্রিপাঠীকে দিলে তিনি তাঁর গবেষণার প্রয়োজনে যে প্রচুর টাকা দরকার, তা মূর্তির গয়না বেচে জোগাড় করবেন৷ এদিকে তাঁর বয়স হয়েছে৷ হার্ট দুর্বল৷ তাই অনন্যাকে সেই গোপন কথাটা জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ রঘু মুখুজ্যে দীর্ঘকাল রাজবাড়ির রান্নাবান্না-পুজো-আচ্চা করে৷ চন্দ্রমুখী দেবীর সঙ্গে সাংসারিক বিষয়ে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল৷ আমার বিশ্বাস, সেই সূত্রে সে ওই গোপন তথ্য জানতে পেরেছিল৷ আই থিংক, নাও এভরিথিং ইজ ক্লিয়ার ডার্লিং! গো টু বেড অ্যান্ড হ্যাভ আ নাইস স্লিপ৷
বাধ্য ছেলের মতো কর্নেলের কথা মেনে কম্বলের আড়ালে ঢুকে গেলুম৷ তারপর বললুম—কর্নেল! শুধু একটা কথা৷ কে এসব খবর আপনাকে জানিয়েছিল?
—অনন্যা! রাজবাড়িতে থেকে তার কাছ থেকে কিছু জানতে চাওয়ার ঝুঁকি ছিল৷ তাই তাকে তার বাবার অসুখের ছলে বাড়ি চলে যেতে বলেছিলুম৷ ক্লিয়ার?
বললুম—ক্লিয়ার!
—দেন গুড নাইট ডার্লিং৷
—গুড নাইট বস৷....
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন