সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
অভ্যাসমতো সেই রবিবার সকাল আটটায় বেরিয়েছিলুম৷ উদ্দেশ্য, ইলিয়ট রোড এলাকায় কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে আড্ডা দেওয়া৷ আমার ফিয়াট গাড়িটা পুরোনো আমলের৷ আজকাল প্রায়ই বেয়াদপি করে৷ সল্টলেক থেকে ই. এম. বাইপাস ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলুম৷ নভেম্বর মাস, কিন্তু শীতের দেখা নেই৷ পার্ক সার্কাস চার নম্বর-পুল থেকে নামতে গিয়েই বুঝলুম ব্রেক ফেল৷ রবিবার বলে গাড়ির সংখ্যা একেবারেই কম৷ তা না হলে সাঙ্ঘাতিক অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে যেত৷ গাড়িটা গড়িয়ে এসে যেখানে ধাক্কা দিল, সেটা ফুটপাতের একটা কোনা৷
ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল স্থানীয় কিছু লোক৷ তারা দৌড়ে এসে জিগ্যেস করল—কুছ খতরনাক তো নেহি হুয়া বাবুজী?
করুণ হেসে বললুম—না ভাই, তোমাদের আশীর্বাদে বেঁচে গেছি৷
তারপর তাদের মধ্যে একজন জেনে নিল, ব্রেক ফেল করে এই কাণ্ড কি না৷ মাথা নেড়ে সায় দিলুম৷ তখন সে বলল—আজ ছুটির দিন আছে৷ তো আমি আপনার ব্রেকের কাজ করিয়ে দেব৷ বাঁয়া তরফ মেরা গ্যারেজ হ্যায়৷
খুশি হয়ে নেমে দাঁড়ালুম৷ তারপর স্টিয়ারিং-এ জানলা দিয়ে হাত রাখলাম৷ লোকটার কথায় কমবয়সীরা গাড়িটা ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলল৷ বাঁ-দিকে ঘুরে গলির ভেতর একটু ঘুরপাক খেয়ে যেখানে পৌঁছুলাম, সেটাই ওর গ্যারেজ৷ গাড়িটা ভেতরে ঢুকিয়ে লোকটা বলল—বাবুজি, আমার নাম আছে আকবর৷ আপনি এই ছোকরাদের দশঠো রুপিয়া দিজিয়ে৷
খুশি হয়ে টাকা দিলাম৷ ছেলে-ছোকরাগুলি টাকাটা নিয়ে হৈ হৈ করে সম্ভবত কোনো চায়ের দোকানের দিকে ছুটে গেল৷ দশ টাকায় এ-বাজারে অতগুলো ছেলের চা ছাড়া আর কী খাওয়া হবে!
আকবর মিস্ত্রি ঘরের তালা খুলে যন্ত্রপাতি বের করল৷ তারপর ব্রেক পরীক্ষা করে দেখে বলল—আধাঘণ্টার কাম হবে বাবুজি৷ আপনি ওই কুর্সিতে ততক্ষণ বৈঠে থাকেন৷
জিগ্যেস করলুম—কত লাগবে আকবর মিঁয়া৷
আকবর লোকটিকে ভালোই মনে হল৷ সে হাসিমুখে বলল—আপনি যা ভালো মনে করবেন তাই দেবেন৷
একটু কৌতুকে বললুম—তা আকবর মিঁয়া, তোমাকে যদি কাজ শেষ করে ওদের মতো দশ টাকা দিই!
আকবর জোরে হেসে উঠল৷ বাবুজি, এই যে আজ ছুটির দিন আমি আপনার কাম করছি তা শুধু রুপেয়াকে লিয়ে নেহি৷
জিগ্যেস করলুম—কেন বলো তো?
এবার আকবর মিস্ত্রি চাপা স্বরে বলল—বাবুজি, আপনাকে আমি দেখেই পহচান করেছি৷ লেকিন আপনি আমাকে পহচান করতে পারছেন না৷
একটু অবাক হয়ে বললুম—আমার তো কিছু মনে পড়ছে না আকবর মিঁয়া৷
আকবর হঠাৎ একটু গলা চড়িয়ে ডাকল—মুন্না, এই মুন্না, কাম আছে৷ বাহার আ যা৷
এলাকায় ইটের বাড়ি একতলা দোতলা এমন কি চারতলা ইতস্তত ছড়িয়ে থাকলেও এটা বস্তি এরিয়া৷ পাশের একটা ঘুপচি ঘর থেকে বছর দশ-বারো হাফ প্যান্ট পরা একটি ছেলে বেরিয়ে এল৷
আকবর তাকে বলল—থোড়াসা কাম হ্যায়৷ ছেলেটি তার কাছে এল৷ পেছনের চাকার তলায় জ্যাক লাগিয়ে সে অনায়াসে গাড়িটা উঁচু করে ফেলল৷ তারপর বুঝতে পারলুম এই মুন্না খুব কম বয়স থেকেই আকবর মিস্ত্রির কাছে কাজ করছে৷ যাই হোক, সে যখন চাকা খোলার কাজে ব্যস্ত; তখন আকবর আমার কাছে এসে বলল—বাবুজি, আপনি নিউজপেপারমে কাজ করেন আমি জানি৷ আপনার সেই সাদা দাড়িওয়ালা কর্নেল সাব-এর খবর ভালো তো?
আরও অবাক হয়ে বললুম—কী আশ্চর্য, তুমি কর্নেল সাহেবকেও চেনো?
আকবর মিস্ত্রি চোখে একটা ভঙ্গি করে আরও চাপা স্বরে বলল— ভুলে গেছেন বাবুজি৷ হায়দার সাহাবের নতুন গাড়ি চুরি হয়েছিল৷ কর্নেল সাহাব সেই গাড়ির তল্লাসে বহুৎ কোসিস করছিলেন৷ আমি উনহিকে বহুৎ মদত দিয়েছিলাম৷ আপনি ভি বড়া সাহেবের সাথ-সাথ ছিলেন দো সাল কি আগে৷
অমনি আমার কেসটার কথা মনে পড়ে গেল৷ কর্নেলের বন্ধু মেজর হায়দার খানের সদ্য কেনা মারুতি গাড়ি চুরির কেসের কথা৷ তবে না, এটি নিছক গাড়ি চুরির কেস বললে ভুল হল৷ সেই গাড়িতে খান সাহেবের মেয়ের একটা ব্যাগ ডিকিতে ঢোকানো ছিল৷ মেয়েটি দিল্লি থেকে প্লেনে চেপে দমদম এয়ারপোর্টে নেমেছিল৷ খান সাহেব নিজেই গাড়ি চালিয়ে মেয়েকে আনতে যান৷ তারপর ফিরে এসে ব্যাগটা ডিকিতে রাখার কথা বাবা-মেয়ে দু’জনেই ভুলে যান৷ আসলে ব্যাগটা ছিল কোনার দিকে৷ আয়তনেও ছোটো৷ কিন্তু তার ভেতর ছিল অন্তত বিশ লাখ টাকা দামের জড়োয়া নেকলস ও আরও কিছু গয়না৷ ব্যাগটার কথা সারারাত বাবা-মেয়ের মনেই ছিল না৷ ভোরবেলা মনে পড়ে মেয়ের তাগিদে মেজর খান নীচের তলার গ্যারেজে এসে দেখেন, তাঁর মারুতি গাড়িটি এক্কেবারে উধাও৷ রাস্তার ধারে বাড়ি৷ নিজের বাড়ি বলে দারোয়ানও রাখতেন না৷
এরপর যা হয়৷ তিনি লালবাজারে অনেক ছোটাছুটি করেও গাড়ি উদ্ধার করতে পারেননি৷ অবশেষে হঠাৎ তাঁর স্মরণ হয় সামরিক জীবনের বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার-এর কথা৷ তখনই মনে পড়ে যায় কর্নেলকে৷
হ্যাঁ, গাড়িটা উদ্ধারের কেসে তখন সঙ্গী ছিলাম আমিও৷ কীভাবে সে-গাড়ি তখন উদ্ধার হয়েছিল তা বলার দরকার নেই৷ তবে সে ছিল ভারি মজার কেস৷ কারণ, গাড়ি-চোর ওই গাড়ি চুরি করে বউবাজারে ডাকাতি করতে গিয়েছিল৷ টহলদার পুলিশের পাল্লায় পড়ে সে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে আসছিল৷ পার্ক সার্কাস পেরিয়ে একটা গলি রাস্তার ভেতর যখন সে ঢুকছে তখন পুলিশ গাড়ির টায়ার লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে৷ টায়ার ফেঁসে যায়৷ কিন্তু ওই অবস্থায় সে গাড়ি নিয়ে আঁকাবাঁকা গলির ভেতর উধাও হয়ে যায়৷
মনে পড়ে গেল, এই আকবর মিস্ত্রিই কর্নেলকে চুপিচুপি গিয়ে খবর দিয়েছিল হায়দার খানের গাড়ি কোন গ্যারেজে আছে এবং গাড়ির রঙ বদলানো হচ্ছে৷ তবে এটা মামুলি কেস নয়৷ কারণ, আকবর মিঁয়ার সঙ্গে সেই গ্যারেজে কর্নেল, আমি, মেজর খান গাড়িটা আবিষ্কার করি৷ তারপর কর্নেল নেহাত খেয়ালবশে একটা স্ক্রু ড্রাইভার-এর সাহায্যে গাড়ির ডিকি খুলে ফেলেন৷ আর কী আশ্চর্য মেজর হায়দার খানের মেয়ের বিশ লাখ টাকার গয়নাভরা ছোট্ট ব্যাগটা যথাস্থানে আছে৷ এটা খুব হাসির ব্যাপার হয়েছিল৷ হতভাগা ডাকাত যদি জানত, এই গাড়ির ভিতরে লাখ টাকা সঙ্গে রেখেছে, তাহলে কি সে আস্ত গাড়িটা চুরি করে দলবল নিয়ে বউবাজারে একটা গয়নার দোকানে ডাকাতি করতে যেত?
আকবর বলল কর্নেল জানতেন মোটর সাইকেল প্রচণ্ড শব্দ করে৷ তাই এই নিঃশব্দ গাড়ি ডাকাতির পক্ষে চমৎকার৷
তার কথায় চমক ভাঙল৷ আকবর মিস্ত্রি আমার জন্য বড়ো মাটির ভাঁড়ে প্রচণ্ড গরম চা এনে ধরল৷ চায়ে চুমুক দিয়েই বললুম, হ্যাঁ, আকবর মিঁয়া, কেসটা মনে পড়ে গেছে৷ সে তো ভারি মজার কেস৷
আকবর দু’হাতে জোরে তালি দিয়ে বলল, আরে ব্বাস, এমন বোকা ডাকু দেখা যায় না কী বলেন?
বললুম—তুমি ঠিক বলেছ, আকবর মিঁয়া৷ যাই হোক আমার গাড়ির ব্রেকটা দেখো৷
ভাগ্যিস গাড়িতে ব্রেক অয়েল ছিল৷ একটা ঝালাই দিয়ে ব্রেক অয়েল ঢুকিয়ে টেস্ট করল আকবর৷ একটু ঘুরে এসে গাড়ি ব্রেক কষে দাঁড় করাল৷ তারপর বলল—চেক হো গিয়া বাবুজি৷
আমি প্যান্টের পকেট থেকে পার্স খুলে তাকে দুটো একশো টাকার নোট দিতে গেলুম৷ সে একটা একশো টাকার নোট নিয়ে সেলাম ঠুকে বলল, বেশি মত দিজিয়ে বাবু৷
এরপর গাড়ি নিয়ে কর্নেলের ডেরায় যখন ঢুকলুম তখন প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে৷ গাড়ি যথারীতি কর্নেলের ফাঁকা গ্যারেজে রেখে তিনতলায় উঠে গিয়ে বেলের স্যুইচ টিপলুম৷ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেল৷ আমার বৃদ্ধ বন্ধু হাসিমুখে বললেন, মর্নিং জয়ন্ত৷ আশা করি গাড়িটা ঠিকমতো মেরামত হয়েছে৷
বিস্ময় চেপে রেখে কর্নেলের জাদুঘর সদৃশ সুপ্রশস্ত ড্রয়িং রুমে ঢুকে বললুম—আপনার দৃষ্টি এখন আপনার বাইনোকুলারের মতো বহুদূর দেখতে পায়৷
কর্নেল তাঁর ইজিচেয়ারে বসলেন৷ হাঁক দিলেন, ষষ্ঠী!
ষষ্ঠীচরণ কফি আনল৷ সেই গরম চা খেয়ে আমার মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেছে৷ চায়ের স্বাদ ছিল শুধু দুধের স্বাদ৷
ষষ্ঠীচরণ ট্রে-তে দু’ পেয়ালা কফি ও এক প্লেট স্ন্যাকস রেখে গেল৷ কর্নেল এক পেয়ালা কফি তুলে নিয়ে বললেন—আগে কফি খাও জয়ন্ত৷ তারপর কথা হবে৷
কফি খেতে খেতে বললুম—হ্যাঁ বস! এখন চাঙ্গা৷ বলুন, আপনি কেমন করে জানলেন, যে পথে আমার গাড়ি খারাপ হয়েছিল এবং এই ছুটির দিনেও সেই গাড়ি মেরামত করতে পেরেছি?
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন—তুমি আকবর মিয়ার গ্যারেজে ব্রেক মেরামত করেছ৷ তাই না?
—কী আশ্চর্য!
—কিচ্ছু আশ্চর্য নয়৷ একটু চিন্তা করলে তুমি বুঝতে পারবে৷
অনেক চিন্তা করেও কিছু মাথায় এল না৷ বললুম—নাহ, নিশ্চয়ই আপনার যষ্ঠীচরণ ওই এলাকায় কোনো কাজে গিয়েছিল৷
কথাটা পিছনে ষষ্ঠীর কানে গিয়েছিল৷ সে পর্দা তুলে মুখ বের করে বলল—না, দাদাবাবু, আমি তো বাজারে গিয়েছিলাম৷ এইমাত্র এসেছি৷
কর্নেল বললেন—ডার্লিং, সাংবাদিকদের সহস্রলোচন থাকা দরকার৷ তুমি আকবর মিঁয়ার ঘরের ভেতরে তাকালে দেখতে পেতে তার একটা টেলিফোন আছে৷
এবার বুঝতে পারলুম৷ বললুম—আকবর মিয়া আপনার খুব পরিচিত৷ কিন্তু সে যে কখন ঘরে ঢুকে টেলিফোন করেছে, বুঝতে পারিনি৷
কর্নেল অট্টহাসি হেসে তাঁর পরিচিত স্বভাবটা দেখালেন৷ তারপর বললেন— গাড়ি চুরির কেসে আকবর আমার সঙ্গে থেকে আমার চেনা হয়ে গেছে৷ সে নিজে থেকেই আমাকে মিস্টিরিয়াস কেসের খোঁজ দেয়৷ তবে তুমি তাকে নাকি প্রথমে চিনতে পারোনি, সেটা তার কাছে বিস্ময় আর কৌতুকের ব্যাপার৷ অতএব সে আমাকে তোমার অগোচরে ফোন করে জানিয়েছে এবং খুব হেসেছে৷ তার অদ্ভুত চাপা খি-খি হাসি এখনও আমার কানে লেগে আছে ডার্লিং! যাই হোক, তুমি ধীরেসুস্থে কফি শেষ করো৷ আমি তোমার ফ্ল্যাটে ফোন করেছিলুম৷ সাড়া না পেরে বুঝতে পেরেছিলুম, তুমি বেরিয়ে পড়েছ৷
একটু হেসে বললুম—তার মানে আজ আমার এখানে লাঞ্চের নেমন্তন্ন৷ এখন আশা করছি, ডিনারেরও নেমন্তন্ন৷ অর্থাৎ আপনি নির্ঘাৎ কোনো রহস্যময় কেস হাতে নিয়েছেন৷
কর্নেল হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন—ঠিক ধরেছ৷ তবে এ কেসটা একটু ভূতুড়েও বলতে পারো৷
কিছুক্ষণ পরে আমরা রাস্তায় নেমেছিলুম৷ কর্নেলের নির্দেশে সাবধানে ড্রাইভ করছিলাম৷ কারণ, আবার যদি গাড়িটা বিগড়ে যায়৷
বরাবর যেমন হয়৷ কলকাতার সব রাস্তা আর অলিগলির নাড়িনক্ষত্র কর্নেলের চেনা৷ আমি শুধু চুপচাপ তাঁর কথামতো এগিয়ে যাচ্ছিলুম৷ কখনও বড়ো রাস্তা, কখনও গোলকধাঁধার মতো গলি দিয়ে এগিয়ে প্রায় আধঘণ্টা পরে ভবানীপুরের আরও সরু একটা গলির মুখে কর্নেল গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন৷
তারপর বললেন, এটা নিরাপদ এলাকা৷ নির্ভয়ে তুমি গাড়ি লক করে আমার সঙ্গে এসো৷
বোবার মতো তাঁকে অনুসরণ করলুম৷ কারণ, আমি জানি, এইসব যাত্রায় উনি আগে কিছু ফাঁস করবেন না৷ চমক দেওয়া কোনো কেস থাকলে তবেই তিনি এমন গম্ভীর হয়ে ওঠেন৷
একটুখানি এগিয়ে বাঁ-দিকে একটা পুরনো আমলের উঁচু গেটওয়ালা বাড়ি দেখতে পেলুম৷ দরজায় দারোয়ান দাঁড়িয়ে ছিল৷ কর্নেলকে দেখামাত্র সে মিলিটারি সেলাম ঠুকল৷ বোঝা গেল, লোকটি একসময় প্রতিরক্ষা দপ্তরে ছিল এবং এই কর্নেল সাহেবকে সে চেনে৷
লম্বা-চওড়া রেলিং-ঘেরা গেটের একটা পাশ খুলে দিলে আমরা ভেতরে ঢুকলুম৷ দু’ধারে ফুলের গাছ এবং নানারকমের দেশি-বিদেশি উঁচু উঁচু গাছ দোতলা বাড়িটাকে ঘিরে রেখেছে৷ আমাদের উদ্দেশে ভারী গলায় কোথা থেকে কেউ সম্ভাষণ করলেন—মর্নিং কর্নেল সাহেব৷ আপনার জন্য অপেক্ষা করে অস্থির হয়ে উঠেছিলুম৷ টেলিফোন করে জেনেছি, আপনারা বেরিয়ে পড়েছেন৷
এতক্ষণে ভদ্রলোককে দেখতে পেলুম৷ কর্নেলের মতোই তাগড়াই চেহারা৷ উজ্জ্বল গায়ের রঙ৷ কিন্তু কর্নেলের মতো মুখে দাড়ির জঙ্গল নেই৷ মাথায় টাকও নেই৷ তার বদলে এলোমেলো সাদা চুল আর পেল্লাই গোঁফ৷ তিনি ডান পাশের একটা ঘর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন৷
কর্নেল তাঁর অভিবাদনের প্রত্যুত্তর দিয়ে বললেন—আমার সঙ্গীটিকে চিনতে পারছেন তো মিঃ রায়চৌধুরী৷
—হ্যাঁ দেখেই বুঝেছি৷ এই ইয়ং ম্যানই আপনার সাংবাদিক বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী৷ নমস্কার জয়ন্তবাবু৷
আমরা বারান্দায় ওঠার পর কর্নেল বললেন—জয়ন্ত, ইনি মিঃ বারীন্দ্র রায়চৌধুরী৷ একসময় ইনি ছিলেন বিহার মুলুকের এক জমিদার৷ এখনও ওঁর বাংলোবাড়িটা আছে, জমিদারি অবশ্য নেই৷ তবে ভারতে শিকারিদের মধ্যে মিঃ রায়চৌধুরীর নাম সবার আগে রাখা উচিত৷
ততক্ষণে আমরা একটা প্রশস্ত হলঘরে ঢুকেছি৷ মেঝেয় বিবর্ণ কার্পেট পাতা৷ দেয়ালে হরিণ, ভালুক ইত্যাদি জন্তুর স্টাফ করা মুন্ডু আটকানো৷ এক কোনায় আস্ত একটা স্টাফ করা চিতাবাঘ৷ হঠাৎ তাকালে মনে হবে জ্যান্ত৷ হিংস্র দাঁত বের করে আছে৷ পুরোনো আমলের আসবাবপত্র ঘরে যেন একটা স্মৃতির গন্ধ ছড়িয়ে রেখেছে৷ চামড়া-আঁটা সোফার গদিতে আমরা বসলুম৷ সামনে গোল শ্বেতপাথরের টেবিল৷
মিঃ রায়চৌধুরী আমাদের মুখোমুখি বসলেন৷ তারপর বললেন—আপনারা কি ট্যাক্সি চেপে এলেন?
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন—না, আমার এই তরুণ বন্ধুর একটা পুরনো ফিয়াট গাড়ি আছে৷ সেই গাড়িতে৷
মিঃ রায়চৌধুরী নড়ে বসলেন—কী অদ্ভুত! গাড়িটা তো সরাসরি ভেতরে আনা যেত৷
কর্নেল বললেন—জয়ন্ত সাহস পেল না৷ কেন জানেন? আজ সকালেই ওর গাড়ির ব্রেক ফেল করেছিল৷ জোর বেঁচে গেছে৷ আর আপনার এই লনের যা অবস্থা, তাতে ওর গাড়ি আবার বিগড়ে যাবে বলে ঢোকাতে সাহস পেল না৷
বারীনবাবু জিভ কেটে সসঙ্কোচে বললেন—আহা, এই এক কাণ্ড! লনের অবস্থা সত্যিই শোচনীয়৷ এবড়ো-খেবড়ো হয়ে গেছে৷ চণ্ডীকে প্রায়ই বলি, আরও কিছু খোয়া এনে ফেলে মিস্ত্রি ডেকে দুরমুশ করে দিক৷ কিন্তু হতভাগার কানেই যায় না৷ সারাক্ষণ কোথায় টো-টো করে ঘোরে কে জানে!
এইসময় দেখলুম, কোণের দিকে একটা সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে৷ সিঁড়িতে বে-রঙা মলিন কার্পেট৷ সেখানে গাঁট্টাগোট্টা চেহারার ধুতি-ফতোয়া পরা একটা লোক নেমে আসছিল৷ তার হাতের ট্রে-র উপর তিনটে পেয়ালা৷ আর প্রকাণ্ড পট৷ ওতে যে কফি আছে, তা চোখ বুজে বলা যায়৷
লোকটি টেবিলের উপর কফির ট্রে রেখে কর্নেলকে সেলাম ঠুকল৷ কী মুশকিল! এই লোকটিও মিলিটারিতে ছিল নাকি? কর্নেল তাকে বললেন, কী রঘু, কেমন আছো?
রঘু কাঁচুমাচু হেসে বলল—ভালো আছি হুজুর কর্নেল সাব৷ লেকিন হাঁটুর কাছে যেখানে গুলি লেগেছিল, সেখানে ব্যথাটা কভি কভি দেখা দেয়৷
কর্নেল এবং বারীনবাবু দু’জনেই হেসে উঠলেন৷ বারীনবাবু বললেন—রঘুর ওই একটাই রোগ৷ মানসিক রোগ বলতে পারেন৷ তবে অরুণাচলে চিনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ওর হাঁটুতে নাকি গুলি লেগেছিল৷ আপনি সে-কথা জানেন৷ শুধু মজার কথা হল, আপনাকে দেখলেই সেই ব্যথাটা জেগে ওঠে৷
রঘু লজ্জা পেয়ে সেখানে আর দাঁড়াল না৷ চুপচাপ ও-ঘরে চলে গেল৷ এরপর আমরা কফি খেতে থাকলাম৷ বারীনবাবু কয়েক চুমুক খাওয়ার পর চাপা স্বরে বললেন—আবার সেই উড়ো চিঠি এসে পড়েছে৷ চিঠিটা গুলতিতে জড়িয়ে কে ঠিক দোতলায় আমার শোবার ঘরে ছুঁড়ে মেরেছে৷ গত রাতের কাণ্ড৷ সবে শুয়েছি এবং বেডসুইচ অফ করতে গেছি৷ অমনি জানালার ফাঁক দিয়ে—
তাঁর কথার ওপর কর্নেল বললেন—কোন জানালা সেটা বুঝতে পেরেছেন?
—না, কর্নেল সাহেব৷ আমি মেঝেতে শব্দ শুনে টের পেয়েছিলুম৷ ব্যাপারটা নিয়ে হাসাহাসি হবে বলে এতদিন চেপে আছি৷ আমার গৃহিণীকে বলিনি যে, ঢিলে একটা চিঠি জড়ানো আছে৷ তাই তিনি ভূতের কাণ্ড বলে বাবা মহেশের মন্দিরে যথারীতি পুজো দিতে গেছেন৷ এর আগের দু’বারও একই কাণ্ড৷ আগের চিঠি দুটো তো আপনি দেখেছেন৷ বাচ্চা ছেলের হাতে লেখা মনে হয়৷ এবার গত রাতের চিঠিটা দেখুন৷
বলে তিনি পাঞ্জাবির বুকপকেট থেকে একটা দোমড়ানো কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন৷ তারপর বললেন—ঢিলটা একটা পাথরকুচি৷ আগের মতোই৷ এ এলাকার আশেপাশে প্রমোটাররা বিল্ডিং তুলছে৷ কাজেই এই পাথরকুচির অভাব নেই৷
কর্নেল চিঠিটা টেবিলের ওপর হাত বুলিয়ে যতটা সম্ভব সোজা করলেন৷ চার ইঞ্চি আন্দাজ লম্বা; চওড়া ইঞ্চি তিনেকের কাগজ৷ কর্নেল পকেট থেকে আতসকাচ বের করে খুঁটিয়ে চিঠিটা পড়লেন৷ তারপর একটু হেসে বললেন—ব্যবসায়ীদের কাছে যে ছোটো চিরকুটের প্যাড থাকে, এটা সেই প্যাডেরই কাগজ৷ আগের দুটোও তাই—আপনাকে বলেছি৷ হাতের লেখা একজনেরই৷
বারীনবাবু বললেন—এ পাড়ায় কোনো ব্যবসায়ীর দোকান তো নেই৷ কিন্তু প্রথমে ভেবেছিলুম, কোনো বদমায়েশ ছেলে আমার সঙ্গে জোক করছে৷ কিন্তু এই চিঠিটা রীতিমতো চিন্তার৷
আমি প্রচণ্ড কৌতূহলে হাত বাড়িয়ে কর্নেলের হাত থেকে কাগজটা নিলুম৷
পড়ে দেখলুম লেখা আছে:
‘ওহে বুড়ো,
দু’দুবার চিঠি লিখেছি৷ এখনো সাড়া পাইনি৷ তুমি এখনো কৌটোটা মহেশ্বরের মন্দিরের পেছনে বটতলায় রেখে আসছো না৷ এবার যদি না রেখে আসো কিংবা পুলিশকে খবর দাও, তাহলে তোমার মুন্ডুটি বাবার মন্দিরের সামনে ঘ্যাচাং করে কেটে রেখে আসব৷ ভেব না, আমরা তোমার শোবার ঘরে ঢোকার গোপন দরজাটা চিনি না৷ এই শেষ চিঠি৷ আজ রাত একটায় একা চুপিচুপি গিয়ে ওটা যথাস্থানে রেখে আসবে৷
ইতি,
হুতুম পেঁচা৷
চিঠিটা পড়ে আমার হাসি পাচ্ছিল৷ তলায় একটা হুতুম পেঁচার ছবিও আঁকা৷ বললুম—কৌটোটা কী মিঃ রায়চৌধুরী?
বারীনবাবু বললেন, বলব৷ কফি খেয়ে নিন, তারপর বলছি৷
কফি শেষ হবার পর তিনি চাপা স্বরে বললেন, কৌটোটা আর কিছুই নয়৷ ব্রোঞ্জের তৈরি কৌটোর মতো দেখতে একটা জিনিস৷ তত বড়োও নয়৷ হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেও কেউ টের পাবে না৷ কর্নেল সাহেব ওটা দেখেছেন৷ কিন্তু উনিও কিছু বুঝতে পারেননি৷ হিজিবিজি, কীসব অজ্ঞাত হরফে লেখা আছে৷ মধ্যিখানে একটা ওইরকম হুতুমপেঁচার মূর্তি৷
এবার কর্নেল চুরুট ধরিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন— মিঃ রায়চৌধুরী, আমি আজ ওটাই নিতে এসেছি৷ কারণ, ব্যাপারটা সত্যি বিপজ্জনক৷ আপনি আমাকে ওটা নিশ্চিন্তে এনে দিন৷ ওতে কী লেখা আছে বা রহস্যটাই বা কী, তা জেনে আপনাকে ফেরত দেব৷ তার বদলে আপনাকে একটা অবিকল এর নকল কৌটো আমি বিকেলের মধ্যেই দিয়ে পাঠাব৷ আপনি শুধু রঘুকে আমার বাড়ি পাঠিয়ে দেবেন৷ রঘুকে জিনিসটা আমি এমনভাবে দেব যে সে জানতেই পারবে না যে এর মধ্যে কী আছে৷
বারীনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেলেন৷ তারপর হরিণের স্টাফ করা মুন্ডুটা একটু ফাঁক করে পেছন থেকে ইঞ্চি তিনেক লম্বা আর ইঞ্চি দুই চওড়া একটা ব্রোঞ্জের তৈরি কৌটোর মতো জিনিস এনে কর্নেলের হাতে গুঁজে দিলেন৷ কর্নেল সেটা তখনই তাঁর প্যান্টের পকেটে চালান করে দিলেন৷
বললুম—ওটা রাখার জায়গা দেখে বোঝা যাচ্ছে, মিঃ রায়চৌধুরী একজন বিচক্ষণ মানুষ৷ কে সন্দেহ করবে যে ওই স্টাফ করা হরিণের মাথার তলায় একটা দামী জিনিস লুকনো আছে৷
কর্নেল কথা না বলে চুপচাপ বেরিয়ে এলেন৷ আমিও তাঁকে অনুসরণ করলুম৷ এতক্ষণে লক্ষ করলুম, এই দোতলা বাড়ির একটা গাড়িবারান্দা ছিল৷ সেটা কবে ভেঙে পড়েছে৷ এবং সেই ইট দিয়ে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা তৈরি করা হয়েছে গেট অব্দি৷
বেরিয়ে এসে গাড়ির লক খুলে চেপে বসলুম৷ আর কর্নেলকে আমার গাড়ির বাঁ-দিকের লক খুলে দিলুম৷ উনি ভিতরে ঢুকে জানালার কাচ নামিয়ে বসলেন৷ দেখলাম মুখটা তখনও গম্ভীর৷ পথে আসতে আসতে জিগ্যেস করলুম, ওতে কী রহস্য আছে বলে আপনার ধারণা?
কর্নেল বলেছিলেন, চলো তো৷ এবার আমরা একটু চিৎপুর এলাকা হয়ে বাড়ি ফিরব৷ ওখানে একজন আমার জানাশোনা মিস্ত্রি আছে৷ সে এই ধরনের জিনিস নকল করতে ওস্তাদ৷
আপার চিৎপর রোডে যাত্রাদলের পোশাক-আশাক বিক্রি হয় বা ভাড়াতে পাওয়া যায়—এটা আমি জানি৷ ঘিঞ্জি ট্রামরাস্তায় কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর আবার একটা গলির ভেতর আমাকে গাড়ি দাঁড় করাতে বলে কর্নেল নেমে গেলেন৷ বললেন—তুমি গাড়িতেই থাকো৷ আমি পনেরো-কুড়ি মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসছি৷ তাঁকে গলির ভিতর ডানদিকে ঘুরে আর-একটা গলিতে অদৃশ্য হতে দেখলুম৷
তারপর বসে আছি তো আছিই৷ অধীর হয়ে প্রতীক্ষা করছি৷ প্রায় বারোটা বাজতে চলল, কর্নেলের ফেরার নাম নেই৷
বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নেমে সামনের একটা পান-সিগারেটের দোকানে গেলুম৷ সিগারেট ছেড়ে দিয়েছি বলা যায়৷ কিন্তু সময় কাটানোর জন্য, বিশেষ করে কর্নেলের জন্য উদ্বেগ হচ্ছিল৷ তাই একটা দামি ব্র্যান্ডের ফিলটার টিপড সিগারেট কিনে নারকেল ছোবড়ার দড়িতে ঝুলন্ত আগুন থেকে সেটা ধরিয়ে নিলুম৷ সময় কাটতে চায় না৷ ভাবছিলুম গাড়ি লক করে এগিয়ে গিয়ে দেখব নাকি! আমার উদ্বেগের কারণ, কর্নেল যে-জিনিসটা বারীনবাবুর কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন, সেটা বিপজ্জনক৷ এটা পাওয়ার জন্যই তাঁকে কে বা কারা হুমকি দিচ্ছে৷ এমন তো হতেই পারে, তারা আমাদের গাড়ি ফলো করে এসে পিছনে কোথাও নেমেছে৷ তারপর আমার গাড়ির পাশ দিয়ে কর্নেলের উপর হামলা চালাতে গেছে৷ এতক্ষণ ধরে কতরকম লোক আমার পাশ দিয়ে গলিতে যাতায়াত করল৷ তাদেরই মধ্যে বারীনবাবুর শত্রুপক্ষের কেউ থাকলে আমার চেনার কথা নয়৷
এখানে বলা দরকার, কর্নেলের সঙ্গে কোথাও বেরুলে বা কর্নেলের বাড়িতে এলে আমি সঙ্গে আমার লাইসেন্স করা পয়েন্ট বাইশ ক্যালিবারের রিভলবারটা নিতে ভুলি না৷ এই নির্দেশ কর্নেলেরই৷
সিক্স-রাউন্ডার অস্ত্রটায় ছ’টা বুলেট ঢোকানো আছে৷ প্যান্টের ডান পকেটে হাত ভরে রিভলবারটায় হাত রেখে আমি এগিয়ে গেলুম৷ গলির সেই ডানদিকের বাঁকে পৌঁছেছি, হঠাৎ দেখি সামনে আর-একটা গলির ভেতর থেকে আমার বৃদ্ধ বন্ধু হন্তদন্ত বেরিয়ে আসছেন৷ আমার কাছে এসে তিনি মিটিমিটি হেসে বললেন—তুমি যা ভেবে আমার খোঁজে যাচ্ছিলে, তা সত্য৷
জিগ্যেস করলুম—কী সর্বনাশ! কেউ কি হামলা-টামলা করেছিল?
কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে বললেন—কতকটা তাই-ই৷ তবে ওরা আমার ফায়ার-আর্মস দেখেই প্রাণভয়ে পালিয়ে গেছে!
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার পর তাঁর পরিচারক ষষ্ঠীচরণ বলল—একটা বাজতে চলল৷ বাবামশাই, এখন আর কফি খেতে চাইবেন না৷
কর্নেল চোখ কটমট করে বললেন—শাট আপ৷ আজ দু’টোয় লাঞ্চ করব৷ কফি না খেলে আমি এখনই অজ্ঞান হয়ে যাব৷
ষষ্ঠীচরণ ভেতরে চলে গেল৷ কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে মাথার টুপি তাঁর পাশের টেবিলে রাখলেন৷ তারপর বললেন—তুমি ভয় পাবে বলে আমি বলিনি৷ একটা কালো মারুতি গাড়ি আমাদের ফলো করে আসছিল৷ ভেবেছিলাম তাকে এড়িয়ে যাব৷ কিন্তু যেতে পারিনি৷ আমি রামভগতের কাছে ব্রোঞ্জের ফলকটা দিয়ে বেরিয়ে আসছি এবং মনে বেশ বুঝতে পারছি, আততায়ীরা আমার উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে৷ ঠিক তাই৷ তারা টের পায়নি আমি কোন ঘর থেকে বেরুচ্ছি৷ আমাকে দেখামাত্র দু’জনে দুটো ড্যাগার বের করেছিল৷ ভেবেছিল, এই বুড়ো-হাবড়া লোকটা এতেই অচৈতন্য হয়ে পড়বে৷ কিন্তু আমি দূর থেকে তাদের সামনে রিভলবার তাক করতেই তারা ইঁদুরের মতো ছুটে গিয়ে কোনো গর্তে লুকোল৷
এইসময় যন্ত্রীচরণ দু’কাপ কফি আনল৷ কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম—এবার তাহলে স্বীকার করুন, আমি আপনার উপযুক্ত বডিগার্ড হতে পেরেছি৷ আমি কিন্তু দুটো লোকের দুই হাতে গুলি করে চিৎপুরে চিৎপাত করতুম৷
কর্নেল হাসলেন—না, তাতে হাঙ্গামা বাড়ত, গুলির শব্দে লোকজন ছুটে আসত৷ পুলিশ আসত৷ যাই হোক, এই ঘটনায় বুঝতে পারছি, মিঃ রায়চৌধুরী সত্যি সাঙ্ঘাতিক লোকের পাল্লায় পড়েছেন৷
এই সময় টেলিফোন বাজল৷ কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন৷ তারপর বললেন—হ্যাঁ মিঃ রায়চৌধুরী, আমি বাড়ি পৌঁছে গেছি৷ তবে পথে একটুখানি হামলা হয়েছিল৷ সেটা কিছু নয়৷ তবে আপনাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি—এবার আপনি যেন সবসময় সঙ্গে আর্মস রাখবেন... না, না, তত কিছু নয়৷ আপনি তো ছিলেন বিখ্যাত শিকারি৷ আপনার বুলেট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না৷ অবশ্য, আমি বলছি, আপনি কাউকে গুলি করবেন না৷ কিন্তু ভয় দেখানোর জন্য তার মাথার উপর দিয়ে গুলি ছুঁড়তে দোষ নেই...৷ সে কী! ওটা কুড়িয়ে নিন! তারপর রঘুকে দিয়ে আমার কাছে পাঠান... হ্যাঁ রঘুকে একটু সাবধানে আসতে বলবেন৷ লক্ষ্য রাখে, কেউ যেন পেছনে আসে কিনা... হ্যাঁ আমি জানি, রঘু একজন পালোয়ান৷ একসময় সে ডিফেন্সে ছিল৷ কাজেই সে জুডো-ক্যারাটের সাহায্যে আত্মরক্ষা করতে পারে৷ আচ্ছা রাখছি৷
এবার জিগ্যেস করলুম—আপনি কি সেই ব্রোঞ্জের কৌটোটা বা ফলকটার নকল তৈরি করে এনেছেন৷
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ, সেইজন্যই একটু দেরি হল৷ রামভগত ছাঁচে ফেলে ওটার একটা নকল তৈরি করে দিয়েছে৷ এটা অবশ্য তামার৷ তবে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সে ওটাকে পুরোনো ব্রোঞ্জের মতো করে দিয়েছে৷
বলে কর্নেল প্যান্টের ডান পকেট থেকে একটা এবং বাঁ-পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করলেন৷ দুটোই খুলে হাতের তালুতে রেখে আমাকে দেখালেন৷ অবাক হয়ে গেলুম৷ দুটোই একইরকম৷ বললুম—কোনটা আসল কোনটা নকল, বোঝা যাচ্ছে না৷ তা ছাড়া দুটোই যদি একই রকমের হয় তাহলে তো বারীনবাবুর শত্রুপক্ষ জিনিসটা পেয়েই যাবে৷
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন—তুমি খালি চোখে দেখছ৷ তাই তফাতটা বুঝতে পারছ না৷ মধ্যিখানে প্যাঁচার মূর্তিটা ঠিকই আছে৷ কিন্তু নকলের চারপাশে যে-চিহ্ন দেওয়া আছে, রামভগত তা সুকৌশলে বদলে দিয়েছে৷
ঠিক দুটোয় ডাইনিং-রুমে দু’জনে খাওয়া-দাওয়া সেরে ড্রয়িং-রুমে ফিরে এলুম৷ তারপর অভ্যাসমতো আমি দক্ষিণের ডিভান-ঘেঁষা দেয়ালে চিৎপাত হলুম৷ ভাতঘুম আমার অতি প্রিয় তাই কখন ঘুমিয়ে গেছি জানি না৷
ষষ্ঠীর ডাকাডাকিতে উঠে বসে দেখলুম, ঘরে আলো জ্বলেছে৷ ফ্যানটা চলছে আগের মতোই৷ এবং ষষ্ঠীর হাতে এক কাপ চা৷ অতএব বোঝা গেল কাঁটায় কাঁটায় চারটে বাজে৷ কর্নেল ঘরে নেই৷ তাঁর কথা জিগ্যেস করলে ষষ্ঠীচরণ ফিক করে হেসে বলল, আপনি শুয়ে পড়ার পরই একটা হ্যোঁৎকা-মোটা লোক এসেছিল৷ বাবামশাই তার হাতে কী একটা গুঁজে দিলেন৷ তারপর বাবামশাই চেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন আর টাকে হাত বোলাচ্ছিলেন৷ তার মানে হচ্ছে দাদাবাবু কর্নেল কোনো সমিস্যের কথা ভাবছিলেন৷
—তাহলে এখন উনি ছাদের বাগানে আছেন, তাই না?
ষষ্ঠী আবার ফিক করে হাসল—বুঝলেন না দাদাবাবু, আজও উনি আপনার গাড়ির চাবি চুরি করে বেইরে গেছেন৷
মুখে কিছু বললুম না৷ কিন্তু মনে যথারীতি অভিমান জাগল৷ কর্নেল কোনো কেস হাতে পেলে ঠিক এমনটাই করেন৷ কেন করেন জিজ্ঞাসা করলে বলেন—আহা, জয়ন্ত, ভাতঘুম তোমার কতকালের অভ্যাস৷ খামোকা তোমাকে ডিসটার্ব করার মানে হয় না৷
চা খেয়ে সটান সিঁড়ি বেয়ে কর্নেলের ছাদের বাগানে গেলুম৷ এই বাগানটা দেখলেই কেমন গা ছমছম করে৷ দেশি-বিদেশি কত রকমের কিম্ভূতকিমাকার ক্যাকটাস, অষ্টাবক্র কী একটা উদ্ভিদ৷ অন্য কোনায় খড়ের চালের ছাউনির একটা অংশ৷ এটা হল প্রজাপতিদের ব্রিডিং রুম৷ ওখানে ভেজা কাঠ আর কী সব অদ্ভুত পোকামাকড়ের ডেরা৷ বাইরে মিহি তারের জাল৷
তবে অনেকগুলো সুদৃশ্য রঙ-বেরঙ-এর ফুল ফুটেছে টবের গাছে৷ আর দিব্যি কয়েকটা বিচিত্র রঙের প্রজাপতি সেখানে বসে আছে, কেউ ওড়াউড়ি করছে৷
কিছুক্ষণ পরে যষ্ঠীচরণ এসে চাপা স্বরে বলল—বাবামশাই বললেন,এবেলা বাগানে আমাকেই জল দিতে হবে আর আপনাকে যেতে বললেন৷
নীচে নেমে এসে দেখি, বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ ইজিচেয়ারে বসে কোলে একটা নোটবই নিয়ে কিছু লিখছেন৷ তাঁর মুখ উলটোদিকে৷ আমি ওঁকে চমকে দেওয়ার জন্য প্রায় নিঃশব্দে নেমে গিয়েছিলুম৷ কিন্তু উনি আমাকে ভড়কে দিয়ে বললেন—গুড ইভনিং ডার্লিং৷ আমার ওপর গাড়ি চুরির জন্য যত রাগ হয়েছে, আমার ছাদের বাগানের প্রজাপতি দেখে তোমার সেই রাগ জল হয়ে গেছে৷
কথাগুলি তিনি বললেন আমার দিকে না ঘুরেই৷ আমি হাসতে হাসতে সোফায় গিয়ে বসলুম৷ বললুম—তা নিশ্চয়ই হয়েছে৷ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষের মনকে শান্ত করে দেয়৷ আবার বিস্মিতও করে৷ কী করে এই ফুল সামান্য বীজ থেকে গাছ গজিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে, তা ভাবতে অবাক লাগে৷ তারপর দেখুন প্রজাপতি৷ কী অসাধারণ ডানার রঙ আর কারুকার্য৷
কর্নেল নোট বই আর কলমটা টেবিলে রেখে তাঁর প্রসিদ্ধ অট্টহাসি হাসলেন৷ তারপর বললেন—বাঃ জয়ন্ত, তুমি তাহলে প্রকৃতির ব্যাপার বেশ বুঝতে পারছ৷ প্রকৃতি সত্যিই রহস্যময়ী, তাই না?
সোফার সামনে সেন্টার-টেবিলে আমার জন্য এক পেয়ালা কফি রেখে গিয়েছিল ষষ্ঠীচরণ৷ কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম—আপাতত আমার মনে হচ্ছে, প্রকৃতির চেয়ে আপনার হাতের ওই নোটবইটা রহস্যময়৷
কর্নেল হাসলেন৷ —আজ তোমার বুদ্ধি-সুদ্ধির নমুনা পেয়েছি৷ তুমিই বলো তো, এটা কী হতে পারে?
একটু ভেবে নিয়ে বললুম—আমার ধারণা, আপনি দুপুরে বেরিয়েছিলেন কোনো ভাষাবিজ্ঞানীর কাছে৷ তিনি ব্রোঞ্জের কৌটো বা ফলকটার চিহ্নগুলো থেকে পাঠোদ্ধার করে দিয়েছেন৷ এখন আপনি এসে সেগুলো নিয়েই আঁক কষছিলেন৷
—ব্রাভো জয়ন্ত! এতদিন পরে আজ দু’দুবার লক্ষ্য করলুম, তোমার দৃষ্টিটা অনেকখানি খুলে গেছে৷
—আমাকে একটু খুলে বলুন না ওই গুপ্ত রহস্যটা কী নিয়ে৷
কর্নেল চুরুটে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন—হ্যাঁ, তোমার ব্যাকগ্রাউন্ডটা হয়তো জানা দরকার৷ তাহলে তুমি তোমার এই নতুন দৃষ্টিশক্তি কাজে লাগিয়ে আমার যোগ্য সহযোগী হয়ে উঠবে৷ এবার বলি শোন—
তারপর কর্নেল যা বললেন, তার সার হল এই—
আগেই জানতে পেরেছিলুম বারীন্দ্র রায়চৌধুরী বিহার মুলুকের জমিদার ছিলেন৷ কর্নেলের কথায় আরও জানা গেল, জায়গাটার নাম চন্দরপুরী৷ স্থানীয় লোকে চন্দরপুরা বলে থাকে৷ এখন সেখানে শিল্পাঞ্চল৷ তবে একটা নদী ওই অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেছে৷ সুন্দর নাম তার— পান্না৷ পান্না নদীর ধারে একটা উঁচু জায়গার ওপর অনেকগুলি বাংলো আছে৷ আর আছে বারীনবাবুদের রাজবাড়ি৷ বারীনবাবুর পূর্বপুরুষকে প্রজারা রাজা বলে ডাকত৷ সরকার ক্রমে ক্রমে তাঁদের জমিদারির অনেকগুলি জায়গায় খনির সন্ধান পায়৷ নানারকম ধাতুর খনি৷ তাই সেগুলো সরকার নিয়ে নেয়৷ এলাকার আদিবাসীরাই পড়ে বিপদে; তাদের সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়৷ একজন আদিবাসীর নাম ছিল শঙ্কু সোরেন৷ সে মিশনারি স্কুলে কিছু লেখাপড়া শিখেছিল৷ তা ছাড়া সে ছিল বারীনবাবুর খুব কাছের মানুষ৷ বারীনবাবু তাকে রাজবাড়ির পিছনের দিকে বাঁজাডাঙায় একটা বাড়ি করে দিয়েছিলেন৷ দেখাদেখি শঙ্কুর গ্রামের লোকেরাও সেখানে বসতি করেছিল৷ তাতে বারীনবাবু খুশিই হয়েছিলেন৷ চণ্ডী নামে শঙ্কুর একজন জামাই ছিল৷ সে বসতির পিছনে একটা টিলার জঙ্গলে বুনো আলু খুঁড়ে বের করতে গিয়ে অনেকগুলো ইট দেখতে পায়৷ অবশ্য তারা জানত ওখানেই বারীনবাবুর কোনো পূর্বপুরুষের দুর্গ ছিল৷ দুর্গটা যে কোথায়, এতকাল কেউ জানত না৷ শঙ্কুর কাছে খবর পেয়ে বারীনবাবু ঘোড়ায় চেপে সেখানে যান৷ তারপর আদিবাসীদের দিয়ে অনেকখানি জায়গা খুঁড়ে ফেলেন৷ দেখা যায়, সেখানে একটা শিবমন্দির ছিল৷ পাথরের শিবলিঙ্গটা প্রায় তিন ফুট উঁচু৷ তলার বেদিটাও পাথরের৷ বেদির তলা থেকে একটা কৌটোর মতো ফলক বেরিয়ে আসে৷ সেটাই সেই ব্রোঞ্জের ফলক৷
এই ফলকটার কথা বারীনবাবু আঠারো শতকের এক ব্রিটিশ সেনানী ক্যাপ্টেন চার্লস প্যাটারসনের বইতে পড়েছিলেন৷ প্যাটারসন স্থানীয় লোকের মুখে শুনেছিলেন, চন্দরপুরীর রাজা তাঁকে জিনিসটা দেখান৷ কিন্তু ক্যাপ্টেন তার পাঠোদ্ধার করতে পারেননি৷ তিনি শুধু এটুকু বলেছিলেন যে, এটা কোনো গুপ্তধনের সংকেত হতে পারে৷ আপনি এটা লুকিয়ে রাখুন৷ আমি রাজধানী কলকাতা থেকে একজন বিচক্ষণ সাহেবকে নিয়ে আসব৷ আশ্চর্য ব্যাপার! তার পরেই ওটা হারিয়ে যায়৷
এতকাল পরে বারীনবাবু ফলকটা খুঁজে পেয়েছিলেন৷ ব্যাপারটা শুধু শঙ্কু আর তার দলবলই জানত৷ ওটা নিয়ে তিনি রাজবাড়িতে আয়রন-চেস্টের ভিতর লুকিয়ে রেখেছিলেন৷ তারপর, ওই হুতুমপ্যাঁচার মূর্তিটাকে সংকেত ভেবে এলাকার জঙ্গলে প্যাঁচার খোঁজে পাগলের মতো ছুটোছুটি করে বেড়ান৷ আদিবাসীদেরও খোঁজার কাজে লাগান৷ কিন্তু জঙ্গল এলাকা বিশাল৷ ওই রকম হুতুমপ্যাঁচা কোথায় যে আছে, তার খোঁজ পাওয়া সহজ ছিল না৷ অবশেষে একদিন দুপুরবেলায় শঙ্কুর জামাই এসে তাঁকে খবর দেয় একটা প্রকাণ্ড বটগাছের কোটরে হুতুমপ্যাঁচার সন্ধান পেয়েছে৷ প্যাঁচা দুটো প্রকাণ্ড৷ তাদের ডাক শুনলে ভয় পেতে হয়৷ বারীনবাবু গিয়ে দেখেন, বটগাছটা ঠিক জঙ্গলের ভিতরে একেবারে ওপর দিকটায়৷ গাছটার গুঁড়িতে একটা পাথরের ভাঙাচোরা দেবমূর্তি পড়ে আছে৷
অতএব তিনি সেখানের মূর্তিগুলো সরিয়ে বিশ্বস্ত আদিবাসীদের নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করেন৷ কিন্তু চারদিক খুঁড়েও কিছু পাওয়া যায়নি৷ আদিবাসীরা এরপর রটিয়ে দেয়—ওটা তাদেরই দেবতার থান৷ আশেপাশের এলাকা থেকে অসংখ্য আদিবাসী এসে জঙ্গল কেটে রাস্তা করে৷ তারপর সেখানে সিঁদুর লেপে মূর্তিগুলো সাজিয়ে এবং ধামসা বাজিয়ে পুজো শুরু করে৷ প্রচুর মুরগি বলি দেওয়া হয়েছিল৷ জায়গাটার নাম হয়ে যায় বোঙা ঠাকুরবাবার থান৷ ওখানে একজন সাঁওতাল গুণিন আর তার চ্যালাকে ছোট্ট ঘর করে দিয়ে পাহারার ব্যবস্থা করে৷ তারপর থেকে অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেন, বারীনবাবু৷ বাইরের কোনো অন-আদিবাসীদের ঠাকুরবাবার থানে যেতে দেবে না৷ এমনকী শঙ্কু সোরেনের জামাই করজোড়ে বলেছিল—রাজাবাবু, আপনিও এখন ওখানে পা বাড়াবেন না৷ আমাদের ঠাকুরবাবার এতকাল পুজো হয়নি বলে আমাদের আদিবাসীদের ভিটেছাড়া হতে হয়েছে৷
যারা আদিবাসী নয়, ওরা তাদের বলে দিকু৷ কোনো দিকুকেই ওই টিলায় উঠতে দেওয়া হত না৷
এরপর স্বাধীনতার আমলে বন্য প্রাণী মারার বিরুদ্ধে সরকার আইন পাশ করেন৷ তারপর কলকাতার বাড়িতেও বৃদ্ধ বাবা একা কাটাচ্ছিলেন৷ তাঁর দেখাশোনা করত ওই রঘু৷ বাবার চিঠি পেয়ে বারীনবাবু ফলকটা নিয়ে ফিরে আসেন৷ তিনি বাবাকেও ওটা দেখিয়েছিলেন৷ কিন্তু নরেন্দ্রনারায়ণবাবুও তাঁকে বলেছিলেন—এটা যত শীগগির পারো, যেখানে ছিল সেখানেই ফেলে দিয়ে এসো৷ বংশপরম্পরায় আমি শুনে এসেছি, এটা ঘরে রাখলে বিপদ হবে৷
তাঁর বাবা নরেন্দ্রনারায়ণ কিছুদিন পরেই মারা যান৷ তারপর থেকেই ফলকটা বারীনবাবুর কাছেই ছিল৷ কিন্তু হঠাৎ ওইরকম ঢিলে বাঁধা চিঠি পেয়ে ভয় পেয়ে গেছেন৷ বিশেষ করে তাঁর বাবা বলেছিলেন, ওটা যেখানে ছিল সেখানে রেখে আসতে৷ কিন্তু বারীনবাবু বাবার চেয়ে ছিলেন বেপরোয়া সাহসী৷ তিনি কথাটা গ্রাহ্য করেননি৷ তাই এটা রেখে দিয়েছিলেন৷
ঘটনার ব্যাকগ্রাউন্ড শোনার পর বললুম—তাহলে কর্নেল বোঝা যাচ্ছে এটাতে কোনো গুপ্তধনের সংকেতই লেখা আছে৷ আর গুপ্তধনটা আদিবাসীদের সেই দখল করা বটগাছেরই তলায় কোথাও পোঁতা আছে৷
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন—তোমার কথা সত্যি হতে পারে৷ তবে গুপ্তধন ব্যাপারটা আলেয়ার আলোর মতোই৷ জীবনে বহুবার দেখেছি, গুপ্তধনের জায়গাটা আবিষ্কার করেও সেখানে কিছু পাওয়া যায়নি৷ তবে অন্য কেউ সেটা উদ্ধার করে নিয়ে গেছে৷ যাই হোক, আজ রাতে বারীনবাবু ওটা ওদের কথামতো যথাস্থানে রেখে আসবেন৷ তারপর দেখা যাক, কী হয়৷
বললুম—বোঝা যাচ্ছে আপনি ব্যাকগ্রাউন্ডটা বললেন৷ কিন্তু নোটবইতে কী লিখেছেন, তা এখনই জানাতে চান না৷
কর্নেল আমাকে অবাক করে তাঁর নোটবইটা একটা আলমারির ভেতর লকারে রেখে এসে বললেন, মুখটি বুজে থাকো৷
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে আমার জন্য একটা ঘর রাখা আছে৷ সেখানে সবসময় আমাকে রাত্রিবাস করতে হয় বলে কয়েক প্রস্ত পোশাক, আর দাড়ি কামানোর সরঞ্জাম রাখা আছে৷
রাত দশটায় ডিনারের পর কর্নেলের নির্দেশে শুয়ে পড়তে হল৷ কিন্তু আমার ঘুম আসছিল না৷ বারীনবাবুর জন্য কেন কে জানে উদ্বেগ বোধ করছিলুম৷ আমার ঘরের আলো নিভিয়ে রেখেছি৷ এতক্ষণে উঠে ফ্যানের স্পিড কমিয়ে দিলুম৷ একটু শীত শীত করছিল৷ তারপর সাবধানে দরজা খুলে পর্দার ফাঁকে উঁকি দিলুম৷ উলটোদিকে করিডোরের ওপাশে কর্নেলের বেডরুম৷ ঘরে আলো জ্বলছে৷ সেটা বোঝা গেল৷ তারপর পা টিপেটিপে কর্নেলের ঘরের দরজায় কান পাতলুম৷ কর্নেল ফোনে চাপা স্বরে কথা বলছেন৷ কিছুদিন তিনি ফোনের লাইন আলাদা করেছেন বোঝা গেল৷ কিছুদিন আগে তাঁর ড্রয়িংরুমের সঙ্গে বেডরুমের লাইন একই সঙ্গে ছিল৷ কাজেই তাঁর কথা শোনার জন্য আগে বহুবার চুপিসাড়ে চেষ্টা করেছি৷ কর্নেল কখনও কখনও টের পেয়ে যেতেন৷ বলতেন—সাবধান জয়ন্ত, মুন্ডু উড়িয়ে দেব৷
কাজেই এখন আর ড্রয়িংরুমের ফোন তুলে শোনার উপায় নেই যে তিনি কার সঙ্গে কথা বলছেন৷ তবে অনুমান করা যায় যে তিনি বারীনবাবুর সঙ্গে বাক্যালাপ করছেন৷ যাক গে, সকালবেলায় জিগ্যেস করে সব জানা যাবে৷
ঘুম ভাঙল দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দে৷ দেখি, ষষ্ঠীচরণ চা এনেছে৷ অন্যান্য রাতে এই দরজা বন্ধ করি না৷ আজ বন্ধ করেছিলাম৷ বিছানায় বসে বেড-টি খাওয়ার মতো সুখ জীবনে আর কিছুতে পাই না৷ অগত্যা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলুম৷ ষষ্ঠীচরণ নিঃশব্দে হেসে বলল— মনে হচ্ছে দাদাবাবু বেশ ভয় পেয়েছেন৷ কিন্তু বাবামশাইয়ের এই বাড়িতে হানা দেয় সাধ্যি কার!
তার হাত থেকে চা নিয়ে চুপিচুপি জিগ্যেস করলুম—তোমার বাবামশাই বোধ হয় ছাদের বাগানে৷
ষষ্ঠী হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল৷ বলল—উনি তো ভোরবেলা বেরিয়ে পার্ক সার্কাস ময়দান অবধি হাঁটাহাঁটি করেন৷ আজও বেরুচ্ছিলেন৷ হঠাৎ টেলিফোন৷ কার কী শুনে হঠাৎ তিনি সেই ছ’টায় বেরিয়ে গেলেন৷ আমার বেশ ভয় করছে দাদাবাবু৷
বিছানায় বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বললুম—নাহ, তোমার বাবামশাই আয়রন ম্যান৷ মানে কী জানো—লোহার মানুষ৷ ওঁর গায়ে গুলি ছুঁড়লে বিঁধবে না৷ তুমি নিশ্চিন্তে গিয়ে চা খাও৷ কাজকর্ম করো৷
এই অ্যাপার্টমেন্টের সদর দরজায় ল্যাচ-কি আছে৷ তার মানে ভেতর থেকে দরজা খোলা যাবে৷ কিন্তু বাইরে থেকে চাবি ছাড়া কিছুতেই দরজা খোলা যাবে না৷ তাই চাবি নিয়ে কর্নেল বাইরে বেরোন৷ অবশ্য যষ্ঠীর কাছে ডুপ্লিকেট চাবি একটা আছে৷ কারণ বাজার যাওয়া, বিভিন্ন কাজে তাকে যেতে হয়৷
এরপর নাইট ড্রেস ছেড়ে পাঞ্জাবি-পাজামা পরে নিলুম৷ তারপর ড্রয়িংরুমের ভিতর দিয়ে ছাদের বাগানে উঠে গেলুম৷ সূর্য উঠেছে কিন্তু আকাশে মেঘলা ভাব৷ পাশের বাড়িটায় নিমগাছটায় প্রচণ্ড কাকের উপদ্রব৷ সেখানে এই সাতসকালে কাকেদের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়েছে৷ কান পাতা দায়৷ ওদের বাধা দিতেই ষষ্ঠী ছাদের কোণে একটা কাকতাড়ুয়া মূর্তি বসিয়ে রেখেছে৷ তাই এদিকে আসছে না৷ কিন্তু আমার বিরক্তি ধরে গেল৷ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নীচে নেমে এলুম৷ ষষ্ঠী কতগুলো খবরের কাগজ বিছানায় রাখছিল৷ জিগ্যেস করলুম, কর্নেল ফেরেননি?
ষষ্ঠী বিরস মুখে বলল, না, দাদাবাবু, উনি ফেরেননি৷ লালবাজারের লাহিড়ি সাহেব এইমাত্র ফোন করেছিলেন৷ উনাকে বললাম, বাবামশাই বাইরে বেরিয়েছেন৷ পরে করবেন৷
নীচে এসে সোফায় বসে একটা কাগজ তুলে নিলুম৷ আমাদের কাগজ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ও কর্নেলের কাছে রাখা হয়৷ সত্যসেবকের সাংবাদিক হয়েও আমার ওই কাগজে রুচি হয় না৷ হঠাৎ ইংরেজি দৈনিকের প্রথম পাতায় একটা খবরে চোখ গেল৷ হেডিংয়ের বাংলাটা এইরকম: প্রাক্তন রাজবংশধরের উপর আক্রমণ৷
পুরোটা পড়ে জানতে পারলুম, গত রাতে কে বা কারা বিহারের প্রাক্তন রাজবংশধর বারীন্দ্রকুমার রায়চৌধুরীর উপর হামলা করে৷ আততায়ীদের গুলি থেকে তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন৷ বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তিনি গভীর রাত্রে পাড়ার একটি মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন৷ সেইসময় ফিরে আসার পথে তাঁকে লক্ষ্য করে কেউ গুলি ছোঁড়ে৷ তিনি একজন প্রখ্যাত শিকারি৷ তিনি সারাজীবন জঙ্গলে প্রচুর শিকার করেছেন৷ তাই তাঁর ইনট্যুইশন বা সহজাত অতিরিক্ত ইন্দ্রিয় যেন থেকে গেছে৷ সেই সহজাত বোধে তিনি নিশ্চয়ই টের পেয়েছিলেন—পেছনে বিপদ৷ তাই একলাফে সরে যান৷ তারপর তিনি স্বীকার করেছেন, আত্মরক্ষার জন্য তিনি পালটা রিভলবারের গুলি ছুঁড়েছেন৷ গত রাতেই খবর পেয়ে পুলিশ ওই জায়গায় টহল দিচ্ছে৷ সকালে বিশদ তদন্ত হবে৷ পুলিশ জানতে চায়, তাঁর গুলি আততায়ীদের কারও গায়ে লেগেছিল কিনা৷ রক্তের ছাপ থেকে তা জানা যাবে৷ তাই ওই গলিরাস্তায় পুলিশ কাউকে হাঁটাচলা করতে দেবে না৷
এবার এই কাগজটা রেখে আমাদের দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকা তুলে নিলুম৷ এ ধরনের ছোটোখাটো ঘটনার খবর আমি লিখি না৷ আমাদের নতুন ক্রাইম রিপোর্টার রূপক বোস লেখে৷ তার আবার কবিতা লেখার অভ্যাস আছে৷ তাই সে গত রাতের ঘটনাটা বেশ জমকালো করে লিখেছে৷ কোন সূত্রে সে জানতে পেরেছে, সেদিন সকালে এক দাড়িওয়ালা টুপি পরা সাহেব মিঃ রায়চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন৷ তাই পাড়ার অনেকে বলছেন, কোনো ইউরোপিয়ান বারীনবাবুর কাছে প্রাচীন আমলের কোনো দামি অ্যান্টিক দ্রব্য কিনতে গিয়েছিলেন৷ পুলিশ মহলে তাই নিয়ে জল্পনা চলছে৷ এ দুটো ঘটনার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো যোগসূত্র আছে৷ খবরটা পড়ে প্রচণ্ড হাসি পেল৷ প্রায় সশব্দে হেসে ফেললুম৷ ক্রাইম রিপোর্টারের কবি হওয়ার চাইতে উপন্যাস লেখক হওয়াই উচিত ছিল৷
কর্নেল ফিরে এলেন৷ তখন প্রায় ন’টা বাজে৷ ঘরে ঢুকেই যথারীতি সম্ভাষণ করলেন—মর্নিং জয়ন্ত৷ আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে৷
কথাটা বলে তিনি ভিতরে এগিয়ে গেলেন৷ তারপর সেই আলমারি খুলে ভিতর থেকে কালকের দেখা নোটবইটা বের করলেন৷ লক্ষ্য করলুম, উনি মন দিয়ে সেই কৌটো বা ফলকটাও হাতে নিয়েছেন৷ আলমারি বন্ধ করে ফিরে এলেন ইজিচেয়ারের কাছে, উঁচু টেবিলের ড্রয়ার খুলে জিনিসদুটো রেখে টুপি খুললেন৷ গলায় ক্যামেরা ঝুলছিল৷ সেটা টেবিলে রাখলেন৷ বাইনোকুলারটাও রেখে ইজিচেয়ারে বসলেন৷
বললুম, নাটক খুব জমেছে মনে হচ্ছে৷ আর আপনি আমার ঘুমের কথা জিগ্যেস করছিলেন? বাইরে কোথাও গিয়ে আমার ঘুম আসতেই চায় না৷ তাই উঁকি মেরে দেখছিলুম, আপনার বেডরুমে আলো জ্বলছে৷
এইসময় যষ্ঠীচরণ তার বাবামশাইয়ের জন্য কফি নিয়ে এল৷ তারপর সে মৃদুস্বরে বলল—বেরেকফাস্ট কিন্তু রেডি আছে৷
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন— আজ একটু দেরিতে খাব৷ তিনি চুপচাপ কিছুক্ষণ কফিতে চুমুক দেওয়ার পর আমার দিকে ঘুরে একটু হেসে বললেন—তুমি ঠিকই বলছ৷ ঘটনা একটু জমাটি বটে! গত রাতে বারীনবাবু আমার কথামতো জিনিসটা যথাস্থানে রেখে ফিরে আসছিলেন৷ কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, বটগাছটার আড়াল থেকে কেউ বা কারা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়েছিল৷ দৈবাৎ তিনি বেঁচে গেছেন৷ কিন্তু বুঝতেই পারছ, শিকারি মানুষ৷ বনজঙ্গলে ঘোরার অভ্যেস৷ এই ধরনের অতর্কিত হামলায় তাঁর অভ্যাসই কাজ করেছিল৷ তিনি ঘুরে দ্রুত রিভলবারের গুলি ছোঁড়েন৷ তারপর আলোছায়া ঘেরা জায়গাটার দিকে টর্চ জ্বেলে দেখতে পান, কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা দুটো লোক আর-একটা লোককে কাঁধে তুলে নিয়ে পাশের গলি দিয়ে উধাও হয়ে গেল৷ হাতে উদ্যত রিভলবার৷ বারীনবাবু ছুটে গিয়ে তাদের আর দেখতে পাননি৷ কিন্তু বটগাছটার কাছে এবং সেই গলি পর্যন্ত টাটকা রক্ত পড়ে আছে৷ অত রাতে গুলির শব্দে পাশের বাড়ির কয়েকজন লোক সাহস করে বেরিয়ে এসেছিলেন৷ বারীনবাবু তাঁদের বলেন—আমি এখানে পুজো দিতে এসেছিলাম৷ তারপর কে কাকে গুলি করেছে বুঝতে পারছি না৷ রক্তের দাগ দেখা যাচ্ছে৷ অবশ্য ততক্ষণে তিনি রিভলবার পকেটস্থ করেছিলেন৷
বললুম—তারপর রাত বারোটায় আপনাকে তাহলে উনিই টেলিফোন করেছিলেন৷
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ৷ আমি তখনই ঘটনাটা লালবাজারে ও. সি অফিসারকে ফোন করে জানাতে বললুম৷
বললুম—কিন্তু সকালে কার ডাকে ছুটে বেরিয়ে ছিলেন?
কর্নেল কিছু বলতে যাচ্ছেন, এমন সময় ষষ্ঠীচরণ এসে জিভ কেটে কাঁচুমাচু মুখে বলল—ওই যা, বলতে ভুলে গিয়েছিলুম বাবামশাই৷ লালবাজারের ওসি ফোন করেছিলেন৷ আমি বলেছি—উনি বেইরে গেছেন৷
কর্নেল তার দিকে চোখ কটমট করে তাকাতে সে ভিতরে ঢুকে গেল৷ কর্নেল তখনই টেলিফোন তুলে ডায়াল করলেন৷ তারপর সাড়া এলে বললেন—অরিজিৎ, শুনলুম তুমি ফোন করেছিলে... হ্যাঁ, বারীনবাবুরই কেস৷ তোমার ডিপার্টমেন্টের নরেশবাবু রাত্রেই গিয়েছিলেন শুনলুম... কর্নেল সহাস্যে বললেন—তাহলে তোমরা এলাকার সব নার্সিংহোম হসপিটালে রীতিমতো অভিযান চালিয়েছে বুঝতে পারছি, বারীনবাবুর সঙ্গে সি পি সাহেবের সম্পর্ক আছে৷ বোধ হয় মামা-ভাগ্নে সম্পর্ক৷ অতএব তোমাদের দুর্ভোগ একটু বেড়েছে আর কী...ঠিক আছে, তোমাদের লোক দিয়ে খোঁজখবর নাও, গুলিতে আহত কেউ কোথাও ফার্স্ট এড নিয়েছে কি না৷ আপাতত রাখি... হ্যাঁ আমি আছি৷ চিন্তার কারণ নেই৷
বুঝতে পারলুম, লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি-কমিশনার (ওয়ান) মিঃ অরিজিৎ লাহিড়ি চাপে পড়েছেন৷ তবে কর্নেল যখন এই কেসে হাত দিয়েছেন, তখন তাঁর উদ্বেগ কমে যাওয়ারই কথা৷
বললুম—কিন্তু ভোরবেলা আপনি পার্কসার্কাস ময়দানে না গিয়ে এই গড়ের মাঠে জগিং করছিলেন?
কর্নেল তাঁর প্রসিদ্ধ অট্টহাসি হাসলেন৷ তারপর বললেন—কতকটা জগিংই বলতে পারো৷ আর জায়গাটা গড়ের মাঠই বটে৷ ডার্লিং, দিনে দিনে তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি খুলছে৷
সকৌতুকে বললুম—সম্ভবত বারীনবাবু গড়ের মাঠে আপনাকে ডেকেছিলেন৷
কর্নেল বললেন—না, অরিজিৎ এতক্ষণে খবর পেয়ে গেছে নরেশবাবুর কাছে৷ এস আই নরেশ ধর বারীনবাবুকে ডেকেছিলেন৷ বারীনবাবু আমাকে ডেকেছিলেন৷ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের উত্তর-পশ্চিম কোণে ঝোপ-ঝাড়ের ভিতর অনেকটা রক্ত পাওয়া গেছে৷ গাড়ির চাকার দাগও দেখতে পেলুম৷ ফার্স্ট এডের রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ, তুলোসমেত সেখানে পড়ে আছে৷ তার মানে একটাই দাঁড়ায় যে, দ্য ভিক্টিম ইজ ডেড৷ বারীনবাবুর গুলি নিশ্চয়ই তার শরীরের ভাইটাল অংশে আঘাত করেছিল৷
বললুম—তাহলে এবার কি পুলিশ কলকাতার শ্মশানগুলোতে খোঁজ-খবর শুরু করেছে?
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন—নাহ, সাড়ে ন’টা বাজে৷ চলো, আর রক্ত ঘেঁটে লাভ নেই৷ ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া যাক৷
ব্রেকফাস্ট করে ড্রয়িংরুমে এলুম৷ কর্নেলের আবার একটু কফি দরকার৷ আমি আর কফিতে নেই৷ ষষ্ঠীকে জানিয়ে দিয়েছি৷
নিঃশব্দে কফি শেষ করে আমার বৃদ্ধ বন্ধু বললেন—এবার তোমার রিঅ্যাকশন জানতে চাই৷ কী মনে হচ্ছে?
চোখ বুজে বলে ফেললুম—সহজ ব্যাপার৷ বারীনবাবুর কাছে যে লোকটি এই ব্রোঞ্জের ফলক চেয়েছিল, সেটা হাতিয়ে নিয়ে সে আর বারীনবাবুকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়নি৷ কারণ, এমন বিচক্ষণ এবং দুঃসাহসী লোক বারীনবাবু যে তাঁর শত্রুকে ছেড়ে কথা কইবেন না, তা সে জানতো৷ তাই তার লোককে গুলি ছুঁড়তে বলেছিল৷ এখন হিতে বিপরীত হয়ে গেছে৷
কর্নেল চুরুটের ধোঁওয়া ছুঁড়ে বললেন—ব্র্যাভো জয়ন্ত! আপাতদৃষ্টে তোমার অনুমান যথার্থ বলে মনে হচ্ছে৷
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চুরুট টানছিলেন আর প্রশস্ত টাকে হাত বোলাচ্ছিলেন৷ বোঝা যাচ্ছিল, উনি ওই ব্রোঞ্জের ফলকে আঁকা হুতুমপেঁচাটাকে নিয়েই রহস্যে হাবুডুবু খাচ্ছেন৷ কিছুক্ষণ পরে উনি সোজা হয়ে বসলেন৷ তারপর ড্রয়ার থেকে শুধু সেই নোটবইটা বের করলেন৷ তারপর সেটার দিকে তাকিয়ে ধ্যানস্থ হলেন৷
বললুম—ওটা আমাকে দেখাতে আপত্তি আছে?
কর্নেল গম্ভীর মুখেই ছোট্ট নোটবইটা আমার হাতে দিলেন৷ পড়ে দেখি, ওটাতে কর্নেলের স্বহস্তে লেখা বাংলায় সম্ভবত একটা শ্লোক৷
‘কস্তুরীচন্দনলেপনায় শ্মশান ভস্মাঙ্গবিলেপনায় চ৷
সৎকুণ্ডলায়মণি কুণ্ডলায় নমঃ শিবায় চ নমঃ শিবায়৷৷’
পড়ার পর বললুম—আমার স্কুলে সংস্কৃত আবশ্যিক পাঠ্য ছিল৷ কিন্তু পণ্ডিতমশাই দেবভাষা আমার মাথায় ঢোকাতে না পেরে যখন-তখন চাঁটি মারতেন৷ অবশ্য, এটুকু বুঝতে পারছি এটা নিশ্চয়ই দেবাদিদেব শিবের স্তোত্র৷ তার মানে, বিহার মুলুকের চন্দরপুরীর সেই শিবলিঙ্গের উপাসনা মন্ত্র৷ কিন্তু এর সঙ্গে হুতুমপেঁচার সম্পর্কও আছে৷ আপনার কাছে তা শুনেছি৷ শুধু বুঝতে পারছি না, এর মধ্যে বারীনবাবুর শত্রুপক্ষ গুপ্তধনের সন্ধান কেমন করে পাবে?
কর্নেল নোটবইটা ফেরত নিয়ে টেবিলের ড্রয়ারে ঢোকালেন৷ তারপর বললেন—একজন প্রত্নতাত্ত্বিক পণ্ডিত ব্রোঞ্জের লিপিগুলো বাংলায় উদ্ধার করে দিয়েছেন৷ লিপিগুলো সেই যুগে, যখন ব্রাহ্মী লিপি থেকে সবে নাগরী লিপির আবির্ভাব হয়েছে৷ তার মানে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতক৷
অবাক হয়ে বললুম—বাপস! এত পুরোনো ব্রোঞ্জ এখনও টিকে ছিল৷
কর্নেল বললেন—জয়ন্ত, তুমি কী বলছ! খ্রিস্টপূর্ব দেড়-দু’হাজার বছর আগেকার মূর্তি হরপ্পা-মহেঞ্জোদাড়োর ধ্বংসাবশেষে আবিষ্কৃত হয়েছিল৷ এখনো সেগুলো পাকিস্তানের মিউজিয়ামে সুরক্ষিত আছে৷
বললুম—ব্রোঞ্জের লিপিটা ঠিক আছে৷ কিন্তু এর পিছনে কোনো গুপ্তধন থাকলে আবার বলছি, নির্ঘাৎ লোপাট হয়ে গেছে৷
কর্নেল একটু হেসে বললেন—চিরদিন গুপ্তধনের এটাই একটা মায়া৷ ইন্দ্রজালও বলতে পারো৷
বললুম—তাহলে বারীনবাবুর শত্রুপক্ষকে অনায়াসে নির্বোধ বলা যায়৷
—সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না৷ বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ চলো, বেরুনো যাক৷
—বারীনবাবুর কাছে আমার যেতে ইচ্ছে করছে৷
কর্নেল বললেন—তাহলে ঝটপট রেডি হয়ে এসো৷ পকেটে তোমার সিক্স রাউন্ডার রিভলবারটা নিতে ভুলো না৷
একটু গা ছমছম করল৷ তবে, এ তো দিনের বেলা৷ তখনই প্যান্ট-শার্ট পরে প্যান্টের ডান পকেটে আমার খুদে আগ্নেয়াস্ত্রটা রুমালে জড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলুম৷ স্যান্ডেলের বদলে বুট পরে নিলুম৷
নীচে নেমে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে লনে আনলুম৷ কর্নেল আমার বাঁ-পাশে বসলেন৷ বারীনবাবুর বাড়ি যে পথে গিয়েছিলুম, সে পথটা ছিল শর্টকাট৷ কিন্তু এখন তা ভুলে গেছি৷ কিন্তু কর্নেলের নির্দেশে গাড়ি ড্রাইভ করছিলুম৷
গিয়ে দেখি, বারীনবাবুর বাড়ির সামনে দু’জন সশস্ত্র পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে আর যেখানে গাড়ি পার্ক করেছিলুম, সেখানে পুলিশের একটা কালো রঙের বেতার ভ্যান৷ এবং তার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন পুলিশ অফিসার৷ সেখানেই গাড়ি লক করে বেরিয়ে আসতেই পুলিশ অফিসার কর্নেলকে নমস্কার করলেন৷ বললেন—নরেশবাবু ভেতরে আছেন৷ চলুন, আপনাদের এগিয়ে দিই৷
অফিসারকে দেখে দু’জন পুলিশই স্যালুট দিল আর গেটের একটা অংশ খুলে দিয়ে বারীনবাবুর সেই দারোয়ান কর্নেলকে মিলিটারি সেলাম ঠুকল৷
আমরা সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠতেই সেই রঘু পালোয়ান সেলাম ঠুকে বলল—বাবুজি আপনার অপেক্ষা করছেন৷ আসুন৷
আবার সেই হলঘরে ঢুকে দেখি সেখানেও দু’জন সশস্ত্র পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে৷ আমরা এবার জীর্ণ কার্পেটে চাপা সিঁড়ি বেয়ে দোতলা গেলুম৷ টানা বারান্দা ধরে এগিয়ে গিয়ে ডানপাশে এসে রঘু কিছু বলল৷ তারপর সরে দাঁড়াল৷ বারীনবাবু পর্দা তুলে বললেন, আসুন কর্নেল সাহেব৷ লালবাজারের নরেশবাবুও আমার সঙ্গে গড়ের মাঠ থেকে এসেছেন৷ অপেক্ষা করছেন আপনার জন্য৷
ভিতরে বেডরুমে ঢুকে দেখি, পুরনো আমলের উঁচু পালঙ্ক৷ দেওয়াল-আলমারিতে ঠাসা বাঁধানো বই৷ আর বারীনবাবুর পূর্বপুরুষের অয়েলপেন্টিং-এ দেয়াল ঢাকা৷ জানালার ধারে হাল আমলের সোফাসেট৷ ডিটেকটিভ সাব-ইন্সপেক্টর নরেশ ধর তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়লেন৷ করজোড়ে বললেন—আসুন কর্নেল সাহেব৷ আমার কপালে এই রাজবাড়ির ব্রেকফাস্ট ছিল৷ এতক্ষণ চলে যেতুম৷ আপনি আসবেন বলে অপেক্ষা করছি৷ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে তিনি মুচকি হেসে বললেন— জয়ন্তবাবুও যে আসবেন তা ধরেই নিয়েছিলাম৷ বড্ড গোলমেলে কেস৷ আপনার দৈনিক সত্যসেবকের সার্কুলেশন ৬ লাখ পেরিয়ে বেড়ে যাবে৷ যদি কেসটা শেষ অব্দি ফাঁস করা যায়৷
কর্নেল মুখোমুখি বসলেন আর অন্য কোণে বসলেন বারীনবাবু৷ কর্নেল জিগ্যেস করলেন—হাতের তাস পুলিশ দেখাবে না তা জানি৷
নরেশবাবু বলে উঠলেন—কর্নেল সাহেবও পুলিশকে হাতের তাস দেখান না৷
কর্নেল বললেন—অলরেডি দেখিয়ে দিয়েছি৷ ঢিলটা কোন পথে আসে, সেটাও মিঃ রায়চৌধুরীকে দেখিয়েছি৷
বারীনবাবু বললেন—হ্যাঁ, ওই শিবমন্দিরের ওখানেই একটা চারতলা বাড়ি আছে৷ ওই বাড়িটার নীচের তিনটে তলায় ভাড়াটে আছে৷ চারতলায় একটা মেস৷ চিলেকোঠা দিয়ে ছাদে ওঠা যায়৷ কিন্তু মেসসুদ্ধু লোককে তো গ্রেফতার করা যায় না৷
কর্নেল বললেন—আমি বলেছিলুম, মেসের লোকগুলোর কার কী নাম, কে কোথায় থাকে তা বাড়িওয়ালার কাছে খোঁজ পাওয়া যেতে পারে৷
নরেশবাবু বললেন—সব নিয়েছি৷ ওদের রেজিস্টার থেকে টুকে নিয়েছি৷ তবে আজ কাজের দিন৷ সবাই বেরিয়ে গেছেন৷ দু’জন শিক্ষক আর চারজন সরকারি কর্মী৷ বাকি তিনজন বিভিন্ন বাণিজ্যসংস্থায় কাজ করেন৷
আমি বলতে যাচ্ছিলুম, ব্রোঞ্জের ফলক বা কৌটোই শিব-স্তোত্র...
কর্নেল আমার দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে বললেন—জয়ন্ত, চন্দরপুরীর হুতুমপেঁচা আর শিবলিঙ্গের ব্যাকগ্রাউন্ড নরেশবাবুর জানা৷
নরেশবাবু ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ একটু হেসে বললেন—জয়ন্তবাবু, শিব-স্তোত্র কি কর্নেল সাহেবের হাতের তুরুপের তাস?
ততক্ষণে আমি স্মার্ট হয়ে উঠেছি৷ বললুম—ব্রোঞ্জের ফলকের ওই লেখাগুলো সম্পর্কে আমি কর্নেলকে বলছিলুম—ওগুলো আর কিছুই নয়, মহাদেবের মন্ত্র৷
কর্নেল এবার হো-হো করে হেসে উঠলেন— হ্যাঁ, জয়ন্ত আজকাল আমার সঙ্গগুণে রীতিমতো ডিটেকটিভ হয়ে উঠতে চায়৷ তবে আমি অবশ্য ডিটেকটিভ নই৷ কারণ, কথাটার ওপর আমার অ্যালার্জি আছে৷ ওই শব্দটা থেকে বাংলা স্ল্যাং টিকটিকির উদ্ভব৷
নরেশবাবু সহাস্যে বললেন—আচ্ছা কর্নেল সাহেব, আপনার হালদার মশায়ের খবর কী? তাঁকে কি এই কেসে আপনি ডাকেননি?
বারীনবাবু হেসে উঠলেন৷—ও, সেই প্রাক্তন পুলিশ-ইন্সপেক্টর মিঃ কে কে হালদারের কথা বলছেন? ওঁকে আপনারা হালদারমশাই বলেন কেন?
কর্নেল বললেন—আপনাকে ঘটনাটা বলেছিলুম, ভুলে গেছেন৷ সেই যে একটা বিয়েবাড়িতে কনে-বউয়ের মামা জনৈক হালদারমশাই সাজিয়ে ওঁকে মোতায়েন রেখেছিলুম৷ বলা ছিল, আমি যদি টের পাই বরযাত্রীদের মধ্যে ডাকাতের দল ঢুকে আছে তাহলে ওঁকে শুধু বলব—‘হালদারমশাই হালদার মশাই আপনার ভাগ্নীর চোখে কাঁটা৷’ তো আসলে চৌত্রিশ বছর পুলিশে চাকরির স্বভাব রিটায়ার করেও মনে সেই পুলিশ অফিসার থেকে গেছেন৷ অতএব আমার কথা শুনেই পাঞ্জাবির পকেট থেকে রিভলবার বের করে শূন্যে গুলি ছুঁড়ে বসলেন৷ মাথার উপর বেলোয়ারি ঝাড়লণ্ঠন ঝুলছিল৷ সেটা ভেঙে গুঁড়িয়ে লুটিয়ে পড়ল৷ সে-সময় কনে বউকে সরিয়ে এনে ‘ডাকাত ডাকাত’ বলে চেঁচিয়ে উঠলুম৷ বিয়েবাড়িতে সাদা পোশাকে ছদ্মবেশে প্রচুর পুলিশ ছিল৷ জনা আট-দশেক ছদ্মবেশী ডাকাত পালিয়ে যাচ্ছিল৷ পুলিশ তাদের ধরে ফেলে৷ আর সত্যিকার বরযাত্রীরাও আতঙ্কে কাঠ হয়ে বিয়ের আসরেই বসেছিলেন৷
বারীনবাবু বললেন—হ্যাঁ, মনে পড়েছে৷ কিন্তু উনি এখনও পূর্ববঙ্গীয় ভাষা ছাড়তে পারেননি কেন জানি না৷
কর্নেল বললেন—হালদারমশাই বলেন, মাতৃভাষা ছাড়বেন কেন? পূর্ববঙ্গের মানুষ, সেখানে ভাষার জন্য পুলিশের গুলিতে এতগুলো মানুষ মারা গেছিল৷ তবে অপেক্ষা করুন, আপনার এই কেসে হালদারমশাইকে আমি আপনার অজ্ঞাতসারেই কাজে লাগিয়েছি৷
নরেশবাবু ঘড়ি দেখে বললেন—আমি যাই৷ আপনারা কথা বলুন৷ আমার বস মিঃ লাহিড়ি অপেক্ষা করছেন৷
নরেশবাবু চলে যাওয়ার পর কর্নেল বললেন—জয়ন্ত, তুমি শিব-স্তোত্র কথাটা বলে ঠিক করোনি৷ নরেশ ধর লালবাজারের বাঘা ডিটেকটিভ৷ উনি কোনো পুরুতঠাকুরকে খুঁজে শিবের অনেক রকমের স্তোত্র শুনতে চাইবেন৷
বললুম—কিন্তু তা শুনে উনি আপনার উদ্ধার করা স্তোত্রটাই যে এই কেসের মোক্ষম ক্লু, তা বুঝবেন কী করে?
কর্নেল তাঁর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে সেই নোটবইটা বের করে বারীনবাবুকে দিলেন৷
বারীনবাবু বললেন—এইসব কথা ব্রোঞ্জের ফলকের গায়ে লেখা আছে? কিন্তু এতে কি সত্যি কোনো গুপ্তধনের সূত্র লুকোনো আছে?
কর্নেল চাপা স্বরে বললেন—নীচের লাইনটা দেখুন৷ ‘‘সৎকুণ্ডলায়মণি-কুণ্ডলায়’’ ...আপনার কি কিছু স্মরণে আসছে?
বারীনবাবু ভ্রু কুঁচকে চোখ বুজে যেন ধ্যানস্থ হলেন৷ কিছুক্ষণ পরে চোখ খুলে বললেন—আশ্চর্য, এ তো ভারি আশ্চর্য! দু’দুটো কুণ্ডল৷ হ্যাঁ, মনে পরছে৷ বাল্যকাল থেকে ঠাকুরমার মুখে দুটো কুণ্ডলের কথা শুনে আসছি৷
ও দুটো নাকি সোনায় বসানো হিরে-মোতি-পান্না-চুনী-সোনা ইত্যাদি মূল্যবান রত্নখচিত ছিল৷ এই দুটো কুণ্ডল আমাদের প্রাচীন রাজবংশের রাজ্যাভিষেকের সময় দুই কানে পরানো হত৷ তাই আমাদের পুরুষানুক্রমে সব বাচ্চার কান ফুটো করা থাকত৷
জিগ্যেস করলুম—আপনারও কান ফুটো করা আছে নাকি?
বারীনবাবু এলোমেলো সাদা চুল সরিয়ে কানের নীচের দিকটা দেখালেন৷ বললেন—হ্যাঁ, এ আমাদের বংশের নিয়ম৷ ভাগ্যিস, কর্নেল সাহেব এটা উদ্ধার করতে পেরেছেন৷
কর্নেল বললেন—নাহ, কুণ্ডল উদ্ধার করতে পারলুম কই! ফলকটার পাঠোদ্ধার করে আমার এমন কিছুই ধারণা হয়েছিল৷ কারণ, ওই শব্দ দুটো অন্য অক্ষরের চেয়ে একটু মোটা করে লেখা ছিল৷
বারীনবাবু হতাশমুখে বললেন—কিন্তু কোথায় সেই কুণ্ডল? আর আমার শত্রুপক্ষই বা কেমন করে জানল সেই কুণ্ডলের কথা!
আবার হঠাৎ আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—আচ্ছা, মিঃ রায়চৌধুরী, আপনার ভাগ্নে চণ্ডীবাবুকে তো এখনো দেখিনি৷ কর্নেল দেখে থাকবেন৷ আপনার মুখে শুনেছি, সে টো-টো করে ঘুরে বেড়ায়৷
কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন—শ্রীমান চণ্ডীচরণ রায়কে আমি দেখেছি৷ সে বিহার মুল্লুকের ছেলে৷ তাই ডন-বৈঠিক, কুস্তি—এ সবে তার নেশা৷ এ পাড়ায় একটা জিমখানা আছে৷ সেখানেই সে দিনটা কাটায়৷ কোথায় ওদের আখড়ার একটা প্রদর্শনী হবে, তাই সে প্রস্তুত হচ্ছে৷
এবার বারীনবাবু তাঁর পালঙ্কের পাশের দেয়ালে ঝোলানো একটা ছবি তুলে নিয়ে বললেন—এই দেখুন, চণ্ডী৷ ওকে দিনের বেলায় দেখার আশা কম৷ কাজেই ছবিতেই দেখে নিন৷
ছবিটা একটা ফটোগ্রাফ৷ ফটোগ্রাফে জাঙিয়া পরা সারা শরীরে দাগড়া দাগড়া পেশী ফোলানো এক তরুণের ফটো৷ বললুম—আপনার ভাগ্নে তো রঘুর চেয়ে মস্ত পালোয়ান৷ ওঁকে বলুন না, আপনার উপর কারা হামলা করছে৷ চণ্ডীবাবু ওদের একজনকে পেলে এখান থেকে সটান গঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলে দেবেন৷
বারীনবাবু একটু হেসে বললেন—আজ ভোরে কর্নেল যখন এসেছিলেন, তখন ওপরের ছাদে রঘু ও চণ্ডী কুস্তি লড়ছিল৷ নরেশবাবুর কান! বললেন—ছাদে কি কেউ কুস্তি লড়ছে? বললুম, উঠে গিয়ে ছাদে দেখে আসুন কী করছে ওরা৷ নরেশবাবু একটু উঁকি মেরে ছাদে ওদের দেখে হেসে অস্থির৷ তারপর নেমে এসে বললেন—রিভলবার বা গুলির সামনে দুই পালোয়ান কিন্তু একেবারেই অচল৷ অতএব আপনি ভাগ্নের সাহায্যের আশা করবেন না৷
এসময় টেলিফোন বেজে উঠল৷ খাটের পাশেই একটা উঁচু টেবিলে রাখা টেলিফোনের রিসিভার তুলে বারীনবাবু সাড়া দিলেন৷ তারপর বললেন—আপনি কে বলছেন... হ্যাঁ কর্নেল সাহেব এখানে আছেন৷ বাই দ্য বাই, আপনি কি মিঃ হালদার কথা বলছেন...? ধরুন৷ বলে তিনি কর্নেলের দিকে সহাস্যে ইঙ্গিত করলেন৷
কর্নেল উঠে গিয়ে রিসিভার ধরে বললেন—হ্যাঁ, বলছি৷ বলুন হালদার মশাই... আপনি আমার বাড়িতে চলে যান৷ আমরা এখনই ফিরে যাব... হ্যাঁ ওসব কথা আমার ঘরে বসেই হবে৷
কর্নেল রিসিভার রেখে বললেন—মিঃ রায়চৌধুরী, আমাদের হালদারমশাই সম্ভবত কোনো সূত্র পেয়েছেন৷ যাই হোক, আপনি কিন্তু দুটো রত্নখচিত মহামূল্যবান কুণ্ডলের কথা স্মরণ করুন৷ আপনার পূর্বপুরুষের, ধরুন আপনার বাবা বা ঠাকুরদার কাগজপত্রের মধ্যে খুঁজে দেখুন, কোনো সূত্র মেলে কি না৷
গিয়ে দেখি, কর্নেলের ড্রয়িংরুমে বসে গোয়েন্দাপ্রবর ফুঁ দিয়ে দিয়ে বেশি দুধ-মেশানো স্পেশাল কফি পান করছেন৷ কিন্তু তাঁর কপালে, গলার পিছনে আর বাঁ-হাতের কব্জিতে ঘড়ির বদলে ব্যান্ডেজ বাঁধা৷ আমাদের দেখে তিনি কাঁচুমাচু মুখে হাসলেন৷
জিগ্যেস করলুম—কী ব্যাপার হালদারমশাই? কারো সঙ্গে মল্লযুদ্ধ করে এলেন নাকি?
হালদারমশাই কর্নেলের দিকে তাকালেন৷ বললেন—কর্নেল স্যার, জোর একখান বাধছিল৷ রিভলবার বাইর করতেই হালা পলায়া গেল৷
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন—অতর্কিতে হামলা বলেই মনে হচ্ছে৷ কিন্তু ওই আঘাতগুলো কিসের?
হালদারমশাই প্যান্টের পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করে নাকে এক টিপ নস্য গুঁজে রুমালে নাক মুছলেন৷ তারপর বললেন—না, আমি বারীনবাবুগো পাড়ায় গলিপথে হাঁটছিলাম৷ একখানে পানের দোকানের কাছে দুইজন দাঁড়াইয়া ছিল৷ কাছে যেই গেছি, এক হালা আমারে খপ কইর্যা ধইরা আছাড় মারল৷ আর মারল কোথায়? পাশেই বিল্ডিং হইতাছিল৷ সেখানে স্টোন চিপসের গাদা, তার উপর৷ হাতের ঘড়ির কাচ ভাইঙ্গা চুরমার৷ সেকেন্ড অ্যাটাকের আগেই পকেট থনে আর্মস বার করছি৷ আর দুই হালায়, পাশের গলি দিয়া ভ্যানিশ হইয়া গেল৷
কর্নেল কথাটা গম্ভীর মুখে শুনছিলেন৷ বললেন—আপনি গুলি ছোঁড়েননি তো?
—নাহ৷ খামোকা গুলি ছুঁইড়্যা করুম কী? বড়ো রাস্তায় গিয়া একটা ফার্মেসি দেখলাম৷ রক্তারক্তি কাণ্ড! হালা গো গায়ে খুব জোর আছে৷ পাথরকুচিতেই কাইট্যা-কুইট্যা তিনখানে রক্ত ঝরছে৷
বললুম—দিন-দুপুরে এই কাণ্ড! তারপর হালদারমশাই বলছেন, পালোয়ান৷ কর্নেল, সেই বারীনবাবুর ভাগ্নে চণ্ডী নয় তো? ওই পাড়ায় একটা জিমখানা আছে৷ সেখানেই তো সে সারাদিন কাটায়৷
হালদারমশাই সখেদে বললেন—তা আমারে আছাড় মারল ক্যান? আমি কী করছি?
কর্নেল বললেন—মিঃ রায়চৌধুরীর ভাগ্নেকে তো আপনি দেখেননি৷ তাছাড়া সে কেনই বা আপনাকে আছাড় মারবে! দেখা যাক৷ বসুন৷ তারপর আস্তে-সুস্থে খবর বলুন৷
হালদারমশাইয়ের মুখে এতক্ষণে হাসি ফুটল৷ চাপা গলায় বললেন—
গত রাত্তিরের গুলি-খাওয়া বজ্জাতের খবর পাইসি৷
—কোথায় পেলেন? কোন সূত্রে?
হালদারমশাই আরো চাপা স্বরে বললেন—ঢাকুরিয়ার একটা নার্সিংহোমে একজন পেশেন্টেরে অ্যাডমিট করছে৷ ওই হোমের একজন নার্স লতিকা; সম্পর্কে আমার বোনঝি হয়৷ কিছু না চিন্তা কইরাই ওরে কইছিলাম—তোমাগো নার্সিংহোম তো গলির ভিতর৷ ছোট্ট নার্সিংহোম৷ ওখানে গত রাত্তিরে গুলিখাওয়া কোনো পেশেন্ট ভর্তি হইসে কিনা আমারে খবর দিও৷ সে গোপনে ফোন করছিল৷ আমিও পেশেন্টের আত্মীয় বইল্যা তারে দেখতে গেছিলাম৷ হ্যাঁ, থাইয়ের উপর গুলি লাগছে৷ কিন্তু পেশেন্টের বয়স জয়ন্তবাবুর মতোই৷ গোঁফ আছে৷ দেইখ্যাই বুঝলাম বডিখান যেন জিমখানায় তৈরি৷ রেজিস্টারে যে নাম লিখছে, তারা হইল গিয়া শচীন্দ্র রায়৷ ঠিকানা ঢাকুরিয়ারই৷ গত রাত্রে লতিকার ডিউটি ছিল না৷ আইজ সকালে সে পেশেন্টেরে দেখছে৷
কর্নেল বললেন—এ তো তাহলে সেই জিমখানার এক মেম্বার৷ কিন্তু মিঃ রায়চৌধুরীর ভাগ্নে চণ্ডীর.... নাহ, এমন হতে পারে চণ্ডীকে কেউ লোভ দেখিয়েছে৷ তবে এই ঘটনা থেকে বোঝা গেল আপনি পেশেন্টকে দেখতে গিয়েছিলেন, তখন তার দলের কেউ সেখানেই ছিল৷ আপনাকে ফলো করে এসে ভবানীপুরের গলিতে অপেক্ষা করছিল৷
বললুম—কিন্তু হালদারমশাই ওই গলিপথে যাবেন, সেটা সে কীভাবে জানল?
হালদারমশাই বললেন—ক্যান, দলের লোকেরে ফোন কইর্যা জানাইয়া দিছে৷ আমার চেহারার ডেসক্রিপশন দিছে৷
কর্নেল হাসলেন— হ্যাঁ, আপনার চেহারাটা টিপিক্যাল৷ লম্বা মানুষ হলেও আপনার গড়নে বলিষ্ঠতা আছে৷ মাথার চুল কুটিয়ে কাটা৷ আর আপনার ওই সরু গোঁফ পাকানো, রোগা৷ একটুতেই গোঁফের ডগা তিরতির কাঁপে৷
হালদারমশাই কষ্ট করে হাসলেন৷ আর আমিও হেসে উঠলাম৷ হালদারমশাই বললেন—আমি আপনার ফোনের লাইন পাই নাই৷ একখানে ওষুধের দোকানে ফোন পাইছিলাম৷ আপনারে না পাইয়া লালবাজারে নরেশবাবুরে জানাইয়া দিছি৷ এতক্ষণ পেশেন্টেরে পুলিশ ধরছে৷
কর্নেল হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে ডায়াল করলেন, সাড়া এলে বললেন—অরিজিৎ, মিঃ হালদার তোমাদের ডিপার্টমেন্টে কিছু জরুরি খবর দিয়েছেন৷ তুমি কি এ সম্পর্কে কিছু জানো...বা! গুলিখাওয়া লোকটা ধরা পড়েছে তাহলে... সে কী, আচ্ছা আমি দেখছি৷ তোমরা তোমাদের আইনের পথে যা করার তা করতেই পার৷ উইশ ইউ গুড লাক৷
টেলিফোন রেখে কর্নেল হালদারমশাইয়ের দিকে তাকালেন৷ এতক্ষণ হালদারমশাই গুলি গুলি চোখে তাকিয়ে ছিলেন৷ তাঁর দুই গোঁফের ডগা তিরতির করে কাঁপছিল৷ উত্তেজনা হলে তাঁর এই অবস্থা হয়৷ এবার ফিক করে হেসে বললেন—তা হইলে পেশেন্টেরে পুলিশ ধরছে৷ তার নাম কইলেন না লাহিড়ি সাহেব৷
কর্নেল বললেন—তার নাম স্বপন হাজরা৷ সে ওই জিমখানার মেম্বার৷ তাকে সবাই আড়ালে বলে গলাকাটা হাজরা৷
—বুঝছি! হালায় মাইনষের গলা কাইট্যা মার্ডার করে৷
কর্নেল কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, সেইসময় টেলিফোন বেজে উঠল৷ তা ছাড়া তিনি খবরটা পেয়ে যেন খুশি হয়ে মৌজ করে চুরুট টানছিলেন৷ বিরক্ত হয়ে বললেন—জয়ন্ত, ফোনটা ধরো তো৷ তেমন কেউ হলে তবেই আমাকে দেবে৷
রিসিভার তুলে সাড়া দিতেই কেউ গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলল—এটা কি কর্নেল সাহেবের টেলিফোন?
বললুম—হ্যাঁ, আপনি কে বলছেন?
—আমি ভবানীপুর থানার ও সি শোভন ব্যানার্জী৷ কর্নেল সাহেব কি নেই?
আমি ব্যাপারটা জানতে খুব আগ্রহী৷ তাই এককথায় বলে দিলুম, উনি একটু বেরিয়েছেন৷ তবে কিছু বলার থাকলে আপনি আমাকেও বলতে পারেন৷
—আপনি কে?
—আমার নাম জয়ন্ত চৌধুরী৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার সাংবাদিক৷
হাসির শব্দ শোনা গেল৷ শোভনবাবু বললেন—আপনাকে নামে জানি৷ আপনি রহস্যের গন্ধ পেলে কর্নেলের কাছে হানা দেন৷ তবে এটা তো কিছু রহস্যের নয়৷ এলাকার কাউন্সিলার নন্দন রায় তাঁর এক চ্যালাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন৷ তার নাম গোবিন্দ৷ নন্দনবাবুর খাতিরে শুধু ডাইরিটুকু নিয়েছি৷ তবে উনি প্রখ্যাত রাজবংশধর বারীন রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে এফ আই আর করতে এসেছিলেন৷ বারীনবাবু নাকি গোবিন্দের বন্ধু স্বপন হাজরাকে গুলি করেছেন৷ গোবিন্দ বলেছে, তারা দু’জনে রাত্রে জিমখানা থেকে বেরিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল৷ সেইসময় গুলির শব্দ শুনে তারা থমকে দাঁড়ায়৷ আর তখনি তারা দেখে, বারীনবাবু তাদের দিকে রিভলবার তাক করেছেন৷ গোবিন্দ বুদ্ধি করে এক লাফে সরে যায়৷ কিন্তু স্বপন একটু গোঁয়ার৷ সে সরেনি৷ তাই তার উরুতে গুলি লাগে৷
জয়ন্তবাবু, কর্নেল ফিরলে আপনি তাঁকে এই কথাগুলো জানিয়ে আমাকে রিং করতে বলবেন৷
উত্তেজনায় প্রায় কাঁপছিলুম৷ বললুম—নিশ্চয়ই বলব৷
শোভনবাবু বললেন— আমাদের এই পুলিশের চাকরি বড্ড ঝামেলার৷ কাউন্সিলার ভদ্রলোক খুব প্রভাবশালী৷ সরকারে তাঁর দল আছে৷ তাই একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওঁকে শান্ত করতে হল৷ বললুম, আপাতত ডায়েরিটা নিচ্ছি৷ এখনি আমার লোক বিশদ তদন্ত করবে৷ তারপর তার রিপোর্টের ভিত্তিতে আমি অ্যাকশন নেব৷
এই সময় কর্নেল আমার হাত থেকে রিসিভার ছিনিয়ে নিয়ে বললেন—আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি৷ ছাদের বাগানে গিয়েছিলুম৷ এইমাত্র নেমে আসছি৷ কী ব্যাপার? আমাকে ডিটেলস বলুন৷ আমার মনে হয়েছে, আপনি কোনো সিরিয়াস ব্যাপারে কথা বলছিলেন৷
আমি কাঁচুমাচু হেসে সোফার কোণের দিকে হেলান দিলুম৷ হালদারমশাইকে দেখলুম, উনি যথারীতি গুলি গুলি চোখে তাকিয়ে আছেন, গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে কাঁপছে৷ কর্নেল চাপা স্বরে কথাবার্তা বললেন৷ তারপর একটু হাসতে হাসতে বললেন—হ্যাঁ, আজকাল পুলিশের চাকরি করাই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে৷ শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা৷ যাই হোক আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মতো ব্যাপারটা ট্যাকল করেছেন৷ কিন্তু এটা একটা বড়ো কেসের লেজটুকু মাত্র৷ আপনি এখনই লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের এস আই নরেশ ধরকে ফোন করে ব্যাপারটা জানুন৷ উনি যা বলেন, সেইমতো চললে আমার মনে হয় আপনি নিরাপদে থাকবেন৷ কারণ, নরেশবাবু ডিসি ডিডি-ওয়ান অরিজিৎ লাহিড়ি মশাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে আপনাকে যা করতে বলার বলবেন... থ্যাঙ্কস মিঃ ব্যানার্জী... হ্যাঁ গুরুতর কিছু হলে তো আমি আছি... কিছু চিন্তা করবেন না... সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টও আমার মতো বে-সরকারি মানুষকে কিছু অধিকার দিয়েছেন৷ আমি দরকার হলে এ ধরনের অপরাধের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারি৷ আচ্ছা আমি রাখছি...
হাসতে হাসতে বললুম—এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে, জিমখানাটা চলে ওই কাউন্সিলার নন্দনবাবুর সহযোগিতায়৷ ওইসব পালোয়ানকে তিনি নিশ্চয়ই ভোটের সময় কাজে লাগান৷
কর্নেল চুরুটটা অ্যাশট্রেতে ঘষে নিভিয়ে দিলেন৷ তারপর গম্ভীরমুখে বললেন—এই নন্দনবাবুই দেখছি বাগড়া দেবেন৷ আমি বারীনবাবুর সঙ্গে একটুখানি আলোচনা করব৷ তবে এখন নয়৷ এখন আমাকে একটা বই নিয়ে বসতে হবে৷ বইটা অষ্টাদশ শতকের এক ব্রিটিশ সেনানীর লেখা৷ ‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য বিগ জমিনডারস অব বিহার’৷
বললুম—বুঝতে পেরেছি৷ সেই বইটা, যাতে হুতুমপেঁচার কাহিনি আছে৷
আমি টেলিফোনে আমাদের ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার নিউজ ব্যুরোর চিফ সত্যদাকে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছিলুম, কর্নেলের সঙ্গে একটা রাঘব বোয়ালের পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছি৷ পাঠকরা এই রহস্যকাহিনি গোগ্রাসে গিলবে৷ সত্যদা খুশি হলে মাঝে মাঝে হালদারমশাইয়ের মতো বাঙাল ভাষায় কথা বলেন৷ তিনি বলেছিলেন—ক্যাসখান জব্বর হইলে তোমার দুইখান ইনক্রিমেন্টের রেকমেন্ড করুম৷ আর আমারে হতাশ করলে গেট আউট কইর্যা দিমু৷
সেদিন কর্নেল বইটা নিয়েই মগ্ন রইলেন৷ সন্ধ্যায় হঠাৎ টেলিফোন বাজল৷ কর্নেল সাড়া দিয়ে কারো সঙ্গে কিছু কথা বললেন৷ তারপর রিসিভার রেখে আমার দিকে তাকালেন৷ —জয়ন্ত, বারীনবাবুর বাড়ি যেতে হবে৷ ওখানে তাঁর ভাগ্নে চণ্ডী আর তাঁর পরিচারক রঘুর মধ্যে হঠাৎ কী কারণে খুব বড়ো রকমের মল্লযুদ্ধ হয়ে গেছে৷ চণ্ডী মার খেয়েছে বেশি৷ তাই তাকে মিঃ রায়চৌধুরী একটা নার্সিংহোমে ভর্তি করে দিয়েছেন৷
জিগ্যেস করলুম—একেবারে নার্সিংহোমে কেন?
—বুঝতে পারছ না, নার্সিংহোমে থাকলে চণ্ডী একেবারে বেরুতে পারবে না৷ নার্সিংহোমকে বলা হয়েছে৷ তাদেরও লোকজন আছে৷
বললুম—আর রঘুবীরের কী অবস্থা?
কর্নেল ভিতরের ঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন—সে চাকরি ছেড়ে দিতে চেয়েছিল৷ অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাখা হয়েছে৷ ডাক্তার ডেকে তার সামান্য কিছু ক্ষতে পটি এঁটে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ তবে গুরুতর আঘাত সে পায়নি৷ যাই হোক, তুমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে এসো৷ পকেটে আর্মস নেবে৷ এখন ক্রমশ কেসটা জটিল হয়ে উঠছে৷
হালদারমশাই দুপুরেই চলে গেছেন৷ কর্নেল তাঁকে কী দায়িত্ব দিয়েছেন, আমি জানি না৷ কারণ, তখন আমি ভাতঘুম দিচ্ছিলুম৷
গাড়িতে যেতে যেতে কর্নেল বললেন—জয়ন্ত, গলিপথে ঢুকে শর্টকাট করার দরকার নেই৷
বরাবর বড়ো রাস্তা ধরেই যাব৷ যদিও এখন জ্যামে পড়ার আশঙ্কা আছে৷ তা থাক৷ কথায় বলে ‘সু-পথ দূর ভালো’৷
ভবানীপুরে বারীনবাবুর বাড়ি পৌঁছোতে সাড়ে-সাতটা বেজে গেছিল৷ গাড়িটা এবার কর্নেলের নির্দেশে এবড়ো-খেবড়ো লন দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়েছিলুম৷ সাড়া পেয়ে বারীনবাবু বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন৷ কর্নেল বেরিয়ে গিয়েই হাত বাড়িয়ে বললেন—গুড ইভনিং মিঃ রায়চৌধুরী৷
বারীনবাবু ম্লান হেসে বললেন—না, কর্নেলমশাই, ব্যাড ইভনিং বলাই ভালো৷ কোথা থেকে কী ঝামেলা আমার ঘাড়ে এসে পড়ছে! এতদিন কিছুই ঘটেনি৷ হঠাৎ এখন আমার ঘাড়ে এসে কেন পড়ছে বুঝতে পারছি না৷ তবু খটকা একটু লেগেছে৷ চলুন ভেতরে, বলছি৷
আমরা হলঘর দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গেলুম৷ সেই সময় হালদারমশাইয়ের মতো কপালে, মাথায়, গালে, কানে পট্টি আঁটা রঘু নীচে নেমে গেল৷ বারীনবাবু বললেন—ও নীচের দরজাটা বন্ধ করতে গেল৷ ওকে বলে রেখেছিলুম৷
ঘরে ঢুকে জানলার ধার ঘেঁষে সোফায় বসলুম৷ এতক্ষণে লক্ষ্য করলুম, বারীনবাবুর হাতে সম্ভবত একটা রাইফেল আছে৷ ওটি উনি বাঁ হাতে এমনভাবে শরীরের সঙ্গে সেঁটে রেখেছিলেন যে আমার চোখে পড়েনি৷ এবার রাইফেলটা পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে উনি কর্নেলের মুখোমুখি বসলেন৷ তারপর বললেন—আগে কফি আসুক৷ আপনি বাড়িতে হয়তো কফি খেয়ে এসেছেন৷ কিন্তু আপনি খেলে আমারও খাওয়া হবে৷ আমার গলা বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে৷
কিছুক্ষণ পরে এক প্রৌঢ়া মহিলা, তাকে বাড়ির কাজের লোক বলেই মনে হচ্ছিল, মাথায় ঘোমটা টেনে সেন্টার টেবিলে একটা ট্রে রেখে গেল৷ বারীনবাবু চাপা স্বরে বললেন—মারামারি করে রঘুয়ার মনের যা অবস্থা! বেগতিক দেখে ওর বউকে ডেকে পাঠিয়েছিলুম৷ বাড়িতে অতিথি-কুটুম এলে এবং খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ওকে ডেকে পাঠাতেই হয়৷ ওদের একটি ছেলে ও মেয়ে আছে৷ ছেলে কোন মোটরের গ্যারেজে কাজ করে৷ কিন্তু মেয়েটি লেখাপড়া শিখেছে৷ বি. এ-র ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে৷
এইসময় বাইরে পর্দার ওদিক থেকে রঘুয়া বলল—স্যার, আমাকে কিছু দরকার আছে?
বারীনবাবু বললেন— না, তুমি সুশীলাকে হেল্প করো৷ আজ রাত্তিরে কর্নেল সাহেবেরা এখানে খাবেন৷
বলে তিনি মিটিমিটি হেসে কর্নেলের দিকে তাকালেন৷ কর্নেল বললেন—তা মন্দ হবে না৷ তবে ফোনে ষষ্ঠীচরণকে একটু জানিয়ে দেওয়া দরকার, আমরা রাতে খাচ্ছি না৷ জয়ন্ত, তুমি ষষ্ঠীকে বলে দাও৷
আমি গিয়ে যষ্ঠীকে ফোনে কথাটা জানিয়ে দিলুম৷ সে বলল—সব ফ্রিজে ভরে রাখছি৷ কাল দুপুরে ওই দিয়েই লাঞ্চ করবেন৷
বুঝলুম সে রাগ করে কথাটা বলছে৷ কারণ আমি জানি না৷ আমি কর্নেলের সঙ্গে খেতে বসলে তার যেন আমাকে খাইয়ে আনন্দ হয়৷
বারীনবাবু টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন৷ বারীনবাবুর মুখে এখন বিরক্তির ছাপ৷ কর্নেল কাগজটা খুলে দেখে চোখ বুলিয়ে বললেন—নিম্ন আদালতের সমন৷ কেন আপনি গুলি ছুঁড়েছিলেন, তার কারণ দর্শাতে হবে৷ আপনার বক্তব্য আদালতের মনঃপূত না হলে—সর্বনাশ! স্বপন হাজরাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে গুলি করে হত্যার চেষ্টায় আপনাকে দায়রা আদালতে সোপর্দ করা হবে৷ কিন্তু আপনাকে এমন একটা সাঙ্ঘাতিক কেসে পুলিশ অ্যারেস্ট করল না কেন?
বারীনবাবু বললেন—লালবাজার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের হাতে কেস৷ নরেশবাবুরা আদালতকে জানিয়ে দিয়েছেন, এ কেসে স্থানীয় পুলিশ বা লোয়ার কোর্টের এক্তিয়ার নেই৷ তারা তদন্ত করছেন৷ সি আই ডি কোনও কেস হাতে নিলে নাকি এ সমনের মূল্য থাকে না৷ তাই হাকিমের এজলাসে গিয়ে একবার মুখ দেখালেই মুক্তি পাওয়া যায়৷ নেহাত টেকনিক্যাল ব্যাপার৷
কর্নেল-এর চুরুট নিভে এসেছিল৷ লাইটার জ্বেলে নিয়ে ওটা ধরিয়ে বললেন—এবার আসল কথায় আসি৷ চণ্ডীবাবুর সঙ্গে রঘুর হাতাহাতির কারণ কী?
বারীনবাবু বললেন—সঠিক বোঝা যাচ্ছে না৷ রঘু বলেছে, সে নীচের তলার একটা ঘরে তালা খুলে এক টুকরো কাঠ খুঁজছিল৷ ওই ঘরে এ বাড়ির বাতিল জিনিস, ভাঙা আসবাব ইত্যাদি রাখা হয়৷ রঘু ঢুকেছিল ওর খুরপির বাঁট করার মতো এক টুকরো কাঠ খুঁজতে৷ লনের ওপাশে রঘু অনেক ফুলের গাছ আর কিছু তরি-তরকারি লাগিয়েছে৷ কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে তার খুরপির হাতলটা ভেঙে গিয়েছিল৷ সেটা আমি দেখেছি৷ তাই আমি ওকে চাবি দিয়ে নীচের তলায় কাঠ খুঁজতে পাঠিয়েছিলুম৷ তারপর নাকি চণ্ডী বাইরে থেকে ফিরে সোজা ওই ঘরে চলে যায়৷ কেন ও-ঘরে রঘু ঢুকেছে, তাই নিয়ে ঝগড়া৷ রঘু ওকে বোঝাতে পারেনি যে আমার হুকুমেই সে ও-ঘরে ঢুকেছে৷ তবে যা বুঝতে পেরেছি, চণ্ডী আগেই হাত চালিয়েছিল৷ তারপর কীভাবে দু’জনের মধ্যে প্রচণ্ড মল্লযুদ্ধ বেধে যায়! আমি নীচের তলায় শব্দ শুনে নেমে গিয়ে দেখি, চণ্ডীর মাথা ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে৷ সারা গায়েও রক্তারক্তি৷ আর তার পেটের উপর বসে রঘু তার দুই বাহু শক্ত করে ধরে আছে৷ আর কানে এল—সে বলছে, চণ্ডীবাবু, বরাবর দেখেছি তুমি স্যারের অজান্তে চাবি নিয়ে গিয়ে কীসব খোঁজাখুঁজি করো৷ আমি কিন্তু কিছু খুঁজতে ঢুকিনি৷ আমার খুরপির বাঁটের জনা একটুকরো শক্ত কাঠ খুঁজতে ঢুকেছিলুম৷ যাই হোক, আমাকে দেখে রঘু উঠে দাঁড়াল৷ চণ্ডী উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠে বলল—মামাবাবু, হয় এ বাড়িতে আপনার চাকর থাকবে, না হয় আমি থাকব৷ শেষ পর্যন্ত আমি অনেক সাধাসাধি করে চণ্ডীকে নিয়ে আমার চেনা একটা নার্সিংহোমে গেলুম৷ কারণ, ওর সারা গায়ে ভীষণভাবে ছড়ে গিয়েছিল৷ তাই ওকে ভর্তি করতে হয়৷
কর্নেল শুনতে শুনতে গম্ভীর হয়ে বললেন—আপনার চাবি কোথায় থাকে যে চণ্ডীবাবু সহজেই ঘর খুলতে পারেন?
বারীনবাবু বললেন—এক সেট চাবি, যেগুলো খুবই মূল্যবান জিনিসপত্র আছে এমন ঘরের জন্য৷ ধরুন, ওই দেয়াল-আলমারিটা কিংবা আয়রন চেস্টটা বা এই ঘর, পাশের ঘর—এসব ঘরের চাবি আমি আমার ট্যাঁকেই গুঁজে রাখি৷ আর ফালতু জিনিস আছে এমন ঘরের চাবি ওই দেখুন দেয়ালের পেরেকে ঝুলছে৷
এইসময় রঘুর বউ সুশীলা পর্দার বাইরে থেকে একটু কেশে বলল—বাবুসায়েব, আমার কিছু কথা আছে৷
বলেই সে পর্দা তুলে ভিতরে ঢুকে পড়ল৷ তারপর কর্নেল ও আমাকে নমস্কার করে মেঝেয় কার্পেটের উপর উবু হয়ে বসল৷ তারপর সে চাপা স্বরে বলল—স্বপন হাজরাকে আপনি গুলি করেছেন৷ তার এক শাগরেদ, ডাক নাম তার হাবল, তাকে একটু আগে ওই চারতলা বাড়ির ছাদের উপর দেখলাম৷ সে আপনার বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে৷ তার দু’চোখে কালো ঠুলির মতো কী একটা যন্তর৷
কর্নেল বললেন—হ্যাঁ, বাইনোকুলার৷ তো সে কী এখনও ওখানে আছে?
সুশীলা বলল—রাত্রিবেলা অল্প একটু আলো পড়েছিল ছাদে৷ তাতেই তাকে দেখে চিনতে পেরেছি৷ কিন্তু আমাকে দেখেই সে চিলেকোঠার ছাদ থেকে তক্ষুনি নেমে গেল৷
বারীনবাবু বললেন—ওই বজ্জাতটার নাম আমি জানি৷ গলাকাটা স্বপন হাজরার চেয়ে সে খুবই বেপরোয়া৷ তবে লালবাজারে পুলিশের খাতায় ওর নাম আছে৷
সুশীলা উঠে দাঁড়িয়ে বলল—আমার বড্ড ভয় করছে বাবুসায়েব৷ আমার স্বামীর উপর হয়তো সে হামলা করতে পারে৷
কর্নেল জিগ্যেস করলেন—কেন? রঘুর উপর তার বেশি রাগ কেন?
সুশীলা বলল—একদিন আমার স্বামীর সঙ্গে এই দুষ্ট বজ্জাতটা তামাশা করতে গিয়েছিল৷ সে ওকে এক ঘুষিতে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল৷ আমার স্বামীর স্বভাব বাবুসায়েব—কোনো বজ্জাতকে সে সহ্য করতে পারে না৷ তার সঙ্গে তামাশা করতে এলেই ঘুষি খায়৷
সুশীলা চলে যাওয়ার পর কর্নেল বললেন—আপনার নীচের ওই ঘরটার চাবি খুলে নিয়ে আপনার লুকোনো চাবির রিং-এ ঢুকিয়ে নিন৷ আর একটা কথা—আমার ইচ্ছা, ওই নীচের ঘরটা পরীক্ষা করে দেখব৷ তবে এই রাত্রিবেলা নয়৷ কাল দিনের দিকে৷ আপনাকে টেলিফোন করেই আসব৷ আপনি এবার খুব সতর্ক থাকবেন৷ আপনার রিভলবারটা কাছেই রাখবেন৷ আমার ধারণা, ওদের দলের লিডারকে গুলি করেছেন—এর প্রতিশোধ ওরা নিতে চাইবে৷
বারীনবাবু বললেন—এ-যাবৎকাল অনেক দুর্ধষ গুন্ডাকে আমি শায়েস্তা করেছি৷ আত্মরক্ষার জন্য আমি সবসময় তৈরি থাকি৷ তবে রঘু আর চণ্ডীর মারামারির ব্যাপারটা আমার কাছে হেঁয়ালি মনে হয়েছে৷ সে-জন্য আপনাকে আসতে বলেছিলাম৷
কর্নেল বললেন—কাল সকাল ন’টা-দশটার মধ্যে এসে আমি ঘরটা পরীক্ষা করব৷ হয়তো ওই ঘরটাই নয়, নীচের তলার আপনার আরো কয়েকটা ঘর আছে৷ সেগুলোও আমি একটু দেখতে চাই৷
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে দেখি আমাদের হালদারমশাই আপেক্ষা করছেন৷ কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে তাঁর দিকে ঘুরে বললেন—আশা করি খবরটা জোগাড় করতে পেরেছেন৷
হালদারমশাইয়ের কপাল, গলা এবং হাতের সেই পট্টি তেমনই আছে৷
একটু হেসে বললেন—হ্যাঁ, বউবাজারের বিখ্যাত জুয়েলার চন্দ্র অ্যান্ড সন্স-এর মালিক হরনাথবাবু তো একসময় আমার ক্লায়েন্ট ছিলেন৷ তাঁর হারানো বিশ লাখ টাকা দামের জুয়েলারি আমি উদ্ধার করে দিয়েছিলুম৷ এখন আমি তাঁর বাড়ি থেকেই আসছি৷
ষষ্ঠীচরণ পর্দার ফাঁকে মুখ বাড়িয়ে বলল—বাবামশাই, আবার কি কফি হবে?
কর্নেল বললেন—হালদারমশাইকে খাইয়েছিস তো?
হালদারমশাই সহাস্যে বললেন—আমাকে দেইখ্যাই ষষ্ঠীচরণ স্পেশ্যাল কফি সার্ভ করছিল৷ একটু আগে কাপ লইয়া গেছে৷
কর্নেল বললেন—তাহলে ষষ্ঠী, আমার জন্য কফি আন৷ আর জয়ন্ত, তুমি বোধহয় এখন কফির বদলে চা খেতেই চাইবে৷
হালদারমশাই পকেট থেকে নস্যির ডিবে বের করে এক টিপ নস্যি নিলেন৷ এবং নোংরা রুমালে নাক মুছে কিছুক্ষণ নস্যির স্বাদ অনুভব করলেন৷ তারপর বললেন—আপনি যা কইছিলেন তাই-ই ঠিক৷ চন্দ্রবাবুর লগে এক ভদ্দরলোকের কথা হইয়া গেছে৷ চেহারার যে ডেসক্রিপশন দিলেন, তাতে মনে হয় তিনি বারীন স্যারের ভাগনা চণ্ডীবাবুই হইবেন৷ এক্সারসাইজ করা বডি, স্পোর্টিং গেঞ্জির আড়ালে বডি দেইখ্যা চন্দ্রবাবুর এইরকম ধারণা হইছে৷ তার চেয়ে বড়ো কথা, উনি উনারে একখান কার্ড দিয়া গেছেন৷ হরনাথবাবু আমারে কার্ডখান দেখাইলেন৷ দেইখ্যাই আমি অবাক৷ তাতে ছাপা আছে—কুমারবাহাদুর বি এন রায়চৌধুরী এবং ঠিকানা—ভবানীপুরের বারীনবাবুরই বাড়ি৷ শুধু ফোন নাম্বারটাই অন্য কারো৷ আমি জিগাইলাম—আপনারে ওই লোকটি কি কিছু বিক্রি করতে চান? চন্দ্রবাবু কইলেন—দুইখান রত্নখচিত কুণ্ডল৷ কুমারবাহাদুরের টাকার দরকার বলেই পূর্বপুরুষের এই দামি রত্ন বিক্রি করতে চাইছেন৷
কর্নেল জিগ্যেস করলেন—তারপর?
—হরনাথবাবু তারে কইয়া দিছেন, উনি কুমারবাহাদুরের বাড়ি গিয়ে জিনিসটা দেখবেন৷
তখন চণ্ডীবাবু ওনারে নিষেধ করেন৷ তার কথা, এমন জিনিস বিক্রি করা তাঁর মতো বিখ্যাত মানুষের কাছে লজ্জার ব্যাপার৷ তাই তিনি তাঁর এজেন্টেরে দিয়া বিক্রি করতে চান৷ ওই নম্বরে ফোন করলে কুমারবাহাদুর জানাইয়া দিবেন কোনখানে রত্ন ওনারে দেখাইবেন৷
আমি বললুম—কিন্তু চণ্ডীবাবুকে তো নার্সিংহোমে বারীনবাবু প্রায় বন্দি করে রেখে এসেছেন৷ তা ছাড়া তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে৷
কর্নেল বললেন—হয়তো চণ্ডীবাবু সেজে তার কোনও চ্যালা চন্দ্র জুয়েলার্সে গিয়েছিল৷ হালদারমশাই, ওই নাম্বারটা কি আপনি টুকে নিয়েছেন?
হালদারমশাই বুকপকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন৷ কর্নেল তখনই টেলিফোন তুলে ডায়াল করলেন৷ তারপর সাড়া এলে মাউথপিসে হাত রেখে আমাকে ইশারা করে দিলেন, তুমি কথা বলো৷ বলা যায় না, যে ফোন ধরেছে সে আমার কণ্ঠস্বর চিনতে পারে৷
রিসিভার নিয়ে সাড়া দিলুম৷ গলাটা ভরাট করে বললুম—আমি কি কুমারবাহাদুর বি এন রায়চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলছি?
জবাব এল—হ্যাঁ
কণ্ঠস্বর আরো ভরাট করে বললুম—আমি জুয়েলার হরনাথচন্দ্র বলছি৷ আপনি আপনার পূর্বপুরুষের দু’খানা খুব দামি রত্ন বিক্রি করতে চান৷ এ খবরটা কি ঠিক?
জবাব এল— হ্যাঁ, ঠিক৷ কিন্তু আপনার গলা শুনে তো মনে হচ্ছে না যে জুয়েলার হরনাথ চন্দ্র কথা বলছেন?
—আমি চন্দ্র মশায়ের এজেন্ট৷ আপনি রত্ন দুটি বিক্রি করতে হলে ভবানীপুরে সতীকান্ত লেনে শিবমন্দিরের কাছে আসবেন৷ ওখানে রত্ন যাচাই করে তারপর কথা হবে৷ আপনি কাল দশটা নাগাদ আসতে পারেন৷ মন্দিরের কাছে বটগাছের পেছনে একটা পার্ক আছে৷ ওই পার্কের বেঞ্চিতে আমি অপেক্ষা করব৷
—ঠিক আছে, সেই কথাই রইল৷
রিসিভার রেখে কর্নেলকে কথাগুলো জানালুম৷ কর্নেল বললেন—হরনাথ চন্দ্র যেমন হালদারমশাইকে চেনেন, তেমনই আমাকেও চেনেন৷ আমিও ওঁর একটা কেস হাতে নিয়েছিলাম৷ সাঙ্ঘাতিক ডাকাতির কেস৷ শেষ মুহূর্তে ডাকাতগুলোকে পুলিশ পাকড়াও করেছিল৷ কাজেই আমি হরনাথবাবুকে টেলিফোন করছি৷
কর্নেল নোটবই খুলে একটা নাম্বারে ডায়াল করলেন৷ তারপর সাড়া বললেন, মিঃ চন্দ্র আছেন কি? ...বলুন, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার কথা বলবেন... মিঃ চন্দ্র, নমস্কার, নমস্কার৷ মিঃ হালদারের কাছে একটা রত্ন কেনাবেচার খবর পেলুম, আপনি কি কুমারবাহাদুরকে ফোন করেছিলেন... করেননি? ঠিক আছে, ফোন করার দরকার নেই৷ আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি,ভবানীপুরে সতীকান্ত লেনে একটা শিবমন্দির আর এক প্রকাণ্ড বটগাছ আছে৷ ওখানে বটগাছের পিছনের পার্কে একটা বেঞ্চি আছে৷ ওই বেঞ্চে কাল সকালে এক ভদ্রলোক আপনার জন্য বসে থাকবেন... না, না, আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই, আমি বটগাছের আড়ালে থাকব... তার হাতে সত্যিই দুটো রত্নখচিত কুণ্ডল আছে কিনা জানা দরকার৷ আপনি বলবেন আপনার এজেন্টের সঙ্গে কথা হয়েছে গত রাতে৷ আপনি ওটি দেখান...তার বেশি কিছু কথা বলবেন না৷... না, না, আমি বটগাছের আড়ালেই থাকব, আপনি ভয় করবেন না৷ প্রয়োজনে আমি অ্যাকশন নেব...৷
রিসিভার রেখে কর্নেল বললেন—আমি ভাবতে পারিনি এত শীগগির মিঃ রায়চৌধুরীর পূর্বপুরুষের সম্পদ বিক্রি হয়ে যাবে আর উনি জানতেও পারবেন না৷ অবশ্য উনি ভেবেছেন হয়তো এমন জায়গায় ওই রত্নদুটো লুকোনো আছে তার সন্ধান কেউ পাবে না৷ কারণ তিনি নিজেও তো তার খোঁজ পাননি৷ জয়ন্ত, সম্ভবত কাল সকাল দশটার মধ্যেই এই জটিল রহস্যের পর্দা উঠবে৷ এর সঙ্গে ওই পাড়ার জিমখানার কোন লোক যে জড়িত আছে, তাও ফাঁস হয়ে যেতে পারে৷
গোয়েন্দাপ্রবর হালদারমশাই বেরিয়ে যাওয়ার পর এবার আমি উত্তেজিত ভাবে বললুম—এতক্ষণ একটা কথাও জিগ্যেস করিনি৷ চুপচাপ আপনার সব কথা শুনেছি এবং আমাকে যা করতে বলেছেন, তা-ও মেনেছি৷ এবার কিন্তু আমি তির ছুঁড়ব!
কর্নেল হাসলেন—ছোঁড়ো! বলে তিনি চুরুটে টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া ছাড়লেন৷
—প্রথমত, আপনি কেমন করে জানলেন চন্দ্র জুয়েলার্সকে চণ্ডী সেজে কেউ রত্ন বিক্রির প্রস্তাব দেবে?
—নেহাত অঙ্ক কষেছিলুম৷
—বুঝলুম না৷
—রঘুবীর বেপরোয়া হয়ে তার মনিবের ভাগ্নেকে এমন মার মেরেছে যে, তাকে নার্সিংহোমে পাঠাতে হয়েছে এবং পাঠিয়েছেন স্বয়ং তার মামাবাবু৷ এমন কি গুণধর ভাগ্নে যাতে ওখানে বন্দি থাকে, গোপনে সে-ব্যবস্থাও করেছেন৷ আমার সন্দেহের কাঁটা এখান থেকেই বিঁধছিল৷ মামাকে রাগের চোটে ভাগ্নে নিশ্চয়ই বলেছে, রঘু রাজবাড়ির পূর্বপুরুষের রত্নদুটোর খোঁজ পেয়েছিল৷ সেটা ছিল ওই পুরনো আসবাবে ঠাসা ঘরে৷ তাই সে খুরপির বাঁটের কাঠ জোগাড়ের ছলে ও-ঘরে ঢুকেছিল৷ কিন্তু চণ্ডী ওত পেতে থাকত৷ নিশ্চয় তেমন কিছু সে আগে থেকে অনুমান করত৷ এবার গতকাল হঠাৎ রঘুর বউ সুশীলা বাড়িতে হাজির হল৷ আমার ধারণা, আমাদের নেমন্তন্নের প্রস্তাবটা রঘুই দিয়েছিল, যাতে তার বউ ওই বাড়িতে আসে৷ ব্যস! চণ্ডীর সন্দেহ বেড়ে যাওয়ার কথা৷ এবার রঘু রত্নদুটো হাতিয়ে বউকে পাচার করবে৷
শুনতে শুনতে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলুম৷ বললুম—আপনার অঙ্কটা কিন্তু খুব সরল অঙ্ক৷
কর্নেল দাড়ি থেকে চুরুটের ছাই ঝেড়ে ফেলে বললেন—সরল কেন? এটাই তো স্বাভাবিক৷ ভাগ্নে অত মার খেয়েও রঘুকে রত্ন দেয়নি৷ এবার মামাকে সম্ভবত রত্ন দুটো দেখিয়েছে৷ তাই বুদ্ধিমান মামা নার্সিংহোমের লোকেদের পাহারার ব্যবস্থা করেছেন৷
—কিন্তু বারীনবাবুর তা হলে তো রঘুর উপর রাগ হওয়ার কথা৷
—পরে কী হবে জানি না৷ রঘু যে এতকালের খোয়া রত্ন উদ্ধার করেছে, এজন্য বারীনবাবুর মনে পুরাতন ভৃত্যের প্রতি দুর্বলতা স্বাভাবিক৷
—বারীনবাবু তা হলে ভাগ্নের কাছ থেকে রত্নদুটো চেয়ে নেননি কেন?
কর্নেল হাসলেন—কী মুশকিল! ভাগ্নে তা তাঁকে দিলে তো? পালোয়ান ভাগ্নে মার যতই খাক, বারীনবাবুকে সে এক ধাক্কায় চিৎপাত করে দিতেও পারে৷ গোঁয়ার চণ্ডীচরণের মতো ছেলেকে বাগে আনতেই বারীনবাবু আমাকে সম্ভবত ডেকেছিলেন৷ কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, চণ্ডী তাঁকে নিশ্চয় নিষেধ করেছিল, আমি যেন এ বিষয়ে কিছু না জানি৷
এই সময় টেলিফোন বাজল৷ কর্নেল বললেন—ফোনটা ধরো জয়ন্ত৷ চুরুটটা আবার নিভে গেছে৷
রিসিভার তুলে সাড়া দিতেই বারীনবাবুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল৷—কর্নেলসায়েব আছেন নাকি৷ আমি বারীন বায়চৌধুরী বলছি৷ জরুরি কথা আছে৷
ইচ্ছে করেই বললুম—আমি জয়ন্ত চৌধুরী৷ কর্নেল বাথরুমে৷ আপনি আমাকে বলতে পারেন৷
—বজ্জাত চণ্ডীটা নার্সিংহোম থেকে পালিয়েছে৷ ওরা বলছে, পিছনদিকের পাইপ বেয়ে নেমে গেছে৷
—কী আশ্চর্য! চণ্ডীবাবুর পালিয়ে যাওয়া মানে রত্নদুটো... কর্নেল আমার হাত থেকে রিসিভার ছিনিয়ে নিয়ে বললেন—বলুন মিঃ রায়চৌধুরী৷... হ্যাঁ৷ জয়ন্তের মুখে কথাটা শুনেই দৌড়ে এলুম৷... আমার কথা শুনুন৷ এ নিয়ে চিন্তা করবেন না৷ নার্সিংহোমের লোকেরা সম্ভবত ঠিক বলছে না৷ চণ্ডীবাবু দিনের বেলায় কোনো একসময় পালিয়েছেন৷...না৷ ওদের দোষ নেই৷...না৷ চণ্ডীবাবুর জন্য ভাববেন না৷ নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ুন৷ আমি কথা দিচ্ছি, কাল সকাল দশটার মধ্যে আপনার পিতৃপুরুষের রত্নদুটো উদ্ধার করে দেব৷...না৷ আমি জাদুবিদ্যা জানি না৷...হ্যাঁ৷ আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন৷ এত রাতে আর কথা বলার অর্থ হয় না৷ রাখছি৷
রিসিভার রেখে কর্নেল হেলান দিয়ে টাকে ও দাড়িতে হাত বুলোতে থাকলেন৷
সে রাতে উত্তেজনার দরুন ঘুম আসতে দেরি হয়েছিল৷ এতকাল পরে এই প্রথম বুঝতে পেরেছিলুম, একজন অলস সাংবাদিকের পক্ষে একটা ক্যামেরাও থাকা জরুরি৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার নিউজ ব্যুরোর চীফ সত্যদা কবে আমাকে কর্নেলের ক্যামেরার উপর ভরসা না করে নিজের জন্য একটা ক্যামেরা সবসময় সঙ্গে রাখার কথা বলেছিলেন৷ যা ঘটতে চলেছে, তার টুকরো টুকরো দৃশ্য ক্যামেরায় তুলে রাখলে আমার রিপোর্টাজ কত উজ্জ্বল হয়ে পাঠকের সামনে ধরা দিতে পারে!
ঘুম ভাঙল যষ্ঠীচরণের ডাকে৷ তার হাতে বেড-টি৷ তখনই বিছানায় উঠে বসে চায়ের কাপ-প্লেট নিলাম৷ তারপর বললুম—তোমার বাবামশায় বুঝি ছাদের বাগানে?
ষষ্ঠী বলল—না দাদাবাবু, একটা ফোন এসেছিল৷ উনি তখনই বেইরে গেছেন৷ বলে গেছেন, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে আসবেন৷
ব্যাপারটা গোলমেলে ঠেকছে৷ হঠাৎ কে তাঁকে ফোন করে ডাকল আর উনি অমনি তখনই বেরিয়ে গেছেন৷ যা ঘটবার কথা তাতে কি কোনো গণ্ডগোল হয়েছে! যাক গে, চিন্তা করে লাভ নেই৷ বেড-টি খেয়ে বাথরুমে নিত্যকর্ম সেরে নিয়ে ড্রয়িংরুমে গেলুম৷ সেন্টার টেবিলে ততক্ষণে অনেকগুলো ইংরেজি, বাংলা খবরের কাগজ এসে গেছে৷ কাগজগুলোর প্রত্যেকটার প্রথম পাতায় চোখ বুলিয়ে নিলুম৷ সবই গতানুগতিক খবর৷ রাজনৈতিক টক-ঝাল-মিষ্টি আর নেতাদের ভাষণ৷ ‘দৈনিক সত্যসেবকে’র ভিতরের পাতাগুলোতেও চোখ বুলিয়ে নিলুম৷ নাহ, কুণ্ডলসংক্রান্ত কোনো খবরই নেই৷ একটু পরে বেল বাজল৷ ষষ্ঠী দরজা খুলে দিতে গেল৷ হালদারমশাই একেবারে রেডি হয়ে চলে এসেছেন৷ ধপাস করে বসে বললেন—কর্নেল স্যার কই গেলেন?
একটু থেমে বললুম—হালদারমশাই, মনে হচ্ছে সকাল দশটার প্ল্যান বোধহয় বদলে গেছে৷
হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন—ক্যান, ক্যান? বদলাইল কেডা?
বললুম—তা জানি না৷ কর্নেল কার ফোন পেয়ে ভোরবেলা বেরিয়ে গেছেন৷ তাই আমার মনে হচ্ছে, কিছু ব্যাঘাত ঘটেছে৷ অবশ্য কর্নেল কখন গেছেন আমি জানি না, এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরবেন বলে গেছেন৷
গোয়েন্দাপ্রবর ঘড়ি দেখে বললেন—প্রায় আটটা বাজে৷ চন্দ্রমশাইরে ফোন করুম নাকি?
বলে তিনি রিসিভারের দিকে হাত বাড়াতেই পর্দা তুলে কর্নেলের নিঃশব্দ আবির্ভাব ঘটল৷ সদর দরজার ল্যাচ-কি বাইরে থেকে চাবি দিয়ে খুলে ঢুকেছেন৷ কাজেই ঘণ্টা বাজানোর দরকার হয়নি৷ তিনি সহাস্যে বললেন—মর্নিং হালদারমশাই! মর্নিং জয়ন্ত৷ তা হালদার মশাই কি হরনাথ চন্দ্রকে ফোন করতে যাচ্ছিলেন?
হালদারমশাই কাঁচুমাচু হেসে বললেন—কার ফোন পাইয়া বারাইছেন শুনলাম৷ তাই ভাবলাম, চণ্ডীবাবু প্ল্যান বদলাইল নাকি?
কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে প্রথমে হাঁক দিলেন—ষষ্ঠী, কফি! তারপর টুপি খুলে রেখে বললেন—আপনি চৌত্রিশ বছর পুলিশে চাকরি করেছেন৷ অবসরের আগে গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর ছিলেন৷ কাজেই আপনার অঙ্কে ভুল হতে পারে না৷ হ্যাঁ, চণ্ডীবাবু প্ল্যান বদলেছেন৷ আমি মিঃ হরনাথ চন্দ্রের টেলিফোন পেয়েই বালিগঞ্জ প্লেসে তাঁর বাড়িতে গিয়েছিলাম৷ জয়ন্তের গাড়ি চুরি করিনি৷ বেড-টি-র আগে তার দৈবাৎ ঘুম ভাঙলে মেজাজ খারাপ হয়ে যেত৷
হাসতে হাসতে বললুম, না, না, আপনি বলুন৷
কর্নেল বললেন—চণ্ডীবাবুর গার্জেন আছে৷ তারা সেয়ানা লোক৷ প্রকাশ্যে ওইভাবে পার্কের মধ্যে টাকা লেনদেন করা বিপজ্জনক, তা তারা বোঝে৷
বললুম—তারা কারা, তা জানতে পেরেছেন?
কর্নেল বললেন—সেই যে গলাকাটা স্বপনের গার্জেন এক কাউন্সিলার ভদ্রলোক৷ তাঁর ছোটোভাই তপন, এলাকায় তপু বলে পরিচিত৷ সে চণ্ডীবাবুদের জিমখানার সেক্রেটারি৷ নিজে ডন বৈঠক করে না বা মুগুরও ভাঁজে না৷ শুধু নাকি বার ধরে ঝোলাঝুলি করে৷ যাই হোক, চন্দ্রমশাইকে প্রথমে চণ্ডী ফোন করে ভোরবেলায়৷ তারপর সে বলে আমাদের ক্লাবের সেক্রেটারি তপুবাবু আপনার সঙ্গে কথা বলবেন৷ এই তপুবাবুকে চন্দ্রমশাইও চেনেন৷ বউবাজার এলাকায় সে প্রায়ই গয়না বিক্রি করে৷ যাই হোক, তপুবাবু বলে, এমন প্রকাশ্য জায়গায় দরাদরি বা টাকা লেনদেন ঠিক হবে না৷ বরং চন্দ্রমশায়ের বাড়িতেই সেটা ভালো হবে৷ হ্যাঁ, সে হরনাথ চন্দ্রকে ভালোই চেনে৷ বহুবার তাঁকে চোরাই গয়না বিক্রি করে ঝামেলায় ফেলেছে৷ কিন্তু এই কুণ্ডলের ব্যাপারটার ব্যাকগ্রাউন্ড হালদারমশাই সবিস্তারে চন্দ্রমশাইকে বলেছেন—
এইসময় তিনকাপ কফি আর এক প্লেট চানাচুর ট্রে-তে করে ষষ্ঠীচরণ রেখে গেল৷ হালদারমশাইয়ের কাপটা চেনা সহজ৷ কারণ, তাতে দুধের ভাগ বেশি৷ তিনি তাঁর কাপ তুলে নিয়ে বললেন—মিঃ চন্দ্র ঠিক কইছেন৷ আমি কর্নেল সাহেবের লগে যতখানি জানি সব কইয়া দিছি তেনারে৷
কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন—সময় ঠিকই থাকছে৷ বেলা দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে৷ যে কোনো সময় সেই তপন রায় বা তপু, চণ্ডীকে নিয়ে যাবেন বালিগঞ্জ প্লেসে৷ আমি মিঃ চন্দ্রকে বলে এলুম, আমরা দশটার আগেই ওখানে পৌঁছে যাব৷ তবে পাশের ঘরে লুকিয়ে থাকব৷
জিগ্যেস করলুম, নরেশবাবুকে ব্যাপারটা জানিয়েছেন?
কর্নেল বললেন—মিঃ চন্দ্র নিজেই ওঁকে জানিয়েছেন৷ আসলে মিঃ চন্দ্র একজন খ্যাতনামা জুয়েলার৷ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জুয়েলারদের সঙ্গে তাঁর কাজ-কারবার৷ অনেক ঐতিহাসিক রত্ন তিনি কেনাবেচা করেছেন৷ কিন্তু এই কেসে ব্যাপারটা অন্যরকম৷ চন্দরপুরীর রাজবংশের কথা মিঃ চন্দ্র ভালোই জানেন৷ তিনি বারীন রায়চৌধুরীর বন্ধু৷ একসঙ্গে স্কুল-কলেজে পড়েছেন৷ বারীনবাবুর সঙ্গে তিনিও কত দুর্গম জঙ্গলে গেছেন৷ না—তিনি নিজে শিকারি নন, কিন্তু বন্ধুর শিকার করা দেখে খুব আনন্দ পেতেন৷
বললুম, কী আশ্চর্য! এতসব ব্যাপার এই কেসের পেছনে আছে ভাবতে পারিনি৷ মনে হচ্ছে, এটা আকস্মিক যোগাযোগ নয়৷
কর্নেল বললেন— না, মিঃ রায়চৌধুরীর কাছেই তাঁর বংশের ওই দুটি বহু মূল্যবান কুণ্ডলের কথা মিঃ চন্দ্র শুনেছিলেন৷
বলে কর্নেল ঘড়ি দেখলেন৷ তারপর বললেন—ষষ্ঠী, আর আধঘণ্টার মধ্যে আমরা তিনজনেই ব্রেকফাস্ট করব৷
ব্রেকফাস্ট শেষ হল সওয়া-নটার মধ্যে৷ তারপরই আমরা সেজেগুজে বেরিয়ে পড়লুম৷ আমার গাড়িতে বালিগঞ্জ প্লেসে যেতে লাগল মাত্র মিনিট কুড়ি৷ মিঃ চন্দ্র আমাদের প্রতীক্ষা করছিলেন৷ তিনি তাঁর গাড়ি-বারান্দার তলা দিয়ে আমার গাড়িকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বাড়ির পেছনে রাখতে বললেন৷ গাড়ি-বারান্দার তলা থেকে সোজা এগুলেই ওঁর নিজস্ব তিনটে গাড়ির গ্যারাজ৷ বাড়ির পিছনে টেনিস কোর্ট৷ দেখলুম, একজন যুবক ও একজন যুবতী টেনিস খেলায় মেতে আছে৷ মিঃ চন্দ্র বাড়ির পূর্বদিকের বারান্দায় উঠে একটা ঘরে গেলেন৷ বললেন—এই ঘরটায় আপনারা বসুন৷ এর পাশের ঘরটা ড্রয়িংরুম৷ লালবাজারের মিঃ নরেশ ধর প্লেন ড্রেসে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ড্রয়িংরুমের ওপাশের ঘরে আধঘণ্টা আগে এসে গেছেন৷ আপনারা বাইরে কোথাও কালো রঙের পুলিশ ভ্যান দেখতে পাননি?
কর্নেল বললেন—দেখেছি৷ একটু দূরে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে৷
মিঃ চন্দ্র বললেন— নরেশবাবুরা চা-কফি সব খেয়েছেন৷ আপনাদের জন্য কফি না চায়ের আয়োজন করব?
হালদারমশাই আর আমি একসঙ্গে বললাম—চা৷
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন—ঠিক আছে, আমিও চা—৷
কিছুক্ষণ পরে চা এসে গেল৷ একটি লোক আমাদের দিকে কেমন চোখে তাকাতে তাকাতে চায়ের ট্রে রেখে গেল৷ আমার মনে হল, বাড়িতে একটা কিছু ঘটবে, তা সে অনুমান করেছে৷ কিন্তু বুঝতে পারছে না৷
এ সময় পাশের ঘরে মিঃ চন্দ্রের জোরালো কণ্ঠস্বর শোনা গেল—আসুন, আসুন৷ আসতে আজ্ঞা হোক৷ তপনবাবুর সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা হল৷ আর চণ্ডীবাবু, প্ল্যান বদলে আপনারা ভালোই করেছেন৷ এইসব কারবার অনেকসময় আমি নিজের বাড়িতে বসেই করি৷ প্রচুর টাকা-পয়সার ব্যাপার৷ যাই হোক, আগে চা খান৷
দুজনেই একসঙ্গে বলল— না, না, চা খাব না৷ আগে মালটা দেখুন৷ দাম ঠিক করুন৷ তারপর কথা৷
আমাদের হাত তিনেক দূরে বাঁ-দিকের দরজা৷ দরজায় পুরু পর্দা ঝুলছে৷ এর পর বেশ কিছুক্ষণ পাশের ঘরে চাপা স্বরে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছিল৷ কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না৷ একসময় তপনবাবুর কথা শোনা গেল৷
—বলেন কি চন্দ্রবাবু? এই ঐতিহাসিক রত্নের মূল্য কি টাকা দিয়ে কেনা যায়? এর সম্মানমূল্য কয়েক কোটি টাকা৷ আপনি সেখানে পঞ্চাশ লাখ অন্তত দিন৷
মিঃ চন্দ্রের কণ্ঠস্বর শোনা গেল৷ আচ্ছা—বলছেন যখন তখন তাই-ই হবে৷ তবে ক্যাশ পঞ্চাশ লাখ এখন নেই৷ লাখ তিরিশ আছে৷ সব হাজার টাকার নোট৷ বাকি কুড়ি লক্ষ ব্যাংক থেকে আমি লোক পাঠিয়ে আনাচ্ছি৷ ব্যাংক খুলে গেছে৷ আমি টেলিফোন করব, অসুবিধা হবে না৷ আপনারা ততক্ষণ জিনিসপত্র আমাকে দিন আর দু’জনে ভাগ করে টাকা গুনতে থাকুন৷
বলে তিনি বিকট হাই তুলে বলে উঠলেন—হরি হে, রক্ষে করো! অমনি কর্নেল, পকেট থেকে রিভলবার বের করলেন৷ হালদারমশাইও তাঁর অস্ত্র বের করলেন৷ আমাকেও বের করতে হল৷ কেননা, বুঝতে পেরেছিলুম, হরি হে, রক্ষা করো—এই কথাটা মিঃ চন্দ্রের সংকেত বাক্য৷
প্রথমে কর্নেল, তার পেছনে হালদার—মশাই, তার পেছনে আমি৷ ঘরে ঢুকে দেখি, উজ্জ্বল আলো৷ আর নরেশবাবু দু’জনের নাকের ডগায় রিভলবার ধরে দাঁড়িয়ে আছেন৷ তাঁর চার-পাঁচজন সঙ্গীও মোতায়েন৷ সব মিলিয়ে সাত-আটখানা আগ্নেয়াস্ত্র৷ আর মাঝখানে মিঃ চন্দ্র কাঁচুমাচু মুখে বলছেন, ওরে বাবা, এ আবার কী হল?
তাঁর হাতে একটা ছোটো কৌটো৷ কালো রঙের কৌটোর উপরে হুতুম পেঁচার মূর্তি৷ কর্নেল খপ করে সেটা কেড়ে নিলেন৷ তখনও মিঃ চন্দ্র ওরে বাবা, এ কী হল বলে আর্তনাদ করছেন৷ নরেশবাবু তপুর কলার চেপে ধরে এক ঝাঁকুনিতে দাঁড় করালেন৷ তারপর তাগড়াই চেহারার এক সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বললেন—হাতকড়াটা হাত দুটো পেছনের দিকে টেনে পরিয়ে দাও৷ এ ব্যাটাছেলের প্যান্টের পকেটের ভিতর আর্মস আছে৷ চণ্ডীবাবু গম্ভীরমুখে বসে ছিলেন৷ সগর্জনে বললেন—আমার মামার সম্পত্তি৷ আমার মামা নিঃসন্তান৷ কাজেই ওটা আমার প্রাপ্য৷ আপনি কর্নেল আর যেই-ই হোন ওটা আমাকে ফেরত দিন৷ বলে, তিনি দাঁড়িয়ে গায়ের গেঞ্জি খুলে ফেললেন৷ পেশি ফোলাতে লাগলেন৷ দু’ হাত দাগড়া দাগড়া হয়ে উঠল৷ হাস্যকর এই দৃশ্য দেখে হালদারমশাই খি খি করে হেসে উঠলেন৷ বললেন—ওই মাংসগুলো আইল কোথা থেকে জয়ন্তবাবু৷ এখানে তো ছিল না৷ বুকের মধ্যে দুইখান মাংস আইয়া পড়ল৷ বুঝতে পারলুম উনি হাসি চাপছেন৷ এমন কী মিঃ চন্দ্র ‘ওরে বাবা, এ কী কাণ্ড!’ বলে হেসে ফেললেন৷
আমি ভাবছিলুম, সর্বনাশ! এই সাঙ্ঘাতিক দৈত্যকে তো গুলি করা যাবে না৷ সেটা ক্রিমিন্যাল অফেন্স হবে৷ একে সামলানো যাবে কী ভাবে?
ওই অবস্থায় দানবরূপী চণ্ডীবাবু কর্নেলের দিকে এগোলেন৷ কর্নেলের কাছাকাছি যেতেই তিনি এক পা তুলে তার পেটের নীচের দিকে কোথায় যেন জুতোর গুঁতো মারলেন৷ অমনি দানবটা বাবা গো, বলে ধপাস করে মেঝেয় লুটিয়ে পড়ল৷ আর নরেশবাবুর আর-এক পালোয়ান সঙ্গী চণ্ডীবাবুর দুটো হাতে দড়ি বেঁধে দড়ির একটা অংশ কোমরের সঙ্গে জড়িয়ে দিলেন৷ আর তাকে কাতুকুতু দিতে থাকলেন৷ আর অমনি ব্যায়ামবীর গেছি রে বাবা, গেছি রে বাবা বলে চিৎকার করে উঠল৷ আর তখন চন্দ্রবাবু ৩০ লক্ষ টাকার বান্ডিল ব্যাগে পুরে ফেললেন৷
এদিকে নরেশবাবু বললেন, —আমাদের ভ্যানটা ঢোকার ব্যবস্থা করতে হবে৷
পকেট থেকে ওয়াকিটকি বের করে দুর্বোধ্য ভাষায় ভ্যান ডাকলেন৷ তারপর সশস্ত্র পুলিশ গাড়ি-বারান্দায় এসে উঠল গাড়ি নিয়ে৷ নরেশবাবু বললেন, —আসি কর্নেল৷ পরে দেখা হবে৷
পুলিশ বাহিনী বিদায় নেওয়ার পর হরনাথবাবু বললেন—প্লিজ একটু বসুন৷ আমি টাকাগুলো যথাস্থানে রেখে আসি৷ তারপর কথা হবে৷
সেইসময় সদর দরজা দিয়ে মিঃ বারীন রায়চৌধুরী হন্তদন্ত ঘরে ঢুকে বললেন—কুণ্ডল উদ্ধার হয়েছে তো কর্নেল সাহেব?
কর্নেল বললেন—আপনি বসুন৷
একটু পরে হরনাথ চন্দ্র ফিরে এসে বারীনবাবুকে বললেন—এত বলেও তোমাকে কোনোদিন আমার বাড়িতে আনতে পারিনি৷ আজ কেমন! কথায় বলে মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল৷ আজ কেমন সুড়সুড় করে চলে এসেছ৷
বারীনবাবু সহাস্যে বললেন—খালি হাতে আসিনি৷ বলে মুখ ফিরিয়ে রঘুকে ডাকলেন৷ বললেন—ওরে রঘুয়া, তোর চন্দরবাবুজিকে ভেট দে৷
দেখলুম, সেই রঘুয়ার মাথায় সিল করা প্রকাণ্ড মাটির হাঁড়ি৷ সে সেটা হরনাথবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—প্রণাম হুজুর৷
হরনাথবাবু ডাকলেন—এই প্রহ্লাদ, এই হাঁড়িটা নিয়ে যা৷ তোর গিন্নী ঠাকুরনকে দিবি৷
এবার কর্নেল তাঁর হাতে সেই হুতুমপেঁচা আঁকা কৌটো দেবার আগে সাবধানে খুললেন৷ অমনি আশ্চর্য ব্যাপার! ঘরের আলো যেন দ্বিগুণ উজ্জ্বল হয়ে উঠল৷ দুটো মার্বেল গুলি আকারের রঙ-বেরঙের রত্নখচিত কুণ্ডল৷ কিন্তু তাকালে চোখ ঝলসে যাবে৷ বারীনবাবু কৌটো দু’হাতে মুখ বন্ধ করে কপালে ঠেকালেন৷ তারপর তাঁর পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে সহাস্যে বললেন—কর্নেল সাহেবকে তো বকশিস দেওয়ার মতো কিছু নেই৷
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন—আছে, তবে শুধু আমাকে একা দিলে চলবে না৷ আমার দুই সঙ্গীকেও দিতে হবে৷ ওই যে প্রকাণ্ড হাঁড়িতে করে যে জিনিসটা পাঠালেন মিঃ চন্দ্রের গিন্নী দেবীর কাছে, ওখান থেকে এই তিনজনের জন্য তিন প্লেট মিষ্টান্ন আনতে বলুন৷
ঘরে হাসির রোল উঠল৷ হরনাথ চন্দ্র বললেন—সে কথা বলতে আছে! দেখবেন, এখনই সব এসে যাবে৷ আমার মিসেস শুনেছেন, কর্নেল সাহেব এসেছেন৷ কাজেই তিনি নিজেই দক্ষিণা নিয়ে উপস্থিত হবেন৷
কিছুক্ষণ পরে মিসেস চন্দ্র সঙ্গে এক পরিচারিকাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন৷ পরিচারিকার হাতে প্রকাণ্ড ট্রে৷ তার উপর ইয়া মোটা-মোটা রসগোল্লা জাতীয় বস্তু৷
বারীনবাবু মিটিমিটি হেসে বললেন—বাগবাজার থেকে অর্ডার দিয়ে তৈরি৷
আমরা সানন্দে বাগবাজারের রসগোল্লার স্বাদ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লুম৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন