রায়পুরের কিংকং রহস্য

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

এক

নভেম্বর মাসে রবিবারের এক সকালবেলা কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে দেখি, একজন রোগাটে গড়নের ভদ্রলোক কর্নেলের সঙ্গে কথা বলছেন৷ আমাকে দেখে তিনি মুখ তুলে তাকালেন৷ কর্নেল আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, —জয়ন্ত, ইনি হলেন কুমারবাহাদুর অমিতেন্দ্র নারায়ণ রায়৷ সাঁওতাল পরগনায় একসময় এঁদের বিশাল জমিদারি ছিল৷ এখন অবশ্য কুমারবাহাদুর ব্যাবসাবাণিজ্য করতে মন দিয়েছেন৷ গতবছর মার্চে রায়পুরে গিয়ে—

কুমারবাহাদুর কর্নেলকে থামিয়ে সহাস্যে বললেন, —কর্নেলসাহেব গত মার্চে এমন একটা সময়ে গেলেন যে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের পূর্বপুরুষের কিছু কীর্তিকলাপ দেখাবো, সে সুযোগ পাইনি৷ জয়ন্তবাবু, একটু আগে কর্নেলসাহেব আপনার কথাই বলছিলেন৷ শুনে খুব খুশি হলুম যে আপনিও একজন ভ্রমণসঙ্গী৷ এবার কিন্তু কর্নেল সাহেবের সঙ্গে আপনাকেও যেতে হবে৷

আমি তাঁকে নমস্কার করে সোফার এককোণে বসলুম৷ লক্ষ্য করলুম, ভদ্রলোকের গায়ের রং পাতাচাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাসে৷ পরনে টাই স্যুট, পাশেই একটা ব্রিফকেস সোফার ওপর রাখা আছে৷ তাঁর চোখদুটি কেন যেন খুবই তীক্ষ্ণ বলে মনে হচ্ছিল৷ চোখে অবশ্য সোনালি ফ্রেমের চশমা, মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, লম্বা নাক, মাথার চুল কাঁচাপাকা৷ মনে হল ভদ্রলোকের বয়স কর্নেলের কাছাকাছি হলেও তিনি এখনও বেশ শৌখিন৷ অবশ্য ওঁর পাশ দিয়ে আসার সময় উগ্র সেন্টের গন্ধ পেয়েছিলুম৷ কিন্তু উনি যে ভঙ্গিতে চাপাম্বরে কর্নেলের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তাতে মনে হয়েছিল উনি নিছক রায়পুরে বেড়াতে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ করতে আসেননি৷ তাছাড়া কর্নেলের হাতে একটা খয়াটে এবং বিবর্ণ পুরু কাগজ আমার চোখে পড়েছিল৷ সেই কাগজে কীসব লেখা আছে৷ কাগজটা সম্ভবত সেকেলের তৈরি, যাকে একসময় বলা হতো তুলট কাগজ৷ তুলোর সঙ্গে এর কী সম্পর্ক, তা অবশ্য জানি না৷

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, —জয়ন্ত, তুমি কি ভূত-প্রেত যক্ষ-রক্ষ দত্যি-দানোয় বিশ্বাস করো?

আমি কিছু বলার আগেই কুমারবাহাদুর মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটিয়ে বলে উঠলেন, —তাহলে শুনুন জয়ন্তবাবু, আমিও আজীবন অতিপ্রাকৃত কোনও কিছুতে বিশ্বাস করতুম না, কিন্তু এবার বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছি৷

তাঁর মতো অভিজাত মানুষের সঙ্গে রসিকতা করা চলে না, তাই মুখে গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বললুম, —তাহলে বোঝা যাচ্ছে আপনি কর্নেল এবং আমাকে সেই অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে লড়িয়ে দিতে চান?

এবার কুমারবাহাদুর হেসে উঠলেন৷ তারপর বললেন, —ওটা নিছক উপলক্ষ্য মাত্র৷ কর্নেলসাহেব পাখি-প্রজাপতি-অর্কিড-ক্যাকটাস এইসবের নেশায় কোথায়-কোথায় ঘুরে বেড়ান৷ উনি একজন বহুদর্শী মানুষ৷ তবে আমাদের রায়পুরে গিয়ে এবার দুর্লভ প্রজাতির ওইসব জিনিসের চেয়ে আরও দুর্লভ প্রজাতির কিছু দর্শন করতে চান, তাতে তাঁর অভিজ্ঞতা আরও বাড়বে বইকী৷

এবার ষষ্ঠীচরণ ট্রে-তে তিন পেয়ালা কফি নিয়ে এল৷ সেন্টার টেবিলে ট্রে রাখার পর সে কুমার বাহাদুরের দিকে কেমন অবাক চোখে তাকাতে-তাকাতে চলে গেল৷ কুমারবাহাদুর বললেন, —আবার কফি!

কর্নেল বললেন, —কুমারবাহাদুর, কফি ঝিমিয়ে পড়া স্নায়ুকে চাঙ্গা করে৷ আর আপনার স্নায়ুর যা অবস্থা, তাতে কফির চেয়ে ভালো ওষুধ আর নেই৷

আমি কর্নেলের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বললুম,—কুমার বাহাদুরের নার্ভ কি অতিপ্রাকৃত শক্তির আবির্ভাবে ঝিমিয়ে পড়েছে?

কুমারবাহাদুর আবার হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ বুঝলুম, মানুষটি সরল প্রকৃতির৷ কারণ যা বোঝা যাচ্ছে, উনি ভূত-প্রেত যক্ষ-রক্ষ পিশাচ, যাই হোক কোনও একটা অমানুষিক এবং ভয়ংকর কিছুর উপদ্রবে কর্নেলের কাছে ছুটে আসতে বাধ্য হয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর স্বাভাবিক অভ্যাসটি নষ্ট হয়নি৷ তা না হলে এমন প্রাণখোলা হাসি তাঁর পক্ষে সম্ভব হতো না৷ তাঁর এই হাসি আমাকে একটু সাহসী করে তুলল৷ এবার জিগ্যেস করলুম, —কুমারবাহাদুর, আপনি কী নিয়ে ব্যাবসা করেন?

তিনি বললেন,—আজকাল তথ্যপ্রযুক্তির যুগ৷ আমাদের রায়পুরের মতো মফসসল শহরও গত বিশ-ত্রিশ বছরে খুব জমাট হয়ে উঠেছে৷ ইলেকট্রনিক গুডস-এর চাহিদাও বেড়েছে৷ আমার ব্যাবসা এইসব নিয়েই৷

বললুম, —কিন্তু অতিপ্রাকৃত কোনও শক্তি আপনার ব্যাবসার ক্ষতি করতে নেমেছে৷ তাই কি?

কুমারবাহাদুর এবার একটু বিমর্ষ হয়ে বললেন, —ব্যাপারটা তা ঠিক নয়, তবে আমার পৈত্রিক বাড়িতে যা সব ঘটছে, তাতে মনে শান্তি থাকছে না৷ আমার কোনও ছেলে নেই, একটি মাত্র মেয়ে৷ তাই বাছাই করে আহিরগঞ্জের রাজপরিবার থেকে পাত্র ঠিক করেছিলুম৷ আমার মেয়ে কুন্তলা গ্যাজুয়েট৷ আর জামাই গ্যাজুয়েট না হলেও মেধা প্রখর৷ সে চমৎকার ইংরেজি লিখতে পারে৷ তাকে আমি আমার বাড়িতেই রেখেছি৷

কর্নেল সকৌতুকে বললেন, —লোকেরা ঘরজামাইকে নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করে কিন্তু গত মার্চে শোভনই ছিল আমার ভ্রমণসঙ্গী৷ হ্যাঁ—একটা কথা জয়ন্ত জানা দরকার, শোভন একজন দক্ষ রাইফেল শুটার৷ এটাও একটা বড়ো গুণ বইকী৷ সারা-ভারত প্রতিযোগিতায় সে আগের বছর প্রথম স্থান দখল করেছিল৷ তাহলেই বোঝো কুমারবাহাদুরের দৃষ্টি কত প্রখর৷

কুমারবাহাদুর বললেন, —শোভনকে ক্রমে-ক্রমে আমার ব্যবসার কাজে দক্ষ করে তুলছি৷ এখন তার হাতে সব ছেড়ে দিয়ে আমি বিশ্রাম চাই৷

এইসময় আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, —আচ্ছা, কুমারবাহাদুর, রাইফেলে অত দক্ষ জামাই থাকতেও অতিপ্রাকৃত শক্তির এত সাহস যে আপনার ওপর বারবার উপদ্রব করছে!

কুমারবাহাদুর একটু চুপ করে থাকার পর চাপাস্বরে বললেন— জয়ন্তবাবু, আপনার নিশ্চয়ই জানা উচিত, রাইফেলের গুলি দিয়ে কোনো অপ্রাকৃত শক্তিকে মোটেই জব্দ করা যায় না৷

কর্নেল বলে উঠলেন,—ওঃ জয়ন্ত, তুমি আজকাল বড্ড বাচাল হয়ে উঠেছ৷ ওসব কথা থাক৷ শুনুন কুমারবাহাদুর, আপনি ফিরে যান, আমরা যাওয়ার আগে আপনাকে ফোনে জানিয়ে তবে যাব৷ কিন্তু স্টেশনে গাড়ি রাখার দরকার নেই৷ আপনি তো জানেন, আমি পায়ে হেঁটে এক-টানা দশ কিলোমিটার পৌঁছতে পারি৷ আর জয়ন্তও তাই৷ পাহাড়ে চড়ার ব্যাপারে ওর আবার একটা ডিগ্রিও আছে৷

কুমারবাহাদুর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, —ওই কাগজটা আমি আর নিয়ে যাচ্ছি না, ওটা আপনিই রাখুন৷ দেখুন, ওটা থেকে কোনও সূত্র বের করতে পারেন নাকি৷

কর্নেল বললেন, —কাগজটার যা অবস্থা, একটু অসাবধান হলেই টুকরো হয়ে যাবে৷ দেখি এটাকে বিশেষ কোনও প্রক্রিয়ায় অটুট রাখতে পারি কিনা৷

বলে কর্নেল কাগজটা তাঁর টেবিলের ড্রয়ার টেনে সাবধানে ঢুকিয়ে রাখলেন৷ তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন, —বসো জয়ন্ত৷ আমি কুমার বাহাদুরকে বিদায় দিয়ে আসি৷

দু’জনে বেরিয়ে গেলেন৷ তারপর ষষ্ঠী কাপ-প্লেটগুলো নিতে এল৷ আমি তাকে জিগ্যেস করলুম, —আচ্ছা যষ্টি, তুমি অবাক চোখে ভদ্রলোককে দেখছিলে কেন?

ষষ্ঠী মুচকি হেসে চাপাস্বরে বলল, —দাদাবাবু বাবামশাইকে বলে দেবেন না কিন্তু৷ ওই ভদ্রলোক যখন এসে বেল টিপেছিলেন, আমি গিয়ে দরজা খুলেই ওঁকে দেখে কেন যেন ভয় পেয়েছিলুম৷

—কীসের ভয়?

ষষ্ঠী কণ্ঠস্বর আরও চাপা করে বলল, —ঠিক যেন চিতেয় শোয়ানো মড়াকে তুলে পোশাক পরিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ সত্যি বলছি দাদাবাবু, আপনি তো অনেকক্ষণ ওঁকে দেখেছেন, ওনার হাসিও শুনেছেন, আপনার মনে হয়নি জ্যাস্ত মানুষের পোশাক পরা আস্ত একটা মড়া?

বলে ষষ্ঠী ট্রে-তে কাপ-প্লেটগুলো নিয়ে চলে গেল৷ সত্যি বলতে কি যষ্ঠীর কথাগুলো শোনার পর আমার চমক জাগল, সত্যিই তো ভদ্রলোকের চেহারা অমন রক্তহীন ফ্যাকাসে অথচ চশমার ভেতর দু-চোখের দৃষ্টি যেন জ্বলন্ত৷ আর হাসিটাও কেমন যেন বিদঘুটে৷

একটু পরে কর্নেল ফিরে এলেন৷ তারপর ইজিচেয়ারে বসে চুরুট ধরালেন৷ তিনি একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, —জয়ন্ত, রায়পুরের কুমারবাহাদুর আমার সামনে একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে গেলেন৷

—কীসের চ্যালেঞ্জ?

—ওই যে বলছিলুম, ভূত-প্রেত যক্ষ-রক্ষ পিশাচ, যাই বলো একটা অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে লড়াই করার চ্যালেঞ্জ৷

আস্তে-আস্তে বললুম, —আপনিও কি ওঁর কথা বিশ্বাস করেছেন?

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, —রায়পুরে এখনও যাইনি, কাজেই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন উঠছে না৷

জিগ্যেস করলুম, —তাহলে?

কর্নেল আস্তে বললেন, —ওঁর পূর্বপুরুষের যে কাগজখানা উনি আমার কাছে রেখে গেলেন, তা পড়ে দেখলে তুমি অন্তত কিছুটা আঁচ করতে পারবে যে আমি কী বলতে চাইছি৷

—কই, দিন তাহলে৷ পড়ে দেখি৷

কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজিয়ে বললেন, —তুমি আনাড়ি হাতে ওই কাগজটা ধরবে আর ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বে৷ কাজেই আগে আমি ওটা ল্যামিনেশনের ব্যবস্থা করি৷ তারপর তুমি পড়ার সুযোগ পেলেও ওটা পড়তে পারবে না৷ কারণ যা লেখা আছে, তার ভাষা সংস্কৃত৷

—তাহলে এক কাজ করুন না৷ কী লেখা আছে, একটা কাগজে কপি করে আমাকে দিন৷ আমি কোনও সংস্কৃত পণ্ডিতকে দিয়ে বুঝে নেব৷

কর্নেল চোখ বুজিয়ে রেখেই বললেন, —তুমি মাঝে-মাঝে এত বোকা হয়ে যাও জয়ন্ত৷ শোনো এখন রিস্ক নেব না৷ তা ছাড়া ওটার দু’পিঠেই পুরোনো আমলের হস্তাক্ষরে অনেক কথা লেখা আছে, যা বাইরের লোককে জানানো যাবে না৷

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর বললুম, —তাহলে এখন উঠি, আপনি ল্যামিনেশন করে একটা খবর দেবেন, তখন না হয় আসব৷

কথাটা শুনে কর্নেল চোখ খুলে সোজা হয়ে বসলেন৷ তারপর চোখ কটমটিয়ে বললেন, —আজ এখানে তোমার লাঞ্চের নেমন্তন্ন, তা ছাড়া সম্ভবত কাল আমরা সন্ধ্যার ট্রেনে রায়পুর রওনা হব৷ এদিকে বাদবাকি যে সময়টুকু, অর্থাৎ দুটো দিন এবং একটা রাত তোমার গাড়িটা আমার দরকার৷

ওঁর কথার ভঙ্গিতে হেসে ফেললুম৷ বললুম, —বুঝতে পেরেছি, রায়পুরের রাজবাড়ির রহস্যের পিছনে এমন সব সূত্র আছে, যার দেখা মিলতে পারে এই কলকাতা মহানগরে৷ তাই তো?

কর্নেল আমার দিকে একটু ঝুঁকে এসে চাপাম্বরে বললেন,—তোমাকে শুধু একটুখানি সূত্র দিচ্ছি৷ গতরাতে রায়পুরের কুমারবাহাদুর আমাকে টেলিফোন করার আগেই দমদমের রাজবাড়ি থেকে আর-এক কুমারবাহাদুর শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরি আমাকে ফোনে জানিয়েছিলেন, রায়পুরে যাওয়ার জন্য কেউ যদি আমাকে আমন্ত্রণ জানাতে আসে আমি যেন তাকে কোনও অজুহাতে এড়িয়ে যাই৷ শুভেন্দু নারায়ণ আমার প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, আজ কোনও একসময়ে ওঁর সঙ্গে যেন দেখা করি৷ তাহলে উনি আমাকে ব্যাপারটা খুলে বলবেন৷

বললুম, —ওরে বাবা, এ যে এক রহস্যের নাকের ডগায় আর-এক রহস্য৷ ঠিক আছে, চলুন তাহলে দমদমের দিকেই যাত্রা করা যাক৷

কর্নেল আবার চোখ কটমটিয়ে বললেন, —তোমাকে বললুম না, আগে কাগজটার ল্যামিনেশন করা দরকার৷ তারপর দু’জনে লাঞ্চে বসব৷

হাসতে-হাসতে বললুম, —ও.কে. বস৷ সবই আপনার ইচ্ছা৷

এদিন বেলা একটায় খাওয়াদাওয়ার পর অভ্যস মতো ভাতঘুমের সুযোগ খুঁজছিলুম৷ কর্নেল বলেছিলেন, —ইচ্ছে করলে তুমি ঘণ্টাদুই ভাতঘুম ঘুমিয়ে নিতে পারো৷ কিন্তু মনে রেখো, ঠিক তিনটেয় আমরা বেরুব৷ দমদমের কুমারবাহাদুর চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে পৌঁছুতে বলেছেন৷

ড্রইংরুমের ডিভানে শুয়ে লক্ষ্য করলুম, কর্নেল অন্যদিনের মতো ইজিচেয়ারে বসলেন না, চুরুট ধরিয়ে টেবিলের নিচের ড্রয়ার থেকে একটা ফাইল বের করলেন, তারপর দরজার দিকে পা বাড়ালেন৷

এর আগে কর্নেল সেই জীর্ণ প্রাচীন কাগজটা বের করে পাড়ারই কোথায় ল্যামিনেশন করতে দিয়ে এসেছিলেন৷ আমাকে সঙ্গে নিতে চাননি৷ এখন তাঁকে আবার একা বেরুতে দেখে বললুম,—সেই কাগজটার এরই মধ্যে ল্যামিনেশন করা হয়ে গেছে বলে মনে হয় না, বরং এক কাজ করলেই পারতেন৷ দমদম যাত্রার পথে ওটা নিয়ে নিতে পারতেন৷

কর্ণেল আমার কোনও কথার জবাব না দিয়ে বেরিয়ে গেলেন৷ অতএব আমি ভাতঘুমের দিকে মন দিলুম৷

সবে ঘুমের রেশ এসেছে, এমনসময় টেলিফোন বেজে উঠল৷ বিরক্ত হয়ে ষষ্ঠী বলে হাঁক দিতে যাচ্ছিলুম, কিন্তু মনে পড়ে গেল আমাদের খাইয়ে দিয়ে স্নান করে বেচারা এখন খেতে বসেছে৷ তাই উঠে গিয়ে আমাকেই টেলিফোনটা ধরতে হল৷ সাড়া দিতেই কেউ রাশভারী গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলল, —কর্নেলসাহেব আছেন?

বললুম, —না, উনি এইমাত্র বেরিয়েছেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবেন৷ আপনি কে তা জানতে পারি?

—তার আগে আমি কার সঙ্গে কথা বলছি জানতে চাই৷

হাসি পাচ্ছিল৷ ভদ্রলোক যেই হোন, স্বভাবটি একটু বেয়াড়া ধরনের৷ কিন্তু কী আর করা যাবে? কর্নেলকে যখন তিনি চাইছেন তখন নিশ্চয়ই কর্নেলের কোনও পরিচিত মানুষ হবেন৷ আর কর্নেলের পরিচিত মানেই সমাজের উঁচু তলার লোক৷ তাই যথাসাধ্য বিনয়ের সঙ্গে বললুম, —আজ্ঞে স্যার, আমার নাম জয়ন্ত চৌধুরী৷ আমি—আমার কথার ওপর ভদ্রলোক বলে উঠলেন, আরে কী আশ্চর্য, জয়ন্তবাবু! তা আপনি হঠাৎ আমাকে স্যার বলছেন কেন?

—আপনাকে ঠিক চিনতে পারছি না৷ কর্নেলকে যাঁরা চেনেন তাঁরা সবাই অভিজাত মহলের লোক৷

এবার হাসির শব্দ ভেসে এল৷ তিনি বললেন, —আপনি কেমন সাংবাদিক জয়স্তবাবু যে গলার স্বর শুনে চিনতে পারেন না, কে কথা বলছে? কর্নেলের কাছে শুনেছি আপনি ওঁর অনেক দিনের সঙ্গী৷

এতক্ষণে চিনতে পারলুম ভদ্রলোক আর কেউ নন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপক ব্রজেন মুখার্জি৷ অমনি ব্যস্ত ভাবে বললুম, —ক্ষমা করবেন মিস্টার মুখার্জি৷ আপনি প্রাচীন ইতিহাসের অধ্যাপক তো, তাই আপনার কথা শুনলে মনে হয় প্রাচীন যুগের কেউ কথা বলছেন৷

পালটা হেসে গুরুগম্ভীর স্বরে অধ্যাপক মুখার্জি বললেন,—আমার হাতে সময় নেই৷ আমি একটা বিশেষ কাজে এখনই বেরুচ্ছি, তাই কর্নেলসাহেব ফিরে এলে তাঁকে বলবেন, উনি যদি কাল সকাল সাতটার মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করেন, কিছুক্ষণ সময় দিতে পারব৷ কারণ সকাল আটটাতে আমাকে একটা সেমিনারে যেতে হবে৷

কথাটা বলেই অধ্যাপকমশাই রিসিভার রেখে দিলেন৷ আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছিল৷ কর্নেল মাঝে-মাঝে বালিগঞ্জ প্লেসের এই অধ্যাপকের শরণাপন্ন হন, বিষয়টা যদি হয় প্রাচীন ইতিহাস কিংবা পুরাতত্ত্ব সম্পর্কিত৷ কর্নেল কি তাহলে রায়পুরের কুমার বাহাদুরের রেখে যাওয়া কাগজটা সম্পর্কে আমার অজান্তে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন?

রিসিভার রেখে অগত্যা আমি আমার ডিভানে এসে গড়িয়ে পড়লুম৷ কিন্তু আর ভাতঘুমের ঝিমুনি এল না৷ চুপচাপ চোখ বুজে পড়ে রইলুম৷

কর্নেল বেরিয়ে যাওয়ার সময় সদর দরজার চাবি সঙ্গে নিয়ে যান৷ ডুপ্লিকেট চাবিটা অবশ্য ষষ্ঠীর কাছে আছে৷ কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় যে ল্যাচ-কি সিসটেম আছে, তাতে ভিতর থেকে চাবি ছাড়া দরজা খোলা যায়৷ কিন্তু বাইরে থেকে চাবি ছাড়া দরজা খোলা যায় না৷ আমি অবশ্য চোখ বুজে রায়পুরের কুমার বাহাদুরের মুখে শোনা অতিপ্রাকৃত শক্তি বা কর্নেল কথিত যক্ষ-রক্ষ পিশাচের ব্যাপারটা ভাবতে চেষ্টা করছিলুম৷ কিন্তু সেখানে কী ঘটছে তা জানি না, কর্নেলও স্পষ্ট করে আমাকে কিছু বলেননি৷ তাই কোনও থিওরি দাঁড় করাতে পারছিলুম না৷

হঠাৎ কানে এল কর্নেলের কণ্ঠস্বর, —জয়ন্ত, উঠে পড়ো৷

তাকিয়ে দেখি কর্নেল কখন এসেছেন এবং একেবারে তৈরি হয়েই আমাকে ডাকছেন৷ একটুও টের পাইনি৷

উঠে বসে বললুম, —কী আশ্চর্য! আপনি একেবারে নিঃশব্দে চলাফেরা করতে পারেন, তা জানি৷ আপনার সামরিক জীবনের ট্রেনিং৷ কিন্তু আমি তো জেগেই ছিলুম, শুধু চোখদুটো বন্ধ ছিল৷

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —দেওয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখো৷

অবাক হয়ে দেখলুম সাড়ে তিনটে বেজে গেছে৷ তার মানে আমি ঘুমোইনি তা ঠিক নয়৷ দিব্যি অন্তত ঘণ্টা দেড়েক ঘুমিয়েছি৷

তাড়াহুড়ো করে পোশাক বদলে এলুম৷ তারপর কর্নেলকে অধ্যাপক ব্রজেন মুখার্জির টেলিফোনের কথা বললুম৷

কর্নেল শুধু বললেন, —ঠিক আছে৷

দু’জনে বেরিয়ে গিয়ে নিচে নামার পর বললুম, —আপনার ল্যামিনেশন হয়ে গেছে?

—হ্যাঁ, বলে কর্নেল লনের দিকে পা বাড়ালেন৷ আমার গাড়িটা পাশেই পার্ক করা ছিল৷ কর্নেল আমার বাঁ-দিকে বসলেন, তারপর স্টার্ট দিয়ে গেটের দিকে যাচ্ছি, এই সময় দারোয়ান কর্নেলের হাতে ভাঁজ করা একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল, —হুজুর, কর্নিলসাব, এহি কাগজটো গেট কা অন্দর কোই ফেক দিয়া৷ দেখিয়ে তো—

কর্নেল চিঠিটা খুলেই চোখ বুলিয়ে আমার হাতে দিলেন৷ দেখলুম সাদা একটা ছোট্ট প্যাডের কাগজে লাল কালিতে আঁকাবাঁকা হরফে লেখা আছে:

‘ডোন্ট পুট ইয়োর আগলি নোজ ইনটু দি অ্যাফেয়ার অফ রায়পুর’ অর্থাৎ,

রায়পুরের ব্যাপারে তোমার কুৎসিত নাক গলাতে যেও না৷

দুই

দারোয়ানকে কর্নেল বলেছিলেন, —এ কিছু না ভগতলাল, বাজে কাগজ৷ কিন্তু সারা পথ আমাকে একটা আবছা ধরনের আতঙ্ক পেয়ে বসেছিল৷ কর্নেল কিন্তু একেবারে নির্বিকার৷

আমার প্রশ্নের উত্তরে উনি সহাস্যে বলেছিলেন, —এক পা না বাড়াতেই প্রতিপক্ষের মাথা খারাপ হতে শুরু করেছে৷ যদিও সত্যি বলতে কী, আমার প্রতিপক্ষ কে বা কারা এখনও জানি না৷ চিয়ার আপ জয়ন্ত, এটা আমার পক্ষে একটা সুলক্ষণ৷

আজ রবিবার, তাই রাস্তায় তত যানবাহন ছিল না৷ ই. এম. বাইপাস হয়ে ঘুরে একটা সঙ্কীর্ণ রাস্তা দিয়ে দমদম এলাকায় ঢুকেছিলুম৷ কর্নেলের নির্দেশে অন্ধের মতো গাড়ি চালাচ্ছিলুম৷ একটা গলি পেরিয়ে অপেক্ষাকৃত চওড়া রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল বললেন, —সামনে ওপারে যে গেটটা দেখতে পাচ্ছ, ওই দেখো ডানদিকের পিলারে মার্বেল ফলকে লেখা আছে, রায়পুর রাজভবন৷

গেটের কাছে গিয়ে অবাক হয়ে বললুম, —এ রায়পুর নিশ্চয়ই বিহারের সাঁওতাল পরগনার সেই রায়পুর নয়?

কর্নেল বললেন, —সেই রায়পুরই বটে৷ তবে এরা ছোটো তরফ, আর সকালে যে কুমার বাহাদুরকে দেখেছ, তাঁরা ছিলেন জমিদারির বড়ো তরফ৷

ততক্ষণে কর্নেলকে দেখে স্যালুট ঠুকে দারোয়ান গেট খুলে দিয়েছে৷ চকমেলানো বাড়ি, সোজা লন গিয়ে শেষ হয়েছে গাড়িবারান্দার নিচে৷ গাড়িবারান্দার ওপরে কর্নেলের মতো তাগড়াই গড়নের উজ্জ্বল গৌরবর্ণ এক বৃদ্ধ ভদ্রলোককে ছড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলুম৷ তিনি হাত নেড়ে বললেন, —সুস্বাগত কর্নেলসাহেব৷

গাড়িবারান্দার নিচে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যখন বেরুচ্ছি, তখনই মনে পড়ে গেল, একি অদ্ভুত আমার ভুলো মন! এই তো গত ফেব্রুয়ারিতে কর্নেলের সঙ্গে এ-বাড়িতে এসেছিলুম৷ কোনও রহস্যভেদের কারণে নয়, এ বাড়ির কুমারবাহাদুর শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরীর কাছে কর্নেল এসেছিলেন রায়পুর এস্টেটে জঙ্গলে কী এক দুর্লভ প্রজাতির অর্কিডের খবর জানতে৷ তারপর আমার অবশ্য কর্নেলের সঙ্গে রায়পুর যাওয়ার সুযোগ হয়নি৷ মার্চ মাসে কর্নেল রায়পুর গিয়ে বড়ো তরফের কুমারবাহাদুরের বাড়িতে আতিথ্য নিয়েছিলেন, যে কথাটা কিনা আজ সকালেই জানতে পেরেছি৷

একতলায় বিশাল হলঘর৷ মিস্টার রায়চৌধুরী একজন লোককে নিচে পাঠিয়ে দিলেন৷ সে করজোড়ে মাথা নুইয়ে কর্নেলকে নমস্কার করল৷ কর্নেল বললেন, —কী গোকুল, কেমন আছ? আর শোনো তোমাদের সেই ধুরন্ধর অ্যালসেসিয়ান সাহেবকে বেঁধে রেখেছ তো?

গোকুল একগাল হেসে বলল, —আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আপনি আসবেন শুনেই রনিকে তেতলায় বেঁধে রেখে এসেছি৷

আমার মনে পড়ে গেল, সে-বার ফেব্রুয়ারিতে এসে কর্নেলের সঙ্গে একটা প্রকাণ্ড অ্যালসেসিয়ান বেজায় বেয়াদপি করছিল৷ একটি ব্যাপারে কর্নেলের সঙ্গে আমার খুবই মিল৷ তা হল, দু’জনেরই কুকুর সম্পর্কে প্রচণ্ড অ্যালার্জি আছে৷

কাঠের সিঁড়িতে বিবর্ণ গালিচা পাতা আছে৷ দোতলায় উঠলেই মিস্টার রায়চৌধুরী হাত বাড়িয়ে প্রথমে কর্নেলের সঙ্গে তারপর আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন৷ তারপর বললেন, —গোকুল, এই বারান্দাতেই আমরা বসব৷ তুই শিগগির কফির ব্যবস্থা কর৷

বারান্দায় পেতে রাখা বেতের চেয়ার-টেবিলের কাছে গিয়ে মিস্টার রায়চৌধুরী বললেন, —নভেম্বরের মাঝামাঝি হতে চলল৷ এটাকে মফসসল অঞ্চল বলা যায়, কিন্তু এখনও শীতের দেখা নেই৷ অতএব এখানেই স্বচ্ছন্দে বসা যেতে পারে৷

আমরা বসার পর কর্নেল বললেন, —আপনি বলেছেন, হাতে সময় কম, তাই কথাটা এখনই সেরে নিতে পারেন৷

মিস্টার রায়চৌধুরী চাপা স্বরে বললেন,—আপনাকে টেলিফোনে শুধু বলেছিলুম, ওই বজ্জাতের শিরোমণি অমিতেন্দ্রের কথায় রায়পুরে যাবেন না৷ কেন আপনাকে যেতে নিষেধ করছি, সেই কথাটা বলি৷ আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি, রাজবাড়ির যে অংশের ওরা মালিক সেই অংশটা অমিতেন্দ্র বিক্রি করে দিতে চায়৷ আপনি তো জানেন, আমার ঠাকুরদা আর অমিতেন্দ্রের ঠাকুরদা পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন৷ রাজবাড়ির উত্তর অংশটা অমিতেন্দ্রের ঠাকুরদার ভাগে পড়েছিল, আর দক্ষিণের অংশটা পড়েছিল আমার ঠাকুরদার ভাগে৷ কিন্তু এই ভাগবণ্টন যিনি করেছিলেন, অর্থাৎ আমাদের দু’জনেরই প্রপিতামহ রাজা সৌরীন্দ্রনাথ রায়৷ তিনি সম্পত্তির বণ্টন সংক্রান্ত দলিলে স্পষ্ট করে বলে গেছেন, রাজবাড়ির পূর্বদিকের পাঁচ একর জমির ওপর যে পুকুর এবং ঠাকুরবাড়ি আছে, তাঁর দুই পুত্রকেই এই ঠাকুরবাড়ি এবং জলাশয়ের দেখাশোনা এক বছর অন্তর পালাক্রমে করতে হবে৷ সেই ব্যবস্থাই এতদিন ধরে চলে আসছে৷ আমার ঠাকুরদা ‘চৌধুরী’ খেতাবটা পেয়েছিলেন বিহারের লাটসাহেবের কাছে৷ যাই হোক, এবছর পয়লা বৈশাখ থেকে চৈত্রের শেষ দিন পর্যন্ত ঠাকুরবাড়ি দেখাশোনার ভার পড়েছে অমিতেন্দ্রের হাতে৷ এখন সে জামাইয়ের পরামর্শে রাজবাড়ির উত্তর অংশ শুধু নয়, ঠাকুরবাড়ি এবং জলাশয়ের অর্ধেক অংশ বেআইনি ভাবে বিক্রি করতে চায়৷ কলকাতার একটি মাড়োয়ারি কোম্পানির সঙ্গে অমিতেন্দ্র নাকি কথাবার্তাও বলেছে৷

কর্নেল এবার বললেন,—কিন্তু আমার কাছে অমিতেন্দ্র এসেছিলেন৷ বলেছিলেন তিনি নাকি একটা অতিপ্রাকৃত শক্তির পাল্লায় পড়েছেন৷ নানারকম রূপ ধরে সে প্রতি রাত্রে তাঁকে উত্যক্ত করছে৷ গত পরশু রাত্রে তিনি নাকি টর্চের আলোয় ঘরের জানলা থেকে এক পলকের জন্য প্রকাণ্ড একটা কালো রঙের মূর্তি দেখতে পান৷ এক সেকেন্ডের জন্য মূর্তিটা মুখ ফিরিয়েছিল৷ ভয়ংকর সেই মুখ৷ দু’দিকে দুটো বড়ো বড়ো লাল দাঁত, চোখ দুটো ভাঁটার মতো লাল৷ গুলি করবেন কী, ওটা দেখে তিনি আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলেছিলেন৷

মিঃ রায়চৌধুরী এবার হেসে উঠলেন৷ বললেন,—কেন? ওর জামাই বিখ্যাত রাইফেলশ্যুট শোভনলালকে ডেকে কিংকংয়ের ওপর গুলি চালাতে বলেনি?

কর্নেল কিন্তু হাসলেন না৷ গম্ভীর মুখে বললেন—হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন৷ কিংকং বলা যায় ওঁর দেখা মূর্তিটাকে৷ তবে উনি আমাকে বলেছেন, ওঁর নিজের হাতেও বন্দুক ছিল৷ কিন্তু ওঁর দৃঢ় বিশ্বাস, ওটা এক অতি-প্রাকৃত শক্তি৷ তার গায়ে গুলি বেঁধে না৷

এইসময় গোকুল কফির ট্রে এনে বেতের টেবিলে রাখল৷ মিঃ রায়চৌধুরী বললেন, —গোকুল৷ তুই রনির কাছে গিয়ে দ্যাখ, রনি আজ বড্ডবেশি চ্যাঁচামেচি করছে৷

গোকুল চলে গেল৷ তেতলায় কুকুরটা যে সত্যি খুব তর্জনগর্জন করছে, তা কানে আসছিল৷ একটু হেসে বললুম, —আপনার রনি আসলে কর্নেলের গন্ধ পেলেই চটে যায়৷ পূর্বজন্মে রনি সম্ভবত—

আমার কথার উপর মিঃ রায়চৌধুরি সহাস্যে বলে উঠলেন—পাক্কা ক্রিমিন্যাল ছিল৷

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, —আর আমি পূর্বজন্মে সম্ভবত ডাঁশমাছি ছিলুম৷ লক্ষ্য করে থাকবেন, কুকুরকে ওই নীল রঙের মাছিগুলো বেজায় জ্বালাতন করে৷

এইসব রসিকতার মধ্যে পরিবেশটা হালকা হয়ে উঠেছিল৷ কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে কর্নেল বললেন, —এবার আপনার বক্তব্যটা শোনা যাক৷

মিঃ রায়চৌধুরী হাতের ঘড়ি দেখে নিয়ে বললেন, —পাঁচটায় একজনের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল৷ থাক৷ যাব না৷ কারণ আপনাকে অনেকদিন পরে মুখোমুখি পেয়েছি৷ তো কথাটা হল—

কর্নেল কী যেন ভাবছিলেন৷ হঠাৎ তাঁর কথায় বাধা দিয়ে বললেন, —আচ্ছা মিঃ রায়চৌধুরী! আপনাদের পরিবারে রাজা ঐশ্বর্য নারায়ণ রায় নামে একজন প্রতাপশালী মানুষ ছিলেন৷

মিঃ রায়চৌধুরী চমকে উঠেছিলেন, তা স্পষ্ট৷ তিনি চাপাম্বরে বললেন, —তাঁর কথা আপনাকে কে বলেছে? অমিতেন্দ্র?

—না৷ আমি অন্য সূত্রে জেনেছি৷ আপাতত সেই সূত্রের কথা চাপা থাক৷

একটু চুপ করে থাকার পর মিঃ রায়চৌধুরী বললেন, —রাজা ঐশ্বর্য নারায়ণ রায় ছিলেন আমার প্রপিতামহের পিতামহ৷ তিনি মুর্শিদাবাদের নবাব আলিবর্দি খাঁর অধীনে বিহারের দক্ষিণ অঞ্চলের একজন সামন্ত রাজা ছিলেন৷ বর্গির হাঙ্গামা দমনে নবাবকে সাহায্য করেছিলেন৷ ওঁর নামে অনেক গল্প চালু আছে৷ দক্ষিণ বিহারে পাহাড়-জঙ্গল এখনও কম নেই৷ তখন তো খুব দুর্গম এলাকা ছিল৷ একদল বর্গি নাকি বাংলা মুলুক থেকে প্রচুর ধনরত্ন লুঠ করে এখনকার রায়পুরে এসে ঐশ্বর্য নারায়ণের পাল্লায় পড়েছিল৷ পাহাড়-জঙ্গলে পথ হারিয়ে তাদের অবস্থা যখন শোচনীয়, ঐশ্চর্য নারায়ণের সেনাবাহিনী তাদের কোণঠাসা করে কচুকাটা করেছিল৷

বলে শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরী হেসে উঠলেন৷ আমি জিগ্যেস করলুম, —বর্গিদের সেই ধনরত্ন নিশ্চয়ই রাজা ঐশ্বর্য নারায়ণের হাতে এসেছিল?

—ঠিক ধরেছেন৷ মিঃ রায়চৌধুরী মুখে হাসি রেখেই বললেন,—এর ফলে একটা গল্প চালু হয়৷ নবাব আলিবর্দির কানে সেই খবর গিয়েছিল৷ রায়পুরের রাজা তাঁর প্রিয়পাত্র ঐশ্বর্য নারায়ণকে তিনি তলব করেছিলেন৷ ধুরন্ধর রাজা খবরটা ভুয়ো বলে অস্বীকার করেন৷ তার পরের গল্পটা হল, নবাব পাছে সৈন্য পাঠিয়ে রাজবাড়ি সার্চ করতে হুকুম দেন, সেই ভয়ে নাকি ঐশ্বর্য নারায়ণ সেইসব ধনরত্ন এমন জায়গায় লুকিয়ে ফেলেন, তন্নতন্ন খুঁজলেও যার হদিশ মিলবে না৷

বললুম, —অর্থাৎ গুপ্তধনের গল্প৷

কর্নেল চুপচাপ চুরুট টানছিলেন৷ এবার বললেন, —জয়ন্ত গুপ্তধনের গল্প নিয়ে রং চড়িয়ে রহস্যকাহিনি লেখার রসদ জোগাড় করছে, মিঃ রায়চৌধুরী৷ এবার আমার দিকে মন দিন৷ আপনি আমাকে টেলিফোনে রায়পুর যেতে নিষেধ করেছিলেন৷ কেন করেছিলেন, তা-ই বলুন৷

শুভেন্দু নারায়ণ এবার গম্ভীরমুখে চাপাস্বরে বললেন, —হ্যাঁ৷ আপনার কথা ঠিক৷ রায়পুরে গুজব রটেছে, সন্ধ্যা থেকে ভোর অবধি কী একটা ভয়ংকর প্রাণী—কিংকং-ই বলতে পারেন, সে নাকি যেখানে-সেখানে আচমকা দেখা দিচ্ছে৷ এখনও সে কোনও ক্ষতি করেনি৷ কিন্তু আতঙ্কে রায়পুরের মতো রীতিমতো একটা মফসসল শহর সন্ধ্যা থেকে জনশূন্য হয়ে যায়৷

কর্নেল হাসলেন৷ —আমাকে কি তার ভয়েই সেখানে যেতে আপনি নিষেধ করছেন?

—না৷ মিঃ রায়চৌধুরী আরও চাপাস্বরে বললেন, —ওই কিংকং-টং অমিতেন্ত্রের তৈরি গুজব৷ আমি আপনাকে যেতে নিষেধ করছি অন্য একটা কারণে৷

—বলুন!

—রাজবাড়ির দক্ষিণ মহলের মালিক আমি৷ একজন নতুন কেয়ারটেকার রেখেছি দেখাশোনার জন্য৷ তিনি বাঙালি৷ তবে পুরুষানুক্রমে রায়পুরের লোক৷ আগের কেয়ারটেকার ছিলেন রাজীব শর্মা৷ কিন্তু তিনি ট্যুরিস্টদের ঘরভাড়া দিয়ে পয়সা কামাতেন৷ অথচ আমি বাইরের লোককে রাজবাড়িতে ঢুকিয়ে ঘরগুলো নোংরা করতে দিতে চাই না৷ নতুন কেয়ারটেকার সমীরবাবু সাহসী এবং কড়া ধাতের লোক৷ সম্প্রতি তাঁর কাছ থেকে খবর পেয়েছি, অমিতেন্দ্র তার অংশ অর্থাৎ উত্তরমহল বিক্রি করে দিচ্ছে৷ তা না হয় দিক৷ কিন্তু আমার আগের কেয়ারটেকার রাজু নাকি অমিতেন্দ্রকে কী একটা গোপন দলিল দিয়েছে—দলিলটা সে আমার দক্ষিণমহলে কোন ঘরে আসবাবপত্রের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল৷ সেই দলিলে নাকি এমন কিছু আছে, যার জোরে অমিতেন্দ্র পুকুর-সমেত পুরো ঠাকুরবাড়ির মালিকানা দাবি করতে পারে৷ রাজু—মানে রাজীব শর্মা স্বভাব-দুর্বৃত্ত৷ রায়পুরের যত বজ্জাত লোক তার চেলা৷ আমার অধীনে থাকার সময় সে তার চেলাচামুণ্ডাদের নিয়ে দক্ষিণমহলে মদ খেয়ে হুল্লোড় করত৷ যাই হোক, লোকটা মহা ধুরন্ধরও বটে৷ ওইরকম একটা দলিলের কথা আমি ছোটোবেলায় আমার ঠাকুরদার কাছে শুনেছিলুম৷ আমাদের দুই ঠাকুরদার বাবা কিংবা তাঁর বাবা—এখন মনে নেই, কেউ নাকি একটা দলিল করেছিলেন, ঠাকুরবাড়ির পুরোটাই বংশের একজনের দায়িত্বে থাকবে৷ কিন্তু এটা অসম্ভব ব্যাপার৷

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —তাহলে আপনি ভেবেছেন, আমি রায়পুরে গেলে কুমারবাহাদুর অমিতেন্দ্রর হয়ে কাজে নামব? কিন্তু আমি গেলে তো কিংকং রহস্যটা ফাঁস হয়ে যাবে৷

—কুমারবাহাদুর৷ শুভেন্দু নারায়ণ বিকৃত মুখে হাসলেন৷—আপনি ওকে কি কুমারবাহাদুর বলেন?

—বলি! কারণ ভদ্রলোক এতে খুশি হন৷ ইচ্ছে করেই কুমারবাহাদুর বলি৷ কিন্তু আপনার মুখে এতক্ষণ যা সব শুনলুম, তাতে আমার মনে হচ্ছে, আমি রায়পুরে গিয়ে আমার এই কুৎসিত নাক গলালে তো আপনারই লাভ৷ আপনি আমার পুরোনো বন্ধু৷ আমি আপনার স্বার্থই আগে দেখব৷

মিঃ রায়চৌধুরীর মুখে চমক লক্ষ্য করেছিলুম, যখন কর্নেল ‘কুৎসিত নাক গলানো’ কথাগুলো বলছিলেন৷ এবার তিনি হাসবার চেষ্টা করে বললেন, —আপনার নাক কুৎসিত, তা কে বলল?

—একটা উড়ো চিঠি৷

—তার মানে৷

কর্নেল বুকপকেট থেকে সেই ভাঁজকরা উড়ো চিঠিটা শুভেন্দু নারায়ণের হাতে দিলেন৷

শুভেন্দু নারায়ণ কাগজের ভাঁজ খুলে উড়ো চিঠিটা এবার নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে পড়ার পর রুষ্ট কণ্ঠস্বরে বললেন, —আশ্চর্য কর্নেল! এটা খুবই আশ্চর্য ঘটনা৷ আজ ভোরবেলা বেড়াতে যাওয়ার সময় গেটের সামনে আমি অবিকল এমন একটি উড়ো চিঠি কুড়িয়ে পেয়েছিলুম৷ চিঠিটা দেখাচ্ছি৷ সত্যি বলতে কী, এটা দেখেই আমি আসলে আপনাকে সতর্ক করতে চেয়েছিলুম৷

তিনি পাঞ্জাবির বুকপকেট থেকে একই মাপের একই কাগজ এবং একই হস্তাক্ষরে লাল ডটপেনে লেখা উড়ো চিঠিটা দেখালেন৷ কর্নেল দুটো চিঠি মিলিয়ে দেখে বললেন—আপনার আপত্তি না থাকলে আপনার চিঠিটা আমি রাখতে চাই৷

—রাখুন৷ আমার কোনও আপত্তি নেই৷

—এর পরও কি আপনি আমাকে রায়পুরে যেতে নিষেধ করবেন?

বেশ কিছুক্ষণ পরে জোরে শ্বাস ছেড়ে মিঃ রায়চৌধুরী বললেন,—না৷ আপনাকে আর নিষেধ করার মতো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না৷ শুধু আপনাকে অনুরোধ করব, আপনি এমন কিছু করবেন না যাতে আমার কোনও ক্ষতি হয়৷

—আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন৷ এবার আমি উঠি৷

শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরী আমাদের বিদায় দিতে গাড়িবারান্দার নিচে এসেছিলেন৷ তাঁকে তখন যষ্ঠীচরণের ভাষায় যেন শুঁটকে মড়ার মতো দেখাচ্ছিল৷ ব্যাপারটা আমার কাছে আশ্চর্য মনে হয়েছিল৷ ফেরার পথে এ-ব্যাপারে কর্নেলকে প্রশ্ন করেও আরেক কুমারবাহাদুর শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরীর এই রূপান্তরের কোনও ব্যাখ্যা পাইনি৷

তবে কর্নেল একটা কথা বলেছিলেন৷ —অমিতেন্দ্র নারায়ণ অর্থাৎ আমাদের কুমারবাহাদুরের গতিবিধির উপর শুভেন্দু নারায়ণের লোক বা লোকেরা তীক্ষ্ণ নজর রাখছে৷ অমিতেন্দ্র আমার কাছে আসছেন, এ খবর শুভেন্দু নারায়ণ তাঁর লোকেদের সূত্রেই পেয়েছিলেন৷ তিনি টেলিফোনে আমাকে রায়পুর যেতে নিষেধ করেছিলেন৷

পরদিন কর্নেলের তাড়ায় ভোর ছ’টায় ঘুম থেকে উঠতে হল৷ কারণ সাড়ে ছ’টায় না বেরুলে অধ্যাপক ব্রজেন মুখার্জির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যাবে না৷ অত ভোরে বিছানা ছেড়ে ওঠার অভ্যাস নেই, কিন্তু এই অ্যাপার্টমেন্টে কর্নেলের বেডরুমের লাগোয়া একটা ঘরে আমার শোওয়া-থাকার ব্যবস্থা আছে৷ কর্নেল নিজের বেডরুমের দরজাটি খুলে রাখেন, যাতে উনি বা ষষ্ঠী সরাসরি আমার ঘরে ঢুকে পড়তে পারেন৷ নভেম্বর মাসের সেই ভোরবেলায় ফ্যান চলছিল এবং আমিও চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিলুম৷ এ অবস্থায় ষষ্ঠীচরণের সাধ্য ছিল না আমাকে ওঠায়! কিন্তু কর্নেলের মিলিটারি হাতের থাবা, না উঠে পার পাইনি৷ যাই হোক, সাত তাড়াতাড়ি বাথরুম সেরে, পোশাক বদলে যখন নিচে নামলুম, তখন কাঁটায়-কাঁটায় সাড়ে ছ’টা বাজে৷

গাড়িতে যেতে-যেতে বললুম, —এই ভোরবেলা ফাঁকা রাস্তায় ইলিয়ট রোড থেকে বালিগঞ্জ প্লেসে পৌঁছতে পনেরো মিনিটও লাগবে না, কাজেই অন্তত বেড টি খেয়ে বেরুতে পারতুম৷

কর্নেল বললেন,—অধ্যাপক মুখার্জি কেমন মানুষ, তা তুমি ভালোই জানো৷ বাঙালি হয়েও একেবারে সাহেবদের মতো ঘড়ির কাঁটা মেনে জীবনযাপন করেন৷ তবে তুমি এঁটো মুখে চা খাওয়ার চাইতে পরিষ্কার মুখে চা খেতে পাবে৷ এবং ঠিক সময়েই পাবে৷

—সাতটায় আমি বেড-টি খাই৷

—ঠিক সাতটায়ই তুমি মিস্টার মুখার্জির ওখানে চা খেতে পাবে৷

আশ্চর্য ব্যাপার, রাস্তার ধারে ওঁর বাড়ির গেটের কাছে গাড়ি লক করে দু’জনে যখন ভিতরে ঢুকলুম, দেখলুম অধ্যাপক মুখার্জির কাজের লোক নকুল হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে৷ সে আমাদের নমস্কার করে শুধু হাতের ইশারায় ঘরের ভেতরটা দেখিয়ে দিল৷ অর্থাৎ অধ্যাপকমশাই আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছেন৷

ভিতরে ঢুকতেই পুরোনো বই আর কর্নেলের ড্রইংরুমের মতো জাদুঘরের জিনিসপত্রে সাজানো প্রশস্ত ঘরের এক কোণ থেকে মিস্টার মুখার্জি সাড়া দিলেন৷ তেমনই গুরুগম্ভীর ভরাট কণ্ঠস্বর, —সুপ্রভাত কর্নেলসাহেব৷ জয়ন্তবাবু সুপ্রভাত৷ আমি খুব খুশি, তার কারণ আপনারা প্রায় কাঁটায়-কাঁটায় ঠিক সময়ে পৌঁছেছেন৷

বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের সামনে তিনি বসে ছিলেন৷ আমরা তাঁর সামনে পাশাপাশি বসলুম৷ তারপর কর্নেল বললেন— প্রফেসর মিস্টার মুখার্জি, এখনও কিন্তু সাতটা বাজতে এক মিনিট দেরি আছে৷

অধ্যাপকমশাই কী বলতে যাচ্ছিলেন, দেখলুম পরদা তুলে নকুল ট্রে-তে কাপ-প্লেট, পট ইত্যাদি সাজিয়ে নিয়ে আসছে৷ সে ট্রে টেবিলে রাখল৷ মিস্টার মুখার্জি বললেন,— আপনার বরাতে কফি নেই৷ কারণ আমি নিজে কফি খাই না৷ নকুলকে কাল সন্ধ্যায় বলে রেখেছিলুম, সে কফি আনতে ভুলে গেছে৷

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —জয়ন্তের অভ্যাস সাতটায় এককাপ চা খাওয়া৷ ওই দেখো জয়ন্ত, দেওয়াল ঘড়িতে এবার কাঁটায়-কাঁটায় সাতটা৷

চা খেতে খেতেই কর্নেল পিঠে আঁটা কিটব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করলেন৷ তারপর তার ভেতর থেকে ল্যামিনেশন করা সেই জীর্ণ কাগজটা বের করলেন৷ তিনি বললেন, —এই কপিটার পুরো বাংলা অনুবাদ আমার দরকার৷

অধ্যাপক মুখার্জি কাগজটা নিয়েই চোখ বুলিয়ে বললেন, —এ তো দেখছি জনৈক রাজা ঐশ্বর্যনারায়ণ রায় কৃত মাতৃবন্দনা৷ এটা পেলেন কোথায়?

—ওই রাজার বংশধরের কাছে৷ প্রফেসর মুখার্জি যেভাবে হোক, আজ বিকেলের মধ্যে এই দুই পৃষ্ঠার বাংলা অনুবাদ আপনি করে দিন৷ আমার অনুরোধ, আপনার এই কাজটা যেন গোপনীয় থাকে৷

অধ্যাপকমশাই চা খেতে-খেতে কাগজের দিকে তাকিয়ে বললেন, —ভুলভাল সংস্কৃতে লেখা মাতৃবন্দনা৷ হ্যাঁ, এখানে মাতৃকা দেখছি দেবী কালিকা৷ ঠিক আছে, চিন্তা করবেন না৷ বিকেল চারটে থেকে পাঁচটার মধ্যে যে-কোনও সময় এসে আপনি এটা এবং এর বাংলা অনুবাদটা নিয়ে যাবেন৷

কর্নেল চাপাম্বরে বললেন, —ওর মধ্যে নাকি কিছু গুপ্ত তথ্য দেওয়া আছে৷ আপনি যদি তা উদ্ধার করে দিতে পারেন, খুব উপকৃত হব৷

অধ্যাপক একটু হেসে বললেন, —সংস্কৃত ভাষাটাই এমন জটিল যে একটি বাক্যের একাধিক অর্থ করা যায়৷

তিন

কর্নেল আমাকে পইপই করে বলেছিলেন, আমার সল্টলেকের ফ্ল্যাটে গিয়ে যেন অন্তত দু-প্রস্থ গরম পোশাক সঙ্গে নিই৷ কেন বলেছিলেন, তা রাতের ট্রেনে যেতে-যেতে হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছিলুম৷ কর্নেল সঙ্গে একটা বাড়তি কম্বল নিয়েছিলেন, সেটা ভাগ্যিস আমাকে দিয়েছিলেন! তাঁর গায়ে অবশ্য ওভারকোট ছিল৷ সকাল সাতটায় তাঁর ডাকে উঠে বসে টের পেলুম, ট্রেনের গতি মন্থর হচ্ছে৷ আমার সঙ্গে শুধু একটা মোটাসোটা ব্যাগ আর কর্নেলের সঙ্গে একটা সুটকেস৷ কিটব্যাগটা অবশ্য তাঁর পিঠে বাঁধা থাকে৷ তাঁর কথায় বুঝতে পেরেছিলুম, আমরা রায়পুরে এসে গেছি৷

প্ল্যাটফর্মে নেমে দেখলুম, এটা একটা মাঝারি ধরনের স্টেশন৷ হিল স্টেশনও বলা যায়, কারণ কুয়াশার মধ্যে এপাশে-ওপাশে টিলা পাহাড় দেখা যাচ্ছিল৷ কর্নেলের মাথায় টুপি, গলায় যথারীতি বাইনোকুলার ও ক্যামেরা ঝুলছিল৷ কিটব্যাগটা ওভারকোটের ওপর দিয়ে কী কৌশলে পিঠের সঙ্গে বেঁধেছেন, কে জানে! তাঁর একহাতে যে সুটকেসটা ঝুলছে, সেটাও বহরে বেশ মোটাসোটা৷ কনকনে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে আমি মাথায় মাফলার জড়িয়ে নিয়েছিলুম৷

স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি অসংখ্য ঘোড়ার গাড়ি, অটো রিকশা, প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি আর সাইকেল রিকশায় প্রশস্ত প্রাঙ্গণ গিজগিজ করছে৷ ট্রেন থেকে যাত্রীও নেমেছিলেন প্রচুর৷ মনে পড়ে গেল রায়পুর একটা পর্যটন কেন্দ্র৷

কর্নেলের সাহেবি চেহারা দেখে বিদেশি ট্যুরিস্ট ভেবে প্রাইভেট কারের ড্রাইভাররা পিছনে লেগেছিল৷ তিনি নির্বিকার মুখে এগিয়ে গিয়ে প্রাঙ্গণের শেষপ্রান্তে একটা কাফেতে ঢুকলেন৷ ভেতরটা এয়ার কন্ডিশান৷ লক্ষ্য করলুম, এটা বিত্তবান লোকেদেরই কফি এবং বিবিধ স্ন্যাক্স খাওয়ার দোকান৷

সেখানে গরম পকৌড়া আর কফি খেয়ে দু’জনে বেরুলুম৷ দেখলুম, এবার কুয়াশা অনেকটাই সরে গেছে এবং রোদ ফুটেছে৷ কর্নেল চড়াই পথে পা বাড়িয়ে বললেন, —সাবধান জয়ন্ত, একপাশ দিয়ে আমার পিছনে-পিছনে হেঁটে এসো৷ কারণ এই সময়টায় রাস্তায় গাড়িঘোড়ার ছুটোছুটি শুরু হয়৷

চড়াইয়ের শেষপ্রান্তে পৌঁছে কর্নেল বাঁ-দিকের একটা পায়েচলা পথে নামতে থাকলেন এবং হুঁশিয়ারি দিলেন, —সাবধান, পা স্লিপ করলে গড়াতে গড়াতে ত্রিশ ফুট নিচে গিয়ে পাথরে ধাক্কা খাবে৷ বরং পাশের ঝোপঝাড়ের ডালগুলোর একটার-পর-একটা আঁকড়ে ধরে নামো৷

দু-ধারের ঘন ঝোপঝাড় আর উঁচু জঙ্গল শিশিরে ভিজে জবজব করছে৷ এভাবে নামা যে কত বিপজ্জনক, তা টের পাচ্ছিলুম৷ কিন্তু মাঝে-মাঝে কর্নেল সকৌতুকে বলছিলেন, —ভুলে যেও না জয়ন্ত, মাউন্টেনিয়ারিংয়ে তোমার নাকি একটা ডিগ্রি আছে৷

একসময় বললুম, —একেবারে শুরুতেই যে আপনি অ্যাডভেঞ্চারে নামবেন তা ভাবিনি৷

কর্নেল আর কোনও কথা বললেন না৷

অবশেষে যখন সমতল জায়গা পেলুম, তার সামনেই দেখি বিশাল গ্রানাইট শিলা কালো হাতির মতো দাঁড়িয়ে আছে৷ পায়ে চলার পথটা এবার শালবনের ভেতর দিয়ে এগিয়েছে৷ কর্নেল এবার সেই পথে এগিয়ে যেতে-যেতে বললেন, —গত মার্চে এসে জেনে গিয়েছি, এই পথে শটকার্ট করলে কুমারবাহাদুরের বাড়ি তত বেশি দূরে নয়৷ তা ছাড়া আমার আরও একটা উদ্দেশ্য আছে৷

জিগ্যেস করলুম, —কী উদ্দেশ্য?

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —একটু দূর থেকে বাইনোকুলারে রাজবাড়ির অবস্থা দেখে নিতে চাই৷

কিন্তু কী অবস্থা কর্নেল দেখে নিতে চান, তা আর খুলে বললেন না৷ মিনিট পনেরো চলার পরেই শালবন শেষ হয়ে গেল৷ এবার সামনে নগ্ন পাথুরে অসমতল জমি৷ সেই জমিতে প্রকাণ্ড সব কালো-কালো পাথর পড়ে আছে৷ কোথাও কোথাও ঝোপ-জঙ্গল এবং কিছু গাছের জটলা৷ আরও কিছুটা এগিয়ে দেখতে পেলুম, কুয়াশার মধ্যে ধূসর রঙের একটা বিশাল বাড়ি৷ তার দেওয়াল জেলখানার মতো উঁচু৷ দোতলায় বড়ো বড়ো পিলার দেখা যাচ্ছিল৷ এগুলোকে বলা হয় ‘করিন্থিয়ান’ ভাস্কর্য৷

কর্নেল একটা পাথরের আড়ালে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলারে অন্তত মিনিট পাঁচেক কী দেখলেন কে জানে৷ তারপর বললেন,—এবার পথটা মোটামুটি সমতল হলেও একটু সাবধানে আসবে৷ কারণ পাথুরে মাটিতে পা স্লিপ করলে হাড়গোড় ভেঙে যাবে৷

জিগ্যেস করলুম, এই পায়ে চলা পথটা দিয়ে কারা হাঁটে?

কর্নেল বললেন, —আদিবাসীরা৷ তারা সরকারি আইন মানে না৷ এখানে প্রচুর বুনো খরগোশ আর সজারু আছে৷ কখনও-সখনও পাশের এলাকা থেকে ময়ূরও উড়ে আসে৷

এবার কিছুটা হাঁটার পর দেখলুম, আমরা সেই চওড়া পিচ রাস্তার উতরাইয়ে পৌঁছে গেছি৷

রায়পুরে ঢোকবার মুখেই দুই মহলা দুটি রাজবাড়ি৷ সামনে দক্ষিণে এবং পশ্চিমে রায়পুর শহর সকালের রোদে দেখা যাচ্ছিল৷ বড়োরাস্তা থেকে বাঁ-দিকে ঘুরে একটা মোরাম বিছানো রাস্তায় কর্নেল পা বাড়ালেন৷ এই রাস্তাটার শুরুতেই একটা সাইনবোর্ড লেখা আছে প্রাইভেট রোড৷ এবং তার তলায় ‘ট্রেসপাসার্স উইল বি প্রসিকিউটেড’ লেখা৷ রাস্তার দু-ধারে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে প্রকাণ্ড সব পাম গাছ৷ তারপরই চোখে পড়ল বিশাল দেউড়ি৷ দেউড়িতে গরাদ দেওয়া গেট৷ কিন্তু এসবের গায়ে প্রাচীনত্বের ধূসরতা স্পষ্ট৷ চাপাম্বরে বললুম, —আচ্ছা কর্নেল, কুমারবাহাদুর তো মস্ত বড়ো ব্যবসায়ী৷ তা বাড়িটার এমন হাল করে রেখেছেন কেন?

কর্নেল বললেন, —জয়ন্ত, তোমার স্মৃতিশক্তি মাঝে-মাঝে দুর্বল হয়ে পড়ে৷ তা না হলে তোমার মনে পড়ত কুমারবাহাদুর তাঁর এই বাড়ি, অর্থাৎ উত্তরমহল কলকাতার কোনো মাড়োয়ারি কোম্পানিকে বিক্রি করতে চান৷

বললুম, —হ্যাঁ৷ দক্ষিণ মহলের মালিক শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরীর কাছে কথাটা শুনেছি৷

এই সময়েই গেটের একটা অংশ দারোয়ান খুলে দিল৷ এবং কুমারবাহাদুর অমিতেন্দ্র নারায়ণকে কর্নেলের মতোই ওভারকোট আর মাথায় টুপি পরে এগিয়ে আসতে দেখলুম৷ তিনি করজোড়ে নমস্কার করে বললেন, —আমার সৌভাগ্য৷ কিন্তু আপনি এত কষ্ট করে হেঁটে এলেন, এটা আমার খুবই খারাপ লাগছে৷ জয়ন্তবাবু আসুন৷ এ বাড়ির চেহারা দেখেই বুঝতে পারছেন, ধ্বংসের দিকে পা বাড়িয়ে আছে৷ কিন্তু এতবড়ো বাড়ি, তা ছাড়া এই ধরনের বাড়ি মেরামত করার কোনও মানে হয় না৷ মেরামতের খরচায় একটা বিশাল দোতলা মডার্ন ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি করা যায়৷

তাঁকে অনুসরণ করে বাড়ির ভিতরে ঢুকলুম৷ দারোয়ান সেলাম দিয়ে বিনীতভাবে বলল, —কর্নিলসাব আসবেন শুনে আমার বহুত খুশি লেগেছে৷ জামাইবাবুভি বহোত খুশি৷ লেকিন—

তার কথার ওপরে কুমারবাহাদুর বললেন, —শোভনলাল জানে আপনি আসবেন৷ সে তো মহা খুশি৷ কিন্তু একটা জরুরি কাজে ওকে পাটনা যেতে হয়েছে৷ আজ বিকেলেই ফেরার কথা৷ আর কুন্তলাও ওর সঙ্গে গেছে৷ কারণ ওর মামাশ্বশুরের খুব অসুখ৷ অবশ্য তাতে আপনাদের সেবার কোনও ত্রুটি হবে না৷

বাড়ির দু-ধারে একতলা সারবন্দি ঘর৷ ওগুলোতে একসময় জমিদারি কাছারি ছিল এবং কর্মচারীরা বাস করতেন৷ এখন অবস্থা জরাজীর্ণ৷ নুড়ি বিছানো লনের দু-ধারে ফুলগাছের মধ্যে ঘাস এবং আগাছার জঙ্গল৷

অমিতেন্দ্র আমাদের একতলার বিশাল হলঘরে ঢুকিয়ে বললেন, —কর্নেলসাহেবের জন্য আগের বারের মতোই দোতলার উত্তর দিকের শেষ ঘরটি গুছিয়ে রেখেছি৷ উত্তরের জানলা না খুললে শীত টের পাবেন না৷ কারণ পূর্বদিকের ব্যালকনিতে বসলে সকালের রোদ যথেষ্ট পাওয়া যায়৷

কর্নেলের সঙ্গী হয়ে এ-ধরনের অনেক রাজবাড়ি আমার দেখা হয়েছে৷ হলঘরে একই ধরনের আসবাব৷ দেওয়ালে ঝোলানো পূর্বপুরুষের পেন্টিং৷ হরিণের মাথা৷ আর স্টাফ করা বাঘ বা ভালুক৷ আমাদের থাকার ঘরটি বেশ চওড়া৷ দু-ধারে দুটি বিছানা৷ র‌্যাকে দেশি-বিদেশি পুতুল সাজানো৷ আর একটা র‌্যাকে কিছু বই৷ আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে অমিতেন্দ্র চলে গেলেন৷ বললুম, —রাজবাড়িতে কি দারোয়ান ছাড়া আর কোনও লোক নেই যে আপনাকে হাতে করে পেল্লায় সুটকেসটা বয়ে আনতে হল?

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —কুমারবাহাদুর জানেন, আমি কাকেও আমার জিনিসে হাত দিতে দিই না৷ গত মার্চে আমার এই স্বভাব উনি ভালোই বুঝে গেছেন৷

উনি সুটকেসটা টেবিলে রেখে পূর্বদিকের দরজা খুললেন৷ বাইরের হাওয়া ঘরে ঢুকে ঠান্ডা বাড়িয়ে দিল৷ কিন্তু রাজবাড়ির সেই জলাশয় আর ঠাকুরবাড়ি দেখার জন্য আমি ঠান্ডা উপেক্ষা করে কর্নেলের সঙ্গে ব্যালকনিতে গেলুম৷

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে এক মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ল৷ জেলখানার মতো উঁচু পাঁচিলের ওধারে চৌকো গড়নের জলাশয়৷ তার অর্ধেকটা কুমার বাহাদুরের এলাকা, এবং বাকি অর্ধেকটা দক্ষিণমহল অর্থাৎ শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরীর এলাকায় অবস্থিত৷ দুই মহলের দুটি খিড়কির দরজার পর দুটি বাঁধানো ঘাট৷ জলাশয়ের পূর্বে নিচু পাঁচিল ঘেরা ঠাকুরবাড়ি৷ সেখানে পৌঁছতে হলে অমিতেন্দ্রদের যেতে হয় জলাশয়ের উত্তর পাড় ঘুরে৷ আর শুভেন্দুদের যেতে হয় দক্ষিণ পাড় ঘুরে৷ এখন শীতের সময় জলাশয়ের বুকে সর্বত্র পদ্মফুলের ডাঁটা কালো হয়ে পড়ে আছে৷ কোথাও বা দু-একটি নেতিয়ে পড়া ফুল বা সবুজ পাতা৷ দেখতে-দেখতে কর্নেলকে বললুম, —আচ্ছা কর্নেল, কোথাও তো পদ্মবীজ দেখতে পাচ্ছি না!

কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে বললেন, —খোলামেলা জায়গা৷ ক্ষুধার্ত আদিবাসীরা পদ্মবীজগুলো সাঁতার কেটে তুলে নিয়ে যায়৷ অবশ্য গোপনে৷ বাড়ির লোকেদের চোখে পড়লে তারা তাড়া খায়৷

বললুম, —এটাকে পুকুর বলা ঠিক নয়৷ এইরকম আয়তাকার জলাশয়কেই তো দিঘি বলা হয়৷

কর্নেল বললেন, —হ্যাঁ৷ এটার নাম রায়দিঘি৷

ঠাকুরবাড়ির পিছনে ঢালু জমি৷ সেই জমিতে ঘন ঝোপঝাড়৷ কোথাও বা দু-একটা গাছ৷ শীতের সকালে নিঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ বোঝা গেল, রাজবাড়িটা উঁচু জমির ওপর তৈরি৷ ঠাকুরবাড়ির পিছনে অসমতল ছোট্ট একটা মাঠের শেষেই বিশাল একটা পাথরের পাহাড়৷ লক্ষ্য করলুম, পাহাড়টার নিচের দিকে কিছু গাছ আছে, কিন্তু বাকিটা সবই নগ্ন পাথর৷ গ্রানাইট পাথরের পাহাড় বলেই মনে হল৷ অবশ্য জলাশয়ের চারদিক এবং ঠাকুরবাড়ি ঘিরে তিনদিকে কাঠের খুঁটি পুঁতে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া আছে, যদিও সে-বেড়া জায়গায়-জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, কোথাও বা দু-তিন সারি তারকাঁটা উধাও৷ বুঝলুম ওই ফাঁক দিয়েই ক্ষুধার্ত আদিবাসীরা রায়দিঘির পদ্মবীজ চুরি করতে আসে৷ দুই মহলের দুটি ঘাটই শানবাঁধানো৷ কিন্তু মজার ব্যাপার, স্নান করার সময় যাতে দুই মহলের লোকেদের মধ্যে দেখাদেখি না হয় সেইজন্য একটা উঁচু ইটের পাঁচিল পুকুরের জল অবধি নেমে গেছে৷

এই সময়েই কর্নেল বলে উঠলেন, —মাই গুডনেস!

জিগ্যেস করলুম, —কী ব্যাপার? কিংকং-কে দেখতে পাচ্ছেন নাকি?

কর্নেল বললেন, —কিংকং-এরও সাধ্য নেই ওই পাহাড়ে ওঠে৷ অথচ একজন লাল কাপড় পরা ত্রিশূলধারী সান্ন্যাসীকে পাহাড়চূড়ার কাছাকাছি দেখতে পেলুম৷ লোকটির মাথায় চূড়ো করে বাঁধা জটা চুল৷

বললুম, —বাইনোকুলারটা দিন না, দেখি৷

কর্নেল বললেন, —সন্ন্যাসী কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা দিয়েই পাহাড়ের খাঁজে অদৃশ্য হল৷ ওখানে সে উঠল কীভাবে, বোঝা যাচ্ছে না৷

আমাদের পিছনে কুমারবাহাদুরের সাড়া পেলুন,—আসুন কর্নেলসাহেব, ব্রেকফাস্টের আয়োজন হয়ে গেছে৷

আমরা দু’জনে ঘরে ঢুকলুম, তারপর দেখলুম কুমারবাহাদুরের সঙ্গে একজন প্রৌঢ়া, হাতে বিশাল ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ অমিতেন্দ্র বললেন, —কষ্ট করে আপনাদের নিচের ডাইনিংয়ে নিয়ে গেলুম না৷ চুনিবালা, হাঁ করে কী দেখছিস? ওটা টেবিলে রাখ৷ এই সাহেবকে চিনতে পারছিস তো?

চুনিবালা করজোড়ে নমস্কার করে বলল, —সাহেবকে আমার মনে আছে বইকী৷ উনি মিলিটারির বড়ো অফিসার৷

কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, —তোমার কী খবর বলো চুনিবালা? কলকাতায় মেয়েকে মাঝে-মাঝে এখনও দেখতে যাও তো?

সে বলল,—যাই হুজুর৷ এই তো দু-সপ্তা আগে রাজবাড়িতে কালীপুজো হল, মেয়ে-জামাইকে নিয়ে এসেছিলুম৷

অমিতেন্দ্র বললেন, —আলাপ পরে করবি৷ এখন দেখ গিয়ে, নকুঠাকুর বাজারে যাবে৷ রাজুবাবুর কাছে টাকা চেয়ে নিয়ে লিস্টি করে দিবি, বাজার থেকে কী-কী আনবে৷

চুনিবালা চলে গেল৷ আমি জিগ্যেস করলুম, —আপনার এই পরিচারিকা নিশ্চয়ই বাঙালি?

অমিতেন্দ্র একটা চেয়ার টেনে বসে বললেন, —ওই দারোয়ান বাদে এ বাড়ির কাজের লোক সবাই বাঙালি৷

কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন, —আপনি রাজুর কথা বললেন৷ মার্চে এসে আপনার বাড়িতে এ-নামের কোনও লোক তো দেখিনি৷

অমিতেন্দ্র একটু চমকে উঠে বললেন, —হ্যাঁ, রাজু বাঙালি নয়৷ ওর নাম রাজীব শর্মা৷ আগে দক্ষিণ মহলের শুভেন্দুদার কেয়ারটেকার ছিল৷ আমার কলকাতার এই দাদাটির কথা আপনাকে আমি বলিনি৷ মহা ধুরন্ধর লোক৷ খামোকা বেচারাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল৷ তারপর একজন লোকাল বাঙালি, সমীর চাকলাদারকে রেখেছে৷ এই সমীরের পূর্বপুরুষ আমাদের পূর্বপুরুষের অধীনে একটা চাকলার দেখাশোনা করত৷ ঠাকুরদার কাছে শুনিছি জমিদারি আমলের চাকলার সব খাজনা আত্মসাৎ করে মিথ্যা রিপোর্ট পাঠাত৷ বংশের সেই দোষ যাবে কোথায়?... আপনারা চুপচাপ বসে কেন? ওই বেসিনে হাত ধুয়ে খাওয়া সেরে নিন৷

জিগ্যেস করলুম, —মিউনিসিপ্যালিটি থেকে কি জলের সাপ্লাই দেয়?

অমিতেন্দ্র গর্বিত হাসি হেসে বললেন,—আমাদের বাড়িতেই কুয়ো আছে৷ মুখ ঢাকা কুয়ো, যেখান থেকে দু’বেলা পাম্প চালিয়ে জল তুলে ওপরের ট্যাঙ্ক ভরে রাখার ব্যবস্থা করেছি৷ যদি বলেন দক্ষিণ মহলের কী অবস্থা? ইঁদারা! ইঁদারা থেকে কষ্ট করে জল তুলতে হয়৷ আমার দক্ষিণ মহলের দাদাটি একেবারে হাড়কেপ্পন৷ সামনের পয়লা বোশেখ থেকে এক বছরের জন্য ঠাকুরবাড়ির দায়িত্ব তার হাতে যাবে৷ স্থানীয় লোকেদের জিগ্যেস করলেই জানতে পারবেন, কালীপুজোর সময় কাঙালি ভোজন কবে থেকে তুলে দিয়েছে, আমি কিন্তু চালিয়ে যাচ্ছি৷

কর্নেল চুপচাপ খাচ্ছিলেন৷ লুচি, বেগুন ভাজা, আলুর দম আর সন্দেশ৷ আমার খিদে পেয়েছিল, আমিও চুপচাপ খাওয়ায় মন দিলুম৷

খাওয়া শেষ হলে অমিতেন্দ্র দরজার পাশে স্যুইচবোর্ডের একটা স্যুইচ টিপে দিলেন৷ একটু পরে চুনিবালা এসে ট্রে নিয়ে গেল৷ অমিতেন্দ্র বললেন,—কফি আনতে যেন দেরি করবি না৷

কর্নেল রুমালে হাত মুছে বললেন, —বাঃ, আমার জন্য সেই ইজিচেয়ারটাও এনে রেখেছেন! জয়ন্ত আমি কিন্তু এবার স্থান বদলাচ্ছি৷

বললুম, —আমিও বদলাব৷ এবং শুধু স্থান না, পোশাকও৷

অমিতেন্দ্র বললেন, —কর্নেল সাহেবের চালচলন থেকে এখনও মিলিটারি লাইফের কিছুই মুছে যায়নি৷ ভাগ্যিস আমার গিন্নি বেঁচে নেই৷ বেঁচে থাকলে ওঁকে আগে পোশাক বদলে, রগড়ে হাতমুখ দাড়ি ধুয়ে তবে খেতে দিতেন৷

বলে তিনি নিজেই হো-হো করে হেসে উঠলেন৷

চুনিবালা চুপচাপ একটা ট্রে-তে তিন পেয়ালা কফি রেখে গেল৷ অমিতেন্দ্র বললেন, —কর্নেলের দেখাদেখি আমিও কফির ভক্ত হয়ে উঠেছি৷

কফি খাওয়ার পর কর্নেল চুরুট ধরালেন৷ তারপর ধোঁয়ার রিঙ পাকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে হঠাৎ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কুমার বাহাদুরের দিকে তাকিয়ে বললেন, —ঠাকুরবাড়ির পিছনের পাহাড়টার নাম চণ্ডীপাহাড়—তাই না?

অমিতেন্দ্র মুখে ঈষৎ আতঙ্কের ছাপ ফুটিয়ে বললেন, —হ্যাঁ, আমি মন্দিরের পেছন থেকে সেই ভয়ংকর মূর্তিটাকে চণ্ডী পাহাড়ের দিকেই যেতে দেখেছি৷ অবশ্য চোখের ভুল হতেই পারে৷ তবে আমার টর্চের আলো খুব জোরালো ছিল৷ রায়পুরে যারা ওকে দেখেছে, তাদের বিশ্বাস; ওর বাস চণ্ডীপাহাড়ে৷

কর্নেল বললেন, —ওই পাহাড়ে কি কোনও গুহা আছে?

—থাকতে পারে৷ তবে পিছনের দিকে—পাহাড়টা যত উঁচু, তার চেয়ে বেশি চওড়া৷ কোথাও একটা প্রস্রবণ আছে, কারণ পাহাড়টা ঘুরে গেলে প্রায় হাফ কিলোমিটার দূরে একটা জলের নালা দেখতে পাবেন৷ খুব স্বচ্ছ জল৷ আদিবাসীদের এলাকা দিয়ে ওই ধারাটা বয়ে গেছে৷ তাই ওরা অনেকটা জায়গা কেটে পুকুরের মতো প্রস্রবণের জল ব্যবহার করে৷

কর্নেল এবার চাপাম্বরে বললেন, —ওই পাহাড়ে কি কোনও সাধু-সন্ন্যাসীকে আপনি কিংবা এখানকার কেউ দেখেছে?

অমিতেন্দ্রকে দেখলুম যেন ভীষণ চমকে উঠেছেন৷ চাপাস্বরে তিনিও বললেন, —আমি কখনও দেখিনি, কিন্তু এখানকার কেউ-কেউ বলে ওই পাহাড়ে একজন সন্ন্যাসী আছেন, তাঁর বয়স নাকি তিনশো বছর৷

কর্নেল বললেন, —আমি ব্যালকনি থেকে ওই পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় জটাজুটধারী লাল কাপড় পরা ত্রিশূল হাতে একজন সন্ন্যাসীকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখলুম৷

কথাটা শুনেই কুমারবাহাদুর আতঙ্কিত কণ্ঠস্বরে বললেন, —কর্নেলসাহেব, তাহলে যে-ভয়ংকর মূর্তিটাকে দেখেছি, সে ওই সন্ন্যাসীরই পোষা কোনও জানোয়ার৷ আমার ধারণা ছিল ওটা কোনও অতিপ্রাকৃত শক্তি, কিন্তু এবার মনে হচ্ছে ওটা আসলে জন্তু৷

চার

পোশাক বদলাব ভেবে আমি উঠতে যাচ্ছিলুম৷ কর্নেল বললেন,—জয়ন্ত, ব্রেকফাস্টের নামে এই গুরুভোজনের পর একটুখানি হাঁটা দরকার৷

বললুম,—হাঁটতে আপত্তি নেই, তবে আমি পাহাড়ে চড়তে পারব না৷ কারণ দৈবাৎ সাধুবাবা দেখে ফেললে, আমার পেছনে তাঁর পোষা কিংকংকে লেলিয়ে দেবেন৷

কর্নেল বললেন, —তোমার কাছে ফায়ার আর্মস আছে জয়ন্ত৷ কাজেই কিংকং ধরাশায়ী হবে৷

কুমারবাহাদুর হাসবার চেষ্টা করে বললেন, —আমার মনে হয় আপনাদের এখন কিছুক্ষণ বিশ্রাম করা উচিত৷ রাতে জেগে দীর্ঘ ট্রেনজার্নি করে এসেছেন৷

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —না, পাহাড়ে চড়তে যাচ্ছি না৷ ও পাহাড়ে চড়তে হলে যেসব সাজসরঞ্জাম দরকার, তা আমাদের কাছে নেই৷ আমরা শুধু মন্দিরের পেছন দিকের ওই মাঠটার অবস্থা দেখব৷

অমিতেন্দ্র অবাক হয়ে বললেন, —অবস্থা দেখবেন মানে?

কর্নেল তেমনই হেসে বললেন, —মার্চে এসে ওখানে লালঘুঘুদের একটা ঝাঁক দেখেছিলুম৷ এখন ন’টা বেজে গেছে৷ শিশির শুকিয়ে গেছে, কাজেই দুর্লভ প্রজাতির ঘুঘুদের অন্তত একটা ছবি ক্যামেরাবন্দি করতে পারলে আমার জীবন সার্থক৷

অমিতেন্দ্র গম্ভীর মুখে বললেন, —যান, তবে সাবধান থাকবেন৷

আমরা দু’জনে নিচে নেমে গেলুম, কুমারবাহাদুর নিচের বারান্দা দিয়ে এগিয়ে গিয়ে একটা খোলা ঘরের ভিতরে ঢুকে পিছন দিকের দরজাটা খুললেন৷ এবার দেখলুম, পিছনের দিকেও একটা বারান্দা আছে, তবে সেটার ওপর ছাদ নেই৷ বারান্দা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সামনে উঁচু দেওয়ালের গায়ে খিড়কির দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল৷ অমিতেন্দ্র বললেন, —আপনি এসে রায়দিঘির ঘাটে দাঁড়িয়ে সিনারি দেখবেন বলে ওই দরজায় তালা দিইনি৷ নইলে এটা তালাবন্ধই থাকে৷

কর্নেল বললেন, —আর আপনাকে কষ্ট করতে হবে না, এবার আমরাই বেরিয়ে যেতে পারব৷ তবে আপনি যেন দরজাটা আর ভেতর থেকে আটকে দেবেন না৷

অমিতেন্দ্র বললেন, —না, না, আপনারা এসে ডাকাডাকি করবেন, সেটা কি ঠিক হবে? দরজা ভেজানোই থাকবে৷

বেরিয়ে গিয়ে ঘাটের সামনে একটুখানি দাঁড়িয়ে থাকার পর কর্নেল রায়দিঘির উত্তরপাড় ঘুরে হাঁটতে থাকলেন৷ তাঁকে অনুসরণ করতে-করতে বললুম, —আপনি ফায়ার আর্মস-এর কথা বললেন কেন? সত্যি কি কোনও বিপদের ঝুঁকি আছে?

কর্নেল বললেন, —ঝুঁকি আছে৷ কারণ এবার আমি রায়পুরে এসেছি দুইপাশে যুযুধান দুটি পক্ষ রেখে৷ জয়ন্ত, সত্যে পৌঁছনো না পর্যন্ত আমি কোনও পক্ষকেই বিশ্বাস করি না৷ না শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরীকে, না অমিতেন্দ্র নারায়ণ রায়কে৷

কর্নেল সিরিয়াস ভঙ্গিতে কথাটা বললেও আমার হাসি পেল৷ বললুম,—একদিকে রায়, অন্যদিকে রায়চৌধুরী, মাঝখানে আপনি, আপনার পাশে আমি৷

এইবার কর্নেলের গাম্ভীর্য ভেঙে গেল৷ সহাস্যে বললেন, —তুমি অনেকটাই ঠিক ধরেছ, তবে সত্যি বলতে কী, আমার পক্ষে এ সাংঘাতিক ব্যালেন্সের খেলা৷ দড়ির ওপর ব্যালান্স রেখে হাঁটা৷ কাজেই তোমাকে বলেছি, সব সময়ই সতর্ক থাকবে৷ ঘরে বা বাইরে সব সময়ই আগ্নেয়াস্ত্রটা হাতের নাগালে রাখবে৷

ভেবেছিলুম কর্নেল মন্দিরে না ঢুকুন, অন্তত মন্দিরের পাশ দিয়ে যাবেন, কিন্তু তিনি কাঁটাতারের বেড়ার একটা প্রকাণ্ড ফোকর দিয়ে গলে নিচে নেমে গেলেন৷ ওদিকে ঘাসে ঢাকা মাটিটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে৷ ঝোপঝাড়ও প্রচুর৷ নিচে নেমে অসমতল রুক্ষ পাথুরে মাটিতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল রাজা ঐশ্বর্য নারায়ণ রায়ের সেই কাগজটার কথা৷ বললুম,—আচ্ছা কর্নেল, একটা ব্যাপারে আমার খুব খটকা লেগেছে৷ আপনার কুমারবাহাদুর আপনাকে দিয়ে আসা সেই কাগজটার সম্পর্কে কোনও কথা জিগ্যেস করলেন না৷ অথচ কাগজটি সম্পর্কে তাঁর প্রচণ্ড কৌতূহল লক্ষ্য করেছিলুম৷

কর্নেল বললেন, —হ্যাঁ, এটা আমিও লক্ষ্য করেছি৷ হঠাৎ যেন ওঁর কাগজটার সম্পর্কে আগ্রহ আর নেই৷ যাকগে! ও নিয়ে আপাতত আমার মাথাব্যথা নেই৷

—কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়?

—ভাগ্যে থাকলে লাল ঘুঘুর ঝাঁকের একটা ছবি তোলার চেষ্টা করব৷ তবে আমার প্রধান লক্ষ্য চণ্ডীপাহাড়৷ গত মার্চে এসেও দেখেছি, ওই পাহাড়ে ওঠা খুব সহজ নয়৷ কিন্তু এবার দেখলুম, এক সন্ন্যাসী পাহাড়ে বোধহয় বাস করেন৷ অতএব গুহা নিশ্চয়ই আছে৷

হাঁটতে-হাঁটতে বললুম, —আপনি সেই সন্ন্যাসীর কাছে পৌঁছনোর জন্য পাহাড়ে ওঠার রাস্তা খুঁজতে যাচ্ছেন? তাই না?

কর্নেল বললেন, —পাহাড়ে ওঠার পথ খুঁজতে হলে অনেক সময় দরকার৷ আমি শুধু কাছে গিয়ে বাইনোকুলারে সেই সন্ন্যাসীকে যেখানে দেখেছিলুম, সেই জায়গাটা একবার দেখে নেব৷

আমরা আরও কিছুটা হেঁটে গেছি, হঠাৎ একটা প্রকাণ্ড পাথরের আড়াল থেকে জিনস-এর প্যান্ট এবং স্পোর্টিং গেঞ্জি পরা বলিষ্ঠ চেহারার এক ভদ্রলোক আবির্ভূত হলেন৷ কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন৷ আমার ডান হাত প্যান্টের পকেটে রিভলভারের বাঁট ছুঁয়েছিল৷ কিন্তু ভদ্রলোক করজোড়ে নমস্কার করে বললেন, —কর্নেলসাহেব, আমার নাম সমীর চাকলাদার৷ গতরাতে কলকাতা থেকে রায়চৌধুরীসাহেব টেলিফোনে আমাকে জানিয়েছিলেন আপনি রায়পুরে আসছেন৷

কর্নেল একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, —তা আপনি কি আমার সঙ্গে আলাপ করার জন্যই এখানে চলে এলেন?

সমীরবাবু কাঁচুমাচু হেসে বললেন, —আপনি ঠিক ধরেছেন৷ দক্ষিণ মহলের দোতলার কাচের জানলা থেকে আপনাদের দেখতে পেয়েছিলুম৷ আপনি কুমার বাহাদুরের অতিথি৷ পাছে উনি কিছু মনে করেন তাই এভাবেই আলাপ করতে এলুম৷

কর্নেল বললেন, —এখানে একটা গুজব রটেছে, যক্ষরক্ষ পিশাচ, নাকি কিংকং জাতীয় ভয়ংকর শক্তির উপদ্রবে সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত রায়পুরের লোকেরা নাকি বাড়ি থেকে বেরোয় না৷

সমীরবাবু একটু হেসে বললেন, —গুজবটা রটেছে, তা ঠিক; কিন্তু এর পিছনে আছেন আপনাদের হোস্ট কুমারবাহাদুর৷

কর্নেল বললেন, —কিন্তু এমন গুজব রটিয়ে তাঁর লাভ কী?

সমীরবাবু একবার পিছন ঘুরে উঁচুতে রাজবাড়িটা দেখে নিয়ে বললেন, —ওঁর কী লাভ সেটা আমি এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি৷ তবে রায়চৌধুরী সাহেবের আগের কেয়ারটেকার রাজু, মানে রাজীব শর্মা দুর্বৃত্ত লোক৷ সে এখন কুমার বাহাদুরের বাড়ির কেয়ারটেকার হয়েছে৷ আমার শোনা কথা, দক্ষিণ মহলে থাকার সময় সে নাকি কী একটা গোপন দলিল খুঁজে পেয়েছিল৷ দলিলটা যে কুমার বাহাদুরের হাতে সে দিয়েছে, এতে কোনও ভুল নেই৷

—দলিল নিয়ে কী হবে?

সমীরবাবু এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে বললেন, —দলিলে নাকি ওঁদের পূর্বপুরুষ রাজা ঐশ্বর্য নারায়ণ রায়ের লুকিয়ে রাখা প্রচুর ধনরত্নের খবর আছে৷ এখন দু’জনে মিলে রাত্রিবেলা সেই গুপ্তধন খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে৷ আমার ধারণা গুপ্তধন এমন জায়গায় রাখা আছে, যেখানে দিনেরবেলা খোঁড়াখুঁড়ি করলে লোকের চোখে পড়বে৷ তাই ভয়ংকর শক্তির আবির্ভাবের কথা রটিয়ে ওরা নির্বিঘ্নে রাত্রিবেলা কাজটা সেরে নিতে চায়৷

কর্নেল বললেন, —ওরা সে কাজ আরম্ভ করেছেন না করেননি—আপনার কী ধারণা?

সমীরবাবু বললেন, —ঠিক জায়গাটা এখনও বোধহয় খুঁজে বের করতে পারেননি৷ তাই এলাকার কোথাও ঘোরাঘুরি করে আমি খোঁড়াখুঁড়ির চিহ্ন দেখতে পাইনি৷

কর্নেল বললেন, —ঠিক আছে৷ প্রয়োজনে আপনার সাহায্যও আমি নেব৷

সমীরবাবু বললেন, —কলকাতা থেকে রায়সাহেব আমাকে বলেছেন, সেই গুপ্তধনে তাঁরও অর্ধেক অংশ আছে৷ অবশ্য যদি গুপ্তধনের কথাটা সত্যি হয়৷ কাজেই আমি সবসময় ওদের দিকে চোখ রেখে চলছি৷

কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, —আপনি কি সারারাত জেগে থাকেন তাহলে?

—আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আমার মাথায়ও একটা জেদ চেপেছে৷ কারণ সত্যি গুপ্তধন পেয়ে গেলে তা কুমার বাহাদুরের বদলে ওই দুর্বৃত্ত রাজুই সব আত্মসাৎ করবে৷ আচ্ছা এবার আমি চলি স্যার৷ আমার এই ফোন নাম্বারটা আপনি রেখে দিন৷ দরকার হলেই ফোন করবেন৷ আর আমিও আপনাকে একটা ভুয়ো নামে ফোন করব৷

সমীরবাবু চলে যাচ্ছেন৷ কর্নেল পিছু থেকে বললেন, —সমীরবাবু, একটা কথা আপনার কাছে জানতে চাই৷ আপনি কি চণ্ডীপাহাড়ে কখনও কোনও সন্ন্যাসীকে দেখেছেন?

সমীরবাবু বললেন, —আমি নিজের চোখে দেখিনি স্যার৷ কিন্তু আদিবাসীদের কাছে শুনেছি, চণ্ডী পাহাড়ের গুহায় এক সাধুবাবা থাকেন৷ তিনি নাকি মন্ত্রবলে উড়ে ওই পাহাড়ের গুহায় যাতায়াত করেন৷

এই বলে সমীরবাবু পাথরের আড়ালে গুড়ি মেরে উধাও হয়ে গেলেন৷

কর্নেল বাইনোকুলার তুলে বিশাল উঁচু নগ্ন পাহাড়ের ওপর দিকে কী দেখতে-দেখতে একবার থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর পূর্বদিকে পাহাড়টার সমান্তরাল হাঁটতে থাকলেন৷ কিন্তু আবার লক্ষ্য করলুম, তিনি মাঝে-মাঝে থমকে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখছেন৷ এবার জিগ্যেস না করে পারলুম না৷

—কিছু সন্দেহজনক কি আপনার চোখে পড়ছে?

কর্নেল বাইনোকুলার নামিয়ে একটু হেসে বললেন, —না৷ তবে ওই যে কথায় আছে, রজ্জুতে সর্পভ্রম৷ আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, সাধুবাবা আড়াল থেকে আমার ওপর নজর রেখেছে৷

কথাটা বলে তিনি আবার পূর্বদিকে পা বাড়ালেন৷

আমি লক্ষ্য করছিলুম, পাহাড়টা আমাদের কাছ থেকে বড়োজোর দশ-পনেরো মিটার দূরে, কোথাও সোজা আবার কোথাও কোণাকুণি হয়ে গেছে৷ কিন্তু এ পাহাড়ে চড়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব বললেই চলে৷

হঠাৎ কর্নেল ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন,—আচ্ছা জয়ন্ত, সমীরবাবুকে দেখে তোমার কী মনে হল?

বললুম, —ভদ্রলোক শিক্ষিত এবং বেশ স্মার্ট৷

কর্নেল আবার হাসতে থাকলেন৷ এবার বললুম, —আপনি কি পাহাড়টার চারদিকে ঘোরাঘুরি করতে চান? আমার কিন্তু ক্লান্তি আসছে৷

কর্নেল বললেন, —পাহাড়টা আমি গত মার্চে এসে দেখে গেছি৷ এটা পূর্ব-পশ্চিমে তত বেশি লম্বা নয়, কিন্তু উত্তর-দক্ষিণে অনেক বেশি লম্বা৷ আর এর শিখরের উচ্চতা অন্তত সাত-আটশো ফুট তো হবেই৷

বললুম, —পাহাড়টা আপনার চেনা৷ তাহলে আবার নতুন করে কী দেখতে চান? সাধুবাবার দর্শন আপনি আর পাবেন বলে মনে হয় না৷

কর্নেল বললেন, —না, আর একটু কষ্ট করো৷ সামনে পাহাড়টা যেখানে দক্ষিণ দিকে ঘুরেছে, ওখানটা দেখে আসি৷

আমার অবস্থা ততক্ষণে শোচনীয়৷ কর্নেলের পাল্লায় পড়লে এমনই ধকল সইতে হবে তা আমার বরাবরই জানা৷

অবশেষে পাহাড়টা যেখানে দক্ষিণ দিকে ঘুরেছে, সেখানে পৌঁছে কর্নেল বাইনোকুলারে সেদিকটা দেখে নিয়ে বললেন, —এদিকটা লক্ষ্য করছ জয়ন্ত? সাজসরঞ্জাম থাকলে এদিক দিয়ে পাহাড়ের মাঝামাঝি জায়গা পর্যন্ত ওঠা যায়৷

ভয় পেয়ে বললুম, —আপনার কিটব্যাগে পাহাড়ে চড়ার সরঞ্জাম তো থাকার কথা৷ আপনি কি সত্যি ওখানে উঠতে চান?

কর্নেল সহাস্যে বললেন, —মোটেও না৷ আমার কিটব্যাগে এ পাহাড়ে চড়ার সরঞ্জাম থাকার কথা নয়৷ আসলে মার্চে এসে দেখেছিলুম, ওই চাতালের পাশে একটা বেঁটে গাছ গজিয়েছে৷ সেই গাছটা এই ক’মাসের মধ্যে অত প্রকাণ্ড হল কী করে, বুঝতে পারছি না৷ যাকগে, এবার চলো ফেরা যাক৷

এবার কর্নেল রুক্ষ পাথুরে জমিটার ওপর দিয়ে পশ্চিম-উত্তর কোণে রাজবাড়ির দিকে লক্ষ্য রেখে হাঁটতে থাকলেন৷ এবার আমার স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল৷ এই খামখেয়ালি বৃদ্ধ মানুষটির এই ধরনের আচরণের উদ্দেশ্য বোঝা আমার পক্ষে অসম্ভব৷ তবে আমার মনে হল, উনি নিশ্চয়ই বিনা উদ্দেশ্যে পাহাড়ের কাছে এসে এতক্ষণ ঘোরাঘুরি এবং দেখাদেখি করেননি৷ সম্ভবত যথাসময়ে ব্যাপারটা জানা যাবে৷ চালু ঘাসে ভরা মাটির ওপর দিয়ে তারকাঁটার ফোকর গলে আমরা পুকুরের পাড়ে উঠলুম৷ তারপরই দেখলুম, কুমারবাহাদুর অমিতেন্দ্র নারায়ণ ঘাটের সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন৷ কাছে গেলে তিনি বললেন,—চণ্ডী পাহাড়ের কাছে গিয়েছিলেন নাকি?

কর্নেল বললেন, —গিয়েছিলুম, কিন্তু সাধুবাবার দর্শন পেলুম না৷

অমিতেন্দ্র বললেন, —আপনারা যাওয়ার পর আমার একটু ভয় হচ্ছিল৷ রাজু বাইরে থেকে ফিরে এসে আপনাদের কথা জিগ্যেস করছিল, আপনারা চণ্ডী পাহাড়ের দিকে গেছেন কিনা৷ গিয়ে থাকলে আমার নাকি বারণ করা উচিত ছিল৷ যাই হোক, নিরাপদে ফিরেছেন দেখে আমার স্বস্তি হচ্ছে৷

খিড়কির দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলুম৷ তারপর দেখলুম, গাঁট্টাগোট্টা চেহারার একজন মধ্যবয়সি লোক বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে৷ তার পরনে হাফপ্যান্ট এবং গায়ে জংলা ছাপের হাফশার্ট৷ তার জুলপি যেমন মোটা এবং লম্বা, তেমনি গোঁফও প্রকাণ্ড৷ দুই ডগা সুঁচোলো৷ মনে হল নিয়মিত গোফের দুই ডগা সে পরিচর্যা করে৷ কিন্তু কর্নেলকে এবং আমাকে করজোড়ে নমস্কার করে যখন হাসল, তখন তার মুখের ভাবে তাকে সরল বলেই মনে হল৷

অমিতেন্দ্র বললেন, —এই দ্যাখো রাজু, ইনিই সেই কর্নেলসাহেব৷

লোকটা তেমনই হেসে বলল, —ক’মাস আগে কর্নেলসাহেব এসেছিলেন, আমি দক্ষিণ মহলের ছাদ থেকে ওঁকে দেখেছিলুম৷ কাজেই আমি ওঁকে দেখামাত্র চিনতে পেরেছি৷

অমিতেন্দ্র বললেন, —কর্নেলসাহেব আবার কফি খাবেন৷ রাজু, তুমি গিয়ে চুনিবালাকে শিগগির কফি করে ওপরের ঘরে নিয়ে আসতে বলো৷

এরপর দোতলায় আমাদের থাকার ঘরে গিয়ে আমি পোশাক বদলে নিলুম৷ কর্নেলও পোশাক বদলে নিলেন৷ অমিতেন্দ্র দোতলায় আমাদের পৌঁছে দিয়েই নেমে গিয়েছিলেন৷ এইসময় আমার মাথায় একটা প্রশ্ন এল৷ বললুম, —আচ্ছা কর্নেল, মার্চে এসে আপনি এই রাজবাড়ির দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়াঝাটি থাকার কথা কি টের পাননি?

কর্নেল কেমন যেন অবাক হয়ে গেলেন৷ বললেন, —ঝগড়াঝাঁটি? একজন তো কলকাতায়, আর একজন এখানে৷ ঝগড়াঝাঁটিটা হবে কী করে?

বললুম, —আচ্ছা, ঝগড়াঝাঁটি মানে, আমি বলতে চাইছি—

কর্নেল আমার কথার ওপর বলে উঠলেন,—শত্রুতা৷

এই সময়ই চুনিবালা কফির ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকে বলল,— কর্নেলসাহেব, ছোটো দিনের বেলা৷ বারে-বারে কফি না খেয়ে একেবারে খেয়ে নিলেই পারতেন৷

কর্নেল বললেন,—মোটে তো এগারোটা বাজে৷ তুমি ভুলে গেছ, আমি একটার আগে খাই না৷

চুনিবালা হঠাৎ দরজার দিকে গিয়ে বাইরের বারান্দাটা দেখে নিয়ে ভিতরে এল৷ তারপর কর্নেলকে চাপাস্বরে বলল,—কর্নেলসাহেব, একটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি৷ ওই রাজু বজ্জাতটা এ-বাড়িতে আসার পর কুমার বাহাদুরের কানে কীসব ফুসমন্তর দিয়েছে, উনি রাজুর কথাই মেনে চলছেন৷ এমনকী জামাইবাবুও রাজুকে পছন্দ করেন না৷ ওই যে রাতবিরেতে রায়পুরে পিচাশের উপদ্রব হয়েছে বলে গুজব রটেছে—

তার কথার ওপর কর্নেল বলে উঠলেন, —তোমাদের কুমার বাহাদুরও তো টর্চের আলোতে স্বচক্ষে পিশাচটাকে দেখেছেন৷

চুনিবালা ফিসফিস করে দু-হাত নেড়ে বলল, —মিথ্যে, একেবারে মিথ্যে৷ উনি রাজুর শেখানো বুলি বলছেন৷ আসল কথাটা আমি আপনাকে সময় পেলে বলব৷ দেখি গিয়ে নকুঠাকুরের রান্না কতদূর হল৷

কথাটা বলে সে বেরিয়ে গেল৷ কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম,—কর্নেল, ব্যাপারটা বড্ড গোলমেলে ঠেকছে৷

কর্নেল কিছু বলার আগেই বারান্দায় পায়ের শব্দ হল, এবং কুমারবাহাদুর পরদা তুলে ঘরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলেন৷ তারপর বললেন, —কর্নেলসাহেব ভাবতে পারেন, আমি কেন আপনাকে সেই কাগজটার কথা জিগ্যেস করিনি৷ আসলে ওই কাগজের অবিকল একটা কপি কলকাতা থেকে ফিরে এসেই নিচের তলার পুরোনো মালঘরে একটা সিন্দুকের মধ্যে পেয়েছি৷ আমার কপিটা কিন্তু পোকায় কাটা অত পুরোনো নয়৷ হাতের লেখা আমার ঠাকুরদার৷ ঠাকুরদা আমাদের পূর্বপুরুষ ঐশ্বর্য নারায়ণ রায়ের রচিত একটা মাতৃবন্দনা কপি করে রেখেছিলেন৷ আমি হাতের লেখা স্পষ্ট পড়তে পেরেছি৷ একালের লেখা তো! এখানকার স্কুলের সংস্কৃতের পণ্ডিতমশাইকে ওটা পড়িয়েছি৷ তিনি হিন্দিভাষী৷ তাই ইংরেজিতে আমাকে অনুবাদ করে দিয়েছেন৷ এটা আদতে কোনও গোপন দলিলই নয়৷

‘এই দেখুন’ বলে তিনি পকেটে হাত ঢুকিয়ে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করে কর্নেলকে দিলেন৷

কর্নেল বললেন, —আমিও ওটার বাংলা অনুবাদ করে নিয়ে এসেছি৷

অমিতেন্দ্র ব্যস্তভাবে বললেন, —দুটোর মধ্যে তফাত কি কিছু দেখতে পাচ্ছেন?

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —শুধু একটাই তফাত৷ বাণ, পক্ষ, সিন্ধু, এগুলো আপনার কপিতে নেই৷

পাঁচ

কুমারবাহাদুর চমকে উঠে বললেন, —বাণ পক্ষ সিন্ধু? আমার ঠাকুরদার কপিতে তো এসব কিছু নেই৷ থাকলে শাস্ত্রীমশাই ঠিকই ইংরেজিতে লিখে দিতেন৷ কই দেখি-দেখি আপনার কপিটা৷

কর্নেল টেবিলে রাখা তাঁর কিটব্যাগের চেন খুলে ল্যামিনেশন করা মূল কপি এবং একটা কাগজে তার বাংলা অনুবাদ বের করে অমিতেন্দ্রকে দিলেন৷ সেই সঙ্গে তিনি ইংরেজি কপিটাও তাঁকে মিলিয়ে দেখতে দিলেন৷

অমিতেন্দ্র বাংলা কপিটাতে দ্রুত চোখ বুলিয়ে বললেন,—আশ্চর্য তো! আমার ঠাকুরদা কি তাহলে কপি করতে ভুল করেছিলেন?

কর্নেল বললেন, —সম্ভবত তাই হবে৷ ভুল করা স্বাভাবিক৷

অমিতেন্দ্রকে চঞ্চল দেখাচ্ছিল৷ তিনি বিড়বিড় করে বলছিলেন, —বাণ পক্ষ সিন্ধু? কর্নেলসাহেব, আমার মনে হচ্ছে মূল কপিটা ছিল ঠাকুরদার বাবার কাছে৷ আমার ঠাকুরদা আর শুভেন্দুর ঠাকুরদা ছিলেন পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই৷

কর্নেল বললেন, —হ্যাঁ, আমি জানি৷ তাই এখন আমার মনে হচ্ছে, এমন হতেও পারে, আপনার ঠাকুরদা তাঁর বাবার অগোচরে কপি করতে গিয়ে কোনও কারণে এই শব্দগুলো না লিখেই থেমে গিয়েছিলেন৷

অমিতেন্দ্রের মুখে চমক লক্ষ্য করলুম৷ উনি চাপাস্বরে বললেন,—আপনার অনুমান ঠিক বলেই মনে হচ্ছে৷ লুকিয়ে কপি করতে গিয়ে হয়তো, সেই সময়েই বাধা পড়েছিল৷ কিন্তু বাণ পক্ষ সিন্ধু, হঠাৎ এসব শব্দ কেন? আপনি কি এটা আমার মতোই কোনও সংস্কৃত পণ্ডিতের কাছে অনুবাদ করিয়ে নিয়েছেন?

কর্নেল বললেন, —তিনি সংস্কৃতের পণ্ডিত বটে, তবে তিনি একজন বিখ্যাত অধ্যাপক৷ ওঁর গবেষণার বিষয় প্রাচীন ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্ব৷

অমিতেন্দ্র আরও চঞ্চল হয়ে বললেন, —তাহলে তো তাঁর পক্ষে এসব শব্দ কেন আছে তা বলা সম্ভব৷ কী বলেছেন তিনি?

কর্নেল বললেন, —অধ্যাপকমশাই বলেছেন, কালীমাতার বন্দনা উপলক্ষ্য মাত্র৷ আসলে সংস্কৃত ভাষার শব্দগুলোর অনেক রকম অর্থ করা যায়৷ কাজেই এই বন্দনার মধ্যে সম্ভবত গুপ্তধনের সংকেত আছে৷

—গুপ্তধন? বলে অমিতেন্দ্র রায় নড়ে উঠেছিলেন৷ একটু পরে জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,—আমাদের বংশে একটা কাহিনি চালু আছে৷ রাজা ঐশ্বর্য নারায়ণ ছিলেন নবাব আলিবর্দির আমলে একজন সামন্ত রাজা৷ বর্গি দমনে নবাবকে তিনি—

কর্নেল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, —সে কাহিনি আমার জানা৷ বর্গিদের লুণ্ঠিত ধনরত্ন ঐশ্বর্য নারায়ণ কেড়ে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন৷ নবাবকে তা জানতে দেননি৷

অমিতেন্দ্র তখনও বিড়বিড় করে আপনমনে আওড়াচ্ছিলেন,—বাণ পক্ষ সিন্ধু—বাণ পক্ষ সিন্ধু—

এই সময়েই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, —বাণ মানে পঞ্চবাণ৷ পক্ষ মানে শুক্লপক্ষ কৃষ্ণপক্ষ —এই দুই পক্ষ৷ সিন্ধু মানে সপ্তসিন্ধু৷ কাজেই আমার মনে হচ্ছে ওটার অর্থ—পাঁচ, দুই, সাত৷ পাঁচশো সাতাশ৷

কর্নেল হেসে উঠলেন৷ চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, —বাঃ! কুমারবাহাদুর, জয়ন্ত হেঁয়ালির সমাধান করে দিয়েছে পাঁচশো সাতাশ৷ এবার আপনি নিজেই চিন্তা করে দেখুন, এটা কী হতে পারে?

অমিতেন্দ্রের দুই চোখে যেন গুপ্তধনের লালসা চকচক করছে দেখছিলুম৷ তিনি চাপাম্বরে বললেন, —ব্যাপারটা সত্যি চিন্তা করে দেখতে হবে৷

কর্নেল যেন তাঁকে তাতিয়ে দিতেই বললেন, —মনে হচ্ছে এটা অঙ্কের খেলা৷ যার মধ্যে গুপ্তধনের সূত্র লুকিয়ে আছে৷ পাঁচ যুক্ত দুই, সমান সাত৷ আবার সাত বিযুক্ত পাঁচ, সমান দুই৷

আলোচনায় বাধা পড়ল৷ চুনিবালা একটু হেসে সাড়া দিয়ে ঘরে ঢুকল৷ সে এঁটো কাপগুলো ট্রে-তে তুলে নিয়ে চলে গেল৷

তারপর অমিতেন্দ্র খুব আস্তে বললেন, —এই যে চুনিবালাকে দেখছেন, সাবধান কর্নেলসাহেব, ওর খুব আড়ি পাতার অভ্যেস আছে৷ জানি না, এতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে আমাদের কথা শুনছিল কিনা৷

কর্নেল বললেন, —ঠিক আছে, আপনি ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করে দেখুন৷ বরং আপনার জামাই শোভনলাল ফিরে এলে তার সঙ্গে গোপনে আলোচনা করতে পারেন৷ কিন্তু কখনওই যেন আপনার নতুন কেয়ারটেকার রাজীব শর্মাকে এসব কোনও কথা বলবেন না৷

অমিতেন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, —পাগল! গুপ্তধন বলে কথা! রাজু যদি জানত, এই কাগজটাতে কী আছে, তাহলে কি আমার হাতে সে তুলে দিত?

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, —রাজু এটা পেল কী করে, তা কি আপনি জানেন?

অমিতেন্দ্র ফিসফিস করে বললেন, —রাজবাড়ির গুপ্তধনের কথা সে জানে৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শুভেন্দুর বাড়ি থেকে কথাটা যেভাবেই হোক তার কানে এসেছিল, তাই সে দক্ষিণ মহলের কোণের ঘরের সিন্দুকের তালা ভেঙে কাগজপত্র খুঁজত৷ আমাকে সে এ-কথা বলেছে৷ কারণ সে-ও যে গুপ্তধনের অংশ পেতে চায়, তার হাবভাব দেখে আমি সে সন্দেহ করেছি৷ দক্ষিণমহল থেকে তার চাকরি গিয়েছিল ওই সিন্দুকের তালা ভাঙার জন্য৷ কাজেই আমি তাকে বাইরে যতই তুষ্ট রাখি, অন্তরে-অন্তরে কিন্তু ওকে ততই অবিশ্বাস করি৷ আচ্ছা আপনারা বিশ্রাম করুন৷ বলে তিনি কাগজগুলো ভাঁজ করে পকেটে ঢোকালেন৷ শুধু কর্নেলকে যেটা দিয়েছিলেন, সেটা কর্নেলের হাতেই রেখে গেলেন৷

বেলা একটায় নিচের ডাইনিং রুমে খেয়ে এসেছিলুম৷ কুমার বাহাদুরও আমাদের সঙ্গে খেয়ে নিয়েছিলেন৷ তারপর দোতলায় আমাদের ঘরে ফিরে এসে বিছানায় গড়িয়ে পড়েছিলুম৷ বেশ কনকনে শীত৷ কম্বল মুড়ি দিতে হয়েছিল৷ কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন৷ একে রাতের ট্রেন জার্নিও তার ওপর দুপুরবেলা ভাতঘুমের অভ্যাস, ভাবছিলুম কর্নেলও ট্রেন জার্নি করেছেন এবং এখানে পৌঁছেও খুব ঘোরাঘুরি করেছেন৷ অতএব তিনিও কম্বল মুড়ি দিয়ে বিশ্রাম নেবেন৷

কিন্তু কর্নেল আমার দিকে পিছু ফিরে বসে থাকা অবস্থায় গম্ভীরস্বরে বলে উঠলেন, —ঘুমিও না জয়ন্ত, একঘণ্টা পরে বেরুতে হবে৷

বিরক্তি চেপে বললুম, —আপনি কি গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে গেছেন যে বিশ্রাম না নিয়েই বেরুতে চান?

কর্নেল বললেন, —তা পেয়েছি বলতে পারো৷ পাঁচ দুই সাত—জয়ন্ত এরইমধ্যে গুপ্তধনের সূত্র লুকোনো আছে৷

তড়াক করে বিছানা থেকে উঠে পড়লুম৷ তারপর দেখি, কর্নেল মিটিমিটি হাসছেন৷ তখনই বুঝতে পারলুম, গুপ্তধনের কথাটা নিছক রসিকতা৷ বললুম, —এখন যদি আমি আবার কম্বল মুড়ি দিই, আমি আর উঠতেই পারব না৷ কাজেই যদি বেড়িয়ে পড়তেই হয় এখনই বেরিয়ে পড়ুন৷

কর্নেল বললেন, —বাঃ, খাসা কথা বলেছ! বেরিয়ে যদি পড়তেই হয় তবে এখনই৷ কিন্তু মনে রেখো ওভারকোট জাতীয় কোনও পোশাক নয়৷ তোমার সবচেয়ে ভালো জ্যাকেটটি পরলেই চলবে৷ মাথায় মাঙ্কি ক্যাপই যথেষ্ট, আর পকেটে—আশাকরি কী বলছি বুঝতে পেরেছ?

—বুঝেছি৷ লোডেড ফায়ার আর্মস৷ কিন্তু কর্নেল, যদি সত্যিই পিশাচ বা কিংকং হামলা করে একটা দুটো গুলি দিয়ে সেটাকে ঠেকানো যাবে?

কর্নেল জ্বলন্ত চুরুটটা অ্যাশট্রে-তে রেখে বললেন, —ঠেকানো যাবে যদি তুমি বেশি নয়, মাত্র এক রাউন্ড ফায়ার করো৷ তবে সাবধান, কখনও কিংকংয়ের বুকে নয়, মাথার ওপর দিয়ে গুলি ছোটাবে৷

হাসতে-হাসতে তিনি বাথরুমে গেলেন, তারপর পোশাক বদলাতে শুরু করলেন৷

সেজেগুজে কর্নেলকে অনুসরণ করলুম৷ মাঙ্কিক্যাপটা জ্যাকেটের পকেটে গুঁজে রাখলুম৷ কারণ বাইরে এখন ঝকমকে রোদ্দুর৷

আমরা নিচের হলঘর দিয়ে বেরুতে যাচ্ছি, সেইসময় দেখলুম, কুমারবাহাদুর এক ভদ্রলোককে ঘরে ঢোকাচ্ছেন৷ গাড়িবারান্দার তলায় একটা ঝকঝকে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে৷ খুব দামি গাড়ি, তা না হলে শব্দ শোনা যেত৷ আজকাল বিদেশের মতোই শব্দহীন গাড়ি এদেশে বিত্তবানরা ব্যবহার করছেন৷

আমাদের দেখে অমিতেন্দ্র বললেন, —আপনারা বেরুচ্ছেন নাকি? এক মিনিট, আলাপ করিয়ে দিই৷ ইনি এখানকার বিখ্যাত ব্যবসায়ী মিস্টার মফতলাল ঝুনঝুনওয়ালা৷

ভদ্রলোকের পরনে বাদামি রঙের পাঞ্জাবি, আর ছাই রঙা জহরকোট৷ পরনের ধুতি উজ্জ্বল সাদা৷ হাঁটু অবধি মোজা পরা, পায়ে দামি পাম্প-শু৷ তাঁর একহাতে একটা ব্রিফকেস৷ আর অন্যহাতের চারটে আঙুলে রত্নবসানো সোনার আংটি৷ মাথার চুল ধুতির মতোই উজ্জ্বল সাদা৷ তিনি আমাদের সঙ্গে নমস্কার বিনিময় করলেন৷ ততক্ষণে অমিতেন্দ্র আমাদের পরিচয়ও তাঁকে দিয়েছেন৷ ভদ্রলোকের মুখে কেমন যেন গাম্ভীর্যের ছাপ৷

কর্নেল বললেন,—আচ্ছা মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা, পরিচয় পেয়ে খুশি হলুম৷

তিনি কর্নেলকে যেন গ্রাহ্যই করলেন না৷ আমরা দরজার বাইরে বেরিয়ে যেতে-যেতে অমিতেন্দ্রের কথা শুনতে পেলুম৷ তিনি ভদ্রলোককে ওপরে তাঁর ঘরে যেতে অনুরোধ করছেন৷ গাড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে গেছি, এমনসময় রাজীব শর্মা আমাদের দেখে কপালে একবার হাত ঠেকিয়ে হন্তদন্ত হলঘরের ভিতরে গিয়ে ঢুকল৷

লনে হাঁটতে-হাঁটতে বললুম, —কর্নেল, কলকাতার যে মাড়োয়ারি কোম্পানি এই রাজবাড়ি কিনতে চান, এই ঝুনঝুনওয়ালা নিশ্চয়ই তাঁদের স্থানীয় প্রতিনিধি৷

কর্নেল বললেন, —তা হতেও পারে৷ তবে আমার মনে হচ্ছে, এই ভদ্রলোককে কোথায় যেন দেখেছি৷

গেটের কাছে দারোয়ান দাঁড়িয়ে ছিল৷ সে সেলাম ঠুকে বলল,—কর্নেল সাহাবকে একটা কথা বলব৷

কর্নেল বললেন, —কী কথা বলবে বলো৷

সে চাপাস্বরে বলল, —হুজুর, সে-বারকার মতো যদি জঙ্গলে যান, হুঁশিয়ার থাকবেন৷ আর সন্ধ্যার আগেই যেন ফিরে আসবেন৷

কর্নেল গম্ভীর মুখেই জিগ্যেস করলেন, —তুমি যা বলতে চাও, তা বুঝতে পেরেছি ভজুয়া৷ রায়পুরে নাকি ভয়ংকর একটা জানোয়ার এসেছে৷ তুমি নিজে তাকে দেখেছ কি?

দারোয়ান দু-হাত জোড় করে মাথার ওপর তুলে ভগবানকে নমস্কার করে বলল, —না হুজুর৷ লেকিন কুমারবাহাদুর দেখেছেন৷ আরও অনেকে দেখেছে৷

কর্নেল পা বাড়িয়ে হঠাৎ ঘুরে বললেন,—আচ্ছা ভজুয়া, যে ভদ্রলোক গাড়ি নিয়ে তোমার কুমারবাহাদুরের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, তিনি কি রায়পুরে ব্যাবসা করেন?

—হাঁ হুজুর৷ লেকিন কলকাত্তাই উনহির দাদা বেওসা করেন৷

এইবার কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —আচ্ছা ভজুয়া, তোমার কুমারবাহাদুর কি এই রাজবাড়ি ওঁদের বিক্রি করে দিতে চান?

দারোয়ানের মুখে যেন কালো মেঘ ঘনিয়ে এল৷ সে খুব চাপাস্বরে বলল, —হুজুর, ওই হারামি রাজু আমার মালিককে এই রাজবাড়ি বেচতে রাজি করিয়েছে৷ রাজুর মতলব ভালো না৷ হুজুর কর্নেলসাব, আমি যা বললুম, তা যেন আর কেউ জানতে না পারে৷

সেই প্রাইভেট রোড দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে বড়ো রাস্তায় পৌঁছলুম৷ আমাদের বাঁ-দিক থেকে সেইসময় একটা সাইকেল রিকশা এসে থামল৷ দেখলুম, রিকশাতে চুনিবালা বসে আছে৷ তার হাতে একটা চটের থলে৷ আমাদের দেখে সে বলল, —কর্নেল সাহেবের সময়-অসময় নেই যেখানে যাচ্ছেন আপনারা যান, তবে সন্ধ্যার আগে যেন বাড়ি ফিরবেন৷

বলে সে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে দিল৷ রিকশাওয়ালা ভেবেছিল আমরা তার রিকশায় চাপব৷ কিন্তু কর্নেল হাত নেড়ে তাকে চলে যেতে ইশারা করলেন৷

সাইকেল রিকশা চলে গেলে চুনিবালা বলল, —আপনার জন্যে ভালো কফি আর কুমার বাহাদুরের জন্যে ওষুধপত্র কিনে আনলুম৷

কর্নেল বললেন, —কিন্তু চুনিবালা, তুমি তো তখন বলছিলে, কুমারবাহাদুরের পিশাচ দেখার ব্যাপারটা একেবারে মিথ্যে৷ উনিই নাকি গুজব রটিয়েছেন৷ তাহলে আমাদের সাবধান করে দিচ্ছ কেন?

চুনিবালা অভ্যাস মতো এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে নিয়ে চাপাস্বরে বলল, —ওই বজ্জাত রাজুকে কিচ্ছু বিশ্বাস নেই৷ আপনারা কুমারবাহাদুরের ভালো করতে এসেছেন ভেবে সে আপনাদের ক্ষতি করতে পারে৷ ওই গুন্ডার সর্দারটা এই বাড়িতে যেচে পড়ে কেন ঢুকেছে তা আমি জানি৷

—কেন বলো তো?

—জামাইবাবু আর দিদিমণি এ বাড়ি বেচতে দিতে চান না৷ দেখুন না জামাইবাবু ফিরে আসুক, তারপর রাজুকে যাতে সে বাড়ি থেকে তাড়ায় তার ব্যবস্থা করে ছাড়ব৷

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —বাড়ির খদ্দের একজন ঝুনঝুনওয়ালা একটু আগে রাজবাড়িতে ঢুকেছে, তা জানো? গিয়েই তাঁর ঝাঁ-চকচক গাড়ি দেখে তোমার চোখ জ্বলে যাবে৷

চুনিবালা কথাটা শুনেই চমকে উঠে বলল, —দেখছ কাণ্ড! জামাইবাবু বাড়িতে নেই, দিদিমণিও নেই, দুপুরে ফোন করে বলেছেন, ওনারা কাল ফিরবেন৷ আর বজ্জাত রাজু এই সুযোগটা কাজে লাগিয়েছে৷ রোসো দেখাচ্ছি মজা৷

বলে চুনিবালা প্রাইভেট রোড দিয়ে হন্তদন্ত চলে গেল৷

বড়ো রাস্তায় লোকজন আর যানবাহনের বড্ড ভিড়৷ একপাশ দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে কর্নেলকে বললুম, — আমরা যাচ্ছিটা কোথায়?

কর্নেল বললেন, —আর কিছুটা এগিয়ে গেলে বাঁ-দিকে একটা মোরাম রাস্তা আছে৷ দু-ধারে শালবন৷ কিন্তু জন্তু-জানোয়ারের ভয় নেই৷

কিছুদূরে হেঁটে গিয়ে অবশেষে সেই নির্জন রাস্তায় পা বাড়ালুম৷ তবে মাঝে-মাঝে আদিবাসীদের দেখা পাচ্ছিলুম৷ তারা রায়পুর বাজার থেকে ফিরে আসছিল৷ আমাদের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে বাড়ি ফেরার তাড়ায় তারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল৷

বললুম, —কর্নেল, ওরা একেবারে যেন তিরবেগে বাড়ির দিকে ছুটে যাচ্ছে৷ তার মানে পিশাচ কিংবা সেই ভয়ংকর জানোয়ারের আতঙ্ক ওদের মধ্যেও ছড়িয়েছে৷

কর্নেল বললেন, —কিন্তু এবার আমাদেরও তিরবেগে এগোতে হবে৷ কারণ যেখানে যেতে চাই, সেখানে পৌঁছুতে বেশ সময় লাগবে৷

—ফেরার পথে যদি সন্ধে হয়?

—কিংকংকে ফেস করবে৷ কীভাবে করবে তা তোমাকে বলে রেখেছি৷ যদি ফায়ার করতেই হয়, তার মাথার ওপর দিয়ে৷

লক্ষ্য করলুম, কর্নেলের মুখে চাপা হাসি৷ তারপর তিনি যেন সামরিক জীবনের লং মার্চ শুরু করলেন৷ এই বয়সে পারেনও বটে৷ একবার দূর থেকে দেখেছিলুম একজনের সঙ্গে তিনি জগিং করছেন৷ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না৷

রাস্তাটা এবার ডাইনে ঘুরে গেছে৷ এরই মধ্যে সূর্য জঙ্গলের আড়ালে চলে গেছে৷ তাই রাস্তায় ঘন ছায়া৷ কিছুদূরে চলার পর বাঁ-দিকে একটা পায়েচলা পথে কর্নেল পা বাড়ালেন৷ সভয়ে বললুম,— আর কত দূরে আপনার গন্তব্য?

কর্নেল শুধু বললেন, —আর বেশিদূর নয়৷ এই জঙ্গলটা পেরুলেই তুমি আমার গন্তব্যস্থান দেখতে পাবে৷

অবশেষে জঙ্গল পেরিয়ে গিয়ে দেখি, একটা ছোট্ট খাল দিয়ে স্বচ্ছ কালো জলের ধারা আমাদের ডাইনে, অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গেছে৷ সেদিকে একটা আদিবাসীদের বসতি চোখে পড়ল৷ তারপর বাঁ-দিকে ঘুরেই দেখি সেই বিশাল নগ্ন কালো পাথরের পাহাড়৷ বললুম, —এটা কি সেই চণ্ডীপাহাড় নাকি!

কর্নেল বললেন,—হ্যাঁ৷ আজ সকালে আমরা চণ্ডী পাহাড়ের ওপর দিয়ে ঘুরেছি, এটা চণ্ডী পাহাড়ের দক্ষিণসীমা৷

বলে তিনি বাইনোকুলারে পাহাড়টা দেখে নিলেন৷ তারপর বললেন, —খালের পাড় ধরে আমরা এবার যাব চণ্ডী পাহাড়ের কাছে৷

খালের দুই পাড়েই ঘন ঘাস৷ কোথাও বা ঝোপঝাড়৷ এদিকটায় দিনের আলো নেই৷ পিছনের শালবনটা আলোকে আড়াল করেছে৷ তবে চণ্ডী পাহাড়ের অনেকটা অংশই রোদের আলোয় স্পষ্ট৷ যতই পাহাড়টার কাছে যাচ্ছিলুম, ততই একটা অজানা আতঙ্ক আমাকে চেপে ধরছিল৷ কর্নেলের মতো দুর্ধর্ষ মানুষ সঙ্গী না হলে আমি এখন কিছুতেই পাহাড়টার কাছে যেতে সাহস পেতুম না৷ একসময় পাহাড়ের একেবারে নিচে পৌঁছে গেলুম৷ এদিকটায় কিন্তু তত বেশি ঝোপঝাড় নেই৷ কারণ পাহাড়ের সানুদেশ প্রায় পুরোটাই পাথরে ঢাকা৷ একখানে ফাটল দিয়ে একটা গাছ গজিয়েছে৷ সেই গাছের তলায় গিয়ে কর্নেল গুড়ি মেরে বসে বাইনোকুলারে খুঁটিয়ে যেন পাহাড়টা দেখতে থাকলেন৷

কিছুক্ষণ পরে তিনি চাপাস্বরে বললেন, —গুহাবাসী সাধুবাবার উড়ে চলার পথটা আবিষ্কার করেছি জয়স্ত৷

কথাটা শুনেই চমকে উঠে বললুম, —উড়ে চলার পথ মানে?

কর্নেল একটু হেসে চাপাম্বরে বললেন, —খালি চোখে দেখা যাবে না৷ আর বাইনোকুলারে দেখতে তুমি তত অভ্যস্তও নও৷ আসলে নিচে থেকে একটার-পর-একটা প্রকাণ্ড পাথর ধাপবন্দি উঠে গেছে পাহাড়ের মাঝ বরাবর৷ ওই পথে উঠতে প্রথম-প্রথম কষ্ট হতে পারে কিন্তু অভ্যাস হয়ে গেলে আর কষ্ট হওয়ার কথা নয়৷ ওঠার পথটা কীরকম জানো? পাহাড়ের গায়ে নিচে থেকে একটার-পর-একটা টিউমারের মতো নানা আকারের পাথর পাহাড়ের গায়ে সেঁটে আছে৷

জিগ্যেস করলুম, —গুহাটা কি দেখতে পেয়েছেন?

—গুহাটা দেখতে পাচ্ছি না বটে, কিন্তু গুহার সামনে সমতল খানিকটা চাতালের মতো জায়গা দেখতে পেয়েছি৷ ওখানে কী একটা চকচকে জিনিস পড়ে আছে৷ জিনিসটা কী, তা বোঝা যাচ্ছে না৷

বলেই তিনি ঠোঁটে আঙুল রেখে গুড়ি মেরে বাঁ-দিকে সরে গেলেন৷ আমিও তাই করলুম৷ তারপর আমার চোখে পড়ল, কী দেখে কর্নেলের ওই সতর্কতা৷ আমাদের সামনে খানিকটা দূরে খালের জলে স্নান করে কৌপিন পরা এক সাধুবাবা পাহাড়ের দিকে এগিয়ে চলেছেন৷ ওখানে এখনও কিছুটা রোদ আছে৷ কর্নেল দ্রুত ক্যামেরায় টেলিলেন্স ফিট করে পরপর কয়েকবার সাটার টিপে অর্ধনগ্ন সাধুবাবার ছবি তুললেন৷ তারপরই দেখলুম, কর্নেল যা বলেছিলেন তা ঠিক৷ সাধুবাবা পাহাড়ের সেই টিউমারগুলোর ওপর দিয়ে অনায়াসে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছেন৷ চাপাস্বরে বললুম, —এখনই গিয়ে ওঁকে চার্জ করলেই তো হতো!

কর্নেল হাসলেন, —কী চার্জ করব—ডিনামাইট?

বিরক্ত হয়ে বললুম, —না, আমি বলতে চাইছি, উনি-কোত্থেকে এখানে এসেছেন, কেনই বা ওই গুহায় বাস করছেন—

আমাকে থামিয়ে দিয়ে কর্নেল বললেন, —জয়ন্ত, মাঝে-মাঝে তুমি একেবারে শিশু হয়ে যাও৷ অনেক সাধু-সন্ন্যাসী তো পাহাড়ের গুহায় বসেই সারাজীবন ধ্যান করেন৷ সারাজীবন পাহাড়েই কাটান৷

বললুম, —না, মানে ওঁর সঙ্গে আলাপ করা যেত৷

কর্নেল বললেন, —আলাপ করার সময় এখনও হাতে আছে৷ যাকগে, আজ সকালে তাহলে রাজবাড়ির ব্যালকনি থেকে আমি ভুল দেখিনি৷ যা দেখেছিলুম তা সত্যি৷ ব্যাস চলো, এবার ফেরা যাক৷ কিন্তু সাবধান, আমাদের এবার শালবনের ভেতর দিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই৷ কারণ আমরা সাধুবাবার চোখে পড়তে চাই না৷

শালবন পেরিয়ে গিয়ে সেই মোরাম রাস্তায় পৌঁছে বললুম,—শুধু একজন সাধুবাবার অস্তিত্ব সত্যি না মিথ্যা, তাই জানার জন্য এই পরিশ্রমের কোনও মানে হয়!

কর্নেল বললেন, —হ্যাঁ, আমার এই পরিশ্রমের একটা মানে আছে৷ তবে সেটা যথাসময়ে তুমি বুঝতে পারবে৷

ছয়

রাজবাড়ি পৌঁছতে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে উঠেছিল৷ সেই ঝুনঝুনওয়ালা ভদ্রলোককে আর দেখতে পাইনি৷ না পাওয়ারই কথা৷ রাজীব শর্মা আমাদের দেখে শশব্যস্তে এসে দোতলায় আমাদের থাকার ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল৷ বাড়িতে উজ্জ্বল আলো৷ রাজীব বলল, —কুমার বাহাদুরকে নিষেধ করেছিলুম৷ কিন্তু উনি ঝুনঝুনওয়ালাবাবুর সঙ্গে বিশেষ কাজে বেরিয়ে গেলেন৷ আপনারা একটুখানি অপেক্ষা করুন, চুনিমাসি কফি দিয়ে যাবে৷

কর্নেল মাথার টুপি খুলে টেবিলে রাখলেন, এবং গলা থেকে বাইনোকুলার ক্যামেরা খুলে সাবধানে একপাশে রেখে দিলেন৷ তারপর কিটব্যাগ খুলে রাখার সময় বললেন, —আচ্ছা রাজীববাবু, আপনাকে একটা কথা জিগ্যেস করি৷

রাজু বলল, —আমাকে বাবু-টাবু বলবেন না স্যার৷ আমি মামুলি আদমি৷

কর্নেল বললেন,—একটা গুজব শুনেছি, মিস্টার ঝুনকুনওয়ালা নাকি রাজবাড়ির এই উত্তরমহল কিনতে চান৷

রাজু অমনি গম্ভীর হয়ে গেল৷ সে বলল, —কর্নেলসাহেব, এই বাড়ির ওপর ঝুনঝুনওয়ালাদের চোখ পড়েছে অনেক আগে৷ জামাইবাবু বাধা না দিলে কবে বাড়ি বিক্রি হয়ে যেত৷

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —কুমারবাহাদুর বলছিলেন, এই বাড়ির দিকে অপদেবতার দৃষ্টি পড়েছে৷ সম্প্রতি এক রাত্রে তিনি নাকি সেই অপদেবতার ভয়ংকর মূর্তিও দেখতে পেয়েছেন৷

রাজু বলল, —এই বাড়ির দিকে শুধু নজর পড়েনি, আসলে রায়পুরের অনেকেই তো সেই ভয়ংকর মূর্তিকে দেখতে পেয়েছে৷

—আপনি—

রাজু জোড় হাতে প্রণাম করে দ্রুত বলল, —আমাকে তুমি বলবেন স্যার৷ তবে অপদেবতার দেখা আমিও একবার পেয়েছি৷

—কবে? কোথায়? কখন?

রাজু মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটিয়ে চাপাম্বরে বলল,—কিছুদিন আগে ঠাকুরবাড়ির মন্দিরে ঠাকুরমশাই সন্ধ্যারতি এবং পুজো করছিলেন৷ আমার কাজ হল তিনি চলে গেলে মন্দিরের তালা এঁটে দেওয়া৷ সেই সন্ধ্যায় মন্দিরের বালবটা ফিউজ হয়ে গিয়েছিল৷ তাই আমি টর্চ হাতে তালা এঁটে বেরিয়ে এসেছি, এমনসময় কী একটা অদ্ভুত শব্দ হল৷ চোর এসেছে ভেবে আমি মন্দিরের পেছনের দিকে গিয়ে যেই আলো ফেলেছি, অমনি দেখি একটা ভয়ংকর কালো মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে৷ বড়ো বড়ো দাঁত, আর চোখদুটো লাল৷ দেখা মাত্র আমার হাতের টর্চ পড়ে গিয়েছিল৷ আমি দৌড়ে এসে ভজুয়াকে বলেছিলুম, কুমার বাহাদুরকে এখনই যেন বন্দুকে গুলি ভরে এখানে আসতে বলে৷ কিন্তু কুমারবাহাদুর যখন এলেন, তখন তিনি টর্চ জ্বেলেছিলেন৷ কিন্তু সেই মূর্তিটা একেবারে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল৷ কুমারবাহাদুর এই কথাটা ঠাকুরমশাই বা কাকেও বলতে নিষেধ করেছিলেন৷ কারণ এ-কথা শুনলে ঠাকুরমশাই সন্ধ্যারতি দিতে আর আসবেন না৷

এই সময়ই চুনিবালার সাড়া পাওয়া গেল৷ সে কফি আর দু-প্লেট আলুভাজা ট্রে-তে নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ তারপর রাজুকে দেখে বলল,—তুমি এখানে দাঁড়িয়ে গল্প করছ, আর ওদিকে কুমারবাহাদুর এসে তোমাকে খুঁজছেন৷

রাজু বলল, —উনি এসে গেছেন?

চুনিবালা বলল, —মাড়োয়ারিবাবুর ড্রাইভার ওঁকে গেটে পৌঁছে দিয়ে গেল৷ উনি এসেই তোমার খোঁজ করছেন৷

রাজু তখনই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল৷ চুনিবালা দরজার বাইরে উঁকি মেরে তার চলে যাওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর রুষ্ট মুখে বলল,—বজ্জাতটা কি আপনাদের ভয় দেখাচ্ছিল?

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —হ্যাঁ৷ রাজু নাকি নিজের চোখে কিছুদিন আগে মন্দিরের পেছনে পিশাচ দেখেছে৷

চুনিবালা বাঁকা মুখে বলল,—ও নিজেই পিচাশ৷ ওকে পিচাশরাও ভয় পায়৷ তা কর্নেলসাহেব, কতদূর ঘুরলেন?

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, —চণ্ডীপাহাড়ের দক্ষিণ দিকে গিয়েছিলুম৷ আমাদের বরাত ভালো, আমরা চণ্ডীপাহাড়ের গুহাবাসী সাধুবাবার দর্শন পেয়েছি৷

চুনিবালা নিস্পলক চোখে তাকিয়েছিল৷ সে চাপাস্বরে বলল, —কাকেও বলিনি, আমিও একদিন সাধুবাবাকে দেখেছি৷

—কোথায় দেখলে?

চুনিবালা তেমনই চুপিচুপি বলল,—বেশিদিন আগের কথা না৷ দিদিমণির সঙ্গে সাঁওতাল পাড়ার একটা মেয়ে মিশনারি স্কুলে পড়ত৷ সে এখন ডাক্তারি পাশ করেছে৷ দিদিমণি একখানা চিঠি লিখে আমাকে গোপনে তার কাছে দিয়ে আসতে বলেছিলেন৷ খুলেই বলি, মেয়েলি রোগের ব্যাপার, তাই মালতি বেশরার কাছেই দিদিমণি চিকিৎসা করতে চেয়েছিলেন৷ তা তাকে চিঠি দিয়ে আমি ফিরে আসছি, হঠাৎ দেখি খালের ধারে সাধুবাবা আর একটা লোক দাঁড়িয়ে কথা বলছে৷ তখনও বুঝিনি সাধুবাবা চণ্ডীপাহাড়ে থাকে৷ থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম৷ আমাকে দেখতে পেয়েই সাধুবাবা যেন পাখা মেলে উড়ে চলে গেল৷ তখন বিকেলবেলা স্পষ্ট দেখলাম কর্নেলসাহের, পাহাড়ের গা বেয়ে যেন উড়েই যাচ্ছে৷

কর্নেল জিগ্যেস করলেন, —আর সেই লোকটা?

—লোকটা ঘুরে আমাকে দেখতে পেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল৷ কাছে আসতেই দেখি, সে গোপাল হাজরা৷

—তুমি চেনো তাকে?

—চিনব না কেন? যে মাড়োয়ারিবাবু আজ রাজবাড়িতে এসেছিল, তার অফিসে কাজ করে৷ আমি তাকে সাধুবাবার কথা জিগ্যেস করব ভাবছি, হঠাৎ সে রাগে চোখমুখ লাল করে বলল, —এই চুনি, তুই এখানে কী করছিস?

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —তাহলে তুমিও তাকে ছেড়ে কথ্য বলোনি?

চুনিবালা রুষ্ট মুখে বলল, —ওর পিতাপুরুষের ছেরাদ্দ করে তবে ছাড়লুম৷ তাকে বললুম, আমি এক্ষুনি গিয়ে জামাইবাবুকে বলছি৷ জামাইবাবু বন্দুকবাজ লোক৷ তাকে এখানকার লোকে ভয় করে৷ এই কথা শুনে হাজরাবাবু তখন আমার হাতে পায়ে ধরতে এল৷ সে যে সাধুবাবার কাছে গিয়েছিল, আমি যেন কাকেও বলি না৷ তারপর সে—বললে বিশ্বাস করবেন না কর্নেলসাহেব, আমার হাতে একখানা একশো টাকার নোট গুঁজে দিল৷

আমি এবার সকৌতুকে বললুম,—বাঃ, তাহলে মাঝখান থেকে তোমার একশো টাকা লাভ হয়ে গেল৷

চুনিবালা এবার একটু হেসে বলল,—পড়ে পাওয়া টাকা! একশো টাকা কম কথা নয়—ছাড়ব কেন?

বাইরে বারান্দায় পায়ের শব্দ শোনা গেল৷ অমনি চুনিবালা এমন গলা চড়িয়ে বলল, —এ-বেলাকার কফি সকালের চেয়ে ভালো, তাই না কর্নেলসাহেব? কুমারবাহাদুর আমাকে পই-পই করে বলেছিলেন—

কুমারবাহাদুর ঘরে ঢুকে বললেন, — কী গো চুনিবালা, এখানে দাঁড়িয়ে সাহেবদের কাছে বাহবা কুড়োচ্ছ, আর ওদিকে নকুঠাকুর তোমার জন্য রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আপন মনে বকবক করছে৷

চুনিবালা তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল৷ কুমারবাহাদুর তার উদ্দেশে দরজার দিকে ঘুরে বললেন, —বাজার থেকে যে কফি এনেছ— তা আমার জন্য এককাপ এখানেই পাঠিয়ে দিও৷ তোমাকে আসতে হবে না, ভজুয়ার বউকে বোলো৷ সে দিয়ে যাবে৷

কুমারবাহাদুর চেয়ারে বসে বললেন, —আজ ঠান্ডাটা বড্ড বেশি পড়েছে৷

কর্নেল বললেন, —আপনি এই সন্ধ্যাবেলা বেরিয়েছিলেন?

কুমারবাহাদুর বললেন, —আর বলবেন না, মফতলালের ওই এক স্বভাব৷ সে এতদিন শুধু টিভি-র কারবার করত৷ এখন কম্পিউটারের ব্যাবসা খুলেছে৷ আমি ওসব বুঝি না, কিন্তু সে আমাকে না দেখিয়ে ছাড়বে না৷ তবে কী জানেন কর্নেলসাহেব, কম্পিউটার দেখলুম বেশ কাজের জিনিস৷ সব হিসেবনিকেশ, যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ—যা কিছু তথ্য আপনার দরকার, সবকিছুই তার পেটে ভরা থাকে৷ যাকগে৷ আপনারা কতদূর ঘুরলেন?

কর্নেল কফিতে শেষ চুমুক দেওয়ার পর চুরুট ধরালেন, তারপর বললেন, —চণ্ডীপাহাড়ের দক্ষিণ দিকে গিয়েছিলুম৷

কুমারবাহাদুর চোখ বড়ো করে বললেন, —কী সর্বনাশ! আমার তো ধারণা, সেই ভয়ংকর অতিপ্রাকৃত শক্তির ডেরা ওদিকেই কোথাও আছে৷

কর্নেল একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, —তা যদি থাকে, তাহলে সে ওই পাহাড়ের গুহাবাসী সাধুবাবারই এক চ্যালা৷

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, —কুমারবাহাদুর, আমরা সাধুবাবাকে দর্শন করেছি, তবে দূর থেকে৷ শুনলে অবাক হবেন, সাধুবাবা সত্যি বিকেলবেলার এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় খালের জলে স্নান করে ঠিক পাখির মতোই যেন উড়তে-উড়তে পাহাড়ের গুহায় চলে গেলেন৷

কুমার বাহাদুরের মুখে যে আতঙ্কের ছাপ লক্ষ্য করলুম, তা সত্যি নাকি অভিনয়, এখন আমার পক্ষে বলা কঠিন৷ তিনি চাপাস্বরে বললেন, —কথাটা শুনে আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে৷ জয়ন্তবাবু আমার সঙ্গে কৌতুক করছেন না তো?

কর্নেল বেজায় গম্ভীরস্বরে বললেন, —ঠিক ধরেছেন, কৌতুক! জয়ন্ত এই সব ব্যাপার নিয়ে তোমার পিতৃতুল্য মানুষের সঙ্গে কৌতুক করা উচিত নয়৷

কর্নেলের কথার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তখনই হাসতে-হাসতে করজোড়ে বললুম,—আমাকে ক্ষমা করবেন কুমারবাহাদুর৷ আপনার মতো মানুষের সঙ্গে কৌতুক করা আমার উচিত নয়৷ কিন্তু কর্নেলের পাল্লায় পড়ে মাঝে-মাঝে এমন সব অস্বস্তিকর জায়গায় আমাকে যেতে হয় যে—

এই সময়েই মাথায় ঘোমটা দিয়ে একটি মধ্যবয়সি মেয়ে ছোট্ট ট্রে-তে এককাপ কফি নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ সে নিঃশব্দে ট্রে-টা টেবিলে রাখতে যাচ্ছিল, কুমারবাহাদুর বললেন, —ঝুমনি, আমি প্লেট আর কাপটা নিচ্ছি, তুমি এই ট্রে আর সাহেবদের এঁটো কাপগুলো বড়ো ট্রে-টা সহ নিয়ে যাও৷

ভজুয়া দারোয়ানের বউ নিঃশব্দেই আদেশ পালন করল৷ সে চলে যাওয়ার পর কুমারবাহাদুর বললেন, —ভজুয়া ইচ্ছে করেই বুড়ো বয়েসে এই বোবা মেয়েটিকে বিয়ে করেছে৷ ও যে আমার কথা শুনতে পেল তা কিন্তু না, কারণ কানে কালা যারা তারাই বোবা হয়৷ তাই কথা বলার সঙ্গে হাতের ইশারাও করছিলুম, তা নিশ্চয়ই আপনারা লক্ষ্য করেছেন?

কর্নেল সহাস্যে বললেন, —গত মার্চে যখন এসেছিলুম, তখন ভজুয়া আমাকে দুঃখ করে বলেছিল, তার কপালে বউ সয় না৷ দু-দুবার বিয়ে করেছিল, দুটো বউই অসুখে ভুগে মারা যায়৷ তা ঝুমনিকে কোথায় পেল সে?

অমিতেন্দ্র বললেন, —এলাকায় খ্রিস্টান মিশন আছে, তা আপনি জানেন৷ ওদের অনাথ আশ্রমেই এই বোবা-কালা মেয়েটি ছিল৷ ফাদার ওলকট সাহেবকে তো আপনি চেনেন৷ ঝুমনির বয়েস হয়েছে, চুলে পাক ধরেছে, অথচ বিয়ে হচ্ছে না, তো আমার কথা শুনে ফাদার ওলকট ভজুয়ার সঙ্গে ওর বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন৷

কর্নেল হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজে কথা শুনছিলেন৷ এবার হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বললেন,—আচ্ছা কুমারবাহাদুর, গোপাল হাজরা নামে আপনি কাউকে চেনেন?

হঠাৎ এ প্রশ্নে অমিতেন্দ্র চমকে উঠেছিলেন৷ তিনি বললেন, —খুব চিনি৷ কিন্তু আপনি কেমন করে তাকে চিনলেন?

কর্নেল বললেন, —চিনি বললে ভুল হবে৷ তবে তার নাম শুনেছি৷ সে নাকি রায়পুরে কোন ব্যবসায়ীর কর্মচারী৷

অমিতেন্দ্র উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, —হঠাৎ তার কথা কেন কর্নেলসাহেব?

—একটা কারণ নিশ্চয়ই আছে, সেটা পরে বলব৷ এবার আমাকে আপনি বলুন সে কি মাঝে-মাঝে রাজবাড়িতে আসে?

—গোপাল! আসে মানে, মফতলালের কাছ থেকে বারতিনেক চিঠি নিয়ে এসেছিল৷

একটু চুপ করে থাকার পর কর্নেল বললেন,—চিঠি কি মফতলালজি নিজে লেখেন! নাকি কোনও কর্মচারীকে দিয়ে লেখান?

অমিতেন্দ্র হাসলেন, —উনি লিখলে হিন্দিতেই লিখবেন৷ কিন্তু আমি যে হিন্দি জানি তা উনি মনে করেন না, তাই ইংরেজিতে চিঠি পাঠিয়েছিলেন৷ কিন্তু মফতলালজি নিজে ইংরেজি জানেন না৷

—যদি কিছু মনে না করেন, মফতলালজির সঙ্গে আপনার কি কোনও ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে?

অমিতেন্দ্রের মুখে গাম্ভীর্য ফুটে উঠল৷ একটু ইতস্তত করে বললেন, —আসলে এই নিরিবিলি জায়গায় ব্যাবসা করতে আমার ভালো লাগে না৷ তা ছাড়া দক্ষিণ মহলের শুভেন্দুদার সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ আছে৷ তাই আমি উত্তরমহল বিক্রি করতে চেয়েছিলুম৷ মফতলালজি কিনতে রাজি হয়েছিলেন৷ এখনও তিনি হাল ছাড়েননি৷ আজও কথা বলতে এসেছিলেন৷ কিন্তু আমার মেয়ে-জামাইয়ের এতে ভীষণ আপত্তি৷ আমার জামাইকে তো দেখেছেন, দুর্দান্ত বেপরোয়া প্রকৃতির মানুষ৷ সে নাস্তিক বললেই হয়৷ কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তিতে তার বিশ্বাস নেই৷ কিন্তু আমি নিজের চোখে যা দেখেছি, এমনকী রাজুও এ-বাড়িতে আসার পর স্বচক্ষে দেখেছে সেই ভয়ংকর মূর্তিটাকে৷ তাই আমি এবার আপনাকে দিয়ে ওই অপশক্তিটার পিছনে কোনও রহস্য আছে কিনা তা জেনে নিতে চাই৷ তারপর আমি একটা সিদ্ধান্ত নেব৷

কর্নেল তাঁর জ্যাকেটের ভিতর-পকেট থেকে দুটো ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন৷ দেখেই বুঝতে পারলুম, ও-দুটো সেই লাল কালিতে ইংরেজিতে লেখা হুমকির চিঠি৷ চিঠিদুটো খুলে কর্নেল অমিতেন্দ্রের হাতে দিয়ে বললেন, —আচ্ছা দেখুন তো কুমারবাহাদুর, এই দুটো চিঠির হাতের লেখা কি আপনার চেনা মনে হচ্ছে?

অমিতেন্দ্র দুটো চিঠিতে চোখ বুলিয়ে বললেন,—কী আশ্চর্য, আমার তো চেনা মনে হচ্ছে! এক মিনিট, বলে তিনি তাঁর পাঞ্জাবির পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করে বললেন, —এটা মফতলালজির কথামতো গোপাল হাজরা আমাকে ইংরেজিতে লিখে দিয়েছে৷ এটাতে পারসোনাল কম্পিউটার সংক্রান্ত কিছু তথ্য আছে৷ কারণ আমি একটা ওইরকম কম্পিউটার কিনতে চেয়েছিলুম৷

কর্নেল তাঁর হাত থেকে তিনটে কাগজই প্রায় ছোঁ মেরে তুলে নিলেন৷ তারপর গম্ভীরমুখে বললেন, —কুমারবাহাদুর, এ তিনটে হাতের লেখাই একজনের৷ অর্থাৎ গোপাল হাজরার৷ এবার বুঝে নিন, আপনাকে কে ভয় দেখিয়ে রাজবাড়ি ছেড়ে যেতে বলছে৷

সাত

সে রাতে গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম৷ ঘুম ভেঙেছিল চুনিবালার ডাকে৷ ঘড়িতে তখন আটটা বাজে৷ চুনিবালার হাতে চায়ের কাপ৷ সে একটু হেসে বলেছিল,—কর্নেলসাহেব ভোরবেলা বেড়াতে যাওয়ার সময় বলেছিলেন, যেন সাতটায় আপনাকে চা দিই৷ কিন্তু চা নিয়ে এসে একটু ডাকাডাকি করে সাড়া পাইনি৷ ভেবেছিলুম, কাল সারাদিন সাহেব আপনাকে বিশ্রাম করতে দেননি৷ তাই বরং পরে চা নিয়ে আসব৷

বিছানায় বসে চায়ে চুমুক দিয়ে বলেছিলুম, —আটটা বাজল, কর্নেল এখনও ফিরলেন না?

চুনিবালা এবার চোখ বড়ো বড়ো করে চাপাম্বরে বলেছিল,— কাল রাতে সে এক সাংঘাতিক কাণ্ড! আপনাকে কর্নেলসাহেব ডাকতে বারণ করেছিলেন৷

জিগ্যেস করেছিলুম, —সাংঘাতিক কাণ্ডটা কী? পিচাশ এসেছিল নাকি?

চুনিবালাকে আতঙ্কিত দেখাচ্ছিল৷ সে বলেছিল, —ছোটোসাহেব, এতদিন ভাবতুম কুমারবাহাদুর আর রাজু মিথ্যা গুজব রটাচ্ছে৷ কিন্তু কাল রাত্রি বারোটায় মন্দিরের দিকে কেমন একটা শব্দ শুনে আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল৷ পরে বুঝেছিলুম, কুমারবাহাদুর ওপরের ছাদ থেকে বন্দুকের গুলি ছুঁড়েছেন৷ তক্ষুনি রাজু, ভজুয়া সবাই হই-হল্লা করে খিড়কির দরজার দিকে ছুটে যাচ্ছিল৷ আমিও গেলুম৷ ততক্ষণে খিড়কির দরজা খুলে কর্নেলসাহেব আর রাজু, আর পিছনে ভজুয়া পুকুরপাড়ে বেরিয়েছে৷ আমিও গিয়েছিলুম৷ কর্নেল সাহেবের টর্চের আলোয় দেখি, ঠাকুরবাড়ির পিছন থেকে মস্ত কালো রঙের একটা পিচাশ নেমে যাচ্ছে৷ কর্নেলসাহেব তাড়া করে গেলেন৷ কিন্তু আর তাকে দেখতে পাননি৷

অবাক হয়ে বলেছিলুম—এত বড়ো কাণ্ড হয়েছে, আর আমি একটুও টের পাইনি!

চুনিবালা বলেছিল, —কখনও-কখনও মানুষের ঘুম এরকম হয়৷ ট্রেনে রাত জেগে এসে সারাদিন কর্নেল সাহেবের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তাই কিছু টের পাননি৷

কথাগুলো বলে ভয়ার্ত মুখে চুনিবালা চলে গিয়েছিল৷

কর্নেল ফিরে এলেন, তখন সাড়ে ন’টা বাজে৷ দেখলুম ওঁর টুপিতে মাকড়সার জাল, শুকনো পাতা, আর দাড়িতে জায়গায়-জায়গায় ঝুলের মতো নোংরা লেগে আছে৷ টুপি, কিটব্যাগ, ক্যামেরা, বাইনোকুলার খোলার পর ওভারকোট খুলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন,—মর্নিং জয়ন্ত, আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে?

বললুম, —আপনার দাড়িতে ওসব কী?

কর্নেল কিছু না বলে বাথরুমে ঢুকে পড়লেন৷ কিছুক্ষণ পরে যখন বেরিয়ে এলেন তখন দেখলুম সাদা দাড়ি আগের মতো ঝলমল করছে৷ পোশাক বদলে নিয়েছেন৷ তারপর তিনি ইজিচেয়ারে বসে টাকে হাত বুলিয়ে বললেন,—ওঃ, জয়ন্ত, আজ মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে খুব কষ্ট পেয়েছি৷ তবে দক্ষিণ মহলের সমীরবাবুকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলুম৷ এ বয়সে আর ধকল সহ্য করা কঠিন, তা হাড়ে-হাড়ে বুঝেছি৷

—আপনারা চণ্ডীপাহাড়ে সাধুবাবার গুহায় উঠেছিলেন নাকি?

কর্নেলকে সত্যি ক্লান্ত দেখাচ্ছিল৷ কিন্তু মিটিমিটি হেসে বললেন,—হ্যাঁ, সমীরবাবু তোমার মতো একেবারে ভেতো বাঙালি নন৷ তাঁর সাহসেই ঝুঁকি নিয়েছিলুম৷

—সাধুবাবা আপনাদের দেখে কী বললেন?

—সাধুবাবা তখন কোথায়? তিনি খালের পাড় দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিলেন৷ সম্ভবত প্রাতঃস্নান করতে৷ সাঁওতাল পাড়ার কাছে নালাটা পুকুরের মতো বড়ো হয়েছে দেখলুম৷ অবশ্য বাইনোকুলারেই দৃশ্যটা চোখে পড়েছিল৷

—তারপর আপনারা প্রায় চার-পাঁচশো ফুট উঁচুতে সাধুবাবার গুহায় উঠে গিয়েছিলেন?

—হ্যাঁ৷ একটা সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চার তো বটেই৷ যাই হোক সাধুবাবা ফেরার আগেই নেমে এলুম৷

—কাল বিকেলে বাইনোকুলারে সাধুবাবার গুহার কাছে কী একটা জিনিস চকচক করতে দেখেছিলেন—কী সেটা?

কর্নেল দুষ্ট হাসি হেসে বললেন, —তা বলব কেন? আমরা কষ্ট করে কেষ্ট পেয়েছি৷ আর তুমি আরামে ঘুমিয়ে তা পেতে চাও?

এই সময়েই কুমারবাহাদুর এবং তাঁর পেছনে চুনিবালা বড়ো ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ চুনিবালা চলে গেলে কুমারবাহাদুর বললেন, —আগে ব্রেকফাস্ট সেরে নিন আপনারা, তারপর কফি খাবেন৷

কথাটা বলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসবার চেষ্টা করে বললেন, —কাল রাতে কী সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছিল জয়ন্তবাবু টের পাননি, নাকি পেয়েছিলেন?

বললুম, —না৷ তবে চুনিবালার মুখে সব শুনেছি৷ শুনে তো আমার খুবই ভয় করছে৷ এইরকম বিপজ্জনক ঘটনা ঘটলে মানুষ তো আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবে৷

অমিতেন্দ্র বললেন, —আপনারা খেয়ে নিন আগে, আমি কর্নেল সাহেবের দেরি দেখে একা ব্রেকফাস্ট করেছি৷ কর্নেলসাহেব, কাল রাতে আপনি তো সচক্ষে সব দেখেছেন৷ আজ আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মেয়ে-জামাই এসে পৌঁছনোর কথা৷ আপনি আমার জামাই শোভনকে ব্যাপারটা সবিস্তারে বলবেন৷ কারণ তার মতে, আমি নাকি ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখেছিলুম৷ বন্দুকের একটা খালি কার্তুজ দেখেও শোভন বিশ্বাস করেনি আমার কথা৷ আর আমার মেয়ে কুন্তলা তো তারও বাড়া৷ সেও এই নিয়ে আমার সঙ্গে জোক করে৷ আমার পেটে একটু গন্ডগোল আছে৷ কুন্তলার মতে পেটের অসুখ যাদের আছে, তারা নাকি ভয়ংকর সব দুঃস্বপ্ন দেখে৷

কথাগুলো বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন৷

কর্নেল বললেন, —কুমারবাহাদুর, আপনি আপনার মেয়ে-জামাইকে কিন্তু আপনাদের পূর্বপুরুষ ঐশ্বর্য নারায়ণ রায়ের লেখা মাতৃবন্দনার শেষের ওই তিনটে শব্দের কথা যেন বলবেন না৷ বাণ, পক্ষ আর সিন্ধু৷

অমিতেন্দ্র বললেন, —হ্যাঁ, বলা উচিত হবে না৷ তাহলে আমার মেয়ে-জামাই দু’জনেই জেদ ধরবে যেন আমি বাড়ি বিক্রি না করি৷ কারণ স্বভাবতই বুদ্ধিমান শোভন ওই সাংকেতিক শব্দতিনটের মধ্যে গুপ্তধনের গুজবের আভাষ খুঁজে পাবে৷

কর্নেল বললেন, —এই তিনটে শব্দ কেন লেখা আছে বলে আপনার মনে হয়?

অমিতেন্দ্র মাথা নেড়ে বললেন, —আমার কেন যেন মনে হয়, ওটা গুপ্তধনের সংকেত নয়৷ যাই হোক, আমি একটু বেরুচ্ছি৷ প্রায় একঘণ্টা পরে ফিরে আসব৷

তিনি চলে যাওয়ার পর বললুম, —আচ্ছা কর্নেল, কাল রাতে সত্যিই কি আপনি তথাকথিত কিংকংকে টর্চের আলোয় দেখেছেন?

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, —নিজের চোখকে অবিশ্বাস করি কী করে! যদিও মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য কালো রঙের বীভৎস প্রাণীটিকে ঠাকুরবাড়ির পেছনে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছি৷ তবু আমি যে ভুল দেখিনি সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷

এবার রসিকতা করে বললুম, —এর আগে কিন্তু বহুবার আপনি কিংকং বা পিশাচ দর্শন করেছেন, আমিও করিছি৷ কিন্তু তারা সবাই ছিল ছদ্মবেশী মানুষ৷ ওই ধরনের লোমশ পোশাক আর মুখোশ আজকাল কিনতে পাওয়া যায়৷

কর্নেল খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন, —আশ্চর্য জয়ন্ত, আমার নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না৷ যে ভয়ংকর প্রাণীটিকে দেখেছি, তার উচ্চতা প্রায় সাত-আট ফুট৷

বলে তিনি বেসিনে হাত ধুতে গেলেন৷

একটু পরেই চুনিবালা ট্রে-তে দু-পেয়ালা কফি আনল৷ এবং ব্রেকফাস্টের ট্রে-টা গুছিয়ে নিয়ে চলে গেল৷ তার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, কারও সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করেছে৷

কথাটা কর্নেলকে জানালে তিনি বললেন, —বেশ তো, সে যখন কফির পেয়ালা নিতে আসবে, তখন তাকে জিগ্যেস কোরো৷

কর্নেল চুপচাপ গম্ভীর মুখে কফিতে মন দিলেন৷ আমি কফির পেয়ালাহাতে পুবের ব্যালকনিতে গেলুম৷ চণ্ডীপাহাড়ের মাথার দিকে যেন কুয়াশার আলোয়ান জড়ানো আছে৷ ঠাকুরবাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, ভজুয়ার বোবা-কালা বউটি মন্দিরের নিচের তিনদিকের সঙ্কীর্ণ প্রাঙ্গণ থেকে শুকনো গাছের পাতাগুলো কুড়িয়ে বাইরে ফেলে দিচ্ছে৷ ঠাকুরবাড়ির দু-ধারে এবং পিছনে কয়েকটা ফুলের গাছ আছে৷ একটা প্রকাণ্ড পুষ্পবতী জবাগাছও চোখে পড়ল৷ এই সময়েই ভিতর থেকে কর্নেল ডাকলেন, —জয়ন্ত, কুমারবাহাদুর বেরিয়েছেন, কাজেই ঝটপট পোশাক পরে রেডি হয়ে নাও৷ আমরাও একটুখানি বেরুব৷

কর্নেলের আদেশ পালন করে তাঁকে অনুসরণ করলুম৷ বলা দরকার, তিনিও পোশাক বদলে নিয়েছিলেন৷ এদিকে আমি ডান পকেটে আমার লোডেড খুদে ফায়ার আর্মসটা ভরে নিয়েছিলুম৷ দু’জনে নিচে গিয়ে শুনি, রাজুর সঙ্গে চুনিবালার তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে৷ আমাদের দেখেই রাজু একটা ঘরে ঢুকে গেল৷ চুনিবালা লনে আমাদের কাছে এসে চাপা গলায় বলল, —সকাল থেকে রাজু আমার পিছনে লেগেছে৷ সে বলছে ওই পিচাশটা নাকি চণ্ডীপাহাড়ের সাধুবাবার পোষা৷ আমি যদি তার নামে কুমার বাহাদুরকে মিথ্যা-মিথ্যি কিছু বলি, তাহলে সে সাধুবাবাকে বলে পিচাশটাকে আমার দিকে লেলিয়ে দেবে৷

কর্নেল কিছু বলার আগে আমি বললুম, —রাজু তোমার সঙ্গে ঠাট্টা তামাশা করছে৷ কাল রাত্রে অমন সাংঘাতিক একটা ঘটনা ঘটেছে, তাই তোমাকে সে দুষ্টুমি করে ভয় দেখাচ্ছে৷

চুনিবালাকে রান্নাঘর থেকে নকুঠাকুর ডাকছিল৷ সে শাড়ির আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে গজগজ করতে করতে সেদিকে এগিয়ে গেল৷

ভজুয়া স্যেলুট ঠুকে গেটের একটা অংশ খুলে দিল৷ তারপর সে বলল, —কর্নেল সাব, এ বাড়িতে থাকতে আমার বহুত ডর লাগছে৷

কর্নেল একটু হেসে তাকে বললেন, —ভজুয়া দেখো না, আমি শিগগিরি ওই পিশাচটাকে গুলি করে মেরে ফেলব৷ তুমি কোনও চিন্তা কোরো না৷

বড়োরাস্তায় এখন যানবাহন এবং মানুষজনের ভিড়৷ বাঁ-পাশ দিয়ে কিছুটা হেঁটে কর্নেল পিছনদিকটা দেখে নিলেন৷ তারপর একটা ঢালু সঙ্কীর্ণ রাস্তায় উঠে বললেন, —এটা শুভেন্দু নারায়ণ রায়চৌধুরীর দক্ষিণ মহলে ঢোকার পথ৷ এর দু-ধারে পাম গাছ নেই৷ কিন্তু লক্ষ্য করো, কেমন সুন্দর সব কেয়ারি করা ঝোপ আর মাঝে-মাঝে একটা করে দেশি-বিদেশি গাছ নিঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷

গাছগুলো নিঝুম হওয়ার কারণ, উত্তরে অমিতেন্দ্রের বাড়ি থাকায় শীতের হাওয়া এদিকে আসতে বাধা পাচ্ছে৷ সামনে একইরকম গেট৷ কিন্তু কোনও দারোয়ানকে দেখতে পেলুম না৷ কর্নেল বললেন,—কোথায় যাচ্ছি বুঝতে পেরেছ তো৷

বললুম, —অনেক আগেই বুঝে গেছি৷ ওই তো গেটের কাছে সমীরবাবু দাঁড়িয়ে আছেন৷

তিনি গেটের একটা অংশ সরিয়ে সম্ভাষণ করে আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলেন৷ দেখলুম বাড়িটা তত পরিচ্ছন্ন হয়ে নেই৷ মনে পড়ে গেল শুভেন্দুবাবু বলেছিলেন, তাঁর আগের কেয়ারটেকার রাজীব শর্মা এই বাড়িতে ট্যুরিস্টদের রেখে পয়সা কামাত৷

সমীরবাবু আমাদের একতলার একটা ঘরে নিয়ে গেলেন৷ সেই ঘরে তিনি থাকেন, তা বুঝতে পারলুম৷ ঘরে অবশ্য কয়েকটা চেয়ার এবং টেবিল আছে৷ আমরা বসার পর সমীরবাবু বললেন, —কর্নেল সাহেব, জয়ন্তবাবুকে আমাদের অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলেছেন তো?

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —যতটুকু বলার তা বলেছি৷ আপনি আবার মুখ ফসকে এমনকিছু বলবেন না, যাতে জয়ন্ত এই পিশাচ বা কিংকং রহস্যের ব্যাপারটা টের পায়৷

সমীরবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, —জয়ন্তবাবুর মুখ দেখে মনে হচ্ছে, উনি কিছু আঁচ করেছেন৷ আপনার অনেক দিনের সঙ্গী উনি৷ যাই হোক, আমি আপনার কথামতো কলকাতায় রায়চৌধুরী সাহেবকে টেলিফোনে সবটা জানিয়েছি৷ উনি খুব হাসছিলেন৷

কর্নেল বললেন, —আপনার কাছে আসব বলেছিলুম, কারণ আমার এখান থেকে একটা টেলিফোন করার দরকার আছে৷ টেলিফোনটা খুব গোপনীয়, তাই আপনাকে এবং জয়ন্তকে অনুরোধ করছি মিনিট দশেকের জন্য একটু বাইরে গিয়ে কোথাও দু’জনে কথা বলুন৷

সমীরবাবু সহাস্যে বললেন, —চলুন জয়ন্তবাবু, আমরা দোতলায় উঠলে উত্তর মহলের লোকেদের চোখে পড়ব৷ বিশেষ করে শয়তান রাজু যদি আপনাকে আমার সঙ্গে এখানে দেখতে পায়, তাহলে আমাদের সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে৷

লনের এককোণে খোলা জায়গায় প্রকাণ্ড একটা ইঁদারা৷ চারদিকটা সিমেন্ট বাঁধানো৷ সেখানে দাঁড়িয়ে সমীরবাবু বললেন, —রায়চৌধুরীসাহেব প্ল্যান করেছেন, আগের মতো মাঝে-মাঝে এই বাড়িতে এসে থাকবেন৷ তাই উনি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এখানে এসে দারোয়ান মালি এবং আরও কিছু কাজের লোক আগের মতো বহাল করবেন৷ এতবড়ো বাড়ি মেরামত করতে অনেক টাকা খরচ হবে৷ কিন্তু রায়চৌধুরী সাহেবের খেয়াল৷ তা ছাড়া এপ্রিলের মাঝামাঝি, অর্থাৎ পয়লা বোশেখ থেকে ঠাকুরবাড়ির পরিচর্যার পালাও তাঁকে নিতে হবে৷ কাজেই আমাকে এখন থেকেই উনি লোকজন দেখে রাখতে বলেছেন৷

বললুম, —গত রাত্রে কী একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছিল, আপনি নিশ্চয়ই তা টের পেয়েছিলেন৷

সমীরবাবু বললেন, —হ্যাঁ, আমি তো আপনাদের বলেছিলুম, রাত্রে আমাকে জেগেই কাটাতে হয়৷ হই-হল্লা শুনে দোতলায় উঠে গিয়েছিলুম৷ কিন্তু ততক্ষণে সব চুপ৷ সকালে কর্নেল আমাকে সব বলেছেন৷

এই সময়েই কর্নেল বেরিয়ে এলেন৷ বললেন, —আমার কাজ শেষ৷ সমীরবাবু আপনি তো রাত্রে জেগেই থাকেন৷ তা ছাড়া আপনার কাছে বন্দুকও আছে৷ আপনি একটু কান খোলা রাখবেন৷ আমি ফাঁদ পাতার সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি৷

সমীরবাবু আমাদের অনুসরণ করে বললেন, —আমি কফি খাই না৷ কিন্তু আমার কাছে চায়ের ব্যবস্থা আছে৷ অন্তত এককাপ চা খেয়ে গেলেও পারতেন আপনারা৷

কর্নেল বললেন, —ধন্যবাদ সমীরবাবু, এখন আর চা খাওয়ার সময় নেই৷ পাটনা থেকে কুমার বাহাদুরের মেয়ে-জামাইয়ের পৌঁছনোর কথা আছে৷ বাড়িতে এখন কুমারবাহাদুর নেই৷ কাজেই শোভনলাল এসে গেলে তার মাথা খাওয়ার সুযোগটি আমি ছাড়ব না৷

সমীরবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, —কুমার বাহাদুরের ভাগ্যে অমন একজন জামাই জুটেছে, তা না হলে কবে উনি ঝুনঝুনওয়ালাদের পাল্লায় পড়ে বাড়িটা বেচে দিতেন৷ শোভনলাল আর কুন্তলাই জেদ ধরে আছে৷

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, —গত রাতে পিশাচ বা কিংকং দর্শনের ঘটনা শুনে শোভনলাল নিশ্চয়ই একটু চমকে যাবে৷ দেখা যাক সে আমাকে কী বলে৷

আমরা বেরিয়ে গিয়ে বড়ো রাস্তায় পৌঁছুলম৷ তারপর হাঁটতে-হাঁটতে আবার সেই প্রাইভেট রোড ধরে উত্তরমহলে গেলুম৷ তখনই লক্ষ্য করলুম, লনের একপাশে গেরাজে একটা ঝকঝকে নতুন গাড়ি৷ গেরাজের পাশে ফাঁকা জায়গায় কুমার বাহাদুরের যে পুরোনো গাড়িটা থাকত, সেটা নেই৷ তার মানে কুমারবাহাদুর এখনও ফেরেননি৷ দোতলা থেকে খুব স্মার্ট এবং উজ্জ্বল গৌরবর্ণ বলিষ্ঠ চেহারার একজন যুবক অনুমান করলুম, বয়সে আমার চেয়ে তিন-চার বছরের বড়ো—চিৎকার করে উঠলেন, —হ্যাল্লো, মাই ডিয়ার বস, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার!

কর্নেল হাত তুলে প্রায় মিলিটারি হাঁক ছাড়লেন, —হ্যাল্লো মাই ডিয়ার ইয়াং ম্যান৷ আমি জানতুম, তুমি যে-সময় আসবে বলে জানিয়েছিলে, ঠিক সেই সময়েই আসবে৷ তোমার অসামান্য সময়জ্ঞান গত মার্চে এসে লক্ষ্য করে গেছি৷

বুঝলুম, এই সেই শোভনলাল রায়৷ আহিরগঞ্জ রাজবাড়ির রাজপুত্র৷ সত্যি রাজপুত্রের মতো চেহারা বটে৷ তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল এক যুবতি৷ সে কর্নেল এবং আমার উদ্দেশে ওখান থেকে করজোড়ে নমস্কার করল৷

শোভনলাল বলল, —তাহলে ইনিই আপনার সেই তরুণ সাংবাদিক বন্ধু এবং আপনার ছায়াসঙ্গী সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী?

দোতলায় গিয়ে কর্নেল তার হাত ধরে একখানা সামরিক হ্যান্ডশেক করলেন বটে৷ অন্য কেউ হলে ওই হ্যান্ডসেকের ঝাঁকুনিতে মুখ থুবড়ে পড়ত৷ কুন্তলা কর্নেলের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেল৷ কর্নেল চোখ কটমটিয়ে বললেন, —তুমি ভুলে গেছ, আমি কারুর প্রণাম নিই না৷ তবে মুখে যখন দাড়ি রেখেছি এবং অনেক সময় লোকেরা আমাকে ঠাট্টা করে ফাদার ক্রিসমাস বলে থাকে, কাজেই তোমাকে আগাম ক্রিসমাস-এর একটা আশীর্বাদ করতে চাই৷

বলে তিনি কুন্তলার মাথায় হাত রেখে হেসে উঠলেন৷ তারপর শোভনের কাঁধে হাত রেখে আমাদের থাকার ঘরে নিয়ে গেলেন৷ কুন্তলাও আমাদের সঙ্গে গেল৷ তারপর শোভন মুখে গাম্ভীর্য এনে বলল, —এসেই চুনিদির কাছে রাতের ঘটনা শুনেছি৷ কর্নেল! এবার আমাদের যুদ্ধে নামা ছাড়া উপায় নেই৷

আট

ঘরে ঢোকার পর কর্নেল বললেন, —তাহলে তুমি গত রাতের পিশাচ অবির্ভাবের ঘটনা পুরো জেনে গেছ!

শোভন বলল,—চুনিদির পিচাশকে কি আপনিও দেখেছেন? নাকি চুনিদি আমাকে কথাটা বানিয়ে বলল৷

কুন্তলা বলল,—চুনিদির অভ্যাস সবকিছু অসম্ভব বাড়িয়ে বলবে৷

কর্নেল হাসতে হাসতে বলল, —তোমাদের চুনিদিও নাকি স্বচক্ষে দেখেছে৷

শোভন বলল, —তাহলে আপনি নিশ্চয়ই তার চোখেই দেখেছেন৷

কর্নেলের মুখে হাসি ছিল৷ তিনি একটু চুপ করে থেকে বললেন, —শোভন, আমি কিন্তু স্বচক্ষেই দেখেছি৷ তবে তোমাদের চুনিদির পিচাশকে আমি কিংকং নাম দিয়েছি৷ কারণ যে মূর্তিটা গতরাতে মন্দিরের পাশে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখেছি, তাতে মূর্তিটার সঙ্গে কিংকং-এর চেহারার সাদৃশ্য আছে৷ শুধু একটাই তফাত, এই কিংকংয়ের চোখদুটো টর্চের আলোয় লাল দেখেছি, আর মুখের দু’দিকে দুটো লম্বা দাঁতও আমার চোখে পড়েছে৷ আমার ধারণা ওই মূর্তিটার চোখের লাল আলোর দাঁতে পড়ায় দাঁতগুলোও লাল দেখাচ্ছিল৷

শোভন জিগ্যেস করল, —আপনার দেখা কিংকং কি গর্জন করছিল?

কর্নেল বললেন, —এটাই বড়ো অদ্ভুত, শোভন৷ তোমার শ্বশুরমশাইয়ের ঘর থেকে চিৎকার আর বন্দুকের গুলির শব্দ শুনে আমি তখনই ব্যালকনিতে গিয়ে টর্চের আলো ফেলেছিলুম৷ তখন কিন্তু কিছু দেখতে পাইনি৷ কিন্তু ততক্ষণে গুলির শব্দে বাড়ির লোকজনের ঘুম ভেঙে গেছে৷ তারা সবাই হই-হল্লা করছিল৷ অগত্যা আমি বারান্দায় বেরিয়ে গিয়ে দেখি তোমার শ্বশুরমশাই বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে তখনই নিচে গেলুম৷ তারপর নিচের ঘর থেকে বেরিয়ে খিড়কির দরজায় গেলুম৷ তোমার শ্বশুরমশাই আমার নির্দেশে খিড়কির দরজার তালা খুলে দিলেন৷

কুন্তলা মন্তব্য করল, —বাড়ির সব চাবি বাবার পকেটেই থাকে৷ ওঁর অভ্যাস চাবিগুলো নাইট-ড্রেসের পকেটে রেখেই ঘুমোতে যান৷

শোভন বলল, —শ্বশুরমশাই এ-বাড়ির কাকেও বিশ্বাস করেন না৷ যাই হোক, তারপর কী হল বলুন৷

কর্নেল বললেন, —ততক্ষণে রাজু, চুনিবালা, ভজুয়া আর তার বউ সবাই ভিড় করে এসেছে৷ দরজা খোলার পর আমি ভেবেছিলুম মন্দিরের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করে দেখব৷ কিংকং বাবাজির অমন বিশাল শরীরের পায়ের ছাপ কোথায় পড়েছে৷ কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, সেই সময় আমার বাঁ হাতে টর্চ আর ডান হাতে লোডেড রিভলভার৷ নেহাত খেয়ালবশে ঠাকুরবাড়ির দিকে টর্চের আলো ফেললুম৷ একই সঙ্গে কুমার বাহাদুরও তাঁর টর্চের আলো ফেলেছিলেন৷ তখনই দেখি, কিংকং বেটাচ্ছেলে তখনও দাঁড়িয়ে ছিল৷ দু’জনের আলো পড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সে যেন অদৃশ্য হয়ে গেল৷ আমি পুকুরের পাড় ঘুরে ঠাকুরবাড়ির পেছনে গিয়ে টর্চের আলো ফেললুম৷ কিন্তু কোথাও তার পাত্তা পেলুম না৷ আরও আশ্চর্য ব্যাপার, সে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই জায়গাটা অনুমান করে তার পায়ের ছাপ খুঁজলুম৷ কিন্তু কোনও দাগ দেখতে পেলুম না! সাত ফুটেরও বেশি উঁচু বলে মনে হয়েছিল কিংকং-কে৷ তাহলে তার দেহের ওজন কত হতে পারে বুঝে নাও৷

শোভন বলল, —তাহলে তো নিশ্চয়ই ওখানকার ঘাসে ঢাকা মাটিতে তার পায়ের ছাপ থাকা উচিত৷

এই সময়েই কুন্তলা বলল, —আমি গিয়ে চুনিদিকে কফি করতে বলি৷ কফি না হলে কর্নেল সাহেবের নার্ভ চাঙ্গা হবে না৷

সে বেরিয়ে যাওয়ার পর শোভন বলল,—শুনলুম, অত সব কাণ্ডের সময় জয়ন্তবাবু নাকি বেঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন?

কর্নেল বললেন, —ওর দোষ নেই৷ সারা রাতের ট্রেন জার্নির পর কাল ওকে সারাদিন বিশ্রাম দিইনি৷

শোভন হাসতে-হাসতে বলল, —আমার মতে সাংবাদিক আর পুলিশ, এঁরা ঘটনাকালে উপস্থিত থাকেন না৷ ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সেখানে যান৷

বললুম, —আপনি হয়তো ঠিকই বলেছেন৷ তবে কর্নেল আমাকে ঘুম থেকে ওঠালে ভালো করতেন৷ অন্তত স্বচক্ষে কিংকং-কে দেখলে তার চেহারার ডিটেলস বর্ণনা দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার পাতায় দিতে পারতুম৷

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, —আমার প্ল্যান যদি ঠিকঠাক কার্যকর হয় তাহলে আজ রাতে তুমি তাকে অবশ্যই স্বচক্ষে দেখতে পাবে৷

শোভন বলল,—আচ্ছা কর্নেল, আমার শ্বশুর মশাইয়ের কাছে শুনেছি, ওটা নাকি একটা অলৌকিক শক্তি৷ কিন্তু আমার শ্বশুরমশাই নাকি কেমন একটা শোঁ-শোঁ বা শনশন জাতীয় শব্দ শুনে টের পান তার আবির্ভাব ঘটেছে৷ অবশ্য উনি বলেছিলেন শব্দটা কখনও শিসের মতো শোনায়৷ ওঁর সারা রাত ঘুম হয় না৷ তাই ওঁর কানে অপদেবতার আবির্ভাবের শব্দ এসে ধাক্কা দেয়৷ আচ্ছা কর্নেল, আপনি কি তেমন কোনও শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন?

কর্নেল বললেন, —না৷ আমার ঘুম ভেঙেছিল বন্দুকের গুলির শব্দে৷ আচ্ছা শোভন, রাজীব শর্মা সম্পর্কে তোমার কী ধারণা?

শোভন গম্ভীর মুখে বলল,—রাজুকে বহাল করতে আমি শ্বশুরমশাইকে নিষেধ করেছিলুম৷ কিন্তু আপনি তো জানেন, এই উত্তরমহল আর দক্ষিণ মহলের মধ্যে বিবাদটা যেন কুরু-পাণ্ডবের৷ তাই যেহেতু শুভেন্দুজেঠু তাকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন, অতএব শ্বশুরমশাইয়ের মাথায় জেদ চেপে গেল৷ তা ছাড়া রাজু শ্বশুরমশাইকে অনেকদিন থেকেই চুপিচুপি লোভ দেখাত, মফতলালজি এই বাড়িটা কিনতে চান৷ ওঁদের গোডাউন হিসেবে এটা ব্যবহার করা হবে৷ প্রায় এক কোটি টাকা দিয়ে উত্তরমহল কিনতে ওরা রাজি৷ তারপরই কিন্তু আপনার বর্ণিত কিংকং-এর দৌরাত্ম্য শুরু হয়েছে৷ কাজেই শ্বশুরমশাই আর আমাকে পাত্তা দিচ্ছেন না৷

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —কিন্তু রাজু দক্ষিণ মহলের সিন্দুক ভেঙে রায়রাজাদের পূর্বপুরুষ ঐশ্বর্য নারায়ণ রায়ের যে কাগজটা তোমার শ্বশুরমশাইকে দিয়েছিল, উনি কলকাতায় গিয়ে আমাকে সেটা পাঠোদ্ধারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন৷ আমি খ্যাতনামা ঐতিহাসিক এবং প্রত্নততাত্ত্বিক অধ্যাপক ব্রজেন মুখার্জির সাহায্য ওটার পাঠোদ্ধার করে এনেছি৷ অধ্যাপক মুখার্জি সাবলীল বাংলায় অনুবাদ করেছেন৷ সেই অনুবাদটা তুমি এবার পড়ে দেখো৷

বলে কর্নেল তাঁর কিটব্যাগ তুলে নিয়ে চেন টেনে মূল কপি এবং অনুবাদ দুটোই বের করে শোভনকে দিলেন৷ শোভন অনুবাদটা পড়তে-পড়তে বলল, —এ তো দেখছি মা কালীর বন্দনা৷

এই সময়ই কুন্তলা এবং চুনিবালা এসে ঘরে ঢুকল৷ চুনিবালা কফির ট্রে টেবিলে রেখে গোমড়া মুখে বলল, —কুমারবাহাদুর বাড়িতে নেই, ওদিকে রাজুর কাছে একটা লোক এসে কিছুক্ষণ আগে খবর দিয়ে গেল, তার ঠাকুমা নাকি খাবি খাচ্ছে৷ রাজুকে বলেছি, ইচ্ছে হলে তুমি ঠাকুমাকে দেখতে যাও৷ তুমি তো মালিকের কথার তোয়াক্কা করো না৷

কুন্তলা বলল, —রাজু আমাকে ধরেছিল৷ আমি ওকে যেতে বলে এলুম৷

শোভন ব্যস্তভাবে বলল, —চুনিদি, তুমি গিয়ে দেখো, ওই বজ্জাতটা বাড়ি থেকে কোনও জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে কিনা৷ ওকে আমি একটুও বিশ্বাস করি না৷

চুনিবালা তখনই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল৷ কুন্তলা শোভনকে বলল, —তুমি অত মন দিয়ে এটা কী পড়ছ?

শোভন বলল,—দক্ষিণ মহল থেকে রাজুর চুরি করে আনা কাগজটার বাংলা অনুবাদ৷ তোমাকেও পড়তে দিচ্ছি, একটু অপেক্ষা করো৷

এইসময় কুন্তলা ছাড়া আমরা তিনজনই কফি পানে মন দিলুম৷ শোভন দ্বিতীয় পৃষ্ঠা পড়ার পর যেন চমকে উঠল৷ বলল,—বন্দনার শেষ ছত্রে হঠাৎ বাণ, পক্ষ, সিন্ধু৷ এর মানে?

কর্নেল বলল,—পাঁচে পঞ্চবাণ, দুয়ে পক্ষ, এবং সাতে সিন্ধু৷ অর্থাৎ, পাঁচ, দুই সাত৷

শোভন অবাক হয়ে বলল, —হঠাৎ পাঁচ-দুই-সাত কেন?

কর্নেল গম্ভীর মুখেই বললেন, —তুমি এ বাড়িতে এতদিন আছ, বর্গিদের কাছ থেকে রাজা ঐশ্বর্য নারায়ণের লুঠ করে নেওয়া ধনরত্নের গল্প শোননি?

কুন্তলা চাপাস্বরে বলে উঠল, —ওগো, এটা সেই গুপ্তধন সংক্রান্ত কোনও সাংকেতিক সূত্র নয়তো?

শোভন বলল, —কর্নেল, আপনার কী মনে হয়?

কর্নেল নির্বিকার মুখে বললেন, —কুন্তলা ঠিকই বলেছে৷

শোভন বলল, —শ্বশুরমশাইকে আপনি এটা দেখিয়েছেন তো?

কর্নেল বললেন, —দেখিয়েছি৷ এর ফলে কুমার বাহাদুরও দোটানায় পড়ে গিয়েছেন৷ গতকাল বিকেলে মফতলালজি এসেছিলেন৷ আমাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তারপর কুমারবাহাদুর তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিলেন৷ গত রাতের ঘটনার পর এখন জানি না তোমার শ্বশুরমশাই গুপ্তধনের লোভ ত্যাগ করে সত্যি বাড়ি বেচে ফেলবেন কিনা৷

কুন্তলা আস্তে বলল, —বাবা, ভজুয়াকে বলে গেছেন আমরা ফিরে এলে যেন সে বলে উনি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন৷ কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি৷ বাবা কেন ডাক্তারের কাছে যাবেন? তাঁর একটা সম্মান আছে৷ রায়পুরের যে-কোনও ডাক্তারকে ফোন করলে এখানে এসে হাজির হবেন?

শোভন কাগজটা কুন্তলার হাতে দিয়ে বলল, —নাও, তুমি পড়ে দ্যাখো৷

কর্নেল বললেন, —তুমি তো এই মুলুকের রাজপুত্তুর৷

শোভন হো-হো করে হেসে উঠল, —আপনি তো আহিরগঞ্জে গিয়েছিলেন বলছিলেন৷ গড়ে ঘেরা রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপে এখন বাঘ ভালুক-হাতির ডেরা৷

কর্নেল বললেন, —তবু তুমি রাজবংশের সন্তান৷ আর আহিরগঞ্জ বিহারে বড়ো একটা গঞ্জ৷ কাজেই হিন্দি তোমার মাতৃভাষার মতো৷ তাই নাগরীলিপি যত পুরোনো হোক, তুমি অন্তত ওই শেষ তিনটে শব্দ পড়তে পারবে৷ মূল কপির শেষ দিকটা তুমি দেখে নাও৷

শোভন দ্বিতীয় পাতার শেষ তিনটে শব্দের দিকে তাকিয়ে বলল, —বাঃ, আপনি কপিটার ল্যামিনেশন করিয়ে এনেছেন দেখছি৷ এটা নষ্ট হওয়ার ভয় নেই৷

তারপর সে শেষ শব্দ তিনটে পড়ার চেষ্টা করে বলল, —কিন্তু কর্নেল, আমি চিনি এখনকার নাগরীলিপি৷ শব্দ তিনটে যে ঠিক বুঝতে পারছি তা বলব না, তবে বিশেষজ্ঞমশাই যখন এই তিনটে শব্দকে বাণ, পক্ষ আর সিন্ধু বলেছেন, আমি কিন্তু ঠিক তাই যেন দেখতে পাচ্ছি৷

এই বলে সে আবার হো-হো করে হেসে উঠল৷

কুন্তলা বাংলা অনুবাদটা পড়ার পর বলল, —জানো, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পাঁচ-দুই-সাত-এই নম্বরটাতে নিশ্চয়ই গুপ্তধনের আভাষ আছে৷ কর্নেলসাহেব চেষ্টা করলে এই রহস্যের সমাধান নিশ্চয়ই করতে পারবেন৷

কর্নেল বললেন, —প্রাচীন শাস্ত্রে এগুলোকে বলা হতো, টুটাভাষ৷

এরপর ‘পাঁচশো সাতাশ’ সংখ্যাটা নিয়ে চাপা গলায় আমরা সবাই আলোচনা শুরু করলুম৷ কিছুক্ষণ পরে বাইরে কুমার বাহাদুরের সাড়া পাওয়া গেল৷ তিনি ঘরে ঢুকেই বললেন, —তোমরা এসে গেছ? তা শোভন, ওখানকার খবর কী?

শোভন বলল, —ভালো৷ কিন্তু এখানকার খবর যা শুনলুম তা তো সাংঘাতিক৷ এবার কর্নেলসাহেব নিজের চোখে যে মূর্তিটা দেখেছেন, সেটা নাকি কিংকং-এর মতো দেখতে৷

অমিতেন্দ্রকে খুবই গম্ভীর দেখাচ্ছিল৷ তিনি বললেন, —খবর যে আরও সাংঘাতিক তার প্রমাণ এই দেখো৷ বলে তিনি পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে শোভনকে দিলেন৷ লক্ষ্য করলুম, —লাল ডটপেনে ইংরেজিতে লেখা একটা ছোট্ট চিঠি৷ কিন্তু আগের চিঠিদুটোর মতো ছোট হরফে লেখা নয়৷ আঁকাবাঁকা বড়ো বড়ো হরফ৷

শোভন চিঠিটা কর্নেলের হাতে দিয়ে কুমার বাহাদুরকে জিগ্যেস করল, —এটা আপনি কোথায় পেলেন?

অমিতেন্দ্র আস্তে বললেন, —গেটের কাছে কে একটু আগে ছুঁড়ে ফেলে পালিয়ে যায়৷ ভজুয়া তাকে দেখতে পায়নি৷ আমি গাড়ি নিয়ে ঢুকছি, তখন সে আমাকে এটা দিল৷

কর্নেল বললেন, —লেখাটা মফতলালজির কর্মচারী সেই হাজরাবাবুর নয়৷ এতে ইংরেজিতে লেখা আছে—টুনাইট আই উইল স্ম্যাশ ইউ৷ আজ রাতে তোমাকে গুঁড়িয়ে ফেলব৷ এইরকমই মানে দাঁড়ায়৷ কিন্তু পরের লাইনে যা হুমকি দিয়েছে, তার মানে দাঁড়ায়, পুলিশকে জানালে আমি জানতে পারব৷ তোমার কলকাতা থেকে ভাড়া করে আনা গোয়েন্দারাও তোমাকে বাঁচাতে পারবে না৷ সাবধান!

ঘরে কয়েক মিনিট সবাই চুপ করে থাকলেন৷ তারপর কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন, —এই চিঠিটা আমি কাল বিকেলেই কোনো একটা জায়গায় একজনের ডেরায় দেখে এসেছিলুম৷ কাজেই আমি জানতুম, এটা যে-কোনও সময় আপনার কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে৷

অমিতেন্দ্র ব্যাকুল কণ্ঠস্বরে বললেন, —কোথায় দেখেছিলেন ও বলতে কি কোনও বাধা আছে?

কর্নেল বললেন,—আছে৷ কিন্তু আপনি কোনও চিন্তা করছেন না৷ এটা দেখে ফেলার পরই আমি আপনার দেখা অপদেবতা, আমার দেখা কিংকং-কে ঠিক সময়ে ধরাশায়ী করব৷ তবে আপনাকে অনুরোধ, ঘুণাক্ষরে বাইরের কোনও লোককে, এমনকী রাজু ফিরে এলে তাকেও যেন কিছু জানাবেন না৷

কুমারবাহাদুর উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন, —শোভন, কর্নেলের সঙ্গে তোমার কথাবার্তা শেষ হলে তুমি একবার আমার ঘরে আসবে৷ আর কুন্তলা তুই বরং নিচে গিয়ে রান্নাবান্নার কী ব্যবস্থা হচ্ছে, তার তদারক কর৷ দেখে এলুম,চুনিবালা রাজুর ওপর খাপ্পা হয়ে প্রলাপ বকছে৷

শোভন বলল, চলুন, আপনার সঙ্গেই যাচ্ছি৷ কুন্তলা তুমিও এসো৷

ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পর বললুম, —এই চিঠিটা কোথায় দেখেছেন, তা আমি অনুমান করতে পেরেছি৷

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, —মুখটি বন্ধ করে রাখো৷ তারপর তিনি বাইনোকুলার হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে চলে গেলেন৷ একটু পরে উঠে গিয়ে উঁকি মেরে দেখলুম, উনি বাইনোকুলারে চণ্ডীপাহাড়ে কিছু দেখছেন৷

সেদিন সন্ধ্যার আরতি শেষ হওয়ার পর থেকেই কর্নেল শোভনকে তাঁর ঘরের ব্যালকনি থেকে ঠাকুর বাড়ির দিকে লক্ষ্য রাখতে বলেছিলেন৷ কিন্তু রাত ন’টা অবধি অপেক্ষা করে শোভন এসে বলেছিল, —বরং এখনই আমরা রাতের খাওয়াটা সেরে নিই৷ শ্বশুরমশাই তো একেবারে নির্জীব হয়ে পড়েছেন৷ তাঁর সিদ্ধান্ত, এভাবে এখানে থাকা যায় না৷ ওসব গুপ্তধন-টন বোগাস ব্যাপার৷

এরপর আমরা নিচের ডাইনিং রুমে গিয়ে খেয়ে নিয়েছিলুম৷ কুন্তলা তার বাবাকে জোর করে টেনে নিয়ে এসেছিল৷ তিনি সামান্য কিছু খেয়ে উঠে যাচ্ছিলেন৷ কর্নেল বলেছিলেন,—আপনি নিজের ঘরে গিয়ে নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়তে পারেন৷ যা কিছু ঘটুক, আপনি বাইরে যাবেন না৷ শুধু খিড়কির দরজার তালাটা শোভনকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে খুলে রেখে আসুন৷

পরের ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণনা করছি৷

খাওয়ার পর কুন্তলা তার বাবাকে সামলানোর দায়িত্ব নিয়েছিল৷ আমি এবং কর্নেল দু’জনেই প্যান্টের পকেটে লোডেড রিভলভার নিয়ে বেরিয়েছিলুম৷ নিচে গিয়ে দেখলুম, শোভন তার হাতে রাইফেল নিয়ে পিছন দিকের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে৷ বাড়ির পিছন দিকে দুই কোণে দুটো আলো জ্বলছিল৷ কিন্তু কর্নেলের নির্দেশে ঠাকুরবাড়ির ফিউজ হয়ে যাওয়া বালবটা বদলানো হয়নি৷ তাই ওদিকটা কিছুটা অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল৷ দিঘির উত্তরপাড় ঘুরে কর্নেল একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে শোভনকে বলেছিলেন, —তুমি যা কিছুই দ্যাখো যেন, কখনও গুলি ছুঁড়বে না৷ যদি কিংকং সত্যি আসে, তাকে ধরাশায়ি করার দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দাও৷

এরপর আমরা অন্ধকারে টর্চ না জ্বেলে কাঁটাতারের বেড়া গলিয়ে নিচে নেমে গেলুম৷ তারপর কর্নেলকে শিস দিতে শুনলুম৷ আশ্চর্য ব্যাপার! সামনের দিক থেকে তেমনই শিসের শব্দ শোনা গেল৷ কর্নেলকে অনুসরণ করে আমরা দু’জনে নিচে একটা বড়ো পাথরের আড়ালে গুড়ি মেরে বসে পড়লুম৷ তারপর সে এক অসহ্য প্রতীক্ষা৷ প্রচণ্ড ঠান্ডায় শরীর যেন হিম হয়ে যাচ্ছিল৷ কতক্ষণ পরে হঠাৎ কানে এল একটি শনশন শব্দ৷ তারপর শব্দটা থেমে গেল৷ একটু পরে তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ ভেসে এল৷ অমনই কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর আমাকে অবাক করে নিচু অসমতল মাঠটার বিভিন্ন স্থান থেকে উজ্জ্বল টর্চের আলো জ্বলে উঠল৷ কর্নেল এবং শোভনও টর্চ জ্বেলে ঠাকুরবাড়ির পিছন দিকে আলো ফেললেন৷ সেই আলোয় দেখলুম, ঠাকুরবাড়ির পিছনে ঢালু ঘাসের জমির ওপর সেই সন্ন্যাসী দু-হাতে বিশাল ভয়ংকর রোমশ কিংকং-কে তুলে ধরেছে৷ তারপর টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে একদল পুলিশ সন্ন্যাসীর দিয়ে দৌড়ে গেল৷ তখনই ফোঁ..ও..শ শব্দ করতে-করতে কিংকং নেতিয়ে পড়ে গেল৷ আর সাধুবাবা ঠাকুরবাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করলেন৷ কিন্তু পরক্ষণেই উজ্জ্বল আলোয় দেখলুম সমীরবাবু লাফ দিয়ে এসে তার চূড়ো করে বাঁধা জটা ধরে ফেললেন৷ কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার! সেই জটা সমীরবাবুর সঙ্গেই থেকে গেল৷ এবং ন্যাড়া মাথা সাধুবাবাকে একজন পুলিশ অফিসার বুকে রিভলভার ঠেকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, —গিরিধারি হ্যান্ড-কাফ লে আও!

অন্য একজন পুলিশ অফিসার বলে উঠলেন, —স্যার এ তো দেখছি সেই কুখ্যাত ডাকু চন্দরলাল সিং!

শোভন কাছে গিয়ে হাসতে হাসতে বলল, —আরে এ-তো সেই ডাকুই বটে৷ একে আমি আহিরগঞ্জ এলাকায় অনেকবার দেখেছি৷

কর্নেল বললেন, —মিস্টার চৌবে, আপনারা চন্দরলাল সিংয়ের ডেরায় ফোর্স পাঠিয়েছেন তো?

বুঝতে পারলুম, এই অফিসার এখানকার থানার অফিসার ইনচার্জ৷ তিনি বললেন, —হ্যাঁ, আপনার কথামতো চণ্ডীপাহাড়ের দক্ষিণ দিকে আমার ফোর্স কিছুক্ষণ আগে চলে গেছে৷ চন্দরলালের ডেরা হাতড়ে যা কিছু পাওয়া যায়, সব তারা সিজ করে আনবে৷

এবার কর্নেল ঢালু জমিতে উঠে গিয়ে, বেচারা নেতিয়ে পড়া কিংকংকে টেনে আনলেন৷ শোভন বলল, —কী আশ্চর্য! এ তো দেখছি একটা নিছক খোলস৷

কর্নেল বললেন, —হ্যাঁ, রবারের তৈরি কিংকং-এর ওপর আঠা দিয়ে আগাগোড়া নকল লোম বসানো হয়েছে৷ আর এই দ্যাখো, পিছন দিকে এই জায়গা দিয়ে বাতাস পাম্প করে একে ফুলিয়ে তোলা হতো৷ চোখেদুটো লাল টুনি বালব ফিট করা আছে৷ এখনও বালবদুটো জ্বলছে৷ ব্যাটারির সাহায্য বালবদুটো জ্বলছে৷

আমি জিগ্যেস করলুম, —তাহলে কাল বিকেলে পাশের চাতালে যে জিনিসটা চকচক করছিল, সেটা কী?

জবাব দিলেন ও. সি. মিস্টার চৌবে৷ হাসতে-হাসতে বললেন,—কর্নেলসাহেব আমাকে টেলিফোনে বলেছিলেন, এই ব্যাটাছেলের ডেরায় একটা বড়ো আকারের পাম্পিং সিরিঞ্জ পাওয়া যাবে৷ সেটা শিগগির আমরা দেখতে পাব৷

এইভাবেই একটা অদ্ভুত ঘটনার হাস্যকর সমাপ্তি ঘটল৷ কিন্তু আমরা কিংকং এবং আসামি চন্দরলালকে নিয়ে যখন উত্তর মহলের দিকে এগোচ্ছি, তখন নিচের মাঠ থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল,—পাকড়ো-পাকড়ো-পাকড়ো—

সেইসঙ্গে টর্চের আলো দেখতে পেলুম৷ সেই আলোতে দেখা গেল, কয়েকজন কনস্টেবল রাজীব শর্মাকে জাপটে ধরে মাটিতে ফেলেছে৷ তারপর তারা তাকে হাতকড়া পড়িয়ে টানতে-টানতে আমাদের কাছে নিয়ে এল৷ শোভন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলল, —এই যে রাজীব চন্দ্র তোমাকে আমি অনেক আগেই চিনতে পেরেছিলুম৷ তুমি মফতলালজির টাকা খেয়ে এ-বাড়িতে কেন ঢুকেছিল, তা বুঝতে পেরেছি৷ গুপ্তধনের লোভ—তাই না?

কর্নেল হসেতে-হাসতে বললেন, —রাজু বড়ো ধুরন্ধর৷ নিশ্চয়ই ওই কাগজটা দক্ষিণ মহলের সিন্দুক থেকে হাতিয়ে ভেবেছিল, এতে গুজবের সেই গুপ্তধনের হদিস আছে৷

কর্নেল সহাস্যে বললেন, —কিন্তু এবার আসল ঘটনাটা বলি৷ ঐশ্বর্যনারায়ণের মাতৃবন্দনার শেষে ওই তিনটে শব্দ বাণ, পক্ষ এবং সিন্ধু আমারই পরামর্শে অধ্যাপক মুখার্জি একই ধরনের কালি দিয়ে একই ধাঁচের প্রাচীন নাগরী হরফে লিখে দিয়েছিলেন৷

এরপর পুলিশ অফিসারেরা তাঁদের বাহিনী এবং দু’জন আসামী সহ উত্তরমহলের লনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন৷ কারণ ঘটনাটা প্রকৃতপক্ষে কী, তা কুমারবাহাদুকে জানিয়ে যেতে চেয়েছিলেন৷ আর কর্নেল নেতিয়ে পড়া কিংকং-কে দেখিয়ে বলেছিলেন, —কুমারবাহাদুর, এই দেখুন আপনার দেখা সেই অতিপ্রকৃত শক্তি বা অপদেবতা৷ বাকি সব কথা আপনাকে পরে বুঝিয়ে বলব৷

আমরা যখন শুতে গেলুম, তখন রাত প্রায় বারোটা বাজে৷ আমাদের ঘরে শোভন, কুন্তলা এবং কুমারবাহাদুর বসেছিলেন৷ কর্নেল কুমারবাহাদুরকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শুনিয়ে বললেন, —আপনার ঠাকুরদা ঐশ্বর্য নারায়ণ মাতৃবন্দনার কপি সঠিক করেছিলেন৷ কিন্তু আমি আপনাকে বাড়ি বিক্রিতে বাধা দেওয়ার জন্য একটা ফন্দি এঁটেছিলুম৷ আপনার দেওয়া মূল কপিতে তিনটে শব্দ অধ্যাপক মুখার্জিকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলুম৷

শোভন হাসতে-হাসতে বলল,—পাঁচ, দুই, সাত৷

কুমারবাহাদুরের মুখে এবার কথা ফুটল৷ তিনি বললেন, —আমি বরাবর বলে আসছি, গুপ্তধনের ব্যাপারটা নেহাত গুজব৷

এই বলে তিনি উঠে গেলেন৷ শোভন, কুন্তলাও উঠে দাঁড়াল৷ শোভন বলল, —আপনারা এবার শুয়ে পড়ুন৷ সকালে থানায় গিয়ে দিনের আলোয় কিংকং এবং সেই পাম্পিং সিরিঞ্জটা দেখে আসব৷ গুডনাইট৷

কর্নেল বললেন, —গুড নাইট৷

তারপর তিনি দরজা বন্ধ করে দিয়ে মুচকি হেসে বললেন,—কী জয়ন্ত, কিংকং নিয়ে কেমন একটা জম্পেশ স্টোরি পেয়ে গেলে! এবার শুয়ে পড়ো৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%