সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
মোহেনজো-দাড়োতে ঘোড়া? অসম্ভব! ওখানে খোঁড়া-খুঁড়ি করে এ-যাবৎ অনেক জন্তুর মূর্তি পাওয়া গেছে, ঘোড়ার কোনো চিহ্নই মেলেনি৷ এর একটাই মানে দাঁড়ায়৷ ওখানকার লোকেরা ঘোড়া নামে কোনো জন্তুর কথা জানত না৷ আর শুধু ওখানে কেন, হরাপ্পা, চানহুদড়ো, কালিবঙ্গান থেকে শুরু করে যেখানে-যেখানে সিন্ধু-সভ্যতার চিহ্ন পাওয়া গেছে, কোথাও ঘোড়ার মূর্তি দেখা যায়নি৷
‘আচ্ছা ডঃ আলুওয়ালা, মোহেনজো-দাড়োর ধ্বংসাবশেষ তো বাঙালি পুরাতাত্ত্বিক রাখালদাস বাঁড়ুয্যে আবিষ্কার করেছিলেন৷ তাই না?’
‘হ্যাঁ৷ ১৯২২ সালে বাঁড়ুয্যেমশাই সিন্ধু প্রদেশের লারকানা থেকে মাইল বিশেক দূরে একটা বৌদ্ধ স্তূপ দেখতে পান৷ সেখানে খোঁড়া-খুঁড়ি করার সময় টের পান, একটা শহরের ধ্বংসাবশেষ মাটির তলায় লুকিয়ে আছে৷ এর প্রায় একশো বছর আগে ওখান থেকে চারশো মাইল দূরে হরাপ্পার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছিল৷ তবে যাকে বলে বিজ্ঞানসম্মত খনন, তা শুরু হয় ১৯২১ সালে৷ তারপর...’
‘তো একটা কথা জিগ্যেস করি ডঃ আলুওয়ালা৷ আপনার বাবা ওই সময় লারকানায় স্টেশনমাস্টার ছিলেন৷ তাই না?’
‘হ্যাঁ৷ কিন্তু আপনি কীভাবে জানলেন?’
‘আপনার লেখা একটা প্রবন্ধ পড়ে৷ চমৎকার প্রবন্ধ৷’
‘বাঃ৷ আপনার দেখছি পুরাতত্ত্ব বিষয়ক পত্রিকা পড়ারও নেশা আছে৷’
‘আমি সবই পড়ি, ডঃ আলুওয়ালা৷ সত্যি বলতে কী, আপনার ওই প্রবন্ধ পড়েই আপনার সঙ্গে যোগাযোগের লোভ সামলাতে পারিনি৷’
‘হাঃ হাঃ হাঃ! এতক্ষণে বুঝলুম, কেন আমার কাছে এসেছেন৷ বাঁচালেন মশাই৷ এতক্ষণ আপনার সঙ্গে কথা বলছি বটে, কিন্তু মনের মধ্যে অস্বস্তি হচ্ছিল প্রচণ্ড রকমের৷’
‘সে কী! কেন, কেন?’
‘আপনার কার্ডটা দেখে৷ ওতে লেখা আছে: কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার৷ অর্থাৎ কিনা শখের গোয়েন্দা৷ দেখেই আমি চমকে উঠেছিলুম৷ আমার কাছে এই সাতসকালে গোয়েন্দা কেন রে বাবা? আমি নেহাৎ অধ্যাপক মানুষ৷ হাঃ হাঃ হাঃ! তার ওপর আপনার সঙ্গী ভদ্রলোক আবার খবরের কাগজের লোক৷ বলুন, অস্বস্তি হয় কি না৷’
এই সময় চা ও স্ন্যাকস এল ঢাউস ট্রে-বোঝাই হয়ে৷ ডঃ আলুওয়ালা ভৃত্যের হাত থেকে ট্রে প্রায় কেড়ে নিলেন এবং টেবিলে রেখে সযত্নে চা তৈরি করতে ব্যস্ত হলেন৷ আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, কর্নেলবুড়ো ডঃ আলুওয়ালার বই-ঠাসা আলমারিগুলোর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন৷ অপরাধতত্ত্ব থেকে প্রকৃতিতত্ত্বে এসে পৌঁছেছিলেন ইদানীং৷ এবার দেখছি, পুরাতত্ত্বে ঝুঁকেছেন৷ হুঁ, বুড়ো এবার তত্ত্ববাগীশ না হয়ে ছাড়বেন না৷
‘চা নিন, কর্নেল৷’
কর্নেল হাত বাড়িয়ে কাপ নিয়ে বললেন, ‘আপনি মোহেনজো-দাড়োর একটা ফলকের হরফগুলো নাকি পড়তে পেরেছেন৷ দয়া করে সেটা যদি একবার দেখান, বাধিত হবো৷’
ডঃ আলুওয়ালা একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘আপনাকে দেখাতে আপত্তি নেই৷ কিন্তু জয়ন্তবাবুকে একটা বিশেষ অনুরোধ করব৷’
বললুম, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷’
‘দেখুন জয়ন্তবাবু, সেই ১৯২২ থেকে এ পর্যন্ত দেশবিদেশের বড়ো বড়ো পণ্ডিত সিন্ধু সভ্যতার সময় নিয়ে বিস্তর মাথা ঘামাচ্ছেন৷ সিলমোহর এবং ফলকের লেখাগুলো পড়তে পারলে হয়তো সঠিক সময় নির্ণয় করা যেত৷ কেউ বলছেন, এ সভ্যতা খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার সালের, কেউ বলছেন, আরো পরবর্তী যুগের৷ তো আজ অব্দি সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি৷ যদিও মাঝে মাঝে কেউ কেউ দাবি করেন যে তিনি লেখাগুলো পড়তে পেরেছেন৷ আসলে সমস্যা কোথায় জানেন? সম্ভবত যে-ভাষার ওই লিপি, সেই ভাষাই হাজার হাজার বছর আগে লুপ্ত হয়েছে৷ যাই হোক, এই সমস্যার একটা সমাধানের পথ আমি খুঁজে পেয়েছিলুম৷ আপনারা চিত্রলিপির কথা নিশ্চয়ই জানেন? অতীত যুগে সূর্য বোঝাতে সূর্য আঁকা হত৷ পাখি বোঝাতে পাখি৷ মোহেনজো-দাড়োর একটা ফলক নিয়ে আমি গবেষণা শুরু করেছিলুম৷ সেটাতে কয়েকটা চিহ্ন দেখে আমার মনে হয়েছিল, এ নিশ্চয়ই চিত্রলিপি৷ চিহ্নগুলোতে ফসলের শীষ, লাঙল, বলদ, শস্যগোলা ইত্যাদির আভাস আছে যেন৷ এই সূত্র ধরেই ফলকটা আমি অনুবাদ করে ফেলেছি৷ কিন্তু এখনই হুট করে সেটা প্রচার করতে চাইনে৷ যদি ভুল প্রমাণিত হয়, উপহাস্যাস্পদ হবো৷ তাই জয়ন্তবাবু খবরের কাগজের লোক বলেই বলছি, ফলকের অনুবাদটা যেন কাগজে ছেপে দেবেন না৷ আমি পত্রিকার প্রবন্ধে শুধু বলেছি, একটা ফলকের পাঠোদ্ধার করেছি বলে মনে করি৷ তার বেশি কিছু লিখিনি৷’
আমি জোরে মাথা দুলিয়ে বললুম, ‘কক্ষনো ছেপে দেব না৷ আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ডঃ আলুওয়ালা৷ তা ছাড়া আপনার সঙ্গে এই সাক্ষাৎকারের ব্যাপারটাই আমি দৈনিক সত্যসেবকে প্রকাশ করব না৷ কারণ, আমার মাননীয় বন্ধু কর্নেল আমাকে আগেই সেটা নিষেধ করে দিয়েছেন৷’
কর্নেল দাড়ি ও টাক পর্যায়ক্রমে চুলকে বললেন, ‘ঠিক, ঠিক৷’
ডঃ আলুওয়ালা উঠে গিয়ে একটা স্টিলের আলমারি খুললেন৷ তারপর একটা ফাইল বের করে আনলেন৷
কর্নেল ঝুঁকে পড়লেন ফাইলের কাগজপত্রের দিকে৷ আমি কিস্যু বুঝলাম না৷ একগাদা কাগজে নানান বিদঘুটে আঁকজোক রয়েছে৷ তার পাশে নানান উদ্ভুটে শব্দ ইংরাজিতে লেখা৷
ডঃ আলুওয়ালা একটা কাগজ তুলে নিয়ে বললেন, ‘ফলকটায় লেখা আছে কী, শুনুন:
শস্যগোলার অধিকর্তাকে একটি সেরা জাতের বলদ পাঠানো হচ্ছে৷’
কর্নেল বললেন, ‘পাঠাচ্ছেন কে?’
‘সে-কথা ফলকে নেই৷ মনে হচ্ছে, এটা একটা বাণিজ্য সংক্রান্ত সংবাদ৷ আজকাল যাকে বলে চালান বা ইনভয়েস৷’
‘ফলকটা কিসের তৈরি? কোথায় আছে ওটা?’
‘ফলকটা ব্রোঞ্জের৷ মাপ হচ্ছে সাড়ে তিন ইঞ্চি চওড়া, সাত ইঞ্চি লম্বা৷ ওটা এখন আছে লন্ডনের জাদুঘরে৷ মোহেনজো-দাড়ো এবং হরাপ্পা পাকিস্তানে৷ তাই পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে ওটা দাবি করছেন৷ শুনেছি, ফলকটা শিগগির ফেরত দেওয়া হবে৷’
‘আপনি কোত্থেকে ফলকের নকল সংগ্রহ করেছিলেন?’
ডঃ আলুওয়ালা হাসলেন৷ ‘আমার বরাত বলতে পারেন৷ বাবা ছিলেন লারকানার স্টেশন মাস্টার৷ এখন তো লারকানা মস্ত শহর৷ পাকিস্তানের প্রখ্যাত নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর বাড়ি ওখানে৷ আমার ছেলেবেলায় লারকানা ছিল অখাদ্য জায়গা৷ যাই হোক, বাবার একটু আধটু পুরাতত্ত্বের বাতিক ছিল৷ স্যার জন মার্শাল ভারতে ব্রিটিশ সরকারের পুরাতত্ত্ব দফতরের কর্তা ছিলেন তখন৷ রাখালদাস বাঁড়ুয্যে ছিলেন তাঁরই অধীনে এক কর্মচারী৷ বাঁড়ুয্যেমশায়ের সঙ্গে বাবার খুব বন্ধুত্ব ছিল৷ সেই সূত্রে বাবা ওঁরই কাছ থেকে এই ব্রোঞ্জের ফলকের একটা অবিকল নকল জোগাড় করেছিলেন৷ সেটা এখনও আমার কাছে আছে৷ দেখাচ্ছি৷’
বলে ডঃ আলুওয়ালা উঠলেন৷ ভেতরের ঘরে চলে গেলেন৷ এতক্ষণে আমি আমার বৃদ্ধ বন্ধুক প্রশ্ন করার সুযোগ পেলুম৷ ‘হ্যালো ওল্ড ঘুঘু! ব্যাপারটা কী বলুন তো?’
‘চুপ, চুপ! আমাকে ঘুঘু বলে ডেকো না৷’
‘তাহলে কি টিকটিকি বলে ডাকব?’
‘কিচ্ছু না৷ স্রেফ কর্নেল বলে ডাকবে৷’
‘বেশ৷ কর্নেল স্যার, এবার বলুন তো সাত-সকালে আমাকে ঘুম থেকে তুলে কেন এই গোরস্থানে নিয়ে এলেন?’
‘গোরস্থান!’ ... কর্নেল চাপা হাসলেন৷ ‘তুমি ঠিকই বলেছ জয়ন্ত৷ মোহেনজো-দাড়ো কথাটার মানে মৃতদেহের স্তূপ৷’
‘এবং এই ডঃ আলুওয়ালা দেখছি সেই গোরস্থানের এক মামদো ভূত!’
‘ছি, ছি! মহাপণ্ডিত মানুষ উনি!’
‘যাই বলুন, হাজার হাজার বছর আগের ব্যাপার নিয়ে যাঁরা মাথা ঘামান, তাঁরা মামদো ভূত নয়তো কী? বর্তমানেই আমাদের কত সব সমস্যা! তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে কাজ হত৷ তা নয়, মোহেনজো-দাড়ো!’
‘উঁহু, মোহেনজো-দাড়োর ঘোড়া৷’
‘সে ঘোড়াও তো কত হাজার বছর আগে মরে ভূত হয়ে গেছে৷ তা ছাড়া এখন ঘোড়ার মূল্য কী? এটা যন্ত্র-যুগ৷ বড়োজোর রেস খেলায় বাজি ধরে যারা, তারা ঘোড়া নিয়ে মাথা ঘামায় দেখেছি৷ আপনি কি ইদানীং রেসুড়ে হয়ে উঠেছেন? ছ্যা ছ্যা!’
‘জয়ন্ত ডার্লিং! তোমার কথাগুলো কিন্তু ভিন্ন অর্থে সত্যি৷ আমি সম্প্রতি মোহেনজো-দাড়োর ঘোড়া-ভূতের পাল্লায় পড়েছি এবং রেসুড়েদের মতো তার পিছনে বাজিও ধরেছি৷’
এবার একটু চমকে উঠলুম৷ বুড়োর কথায় হেঁয়ালি আছে৷ কিন্তু আর প্রশ্ন করার সুযোগ পেলুম না৷ ডঃ আলুওয়ালা হন্তদন্ত ফিরে এলেন৷ একেবারে অন্য রকম চেহারা৷ হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, ‘তাজ্জব কাণ্ড কর্নেল! ফলকটা খুঁজে পেলুম না!’
‘সে কী!’
‘শুধু তাই নয়, শোবার ঘরের যে আলমারির লকারে ওটা রেখেছিলুম, তার তালা ভাঙা৷ আলমারির পাল্লার তালা কিন্তু ঠিক আছে৷’
‘ভারি আশ্চর্য তো!’
‘অতি আশ্চর্য! গত রাতেও দেখেছি, লকারটা ঠিক আছে৷ এখন দেখি তালা ভাঙা৷ কে এমন সাংঘাতিক কাজ করল বুঝতে পারছি না!’
‘আর কোনো জিনিস চুরি গেছে কি?’
‘নাঃ৷ আমার স্ত্রীর গয়নাগাঁটি এবং কিছু নগদ টাকা ছিল৷ সব আছে৷’
‘আপনার স্ত্রী কিছু বলতে পারছেন না?’
‘আমার স্ত্রী গতকাল সকালে বোম্বাই গেছেন মেয়েকে নিয়ে৷ বাড়িতে আমি একা৷’
‘আপনার চাকর আছে দেখলুম৷’
‘ও! হ্যাঁ! বৈজু আছে বটে৷ কিন্তু সে তো খুব বিশ্বাসী ছেলে৷ প্রায় মাস তিনেক হল, তাকে রেখেছি৷ বুঝতেই পারেন, আজকাল ভালো ঝি-চাকর পাওয়া কত সমস্যা!’
‘বৈজুকে জিগ্যেস করলেন কিছু?’
‘নিশ্চয়ই করব৷ বোধহয়, বাজার করতে গেছে৷ ফিরে আসুক৷’
‘আপনি দয়া করে বসুন, ডঃ আলুওয়ালা!’
কর্নেলের কথায় উনি ধুপ করে বসলেন৷ উত্তেজনায় তখনও ওঁকে অস্থির দেখাচ্ছে৷ আমি বললুম, ‘পুলিশে জানানো উচিত৷’
কর্নেল বললেন, ‘অবশ্যই৷ আচ্ছা ডঃ আলুওয়ালা, ফলকের নকল চুরি করে কার কী লাভ হতে পারে?’
ডঃ আলুওয়ালা জবাব দিলেন, ‘বুঝতে পারছি না৷ তবে একটা কথা, ওই ফলকটার ছবি কিন্তু এ-যাবৎ কোনো বইয়ে দেখিনি৷ কোথাও কোনো উল্লেখও পাইনি৷ নেহাত বাবার খেয়াল ছিল, তাই সংগ্রহ করেছিলেন এবং আমি দেখবার সুযোগ পেয়েছিলুম৷’
‘লন্ডন মিউজিয়ামে যে আসল ফলকটা আছে, কী ভাবে জানলেন?’
‘খবরের কাগজে পড়ে৷ পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে যে-সব প্রত্নদ্রব্য দাবি করেছেন, তার মধ্যে ওই ফলকটার উল্লেখ ছিল৷’
‘হুম! কষ্ট করে এবং প্রচুর অর্থব্যয়ে লন্ডন যাওয়ার চেয়ে আপনার আলমারি থেকে ওটার নকল বাগানো অনেক সোজা হয়েছে৷’
ডঃ আলুওয়ালার মনে ধরল কথাটা৷ সায় দিয়ে বললেন, ‘ঠিক, ঠিক৷ কিন্তু ওতে এমন কী আছে কে জানে? চোর ইচ্ছে করলে এই ফাইলটাও হাতাতে পারত৷ এতেও কাগজে আঁকা অবিকল স্কেচ রয়েছে৷’
কর্নেল হাসলেন৷ ‘কাগজের স্কেচের চেয়ে ব্রোঞ্জের নকল ফলকটাই কাজে লাগবে মনে হয়েছে কারুর৷ আপনার এই স্কেচ তো নকলস্য নকল৷ আপনার ড্রইং ক্ষমতায় সম্ভবত আস্থা নেই ভদ্রলোকের৷’
‘ভদ্রলোক! সে ব্যাটা ভদ্রলোক! নচ্ছার চোর কাহেকা৷ এক্ষুনি থানায় জানাচ্ছি৷’
ডঃ আলুওয়ালা উত্তেজিতভাবে ফোনের কাছে গেলেন৷ ডায়াল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘সব সময় এনগেজড! কলকাতার টেলিফোনকে ভূতে ধরেছে৷ নাঃ! থানায় গিয়েই সব জানিয়ে আসি৷ বৈজু আসুক৷’
এই সময় আমি লক্ষ্য করলুম, কর্নেল টেবিলে রাখা সেই ফাইল থেকে একটুকরো কাগজ তুলে নিয়ে কোটের পকেটে ঢোকালেন৷ ডঃ আলুওয়ালা টের পেলেন না৷ আবার ডায়াল করতে ব্যস্ত হয়েছেন৷ বোঝা যায়, থানায় যেতে মন চাইছে না৷ নেহাৎ বেঘোরে না পড়লে আজকাল থানায় যেতে কারই বা ইচ্ছে করে!
কিন্তু কর্নেল যা করলেন, তাও যে চুরি! আমি কটমট করে তাকাতেই উনি চোখ টিপে একটু হাসলেন৷ আমার অস্বস্তি হল৷ বুড়ো বয়সে কেলেঙ্কারি করবেন যে!
ডঃ আলুওয়ালা আরও কয়েকবার চেষ্টা করার পর থানার লাইন না পেয়ে হাল ছেড়ে দিলেন৷ তারপর আমাদের কাছে এসে বিমর্ষভাবে বললেন, ‘দেখুন তো, কী সর্বনাশ হল!’
কর্নেল বললেন, ‘থানায় গিয়ে জানিয়ে দিন এক্ষুনি৷ আর ইয়ে, আমরা তাহলে উঠি৷ অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করলুম আপনার৷’
‘মোটেই না! ভাগ্যিস আপনারা এসেছিলেন, তাই চুরিটা এত শিগগির ধরা পড়ল৷ নইলে আমি তো ওই আলমারি এখন খুলতুম না৷ কিচ্ছু টেরও পেতুম না৷’
কর্নেল ও আমি উঠে দাঁড়ালুম৷ ডঃ আলুওয়ালা এগিয়ে গিয়ে দরজার পর্দা তুলে ধরলেন৷ ভদ্রলোক অতি সজ্জন ও কেতাদুরস্ত মানুষ৷
আমরা তিনতলা থেকে নেমে আসছি, দোতলার মুখে ডঃ আলুওয়ালার চাকর সেই বৈজুর সঙ্গে দেখা হল৷ তার হাতে বাজারের থলে৷ সসম্ভ্রমে একপাশে সরে সে আমাদের সেলাম দিল৷ কর্নেল তাকে কী যেন জিগ্যেস করতে ঠোঁট ফাঁক করলেন৷ করেই ঠোঁট বুজিয়ে নিলেন৷ বৈজু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল৷ কর্নেল গট গট করে নেমে গেলেন৷ আমি বৈজুর দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টে তাকাতে তাকাতে তাঁকে অনুসরণ করলুম৷
রাস্তায় আমার গাড়ি দাঁড় করানো ছিল৷ একটু পরে গাড়িতে যেতে যেতে বললুম, ‘আপনিও ওই চুরিতে জড়িয়ে পড়বেন কিন্তু৷ ডঃ আলুওয়ালা যখন টের পাবেন, কাগজে আঁকা ফলকের চিত্রলিপিটা নেই—তখন আপনার ওপরই সন্দেহ হবে৷’
কর্নেল চাপা হেসে বললেন, ‘চোরের ওপর বাটপাড়িতে দোষ নেই, জয়ন্ত৷’
‘তার মানে?’
‘ডঃ আলুওয়ালার ব্রোঞ্জের ফলকটাও চুরি করা৷’
‘সে কী! উনি যে বললেন, রাখালদাস বাঁড়ুয্যে ওঁর বাবাকে—’
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘স্রেফ মিথ্যে৷ বাঁড়ুয্যেমশাই সত্যি এক ভদ্রলোককে আসল ফলকের একটা নকল বানিয়ে দিয়েছিলেন৷ কিন্তু সেই ভদ্রলোকের নাম ডঃ পরমেশ্বর ভট্টাচার্য৷ তিনি ছিলেন একজন নামকরা প্রত্নবিজ্ঞানী৷ বাঁড়ুয্যে মশায়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু৷ তাঁর বাড়ি বর্ধমানের এক গ্রামে৷ অনেক বছর আগে মারা গেছেন৷ তাঁর ছেলে শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন৷ এখন রিটায়ার করেছেন৷ সম্প্রতি মাস দুই আগে তাঁর গ্রামের বাড়ি থেকে রহস্যজনক চুরি হয়েছে৷ চোর আর কিছু নেয়নি—নিয়ে গেছে শুধু একটা ব্রোঞ্জের ফলক৷’
‘কী কাণ্ড! তাহলে ডঃ আলুওয়ালাই কি এই চুরির পেছনে?’
‘তা আর বলতে! পুরাতাত্ত্বিক পত্রিকা ‘দ্য অ্যানশিয়েন্ট ওয়ার্লড’-এ একটা বিশেষ ফলক প্রসঙ্গে ওঁর লেখা প্রবন্ধ পড়েই আমার সন্দেহ জেগেছিল৷ তাই আজ ওঁর বাড়ি এসেছিলুম৷ ইচ্ছে করেই নিজের পরিচয় দিয়েছিলুম৷ ভদ্রলোক অসম্ভব ধূর্ত!’
‘কিন্তু ওঁর আলমারি ভেঙে ফলকটা চুরি গেছে! নিশ্চয়ই ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো৷’
কর্নেল হো হো করে হাসলেন৷ ‘চুরি যায়নি৷ এক মিথ্যে ঢাকতে আরেক মিথ্যে৷’
আমি হতভম্ব হয়ে গেলুম! সত্যি, এতক্ষণে একটা জটপাকানো রহস্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে৷
এলিয়ট রোডে কর্নেলের ফ্ল্যাটটি পুলিশ ও ওঁর চেনাজানা মহলে ‘বুড়ো ঘুঘুর বাসা’ বলে পরিচিত৷ সেদিন দুপুর অব্দি সেখানে কাটাতে হল আমাকে৷ কাপের পর কাপ চা খেলুম এবং অসংখ্য প্রশ্ন করলুম৷ জবাবে যেটুকু জানলুম, তা আগেই যা জেনেছি তার একচুল বেশি নয়৷ অর্থাৎ বর্ধমানের এক গ্রামের জনৈক স্কুল-শিক্ষক শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বাড়ি থেকে ব্রোঞ্জের ফলক চুরি গেছে৷ শচীনবাবু কবে এসে কর্নেলকে ধরে ছিলেন৷ কর্নেল কথা দিয়েছিলেন, চেষ্টা করবেন ফলকের হদিস পেতে৷ মনে হচ্ছে, পেয়েও গেলেন৷ ব্যস, এটুকুই৷
কর্নেল ডঃ আলুওয়ালার আঁকা সেই স্কেচটার দিকে তাকিয়ে ধ্যানমগ্ন৷ কয়েকবার প্রশ্ন করে যখন জবাব আর পেলুম না, তখন বললুম, ‘বেলা হয়ে গেছে৷ আমি উঠি তাহলে৷’
কর্নেলের ধ্যান ভাঙল এ-কথায়৷ বললেন, ‘আচ্ছা, জয়ন্ত! ফলকের স্কেচে এই চিহ্নটা দেখে কী মনে হচ্ছে তোমার? বাঁ-দিক থেকে পঞ্চম চিহ্নটা৷’
তারপর স্কেচটা আমার সামনে এগিয়ে ধরলেন৷

দেখে নিয়েই বললুম, ‘হনুমান ওটা৷ অবশ্য অনুমানের হনুমানও বলতে পারেন৷’
কর্নেল হেসে উঠলেন৷ বললেন, ‘তাহলে ডঃ আলুওয়ালার পাঠোদ্ধারটা দাঁড়াচ্ছে: ‘শস্য অধিকর্তাকে একটি সেরা জাতের হনুমান পাঠানো হল৷’ এই তো? বৎস, হনুমান শস্যের যম৷ অতএব শস্য অধিকর্তার কাছে হনুমান পাঠিয়ে রসিকতা করেছিল কেউ!’
‘তা ছাড়া আর কী হতে পরে? ডঃ আলুওয়ালা ওটাকে কীভাবে বলদ ভাবলেন কে জানে!’
‘আচ্ছা জয়ন্ত, ওটাকে ঘোড়া ভাবতে দোষ কী?’
‘কিন্তু ডঃ আলুওয়ালা তো বললেন, মোহেনজো-দাড়োতে ঘোড়ার কোনো মূর্তি পাওয়া যায়নি৷ বুনো জন্তু জানোয়ারের মূর্তি আছে৷ ঘোড়ার মতো উপকারী গৃহপালিত প্রাণীর মূর্তি কেন থাকবে না? তার মানে ঘোড়ার কথা কেউ জানত না৷ তাই ঘোড়ার চিহ্নই নেই৷’
‘তা বটে৷ হরাপ্পাতে কুকুর আর মুরগির মূর্তি পর্যন্ত পাওয়া গেছে৷’
‘তাহলে বুঝতেই পারছেন, ওটা ঘোড়া নয়, হনুমান!’
‘হুম, জয়ন্ত তুমি শুনলে খুশি হবে যে ওখানে হনুমানের ছবিও পাওয়া গেছে৷’
লাফিয়ে উঠে বললুম, ‘তবে তো আর কথাই নেই৷ ওটা হনুমান৷ বাঁ-দিক থেকে চতুর্থ চিহ্নটা লক্ষ্য করুন না! হনুমানটার তাড়া খেয়ে একটা লোক পালাচ্ছে৷ এই লোকটাই শস্য-অধিকর্তা৷’
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ‘সাবাস জয়ন্ত, সাবাস! প্রত্নতত্ত্ব দফতর তোমাকে যাতে পুরস্কৃত করেন, তার ব্যবস্থা করা যাবে৷ কিন্তু মুশকিল কী হয়েছে জানো? ডঃ পরমেশ্বর ভট্টাচার্যও এই ফলকটার পাঠোদ্ধার করেছেন বলে দাবি করেছিলেন৷ তাঁর অনুবাদ একেবারে আলাদা৷ তোমাকে দেখাচ্ছি৷’
বলে কর্নেল উঠে টেবিলের দেরাজ থেকে একটা কালো জীর্ণ নোটবই বের করে আনলেন৷ নোটবই খুলে বললেন, ‘ডঃ ভট্টাচার্যের মতে, প্রাচীন যুগের ভারতে প্রচলিত খরোষ্ঠি লিপির মতো সিন্ধুলিপি ডানদিক থেকে পড়তে হবে৷ সেইভাবে পড়ে উনি কী অনুবাদ করেছেন শোনো:
...প্রথম চিহ্নের অর্থ: সৌর বৎসরের ষষ্ঠমাস৷ সূর্যের চাকার মধ্যে ছটা রেখা থাকায় ওটা হবে ষষ্ঠ মাস৷ দ্বিতীয় চিহ্নের অর্থ: চন্দ্রের প্রতিপদ৷ চন্দ্রকলার মধ্যে একটা দাড়ি রয়েছে৷ তৃতীয় চিহ্নের অর্থ: সিন্ধুনদের বাঁকের মধ্যবর্তী ত্রিকোণ ভূমি৷ চতুর্থ চিহ্নের অর্থ: ঘোড়া৷ পঞ্চম চিহ্নের অর্থ: মানুষ৷ যষ্ঠ চিহ্নের অর্থ : খণ্ডীকৃত কৃষিজমি৷ সপ্তম চিহ্নের অর্থ : শস্য৷ অষ্টম চিহ্নের অর্থ: বৃক্ষমূলে প্রোথিত সম্পদ৷...
কথাগুলি বাক্যের আকারে সাজালে দাঁড়ায়: বৎসরের ষষ্ঠমাসে চাঁদের প্রথম তিথিতে এক ব্যক্তি ঘোড়া নিয়ে সিন্ধু নদের বাঁকে ত্রিকোণ শস্যক্ষেত্রের সীমানায় এক বিশাল গাছের তলায় ধনসম্পদ পুঁতে রেখেছিল৷’
আমি চমকে উঠে বললুম, ‘গুপ্তধন! গুপ্তধন!’
কর্নেল হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ডঃ ভট্টাচার্যের ডাইরি থেকে পড়ে শোনাচ্ছি৷ শুনে যাও৷’
‘...বাঁড়ুয্যেমশায়ের সঙ্গে আমার এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে৷ উনি আমার অনুবাদ যথার্থ বলে স্বীকার করেছেন৷ সিন্ধুনদ এখন মোহেনজো-দাড়ো থেকে সামান্য দূরে সরে গেলেও ধ্বংসাবশেষের দু মাইল দূরে প্রাচীন খাতের চিহ্ন আমরা দু’জনেই দেখে এসেছি৷ অবিকল ওই তৃতীয় চিহ্নের মতো বাঁক দেখেছি৷ তিনকোনা জমিটার আয়তন আন্দাজ বারো একর৷ পোড়ো রুক্ষ জমি৷ ক্ষয়াখর্বুটে গুল্মে ঢাকা৷ বাঁড়ুয্যেমশাই বলেছেন, প্রত্নদফতরের কর্তা জন মার্শালকে কথাটা বলবেন এবং ওই জায়গায় মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু করা হবে৷’...
কর্নেল আবার কয়েকটা পাতা উল্টে গিয়ে পড়তে শুরু করলেন:
‘...আমাদের দুর্ভাগ্য৷ প্রবল বর্ষার জন্য খোঁড়ার কাজ একবছর পিছিয়ে গেল৷ তাছাড়া জন মার্শালও বিশেষ উৎসাহ দেখাচ্ছেন না৷ বাঁড়ুয্যে মশাই বলছিলেন, তাঁর শরীর ইদানীং ভালো যাচ্ছে না৷ শীঘ্ৰ কলিকাতায় ফিরতে চান৷...
‘...বাড়ুয্যেমশাই কাল চলে গেলেন দেশে৷ আমি স্টেশনে তাঁকে টেনে তুলে দিয়ে এসেছি৷ স্টেশন-মাস্টার রামচন্দ্র আলুওয়ালার সঙ্গে অনেকক্ষণ আড্ডা দিলাম৷ কথায় কথায় ঝোঁকের মুখে ওঁকে ব্রোঞ্জের ফলকটার কথা বলে ফেললাম৷ কাজটা ঠিক হল কিনা কে জানে! ভদ্রলোক কিন্তু পুরাতত্ত্বের ব্যাপারে খুব উৎসাহী৷ অনেক খোঁজ-খবর রাখেন৷ বললেন, সরকারী দফতরের ব্যাপার-স্যাপারই এরকম৷ ওদের বিশ মাসে বছর৷ বরং আপনি যদি আমার সাহায্য চান, বলুন৷ মাটি কাটার লোক জোগাড় করে দেব৷ আমি বললুম, ওখানে বেসরকারী লোককে মাটি কাটতে দেওয়া হবে না৷ আইনে বাধা আছে৷ তাই শুনে ষ্টেশন-মাস্টারটি বললেন, তাহলে রাতে লুকিয়ে মাটি খোঁড়ার ব্যবস্থা করা যায়৷ আমার হাসি পেল৷ গুপ্তধনের কথা শুনেই ভদ্রলোক লোভে চঞ্চল হয়ে উঠেছেন৷ বললুম, তা কি সম্ভব? এক রাতের কাজ নয়৷ কাজেই ধরা পড়ে যাবার চান্স আছে৷ আমারও চাকরি যাবে মশাই! এতে আলুওয়ালা খুব নিরাশ হলেন৷...
‘...স্যার জন মার্শালকে কলকাতার অফিসে সব জানিয়ে আবার চিঠি লিখেছিলাম৷ আজ জবাব এসেছে৷ উনি এবার স্পষ্ট করে বলেছেন যে আমার পাঠোদ্ধার ভুল৷ তা ছাড়া ওই বিশেষ চিহ্নটা ঘোড়া নয়৷ সিন্ধুসভ্যতায় ঘোড়ার কথা অবান্তর৷ তখন প্রাক-আর্য যুগে ওখানে ঘোড়ার কথা কেউ জানতই না৷ ঘোড়াকে বশ মানানো হয়েছিল মধ্য এশিয়ায়৷ সে সিন্ধু-সভ্যতার যুগের অন্তত দেড়-দুই হাজার বছর পরের কথা৷
...হায়! কীভাবে বোঝাব, আমার অনুবাদ যথার্থ! মার্শাল কেন বুঝতে পারছেন না, এমনও তো হতে পারে, তারও আগে তিব্বত বা চীনে ঘোড়াকে বশ মানানো হয়ে থাকবে এবং কোনো দেশত্যাগী অথবা পলাতক রাজপুরুষ ঘোড়ার পিঠে ধনরত্ন নিয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন মোহেনজো-দাড়ো শহরে! তিনিই ধনরত্ন ওইভাবে গুপ্তস্থানে পুঁতে রেখেছিলেন এবং সেই সংবাদ প্রাচীন প্রথামতো একটা ব্রোঞ্জের ফলকে খোদাই করেছিলেন—যাতে তাঁর অবর্তমানে কেউ না কেউ ধনরত্নের সম্পতি করতে পারে!
...এই অনুমানের কারণ আছে৷ তিব্বতের মঠে এক পুরানো পুঁথিতে লেখা আছে : মর্ম অর্থাৎ ব্রহ্মবংশোদ্ভূত রাজা হেহয় এক দুর্যোগের রাতে অশ্বসহ এই মাঠে আশ্রয় নেন৷ তাঁর সঙ্গে প্রচুর ধনরত্ন ছিল৷ বিবেকবান বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা ধনরত্ন ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে এড়িয়ে চলেন৷ তাই রাজা হেহয়কে পরামর্শ দেন, স্বরাজ্য ব্রহ্মাবর্তে ফিরে গিয়ে আপোসে মিটমাট করুন৷ তা শুনে রাজা হেহয় ক্রুদ্ধ হয়ে মঠ ত্যাগ করেন৷
...কোথায় গিয়েছিলেন হেহয়? নিশ্চয়ই মোহেনজো-দাড়ো নামে দ্রাবিড় রাজ্যে৷ আমার ধারণা, হেহয় থেকেই ‘হয়’ কথাটির উদ্ভব৷ হয় মানে ঘোড়া৷ পুরাণে হয়গ্রীব অবতারের কথা আছে৷ সে কি ব্রহ্মাবর্তরাজ হেহয়েরই উপাখ্যান? সম্ভবত রাজ্যে বিদ্রোহের ফলে হেহয়কে উত্তরে পালাতে হয়েছিল৷ আশ্রয় না পেয়ে সেখান থেকে তিনি কাশ্মীর ঘুরে দক্ষিণ পশ্চিমে দ্রাবিড় রাজ্যের রাজধানীতে চলে আসেন৷ কাশ্মীরে একটি গিরিপথের নাম হোহো৷...
কর্নেল ডাইরিটি বন্ধ করে বললেন, ‘তাহলে দেখা যাচ্ছে ডঃ আলুওয়ালার ফলকচুরির উদ্দশ্য সম্ভবত নিছক পুরাতত্ত্ব নয়, গুপ্তধন৷ পৈতৃক নেশার ব্যাপার৷’
বললুম, ‘কিন্তু মোহেনজো-দাড়ো তো এখন পাকিস্তানে৷ অর কি সুবিধে করতে পারবেন ডঃ আলুওয়ালা?’
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘জানি না৷ তবে সম্প্রতি একটা সুযোগ ওঁর সামনে এসেছে৷ সিমলা চুক্তি অনুসারে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের জ্ঞান আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ তারই ভিত্তিতে খুব শিগগির ভারত থেকে একদল পুরাতাত্ত্বিক পাকিস্তানে মোহেনজোদাড়ো-হরাপ্পা দেখতে যাচ্ছেন৷ তুমি খবরের কাগজের লোক হয়েও এ খবর রাখো না দেখে অবাক লাগছে বৎস!’
বললুম, ‘রোজ হাজার হাজার খবর বেরোয়৷ অত মনে থাকে না!’
‘তা স্বীকার করছি৷’ ...বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ একটু পায়চারি করলেন৷ তারপর বললেন, ‘পুরাতাত্ত্বিকদের সঙ্গে একদল সাংবাদিকও যাচ্ছেন শুনেছি৷ জয়ন্ত, তোমাকে একটা দায়িত্ব দিচ্ছি৷ তুমি যে ভাবে হোক, কর্তৃপক্ষকে বলা-কওয়া করে দৈনিক সত্যসেবকের পক্ষ থেকে তোমার নামটা সেই দলে ঢোকবার ব্যবস্থা করো৷ আর আমিও চেষ্টা করে দেখি, কোন ফিকিরে নিজেকে ঢোকাতে পারি৷’
হাসতে হাসতে বললুম, ‘খুব সোজা রাস্তা আছে৷ আপনি তো ইদানীং ন্যাচারালিস্ট বা প্রকৃতিবিজ্ঞানী হয়ে উঠেছেন৷ দুর্লভ ও বিরলজাতের পাখি-প্রজাপতি পোকামাকড় নিয়ে ধানাইপানাই করছেন বিস্তর৷ বিদেশি কাগজে অনেক প্রবন্ধও লিখে ফেলেছেন৷ মাকড়সা আর প্রজাপতি সম্পর্কে তো আপনার খুব মাথাব্যথা৷ কারণ নাকি, দুইয়ের মধ্যেই খুনি ও জোচ্চোরদের প্রবৃত্তি আবিষ্কার করে ফেলেছেন৷ অতএব হে প্রাজ্ঞ ঘুঘু! আপনার অসুবিধেটা কোথায়? বিশেষ করে কেন্দ্রীয় দফতরে দিল্লিওয়ালারা অনেকেই তো আপনার বন্ধু৷ আপনি......’
কর্নেল হাত তুলে থামিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘যথেষ্ট, যথেষ্ট ডার্লিং৷ তোমার প্রদর্শিত পথেই আমি এগোব৷’
অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে পাকিস্তানগামী সাংবাদিকদের দলে ঠাঁই পেলুম৷ দিল্লির পালাম বিমানবন্দরের লাউঞ্জে যখন পৌঁছেছি, তখনও কিন্তু কর্নেলের পাত্তা নেই৷ বিমান ছাড়তে আর পনেরো মিনিট দেরি৷ উদ্বিগ্ন হয়ে ঘোরাঘুরি করছি, সেই সময় পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিতদের দলটি এসে পৌঁছলেন৷ পনেরোজন পণ্ডিত এক জায়গায় জুটলে যা হয়৷ প্রত্যেকের মুখ গম্ভীর—হাবভাব দেখে ভয় করে আমার৷ দু-তিনজন বাদে সবার চুল পাকা৷ জ্ঞানের তাপেই হয়তো টাক পড়েছে অনেকের মাথায়৷ কিন্তু কোথায় আমার সেই সুপরিচিত টাক? শুধু টাক থাকলেই চলবে না, দাড়িও চাই৷
রাশভারি দলটির মধ্যে দাড়িওয়ালা আছেন, টাকওলাও আছেন৷ কিন্তু একসঙ্গে দাড়ি ও টাক আছে, এমন কাকেও তো দেখতে পাচ্ছি না৷
তাহলে কর্নেল কি দলে ভিড়তে পারেননি? ভাবনায় পড়ে গেলুম৷ আমি খামোকা একা গিয়ে করবটা কী? তা ছাড়া ওইসব গোরস্থান বা ভূত-পেরেতের জায়গায় যাওয়া আমার একেবারে পছন্দসই নয়৷ নেহাৎ বুড়ো ঘুঘুমশায়ের টানে এত কাণ্ড করে এখানে হাজির হয়েছি৷
মাইকে বিমানযাত্রীদের ডাকাডাকি শুরু হল৷ সেই সময় ঠাহর করে দেখি, ডঃ আলুওয়ালা ভিড় ঠেলে বেরিয়ে কাকে যেন খুঁজছেন৷ আমার চোখে চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর এগিয়ে এলেন হাসিমুখে, ‘আরে! জয়ন্তবাবু না? আপনিও কি যাচ্ছেন নাকি ডেলিগেশনের সঙ্গে?’
‘যাচ্ছি৷ আপনিও আছেন, তা লিস্টে দেখলুম৷ ...’ বলে আমি খুব অন্তরঙ্গতা প্রকাশ করলুম৷
ডঃ আলুওয়ালা মুখে খুশির ভাব ফুটিয়ে বললেন, ‘যাক গে মশাই৷ বাঁচা গেল! আমি গোলমাল ভিড়, এসব একদম পছন্দ করি নে৷ তাতে বুঝতেই পারছেন, আজকাল আমি অনেক জ্ঞানীগুণী লোকেরই ঈর্ষার কারণ হয়েছি৷ তাই একদম ইচ্ছে করছিল না যেতে৷ তো সরকারও ছাড়লেন না, আর শেষ অব্দি দেখলুম, যে বিষয়ে সারাজীবন গবেষণা করছি সেই বিষয়েই তো এই ডেলিগেশন৷ তবে তার চাইতে বড়ো কথা বাল্যস্মৃতি৷ লারকানা এলাকায় আমার ছেলেবেলা কেটেছে৷ কাজেই মনের টানও বাজল৷’
আমি মন দিয়ে ওঁর কথা শুনছিলুম না৷ কারণ কর্নেল বুড়ো এখনও এসে পৌঁছলেন না৷ বিমানযাত্রীদের আবার ডাকা হচ্ছিল৷ ডঃ আলুওয়ালা আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলেন৷ সিকিউরিটি পুলিশ ও শুল্ক-দপ্তরের লোকেরা পরীক্ষা করছেন প্রত্যেক যাত্রীকে৷ লাইনে দাঁড়াতে হবে৷
পাসপোর্ট, ভিসা এবং অন্যান্য আইন কানুনের ব্যাপার সামলে যখন পাকিস্তান এয়ারলাইনসের বিশাল বোয়িং বিমানের সিঁড়ির কাছে পৌঁছলুম, তখনও কর্নেলের পাত্তা নেই৷
কোনো গণ্ডগোলে পড়েননি তো? ডেলিগেশনের লিস্টে নাম আছে দেখেছি৷ অথচ এখনও আসছেন না কেন?
দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সুযোগ নেই৷ ডঃ আলুওয়ালা ঠেলতে ঠেলতে বিমানে চড়িয়ে ছাড়লেন৷ সিট নম্বর মেলাতে গিয়ে দেখি আমার পাশে ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী বলে এক পণ্ডিতের সিট পড়েছে৷ দুচ্ছাই! বরং কোনো সাংবাদিক পাশে থাকলে জমত ভালো৷ মিঃ যোশী গাব্দাগোব্দা প্রকাণ্ড মানুষ৷ বেঁটে, দাড়িগোঁফ আছে মুখে৷ অবশ্য টাক নেই৷ কাঁচাপাকা কোঁচকানো একরাশ চুলে মাথাটা ভর্তি৷ আমার সঙ্গে তখুনি আলাপ করে নিলেন৷ ভারি অমায়িক লোক মনে হল৷ একটু পরেই বিমান ছাড়ার সময় হয়ে গেল৷ আমি তখন কর্নেলের আশা ছেড়ে দিয়ে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছি৷
বিমান স্টার্ট দিল৷ রানওয়ে দিয়ে চলতে চলতে ক্রমশ গতি বাড়ল৷ তারপর মাটি ছাড়া হল৷ আজ আবহাওয়া ভারি চমৎকার৷ সকালের রোদ ঝলমল করছে৷
কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখি আকাশের এতদূরে পৌঁছেছি যে নীচে সব সমতল দেখাচ্ছে—যেন একখানা চমৎকার কার্পেট পাতা রয়েছে৷ যাক গে, কর্নেল যখন এলেন না, তখন ফলক-রহস্য তোলা রইল৷ অন্য সাংবাদিকরা যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন, আমিও যখন সাংবাদিক তখন সেই উদ্দেশ্যেই পাকিস্তান সফর করে আসি৷ উপায় কী আর?
লারকানা বিমানবন্দর তিন ঘণ্টার যাত্রা৷ একটু পরে বিমানের পরিচারিকা স্ন্যাকস ও কফি দিতে এলেন৷ স্ন্যাকসের প্যাকেটের সঙ্গে দেখি একটা চিরকুট৷ তাতে লেখা আছে: ডার্লিং৷ ইওর ওল্ড ডাভ ইজ হেয়ার৷
ওল্ড ডাভ! বুড়ো ঘুঘু! আমি চঞ্চল চোখে তাকাতেই পরিচারিকা একটু হেসে পিছনে ইশারা করলেন৷ ঘুরেই ইচ্ছে করল চেঁচিয়ে উঠি, ‘হ্যালো ওল্ড ম্যান!’
কিন্তু চেঁচামেচি করা গেল না৷ দু’জনে পরস্পরের দিকে হাসলুম শুধু৷ ধড়ে প্রাণ এল আমার৷
ডঃ যোশী আমার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলেন৷ কথায় কথায় জানলুম, ইনি পুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক৷ ছাত্রজীবনে কলকাতায় ছিলেন৷ বাঙালিদের প্রতি প্রচুর শ্রদ্ধা পোষণ করেন৷ এক ফাঁকে আমি জিগ্যেস করলুম, ‘আচ্ছা স্যার, সিন্ধু-সভ্যতার যুগে কি ঘোড়া ছিল না?’
ডঃ যোশী যেন চমকে উঠলেন৷ বললেন, ‘ঘোড়া? হঠাৎ ঘোড়ার কথা কেন? তারপর হাসতে থাকলেন৷ সাংবাদিকদের পক্ষে ঘোড়ারোগ খুব সুবিধের নয়৷’
মনে মনে একটু একটু রাগ হল৷ কিন্তু মুখে হাসি ফুটিয়ে বললুম, ‘প্রশ্নটা কি অন্যায়, স্যার?’
ডঃ যোশী আমার কাঁধে হাত রেখে সকৌতুকে বললেন, ‘মোটেই না৷ তবে ইদানীং দেখছি কারুর-কারুর মাথায় সিন্ধু-সভ্যতার কাল্পনিক ঘোড়া দৌড়াদৌড়ি করছে৷’
‘তাহলে সিন্ধুঘোটক বলুন!’
ডঃ যোশী আরও জোর হেসে উঠলেন৷ ‘যা বলেছেন! অবশ্য সিন্ধুঘোটক থাকে অন্য সিন্ধুতে৷ অর্থাৎ সমুদ্রে৷ এ সিন্ধু প্রদেশটা নেহাৎ মাটি দিয়ে তৈরি৷ তাই মাটির ঘোড়া দু-একটা থাকলেও থাকতে পারত সিন্ধুসভ্যতার যুগে৷’
‘যেমন আমাদের বাঁকুড়ার ঘোড়া৷ কুটির শিল্পের খাসা দৃষ্টান্ত৷’
ডঃ যোশী আমার পাল্টা রসিকতায় খুশি হলেন৷ বললেন, ‘রসকষ আছে বলেই আমি সাংবাদিকদের পছন্দ করি৷’
‘স্যার, একটু আগে বললেন, ইদানীং নাকি কারুর কারুর মাথায়...’
বাধা দিয়ে ডঃ যোশী বললেন, ‘হ্যাঁ জয়ন্তবাবু৷ যেমন ধরুন আপনাদের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্বের অধ্যাপক ডঃ আলুওয়ালার মাথায় ঘোড়া ঢুকেছে৷ এর আগে উনি মাথায় বলদ ঢুকিয়েছিলেন৷ এখন বলছেন, বলদটা আসলে ঘোড়াই হবে৷ বিশুদ্ধ সংস্কৃতে যাকে বলে কিনা ‘হয়’৷’
‘শুনেছি হেহয় থেকে নাকি ‘হয়’৷’
‘এ্যাঁ!’ বলে ডঃ যোশী আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্তে৷ তারপর বললেন, ‘কোথায় শুনলেন এ-কথা?’
বললুম, ‘এক ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিতের কাছে৷’
‘কে তিনি? নাম কী? থাকেন কোথায়?’
এতক্ষণে মনে হল, ভুল করেছি৷ মুখ ফসকে গোপন একটা তথ্য বের করে দিয়েছি৷ অথচ কর্নেল পইপই করে বারণ করেছিলেন৷ অগত্যা বানিয়ে বললুম, ‘কলকাতার ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিত ডঃ ভবার্নব ভট্টাচার্যর কাছে৷
‘ডঃ ভবার্নব ভট্টাচার্যর নাম তো শুনিনি!
আমার ভাগ্য ভালো, এইসময় পরিচারিকা দ্বিতীয় দফা খাদ্য পরিবেশন করতে এলেন৷ এটা ব্রেকফাস্ট৷ ডঃ যোশীকে পেটুক মনে হল৷ তক্ষুনি স্যান্ডউইচের প্যাকেট খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷ কিন্তু আড়চোখে লক্ষ্য করলুম, উনি খেতে খেতে মাঝেমাঝে সন্দেহাকুল দৃষ্টিতে আমাকে দেখে নিচ্ছেন৷ ব্যাপারটা কেমন লাগল৷...
কিন্তু আমার পক্ষে স্বস্তির কথা, ডঃ যোশী আর এ প্রসঙ্গে গেলেন না৷ দেশের রাজনীতি নিয়ে পড়লেন৷ দেখতে দেখতে কখন সময় কেটে গেল৷ আমাদের বিমান লারকানা বিমান বন্দরের ওপর চক্কর দিতে শুরু করল৷ নীচে সিন্ধুনদ দেখা যাচ্ছিল৷ লারকানার পূর্বে সামান্য দূরে সিন্ধুনদ বয়ে চলেছে৷
বিমান যখন মাটি ছুঁল, তখন সকাল সাড়ে দশটা৷ পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি এবং সেখানকার একদল পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিত ভারতীয় প্রতিনিধিদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছিলেন৷
পরিচয় ও কোলাকুলি পর্ব সেরে কয়েকটি গাড়ি করে শহরের দক্ষিণপ্রান্তে নিরিবিলি এলাকায় একটা মস্ত হোটেলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল৷ দশতলা এই রাজকীয় হোটেলে বিদেশি পর্যটকদের বেশ ভিড় দেখলুম৷ শীতের শেষ বলে নাকি এখন ভিড়টা কমেছে৷ মোহেনজো-দাড়ো এখান থেকে কিছু দূরে দক্ষিণে সিন্ধুনদের পশ্চিম-তীরে রয়েছে৷ তাই এত পর্যটকের ভিড়৷
এলাকার ভূ-প্রকৃতি কেমন যেন রুক্ষ৷ অবশ্য গাছপালা রয়েছে প্রচুর৷ তাদের রঙ কেমন ধূসর৷ ছোটো-ছোটো পাহাড় আছে অসংখ্য৷ পাকিস্তান সরকার সিন্ধু নদের জল সেচের কাজে লাগিয়েছেন৷ ফলে ফসলের ক্ষেত ও গাছপালা অনেকটা শ্রী ফুটিয়ে তুলেছে৷
কর্নেলের মুখোমুখি হয়েছিলুম হোটেলের লাউঞ্জে৷ তারপর আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, বুড়োর ঘরেই আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে৷ অর্থাৎ বুড়ো ঘুঘুই তদ্বির করে এ ব্যবস্থাটা করে ফেলেছেন৷ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচলুম৷
ঘরটা দক্ষিণ-পূর্ব কোণে, সাততলায়৷ কর্নেল দক্ষিণের জানলায় দাঁড়িয়ে ওঁর প্রখ্যাত বাইনোকুলারটি—যা বিরল জাতের পাখির খোঁজে ব্যবহার করেন, চোখে রেখে বললেন, ‘হুম! মোহেনজো-দাড়ো অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে৷’
বললুম, ‘আপনার মাথাখারাপ! এখান থেকে অনেক মাইল দূরে!’
‘ঠিকই৷ তবে আমরা একটা টিলার মাথায় দশতলা হোটেলের সাততলায় দাঁড়িয়ে আছি৷ সামনে বরাবর ফাঁকা৷ তুমিও দেখতে পারো৷ তা ছাড়া এই দূরবীনটা খুব শক্তিশালী!’
‘কাছে গিয়েই দেখব’খন৷ বিকেল তিনটেয় যাওয়ার প্রোগ্রাম না?’
‘হুঁ৷ বলে কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে আবার যেন মোহেনজো-দাড়ো দেখতে থাকলেন৷ কী বিদঘুটে স্বভাব!’
বললুম, ‘এবার আমার প্রশ্নের জবাব দিন৷’
‘বলো ডার্লিং!’
‘পালামে পৌঁছতে আপনার দেরি হল কেন?’
‘পাকিস্তানের দূতাবাসে গিয়েছিলুম এক বন্ধুকে নিয়ে৷’
‘কেন?’
‘মোহেনজো-দাড়োর সরকারী অতিথিশালায় একটা ডাবলবেড ঘর জোগাড় করতে৷’
‘সে কী! ডেলিগেশনের ব্যাপার৷ এঁদের সঙ্গেই তো থাকা উচিত৷’
‘থাকব না৷ আমি আগাম ব্যবস্থা সেরে এসেছি৷’
‘আমাদের প্রতিনিধিদের নেতা আপত্তি করবেন না তো?’
‘ডঃ তিড়কে? মোটেই না৷ কথা বলে নিয়েছি ওঁর সঙ্গে৷’
‘ডঃ আলুওয়ালার সঙ্গে নিশ্চয়ই চোখাচোখি হয়েছে আপনার?’
‘হয়েছে৷ ভদ্রলোক খাপ্পা হয়ে গেছেন৷ বিশেষ কথাবার্তাই বললেন না৷’
‘স্কেচ চুরির অভিযোগ করলেন না?’
‘নাঃ৷ তো জয়ন্ত, তোমার সঙ্গে ডঃ যোশীর খুব ভাব দেখলুম৷’
‘ভাব জমাতে আমি ওস্তাদ৷’
‘তোমাকে একটা ব্যাপারে সতর্ক করে দিই৷ ডঃ যোশীর সঙ্গে আর ভাব জমাতে যেও না৷ আমাকেও বিপদে ফেলবে৷ বিপদে পড়বে৷’
‘কেন? কেন?’
‘আপাতত আর কিছু বলব না, ডার্লিং!’
জানি, আর হাজার প্রশ্ন করলেও জবাব পাব না, তাই চুপ করে গেলুম৷ যতক্ষণ কথা বললেন, কর্নেলের চোখে বাইনোকুলার রয়ে গেল৷ কী দেখছেন অমন করে? আমার অস্বস্তি জাগল৷ তাই না বলে পারলুম না, ‘এত করে কী দেখছেন বলুন তো?’
কর্নেল বাইনোকুলার আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘এবার তুমি দেখো৷ আমার দেখা শেষ হয়েছে আপাতত৷’
‘দেখবটা কী? মোহেনজো-দাড়ো তো?’
‘না৷ এই হোটেলের নীচের রাস্তার ওপারে যে টিলাটা আছে, সেখানে দেখবে একটা পার্ক৷ পার্কে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন দুই ভদ্রলোক৷’
তক্ষুনি বাইনোকুলারে চোখ রাখলুম৷ তারপর চমকে উঠলুম৷ দুই ভদ্রলোকের একজন হচ্ছেন ডঃ আলুওয়ালা৷ অন্যজনের গাঁট্টাগোট্টা চেহারা৷ পেল্লায় গোঁফ আছে মুখে৷ এই গুঁফো লোকটিকে আমাদের দলে দেখেছি, এতে কোনো ভুল নেই৷
কিন্তু ডঃ আলুওয়ালা হোটেলে পৌঁছেই বেরিয়ে গেছেন এবং ওই লোকটির সঙ্গে এতক্ষণ ধরে কী কথা বলছেন? ভারি সন্দেহজনক ব্যাপার৷
একটু দেখেই আমার ক্লান্তি লাগল৷ সরে এলুম৷ কর্নেল পোষাক বদলাতে ব্যস্ত হয়েছেন৷ আমি পোষাক বদলে নিলুম৷ দিল্লিতে ভোরবেলা স্নান করে নিয়েছি৷ এখানে দেখেছি মার্চ মাসেও শীতটা কড়া৷ বাথরুম থেকে এসে দেখি, চা এসে গেছে৷ তার সঙ্গে প্রচুর ফল এবং মিষ্টান্নও৷ আমরা সরকারী অতিথি বলেই এত আদর নিশ্চয়ই৷
কিন্তু কর্নেলের মুখটা গম্ভীর কেন? কাছে যেতেই একটা খাম এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ওদের টনক নড়েছে৷ এই দেখো৷’
‘কাদের?’
‘খুলে চিঠিটা পড়ে নাও আগে৷’
খামের মধ্যে ভাঁজকরা একটা চিঠি আছে৷ খামের ওপরে ইংরেজিতে লেখা: ৬৩২ নম্বর স্যুটের অধিবাসী-দ্বয়কে৷
চিঠি নয়—চিরকুট বলাই উচিত৷ তাতে ডটপেনে লেখা আছে: ‘ঘোড়াটা রোগা৷ ওই নিয়ে রেস লড়তে যেওনা৷ সবর্বস্বান্ত হবে৷ ইতি—রেসুড়েদের রাজা৷’
আমার হাত কাঁপছিল৷ কর্নেল চাপা হেসে বললেন, ‘জয়ন্ত কি এতেই ভয় পেয়ে গেলে?’
শুকনো হেসে বললুম, ‘মোটেও না৷ আপনার কথামতো আমি সঙ্গে আমার রিভালবারটা এনেছি৷ গুলিও এনেছি প্রচুর৷ না না—আইন ভেঙে আনিনি৷ সিকিউরিটির হাতে ধরা পড়তুম৷ ওদের মেটাল ডিটেকটর যন্ত্রে ঠিক টের পেয়ে যেত৷ দিল্লির পাকিস্তানী দূতাবাসে আপনার যেমন বন্ধু আছেন, আমারও কি থাকতে নেই? তবে আমার প্রত্যক্ষ বন্ধু নয়৷ বন্ধুর বন্ধু আর কী! আর আপনি তো জানেন, সাংবাদিকরা কিছু বিশেষ সুবিধা সব দেশের সরকারের কাছেই পেয়ে থাকেন৷ অতএব কোনো ঝামেলা হয়নি অনুমতি পেতে৷’
কর্নেল বললেন, ‘আমিও সশস্ত্র, জয়ন্ত৷ আমারও অনুমতি পেতে ঝামেলা হয়নি৷ বরং আরও অস্ত্র-সাহায্য চাইলে পেয়ে যাব৷’
‘বলেন কী!’
‘এখনই সব বুঝতে পারবে৷ করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের সিন্ধু-সভ্যতা সংক্রান্ত শাখার প্রধান অধ্যাপক ডঃ আবদুল করিমের আসবার সময় হল৷ তাঁর সঙ্গে আসছেন সরকারী গোয়েন্দা দফতরের স্থানীয় অধিকর্তা কর্নেল কামাল খাঁ৷ আমি সব আয়োজন করেই এসেছি৷’
সব দুর্ভাবনা মুহূর্তে চলে গেল৷ চা খেতে-খেতে এবার ডঃ যোশীর সঙ্গে আমার বাক্যালাপ প্রসঙ্গটি তুললুম৷ কর্নেল বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তুমি এখনও বড্ড ছেলেমানুষ, জয়ন্ত! কোন আক্কেলে ‘হেহয়’ কথাটা বললে ওঁকে?’
‘মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে৷ কিন্তু ডঃ যোশী আসলে কে?’
‘এই প্রশ্ন শুনে বুঝতে পারছি, তোমার বুদ্ধি খুলেছে৷ জয়ন্ত, ওই একই প্রশ্ন আমার মাথাতেও ঘুরছে৷ কারণ পুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পত্রিকায় ডঃ যোশীর যে ছবি দেখেছিলুম, তাতে মুখে দাড়ি নেই৷’
‘কী মুশকিল! এখন দাড়ি রেখেছেন উনি?’
‘সেই ছবির মুখে দাড়ি কল্পনা করেছি, কিন্তু মিলছে না৷’
‘তাহলে কি ইনি জাল ডঃ যোশী?’
এই সময় ফোন বাজল৷ কর্নেল ফোন তুলে সাড়া দিলেন এবং চাপা গলায় কী বললেন৷ তারপর ফোন রেখে হাসিমুখে ঘুরলেন, ‘জয়ন্ত, ডঃ করিম এবং কামাল খাঁ এসে গেছেন৷’
তিন মিনিট অপেক্ষার পর ঘণ্টা বাজল৷ দরজা খুললে একজন বেঁটে, অন্যজন দৈত্যের মতো বিশাল লোক ঘরে ঢুকে সম্ভাষণ জানালেন৷ কর্নেলের সঙ্গে কোলাকুলি শেষ হতেই চায় না৷ তারপর আমার দিকে দু’জনে এগোতেই ভয় পেয়ে গেলুম৷ এই বেঁটে ও লম্বা পর্বতের সামনে আমি একেবারে নেংটি ইঁদুর যে!
কর্নেল বেঁটে ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, ‘জয়ন্ত, ইনিই ডঃ করিম৷ তারপর দৈত্যের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বললেন—আমার একসময়কার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কামাল খাঁ৷ মিলিটারি জীবনে দু’জনেই আফ্রিকা রণাঙ্গনে ছিলুম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়৷ ইনিও কর্নেল৷’
মনে হল ওঁরা ব্যস্ত৷ ঝটপট কাজের কথা শুরু করলেন৷ কর্নেল কামাল খাঁ ব্রিফকেস থেকে একটা ভাঁজ-করা ম্যাপ বের করে বিছানায় খুলে ধরলেন৷ তিনজনে ম্যাপের ওপর ঝুঁকে পড়লেন৷ তারপর যা সব কথাবার্তা হল, আমি স্পষ্ট কিছু বুঝতে পারলুম না৷ শুধু টের পেলুম, এতদিনে মোহেনজো-দাড়োর ঘোড়া-রহস্যের একটা কিনারা হতে চলেছে৷
ওঁরা বিদায় নিয়ে যাওয়ার পর আমরা লাঞ্চ খেতে গেলুম৷ এই ফ্লোরেও ডাইনিং হল আছে৷ সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভোজ দিচ্ছেন৷ বক্তৃতাও হল৷ তারপর অতিথিদের খানাপিনা শেষ হতে পাক্কা একঘণ্টা লেগে গেল৷
ঘরে ফিরে কর্নেল বললেন, ‘জয়ন্ত, ভোজসভায় একটা বিশেষ ব্যাপার কি তোমার চোখে পড়েছে?’
‘বিশেষ ব্যাপার? না তো৷’
‘ডঃ আলুওয়ালা কিন্তু ভোজসভায় অনুপস্থিত!’
‘তাই নাকি? লক্ষ্য করিনি৷’
‘তুমি না সাংবাদিক! সব কিছুতে লক্ষ্য রাখা তোমার উচিত ডার্লিং!’
‘তাই বলে আলুওয়ালা পটলওয়ালাদের নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই৷’
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, ‘কিন্তু প্রতিনিধিদলের নেতা ডঃ তিড়কের মাথাব্যথা শুরু হয়েছে৷ ডঃ আলুওয়ালা ছিলেন ডঃ যোশীর ঘরে৷ ডঃ যোশী বলছেন, তাঁর সঙ্গে নাকি কী একটা ব্যাপারে তর্কাতর্কি হয়েছিল৷ ডঃ আলুওয়ালা রেগেমেগে দুপুর সাড়ে বারোটা নাগাদ জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেছেন৷ ডঃ তিড়কে এতে যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি খাপ্পা৷ ভারতীয় পণ্ডিতের এহেন আচরণ বিদেশে বাঞ্ছনীয় নয়৷ যাই হোক, নীচে রিসেপশনের কেউ লক্ষ্য করেনি কখন উনি বেরিয়ে গেছেন৷ শুধু লিফটম্যান বলেছে, এক বেঁটে মোটা ভদ্রলোক ব্যাগেজ নিয়ে নেমেছেন৷ যাক গে, এবার নাটক জমে উঠল মনে হচ্ছে৷’
ক্লান্তি তো বটেই, বাদশাহী ধরণের একটা অসাধারণ খাওয়ার পর আমার চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসছিল৷ শুয়ে পড়লুম৷ সেই সময় লক্ষ্য করলুম, কর্নেল একটা ম্যাপ খুলে বসেছেন এবং কীসব চিহ্ন দিচ্ছেন ম্যাপে৷
ঘুম ভাঙল কর্নেলেরই ডাকে৷ ‘ওঠো, ওঠো জয়ন্ত! তিনটে বেজে এল৷ আমরা এবার রওনা দেব৷ ডঃ তিড়কের কাছে বিদায় নেওয়া হয়ে গেছে৷ আর দেরি করা ঠিক নয়৷ এখনই কামাল সায়েবের জিপ এসে পড়বে৷’
দ্রুত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলুম৷ কিছুক্ষণ পরে ফোনে রিসেপশান থেকে জানাল, ‘জিপ এসে গেছে৷’ আমরা বেরিয়ে পড়লুম৷ ব্যাগেজ হোটেলের লোকেরা এসে নিয়ে গেল৷ করিডোরে লিফটের দিকে এগোচ্ছি, টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সাংবাদিক রঘুনন্দনের সঙ্গে দেখা৷ বললেন, ‘এ কী চৌধুরী! কোথায় যাচ্ছ তুমি?’
‘এত বাদশাহী আরামে থাকা পোষাবে না ভাই! এক চেনা ভদ্রলোকের ওখানে উঠব৷’
‘সে কী!’
রঘুনন্দন হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল৷ আমি দৌড়ে গিয়ে লিফটে ঢুকলুম৷ কর্নেল বললেন, ‘কী বললে ওঁকে?’
বললুম, ‘এক চেনা ভদ্রলোকের বাসায় যাচ্ছি৷...’
নীচে নেমে গিয়ে জিপে উঠলুম৷ পাঠান ড্রাইভার জিপে স্টার্ট দিল৷ রাস্তায় যেতে যেতে একটা অদ্ভুত বৈষম্য চোখে পড়ছিল৷ বিশাল চওড়া হাইওয়েতে অজস্র বিলিতী গাড়ি যাতায়াত করছে বটে, উট আর ঘোড়াগাড়ির সংখ্যাও কম নয়৷ মাথায় পাগড়ি ও পা-অব্দি রঙবেরঙের আলখাল্লাপরা মানুষের ভিড়ে বিলিতী পোষাকের মানুষও রয়েছে৷ সেইসঙ্গে ভেড়ার পাল নিয়েও যাচ্ছে যারা, তারা কসাই না রাখাল বুঝতে পারলুম না৷
অদ্ভুত এখানকার ভূ-প্রকৃতিও৷ কখনও চড়াই, কখনও উৎরাই৷ এই রাস্তার দু’ধারে মাঝে মাঝে টানা সবুজ শস্যের মাঠ, কখনও বা ধূ-ধূ বালিয়াড়ি আদিগন্ত৷ ন্যাড়া টিলা, আবার কখনও রুক্ষ বাঁজা জমির ওপর বড়ো-বড়ো পাথর পড়ে রয়েছে৷ তারপর রাস্তা ক্রমশ নীচের দিকে নেমে গেছে৷ গাছপালা খুবই কম৷ তারপর একটানা বাজার৷ বাজার পেরিয়ে গিয়ে একটা টিলার গায়ে সরকারী গেস্টহাউস৷
গেস্টহাউসের পুবের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, ‘ওই হের বৎস! সিন্ধুনদ ও তার তীরবর্তী হাজার-হাজার বছরের পুরনো ভারতীয় সভ্যতার নিদর্শন সেই মোহেনজো-দাড়ো৷’
কে জানে কেন, অস্বস্তিতে আমার বুক কেঁপে উঠল এতক্ষণে!
গেস্টহাউসটার পরিবেশ এই রুক্ষ মরুসদৃশ জায়গায় একেবারে বিপরীত৷ সবুজ গাছ ও ফুলে সাজানো৷ মোহেনজো-দাড়ো রয়েছে পুবে অনেক নীচে৷ তার ওধারে সিন্ধুনদের চরগুলো দেখা যাচ্ছে৷ বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে চা খেতে খেতে কর্নেল হঠাৎ বললেন, ‘ওই দেখো জয়ন্ত, ভারতীয় পণ্ডিত এবং সাংবাদিকদের বাসদুটো দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ ওঁরা মোহেনজো-দাড়ো শহরের রাজপথে হেঁটে যাচ্ছেন৷’
দেখে নিয়ে বললুম, ‘আমরা কখন বেরুব?’
‘সন্ধ্যার একটু আগে৷ ওঁরা বিদায় নিন, তারপর৷’
‘ওরে বাবা! শুনেছি ভূতের ভয়ে নাকি সন্ধ্যার দিকে ওখানে কেউ ঘেঁষে না৷’
‘তা সত্যি৷ তবে সরকারী লোকেরাও পাঁচটার পর ওখানে কাউকে যেতে দেয় না৷’
‘আমরা কীভাবে যাব তাহলে?’
‘আমরা আপাতত অন্য এলাকায় যাব৷’
এরপর কর্নেল মোহেনজো-দাড়োর কথা শুরু করলেন৷ বুঝলুম, বুড়ো ইতিমধ্যে প্রচুর কেতাব পড়ে ফেলেছেন৷ সিন্ধু সভ্যতার বৈশিষ্ট্য, ইরাণের ইউফ্রেটিশ ও টাইগ্রিস নদীর তীরে সুমেরু সভ্যতার সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে শুরু করে আর্যদের ভারতে আগমন এবং দ্রাবিড় জাতির সঙ্গে সংঘর্ষ, ‘সে এক পেল্লায় ইতিহাস শুনিয়ে ছাড়লেন৷ আমার কান ও মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল৷ সেই সময় ডঃ করিম এবং কর্নেল কামাল খাঁ এসে গেলেন৷ বাঁচা গেল এবার৷’
আরেক প্রস্থ চা খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লুম৷ তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে৷ কিন্তু যথেষ্ট রোদ আছে৷ কারণ এটা পশ্চিম ভারতের—থুড়ি, পশ্চিম পাকিস্তানের একটি অঞ্চল৷ কলকাতার সঙ্গে সময়ের তফাৎ আছে৷ কলকাতার সূর্যাস্ত যখন, তখনও এখানে সূর্য দিগন্তের অনেকটা উঁচুতে৷
আমরা জিপে চেপে চলেছি৷ বুঝলুম, গন্তব্যস্থান আপাতত ওই ভূতের শহর নয়, সিন্ধুনদের সেই মজে-যাওয়া ত্রিকোণ জায়গা৷ বুকের মধ্যে কাঁপন শুরু হয়ে গেল৷
দক্ষিণে মাইল দুই এগিয়ে ন্যাড়া এবং পাথরভর্তি জমি এবং টিলাগুলোর মধ্যে একখানে জিপ দাঁড়াল৷ সবাই নামলুম৷ আগে আগে চললেন ডঃ করিম৷ উনি পথ প্রদর্শক৷
এবার আমরা পুবের দিকে চলেছি৷ রাস্তাঘাট নেই কোথাও৷ কাঁটাঝোপ আর পাথুরে জমি৷ কিছুটা এগিয়ে দূরে আবার সিন্ধুনদ চোখে পড়ল৷ আমরা যেখানে দাঁড়ালুম, তার নীচে গভীর এবং চওড়া খাদ উত্তর থেকে এসে বাঁক নিয়ে পুবে এগিয়ে গেছে৷ কর্নেল বলে উঠলেন, ‘এটাই কি সেই প্রাচীন সিন্ধুনদের গতিপথ?’
ডঃ করিম বললেন, ‘হ্যাঁ৷ আমাদের এই খাদ পেরিয়ে ওপারে উঠতে হবে৷’
পাথরে পা রেখে সাবধানে চারজনে নামতে শুরু করলুম৷ তিনশো ফুট নীচে খাদে অন্ধকার জমে গেছে ইতিমধ্যে৷
খাদ থেকে ওপারে ওঠাটা ভারি কষ্টকর৷ কিন্তু তিন জন বয়স্ক মানুষ—বিশেষ করে একজন তো পঁয়ষট্টি বছরের বুড়ো, অর্থাৎ কর্নেল নীলাদ্রি সরকার—ওঁরা যখন পারছেন, জোয়ান হয়ে আমার না পারার কারণ নেই৷
ওপরে উঠে ঢালু সমতল ত্রিকোণ জমিটায় যখন পৌঁছলুম, তখন প্রচণ্ড হাঁফাচ্ছি৷
ডঃ করিম বললেন, ‘আসুন, কিছুক্ষণ বিশ্রাম করা যাক৷ এখনও কিছুটা দেরি আছে৷’
সবাই শুকনো ঘাসে বসে পড়লুম৷ জানতে চাইলুম কিসের দেরি?
‘চাঁদ ওঠার৷ জবাবটা কর্নেল দিলেন৷ জয়ন্ত, প্রথম চাঁদ কিন্তু! প্রতিপদে চাঁদ দেখা যায় না৷ আজ দ্বিতীয়া৷’
‘তা চাঁদের সঙ্গে কী সম্পর্ক?’
‘ফলকের সংকেতের কথা কি ভুলে গেছ জয়ন্ত?’
‘তাই বলুন৷ কিন্তু চাঁদ উঠলে হবেটা কী শুনি?’
ডঃ করিম হাসতে হাসতে বললেন, ‘জয়ন্তবাবু সাংবাদিক মানুষ৷ কাজেই এত কৌতূহলী৷ তবে অপেক্ষা করুন৷ কিছুক্ষণ পরেই সব বুঝতে পারবেন৷’
দিনের আলো ক্রমশ কমে আসছিল৷ ওঁরা চাপা গলায় কীসব আলোচনা করছিলেন৷ কান দিলুম না৷ আমি একটু কল্পনাপ্রবণ হয়ে পড়েছিলুম৷ আজ থেকে অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে এখানে শস্যক্ষেত্র ছিল৷ ব্রহ্মাবর্তরাজ হেহয় রাজ্যচ্যুত হয়ে এদেশে-সেদেশে ঘুরতে ঘুরতে ঘোড়ার পিঠে চেপে যখন এখানে পৌঁছলেন, তখন সবে চাঁদ উঠেছে৷ একফালি ক্ষীণ চাঁদ৷ ধনরত্ন লুকিয়ে রাখতে এসেছেন এই নির্জন শস্যক্ষেত্রে৷ কারণ কখন ওই ধনের লোভে তাঁকে দস্যুরা মেরে ফেলবে, বলা যায় না৷
কল্পনার চোখে দেখতে থাকলুম দৃশ্যটা৷ নির্জন নিঃঝুম, অন্ধকার ঘনিয়ে ওঠা এই মাঠে ওই যেন একটা ঘোড়ার লাগাম ধরে এগিয়ে আসছে একটা মানুষ! তারপর...
আচমকা আমার কল্পনা ছত্রখান হয়ে গেল৷ কোত্থেকে কে বা কারা গুলিবৃষ্টি শুরু করল মুহুর্মুহ৷ সঙ্গে সঙ্গে আমরা উবুড় হয়ে শুয়ে পড়লুম৷ কর্নেল কামাল খাঁ-র চিৎকার শুনলুম, ‘লুকিয়ে পড়ুন, লুকিয়ে পড়ুন! পাথরের আড়ালে চলে যান সবাই!’
এখানে-ওখানে পাথরের মস্ত চাঁই রয়েছে৷ তখন অন্ধকার কিছুটা ঘন হয়েছে৷ ঝোপ ঝাড় ও শুকনো ঘাসে প্রায় সাপের মতো বুকে হেঁটে যে-যেখানে পারলুম, আত্মরক্ষা করতে ব্যস্ত হলুম৷ একটা উঁচু পাথরের আড়ালে পৌঁছে মাথা তুললুম৷ আবার এক-ঝাঁক গুলি এসে পড়ল৷ মুখ গুঁজে মড়ার মতো পড়ে রইলুম৷
তারপর সব চুপচাপ৷
তারপর জোরালো টর্চের আলো ছড়িয়ে এল৷ সঙ্গে সঙ্গে মনে হল আমাদের দলের কেউ আলো লক্ষ্য করে গুলি ছু’ড়লেন৷ আলো নিভে গেল৷
এতক্ষণে আমার মনে পড়ল, আসার সময় রিভলবারটা নিতে ভুলে গেছি! নিজেকে অসহায় মনে হল৷ ঘটনার আকস্মিকতায় আমাদের দলটা ছত্রভঙ্গ হয়ে কে কোথায় ছিটকে পড়েছি, বোঝা যাচ্ছে না৷ পাথরটা উঁচু এবং প্রকাণ্ড৷ এপাশ-ওপাশ সাবধানে ঘুরে আবছা অন্ধকারে কাকেও দেখতে পাচ্ছি না৷ উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছি৷
একটু পরে সম্ভবত পিছনে খাদের দিক থেকে কর্নেল কামাল খাঁ-র ডাক শোনা গেল, ‘জয়ন্তবাবু! জয়ন্তবাবু!’
সাড়া দিয়ে বললুম, ‘আমি এখানে!’
সঙ্গে সঙ্গে আমার সামনের পাথরে এক-ঝাঁক গুলি এসে পড়ল৷ স্প্রিন্টারের ফুলকি আর পাথরের টুকরো ছিটকে পড়তে থাকল৷ আবার ঘাড় গুঁজে মড়ার মতো পড়ে রইলুম৷
গুলি-ছোঁড়া বন্ধ করল ওরা৷ কতক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মুখ তুলে দেখি, অন্ধকার ঘন হয়েছে৷ কারুর কোনো সাড়া নেই৷ চেঁচিয়ে কর্নেলকে ডাকব ভাবলুম৷ কিন্তু আবার যদি ওরা গুলি ছোঁড়ে, সেই ভয়ে চুপ করে গেলুম৷
কিন্তু ওরা কারা? যারাই হোক, অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি এখানে আমাদের এসে পড়াটা ওদের পছন্দ হয়নি৷
ঘাড় ঘুরিয়ে এ-সময় চোখে পড়ল, পিছনে দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশের দিগন্তে একফালি ক্ষীণ চাঁদ জেগে আছে৷ এখনই ওই চাঁদ অস্ত যাবে৷ পাঁচ হাজার বছর আগে এখানে ঠিক এই সময়ে যে নাটক শুরু হয়েছিল, আজ এত কাল পরে কি তারই শেষ দৃশ্য অভিনীত হচ্ছে?
কিন্তু আর এভাবে থাকা যায় না৷ আস্তে আস্তে গিরগিটির মতো লম্বা হয়ে পিছিয়ে গেলুম৷ যে ভাবেই হোক, খাদে গিয়ে নামতে হবে৷ সম্ভবত দুই কর্নেল এবং ডঃ করিম খাদেই নেমে গেছেন এবং আমার অপেক্ষা করছেন৷ একবার নীচে থেকে আবছা ডাকও যেন শুনলুম৷
কতক্ষণ ওইভাবে পিছু হটে এগিয়েছি হিসেব নেই৷ এক সময় দেখি, উঁচু-উঁচু পাথরের মধ্যে এসে পৌঁছেছি৷ মনে পড়ল, খাদের কিনারায় এমনি উঁচু পাথরের সারি ছিল বটে৷ এবার হামাগুড়ি দিয়ে সিধে এগোলুম৷ কিন্তু হঠাৎ পা পিছলে গেল এবং গড়াতে গড়াতে নীচের দিকে পড়তে থাকলুম৷
ক্রমাগত পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে হাড়গোড় ভেঙে যাবার দাখিল৷ আঁকড়ে ধরার মতো কিছু পাচ্ছি না৷ শুধু মসৃণ পাথর৷ তারপর গিয়ে পড়লুম বালির গাদায়৷ আঘাতটা জোর হল না৷ বুঝলুম, খাদের তলায় বালির চড়ায় এসে পড়েছি৷
চিত হয়ে কতক্ষণ আচ্ছন্নভাবে পড়ে থাকলুম৷
হঠাৎ কী একটা খসখস শব্দ হল৷ তারপর বিশ্রী দুর্গন্ধ টের পেলুম৷ উঠে বসলুম৷ নিশ্চয়ই কোনো হিংস্র জন্তু—বাঘ কিংবা নেকড়ে৷ শুনেছি এদেশের পাহাড়ি এলাকায় নেকড়েরা দলে দলে ঘুরে বেড়ায়৷ আতঙ্কে আবার কাঁপুনি শুরু হল৷
একটু পরে মনে হল, যে খসখস শব্দটা শুনেছিলুম, সেটা ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে৷ দুর্গন্ধে বমি এসে যাচ্ছে৷ নাকে রুমাল চাপা দেব ভেবে যেই প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাতে গেছি, ওমনি কী একটা প্রাণী আমার হাত ধরে ফেলল৷
হাত ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে বুঝলুম, প্রাণীটার গায়ে অসম্ভব শক্তি৷ সে এক হ্যাঁচকে টানে আমাকে বালির ওপর টানতে শুরু করল৷
এবার টের পেলুম, প্রাণীটার মানুষের মতো হাত আছে৷ সেই হাতে আমার কব্জি সাঁড়াশির মতো ধরেছে৷ পরক্ষণে সে আচমকা পিলে চমকানো হাসি হেসে উঠল—হিঁ—হিঁ—হিঁ—হিঁ— হিঁ—হিঁ!
ওরে বাবা! এ যে ভূতুড়ে হাসি! তাহলে এ কার পাল্লায় আমি পড়েছি? চেঁচিয়ে ওঁদের ডাকব ভাবলুম, কিন্তু গলা দিয়ে শুধু গোঁ গোঁ আওয়াজ হল৷ তারপর দেখি, সেই ভূতুড়ে প্রাণীটা দু’হাতে আমাকে শূন্যে তুলে নিয়েছে এবং দৌড়ুতে শুরু করেছে৷ বিকট গন্ধে নাড়ি-ভুঁড়ি উগরে আসছে৷
তারপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললুম৷...
যখন জ্ঞান হল, কয়েক মুহূর্ত কিছু বুঝতে পারলুম না কোথায় আছি এবং কী ঘটেছে৷ তারপর সব মনে পড়ল৷ সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসলুম৷ সর্বাঙ্গে ব্যথা করছে৷
সামনে একটা পিদিম জ্বলছে৷ সেই আলোয় যা দেখা গেল, বুঝলুম আমি একটা গুহার মধ্যে আছি৷ পিদিম জ্বলছে একটা পাথরের বেদির ওপর৷ মাটির পিদিম৷ আর বেদির পাশে এক বুড়ো জটাজুটধারী লম্বা-চওড়া দাড়িওয়ালা ফকির চোখ বুজে সম্ভবত ধ্যান করছেন৷ তাঁর গলায় কয়েকটা রঙিন পাথরের মালা৷
তখন মুহূর্তেই আতঙ্ক ঘুচে গেল৷ ডাকলুম, ‘ফকিরসায়েব! ফকিরসায়েব!’
ফকির চোখ খুললেন এবং ঘুরে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন৷
বললুম, ‘আমাকে এখানে কে আনল ফকিরসায়েব?’
ফকির ইশারায় কাছে ডাকলেন৷ গুহার ছাদটা নীচু৷ দাঁড়ালে মাথা ঠেকে যাবে৷ প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে কাছে গেলুম৷ তখন ফকির আমাকে অবাক করে পরিষ্কার বাংলায় বলে উঠলেন, ‘তুমি কে বাবা?’
‘এ কী! আপনি বাঙালি?’
‘হ্যাঁ বাবা, আমি বাঙালি৷ কিন্তু তুমি কি কোনো পর্যটক? মোহেনজো-দাড়ো দেখতে এসেছিলে?’
‘হ্যাঁ ফকিরসায়েব৷ কিন্তু আপনি...’
ফকির একটু হেসে বললেন, ‘আমি সংসারত্যাগী ফকির, সে তো দেখতেই পাচ্ছ৷ এই গুহায় সাধনভজন করি৷ এটাই আমার আস্তানা৷ কিন্তু তুমি কেমন করে ওই নচ্ছারটার পাল্লায় পড়লে? ভাগ্যিস, ওই সময় একবার বেরিয়েছিলুম৷ আমার সামনে পড়তেই ব্যাটা তোমাকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেল৷ আমি তখন নিয়ে এলুম তোমাকে৷’
‘কে ও? ভূত, না মানুষ?’
ফকির আবার হেসে ফেললেন৷ ‘ও ব্যাটাকে ভূতও বলতে পারো, মানুষও বলতে পারো৷ ও একটা ভূত-মানুষ৷’
‘তার মানে কী ফকিরসায়েব?’
‘মানে? মানে কি আমিও জানি ছাই! এই গুহায় জুটেছি আজ প্রায় দু’বছর৷ প্রথম প্রথম আমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিল৷ তারপর আমিই ওকে ভয় পাইয়ে দিলুম৷ আমার এই ফকিরী চিমটে ঝন ঝন করে বাজালেই ব্যাটা পড়ি-কী-মরি করে পালিয়ে যায়৷ তবে এ-কথা ঠিক, ওকে দিনে একবারও দেখিনি৷ তাহলে ও আসলে কে, ঠিকই বুঝতে পারতুম৷ ব্যাটা সন্ধ্যার পর বেরিয়ে পড়ে৷ এই খাদেই ওর গতিবিধি৷ তবে একবার ফুটফুটে চাঁদের আলোয় সামনা-সামনি দেখেছিলুম৷ ও মানুষের মতো দু’পায়েও হাঁটে৷ অসম্ভব জোরে দৌড়াতে পারে৷ আর ওর একটা বিদঘুটে অভ্যাস৷ মাঝে মাঝে ঘোড়ার মতো চিঁহি করে ওঠে! মনে হবে, ওটা ওর হাসি৷ কিন্তু মোটেও তা নয়৷ ব্যাটা নিজেকে হয়তো ঘোড়া ভাবে৷’
ফকিরের এসব কথা শুনে আমি তো হতভম্ব! বললুম, ‘এবার আপনার কথা বলুন৷’
‘আমার কথা কী বলবো বাবা? বললুমই তো, আমি সংসারত্যাগী মানুষ৷’
‘কিন্তু আপনি বাঙালি বলেই আমার সব কিছু জানতে ইচ্ছে করছে৷’
‘জেনে কী হবে? তার চেয়ে এখন তোমার বিশ্রাম জরুরি৷ এ গরিবের আখড়ায় তোমার খুব কষ্ট হবে, জানি৷ কিন্তু উপায় কী? অল্প কিছু ফল আছে৷ খেয়ে নাও৷ ওই কুঁজোয় জল আছে৷ খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ো৷ কম্বলও পাবে৷’
‘জায়গাটা কোথায় বলুন! আমি বরং ট্যুরিস্ট লজে ফিরে যাব তাহলে৷’
‘সর্বনাশ! সর্বনাশ! খবরদার বাবা, এখন গুহা থেকে বেরুলেই বিপদে পড়বে৷’
‘কেন বলুন তো?’
ফকির গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘সম্প্রতি কিছুকাল থেকে গুন্ডাপ্রকৃতির কিছু লোক ওপরের দিকে একটা গুহায় আস্তানা গেড়েছে৷ তাদের কাছে প্রচুর গুলিবারুদ অস্ত্রশস্ত্রও আছে সম্ভবত৷ মাঝে মাঝে দেখি, তারা এখানে-ওখানে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করছে৷ পাথরের আড়াল থেকে ওদের গতিবিধি লক্ষ্য করেছি৷ আমার ধারণা, ওরা গুপ্তধন খুঁজছে৷ যদি দৈবাৎ ওদের পাল্লায় পড়ে যাও, খুন হয়ে যাবে৷ কারণ ওদের খবর কেউ জানুক, এটা ওরা চায় না৷ একদিন আমি তো গুলিতে মরতে মরতে বেঁচে গেছি৷ ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমার এই আস্তানার খবর ওরা জানে না৷’
আজ সন্ধ্যায় যা ঘটেছে, ফকিরকে বলব ভাবলুম৷ পরে মনে হল, কী দরকার? ফকির হয়তো আরও ভয় পেয়ে যাবেন এবং আমাকেও পাল্টা আরেকটা গুপ্তধন-সন্ধানী দলের লোক ভেবে বসবেন৷
বললুম, ‘অন্তত একটা কথার জবাব দিন৷ এই গুহাটা ট্যুরিস্ট লজ থেকে কতদূরে?’
‘তা মাইল পাঁচেকের বেশি তো হবেই৷ তবে গুহাটা খাদের ধারেই৷ একবার বেরিয়ে গেলে কিন্তু আর খুঁজে এখানে ঢোকা মুশকিল৷ এটাই এ গুহার মজা!’
‘কেন?’
‘সে স্বচক্ষে সকালে দেখবে’খন৷ এটা একটা গোলকধাঁধার মতো৷ খাদের পাশে দেয়ালের মতো এবড়ো-থেবড়ো পাথরে অজস্র ফাটল আছে৷ কোন ফাটল দিয়ে ঢুকলে এ গুহায় পৌঁছানো যাবে, বোঝা মুশকিল৷ আমারও মাঝে মাঝে গণ্ডগোল হয়ে যায়৷ বিশেষ করে রাতের বেলা৷ ভুল ফাটলের মধ্যে ঢুকে হয়রান হই৷ প্রত্যেকটা ফাটলই তলায় তলায় সুড়ঙ্গের মতো গলি ঘুঁজি ঘুরে গিয়ে শেষ হয়েছে৷ শুধু একটা ফাটলের পথ এ-গুহায় পৌঁছেছে৷ সেই ফাটলে অবশ্য একটা চিহ্ন দিয়ে রেখেছি৷ অন্যের চোখে পড়া মুশকিল৷ ওটা শুধু আমিই চিনতে পারি৷...’ বলে ফকির বেদির ওপর রাখা একটা ঝোলা থেকে দুটো আপেল বের করলেন৷ তারপর বললেন, ‘নাও৷ খেয়ে ফেলো৷ অনেক রাত হয়েছে৷ আমার এখন ধ্যানে বসার সময়৷ দয়া করে আর আমাকে ডাকাডাকি কোরো না৷ আর এই কম্বলটা রইল৷ গুহার মধ্যে শীত তত টের পাবে না৷ শুয়ে পড়বে চুপচাপ৷’
কী আর করি, একটা আপেলে কামড় বসালুম৷ ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে৷ মাটির কুঁজো থেকে জলও খেলুম৷ তারপর নগ্ন পাথরের মেঝেয় শুয়ে পড়লুম৷ কম্বলটা দরকার হল না৷ ওই একটা মোটে কম্বল৷ ফকিরের কম্বলে আর ভাগ বসাই কেন? ফকির আবার চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়েছেন ততক্ষণে৷
যাক গে, রাতের আশ্রয় পেয়েছি এবং মামদো ভূতের—উঁহু, ঘোড়াভূতের হাত থেকে বেঁচে গেছি, এই পরম সৌভাগ্য!
হঠাৎ মনে পড়ল, কর্নেল বলেছিলেন মোহেজো-দাড়োর ঘোড়াভূতের কথা৷ তাহলে তো এই সেই ঘোড়াভূত! ওর বিকট হাসির মতো হিঁহিঁ করে ওঠাটা এখনও কানে ভাসছে৷
কিন্তু কে ও? বেঁচেবর্তে ট্যুরিস্ট লজে ফিরতে পারলে কর্নেলকে সব জানাতে হবে৷ তারপর এই রহস্যের কিনারা করতেই হবে৷
এইসব ভাবতে-ভাবতে আর ঘুমই এল না৷ তার ওপর সারা শরীরে ব্যথা৷ কেটে-ছড়ে গেছে অনেক জায়গায়৷ জ্বরজালা না এলে বাঁচি৷ একটু পরে পাশ ফিরে দেখলুম, ফকির একইভাবে ধ্যানস্থ৷ পাশ দিয়ে বেদিটা দেখা যাচ্ছে৷
বেদিটার কিছু অংশে আলো পড়েছে৷ হঠাৎ চমকে উঠে দেখলুম, বেদির গায়ে অজস্র খোদাই করা চিহ্ন দেখা যাচ্ছে৷ অবিকল সিন্ধুলিপির মতো!
মতোই বা বলছি কেন? এখানে সিন্ধুলিপিই তো স্বাভাবিক৷ তাহলে এই বেদিটা নিশ্চয়ই সিন্ধু-সভ্যতার সমকালীন!
চঞ্চল হয়ে উঠলুম৷ তাহলে তো আমি এ-যাবৎ অনাবিষ্কৃত একটা প্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কার করে ফেলেছি!
কিন্তু ওই বেদিটা কিসের? নিছক পুজো-আচ্চার বেদি—নাকি ওটা একটা কবর? সিন্ধুসভ্যতায় কবরও পাওয়া গেছে অনেকগুলো৷ তখন যেমন মড়া পোড়ানো হত, তেমনি কবরও দেওয়া হত৷ হরাপ্পাতে কয়েকটা কঙ্কালও পাওয়া গেছে৷ মাটির জালায় সেগুলো ঠেসে ভরা ছিল৷ কর্নেলের কাছেই তো শুনেছি এসব কথা৷
সাবধানে মুখটা একটু বাড়িয়ে লিপিগুলো ভালো করে দেখার চেষ্টা করলুম৷ তারপর আবার চমকে উঠলুম৷
এ কী দেখছি! ডঃ আলুওয়ালার যে-ফলকের স্কেচ কর্নেল হাতিয়েছিলেন এবং ডঃ ভট্টাচার্য যে-ফলকের পাঠোদ্ধার করেছিলেন—তার সঙ্গে বেদির গায়ে খোদাই করা লিপিগুলোর হুবহু মিল রয়েছে৷
সেই ফলকের চিত্রলিপিগুলো আমার স্পষ্ট মনে আছে৷ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলুম না৷ অবিকল সেই বলদ অথবা হনুমান অথবা ঘোড়া এবং মানুষটাও রয়েছে যে!
তাহলে কি এই বেদির তলায়...
আর ভাবতে পারলুম না৷ আনন্দে উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে উঠলুম৷ যেভাবেই হোক, এই গুহায় ঢোকার পথটা সকালে যাবার সময় ফকিরের অজান্তে চিহ্নিত করে রাখব৷
তারপর আর সময় কাটতেই চায় না৷ ফকির ধ্যানমগ্ন৷ নিস্তব্ধ গুহা ছমছম করছে৷
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি৷
ফকিরের ডাকে সেই ঘুম ভাঙল৷ তাকিয়ে দেখি, মাথার ওপর একটা ফাটল দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে গুহায় ঢুকেছে৷ গুহার ভেতর অন্ধকার নেই৷
উঠতে গিয়ে টের পেলুম, এবার হেঁটে অতখানি পথ যাওয়া ভারি কষ্টকর হবে৷ কিন্তু উপায় নেই৷
ফকির সস্নেহে জিগ্যেস করলেন, ‘শরীর কেমন বাবা? হেঁটে যেতে পারবে তো?’
একটু হেসে বললুম, ‘দেখা যাক৷’
‘যদি না পারো, থেকে যাও৷ তোমার সেবাযত্বের ত্রুটি হবে না৷’
‘না ফকির সায়েব, আমাকে যেতেই হবে৷’
‘তাহলে এসো৷’
ফকিরের সাহায্যে আস্তে আস্তে উঠে বসলুম৷ নীচু খাদ৷ ফকির আগে, আমি পেছনে—সাবধানে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে চলতে থাকলুম৷
সত্যি এ একটা গোলক ধাঁধা৷ ঘুরে-ঘুরে পথটা অন্ধকারে এগিয়েছে৷ আমি বাঁকগুলো গুনতে থাকলুম৷ ন’টা বাঁকের পর অন্ধকার ঘুচল৷ কিন্তু টের পেয়ে গেছি, এই সুড়ঙ্গপথের আরও অনেক শাখাপথ আছে৷ তবে সেই পথগুলো আরও ঘুপটি৷ কাজেই ভুল হবার চান্স নেই৷
আবছা আলোর মধ্যে চলার সময় হাত বাড়িয়ে ফকিরের অজান্তে একটুকরো পাথর কুড়িয়ে নিলুম৷ কিছুক্ষণ পরে ফাটলের মুখে পৌঁছানো গেল৷ ফকির বেরিয়ে গিয়ে ডাকলেন, ‘এসো বাবা!’
সেই সময় দ্রুত পাথরের টুকরোটা দিয়ে ফাটলের নীচে একটা বর্গমূল নির্ণয়ের চিহ্নের মতো চিহ্ন দিলুম৷
ফাটলটা মোটে ফুট দেড়েক চওড়া, কিন্তু অনেক—খানি লম্বা৷ অতিকষ্টে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, সেই খাদে পৌঁছেছি৷ খাদটা বালি আর পাথরে ভর্তি৷ দু’ধারে খাড়া পাথরের দেয়াল৷ ফকির ফের জিগ্যেস করলেন, ‘কষ্ট হচ্ছে কি হাঁটতে?’
বললুম, ‘না৷’
‘আমি কিন্তু বেশিদূর যেতে পারব না৷ তোমাকে মোহেনজো-দাড়োর প্রটেক্টেড এরিয়ার কাছে পৌঁছে দিয়ে আসব৷’
ফকিরের মুখে ইংরিজি শব্দটা শুনে চমকে উঠলুম৷ উচ্চারণও নিখুঁত৷ তাহলে কে এই ফকির? বললুম, ‘আপনি নিজের কোনো পরিচয়ই দিলেন না ফকির সায়েব!’
ফকির একটু হেসে বললেন, ‘কী হবে পরিচয় জেনে? পরিচয় বলতে আজ আর কী আছে আমার? ঈশ্বরের ধ্যানে কাটাচ্ছি৷ যে’কটা দিন বাঁচব, ঈশ্বরের ধ্যানেই কাটাব৷ বাবা, আমার মত পাপী আর কে আছে? এ সেই পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত!’
‘পাপী কেন বলছেন আপনি?’
‘হ্যাঁ বাবা, আমি মহাপাপী৷ একদিন আমিও মোহেনজো-দাড়োর গুপ্তধনের লোভে পাগল হয়ে উঠেছিলুম৷ গুপ্তধনের লোভ বড়ো সাংঘাতিক বাবা! এই লোভেই আমার এক প্রাণের বন্ধুকে খুন করেছিলুম!’
বলে ফকির দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন৷ আমি হতবাক!
পরক্ষণেই উনি সংযত হয়ে চোখ মুছলেন জোব্বায়৷ তারপর বললেন, ‘চলো বাবা! এখনও অনেকটা পথ যেতে হবে৷’
বাকি পথ আমরা দু’জনেই চুপচাপ এলুম৷ মাইল-টাক চলার পর দেখা গেল, একখানে খাদের দু’ধারেই ঝোপঝাপ গাছপালা দেখা যাচ্ছে৷ পাথরও বিশেষ নেই৷ দু’ধারে পাড় অনেক ঢালু৷ ফকির বললেন, ‘বাঁ-পাড়ে উঠে গেলেই আশা করি সব চিনতে পারবে৷’
আমি কৃতজ্ঞতায় ওঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে এগিয়ে গেলুম৷ এক সময় পাড়ে উঠে পিছু ফিরে দেখি ফকির দ্রুত চলেছেন খাদের পথে৷ একবারও ওঁকে পিছু ফিরতে দেখলুম না৷ কিন্তু কে এই ফকির?
ট্যুরিস্ট ম্যানেজার ইকবাল খাঁ আমাকে দেখেই দৌড়ে এলেন৷ বললেন, ‘কী ব্যাপার মিঃ চৌধুরী? আপনার এ-দশা কেন? কোথায় ছিলেন সারারাত? আমরা তো ভেবে সারা৷ আপনার কর্নেল সায়েব আবার সকালে আপনাকে খুঁজতে বেরিয়েছেন৷ ডঃ করিম আর কর্নেল কামালও গেছেন একদল মিলিটারি নিয়ে৷’
‘মিলিটারি নিয়ে? সে কী!’
ইকবাল খাঁ হাসলেন৷ ‘এ দেশে মিলিটারি ছাড়া দুশমনদের জব্দ করা যায় না মিঃ চৌধুরী৷ আমরা কথায়-কথায় মিলিটারির সাহায্য নিই৷ যাকগে, ঝটপট পোষাক বদলান৷ আমি খবর পাঠাই ওঁদের৷’
আমাদের ঘরের ডুপ্লিকেট চাবি ওঁর কাছে রয়েছে৷ দরজা খুলে দিলেন৷ বেয়ারা হুকুমের অপেক্ষায় সেলাম দিয়ে দাঁড়ালে বললুম, ‘আপাতত এককাপ কড়া কফি ছাড়া আর কিছু দরকার হবে না৷’
‘ব্রেকফাস্ট খাবেন না স্যার?’
‘ওঁরা ফিরে আসুন, তারপর৷’
বেয়ারা চলে গেল৷ একটা এনার্জি ট্যাবলেট বের করে খেয়ে ফেললুম৷ তারপর বাথরুমে ঢুকে পোষাক ছাড়লুম৷ স্নান করে এসে দেখি, কফি রেডি৷
জানলার কাছে বসে কফি খেতে খেতে মোহেনজো-দাড়ো শহরের দিকে তাকিয়ে রইলুম৷ কী বিচিত্র মানুষের অতীত ইতিহাস!
কতক্ষণ পরে বাইরে জিপের শব্দ হল৷ তারপর দুমদাম জুতোর শব্দ শোনা গেল বারান্দায়৷ প্রথমে ঢুকলেন কর্নেল কামাল খাঁ৷ দৈত্যাকৃতি পাঠান ভদ্রলোক এক লাফে এগিয়ে আমাকে প্রায় শূন্যে তুলে ফেললেন৷ মুখে শুধু— ‘হ্যাল্লো, হ্যাল্লো, হ্যাল্লো!’
ডঃ করিম বললেন, ‘তবিয়ত ঠিক আছে তো জয়ন্তবাবু?’
বললুম, ‘হাঁ, ঠিক আছে৷’
আমার বৃদ্ধ বন্ধু টাকে হাত বুলোচ্ছেন এবং মিটমিটি হাসছেন৷ টুপিটা বগলদাবা৷ গলায় বাইনোকুলার ও ক্যামেরা যথারীতি ঝুলছে৷ বললেন, ‘আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে ডার্লিং! হবারই কথা৷ ফকিরসায়েব অতি দয়ালু এবং স্নেহপ্রবণ মানুষ৷’
তিনজনেই অট্টহাস্য করে উঠলেন৷ তারপর কর্নেল বললেন, ‘এটা কোনো অলৌকিক উপায়ে অবগত হইনি আমরা৷ কারণ আমরা ফকির নই৷ সাধারণ মানুষ মাত্র৷’
বিরক্ত হয়ে বললুম, ‘হেঁয়ালি করার দরকারটা কী?’
ডঃ করিম বললেন, ‘একটা হেঁয়ালি বোধ হয় আছে জয়ন্তবাবু৷ আপনাকে রাতে বিশেষ খোঁজাখুজি করতে পারিনি, সে-জন্য ক্ষমা করবেন৷ অন্ধকারে ওই এলাকায় গেলে আবার দুশমনগুলোর সঙ্গে অকারণ গুলি ছোঁড়াছুড়ি করতে হত৷ তাই সক্কালে বেরিয়ে পড়েছিলুম৷ খাদ বরাবর সিন্ধুনদ অব্দি এগিয়ে ব্যর্থ হয়ে যখন ফিরে আসছি, একখানে আপনার বন্ধু বালিতে আপনার জুতোর ছাপ আবিষ্কার করলেন৷ ছাপ ক্রমশ উত্তর পশ্চিমে এগিয়েছে৷ তার মানে, বোঝা গেল আপনি ফিরে চলেছেন৷ একটা বাঁক পেরিয়ে দেখি একজন ফকির হন্তদন্ত আসছেন৷ আমাদের তিনি দেখেই পাড়ের দেয়ালের খাঁজে লুকিয়ে পড়লেন৷ কর্নেল কামাল খাঁ তাঁর বাহিনী নিয়ে দৌড়ে গিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেললেন৷ গুলি ছোঁড়ার ভয় দেখালে ফকির সাহেব বেরিয়ে এলেন৷ তাঁর মুখেই আপনার খবর পাওয়া গেল৷’
কর্নেলের দিকে ঘুরে বললুম, ‘ওই ফকির কিন্তু বাঙালি এবং রীতিমতো শিক্ষিত লোক!’
কর্নেল বললেন, ‘জানি বৎস! তবে তুমি কি ওঁর আসল পরিচয় টের পেয়েছ?’
‘না তো৷ কে উনি?’
‘উনি এক প্রখ্যাত বাঙালি পুরাতত্ত্ববিদ পণ্ডিত ডঃ ফরিদ আমেদ! একসময় কলকাতার পুরাতত্ত্ব দফতরের অধিকর্তা ছিলেন৷ অজন্তা, ইলোরা এবং সিন্ধু-সভ্যতার ওপর ওঁর মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থগুলো দেশ-বিদেশে এখনও সমাদৃত হয়৷ দেশভাগের পর উনি চলে যান প্রাক্তন পূর্বপাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশে৷ সেখানে রিটায়ার করার পর দিব্যি ছিলেন৷ হঠাৎ লন্ডনে একটা সেমিনারে আমন্ত্রিত হন এবং সেখানে গিয়ে জাদুঘরে একটা ব্রোঞ্জের ফলক দেখতে পান৷’
‘রাজা হেহয়ের আসল ফলকটা তো?’
‘ঠিক বলেছ৷ ওই হল ওঁর কাল৷ অভিশপ্ত ফলক বলতে পারো৷ ফিরে এসে ফলকের পাঠোদ্ধারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷ সে এক দীর্ঘ কাহিনি৷ সংক্ষেপেই বলছি৷ বর্ধমানের গ্রামে ডঃ ভট্টাচার্যের ছেলে সেই শিক্ষক ভদ্রলোকের কাছেও উনি অনেকবার যাতায়াত করেছিলেন৷ কারণ ডঃ ভট্টাচার্যের বইয়ে ফলকটার উল্লেখ ছিল৷ শেষপর্যন্ত ওঁর ডাইরিটা দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন ডঃ আমেদ৷ নিজের অনুবাদের সঙ্গে ডঃ ভট্টাচার্যের অনুবাদের মিল দেখে আর ধৈর্য ধরতে পারেননি৷ নাম ভাঁড়িয়ে ভারতীয় নাগরিক সেজেই উনি পাসপোর্ট-ভিসা জোগাড় করেন৷’
আবার একপ্রস্থ কফি এল৷ আমার ব্রেকফাস্টও এসে গেল৷ খেতে খেতে বললুম, ‘তারপর কী হল বলুন?’
কর্নেল বললেন, ‘ডঃ আমেদ একটা ভুল করলেন৷ ডঃ ভট্টাচার্যের ডাইরিতে লারকানার স্টেশন-মাস্টার আলুওয়ালার উল্লেখ ছিল৷ তাঁর ছেলে ডঃ আলুওয়ালার সঙ্গে ডঃ আমেদের অল্প চেনাজানা ছিল৷ একা মোহেনজো-দাড়ো অভিযানে যেতে সাহস করেননি৷ ডঃ আলুওয়ালাকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু ডঃ আলুওয়ালা পণ্ডিত মানুষ হলে কী হবে? ভীষণ পাজি লোক৷ যাবার আগে ষড়যন্ত্র করেন যে গুপ্তধন পেলে ডঃ আমেদকে মেরে ফেলা হবে৷ তাই এক আন্তর্জাতিক ডাকাতদলের সর্দার কিষাণচাঁদের সাহায্য নিলেন৷ কিষাণচাঁদ পণ্ডিত সাজল৷ নাম নিল ডঃ ব্রীজেশ সিং৷ ডঃ আমেদ অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে সঙ্গে নিতে বাধ্য হলেন৷ যাইহোক, ডঃ আমেদ একটা কাজ কিন্তু করেছিলেন, ফলকের প্রকৃত অনুবাদের কথা সঙ্গীদের জানাননি৷ এখানে এসে বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেন তিনজনে৷ তারপর এক রাতে তিনজনে কী একটা কথায় নাকি তুমুল ঝগড়া বেধে যায়৷ রাগের চোটে ডঃ আমেদ খাদের ওপর থেকে ধাক্কা মেরে ডঃ আলুওয়ালাকে ফেলে দেন৷ কিষাণচাঁদ তাঁকে আক্রমণ করে৷ কিন্তু ভাগ্যক্রমে ওই সময় একদল মিলিটারি টহলদার দূর থেকে সার্চলাইট ফেলেছিল৷ নেহাৎ রুটিন-মাফিক ঘোরাঘুরি করছিল ওরা৷ এর ফলে কিষাণচাঁদ পালিয়ে যায়৷ ডঃ আমেদও লুকিয়ে পড়েন৷ সকালে খাদে নেমে এক-জায়গায় রক্ত দেখে ওঁর অনুতাপ জাগে৷ ভাবেন, নির্ঘাৎ ডঃ আলুওয়ালা এখানে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন এবং নেকড়েরা তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলেছে৷ ধর্মভীরু ডঃ আমেদের অনুশোচনা তীব্র হয়ে ওঠে ক্রমশ৷ দিনের পর দিন পাপবোধে অস্থির হয়ে ওঠেন৷ তারপর ফকিরী অবলম্বন করেন৷ তারপর থেকে ওইভাবে থেকে গেছেন৷’
‘এসব কথা কি উনিই বলেছেন আপনাকে?’
আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন কর্নেল কামাল খাঁ৷ ‘মিঃ চৌধুরী, দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, ফকির সায়েব ওরফে ডঃ আমেদকে আমি গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়েছি৷ জেরার চোটে উনি সব কবুল করেছেন৷’
চমকে উঠলুম৷ ‘গ্রেফতার করেছেন? কেন?’
‘প্রথম কথা উনি নাম ভাঁড়িয়ে ভিসা জোগাড় করেছিলেন৷ পরে আমার গোয়েন্দা দফতর সেটা টের পেয়ে ওঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল৷ এটা দু’বছর আগের ঘটনা৷ দ্বিতীয় কথা, উনি বেআইনীভাবে গুপ্তধন খোঁজাখুঁজি করেছেন৷ আমরা কিষাণ সিং এবং ডঃ আলুওয়ালাকেও গ্রেফতার করার জন্যে প্রস্তুত ছিলুম৷ কিন্তু ব্যাপারটা টের পেয়েই দু’জনে গা-ঢাকা দিয়েছে৷’
কর্নেল সরকার বললেন, ‘কিষাণ সিং কে জানো? তুমি প্লেনে যে ভদ্রলোকের পাশে বসে এসেছ—সেই জাল ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী!’
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন, ‘গা-ঢাকা দিয়ে দু’জনে দলবল নিয়ে ওই এলাকায় লুকিয়ে আছে৷ ওদের অস্ত্রশস্ত্র আছে প্রচুর৷ কিষাণ সিংএর লোকেরা তো ওখানে বরাবর রয়ে গেছে৷ কোনো গুহায় আস্তানা গেড়েছে৷ খুঁজে বের করতেই হবে৷’
বললুম, ‘ফকির সায়েব কোথায় এখন?’
‘আপাতত লারকানায় হাজতে পাঠিয়ে দিয়েছি৷’
শুনে খুব দুঃখ হল৷ কিন্তু এদেশে মিলিটারি আইন৷ কিছু করার নেই৷
আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে কর্নেল কামাল খাঁ এবং ডঃ করিম চলে গেলেন৷ কর্নেলকে বললুম, ‘হ্যালো ওল্ড ম্যান! ফকির সায়েবের কাছে কী শুনেছেন জানি না৷ আমার ব্যাপারটা এবার আপনার শোনা দরকার৷ আমি গুপ্তধনের খোঁজ পেয়েছি৷’
কর্নেল চমকে উঠলেন৷ ‘সে কী! কোথায়? কী ভাবে পেলে?’
‘বলব৷ একটা শর্তে৷’
‘কী শর্ত?’
‘কথা দিন, পাকিস্তানী গোয়েন্দা দফতরের অধিকর্তা এবং আপনার বন্ধু ওই কর্নেল কামাল খাঁ-কে বলে ফকির সায়েবের মুক্তির ব্যবস্থা করবেন!’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘চেষ্টা করতে পারি৷’
‘চেষ্টা নয়, করতেই হবে৷ কামাল খাঁ-র হাতে প্রচুর ক্ষমতা!’
‘ঠিক আছে৷ এবার বলো৷’
‘ফকির সায়েব যে গুহায় থাকেন এবং আমি যেখানে আশ্রয় পেয়েছিলুম, সেখানে একটা বেদি আছে৷ তার গায়ে অবিকল সেই ফলকের চিত্রলিপি খোদাই করা আছে৷’
কর্নেল অবাক হয়ে বললেন, ‘বলো কী জয়ন্ত!’
‘হ্যাঁ৷ গুহার পথ খুঁজে বের করা কঠিন৷ তাই গোপনে একটা চিহ্ন দিয়ে এসেছি৷’
কর্নেল গম্ভীর মুখে কিছু ভাবলেন, ‘তারপর বললেন তাহলে তো ফকিরসায়েব অর্থাৎ ডঃ আমেদ গপ্তধনের সন্ধান পেয়েই গিয়েছিলেন! অথচ... আশ্চর্য তো!’
‘কী আশ্চর্য!’
‘তবু উনি গুপ্তধন উদ্ধার করেননি কেন?’
‘হয়তো সংসারত্যাগী ফকির হয়েছেন এবং ডঃ আলুওয়ালাকে মেরে ফেলার পাপ হয়েছে বলে ভেবেই নির্লোভ থাকার সাধনা করেছেন৷ বলছিলেন, প্রায়শ্চিত্ত করছি৷’
‘হুম! তোমার কথায় যুক্তি আছে৷’
‘সেই স্বাভাবিক৷ তাই বেদির সামনে ওঁকে ধ্যানমগ্ন দেখেছি৷’
‘ঠিক, ঠিক...’ বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর একটু পায়চারি করে বললেন, ‘জয়ন্ত, আমি আসছি৷’
বেরিয়ে গেলেন কর্নেল৷ আমার শরীরের ব্যথাটা যায়নি৷ একটা পেনকিলার ট্যাবলেট খেয়ে নিলুম এবং শুয়ে পড়লুম৷ ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল৷...
দুপুরে লাঞ্চের সময় কর্নেল এসে আমাকে জাগালেন৷ তখন শরীর অনেকটা হালকা হয়েছে আমার৷
খাওয়াদাওয়া সেরে কর্নেল বললেন, ‘এখনই ডঃ করিম এবং কর্নেল কামাল খাঁ এসে পড়বেন৷ ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে সেই লারকানা যেতে হয়েছিল৷ তোমার কথামতো কর্নেল কামালকে অনুরোধ করেছি৷ সম্ভবত ফকিরসায়েব মুক্তি পাবেন৷ তুমি চিন্তা কোরো না৷ তৈরি হয়ে নাও৷’
পোষাক পরে ফেললুম ঝটপট৷ এবার গুলিভরা রিভলবারটা নিতে ভুল করলুম না৷ বললুম,‘দিনের আলো থাকতে-থাকতে পৌঁছানো দরকার৷ নইলে ফাটলের চিহ্নটা খুঁজেই পাব না৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘বোধ করি, তোমার চিহ্নের আর দরকার হবে না৷ কারণ ফকির সায়েবকে কর্নেল কামাল সঙ্গে আনার চেষ্টা করবেন৷ নিজের গোপন আস্তানা চিনতে ওঁর ভুল হবে না আশা করি৷’
আমার মনে যেটুকু গর্ব ছিল, মিইয়ে গেল৷ মনে মনে কামনা করলুম, ফকির সায়েব যেন কিছুতেই না আসেন৷ তাহলে আমাকেই সাধাসাধি করিয়ে ছাড়ব৷ এতকাল কর্নেল সব রহস্যের চাবিকাঠিটি নিজের হাতে রেখেছেন৷ এবার চাবিকাঠি আমি ভাগ্যক্রমে হাতিয়েছি৷ এমন মওকা ছাড়ব কেন?
কিছুক্ষণ পরে জিপের শব্দ হল বাইরে৷ আমরা বেরিয়ে গেলুম৷...
জিপে যেতে-যেতে ওঁদের যে আলোচনা হল, তাতে বুঝলুম কর্নেল কামাল খাঁয়ের বাহিনীটি বেশ বড়ো৷ একদল দুপুরে গিয়েই সেই শুকনো খাদের মাথায় ত্রিকোণ মাঠটা ঘিরে রেখেছে৷ পাথরের আড়ালে ওৎ পেতে সৈনিকেরা লক্ষ্যও রেখেছে৷ সৈনিকগুলো নাকি একেবারে কসাই৷ কিষাণচাঁদের দলের লোকদের পেলেই গলায় ছুরি চালিয়ে কোতল করবে৷ বেছে বেছে কাঠখোট্টা ধরণের হিংস্র পাঠানদেরই মোতায়েন করা হয়েছে৷ কাজেই কিষাণচাঁদ আর সুবিধে করতে পারবে না আজ৷ একেই বলে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা৷ আগের দিনে যেখানে জিপ রেখে আমরা খাদে নেমেছিলুম, সেইখানেই নামলুম৷ যেতে যেতে হঠাৎ চোখে পড়ল, খাদের ওপরে উঁচুতে পাথরের আড়ালে মিলিটারি পাঠান সাবমেশিনগান বাগিয়ে বসে আছে৷ এ যে প্রায় যুদ্ধের আয়োজন!
বুঝলুম, কর্নেল কামাল খাঁ কাল সন্ধ্যায় কিষাণচাঁদের দলের হাতে ঢিট খেয়ে ভারি রেগে গেছেন এবং আজ তার শোধটা ভালোমতোই তুলবেন৷
বেচারি আলুওয়ালার জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছিল৷ অধ্যাপক এবং পণ্ডিত মানুষ৷ অথচ গুপ্তধনের নেশায় পড়ে এমন সর্বনাশের পথে ছুটে বেড়াচ্ছেন কতদিন থেকে!
ব্রহ্মাবর্ত-রাজ হেহয়ের গুপ্তধন যে অভিশপ্ত, তাতে কোনো ভুল নেই৷ সেই অভিশাপের জন্যেই মানুষ হয়ে পড়েছে ষড়যন্ত্রী শয়তান৷
যাচ্ছি তো যাচ্ছি, খাদের যেন শেষ নেই৷ বাঁক ঘুরে পুবে এগিয়ে সেই গুহা৷ কিন্তু অবাক কাণ্ড, ঠিক সেই জায়গাটা আমি চিনতে পারছিনে কেন? কর্নেল বারবার জিগ্যেস করছেন৷ আমি বাঁ-দিকে খাড়া দেয়ালের মতো পাড়ে ফাটল খুঁজছি৷ এখানে কোথাও ফাটল নেই৷ তাহলে কি বেশি এগিয়ে এসেছি?
মনে পড়ছে, বাঁকের পরই বাঁ-দিকে ফাটল শুরু হবার কথা৷ অজস্র ফাটল পাথুরে পাড়ে তখন লক্ষ্য করেছিলুম৷ কিন্তু কই সেগুলো?
এবার কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, ‘জয়ন্ত সব গুলিয়ে ফেলেছে৷ তাহলে এবার আমরা নিজেদের বুদ্ধির ওপর ভরসা করে খুঁজি৷ কী বলেন ডঃ করিম?
ডঃ করিম বললেন, ‘অগত্যা তাই৷’
কর্নেল কামাল খাঁ আমাদের দেহরক্ষীর মতো দু’হাতে দুটো রিভলবার বাড়িয়ে সাবধানে চারদিক দেখতে দেখতে পিছনে আসছিলেন৷ বললেন, ‘কী হল?’
কর্নেল বললেন, ‘জয়ন্ত পথ হারিয়েছে৷’
একেই বলে পিলে-চমকানো হাসি৷ এক কর্নেলের কথা শুনে আরেক কর্নেল যা একখানা হাসলেন, এই খাদের মধ্যে যেন মেঘ ডাকল৷
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ও ডঃ করিম বালির দিকে ঝুঁকে বোধ করি আমারই সকালবেলার জুতোর ছাপগুলো খুঁজছেন৷ কিন্তু খাদের মধ্যে প্রবলবেগে বাতাস বইছে৷ শুকনো বালি উড়ছে৷ ছাপ ঢেকে গেছে স্বভাবত৷
হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল, গুহার ফাটল দিয়ে বেরিয়ে খাদের ওপারে প্রথমেই চোখে পড়েছিল একটা বিরাট লাল পাথর৷ এখানে কোথাও অমন লাল পাথর না থাকায় ওটা চোখে না পড়ে পারে না৷ কথাটা বললুম ওঁদের৷ ওঁরা খুঁজতে ব্যস্ত হলেন৷
আমি ডানদিকের পাড়ে পাথরগুলো ভালো করে দেখার জন্যে কর্নেলের কাছে বাইনোকুলার নিলুম৷ প্রথমে পিছনের দিকে অর্থাৎ যেদিক থেকে এসেছি, সেদিকে ডান পাড়টা খুঁটিয়ে দেখলুম৷ কোন লাল পাথর নেই কোথাও৷ অন্তত মাইলখানেক দূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷
তারপর সামনের দিকে ডানপাড় বরাবর লক্ষ্য করলুম৷ কিন্তু কোথায় গেল লাল পাথরটা? এ যে রীতিমতো রহস্যময় ব্যাপার! সামনে খাদ সোজা পুবে গিয়ে সিন্ধু নদে মিশেছে৷ পাথরের একটা প্রাকৃতিক বাঁধ দেখা যাচ্ছে শেষ সীমায়৷ তাই বর্ষায় এই খাদে নদের জল ঢোকার সুযোগ পায় না৷ তবে বৃষ্টির জল জমতে পারে৷ কিন্তু এই এলাকায় বৃষ্টি হয় না বললেই চলে৷ তাই জল জমলেও তার পরিমাণ সামান্য হওয়াই সম্ভব৷ বুঝতে পারলুম, এ-জন্যেই গুহাটা নিরাপদ রয়েছে৷ নইলে বর্ষায় জল ঢুকে যেত৷ ফকির সায়েবের পক্ষে ওখানে বাস করা সম্ভবই হত না৷
বাইনোকুলারে চোখ রেখেই এ-কথা ভাবছিলুম৷ হঠাৎ দেখলুম, আমাদের কাছেই ডান পাড়ে একটা পাথরের আড়ালে কালো রঙের কী একটা বসেছিল, সরে গেল৷ বললুম, ‘কর্নেল৷ নেকড়ে বাঘ নিশ্চয়ই! কালো না অথচ একটা কালো জন্তু দেখলুম যেন৷ এখানে কি ভালুক আছে?’
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন, ‘কোথায়, কোথায়?’
‘ওই যে ওখানে৷’
সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে উনি ওপর দিকটা তাক করে দু’হাতের রিভলবার থেকে এক ঝাঁক গুলি ছুঁড়ে বসলেন৷ প্রচন্ড প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল৷ তারপর তুলকালাম ঘটে গেল৷
আমাদের বাঁ-দিকের পাড়ে সেই ত্রিকোণ মাঠ অন্তত একশো ফুট উঁচুতে রয়েছে৷ সেখান থেকে পাঠান মিলিটারিরা গুলিবর্ষণ শুরু করে দিল৷ আমরা উপুড় হয়ে শুয়ে প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত হলুম৷ কর্নেল কামাল খাঁ রেগে আগুন হয়ে গেলেন৷ দুর্বোধ্য ভাষায় গালাগালি দিতে-দিতে যখন উঠলেন, তখন সাদা বালিতে মিলিটারি পোষাক ভূতের পোষাক হয়ে উঠেছে৷ তারপর বিকট চিৎকার করে মাতৃভাষায় কী বললেন৷
মুখ তুলে দেখি, পাড়ের উঁচুতে এক মিলিটারি পোষাকপরা মূর্তি দাঁত বের করে স্যালুট দিচ্ছে৷ পশ্চিম থেকে রোদ্দুর সোজা তার দাঁতে গিয়ে পড়েছে৷ সে এক দেখার জিনিস বটে!
বাকি তিনজনে বালি ঝাড়তে ঝাড়তে উঠলুম৷ হঠাৎ কর্নেল বলে উঠলেন, ‘জয়ন্ত, জয়ন্ত! ওই তোমার লাল পাথর৷’
ঘুরে দেখে আমি হতবাক৷ আশ্চর্য কাণ্ড, এতক্ষণ ধরে খুঁজছি—কোথাও ছিল না৷ হঠাৎ যেন আলাদিনের পিদিমের দৈত্যের মতো ওটা আমাদের নাকের ডগায় এসে ঠিক জায়গায় বসেছে৷ এই রহস্যের অর্থ কী?
কর্নেল গুম হয়ে যেন এ-কথাই ভাবছিলেন৷ তারপর ইউরেকা বলে চেঁচিয়ে ওঠার মতো বললেন, ‘বুঝেছি! বুঝেছি৷ ব্যাপারটা আর কিছু নয়—মোহেনজো-দাড়োর কাক৷’
‘কাক! তার মানে?’
‘ওই দেখো, কাকগুলো এখন তুমুল চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে পালিয়ে যাচ্ছে৷ আসলে ওই কাকগুলো লাল পাথরটা জুড়ে বসেছিল৷ তাই এতক্ষণ লাল রঙ ঢেকে গিয়েছিল৷ গুলির শব্দে ভয় পেয়ে পালাতেই লাল পাথরটা বেরিয়ে পড়েছে৷ শুনেছিলুম বটে কাকের কথা৷ সিন্ধুপ্রদেশে নাকি অসংখ্য কাকের উপদ্রব আছে৷ বিশেষ করে নাকি মোহেনজো-দাড়োতে কাকের উপদ্রবটা বেশি৷ এবার স্বচক্ষে দেখলুম৷’
বললুম, ‘কিন্তু লাল পাথরের বিপরীত দিকের ফাটল পাড়ে থাকার কথা৷ কিন্তু ফাটল নেই যে!’
কর্নেল বললেন, ‘হুম! ওই তো ফাটল৷ একটা কেন? সারিসারি কয়েক গজ অন্তর অজস্র ফাটল দেখতে পাচ্ছি৷’
এতক্ষণে গোলমালটা টের পেলুম৷ সকালে সূর্যের আলো পড়েছিল পশ্চিমের পাড়ে৷ এই পুবপাড়টা ছিল ছায়ায় ঢাকা৷ তাকালে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল ফাটলগুলো৷ কিন্তু সূর্য এখন পশ্চিমে রয়েছে৷ তার উজ্জ্বল কিরণ এসে পড়েছে পুব পাড়ের দেয়ালে৷ সোনালি রঙের পাথরে সেই আলো ঠিকরে গিয়ে বিভ্রম সৃষ্টি করেছে৷ দেয়ালটা মসৃণ বলেই রোদের প্রতিফলন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে৷
এবার খুঁটিয়ে প্রতিটি ফাটলের তলার দিকে আমার এঁকে রাখা সেই বর্গমূল চিহ্ন খুঁজতে শুরু করলুম৷ সাতটা ফাটলের পর যে ফাটলটা দেখলুম, তার তলায় চিহ্নটা দেখা গেল এবং আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলুম, ‘পাওয়া গেছে! পাওয়া গেছে!’
প্রথমে ঢুকলুম আমি৷ তার পিছনে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার৷ তার পিছনে ডঃ করিম৷ শেষে কর্নেল কামাল খাঁ৷
কর্নেল টর্চ জ্বেলে আমায় কাঁধের ওপর ধরে রেখেছেন৷
গোলকধাঁধার পথ এটা৷ বাঁকে-বাঁকে ন’টা সরু ফাটল দেখে গেছি৷ সেগুলো এড়িয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে গুহার মুখে পৌঁছনো গেল৷
ভেতরে সকালের মতো আলো নেই৷ যদিও ফাটল দিয়ে ওপরের আলো টের পাওয়া যাচ্ছে৷ কারণ সকালে সূর্য ছিল ওদিকেই৷ সোজা আলো এসে ঢুকছিল৷ এখন সূর্য পশ্চিমে চলে গেছে৷
বেদিতে পিদিম জ্বলছে না৷ দেখে কেমন খারাপ লাগল৷ ফকিরসায়েবের কম্বলটা ভাঁজ করে রাখা আছে৷ ওঁর ঝোলাটাও আছে৷ কর্নেল কামাল খাঁ ও-দুটো নিলেন৷ ডঃ করিম টর্চের আলোয় বেদির লিপিগুলো পরীক্ষা করে বললেন, ‘এই তাহলে সেই গুপ্তধন!’
কর্নেল সরকার বললেন, ‘বেদিটা ভাঙা উচিত নয়৷ সেটা একটা জঘন্য অপরাধই হবে৷ বরং পরীক্ষা করে দেখা যাক আগে৷’
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন, ‘আমার কাছে ট্রেঞ্চে খোঁড়ার ছোট্ট গাঁইতি আছে৷ দরকার হবে বলে এনেছি৷’
‘দেখছি৷’ বলে কর্নেল সরকার বেদির চারদিক খুঁচিয়ে দেখতে থাকলেন৷ তারপর ওপাশে গিয়ে দু’হাতে সিন্দুকের ডালা খোলার মতো হ্যাঁচকা টান দিলেন৷ বেদির ওপরটা নড়ে উঠল৷
ডঃ করিম বললেন, ‘এ কী! এ যে দেখছি একটা পাথরের সিন্দুক!’
সবাই মিলে হাত লাগিয়ে পাথরের ডালাটা সরানো হল৷ ভেতরে আলো ফেলতে দেখা গেল, কোনার দিকে দুটো বাঁকা ধূসর রঙের আট-ন ইঞ্চি মাপের চ্যাপ্টা কী জিনিস ছাড়া আর কিছু নেই৷
কর্নেল হাত বাড়িয়ে তুলতে গিয়ে বললেন, ‘গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে৷ ওঠানো যাবে না!’
বললুম, ‘কী ও দু’টো?’
‘সম্ভবত ঘোড়ার চোয়াল৷ প্রিয় ঘোড়ার মৃত্যু হলে প্রাগৈতিহাসিক যুগে তার দুটো চোয়াল যত্ন করে রাখা হত৷’
ডঃ করিম বললেন, ‘তাহলে রাজা হেহয়ের ঘোড়ার চোয়াল!’
‘তা ছাড়া আর কী!’ ... বলে কর্নেল হাত বাড়িয়ে কী একটা তুলে নিলেন৷ চোখের সামনে নাড়াচাড়া করে দেখে বললেন, ‘একটা ব্রোঞ্জের চাকতি৷ অ্যাসিডে পরিষ্কার করে দেখতে হবে এই সিলমোহরটা কার৷’
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন, ‘তাহলে গুপ্তধন নেই?’
‘সেই তো দেখছি৷ মনে হচ্ছে, কে কবে হাতিয়ে নিয়ে গেছে৷’ কর্নেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন৷ ‘কতকাল আগে নিয়ে গেছে, কে বলতে পারে!— হয়তো দু’হাজার বছর আগে—কিংবা তারও আগে৷ ভাই কামাল সায়েব! সব গুপ্তধনই এখন তাই নিছক কিংবদন্তীতে পরিণত৷’
আমরা গুহার মধ্যে হতবাক হয়ে বসে রইলুম৷ একটু পরে স্তব্ধতা ভেঙে ডঃ করিম বললেন,‘গুপ্তধন কী ছিল, জানি না৷ কিন্তু এ একটা বড়ো আবিষ্কার নয় কি কর্নেল সরকার? ব্রহ্মাবর্ত—রাজ হেহয়ের বাকি ইতিহাসটুকু পেয়ে গেলুম৷ এই পাথরের সিন্দুকই বিশ্বের পুরাতত্ত্বের ইতিহাসে সেরা একটি সম্পদ৷ আসলে এটাই একটা গুপ্তধন৷ দেশবিদেশে হিড়িক পড়ে যাবে৷ বিশেষ করে আপনাদের ভারতীয় পণ্ডিতরা এসেছেন৷ এই বিস্ময়কর আবিষ্কার দেখতে তাঁদের আমন্ত্রণ জানাব৷ ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায় এবার আলোকিত হয়ে উঠবে৷...’
হঠাৎ আমাদের পিছন থেকে কে জোরালো টর্চের আলো ফেলল৷ চোখ ধাঁধিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে৷ সে চীৎকার করে বলল, ‘একটু নড়লেই গুলি করব৷ যে যেভাবে আছ, চুপ করে বসে থাকো৷ আর টর্চ নেভাও৷’
ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা হতচকিত! আমাদের টর্চগুলো নিভে গেল৷
তারপর কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘ডঃ আলুওয়ালা! শুনে দুঃখিত হবেন যে গুপ্তধনের সিন্দুকটা একেবারে খালি৷ স্বচক্ষেই দেখুন৷ রাজ হেহয়ের ঘোড়ার চোয়াল দুটো ছাড়া আর কিছু নেই!’
‘মিথ্যা কথা! তোমরা গুপ্তধন বাগিয়ে লুকিয়ে ফেলেছ!’
‘না ডঃ আলুওয়ালা! আমরা...’
‘চুপ৷ এখনও বলছি, গুপ্তধন বের করো৷ নয়তো গুলি করে মারব!’
‘গুপ্তধন যদি সত্যি আমরা বাগিয়ে থাকি এবং আপনাকে তা দিই, তাহলেও তো আপনি আমাদের খুন করবেন ডঃ আলুওয়ালা৷ কারণ, আমাদের বাঁচিয়ে রাখলে আপনিই বিপদে পড়বেন৷’
শুনে আমার আত্মা খাঁচাছাড়া হবার উপক্রম৷ অথচ কর্নেল কী ঠান্ডা গলায় নির্বিকার মুখে কথা বলছেন!
ডঃ আলুওয়ালা জোরালো আলোর পিছনে রয়েছেন বলে ওঁকে দেখতে পাচ্ছি না৷ এবার হা হা করে হেসে বললেন, ‘ঠিকই বুঝেছ! তাহলে রেডি৷...’
হঠাৎ ওঁর পিছনে কাল রাতে শোনা সেই বিদঘুটে হাসি অথবা ঘোড়ার ডাক শোনা গেল—হিঁ—হিঁ—হিঁ—হিঁ—হিঁ—হিঁ!
তারপর কী একটা ঘটল! ডঃ আলুওয়ালার টর্চ ছিটকে পড়ল৷ হাতের রিভলবার থেকে গুহার মধ্যে কান ফাটানো আওয়াজে গুলি বেরুল৷ কয়েক মুহূর্ত অন্ধকারে ধস্তাধস্তির শব্দ শোনা গেল৷ গুহার ভেতর ততক্ষণে উগ্র দুর্গন্ধে ভরে গেছে৷
তারপর আমাদের টর্চগুলো জ্বলে উঠল৷ সেই আলোয় যা দেখলুম, গায়ের রক্ত ঠান্ডা হয়ে গেল৷ একটা কালো চামচিকের মতো মানুষজাতীয় প্রাণী ডঃ আলুওয়ালার বুকের ওপর বসে দু’হাতে গলা টিপে ধরেছে৷ ডাঃ আলুওয়ালার জিভ বেরিয়ে গেছে৷
কর্নেল কামাল খাঁ দু’হাতের দুটো রিভলবারেরই ঘোড়া টিপে দিলেন৷ প্রাণীটা একটা বিদঘুটে আর্তনাদ করে ছিটকে পড়ল৷ তারপর কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে গেল৷
আমরা হামাগুড়ি দিয়ে কাছে গেলুম৷ ডঃ আলুওয়ালাকে পরীক্ষা করে কর্নেল হতাশভাবে বললেন, ‘বেচারি মারা পড়েছেন! অতি লোভের পরিণাম!’
প্রাণীটাকে কর্নেল কামাল খাঁ ও ডঃ করিম পরীক্ষা করছিলেন৷ কর্নেল সরকার একটু ঝুঁকে দেখে নিয়ে বললেন, ‘এ কী! এ যে মানুষ!’
লারকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের একটি বিশাল সভাকক্ষে ভারতীয় পণ্ডিতদের সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল পরদিন সকাল দশটায়৷ একের পর এক দু’দেশের পণ্ডিতরা বক্তৃতা দিতে উঠে মোহেনজো-দাড়োতে নতুন এবং বিস্ময়কর প্রত্ন-আবিষ্কারের কথা বলছেন৷ প্রত্যেকেই কর্নেলবুড়ো এবং এই অধম সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর প্রশংসা করছেন৷ ডঃ আলুওয়ালার জন্য দুঃখ প্রকাশও করছেন৷
শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল৷ উসখুস করছি দেখে কর্নেল বললেন, ‘তোমাকেও বক্তৃতা দিতে হবে ডার্লিং! তৈরি হয়ে নাও৷’
‘পাগল, না মাথাখারাপ! আমি ওতে নেই৷ এক্ষুনি কেটে পড়ছি৷’
উঠতে যাচ্ছি, ডঃ করিম ঘোষণা করলেন, ‘এবার ভারতীয় সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরীর মুখে এই রোমহর্ষক আবিষ্কারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শুনবেন আপনারা৷ মিঃ চৌধুরী কলকাতার প্রখ্যাত পত্রিকা দৈনিক সত্যসেবকের স্পেশাল রিপোর্টার৷’
কী আর করি, অগত্যা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সংক্ষেপে দায়সারা কাহিনি শোনালুম৷ তারপর আসনের উদ্দেশে এগোলুম৷ মুহুর্মুহু করতালি চারদিকে৷ আমি তো একেবারে ঘাবড়ে গেছি৷
গিয়ে দেখি, কর্নেলের আসন শূন্য৷ এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওঁকে খুঁজলুম৷ তারপর দেখি, দরজার পাশে উঁকি মেরে চোখের ইশারায় আমাকে ডাকছেন৷
কাছে যেতে যেতে শুনি, সভাপতি ডঃ করিম ঘোষণা করছেন, ‘এবার আমি প্রখ্যাত প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারকে অনুরোধ করছি...’
বাইরে গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘এসো কেটে পড়া যাক৷’
বললুম, ‘আপনি অদ্ভুত মানুষ তো! এটা অভদ্রতা হচ্ছে না? আপনাকে তাঁরা বক্তৃতা দিতে ডাকছেন আর আপনি কেটে পড়ছেন?’
কর্নেল জবাব না দিয়ে হনহন করে লন পেরিয়ে চললেন৷ আমার খুব রাগ হল৷ মাঝে মাঝে বুড়োর মাথায় যেন ভূত চাপে৷ এমন একটা জ্ঞানীগুণীর সমাবেশ ছেড়ে এবং রীতিমতো অভদ্রতা দেখিয়ে চলে গেলেন! এতে ভারতেরই মাথা কি হেঁট হচ্ছে না? কারণ উনি একজন ভারতীয় প্রতিনিধি!
দেশের সম্মান বাঁচাতে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল৷ এখনই সভামঞ্চে গিয়ে জানিয়ে দেব, কর্নেল সরকার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন৷ তাই তিনি ভাষণ দিতে পারছেন না৷
কিন্তু হলে ঢুকেই আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল!
মঞ্চে অবিকল কর্নেলের মতোই দাড়ি ও টাকওয়ালা এক কৃষ্ণ ভদ্রলোক সবে মাইকের সামনে দাঁড়িয়েছেন এবং সবিনয়ে ঘোষণা করছেন, ‘অধমের নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার...’
আমি কি স্বপ্ন দেখছি? আসল কর্নেল থাকতে নকল কর্নেল কেন রে বাবা? ডঃ করিম এবং আরও অনেকে তো আসল কর্নেলকে চেনেন৷ এমন কি এই দু-তিনদিন ধরে ওঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়ালেন৷ অথচ একজন উটকো লোক উঠে গিয়ে কর্নেল সেজে মঞ্চে ভাষণ দিচ্ছে!
আমি হতভম্ব হয়ে সামনের দিকে সাংবাদিকদের জায়গায় আমার নির্দিষ্ট আসনে বসতে গেছি, সেই সময় আচম্বিতে একটা তুলকালাম শুরু হয়ে গেল৷
প্রথমে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হল৷ তারপর দেখলুম, নকল কর্নেল মাইকের সামনে উঁচু ডেস্কটার তলায় ঢুকে পড়লেন৷
তারপর চেঁচামেচি, হুড়োহুড়ি তাণ্ডব চলতে থাকল৷ মিলিটারি সেপাইদের মঞ্চ ঘিরে ফেলতে দেখলুম৷ ওরে বাবা! পাকিস্তানে কি আবার মিলিটারি বিপ্লব হচ্ছে তাহলে?
মঞ্চে কর্নেল কামাল খাঁ-কে দেখলুম৷ দু’হাতে দুটো রিভলবার নিয়ে হেঁড়ে গলায় গর্জন করলেন, ‘যে-যেখানে আছেন, চুপচাপ বসে পড়ুন! আমরা আততায়ীকে পাকড়াও করেছি৷’
এই সময় আমার বাঁ-দিকের দরজার কাছে দেখতে পেলুম, সেপাইরা একটা লোককে টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছে৷ লোকটাকে আমার চেনা মনে হল৷ ওঃ হো! একেই তো সেদিন পার্কে ডঃ আলুওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলুম৷ সভা এবার অনেকটা শান্ত হয়েছে৷ যারা হুড়মুড় করে বেরিয়ে গিয়েছিল, তারা অনেকে ফিরে এসে আসনে বসছে৷ বুঝলুম, এ দেশে এমন কাণ্ড যেন লোকের গা-সওয়া৷
কিন্তু ততক্ষণে আমি ব্যাপারটা ধরতে পেরেছি৷
গোয়েন্দা দফতর আগে ভাগে টের পেয়েছিল, কর্নেল মঞ্চে উঠলেই গুপ্তঘাতকের পাল্লায় পড়বেন৷ তাই নকল কর্নেল সাজিয়ে গোপনসূত্রে পাওয়া খবরের সত্যতা যাচাই করতে চেয়েছিল৷ বলাই বাহুল্য, সত্যিকার কর্নেলকে মঞ্চে হাজির করে ঝুঁকি নিতে চায়নি৷ কিন্তু বলিহারি সাহস ওই নকল কর্নেল ভদ্রলোকের৷ যদি গুলিটা লাগত!
আমি আর বসে থাকতে পারলুম না৷ তক্ষুনি ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে পড়লুম৷ বাইরে কোথাও কর্নেলকে দেখতে পেলুম না৷
তখন একটা ট্যাক্সি ডেকে সটান হোটেলে চলে গেলুম৷ ইন্টারলকিং সিসটেমের দরজা লক করা আছে৷ চাবি দিয়ে খুললুম৷ হ্যাঁ, বুড়ো ঘরেই আছেন৷ তবে চুপচাপ বসে নেই৷ টেবিলে সেই গুহার সিন্দুকে পাওয়া চাকতিটা ঘষামাজা করছেন৷ দুটো বেঁটে শিশিতে সাদা ও রঙিন তরল পদার্থ রয়েছে৷ একটা ছোট্ট ব্রাশ দিয়ে ব্রোঞ্জের চাকতিটা পরিষ্কার করছেন কর্নেল৷
ঘরে ঢুকেই রুদ্ধশ্বাসে যা ঘটেছে বললুম৷ শুনে কর্নেল একটু হাসলেন৷ বললেন, ‘কিষাণচাঁদ ওরফে ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী সহজে ছাড়বে না৷ এবার মরিয়া হয়ে উঠেছে৷’
অবাক হয়ে বললুম, ‘কেন? গুপ্তধনের সিন্দুক তো খালি! মিছিমিছি আর কেন সে ঝামেলা করতে চাইছে?’
কর্নেল চাকতিটা দেখিয়ে বললেন, ‘জয়ন্ত, ভেবেছিলুম রাজা হেহয়ের গুপ্তধন-রহস্যের পর্দা এতদিনে তুলতে পেরেছি৷ কিন্তু তার বদলে দেখেছি, রহস্য আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল৷’
‘বলেন কী!’
‘এই চাকতিটা লক্ষ্য করো৷ একটা ফুটো দেখতে পাচ্ছ৷ তাই না? আমার ধারণা, ব্রোঞ্জের এই চাকতি বা সিলমোহরটা রাজা হেহয়ের ঘোড়ার কপালে ঝোলানো ছিল৷ চাকতির হরফগুলোর পাঠোদ্ধার করা পণ্ডিতদের কাজ৷ কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ব্রোঞ্জের ফলকটা বা পাথরের সিন্দুকের গায়ে যে-চিত্রলিপি আমরা দেখেছি, এগুলো সেই ঢঙের চিত্রলিপি নয়৷ তুমি এই আতসকাচের মধ্যে দিয়ে দেখতে পারো৷ এ কিছুতেই সিন্ধু-সভ্যতার চিত্রলিপি নয়৷ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের৷’
আতসকাচের সাহায্যে রোজের চাকতিটা দেখতে থাকলুম৷ হ্যাঁ, কর্নেল যা বলেছেন, তাই বটে৷

‘এই চাকতির মধ্যে দণ্ডধারী পুরুষটি নিশ্চয়ই রাজা৷ ব্রহ্মাবর্তের রাজা হেহয়৷ কী বলেন কর্নেল?’
কর্নেল হেসে বললেন, ‘ব্যস! তাহলে তুমি তো পাঠোদ্ধার করেই ফেলেছ দেখছি! তোমাকে পণ্ডিতরা এবার বিদ্যাদিগগজ বাচস্পতি উপাধি দেবেন, জয়ন্ত! নাকি বিদ্যার্ণব বিদ্যাবাগীশ গোছের কিছু চাই তোমার?’
ক্ষুব্ধ হয়ে বললুম, ‘এটা একটা রামছাগলকে দেখান৷ বলবে, এই মূর্তিটা একজন রাজার৷ রাজার হাতে রাজদণ্ড থাকে না?’
‘কে জানে!’ বলে কর্নেল অন্যমনস্কভাবে ঘড়ি দেখলেন৷ তারপর হাই তুলে বললেন, ‘ডঃ করিম আসা অব্দি অপেক্ষা করব আমরা৷ তারপর বেরুব৷’
‘কোথায় বেরুবেন? আবার ওই ঘোড়া ভূতের আড্ডায় নাকি?’
‘হুম৷ কিন্তু তুমি ওকে এখনও ঘোড়াভূত বলছ কেন জয়ন্ত? বেচারি আসলে তো একজন মানুষ৷ রাজা হেহয়ের গুপ্তধনের লোভে এ-পর্যন্ত কত মানুষ যে অমনি পাগল হয়ে গেছে, তার সংখ্যা নেই৷ এই হতভাগ্যের পরিচয় আর জানা সম্ভব নয়৷ শুধু এইটুকুই বলতে পারি, সে পাগল হয়ে যাবার পর ওই এলাকার কোনো একটা গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল৷ অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে জীবন ধারণ করছিল৷ আর শেষপর্যন্ত নিজেকেই ভেবেছিল, রাজা হেহয়ের সেই ঘোড়া৷’
‘কিন্তু ওর গায়ের রঙ এত কালো হল কীভাবে?’
‘যে গুহায় ও ছিল, সম্ভবত সেই গুহায় কালো ছাই ভর্তি রয়েছে৷ কিসের ছাই, তাও এখানে ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছে৷ শুনলে অবাক হবে, কারবন-১৪ নামে একরকম আধুনিক পরীক্ষা পদ্ধতি আছে৷ তাতে প্রায় নিখুঁত হিসেব করে বলা যায়, জিনিসটি কত বছরের পুরনো৷ জানা গেছে, লোকটার গায়ে যে ছাই লেগে আছে, তা আজ থেকে প্রায় পাঁচহাজার বছর আগের কাঠ পোড়ানো ছাই৷’
‘বলেন কী! তাহলে মোহেনজো-দাড়োতে যখন মানুষ বাস করত, তখনকার ছাই!’
‘হ্যাঁ জয়ন্ত৷ তখনকারই৷’
‘কিন্তু গুহার মধ্যে কাঠ পুড়িয়েছিল কেন?’
‘সম্ভবত ওটা ছিল মোহেনজো-দাড়োবাসীদের শ্মশান৷’
‘গুহার মধ্যে শ্মশান! কেন?’
‘জয়ন্ত, সব দেশেই প্রাগৈতিহাসিক কালে গোপনে মৃতদেহের সৎকার করার প্রথা ছিল৷ সর্বত্র এর প্রমাণ পাওয়া গেছে৷ লোকে বিশ্বাস করত, মৃতদের আত্মা শান্তিতে থাকতে চায়৷ তাই এমন নির্জন জায়গায় তাদের শেষকৃত্য করা হত—যাতে কোনোক্রমেই জীবিত মানুষদের জীবনযাত্রার কোনো আওয়াজ তাদের কানে না পৌঁছয়৷ নইলে তাদের শান্তির ঘুম ভেঙে যাবে এবং বিরক্ত হয়ে জীবিতদের ক্ষতি করতে থাকবে৷ বুঝলে তো?’
‘বুঝলুম৷ এবং এও বুঝলুম, আপনি সেই শ্মশানগুহা আবিষ্কার না করে ছাড়বেন না৷ কিন্তু একটু আগে সম্বর্ধনা সভায় যা ঘটল, তাতে কি আপনার একটুও ভয় হচ্ছে না?’
কর্নেল মিটিমিটি হেসে শুধু মাথা দোলালেন৷
‘কিষাণচাঁদ ডাকুর হাতে নির্ঘাৎ এবার প্রাণটি খোয়াবেন দেখছি৷’
‘তুমি কি খুব ভয় পেয়েছ, ডার্লিং?’
‘আলবাৎ পেয়েছি৷ সবসময় আমার বুকে ভূমিকম্প হচ্ছে!’
কর্নেল হো হো করে হেসে উঠলেন৷ ‘তত ভয়ের কারণ নেই জয়ন্ত৷ আমার বন্ধু কর্নেল কামাল খাঁ অতি ধুরন্ধর গোয়েন্দাসর্দার৷ কিষাণচাঁদের দলেও ওঁর এজেন্ট রয়েছে৷ কাজেই নিশ্চিন্তে গোঁফে তা দাও৷’
‘আমার গোঁফই নেই৷’
‘গোঁফ রাখতে শুরু করো৷’ ... বলে কর্নেল ফোনের দিকে হাত বাড়ালেন৷ ফোন বাজছিল৷ কাকে কী জবাব দিয়ে বললেন, ‘ডঃ করিম এবং আমাদের প্রতিনিধিদলের নেতা ডঃ তিড়কে এসে গেছেন৷’
একটু পরেই ওঁরা দু’জনে ঘরে ঢুকলেন৷ ডঃ তিড়কে কর্নেলের বয়সী৷ মস্ত গোঁফ আছে৷ লম্বা ঢ্যাঙা রোগাটে গড়নের মানুষ৷ একটু কুঁজোও৷ তিনজনে টেবিল ঘিরে বসে চাকতিটা দেখতে ব্যস্ত হলেন৷ আমি কর্নেলের নির্দেশমতো কফির অর্ডার দিলুম ফোনে৷ ঘড়িতে এখন বাজছে দুপুর বারোটা৷ লাঞ্চ সেই একটায়৷
একটু পরে প্রথমে মুখ খুললেন ডঃ তিড়কে৷ ‘এটা হিটাইট চিত্রলিপি মনে হচ্ছে৷’
ডঃ করিম বললেন, ‘হ্যাঁ, আমারও তাই ধারণা৷’
কর্নেল বললেন, ‘হিটাইট? পশ্চিম-এশিয়াবাসী আর্যদের একটা শাখা ছিল ওরা৷ তাই না?’ ডঃ তিড়কে বললেন, ‘হ্যাঁ, কর্নেল সরকার৷ হিটাইটরাও আর্য জনগোষ্ঠিভুক্ত ছিল৷ প্রথমে ওরাও বর্বর পশুপালক ছিল৷ অনেক প্রাচীন কৃষিকেন্দ্রিক নগর-সভ্যতা ওরা ধ্বংস করেছিল৷ পরে ওরা ক্রমশ সভ্য হয়ে ওঠে৷ বাইবেলেও ওদের কথা আছে৷ সিরিয়ায় ওদের অনেক ফলক ও শিলমোহর পাওয়া গেছে৷’
ডঃ করিম বললেন, ‘হিটাইটরা নিজেদের দেশকে বলত হাট্টি বা হত্তি৷’
কর্নেল বললেন, ‘কিন্তু হিটাইট ভাষায় লেখা এই চাকতি রাজা হেহয়ের ঘোড়ার মাথায় ঝোলানো ছিল কেন? হেহয়কে তো উত্তর ভারতের ব্রহ্মাবর্ত রাজ্যের লোক বলা হয়৷ কোথায় সিরিয়া, কোথায় উত্তর ভারত!’
ডঃ তিড়কে একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘বড্ড গোলমেলে ব্যাপার, তা সত্যি৷ এই চাকতিতে কী লেখা আছে না জানা পর্যন্ত রহস্যভেদ করা যাচ্ছে না৷ ডঃ করিম, চলুন বরং আপনার স্টাডিতে গিয়ে দু’জনে কিছুক্ষণ মাথা ঘামানো যাক৷ হিটাইট লিপির পাঠোদ্ধার তো জার্মান পণ্ডিত হেলমুথ থিওডোর বোসার্ট ১৯৪৬ সালে করে ফেলেছেন৷ কাজেই সেই সূত্র ধরে এগোলে আমরাও নিশ্চয়ই চাকতির লেখাগুলো পড়ে ফেলতে পারব৷’
ডঃ করিম বললেন, ‘কর্নেল সরকারকেও আমন্ত্রণ জানাচ্ছি৷’
কর্নেল সবিনয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘ক্ষমা করবেন ডঃ করিম৷ আপনাদের কাজের সময় এই অপণ্ডিত মহামূর্খের উপস্থিতি অনেক বিঘ্ন ঘটাবে৷ আপনারা অনুগ্রহ করে সময়মতো জানাবেন, চাকতিতে কী লেখা আছে৷ ব্যস, তাহলেই যথেষ্ট৷’
চাকতি নিয়ে ওঁরা চলে গেলেন৷ দরজা লক করে এসে কর্নেল বললেন, ‘জয়ন্ত আশা করি, বুঝতে পেরেছ যে রাজা হেহয়ের গুপ্তধনরহস্য কেন ঘনীভূত হয়েছে?’
মাথা দুলিয়ে বললুম, ‘কিচ্ছু বুঝিনি৷’
‘যে সিন্দুকটা আমরা গুপ্তধনের আধার বলে ভেবেছি, ওটা আসলে মৃত ঘোড়ার চোয়াল সংরক্ষণের জন্য প্রাচীন প্রথ্য অনুসারে তৈরি একটা পাথরের সিন্দুক৷...’ কর্নেল ছাত্রকে বোঝানোর ভঙ্গীতে বলতে থাকলেন৷... ‘একটা ব্যাপার গোড়াতেই আমাদের বুঝতে ভুল হয়েছিল৷ ব্রহ্মাবর্তরাজ হেহয়ের মাতৃভাষা কিছুতেই সিন্ধুভাষা ছিল না—হতেই পারে না৷ তিনি এখানে বিদেশি মাত্র৷ যদি গুপ্তধনের সংকেত তিনি ফলকে লিপিবদ্ধ করেন, তাহলে মাতৃভাষাতেই করা স্বাভাবিক ছিল৷ কাজেই এটা মোটেই রাজা হেহয়ের লিপি নয়৷ নিশ্চয়ই অন্য কারুর৷ তিনি স্থানীয় লিপিকরকে দিয়ে মোহেনজো-দাড়োর ভাষায় লিখিয়ে নিয়েছিলেন, তাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না৷ কারণ তাতে দ্বিতীয় একজন গুপ্তধনের হদিশ পেয়ে যাবে৷ কোনো বুদ্ধিমান মানুষ এটা করবেন না৷’
‘তাহলে?’
‘এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে৷ কোনো মোহেনজো-দাড়োবাসী সন্দেহবশে রাজা হেহয়ের পিছু নিয়েছিল এবং সে যা দেখেছিল, তা একটা ব্রোঞ্জের ফলকে লিপিবদ্ধ করেছিল৷ এবার এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ডঃ ভট্টাচার্যের অনুবাদটা পড়া যাক৷ কী দাঁড়াচ্ছে শোনো:
‘আমি দেখেছি: ... সৌর বর্ষের ষষ্ঠ মাসে চাঁদের প্রথম তিথিতে একজন লোক একটা ঘোড়া নিয়ে সিন্ধুনদের তীরে ত্রিকোণ ভূমিতে উপস্থিত হল৷ ঘোড়ার পিঠে একটা বাকসো ছিল৷ সে বাকসোটা শস্যক্ষেত্রের সীমানায় একটি বৃক্ষের নীচে পুঁতে রাখল৷’
বললুম, ‘আমি দেখেছি-টা কোথায় পাচ্ছেন?’
কর্নেল হতাশভঙ্গিতে বললেন, ‘তাহলে সব প্রাচীন লিপির ইতিহাস তোমাকে শোনাতে হয়৷ আপাতত সে-সময় হাতে নেই৷ শুধু জেনে রাখো, সব প্রাগৈতিহাসিক ফলক বা শিলালিপি বা শিলমোহরে যা কিছু লেখা আছে, সবের গোড়ায় ধরে নিতে হবে, কেউ কিছু বলছেন কিংবা ঘোষণা করছেন৷ অর্থাৎ প্রত্যেকটি লেখা ব্যক্তিগত উক্তি৷ আজকালকার মতো নৈব্যক্তিক নয়৷ কোনো পুরোহিত বা কোনো রাজা বা কেউ না কেউ কিছু স্থায়ীভাবে অন্যান্য মানুষকে জানাতেই ওগুলো লিখেছেন৷ নিজে না লিখুন, লিপিকারকে দিয়ে লিখিয়েছিলেন৷ কাজেই সব লেখার গোড়ায় ‘আমি দেখেছি’ বা ‘আমি বলছি’ এই কথাটা ধরে নিতেই হবে৷ এই ফলকে একটা ঘটনার কথা লেখা রয়েছে৷ কাজেই...’
বাধা দিয়ে বললুম, ‘বেশ, তাই৷ তাহলে পাথরের বাকসেও অবিকল একই লেখা এল কী ভাবে?’
‘এর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়৷ সে লোভ সামলাতে না পেরে রাজা হেহয় এবং তার ঘোড়াটিকেও হত্যা করেছিল৷ তারপর তখনকার প্রথা অনুসারে পালিত পশু হিসাবে ঘোড়ার চোয়াল একটা পাথরের সিন্দুকে ভরে ওই গৃহায় সমাধিস্থ করেছিল৷ ঘোড়ার মাথায় ঝোলানো শিলমোহর বা চাকতিটাও সিন্দুকে রেখে দিয়েছিল৷ কারণ ওটা ঘোড়াটারই একটা সাজ৷’
‘কিন্তু গুপ্তধন?’
‘বলছি৷ পাথরের সিন্দুকের গায়েও একই কথা লিখে রাখার কারণ : নিজের জীবনে যে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল, তার একটা বিবরণ আরও স্থায়ীভাবে রেখে যেতে চেয়েছিল সে৷ এবার গুপ্তধনের প্রসঙ্গে আসি৷ আমরা দুটো লেখাতেই কিন্তু এমন কোনো আভাস পাচ্ছি না, যাতে নিশ্চয় করে বলা যায় ঘোড়ার পিঠে সোনাদানা হীরাজহরত ছিল৷ একটা বাকসোজাতীয় জিনিস চিত্রলিপির ঘোড়ার পিঠে দেখছি এবং তিনটে ডালওয়ালা গাছের তলাতেও শুধু সেই বাকসোই দেখছি৷ একই চৌকোনা জিনিস এবং মধ্যিখানে একটা বিন্দুচিহ্ন৷’
‘তাহলে কী এমন অমূল্য জিনিস ছিল বাকসে, যা রাজা হেহয় কাকেও জানতে দিতে চাননি?’
‘বোঝা যাচ্ছে না৷ শুধু এইটুকু বুঝতে পারছি মোহেনজো-দাড়োবাসী লোভী ও খুনে লোকটি বাকসোর মধ্যে হীরে জহরত সোনাদানা না পেয়ে নিরাশ হয়ে কিংবা পাপবোধে অনুতপ্ত হয়েই ঘটনাটা লিখে রেখেছিল৷’
‘ভ্যাট! আরও গোলমাল হয়ে গেল সব৷ তিব্বতী মঠের পুঁথিতে বলা হয়েছে নাকি, রাজা হেহয় ধনরত্ন নিয়েই আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে৷’
‘তিব্বতী মঠের সাধুরাও কি ওই লোকটির মতো ভুল করতে পারে না?’
‘হ্যাঁ৷ তা অবশ্য ঠিকই৷’
এই সময় ফের ফোন বাজল৷ কর্নেল ফোন তুলে কী শুনে নিয়ে বললেন, ‘অলরাইট৷ উই আর রেডি৷’ তারপর ফোন রেখে বললেন, ‘জয়ন্ত, লাঞ্চের আয়োজন করা হয়েছে৷ তৈরি হয়ে নাও৷’
বিকেলে আমরা আবার চলেছি মোহেনজো-দাড়োর দিকে৷ এবার সঙ্গে রীতিমতো মিলিটারি কনভয়৷ চারটে ট্রাকভর্তি মিলিটারি সামনে ও পিছনে যেন আমাদের জিপটাকে গার্ড দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে৷ এ তো দেখছি ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে যাওয়ার মতো৷ আমার অস্বস্তি বেড়ে যাচ্ছিল৷
আমাদের জিপে আছেন আজ পাঁচজন৷ কর্নেল, আমি এবং ডঃ তিড়কে বসেছি পেছনে৷ কর্নেল কামাল খাঁ জিপ চালাচ্ছেন৷ তাঁর পাশে বসেছেন ডঃ করিম৷ বুঝতে পারছি, ভারতীয় প্রতিনিধিদের নিরাপত্তার কড়া আয়োজন করা হয়েছে৷
ভারতের অন্যান্য প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা আজ মোহেনজো-দাড়োর সাত মাইল দূরে একটা বৌদ্ধ স্তূপ দেখতে গেছেন৷ সহকারী নেতা ডঃ দীনবন্ধু আচার্য তাঁদের নেতা হয়েছেন৷ কারণ মূল নেতা ডঃ তিড়কে আমাদের সঙ্গে এসেছেন৷
মোহেনজো-দাড়োর কাছাকাছি এসে আমাদের জিপ একটা এবড়ো-খেবড়ো বাজে রাস্তার দক্ষিণে এগোল৷ বাঁ-দিকে অজস্র ন্যাড়া টিলার আড়ালে সিন্ধু নদ দেখা যাচ্ছে মাঝেমাঝে৷ ডানদিকে রুক্ষ ধু-ধু মরুভূমি বলাই চলে—বালি, পাথর আর কঠিন মাটির দেশ৷ ছোটো-ছোটো কাঁটাগাছ আর ক্কচিৎ ঝোপঝাড় আছে৷ সেইসব ক্ষয়াখর্বুটে ঝোপের পাতা মুড়িয়ে খাচ্ছে মস্তো-মস্তো ছাগল আর তাগড়াই গড়নের ‘দুম্বা’ নামে এক জাতের ভেড়া৷ কোথাও উটের পিঠে জিনিসপত্র চাপিয়ে দড়ি ধরে আস্তে-সুস্থে চলেছে কোনো মানুষ৷ মাথায় প্রকাণ্ড পাগড়ি, হাতে একটা লম্বা বর্শা৷ একখানে জিপসীদের ছোটোখাটো একটা দলকে দেখলুম, তাঁবু পেতে রান্নাবান্না করছে৷ ওখানে একটা কুয়ো আছে৷ একদল ছাগল-ভেড়াকে লাইন দিয়ে চৌবাচ্চা থেকে জল খাওয়াচ্ছে রাখালরা৷ জিপসী মেয়েরা চাকা ঘুরিয়ে জল তুলছে আর অকারণে হাসাহাসি করছে৷ আমাদের মিলিটারি গাড়িগুলো দেখে কিছুক্ষণ যেন ওরা সবাই ভয় পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল৷
এবার সত্যি বলতে কী কোনো পথই নেই৷ অসমতল প্রান্তর ও বালিয়াড়ি পেরিয়ে কনভয় চলেছে৷ ধুলোর মেঘ চলেছে আমাদের সঙ্গে৷ দম আটকানো অবস্থা৷
কর্নেল ও ডঃ তিড়কে চাপা-গলায় কীসব আলোচনা করছেন৷ মাঝে মাঝে পিছু ফিরে সামনের সিট থেকে ডাঃ করিমও তাতে যোগ দিচ্ছেন৷ কিছু বুঝতে পারছি না—শুধু ‘হিটাইট’ শব্দটা বাদে৷
এদিকে ধূলোয় ধূসর হয়ে গেছি সবাই৷ বড্ড বিরক্তিকর লাগছিল যাত্রাটা৷ এক সময় কর্নেলের উদ্দেশে না বলে পারলুম না, ‘আর কতদূর?’
সামনে থেকে ডঃ করিম জবাব দিলেন, ‘এসে পড়েছি৷’
সামনে বাঁ-দিকে সিন্ধু নদ দেখা যাচ্ছিল৷ ঘড়িতে তখন ছ’টা বাজে৷ সূর্য অস্ত যেতে এখনও ঘণ্টাখানেক দেরি আছে৷ কিন্তু এবার আর ধুলো নেই৷ মাটি শক্ত৷ হলদে ঘাসের চাবড়া গজিয়েছে৷ তারপর একটা-দুটো করে গাছও নজরে পড়তে থাকল৷ আমরা সিন্ধুনদের প্রায় কিনারা ধরে চলেছি এখন৷
কোথাও কোনো বসতি দেখতে পেলুম না৷ তবে আরও দূরে দক্ষিণে দিগন্তের কাছে সবুজ রঙ দেখতে পেয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘ওটা কী?’
ডঃ করিম বললেন, ‘ওটা সেচ এলাকা৷ ওখানে সরকারী কৃষিক্ষেত্র আছে৷’
বাঁয়ে অনেকগুলো টিলা সিন্ধুনদের ধারে সার বেঁধে চলে গেছে সবুজ কৃষিক্ষেত্রের দিকে৷ ডাইনেও তেমনই টিলার সারি আছে৷ এখানে অজস্র কাঁটাগুল্মের জঙ্গল গজিয়ে রয়েছে৷ আর তার মধ্যে-মধ্যে একটা করে চ্যাপ্টা পাথর পোঁতা আছে দেখলুম৷ জিগ্যেস করে জানা গেল, ওগুলো কোনো যুগের গোরস্থান৷ প্রাগৈতিহাসিক যুগের তো বটেই৷ ওই পাথরগুলো নাকি এই এলাকার এক আদিবাসী জনগোষ্ঠির কাছে খুব পবিত্র৷ তারা প্রতিবছর শীতের শুরুতে এসে ওখানে পুজো আচ্চা করে৷ ভেড়া বলি দেয়৷ মেলা বসে তখন৷ অনেক পর্যটকও দেখতে আসে৷ শুনলুম, জায়গাটার নাম দুহালা৷ নামটা অদ্ভুত লাগল৷ কতকটা বাংলা-বাংলা নাম যেন!
এখানেই আমাদের কনভয় থামল৷ আমরা জিপ থেকে নামলুম৷ কর্নেল কামাল খাঁ মিলিটারি সেপাইদের দুর্বোধ্য ভাষায় কী সব আদেশ দিলেন৷ তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সিন্ধুনদের ধারে টিলাগুলোর দিকে চলে গেল৷ জনকয় সেপাই সাবমেশিনগান নিয়ে পাহারায় রইল গাড়িগুলোর কাছে৷
ফ্লাস্কে আনা চা খাওয়া হল ঘাসে বসে৷ আলোচনা শুরু হল তার ফাঁকে-ফাঁকে৷ সামনে একটা ম্যাপও রাখা হল৷ ওঁরা ঝুঁকে পড়লেন ম্যাপটার দিকে৷ আমি মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছি না৷
একসময় অধৈর্য হয়ে উঠে দাঁড়ালুম৷ সেই প্রাগৈতিহাসিক গোরস্থানে গিয়ে চ্যাপ্টা পাথরগুলো দেখতে থাকলুম৷ প্রতিটি পাথর মাটির ওপর অন্তত ছ’সাতফুট লম্বা৷ তার গায়ে দুর্বোধ্য কী যেন লেখা আছে৷
হঠাৎ মনে পড়ে গেল, পূর্বভারতে মেঘালয় এলাকায় এমন অনেক গোরস্থান দেখেছিলুম বটে৷ শিলঙ থেকে চেরাপুঞ্জি যাবার পথে একটা দেখেছি৷ আরও নানা জায়গায়৷ ওগুলো খাসি জাতির লোকদের কাছে খুব পবিত্র৷ ওরাও পূজা-আচ্চা করে সেখানে গিয়ে৷
আমার পিছনে জুতোর শব্দ হচ্ছিল৷ ঘুরে দেখি, আমার বৃদ্ধ বন্ধুটি আসছেন৷ মুখে মিটিমিটি হাসি৷ ‘হ্যাল্লো ক্ষুদে পণ্ডিত৷ নতুন কিছু আবিষ্কার করলে নাকি?’
‘চেষ্টা করছি৷’
‘কিন্তু সাবধান, এখানে বিস্তর ভূত আছে৷ ঘাড় মটকে দেবে৷’
বুড়োয় কথায় না হেসে পারা যায় না৷ হাসতে-হাসতে বললুম, ‘আপনারা কি সেইসব ভূতের সঙ্গে লড়াই করতে সেপাইশাস্ত্রী গোলাগুলি নিয়ে এসেছেন?’
‘তুমি ঠিকই ধরেছ, জয়ন্ত৷’
‘আর কিষাণচাঁদ ডাকু বুঝি ওদেরই সর্দার?’
‘বাঃ! তাহলে তোমার বুদ্ধি খুলে গেছে৷’
‘কিন্তু কর্নেল, আগেভাগে বলে দিচ্ছি, ওসব গোলাগুলির মধ্যে আমি নেই৷’
আমার মুখের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সিন্ধুনদের ধারে টিলাগুলোর দিকে পৃথিবী-কাঁপানো একটা আওয়াজ হল৷ তারপর দেখলুম, কিছুটা দূরে প্রচণ্ড ধোঁয়া এবং তার সঙ্গে বড়ো-বড়ো পাথরের টুকরো আকাশে ছড়িয়ে গেল৷ পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠেছিল৷ কী সাংঘাতিক ওই বিস্ফোরণ!
কর্নেল চাপা গলায় বললেন, ‘ডিনামাইট দিয়ে টিলাটা উড়িয়ে দিল বুঝি!’
উত্তেজিত ভাবে বললুম, ‘কারা ডিনামাইট চার্জ করল কর্নেল?’
‘আবার কারা? কিষাণচাঁদরা৷’
‘কেন বলুন তো?’
‘একটা গুহায় ঢোকার পথ খুঁজে পাচ্ছিল না, তাই পাহাড় উড়িয়ে দিয়ে সে গুহার পথ আবিষ্কার করতে চায়৷’
‘কী আছে সে গুহায়?’
‘জানি না৷ শুধু এইটুকু জানি, কিষাণচাঁদ মহাই ধুরন্ধর লোক এবং সে আমাদের টেক্কা দিতে পেরেছে৷ সম্ভবত সে কোনো অসাধারণ পুরাতাত্ত্বিক পণ্ডিতের সাহায্য নিয়েছে৷’
‘ডাকুকে কোন পণ্ডিত সাহায্য করতে যাবেন?’
কর্নেল জবাব না দিয়ে হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন৷ ‘চলে এসো জয়ন্ত৷ আমরা এবার রওনা দেব৷’
ওঁর সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে দেখলুম, ডঃ তিড়কে এবং কর্নেল কামাল খাঁ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন৷ এবার দলবেঁধে সবাই দ্রুত টিলাগুলোর উপর দিয়ে এগিয়ে চললুম৷
একটা টিলার ওপর পৌঁছে বড়ো পাথরের আড়ালে সবাই বসে পড়লুম৷ উঁকি মেরে দেখে অবাক হয়ে গেলুম৷ নীচে সিন্ধুনদ দেখা যাচ্ছে৷ হঠাৎ মনে হবে সমুদ্র যেন৷ কুলকিনারাহীন৷ তবে জায়গায় জায়গায় অনেক বালিয়াড়ি দ্বীপের মতো জেগে আছে৷ আমাদের টিলার ঠিক নীচে পাথরের প্রশস্ত একটা চাতাল ছাদের মতো ছড়িয়ে রয়েছে৷ সেই চাতালে জন-পাঁচেক সশস্ত্র লোক একজন আলখাল্লাধারী ফকিরকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে৷
ফকির আর কেউ নন, আমার প্রাণদাতা সেই সাধক পুরুষ এবং বাঙালি পণ্ডিত ডঃ আমেদ!
কর্নেলের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল৷ ফিসফিস করে বললেন, ‘যা আশঙ্কা করেছিলুম, তাই ঘটেছে৷ ফকিরসায়েব কিষাণচাঁদের পাল্লায় পড়েছেন!’
ডঃ করিম বললেন, ‘মুক্তি পেয়েই উনি গা-ঢাকা দিয়েছিলেন৷ অনেক খুঁজে আর পাত্তা পেলুম না৷ কিন্তু ভাবিনি যে উনি বোকার মতো আবার এখানে এসে পড়বেন৷’
ওঁকে থামিয়ে দিলেন কর্নেল কামাল খাঁ৷ ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে ইশারা করলেন৷ সেই সময় দেখলুম, মিলিটারি সেপাইরা বুকে হেঁটে চাতালটার দু-দিক থেকে পাথরের আড়ালে এগুচ্ছে৷ আমার বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল৷ নির্ঘাৎ প্রচণ্ড লড়াই বেধে যাবে৷ তার মধ্যে ফকিরসায়েব বিপন্ন হয়ে পড়বেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই৷ এই কর্নেল কামাল খাঁ পাঠান বলেই বুঝি এত গোঁয়ারগোবিন্দ মানুষ৷
কিন্তু তারপরই আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, সেপাইরা চাতালের তলায় গিয়ে ঢুকল৷ এবং ফকিরসাহেব দু’হাতে বার কতক তালি বাজালেন৷ আকাশের দিকে মুখ৷
তারপর সিন্ধুনদের দিকে ইশারা করে কিছু বললেন৷ সশস্ত্র লোকগুলো সেদিকে তাকিয়ে কী দেখতে থাকল৷ তখন সদ্য সূর্যাস্ত হয়েছে৷ সিন্ধুর জলে রক্তিম ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছে৷ দেখতে-দেখতে সেই সিঁদুর-গোলা জলের রঙ বদলাতে থাকল৷ এমন বিচিত্র দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি৷ সোনালি-রূপালি পাখনা মেলে যেন অসংখ্য পরী স্নান করতে নেমেছে!
ব্যাপারটা বিস্ময়কর এ-জন্যে যে শুধু একটা জায়গায় ওই রঙের খেলা দেখা যাচ্ছে৷ লোকগুলো নিশ্চয়ই তাজ্জব হয়ে দেখছে৷ ফকিরসায়েব এবার সোজা দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে প্রার্থনা করছেন৷
তারপর দেখলুম, ফকিরসায়েব প্রার্থনা শেষ করে কয়েকবার তালি দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে পাথরের চাতালটার কিনারা থেকে মিলিটারি সেপাইরা আচমকা লাফিয়ে উঠল এবং লোকগুলোকে ঘিরে ফেলল৷
লোকগুলো চমকে উঠেছিল৷ ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থায় প্রত্যেকে বন্দুক ফেলে দিয়ে দু’হাত তুলে দাঁড়াল৷
কর্নেল কামাল খাঁ দৌড়ে নেমে গেলেন৷ দু’হাতে দুটো রিভলবার থেকে দু’বার গুলি ছুঁড়তে ভুললেন না৷
আমারও নীচে গিয়ে ব্যাপারটা মুখোমুখি দেখার ইচ্ছে করছিল৷ কিন্তু একটু নড়তেই কর্নেল চিমটি কেটে বসে থাকতে ইশারা করলেন৷
কর্নেল কামাল খাঁ এবং তাঁর বাহিনী ডাকাতগুলোকে আগ্নেয়াস্ত্রের ডগায় রেখে চাতাল থেকে নামালেন৷ অপেক্ষাকৃত ঢালু পথটা দিয়ে ভেড়ার পালের মতো ডাকিয়ে নিয়ে চললেন৷ ফকিরসায়েব এবার আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন৷
কর্নেল বললেন, ‘চলুন, এবার যাওয়া যেতে পারে৷’ আমরা চারজনে নীচে নেমে গেলুম৷ নামাটা সহজ হল না অবশ্য৷ পাথরে সাবধানে পা রেখে নামতে হল৷
কাছে গিয়েই ডঃ করিম বুকে জড়িয়ে ধরলেন ফকিরসায়েবকে৷ কর্নেল এবং ডঃ তিড়কে করমর্দন করলেন ওঁর সঙ্গে৷ আর আমি ওঁর পায়ের ধুলো নিয়ে মাথায় ঠেকালুম৷ এই মানুষটি আমার প্রাণদাতা!
ফকিরসায়েব হাসতে হাসতে বললেন, ‘কেরামতিটা কেমন দেখালুম বলুন? সিন্ধুনদের ওই জায়গাটায় অদ্ভুত আলোর খেলা দেখা যায় সন্ধ্যার আগে৷ ন্যাচারাল ফেনোমেনা৷ ব্যাটাদের বললুম, ওই দেখো—ওখানেই রাজা হেহয়ের গুপ্তধন পোঁতা আছে৷ ওরা বিশ্বাস করল...’
ফকিরসায়েব ওরফে ডঃ আমেদের কাছে জানা গেল: কাল বিকেলে কর্নেল কামাল খাঁ ওঁকে মুক্তি দিয়েছিলেন৷ উনি তাঁর গুহার আড্ডায় ফেরার পথে কিষাণচাঁদের হাতে বন্দি হন৷ বুদ্ধিমানের মতো তিনি ওদের সাহায্য করতে রাজি হয়েছিলেন৷ নইলে প্রচণ্ড নির্যাতন করে ওরা তাঁকে মেরে ফেলত৷ এখানে ওই খাড়িমতো জায়গায় উঁচু তিনশোফুট যে পাথরের দেয়াল দেখা যাচ্ছে, তার গায়ে দু’শোফুট উঁচুতে একটা গর্ত আছে৷ ওই গর্তটা একটা গুহার পথ৷ কিন্তু নীচে সিন্ধু নদের জল ওখানে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছে৷ তাই ওখানে কোনো নৌকা নিয়ে যাওয়া অসম্ভব৷ গেলেও খাড়া পাথরের দেয়াল বেয়ে উঠে ওই গর্তে পৌঁছানো দুঃসাধ্য৷ তাই কিষাণচাঁদকে উনি পরামর্শ দিলেন, যদি দেয়ালটার ওপর থেকে দড়ি ঝুলিয়ে সেই দড়ি বেয়ে কেউ নামতে পারে, তাহলে একশোফুট নীচে গর্তটায় পৌঁছতে পারবে৷ এ কাজ দক্ষ পর্বতারোহীর৷ ওদের দলে তেমন কেউ নেই৷ তাই সেই দুপুর থেকে ওপরে গর্ত খুঁড়ে ডিনামাইট ভরে দিয়েছিল কিষাণচাঁদ৷ কিছুক্ষণ আগে আমরা সেই ডিনামাইটের বিস্ফোরণ টের পেয়েছি৷ দেয়ালটা উড়ে গেছে৷ গুহার ছাদে ফাটল ধরেছে৷ সেই ফাটল দিয়ে কিষাণচাঁদ নেমে গেছে একা৷ সঙ্গীদের বলে গেছে, এক-ঘণ্টার মধ্যে আমি না ফিরলে এই ফকিরকে জবাই করবে৷
এখনও কিষাণচাঁদ ফেরেনি৷ এদিকে চাতালে দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে হঠাৎ ফকিরসায়েবের চোখে পড়েছিল, একদল মিলিটারি সেপাই পাথরের আড়ালে বসে আছে৷ তখন তিনি শয়তানগুলোকে কথায় কথায় ভুলিয়ে রাখেন এবং ওই কেরামতি দেখান৷ সেইসঙ্গে সেপাইদের এগিয়ে আসতেও ইশারা করেন৷
কর্নেল কামাল খাঁ বন্দিদের ট্রাকে তুলে চালান করে ফিরে এলেন৷ এখন আলো আর নেই৷ ধূসরতা ঘনিয়ে উঠেছে৷ উনি এসেই বললেন, ‘কিষাণচাঁদ তো নেই ওদের দলে!’
ফকিরসায়েব বললেন, ‘চলুন, আপনাদের কিষাণচাঁদের কাছে নিয়ে যাই৷ কিন্তু তার আগে বলুন, আপনারা এভাবে এখানে হঠাৎ এসে পড়লেন কোন সূত্রে?’
জবাব দিলেন ডঃ তিড়কে৷ ‘সে ভারি অদ্ভুত যোগাযোগ বলতে পারেন৷ রাজা হেহয়ের ঘোড়ার কপালে যে ব্রোঞ্জের চাকতি ছিল, সেটা নিশ্চয়ই আপনি পাথরের সিন্দুকে দেখেছিলেন?’
‘হুঁ, দেখেছিলুম৷ কিন্তু আমি ও নিয়ে আর মাথা ঘামাতে চাইনি৷ ঈশ্বরের দিকে যে মন ফিরিয়েছে, তার কাছে আর ওসব জিনিসের কতটুকু মূল্য ডঃ তিড়কে?’
‘তা ঠিক৷ এবার ব্যাপারটা শুনুন তাহলে৷ ওই চাকতিটা একটা হিটাইট শিলমোহর৷ হিটাইট লিপি আছে ওতে৷’
‘বলেন কী! ব্রহ্মাবর্তরাজের ঘোড়ার সাজে হিটাইট লিপি৷’
‘হ্যাঁ৷ যাই হোক, হঠাৎ আমার মনে পড়ে গিয়েছিল, একটা হিটাইট ফলকে সিন্ধুনদ অঞ্চলের সূর্য-পূজারি সম্প্রদায়ের উল্লেখ আছে৷ তারা মৃতদেহের কবর দেয় এবং প্রতিটি কবরে পাথর পুঁতে খাড়া করে রাখে৷ তারা ঘোড়া আমদানি করে হিটাইট দেশ হাট্টি (আধুনিক সিরিয়া) থেকে৷ মোহেনজো-দাড়োবাসীরা অবশ্য ঘোড়া তাদের কাছে দেখে থাকবে৷ কিন্তু ঘোড়া তারা যে কারণেই হোক, পছন্দ করেনি৷ হয়তো ঘোড়ার পিঠে চাপা পাপ ভাবত৷ লাঙল বা গাড়ি টানতে তো বলদই যথেষ্ট৷ আমি তাই ডঃ করিমকে জিগ্যেস করলুম, সিন্ধু নদের তীরে তেমন কোন গোরস্থান আছে নাকি৷ উনি বললেন—হ্যাঁ, আছে৷ তখন ঠিক হল, আমরা সেখানে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করব৷ সেই সময় কর্নেল কামাল খাঁ জানালেন, কিষাণচাঁদের দল দুহালায় রওনা হয়ে গেছে৷ ওর দলে সরকারী গোয়েন্দা আছে৷ সেই খবর দিয়েছে৷ তখন আমরা বুঝলুম, আমাদের অনুমান সঠিক৷ কিষাণচাঁদ কীভাবে এসব জানতে পেরেছিল, কে জানে৷’
কর্নেল কামাল খাঁ বললে, ‘লারকানা জাদুঘরের সহকারী ডিরেক্টর আরশাদ হুসেন কিষাণচাঁদের পরামর্শদাতা৷ ফিরে গিয়েই ওঁকে আমি গ্রেফতার করব৷ এবার চলুন ফকিরসায়েব৷ অন্ধকার হয়ে এল যে৷’
ফকিরসায়েব পা বাড়িয়ে বললেন, ‘চলুন৷ কিন্তু সাবধান৷ আলো জ্বালবেন না৷ আমি গোপন একটা পথে আপনাদের ওই গুহায় নিয়ে যাব৷ শুধু মনে রাখবেন কিষাণচাঁদ খুব ধূর্ত এবং ভীষণ হিংস্র৷’
ফকিরসায়েব আগে, তাঁর পিছনে কর্নেল কামাল খাঁ, তাঁর পিছনে ডঃ করিম, তারপর একে-একে ডঃ তিড়কে, কর্নেল সরকার এবং আমি৷ আমি সবার পিছনে৷ অন্ধকার খুব একটা ঘন হয়নি৷ তা ছাড়া আজ চতুর্থী চাঁদের জ্যোৎস্না ফুটেছে৷ অসুবিধে হচ্ছিল না৷
ওপরে উঠে সমতল একটা জায়গা পাওয়া গেল৷ ততক্ষণে চাঁদের আলো বেশ পরিষ্কার হয়েছে৷ এক ফাঁকে ফিস ফিস করে কর্নেলকে জিগ্যেস করলুম, ‘ব্রোঞ্জের চাকতিতে কি সত্যি গুপ্তধনের খোঁজ আছে?’
কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, ‘ভাগ চাই নাকি তোমার? পাবে, কথা দিচ্ছি৷’
রাগে মুখ দিয়ে কথা বেরুল না৷ আমি কি গুপ্তধনের লোভে ঘুরে বেড়াচ্ছি এঁদের সঙ্গে? অদ্ভুত বললেন তো!
কাঁটাঝোপগুলো এড়িয়ে সাবধানে অনেকখানি যাওয়ার পর ফকিরসায়েব দাঁড়ালেন৷ সামনে আবার একটা প্রাগৈতিহাসিক কবরখানা মনে হল৷ সার সার চ্যাপ্টা উঁচু পাথরের চাঁই পোতা আছে৷ ফিকে জ্যোৎস্নায় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো৷ আগে না দেখা থাকলে ভয়ে ভিরমি খেতুম৷
ফকিরসায়েব ইশারায় সেই কবরখানায় ঢুকতে বলে এগিয়ে গেলেন৷ মাঝামাঝি গিয়ে একখানে একটা পাথরের সামনে দাঁড়ালেন৷ ফিসফিস করে বললেন, ‘এখানেই!’
তারপর পাথরের চাঁইটা অক্লেশে দু’হাতে উপড়ে ফেললেন৷ এ যে দৈত্যদানবের কীর্তি! আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে গেছি৷ কেউ কেউ অস্ফুটস্বরে বিস্ময়সূচক শব্দও করেছেন৷ তাই ফকিরসায়েব বললেন—এই পাথরগুলো কাঠের তক্তার মতো হালকা৷ এক বিশেষ ধরনের পাথর৷ অথচ ভারি মজবুত৷ দুহালা এলাকার লোকেরা বলে চাঁদের পাথর৷ সূর্যদেব পুজোয় খুশি হয়ে নাকি ওদের পূর্বপুরুষদের এইসব পাথর চাঁদ থেকে পাঠিয়ে দিতেন৷ পরীরা বয়ে আনত৷ অবশ্য কেউ মারা গেলে, তবেই৷ যাক গে, এই নীচের এই বেদিটার তলায় সুড়ঙ্গপথ আছে৷’
বলে উনি বেদির মতো চারকোণা একটা হালকাপাথর একইভাবে তুলে পাশে রাখলেন৷ বেদির মধ্যে পাথরের চাঁই বসানোর গর্ত রয়েছে৷
ফকির সায়েব বললেন, ‘সাবধান, আলো জ্বালবেন না কেউ৷ ভেতরে কিষাণচাঁদ কোথায় আছে আমরা জানি না৷ সিঁড়ি বেয়ে নামবেন একে-একে৷ প্রত্যেকে প্রত্যেকের পিঠে হাত রাখবেন৷’
গর্তটা কোনোমতে একজন ঢোকার মতো৷ কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, ‘জয়ন্ত, ইচ্ছে না করলে তুমি অপেক্ষা করতে পারো এখানে৷’
বললুম, ‘পাগল! একা এই ভূতের রাজ্যে বসে থাকার চেয়ে পাতালে আপনাদের সঙ্গে গিয়ে মরা ঢের ভালো৷’
একে একে সবাই অদৃশ্য হলেন৷ তারপর কর্নেলের পিছনে আমিও নেমে গেলুম৷ কেমন একটা বাসি ধূপ-ধুনোর গন্ধ যেন৷ কুয়োর মতো সুড়ঙ্গের সিঁড়ি বেয়ে নামছি তো নামছি৷ ঠাসা অন্ধকার৷ সংকীর্ণ জায়গা৷ দম আটকে যাচ্ছিল৷
কতক্ষণ পরে টের পেলুম, মেঝের মতো মসৃণ চওড়া একটা জায়গায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি৷
হঠাৎ সামনে দূরে কোথাও একঝলক আলো জ্বলেই নিভে গেল৷ ফকিরসায়েব ফিসফিস করে বললেন, ‘আবার সবাই সবাইকে ছুঁয়ে পা বাড়ান৷ আমি আগে থাকছি৷’
এবার মেঝের মতো সমতল জায়গায় হেঁটে চলেছি পরস্পরকে ছুঁয়ে৷ কখন ডাইনে, কখনও বাঁয়ে ঘুরে-ঘুরে অনেকখানি যাওয়ার পর সবাই দাঁড়ালুম৷ কোথাও খসখস শব্দ হচ্ছে৷ শব্দটা বাড়তে থাকল৷ তারপর উপর্যুপরি বন্দুকের আওয়াজে গুহার স্তব্ধতা চুরমার হয়ে গেল৷
তারপর একটা অমানুষিক আর্তনাদ অথবা গর্জন শোনা গেল৷ আঁ—আঁ—আঁ—আঁ! ওটা যে মানুষের গলার নয়, তা ঠিকই৷ কিন্তু অমন কানে তালা-ধরানো ভয়ঙ্কর চিৎকার কোন প্রাণীর?
অমনি ফকিরসায়েব চাপা গলায় বলে উঠলেন, ‘সর্বনাশ! শ্মশানগুহার দানবটা জেগে গেছে! পালিয়ে আসুন, পালিয়ে আসুন৷ যেপথে এসেছি, সেই পথে!’
একটা হুড়োহুড়ি পড়ে গেল৷ ঝোঁকের মাথায় কর্নেল কামাল খাঁ টর্চ জ্বাললেন৷ ফকিরসায়েব বললেন, ‘আলো নয়! আলো নয়৷ আমার পিছুপিছু সেইভাবে চলে আসুন সবাই!’
আমি সবার পিছনে৷ হুড়োহুড়ি করে উঠতে গিয়ে পড়ে গেলুম৷ তারপর গড়াতে গড়াতে আবার মেঝেয়৷ কর্নেল কি টের পেলেন না? পায়ের শব্দ ওপরের দিকে মিলিয়ে গেল দ্রুত৷ সেদিনকার চোটখাওয়া জায়গাতেই আবার চোট খেয়েছি৷ গোড়ালি দুমড়ে গেছে৷ উঠতে দেরি হল৷
তারপর আর কিছুতেই সিঁড়িটা খুঁজে পেলুম না৷ যেদিকে যাই, দেয়ালে বাধা পাই৷ শেষে একজায়গায় ফাঁক পেয়ে পা বাড়ালুম, কিন্তু সেখানে সিঁড়ি নেই৷ এদিকে পিছনে আবার বন্দুকের প্রচণ্ড আওয়াজ আর সেই অমানুষিক গর্জন বা আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে—আঁ-আঁ-আঁ-আঁ!
পাগলের মতো খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে চললুম৷ কিছুটা যাওয়ার পর মনে হল ধুলোবালির মধ্যে হাঁটছি৷
গলা শুকিয়ে গেছে৷ আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছি৷ শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে রিভলবার বের করলুম এবং দেশলাই বের করে জ্বালতেই দেখি, আমি কালো ছাইগাদায় হাঁটু অব্দি ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছি!
তাহলে এই সেই মামদো-ভূতের আড্ডা শ্মশানগুহা! এখান থেকে বেরুতে পারলে আমাকেও সবাই মামদোভূত ভেবে বসবে, তাতে কোনো ভুল নেই৷
অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি তো আছিই৷ এই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে আবার কোথায় যেতে কোথায় গিয়ে পড়ব ভেবে পা বাড়াতে সাহস হচ্ছে না৷
ওদিকে গুলির শব্দ ও গর্জন বা আর্তনাদটা আবার থেমেছে৷ মনে হচ্ছে, কিষাণচাঁদ কিংবা সেই অজ্ঞাত দানবের লড়াই শেষ হয়েছে এতক্ষণে৷ কে জিতেছে কে জানে! আমি মনে জোর আনার চেষ্টা করতে থাকলুম৷
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলুম জানি না, হঠাৎ পিছন থেকে আমার গায়ে টর্চের আলো পড়ল৷ ঘুরেই রিভলবার বাগিয়ে গর্জে বললুম, ‘কে তুমি?’
আলোর পিছন থেকে চাপা অট্টহাসি হাসল কেউ৷ ‘কী! বুড়ো ঘুঘুর বাচ্চা যে! তুমি কেমন করে শ্মশান-গুহার ছাইগাদায় এসে জুটলে হে? তোমার বুড়ো ঘুঘুটি কোথায়? তার সাঙ্গপাঙ্গ টিয়াবুলবুলি আর সেই হুতুম প্যাঁচাটাই কোথায়?’
‘আর একটা কথা বললে গুলি ছুঁড়ব!’
‘তার আগে তোমার মুন্ডু উড়ে যাবে৷ দেখতে পাচ্ছ না, এটা একটা স্টেনগান?’
এবার লক্ষ্য করলুম, আলোর সামনে কালো একটা নল আমার দিকে তাক করে আছে৷ বললুম, ‘তুমি কি কিষাণচাঁদ?’
‘রিভলবার ফেলে দাও আগে৷ তারপর কথাবার্তা হবে৷’
‘যদি না ফেলি!’
‘মুন্ডটি হারাবে৷ রেডি—ওয়ান... টু... থ্রি...’
রিভলবার ফেলে দিলুম৷ ছাইগাদায় ডুবে গেল৷ কিষাণচাঁদ এসে পায়ে ছাই সরিয়ে সেটা তুলে নিল৷ দেখলুম, ওর জামাপ্যান্টে রক্ত লেগে আছে৷ রক্তগুলো ওর নিশ্চয়ই নয়৷ কারণ ওকে আহত বলে মনে হচ্ছে না৷
সে আমার জামার কলার খামচে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে চলল৷ পায়ের ব্যথার কথা ভুলে গেলুম৷ নির্ঘাৎ শয়তানটা আমাকে জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছে৷
নীচু ছাদওয়ালা একটা করিডোরের মতো জায়গা পেরিয়ে একটা প্রশস্ত ঘরে পৌঁছলুম৷ সেখানে দেখি, অনেক মাটির জালা রয়েছে৷ গুপ্তধন নাকি?
পরক্ষণে বুঝলুম, সব ছাইভর্তি অর্থাৎ অস্থিভস্ম৷ কত হাজার-হাজার লোকের অস্থিভস্ম কে জানে! মনে হল, একটু আগে যে ঘরে ঢুকে পড়েছিলুম—সে ঘরের জালাগুলো কেউ ভেঙে ফেলেছে বলে ছাই ঘরময় ছড়িয়ে রয়েছে৷
কিষাণচাঁদ এবার পকেট থেকে একটা মোম জ্বালল৷ একটা জালার মুখে রেখে টর্চ নেভাল৷ তারপর বাঁকা হেসে বলল, ‘এবার খবর বলো হে ক্ষুদেঘুঘু!’
বললুম, ‘খবর সাংঘাতিক৷ তোমার দলবলকে মিলিটারিরা গ্রেফতার করে চালান দিয়েছে৷ এবার তোমার সেই দশা হবে৷ চারদিক মিলিটারিরা ঘিরে রেখেছে৷’
কিষাণচাঁদ একটু ভড়কে গেল যেন৷ ভুরু কুঁচকে বলল, ‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ৷ আর তোমার পরামর্শদাতা মুরুব্বি লারকানা জাদুঘরের এ্যাসিন্ট্যান্ট ডিরেক্টরকেও এতক্ষণ গ্রেফতার করা হয়েছে৷’
কিষাণচাঁদ কী যেন ভাবল৷ তারপর বলল, ‘সেদিন প্লেনে আসতে-আসতে তোমার প্রতি আমার স্নেহ জন্মে গিয়েছিল৷ নয়তো এতক্ষণ তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতুম না৷ তা ছাড়া তুমি সাংবাদিক৷ সাংবাদিক মারা আর ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা একই কথা৷ যাকগে, আমার এই ব্যবহারের বিনিময়ে তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত৷’
‘আলবাৎ করছি৷ আমি কৃতজ্ঞ ডঃ অনিরুদ্ধ যোশী!’
কিষাণচাঁদ বাঁকা হেসে বলল, ‘ডঃ অনিরুদ্ধ যোশীকে তোমার মনে ধরেছিল দেখছি৷ হুঁ, আমাকে কিন্তু অদ্ভুত মানিয়েছিল!’
‘দারুণ! আমি তো একটুও ধরতে পারিনি!’
‘কিষাণচাঁদ লাখে একটাই জন্মায় হে ছোকরা! যাকগে, এবার তোমাকে নিয়ে কী করব একটু ভাবা যাক৷...’ বলে সে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল৷ ভাবতে থাকল৷
বললুম, ‘আমি আপনাকে ডঃ যোশী বললে কি রাগ হবে কিষাণ-ভাই?’
‘তুমি আমাকে ভাই বলছ?’
‘কেন বলব না? আমাকে এতক্ষণ বাঁচিয়ে রেখেছেন৷ আমি কি অকৃতজ্ঞ?’
‘হুঁ, তুমি এবার পথে এসেছ দেখছি৷ তা আমাকে ডঃ যোশী বললে আপত্তি করব না৷ পুনার ডঃ যোশীর সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক জানো? আমরা দুজনে স্কুল-কলেজে সহপাঠী ছিলুম৷ সে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু৷ আমাদের দু’জনের চেহারাতেও দারূণ মিল৷ তো যাকগে সেকথা৷ শোনো... তোমাকে আমি হ্যাঁ, মুক্তিই দেব৷ একটা শর্তে৷’
‘বেশ, বলুন৷’
‘হেহয়রাজার ঘোড়ার সেই ব্রোঞ্জের চাকতিটা আমার চাই৷’
‘কিন্তু আমি কোথায় পাব? আমার কাছে তো ওটা নেই৷’
‘তুমি এই কাগজে নিজের হাতে লেখো : ‘আমি বন্দি আছি৷ আমার মুক্তিপণ হিটাইট ব্রোঞ্জচাকতি৷ পত্রবাহকের হাতে না দিলে আগামীকাল ভোর ছ’টায় এরা আমাকে মেরে ফেলবে৷’ নীচে নাম সই করে তারিখ দাও৷ আমার লোক এটা আজ রাতে তোমার কর্নেল সায়েবের কাছে পৌঁছে দেবে৷ চাকতি কোথায় কীভাবে পৌঁছে দিতে হবে সেসব আলাদা চিরকুটে লিখে দেব৷ বাকি যা করার, আমি করব৷ নাও, লেখো৷’
সে পকেট থেকে একটা নোটবই বের করে কাগজ ছিঁড়ল এবং একটা ডটপেন দিল৷ আমি কথাগুলো লিখে সই করে দিলুম৷ তারিখও দিলুম৷
এবার কিষাণচাঁদ জালার ওপর রাখা একটা হ্যাভারস্যাক থেকে মোটানাইলনের রশারশি বের করল৷ বুঝলুম, দেয়াল বেয়ে এই গুহায় ঢোকার জন্য দরকার হবে বলে দড়ি এনেছিল সে৷
দড়িতে আমার হাতদুটোকে পিঠমোড়া করে বাঁধল৷ তারপর বলল, ‘চলো, তোমাকে ভালো জায়গায় রেখে আসি৷ এখানে থাকলে তো তোমার স্যাঙাতরা এসে তোমাকে উদ্ধার করে ফেলবে৷’
একহাতে টর্চ আর আমার রিভলবার অন্যহাতে স্টেনগানের নল আমার পিঠে ঠেকিয়ে সে আমাকে ঠেলতে-ঠেলতে নিয়ে চলল৷ আবার একটা নীচু ছাদওয়ালা সংকীর্ণ করিডোরের মতো জায়গা পেরিয়ে গেলুম৷ এতক্ষণে মনে হল অজস্র ঘর ও করিডোরওয়ালা এই গুহাটা প্রাকৃতিক গুহা নয়৷ প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষরা বানিয়েছিল৷ এখানেই তারা সম্মানিত লোকেদের অস্থিভস্ম এনে জালায় রেখে দিত৷
এবার যে চওড়া ঘরে ঢুকলুম, সেই ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠতে হল! একটা অক্টোপাসের গড়নের মতো জানোয়ার রক্তাক্ত শরীরে পড়ে আছে৷ বললুম, ‘ওটা কী প্রাণী? ওটার সঙ্গেই কি আপনি লড়াই করছিলেন তখন?’
কিষাণচাঁদ খুশি হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ৷ দেখতে পাচ্ছ, ওটার কী দশা হয়েছে৷’
‘প্রাণীটার নাম কী ডঃ যোশী?’
কিষাণচাঁদ আরও খুশি হয়ে বলল, ‘ওটা অধুনালুপ্ত প্রাগৈতিহাসিক জীব হেক্টোপাস৷’
হেক্টোপাস নামে এই প্রাগৈতিহাসিক জন্তুটির রক্তাক্ত শরীর থেকে বিশ্রি দুর্গন্ধ বেরুচ্ছিল৷ এই ঘরেই যদি আমাকে বন্দি করে রাখে, তাহলে বমি করতে করতে নির্ঘাৎ মারা পড়ব৷ কিন্তু কিষাণচাঁদ আমাকে সেই ঘর থেকে আরেকটা ঘরে নিয়ে গেল৷
এ ঘরের ছাদের ফাটল দিয়ে আকাশ দেখা গেল৷ তখন বুঝলুম, এই ঘরেরই ওপরটা ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে ফেলেছে কিষাণচাঁদ৷ ফাটলটা অনেকটা চওড়া৷ মেঝেভর্তি পাথরের চাঁই পড়ে আছে৷ ভয় হল, এখনই ফাটল ধরা ছাদটা ধসে পড়বে না তো?
কিষাণচাঁদ বলল, ‘এবার আমার কিছু হুকুম তামিল করো লক্ষ্মীছেলের মতো৷’
‘বলুন কী করতে হবে?’
‘এই টর্চটা ধরে থেকে আমাকে আলো দেখাবে৷’
‘আমার হাত যে বাঁধা৷’
‘তাতে কোনো অসুবিধা হবে না সোনা! তোমার কব্জি দুটো পিছন দিকে বাঁধা আছে এই তো? আমি তোমার হাতে জ্বলন্ত টর্চ ধরিয়ে দিচ্ছি৷ তুমি এদিকে পিঠ রেখে দাঁড়াও৷ ব্যস! কিন্তু খুব সাবধান৷ আলো ওপরে ফেলার চষ্টা করবে না৷ তা করলেই দেখতে পাচ্ছ, স্টেনগান রেডি আছে৷’
‘কী করতে চান ডঃ যোশী?’
কিষাণচাঁদ চোখ নাচিয়ে বলল, ‘বাহাদুর ছোকরা দেখছি হে৷ এ্যাঁ? ডঃ যোশী বলে আমাকে গলাবার চেষ্টা করছ যে! উঁহু, ও চালাকি বারবার খাটবে না৷ নাও, টর্চ ধরে থাকো৷ সাবধান!’
আমি ঘুরে দাঁড়ালুম৷ সে আমার হাতে জ্বলন্ত টর্চ ধরিয়ে দিল৷ টর্চের মুখ দেয়ালের দিকে৷ তারপর চোখের কোণা দিয়ে দেখলুম, সে একটা বড়ো পাথর ঠেলে এনে এক জায়গায় রাখল৷ সেই পাথরে তাকে উঠতে দেখে টের পেলুম, সে কী করতে চায়৷
আমাকে বেঁধে রাখা দড়ির ডগা সে নিজের কোমরে জড়িয়ে ভালোভাবে বাঁধল৷ তারপর ছাদের ফাটল আঁকড়ে ওপরে উঠে গেল৷ দড়িটা বেশি বড়ো নয়৷ টানটান হয়ে রইল৷ ওপর থেকে সে স্টেনগানের নল বের করে রাখতে ভুলল না৷ তারপর হুকুম দিল চাপা গলায়, ‘আঙুল বাঁকা করে টর্চের স্যুইচ অফ করে দাও৷’
চেষ্টা করে বললুম, ‘পারছি না যে!’
‘পারতেই হবে৷ স্যুইচ তোমার তর্জনীর কাছেই রেখেছি, টিপে নীচের দিকে ঠেলে দাও৷’
অনেক কষ্টে টর্চ নেভাতে পারলুম৷ তখন সে বলল, ‘সাবধান! তোমার সঙ্গে আমিও বাঁধা আছি৷ কাজেই অন্ধকারে পালাবার চেষ্টা করো না৷ এবার যা বলছি, করো৷ ওই পাথরে উঠে দাঁড়াও৷’
দু’হাত পেছনে বাঁধা আছে৷ কিছুতেই উঠতে পারছিনা৷ কোনোভাবেই ওঠা সম্ভব নয়৷ অথচ সে বারবার ফিসফিস করে বলছে, ‘কী হল? দেরি হচ্ছে কেন?’
বললুম, ‘অসম্ভব৷ হাত বাঁধা মানুষ পাথরে চাপবে কী ভাবে?’
‘লাফ দাও না৷’
‘অন্ধকারে লাফ দিয়ে হাড়গোড় ভাঙবে না? তা ছাড়া পাথরটা যে আড়াই ফুটের বেশি উঁচু মনে হচ্ছে৷’
‘অপদার্থ! মুরগির যেটুকু জোর আছে, তোমার নেই৷ আবার ঘুঘুগিরি করতে এসেছ! ঠিক আছে, তোমাকে ওঠাচ্ছি৷ কিন্তু ব্যাপারটা ভারি কষ্টদায়ক হবে তোমার কাছে৷’
অসহ্য লাগছিল৷ পা-মচকানো ব্যথা, তার ওপর বেঁধে রাখার ফলে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে কব্জির ওখানটা ফুলে ঢোল হচ্ছে বুঝতে পারছি৷ খুব যন্ত্রণা শুরু হয়েছে৷ তার ওপর সেই অবস্থায় টর্চ ধরে আছি৷ দাঁতে দাঁত চেপে বললুম, ‘যা হয়, করুন৷ আর পারছি না৷’
আমাকে ওপর থেকে সে হ্যাঁচকা টানে শূন্যে ঝোলাল৷ আর্তনাদ করে উঠলুম৷ দুই বাহু ভেঙে গেল মনে হল৷ কিন্তু সে চাপা গর্জে বলল, ‘চুপ!’
দ্বিতীয়বার হ্যাঁচকা টানে আমাকে শয়তানটা ফাটলের কাছে তুলে ফেলল৷ ওর গায়ে দানবের শক্তি যেন৷
কিন্তু আর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারলুম না৷ অজ্ঞান হয়ে গেলুম৷
কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলুম জানি না, যখন জ্ঞান হল দেখি মুখের ওপর বিশাল নক্ষত্রভরা আকাশ ঝলমল করছে৷ সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে৷ তারপর টের পেলুম, আমি বালির ওপর শুয়ে আছি৷ আমার বাঁধনটা আর নেই৷ কিন্তু উঠে বসার ক্ষমতাও নেই৷ এদিকে প্রচণ্ড কনকনে ঠান্ডা৷ যন্ত্রণা ও ঠান্ডার চোটে কাতর হয়ে রইলুম৷
আমার মাথা, কাঁধ, মুখ ও জামার ওপরটা ভিজে মনে হচ্ছিল৷ আমি অতিকষ্টে বললুম, ‘কে আছ এখানে?’
সঙ্গে সঙ্গে মাথার কাছ থেকে কিষাণচাঁদের সাড়া এল, ‘এই যে সোনা! ঘুম ভেঙেছে দেখছি৷ অনেক কষ্ট দিলে হে৷ কিষাণচাঁদ জীবনে যা করেনি, তাকে দিয়ে তাই করালে৷ তোমার মতো একটা ক্ষুদে বিচ্ছুর সেবাও করতে হল৷’
‘আমি কৃতজ্ঞ ডঃ যোশী৷’
‘চুপ৷ বাঁদরামি করলে মুখ ভেঙে দেব৷’
বুঝলুম, কিষাণচাঁদ খামখেয়ালী প্রকৃতির লোক৷ এখন একরকম, তখন একরকম হয়ে ওঠে৷ ওর রাগ হয়, এমন কিছু করা উচিত হবে না৷ বললুম, ‘দাদা বললে কি আপত্তি করবেন কিষাণচাঁদজি?’
‘আমি কারুর দাদা নই৷’
‘আমার সেবা করেছেন যে! দাদা ছাড়া ছোটোভায়ের সেবা কেউ করে?’
‘করেছি নিজের স্বার্থে৷ চাকতিটা না পাওয়া পর্যন্ত যেভাবেই হোক তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে৷’
‘তারপর বুঝি মেরে ফেলবেন?’
‘চাকতি পেলে দেখা যাবে৷’
‘আপনি কিন্তু কথা দিয়েছেন, চাকতি পেলে আমাকে ছেড়ে দেবেন৷’
কিষাণচাঁদ কোনো কথা বলল না৷ মনে মনে শিউরে উঠলুম৷ তাহলে কি সে আমাকে মেরে ফেলবে চাকতি পেলেও?
জানি না, আমার চিঠি পেয়ে কর্নেল কী করবেন৷ আমাকে তিনি কত স্নেহ করেন, তা জানি৷ কিন্তু ওই চাকতিটা তো তাঁর ব্যক্তিগত জিনিস নয়৷ যখনই পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি ডঃ করিম এবং কর্নেল কামাল খাঁ-কে ওটা দেখিয়েছেন, তখনই ওটা সরকারী সম্পত্তি হয়ে গেছে৷
ভেবে দেখলুম, এই নৃশংস ডাকাত সর্দারের হাতে আমার প্রাণ যাবেই৷ চাকতি পেলেও হয়তো যাবে৷ না পেলে তো যাবেই৷
কিন্তু কাপুরুষের মতো মরার চেয়ে লড়াই করে মরাই কি ভালো নয়? এখন আমার হাতে বাঁধন নেই৷ কিন্তু ওঠার ক্ষমতাও নেই৷ যন্ত্রণা হচ্ছে শরীরে৷ তাহলে কীভাবে লড়াই করব ওর সঙ্গে?
আমার রিভলবারটাও ওর কাছে৷ কাত হয়ে অতি কষ্টে একটু মুখ তুলে দেখার চেষ্টা করলুম কোথায় আছি৷ অন্ধকার রাতে নক্ষত্রের আলো খানিকটা স্বচ্ছতার সৃষ্টি করে৷ চাঁদ সেই সন্ধ্যারাতেই ডুবে যাওয়ার কথা৷
মনে হল, জায়গাটা মরুভূমির মতো৷ মাঝে মাঝে হাওয়া আসছে আর ঠান্ডাটা বাড়িয়ে দিচ্ছে৷ একটু পরে জিগ্যেস করলুম, ‘আমি কোথায় আছি কিষাণচাঁদজি?’
‘দোশান মরুভূমিতে৷’
চমকে উঠলুম! দোশান মরুভূমির কথা আমি শুনেছিলুম৷ মোহেনজো-দাড়োর কুড়ি-বাইশ মাইল দক্ষিণ পশ্চিম কোণে একটা মরুভূমি আছে৷ তার নাম দোশান৷ সিন্ধু নদের জল খাল কেটে নিয়ে গিয়ে সেখানে গাছপালা লাগানো ও শস্যক্ষেত্রের পরিকল্পনা করা হয়েছে৷ খাল কাটার কাজ নাকি এখনও শেষ হয়নি৷
কিন্তু এতদূরে কীভাবে আমাকে নিয়ে এল কিষাণচাঁদ? কোন পথেই বা আনল?
জানার জন্য ওকে ডাকলুম৷ জবাব দিল না৷ মাথার কাছে বসে সে সিগারেট টানছে৷ কয়েকবার ডাকার পর জবাব না পেয়ে চোখ বন্ধ করলুম৷ ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিলুম৷
কিছুক্ষণ পরে মনে হল কোথায় দূরে একটা অস্পষ্ট শব্দ হচ্ছে৷ তারপর শিস দিল কেউ৷ কিষাণচাঁদ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে দু’বার শিস দিল৷ তারপর টর্চ জ্বেলে এদিকে-ওদিকে দোলাল৷
একটু পরে কাত হয়ে আবছা দেখি, একটা উট হেঁটে আসছে৷ উটটা কাছে এসে হাঁটু ভাঁজ করল৷ একটা লোক নেমে এল৷ কিষাণচাঁদ ভারি গলায় জিগ্যেস করল, ‘কী খবর?’
‘পেয়েছি৷’
‘দাও৷’
অন্ধকারে কী একটা জিনিস হাত বাড়িয়ে নিল কিষাণচাঁদ৷ টর্চ জ্বেলে পরীক্ষা করতে থাকল৷
দেখলুম, সেই হিটাইট চাকতিটা৷
সঙ্গে সঙ্গে আশা-নিরাশায় দুলতে থাকলুম৷ এবার আমাকে মেরে ফেলবে কিষাণচাঁদ, নাকি মুক্তি দেবে?
টর্চের আলোয় কিষাণচাঁদের মুখভাব বদলাচ্ছিল৷ সেটা আনন্দের প্রকাশ বলেই ধরে নিলুম৷ আলো নিভিয়ে সে বলল, ‘যাকে দেখিয়ে আনতে বলেছিলুম, তাঁকে দেখিয়ে এনেছ?’
‘হ্যাঁ, স্যার৷ এই নিন, উনি চিঠিও দিয়েছেন৷’
ডাকাত সর্দারকে স্যার বলা শুনে এখন হাসার অবস্থা নয়৷ নয়তো হো হো করে হেসে ফেলতুম৷ কিষাণচাঁদ মন দিয়ে চিঠি পড়ছে এখন৷ পড়া শেষ হলে সে টর্চ নিভিয়ে জিগ্যেস করল, ‘আর কী বললেন?’
‘বললেন, খাঁটি জিনিসই বটে৷’
‘কখন দেখা হবে ওঁর সঙ্গে?’
‘চিঠিতে তো সব লিখে দিয়েছেন৷’
‘তোমার মুখেই শুনি৷’
‘কাল দশটায় তিন নম্বর গেটে থাকবেন৷’
‘ঠিক আছে৷ চলো, রওনা হওয়া যাক৷’
‘আপনার উট কী হল?’
‘পাঠিয়ে দিয়েছি৷ হারুনকে বলেছি, উট বেঁধে রেখে তাবারুর জিপ নিয়ে রুন্ডিতে অপেক্ষা করবে আমার জন্যে৷ তুমি কোন পথে এলে?’
‘জুলং বাজার হয়ে৷’
‘মিলিটারি আছে ওখানে?’
‘নাঃ৷ তবে শুনলুম, দুহালার দিকে একটা বড়ো কনভয় রাত বারোটায় রওনা দিয়েছে৷
‘ঠিক আছে৷ চলো রওনা হই৷’
‘আসামির অবস্থা কী? কবর দিয়ে যেতে হবে নাকি?’
কিষাণচাঁদ টর্চের আলো আমার মুখে ফেলল৷ ওর স্যাঙাত বলল, ‘তাজ্জব! এখনই তাজা হয়ে আছে যে স্যার!’
কিষাণচাঁদ চাপা হেসে আমার উদ্দেশে বলল, ‘তাহলে ছোটোঘুঘু! আসি আমরা৷ তুমি আরামে ঘুমোও৷ তোমাকে মুক্তি দেব বলেছিলুম, দিলুম৷ আমরা আসি৷’
ওঠার চেষ্টা করে বললুম, ‘আমি এখানে পড়ে থাকব? এ তো মরুভূমি!’
‘বাঙালি হয়ে জন্মেছ৷ মরুভূমি একবার দেখবে না কেমন বস্তু?’
রাগে দুঃখে বলে উঠলুম, ‘আপনি এত নিষ্ঠুর কিষাণচাঁদজি! আপনি জবাব দিয়েছিলেন, চাকতির বদলে কর্নেলের কাছে আমাকে পৌঁছে দেবেন৷’
‘মোটেও না৷ তেমন কিছু বলিনি৷ যা বলেছি, তা করেছি৷ তোমার ঠিকানা আমার লোক তোমার বুড়ো ঘুঘুকে দিয়ে এসেছে৷ অতএব ভাবার কিছু নেই৷ ওরা এসে তোমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে৷’
বলে কিষাণচাঁদ উটের পিঠে বসল৷ ওর স্যাঙাত উটের দড়ি ধরে নিয়ে চলল৷ আস্তে আস্তে দূরে উটের পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল৷ অন্ধকার রাতের মরুভূমিতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় আহত শরীরে পড়ে রইলুম৷ চোখ ফেটে জল এল এতক্ষণে৷
একটু পরে হঠাৎ মাথায় এল, এই মরভূমিতে কর্নেলরা আমাকে খুঁজে পাবেন কী ভাবে? ওঁরা খুঁজতে খুঁজতে যদি বেলা হয়ে যায়, রোদ তীব্র হতে থাকে, তাহলে তো আমি তেষ্টাতেই মারা পড়ব৷ তারপর প্রচণ্ড উত্তাপ তো আছেই৷
অতএব প্রাণপণ চেষ্টায় কোনোরকমে যদি রাত থাকতে এগোবার চেষ্টা করি, তাহলে বাঁচার সুযোগ পেতেও পারি৷
কিষাণচাঁদ যে দিকে গেল, সেই দিকে তাকিয়ে আবছা দূরে যেন সিগারেটের আগুন দেখলুম৷ মরিয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করলুম৷
হামাগুড়ি দিয়ে কিছুটা চলার পর উঠে দাঁড়ালুম অতিকষ্টে৷ দুই কাঁধে ভীষণ যন্ত্রণা৷ আস্তে আস্তে টলতে টলতে পা বাড়ালুম৷ কখনও আছাড় খাচ্ছি, কখনও উঠে হামাগুড়ি দিচ্ছি৷ আবার কখনও কয়েক পা কুঁজো হয়ে হাঁটছি৷ এভাবে কিছুটা চলার পর মনে জোর এল৷
যখনই দম আটকানোর মতো অবস্থা হল, তখনই থেমে চিত হয়ে শুয়ে পড়লুম৷ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলুম৷ তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে এইভাবে এগিয়ে গেলুম৷
একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র লক্ষ্য করে চলার ফলে কিষাণচাঁদরা যে পথে গেছে, সেই পথেই যাচ্ছি মনে হল৷ সাদা বালির ওপর নক্ষত্রের আলো পড়ায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল উটের ও মানুষের পায়ের গভীর ছাপ৷
একবার মনে হল কিষাণ চাঁদের নাগাল পেয়ে গেছি৷ পরে দেখলুম, ভুল৷ বাতাসের শব্দ৷
এইভাবে চলেছি তো চলেছি৷ কখনো হাঁটু ভর করে, কখনও বুকে হোঁটে৷ আবার কখনও উঠে দাঁড়িয়ে পা ফেলার চেষ্টা করছি৷ মাঝে মাঝে বিশ্রামও নিচ্ছি৷
কতক্ষণ পরে উটের পায়ের দাগ হারিয়ে ফেললুম৷ সামনে উঁচু বালির পাহাড় আছে মনে হল৷ সেখানে গিয়ে অনেক চেষ্টা করেও ওটাতে উঠতে পারলুম না৷ প্রতিবার কিছুটা উঠে গড়িয়ে নীচে এসে পড়লুম৷
বাররার চেষ্টার পর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়লুম৷ শেষবার গড়াতে গড়াতে এত জোরে নীচে পড়লুম যে ঝাঁকুনির চোটে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলুম৷
যখন জ্ঞান হল, তখন দিনের আলো ফুটছে৷
অনেক কষ্টে মুখ তুলে চারপাশটা দেখলুম৷ তারপর আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল৷ যতদূর চোখ যায়, শুধু বালি আর বালি! দিগন্তে আকাশ নীচু হয়ে এসে মিলেছে৷ মরুভূমি কাকে বলে, এতক্ষণে টের পেলুম৷
একটু পরে সূর্য উঠবে৷ তারপর কী ঘটবে, স্পষ্ট বুঝতে পারছি৷
তবু মানুষের মনে কী যেন একটা শক্তি আছে৷ বেঁচে থাকার একটা সুতীব্র ইচ্ছা আছে৷ সেই শক্তি আর ইচ্ছা আমাকে সাহস জোগাল৷
আবার ক্ষীণ একটা আশা জেগে উঠল, কর্নেলরা আমাকে খুঁজে বের করবেনই৷ বিশেষ করে কর্নেল কামাল খাঁ মিলিটারি কনভয় নিয়ে নিশ্চয়ই বেরিয়ে পড়েছেন ওঁর সঙ্গে৷ আমি চারদিকে তীক্ষদৃষ্টি রেখে বসে রইলুম৷ এ আমার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ!
কিছুক্ষণ পরে দিগন্তের আকাশ লালচে হয়ে উঠছে, দেখে জানলুম ওটাই তাহলে পূর্বদিক৷ আমি উত্তর দিকেই এগিয়েছি৷ আমার পায়ের ছাপ দেখে সেটা বোঝা গেল৷ কিন্তু এবার সূর্য ওঠার সময় হয়েছে৷ দেখতে দেখতে মরুভূমির সূর্য উঁকি দিল৷ লাল প্রকাণ্ড একটা চাকার মতো সূর্য৷ বুক শুকিয়ে গেল আতঙ্কে৷
চাকাটা ক্রমশ বড়ো হতে হতে এক লাফে মাটিছাড়া হল৷ এক ভয়ঙ্কর একচক্ষু দানব যেন আমাকে দেখতে পেয়েই লাল জিভ বের করে ঠোঁট চাটছে৷
ওদিকে তাকাতে ভয় করছিল৷ তাই ঘুরে দক্ষিণে দৃষ্টি রাখলুম৷ তারপর এক আজব দৃশ্য দেখলুম৷ শূন্যে কী একটা কালো জিনিস ভাসছে৷
জিনিসটা কাঁপতে কাঁপতে রঙ বদলাল ক্রমশ৷ মনে হল, কী একটা প্রকাণ্ড চারঠেঙে প্রাণী দিগন্তের আকাশে নড়বড় করে পাখির মতো সাঁতার কাটছে৷
একটু পরে দেখি, প্রাণীটা যেন একটা উট৷
তাহলে কি মরুভূমিতে দিনের প্রথম মরীচিকা দেখতে পাচ্ছি আমি? মনে মনে ঠিক করলুম, মরীচিকার দিকে তাকাব না৷ মরীচিকার নাকি মায়া আছে৷ মানুষ বা প্রাণীকে আকর্ষণ করে নিয়ে যায় এবং পরিণামে ওই মিথ্যার পিছনে ছোটাছুটি করে মারা পড়তে হয়৷
কিন্তু আবার দেখবার ইচ্ছে হল ব্যাপারটা৷ তখন ঘুরে, স্পষ্ট দেখলুম সত্যি-সত্যি একটি উট দৌড়ে আসছে৷ উটের পিঠে একটা ছাতার মতো কিংবা নৌকার ছইয়ের মতো জিনিস চাপানো রয়েছে এবং তাতে দু’জন মানুষ বসে আছে৷
মরীচিকার পিছনে মানুষ ছোটে৷ কিন্তু এ যে দেখছি মরীচিকাই আমার দিকে ছুটে আসছে৷ হতবাক এবং অসহায় হয়ে তাকিয়ে রইলুম৷
ততক্ষণে সূর্যের রঙ সোনালি হয়ে উঠছে৷ দিগন্ত বিস্তৃত ধু-ধু বালির সমুদ্রে তরল সোনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে যেন৷ ক্রমশ উত্তাপ জেগে উঠছে শীতল বালিতে৷
উটটা দেখতে দেখতে এসে পড়ল কাছাকাছি৷ তখন দেখলুম, সামনের দিকে বসে আছে একটি কিশোরী মেয়ে৷ তার হাতে উটের দড়ি৷ পিছনে বসে আছে এক বৃদ্ধ৷ ওরা আমাকে দেখতে পেয়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছিল না৷
তাই অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে দু’হাত তুলে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠলুম, ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’
সঙ্গে সঙ্গে কিশোরীটি উটের দড়ি টেনে ধরল এবং উটটা মুখ উঁচুতে তুলে দাঁড়িয়ে গেল৷
আবার চিৎকার করে বললুম, ‘বাঁচাও! বাঁচাও!’
উট দৌড়তে শুরু করেছে আমার দিকে৷ এ কখনো মরীচিকা হতে পারে না৷ মরীচিকার কোনো ছায়া পড়ে না৷ কিন্তু এই উট এবং তার আরোহীদের লম্বাটে ছায়া পড়েছে৷
উটটা এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেল৷ কিশোরীটি ড্যাবডেবে চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল৷ বৃদ্ধ দুর্বোধ্য ভাষায় আমাকে কী বলল, বুঝতে পারলুম না৷ ইশারায় বোঝবার চেষ্টা করলুম, পথ হারিয়ে বিপদে পড়েছি৷ আমাকে উদ্ধার করো৷
উটকে ইশারা করতেই হাঁটু ভাঁজ করল৷ তখন বৃদ্ধ এবং কিশোরী নেমে দাঁড়াল৷ আমাকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে দেখে নিয়ে বৃদ্ধ এবার উর্দুভাষায় বলল, ‘তুমি কে? এখানে কেমন করে এলে?’
উর্দু আর হিন্দিতে তফাত খুব কম৷ জবাব দিলুম৷ ‘আমি হিন্দুস্তানী৷ খবরের কাগজের লোক৷ দোশান মরুভূমি দেখতে এসে দিগভ্রান্ত হয়ে পড়েছি৷ সারারাত ঘুরে মরছি৷’
বৃদ্ধ হাসল৷ ‘তাজ্জব কথা বটে৷ মরুভূমি দেখার শখ এত বেশি তোমার? ঠিক আছে৷ এসো আমাদের সঙ্গে৷ তবে আমার উটটা খুব ক্লান্ত৷ আগের রাতে আমরা গিয়েছিলুম এই মরুভূমির একটা তীর্থে৷ সেখানে এক পীরের দরগা আছে৷ মানত দিতে গিয়েছিলুম৷ ওখানে একটা মরুদ্যান আছে৷ সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় রওনা দিয়েছিলুম৷ কিন্তু উটটা পাজি৷ পথ ভুল করে উল্টোদিকে চলে গিয়েছিল৷ তাই সকাল হয়ে গেল৷ আমরা ফিরে যাচ্ছি রুন্ডির বাজারে৷’
বৃদ্ধের গায়ে একটা হাতাকাটা ফতুয়া, পরনে ঢিলেঢালা পাতলুন, কোমরে একপ্রস্থ কাপড় জড়ানো৷ মাথায় পাগড়ি আছে৷ তার কাছে একটা বল্লম আর সেকেলে গাদাবন্দুকও দেখতে পাচ্ছিলুম৷
মেয়েটির পরনে একটা ঘাগরা৷ কোমরবন্ধ আছে৷ ফুলহাতা জামার ওপর একটা হাতকাটা ক্ষুদে জহরকোটের মতো সবুজ ও নকশাদার আঙরাখা চাপানো৷ পরনে সালোয়ার ও পায়ে নাগরা জুতো৷ তার চুল বেণীবাঁধা৷ মাথায় একটা রুমালও সুন্দরভাবে জড়ানো আছে৷ সে ফ্যালফ্যাল করে আমাকে দেখছে আর দেখছে৷
সাজপোশাক দেখে মনে হল এরা কি জিপসীদলের লোক? তাই জিগ্যেস করলুম, ‘আপনারা কি রোমানি?’
জিপসীরা নিজেদের রোমানি বলে৷ বৃদ্ধ জবাব দিল, ‘হ্যাঁ আমরা রোমানি৷ আমাদের লোকেরা রুন্ডি বাজারের ওখানে একটা মাঠে তাঁবু পেতেছে৷ আমি ওদের সর্দার৷ দলের জন্যে মানত দিতে গিয়েছিলুম৷ তা, তোমার মুখ দেখে বুঝতে পারছি, খাওয়া জোটেনি৷ ঠিক আছে৷ রোদ বেড়ে যাচ্ছে৷ উটের পিঠে যেতে-যেতে খেয়ে নেবে৷’
উটের পিঠে সুন্দর গদির আসন৷ ছইয়ের মতো একটা কাঠামো চাপানো৷ তিন দিক তেরপলের মতো শক্ত কাপড়ে ঘেরা৷ ছাদও রয়েছে৷ আরামে বসব ভাবলুম৷ কিন্তু উট চলতে শুরু করলে বেজায় ঝাঁকুনি টের পেলাম৷ শরীরের ব্যথা বেড়ে গেল৷
বৃদ্ধ খুব দয়ালু৷ সে একটা টিফিন কেরিয়ার বের করে একটুকরো মোটা রুটি, খানিকটা জেলির মতো জিনিস আর একমুঠো কিসমিস দিল৷ বলল, ‘খেয়ে নাও৷ আর এই রইল জল৷ সবটাই খেয়ে নিতে পারো৷ আর আমাদের জলের দরকার হবে না৷ ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌঁছে যাব৷’
ক্ষুধা-তৃষ্ণা মিটিয়ে নিয়ে ওদের সঙ্গে গল্প শুরু করলুম৷ কথায়-কথায় জানা গেল, বৃদ্ধ জিপসী-সর্দারের নাম মেহেরু৷ ওর মেয়ের নাম রমিতা৷ ওরা রুন্ডিবাজার এসেছে দিন সাতেক আগে৷ তার আগে ওরা ছিল কাফরিস্তানে৷ সেটা বালুচিস্তান ও ইরানের মধ্যে একটা পাহাড়ি এলাকা৷ কাফরিস্তানে থাকার সময় ওদের তিনটে ভেড়া মারা পড়েছে অসুখে৷ রুন্ডিতে এসে কয়েকটা মুরগি মারা পড়েছে৷ ওদের ধারণা, শয়তানের নজর পড়েছে দলের ওপর৷ তাই তিখারি মরুদ্যানের তীর্থে পুজো দিয়ে এল৷
কিছুক্ষণের মধ্যেই রমিতার সঙ্গেও আমার খুব ভাব হয়ে গেল৷ আমি কোন দেশের লোক, সে-দেশটা কেমন, সব খুঁটিয়ে জিগ্যেস করল৷ তারপর অবাক হয়ে গেল যেন৷ সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা সবুজ বাংলার ছবি ওর কল্পনায় আসছিল না৷ তারপর কলকাতার কথা উঠল৷ কলকাতার কথা ওরা শুনেছে৷ বড়ো আজব শহর পুবের দেশে নাকি৷ বাবা ও মেয়ে অজস্র প্রশ্ন করে কলকাতা শহরের কথা জেনে নিল৷ তারপর বুড়ো বলল, ‘কলকাতা না দেখে ওর মৃত্যু হবে না৷ দেখা চাই৷ তবে সে তো বহুদিনের রাস্তা৷ সেই যা সমস্যা৷...’
ঘণ্টা দেড়েক চলার পর দিগন্তে রুন্ডি বাজারের বাড়িগুলো ভেসে থাকতে দেখা গেল৷ একটু ভয় হল এবার৷ কিষাণচাঁদ রুন্ডির কথা বলছিল৷ ওখানে নিশ্চয়ই ওর লোকজন আছে৷ আমাকে কি তারা চিনতে পারবে?
আরও আধঘণ্টা চলার পর আমরা রুন্ডি পৌঁছে গেলুম৷ রুক্ষ অনুর্বর পাহাড়ি এলাকা৷ কিছু কল-কারখানা আছে দেখলুম৷ শহরের বাইরে একটা উপত্যকায় জিপসীদের গোটা পাঁচেক তাঁবু রয়েছে৷ ছাগল-ভেড়া-দুম্বা আর মুরগির পাল আছে৷ বেঁটে কয়েকটা ঘোড়া আর উটও আছে৷ কুকুর আছে এক-ডজন৷ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করছিল কুকুরগুলো৷ দু’জন জোয়ান জিপসী তাদের তাড়া করে ভাগিয়ে দিল৷ তারপর তিরিশ বত্রিশ জন ক্ষুদে ও বড়ো নানা বয়সের জিপসী নারী-পুরুষ আমাকে ঘিরে ধরল৷ সর্দার মেহেরু তাদের অল্প কথায় ব্যাপারটা শুনিয়ে আমাকে তার তাঁবুতে নিয়ে গেল৷
তাঁবুর মধ্যে একটা খাটিয়ায় সুন্দর বিছানাপাতা রয়েছে৷ আমাকে শুয়ে পড়তে বলল৷ একটু পরে রমিতা এল হাসতে-হাসতে৷ ভাঙা উর্দুতে বলল, ‘ভাইজি৷ আপনার স্নান করা দরকার৷ আমি জল এনেছি কুয়ো থেকে৷ স্নান করে নিন৷’
বেরিয়ে দেখি, তাঁবুর সামনে একটা টুল পেতে রেখেছে৷ দুটো প্ল্যাস্টিক বালতিতে জল রয়েছে৷ রমিতার হাতে সাবানের কৌটো আর তোয়ালে৷ শুধু তাই নয়, একপ্রস্থ পোশাকও এনেছে৷
টের পাচ্ছিলুম, জিপসীরা একালের শহরে মানুষের ব্যবহৃত সব জিনিসই ব্যবহার করে৷ স্নান করার পর শরীরের ব্যথা অনেকটা কমে গেল৷ রমিতা ছাগলের টাটকা দুধ এনে দিল এক গ্লাস৷ বলল, ‘ভাইজি, খেয়েদেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও৷ খাবার সময় হলে ডাকব৷’
চোখের পাতা জড়িয়ে আসছিল৷ আমার পরনে এখন জিপসী পোশাক৷ ঘুমিয়ে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলুম৷ মরভূমির মধ্যে দুলতে দুলতে উটের পিঠে চলেছি তো চলেছি৷ রমিতা বলছে—ভাইজি! বাংলা মুল্লুক আর কতদূর?...
ঘুম ভেঙে দিল কার ভারী গলার ডাকাডাকিতে৷ তারপর চোখ খুলে কয়েক মুহূর্তে বুঝতে পারলুম না—কোথায় আছি৷
‘ডার্লিং! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে৷’
সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে উঠে বসলুম৷ এই কণ্ঠস্বর এবং এই বাক্যটি বহুকালের পরিচিত!
দেখি, আবার খাটিয়ার পাশে একটা টুলে বসে আছে আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার!
নিশ্চয়ই আবার বিদঘুটে একটা স্বপ্ন দেখছি৷ চোখ কচলে বললুম, ‘আপনি কি সত্যিই কলকাতার এলিয়ট রোডবাসী সেই বৃদ্ধ ঘুঘু?’
‘অবশ্যই সত্য, ডার্লিং?’
‘কিন্তু কী উদ্দেশ্যে এসেছেন? জয়ন্ত তো কিষাণ চাঁদের হাতে মারা পড়েছে৷ আমি জয়ন্ত নই৷ দেখছেন না, আমি একজন জিপ্সী৷’
‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি৷’
‘লজ্জা করেনি আপনার আমার কাছে আসতে? কাল সারারাত আমি মরুভূমিতে কী ভোগান না ভুগেছি৷ নেহাৎ বাবা-মার পুণ্যে কোনোমতে বেঁচে গেছি৷’
কর্নেল হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সব শুনেছি৷ জয়ন্ত, আমাদের ক্ষমা করো৷ তোমাকে উদ্ধারের জন্য যথাসাধ্য করেছি৷ সারাটা রাত পুরো একটা মিলিটারি কনভয় নিয়ে কর্নেল কামাল খাঁ আর আমি দোশান মরুভূমি তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছি৷ কিষাণচাঁদ যে পথনির্দেশ দিয়েছিল, তা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যে৷ ওর নিষ্ঠুরতার তুলনা নেই৷’
‘আমি জিপ্সী তাঁবুতে আছি, কে বলল?’
‘তোমাকে সারারাত খোঁজাখুঁজি করে আমরা রুন্ডির দিকে আসছিলুম৷ একখানে উটের পায়ের ছাপ দেখে সন্দেহ হল৷ পরীক্ষা করে দেখলুম, বালিতে কেউ শুয়েছিল৷ আশেপাশে কয়েকটা জুতোর ছাপও রয়েছে৷ তারপর উটের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে আমাদের গাড়ি এগোল৷ ছাপ গেছে সোজা উত্তরে৷ তখন ভাবলুম, হয়তো কিষাণচাঁদ তোমাকে এখনও ছেড়ে দেয়নি৷ কোনো কারণে আরও কোনো তথ্য আদায় করতে চায়৷ যাই হোক, এইমাত্র রুন্ডি পৌঁছে খবর নিতে শুরু করলুম—দোশান থেকে কোনো উটওয়ালা এদিকে এসেছে নাকি৷ তারপর সেইসূত্রে এদের তাঁবুতে এসে দৈবাৎ তোমাকে পেয়ে গেলুম৷’
তাঁবুর সামনে ভিড় জমেছিল৷ দু’জনে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, কর্নেল কামাল খাঁ একদল সেপাই নিয়ে আসছেন৷ জিপ্সীদের মুখে আতঙ্কের ছাপ পড়েছে৷ ব্যাপারটা কর্নেলকে বললুম৷ তখন তিনি ওদের উদ্দেশে ছোটোখাটো একটা ভাষণ শুরু করলেন৷ কর্নেল যে এত চমৎকার উর্দু জানেন, কে জানত৷
কর্নেলের বক্তৃতা শুনে ওরা খুশি হল৷ জিপ্সীরা খুব আমুদে৷ কেউ কেউ অতি উৎসাহে নাচগান জুড়ে দিল আমাদের ঘিরে৷
ভিড় ঠেলে রমিতা এতক্ষণে এসে আমার হাত ধরল৷ ‘ভাইজি, তুমি নাকি চলে যাচ্ছ?’
‘যাচ্ছি বোন!’
‘বা রে! তোমার জন্যে খানার যোগাড় হয়েছে না? তুমি আমাদের মেহমান (অতিথি)৷’
কর্নেল ওর চিবুকে সস্নেহে নাড়া দিয়ে বললেন, ‘বেটি! এ বুড়ো বুঝি মেহমান নয়?’
রমিতা সলজ্জ হেসে মাথা দুলিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, তুমিও মেহমান৷’
কর্নেল কামাল খাঁ ভিড়ে উঁকি মেরে বললেন, ‘আর আমি?’
রমিতা ভেংচি কেটে বলল, ‘তুমি তো মিলিটারি আদমি৷ মানুষ মারো৷ তুমি দূর হও এক্ষুনি৷’
সর্দার মেহেরু বলল, ‘ছি, ছি বেটি! সবাই মেহমান৷ আজ সবাই খাবে৷ আজ আমাদের জীবনে একটা খুশির দিন৷ তিখারির পীরবাবা আমাদের দয়া করেছেন৷ তাই এত সব বড়া আদমি আমাদের তাঁবুতে এসেছেন৷’
বলে সে জিপ্সীভাষায় ভিড়ের উদ্দেশে কিছু বলল৷ অমনি ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল৷ কাঠের খুঁটি পুঁততে শুরু করল জোয়ানরা৷ তার ওপর রঙীন নকশা-কাটা শামিয়ানা চড়াল৷ বুঝলুম, রীতিমতো একটা পার্টির আয়োজন হচ্ছে৷ কী সুন্দর ঝালরওয়ালা শামিয়ানা!
একটু তফাতে তেরপলের ছাউনির তলায় উনুনে বড়ো-বড়ো পাত্রে রান্না চাপল৷ যাকে বলে, কমিউনিটি ভোজ৷ একসঙ্গে ওরা খায়৷ এখন হঠাৎ মেহমান এসে পড়ায় বাড়তি খাদ্যের ব্যবস্থা হচ্ছে৷ দু’জন জোয়ান একটা মস্ত দুম্বা নিয়ে গেল টানতে টানতে৷ নিশ্চয়ই ওই দুম্বার মাংসে অতিথিদের সেবা হবে৷
গতিক দেখে কর্নেল কামাল খাঁ ওঁর দলবলকে ধমক-ধামক দিয়ে কোথায় যেন পাঠিয়ে দিলেন৷ পঞ্চাশজন সেপাইয়ের খাবার জোগানো এদের ওপর অত্যাচারের শামিল হত৷ জনা দুই মিলিটারি অফিসার এবং স্বয়ং কামাল খাঁ রয়ে গেলেন৷ একটা জিপ থাকল৷ জিপ ঘিরে জিপ্সী ছেলেমেয়েরা খেলা জুড়ে দিল৷ উজ্জ্বল রৌদ্রে বিশাল নীল আকাশের তলায় রঙিন পোশাকপরা ছেলেমেয়েদের মনে হচ্ছিল প্রজাপতির ঝাঁক৷
এদিকে তাঁবুর সামনে একদল যুবক-যুবতী গিটারের বাজনার সঙ্গে নাচগান শুরু করেছে৷ দেখলুম, বিশালদেহী কর্নেল কামাল খাঁ-কে ওরা টানতে টানতে ভেতরে ঢোকাল৷ তারপর তাজ্জব হয়ে গেলুম৷ মাথার ওপরে একটা হাত ঘুরিয়ে এবং মাঝে মাঝে গোঁফে তা দিয়ে ভুঁড়ি দুলিয়ে ও কোমর ঘুরিয়ে গোয়েন্দা দফতরের মিলিটারি অধিকর্তা সে কী নাচ নাচছেন!
হঠাৎ রমিতা দৌড়ে এসে কর্নেল বুড়োকে হ্যাঁচকা টান দিল৷
তারপর দেখলুম, বুড়ো আসরে ঢুকে গেছেন৷ এবং দিব্যি নাচ শুরু করেছেন৷ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের নাচ দেখব, সে কি স্বপ্নেও ভেবেছিলুম?
ওদের নাচগান চলতে থাকল৷ সর্দার মেহেরু আমাকে নিয়ে গেল ওর সেই তাঁবুতে৷ তারপর বলল, ‘তুমি কমজোর হয়ে গেছ, বেটা৷ তুমি রোদে ঘুরো না৷ চুপচাপ শুয়ে থাকো৷ খেতে একটু দেরিই হবে৷ ততক্ষণ তুমি এই আংরেজি কেতাবটা পড়তে পারো৷’
বইটা দেখে অবাক হলুম৷ জাঁ পল সোবার্তের লেখা ফরাসি বইয়ের ইংরাজি অনুবাদ: দা জিপসীজ৷ বললুম, ‘এই বই কোথায় পেলেন সর্দারজি?’
মেহের বলল, ‘এক সায়েব দিয়েছিল৷ আমাদের খবরাখবর জানতে এসেছিল৷ তখন আমরা কাফ্রিস্তানে ছিলুম৷ ওটা তুমি ইচ্ছে করলে নিতে পারো৷ আমরা কী করব ও নিয়ে?’
বইটা পড়তে শুরু করলুম৷ অনেক খবর জানা গেল৷ এরা আসলে ভারতেরই বাসিন্দা ছিল কোনো যুগে৷ এদের ভাষায় হিন্দুস্তানী শব্দ প্রচুর৷ রোমানি কথাটা এসেছে সংস্কৃত ‘রম্যাণি’ থেকে৷ তার মানে ভ্রমণকারী৷ ফারসি ভাষাও সংস্কৃতভাষার জ্ঞাতি৷ ফারসিতে ‘রম’ মানেও ভ্রমণ৷ ‘রমতা’ মানে বেড়াচ্ছে৷
তাহলে রমিতার মানে দাঁড়ায়— যে মেয়ে সারাজীবন বিশ্বজুড়ে ঘুরে বেড়াবে বলে জন্মেছে৷ হায়, আমি যদি একজন জিপসী হতুম, রমিতা হত আমার ছোটোবোন!
রওনা হতে পাঁচটা বেজে গেল৷ রমিতার জন্যে রুন্ডি বাজার থেকে কয়েকটা সুন্দর পাথরের মালা আর একজোড়া সোনার দুল কিনে এনেছিলুম৷ সেগুলো পেয়ে রমিতার কী খুশি!
কিন্তু যাবার সময় সে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, ‘ভাইজি এমন করে চলে যাবে জানলে ওই মরুভূমিতেই ফেলে রেখে আসতুম৷’
ওকে আদর করে বললুম, ‘বোনটি আমার! রাগ কোরো না৷ আবার দেখা হবে৷’
সে বেণী দুলিয়ে জোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘হবে না৷ বাইরের লোকের সঙ্গে আমাদের দু’বার দেখা হয় না৷’
‘বেশ৷ তাহলে মরে গিয়ে আমি তোমাদের দলে জন্মাব৷’
রমিতা কী বুঝল কে জানে, হঠাৎ ভেংচি কেটে দৌড়ে চলে গেল তাঁবুর দিকে৷
কিছুক্ষণ পরে পাহাড়ের চড়াইয়ে ওঠার সময় ঘুরে নীচের উপত্যকার জিপসী তাঁবুগুলোর দিকে তাকালুম৷ হঠাৎ দেখতে পেলুম, উপত্যকার পূর্বদিকের টিলার চূড়ায় একটা পাথরের ওপর রমিতা দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে রুমাল নাড়ছে৷
আমি হাত নেড়ে মনে মনে বললুম—বিদায় রমিতা! বিদায়! মন খারাপ হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্যে৷ এই যাযাবর মানুষগুলোর সম্পর্কে কত ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে৷ ওরা নাকি চোর-ডাকাত, খুনে এবং জাদুকর!
মনে হল, সব মিথ্যা৷ ওদের ওই চির-যাযাবর জীবনের আনন্দ, ওদের স্বাধীনতা আর বাধা-বন্ধহীন উদ্দাম জীবন দেখে ঈর্ষাবশত আমরা ওদের নামে বদনাম রটাই৷
কিছুক্ষণ পরে আমাদের জিপ পৌঁছল একটা প্রশস্ত হাইওয়েতে৷ অজস্র যানবাহন যাতায়াত করছে৷ কর্নেল কামাল খাঁ জানালেন—এই হাইওয়ে লারকানায় পৌঁছেছে৷
উনি জিপ চালাচ্ছেন৷ কর্নেল ও আমি ওঁর ডানপাশে বসেছি৷ এতক্ষণে কর্নেলকে জিগ্যেস করার সময় পেলাম৷ ‘শেষ পর্যন্ত কী হল গুপ্তধনের?’
কর্নেল বললেন, ‘হিটাইট সিলমোহরের অবিকল একটা নকল ভাগ্যিস আগেভাগেই তৈরি করিয়ে রেখেছিলুম৷ সেটা দেওয়া হয়েছে কিষাণচাঁদকে৷ চিত্রলিপি অদলবদল করা হয়েছে ডঃ তিড়কের সাহায্যে৷ ওই সূত্র ধরে কিষাণচাঁদ ফাঁদে পড়বে৷ কামালসায়েব ফাঁদ পেতে রেখেছেন৷ মোহেনজো-দাড়োর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে লুকিয়ে আছে ওঁর বাহিনী৷’
‘গতরাতে দুহালার সেই গুহায় কি আমার খোঁজ করেন নি আপনারা?’
‘করেছিলুম৷ তোমাকে পাইনি৷ তারপর...’
‘থাক ও কথা৷ এবার হিটাইট সিলমোহরটার কথা বলুন৷’
‘ওটা হিটাইট-রাজ তাবার্নার সিলমোহর৷ ওটা একটা আদেশপত্র৷ তাতে লেখা আছে:
‘এতদ্বারা হিটাইট রাজ তাবার্না তাঁর পুত্র হেহয়কে আদেশ দিচ্ছেন, প্রিয় সখা ইন্দিলাম্মার অস্থিভস্ম সিন্ধুতীরবর্তী সূর্য-উপাসক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দিতে হবে৷’
বললুম, ‘কিন্তু হেহয় তো উত্তর ভারতের রাজা ছিলেন!’
কর্নেল বললেন, ‘হ্যাঁ ও ঘটনা ভারতে আর্যদের আগমনের প্রথমযুগের৷ হিটাইটরাও আর্য৷ আর্যদের যে-গোষ্ঠিকে বলা হয় ইন্দো-ইরানীয়, তাদের উপাস্য দুই দেবতা অসুর ও দেবকে কেন্দ্র করে পরস্পর সংঘর্ষ বেধেছিল৷ দেব-ভক্ত আর্যগোষ্ঠি পালিয়ে এসে পশ্চিম ভারতে বসতি স্থাপন করে৷ অসুর-ভক্তরা ইরানে থেকে যায়৷ ওদিকে একদল হিটাইটরাও কাশ্মীর হয়ে উত্তর ভারতে এসে বসতি করে৷ তাবার্নার পুত্র হেহয় ছিল এই গোষ্ঠির নেতা৷ এ পর্যন্ত আমরা প্রমাণসিদ্ধ ইতিহাস পাচ্ছি৷ পরেরটুকু এই চাকতি থেকে অনুমান করে নিতে হয়েছে৷’
‘বলুন, শুনি৷’
‘সম্ভবত দেবভক্ত আর্যদের আর-একটা দল সূর্য-উপাসক হয়ে ওঠে এবং দুহালায় গিয়ে বাস করতে থাকে৷ তাদেরই নেতার নাম ইন্দিলাম্মা৷ ইন্দি শব্দটাতে সিন্ধুর আভাস আছে৷ যাই হোক, ইন্দিলাম্মা হিটাইটরাজ তবার্নার প্রিয় বন্ধু ছিলেন৷ হাট্টিদেশে বেড়াতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে তিনি মারা যান৷ তাই তাবানা তাঁর অস্থিভস্ম পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পুত্র হেহয়ের কাছে উত্তর ভারতে৷ এর পর কী ঘটেছিল, তিব্বতী মঠের পুঁথিতে পাওয়া যাচ্ছে৷ এখানে একটা কথা বলা দরকার৷ গৌতম বুদ্ধ খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকের৷ আর এ ঘটনা তার আড়াই হাজার বছর আগের৷ কিন্তু আধুনিক পণ্ডিতদের মতে, বৌদ্ধধর্ম আরও প্রাচীন৷ গৌতম বুদ্ধ ১৯তম বুদ্ধ ছিলেন৷ কাজেই আর্যযুগেও বৌদ্ধ ছিল তিব্বত অঞ্চলে৷
‘হেহয় এই সময় রাজ্যচ্যুত হন এবং পিতৃ আদেশ পালন করতে ঘোড়ার পিঠে একটা বাক্সে ইন্দিলাম্মার চিতাভস্ম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন৷ পশ্চিম-তিব্বত ঘুরে তিনি কাশ্মীর হয়ে পাঞ্জাব পেরিয়ে দুহালা পৌঁছনো নিরাপদ মনে করেছিলেন৷ তারপর যথাসময়ে তিনি পৌঁছান মোহেনজো-দাড়ো শহরে৷ বাকসে বিন্দু-চিহ্ন মৃতের প্রতীক৷ শ্মশানগুহার জালার গায়ে এই চিহ্ন আমরা দেখেছি৷’
‘কিন্তু তিনি অস্থিভস্মের বাকসো পুঁততে গেলেন কেন?’
‘ডঃ তিড়কে ব্রোঞ্জের সেই ফলকটা ভালোভাবে পরীক্ষা করে একটা কারণ খুঁজে পেয়েছেন৷ ঘোড়াটার যে চিত্রকল্প আঁকা হয়েছে, তা একটা রুগ্ন ঘোড়ারই৷ কারণ ঘোড়ার পেটের দিকটায় টানা কয়েকটা রেখা আছে৷ ওগুলো পাঁজরের হাড় বেরিয়ে পড়া ঘোড়া৷ তা না হলে স্বাভাবিক রীতিতে অন্যান্য জীবজন্তুর ছবির মতোই পেটটা চৌকো করে আঁকা হত৷ কোনো রেখার আঁকিবুকি থাকত না৷’
‘খুব যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা৷ তারপর?’
‘ঘোড়াটা বাকসো বইতে পারছিল না৷ ওদিকে সম্ভবত দীর্ঘ পথশ্রমে ক্লান্ত হেহয় দুহালা পৌঁছতে পারেননি৷ বিশ্রাম করতে চেয়েছিলেন মোহেনজো-দাড়োতে৷ কিন্তু পবিত্র অস্থিভস্মের বাকসো দেখে লোকেরা কানাকানি শুরু করেছিল৷ পাছে বাকসোটা কেউ কেড়ে নিয়ে ধনরত্বের বদলে ছাই দেখে তা নষ্ট করে ফেলে, তাই হেহয় ওটা সে-বারের মতো নির্জন কোনো গুপ্তস্থানে পুঁতে রাখতে গিয়েছিলেন৷ ঘোড়াটাও আর ভার বইতে পারছিল না৷ তাঁর পক্ষে বাকসো বয়ে নিয়ে সৌর উপাসক সম্প্রদায়ের জনপদ খুঁজে বের করা কঠিন কাজ৷ ফলে যা স্বাভাবিক, তাই করতে গেলেন এবং এক গুপ্ত অনুসরণকারীর পাল্লায় পড়লেন৷ আশা করি, এবার সব স্পষ্ট হয়েছে তোমার কাছে৷’
‘হয়েছে৷ তাহলে অস্থিভস্মের জন্যেই এতকাল ধরে এত হাঙ্গামা আর খুনোখুনি? ভ্যাট! কোনো মানে হয়? ’
‘হ্যাঁ, জয়ন্ত৷ অলীক গুপ্তধনের নেশা৷ এ নেশা চিরকালের৷’
একটু পরে জিগ্যেস করলুম, ‘ফকিরসায়েব কোথায় আছেন?’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘করাচি রওনা হয়ে গেছেন৷ সেখান থেকে মক্কাতীর্থে যাবেন৷ সেখানেই বাকিজীবন সন্ন্যাস-ব্রতে কাটাবেন৷’
‘একটা প্রশ্নের জবাব বাকি আছে৷’
‘কী?’
‘কাল সন্ধ্যায় সব জেনেও কেন দুহালা অভিযানে গিয়েছিলেন? খামোকা যত রাজ্যের বিপদ আমাকেই ভুগিয়ে ছাড়লেন৷’
কর্নেল জোরে হাসলেন, ‘গিয়েছিলুম শ্মশানগুহায় হেহয়ের বাকসোটারই সন্ধানে৷ সেই সঙ্গে বন্ধুবর কামাল খাঁয়ের প্লান ছিল দুর্ধর্ষ ডাকু কিষাণচাঁদকে বন্দি করা৷’
কর্নেল কামাল খাঁ বললেন, ‘কাল হাত ফসকে পালিয়েছিল৷ উটের পিঠে যে জয়ন্তবাবুকে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাটা, কীভাবে বুঝব? ব্যাট৷ ছদ্মবেশ ধরতে ওস্তাদ৷ দিব্যি উটওয়ালা সেজে নাকের ডগা দিয়ে চলে গেল৷ তখন রাত প্রায় সাড়ে-ন’টা৷ তবে আজ আর ওর নিস্তার নেই৷ ফাঁদে পড়বেই৷’
বললুম, ‘আচ্ছা কর্নেল, অস্থিভস্মের বাকসোটা কি পেয়েছেন?’
কর্নেল বললেন, ‘পেয়েছি৷ শ্মশানগুহায় একটা জালার মধ্যে ছিল৷ পাথরের বাকসো৷ দু-ফুট চওড়া, আড়াইফুট লম্বা৷ মজার ব্যাপার, হেহয়ের হত্যাকারী এটা পৌঁছে দিয়ে থাকবে৷ সেই বাকসের গায়েও অবিকল একই কথা লিখে রেখেছে সে৷ ব্রোঞ্জের ফলকে এবং ঘোড়ার চোয়াল রাখা সিন্দুকের গায়ে লেখা ছিল, হুবহু তাই৷ বোঝা যায়, খুব অনুতপ্ত হয়েছিল লোকটা৷...’
বাকি পথ আমরা চুপচাপ ছিলুম৷ জিপের গতি ক্রমশ বাড়ছিল৷ সাতটার মধ্যে পৌঁছে গেলুম লারকানায়৷ সেই হোটেলের পরিচিত ঘরে আমাদের পৌঁছে দিয়ে কর্নেল কামাল খাঁ চলে গেলেন৷
অনেক রাতে কর্নেলের ডাকে ঘুম ভাঙল৷ কর্নেল বললেন, ‘সুসংবাদ ডার্লিং! এইমাত্র বন্ধুবর কামালের ফোন পেলুম৷ মোহেনজো-দাড়োর শস্যগোলার ওখানে কিষাণচাঁদ এবং তার সঙ্গীরা ধরা পড়েছে৷ এবার নিশ্চিন্তে ঘুমোও৷ অনেক ভোগান্তি গেছে তোমার ওপর৷ তবু তোমার বাকি রাতের সুনিদ্রার কথা ভেবে তোমাকে—এই খবর দেওয়া জরুরি ভেবেছিলুম৷ আর ডার্লিং জয়ন্ত, আগামীকাল সকালে আমরা সিন্ধু-সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাব৷ শুভরাত্রি! সুপ্রচুর সুনিদ্রা হোক!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন