কিছু অলৌকিক

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ভূতের পাহাড়ে একটি সূর্যাস্ত

মে মাসের গরম আবহাওয়ায় যাঁরা জীবনধারণ অসহ্য মনে করেন, সময় ও টাকাকড়ি থাকলে তাঁদের পক্ষে বাণেশ্বরের চেয়ে ভালো জায়গা আর দুটি নেই৷ উত্তরপ্রদেশ ও নেপালের সীমান্তে এই তরাই অঞ্চলের পাহাড়ি জঙ্গল বসন্ত ও গ্রীষ্ম, দুটি ঋতুতেই নিজস্ব সৌন্দর্যের জন্যে প্রসিদ্ধ৷ বসন্তে গাছে-গাছে ও ঝোপেঝাড়ে যে অজস্র লাল ও হলুদ ফুল ফোটার পালা শুরু হয়, গ্রীষ্মের শেষ দিনটি অবধি তাতে বিরতি পড়ে না৷ যে দিকে চোখ যায়, স্থির শব্দহীন ওই উজ্জ্বল রঙের মেলা ভ্রমণবিলাসী ও শান্তিকামীদের মন ভরিয়ে দেয় অপার্থিব কী এক সুখের স্বাদে এবং তার সঙ্গে যখন দূর সমতলের উচ্চণ্ড আবহাওয়া সইতে না পেরে পালিয়ে আসা হাজার-হাজার পাখি প্রতিটি সকাল-সন্ধ্যা কোরাসে গান গাইতে থাকে, মনে পড়ে যায় প্রখ্যাত এক ফারসি কবির অতিখ্যাত একটি লাইন: ‘স্বর্গ যদি কোথাও থাকে, সে এখানে—এখানে এবং এখানেই৷’

সমুদ্রতল থেকে তিন-সাড়ে তিন হাজার ফুট উঁচুতে আছে বলে বাণেশ্বরের আবহাওয়া এই গ্রীষ্মে খুবই শান্তিদায়ক৷ রাতের দিকে বরং একটু শীত-শীতই লাগে৷ বিশেষ করে রাত তিনটের পর হিমালয়ের তুষারে-ঢাকা উত্তর অঞ্চল থেকে একটা হাওয়া আসে শেষরাতের অতিথির মতন, সূর্য না ওঠা অবধি সে বেশ খানিকটা দাপট দেখাতে থাকে এবং তখন গায়ে কম্বল না চড়ালে রক্ষে থাকে না৷

বাণেশ্বরের আরেকটি বড়ো আকর্ষণ, ধর্ম৷ বাণেশ্বর-শিবের একটি খুব পুরোনো মন্দির আছে এখানে৷ সারা ভারত থেকে লক্ষ তীর্থযাত্রী বছরের একটি সময়ে এখানে এসে ভিড় জমান৷ সে সময়টা হল চৈত্রের শিবচতুর্দশী তিথি৷ তারপর কিছুদিন বাণেশ্বর চুপচাপ অনাথ পড়ে থাকে৷ স্থায়ী ছোট্ট বাজারটা আবার ফাঁকা-ফাঁকা দেখায়৷ কিছু সরকারি আপিস, কোয়ার্টার, একটা স্বাস্থ্যনিবাস, তিনটে ছোটো-বড়ো হোটেল আর ত্রিশ-বত্রিশটি বেসরকারি বাড়ি মিলে অল্পস্বল্প জীবনযাত্রার যা ভিড় ও চাঞ্চল্য, তা বিশাল আকাশ ও পরিব্যাপ্ত অরণ্য-ভূমিতে খুব একটা তরঙ্গ তুলতে পারে না৷

তারপর গ্রীষ্মে আস্তে-আস্তে কিছু ভ্রমণবিলাসীর ভিড় দেখা যায়৷ কিন্তু তাঁরা অনেকেই টাকা-কড়িওয়ালা মানুষ৷ কারণ এখানে জিনিসপত্রের দাম বড্ড চড়া৷ হোটেলভাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে৷ এর একমাত্র কারণ বাণেশ্বরের ইউরোপীয় ঐতিহ্য—যা ব্রিটিশ আমলের সৃষ্টি৷ শিবমন্দির এলাকায় ধর্মশালা অবশ্য আছে৷ কিন্তু সেখানে সাধু-সন্ন্যাসীদেরই দাপট বেশি৷ আর, সারা ভারতে এটা বরাবর লক্ষ্য করার মতন ব্যাপার যে একমাত্র বাঙালিই সম্পূর্ণ ধর্মছাড়া কারণে অর্থাৎ নিছক ভ্রমণ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যলিপ্সায় ঘরের বাইরে পা বাড়ায় এবং বাণেশ্বর কেন, এ-জন্যে আরও দুর্গম জায়গায় যেতে তার আপত্তি নেই৷ অন্য প্রদেশবাসীরা এরকম ধর্মহীন বা অর্থোপার্জন বর্জিত ভ্রমণের সচরাচর পক্ষপাতী নন৷ বাঙালি মানসিকতার বৈশিষ্ট্য এটাই৷

বাণেশ্বরের পূর্বপ্রান্তে বয়ে চলেছে সারদা নদী, ওপারে নেপাল৷ উত্তরদিকটা খুবই দুর্গম, খাড়া পাহাড়ের দেওয়াল নেমে গেছে ভয়ংকর খাদে, তারপর শুরু হয়েছে ঢেউখেলানো পাহাড় ও বনাঞ্চল, দূরে তুষার-ঢাকা পাহাড়গুলো পর্যন্ত বিস্তৃত৷ বাকি পশ্চিম ও দক্ষিণেও তেমনি পাহাড় ও জঙ্গল আছে—কিন্তু অনেক রাস্তাঘাট ও মাঝে-মাঝে উপত্যকা থাকায় দুর্গম নয়৷ এইসব রাস্তায় এখন বাস চলাচল করে নিয়মিত৷ কোথাও পাহাড়ি নদী থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, কোথাও সেনানিবাস ও সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে৷ কিন্তু কয়েক-শো বর্গমাইল পাহাড়-জঙ্গলের পরিবেশে এসব মানুষোচিত স্পন্দন খুবই নগণ্য৷ এখনও প্রকৃতির দাপটই এখানে বেশিমাত্রায় প্রকট৷ আদিমতার বিস্তীর্ণ অন্ধকারময় সমারোহে ইলেকট্রিক বালবগুলো জোনাকির চেয়েও তুচ্ছ হয়ে পড়ে৷ পাহাড়ের গায়ে কোনও উজ্জ্বল সাদা বা হলুদ বাড়িও মনে হয় এই আদিমতার একটি অদ্ভুত ধরনের অংশ ছাড়া কিছু নয়৷

আমার বৃদ্ধ সঙ্গী এবং বন্ধুটি, যাঁর নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, একজন খাঁটি প্রকৃতিবিদ৷ বাইনোকুলার ও আশ্চর্য একটি ক্যামেরা সবসময় তাঁর কাছে থাকে৷ নানা জাতের পাখি দেখা ও নোট করে যাওয়া তাঁর হবি৷ এক বিকেলে যখন আমরা ‘গ্রিন ভিউ’ হোটেল থেকে বেরিয়ে টনকপুর রোডে ঘুরছি, ডানদিকের লাগোয়া পাহাড়ের চুড়োয় পুতুল-পুতুল দুটি মেয়ের মূর্তি দেখতে-দেখতে তিনি বললেন—বুঝলে জয়ন্ত, এই হচ্ছে বাঙালির মানসিক বৈশিষ্ট্য৷ ওই যে মেয়ে দুটিকে দেখছ, বাইনোকুলার ছাড়াও এই বুড়ো চোখে দেখে আমি বলতে পারি—ওঁরা সেই বঙ্গ-ললনাদ্বয়৷ ওঁরা এখন সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছু দেখছেন না এবং নিছক সৌন্দর্যের খাতিরেই সবরকম বিপদ-আপদের তোয়াক্কা না করে অকুতোভয়ে এই ভূতের পাহাড়ে উঠে গেছেন৷

বুড়োর ধারণা কখনও মিথ্যা হতে দেখিনি৷ তবু ব্যাপারটা বেশ অবাক লাগল৷ এখানে আসার পরই শুনে আসছি যে ওটা ভূতের পাহাড় নামে কুখ্যাত এবং পারতপক্ষে ওটাতে কেউ ওঠে না৷ অথচ এখন এই শেষবেলায় দুটি মেয়ে ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেন? বাঙালি যতই সৌন্দর্যের পূজারি হোক, ভূতের ব্যাপারে সে আফ্রিকার আদিমতম গোষ্ঠীর চেয়ে কোনও অংশে পিছিয়ে নেই—এটা অস্বীকার করবে কোন মূর্খ?

কর্নেলের কাছ থেকে বাইনোকুলারটা নিয়ে চোখে রাখলুম৷ অমনি চমকে উঠলুম৷ চিনতে একটুও ভুল হল না৷ আরে, এঁরা তো আমাদের পাশের স্যুটেই গতকাল এসে উঠেছেন! অল্পস্বল্প আলাপও হয়েছে পরস্পর—তবে সেটা এই বুড়োর দৌলতে৷ ইনি যেখানে যান, আলাপ জমাতে তো দেরি করেন না—তা সে যে শ্রেণির লোক হোক না কেন!

বাইনোকুলারটা নামিয়ে রেখে বললুম—মাই ডিয়ার ওল্ড ম্যান, আপনি কি পূর্বজন্মে পক্ষিবিশেষ ছিলেন, যারা এক মাইল ওপর থেকেও পৃথিবীতে প্রাণীর নিস্পন্দ দেহ দেখতে পায়?

কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন—তুমি আমাকে শকুন বলতে চাও, জয়ন্ত?

—তা ছাড়া কী বলব?...বলে কপট গাম্ভীর্যে বাইনোকুলারটা ফিরিয়ে দিলুম ওঁর হাতে৷—ওঃ! এইসব দিব্যদৃষ্টির অধিকারীদের কাছাকাছি থাকতেও বড্ড ভয় করে৷ মানুষের মনের ভেতরও তাঁদের দৃষ্টি হানা দিতে পারে বইকী!

—পারে৷... কর্নেলের মুখ কৌতুকে উজ্জ্বল হল৷ —যেমন, এ মুহূর্তে শ্রীমান জয়ন্তের চিত্তচাঞ্চল্য আমি স্পষ্ট অবলোকন করতে পারছি৷ সে এই পক্ককেশ শ্মশ্রুবিশিষ্ট বুড়োকে ছেড়ে ভূতের পাহাড়ে উঠে যেতে চাইছে৷ তার তর সইছে না তো, আমার আপত্তি নেই, জয়ন্ত৷ চলে যাও৷ ওঁদের সঙ্গ দিয়ে আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে এসো৷ আর, দেখো জয়ন্ত, প্রকৃতির মধ্যে মানুষ একা গিয়ে পড়লেই নিঃসঙ্গ বোধ করে—সে হাঁপিয়ে ওঠে৷ কারণ আদিম সময় থেকেই মানুষ যুথবদ্ধ প্রাণী হয়ে বেঁচে আসছে৷ এই লক্ষ-লক্ষ বছরের অভ্যাস তার দেহের কোষে-কোষে—ক্রোমোসোমে অর্থাৎ জিনপুঞ্জে ডি এন এ অণুর মধ্যে রয়ে গেছে৷

হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলুম—প্লিজ কর্নেল, প্লিজ! জেনেটিকস নিয়ে লেকচার শুরু করলে এই চমৎকার বিকেলটার কী পরিণতি ঘটবে, ভেবে আমি শিউরে উঠছি৷ তার চেয়ে দয়া করে চলুন, আজ আমরা দু’জনেই ওই ভূতের পাহাড়ে উঠে যাই৷ তা ছাড়া, হে ধুরন্ধর গোয়েন্দা মহোদয়, পাহাড়ের ভূত-ঘটিত রহস্যও তো আপনার এবারকার ভ্রমণের সূত্রে একটা আশ্চর্য অভিজ্ঞতা হতে পারে৷

কর্নেল একবার বাঁ-দিকের রাস্তার ওধারে দক্ষিণের ঢালু হয়ে যাওয়া জঙ্গল ও উপত্যকায় উড়ন্ত পাখির ঝাঁক দেখে নিয়ে বললেন—কিচ্ছু অসম্ভব নয়, জয়ন্ত৷ এটা আমার ভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্য বলতে পারো, যেখানে যাই, তোমাদের হিন্দু দেবতা নারদের ঢেঁকির মতন একটা-না-একটা ডেড-বডি আমার বাহন হয়ে ওঠে! হরিবল জয়ন্ত, হরিবল! যেন এক ইটারনাল মার্ডারার আমার পিছনে সবসময় ওত পেতে ঘুরছে৷

কর্নেলের মুখে আচমকা একথা বেরোতে শুনে আমার যেমন অবাক লাগল, তেমনি অজানা আতঙ্কে গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল৷ কেন এ-কথা বলছেন কর্নেল? এখানে এসে তেমন কি কোনও ভয়ংকর ঘটনার আভাস পেয়েছেন?

আরও আড়ষ্ট হয়ে দেখলুম, বুকে উনি ক্রস আঁকলেন৷ উদ্বিগ্ন হয়ে বললুম—হঠাৎ এসব কেন কর্নেল?

—ও কিছু না৷ ভূতের খাতিরে৷ যেখানে ভূত, সেখানেই মৃত্যুর গন্ধ৷ চলো জয়ন্ত, অবশেষে তা হলে আমরা ভূতের পাহাড়েই যাই৷ কিন্তু সাবধান বৎস, শ্যামলী ও জয়ন্তীর সঙ্গে কখনও প্রেম জমাতে চেষ্টা করবে না—কারণ তোমার ফিঁয়াসে বেচারি চন্দ্রাণীর কাছে তোমার দায়-দায়িত্ব আমাকে বুঝে নিতে হয়েছে৷ ফিরে গিয়ে তোমার সম্পর্কে একটা সার্টিফিকেট আমার কাছে না পেলে সে সংশয়ে ভুগবে৷

হো-হো করে হেসে উঠলুম ওঁর কথার ভঙ্গিতে৷ তারপর ‘আই অ্যাসিওর ইউ, ওল্ড ওয়াচডগ’ বলে ওঁর একটা হাত নিলুম এবং ভূতের পাহাড়ে চড়া শুরু হল৷

আমার প্রাজ্ঞ সঙ্গীর বয়স ষাট পেরিয়ে গেছে৷ তবু মাঝে-মাঝে ওঁর শারীরিক ক্ষমতা দেখে তাক লেগে যায়৷ এই বত্রিশেই আমার কয়েকশো ফুট খাড়াই ভাঙতে হাঁফ ধরে যাচ্ছিল, আর উনি পাহাড়ি বাঘের মতন অনায়াসসাধ্য ক্ষিপ্রতা ও দক্ষতায় সবসময় অনেকটা করে এগিয়ে রয়েছেন৷ এখন যদি প্রশ্ন করি তা হলে উনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা রণাঙ্গনের কোন-কোন পাহাড়ে উঠেছিলেন, তার বর্ণনা শুরু করবেন৷ সর্বক্ষেত্রে ওই একটি বাক্যই তাঁর মূলধন: বাছা জয়ন্ত, কথাটা হচ্ছে ‘অতীত অভিজ্ঞতা৷’ তবে কিনা এ জিনিসটা সব মানুষেরই আছে৷ স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষ তা অর্জন করে৷ কিন্তু তাকে কাজে লাগাতে পারে ক’জন? যে পারে, তাকেই আমরা সবখানে জিতে যেতে দেখি৷ এখন, আমার কথা উঠলে বলব যে, আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার প্রতিটি ব্যাপারেই সাধ্যমতো অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবার চেষ্টা করি৷

ওঁর এ স্বভাবটাও আমার এতদিনের জানা হয়ে গেছে যে কর্নেল বলে ডাকলে উনি খুবই খুশি হন৷ পদবিটা ওঁর সামরিক জীবনের স্মারক৷ কিন্তু মজার কথা, যোদ্ধা হিসেবে উনি কত বড়ো ছিলেন জানি না, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার বা গোয়েন্দা হিসেবে ওঁর কুশলতার কোনও তুলনা নেই৷ এটা ওঁর বর্তমান পেশা নয় মোটেও৷ নিছক হবি—বিরল জাতের পাখি খুঁজে বের করার হবির মতনই এটা খেয়ালি ঝোঁক৷ এ-জন্যে একটি পয়সাও কারও কাছে উনি দাবি করেন না৷

যাই হোক, ভূতের পাহাড়ের দক্ষিণ কাঁধ দিয়ে দূর উপত্যকার ওদিক থেকে পড়ন্ত সূর্যের লালচে রোদ্দুর এসে পড়ে ওঁর মুখটা জ্বলজ্বল করছিল৷ খানিকটা ঝোপঝাড়ে ভরা খাড়াই অনেক কষ্টে ভেঙে এবার আমরা বেশ ঢালু ঘাসের জমি পেয়ে গেলাম৷ জমিটায় বড়ো-বড়ো পাথর ছড়ানো৷ তার ডাইনে অর্থাৎ উত্তরে ঘন গাছপালার জঙ্গল৷ ঢালুটা পেরিয়ে সোজাসুজি চুড়োয় ওঠা অসম্ভব—সামনে একটা গ্রানাইট দেওয়াল রয়েছে৷ তাই আমাদের ডাইনের জঙ্গলে ঢুকতে হল৷ এখানে ঢোকার পর আমরা শ্যামলী ও জয়ন্তীকে আর দেখতে পাচ্ছিলুম না৷ গাছের আড়াল দৃষ্টিতে বাধা দিচ্ছিল৷

কর্নেল এক জায়গায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন৷ তারপর কান পেতে কিছু শুনে বললেন—কাছাকাছি ওপিঠে কোথায় একটা ঝরনা আছে মনে হচ্ছে৷ নিশ্চয়ই সাধারণ ঝরনা নয়, পাতাল জলের ধারা৷ অর্থাৎ যাকে বলে প্রস্রবণ৷ এনি ওয়ে! জয়ন্ত, সম্ভবত, ওই ঝরনার জল স্বাস্থ্যকর৷ ফেরার পথে সময় থাকলে একবাব ওদিকটা ঘুরে যাব৷ আমার কাছে একটা হ্যাভারস্যাক রয়েছে৷ কিছু জল নিয়ে যাব৷

তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন—হুম! তুমি অধৈর্য হয়ে পড়েছ! চলো, এখন আমরা চুড়োর ওদিকেই যাই৷

ক্লান্তির জন্যে পরিহাসটা গায়ে মাখলুম না৷ তা ছাড়া ইতিমধ্যে আমি এক অদ্ভুত ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠেছিলাম৷ এই পাহাড়টার নাম ভূতের পাহাড় কেন? শনশন করে হাওয়া বইছিল আর নির্জন পাহাড়ি জঙ্গল জুড়ে কী যেন ধুন্ধুমার অদৃশ্য উপদ্রব চলছিল, ঠিক বোঝাতে পারব না এই অনুভূতিটা—মনে হচ্ছিল, জীবিতদের আবির্ভাবে যুগ-যুগান্তের বাসিন্দা অশুভ আত্মারা যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে! একটা আশ্চর্য ব্যাপার দেখলুম, এলাকার অন্য সব পাহাড় ও জঙ্গলের মতন এখানে কোনও গাছেই ফুল নেই, এখানে কোথাও কোনও পাখিও নেই৷ সচরাচর পাহাড়ি এলাকায় যে গিরগিটিজাতীয় প্রাণী সবসময় চোখে পড়ে, তারাও এখানে নেই৷ তখন আরও সচেতন দৃষ্টিতে পরখ করতে থাকলুম এবং টের পেলুম যে এক উদ্ভিদ ছাড়া দ্বিতীয় কোনও পার্থিব প্রাণী যেন এখানকার বাসিন্দা নয়! এ যে রীতিমতো অবিশ্বাস্য ব্যাপার!

পথ বলতে কিছু নেই৷ আন্দাজ করে এগোতে হচ্ছিল৷ জঙ্গলের পর বড়ো-বড়ো পাথরের টুকরো পেরিয়ে যেতেই আমরা ৪৫ ডিগ্রি কোণ বরাবর উঁচুতে ফের মেয়ে-দুটিকে দেখতে পেলুম৷ ওদের কথা কিছুক্ষণ ভুলেই গিয়েছিলুম যেন৷ এখন দেখামাত্রই দ্বিতীয় এক বিস্ময় জাগল! এরকম কষ্টসাধ্য চড়াই ভেঙে ও জঙ্গল ঠেঙিয়ে এই নির্জন কুখ্যাত পাহাড়ের চুড়োয় গিয়ে ওঠার ক্ষমতা ও সাহস ওরা পেল কোথায়? বিশেষ করে, দুটি বাঙালি মেয়ে ওরা—বয়স বড়োজোর পঁচিশের মধ্যেই৷ কোনও পুরুষ সঙ্গী নেই৷ মেমসায়েব হলে অবাক হতুম না নিশ্চয়ই৷ তাই কথাটা মনে আসার সঙ্গে-সঙ্গে কর্নেলকে বললুম—হ্যাল্লো ওল্ড ম্যান, নীচে থেকে যা ভেবেছিলুম, পাহাড়টা অত সাদাসিধে গোবেচারা নয় দেখতে পাচ্ছি কিন্তু৷ এমন ঘোরপ্যাঁচওয়ালা জায়গায়, স্ত্রীলোক পা বাড়ান কোন সাহসে? বাপস! আমারই তো শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে!

কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন—জয়ন্ত, কথাটা তুমি ঠিকই বলেছ৷ তবে শ্রীমতীদের তুমি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কোরো না৷ ওরা দুটিতেই কিন্তু এক মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবের সদস্যা৷ গতবছর এমনই জুনে যে মহিলা অভিযাত্রীরা মানালিতে চড়েছিলেন, শ্যামলী ও জয়ন্তী সে-দলে ছিল৷

এতক্ষণে সব টের পেয়ে গেলুম৷ —তাই বলুন! কিন্তু আশ্চর্য, এরই মধ্যে ওদের নাড়ি-নক্ষত্র আপনার জানা হয়ে গেছে দেখছি!

কর্নেল একটা শুকনো বেঁটে হলুদ গাছের গায়ে জড়িয়ে থাকা মোটা-মোটা একগুচ্ছ লতা আঁকড়ে ধরে একটা পাথরে উঠলেন৷ তারপর আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন—চলে এসো৷

এবার আমরা চুড়োর সীমানায় এসে গেছি৷ চুড়োটা হাতির পিঠের মতো দেখতে—লম্বায় বড়োজোর বিশ গজ, চওড়ায় তার আদ্ধেক৷ কোথাও টাকের মতো নগ্ন পাথর রয়েছে, কোথাও শুকনো ঘাস৷ ততক্ষণে ওরা আমাদের দেখতে পেয়েছে৷ দু’জনেই এদিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে৷ মুখে চাপা হাসি ঝিলিক দিচ্ছে৷ প্রচণ্ড বাতাসে শাড়ি জড়িয়ে যাচ্ছে পায়ে৷ দেখে তাক লেগে গেল আমার৷ কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন—কনগ্রাচুলেশান গার্লস!

দু’জনেই হাত নেড়ে বলল—কনগ্রাচুলেশান কর্নেল!

দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় একটা বড়ো পাথর চুড়ো থেকে বেরিয়ে ছিল চাতালের মতন৷ তার ওপর গিয়ে বসে পড়লুম সবাই৷ কর্নেল আরামে বসে চুরুট বের করলেন৷ ওরা বাতাস বাঁচিয়ে সেটা জ্বালতে সাহায্য করল৷ এ বুড়োর সঙ্গে তরুণীদের কীভাবে অত খাতির জমে যায়, আজও আমার কাছে রহস্য!

শ্যামলীর হালকা ছিপছিপে গড়ন, মুখটা কিছু লম্বাটে, ডিমালো গাল ও সুচলো চিবুক৷ ওর চোখদুটোয় এক ধরনের নির্লিপ্ততা বা ঔদাসীন্যের ভাব আছে৷ খুব পাতলা ঠোঁট—তাই একটুখানি হাসিও জোরালো হয়ে ফোটে৷ আর জয়ন্তী ওর চেয়ে খানিকটা স্বাস্থ্যবতী অর্থাৎ অল্পস্বল্প মুটকি বলা যায়—অতটা ফরসাও নয়, চাপা রং৷ মুখটা ভারী ও ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক, পুরু ভুরু, দৃষ্টিতে তীব্রতা আছে৷ ভরাট গাল, অর্ধবৃত্তাকার চোয়াল৷ তার গ্রীবা ও বাহুদুটোয় শক্তির আভাস মেলে৷ দু’জনেই মোটামুটি সুন্দরী এবং পতঙ্গ আকর্ষণের মতন দীপ্তিময়ী৷

শ্যামলী বলল, —আজ কতগুলো পাখির ছবি নিলেন কর্নেল?

কর্নেল হাসলেন৷ —এ বেলা ক্যামেরাকে সে সুযোগ দিলুম কই? আমার তরুণ বন্ধুটি হঠাৎ তোমাদের আবিষ্কার কবে খুব ধাঁধায় পড়ে গেলেন—যার ফলে...

ব্যস্ত হয়ে কপট রাগে গর্জালুম—শাট আপ ওল্ড ম্যান৷ মোটেও তা ঘটেনি৷

শ্যামলী ও জয়ন্তী হেসে উঠল৷ কর্নেল অপ্রস্তুত হবার ভান করে বললেন, —তা হলে আমারই বোঝবার ভুল৷ যাই হোক, এই পাহাড়টা নাকি কুখ্যাত৷ এখানে অজস্র ভূতের আড্ডা৷ তাই কারও মনে ধাঁধা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক বইকী!

জয়ন্তী বলল, —ব্যাপারটা কী হয়েছে, তা হলে বলি কর্নেল৷...

তাকে বাধা দিয়ে শ্যামলী বলল, —দেখো জয়া, তোমার ওসব আজেবাজে কুসংস্কারের ঢাকঢোল আর না পেটালেও চলবে৷

জযন্তী হাসতে-হাসতে বলল, —কিন্তু তুমিই তো বললে যে...৷

শ্যামলী রেগে গেল৷ —কী বললুম? বললুম যে ভূত দেখেছি—তুমিও দেখবে এসো?

জয়ন্তী বলল, —ওভাবে বলোনি৷ স্বপ্নে দেখেছ বললে৷

শ্যামলী বলল, —হ্যাঁ, স্বপ্ন৷ নিছক দিবাস্বপ্ন৷ তবে সে-জন্যেই কি তোমাকে এখানে টেনে এনেছিলুম?

জয়ন্তী বলল—না, তা আনোনি৷ বললে, এখান থেকে সূর্যাস্ত নাকি খুব সুন্দর লাগে৷ কিন্তু যাই বলো, তোমার আসল মতলব ছিল—স্বপ্নের ব্যাপারটা সত্যি কি না দেখতে আসা৷

—হ্যাঁ, তুমি মনের লেখা পড়তে ওস্তাদ!

—কিছুটা৷ দেখো, আমাকে লুকিয়ে পার পাবে না৷

—এখানে ওঠার পর সবসময় লক্ষ্য রেখেছি, তুমি অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন খুঁজছ৷ আমি দিব্যি তখন টের পেয়ে গেলুম যে আসলে তুমি স্বপ্নের ব্যাপারটা নিয়েই কৌতূহলী এবং সূর্যাস্ত দেখার ছলে এনকোয়ারি করতে এসেছ৷ আর এ তো তোমার বরাবরকার স্বভাব৷ কেন? সে-বার মুক্তেশ্বরের ওদিকে রাতদুপুরে বাংলোর পিছনে কীসের শব্দ শুনে ওই কনকনে ঠান্ডায় বেরিয়ে পড়তে আমাকে সাধাসাধি করেছিলে! অথচ বললুম—ঘুমের ঘোরে যা শোনার শুনেছ, ওটা সত্যি নয়৷ তোমার এই নাক-গলানো অভ্যেস দেখে মনে হয়—গত জন্মে নিশ্চয়ই তুমি পুলিশের গোয়েন্দা-টোয়েন্দা ছিলে৷ বাণেশ্বরে এসে স্বপ্নে দেখবে একটা আস্ত জ্যান্ত মড়া—সেটা আবার এই ভূতের পাহাড়েই ডিগবাজি খেয়ে বেড়াবে, কী অদ্ভুত ব্যাপার!

আমরা দু’জনে চুপচাপ ও হাঁ করে ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলুম এতক্ষণ৷ দুটি স্ত্রীলোকের সংলাপ, তর্কাতর্কি, ভাবভঙ্গি বরাবর আমার কাছে জটিল হেঁয়ালি এবং দুর্বোধ্য৷ স্ত্রীলোক যে অপার রহস্যের আগার, তাতে কোনও ভুল নেই৷ দু’জন জলজ্যান্ত পুরুষের সামনে এতক্ষণ ওরা যেসব নিয়ে কথা বলল, তা যত অদ্ভুত বা খাপছাড়া শোনাক—এটাই সম্ভবত স্ত্রী-জাতির স্বাভাবিক রীতিনীতি৷ আমি ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার সিগারেট ধরালুম৷ সূর্যাস্ত দেখতে থাকলুম৷

এবার কর্নেল বললেন—বাই জোভ! স্বপ্নে জ্যান্ত মড়া! সে কী!

জয়ন্তী মুখ টিপে হেসে বলল—দিবাস্বপ্ন৷ তাও আবার গ্রীষ্মকালীন! কাজেই বুঝতেই পারছেন কর্নেল, বহু অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যেতে পারে৷ কিন্তু শ্যামলীর কারবারই আলাদা৷ ওই যে বললুম, সবতাতে নাক-গলানো ওর চাই-ই৷ আবার বলে কী জানেন? ওর নাকি একটা সিক্সথ সেন্স আছে৷ ওই সিক্সথ সেন্সের জ্বালায় যে পড়েছে, সেই জানে পরিণতিটা কদ্দূর গড়ায়৷ ইতিমধ্যে আপনারা না এসে পড়লে ও নির্ঘাত সারা পাহাড় খোঁজাখুঁজি করে বেড়াবার জন্যে আমাকে সাধাসাধি করত৷ ওকে সামলানো আমার পক্ষে এত কঠিন হয়ে পড়ে সময়-সময়!

শ্যামলী মুখ গম্ভীর করে বসে ছিল৷ ওর কথা শোনার পর বলল—থাক, আর গার্জেনগিরি ফলাতে হবে না৷

আমার মনে হল, চেহারা দেখে শ্যামলীকে খুব হুল্লোড়বাজ সরল মেয়ে মনে হলেও আদতে ও তার উলটো৷ বেশ চাপা ধরনের মেয়ে৷ এই চেপে রাখার প্রবণতার জন্যেই সম্ভবত ওর সুন্দর টানাটানা চোখ দুটোকে নির্লিপ্ত বা উদাসীন দেখায়৷

তা কর্নেল বুড়োও আবার সবতাতে নাক-গলানোর জন্যে প্রসিদ্ধ৷ ওঁর মুখে একটা চাঞ্চল্য লক্ষ্য করলুম এবার৷ বললেন—হুম৷ তা হলে জয়ন্তী, তুমি বলতে চাইছ যে আজ দুপুরে হোটেলে তোমরা দুপুরবেলা দুটিতে ঘুমিয়ে কাটিয়েছ৷ তারপর ঘুম ভেঙে উঠে শ্যামলী তোমাকে বলেছে, স্বপ্নে এই ভূতের পাহাড়ে একটা জ্যান্ত মড়া ডিগবাজি খাচ্ছিল৷ তারপর বলেছে, পাহাড়টায় চড়ে সূর্যাস্ত দেখা যেতে পারে৷ এবং তোমরা শেষ অব্দি বেরিয়ে পড়েছ, চড়েছ, তারপর তোমার ধারণা হয়েছে যে আসলে শ্যামলী তার স্বপ্নের সত্যতা পরীক্ষা করতেই এখানে এসে হানা দিয়েছে৷ এই তো?

জয়ন্তী সোৎসাহে মাথা দুলিয়ে বলল—হুবহু ঠিক৷ কর্নেল! সত্যি আপনার দক্ষতা আছে রিপোর্টিংয়ে৷

কর্নেল আমাকে দেখিয়ে বললেন—কিন্তু হিয়ার ইজ এ রিয়্যাল রিপোর্টার৷ আশা কবি, তোমাদের মনে আছে সে-কথা৷ দৈনিক সত্যসেবকের প্রখ্যাত রিপোর্টার শ্রীমান জয়ন্ত চৌধুরী সামনাসামনি থাকতে, মাই ডিয়ার গার্ল, আমাকে ওই প্রশংসাটা দিও না৷ জয়ন্ত মনে-মনে তোমার মাথা কাটবে৷

জয়ন্তী আমার দিকে কটাক্ষ করল৷ —উনিই যে তিনি, তার প্রমাণ তো শুধু আপনার মুখের কথা৷ তাই বিশ্বাস না করে উপায় নেই৷ কিন্তু ওঁকে আমার মোটেও সেরকম মনে হচ্ছে না, কর্নেল!

কর্নেল বললেন, —কেন, কেন?

জয়ন্তী ফিক করে হাসল! —রিপোর্টাররা সবসময় কৌতূহলী হবেন৷ সবসময় পেছনে লেগে থাকবেন৷ প্রশ্নে-প্রশ্নে জ্বালিয়ে মারবেন৷ আরও স্মার্ট হবেন৷ কিন্তু আপনার ভদ্রলোক দেখছি, নিতান্ত সাদাসিধে মানুষ৷ কথাই বলতে পাবে না৷ চুপচাপ, ভীতু-ভীতু মুখ, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন খালি৷

শ্যামলী ধমকাল, —তুমি বড্ড বাচাল, জয়া৷ এবার আমাকে ছেড়ে ভদ্রলোককে নিয়ে পড়লে? নিজেকে কি তুমি ভি আই পি মনে করো? ভি আই পি হলে নিশ্চয়ই জয়ন্তবাবু তোমার পিছনে লেগে থাকতেন—তুমিও খুব প্লিজড হতে৷

কর্নেল হো-হো করে হেসে উঠেছিলেন৷ বললেন—জয়ন্ত আসলে এবার মনমরা হয়ে আছে৷ পাহাড়-জঙ্গল এসব প্রাকৃতিক পরিবেশে একজন সুযোগ্য যুবকের পাশে একজন যুবতীকেই মানায়৷ তার বদলে এক বাহাত্তুরে ওল্ড ফুল?

জয়ন্তী সপ্রতিভ ভঙ্গিতে বলল, —আহা! সে-ও কথা! জয়ন্তবাবু আর মন খারাপ করে থাকবেন না৷ আমরা আপনাকে সঙ্গ দেব৷ রাজি তো?

টের পেলুম, মেয়েটি সত্যি বাচাল এবং যেন একটু পুরুষালি টাইপের৷ অথচ ওর মুখে একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ বেশ প্রখর৷ অধ্যাপিকা কিংবা দিদিমণিসুলভ গাম্ভীর্যের রেখা প্রকট হয়ে আছে৷ তাই বেশি কথা বললেও বেশ মানিয়ে যায়৷ শুধু বললুম, —প্রস্তাবটা ভেবে দেখব৷

জয়ন্তী খিলখিল করে হেসে উঠল৷ এই সময় লক্ষ্য করলুম, শ্যামলী কিন্তু বরাবর কেমন গম্ভীর আর অন্যমনস্ক হয়ে রয়েছে৷ মনে কী যেন চাপা চাঞ্চল্য আছে, তা দমিয়ে রাখার যত্ন ও কষ্ট ওর মুখে ছাপ ফেলেছে৷ খারাপ স্বপ্ন দেখলে অনেকে নাকি এরকম নার্ভাস হয়ে পড়ে৷ আমার এক বন্ধু তার ফিঁয়াসের মৃত্যু দেখেছিল স্বপ্নে, মেয়েটি থাকে বোম্বেতে—সে ক’দিন ধরে এমন উত্ত্যক্ত হল যে অবশেষে বোম্বে মেলের টিকিট কেটে বসতে বাধ্য হল৷ তবে সে তো প্রেমজ অস্বস্তির ব্যাপার৷ শ্যামলী কার মড়া দেখল স্বপ্নে, জানতে ইচ্ছে করছিল৷

কথাটা বলেই ফেললুম, —বাই দ্য বাই, স্বপ্নে যার মৃত্যু দেখা যায়, তার নাকি আয়ু বাড়ে৷ শ্রীমতী শ্যামলী নিশ্চয়ই কোনও আত্মীয়ের মৃতদেহ দেখে থাকবেন৷ কারণ আমরা স্বপ্নে সাধারণত প্রিয়জনকেই মরতে দেখি৷

কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে পাহাড়েব উত্তর-পশ্চিম গায়ে সম্ভবত পাখি খুঁজছিলেন৷ অন্যমনস্কভাবে শুধু বললেন, —রাইট, দ্যাটস রাইট!

জয়ন্তী বলল, —মাই গুডনেস! হ্যাঁরে শ্যামলী, কার মড়া দেখেছিস তা তো বলিসনি?

শ্যামলী বাঁকা ঠোঁটে বলল, —ওসব ছাড়ো তো বাবা! এক-কথা নিয়ে ভ্যাজর-ভ্যাজর ভালো লাগে না৷ ওই দেখ, দিনমণি এবার ডুব দিলেন৷

আমরা এবার সূর্যাস্তের দিকে ঘুরে বসলুম৷ অপূর্ব, অপূর্ব৷ দূর উপত্যকার ওদিকে পর্বতশ্রেণীর মাথায় একটা বিশাল লাল গোলক আস্তে-আস্তে নেমে যাচ্ছে৷ চারদিকে হালকা গোলাপি, হলুদ, সবুজ, নীল, সোনালি এক ব্যাপক বর্ণচ্ছটা ছড়িয়ে পড়ছে দীর্ঘ সব তুলির টানের মতন জ্যামিতিক সরলরেখায়, দিগন্তকে দেখাচ্ছে অলৌকিক শক্তিমান এক মহান সাধু৷ শবের মতন নিস্পন্দ শুয়ে আছেন তিনি, যেন স্বয়ং মহাকাল৷

গ্রিন ভিউ হোটেলের দিকে যে প্রাইভেট রাস্তা উঠে গেছে, তার শুরুতে বড়ো সরকারি রাস্তার বাঁক৷ বাঁকের মুখে ডান হাতে অর্থাৎ দক্ষিণে কয়েক একর সমতল জমির ওপর একটা মোটামুটি বড়ো বাড়ি৷ বাড়িটা অবশ্য একতলা৷ পুরোনো ধাঁচের এইসব বাড়ি এখানে অনেক রয়েছে৷ কাঠ ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে প্রাঙ্গণটা ঘেরা৷ ফুলবাগিচা আর দেশি-বিদেশি অনেক গাছ আছে৷ সবুজ ঝকঝকে লনে চেয়ার-টেবিল পেতে কয়েকজন পুরুষ ও স্ত্রীলোক বসে আছেন দেখলুম৷ গেটে বোগেনভিলিয়ার ঝাঁপি আছে৷ এখান অবধি এসেই কর্নেল বললেন, —যদি আপত্তি না থাকে, আমি জয়ন্তী ও শ্যামলীকেই বিশেষভাবে বলছি, বাণেশ্বরের এক মহীয়সী মহিলার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে চাই৷ উনি ভীষণ খুশি হবেন৷ অন্যপক্ষে তোমরাও খুব খুশি তো হবেই—উপবস্তু একটি আশ্চর্য চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় হবে৷ রিয়েলি, মিসেস মালহোত্রার কোনও তুলনা হয় না৷ এমন মিশুকে মহিলা আজকাল দুর্লভ৷

জয়ন্তী উৎসাহ দেখাল৷ কিন্তু শ্যামলী বলল, —আজ থাক৷ বরং আরেক সময় আসা যাবে৷

জয়ন্তী ওর হাত ধরে টানল৷ —আয় না বাবা৷ এখানে ঘুরতেই তো এসেছি! প্রবাসে নিয়ম-টিয়ম কেউ মানে নাকি! বলা যায় না, নতুন চেনাজানা থেকে অনেক সময় অনেক কিছু মিলে যায়৷

কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমনসময় এক প্রৌঢ়া মহিলাকে দেখলুম চেয়ার ছেড়ে হনহন করে গেটের দিকে এগিয়ে আসছেন হাসিমুখে৷ কর্নেল আগে থেকেই হাত নাড়তে লাগলেন এবং চাপাস্বরে বললেন—মিসেস মালহোত্রা৷

ইনি যে যৌবনে অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন, তার ছাপ এখনও মুছে যায়নি৷ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখার মতন চেহারা৷ কর্নেলকে ইংরেজিতে বলে উঠলেন, —হ্যালো, হ্যালো! আসুন, আসুন! আপনারই অপেক্ষা করছি আমরা৷ ডঃ পট্টনায়ক তো অস্থির এদিকে— যা খেয়ালি মানুষ আপনি! বলা যায় না, কোথায় জঙ্গলে গিয়ে ওত পেতে বসে রয়েছেন!

তারপর আমাদের দিকে ঘুরে অত্যন্ত অমায়িক হেসে বললেন, —কী কাণ্ড! এইসব কচি-কচি ছেলেমেয়ে নিশ্চয়ই কর্নেলসায়েবের পাল্লায় পড়ে হয়রান হয়েছে!

কর্নেল আমাদের সস্নেহে দেখে নিয়ে বললেন, —আলাপ করিয়ে দিই৷ মিসেস সরোজিনী মালহোত্রা একসময় নৈনিতাল গার্লস কলেজের অধ্যক্ষা ছিলেন৷ এখন পাকাপাকিভাবে বাণেশ্বরের বাসিন্দা৷ আর এ হচ্ছে শ্যামলী সেন, ওর বন্ধু জয়ন্তী রায়—দু’জনেই সেরা পাহাড়-চড়িয়ে৷ মানালি অভিযানে ছিল৷ এ জয়ন্ত চৌধুরী—কলকাতার প্রখ্যাত দৈনিক সত্যসেবকের রিপোর্টার, প্রখ্যাত ব্যক্তি এখন৷

মিসেস মালহোত্রা এসে শ্যামলী ও জয়ন্তীকে জড়িয়ে ধরলেন দু-হাতে৷ তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন—চলে আসুন, চলে আসুন! ওঃ, আমার কী সৌভাগ্য আজ! খুব জমে যাবে আসর! কর্নেল, আপনার কোনও তুলনা হয় না৷

ধাড়ি মুরগি যেমন ছানা নিয়ে এগোয়, আমাদের নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন মিসেস মালহোত্রা৷

লনে অনেকগুলো খালি চেয়ার ছিল৷ আমরা বসে পড়লুম৷ মিসেস মালহোত্রা ছোটাছুটি করে বেড়াতে থাকলেন ব্যস্তভাবে৷ একজন লোক একটা ট্রে-তে সাজিয়ে কোকা-কোলার বোতল নিয়ে এল৷

ততক্ষণে অন্ধকার সবে জমে উঠছে৷ বাড়ির সামনে বাতিটি জ্বলে উঠল৷ এবার মিসেস মালহোত্রা পরিচয় করাতে থাকলেন৷ —ইনি মিঃ অরিন্দম দ্বিবেদী—ইতিহাসের অধ্যাপক, থাকেন দিল্লিতে৷ ইনি মিঃ রঘুবীর জয়সোয়াল—রিটায়ার্ড পুলিশ সুপার, এখন জয়পুরের বাসিন্দা৷ আর ইনি হচ্ছেন প্রখ্যাত ফোরেনসিক এক্সপার্ট ডঃ সতীনাথ পট্টনায়ক—ওড়িশার লোক, এখন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোরেনসিক বিভাগের লেকচারার৷ এখন আসতে বাকি রইলেন মিঃ মোহন পারেখ—বোম্বের বিখ্যাত ফিল্ম গায়ক৷ এবার আমার নবাগত বন্ধুদের পরিচয় করিয়ে দেবেন স্বনামধন্য কর্নেল এন সরকার৷

কর্নেল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ‘মাননীয় ভদ্রমহোদয়গণ ও ভদ্রমহিলারা’ সম্বোধন করার পর পাঁচ মিনিট ধরে আমাদের তিনজনের সম্পর্কে গালভরা কিছু বাক্য বলে বসে পড়লেন৷

তারপর উঠলেন ফের মিসেস মালহোত্রা৷ —ফ্রেন্ডস! আজকের আসরের প্রোগ্রাম আবার ঘোষণা করতে অনুমতি দিন৷ একটু পরেই আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় যাব এবং প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করব৷ হ্যাঁ—আমাদের আজকের প্রোগ্রাম মিডিয়ামের মধ্যে অশরীরী আত্মা আনা৷ চমৎকার প্রোগ্রাম এবং রোমাঞ্চকর৷ তাই নয়?

কে জানে কেন, আমি শিউরে উঠলুম৷ চারপাশে সমর্থনসূচক সাড়া পড়ে গেল৷ কর্নেল প্রশংসা করে বললেন, —ওয়ান্ডারফুল! মিসেস মালহোত্রার নতুনত্বের তুলনা হয় না!

তারপর একটুখানি নীরবতা জাগল৷ সেই সময় শুনলুম, আমার পাশ থেকে শ্যামলী ফিসফিস করে জয়ন্তীকে বলছে, তুই এসব বিশ্বাস করিস?

জয়ন্তী বলছে, —নিশ্চয়ই করি৷

—আমি করি না৷ সব ধাপ্পা৷ মিডিয়ামরা ধাপ্পা দেয়!

—বেশ তো! তুই মিডিয়াম হয়ে দেখ না৷ পারবি?

—নিশ্চয়ই পারব! —বলে শ্যামলী হাসল একটু৷ ফের বলল, —মিডিয়াম ওদের নিশ্চয়ই ঠিক করা আছে৷ যে-সে নাকি মিডিয়াম হতেই পারে না৷ ওটাই তো চালাকি রে!

—চালাকি? বেশ—ওঁদের বলছি, তোকেই মিডিয়াম করে যেন৷

—বলে দেখ৷ রাজি হবে না৷

কর্নেল হঠাৎ ঘুরে বললেন, —ইয়ে মিসেস মালহোত্রা, মিডিয়াম কে হচ্ছেন?

মিসেস মালহোত্রা ঘড়ি দেখে বললেন, —আইডিয়াটা মিঃ পারেখের৷ উনিই তো মিডিয়াম হবেন বলেছিলেন৷ এখনও এসে পৌঁছলেন না—আশ্চর্য তো!

এবার শ্যামলী মুখ ফুটে বলে ফেলল, —মিসেস মালহোত্রা, আমি মিডিয়াম হতে রাজি আছি৷

তীক্ষ্ণদৃষ্টে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মিসেস মালহোত্রা কী যেন দেখলেন৷ তারপর সস্নেহে হেসে বললেন, —পরে কিন্তু শরীর ভীষণ খারাপ করবে৷

—করুক না৷ —শ্যামলীর কণ্ঠস্বরে দৃঢ়তা ফুটে উঠল৷

কর্নেল বললেন, —হ্যাঁ, শ্যামলী পারবে৷ ওর শক্তি, সাহস দুই-ই আছে৷ আমি সার্টিফাই করতে পারি৷

মিসেস মালহোত্রা ঘড়ি দেখে একটু ইতস্তত করার পর রাজি হয়ে গেলেন—ঠিক আছে৷ কর্নেলের কথার ওপর কথা নেই৷ ফ্রেন্ডস, তা হলে আমরা আর মিঃ পারেখের জন্যে অপেক্ষা না-ও করতে পারি৷ কী বলেন আপনারা?

সবাই সায় দিলেন৷ তখন মিসেস মালহোত্রা আবার ঘড়ি দেখে বললেন—কফি খেয়েই আমরা উঠব৷ ঠিক সাতটায় বসব৷

আমার কী জানে কেন, খুব অস্বস্তি হতে লাগল৷ শ্যামলীর মিডিয়াম হতে চাওয়াটা পছন্দ হচ্ছিল না৷ জয়ন্তীও এবার চুপিচুপি ওকে নিবৃত্ত করছে শুনলুম৷ কিন্তু শ্যামলী জেদের সঙ্গে ফিসফিস করে বলল, —ভ্যাট! সব বাজে৷ দেখি না কী হয়!

অশরীরী আত্মার আবির্ভাব

লম্বা-চওড়া আর বিলিতি ধাঁচে সাজানো ডাইনিং-হল পেরিয়ে শ্রীমতী মালহোত্রার স্টাডি বা পড়াশোনার ঘরে ঢুকলুম আমরা৷ আর সেইসময় বাইরে প্রচণ্ড মেঘগর্জন শোনা গেল৷ তারপর শুরু হল ভয়ংকর পাহাড়ি ঝড়৷ শ্রীমতী মালহোত্রার মুখে উদ্বেগ দেখা দিল৷ —ওই যাঃ! বেচারা পারেখ আর আসতে পারবে না!

ঝড়ে বাড়ির দরজা-জানলাগুলো বিকট শব্দে কাঁপছিল৷ উনি চেঁচিয়ে উঠলেন—সরযূ! লছমন! বদ্রী! তোমরা দরজা-জানলাগুলো বন্ধ করে দাও!

সব বন্ধ হলেও ঝড়ের শব্দ চাপা শোনাচ্ছিল৷ মেঘের গর্জনে বাড়িটা কেঁপে-কেঁপে উঠছিল মুহুর্মুহু৷ গৃহকর্ত্রীর মুখে উদ্বেগের ছাপটা আরও গাঢ় হতে দেখছিলুম৷ অরিন্দম দ্বিবেদী চাপাগলায় বললেন, —বড়ো আশ্চর্য তো! হঠাৎ এমন প্রাকৃতিক উপদ্রব কেন?

রঘুবীব জয়সোয়াল একটু হাসলেন, —হ্যাঁ, প্রকৃতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে৷ কারণ, কোনও অশরীরী আত্মা যেভাবেই হোক টের পেয়ে গেছে যে, তাকে ডাকা হতে পারে!

এ কথায় বাকি সবাই চাপা হাসলেন৷ কিন্তু শ্রীমতী মালহোত্রা ক্ষুব্ধ হলেন৷—মিঃ জয়সোয়াল, তুচ্ছতাচ্ছিল্য আপনি করতে পারেন বটে; কিন্তু বিজ্ঞানকে চমকে দেওয়ার মতো বহু ব্যাপার পৃথিবীতে এখনও আছে৷ এ-কথা মানেন তো?

ডঃ সীতানাথ পট্টনায়ক বললেন, —তা তো আছেই! তবে আত্মার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হতে পারে! মানসিক অবস্থার ওপর সবকিছু নির্ভর করে৷ হ্যালুসিনেশন বা ভ্রমদর্শন বলে একটা কথা আছে...

ওঁকে বাধা দিয়ে শ্রীমতী মালহোত্রা একটু হেসে বললেন, সবুর, সবুর! এ আসরে আমরা মোট আটজন লোক৷ এ কোনও নিছক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হবে না—কারণ একই জায়গায় একইসঙ্গে আটজন মানুষ হ্যালুসিনেশনে ভুগবে না নিশ্চয়ই!

অরিন্দম দ্বিবেদী কুণ্ঠিত মুখে বললেন, তা হলে আত্মা যে আজ আসবেই, আপনি শিওর?

শ্রীমতী মালহোত্রা শ্যামলীর দিকে সস্নেহে তাকিয়ে বললেন, সবই নির্ভর করছে আমাদের এই স্যুইট মিডিয়ামটির ওপর৷ তোমার ভয় করছে না তো শ্যামলী?

শ্যামলীর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলুম৷ ওর মুখে একটা জেদের ছাপ রয়েছে, সে-জন্যেও নয়—তা বাদেও কী যেন আছে, রহস্যময় কিছু, এবং ওই চোখের দৃষ্টি আমার একটুও স্বাভাবিক মনে হল না৷ কেমন যেন তীক্ষ্ণ, গভীর উজ্জ্বল—অথচ দূরের নক্ষত্রের মতো ওই দৃষ্টিপাত! যেন সে আমাদের মধ্যে থেকেও আমাদের একজন হয়ে নেই! নিজের মনের ভুল? কে জানে! আমার মধ্যে একটা অস্বস্তি জাগল৷

আমি কর্নেলের দিকে তাকালুম৷ বুড়ো চোখ বুজে বসে রয়েছেন পাথরের মতো৷ শ্রীমতী মালহোত্রাও যেন শ্যামলীর মুখে আমার মতোই কিছু দেখলেন৷ তাই কোনও জবাব না পেয়েও ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, তা হলে আসুন, আমরা ওই টেবিলে গিয়ে বসি৷ তারপর ঘড়ি দেখে নিলেন৷ অস্ফুটম্বরে ফের বললেন, জাস্ট সাতটা পনেরো মিনিট৷ কুইক!

ঘরের মেঝে পুরোটা কাশ্মীরি কার্পেটে ঢাকা৷ ঠিক মধ্যিখানে একটা মেহগনি-রং বিশাল গোলটেবিল—তাতে কোনও ঢাকনা নেই৷ টেবিলের চারদিক ঘিরে অনেকগুলো চেয়ার৷ আমরা গিয়ে বসলে একটা বাড়তি হল৷ সেটা তফাতে সরিয়ে রাখলেন শ্রীমতী মালহোত্রা৷ বললেন—বদ্রীটার বুদ্ধিসুদ্ধি আর হবে না৷ বলেছিলুম ছ’টা চেয়ার রাখতে—রেখেছে ন’টা! ছয়কে নয় শোনে যে, তার কানের অসুখ হয়েছে৷

বদ্রী সম্ভবত আমাদের পিছু-পিছু এসে ঘরে দাঁড়িয়েছিল৷ বয়সে প্রৌঢ়, কিন্তু দেহের গড়নে শক্তি-সামর্থ্যের ছাপ স্পষ্ট৷ সে কাঁচুমাচু মুখে বলল, আমি ছ’টাই রেখেছিলুম মা৷ পরে সমঝে দেখলুম, ওনারা ন’জন হচ্ছেন, তাই...৷

গৃহকর্ত্রী হেসে বললেন, তা হলে তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়৷ কিন্তু বাছা, আমরা তো ন’জন ছিলুম না—আটজন মোটে!

বদ্রী বলল, পারেখসায়েবকে নিয়ে ন’জন যে মা!

—বদ্রী, তুমি বুদ্ধিমান! কিন্তু এই দুর্যোগে উনি আর আসতে পারবেন কি? যাকগে৷ শোনো বদ্রী, তুমি বাইরের ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করো৷ যদি দৈবাৎ পারেখসাহেব এসে পড়েন, ওঁকে ও-ঘরেই বসতে বলবে৷ কারণ আমাদের আসর শুরু হলে আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া সম্ভব নয়৷

বদ্রী মাথা নেড়ে চলে গেল৷ শ্রীমতী মালহোত্রা দরজার তালা খুলে ওকে যেতে দিলেন—তারপর ভালো করে আটকে দিলেন৷ তারপর উজ্জ্বল আলোটা নিভিয়ে একটা হালকা নীলাভ আলো জ্বাললেন৷ ঘরটা কেমন রহস্যে ভরে গেল যেন৷ নীলাভ আলোটা এত কম ওয়াটের যে কারও মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না৷ এ-সময় সবগুলো মুখের দিকে আমি তাকালুম৷

আমার ডাইনে বসেছে জয়ন্তী৷ সে তাকিয়ে আছে কর্নেলের দিকে৷ আমার বাঁয়ে বসেছেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার৷ তিনি শ্রীমতী মালহোত্রার দিকে তাকিয়ে আছেন৷ শ্রীমতী মালহোত্রা এখনও বসেননি—দাঁড়িয়ে আছেন৷ কর্নেলের বাঁয়ে ডঃ পট্টনায়ক৷ তিনিও গৃহকর্ত্রীকে দেখছেন৷ তাঁর বাঁ-দিকে রঘুবীর জয়সোয়াল—তাঁর দৃষ্টি শ্যামলীর দিকে, শ্যামলী তাঁর পাশের চেয়ারে এবং আমার চেয়ারের একেবারে উলটোদিকে আমার সামনাসামনি৷ শ্যামলী টেবিলে দৃষ্টি রেখেছে৷ শ্যামলীর বাঁয়ে শ্রীমতী মালহোত্রার চেয়ার—তিনি দাঁড়িয়ে আছেন৷ তাঁর বাঁয়ে অর্থাৎ জয়ন্তীর ডাইনে রয়েছেন অধ্যাপক দ্বিবেদী৷ তিনি যেন জয়সোয়ালকেই দেখছেন৷

ঘরে স্তব্ধতা—কিন্তু বাইরে প্রকৃতি তোলপাড় হচ্ছে৷ মাঝে-মাঝে বাজ পড়ছে৷ মেঘ ডাকছে৷ ঝড়ের শনশন শাঁ-শাঁ শব্দে পাহাড় আর অরণ্য মুখর হচ্ছে৷ বাড়িটা থরথর করে কাঁপছে যেন৷ তারপর মনে হল, বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ পাহাড়ি ঝড়বৃষ্টির ভীষণতার কোনও তুলনা নেই৷ এসব সময় ধস নামে৷ সে বড়ো বিপজ্জনক কাণ্ড! অনেক বসতি গুঁড়ো হয়ে যায়৷ মানুষ চাপা পড়ে৷ রাস্তা পাথরের স্তূপে বন্ধ হয়ে যায়৷ আবার অনেক সময় রাস্তাও ধসে গিয়ে অতল খাদ সৃষ্টি হয়৷ এখনও নিশ্চয়ই তা হচ্ছে কোথাও৷

শ্রীমতী মালহোত্রা বক্তৃতার ঢঙে বললেন—বন্ধুগণ! এবার আমাদের আসর শুরু হবে৷ তার আগে দু-চার কথা বলা দরকার৷ অবসরজীবনে প্রেততত্ত্ব নিয়ে পড়াশুনো করে আমার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে যে মানুষের দেহ ধ্বংস হয়, কিন্তু আত্মা ধ্বংস হয় না৷ ভারতবর্ষের প্রাজ্ঞ দার্শনিকরা যে-সত্য হাজার-হাজার বছর আগে জেনেছিলেন, পাশ্চাত্যের নিরীশ্বরবাদী দর্শন আর বিজ্ঞানের পাল্লায় পড়ে আমরা বিদগ্ধ শিক্ষিত সমাজ তা অস্বীকার করতে শিখেছি৷ আমিও একসময় তাই করেছি৷ কিন্তু এক দুর্ঘটনায় আমার স্বামী ডঃ মালহোত্রার মৃত্যুর পর এমন অনেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা আমার হল, যার ফলে আমি প্রেততত্ত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করলুম৷ এখন কথা হচ্ছে—আত্মা দেহের মৃত্যুর পর থেকে যাচ্ছে৷ কিন্তু তার এ থাকাটা কীরকম? এর জবাব আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমেই পাচ্ছি৷ আপনারা জানেন; আলো, শব্দ এসব হল একরকমের তরঙ্গ৷ একটা তরঙ্গের নির্দিষ্ট মাপে আমরা আলো দেখতে পাই বা শব্দ শুনতে পাই৷ কিন্তু আমাদের এমন কোনও ইন্দ্রিয় নেই, যা দিয়ে সেই নির্দিষ্ট মাপের বাইরে কোনও আলো বা শব্দ আমরা টের পেতে পারি৷ এখানেই আমরা অসহায়৷ এখন তা হলে দাঁড়াল, তরঙ্গতত্ত্ব৷ বিজ্ঞান আজ বলছে, আমাদের চিন্তাভাবনাও একরকম তরঙ্গ—মস্তিষ্কে তার উদ্ভব৷ মস্তিষ্কের তরঙ্গ নিয়েই গড়ে উঠেছে প্যারা-সাইকোলজি শাস্ত্র৷ সব তরঙ্গেরই ধর্ম গতিশীলতা, অর্থাৎ স্থানান্তরে চলাচলে সমর্থ সে৷ তা হলে দাঁড়াচ্ছে—মস্তিষ্কের যে বিশেষ মাত্রার তরঙ্গ উঠল, তা চলতে শুরু করল মস্তিষ্কের কেন্দ্র থেকে৷ এই তরঙ্গ ইথারের মতোই সর্বব্যাপী৷ পৃথিবীর সকল মস্তিষ্কে গিয়ে কাঁপন তোলে৷ কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে, আমরা এত নানা ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত থাকি, এত ঝঞ্ঝাট ও বৈষয়িক জটিলতায় আমাদের দিন কাটাতে হয় যে নিজের মস্তিষ্কতরঙ্গ নিয়েই কূল পাইনে—অন্য বহিরাগত তরঙ্গের আঘাতে কী অনুভূতি আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হল, খোঁজ রাখিনে৷ ধরুন, কোনও মানুষ মৃত্যুর মুহূর্তে তীব্রভাবে কিছু ভেবেছিল—হ্যাঁ, আবার বলছি ‘তীব্রভাবে’৷ এই তীব্র তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে—প্রত্যেকটি মস্তিষ্কের স্নায়ুকেন্দ্রে আঘাত হানল৷ আমরা যদি সজাগ ও অনুভূতিশীল হই, তা হলে তা টের পাব৷ যেমন আমি আমার স্বামীর মৃত্যু টের পেয়েছিলুম ষাট মাইল দূর থেকে৷ আমার মনে হয়েছিল—কে যেন আমার অতি প্রিয়জন আমারই নাম ধরে কিছু বলতে চাইছেন৷...

বাইরে কোথাও ফের বাজ পড়ল এবং তাবপর আবছা শোনা গেল কে যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে প্রচণ্ড৷ শ্রীমতী মালহোত্রা অস্ফুটস্বরে বলে উঠলেন, ওই বুঝি পারেখ এল!

কিন্তু দু-মিনিট অপেক্ষা করার পরও বদ্রী তাকে নিয়ে এল না বা বদ্রী নিজেও কোনও সাড়া দিল না৷ তা হলে কি আমাদের কানের ভুল?

শ্রীমতী মালহোত্রা ফের শুরু করলেন, —হ্যাঁ, আমার ধারণা, সবচেয়ে তীব্র মস্তিষ্কতরঙ্গ বা ব্রেনওয়েভগুলো মোটামুটি অনুভূতিশীল সচেতন মানুষরা ধরতে পারেন এবং ব্যাখ্যা করতে পারেন৷ এই তীব্রতা কখন থাকে? আকস্মিকভাবে যখন কোনও মানুষের মৃত্যু হয়, তখন৷ তাই আমার বক্তব্য, আমাদের খুব পরিচিত কোনও মানুষ যদি আকস্মিক দুর্ঘটনায় অথবা কোনও ভাবে মারা গিয়ে থাকেন, তাঁর সেই মৃত্যুকালীন তীব্র ব্রেনওয়েভটা ধরতে পারলে তারই সূত্রে আমরা তাঁর আত্মাকেও আকর্ষণ করে আনতে পারব৷

কর্নেল স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, —রাইট, রাইট!

ডঃ পট্টনায়ক বললেন, —খুবই যুক্তিসিদ্ধ৷

জয়সোয়াল একটু হাসলেন মনে হল৷ অধ্যাপক দ্বিবেদী বললেন, তা হলে তো মিডিয়ামেরই পরিচিত কোনও মানুষের আত্মা হওয়া দরকার!

জয়ন্তী কী বলতে যাচ্ছিল, শ্রীমতী মালহোত্রা বললেন, —ঠিক বলেছেন প্রফেসর দ্বিবেদী৷ এক্ষেত্রে শ্যামলীকেই মিডিয়াম করেছি যখন, তার পরিচিত কোনও আত্মা আনাই সহজ হবে৷ শ্যামলী, ডার্লিং! এমন কাকেও কি তোমার এ মুহূর্তে মনে পড়ছে—যিনি দুর্ঘটনায় অথবা ধরো, আততায়ীর হাতে হঠাৎ মারা পড়েছিলেন?

আমরা শ্যামলীর দিকে তাকালুম৷ সে অস্ফুটস্বরে শুধু বললে, —হ্যাঁ৷

জয়সোয়াল বললেন, —একটা কথা! তাঁকে যদি আমরা সবাই না চিনি, তা হলে কীভাবে বুঝব যে শ্যামলী আমাদের ঠকাচ্ছেন না? তা ছাড়া, আমার যা জানা আছে—মিডিয়ামের মারফত আত্মা আসরে আসেন, কিন্তু তার জন্যে সেই আত্মা সম্পর্কে আসরের সবাইকে চিন্তা করতে হয়৷ এক্ষেত্রে আমাদের কি তা হলে নির্বাক দর্শকের ভূমিকায় বসে থাকতে হবে?

শ্রীমতী মালহোত্রা বললেন,—আমার এ আসরের রীতি একেবারে অন্যরকম৷ কারণ, আমি বিজ্ঞানের সূত্র অনুসারে ব্যাপারটা ঘটাতে চাই৷ কাজেই আমাদের এক্ষেত্রে শ্যামলীর ওপরই নির্ভর কবতে হবে৷ আর—সে ঠকাচ্ছে কি না, তার প্রমাণ পেতে আমাদের অসুবিধে হবে না৷ আমরা তাকে প্রত্যেকে প্রশ্ন করব৷ মৃত মানুষের আত্মা যেহেতু সর্বচর এবং সময়ের বাঁধনে বাঁধা থাকে না, তাই জয়সোয়াল যদি ইচ্ছে করেন, তাঁর নিজের ছেলেবেলার কোনও ঘটনা সম্পর্কে আত্মা কিছু বলুক, তা অবশ্যই বলা উচিত৷ অন্তত আভাস দেওয়া উচিত৷ তা না হলে তো শ্যামলীর ওপর সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক৷

এ সময় জয়ন্তী আমার ঊরুতে আঙুলের চাপ দিল৷ বুঝলুম, ওর বক্তব্য—শ্যামলী এবার ঠেলাটা টের পাক!

তা ঠিক৷ শ্রীমতী মালহোত্রা ফাঁকি বা চালাকির দরজা বন্ধ করে দিলেন৷ কে জানে কেন, অস্বস্তি হতে লাগল আমার৷ ওদিকে বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সমানে চলেছে৷

শ্রীমতী মালহোত্রা ঘড়ি দেখে বললেন,—এবার আলো নেভাব৷ শ্যামলী, বাছা তোমার ভয় করছে না তো? এখনও বলো!

শ্যামলী মাথা দোলাল৷

—ওক্কে! তা হলে আলো নিভলেই শ্যামলী তুমি তোমার সেই পরিচিত লোকটির সম্পর্কে চিন্তা শুরু করবে৷ খবরদার, অন্য কোনও চিন্তা নয়৷ শুধু—তাঁর কথা ভাববে৷ প্রথমে তাঁর চেহারাটা সামনে আনবে৷ তারপর মনে মনে তাঁকে ডাকবে৷ তাঁর সম্পর্কে প্রত্যেকটি স্মৃতি ব্যবহার করবে৷ আশা করি, আর কিছু বুঝিয়ে বলার দরকার নেই৷ এবার আমরাও বিমূর্তভাবে শ্যামলীর সেই আত্মাকে আহ্বান জানাব৷ প্লিজ, কেউ অন্যমনস্ক হবেন না৷

তারপরই টেবিলের পাশে কোথাও স্যুইচ টিপে দিলেন উনি৷ আলো নিভে গেল৷ ঘরটা প্রায় অন্ধকারে ভরে গেল তক্ষুনি৷ আমার মনে হল, চোখ নামে কোনও ইন্দ্রিয় আমার নেই৷ শ্রীমতী মালহোত্রা শুধু একবার ফিস-ফিস করে বললেন, কেউ কোনও শব্দ নয়৷ নড়বেন না প্লিজ৷ শ্যামলীর পরিচিত আত্মাকে মনে-মনে ডাকুন৷

দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল যেন৷ বাইরে ঝড়বৃষ্টি আর মেঘের তুমুল গর্জন—এখানে এই অন্ধকারে যেন ক’জন মানুষ হারিয়ে গেছে পৃথিবীর বিপুল জীবনধারা থেকে৷ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে যেন৷

কতক্ষণ কেটে গেল৷ ক্রমশ আমার মনে সেই অস্বস্তিটা বেড়ে যাচ্ছিল৷ একটা চাপা আতঙ্ক গলা শুকিয়ে কাঠ করে দিচ্ছিল৷ সত্যি কি কোনও আত্মার আবির্ভাব আসন্ন! চমকে উঠছিলুম, কারও ঠান্ডা, অতি ঠান্ডা হাতের ছোঁওয়া পাচ্ছি না তো? কোনও বরফের হাত হিংস্রতায় নিঃশব্দতায় আমারই গলায় চেপে বসছে না তো? আবার প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ল৷ বাড়িটা কেঁপে উঠল৷ তারপর শ্যামলীর ওখান থেকে কী একটা আবছা শব্দ হল৷

তারপরই শ্যামলীর কণ্ঠস্বর শুনলুম৷ এ কণ্ঠস্বর যে শ্যামলীরই, তা অবশ্য বলা কঠিন৷ কেমন চাপা, নাকিস্বর, দুরারোগ্য রোগে ভুগছে এমন দুর্বল কারও গলা!—আমি... আমি কোথায় আছি?

আরও দু’বার কথাটা শুনলুম৷ তারপর শ্রীমতী মালহোত্রাকে চাপাস্বরে বলতে শোনা গেল—মিসেস সরোজিনী মালহোত্রার ঘরে৷

—কেন? এখানে কেন? এখানে কেন আমি? কেন-কেন-কেন?...

—তার আগে বলুন, কে আপনি?

—আমি...তাই তো! আমি কে? কে আমি? কে?

—স্মরণ করুন৷ ভেবে দেখুন, কে আপনি৷

—মনে পড়ছে না৷ আমার মনে পড়ছে না৷ কিচ্ছু মনে পড়ছে না৷

—এখানে আসার আগে কোথায় ছিলেন?

—কোথায় ছিলুম? আমি... আমি কোথায়... হ্যাঁ... ছিলুম পাহাড়ি খাদে৷

—পাহাড়ি খাদে? ওখানে কেন বলুন তো?

—জানি না৷ কিচ্ছু জানি না৷ আমি জানি না৷

—কোন পাহাড়ি খাদে? এ প্রশ্নটা করলেন অধ্যাপক অরিন্দম দ্বিবেদী৷

—ভূতের পাহাড়ের পশ্চিমে৷ ভূতের পাহাড়ে—ভূতের পাহাড়ে...৷

শ্রীমতী মালহোত্রার তীব্র চাপা কণ্ঠস্বর শোনা গেল৷ —কিন্তু কে? আপনি কে?

—আমার কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে৷ কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে৷

—কে আপনি...এ কণ্ঠস্বর জয়সোয়ালের৷

—আমার ঘাড় ভেঙে গেছে৷ লাংস ফেটে গেছে৷ হার্ট গুঁড়ো হয়ে গেছে৷

শ্রীমতী মালহোত্রা বললেন, —আপনাকে ফেলে দিয়েছিল কেউ?

—ফেলে দিয়েছিল৷ ডেকে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়েছিল৷ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল!

—কে ফেলে দিয়েছিল? কী নাম তার?

—বলব না, আমি বলব না, কিছুতেই বলব না৷

—কেন ফেলে দিয়েছিল?

—আমি তাকে চিনতুম৷ এবার সে ভয় পেয়েছিল৷ খুব ভয় পেয়েছিল৷

এবার কর্নেল বললেন—কিন্তু আপনি কে?

—বলব না৷ বলব না৷ বলব না৷

—না বললে আপনার হত্যাকারীকে শাস্তি দেওয়া যাবে না যে!

—কে? কে দেবেন শাস্তি? কে দেবেন তাকে শাস্তি? কে—কে?

—আমি কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি—আই প্রমিস৷

—চিনি আপনাকে৷ খুব চিনি৷ চিনি—চিনি—চিনি...৷

—তাই বলছি, বলুন কে আপনি?

—বলব? আমি বলব—বলব—বলব?

যেন সাতটি কণ্ঠ একসঙ্গে বলে উঠল, —বলুন, বলুন!

—আমি... আমি মোহন পারেখ! মোহন—মোহন পারেখ৷

ঘরের মধ্যে ভয়ংকর শব্দে বাজ পড়ল যেন৷ যেন সবাই একসঙ্গে অস্ফুটস্বরে বলে উঠলুম— মোহন পারেখ...!

তারপর শ্রীমতী মালহোত্রা বললেন,—অসম্ভব! মোহন পারেখ জীবিত৷ তার এখানে আসার কথা ছিল৷ ঝড়জলে আটকে গেছে হোটেলে৷ আপনি মিথ্যে বলছেন৷ আজ সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টাতেও সে ফোন করেছিল—ঝড়জলে বেরুতে পারছে না৷

—এখন করল না কেন? কেন করল না? কেন ফোন করল না?

কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতা৷ তারপর আবার মেঘ ডেকে উঠল৷ একবার নয়—পরপর কয়েকবার৷ ঘর প্রচণ্ড জোরে কেঁপে উঠল৷ সেইসময় যেন আবছা কী একটা শব্দ শুনলুম৷ তারপর শ্রীমতী মালহোত্রা একটু চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, মিথ্যে—শ্যামলীর চালাকি৷ এমন চমৎকার আসরটা ভেস্তে দিল বোকা মেয়েটা!

তারপর চেয়ার নড়ার শব্দ হল৷ তারপরই সেই নীল আলোটা জ্বলে উঠল৷ প্রথমেই আমার চোখ গেল শ্যামলীর দিকে৷ সে চেয়ারে হেলান দিয়েছে, মাথাটা একপাশে কাত হয়েছে, ডান হাতটা ঝুলছে এবং বাঁ-হাত ঊরুর ওপর পড়ে রয়েছে৷ অজ্ঞান হয়ে গেছে নাকি?

জয়ন্তী চেঁচিয়ে উঠল, —শ্যামলী, শ্যামলী!

শ্রীমতী মালহোত্রা দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ বিরক্ত হয়ে বললেন, —ও মোটেও অজ্ঞান হয়নি! ও চালাকি করছে! আজকালকার মেয়েগুলোকে আমি তো কম চিনিনে? সব বিচ্ছু! ইস! কী চমৎকার সময় আজ পাওয়া গিয়েছিল৷ এই ঝড়বৃষ্টির রাতেই তো ওরা আসে!

জয়সোয়াল খুকখুক করে হেসে বললেন, —মোহন পারেখ! মাই গুডনেস! ছোকরা শুনলে ক্ষেপে আগুন হয়ে যাবে!

অধ্যাপক উদ্বিগ্ন স্বরে বললেন, —দেখুন, আমার মনে হচ্ছে, আপনারা ভুল করছেন! শ্যামলী হয়তো সত্যি অজ্ঞান অবস্থায় রয়েছে৷

এই শুনে জয়ন্তী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ তারপর ওর দিকে এগিয়ে গেল৷ —শ্যামলী! এই শ্যামলী!

এই সময় শ্রীমতী মালহোত্রা দেওয়ালের দিকে এগিয়ে বড়ো আলোর স্যুইচ টিপে দিলেন৷ উজ্জ্বল সাদা আলোয় ঘর ভরে গেল৷ তারপর দেখলুম জয়ন্তী শ্যামলীর কাঁধে হাত রেখে ফের একবার ‘শ্যামলী’ বলে ডেকেই ভাঙা গলায় বিস্ময়-আতঙ্ক মেশানো চিৎকার করে উঠল—এ কী! শ্যামলীর কী হয়েছে? ওর গা এত ঠান্ডা কেন? চেহারা এমন কেন?

কর্নেলের দিকে তাকালুম৷ ভুরু কুঁচকে তীব্র দৃষ্টিতে শ্যামলীকে দেখছিলেন উনি৷ এবার জয়ন্তীর কথার সঙ্গে-সঙ্গেই উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুটস্বরে বললেন, ওঃ জেসাস! শ্যামলীর চেহারা অমন কেন? না—না, এ অদ্ভুত—অবিশ্বাস্য!

এতক্ষণে ঠাহর হল৷ তাই তো৷ শ্যামলীর অত সুন্দর মুখটা ঠিক যেন বাঁদরের মুখের চেয়ে কুৎসিত দেখাচ্ছে৷ ওই মুখ কি মানুষের? যেন কোনও ভয়ংকর শক্তি ওর চেহারাকে যতটা পারে বীভৎস করে গেছে অন্ধকারের সুযোগে৷ মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল৷ গায়ে কাঁটা দিল৷ অজ্ঞাত ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠলুম৷ শ্যামলীর দিকে তাকাতে সাহস পেলুম না আর৷

কয়েক মুহূর্তের জন্যে সবাই স্তব্ধ হয়ে প্রচণ্ড বিস্ময় আর আতঙ্কে ওই বীভৎসতা লক্ষ্য করছিল৷ তারপর কর্নেল গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন,—জয়ন্তী, তুমি সরে দাঁড়াও ওখান থেকে৷ ডঃ পট্টনায়ক, প্লিজ! একবার পরীক্ষা করে দেখুন তো শ্যামলীর কী হয়েছে?

শ্রীমতী মালহোত্রার মুখ ততক্ষণে সাদা হয়ে গেছে৷ ভয়ার্তস্বরে বললেন, —তা হলে কি শ্যামলী সত্যি-সত্যি অভিনয় করেনি? কিন্তু মোহন পারেখ—না, না, সে অসম্ভব!

ডঃ পট্টনায়ক এগিয়ে গিয়ে প্রথমে শ্যামলীর নাড়ি দেখলেন৷ ওঁর মুখে বিস্ময় দেখলুম৷ তারপর হাতটা রেখে চোখের পাতা পরীক্ষা করলেন৷ তারপর ভাঙা গলায় একটু কেশে শান্তভাবে বললেন, —কর্নেল, শ্যামলী মারা গেছে!

জয়ন্তী ডুকরে কেঁদে উঠল, —তুই এ কী করলি শ্যামলী?

শ্রীমতী মালহোত্রা ওকে দু-হাতে ধরে তফাতে নিয়ে গেলেন৷ ধরা গলায় বললেন, —ক্ষমা করো, তোমরা আমায় ক্ষমা করো৷ এ হবে আমি একটুও ভাবিনি৷ প্রেততত্ত্বের একটা বইতে অবশ্য সতর্ক করা হয়েছে—এ আগুন নিয়ে খেলা৷ সাবধানে আত্মাদের ডাকতে হয়৷ কিন্তু আমি সাবধান করে দিইনি ওকে৷ আমারই ভুলের জন্যে ফুলের মতন অমন কচি মেয়েটা...ওঃ ভগবান৷ এ আমি কী করলুম!

—শ্যামলী মারা গেছে? কর্নেল বলে উঠলেন৷ সে কী! না—না—এ অবিশ্বাস্য!

জয়সোয়াল আস্তে-আস্তে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ —আপনার ভুল হচ্ছে না তো ডঃ পট্টনায়ক?

ডঃ পট্টনায়ক মাথা দোলালেন৷ —না৷ শ্যামলী আর বেঁচে নেই৷

অধ্যাপকও উঠে দাঁড়ালেন৷ —কিন্তু, কী ভাবে মৃত্যু হল ওর? আপনারা কি বলতে চান কোনও প্রেতশক্তিই ওকে হত্যা করে গেছে?

জবাবটা দিলেন শ্রীমতী মালহোত্রা৷ —হ্যাঁ, কোনও দুষ্ট আত্মার আবির্ভাব ঘটেছিল ওর মধ্যে৷ মোহন পারেখ কখনও তার নাম হতে পারে না৷ নিজের নামটা সে বলতে চায়নি৷ কারণ, আপনারা বুঝতে পারছেন না—মোহন পারেখ যদি সত্যি আজ মারা গিয়ে থাকে, তা হলেও শ্যামলীর সঙ্গে ওর পরিচয় থাকা কী ভাবে সম্ভব?

জয়সোয়াল বললেন, —তা হলে মানতে হয় সত্যি-সত্যি ভূত এসে মেরে গেল শ্যামলীকে? অ্যাবসার্ড! ইমপসিবল! আনবিলিভেবল!

কর্নেল ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিলেন৷ মুখ তুলে শুধু বললেন,—রাইট, রাইট! কিন্তু...না, না! আমার বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পাচ্ছে ক্রমশ৷

—চারপাশে আমরা রইলুম জলজ্যান্ত এতগুলো মানুষ! আর ভূত এসে মারল? অসম্ভব!—জয়সোয়াল দৃঢ়স্বরে বললেন৷

শ্রীমতী মালহোত্রা বললেন, —কিন্তু ওর চেহারাটা দেখুন! মিঃ জয়সোয়াল, আপনি তো পুলিশ সুপার ছিলেন! অনেক মার্ডারড ডেডবডি দেখেছেন৷ শ্যামলীর ডেডবডিটা দেখেও কি বুঝতে পারছেন না কী ঘটেছে?

অধ্যাপক দ্বিবেদী ভীতস্বরে বললেন—ভয় পেয়ে মারা পড়েনি তো?

আমি এতক্ষণ কাঠ হয়ে বসেছিলুম৷ এবার সংবিৎ ফিরে এল৷ উঠে দাঁড়িয়ে বললুম—কর্নেল! আমার মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা এখনই পুলিশকে জানানো দরকার৷ আফটার অল—এ একটা আকস্মিক মৃত্যু!

কর্নেল আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে বললেন, —রাইট, রাইট! আমার জ্ঞানবুদ্ধি লোপ পেতে বসেছিল, জয়ন্ত৷ এমন অদ্ভুত মৃত্যু আমি জীবনে কখনও দেখিনি৷ মিসেস মালহোত্রা, ওকে ফোনটা দেখিয়ে দিন—প্লিজ! আর—জয়ন্তী, তুমি আমার কাছে এসো৷ মিঃ জয়সোয়াল, আপনি জানলা খুলে দেখুন তো ঝড়বৃষ্টির অবস্থাটা কী! অধ্যাপক, আপনি এখানে সরে আসুন৷ ডঃ পট্টনায়ক, আপনি শ্যামলীর পাশেই থাকুন৷

নির্দেশগুলো শুনতে-শুনতে আমি শ্রীমতী মালহোত্রার সঙ্গে দরজার দিকে এগিয়ে গেলুম৷ দরজার যা ব্যবস্থা, ভেতর থেকে টানলেই তালাবন্ধ হয়ে যায়৷ চাবি ছাড়া খোলা যায় না৷ শ্রীমতী মালহোত্রার ট্যাকে চাবির গোছা লক্ষ্য করলুম৷ দরজা খুলে ডাইনিং হলে ঢুকে উনি বললেন—ওই যে ফোন!

ডাইনিং হলে একা বদ্রী বসে ছিল৷ গৃহকর্ত্রীকে দেখে বলল, পারেখসায়েব তো আসেননি মা৷ একবার যেন কে দরজায় ধাক্কা দিল—খুললুম, কিন্তু কাকেও দেখতে পেলুম না!

শ্রীমতী মালহোত্রা তাকে কিছু বললেন না৷ গম্ভীর মুখে আবার স্টাডিতে ফিরে গেলেন৷ আমি ততক্ষণে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি৷ এমন হতভম্ব যে ওঁকে বলতে ভুলে গেছি যে টেলিফোনটা যাকে বলে ডেড—নিষ্প্রাণ!

কয়েকবার টেপাটেপি করে বদ্রীকে ইশারায় ডাকলুম৷ সে কাছে এসে সেলাম দিয়ে বলল, লাইন পাচ্ছেন না হুজুর?

—না বদ্রী৷ মনে হচ্ছে, লাইনটা কেউ কেটে রেখেছে!

বদ্রী চমকে উঠে বলল, তাজ্জব! কে কাটবে লাইন? এই তো সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় পারেখজিকে ফোন করতে বললেন মাইজি৷ ফোন করলুম!

—পারেখজি? মানে মোহন পারেখ?

—জি হাঁ সাহাব৷

—পেলে ওঁকে?

—জরুর পেলুম৷ বললুম, মাইজি আপনার ইন্তেজার করছেন৷ তো পারেখজি বললেন, এখনই আসছি৷ তারপর তো ঝড় উঠল৷

—বদ্রী, এসো, আমরা লাইনটা খুঁজে দেখি—ঘরেই কোথাও কিছু ঘটেছে নাকি!

বদ্রী ব্যস্ত হয়ে লাইনটা খুঁজতে শুরু করল৷ আমিও তার সঙ্গে পরীক্ষা করতে থাকলুম৷ অবশেষে হাত পাঁচেক দূরে একটা বড়ো আলমারির পিছনে আবিষ্কার করলুম, তারটা সুন্দর ভাবে কেউ দু’ভাগে কেটে রেখেছে!

বদ্রী চেঁচিয়ে উঠল—হায় রামজি! কে এমন কাজ করল?

বললুম, —বদ্রী, ব্যস্ত হতে হবে না৷ শোনো, তুমি গিয়ে দরজাটা খুলে দেখো তো, ঝড়বৃষ্টি কমেছে নাকি৷

বদ্রী সঙ্গে-সঙ্গে গিয়ে দরজা খুলে দিল৷ ঝড় কমেছে—শুধু ফোঁটা-ফোঁটা বৃষ্টি ঝরছে৷ আমিও ওর পিছনে দাঁড়িয়ে দেখে নিলুম৷ কিন্তু এক মুহূর্তও দাঁড়াতে সাহস হল না৷ ওই অন্ধকারে যেন আজ রাতে দলে-দলে অশরীরী আত্মা এসে অপেক্ষা করছে, কখন কার নাম ধরে ডাকা হবে! আতঙ্কে কাঠ হয়ে বললুম, দরজা বন্ধ করো বদ্রী! তারপর প্রায় দৌড়ে স্টাডির দরজায় হাজির হলুম৷ বোতাম টিপে দরজা খুলে দিলেন শ্রীমতী মালহোত্রা৷ তখন রুদ্ধশ্বাসে বললুম, —কর্নেল, কর্নেল! কে ওঘরে ফোনের লাইনটা কেটে রেখেছে!

শ্রীমতী মালহোত্রা চেঁচিয়ে উঠলেন, —হোয়াট? ফোনের লাইন কেটেছে?

ঘরের আর সবাই চমকে উঠলেন একসঙ্গে৷ কর্নেল চিন্তিত মুখে এক মুহূর্ত কী ভেবে নিয়ে বললেন, মিসেস মালহোত্রা! এখনই বদ্রীকে আলো দিয়ে থানায় পাঠান৷ এক মুহূর্ত দেরি নয়৷ জয়ন্ত, প্লিজ—বদ্রীর সঙ্গে যাও! আগাগোড়া সব জানাবে ওঁদের৷ কুইক!

আবার বেরিয়ে এলুম গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে৷

প্যাথোজেন ও ইলেকট্রনিক ঘড়ি

ঘুম ভাঙলে প্রথমে কয়েক মুহূর্ত কিছু টের পেলুম না যে কোথায় আছি৷ মাথাটা খালি লাগছিল৷ তারপর মনে পড়ল রাত তিনটেয় গ্রিন ভিউ হোটেলে ফিরে এসেছিলুম কর্নেলের সঙ্গে৷ কোনও কথা আর বলিনি পরস্পর এবং শুয়ে পড়েছিলুম৷

মাথার কাছে হাতড়ে ঘড়িটা বের করলুম৷ দেখি, সাড়ে আটটা বাজে৷ তখন মুখ ঘুরিয়ে আমার বৃদ্ধ বন্ধুকে খুঁজলুম৷ ওঁর বিছানা খালি৷ এত পারেন বটে! যত রাতই জাগুন, বরাবর দেখেছি, ছ’টার পর আর বিছানায় কিছুতেই পড়ে থাকবেন না৷ প্রাতঃকৃত্য সেরেই বেড়াতে বেরোবেন এবং যথাসময়ে ফিরে আমাকে জেগে থাকতে দেখলে সলজ্জ হেসে বলবেন, ‘সুপ্রভাত তরুণ বন্ধু! আশা করি, সুনিদ্রার কোনও ব্যাঘাত ঘটেনি৷’

পশ্চিমের জানলা খোলা ছিল৷ কাত হয়ে কিছুক্ষণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে থাকলুম৷ এখন উজ্জ্বল রোদ ঝলমল করছে৷ পাহাড় ও অরণ্য জুড়ে সবুজ হলুদ ও লাল রঙে আঁকা এক অপার্থিব আনন্দধারার ছবি আঁকা হয়েছে যেন৷ তাজা জীবনের ওই রূপে মৃত্যুর দুঃখ বা অশরীরী অশুভের কোনও আতঙ্ক নেই৷

এবার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সেই কুখ্যাত ভূতের পাহাড়ে চোখ গেল৷ সেখানেও রোদ ঝলমল করছে৷ এখন মনে হল, গত রাতে যা কিছু ঘটেছে সব একটা মারাত্মক দুঃস্বপ্ন ছাড়া কিছু নয়৷

হাত বাড়িয়ে ঘণ্টার স্যুইচ টিপতে যাচ্ছি, দরজায় বেয়ারা হরিয়ার পরিচিত গলা শোনা গেল—বেড-টি এনেছি সাহাব!

—চলে এসো!

হরিয়া চা রেখে চলে গেল৷ ওকে জিগ্যেস করলুম না—এখন বেড-টি দিতে কে ফরমাশ করল৷ কর্নেল ছাড়া আর কে হবেন? নিশ্চয়ই বুড়ো তাঁর হাজার চোখের একটি দিয়ে সব দেখতে পাচ্ছেন আমি কী করছি না-করছি৷

ধীরে-সুস্থে আধশোয়া অবস্থায় চা খেয়ে তারপর উঠে পড়লুম৷ বাথরুমে গিয়ে দাড়ি কাটতে-কাটতে রাতের সব ঘটনা এতক্ষণে চোখের সামনে ভেসে উঠল৷ শ্যামলীর মুখটা মনে পড়ল৷ অমনি সারা শরীর ভয়ে হিম হয়ে গেল৷ অধ্যাপক অরিন্দম দ্বিবেদী পুলিশ অফিসার মিঃ সত্যেশ খান্নাকে বলছিলেন, —যদি এ কোনও অলৌকিক বা ভূতুড়ে কাণ্ড হয়, তা হলে আমার ধারণা, বিকেলে ওই ভূতের পাহাড়ে চড়ার সময়ই দুষ্ট আত্মাটা শ্যামলীর পিছু নিয়েছিল৷

তখন কথাটা গ্রাহ্য করিনি৷ এখন মনে হল, তাই ঘটেছে৷ তা ছাড়া আর কী ব্যাখ্যা হতে পারে শ্যামলীর মৃত্যুর? আর মোহন পারেখের ব্যাপারটা...

চিন্তায় বাধা পড়ল আমার বৃদ্ধ সঙ্গীর গম্ভীর কণ্ঠস্বরে৷ ‘সুপ্রভাত জয়ন্ত৷ আশা করি তোমার সুনিদ্রা হয়েছে৷’

উঁকি মেরে দেখি, কর্নেল আর জয়ন্তী ঘরে ঢুকেছেন কখন৷ আশ্চর্য, এতটুকু শব্দ হয়নি দরজার! জয়ন্তীর মুখটা ফোলা-ফোলা৷ চোখ দুটো কোটরে ঢুকেছে৷ শোকগ্রস্ত রুক্ষ চেহারা৷ বেচারার জন্যে দুঃখ হল৷ সে একটা চেয়ারে বসলে কর্নেল আমার উদ্দেশে ফের বললেন—জয়ন্তের মেজাজের কাঁটা কি এখনও স্বাভাবিক ডিগ্রিতে পৌঁছয়নি? দুঃখিত বৎস, খুবই দুঃখিত৷ তোমাকে ওই পাহাড়ি জংলি টাট্টু বদ্রীটার সঙ্গে ভূতপ্রেত অধ্যুষিত বাণেশ্বরে খানিকটা ছোটাছুটি করিয়েছিলুম গত রাত্রে৷ এজন্যে আমাকে ক্ষমা করো৷ তোমার মতো শক্তসমর্থ বুদ্ধিমান যুবক আর কোথায় পেতুম তখন?

কথার ভঙ্গি শুনে হেসে ফেললুম৷—দাড়ি কাটার সময় কথা বলতে নেই৷ এ আমার গুরুজনের শিক্ষা৷ যাক গে৷ মোহন পারেখের পাত্তা পাওয়া গেল?

—হ্যাঁ৷

চমকে উঠলুম৷ —হ্যাঁ মানে? শ্যামলীর কথা তা হলে সত্যি?

—নিখাদ সত্যি, জয়ন্ত৷ কিছুক্ষণ আগে ভূতের পাহাড়ের পশ্চিম খাদে ওর দলাপাকানো লাশটা পুলিশ খুঁজে পেয়েছে৷ কেউ সত্যি ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল৷

তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলুম৷ দাঁত ব্রাশ করা আর হল না৷ ঘরে ঢুকে নিজের বিছানায় বসে বললুম—আপনি স্বচক্ষে দেখে এলেন নাকি?

—দেখলুম৷... কর্নেল চিন্তিত মুখে জবাব দিলেন৷

—শ্যামলীর লাশের ময়নাতদন্ত এতক্ষণ নিশ্চয়ই হয়ে যাওয়া উচিত৷ কোনও খবর পাননি এখনও?

—ডঃ পট্টনায়ক মর্গে রয়েছেন৷ উনি রিং করবেন ন’টা নাগাদ৷ দেখা যাক৷

—মর্গ তো সেই বাণেশ্বর-ইস্টের হাসপাতালে?

কর্নেল মাথা দোলালেন৷ জয়ন্তী আস্তে ভাঙা গলায় বলল—কী পাবে লাশে? কিছু না৷ আমাকে শ্যামলী বরাবর কুসংস্কারের ডিপো বলে ঠাট্টা করত৷ তাই যেন ওর এই কঠিন শাস্তি হল! ওর মাকে কী ভাবে মুখ দেখাব, ভেবে পাচ্ছি না৷

বললুম, —ওর আত্মীয়স্বজনকে টেলি করা হয়েছে তো?

কর্নেল বললেন, —তুমি এইমাত্র ঘুম থেকে উঠেছ কি না৷ গতরাত্রে আরও কত ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, জানো না জয়ন্ত৷ বাণেশ্বরে আমরা আপাতত কয়েকটা দিন আটকে গেলুম৷ কারণ ফেরার পথ বন্ধ৷ টনকপুরের রাস্তায় বিরাট ধস নেমেছে৷ টেলিসংযোগ বিচ্ছিন্ন—সব পোস্ট উপড়ে গেছে৷ মেন ইলেকট্রিক লাইনও ছিঁড়েছে৷ তার ফলে এখন স্থানীয় বিদ্যুতের ওপর সামান্য ভরসা৷ লাধিয়া নদীর জলপ্রপাত থেকে জলবিদ্যুৎ যেটুকু হয় তার তিন ভাগ যায় সামরিক ছাউনিতে, এক ভাগ পায় বাণেশ্বরের অসামরিক বাসিন্দারা৷ লোডশেডিং না হয়ে যায় না আজ৷ বুঝলে জয়ন্ত, আপাতদৃষ্টিতে সমস্ত ব্যাপারটা যেন এক অদৃশ্য শক্তির মারাত্মক ষড়যন্ত্র!

বললুম, —তা হলে অবশেষে আপনি এতদিনে অলৌকিকে বিশ্বাসী হলেন?

—হলুম মানে? আমি কি অলৌকিকে অবিশ্বাসী ছিলুম কখনও?

ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম আমার দীর্ঘ দিনের চেনা যুক্তিবাদী বিজ্ঞানী ও সর্বশাস্ত্রবিদ প্রাজ্ঞ বন্ধুটির দিকে৷ বলেন কী! অবশেষে এই বাণেশ্বরে এসে এক রাত্রেই ভীষণ ভাবে বদলে গেলেন ভদ্রলোক?

আমার মনের কথাগুলো যেন টের পেয়েই ধুরন্ধর গোয়েন্দা-প্রবর একটু হাসলেন৷ বললেন, —বৎস জয়ন্ত, ধর্মসূত্রে আমি বরাবর একজন খ্রিস্টিয়ান, তা তো জানোই৷

—কী মুশকিল! ভগবানে বিশ্বাস এক কথা, আর ভূতে বিশ্বাস অন্য কথা যে!

—জয়ন্ত, জয়ন্ত! খামোখা তর্ক করো না৷ আমি ভূত কথাটা বলিইনি৷ বলেছি, অদৃশ্য শক্তির কথা৷ সবসময় পায়ে-পায়ে এই অদৃশ্য শক্তির খেলা তুমি কি লক্ষ্য করো না? ভুলে যেও না—আমাদের সামনে প্রতি মুহূর্তে রয়েছে এক অজানা ভবিষ্যৎ৷ যা ইচ্ছে করি, তা যে ঘটবেই তার গ্যারান্টি আছে কি? সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটতে পারে—ওই বুঝি ডঃ পট্টনায়ক ফোন করছেন৷

প্রতি স্যুটে ফোনের ব্যবস্থা আছে গ্রিন ভিউ হোটেলে৷ ফোন বেজে উঠেছিল৷ কর্নেল হাত বাড়িয়ে ফোনটা ধরলেন—হ্যালো, কর্নেল সরকার বলছি৷... হ্যাঁ৷... মাই গুডনেস!... কী? রক্তে প্যাথোজেন? আর ইউ শিওর, ডক্টর?...ও! মাই!... আই এগ্রি... ঠিক আছে৷ চলে আসুন, অপেক্ষা করছি৷...কে? মিঃ খান্না?... দ্যাটস রাইট৷ চলে আসুন৷

কর্নেল ফোন রাখলেন৷ জয়ন্তী উদ্বিগ্নমুখে বলল, —মর্গ থেকে ফোন করছিল নাকি?

কর্নেলকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল৷ বললেন, —হ্যাঁ৷ শ্যামলীর মৃত্যুর কারণ তেমন কিছু বোঝা যায়নি৷ হঠাৎ হার্ট ফেল করেছে, এটুকুই বলা যাচ্ছে৷ আর রক্তে প্যাথোজেন নামে একরকম সাংঘাতিক জীবাণু পাওয়া গেছে৷ এসব জীবাণু জন্মায় ফুলগাছের গোড়ায় স্যাঁতসেঁতে মাটিতে৷ অনেক সময় ফুলদানিতে অনেকদিন ফুল রাখলে তার জলে এরা কলোনি গড়ে তোলে৷ রক্তের সংস্পর্শে গেলেই চোখের পলকে ঠিক পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণের মতো কোটি-কোটি কলোনি গড়ে তোলে৷ সম্প্রতি একটা মার্কিন মেডিক্যাল পত্রিকায় পড়ছিলুম, মিয়ামি হাসপাতালের সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে পরপর অনেকগুলো অপারেশনের রুগি মারা পড়ে৷ ডাক্তাররা হতভম্ব৷ তদন্ত বোর্ড বসল৷ শেষঅব্দি গোয়েন্দা বিভাগ আসরে নামল৷ তবু রহস্যের মীমাংসা হল না৷ অবশেষে দু’জন ছোকরা ডাক্তার মরিয়া হয়ে লেগে গেলেন৷ তারপর আবিষ্কার করলেন যে ওই ওয়ার্ডে একটা ফুলদানিই হচ্ছে অপরাধী! না—না জয়ন্ত, তাই বলে তুমি এ ঘরের ফুলদানি দুটোর দিকে নিষ্ঠুরভাবে তাকিও না৷ ওই পাহাড়ি অর্কিডে সাজানো টারিলাস ম্যারাইটাভিরাস গোষ্ঠীর ফুল অনেক কষ্টে আমি সংগ্রহ করেছি৷ প্রতি সকালে তুমি ঘুমিয়ে থাকার সময় ফুলদানি দুটোর জল পালটে দিই৷ জীবাণুনাশক লোশন ঢেলে দিই৷ অতএব নির্ভয়ে থাকো৷ আর জয়ন্তী, ডার্লিং! ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করো কিছুক্ষণ৷ সেই ছ’টা থেকে অনেক ঘুরেছ এ বুড়োর সঙ্গে৷ যথাসময়ে তোমাকে ডাকব৷

জয়ন্তী বেরিয়ে গেল৷ আমি বললুম—মোহন পারেখের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু ভাবলেন?

কর্নেল বললেন—ভেবেছি৷ ও ঠিক আমাদের নীচের তলার স্যুটে ছিল৷ বেয়ারারা বলেছে, গতকাল দুপুর নাগাদ ও বেরিয়ে যায়৷ কাউকে কিছু বলে যায়নি৷ আর ফেরেওনি৷

—কিন্তু বদ্রী বলল সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় ফোন করে ওকে এখানে পেয়েছিল!

—বদ্রীটা সম্ভবত কিছু জানে, গোপন করছে৷ তবে ওর ভুল হতেও পারে৷ কারণ, পুলিশের জেরায় ও কবুল করেছে যে পারেখের কণ্ঠস্বর ওর চেনা নয়৷ তা যদি সত্যি হয়, তা হলে অন্য কেউ ওসময় ওর স্যুটে ফোন ধরেছিল৷

—কিন্তু স্যুটে তো ডিরেক্ট লাইন নেই! হোটেলের ম্যানেজার কী বলছেন? অপারেটারেরই বা বক্তব্য কী?

—ম্যানেজার কোনও খবর রাখেন না৷ অপারেটর মেয়েটি বলছে যে সে যথারীতি পারেখসায়েবের স্যুটে কানেকশন দিয়েছিল৷ কোনও বোর্ডার ঘরে না বাইরে, তার তো জানার কথা নয়৷ তবে সে দু’পক্ষের যা সব কথাবার্তা শুনেছে, তাতে বদ্রীর কথা ঠিকঠাক মিলে যায়৷

—অর্থাৎ ওই সময় পারেখের ঘরে কেউ ছিল?

—রাইট, রাইট৷

—পারেখের ঘর তো রাত্রেই সার্চ করা হচ্ছিল৷ কিছু বোঝা গেছে?

—কিচ্ছু না৷ তেমন কোনও সন্দেহজনক ব্যাপার দেখা গেল না৷ তবে কিছু খোওয়া গেছে কি না, বলা কঠিন৷ বলতে পারত পারেখ নিজে৷

—কিন্তু কর্নেল, মিসেস মালহোত্রার লাইন কাটল কে? বদ্রীকে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না৷

—বদ্রীকে পুলিশও বিশ্বাস করে না৷ তাই গ্রেফতার করেছে৷ দেখা যাক৷

এই সময় জয়ন্তী হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল৷ —কর্নেল! কর্নেল! এ কী কাণ্ড! আমাদের ঘরে কেউ ঢুকেছিল—জিনিসপত্র হাতড়ে একাকার করে রেখেছে!

—সে কী! বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর আমার দিকে ঘুরে বললে—জয়ন্ত, এক মিনিট৷ আমি আসছি৷ তুমি তিনটে ব্রেকফাস্ট বলে দাও৷ খিদে পেয়েছে এবার৷

ফোনে ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিয়ে রাতের পোশাক বদলাচ্ছি, তখন কর্নেল ও জয়ন্তী ফিরলেন৷ বললুম, —কী ব্যাপার?

কর্নেল একটু হাসলেন—ক্রমশ বোঝা যাচ্ছে, মোহন পারেখ বা শ্যামলীর হত্যাকারী ভূতপ্রেত হোক বা মানুষ হোক, একটা কিছু খুঁজে পাওয়ার জন্যে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে৷ কী হতে পারে সেটা? এ সার্টেন থিং—কোনও একটা জিনিস, তা অপরের কাছে যত অনাবশ্যক বা তুচ্ছ মনে হোক, তার কাছে জীবনমরণ প্রশ্নে জরুরি৷ হ্যাঁ—এটা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠছে৷ জিনিসটা যে কী, তা শ্যামলী আর মোহন পারেখই জানত৷ দুর্ভাগ্যক্রমে দু’জনেই আজ মৃত!

এই সময় ডঃ পট্টনায়কের সাড়া পাওয়া গেল৷ —আসতে পারি কর্নেল সরকার?

কর্নেল দরজা খুলে বললেন—আসুন, আসুন৷ আপনারই অপেক্ষা করছি৷ এখন শুধু ব্রেকফাস্টপর্ব বাকি৷ আপনি ইচ্ছে করলে আমাদের সঙ্গে...

ডঃ পট্টনায়ক বসে পড়লেন৷ তারপর চিন্তিত মুখে বললেন—জীবনে অনেক মড়া ঘেঁটেছি৷ একসময় তো ডাক্তারিই পেশা ছিল৷ ভুবনেশ্বর মর্গের চার্জেও ছিলুম কিছুদিন৷ তারপর তো বিলেতে ফোরেনসিক ডিগ্রি নিয়ে এলুম৷ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডেও শিক্ষানবিসি করেছি৷ কিন্তু কর্নেল, শ্যামলীর ডেডবডি আমাকে এক অদ্ভুত রহস্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে৷ মাথামুন্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারছিনে৷ এ এক আজব হেঁয়ালি!

—দয়া করে বিশ্লেষণ করুন, ডক্টর৷

—মৃত্যুর কারণ কমন৷ আকস্মিক হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়া৷ কিন্তু কেন বন্ধ হল হৃৎপিণ্ড? ওইরকম হঠাৎ বন্ধ হলই বা কেন? তার কোনও সূত্র বডিতে নেই৷ রক্তে অবশ্য প্রচুর প্যাথোজেন পাচ্ছি৷ কিন্তু প্যাথোজেন—প্রথম কথা, রক্তের সংস্পর্শ না পেলে দেহে ঢুকতে পারে না৷ দ্বিতীয় কথা—ঢুকলেও মৃত্যু ঘটাতে অন্তত সাত-আট ঘণ্টা সময় নেয়৷ এই সময়টার পর্ব ভাগ করা যায়৷ প্রথমে শুরু হয় অস্বস্তি, মাথা ঘোরা, ঘুম-ঘুম ভাব৷ দ্বিতীয় পর্বে আক্রান্ত স্থান ফুলতে শুরু করে৷ বেদনা বাড়ে৷ জ্বর আসে প্রচণ্ড৷ চোখের তারা লাল হয়ে যায়৷ তৃতীয় পর্বে আরম্ভ হয় প্রলাপ বকা৷ খিঁচুনি৷ মুখে ফেনা জমে ওঠা৷ গলায় ঘড়ঘড় শব্দ৷ তারপর শ্বাসকষ্ট এবং আধ ঘণ্টার মধ্যেই হার্ট ফেল করে৷ এখন বলুন কর্নেল, প্যাথোজেন কীভাবে শ্যামলীর মৃত্যুর কারণ বলি?

কর্নেল বললেন, —তা তো বটেই৷

—অথচ ব্লাডে প্যাথোজেন রয়েছে৷ কী ভাবে এল এই জীবাণু? দেহে কোনও ক্ষত নেই শ্যামলীর৷

—ইনজেকশনের কোনও চিহ্নও পাননি?

—পাইনি৷ সে তো আপনাকে ফোনেই বলেছি তখন৷ ডঃ পট্টনায়ক একটু হাসলেন৷—এই প্যাথোজেনই সমস্যার সৃষ্টি কবেছে৷ তা না হলে মৃত্যুটার একটা ব্যাখ্যাই দেওয়া যেত—ভূতের হাতে মৃত্যু!

কর্নেল একটু নড়ে বসলেন৷ —আচ্ছা ডঃ পট্টনায়ক, শ্যামলীর কোনওরকম অসুখ-বিসুখের চিহ্ন কি পেয়েছেন বডিতে?

মাথা নাড়লেন ডঃ পট্টনায়ক৷—কিছু পাইনি৷ সে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল—নীরোগ ছিল৷ এমন কোনও অবস্থা তার দেহে দেখিনি, যাতে কোনও অসুখের আভাস মেলে৷ অবশ্য, ওই প্যাথোজেনঘটিত প্রতিক্রিয়াটা বাদে৷

—ডঃ পট্টনায়ক, এবার আমার প্রশ্নের জবাব দিন৷

—বলুন৷

—আমি যদ্দূর জানি, প্যাথোজেন দেহে ঢোকার পর কলোনি ফর্ম করতে শুরু করে সেকেন্ডে হাজার কোটি হিসেবে৷ এরকম চলে কমপক্ষে দু-ঘণ্টা৷ এই পর্যায়ের কলোনির চেহারা ঠিক গুচ্ছ-গুচ্ছ৷ পরের পর্যায়ের দু-ঘণ্টা সেকেন্ডে পাঁচশো কোটিতে দাঁড়ায়৷ এই কলোনির চেহারাও গুচ্ছ-গুচ্ছ—কিন্তু একটি করে বৃত্ত থাকে৷ একেকটি বৃত্তে এক কোটি করে গুচ্ছ৷ তৃতীয় পর্যায়ে কলোনি গড়ার গতি আরও মন্থর—সেকেন্ডে আড়াইশো কোটি৷ গুচ্ছ-বৃন্তগুলো এবার ঠিক বৃত্ত বলা যায় না—বলা যায় ডিম্বাকৃতি৷ চতুর্থ পর্যায়ে আবার গোড়ার মতো সরলরেখায় চলে৷ কিন্তু গুচ্ছগুলো অনেক বড়ো৷ গোড়ায় একটা গুচ্ছের মাপ থাকে এক বাই লক্ষ সেন্টিমিটার৷ শেষ ধাপে গুচ্ছের মাপ হয় এক লক্ষ সাতান্ন হাজার সেন্টিমিটারের কিছু বেশি৷

ডঃ পট্টনায়ক হাঁ করে শুনছিলেন৷ এবার বললেন, —ওয়ান্ডারফুল!

—হ্যাঁ৷ এ আমার সামান্য পড়াশোনার ফলাফল মাত্র৷ এখন তা হলে শুনুন ডঃ পট্টনায়ক৷ কারও দেহে প্যাথোজেন সংক্রামিত হলে এটা বের করা সম্ভব যে, ঠিক কোন জায়গা দিয়ে ওই মারাত্মক জীবাণু ঢুকেছে৷ প্রথম পর্যায়ের কলোনির চেহারা ও মাপ নিয়ে এবং দেহের যেখানে ওগুলো পাওয়া গেছে, সেখানে খুঁজলেই অবশ্য আমরা প্রথম আক্রমণের জায়গাটি দেখতে পাব৷

কর্নেল থামতেই ডঃ পট্টনায়ক লাফিয়ে উঠলেন—তাই তো! তাই তো! এদিকটা তো ভাবিইনি৷... বলে তিনি ফোন তুলে নিয়ে ব্যস্তভাবে বললেন, —বাণেশ্বর-ইস্ট হ্যারিংটন হসপিটাল প্লিজ!

তারপর ফোনে কান রেখে আমাদের দিকে ঘুরে বললেন, —এতক্ষণ ডেডবডিটার কী অবস্থা কে জানে?

জয়ন্তী বলে উঠল, —কী অবস্থা মানে? ডেডবডি আমরা নেব যে!

আমি বললুম, —টেলি-যোগাযোগ চালু করতে এক সপ্তাহ লেগে যাবে৷ শ্যামলীর আত্মীয়স্বজনের ভাগ্যে বডি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই৷

এই সময় ব্রেকফাস্ট এসে গেল৷

ডঃ পট্টনায়ক লাইন পেলেন৷ —হ্যালো! হ্যারিংটন? ডঃ প্রসাদকে দিন৷... ডঃ প্রসাদ, পট্টনায়ক বলছি৷ জরুরি ব্যাপার৷ ডেডবডিটা অ্যাজ ইট ইজ আছে তো?... আছে? প্লিজ—তাই রাখুন৷... না, না৷ আমি এখনই যাচ্ছি৷ একটা ভুল... হ্যাঁ, যাচ্ছি৷

ডঃ পট্টনায়ক উঠে দাঁড়ালেন৷ —কর্নেল, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ৷ ব্যাপারটা আমি ভাবিইনি আদতে৷ ঠিক আছে—চললুম৷

কর্নেল বললেন, —আমাকে মিসেস মালহোত্রার ওখানে পেয়ে যাবেন৷ এখনই বেরোব আমরা৷

ডঃ পট্টনায়ক বেরিয়ে গেলেন ব্যস্তভাবে৷...

সেই বিভীষিকার স্মৃতিজড়ানো ঘরটাতে কর্নেলের সঙ্গে ঢুকে আবার আমার অস্বস্তি জেগে উঠেছিল৷ ঘরের যেখানে যা ছিল, একটুও নড়চড় করা হয়নি৷ গত রাতের গোলটেবিল আর তাকে ঘিরে আটটা চেয়ার একই অবস্থায় আছে৷ পারেখ সাহেবের জন্যে বদ্রী যে চেয়ারটা রেখেছিল এবং শ্রীমতী মালহোত্রা যেখানে সরিয়ে রেখেছিলেন, সেটা সেখানেই আছে৷ রাতে পুলিশ এসে পড়ার পর থেকে বাড়িটা প্রকৃতপক্ষে কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে৷

আমার বিভ্রম ঘটছিল৷ মনে হচ্ছিল, ওই শূন্য চেয়ারটায় এখনও শ্যামলীকে যেন দেখতে পাচ্ছি—সেই বীভৎস কালচে মুখ একদিকে কাত হয়ে আছে! পুলিশ অফিসার শ্রীখান্না আর কর্নেল ঘরের জানলাগুলো খুলে দিলেন৷ ঘরের মধ্যে সকালের উজ্জ্বল আলো এসে ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গে আমার অস্বস্তি খানিকটা দূর হল৷

খান্না ঘরটার ভেতর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, —কর্নেল, আমার মনে হচ্ছে আততায়ী এই ঘরে আগে থেকেই লুকিয়ে ছিল৷ এতে কোনও ভুল নেই৷ এত সব বইয়ের শেলফ আর আলমারি চারদিকে! পিছনে ফাঁক যেটুকু আছে, একজন লোক কাত হয়ে দিব্যি দাঁড়িয়ে থাকতে পারে৷ কেউ তাকে দেখতে পাবে না৷

এই বলে তিনি শ্যামলীর চেয়ারের এক মিটার দূরে বড়ো আলমারির পিছনে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালেন৷ কর্নেল বললেন, —অবশ্য সবই অনুমান৷ এবং অনুমান কখনও সিদ্ধান্ত নয় মিঃ খান্না৷

—তা যদি বলেন, আমি বলব, অনুমানটা যুক্তিসিদ্ধ৷... খান্না সরে গিয়ে পাশের জানলার কাছে গেলেন৷—জানলাগুলো সবই বন্ধ ছিল৷ কাজেই বাইরে থেকে কেউ যে কিছু ছুঁড়ে মারবে শ্যামলীর দিকে, তাও অসম্ভব!

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —ছুঁড়বেটা কী শুনি?

—ধরুন, কোনও বিষাক্ত সূচলো অস্ত্র৷ এমন সূক্ষ্ম অস্ত্র কি থাকতে পারে না কর্নেল?

—খুব পারে৷ বিদেশে পেশাদার এক হত্যাকারী একরকম যন্ত্র বানিয়েছিল৷ রিভলভারের মতো দেখতে৷ গুলির বদলে নল দিয়ে দু-ইঞ্চি সূক্ষ্ম ইঞ্জেকশানের সূচের মতো বিষাক্ত তির ছুঁড়ে মারত৷ ভিকটিম সঙ্গে-সঙ্গে ঢলে পড়ত৷ এই বিষ কিন্তু আমাদের সভ্যজগতের জানাশোনা বস্তু নয়৷ ব্রাজিলের আমাজন নদের অববাহিকায় যে হাজার-হাজার বর্গমাইল জঙ্গল রয়েছে, সেখানকার জিভারো নামে এক আদিম জাত ‘নাটেমা’ নামে একরকম সুতীব্র বিষ তৈরি করে৷ তা সামান্য পরিমাণে তিরে মাখিয়ে তারা শিকার করতে অভ্যস্ত৷ সেই হত্যাকারী কীভাবে নাটেমা জোগাড় করেছিল কে জানে, তার অদ্ভুত ব্লো-গানের সাহায্যে দিব্যি হত্যার পর হত্যা চালিয়ে যাচ্ছিল৷ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের তো আক্কেল গুড়ুম...!

খান্না সোৎসাহে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন, —কর্নেল, কর্নেল! এক্ষেত্রেও যেন তাই হয়েছে অবিকল৷ কারণ, ডেডবডিতে আমাদের ডাক্তাররা আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে মারা পড়ার মতো কোনও জিনিস খুঁজে পাননি৷ এ সেই নাটেমার কাজ নয় তো?

কর্নেল হো-হো করে হেসে উঠেই গম্ভীর হয়ে গেলেন হঠাৎ! আপনমনে অস্পষ্ট স্বরে দুর্বোধ্য কী আওড়ালেন৷ তার মধ্যে দুটো শব্দ বোঝা গেল—‘নাটেমা’, ‘প্যাথোজেন’৷

খান্না তাঁকে অবাক হয়ে লক্ষ্য করার পর বললেন, —এনিথিং সিরিয়াস, কর্নেল?

কর্নেল আবার স্বাভাবিক হয়ে গেলেন৷ —না, তেমন কিছু নয়৷ মিঃ খান্না, এবার আমাদের ডাইনিং হলে যেতে হবে৷

—সে কী! আপনার এর মধ্যেই ডিটেল পরীক্ষা হয়ে গেল নাকি? বলেছিলেন, দিনের আলোয় ঘরটা খুঁটিয়ে দেখবেন!

—নাঃ, দেখার কিছু নেই৷.. বলে কর্নেল ফের একটু হাসলেন৷

—মিসেস মালহোত্রার বইয়ের সংগ্রহ দেখাটাই উদ্দেশ্য ছিল আসলে৷ কী কাণ্ড! শুধু প্রেততত্ত্ব, প্যারাসাইকলজি আর দর্শনের বইতে ভর্তি৷ সত্যি, ভদ্রমহিলার পাণ্ডিত্যের কোনও তুলনা হয় না! কী জয়ন্ত, তুমি মুখ বুজে রয়েছ যে? বলো—কিছু বলো৷

বললুম, —কী বলব? আমি যদি কর্নেল সরকার হতুম, তা হলে অন্তত এ ঘরে একটা ব্যাপার চোখ এড়িয়ে যেত না যে৷

কর্নেল আমাকে থামতে দেখে কৌতূহলী হয়ে বললেন, —বলে যাও৷

—দেওয়ালঘড়ির কাঁটা দুটো চলছে না৷ আটটা পাঁচ মিনিটে আটকে আছে৷

খান্না দ্রুত নিজের ঘড়ি দেখলেন৷ তাঁর মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল৷ কর্নেল মুখ তুলে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন তো আছেনই৷ আমি এই রহস্যের আবিষ্কর্তা হিসেবে খুবই গর্বিত বোধ কবছিলুম৷ মনে-মনে বলছিলুম, কী গোয়েন্দাপ্রবর? তা হলে অনেক ব্যাপার তোমারও চোখ এড়িয়ে যায় বটে তো?

খান্না রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলেন, —ঘড়িটা বন্ধ দেখছি? রাত্রে তো লক্ষ্য করিনি আমরা৷

এবার কর্নেল মুখ নামালেন৷ মুখটা দারুণ গম্ভীর৷ বললেন, —হুম! ঠিক ওই সময়ই শ্যামলীকে মৃত অবস্থায় আমরা দেখতে পাই—অর্থাৎ তখনই মিসেস মালহোত্রা বড়ো আলো জ্বেলে দেন৷ আমি অভ্যেসমতো তখন নিজের ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলুম৷ তারপরই দেখছি, ওই দেওয়ালঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে৷ ভারী আশ্চর্য তো!

খান্না ব্যস্তভাবে বললেন, —মিসেস মালহোত্রা কিছু বলতে পারেন নাকি দেখা যাক৷ এক মিনিট—আসছি৷

উনি ডাইনিং হলের দিকে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন৷ রাত্রেই এ ঘরের চাবি উনি শ্রীমতী মালহোত্রার কাছে নিয়ে রেখেছেন৷

কর্নেল ঘড়িটার দিকে আরেকবার তাকিয়ে সপ্রশংস স্বরে বললেন, —তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, জয়ন্ত৷

বললুম, —তা হলে দেখুন, আপনার সঙ্গগুণে আমিও সহস্রাক্ষ হতে পেরেছি৷

কর্নেল মিটিমিটি চোখে হেসে বললেন, —তবে কী জয়ন্ত, জানো? চোখ দুটোই থাক, আর হাজারটাই থাক—খুব কাছে দেখলে সব জিনিসই ঝাপসা লাগে!

প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলুম, শ্রীমতী মালহোত্রা এসে পড়লেন৷ —কী ব্যাপার? ঘড়ি বন্ধ? সে কী? ঘড়ি তো কেউ বন্ধ করিনি আমরা! হঠাৎ বন্ধ হওয়ার কোনও কারণও তো নেই৷ ইলেকট্রনিক সিস্টেমে তৈরি একেবারে মডার্ন জিনিস৷ আমার পরলোকগত স্বামীর পার্টনার বিদেশ থেকে এনে উপহার দিয়েছিলেন৷ এত ভালো সার্ভিস কোনও ঘড়ি দেয় না!

কর্নেল বললেন, —তা হলে ওটা ইলেকট্রিক কারেন্টে চলে মিসেস মালহোত্রা?

—হ্যাঁ...বলে শ্রীমতী মালহোত্রা ঘড়িটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন৷ বিড়বিড় করে বললেন ফের—আশ্চর্য, পরম আশ্চর্য ঘটনা! ঠিক এ সময় অশরীরী আত্মাটা শ্যামলীকে মেরে রেখে চলে যায় গত রাতে৷ আটটা পাঁচ... ঘড়ি দেখে নিয়েছিলুম তক্ষুনি...৷

—কোন ঘড়ি?

—রিস্টওয়াচ৷

কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়েছিলেন৷ বললেন, —মিসেস মালহোত্রা, অনুগ্রহ করে আর একটা কথার জবাব দিন৷ আপনার চেয়ার থেকে ওই ঘড়িটা সোজা তাকালেই চোখে পড়ে৷ গত রাতে প্রথম আলো বা দ্বিতীয় আলোটা জ্বালার পর তো স্বভাবতই আপনার ওদিকে চোখ পড়া উচিত ছিল!

শ্রীমতী মালহোত্রা গম্ভীর মুখে বললেন, —ছিল, অবশ্যই ছিল৷ কিন্তু কেন যে ওদিকে তাকাইনি, সেটা এখন বলা কঠিন৷ তবে একটা সহজ ও সঙ্গত কৈফিয়ত আমি দিতে পারি৷ প্রেতশক্তিতে যারই বিশ্বাস আছে, সেই পারে কর্নেল! সে আমাদের বিভ্রান্ত করে ফেলেছিল!

—কিন্তু আপনি তখন আলো জ্বেলেছিলেন কেন, তা আশা করি স্মরণ আছে মিসেস মালহোত্রা৷ আপনি শ্যামলীকে অবিশ্বাস করেই রেগে গিয়েছিলেন৷ অর্থাৎ প্রেতশক্তি সত্যি-সত্যি আসেনি এই বিশ্বাসেই আলো জ্বেলেছিলেন!

শ্রীমতী মালহোত্রা এবার চঞ্চল হয়ে উঠলেন, —কিন্তু প্রেতশক্তি সত্যিই এসেছিল, অস্বীকার করতে পারেন? আপনিও তো ছিলেন কর্নেল৷ বলুন, আপনিও কি অভিভূত বা হতভম্ব হয়ে পড়েননি তখন? আপনিও কি অন্য কোনওদিকে তাকাবার সুযোগ পেয়েছিলেন?

কর্নেল হার মেনে বললেন, —রাইট, বাইট৷ আই এগ্রি, ম্যাডাম৷ আলো জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে একমাত্র শ্যামলীই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল বটে৷

এইসময় মিঃ খান্না বলে উঠলেন, —মাই গুডনেস! কর্নেল! মিসেস মালহোত্রা! ঘড়ির পিছনে ইলেকট্রিক তারটা কাটা রয়েছে যে!

এবার খান্নার দিকে চোখ গেল সবার৷ এতক্ষণ তিনি ঘড়ির কাছে দাঁড়িয়ে মুখ তুলে কী সব দেখছিলেন৷ আমরা গিয়ে দেখলুম, ঠিক তাই বটে৷

কিন্তু শ্রীমতী মালহোত্রা সন্দেহাকুল হয়ে বললেন, —তারটা জ্বলে যায়নি তো মিঃ খান্না?

—না ম্যাডাম৷ সুন্দরভাবে ধারালো কিছু দিয়ে কাটা হয়েছে!

শ্রীমতী মালহোত্রা যেন শিউরে উঠলেন৷—ফোনের লাইনও অমনিভাবে কে কেটে রেখেছে! কেন—কেন কর্নেল? কী উদ্দেশ্যে ছিল সেই অশরীরী আত্মার?

অসহায় দেখাচ্ছিল ভদ্রমহিলাকে৷ কর্নেল বললেন, —আপনার প্রেততত্ত্বে কী বলে জানি না৷ প্রেতশক্তি কি এমন কিছু করে? পড়েছেন এমন কোনও ঘটনার কথা?

শ্রীমতী মালহোত্রা উদ্বিগ্নমুখে জবাব দিলেন, —কিচ্ছু অসম্ভব নয় ওদের পক্ষে৷ অনেক অদ্ভুত ঘটনার কথা নিশ্চয়ই পড়েছি৷

খান্না সকৌতুকে বললেন, —প্রেতশক্তি ছুরি ব্যবহার করেছে নাকি?

শ্রীমতী মালহোত্রা ক্ষুদ্ধস্বরে বললেন, —পার্থিব অস্ত্র ব্যবহার করার দরকাবই হয় না ওদের৷ ইচ্ছে করলেই সব ঘটে যায়৷ বড়ো গাছ বিনা ঝড়ে আচমকা ভেঙে পড়ার কথা কি শোনেননি আপনারা? শোনেননি, সেবারে হঠাৎ ভূতের পাহাড়ের ওপর থেকে তিনশো টন একটা পাথর পড়ে গিয়েছিল দিনদুপুরে? বস্তুবাদী বিজ্ঞান বলবে এই-এই কারণে এটা ঘটেছে৷ কিন্তু কারণেরও কারণ থাকে৷

কর্নেল অন্যমনস্ক হয়ে ছিলেন যেন৷ হঠাৎ বললেন, —আচ্ছা মিসেস মালহোত্রা, আপনার ওই ঘড়িটার তো দেখছি পেন্ডুলাম নেই৷ কিন্তু টিকটিক শব্দ করতে তো বারণ নেই৷ রাত্রে আমরা তেমন কোনও শব্দ শুনিনি কিন্তু৷

—না৷ ইলেকট্রনিক সিস্টেম থাকায় ওটা নিঃশব্দে চলে৷

—ঘণ্টাও কি বাজে না?

শ্রীমতী মালহোত্রা চমকে উঠে বললেন, —বাজে তো!

—কিন্তু গত রাত্রে আমরা ঘড়িটা বাজতে শুনিনি৷

শ্রীমতী মালহোত্রার মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল৷ —তাই তো! হ্যাঁ—ঘড়িটা তো বাজেনি! আশ্চর্য, বড়ো আশ্চর্য! আমার তো একটু খেয়াল ছিল না!

এতক্ষণ ধরে এই ভ্যাজর-ভ্যাজর শুনে আমার কান গরম হয়ে উঠেছিল৷ তাই বললুম, —আপনারা কথা বলুন, কর্নেল৷ আমি একটু বাইরে ঘোরাঘুরি করি ততক্ষণ৷

কর্নেল বললেন, —হ্যাঁ-হ্যাঁ৷ দেখো জয়ন্ত, বেচারা জয়ন্তী এতক্ষণ ওঘরে হাঁপিয়ে উঠেছে৷ তুমি ওকে সঙ্গ দাও৷ আমরা আসছি৷ মিঃ খান্না, ওকে দরজা খুলে দিন৷

—ইন্টারলকিং সিস্টেমের এই এক জ্বালা!—বলে মিঃ খান্না দরজা খুলে দিলেন৷

আমি ডাইনিং হলে গিয়ে জয়ন্তীকে খুঁজলুম৷ বা রে! গেল কোথায় সে? এতক্ষণ একা বসিয়ে রাখার জন্যে রেগে হোটেলে ফিরে গেল নাকি? দরজার বাইরে তিন-চারজন কনস্টেবল বসে ছিল৷ ভেতরে একজন সাব-ইন্সপেক্টর কোনার সোফায় বসে পুরোনো কাগজ পড়ছিলেন৷ এর আগেই আলাপ হয়েছে ভদ্রলোকের সঙ্গে৷ নাম ব্রিজেশ সিং৷ আমাকে দেখে বললেন— ওঁদের বেরোতে দেরি হবে নাকি চৌধুরী সাহাব?

—হতে পারে৷ ইয়ে মিঃ সিং, আমাদের সঙ্গের ভদ্রমহিলা কোথায় গেলেন বলুন তো?

ব্রিজেশ সিং হাসলেন৷ —স্ত্রীলোকেরা স্যার বড্ড সাম্প্রদায়িক৷ সুতবাং মিস রায়কে কিচেনের দিকে যেতে দেখেছি এবং সরযূর সঙ্গে কথা বলতে শুনেছি৷

আমি একটু ইতস্তত করে ডাইনিংয়ের শেষ দিকে কিচেনের কাছে এগিয়ে গেলুম৷ ওখানে যেতেই জয়ন্তীর কণ্ঠস্বর কানে এল৷ ডাকব কি না ভাবছি, লছমন নামে বুড়ো চাকরটা পরদা তুলে বেরিয়ে এল৷ আমাকে দেখে সেলাম দিয়ে বলল, —দিদিজিকে খুঁজছেন স্যার? সরযূর সঙ্গে গপসপ করছেন৷ ডেকে দিচ্ছি৷

সে চলে গেল৷ তারপর জয়ন্তী বেরিয়ে এল৷ বললুম, —রাগ করেননি তো? আপনি আমাদের সঙ্গে ওঘরে যেতে চাইলেন না—তো কী করব?

জয়ন্তী বলল, —ওঘরে প্রাণ গেলেও যেতে পারব না৷ সব মনে পড়ে যাবে যে!

—না, আর যেতে বলতে আসিনি৷ চলুন, বাইরে লনে যাই৷

—চলুন!

লনে কনস্টেবল আর কিছু পুলিশ অফিসার রয়েছেন৷ আমরা বাড়ির পিছন দিকে চলে গেলুম৷ সুন্দর ফুলবাগিচা আর গাছপালা আছে সেদিকটায়৷ একটা ফুলেভরা মেখুগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালুম৷ সেই সময় জয়ন্তী চাপা গলায় বলল, —জয়ন্তবাবু, সরযূর কাছে একটা অদ্ভুত কথা আদায় করতে পেরেছি!

—কী বলুন তো?

জয়ন্তী কণ্ঠস্বর আরও চাপা করে বলল, —টেলিফোন লাইনটা মিসেস মালহোত্রাকে ও নিজে হাতে কাটতে দেখেছে৷ আমাদের লনে বসিয়ে রেখে একবার বাড়ি ঢুকলেন, মনে পড়ছে—ছ’টা বা ওইসময় নাগাদ? তখনই নাকি সরযূ দেখে ব্যাপারটা৷ সে বলল, মাইজি স্রেফ পাগলি৷ স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে অদ্ভুত-অদ্ভুত সব কাণ্ড করে আসছেন—মাথামুন্ডু খুঁজে পায় না সরযূরা৷ তা, সরযূ কথাটা বদ্রীকে না বলে পারেনি৷ তখন বদ্রী ওকে আরেকটা অদ্ভুত ঘটনা শোনায়৷ মাইজি নাকি স্টাডিতে ঢুকে—৷

—ইলেকট্রনিক ঘড়ির তার কেটেছেন, এই তো?

জয়ন্তী সবিস্ময়ে বলে উঠল, —জানেন আপনি? কীভাবে জানলেন? আশ্চর্য তো!

শ্রীমতী মালহোত্রার কাণ্ড

জয়ন্তীর কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে এবার শ্রীমতী মালহোত্রার বাড়িটা দিনের আলোয় খুঁটিয়ে দেখছিলুম৷ আমরা আছি একেবারে দক্ষিণের শেষপ্রান্তে৷ ফুট পাঁচেক উঁচু পাঁচিলের নীচে ঝোপজঙ্গল এবং তারপর খাড়া নেমে গেছে পাথরের দেওয়াল৷ বোঝা গেল একটা ছোটোখাটো পাহাড়ের মাথা সমতল করে বাড়ি ও সংলগ্ন প্রাঙ্গণটা গড়ে উঠেছিল কবে৷ পাহাড়টা উত্তরের বড়ো রাস্তার গা ঘেঁষে উঠেছিল৷ ওই দিকটা ছাড়া বাকি তিন দিকেই ঢালু বা খাড়া পাথরের দেওয়াল, কোথাও বা ফাটলে ঝোপঝাড় গাছপালা গজিয়ে রয়েছে৷ মনে হল, এ বেশ চমৎকার একটা দুর্গ!

জয়ন্তী যে বুদ্ধিমতী মেয়ে, তাতে কোনও ভুল নেই৷ সে সরযূর কাছে বাড়িটার ইতিহাস জেনে নিয়েছে৷ এ এক অপয়া বাড়ি নাকি৷ মালহোত্রা সায়েবের প্রবল আপত্তি ছিল কিনতে৷ এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে খুব ঝগড়াঝাঁটি হত৷ শেষ অবধি তিনি যখন গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেলেন, তখন মাইজির কিনে ফেলতে অসুবিধে হল না৷ এদিকে কলেজেও রিটায়ার করার বয়স হল৷ তখন সোজা এখানে এসে উঠলেন৷

জয়ন্তী এইসব গল্প কবার পর বলল, —তা হলে দেখুন, আমার বদ্ধমূল ধারণা যে ওই ভদ্রমহিলাই শ্যামলীর মৃত্যুর কারণ৷ কর্নেলকে এটা কিছুতেই বোঝাতে পারলুম না৷

বললুম, কর্নেল বড্ড একগুঁয়ে মানুষ৷ কিন্তু ঘড়ি আর ফোনের তার কাটার পর মিসেস মালহোত্রাকে আর সন্দেহ না করে উপায় নেই৷ তবে কী জানেন? একটা সঙ্গত মোটিভ (উদ্দেশ্য) সব ডেলিবারেট বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পিছনে থাকে৷ শ্যামলীকে হত্যার উদ্দেশ্যটা কী, সেটাই এখন জানা যাচ্ছে না৷

জয়ন্তী দৃঢ়কণ্ঠে বলল, —আপনি যদি প্রেতশক্তিতে বিশ্বাস কবেন, তা হলে হত্যার মোটিভ খোঁজার প্রশ্নই উঠবে না৷ জীবনে যারা অতৃপ্ত থেকে যায়, মৃত্যুর পর তারা জীবিত মানুষদের ওপর সুযোগ পেলেই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে৷ এক্ষেত্রে সুযোগটা করে দিলেন ওই ভদ্রমহিলা৷ কাজেই শ্যামলীর মৃত্যুর জন্যে উনিই দায়ী৷

—কিন্তু ঘড়ি আর ফোনের তার কাটার উদ্দেশ্য কী?

জয়ন্তী তার ধারণার সপক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে খুব ব্যগ্র হল৷ বলল, —আমি ব্যাপারটা যেভাবে বুঝেছি, আপনাকে বলি, শুনুন৷ মিসেস মালহোত্রার সঙ্গে প্রেতশক্তিদের যোগাযোগ আছে৷ উনি বলছিলেন যে, স্বামীর মৃত্যুর পর উনি থিওজফি বা প্রেততত্ত্বের চর্চা শুরু করেন, তা মিথ্যে৷ সরযূ সব বলেছে৷ ভূতপ্রেত নিয়ে ওঁর উৎসাহ তার অনেক আগে থেকে৷ এখনও অনেকে সন্দেহ করে ওঁর স্বামীর জিপ পাহাড়ি খাদে উলটে যাওয়ার পিছনে ওঁর কারসাজি ছিল৷ কোনও দুষ্ট আত্মাকে দিয়ে কাজটা করিয়েছিলেন ভদ্রমহিলা৷ যাই হোক, এটা এইসব পাহাড়ি এলাকার লোকেদের চিরাচরিত কুসংস্কার বলা যেত৷ কিন্তু গতরাত্রে যা ঘটতে দেখেছি, তাতে আমি কনভিন্সড৷ তর্ক করবেন না৷ এবার শুনুন—কীভাবে কী ঘটেছে৷

হাসি লুকিয়ে বললুম—বলুন না, শুনে যাচ্ছি৷

—সরযূ বলেছে, বোম্বের গায়ক ভদ্রলোক মোহন পারেখকে মাইজি পেটের ছেলের মতো ভালোবাসতেন৷ সরযূর ভয় হত, দুষ্ট আত্মারা তো তাদের স্বভাব অনুযায়ী বেছে বেছে মাইজির প্রিয়জনদেরই মারবার তালে থাকবে৷ এ বেচারার আবার কিছু বিপদ না হয়! সরযূ ভেবেছিল, পারেখজিকে সতর্ক করে দেবে গোপনে৷ কিন্তু সুযোগ পায়নি৷ ব্যস, পারেখজিকে ভূতের পাহাড়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল! এখন আমার ধারণা, হোটেলে থাকার সময় এই পারেখ ভদ্রলোক নিশ্চয়ই শ্যামলীর প্রতি মনে-মনে লোভী হয়ে পড়েছিলেন!

—কিন্তু তার প্রমাণ কী?

জয়ন্তী এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল—আর লুকিয়ে লাভ নেই, আপনাকেই বলছি৷ শ্যামলীর সঙ্গে পারেখের আলাপ হয়ে গিয়েছিল৷ আমার নিষেধ কানে নেয়নি শ্যামলী৷ ওঁর ঘরে গিয়ে আড্ডা দিয়ে আসত৷

—বলেন কী!

—হ্যাঁ৷ শ্যামলীর ওই একটা দুর্বলতা ছিল৷ ফিল্ম ওয়ার্ল্ডের বিখ্যাত লোকদের প্রতি ওর প্রচণ্ড মোহ ছিল৷

—হুঁ, তারপর?

—তারপর যা হয়েছে, খুব সোজা৷ পারেখ খাদে পড়ে মারা গেলেন, কিন্তু মনের অতৃপ্ত বাসনা তো নষ্ট হওয়ার নয়৷ কাল সন্ধ্যার আগে কতক্ষণ সেই খাদের অত কাছে শ্যামলী দাঁড়িয়ে রইল৷ পারেখের আত্মা ওকে অমনি বাগে পেয়ে গেল৷ পিছু নিল৷ তাই স্বাভাবিক নয়?

জয়ন্তী যেভাবে গাম্ভীর্য ও গুরুত্বসহকারে কথাগুলো বলল, আমার মনে যেন একটা চাপা অস্বস্তি ঘুরে বেড়াতে শুরু করল৷ সত্যি কি প্রেতশক্তি বা অতৃপ্ত আত্মা বলে কিছু আছে? প্রকাশ্যে অন্যমনস্কভাবে বললুম—হুঁ, সেটা স্বাভাবিক৷

জয়ন্তী দুঃখিত মুখে বলতে থাকল—জানেন? মানুষের মনে যেন কী আছে৷ যাকে ভালোবাসি কিংবা যার জন্যে মনে-মনে ভাবি, তার সঙ্গে যেন একটা অদৃশ্য মেন্টাল ওয়েভ বা ভাব-তরঙ্গের যোগাযোগ ঘটে৷ মিসেস মালহোত্রার থিওরি খুবই সত্য৷ প্যারাসাইকলজির ব্যাপারটা আমিও কিছুটা জেনেছি৷ একশো মাইল দূরে ধরুন কোনও প্রিয়জন আছেন—হঠাৎ এখানে আমার মনে অস্বস্তি জাগল তাঁর সম্পর্কে৷ পরে খবর এল—তিনি অসুস্থ বা মারা গেছেন—ঠিক ওই একই সময়ে৷ এরকম ঘটনা তো কত ঘটে আসছে!

—হ্যাঁ, শুনেছি৷

—ঠিক এভাবেই মোহন পারেখের মৃত্যুর ব্যাপারটা নিশ্চয়ই শ্যামলী অবচেতন মনে টের পেয়ে থাকবে৷ তা না হলে একটা অদ্ভুত স্বপ্নের কথা কেন বলেছিল সে? আসলে স্বপ্ন কথাটা ওর বানানো৷ ও আমাকে ওর মনের গোপন অস্বস্তির কথাটা বলতে লজ্জা পেয়েছিল৷ তাই বানিয়ে যা-তা একটা বলে অবচেতন প্রক্ষোভ শান্ত করতে চেয়েছিল৷ এবং শেষ অবধি আর না থাকতে পেরে ভূতের পাহাড়ে গিয়ে হাজির হয়েছিল৷ তখন আপনারাও তো গিয়েছিলেন৷ কেমন অন্যমনস্ক মনে হয়নি ওকে?

—হ্যাঁ৷ ব্যাপারটা চোখ এড়ায়নি আমার৷

—শুধু তাই নয়, ওকে কেমন অপ্রকৃতিস্থ দেখাচ্ছিল৷ যেন নিশির ডাকে চলে-আসা মানুষের মতো৷ কথা বলছিল যেন ঘুমের ঘোরে৷

অতটা মনে হয়নি আমার৷ তবে জয়ন্তীকে সায় দিতে হল৷ বললুম, —ঠিক, ঠিক৷

জয়ন্তী সোৎসাহে বলল, —আর ফেরার পথেই পড়বি তো পড়, একেবারে মিসেস মালহোত্রার পাল্লায়! কর্নেল সায়েব একটা উপলক্ষ্য মাত্র৷ তার ওপর দেখুন, প্ল্যানচেটের আসরও তখন একেবারে ঠিকঠাক পরিকল্পিত হয়ে রয়েছে৷ এগুলো সবই কি নিছক আকস্মিক যোগাযোগ বলে উড়িয়ে দেবেন?

—আপনি ঠিকই বলছেন জয়ন্তীদেবী৷ কিন্তু ফোন আর ঘড়ির তার...

বাধা দিয়ে জয়ন্তী বলল, —প্রথমে ঘড়ির তার কাটার কারণ বলি৷ মিসেস মালহোত্রা শ্যামলীর মৃত্যুর সময় চিহ্নিত করেছিলেন৷ প্রেতশক্তির নির্দেশেই করেছিলেন৷ রাত আটটা পাঁচে...

চমকে উঠে বাধা দিলুম—আপনি তো আজ ওঘরে যাননি৷ কেমন করে জানলেন ঘড়ির কাঁটা আটটা পাঁচে থেমে আছে?

জয়ন্তী হাসল একটু৷ —গত রাতে ও ঘরে ঢোকার সময় আমার চোখ পড়েছিল ঘড়িটার দিকে৷ তখন তো মোটে সাতটা প্রায়৷ তাই ঘড়িতে আটটা পাঁচ দেখে অবাক হয়েছিলুম৷ কিন্তু প্ল্যানচেটের আসর বসবে—সব উত্তেজনা তাই নিয়ে৷ ফলে কথাটা বলতে ভুলে গিয়েছিলুম৷

—আশ্চর্য, কেন যে আমি ওদিকে তাকাইনি!

—আপনার চোখ সারাক্ষণ ছিল শ্যামলীর দিকে৷

হাসি পেল৷—কে জানে! তা এবার ফোনের তার কাটার উদ্দেশ্য বলুন৷

—মিসেস মালহোত্রা চাননি যে তক্ষুনি পুলিশ এসে হাঙ্গামা বাধাক৷ মতলব ছিল, ব্যাপারটা যে-কোনও ভাবে সামলাবেন ততক্ষণে৷

—বা রে! পায়ে হেঁটে তো থানায় গিয়ে খবর দেওয়া যায়৷ একঘণ্টা দেরি হয় বড়োজোর! নাঃ, আপনার এ ধারণাটার কোনও যুক্তি নেই জয়ন্তীদেবী! আমি বদ্রীকে নিয়ে পায়ে হেঁটে গিয়েছিলুমও বটে৷

জয়ন্তী একটু ভেবে নিয়ে বলল, —ঠিক বোঝাতে পারছি না৷ কিন্তু এটা স্পষ্ট যে মিসেস মালহোত্রা সময় চেয়েছিলেন তা সে যে জন্যেই হোক৷ এবং পেয়েছিলেনও৷ প্রায় তিন ঘণ্টা পরে আপনারা পুলিশ নিয়ে এলেন!

—কিন্তু কর্নেলের মতো ধুরন্ধর লোক তো সারাক্ষণ উপস্থিত ছিলেন৷ মিসেস মালহোত্রার তেমন কোনও উদ্দেশ্য থাকলে তা ব্যর্থ হয়েছে৷ মিঃ খান্নার চেয়ে কর্নেলের বুদ্ধিচাতুর্য বা অপরাধতত্ত্বের ব্যাপারে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনেক বেশি জয়ন্তীদেবী৷

জয়ন্তী ফের একটু ভেবে বলল, —তা হলে বলব, কর্নেল সম্পর্কে মিসেস মালহোত্রার ধারণা হয়তো স্পষ্ট নয়৷ ওঁর সঙ্গে পরিচয় কতদিনের জানেন?

—শুনেছি৷ এখানে এসেই আলাপ হয়েছে ওঁদের৷ জয়ন্তী লাফিয়ে উঠল—আমার থিওরি কারেক্ট৷ ভদ্রমহিলা কর্নেলের পরিচয় জানেন না৷

—বেশ৷ কিন্তু কিছুটা সময় কেন দরকার হয়েছিল মিসেস মালহোত্রার, তা ভেবেছেন কি?

জয়ন্তী মাথা দুলিয়ে বলল, —সেটাই বুঝতে পারছিনে৷ ফোনের তার কাটার আর কিছু উদ্দেশ্য মাথায় ঢুকছে না৷

—তা ছাড়া, কাটা তার জোড়া দিলেই তো ফোন আবার চালু হয়ে যায়৷ ধরে নিচ্ছি, তাতেও কিছুটা সময় লাগছে৷ কিন্তু...নাঃ, আপনার এই ব্যাখ্যাটা মানা গেল না৷

জয়ন্তী একটু চুপ করে থেকে বলল, —অশরীরী আত্মাদের ব্যাপার বুঝতে পারে একমাত্র তারাই, যাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে৷ কে বলতে পারে, সরযূ যাকে তার কাটতে দেখেছিল তিনি সত্যি-সত্যি মিসেস মালহোত্রা নন—তাঁর চেহারা ধরেছিল কোনও প্রেতশক্তি!

এই সময় লছমন নামে মিসেস মালহোত্রার লোকটা এল৷ সেলাম করে সবিনয়ে বলল, —কর্নেল সাহাব আপনাদের সেলাম দিয়েছেন৷

আমরা দু’জনে তক্ষুনি এগিয়ে গেলুম৷ ডাইনিং হলে ঢুকে দেখি, রঘুবীর জয়সোয়াল, অধ্যাপক দ্বিবেদী আর ডঃ পট্টনায়ক কখন এসে পড়েছেন৷ শ্রীমতী মালহোত্রা ব্যস্তভাবে এদিক-ওদিক করছেন৷ কর্নেল আমাদের দেখে ঈষৎ হেসে চাপাস্বরে বললেন, —এই যে জয়জয়ন্তী!

কর্নেলের বেমক্কা রসিকতায় জয়ন্তীর মুখটা লাল হয়ে গেল—আড়চোখে দেখলুম৷ বললুম, —কর্নেল, আবার প্ল্যানচেটের আসর নাকি?

কর্নেল তক্ষুনি গম্ভীর হয়ে গেলেন—হুম! আপাতত চায়ের আসর৷ তোমরা বসে পড়ো৷

একটু পরেই চা এসে গেল৷ চা খেতে-খেতে কর্নেল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, —লেডিজ অ্যান্ড জেন্টেলমেন! গত রাতে মিঃ খান্না যথারীতি প্রত্যেকের কাছে একটা করে বিবৃতি নিয়েছেন৷ কিন্তু ইতিমধ্যে আরও অনেক নতুন তথ্য আমরা জেনেছি, যেগুলো সমস্যার সৃষ্টি করেছে৷ অতএব আবার আপনাদের বিরক্ত করতে আমরা বাধ্য হব৷

অধ্যাপক দ্বিবেদী বলে উঠলেন, —অবশ্য, অবশ্য৷ এই অদ্ভুত হত্যাকাণ্ডের একটা ফয়সালা করার জন্যে আমাদের প্রত্যেকেরই কষ্ট স্বীকার করা উচিত৷

জয়সোয়াল মাথা নেড়ে বললেন, —আই এগ্রি৷

কর্নেল বললেন, —আপনাদের স্মরণশক্তিকে সাহায্য করা হবে ভেবে আমরা হত্যাকাণ্ডের জায়গাতেই একে-একে ডাকব এবং কিছু প্রশ্ন করব৷

অধ্যাপক খুশি হয়ে বললেন, —ভেরি ওয়েল! তারপর নিশ্চয়ই আমরা এই নজরবন্দি দশা থেকে মুক্তি পাব!

উনি জোরে হাসলেন কথাটা বলার পর এবং তা নিশ্চয়ই শুকনো হাসি৷ ওঁকে সমর্থন করে জয়সোয়াল বললেন, —যত খুশি প্রশ্ন করুন, আপত্তি নেই৷ এবং আমাকে সন্দেহ-ভাজন মনে না হলে আশা করি আমি যেন আগামীকাল নৈনিতাল পৌঁছে যেতে পারি! সেখানে আমার জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে একটা৷

মিঃ খান্না বললেন, —কার্যত আপনারা স্যার আমাদের হাতে না হলেও প্রকৃতির হাতে এখন বন্দি৷ বেরোবার কোনও রাস্তা নেই৷

ব্রিজেশ সিং হেসে বললেন, —দ্বীপান্তরিত বলা যায়! কারণ বাণেশ্বরের সঙ্গে এখন বাইরের সব সংযোগ আপাতত কয়েকদিনের জন্যে বিচ্ছিন্ন৷

অধ্যাপক, জয়সোয়াল, জয়ন্তী আর আমি একসঙ্গে নড়ে উঠলুম৷ জয়ন্তী কাঁদো-কাঁদো স্বরে বলল, তা হলে শ্যামলীর খবর এখনও ক’দিন পাঠানো যাবে না? কর্নেল যে বললেন, আপনাদের রেডিও সিস্টেম আছে...৷

খান্না বললেন, —না৷ কোনও উপায় নেই৷ দুঃখের বিষয়, আমাদের যে বেতার ব্যবস্থা আছে, গত রাত থেকে তাও হঠাৎ বিগড়ে বসেছে৷ অনেক চেষ্টা করা হল মেরামতের৷ কিন্তু সব এখন অবধি ব্যর্থ৷ বাণেশ্বর সামরিক ছাউনি থেকে যে কোনও সাহায্য পাব, তারও উপায় নেই৷ পথ ধসে অতল খাদ সৃষ্টি হয়েছে ওদিকে৷ এক উপায় হচ্ছে হেলিকপ্টার৷ কিন্তু তাও আছে সামরিক ছাউনিতে৷

জয়সোয়াল বললেন, —কেন? সারদা নদী পেরিয়ে নেপালে ঢুকতে পারলে তো ঘুরপথে পৌঁছনো যায়—কোঠাইকুণ্ড হয়ে ঝরকাহাট৷

খান্না হাসলেন৷ —দেখে আসতে পাবেন সারদা নদীর অবস্থা৷ প্রচণ্ড বন্যা বইছে৷ তা ছাড়া বাণেশ্বরের পূর্ব সীমায় পাহাড় যা ধসেছে, নদী অবধি পৌঁছনোও অসম্ভব৷ তাও ধরে নিচ্ছি, কোনওরকমে নদী পেরোলেন—কিন্তু নেপালের ওই বর্ডারটা খাড়া পাহাড়৷ আস্ত পাথরের দেওয়াল উঠেছে তিন-চারশো ফুট উঁচু৷ কীভাবে ঢুকবেন নেপালে?

শ্রীমতী মালহোত্রাকে এতক্ষণ মুখ টিপে হাসতে দেখছিলুম৷ এবার হাত তুলে বললেন, —এক মিনিট৷ মিঃ খান্না আর কর্নেল সরকারকে প্রশ্ন করছি, এতসব ঘটনা একইসঙ্গে ঘটার মধ্যে কি আপনারা এখনও নিছক আকস্মিকতা আছে বলতে চান?

কর্নেল তাকিয়ে থাকলেন মাত্র৷ খান্না বললেন, —পুলিশ-শাস্ত্র সম্পূর্ণ নাস্তিকের শাস্ত্র মিসেস মালহোত্রা৷ এ শাস্ত্র অনুসারে কার্যের পিছনে কারণ থাকবেই৷

—তা হলে বলুন, একই সময়ে বেতারযন্ত্র বিগড়ে গেল কেন? যদি বা বিগড়ে গেল, সারানো সম্ভব হল না কেন?

—দেখুন ম্যাডাম, প্রকৃত ব্যাপারটা বর্ণনা করতে হলে আমাকে এখন সরকারের সমালোচনা করতে হয়৷ যে কোম্পানি ওই যন্ত্র সরবরাহ করেছিল, বাজারে তার প্রচুর বদনাম আছে৷ কিন্তু বেছে-বেছে তাকেই নেওয়া হল, এর কারণ দুর্নীতি ছাড়া কী? বেতারযন্ত্রটা বছরে সাত মাসই বিগড়ে বসে থাকে যখন-তখন৷ কাল রাতে হঠাৎ আবার বিগড়ানোর কারণ সম্ভবত ঘনঘন বজ্রপাত৷

শ্রীমতী মালহোত্রা মাথা দুলিয়ে বললেন, —তবু আপনারা ভাঙবেন তো মচকাবেন না! চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেই বা কী৷ অলৌকিক শক্তি যে এখনও মানুষের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে, মানুষ অত জেনেও তা মানতে চায় না!

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, —আমাদের দেরি করা উচিত নয়৷ মিঃ খান্না, তা হলে চলুন; আমরা মিসেস মালহোত্রার স্টাডিতে যাই৷ মিঃ খান্না, আপনার স্টেনো ভদ্রলোক কি এসে গেছেন?

ব্রিজেশ সিং উঠে গিয়ে দরজার বাইরে কাকে ডাকলেন—জয়গোপাল৷ রাজেন্দ্রজিকে পাঠিয়ে দাও৷

একটু পরে স্টেনোগ্রাফার ভদ্রলোক এলেন৷ চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়েসের সুন্দর এক যুবক৷ মুখে মিষ্টি হাসি৷ আমার খুব ভালো লাগল ভদ্রলোককে৷ হয়তো বাঘা-বাঘা বুড়োদের মধ্যে এতক্ষণে একজন তাজা যুবক দেখতে পেলুম, তাই৷

স্টাডিতে ঢুকে গেলেন কর্নেল, খান্না আর সেই রাজেন্দ্র৷ দু-মিনিট এ-ঘরটা স্তব্ধ হয়ে থাকল৷ তারপর ও ঘরের দরজা খুলে খান্না মুখ বের করে ডাকলেন—মিঃ জয়সোয়াল, প্লিজ!

জয়সোয়াল সায়েব রাশভারী মূর্তি নিয়ে উঠে গেলেন৷ আমি সিগারেট ধরালুম৷ তারপর দেখি, জয়ন্তী উঠে গেল শ্রীমতী মালহোত্রার কাছে৷ উনি বসেছিলেন কোণের দিকে একটা চেয়ারে—সামান্য দূরে৷ জয়ন্তীকে উনি সস্নেহে জড়িয়ে ধরে জানলার কাছে গেলেন৷ তারপর দু’জনের মধ্যে অস্ফুটস্বরে কথাবার্তা চলতে থাকল৷ মনে-মনে হাসলুম৷ শ্রীমতীর চেলা হওয়ার উপযুক্ত মেয়ে জয়ন্তী৷ নির্ঘাৎ এখন প্রেতশক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে দু’জনের মধ্যে৷ বিশেষ করে পুলিশের বেতারযন্ত্র বিগড়ানো ওঁদের তপ্ত কড়াইয়ে আরেকটি বিস্ফোরণ সৃষ্টি করেছে নিঃসন্দেহে!

অধ্যাপক দ্বিবেদী মনমরা হয়ে বসে ছিলেন৷ আমি ওঁর পাশে উঠে গেলুম৷ উনি খুশি হয়ে বললেন, —আসুন, আসুন মিঃ চাউড্রি৷ দেখুন তো, এসব কী গড়বড় কাণ্ড হল! আগামী পরশু দিল্লিতে আমার এক বড়ো অনুষ্ঠানে ভাষণ দেওয়ার কথা আছে৷ ভেবেছিলুম, রওনা দেব! অথচ আটকে গেলুম৷ কবে যে রাস্তা খুলবে, তাও তো বলতে পারছে না কেউ!

লোকটিকে গত সন্ধ্যা থেকেই খুব নিরীহ মনে হয়েছিল৷ উনি যে আমাদের গ্রিন ভিউ হোটেলেই নীচের স্যুটে উঠেছেন, কর্নেলের কাছে শুনেছিলুম৷ বললুম, —আপনি নিশ্চয়ই আমাদের আসার আগেই এসেছেন এখানে?

—আমি এসেছি তেসরা জুন৷ প্রতিবছরই ছুটির দু-একটা সপ্তাহ এখানেই কাটিয়ে যাই৷ এবার অবশ্য নানা প্রোগ্রামে দিন পাঁচেকের বেশি থাকা যেত না৷ তার মানে, আজ আটই জুন—আজই রওনা হতুম৷ তা ছাড়া... একটু হাসলেন অধ্যাপক৷ —তা ছাড়া এবার হোটেলের চার্জও প্রায় দেড়া বাড়িয়ে দিয়েছে৷ অত বেশি টাকা কোথায়, বলুন?

—মিসেস মালহোত্রার সঙ্গে আলাপ কি এখানেই হয়েছে?

—আবার কোথায় হবে?... অধ্যাপক একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, গ্রিন ভিউতে গিয়ে প্রতি সিজনে ভদ্রমহিলা যেচে পড়ে সবার সঙ্গে আলাপ করে আসেন! বড্ড খামখেয়ালি!

পরক্ষণে জিভ কাটলেন৷ শ্রীমতী মালহোত্রা শুনলেন না তো? জয়ন্তীকে নিয়ে উনি মেতে উঠেছেন৷ অধ্যাপক এবার গলার স্বর চাপা করলেন—ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছে গত বছর জুনে৷ সে-বারও এমনই প্ল্যানচেটের আসর বসিয়েছিলেন৷ তবে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি৷ আর—আমিও অবশ্য সেই আসরে যোগ দিতে পারিনি৷ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলুম ওইদিন৷

—মিঃ জয়সোয়ালও কি বরাবর আসেন এখানে?

—না, এই প্রথম৷ বলছিলেন তো তাই-ই! কে জানে কেন, ভদ্রলোককে আমার কেমন রহস্যময় মনে হয়৷ আপনার হয় না?

—যা বলেছেন! কেমন যেন চাপা চালচলন৷

—তার ওপর ওঁর মধ্যে একটা পুলিশ ঢঙের সবজান্তা ভাব আছে, লক্ষ্য করেছেন? ওটা আমার দু-চক্ষের বিষ৷ ও নাকি রিটায়ার্ড পুলিশ সুপার৷ হুঁ!

আবার সায় দিলুম—একটুও বেঠিক বলেননি স্যার!

স্যার শুনে অধ্যাপক আরও নরম হয়ে বললেন—আপনি একজন মডার্ন ইয়ংম্যান৷ আপনি ঠিক বুঝবেন, এইসব পুলিশ-টুলিশের মানেটা কী? স্রেফ মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার অর্থাৎ জন্মগত স্বাধীনতার দাবিকে দমন করার জন্যেই তো রাষ্ট্র এদের পুষে রেখেছে৷ তাই না? ডঃ হেন্ডাটরলভ গেটাসকিনটিকভের থিওরির কথা নিশ্চয়ই জানেন৷ রাষ্ট্র মানেই ব্যক্তির হাতের হাতকড়া৷ হাতকড়া-তত্ত্বের তিন নম্বর অধ্যায়ে তিনি বলেছেন...৷

আমার মহাসৌভাগ্য, অধ্যাপকের হাত থেকে বাঁচাতে জয়সোয়াল বেরিয়ে এলেন এবং মুণ্ডু বাড়িয়ে খান্না ডাকলেন—অধ্যাপক দ্বিবেদী, প্লিজ!

অধ্যাপক মুহূর্তে স্প্রিঙের মতো গুটিয়ে সুড়সুড় করে চলে গেলেন৷ ওঁর মুখ দেখে মায়া জাগছিল৷ জয়সোয়াল এসে আমার পাশে গম্ভীরমুখে বসে পড়লেন৷ বললুম, আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল, স্যার!

জয়সোয়াল পকেট থেকে পাইপ বের করে বললেন, —আপনার আবার কী ঝামেলা চাউড্রি? ইয়ংম্যান—তার ওপর ধুরন্ধর প্রাইভেট গোয়েন্দার সঙ্গী—মজাটা উপভোগ করে যান না চুপচাপ৷

ওঁর কথার ভঙ্গিতে মনে-মনে খাপ্পা হলুম৷ তবে সেই ভাবটা লুকিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললুম, —যা বলেছেন! তবে মুশকিল কী জানেন, গোয়েন্দার পাল্লায় পড়ে আবার প্রাণে মারা না যাই এবার!

জয়সোয়াল ভুরু কুঁচকে বললেন, —তেমন কি কোনও লক্ষণ দেখছেন?

—লক্ষণ কি আপনিও দেখতে পাচ্ছেন না?

—না তো!

—হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যেকেই কি ক্রমশ বেশি করে জড়িয়ে পড়ছি না?

—কী বলতে চান আপনি?

ওরে বাবা! এ যে ভারী কড়া ধাতের লোক৷ হবে নাই বা কেন? জাঁদরেল পুলিশ-সুপার ছিল একসময়৷ আমতা-আমতা করে বললুম, —কতদিন আটকে পড়ে থাকব আমরা, কোনও ঠিক নেই৷ কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি, যতদিন থাকব—তত বেশি করে আমাদের প্রত্যেককে জিগ্যেসপত্তর করা হবে৷ প্রতিদিনই নতুন-নতুন প্রশ্ন গজাবে ওঁদের মাথায়, আর এমনি করে ডাকা হবে৷ জবাব দিতে হবে৷ হরিবল!

কথাটা বুঝলেন যেন জয়সোয়াল৷ পাইপের তামাকে আগুন জ্বেলে বললেন, —ঠিক, তা ঠিক৷ আই এগ্রি৷

—আপনি তো স্যার জয়পুরে থাকেন?

—হ্যাঁ৷ কেন?

—জয়পুরের আবহাওয়া এখন কীরকম বলুন তো?

—প্রচণ্ড গরম৷ বাঙালিবাবুরা কল্পনাও করতে পারবেন না৷

—তা হলে তো স্যার, আপনার এখানে পুরো গ্রীষ্মকালটা কাটিয়ে যেতে আপত্তি থাকার কথা নয়৷ রাস্তার ধস ছাড়লেই বা কী!

—হোটেল ভাড়াটা দেবে কে? আপনার কর্নেল সায়েব দিতে রাজি থাকলে তো ভালোই৷

বুঝলুম, লোকটার সঙ্গে জমবে না৷ এ বড্ড বদমেজাজি গোঁয়ার প্রকৃতির লোক৷ তাই চুপচাপ বসে থাকলুম৷ একটু পরে জয়সোয়াল নিজের মনেই বলে উঠলেন, —হুঁ! গোয়েন্দাগিরি ফলানো হচ্ছে আমার ওপর৷ কেন যে এসব প্রাইভেট হ্যান্ডকে খান্না পাত্তা দেয়, বুঝি না! আমি বলব কর্তৃপক্ষকে৷ নিশ্চয়ই বলব, দেখবেন৷

সবিনয়ে বললুম, —আমাকে কি কিছু বলছেন স্যার?

জয়সোয়াল এতক্ষণে ফেটে পড়লেন৷ —বলছি৷ আপনার ওই নির্বোধ সঙ্গীটিকে বলবেন বলেই বলছি৷ বলবেন, ডিটেকশান অত সহজ নয়৷ আরে! ভিকটিম মেয়েটির পাশের চেয়ারে ছিলুম বলেই আমি ওকে অন্ধকারে দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করে মেরে ফেললুম! বলে কী নির্বোধের মতো! চেনা নেই, জানা নেই—কোথায় কলকাতার এক বাঙালি! সামান্য এক লেড়কি! আর আমি হলুম রাজস্থানের রিটায়ার্ড পুলিশ-সুপার মিঃ রঘুবীর জয়সোয়াল—যার দাপটে একসময় পাগলা হাতিরও মগজের অসুখ সেরে যেত! খান্নাটা ওর পাল্লায় পড়ে নির্ঘাত মরবে৷

বলেই জয়সোয়াল সায়েব উঠলেন৷ গটগট করে বেরিয়ে গেলেন৷ যাওয়ার সময় ব্রিজেশ সিং ওঁর পাশে-পাশে এগিয়ে বলে এলেন—হোটেল ছেড়ে কোথাও গেলে আমাদের লোককে বলে যাবেন, স্যার৷ জাস্ট এ রুটিন ইন্সট্রাকশান৷

জয়সোয়াল ‘আচ্ছা’ বলে জোর ধমক দিয়ে পরদা তুলে অদৃশ্য হলেন৷ লন থেকে ওঁর জুতোর শব্দ ভেসে আসতে থাকল৷

ব্রিজেশ সিং চাপা হেসে আমার দিকে এগিয়ে এলেন৷ বললেন, —মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গেল কেন জয়সোয়ালজির? নিশ্চয়ই কর্নেল সায়েব কোথাও জোর ঘা দিয়েছেন, বুঝলেন মিঃ চাউড্রি?

বললুম, —তাই তো মনে হচ্ছে৷ আচ্ছা মিঃ সিং, ওঁকে কি এই প্রথম দেখলেন আপনি; নাকি আগে পরিচয় ছিল?

—এই প্রথম৷ তবে পুলিশ বিভাগে ওঁর প্রচণ্ড নাম আছে শুনেছি৷

—উনি আমাদের হোটেলেই উঠেছেন, জানতুম না৷ তাহলে তো আগেই আলাপ করে ফেলতুম৷

—খবরদার, খবরদার! বড্ড বদরাগী মানুষ৷ কক্ষনো ঘাঁটাতে যাবেন না কিন্তু!

ব্রিজেশ সিং একটু দাঁড়িয়ে থেকে লনের দিকে বেরোলেন৷ তারপর অধ্যাপককে বেরিয়ে আসতে দেখা গেল৷ উনি মেজাজ খারাপ করে বেরোচ্ছেন না, তা ওঁর মুখের হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল৷ খান্না যথারীতি ডাকলেন—মিসেস মালহোত্রা প্লিজ!

অধ্যাপক আপনমনে হাসতে-হাসতে বেরিয়ে গেলেন পরদা তুলে৷ আমাদের দিকে ঘুরেও তাকালেন না৷ শ্রীমতী মালহোত্রা স্টাডিতে গিয়ে ঢুকলে জয়ন্তী আমার কাছে এসে বসল৷ বললুম, খুব প্রেতচর্চা করা হচ্ছিল যেন?

জয়ন্তী একটু হাসল৷ —হ্যাঁ৷ কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি যে আপনাকেও এখানে বসে ডাকের অপেক্ষা করতে হচ্ছে কেন? ভেবেছিলুম—কর্নেলের অন্তরঙ্গ সঙ্গী আপনি, নিশ্চয়ই ওঁদের টেবিলে থাকবেন ওঁদের সঙ্গে৷

—অবাক আমি একটুও হইনি, তা বলব না৷ তবে আমার বৃদ্ধ বন্ধুটির অনেক কাজই আমার কাছে রহস্যময়৷

—তার মানে আপনাকেও নিশ্চয়ই সন্দেহের আওতায় রাখা হয়েছে?

—সেটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়৷

—তা হলে আমাকেও তাই রাখা হয়েছে?

—বললুম তো, সেটাই নিয়ম এসব ক্ষেত্রে৷

—কিন্তু শ্যামলীকে আমি... বলেই ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন প্রচণ্ড অভিমানে থেমে গেল জয়ন্তী৷

ডাকলুম—জয়ন্তী!

—বলুন৷

—মিসেস মালহোত্রার সঙ্গে কথা বলতে আপনার ভয় হচ্ছিল না তো?

—কেন? কীসের ভয়?... বলেই জয়ন্তী যেন সামলে নিল৷ পরক্ষণে একটু হেসে ফের বলল, আপনারা তো কাছাকাছি ছিলেন! আসলে কী জানেন, ভদ্রমহিলা খুব অমায়িক সাদাসিধে মানুষ৷ শুধু একটু-আধটু পাগলামিই যা করেন মাঝেমধ্যে৷ কথা বলে আরও বুঝলুম, উনি অনেক সময় অবসেসনের ঘোরে অনেক কিছু করেন, পরে জ্ঞান হলে খুব পস্তান৷

—অবসেসনের রুগি? বলেন কী!

—হ্যাঁ৷ আমি তো সোজা ফোন আর ঘড়ির তার কাটার কথা জিগ্যেস করে বসলুম৷ তখন উনি...

বাধা দিয়ে বললুম, —সর্বনাশ! আপনি ওঁকে বলে দিলেন?

—ক্ষতি কী? জয়ন্তী বেপরোয়া হয়ে জবাব দিল৷—তা উনি কী বললেন জানেন? হ্যাঁ—আমার হাত দিয়েই পরলোকের বাসিন্দারা এ কাজটি করিয়েছে৷ তাদের কী উদ্দেশ্য ছিল আমি জানি না৷ যাই হোক, পরে যখন সব মনে পড়ল, তখন বেশ ভয় পেয়ে গেলুম৷ তবে এবার নিজের মুখেই স্বীকার করব৷ আমি বললুম, হ্যাঁ, তাই করুন৷ তখন উনি বললেন—শুধু এটাই নয়, এমন অনেক কাজ উনি সময়-সময় করে ফেলেন, যার কোনও মাথামুন্ডু নেই৷ একবার নাকি বাগানে রাত্তিরবেলা নিজের শাড়ি পুঁতে রেখে এসেছিলেন৷ সরযূ সেটা পরে আবিষ্কার করে৷ সরযূও এ কথাটা আমাকে বলেছিল৷ তখন আপনাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলুম৷

—অবসেসনের রুগিরা এ কাজ করে বটে!

—তা হলে জয়ন্তবাবু অবসেসনে থাকা অবস্থায় উনি কাউকে মেরে ফেলতেও তো পারেন?

—খুব পারেন৷ কর্নেল একটা ঘটনার কথা বলেছিলেন৷ তাতে এক অবসেসনের রুগি নিজের স্ত্রীর গলা টিপে খুন করেছিল৷ পরে তার আর কিচ্ছু মনে ছিল না৷

জয়ন্তী আঁতকে উঠল! —সর্বনাশ! তা হলে তো এ ভদ্রমহিলার কাছ থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ৷

হেসে বললুম, —আপনি তো পাহাড়ে-চড়া খেলোয়াড় মেয়ে! আপনার গায়ের জোরে বুড়ি পারবেন না—নিশ্চিন্ত থাকুন৷

এইসময় শ্রীমতী মালহোত্রা হাসতে-হাসতে বেরিয়ে এলেন৷ এত ঝটপট! খান্না ডাকলেন—জয়ন্তবাবু আসুন৷

কর্নেলের সঙ্গে অনেকবার অনেক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছে৷ কিন্তু কখনও আমাকে বাইরের লোকের মতো প্রশ্ন করা হয়নি—কিংবা বাইরে বসে থাকতেও হয়নি৷ এবার এমন কাণ্ডের অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলুম না৷ একটু অভিমানও হয়েছিল৷ তবু সেটুকু চেপে সপ্রতিভ ভঙ্গিতে স্টাডিতে ঢুকলুম৷

খান্না বললেন, —বসুন৷ আপনার নাম ঠিকানা পেশা ইত্যাদি বলুন৷

বললুম৷ স্টেনো ভদ্রলোক লিখে নিলেন৷ টেবিলের অন্য পাশে কর্নেল গম্ভীরমুখে বসে রয়েছেন৷ আমার দিকে তিনি তাকাচ্ছেন না৷

খান্না বললেন, —আপনাকে শুধু একটিমাত্র প্রশ্ন করব, জয়ন্তবাবু৷

—বেশ তো৷ করুন না৷

—গত রাত্রের ভূতের আসরে যখন আলো একেবারে নিভিয়ে দেওয়া হয়, তারপর থেকে আবার আলো জ্বলে ওঠার মধ্যে—অর্থাৎ যতক্ষণ ঘরটা অন্ধকার ছিল, আপনি কি আপনার চেয়ার ছেড়ে একমুহূর্তের জন্যেও উঠেছিলেন?

এ তো বড়ো অদ্ভুত প্রশ্ন! আমি ঘাবড়ে গেলুম৷ খান্না আমার তাকানো দেখে কিছু টের পেয়ে আবার বললেন, দয়া করে জবাব দিন৷

দৃঢ়কণ্ঠে বললুম, —না৷

আমার বৃদ্ধ ঘুঘুটি এবার ডেকে উঠলেন, —হুম জয়ন্ত! সত্যি-সত্যি না?

বললুম, —আমার উঠতে ইচ্ছে করছিল৷ কারণ শ্যামলীর কণ্ঠস্বরে আমার সন্দেহ জেগেছিল৷

—কিন্তু তুমি ওঠোনি?

—না৷

—কেন?

—এখন বলা কঠিন৷ হয়তো ভেবেছিলুম, যদি সত্যি ভূতপ্রেত হয়, আমার ক্ষতি করতে পারে—কিংবা উঠতে গেলে চেয়ারে শব্দ হবে, কারও সঙ্গে ধাক্কা লাগতেও পারে!

—হুম! তা হলে শ্যামলীর গলার স্বর শুনে তোমার সন্দেহ হয়েছিল?

—হ্যাঁ, মনে হচ্ছিল, অন্য কেউ কথা বলছে৷

বুড়ো ঘুঘু ঘাড় নাড়লেন৷ তারপর খান্নার দিকে তাকালেন৷ খান্না বললেন, —একটা মূল্যবান সূত্র দেওয়ার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ, জয়ন্তবাবু৷ ঠিক আছে, চলুন—আপনাকে পৌঁছে দিই!

বেরিয়ে দেখি, পাশাপাশি বসে জয়ন্তী আর মিসেস মালহোত্রা গল্প করছেন৷ খান্না জয়ন্তীকে ডাকলেন৷ জয়ন্তী ভীতু মুখে চলে গেল৷

আমি শ্রীমতী মালহোত্রার পাশে গিয়ে বসলুম৷ উনি সস্নেহে বললেন, —আপনার সঙ্গে ভালো করে আলাপই হয়নি৷ বসুন, বসুন৷ মা ও ছেলের কিছুক্ষণ আলোচনা করা যাক৷ বাণেশ্বরে বুঝি এই প্রথম আসা হল?

—হ্যাঁ, প্রথমই৷ কিন্তু এসেই পড়ে গেলুম ঝামেলায়!

—না, না! সব ঝামেলা মিটে যাবে৷ কিচ্ছু ভাববেন না! কেউ তো টের পাচ্ছে না আসল ব্যাপারটা কী! পেলেও মানতে চায় না৷ দেখবেন, এর ফলে কী হয়? এই তো সবে শুরু৷ কমিউনিকেশন বন্ধ, বেতার বিগড়েছে, মানুষ মরল—এরপর আরও সাংঘাতিক ব্যাপার হবে৷ আমি দিব্যচক্ষে সব দেখতে পাচ্ছি— সব—স-ব...৷

বলতে-বলতে হঠাৎ বুড়ি করলেন কী, নিজের শাড়ির আঁচলটা ফরফর করে ফেড়ে ফেললেন৷ বাধা দেওয়ার ফুরসতই পেলুম না৷ ওঁর চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলুম৷ অস্বাভাবিক দৃষ্টি৷ ঠোঁট কাঁপছে৷ তারপর উনি ছাইদানি আর টেবিলটা উলটে দিলেন৷ আমি বাধা দিতে গিয়েই টের পেলুম, হাত দুটো একেবারে ইস্পাতের তৈরি! এক ধাক্কায় ছিটকে পড়লুম মেঝেয়৷ জোর চোট লাগল৷

শ্রীমতী মালহোত্রা এবার কোনার দিকে শান্তভাবে এগোচ্ছেন৷ মেঝে থেকে উঠেই চেঁচিয়ে ডাকলুম—মিঃ সিং! সরযু! লছমন!

ব্রিজেশ সিং বাইরে থেকে দৌড়ে এলেন৷ লছমন আর সরযূও এসে গেল৷ শ্রীমতী মালহোত্রা তখন কোনের একটা সুন্দর পুতুল তুলে আছাড় দিতে যাচ্ছেন৷ ব্রিজেশ সিং ধরে ফেললেন৷ কিন্তু এখন ওঁর গায়ে অসুরের শক্তি৷ ব্রিজেশও পড়ে গেলেন মেঝেয়৷ বুড়ি তখন বিড়বিড় করে কী বলছেন৷ পুতুলটা হাতে ধরা৷ এবার সরযূ দৌড়ে ভেতরে কোথাও গেল৷ তারপর একটা তাতানো লাল লোহা এনে বুড়ির সামনে ধরে চেঁচিয়ে বলল, —মাইজি! হোঁশমে আইয়ে! অমনি বুড়ি চোখ বের করে পড়ে গেলেন৷ এবার আমরা জানতে পারলুম, ভদ্রমহিলার সম্ভবত উৎকট হিস্টিরিয়া রোগ আছে এবং বরাবর তার প্রকোপ সামলাতে সরযূদের প্রাণান্ত হয়৷ লছমন ব্রিজেশ সিং আর আমাকে সেইসব কথা ইনিয়ে-বিনিয়ে শোনাতে শুরু করল৷ সরযূ তখন মাইজিকে সামলাচ্ছে৷

লছমন বলল, —দো সাল আগে মালহোত্রাজি অ্যাকসিডেন্টে মারা যাওয়ার পর থেকেই মাইজির এই আজব রোগ হয়েছে৷ দাওয়াইপানি করার কথা বললে মাইজি তেড়ে মারতে আসবেন৷ লেকিন, আসলি বাত হচ্ছে—মাইজির পেটের মধ্যে কীভাবে বাণেশ্বরের ভূতটা ঢুকে গেছে৷...

যুক্তি, সম্ভাবনা ও জয়সোয়ালজি

মালহোত্রা বুড়িকে নিয়ে ওরা ভেতরে শোওয়ার ঘরে চলে গেলে আমি বেরোলুম৷ ঘরের ওই পরিবেশে এবার দম আটকে আসছিল৷ বাইরে লনে কিছুক্ষণ পায়চারি করলুম৷ কিন্তু জয়ন্তী বা কর্নেলরা কেউ বেরোচ্ছেন না৷ ব্যাপার কী? জয়ন্তীকে অতক্ষণ ধরে প্রশ্ন করা কেন? মুহূর্তে আমার মাথায় একটা আবছা সন্দেহ ভেসে এল৷ জয়ন্তী বা শ্যামলীর পিছনের কথা তো কিছুই জানি না৷ এমনও তো হতে পারে যে মোহন পারেখের সঙ্গে প্রণয়ঘটিত কোনও ঘটনার জের এই বাণেশ্বর অবধি ধেয়ে এসেছিল এবং পরিণামে পারেখ আর শ্যামলীর মৃত্যু ঘটল!

সন্দেহটা মাথায় দিব্যি ভেসে বেড়াতে থাকল৷ কলকাতার সাউথ পার্ক লেনের সেই দু-বোন মিতা-রিতার কেসটা মনে পড়ে যাচ্ছিল৷ ওরা একজনকেই ভালোবাসত৷ তারপর ছোটোবোন রিতা পরিণামে নিজের সহোদর দিদি মিতাকে হত্যা করতে কুণ্ঠিত হয়নি৷ বিহারে এমনি এক পাহাড়ি অঞ্চলে বেড়াতে গিয়ে ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল৷ কথামতো আগে গেল দু-বোন, তারপর ওদের প্রণয়ী৷ রিতা এক সন্ধ্যায় পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দিল সেই যুবকটিকে৷ ফিরে এসে সেই রাতেই পটাশিয়াম সায়নাইড দিয়ে দিদিকে হত্যা করল৷ এবং আত্মহত্যার ঘটনা বলে রটাল৷ একটা চিঠিও পাওয়া গেল মিতার বিছানার তলায়৷ আত্মহত্যার কারণ খুবই স্বাভাবিক৷ প্রণয়ীর মৃত্যুর পর তার বেঁচে থাকার কোনও অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না, তাই বিষ খেল৷ ওদিকে প্রণয়ীর মৃত্যুটা আকস্মিক দুর্ঘটনা বলে সবাই মেনে নিয়েছে৷ কাজেই রিতা সবদিক থেকে নিরাপদ হল৷ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে তার কোনও অসুবিধেই হল না৷

কিন্তু আমার সঙ্গের বুড়ো ঘুঘুটির চোখ এড়িয়ে যাওয়া অনেকের পক্ষেই অসম্ভব৷ ঘটনাচক্রে তিনি তখন সেই পাহাড়ি স্বাস্থ্যনিবাসে এক বন্ধুকে দেখতে গেছেন৷ কোথাও কোনও আকস্মিক মৃত্যুর গন্ধ পেলেই উনি তো একেবারে চঞ্চল হয়ে ওঠেন!

যাই হোক, সে কেসের কথা খবরের কাগজে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ হয়েছিল৷ ধুরন্ধর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার হত্যাকারীকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন৷ রিতার বয়স বিবেচনা করে তার যাবজ্জীবন জেল হয়ে যায়৷ জেলে মাঝে-মাঝে দেখা করে আসতেন কর্নেল৷ ফিরে এসে বলতেন, মেয়েটি অনুতপ্ত হয়েছে এতদিনে৷...

বাণেশ্বরের ঘটনার সঙ্গে এ ঘটনার একটা মোটামুটি মিল আছে, তা এতক্ষণে হঠাৎ আবিষ্কার করে আমি ভীষণ চঞ্চল হয়ে উঠলুম৷ কর্নেল কি মিতা-রিতার কেসটা ভুলে গিয়েছিলেন?

জয়ন্তীকে এখনও জেরা করা হচ্ছে দেখে আমার মনে হল, কর্নেল নিশ্চয়ই কেসটা ভোলেননি৷ অমনি গা শিউরে উঠল৷ তারপর ক্রমশ মন খারাপ হতে থাকল৷ জয়ন্তী কি রিতা? জয়ন্তী অত ভালো মেয়ে—অমন সরল, নিরহঙ্কার, আর দয়ালু! মনে-মনে তার মুখের দিকে তাকালুম৷ কোথাও একবিন্দু পাপের ছায়া দেখতে পেলুম না৷ না, না—আমি ভুল করছি৷ তা ছাড়া মোহনকে না হয় ভূতের পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলা সহজ হল, শ্যামলীকে কীভাবে মারল সে? অতগুলো লোকের মধ্যে, অন্ধকার হলেও, চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে হত্যা করার মতো দক্ষতা, চাতুর্য আর নার্ভ তার যে নেই, আমি এতে নিঃসন্দেহ৷ কর্নেল বলেছেন, এ কাজ কোনও প্রচণ্ড শক্তিধর ক্ষুরধার-বুদ্ধিসম্পন্ন অভিজ্ঞ হত্যাকারীর৷ সে প্রেত হোক, আর মানুষই হোক, তার শক্তি অতি সাংঘাতিক৷ তা ছাড়া, প্যাথোজেন বা নাটেমা নামক আদিম জিভারো ইন্ডিয়ানদের ব্যবহৃত বিষ কোথায় পাবে জয়ন্তী? যদি বা পায়, সে তো অন্য কোথাও অন্য কোনও সুযোগে তা ব্যবহার করতে পারত! এমনকী তা বাদেও কোনও পর্বতাভিযানে গিয়ে শ্যামলীকে খুব সহজেই সে ধাক্কা দিয়েই তুষারখাদে ফেলে মারতে পারত৷ ধরা যাক, যেভাবে মোহনকে মেরেছে সেভাবে তাকেও মারতে পারত ভূতের পাহাড়ে গিয়ে৷ কেউ কোনও সন্দেহ করত না৷ কারণ দু’জনেরই পাহাড়ে চড়ার সার্টিফিকেট আছে৷ জয়ন্তী কৈফিয়ত দিত, পশ্চিমের খাড়াই বেয়ে চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করছিল তারা—হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ খুবই স্বাভাবিক কৈফিয়ত হত৷

কিন্তু আরেকটা যুক্তি মনে ভেসে এল৷ সেটাও কর্নেলের৷ হত্যাকারী যেই হোক, শ্যামলীকে হত্যা করেছে সে আকস্মিক সিদ্ধান্তে৷

কথাটা বারবার নাড়াচাড়া করে দেখলুম৷ হ্যাঁ, ঠিক তাই-ই বটে৷ কারণ ওই পরিবেশে শ্যামলীকে হত্যা করার ঝুঁকি ছিল—অন্ধকার থাকলেও ঝুঁকিটা খুব সামান্য নয়৷ হত্যাকারী মরিয়া হয়ে ঝুঁকিটা নিয়েছিল, তা বোঝা যায়৷ মার্ডার-উইপন বা হত্যার অস্ত্র যাই হোক, হত্যা করার মতলব যদি আগেই পবিকল্পিত হয়ে থাকে, তা হলে এতগুলো লোকের মধ্যে তা ব্যবহার না করে অন্যখানে শ্যামলীকে একা পেয়ে দিব্যি কাজে লাগানো যেত না কি? বিশেষ করে জয়ন্তীই যদি হত্যাকারী হয়, তা হলে তো তার সুযোগের জন্যে প্ল্যানচেটের আসরে আসতে হবে কেন?

স্বাভাবিক হতে বাধা অবশ্য নেই৷ ধরা যাক, জয়ন্তী মোহনকে খাদে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে এবং শ্যামলী আড়াল থেকে দেখেছে, তারপর হঠাৎ প্ল্যানচেট আসরের সুযোগ পেয়ে প্রিয় বান্ধবীর কীর্তি ফাঁস করতে চেয়েছে—এতে জয়ন্তী বিপদ বুঝেই শ্যামলীকে কোনও অজ্ঞাত অস্ত্রে হত্যা করেছে৷

আবার দেখলুম, জয়ন্তীর দিকে সন্দেহের পাল্লাটা ভারী হয়ে যাচ্ছে৷

তখন হাল ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ সিগারেট খেলুম এবং পায়চারি করলুম৷ হ্যাঁ এবং না’র দোলায় অস্থির হতে থাকলুম৷ খানিকটা আগে হলুদ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে জয়ন্তী প্রেতশক্তিকে হত্যাকারী প্রমাণের জন্যে উঠে পড়ে লেগেছিল কেন? সে সুশিক্ষিতা আধুনিকা৷ আমার অবাক লাগছিল তার মতামত৷ অবশ্য শ্যামলী গতকাল বিকেলে ভূতের পাহাড়ে ওকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলে বিদ্রুপ করছিল বটে! তা হলেও আজ জয়ন্তী যেন ভূতপ্রেত দিয়ে তার আত্মরক্ষার জন্যে নিছক একটা সাফাই গড়ে তুলছিল আমার কাছে৷ নাঃ, ভূতে আমার এখন এই উজ্জ্বল দিনের বেলায় একটুও বিশ্বাস নেই! চমৎকার ঝিরঝিরে বাতাস দিচ্ছে৷ চারদিকে স্পষ্টতার মধ্যে কোনও অশুভশক্তির কোনও চিহ্ন নেই৷

সিগারেট শেষ হলে একটা সিদ্ধান্ত নিলুম৷ জয়ন্তীর সঙ্গে যতটা পারি ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা শুরু করব৷ দরকার হলে ফ্লার্টিং করব—এমনকী ওকে চুমু খেতে চেষ্টা করব, বুকে টানব৷ দেখা যাক, এতে কতখানি ফল পাওয়া যায়৷ নিপুণ প্রেমের অভিনয় দিয়ে, অবশ্য জানি না (ও যদি সত্যিকার হত্যাকারী হয়) কতখানি সিদ্ধিলাভ সম্ভব হবে৷ অন্তত এটুকু বলতে পারি, বহুদিন ধরে ধুরন্ধর এক গোয়েন্দার শিষ্যত্ব নিয়ে যা কিছু শিখেছি, তা ঠিক-ঠিক প্রয়োগ করতে পারলে কিছুটা কাজ হবেই৷

হাসি পেল৷ প্রেমের অভিনয় করতে গিয়ে সত্যি-সত্যি প্রেমে পড়ে যাব না তো? তা হলে আবার উলটো বিপদ হবে৷ জয়ন্তীর মধ্যে একটা মারাত্মক টান আছে—এমনিতেই তার খপ্পরে পড়েছি আজ সকাল থেকে৷ ওকে না দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলুম না অতক্ষণ? মনকে বললুম—শক্ত হবি ব্যাটা! খবরদার, বেশিদূর এগিয়েছ কি মরেছ৷

আর আমার প্রেমিকা চন্দ্রাণীর (সে এখন কলকাতায়; এম. এ. পরীক্ষার ফল না বেরোলে কোথাও নড়বে না) উদ্দেশে বললুম—চন্দ্রা, এখন দিনকতকের জন্যে আমাকে ছুটি দাও৷ মানুষ যেমন মাঝে-মাঝে নিজের ঘর ছেড়ে অন্যের ঘরে ক’দিন বেড়াতে যায়, তেমনি আমিও তোমার-আমার নিজস্ব ঘর থেকে অন্য একটি ঘরে বেড়িয়ে আসি৷ বাইরে বেড়াতে গেলেই তো নিজের ঘর কিছু পর হয়ে যায় না৷

তখনও কর্নেলদের কোনও পাত্তা নেই৷ ব্যস্ত হয়ে ডাইনিং হলে উঁকি মেরে চলে এলুম৷ তারপর একেবারে গেট পেরিয়ে রাস্তায় উঠলুম৷ অন্যমনস্কভাবে হোটেলের দিকে চলেছি, হঠাৎ দেখি রাস্তার ধারে বেমক্কা গজিয়ে ওঠা পিরামিডের মতো তিনকোনা প্রকাণ্ড ন্যাড়া পাথরের কাছে দাঁড়িয়ে জয়সোয়ালজি পাইপ টানছেন৷ সূর্য এখন প্রায় মাথার ওপর, তাই পাথরটার উত্তরধারে ছায়া সেঁটে গেছে৷ ওই একফালি ছায়ায় ভদ্রলোক আপনমনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন৷ পিঠটা পাথরে ঠেকিয়ে একটু বাঁকাও হয়েছেন৷ আমি এই বদমেজাজি প্রাক্তন পুলিশ ডিক্টেটরের পাল্লায় পড়া বাঞ্ছনীয় মনে করলুম না৷ কিছুক্ষণ আগে যেভাবে রেগেমেগে বেরিয়ে এসেছেন, বলা যায় না—এখন সেই রাগটা আমার ওপর ঝেড়ে বসতে পারেন পুরোপুরি৷

এড়িয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ উনি হাত তুলে ডাকলেন—চাউড্রিজি! প্লিজ কাম হিয়ার৷

গলার স্বর একেবারে অন্যরকম এখন৷ তবু ভয়ে-ভয়ে কাছে গেলুম৷ —এখনও হোটেলে ফেরেননি স্যার!

—নাঃ৷ জাস্ট থিংকিং—ভাবছি৷ আসুন চাউড্রিজি!

এখানে ওইভাবে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন পুলিশ সুপারটি কী ভাবছেন, জানতে কৌতূহল হচ্ছিল৷ আমি কাছে গেলে পা বাড়ালেন৷ তারপর আমার একটা হাত নিয়ে বললেন—আমার মেজাজ সময়ে-সময়ে লোকে বড্ড বিগড়ে দেয়৷ তখন সামনে যাকে পাই, কড়া কথা বলে বসি৷ আপনি আমার ছেলের বয়েসি চাউড্রিজি, দয়া করে কিছু মনে করবেন না৷

ব্যস্তভাবে বললুম—না, না৷ কী যে বলেন, স্যার৷

—দেখুন, আমি সেই বাইশ বছর বয়সে ব্রিটিশ আমলে পুলিশের চাকরি নিয়েছিলুম৷ নিজের যোগ্যতায় সামান্য সার্জেন্ট থেকে অবশেষে পুলিশ-সুপার হয়েছিলুম৷ অজস্র মেডেল আর পুরস্কার পেয়েছি জীবনে৷ কত মারাত্মক সব কেসের অপরাধীদের খুঁজে বের করেছি—সে এক দীর্ঘ রোমাঞ্চকর অধ্যায় ছিল জীবনের৷ আমার চোখে চোখ পড়লেই গলগল করে অপরাধীরা সব কবুল করে যেত৷ আপনি রাজস্থানে যান৷ তামাম স্টেট আমার নাম শুনলে এখনও বলে উঠবে—হ্যাঁ, পুলিশ-সুপার একজনই ছিল—সে জয়সোয়ালজি৷ এখন আমার অবসরজীবন৷ আজ দশ বছর অবসর নিয়েছি৷ বয়েস হয়েছে৷ ছোটাছুটি বা কোনও ঝামেলা বিলকুল পছন্দ হয় না, পারিও না৷ কিন্তু বড়ো কষ্ট হয় চাউড্রিজি, বুঝলেন? কোন জমানা ছিল—আর আজ কোন জমানা এল! শাসন চালাবার যোগ্যতা নেই, বুদ্ধিসুদ্ধি নেই, সব আলুর কারবারি ঢুকেছে প্রশাসনে৷ আর পুলিশ প্রশাসন? ছ্যা-ছ্যা! অযোগ্য নির্বোধ কতকগুলো লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ পুলিশ শুনলেই একসময় লোকের পিলে চমকে উঠত৷ আর আজ? পুলিশের প্যান্ট খুলে লোকেরা লেজ খুঁজে দেখে৷

হো-হো করে হেসে উঠলুম৷

জয়সোয়ালজি বললেন, —হাসবেন না, হাসবেন না৷ হাসির কথা নয়৷ খুবই দুর্ভাবনার কথা চাউড্রিজি৷ পুলিশকে যদি ভয় না করল, তো প্রশাসন চলবে কেমন করে? তাই তো এই অরাজক অবস্থা সারা দেশে৷ দুর্নীতি আর খুনজখম হু-হু করে বেড়ে গেছে৷ এত ক্রিমিনাল বেড়ে যাওয়ার কারণ কী জানেন? লোকে পুলিশকে আর ভয় করে না৷ দেখছে, এরা আসলে কাকতাড়ুয়া—খড়ের মূর্তি৷ তালপাতার সেপাই সব৷ হাতে খেলনার বন্দুক-পিস্তল৷ যান—পরীক্ষা করে দেখুন, গুলি বেরোয় না—বেরোয় গুলতির গুল!

আবার হাসি এল, কিন্তু সামলে নিলুম৷ কড়া ধমক খাওয়া বিচিত্র নয়৷ বললুম—ঠিক বলেছেন স্যার৷ আমাদের পশ্চিমবঙ্গে তো তাই ঘটছে৷ বাচ্চা ছেলেরা পুলিশের হাত থেকে বন্দুক-পিস্তল কেড়ে নিয়ে কেটে পড়ছে৷

জয়সোয়ালজি জোর নড়ে উঠলেন—বিলকুল তাই ঘটছে! আরে! তুমি হচ্ছ কি না পুলিশ৷ ব্রিটিশ ট্র্যাডিশনের বীরত্ব, তেজ, শক্তি, সাহস তোমার রক্তে থাকবে গাঁথা৷ তা কি না, হাতে অমন সাংঘাতিক অস্ত্র থাকতে তুমি ভ্যাবলার মতো মার খাচ্ছ? পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপার দেখতে-দেখতে আমি পাগল হয়ে যাই চাউড্রিজি! ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা৷ যার হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তাকে কিনা সামান্য ছুরি দিয়েই কাহিল করে মারছে? আমি হাসব না কাঁদব ভেবে পাই না, যখন দেখি, বন্দুক-পিস্তলের সঙ্গে শেকল লটকানো রয়েছে৷ সব বাঘ এখন গিদ্ধড় হয়ে গেছে চাউড্রি! আমার হাত নিশপিশ করে৷ দিক না একদিনের জন্যে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ কর্তার দায়িত্ব আমার কাঁধে—মাত্র একদিন, বুঝলেন? দেখবেন—সব শালা শায়েস্তা হয়ে গেছে!

সায় দিলুম—যা বলেছেন, স্যার!

—এই খান্নাটাকে কী ভাবছেন? ও তো একটা বুদ্ধুর বুদ্ধু৷ পুলিশ ইন্সপেক্টর হয়েছে নেহাত খুঁটির জোরে৷ ও একজন কনস্টেবল হওয়ারও যোগ্য নয়৷ তা ছাড়া, কিছু মনে করবেন না চাউড্রি, আপনার কর্নেল ভদ্রলোকের ব্যাকগ্রাউন্ড আমি জানি না—উনি চোখের সামনে যা দেখছেন, তা ছেড়ে দিয়ে তফাতে ঘুরতে যাচ্ছেন৷ কোনও-কোনও মানুষের স্বভাব অবশ্য এমনিই হয়৷ আপনার কর্নেল কি ডিটেকটিভ ডিপার্টে ছিলেন?

জবাব দিলুম—না, না৷ উনি মিলিটারির লোক৷

জয়সোয়ালজি পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়ে ঘোঁতঘোঁত করে পুলিশি হাসি হাসলেন৷ —শখের গোয়েন্দা?

—আজ্ঞে হ্যাঁ৷ ওঁর অনেক হবির মধ্যে এটাও একটা৷

জয়সোয়ালজি আমার দিকে ট্যারা চোখে তাকিয়ে বললেন—আপনার ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোককে বলে দেবেন, খুনোখুনি হবির মধ্যে পড়ে না৷ আগুন নিয়ে খেলার শামিল৷ আরে বাবা, ডিটেকশান বিদ্যা যদি অতই সহজ আর অশিক্ষিত-পটুত্বের ব্যাপার হত, তা হলে আর ট্রেনিং এবং অভিজ্ঞতার দরকার হত না!...

হোটেলের গেটে এসে পড়েছিলুম, তাই বাঁ-দিকে ঘুরছি—জয়সোয়ালজি আমার হাত ধরে টানলেন৷ —লাঞ্চের এখনও ঢের দেরি আছে৷ চলুন না, একবার নেপাল বর্ডার অবধি ঘুরে দেখে আসি, কী অবস্থা৷ আমি যখন বললুম, সারদা নদী পেবিয়ে নেপাল হয়ে বেরোনো যায়, খান্না কী জবাব দিল শুনলেন তো? আমি বাজি রেখে বলছি—ব্যাটা ওদিকে কখনও পা বাড়ায়নি৷ ওদিকটা আমার চেনা৷

প্রস্তাবটা ভালো মনে হল৷ রাস্তা কবে মেরামত হবে ঠিক নেই৷ কালই যদি দরকার বুঝি, ঘুরপথে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে ছাড়া উচিত হবে না৷ খুব বেশিদিন থাকাও যাবে না৷ ছুটি ফুবিয়ে যাবে৷ তাই ওঁর সঙ্গে পা বাড়ালুম৷ বললুম—কত দূর জায়গাটা?

জয়সোয়ালজি জবাব দিলেন—বেশি না, এক কিলোমিটার মাত্র৷ খান্নার কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না৷ সারদা নদীতে এই বে-মরশুমে বন্যা হয়ে গেল—মাত্র এক রাতের ঝড়বৃষ্টিতে? ব্যাটা বড্ড ফাঁকিবাজ৷ আসলে আমাদের ভয় দেখাচ্ছে৷

টনকপুর রোড ঘুরে বাঁ-দিকে চলে গেল৷ আমরা সে রাস্তা ছেড়ে সরু একটা পায়ে-চলা রাস্তায় নামলুম৷ দু-ধারে ঘন জঙ্গল৷ রাস্তাটা একটা পাহাড়ের গায়ে উঠে গেছে৷ চড়াইয়ে ওঠার পর লক্ষ্য করলুম, আশেপাশের পাহাড়গুলোতে অজস্র ধসের চিহ্ন রয়েছে৷ নীচের উপত্যকার ওপর ধস নেমে সেখানেও অনেক গাছপালাকে মিশমার করে ফেলেছে৷ মনে হচ্ছে, যেন কোনও মহাকায় দানব হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে প্রকৃতির সাজানো ঘর-সংসার লণ্ডভণ্ড করে আবার কোনও গুহার অন্ধকারে গিয়ে লুকিয়ে পড়েছে৷

লক্ষ্য করলুম, কড়া ধাতের মানুষ হলে কী হবে, জয়সোয়ালজিরও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার চোখ আছে৷ কারণ, মাঝে-মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছেন এবং আণ্ডনফুলের উজ্জ্বলতায় ভরা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে অস্ফুটম্বরে তারিফ করছেন৷ একস্থানে পাথরের ওপর ঝরনাধারার মতো অজস্র হলুদ অর্কিডের গুচ্ছ, ডগায় আশ্চর্য সুন্দর লাল ফুল ফুটে রয়েছে৷ উনি দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন৷ তারপর সস্নেহে ঝুঁকে অর্কিডগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন৷ তারপর বললেন—চাউড্রিজি কি বিবাহিত?

সলজ্জ হেসে জবাব দিলুম—না স্যার!

জয়সোয়ালজি বললেন—করবেন না৷ খামোখা প্রবৃত্তির বশে ঘরে দুশমন ডেকে এনে কী ফল?

—আপনি কি বিবাহিত, স্যার?

জয়সোয়ালজি ঘাড় নেড়ে বললেন, —নো-ও-ও! আপনি পাগল হয়েছেন চাউড্রি? জীবনে সবকিছুকে আমি বিশ্বাস করতে রাজি—ওই একটি বাদে৷ স্ত্রীলোক! বলবেন, কেন এ-কথা বলছি? বলছি স্রেফ আমার অভিজ্ঞতা থেকে৷ পৃথিবীতে যতরকম অপরাধ ঘটে থাকে, তার শতকরা নিরানব্বইটির পিছনে কোনও-না-কোনওভাবে স্ত্রীলোকের প্রভাব আছেই৷ স্ত্রীলোক সম্পর্কে খ্রিস্টানধর্মের ইশারা আপনার মালুম হচ্ছে না? অ্যাডামকে স্ত্রীলোকই তো জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেতে প্ররোচিত করেছিল৷ শয়তান প্রথম চেষ্টাতেই কৃতকার্য হয়েছিল ইভের ওপর৷ অ্যাডাম পুরুষ মানুষ৷ তাকে শয়তান নোয়াতে পারেইনি৷ আর, আমাদের হিন্দুশাস্ত্র দেখুন৷ সেখানেও বলছে—নারী নরকের দ্বার৷ তাই ঈশ্বরসাধনার প্রতিবন্ধক সে৷ ব্রহ্মচর্য ছাড়া ঈশ্বর পাওয়া যায় না৷ তবে দেখুন চাউড্রিজি, ঈশ্বর-টিশ্বর অনেক বড়ো কথা৷ আমি সামান্য মানুষ৷ আমি জানি, স্ত্রীলোক নিয়েই সাতকাণ্ড রামায়ণ আর অষ্টাদশপর্ব মহাভারত!

ওঁকে সায় দিয়ে বললুম—ট্রয়ের যুদ্ধ, ওদিকে আরবের মুসলমানদের কাববালার যুদ্ধ—সবই স্যার, স্ত্রীলোকের কারণে ঘটেছিল নাকি৷ এমনকী কোনও-কোনও পণ্ডিত বলেছেন, মোহেনজো-দড়ো সভ্যতার পতনের মূলেও স্ত্রীলোক! আর স্যার, আমাদের বাঙালি-মতে বলা হয়, স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী!

জয়সোয়ালজি আমার কাঁধে অন্তরঙ্গভাবে হাত রেখে বললেন, —বাঙালি খুব বুদ্ধিমান জাত৷ টেগোরকে তাই নোবেল প্রাইজ দিয়েছিল বিলিতি পণ্ডিতরা৷

—টেগোরও স্যার স্ত্রীলোকের ব্যাপারটা এক বিয়েতেই বুঝে ফেলেছিলেন৷ তাই স্ত্রীর অকালমৃত্যুর পর বাকি জীবন আর বিয়েই করলেন না! বুড়িয়ে খটখটে হয়ে একা-একা মারা গেলেন৷ তবু কোনও স্ত্রীলোককে পাত্তাই দিলেন না!

জয়সোয়ালজির চোখ পিটপিট করছিল উত্তেজনায়৷ এবার চাপা গলায় বললেন— মোহন পারেখটা বোকার মতো ওই স্ত্রীলোকের প্যাঁচে পড়েই মারা গেছে, বুঝলেন চাউড্রি? আমি জানি৷

চমকে উঠে বললুম—আপনি জানেন?

—নিশ্চয়ই জানি৷ মানে—প্রত্যক্ষদর্শী নই৷ কিন্তু এ আমার একরকম জানাই বলতে পারেন৷ খান্নাটা বড্ড ভুল করছে৷

—ব্যাপারটা জানতে খুব কৌতূহল হচ্ছে, স্যার৷

জয়সোয়ালজি হাঁটতে-হাঁটতে বললেন—দেখুন, বরাবর আমার মেথড অফ ডিটেকশান হচ্ছে, প্রথম মুহূর্তেই ইনটুইশান বা সহজাত বোধ যা বলে, তার দিকে মনোযোগ দাও৷ শ্যামলী মেয়েটি মারা গেছে শোনার সঙ্গে-সঙ্গে আমার ইনটুইশান বলে দিল—মিসেস মালহোত্রার দিকে লক্ষ্য রাখো!

—কিন্তু স্যার...৷

—ওয়েট, ওয়েট৷ মোটিভ পরে খুঁজবেন৷ প্রথমে দেখুন হত্যার চান্সটা কার বেশি ছিল? শ্যামলীর কাছাকাছি ছিল যে, তারই৷ এখন, ওর ডাইনে ছিলুম আমি, বাঁয়ে মিসেস মালহোত্রা৷ কেমন?

—হ্যাঁ স্যার!

—এখন দেখুন, আমি জানি যে আমি হত্যা করিনি৷ তা ছাড়া, যুক্তিশাস্ত্রের বিচারে আমিই যখন ডিটেকশন করছি অর্থাৎ হত্যাকারীকে খুঁজছি, তখন আমি নিজে হত্যাকারী নই৷ তা হলে দেখলুম, বাকি রইলেন মিসেস মালহোত্রা৷ কিন্তু তিনি কেন খুন করবেন? হ্যাঁ—এ একটা প্রশ্ন৷ অনেক ভাবলুম৷ ভেবে দেখলুম, ভদ্রমহিলা প্রেততত্ত্ব চর্চা করেন৷ ওঁর বদ্ধমূল ধারণা, প্রেতকে মিডিয়ামের দেহে আনা যায়৷ তাই শ্যামলীর মধ্যে প্রেতাত্মা আসুক, এই জেদ ওঁর ছিল৷ বলুন, এমন অবস্থায় ভদ্রমহিলার এই জেদ থাকা উচিত কি না?

—ঠিক বলেছেন স্যার৷ গোঁড়া বিশ্বাসী মানুষ তার বিশ্বাসকে সত্য প্রমাণের জন্যে সবসময় জেদ ধরে বসে থাকে৷

—আপনি বুদ্ধিমান, চাউড্রি৷ তার ওপর আমরা এতগুলো হোমরাচোমরা সব মানুষ বসে আছি আসরে৷ আমাদের তাক লাগাতে পারলে মিসেস মালহোত্রার মস্ত জয় হয়ে যায়! এদিকে আমরা সবাই প্রায় অবিশ্বাসী৷ কাজেই ভদ্রমহিলা প্রায় বাজি ধরে বসেছিলেন৷ সাইকোলজিকাল পয়েন্ট থেকে ভেবে দেখুন চাউড্রিজি, এ ছিল মিসেস মালহোত্রার জীবনের এক চরম সঙ্কটময় মুহূর্ত৷ হেরে গেলে সে এক বড়ো অসম্মানের কথা, বড়ো লজ্জার কথা ওঁর জীবনে!

—ঠিক স্যার, আপনার যুক্তি অসাধারণ৷

জয়সোয়ালজি এবার গোঁফে তা দিয়ে বললেন—এমন সঙ্কটময় মুহূর্তে, এমন একটা মানসিক উদ্বেগের সময়ে, মিসেস মালহোত্রা দেখলেন যে শ্যামলী অভিনয় করছে৷ অর্থাৎ তামাশা করছে!

—অভিনয় করছে?

—বিলকুল! আপনি কি বিশ্বাস কবেন, শ্যামলীর মুখ দিয়ে ভূতে কথা বলছিল? এই বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানের যুগে, যখন মানুষ গ্রহান্তরে পাড়ি দিচ্ছে, তখন আপনি ওইসব আদিম কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকবেন?

—মোটেও না, স্যার৷ ভূতটুত ছেলেভুলোনো গল্প ছাড়া কী?

—হ্যাঁ, মিসেস মালহোত্রা টের পেলেন যে শ্যামলী তাঁর বিশ্বাস নিয়ে তামাশা করছে৷ বলবেন—কেমন করে টের পেলেন? পেলেন—যখন দেখলেন, জলজ্যান্ত মোহন পারেখকে ভূত বানাচ্ছে শ্যামলী৷

—কিন্তু মোহন সত্যি তো তখন মৃত!

—মৃত হলেও তখন সে সবার কাছে জীবিত৷ কারণ কেউ জানত না যে, সে পাহাড়ের খাদে পড়ে মারা গেছে৷ মোহন মালহোত্রা ফ্যামিলির নাকি খুব ন্যাওটা ছিল শুনলুম৷ মিসেস মালহোত্রা নিঃসন্তান৷ এক্ষেত্রে মোহনের মৃত্যু জেনেও উনি চুপচাপ বসে থাকবেন, এটা যুক্তিসঙ্গত মনে হয় আপনার?

—না স্যার৷

—মোহনের মৃত্যু কীভাবে হল, পরে আসছি সে-কথায়৷ এখন দেখুন, যেই মিসেস মালহোত্রা টের পেল যে বাঙালি মেয়েটি তাঁকে নিয়ে তামাশা করছে, অমনি তাঁর মাথায় বিস্ফোরণ ঘটল৷ চাউড্রি, এ হচ্ছে মিসেস মালহোত্রার আকস্মিক সিদ্ধান্ত!

মুহূর্তে কর্নেলের ওই একই কথা মনে পড়ে গেল৷ আকস্মিক সিদ্ধান্তেই হত্যাকারী শ্যামলীকে খুন করেছে! আমি জয়সোয়ালজির মুখে কর্নেলের উক্তি এবং যুক্তির প্রতিধ্বনি শুনে শুধু অবাক নই, অভিভূত হলুম৷ জয়সোয়ালজি সত্যি ঝানু অভিজাত পুলিশ অফিসার! ওঁর যুক্তি, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, পটভূমির খুঁটিনাটি অবস্থা বিচার এবং সম্ভাবনাতত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ দেখে চমৎকৃত হয়ে বললুম—অপূর্ব ডিডাকশান আপনার! এদিকটা কেউ ভাবছেন না!

—এবার প্রশ্ন ওঠে, মার্ডার-উইপনটা তা হলে কী ছিল? চাউড্রিজি, মিসেস মালহোত্রা কেন, পৃথিবীর যেখানে যারাই প্রেততত্ত্ব, ব্ল্যাক আর্ট, ব্ল্যাক ম্যাজিক, ডাইনিতত্ত্ব বা উইচক্র্যাফট, এক্সরসিজম বা ঝাড়ফুঁক, তুকতাক ইত্যাদি আদিম সংস্কার নিয়ে চর্চা করে— তাদের অদ্ভুত-অদ্ভুত সব জিনিস সংগ্রহ করে রাখতে হয়৷ কেন রাখতে হয় জানেন? মানুষকে তাক লাগাবার জন্যে৷ কারণ, বাস্তবিক তো পৃথিবীতে কোনও অলৌকিক ব্যাপার মাথা খুঁড়লেও ঘটতে দেখা যায় না৷ যা আপাতদৃষ্টিতে অলৌকিক মনে হয়, তার পিছনে বাস্তব কারণ ও যুক্তি থাকেই৷ তাই অসহায় ও মরিয়া হয়ে তারা বিচিত্র জিনিস জোগাড় করে রাখে৷ উদ্দেশ্য—অগত্যা ম্যাজিক দেখিয়ে বিশ্বাস উৎপাদন৷ এর জন্যে দরকার হলে তারা হত্যাতেও কুণ্ঠিত হয় না৷ রাজস্থানের এক গ্রামে এক তথাকথিত ডাইনি নিজের শক্তি দেখাতে কী করেছিল শুনুন৷ বশীকরণ, তাড়ন, মারণ, উচাটন ইত্যাদি প্রাচীন ভারতীয় ডাকিনীবিদ্যার কথা আশা করি আপনার জানা আছে৷ একটা লোক তার শত্রু নিপাতের জন্যে সেই ডাইনিকে ধরল৷ তখন ডাইনি করল কী, মারণমন্ত্রের অনেকরকম তুকতাকের ভড়ং করল৷ কিন্তু কার্যত সে সেই ভিকটিমের বাড়িতে রাতের অন্ধকারে গিয়ে চুপিচুপি তার ছাতুর মধ্যে বিষ মাখিয়ে এল৷ ছাতুখোর লোকটার ভোরে ছাতু খেয়ে কাজে যাওয়া অভ্যাস ছিল৷ যাই হোক, সে এক অদ্ভুত বিষ৷ লোকটা ক্রমশ পেটের অসুখে মারা পড়ল৷ চাউড্রি, আদিম যুগের লোকেরা অদ্ভুত সব বিষের সন্ধান রাখে—আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞান তা কল্পনাও করতে পারে না৷ আপনি যান আফ্রিকার জঙ্গলে, কিংবা অস্ট্রেলিয়া, কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলে—দেখবেন, আদিম অধিবাসীরা কতরকম আশ্চর্য বিষের সন্ধান রাখে৷ তা মডার্ন চিকিৎসাবিজ্ঞানে হেঁয়ালির সৃষ্টি করবে৷

মনে পড়ে গেল কর্নেলের মুখে শোনা প্যাথোজেন এবং নাটেমার কথা৷ প্যাথোজেন তো একালের আবিষ্কার, কিন্তু নাটেমা দক্ষিণ আমেরিকার জংলি জিভারো জাতির আবিষ্কৃত বিষ! এত তথ্য জয়সোয়ালজির জানা! আবার ওঁর বুদ্ধিমত্তা ও অভিজ্ঞতার প্রতি শ্রদ্ধায় নুয়ে পড়লুম৷ বললুম—খুব ইন্টারেস্টিং স্যার৷ বলুন৷

জয়সোয়ালজি দম নিয়ে বললেন—মিসেস মালহোত্রাও আসলে সেই প্রিমিটিভ উইচক্রাফটের চর্চা করেন৷ নানা দেশ ঘুরেছেন শুনেছি৷ ওঁর পক্ষে তেমন কোনও আদিম এবং আমাদের অজ্ঞাত মারণাস্ত্র জোগাড় করা মোটেও অসম্ভব নয়৷ রাজস্থানে ডাকিনীবিদ্যার প্রভূত চর্চা আছে গ্রামাঞ্চলে৷ কত কেস যে আমি ধরেছি, ইয়ত্তা নেই৷ একবার একটা কেস ধরলুম৷ একের পর এক এলাকার বাচ্চারা অদ্ভুত একটা রোগে মারা পড়ছে৷ ডাক্তাররা ব্যতিব্যস্ত৷ রোগটা ধরতেই পারছেন না৷

বলেই উনি থেমে গেলেন৷ কেন থামলেন খুঁজছি, দেখি উনি বাঁ-দিকে তাকিয়ে রয়েছেন৷ কিছু লক্ষ্য করছেন যেন৷ বাঁ-দিকে নীচে জঙ্গলেভরা একটা উপত্যকা৷ আমার চোখে কিছু পড়ল না৷ তাই বললুম—আর কদ্দূর স্যার?

জয়সোয়ালজি বললেন, —এসে গেছি৷ সামনের বাঁক ছাড়ালেই দেখতে পাব৷

হাঁটতে-হাঁটতে উনি বারবার পিছু ফিরে সেদিকে তাকাচ্ছেন দেখে আর চুপ করে থাকা গেল না৷ বললুম—কী স্যার?

জয়সোয়ালজি ভুরু কুঁচকে গম্ভীর হয়ে বললেন—চাউড্রি, ওই অধ্যাপক ভদ্রলোককে আপনার কেমন মনে হয়?

—ভালোই৷ কেন বলুন তো?

—তখন মোহন পারেখের মৃত্যুর ব্যাপারটা বলতে গিয়ে বলা হয়নি৷ এবার শুনুন৷ মোহনকে ভূতের পাহাড় থেকে সম্ভবত ওই অধ্যাপকই ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল৷

চমকে উঠে বললুম, —সে কী!

—এ-কথা কেন মাথায় এসেছে, জানেন? আমার সঙ্গে যতটুকু আলাপ হয়েছে, অধ্যাপক দ্বিবেদী ভীষণ সেকেলে রুচির মানুষ৷ বিশেষ করে খুব নীতিবাগীশ৷ ফিল্মের লোকেদের প্রতি ওর প্রচণ্ড রাগ৷ মোহন পারেখের সম্পর্কে ভীষণ নিন্দে করছিল গতকাল৷ বলছিল, এরাই দেশটাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দিচ্ছে!

—বলেন কী!

—হ্যাঁ৷ বলছিল, মোহন নাকি মেয়েছেলে দেখলেই বাঘের মতো হালুম করে ঝাঁপ দেয়! ঘোঁত ঘোঁত করে হাসলেন জয়সোয়ালজি৷ ফের বললেন, অধ্যাপক বলছিল, ওই মোহন নাকি কত মেয়ের সর্বনাশ করেছে সংখ্যা নেই৷ ওর ফাঁসি হওয়া দরকার৷ মোহনের নিন্দে করার সময় অধ্যাপকের মুখে আমি একটা ক্রুর অভিসন্ধি লক্ষ্য করেছিলুম৷ দেখার পর, ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল৷

—কিন্তু দেখে তো মনে হয় বড্ড নিরীহ ভীতু মানুষ৷

—কার পেটে কী আছে, বলা কঠিন৷ চেহারা দেখে কি খুনি চেনা যায় চাউড্রি?... বলে উনি চুপ করে গেলেন হঠাৎ, ফের নীচের উপত্যকায় কী দেখলেন৷

বাঁকের কাছে এসে মুখ খুললেন—দেখুন চাউড্রি, নীচের ওই জঙ্গলে মনে হচ্ছে, অধ্যাপককে দেখছিলুম৷

হৃৎপিণ্ডে খিল ধরে গেল অজানা ভয়ে, বললুম, —অ্যাঁ! অধ্যাপক?

—সেইরকম মনে হল৷ ব্যাটা গতিক বুঝে সারদা পেরিয়ে নেপালের দিকে কেটে পড়ার মতলব করেনি তো?

—কিন্তু পুলিশ যে সবাইকে চোখে-চোখে রেখেছে?

জয়সোয়ালজি রেগে গিয়ে বললেন, —খান্নার পুলিশকে আর পুলিশ বলবেন না চাউড্রি! ওতে একটা বিবাট গৌরবোজ্জ্বল ট্র্যাডিশনকে অপমান করা হয়! এই যে আমি বা আমরা দু’জনে চলে এলুম, এখন দিব্যি পালাতে পারি—কে দেখছে?

ঘাবড়ে গিয়ে বললুম—আমাদের পালাবার কোনও কারণ নেই স্যার!

—নিশ্চয়ই নেই৷ কিন্তু ডিসিপ্লিন ইজ ডিসিপ্লিন!

—সত্যি, পুলিশ আজকাল বড্ড নিষ্ক্রিয়৷

কথাটা বলার পরই লক্ষ্য করলুম, সামনে পূর্বে বিশাল খোলামেলা আকাশ—নীচে বিরাট একটা নদী৷ প্রচণ্ড বেগে স্রোত বয়ে যাচ্ছে৷ ওপারে নেপালের পাহাড় রোদে ঝলমল করছে৷ কিন্তু খান্না ঠিকই বলেছিলেন, দুরন্ত খাড়া ওইসব পাহাড়৷ নদীর গা ঘেঁষে সোজা দেওয়ালের মতো উঠে গেছে হাজার-হাজার ফুট উঁচুতে৷ নদীর স্রোতেও অজস্র গাছ ভেসে যাচ্ছে দেখলুম৷ ডাইনে দূরে প্রচণ্ড জলকল্লোল শোনা যাচ্ছিল৷ জয়সোয়ালজি বললেন, জলপ্রপাত আছে ওখানটায়৷ ওই দেখুন, কেমন ধোঁয়া হয়ে রয়েছে! ওগুলো আস্ত মেঘ৷

আমাদের পায়ের কয়েক গজ তফাতে ধস নেমেছে৷ নদীগর্ভ পর্যন্ত খাড়া দেওয়ালের মতো নেমে গেছে এই পাহাড়টা৷ বাঁ-দিকের উপত্যকা থেকেও একটা পাহাড় উঠেছে নদীর ধার অবধি৷ এই পাহাড় দুটোর মধ্যে এক গভীর খাদ৷ তলার দিকে তাকানো যায় না৷

মিনিট দশেক চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর ঘড়ি দেখলেন জয়সোয়ালজি৷ তারপর বললেন, চলুন, ফেরা যাক৷ নেপাল হয়ে যাওয়া দেখছি সত্যি অসম্ভব৷ তবে খান্নাটা পরের মুখে ঝাল খেয়েই বলছিল, তা আমি হলফ করে বলতে পারি৷

আবার ফেরা শুরু হল৷ এবার উনি বেশ খানিকটা গম্ভীর৷ কিছুদূর আসার পর ডাইনে সেই উপত্যকার দিকে জীবজন্তুদের একটা চলার পথ নেমে গেছে যেখানে, সেখানে এসেই আচমকা জয়সোয়ালজি বললেন—চাউড্রি, চলে আসুন তো!

তারপর ওই ঢালু পথ বেয়ে পাহাড়ি বাঘের মতো দৌড়ে নামতে শুরু করলেন জয়সোয়ালজি৷ আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওঁকে অনুসরণ করার চেষ্টা করলুম৷ ঘুরে-ঘুরে পথটা নীচে নেমেছে৷ দু-ধারে ঝোপঝাড় আর বড়ো-বড়ো গাছ৷ পাথরও ছড়িয়ে রয়েছে সবখানে৷ একটা বাঁকে গিয়ে ওঁকে হারিয়ে ফেললুম৷ তখন চাপা গলায় ডেকে উঠলুম—জয়সোয়ালজি৷ জয়সোয়ালজি!

সামনে কোথাও ঝোপের ওপাশ থেকে আওয়াজ এল—শাট আপ!

ধমক খেয়ে ঢোঁক গিললুম৷ তারপর এগিয়ে গিয়ে দেখি, উনি একটা বড়ো পাথরের আড়াল থেকে নীচে কী লক্ষ্য করছেন৷ কাছে গেলে ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ করতে ইশারা করলেন৷

কাছে গিয়ে সেদিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে থাকলুম৷ অধ্যাপক অরিন্দম দ্বিবেদী!!

তা হলে সত্যিই এই জাঁদরেল পুলিশকর্তার ধুরন্ধর দৃষ্টিকে ফাঁকি দিতে পারেননি ভদ্রলোক৷ কিন্তু এখানে কী করতে এসেছেন? সারদা পেরিয়ে নেপালের দিকে পালানোর মতলবে নয় তো?

নিশ্চয়ই৷ তা ছাড়া আর কোনও কারণ থাকতে পারে না৷

কিন্তু উনি স্রেফ খালি হাতে এসেছেন৷ পরনে যথারীতি ঢোলা পাতলুন, জগঝম্প গলাবন্ধ শেরোয়ানি-জাতীয় কোট! ওই বেশে কি সাঁতার দিতে পারবেন ভদ্রলোক?

দেখলুম, অধ্যাপক একটা প্রকাণ্ড ওক গাছের গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন৷ তা হলে আমাদের দেখতে পেয়েছেন নির্ঘাত! কিন্তু উনি যেভাবে দাঁড়িয়েছেন, আমরা ওঁকে পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছি৷

জয়সোয়ালজি এবার শিকারি বাঘের মতো গুড়ি মেরে বসে পড়লেন৷ দেখাদেখি আমিও বসলুম৷ তখন উনি ফিসফিস করে বললেন—আপনি বাঁ-দিক ঘুরে ব্যাটাকে ঘিরে ফেলুন, আমি ডানদিক ঘুরে যাচ্ছি৷ সাবধান, যেন ও দেখতে না পায়৷

কথামতো আমি গুড়ি মেরে, কখনও বুকে হেঁটে, পাথর আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে এগোতে শুরু করলুম৷ জয়সোয়ালজিও ডানদিকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷ আর যেই ওঁকে ফের দেখতে গেছি, অমনি পা হড়কে সড়সড় করে একেবারে গড়াতে-গড়াতে গিয়ে অনেকটা নীচে পড়লুম৷ তারপর পোশাক থেকে ধুলোমাটি খড়কুটো ঝাড়তে-ঝাড়তে তাকিয়ে দেখি ওক গাছটা ফাঁকা৷ জয়সোয়ালজি গুম হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে৷ কাছে গেলে বললেন—পালিয়েছে! ব্যাটা অসম্ভব ধূর্ত!

ভূতের পাহাড়ে সাইরেন

সেদিন বিকেল নাগাদ আমার সব অভিমান জল করে দিয়ে গোয়েন্দাপ্রবর বিছানার পাশে বসে আমার হাত ধরলেন এবং বললেন, জয়ন্ত ডার্লিং! এবার আমরা যথারীতি বেড়াতে বেরোবো৷ আশা করি, একপ্রস্থ চমৎকার স্যুট তুমি পরবে৷ পশ্য, পশ্য! বাইরে কী চমৎকাব দৃশ্যরাজি! এ বুড়োর মনেও আজ রং ধরেছে৷

ভালো করে তাকিয়ে দেখি, কর্নেল যেন কোনও উৎকৃষ্ট হোটেলের জাঁকালো পার্টিতে চলেছেন! বাটনহোলে একটি লাল গোলাপও গুঁজেছেন৷ সবিস্ময়ে বললুম, অস্যার্থ?

—ডার্লিং! প্রকৃতির কাছ থেকেই তো মানুষ সবকিছু শিখেছে! এমন কিছু দেখাতে পারবে না—যার মূল আইডিয়ার জন্য প্রকৃতির কাছে মানুষ ঋণী নয়৷ সুতরাং, যদি তোমার চোখ থাকে এবং মাথার ধূসর পদার্থবিশেষে কোনও সৌন্দর্যবোধ থাকে, তাহলে দেখবে এই ডিসকমিউনিকেটেড বাণেশ্বরের প্রকৃতি সমস্ত ধ্বংসযজ্ঞের পর আবার কী নতুন সাজে সেজেছেন! লুক—জাস্ট লুক!

জানলা দিয়ে তাকিয়ে অভিভূত হয়ে গেলুম৷ রাতের ঝড়বৃষ্টির পর অনেকদিনের মালিন্য ধুয়ে-মুছে চারপাশে এক উজ্জ্বল বর্ণসমারোহ জেগে উঠেছে৷ দুপুর অবধি অতটা লক্ষ্য করিনি৷ কারণ, জয়সোয়ালজির যুক্তি এবং অধ্যাপকের কাণ্ড নিয়ে যথেষ্ট বিপর্যস্ত ছিলুম৷ এখন উঠে কোনও কথা না বলে তাড়াতাড়ি সেজে নিলুম৷

কর্নেল সেই অবসরে পাশের ঘরে গেলেন—অবশ্যই জয়ন্তীর খোঁজে৷ আমি যখন কর্নেলের দেখাদেখি বাটনহোলে ফুলদানি থেকে একটা গোলাপ তুলে নিয়ে গুঁজছি, উনি ফিরে এসে বললেন, চমৎকার জয়ন্ত! অপূর্ব দেখাচ্ছে তোমাকে!

—জয়ন্তী যাচ্ছেন তো?

কর্নেল হাসলেন৷ —জয়ন্তীর কথা তুমি জিগ্যেস করবে, জানি৷ কিন্তু খুবই দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি বন্ধু, শ্রীমতী জয়ন্তী তাঁর ঘরে নেই৷

—মেয়েটার সাহস তো বড্ড! একা কোথায় বেরলো?

—স্ত্রীলোকের গতিবিধির খবর দেবদূতরাও টের পান না৷ যাকগে, জয়ন্ত, এ নিয়ে দুঃখ করো না৷ চলো, এই বুড়োই আজ তোমাকে চাঙ্গা রাখবে৷

কপট রাগ দেখিয়ে বললুম, —জয়ন্তীর জন্যে আমার বয়ে গেছে! ওর ঘরে আজ কে কীসব খোঁজাখুঁজি করেছিল, সে-জন্যেই আমার মাথাব্যথা৷

কর্নেল মৃদু হেসে বললেন, —মাথাব্যথায় কোনও লাভ নেই, বন্ধু৷ চলো, আমরা রওনা দিই!

সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় ম্যানেজার শিবপ্রসাদের সঙ্গে দেখা হল৷ কর্নেল বাও করে বললেন, —গুড আফটারনুন প্রসাদজি!

—গুড আফটারনুন, স্যার! আপনার কাছেই যাচ্ছিলুম৷

—বলুন৷

—মিস রায়ের ঘরে আজ যে ঢুকেছিল বা জিনিসপত্র হাতড়েছে, তাকে আমাদের বেয়ারা হরিয়া দেখেছে স্যার৷ কিন্তু ওর কথা বিশ্বাস হচ্ছে না৷

—তাই বুঝি? কে সে?

—প্রফেসর দ্বিবেদী৷

কর্নেল হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ আমি হতভম্ব হয়ে গেলুম৷ বললুম—প্রফেসর দ্বিবেদী জয়ন্তীর ঘরে ঢুকেছিলেন? সে কী?

শিবপ্রসাদ কী বলতে যাচ্ছিলেন, কর্নেল আমার হাত ধরে টানলেন—ওক্কে মিঃ প্রসাদ৷ আপনাকে যথেষ্ট ধন্যবাদ!

—স্যার, যাই বলুন, এটা তো হোটেলের সুনামের পক্ষে ক্ষতিকর৷ কাজেই আমি ভাবছি, ভদ্রলোককে ডিবেক্ট চার্জ করব৷ কী জবাব দেন, শোনা দরকার৷

—প্লিজ মিঃ প্রসাদ! ছেড়ে দিন৷ আমি অধ্যাপকের সঙ্গে কথা বলে দেখবখন৷ এ নিয়ে আর উত্তেজিত হবেন না! ব্যাপারটা চেপে যান৷

বলে কর্নেল, ম্যানেজার আর আমি নীচে এলুম৷ লাউঞ্জের শেষপ্রান্ত অবধি আমাদের এগিয়ে দিয়ে গেলেন ম্যানেজার৷ পথে নেমে বললুম, —এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার, কর্নেল! অধ্যাপক দ্বিবেদী আরেক কাণ্ডও করেছিলেন৷ শুনুন—৷

আমাকে বাধা দিয়ে বৃদ্ধ গোয়েন্দা বলে উঠলেন, —জয়ন্ত, জয়ন্ত! ব্রিলিয়ান্ট৷ আজকের পশ্চিম আকাশটা লক্ষ্য করছ? চলো, আজও আমরা ওই ভূতের পাহাড়ে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখব৷ পা চালিয়ে চলো! কুইক!

এই বলে আমার হাত ধরে সত্যি-সত্যি কুইক মার্চ করে চলতে থাকলেন কর্নেল৷ চড়াই-উতরাইয়ের রাস্তা৷ হাঁফ ধরে যাচ্ছিল আমার৷ অথচ ওঁর যেন এতটুকু পরিশ্রম হচ্ছে না৷ একসময় বললুম, এত তাড়া তো একটা টাঙ্গা করে নিলেই হত!

কোনও জবাব পেলুম না৷ ভূতের পাহাড় সামনে দেখা যাচ্ছিল৷ এত ছোটাছুটির পর ওই পাহাড়ে উঠতে পারব কি না আমার সন্দেহ হচ্ছিল৷ বড়ো রাস্তা ছেড়ে আগের দিন যেখানে উঠতে শুরু করেছিলুম, সেখানে এসে কর্নেল এতক্ষণে মুখ খুললেন৷ —জয়ন্ত, এবার তোমায়-আমায় কিছুক্ষণের জন্যে ছাড়াছাড়ি হবে৷

অবাক হয়ে বললুম, —তার মানে?

—তুমি কালকের চেনা পথ ধরে চুড়োয় উঠবে৷ আমি উত্তরদিকটা ঘুরে উঠতে চাই৷ কোনও ভয় নেই বৎস৷ সূর্যের আলো থাকতে ভূতরা আক্রমণ করবে না৷ নেহাত যদি করে বসে, আশা করি আত্মরক্ষা করতে পারবে৷ ওক্কে?

—কিন্তু ব্যাপারটা কী?

—কিচ্ছু না৷ জাস্ট এ গেম—চিলড্রেনস গেম! দেখো জয়ন্ত, মাঝে-মাঝে শিশু হয়ে যাওয়ার মতো নির্মল আনন্দ আর কিছুতে নেই! ওতে বয়স কমে যায়৷ আচ্ছা, অ রিভোয়া!

অর্থাৎ আবার দেখা হবে, বিদায়৷ বুড়ো ধীরে-সুস্থে পাহাড়ের ঢালু গা বেয়ে উত্তর দিকে এগোলেন৷ আমি সেই চেনা জায়গাগুলো পেরিয়ে পাহাড়ের পুবগায়ে চড়া শুরু করলুম৷ ঝরনা ডাইনে রেখে বড়ো-বড়ো গাছগুলোর ভেতর দিয়ে একটু এগোতেই চোখে পড়ল, একটা পাথরের আড়ালে কী যেন নড়ে উঠল৷ অমনি গা শিরশির করে উঠল৷ হৃৎপিণ্ডে একটা অস্থিরতা জাগল৷ এ পাহাড়ের নাম ভূতের পাহাড় যখন, তখন নিশ্চয়ই কিছু অদ্ভুত ঘটনা লোকে এখানে ঘটতে দেখেছে৷ এখন কথা হচ্ছে, পাথরের আড়ালে একটা কিছু নড়তে আমি দেখেছি৷ কী হতে পারে সেটা? জন্তুজানোয়ার নয় তো? সূর্য পাহাড়ের ওপাশে নেমে গেছে৷ এপাশটা তাই ইতিমধ্যে বেশ ছায়া-ছায়া হয়ে পড়েছে৷ তাতে ঘন গাছপালা থাকায় দৃষ্টি বাধা পাচ্ছে এবং গাছের তলায় আবছা অন্ধকারও জমে রয়েছে৷ থমকে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করলুম৷ মিনিটখানেক পরে বুঝলুম, পাথরের ওপাশে একটা জ্যান্ত কিছু অবশ্যই আছে এবং সেটা আবার নড়ল৷

এক মুহূর্ত ইতস্তত করে পকেট থেকে বিপদ-আপদের সঙ্গী রিভলভারটা বের করলুম৷ গুলি পোরা ছিল না৷ সুতরাং অস্ত্রটা আঘাত হানার জন্য তৈরি করে নিতে বেশ সময় লাগল৷ অবশ্য, অটোমেটিক রিভলভার৷ পরপর পাঁচবার গুলি ছোঁড়া যায়৷ দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার পক্ষ থেকে সে-বার এক দুর্দান্ত আন্তর্জাতিক স্মাগলিং চক্র ধরে দেওয়ার পুরস্কারস্বরূপ সরকার আমাকে এই অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছিলেন৷

এবার পা টিপে-টিপে এগোলুম সেদিকে৷ জায়গায়-জায়গায় পাথর থাকায় বাধা পাচ্ছিলুম৷ তবে ঢালু বলে উঠতে অসুবিধে হচ্ছিল না৷ হাত দশেক ডাইনে ঘুরে এবার পাথরটার সোজাসুজি পৌঁছলুম৷ পরক্ষণে অবাক হয়ে গেলুম৷ জয়ন্তী!! এ যে জয়ন্তী!!

এত অবাক যে অন্তত এক মিনিট হাঁ করে তাকিয়ে রইলুম ওর দিকে৷ কিন্তু ওকী করছে সে? হেঁট হয়ে একটা কিছু করছে—তার ফলে ওর শরীরটা ঝাঁকুনি খাচ্ছে৷ হ্যাঁ, এই নাড়াচাড়াটাই আমার চোখে পড়েছিল বটে৷

পা টিপে-টিপে এগিয়ে গিয়ে দেখি, সে একরাশ নুড়িপাথর নিয়ে যেন খেলা করছে৷ এই পাহাড়ের খাঁজ মতো জায়গায় ওইরকম অজস্র নুড়ি-পাথর জমে থাকতে দেখেছি৷ সম্ভবত বৃষ্টির সময় যখন পাহাড়ের গা বেয়ে জল গড়ায়, তখন মাটি ধুয়ে যাওয়ার ফলে ছোটো-ছোটো পাথরের টুকরো নেমে এসে খাঁজগুলোতে আটকে থাকে৷ যুগ-যুগ ধরে এইরকমটি ঘটে এসেছে এবং বৃষ্টিধারা ও বাতাসের আঘাতে পাথরগুলো মসৃণ হয়ে উঠেছে৷

কিন্তু এই জনমানুষহীন ভূতুড়ে পাহাড়ে একা জয়ন্তী কি ওই ছেলেখেলা করতেই এসেছে? বিশেষ করে প্রেতশক্তিতে তার বদ্ধমূল বিশ্বাস আছে—তা ছাড়া তার একমাত্র অন্তরঙ্গ বন্ধু ও সাথী এই দূর প্রবাসে ওইভাবে ভয়ংকর মৃত্যু বরণ করেছে, এত কাণ্ডের পরও কী সাহসে সে এখানে একা এল?

ওকে চমকে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না৷ তাই জুতোয় সামান্য শব্দ করলুম৷ কিন্তু সে এত তন্ময় যে তা টেরও পেল না৷ তখন একটু কেশে উঠলুম৷

এবার সে সাঁৎ করে ঘুরল এবং উঠে দাঁড়াল৷ পরক্ষণে তার মুখে অপ্রস্তুত হাসি ফুটে উঠল৷ সে হাত দুটো ঝাড়তে-ঝাড়তে বলল—বাব্বা! আমি ভাবলুম বুঝি অধ্যাপক দ্বিবেদী!

এ কথায় আরও অবাক হয়ে বললুম—ওঁর বদলে শ্রীমান জয়ন্ত চৌধুরী! কিন্তু হঠাৎ ওই নিরীহ ভদ্রলোকের কথাই বা ভাবলেন কেন বলুন তো?

জয়ন্তীকে নার্ভাস দেখাচ্ছিল৷ বলল—আমি আসার একটু আগে দূর থেকে ওঁকে উঠতে দেখেছিলুম৷ আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি?

—না তো!

জয়ন্তী পা বাড়িয়ে বলল—চলুন, ওপরে যাই৷ আজও সূর্যাস্ত দেখা যাক৷

—চলুন৷

একটু পরেই জয়ন্তী অদ্ভুত কৌশলে আমাকে ছাড়িয়ে কত সহজে অনেকটা ওপরে ওঠে গেল৷ ওর পক্ষে এ অবশ্য স্বাভাবিক৷ পাহাড়ে চড়ায় ওর দক্ষতা আছে৷ ওপর থেকে সে ঘুরে ডাকল আমাকে৷ —তাড়াতাড়ি আসুন! সূর্য ডুবে যাবে যে!

চুড়োয় যখন উঠলুম, তখন যথারীতি হাঁপাচ্ছি৷ হাঁপ সামলানোর পর জয়ন্তীর কাছাকাছি এগিয়ে বসে পড়লুম৷ তারপর বললুম—ওখানে কী করছিলেন জয়ন্তী দেবী?

জয়ন্তী পশ্চিমে মুখ ফিরিয়ে বসে ছিল৷ একটু চমক লক্ষ্য করলুম ওর মুখে৷ কিন্তু নিস্পৃহ কণ্ঠস্বরে বলল, ওঠার পথে এমন সুন্দর নুড়িগুলো দেখলুম৷ অমনি বালিকাসুলভ খেয়াল জেগে উঠল৷

—তা হলে বলব, আপনি নিশ্চয়ই বাল্যজীবনটা গ্রামেই কাটিয়েছেন?

—ঠিক তাই৷ একেবারে অজ পাড়াগাঁয়ে৷ কিন্তু এ প্রশ্ন কেন?

—শহরের মেয়েদের বাল্যজীবনে ধুলোপাথর নিয়ে খেলা সম্ভব নয়, তাই!

—আপনি গোয়েন্দার উপযুক্ত শিষ্য জয়ন্তবাবু৷... বলে জয়ন্তী এবার হালকা ভঙ্গিতে হেসে উঠল৷

সিগারেট ধরিয়ে বললুম—তা হঠাৎ একা-একা বেরিয়ে পড়লেন যে! কর্নেল আসবাব সময় আপনার ঘরে গিয়ে খুঁজেছিলেন আপনাকে৷

—কর্নেল সায়েব এসেছেন নাকি? কোথায় তিনি?

—এই পাহাড়ের নীচে দু’জনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়েছে৷ তারপর তাঁর খবর এ পর্যন্ত পাইনি৷

হঠাৎ জয়ন্তী পশ্চিমে একটু ঝুঁকে নীচের দিকে তাকিয়ে রইল৷ তাবপর চাপা গলায় বলল, দেখুন তো জয়ন্তবাবু, ওই যে নীচের খাড়াই পাথরের মাথায় ছোট্ট চাতালে, ওই লোকটা কে?

ওর নির্দেশমতো ঝুঁকে দেখি, পাহাড়ের পশ্চিম ঢালে খাড়া দেওয়ালের নীচে অন্তত তিনশো ফুট দূরত্বে জয়সোয়ালজি দাঁড়িয়ে আছেন—একা৷ অবাক হয়ে বললুম—সর্বনাশ! ওখানে পৌঁছলেন কীভাবে ভদ্রলোক?

জয়ন্তী বলল, জানেন? ওখানেই মোহন পারেখকে কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল৷ আরও একটু ঝুঁকলে ব্যাপারটা টের পাবেন৷ কিন্তু সাবধান, মাথা ঘুরে যাওয়ার চান্স আছে৷

বাপস! সেই অতল খাদের শূন্যতার কোনও তুলনা হয় না! সত্যি মাথা ঘুরে যাওয়ার দশা হল৷ সামলে নিয়ে সরে এলুম৷ বললুম—ওই খাদে পারেখজিকে ফেলে দিয়েছিল তা আপনি কীভাবে জানলেন?

জয়ন্তী চোখ নামিয়ে একটু হাসল—গোয়েন্দা সায়েবের শিষ্য তা হলে আমার দিকে সবসময় কড়া নজর রেখেছেন, বলুন?

ওর ওই কটাক্ষ আর হাসিতে যৌবনের উগ্র ঝাঁজ ছিল৷ পলকে আড়ষ্ট হয়ে বললুম, ছিঃ, ছিঃ! কী যে বলেন! জাস্ট একটা কৌতূহল৷ কারণ আমিও জানি না, কোন খাদে পারেখজির বডি পাওয়া গেছে৷

জয়ন্তী হয়তো বিশ্বাস করল আমার কথা৷ বলল, —আজ সকালে যখন আপনি ঘুমোচ্ছিলেন, কর্নেলসায়েবের সঙ্গে আমি আপনার প্রক্সি দিয়ে বেড়িয়েছি, তা জানেন কি?

—তাই বলুন৷ আমি ভাবলুম...৷

জয়ন্তী চাপা দুষ্টুমি করে ব্যস্তভাবে বলল, —বলুন, বলুন৷ ভাবলেন যে আমিই পারেখজিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলুম!

ওর চোখে চোখ রেখে বললুম, —আপনি তা পারেন জয়ন্তী!

জয়ন্তীর চোখ দুটো জ্বলে উঠল৷ —পারি মানে?

প্রেমিকের আবেগ এসে গেল আমার কণ্ঠস্বরে৷ পারেন! যেমন—এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে আমাকেও কোন অতল খাদে ফেলে দিয়েছেন এবং আমি বক্তাক্ত হয়ে ধুঁকছি!

জয়ন্তী কথাটা বুঝল৷ কিন্তু অভিনয়টা ধরতে পারল না৷ তাই অমনি মুখটা লাল হয়ে উঠল৷ সে একটু ঘুরে গিয়ে বলল, আমার কি অত সাহস বা শক্তি আছে? সামান্য মেয়ে আমি৷

—আপনি অসামান্যা, জয়ন্তী৷ যত দেখছি আপনাকে, অবাক হচ্ছি৷

—কেন শুনি?

—কোনও কৈফিয়ত দিতে পারব না৷ তবে আমার এই অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ আমার বৃদ্ধ বন্ধুটির চোখ এড়ায়নি৷ আজ শ্রীমতী মালহোত্রার ঘরে উনি আমাদের কী বলে সম্ভাষণ করেছিলেন, মনে পড়ছে?

জয়ন্তী সুন্দর হেসে অস্ফুটস্বরে বলল, —জয়জয়ন্তী!

আমার সংকল্প ছিল যে সুযোগ পেলে হাতের চেটো নিতে কার্পণ্য করব না৷ বিশেষ করে এই নির্জন পাহাড়ের চূড়া, পশ্চিমে চমৎকার একটা অস্তবাগ, এবং এই যুবতী মেয়েটি মিলে আমার মধ্যে একটা হঠকারিতার উপদ্রবও সৃষ্টি করছিল৷ তাই খেলার ছলে ওর হাতের চেটো নিলুম, কী প্রতিক্রিয়া হবে জানতুম না, একটা রিস্ক নিতে হল বইকী—কিন্তু আশ্চর্য, জয়ন্তী চুপ করে থাকল৷ এবার ওকে চাপাস্বরে ডাকলুম—জয়ন্তী?

—উঁ?

—আপনি আমাকে গোয়েন্দার শিষ্যটিষ্য বলবেন না, প্লিজ৷

জয়ন্তী ঘুরে সুন্দর হাসল আবার৷ তবে কী বলব?

—মিতা৷

—কারণ?

—কারণ দু’জনের একই নাম৷

এই সময় সূর্য ডুবে যাচ্ছিল৷ সেই রাঙা আলোয় জয়ন্তীকে বড়ো সুন্দর দেখাল৷ আরও একটু হঠকারিতায় আমি তাকে মৃদু আকর্ষণ করলুম, জয়ন্তী বাধা দিল না৷ এবার ওর মুখের দিকে ঝুঁকে চুমু খাওয়ার জন্যে যেই মুখ নামিয়েছি, পিছনে কোথায় কর্নেলের কাশির শব্দ আর সম্ভাষণ শুনতে পেলুম৷—গুড ইভনিং জয়ন্ত, গুড ইভনিং জয়ন্তী!

দু’জনে ছিটকে দু-পাশে সরে গেলুম তক্ষুনি৷ জয়ন্তী আমার দিকে কপট ক্রোধে একটু কটাক্ষ করল৷ ঘুরে দেখি, উত্তরের ঝোপের ডগায় কর্নেলের টুপি দেখা যাচ্ছে৷ বাহাত্তুরে বুড়ো! মনে-মনে ওঁর মুন্ডুপাত করতে-করতে উনি এসে গেলেন৷

বেরোবার সময় শরীরের কোথায় বাইনোকুলার আর ক্যামেরা লুকিয়েছিলেন জানি না, এখন দেখি সুদৃশ্য ইভনিং স্যুটের ওপর বেখাপ্পা হয়ে ওই জিনিস দুটো ঝুলছে৷ বোঝা গেল, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানতে ছাড়ে না!

—যাকগে, জয়জয়ন্তী তা হলে পর্বতশীর্ষে! ব্র্যাভো! ওয়ান্ডারফুল!... বলে বুড়ো কাছের পাথরের চাতালে পা ঝুলিয়ে বসলেন৷

জয়ন্তী অপ্রস্তুত অবস্থায় ছিল৷ এবার বলল, —আপনি কি উত্তর দিক হয়ে উঠলেন?

—হ্যাঁ৷

—কিন্তু ওদিকটা যে ভীষণ খাড়া৷

—তাতে কী? ওঠার একটা গোপন পথ আমি আবিষ্কার করেছি৷ ওই পথে মোড় নিয়ে ওই নীচের খাদের চাতালে যাওয়া যায় —যেখানে এখন মিঃ রঘুবীর জয়সোয়াল রয়েছেন!

বলে কর্নেল বাইনোকুলারটা চোখে নিয়ে কিছুক্ষণ জয়সোয়ালকে দেখলেন৷

জয়ন্তী বলল, —আমরা অনেক আগেই দেখেছি ভদ্রলোককে৷ ওখানে কী করছেন উনি?

আমি বললুম, —রিটায়ার্ড পুলিশ সায়েব তদন্ত করতে গেছেন৷

কর্নেল হেসে উঠলেন৷ —তবে তদন্ত করতে আরও অনেকে এখন এই ভূতের পাহাড়ে চড়েছেন মনে হচ্ছে৷

জয়ন্তী চমকে উঠে বলল, —আর কে?

—মিসেস মালহোত্রা আর অধ্যাপক অরিন্দম দ্বিবেদী৷ ভদ্রমহিলা আছেন একেবারে খাদের তলায়৷ তাই খালি চোখে ওঁকে দেখা কঠিন৷ আর অধ্যাপক আছেন জয়সোয়ালজির অন্তত একশো ফুট নীচে একটা খোঁদলে৷

বললুম, —মিসেস মালহোত্রা খাদে কী করছেন? সর্বনাশ! অবসেসনের অবস্থায় ওখানে চলে যাননি তো?

জয়ন্তী বলল, —অধ্যাপকমশায়ই বা খোঁদলে কী করছেন?

কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, —মনে হচ্ছে, প্রত্যেকেই ব্যস্ত হয়ে খোঁজাখুঁজি করছেন যে পরপর এই দুটো হত্যাকাণ্ডের পিছনে সত্যি-সত্যি কী ব্যাপার আছে?

বললুম, —তার মানে, মিসেস মালহোত্রাও প্রেতের হাতে মৃত্যু সম্পর্কে নিঃসন্দিগ্ধ নন?

কর্নেল বললেন, —ছাড়া আর কিছু ব্যাখ্যা দিতে পারছিনে, জয়ন্ত৷ যাকগে, এখন সূর্যাস্তের প্রতি আমাদের দৃষ্টি ফেরানো উচিত নয় কি? দেখো তো, কত পবিত্র, কত মহান এক ঐশ্বরিক প্রকাশ ওই প্রাকৃতিক রূপ৷ বৎস জয়ন্ত, বৎসে জয়ন্তী, এখন আমরা কিছুক্ষণের জন্যে সবরকম পার্থিব কলুষতা ভুলে যাই এসো৷ ওই দিব্য আলোর মধ্যে জীবনের গভীর আনন্দ খুঁজে নিই৷...

বসে থাকতে-থাকতে শিগগির সন্ধ্যার অন্ধকার এসে গেল৷ ভারতের সমতলে আমরা সূর্যাস্তের পরও বেশ কিছুক্ষণ যে অপূর্ব শান্ত আলো দেখি অর্থাৎ যাকে বলা হয় গোধূলিকাল, এইসব উঁচু পাহাড়ি এলাকায় তার নামমাত্র নেই৷ খুব শিগগির রাত্রি এখানে হানা দেয়৷ তবে আমরা একটা পাহাড়ের মাথায় বসে আছি বলে নীচের দিকটা যখন ঘোর কালো ছায়ায় ঢেকে গেছে, এখানে তখন সামান্য আবছা ধরনের আলো ছিল৷ জয়ন্তী এবার বলে উঠল—নামতে অসুবিধে হতে পারে৷ এখন ফেরা যাক, কী বলেন কর্নেল?

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন হঠাৎ৷ তারপর বললেন—প্লিজ জয়ন্তী, আর একটুখানি তোমাদের আটকে রাখতে চাই৷ আমি ফেরা না অবধি তোমরা দু’জনে অপেক্ষা করো, এই আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ৷

বুড়োর কথা বলার ধরনই ওইরকম৷ বললুম—আবার কোথায় যাবেন?

—একটুখানি দরকার আছে৷ কোনও প্রশ্ন কোরো না, জয়ন্ত৷

জয়ন্তী বলল, —আপনি কি ওঁদের কারও সঙ্গে আলাপ করতে যাচ্ছেন?

কর্নেল একটু হেসে বললেন,— তুমি বুদ্ধিমতী জয়ন্তী৷ আমি জয়সোয়ালজির কাছেই যাচ্ছি৷ আর জয়ন্ত, তোমাকে আরেকটা কথা বলতে চাই৷ মন দিয়ে শোনো৷

—বলুন৷

—আমি চলে যাওয়ার পর প্লিজ, একটুখানি কান তৈরি রেখো৷ যদি আমার কোনও ডাক শোনো, তক্ষুনি চেঁচিয়ে সাড়া দেবে এবং শব্দ লক্ষ্য করে দৌড়ে যাবে৷ কেমন?

আমার গা শিউরে উঠল৷ ব্যাপার কী? কিন্তু জানি, খুঁটিয়ে কোনও জবাব এখন উনি দেবেন না৷ তাই বললুম—ঠিক আছে৷

—আশা করি তোমার দুটো কানই সম্পূর্ণ সুস্থ, জয়ন্ত?

—নিশ্চয়ই সুস্থ!

—তবু বলছি, অতিরিক্ত আত্মপ্রত্যয় মানুষকে অনেক সময় ঠকায়৷ তাই দরকার হলে ওই যুবতীটির কানের প্রতি নির্ভর করবে৷ জয়ন্তী, তুমি কী বলো?

জয়ন্তীও এই দায়িত্ব পেয়ে খুশি হল যেন৷ বলল, —দেখুন কর্নেল, পর্বতাভিযানে আমাদের কানই সবসময় বড়ো সহায়৷ সামান্য শব্দ থেকে আঁচ করতে হয়, কোথাও ধস নামতে যাচ্ছে কি না, কিংবা তুষারঝড় আসছে কি না!

কর্নেল খুব উৎসাহী হয়ে বললেন, —এক্সেলেন্ট! এটা আমি ভাবিইনি৷ ওকে বন্ধুগণ, অ রিভোয়া!

উনি যেপথে উঠে এসেছিলেন, অর্থাৎ উত্তরদিকে, ঝোপঝাড় ঠেলে দ্রুত অদৃশ্য হলেন! তারপর আমার অস্বস্তি হতে থাকল৷ কেন অতক্ষণ ধরে কান নিয়ে অত কথা বললেন কর্নেল? এখন মুশকিল হচ্ছে, এখানে প্রচণ্ড জোরে দক্ষিণের বাতাস বইছে৷ ক্রমশ বাতাসটা বেড়েও যাচ্ছে৷ এ অবস্থায় উত্তরের কোনও শব্দ শুনতে পাওয়া অসম্ভব নয় কি? কথাটা এতক্ষণে মাথায় এল৷ তা ছাড়া উনি গেলেন উত্তরের খাড়াইয়ে নীচের দিকে৷ ওখান থেকে কোনও চিৎকার শোনা যাবে কি না সন্দেহ আছে৷

কথাটা জয়ন্তীকে বলতে সে বলে উঠল, —তাই তো! চলুন, আমরা এগিয়ে উত্তরের খাড়াইয়ের মাথায় কোথাও বসি৷

দু’জনে এগিয়ে গেলুম৷ এই সময় টের পেলুম, বাতাসটা জোর বেড়ে গেছে৷ সোজা দাঁড়িয়ে থাকা যেমন কঠিন, পা বাড়ানোও তাই৷ তায় ঘন রিঙ্গেল ঝোপে ভর্তি জায়গাটা৷ ঝোপে ঢুকতে গিয়ে জয়ন্তী বলল, —কী কাণ্ড! আমরা নিশ্চয়ই কেউ টর্চ আনিনি?

অস্বস্তি বেড়ে গেল সঙ্গে-সঙ্গে৷ টর্চ আনার কথা মাথায় আসেনি! কিন্তু কর্নেলের কাছেও তো টর্চ আছে বলে মনে হল না৷ ঘাড় নেড়ে জবাব দিলুম—নাঃ!

অবশ্য ও বুড়োর কথা আলাদা৷ উনি এক অলৌকিক প্রাণী বলা চলে৷ এই সময় আরও মনে হল, এসব পাহাড়ে নাকি অজগর, শঙ্খচূড় আর চন্দ্রবোড়া সাপের খুব উৎপাত আছে৷ এ কী মুশকিলে ফেলে গেল বুড়ো৷ পাছে সাপের কথায় জয়ন্তী আঁতকে ওঠে, ওকে কিছু বললুম না৷

কিন্তু ওর সাহসের পরিচয় পেয়ে ততক্ষণে অবাক আমি৷ দিব্যি রিঙ্গেল ঝোপের ভিতরে ঢুকে গেল জয়ন্তী৷ তারপর ডাকল—চলে আসুন শিগগির৷

পুরুষমানুষের আঁতে লাগল নিশ্চয়ই৷ লম্বা পা ফেলে এগিয়ে ওকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলুম৷ তখন জয়ন্তী খপ করে আমার হাত ধরল৷—আস্তে মশাই, আস্তে৷ কখনও পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিং নিয়েছেন কি? আমাকে ফলো করুন তা হলে৷ নয়তো পড়ে গিয়ে ঘাড় ভাঙবেন৷

অন্ধকারে ওর চাপা খিলখিল হাসি শোনা যাচ্ছিল৷ প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি যে নারী, তা এমন করে কখনও টের পাইনি৷ ওকে মনে হচ্ছিল রহস্যময় এক শক্তি—যা আমাকে কোনও ভয়ংকর বিনাশ অথবা আনন্দময় এক পূর্ণতায় পৌঁছে দিতে চলেছে৷

অবশ্য এই আবেগ সামলে নিতে হচ্ছিল৷ কারণ, সময় ও পরিবেশ প্রেমের অনুকূল নয় এখন৷ একটু পরেই জয়ন্তী দাঁড়াল৷ বলল, এই পাথরটায় বসা যেতে পারে৷ কিন্তু সাবধান, সামনে ঝুঁকবেন না৷

অন্ধকারে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে টের পেলুম, একটা চ্যাটালো দশ বর্গফুট আন্দাজ পাথর ঝোপের শেষ প্রান্তে উঁচু হয়ে রয়েছে৷ জয়ন্তীর দৃষ্টিশক্তি যে বিস্ময়কর, তাতে আর সন্দেহ রইল না৷ আমার হাতটা ছেড়ে দেয়নি সে৷ টেনে বসিয়ে দিল পাশে৷ তারপর আমার দিকে ঘুরে কিছু বলতে চেষ্টা করল৷ সেই সময় ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের আশ্চর্য সুন্দর গন্ধ এসে লাগল—আমার সারা মুখে সেই বিচিত্র গন্ধটার ঝাপটানিতে একটা প্রচণ্ড তোলপাড় সৃষ্টি করল৷ এবার স্থানকাল ভুলে ঝটপট ওকে চুমু খেয়ে ফেললুম৷ জয়ন্তী আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল, যাঃ, এখন অসভ্যতা করে না!

বুঝতে পারছিলুম, অন্ধকারে ও কতখানি রাঙা হয়ে উঠেছে৷ আমি প্রেমিকের গলায় ডাকলুম—জয়া!

জয়ন্তী হাসল৷ —আমার ডাকনামটা কীভাবে জানতে পারলে, শুনি?

—গতকাল বিকেলে এখানে শ্যামলী ওই নামে তোমাকে ডেকেছিল৷

জয়ন্তী অমনি আমার মুখে হাত চাপা দিল৷ চুপ! এখন শ্যামলীর কথা বলো না৷

না—শ্যামলী মানেই এক বীভৎস মৃত্যু৷ এখন ওর স্মৃতি সহ্য করা যাবে না৷ এই বিচিত্র সময়টা বিস্বাদ হয়ে পড়বে৷ আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললুম—দেখো জয়া, তোমার হাতে আমার কান দুটোরও জিম্মা দিলুম৷ কারণ আমি এখন কিছুক্ষণ অন্য জগতে ঢুকে পড়তে চাই৷ তুমি কিন্তু শুনতে পেলেই আমাকে বলবে!

জয়ন্তী হয়তো হাসল৷ —উঁহু৷ আমি তো গোয়েন্দামশায়ের শিষ্য নই৷ সে দায় তোমার!

ঠিক সেই সময় বাতাসটা ঘুরে গেল এবং এলোমেলো বইতে থাকল৷ তারপরই আমার চোখ গেল পশ্চিমের আকাশে৷ ওদিকের কয়েক হাজার ফুট উঁচু পাহাড়গুলোর ওপর কিছু আগেও অনেক নক্ষত্র দেখেছি, এখন তাদের একটাও নেই এবং খুবই কালো মেঘের ব্যাপকতা ঘনিয়ে উঠেছে৷ তারপর আচমকা বিদ্যুৎ ঝিলিক দিতে দেখলুম৷ সর্বনাশ! কালকের মতো ঝড় উঠবে নির্ঘাত! জয়ন্তীও বলে উঠল—এই রে! কী হবে?

জয়ন্তীর কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে প্রচণ্ড গর্জন করে উঠল মেঘ৷ বাতাস একেবারে উলটোদিকে ঘুরল৷ দেখতে-দেখতে চারপাশের পাহাড় ও জঙ্গলে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল৷ মনে হল, লক্ষ-লক্ষ হাতি হঠাৎ খেপে গিয়ে দৌড়ে আসছে৷ আবার ভয়ংকর শব্দে মেঘ ডাকল৷ থরথর করে কাঁপতে থাকল এই পাহাড়টা৷ তারপরই এসে পড়ল ঝড়৷

সেই ভয়াবহ তাণ্ডবের বর্ণনা দেওয়ার সাধ্য আমার নেই৷ দু’জনে দু’জনকে শক্ত করে ধরে বসে আছি, তা না হলে ছিটকে পড়ব মনে হচ্ছে৷ জয়ন্তী ভয়ার্ত স্বরে বলল—জয়ন্ত, আমাদের এখনই এখান থেকে নেমে যাওয়া দরকার৷ বৃষ্টি শুরু হলেই কিন্তু ধস নামার সম্ভাবনা!

কর্নেলের জন্যে রাগ হল৷ বললুম—বুড়োর পাল্লায় পড়ে বেঘোবে প্রাণটা যাবে দেখছি৷ এখন কী করা যায়, বুঝতেও তো পারছিনে! ওঁকে বরং চেঁচিয়ে ডাকি, কী বলো?

জয়ন্তী বলল, —হ্যাঁ৷ তা ছাড়া কোনও উপায় নেই! সাড়া যদি পাও, বলে দাও, আমরা নেমে যাচ্ছি৷

ডাকবার জন্যে মুখের কাছে হাত তুলে চোঙ বানিয়েছি, অমনি সে এক অদ্ভুত আর অমানুষিক আওয়াজ শুনতে পেলুম৷ সঙ্গে-সঙ্গে শরীরের রক্ত হিম হয়ে পড়ল৷ জয়ন্তী রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল—ও কীসের আওয়াজ? কীসের আওয়াজ জয়ন্ত?

আঁ-উ-উ-উ! আঁ-উ-উ-উ! কতকটা সাইরেনের মতো—বিপদজ্ঞাপক কাঁপা-কাঁপা সুর, কিংবা কোনও গুহার ভেতর কোনও প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী যেন ওই দানবীয় ডাক ছাড়ছে৷

এদিকে মুহুর্মুহু বাজ পড়ার বিরাম নেই৷ দূরে একটা দাবানল দেখা গেল পাহাড়ের মাথায়৷ ঝড়ের ভয়ংকর শব্দে এই পাহাড়টা কেঁপে-কেঁপে উঠছে৷ মনে হচ্ছে, এই কুখ্যাত পাহাড়ের যুগযুগান্তকালের ভূতপ্রেতের দল যেন জেগে উঠেছে৷ তারা দল বেঁধে অমানুষিক কণ্ঠে চিৎকার করছে আঁ-উ-উ-উ! আঁ-উ-উ-উ!

আর এক মুহূর্তও এখানে নয়৷ বললুম—গোল্লায় যাক বুড়ো৷ জয়ন্তী, ওঠো—কুইক!

জয়ন্তী উঠে পড়ল৷ আমরা দু’জনে সামনে ঝুঁকে হাত ধরাধরি করে সেই ওঠার পথটা অনুমান করে এগিয়ে গেলুম৷ একখানে ঢালু পেতেই নামতে শুরু করলুম৷ মাঝে-মাঝে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছিল৷ পথ আন্দাজ করতে অসুবিধে হচ্ছিল না৷ পিছনে ভূতুড়ে আওয়াজটা সমানে শোনা যাচ্ছিল৷ এবার সেই উঁচু গাছের জঙ্গলের কাছাকাছি আসতেই জয়ন্তী হঠাৎ বলে উঠল—জয়ন্ত, এক মিনিট!

আমার হাত ছেড়ে দিয়ে সে যেন একটা লাফ দিল সামনে৷ তারপর তাকে অদৃশ্য হতে দেখলুম৷ অমনি আরও ভয় পেয়ে ডেকে উঠলুম—জয়া, জয়া!

বিদ্যুৎ ঝলক দিল৷ তখন দেখতে পেলুম, জয়ন্তী সেই নুড়িগুলোর কাছে হাঁটু দুমড়ে বসে রয়েছে৷ আমি আন্দাজে সেদিকে এগোতেই ওর সঙ্গে ধাক্কা লাগল৷ সে আমার হাত ধরে টানল—আর নয়৷ চলে এসো!

তারপর সে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় প্রায় দৌড়তে শুরু করল জঙ্গলটার মধ্যে৷ এখানে জমি কিছুটা সমতল৷ তারপর ঘাসে-ভরা ঢালু জমিটা পেরিয়ে একেবারে নীচে গিয়ে পৌঁছলুম আমরা৷ সেখান থেকে আবার এক দৌড়ে সোজা পাকা রাস্তায় ওঠা গেল৷

এবার জয়ন্তী দাঁড়াল৷ নীচে ঝড়ের প্রকোপ কিছু কম৷ একটা বড়ো প্রশ্বাস পড়ল দু’জনের৷ জয়ন্তী বলল, —সেই ভূতুড়ে আওয়াজটা আর কিন্তু শোনা যাচ্ছে না৷

কান পাতলুম—ঠিক তাই বটে৷ কিন্তু এবার বাতাসে কিছু ঠান্ডা ভাব টের পাওয়া যাচ্ছে৷ বৃষ্টি আসবে নির্ঘাত! বললুম, কর্নেলের জন্যে অপেক্ষা করে লাভ নেই, জয়া৷ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কুকুরের মতো ভেজার চেয়ে চলো আমরা হোটেলে ফিরে যাই৷

জয়ন্তী বলল, —কিন্তু কী ভাববেন উনি?

—যা খুশি ভাবুন! আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই৷

—যাব?

ওর হাত ধরে টানলুম৷—পাগল! কর্নেলকে তুমি চেনো না৷ উনি একাই একশো৷

অগত্যা জয়ন্তী পা বাড়াল৷ কিছুটা যাওয়ার পর সে বলল, —ওই বিকট আওয়াজ কীসের বলে মনে হল তোমার?

—সম্ভবত ওদিকের সামরিক ছাউনিতে সাইরেন বাজাচ্ছিল৷ ঝড়ের জন্যে হুঁশিয়ারি দিচ্ছিল৷

—ভ্যাট! সে ছাউনি কমপক্ষে সাত মাইল দূরে৷ আওয়াজটা কিন্তু ভূতের পাহাড়ের পশ্চিম গায়ে উঠছে মনে হল আমার৷

—বেশ, তুমিই বলো ও কীসের আওয়াজ?

—তুমি তো অলৌকিক শক্তিতে বিশ্বাস করো না৷ বলে কী হবে?

—বিশ্বাস করছি, অন্তত তোমার খাতিরে৷

জয়ন্তী আমার গালে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, —এই দুঃসময়ে অত প্রেমের বাতিক কেন তোমার? শোনো—এবার বুঝলুম, কেন ওটাকে সবাই ভূতের পাহাড় বলে৷

—হুঁ৷ ঝড়ের সময় সম্ভবত ওই আওয়াজ শোনা যায়, তাই৷ তো ইয়ে, জয়া—এবার বলো তো, ওই নুড়িগুলোর রহস্য কী? কেন ওখানে তুমি হঠাৎ ঝাঁপ দিলে?

জয়ন্তী একটু চুপ করে থাকার পর বলল, —বলব৷ চলো, আগে হোটেলে পৌঁছই ভালোয়-ভালোয়৷

—ভালোয়-ভালোয় কেন?

—সাবধানে চারিদিকে লক্ষ্য রেখে এগোচ্ছ তো? আমার ক্রমশ একটা অন্যরকম অস্বস্তি হচ্ছে৷

—ভয় নেই, আমার কাছে আত্মরক্ষার ভালো ব্যবস্থা আছে৷ এই দেখো৷

জয়ন্তীর একটা হাত আমার প্যান্টের পকেটে এগিয়ে দিলুম৷ অস্ত্রটা পরখ করে দেখে সে বলল—ব্যাপারটা তোমাকে বলা যেতে পারে৷ কর্নেল আমাকে অধ্যাপক দ্বিবেদীর দিকে নজর রাখতে বলেছিলেন৷ আজ বিকেলে সাড়ে তিনটে নাগাদ ওঁকে বেরোতে দেখে আমি পিছু নিলুম৷ দেখি, উনি ভূতের পাহাড়ের দিকে চলেছেন৷ আমি নীচের একটা বাঁকে গাছের আড়াল থেকে দেখলুম, পাহাড়ের গায়ে বড়ো গাছের জঙ্গলটার ভেতর থেকে বেরিয়ে উনি সেই খাঁজটার কাছে গেলেন৷ তখন আমিও পাহাড়ে চড়া শুরু করলুম৷ এসব পাহাড় আমার কাছে হাতের চেটোর মতো৷ দু-তিন মিনিটে জঙ্গলের শেষ দিকটায় গিয়ে উঁকি মেরে দেখি, অধ্যাপক নুড়িগুলো ঘাঁটছেন৷ একটু পরে উনি হাত ঝাড়তে-ঝাড়তে চলে এলেন৷ পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়লুম৷ দেখলুম, উনি ঝরনার দিকে চলে গেলেন—উত্তর দিকে৷ তখন আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর নুড়িগুলোর কাছে গেলুম৷ খাঁজের গর্তে একগাদা নুড়ি জমে রয়েছে৷ ব্যাপারটা বুঝতে পারলুম না৷ আমি ওগুলোর তলা অবধি সাফ করেছি, তুমি গিয়ে হাজির হলে৷ যাই হোক, ততক্ষণে রহস্যটা ধরা পড়েছে৷ অধ্যাপক একটা খাম লুকিয়ে রেখে গেলেন৷ তুমি এসে পড়ায় খামটা নেওয়া হল না৷

অভিমানী স্বরে বললুম, —তুমি তো অদ্ভুত জয়া৷ আমাকে অবিশ্বাস করলে! আশ্চর্য তো! আমি...৷

কথা আটকে গেল ক্ষোভে৷ জয়ন্তী আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, —বিশ্বাস করো, অত ভেবে কিছু করিনি! আমি এমন হতভম্ব হয়ে পড়েছিলুম যে কর্নেলকে জানানোর আগে কাউকে বলা উচিত হবে কি না ভেবে পাইনি৷ বেশ তো, এখন তো বললুম৷

—খামটা ফেরার পথে নিয়ে এলে তা হলে?

—হুঁউ৷

—কই, দেখি৷

—এখানে নয়, হোটেলে ফিরে দেখাব৷

—না, জাস্ট একবার ছুঁয়ে আঁচ করে দেখি না, কী আছে?

—একটা হালকা খাম৷ চিঠিফিটি আছে হয়তো৷

—জয়া, একবার প্লিজ ছুঁতে দাও! কই, কোথায় রেখেছ?

—ভ্যাট৷ কাতুকুতু লাগছে৷

—কোথায় রেখেছ, বলোই না বাবা!

—বুকে৷ মেয়েরা যেখানে গোপনীয় জিনিস রাখে!

জেদের বশে ওর ব্লাউজের ভেতর হাত ঢোকাতে যাচ্ছি, আচমকা পিছনে কর্নেলের গম্ভীর আওয়াজ এল—জয়ন্ত, অসভ্যতা করে না!

আচমকা ওই আওয়াজ শুনেই ছিটকে সরে দাঁড়িয়েছিলুম৷ কর্নেল এগিয়ে এসে বললেন, জয়ন্তী, শিগগির খামটা দাও! তুমি বড্ড অসাবধানী৷

জয়ন্তীও চমকে উঠেছিল— কর্নেল!

—হ্যাঁ, খামটা দাও৷ আর দেখো, বৃষ্টি আসছে৷ তিনজনেই এবার দৌড়তে শুরু করি৷

জয়ন্তী বুকের ভেতর থেকে বের করে জিনিসটা দিল৷ পকেটে পুরেই কর্নেল বললেন, কুইক মার্চ!

হ্যাঁ, ঝড়টা কমে এসেছে— কালকের মতো ভয়ংকর ঝড় আজ আর হল না, কিন্তু বৃষ্টির গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে৷ আমরা তিনজনে জোর কদমে হোটেলের দিকে এগিয়ে গেলুম৷

লাউঞ্জে ডঃ সীতানাথ পট্টনায়ক আর মিঃ খান্না বসেছিলেন৷ কর্নেলকে দেখে খান্না বললেন, কতক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছি আপনার৷

কর্নেল একটু হেসে বললেন, —তাই বুঝি! এক মিনিট—আমি এই কচি বন্ধু দুটিকে বিদায় দিয়ে এক্ষুনি আসছি৷

ঘরে এসে আমি ও জয়ন্তী ক্লান্তভাবে বসে পড়লুম৷ বাইরে তখন জোর বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ কর্নেল বললেন, —আবার আমি কিছুক্ষণের জন্যে বিদায় নিচ্ছি৷ অ রিভোয়া জয়জয়ন্তী, অ রিভোয়া৷ তোমাদের সময় আনন্দময় হোক৷

উনি বেরিয়ে গেলে জয়ন্তী আমার দিকে তাকাল৷ আমিও তাকালুম ওর দিকে৷ দু’জনেই খামটার কথা ভাবছি, তাতে কোনও ভুল নেই৷

একটু পরে দু’জনেরই একসঙ্গে ফোঁস করে দুটি দীর্ঘশ্বাস পড়ল৷ তারপর জয়ন্তী আমার বিছানায় গড়িয়ে পড়ে বলল, —কফি বলে দাও জয়ন্ত৷ বড্ড ক্লান্ত৷

ফোনটা তুলে রুম সার্ভিসের নম্বর ডায়াল করতে থাকলুম৷ বৃষ্টির সুন্দর শব্দে এখন বাণেশ্বরের রহস্যময় আরেকটি রাত মুখর হয়ে উঠেছে৷

গুহার মধ্যে একটি হাত

সে রাতে জয়ন্তী আর আমি ঘরে বসেই ডিনার খেলুম৷ তারপর দশটা বাজল, বারোটা বাজল—তখনও গোয়েন্দাপ্রবরের পাত্তা নেই৷ দু’জনে অবশ্য গল্পগাছা এবং একটু-আধটু ফস্টিনস্টি করে কাটাচ্ছিলুম৷ তবে জয়ন্তী আমাকে বেশিদূর এগোতে দেয়নি৷ যাই হোক, বারোটার পর হাই তুলে ঢুলুঢুলু চোখে এবং ঘুমজড়ানো গলায় ও বলেছিল, আমি বুড়োর বিছানায় শুয়ে পড়ছি৷ খবরদার, বিবক্ত করবে না কিন্তু৷ চেঁচামেচি করে হোটেল মাথায় করব বলে দিচ্ছি৷

—বেশ, করব না৷ কিন্তু কর্নেল ফিরলে কি তোমার ঘরে গিয়ে শুতে বলব?

—হুঁ৷ কারণ, গত রাতটা প্রাণের দায়ে একা কাটিয়েছি৷ আজ আর নয়, বাব্বা! আজ প্রাণভরে ঘুমুতে চাই৷

বলেই সে শুল তো সঙ্গে-সঙ্গে মড়া হয়ে পড়ল৷ আমারও ঘুম পাচ্ছিল৷ শুয়ে পড়েছিলুম৷ তারপর কখন কর্নেল ফিরেছেন, ঘড়ি দেখিনি, প্রায় ঘুমের ঘোরে দরজা খুলে দিয়েছি এবং তক্ষুনি টলতে-টলতে ফের বিছানায় গড়িয়ে পড়েছি৷ কর্নেল, আমার অনুমান, জয়ন্তীর ব্যাগ হাতড়ে ওর ঘরের চাবি নিয়ে বেরিয়ে গেছেন এবং বাইরে থেকে আমাদের ঘরটা লক করে দিয়েছেন৷

সকালে জয়ন্তী আমাকে ওঠাল, তখন সাতটা৷ জীবনে এত সকালে ওঠার অভ্যাস নেই৷ ওকে তেড়ে ধমক দিলুম৷ কিন্তু ও আমাকে কাতুকুতু দিতে থাকল৷ সেই সঙ্গে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ইস! কী চান্স না গেছে তোমার!

ক্ষিপ্ত মেজাজের দরুন কথাটা অসভ্যতা বলেই ধরে নিলুম এবং নিজের চরিত্রের বলিষ্ঠতা সম্পর্কে ওকে একটা কড়া বক্তৃতা শোনাতে হুড়মুড় করে উঠে বসলুম৷ বললুম, —দেখো জয়া, তুমি আমাকে চিনতে ভুল করছ! আমার মেয়েবন্ধুর সংখ্যা ছাত্রজীবন থেকে এ অবধি খুব কম নয়৷ কতবার একসঙ্গে বাইরে কাটিয়ে এসেছি দল বেঁধে৷ লিমিট রেখে কীভাবে অন্তরঙ্গতা বজায় রাখা উচিত—সে সেন্স আমার আছে৷

জয়ন্তী আমার মুখে হাত চেপে বলল, —চুপ! বেড-টি বলেছি৷ ওই শোনো, দরজায় নক করছে৷ কিন্তু হায়, ওই অমৃত আপাতত বরাতে নেই! কারণ, দেখে এসেছি দরজা বাইরে থেকে লক করা৷ কর্নেল ছাড়া এ কাজ আর কার সাহস হবে?

কিন্তু কী আশ্চর্য, দরজা খুলে গেল এবং বেড-টির ট্রে নিয়ে হাসিমুখে ছোকরা বেয়ারাটি ঢুকে বলল, —সেলাম সাব, সেলাম মেমসাব!

জয়ন্তী ভুরু কুঁচকে বলল, —দরজা লক করা ছিল না?

—জি না মেমসাব৷

—সে কী! এই একটু আগে আমি দেখলুম, দরজা লকড৷

আমি বললুম, —করিডোরে কাকেও দেখলে এইমাত্র?

—জি হাঁ৷ কর্নেল সাহাব নেমে গেলেন৷

আমরা পরস্পর তাকাতাকি করে একটু হাসলুম৷ বেয়ারা ট্রে-টা রেখে চলে গেল৷ চায়ের কাপ তুলে নিয়ে জয়ন্তী বলল, —আমি কিন্তু আজকাল বাসিমুখে বেড-টি খাইনে৷ খাওয়া উচিত নয়৷ অস্বাস্থ্যকর৷ তবে একসময় খেতুম, ভারি ভালো লাগত৷ তুলনা হয় না!

চায়ে চুমুক দিয়ে বললুম, —হ্যাঁ, তুলনা হয় না বটে৷ তাই স্বাস্থ্য মানি না৷ আমি তো এভারেস্টের চুড়োয় ওঠবার অ্যামবিশান নিয়ে জন্মাইনি৷

জয়ন্তী চোখে ও ঠোঁটে ঝিলিক তুলে বলল, —বাসিমুখে আর কী খেতে ভালো লাগে বলো তো?

—সিগারেট৷

—ভ্যাট! বলতে পারলে না৷

—চুমু?

জয়ন্তী হাসতে-হাসতে অন্যদিকে মুখ ঘোরাল৷ শুধু বলল, যাঃ!

—তোমার এক্সপিরিয়েন্স থেকে বলছ নিশ্চয়ই?

—না বাবা, না৷ ও কথা মোটেও নয়৷ আমি বলতে চাইছিলুম, বাসিমুখে কখনও পেস্ট খেয়ে দেখেছ? ছেলেবেলায় আমি খেতুম৷

—এই রামোঃ! পেস্ট খেতে? ছ্যা, ছ্যা!

জয়ন্তী হাসতে-হাসতে আমার হাঁটুতে খানিকটা চা ফেলে দিল৷

বাথরুমে প্রাতঃকৃত্য ইত্যাদি সেরে নিতে আমার ঘণ্টাখানেক লেগেছে৷ বেরিয়ে দেখি, জয়ন্তীর বদলে আমার বন্ধুবর বসে রয়েছেন৷ স্বভাবমতো বাও করে বললেন—সুপ্রভাত জয়ন্ত ডার্লিং! আশা করি, আজও সুনিদ্রার কোনও ব্যাঘাত ঘটেনি?

গম্ভীর হয়ে বললুম, —ঘটবার চান্স ছিল৷ তবু ঘটতে দিইনি৷

—তুমি কি আমার ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছ জয়ন্ত?

—বিলক্ষণ৷ আপনার কি এতটুকু বৈষয়িক বুদ্ধি-সুদ্ধি নেই যে জয়ন্তীকে এ-ঘরে রেখে চলে গেলেন! ওকে জাগিয়ে নিজের ঘরে পাঠানো উচিত ছিল না কি? এবং তার ওপর দরজা লক করে গেলেন! ভেতরে যে একজন শক্তসমর্থ যুবক আর একজন স্বাস্থ্যবতী যুবতী রয়ে গেল—তারা সদ্যপরিচিত এবং সম্পূর্ণ অনাত্মীয়, তাও খেয়াল করলেন না?

কর্নেল অপ্রতিভ মুখে বললেন, —তুমি ঠিকই বলেছ, জয়ন্ত৷ ঘাট মানছি৷ এখন এসো, ঝটপট ব্রেকফাস্ট সেরে নিই৷ অর্ডার দেওয়া হয়ে গেছে৷ জয়ন্তীও আসছে৷ তারপর তোমাদের সামনে একটা চমৎকার দলিল পেশ করব৷ আজ সারাদিন তোমাদের নিয়ে কাটাতে কোনও অসুবিধে নেই৷

চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে বললুম, —দলিল? মানে, সেই খামটা তো?

—খামটা পরে৷ এ দলিল আমার তৈরি৷

জয়ন্তী এসে গেল৷ হালকা নীল শাড়ি, হাতকাটা ব্লাউজের দু-ধারে ঝুলছে দুটি সরল আর নগ্ন বাহু জোরালো নিয়নবাতির মতো উজ্জ্বল৷ তার বুকের এই উদ্দীপ্ত প্রগলভতা এর আগে লক্ষ্য করিনি৷ মনে হল, দুরধিগম্য পাহাড়ের বিপদসঙ্কুল চূড়া জয়ের চেয়ে সম্ভবত পুরুষ-মানুষকে জয়ের গর্ব আনন্দ আর তৃপ্তি আজও মেয়েদের অনেক-অনেক বেশি৷ এবং এ সবের চাপে মেয়েরা যেন একটু স্বার্থপরও হয়ে ওঠে৷ অন্তত শ্যামলীর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে জয়ন্তীর আচরণের চুলচেরা বিচার করলে এই স্বার্থপরতাটাই টের পাওয়া যায়৷ সত্যি, মেয়েদের রহস্যময়তার কোনও তুলনা নেই৷

জয়ন্তীর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে কর্নেল বললেন, —ইয়ে, জয়ন্ত, জয়ন্তীর মধ্যে এবেলা আমরা নতুন কিছু নিশ্চয়ই প্রত্যক্ষ করছি৷ তবে দেখো, মানুষের যা কিছু সৌন্দর্য—চেতনা, তা আজও প্রকৃতির নিয়মের বাইরে নয়৷

বক্তৃতা থামিয়ে দিল ব্রেকফাস্টের ট্রে৷ আমরা নিঃশব্দে খেতে বসলুম৷ খাওয়ার পর কর্নেল বললেন—ততক্ষণ তোমরা এই কাগজগুলো পড়ে ফেলো৷ আমি একবার লাউঞ্জে যাই৷ ডঃ পট্টনায়ক এসে পড়বেন৷ ওঁকে নিয়েই ফিরব৷

পকেট থেকে কয়েক শিট ভাঁজ-করা কাগজ হাতে গুঁজে দিয়ে কর্নেল বেরিয়ে গেলেন৷ আমি আর জয়ন্তী পাশাপাশি বসে তা পড়া শুরু করলুম৷

হাতের লেখা কর্নেলেরই৷...

(১) শ্রীমতী সরোজিনী মালহোত্রা: ৭ জুন অর্থাৎ শ্যামলীর মৃত্যুর দিন সকাল আটটায় গ্রিনভিউ হোটেলে মোহন পারেখের সঙ্গে দেখা করেন৷ একঘণ্টা ছিলেন পারেখের ঘরে৷ হিস্টিরিয়ার রুগি৷ সরযূ, লছমন আর বদ্রীর বর্ণনা অনুসারে দু-বছর আগের জুনে স্বামীর জিপ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর থেকে এই রোগ হয়েছে৷ ডঃ পট্টনায়কের মতেও, রোগটা অভিনয় নয়৷ ভদ্রমহিলার নার্ভের অবস্থা চরমের দিকে এগোচ্ছে৷ এখন থেকে চিকিৎসা করা দরকার৷ নয়তো ভবিষ্যতে উন্মাদ রোগের সম্ভাবনা আছে৷ মাঝে-মাঝে অদ্ভুত কাণ্ড করেন৷ ৮ জুন সকালে তার কিছু নমুনা আমরা পেয়েছি৷ ফিটের সময় বিড়বিড় করে একটা নাম উচ্চারণ কবেন৷ মহাবীর সিং৷ জ্ঞান হওয়ার পর প্রশ্ন করলে বলেন—ও নামে কাকেও চিনি না! সরযূ, লছমন, বদ্রীও চেনে না৷ প্ল্যানচেটের আসর গত বছর প্রথম এক রাত্রে বসিয়েছিলেন৷ অধ্যাপক দ্বিবেদী, জয়সোয়াল বা মোহন পারেখ কেউ ছিলেন না সে আসরে৷ যাঁরা ছিলেন, তাঁরা এবার বাণেশ্বরে আসেননি৷ তবে সে-আসর ব্যর্থ হয়েছিল৷ আত্মা আসেনি৷ মিডিয়ামটি নাকি খুবই ভীতু প্রকৃতির ছিলেন, তাই আসেনি—এ হল শ্রীমতী মালহোত্রার মত৷

(২) শ্রী হরিহরপ্রসাদ মালহোত্রা: সরোজিনীর স্বামী৷ বড়ো ব্যবসায়ী ছিলেন৷ কিন্তু এক অতর্কিত লোকসানের ধাক্কায় ক্রমশ ব্যবসা ভাঁটার দিকে যায়৷ আর সামলাতে পারেননি৷ একদিন নৈনিতাল থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে জিপ দুর্ঘটনায় মারা পড়েন৷ জিপটা খাদে গড়িয়ে পড়ে৷ সঙ্গে কেউ ছিল না৷ একা নিজেই ড্রাইভ করছিলেন নাকি৷ অন্তত তাঁর স্ত্রীর এই বর্ণনা৷ মন্তব্য: তথ্য খুব সামান্য৷ রাস্তা ও বেতার যোগাযোগ চালু হলে বিস্তারিত তথ্য নৈনিতাল পুলিশের পক্ষে জানা সম্ভব হত৷ শ্রীমতী মালহোত্রাও অনেক কথা সম্ভবত গোপন করছেন৷

(৩) শ্রী মোহন পারেখ: বোম্বের প্রখ্যাত ফিল্ম গায়ক৷ মালহোত্রার বন্ধুর ছেলে৷ ছেলেবেলা থেকে ওঁদের সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ ছিল৷ মালহোত্রার মৃত্যুর দিন সে ঘটনাচক্রে নৈনিতাল যায়৷ পথে জিপ দুর্ঘটনা ঘটতে দেখে এবং দুঃসংবাদ তাঁর মুখেই শ্রীমতী মালহোত্রা পান৷ হোটেলে তার ঘরে একটি টেলিগ্রাম পাওয়া গেছে৷ শ্রীমতী মালহোত্রা তাকে অবিলম্বে বাণেশ্বরে আসতে বলেছেন৷ টেলিগ্রামের ডেসপ্যাচ তারিখ তেসরা জুন৷ পারেখ পৌঁছোয় ৬ জুন রাত্রে৷ ৭ জুন দুপুরে সে বেরিয়ে যায়৷ আর ফেরেনি৷ ভূতের পাহাড়ের পশ্চিম খাদে তার লাশ আবিষ্কৃত হয় ৮ জুন ভোর ৬টায়৷ মন্তব্য: হঠাৎ তাকে শ্রীমতী মালহোত্রার টেলি করার কারণ কী? উনি তেমন কোনও কৈফিয়ত দিচ্ছেন না৷ বলছেন, ওকে দেখতে ইচ্ছে করছিল৷ বিশ্বাস হয় না৷

(৪) শ্রীমতী শ্যামলী সেন : ৭ জুন সকালে মোহন পারেখের সঙ্গে লাউঞ্জে আলাপ৷ শ্যামলী ওর খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে৷ জয়ন্তী বিরক্ত হয়েছিল৷ পারেখের ঘরেও গিয়েছিল শ্যামলী৷ জয়ন্তী এতে রাগ করে ওপরে চলে আসে৷ একটু পরেই শ্যামলী ফেরে৷ অভ্যাসমতো জয়ন্তীর ঘুম এসেছিল৷ ঘুমজড়ানো চোখে দেখে, শ্যামলী বিছানা ঠিকঠাক করছে৷ (ব্যাপারটা সিগনিফিকান্ট) তারপর শুয়ে পড়ে সে৷ জয়ন্তী ঘুম ভাঙে আড়াইটে নাগাদ৷ তখন দেখে, শ্যামলী বিছানায় নেই৷ সে ভাবে, পারেখের ঘরে গেছে৷ আধঘণ্টা পরে শ্যামলী আসে৷ অপ্রকৃতিস্থ চেহারা৷ জয়ন্তীর মনে সন্দেহ হয়, মোহন পারেখ ওকে বাগে পেয়ে নিশ্চয়ই একটা কিছু করেছে৷ জয়ন্তী প্রশ্ন করলে শ্যামলী জবাব দেয়, একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখে মন খারাপ হয়েছিল৷ তাই বাইরে লনে পায়চারি করছিল এতক্ষণ৷ স্বপ্নটার কথা আমরা ওইদিনই ভূতের পাহাড়ে শুনেছি৷ সাড়ে তিনটেয় দু’জন বেরোয়৷ শ্যামলী সারাক্ষণ অন্যমনস্ক ছিল৷ মন্তব্য: মিডিয়াম হওয়ার সময় পারেখের আত্মা ওর মুখ দিয়ে যা-যা বলেছিল—তা অবিকল এখানে নোট করা হল৷...

(‘আমি তাকে চিনতুম৷’ এই বাক্যটার তলায় লাল কালির দাগ৷ প্রশ্ন: কে কাকে চিনতে পেরেছিল?)

(৫) অধ্যাপক অরিন্দম দ্বিবেদী: ৩ জুন এসেছেন৷ ৭ জুন মোহন পারেখ চলে যাওয়ার পর নাকি মোহন পারেখের ঘরে ঢোকেন৷ বেয়ারাদের সাক্ষ্য৷ দুপুরে লাঞ্চের সময় হোটেলে ছিলেন না৷ বলছেন এক মাইল দূরে জলপ্রপাত দেখতে গিয়েছিলুম৷ ফেরেন বিকেল তিনটে নাগাদ৷ তারপর পোশাক বদলে বেরিয়ে যান৷ শ্রীমতী মালহোত্রার কথামতো চারটেয় পৌঁছন ওঁর বাড়ি৷ লনে চেয়ার পেতে অপেক্ষা করছিলেন ভদ্রমহিলা৷ ৮ জুন সকালে জয়ন্তীর ঘরে ঢুকেছিলেন৷ বলছেন, শ্যামলীর আত্মীয়স্বজনকে খবর পাঠানোর ব্যাপারে ‘বেচারা’ বাঙালি মেয়েটিকে সাহায্য করা যায় কি না জানতে গিয়েছিলেন৷ দরজা খোলা ছিল৷ ঢুকে দেখেন কেউ নেই, তখন কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে আসেন৷ অথচ জয়ন্তী বলছে, দরজা লক করা ছিল৷ ৯ জুন বিকেলে আমি ভূতের পাহাড়ে পশ্চিমের খাদের একটা ছোটো চাতালে ওঁকে আবিষ্কার করি৷ কী করছিলেন? জবাবে বলছেন—বেচারি পারেখ কীভাবে কোথায় পড়ে মারা গিয়েছিল, দেখার কৌতূহল ছিল৷ কিন্তু জয়ন্তী যে খামটা উদ্ধার করেছে, তা উনিই লুকিয়ে রেখেছিলেন ভূতের পাহাড়ের পূর্বদিকের খাঁজে৷ এ খাম কোথায় পেলেন? (খামে আছে একটি ছবির নেগেটিভ প্রিন্ট৷) খামের প্রশ্নে উনি আকাশ থেকে পড়লেন! জয়ন্তী ভুল দেখেছে৷ উনি নুড়ির ওখানে যানইনি৷ মন্তব্য: স্পষ্টই মিথ্যা বলছেন৷ কী উদ্দেশ্যে?

(৬) শ্রী রঘুবীর জয়সোয়াল : ৬ জুন এসেছেন৷ (বেশ সিগনিফিক্যান্ট) ৭ জুন বেরিয়ে যান দুপুর বারোটায়৷ ফেরেন একেবারে চারটে নাগাদ৷ সাড়ে চারটেয় যান মালহোত্রা ভবনে৷ মোহন পারেখের সঙ্গে পরিচয় নেই কস্মিনকালে৷ বেরিয়েছিলেন সামরিক ছাউনির উদ্দেশে৷ সেখানে এক মেজর তাঁর বন্ধু নাকি৷ ওখানেই খাওয়া-দাওয়া করেন৷ (এর সত্যতা যাচাই আপাতত রাস্তা চালু না হওয়া অবধি অসম্ভব) শ্রীমতী মালহোত্রার সঙ্গে পরিচয় এখানে আসার পরেই৷ ভূতপ্রেত ও ভগবানে আস্থা নেই৷ তাঁর মতে, হত্যাকারী শ্রীমতী মালহোত্রা ছাড়া আর কেউ নয়৷ উদ্দেশ্য? রাস্তা চালু হলে ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি পাব৷ জয়সোয়ালজির মতে, শ্রীমতী মালহোত্রার ওই হিস্টিরিয়া নিছক ভান৷ (জাঁদরেল পুলিশকর্তার পক্ষে এ-সব মতামত স্বাভাবিক) আজ পশ্চিমের খাদে গিয়েছিলেন সরেজমিনে তদন্তে৷ সেখান থেকে শ্রীমতী মালহোত্রাকে আবিষ্কার করেন নীচের খাদে৷ এর অর্থ—হত্যাকারীর সেই চিরন্তন মানসিকতা৷ হত্যাকাণ্ডের জায়গায় আবার যাওয়ার প্রচণ্ড কৌতূহল থাকে৷ না গিয়ে কিছুতেই পারে না৷ (শ্রীমতী মালহোত্রা কিন্তু স্বীকার করেছেন যে সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আজ খাদে গিয়েছিলেন৷ উদ্দেশ্য? কৌতূহল এবং শোক৷ বাছা পারেখের জন্যে দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলতে গিয়েছিলেন৷)...

এবার সাত নম্বর লোকটির নাম দেখে আমি আকাশ থেকে পড়তে-পড়তে চেঁচিয়ে উঠলুম—আরে, এ কী!

জয়ন্তীও চমকে উঠেছিল৷ পরক্ষণে সে ফিক করে হেসে উঠল৷ বলল, —সুপার এক্সেলেন্ট! হিপ হিপ হুররে! তারপর ঝুঁকে পড়ল কাগজটার দিকে৷

(৭) শ্রী জয়ন্ত চৌধুরী: ঘটনার সময় অর্থাৎ ৭ জুন রাত্রে প্ল্যানচেটের আসরে ঘর অন্ধকার হওয়ার পর সে চেয়ার ছেড়ে উঠেছিল কি? বলেছে, উঠিনি৷ অথচ আমার ধারণা, সে উঠেছিল এবং শ্যামলীর দিকে এগোচ্ছিল৷ আমার হাতে ওর খসখসে কোটের ছোঁওয়া লেগেছিল৷ খামচে ধরতে যাচ্ছি, নিঃশব্দে পাশ কাটিয়ে এল—কারণ টের পেয়েছিল যে আমি অন্ধকারেও সজাগ ও সতর্ক রয়েছি৷ (মন্তব্য: ওরকম খসখসে কোট কারও গায়ে ছিল না তখন৷)

জয়ন্তী অবাক চোখ তুলে বলল, —কী খুদে গোয়েন্দামশাই? ব্যাপারটা কী খুলে বলো তো?

আমি গুম হয়ে বললুম, —ভ্যাট! সব গুল৷

—কর্নেলের ভুল হবে, বলতে চাও?

—আলবাৎ হবে৷ উনি তো দেবতা নন!

জয়ন্তী একটু চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল—কে জানে! তোমাকে আমার বড্ড রহস্যময় লাগে!

—লাগা উচিত৷ প্রেমিক হিসেবে নিজেকে আমি খুব রহস্যময় মনে করি৷

—থাক৷ আত্মপ্রশংসায় কাজ নেই৷ তারপর কী লিখেছেন কর্নেল, দেখি৷ আমরা আবার কাগজে চোখ রাখলুম৷...

কিছু বাড়তি তথ্য: (১) প্ল্যানচেটের সময় অন্ধকারে জয়সোয়ালজির চেয়ার অন্তত এক মিনিট খালি ছিল৷ আমি হাত বাড়িয়ে এটা টের পেয়েছিলুম৷ সত্যিকার ভূত কি না দেখতে চেষ্টা করছিলেন নাকি? (২) ডাইনিং হলে কফি খাওয়ার সময় অর্থাৎ আসরের আগে অধ্যাপক দ্বিবেদী আর শ্যামলী পাশাপাশি বসেছিল৷ তখন ওরা চাপা গলায় কিছু আলোচনা করছিল৷ অধ্যাপকের উচ্চারিত একটা শব্দ কানে এসেছিল আমার—সাবধান! (৩) স্টাডিতে শ্যামলীর ঠিক পিছনের বুকশেলফটার তলায় খুবই সূক্ষ্ম কালো একটা চুলের মতো জিনিস পাওয়া গেছে৷ কতকটা বিষাক্ত পতঙ্গের হুলের মতো দেখতে৷ ডঃ পট্টনায়কের পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি৷ সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতির অভাব৷ (৪) শ্যামলীর মাথার পিছন দিকে বোলতার হুল ফোটানোর মতো একটা স্পট আছে৷ ওখানেই প্যাথোজেন প্রথম ঢোকে৷ (৫) ডঃ পট্টনায়ক বলছেন, প্যাথোজেনের সঙ্গে এক ধরনের অজ্ঞাত রাসায়নিক জিনিসও দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় পাওয়া গেছে৷ জিনিসটার অদ্ভুত ক্রিয়াশীলতায় প্যাথোজেনের কলোনি ফর্ম করার ক্ষমতা হাজার গুণ বেড়ে যায়৷...

আর পড়া হল না৷ কর্নেল এসে পড়লেন৷ এসেই কাগজগুলো ছোঁ মেরে প্রায় কেড়ে নিলেন—যথেষ্ট হয়েছে! আমরা এবার বেড়াতে বেরোব৷ ওঠো তোমরা৷ নীচে ডঃ পট্টনায়ক অপেক্ষা করছেন৷

উঠে দাঁড়িয়ে বেজারমুখে বললুম, —আমার নামে ওসব কী লিখেছেন, শুনি?

কর্নেল মুচকি হেসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, —এখন কোনও কথা নয়, ইয়ংম্যান৷ চলো, বেরিয়ে পড়া যাক৷

হোটেলের লনে গিয়ে দেখি, একটা জিপ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে৷ কর্নেল ইশারা করলে আমি আর জয়ন্তী লক্ষ্মী ছেলে-মেয়ের মতো পিছনের দিকে ঢুকে বসলুম৷ কর্নেল আর পট্টনায়ক বসলেন সামনে৷ ড্রাইভারের পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছিল, গাড়িটা পুলিশের৷

স্টার্ট দিয়ে টনকপুর রোডে পৌঁছলে জয়ন্তী আমার দিকে তাকাল৷ অর্থাৎ কোথায় যাওয়া হচ্ছে এভাবে? মাথা নাড়লুম—কে জানে! যমের বাড়ি যে নয়, তা নিশ্চিত৷ গত পরশু রাতের ভয়ংকর দুর্যোগে বাণেশ্বর যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে থাকে, তা হলে তার সব রাস্তারই গড় দূরত্ব নিশ্চয়ই কমে গেছে৷ টনকপুর রোডের কোথায় ধস নেমেছে জানি না, তবে জিপের গতি দেখে মনে হল খানিকটা দূরেই হবে৷

মাইলটাক রাস্তার আঁকিবুকি গোলকধাঁধায় ঘুরে একটা অন্তত হাজার পাঁচেক ফুট উঁচু পাহাড়ের গায়ে গাড়ি উঠল৷ তারপর ফের এক চুলের কাঁটার মতো বাঁকের কাছে গিয়ে থেমে গেল৷ ডাইনে খাড়া পাথরের দেওয়াল, বাঁয়ে অতল খাদ৷ তাকিয়ে গা শিরশির করে উঠল৷ কর্নেল বললেন—তা হলে নেমে পড়া যাক৷

সবাই নামলুম৷ জিপটা যেখানে ব্রেক কষেছিল, সেখানে বাঁয়ে খাদের ওপর রাস্তার কিনারা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা প্রকাণ্ড হলদু গাছ৷ কাজেই ছায়া ছিল৷ কর্নেল আমার ও জয়ন্তীর হাত ধরে সস্নেহে বললেন, —ডঃ পট্টনায়ক, চলে আসুন৷

বাঁকের ওপারে কয়েক গজ এগিয়ে থমকে দাঁড়ালুম সবাই৷ এই ভয়ংকর ধসের চেহারা কল্পনা করতে পারিনি৷ বনেদি এই হাইওয়েটা হঠাৎ কেউ যেন পাহাড়ের গা থেকে ধারালো কোনও অস্ত্রে চেঁছে সাফ করে ফেলেছে—ঠিক দাড়ি কামানোর মতো৷ ওপারে রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে অন্তত সিকি মাইল দূরে৷ নীচে বয়ে চলেছে একটা প্রবল জলস্রোত৷ উত্তর থেকে এসে ধসের খাদ ঘুরে একটা প্রকাণ্ড শাখাপথ তৈরি করে ফেলেছে সে৷ অজস্র গাছ উপড়ে পড়ে রয়েছে ইতস্তত৷

ধ্বংসের এই দৃশ্য বিস্ময় এনেছিল প্রত্যেকের চোখে৷ একটু পরে ঠাহর হল, মানুষ তাই বলে ভড়কে যাওয়ার তো প্রাণী নয়৷ ওপারে অসংখ্য লোক রাস্তাটা আবার গড়ে তুলতে চেষ্টা করছে৷ পোশাক দেখে বোঝা গেল, ওরা সামরিক বাহিনীর লোক৷ অনেকগুলো এক্সক্যাভেটার, ডোজার, ক্রেনও দেখতে পেলুম৷ এতদূর থেকে নীচে সবকিছু পোকার নড়াচড়া বলে ভুল হতে পারে৷

কিন্তু এইসব দেখাতেই কি নিয়ে এলেন কর্নেল? ওঁর দিকে তাকালুম৷ একটু হাসলেন৷—দেখলে তো জয়ন্ত? অন্তত পনেরো দিনের আগে এখান থেকে বেরোনো যাবে না৷ তবে যদি অন্য ব্যবস্থা হয়ে যায় ইতিমধ্যে, তো মঙ্গল৷

আমি কোনও জবাব দিলুম না৷ জয়ন্তী শিউরে উঠে বলল, —সর্বনাশ! তা হলে কী হবে!

কর্নেল জবাব দিলেন, —খুব সম্ভব হেলিকপ্টার নামবার জায়গা আজই করে ফেলবেন বাণেশ্বর কর্তৃপক্ষ৷ গতকাল থেকে মিলিটারি হেলিকপ্টার খুব ঘোরাঘুরি করছে, নামতে পারছে না৷ বাণেশ্বর ইস্টের এয়ারস্ট্রিপটা সারদা নদী পুরো খেয়ে ফেলেছে৷ ওখানেই একটা পাহাড়ের মাথায় গাছপালা সাফ করা হচ্ছে৷ যাক গে, এবার আমরা নির্দিষ্ট জায়গায় যাব৷ ডঃ পট্টনায়ক, আপনিও তো পথ চেনেন—আপনিই লিড নিন৷

পথ! এখানে পথ কোথায়? চারদিকে খুঁজছি দেখে ডঃ পট্টনায়ক বললেন, —চলে আসুন জয়ন্তবাবু!

খাদের দিকে রাস্তার কিনারায় একটা সাত-আট ফুট উঁচু পাথর রয়েছে৷ ডঃ পট্টনায়ক পাথরটার কাছে গিয়ে হঠাৎ এক লাফ দিলেন৷ তারপর উনি অদৃশ্য৷ আমি হতবুদ্ধি হয়ে ইতস্তত করছি দেখে কর্নেল পিছন থেকে ঠেলে দিলেন৷ প্রথমে ভড়কে গিয়েছিলুম৷ কিন্তু পড়ে গিয়ে দেখি একটা মোটামুটি চওড়া জায়গায় দাঁড়িয়ে গেছি৷ ফুট চারেক নীচে এটা একটা চাতাল৷ তারপর পাথরের চাঁই ধাপে-ধাপে নেমে গেছে গভীর খাদটার দিকে৷ লাফিয়ে-লাফিয়ে নামা শুরু হল৷ আন্দাজ একশো ফুট নামার পর দেখি ডঃ পট্টনায়ক একটা গুহার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন৷

আমার পরে নামল জয়ন্তী, তারপর কর্নেল৷ ডঃ পট্টনায়ক পকেট থেকে একটা টর্চ বের করে বললেন, —সাবধানে আমাকে অনুসরণ করুন সবাই৷

গুহার দরজাটা ফুট পাঁচেক উঁচু, চওড়ায় ফুট তিন-সাড়ে তিন হবে৷ অস্বস্তি হল একটু৷ ঘুরে কর্নেলের দিকে তাকালুম৷ কর্নেল এগিয়ে যেতে ইশারা করলেন৷ ডঃ পট্টনায়ক ভেতর থেকে ডাকছিলেন, কই, চলে আসুন আপনারা৷

এই সময় লক্ষ্য করলুম, গুহার দরজার কালো স্লেটপাথরে অজস্র নাম সই করা রয়েছে৷ সব দ্রষ্টব্য পুরোনো জায়গায় এমন কাণ্ড চোখে পড়ে৷ যারা বেড়াতে যায়, তারাই নাম লিখে রেখে আসে৷ কাজেই, এই গুহাটা অনাবিষ্কৃত রহস্যময় কোনও গুহা নয়৷ তবে দু-ধারে ঝোপঝাড় গাছপালা কিছু ছিল, ঝড়ে-বৃষ্টিতে ধস নেমে সেগুলো সাফ হয়ে গেছে৷ মাটি বলতে যা কিছু ছিল, সেদিন রাতে প্রকৃতি সব ধুয়ে-মুছে ফেলেছেন৷ কাজেই মাটির সন্তান ওই উদ্ভিদও মাটির অনুগামী হতে বাধ্য হয়েছে৷

আঁশটে গন্ধ সব গুহাতেই পাওয়া যায়৷ নাকে রুমাল দিয়ে এগোলুম৷ মাথা নিচু করে যেতে হচ্ছিল৷ ভেতরটা প্রচণ্ড অন্ধকার৷ দম আটকে আসছিল৷ আন্দাজ পনেরো থেকে কুড়ি ফুট যাওয়ার পর ডঃ পট্টনায়ক বললেন—বাঁয়ে ঘুরতে হবে৷

মোড় নিতেই মনে হল এবার একটা চওড়া জায়গায় এসে পড়েছি৷ ডঃ পট্টনায়ক চারদিকে আলো ফেলছিলেন৷ ঠিক তাই৷ ছাদটা অন্তত ফুট নয়েক ওপরে—ভেতরটা কমপক্ষে পনেরো ফুট চওড়া৷ টুকরো কাগজ, বাদামের খোসা, চকোলেটের প্যাকেট, আর একটা ছেঁড়াখোড়া কম্বলও পড়ে থাকতে দেখলুম টর্চের আলোয়৷ এবার কর্নেল বললেন, —জয়ন্তী, তা হলে এবার খুঁজে দেখা যেতে পারে৷

জয়ন্তী বলল, —ডঃ পট্টনায়ক, টর্চটা দিন, প্লিজ!

আমি জয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে আছি তো আছি! টর্চটা ঝলসে উঠছে বারবার, আর ওর মুখেচোখে একটা তীব্রতা লক্ষ্য করছি৷ আর ক্ষোভে অভিমানে মনে জ্বালা ধরে যাচ্ছে! আশ্চর্য, জয়ন্তী আমাকে কত কথা লুকিয়েছে তা হলে! এই গুহার ব্যাপারটা তো বলেনি আমাকে— বলেছে, ওই ধুরন্ধর বুড়োটাকে! ঠিক আছে—এত গোপনীয়তা যখন আমার সঙ্গে, তখন আর ভাব করে কাজ নেই৷ আড়ি, তোমার সঙ্গে আড়ি, জয়ন্তী! মনে-মনে ওকে একশো আড়ি দিলুম৷

এ সময় আমার কাঁধে কর্নেলের হাত পড়ল৷ —কী জয়ন্ত! খুব বোকা বানিয়ে ফেলেছি কি? প্লিজ, ডার্লিং, একটু ধৈর্য ধরো৷

জয়ন্তী হাঁটু দুমড়ে কাগজের টুকরোগুলো কুড়োচ্ছিল৷ অস্ফুটম্বরে বলল—আর কি পাব খুঁজে? ৬ তারিখ দুপুরের ব্যাপার, আজ ৯ তারিখ! তিন দিন!

বলতে-বলতে হঠাৎ সে কোণের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ উত্তেজিত স্বরে বলল ফের, পেয়ে গেছি! এই যে! তারপর দলাপাকানো একটুকরো কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে কর্নেলের দিকে হাত বাড়াল৷

কর্নেল সেটা নিয়ে পকেটে পুরলেন৷ তারপর অকারণ চেঁচিয়ে বললেন—তা হলে ফেরা যাক৷ ডঃ পট্টনায়ক, আপনি আগে—তারপর জয়ন্ত, তার পিছনে জয়ন্তী, শেষে আমি৷

কিন্তু চওড়া জায়গা থেকে সরু সুড়ঙ্গে পৌঁছে দেখি, আমি সবার পিছনে৷ আমার আগে জয়ন্তী, তার আগে কর্নেল, এবং ডঃ পট্টনায়ক সবার আগে৷ তারপরই ডঃ পট্টনায়ক ঘোষণা করলেন—যাঃ! স্যুইচ বিগড়ে গেল টর্চের৷ সাবধানে এগোন!

কেউ কোনও জবাব দিল না৷ জয়ন্তীকে ছুঁয়ে আন্দাজ করে পা বাড়াচ্ছিলুম৷ দম আটকে যাচ্ছিল আবার৷ আগে জানলে কক্ষনো ঢুকতুম না এখানে৷

তারপর মনে হল, হাত বাড়িয়ে জয়ন্তীকে আর পাচ্ছি না৷ আসার সময় বাঁ-দিকে বেঁকে গিয়েছিল সুড়ঙ্গ—এবার তা হলে ডাইনে ঘুরতে হবে৷ ভাবলুম—ওদের ডাকি৷ কিন্তু পাছে ওঁরা ভাবেন যে ভয় পেয়ে গেছি, আঁতে ঘা লাগল৷ তাই সাহস করে ডাইনের দেওয়ালে হাত রেখে এগোলুম৷ মনে হচ্ছিল, আমি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছি৷ ওঁদের পায়ের শব্দ আবছা শোনা যাচ্ছে৷ এই সময় ডাইনে মনে হল পথটা ঘুরেছে৷ যেই ঘুরতে গেছি, অমনি টের পেলুম কী একটা আমার কোটের পকেটে ঢুকেছে৷ আঁতকে উঠে চেঁচালুম—কর্নেল, কর্নেল!

ভেবেছিলুম, নির্ঘাত পাহাড়ি গুহার অজগর ছাড়া কিছু নয়৷ কিন্তু আশ্চর্য! সেই জিনিসটা সঙ্গে-সঙ্গে পকেট থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল৷

আরও অবাক কাণ্ড, কর্নেলদের সাড়া পেলুম না৷ তখন আমার অবস্থা শোচনীয়৷ হাত-পা থরথর করে কাঁপছে—শরীর হিম, গলা শুকনো কাঠ৷ আবার চেঁচিয়ে উঠলুম, কর্নেল৷ ডঃ পট্টনায়ক! জয়ন্তী!

এবার সামান্য তফাতেই ডঃ পট্টনায়কের সাড়া পাওয়া গেল৷ —এই যে, এদিকে জয়ন্তবাবু৷

তারপর, অবাক কাণ্ড, ডঃ পট্টনায়কের বিগড়ে যাওয়া টর্চটা জ্বলে উঠল৷ আলো দেখাচ্ছিলেন উনি৷ আর পিছন ফিরে তাকালুম না৷ দৌড়ে সঙ্গ ধরলুম৷ তখন পট্টনায়ক বললেন, —হঠাৎ থেমে গিয়েছিলেন নাকি?

কোনও জবাব দিলুম না৷

বাইরে বেরিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস পড়ল স্বাভাবিকভাবে৷ মনে-মনে নাক-কান মলে গুম হয়ে ওঠা শুরু করলুম সবার আগে৷ পিছনে জয়ন্তী ও কর্নেলের হাসির শব্দ শুনলুম৷

ওপরে গিয়ে হলদু গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মাথা ঠান্ডা করছি, কর্নেলরা এসে গেলেন৷ জয়ন্তী চাপা হেসে বলল, কী হয়েছিল তোমার? পিছিয়ে পড়েছিলে কেন?

জবাব দিলুম না৷ সিগারেট বের করে ধরালুম৷ সেই সময় কর্নেল মৃদু হেসে কাছে এলেন৷—ডার্লিং জয়ন্ত, আশা করি ভীষণ ভয়ের ব্যাপার কিছু ঘটেনি!

আর চুপ করে থাকা গেল না৷ রেগেমেগে বলে উঠলুম, আজ থেকে এই শেষ৷ আর কক্ষনো আমাকে কোথাও যেতে ডাকবেন না৷

কর্নেল নিরীহ মুখে বললেন, আহা, অত রাগ কি তোমার মতো ছেলের শোভা পায়, জয়ন্ত? তুমি একটা জিনিয়াস ছেলে৷ তোমার সাহস আর শক্তির পরিচয় এর আগে তো কম পাইনি৷ হঠাৎ তুমি মিছিমিছি ভয় পেয়ে যাবে, এ তো ভাবতেই পারিনি আমরা?

এ একটা অদ্ভুত ব্যাপার, বুড়োর ওপর রাগ করে থাকা কিছুতেই যায় না৷ ওই কথাগুলো এমন গুরুত্ব দিয়ে বললেন যে, মনে হল উনি সত্যিই আমার জন্য সহমর্মিতা অনুভব করছেন৷ তাই রাগ খানিকটা কমিয়ে দিয়ে বললুম, থাক, খুব হয়েছে৷ আমি কচি খোকা নই৷

কর্নেল চাপা গলায় বললেন, কী? হয়েছিল কী বলো তো?

গজগজ করে জবাব দিলুম, অনেক কিছুই৷ প্রথমত—আপনি ঘোষণা করলেন যে সবার পিছনে থাকবেন৷ অথচ পরে দেখি, আমাকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে পিছনে ঠেলে দিলেন৷ দ্বিতীয়ত—ডঃ পট্টনায়কের টর্চ আচমকা বিগড়ানোর ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য৷ আপনাদের একটা ষড়যন্ত্র ছিল এর পিছনে৷ আমাকে নিয়ে মজা করতে চেয়েছিলেন৷ বলুন, এটা আমার পক্ষে অপমানজনক কি না৷ বলুন, এরপরও আপনাদের সঙ্গে ঘোরা আমার উচিত কি?

কর্নেল বিব্রতমুখে বললেন, —আ ছিঃ-ছিঃ! ওকথা বোলো না জয়ন্ত৷

ডঃ পট্টনায়ক একটু তফাতে দাঁড়িয়ে মৃদু-মৃদু হাসছিলেন৷ এবার কাছে এসে বললেন—চেঁচিয়ে উঠেছিলেন কেন জয়ন্তবাবু?

বললুম, দেখুন ডঃ পট্টনায়ক, ওই গুহার মধ্যে একটা অজগর-টজগর আছে, তাতে কোনও ভুল নেই৷

—অজগর? কর্নেল আমার দিকে তাকালেন৷ পট্টনায়কও বিস্মিতমুখে তাকিয়ে রইলেন৷

—হ্যাঁ৷ তা ছাড়া আর কী হতে পারে? আমার কোটের পকেটে মুখ ঢুকিয়ে দিয়েছিল সাপটা৷

জয়ন্তী খিলখিল করে হেসে উঠল৷ এবং আশ্চর্য, কর্নেল আর ডঃ পট্টনায়কও হো-হো করে হেসে উঠলেন৷ সে-হাসি আর থামতে চায় না৷ আমি এক লাফে তক্ষুনি গাড়িতে উঠে বসলুম৷ ড্রাইভার বলল, ক্যা হুয়া সাহাব?

—কুছ নেহি৷ বলে গম্ভীর মুখে বসে রইলুম৷

একটু পরে তিনজনে গাড়িতে ঢুকলেন৷ ঢুকেই কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন—তোমার ভুল হচ্ছে না তো জয়ন্ত? ওটা কি সাপ ঢুকছিল, নাকি কারুর হাত?

জবাব দিলুম না৷ কিন্তু কথাটা শুনেই আঁতকে উঠলুম৷ হৃৎপিণ্ডে এক ঝলক রক্ত উপচে উঠল৷

কর্নেল হাসতে-হাসতে বললেন, সাপ হোক, আর হাতই হোক, ওটা যে খুবই নিরীহ বস্তু, তাতে আমাদের সন্দেহ নেই৷ ধরমবীর স্টার্ট দাও৷ তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার৷ আর ডঃ পট্টনায়ক, তা হলে আমাদের অনুমান হুবহু সত্য বলে প্রমাণিত হল৷ তাই না?

লাঞ্চের পর হোটেলের বাইরে লনে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আগাগোড়া সবটা ভাবছিলুম৷

ভাবতে-ভাবতে টের পেলুম, প্রকৃত ব্যাপারটা কী ঘটেছে৷ গুহায় কর্নেলের পিছনে থাকার কথা চেঁচিয়ে বলে দেওয়া এবং আমাকে পিছনে ঠেলে দেওয়ার কারণ, কর্নেল জানতেন কেউ ওই কাগজটা হাতাতে চেষ্টা করবে৷ অর্থাৎ গুহার মধ্যে আগে থেকে কেউ লুকিয়ে ছিল কোথাও, কর্নেল জানতেন৷ কিন্তু তাকে হাতেনাতে ধরলেন না কেন উনি? যেন মজাটা আমার সঙ্গে নয়, তাঁর সঙ্গেই করলেন৷ সুতরাং, একটা ব্যাপার এতে স্পষ্ট৷ এই গুপ্ত লোকটিকে কর্নেল হাতেনাতে ধরতে চান না৷ স্বভাবমতো তার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে চান৷

কিন্তু দুটো তীব্র প্রশ্ন সামনে ভেসে এল৷ এক: সে-ই কি শ্যামলী ও পারেখের হত্যাকারী? দুই: ওই কাগজে কী আছে?

প্রথম প্রশ্নটার দিকে আলাদা করে তাকাতে গিয়ে রক্তে খিল ধরে গেল! ওরে বাবা! তা হলে তো সে অনায়াসে আমাকে খুন করতে পারত—ঠিক যে উপায়ে শ্যামলীকে খুন করেছে! অথচ কর্নেল বলেছেন যে ‘সেই হাতটা খুবই নিরীহ বস্তু!’ কেন?

এই সময় জয়ন্তী হাসতে-হাসতে বেরিয়ে এল৷ আমার কাছে এসে বলল, —কী ছোটো গোয়েন্দামশাই, মনে-মনে খুব ঝাল ঝাড়া হচ্ছে কারও ওপর—তাই না?

বললুম—বয়ে গেছে! সিগারেট খাচ্ছি দেখতে পাচ্ছ না? তা ছাড়া যা গরম পড়েছে৷ হাওয়া নিচ্ছি গায়ে৷

জয়ন্তী আরও কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল৷ তারপর বলল, —বুঝতে পারছি, তুমি আমার ওপর ভীষণ রেগে আছ৷ কর্নেলের আদেশের অবাধ্য হওয়ার ক্ষমতা ছিল না৷ আমাকে ভুল বুঝো না, জয়ন্ত৷

—ঠিক আছে৷ আমি তো অবাধ্য হতে বলিনি কাউকে৷

—কিন্তু এই চমৎকার পরিবেশে তোমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন অবাধ্য হতে ইচ্ছে করছে৷ এবার অনায়াসে জবাব দেব, প্রশ্ন করো৷

ওর সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে অভিমান পুষে রাখা গেল না৷ বললুম, —ওই কাগজটার কী ব্যাপার?

—ব্যাপার সত্যি বড্ড অদ্ভূত৷ তবে প্রথমে অতটা বুঝতে পারিনি বলে গুরুত্ব দিইনি এবং ভুলেও গিয়েছিলুম৷ ৬ তারিখে আমি আর শ্যামলী ওই গুহা দেখতে গিয়েছিলুম৷ আরও অনেক ট্যুরিস্ট ছিল ওখানে৷ বেশ ভিড় ছিল৷ অনেকে মোমবাতি হাতে নিয়ে ঢুকেছিল, তাই আলোর অভাব ছিল না৷ গুহার গায়ে আশ্চর্য সুন্দর সব ছবি আছে৷ অজন্তার মতো ফ্রেস্কো ছবি৷ তারপর কী হল শোনো৷ ভিড়ের মধ্যে কে শ্যামলীর হাতে একটা ভাঁজকরা, কাগজ গুঁজে দিল৷ আমি দেখিনি, একটু পরেই শ্যামলী বলল সে-কথা৷ তখন দু’জনে সেই অল্প আলোয় কাগজটা খুব পড়ার চেষ্টা করলুম৷ মোমের আলোগুলো নড়াচড়া করছিল৷ সেই ফাঁকে যতটা পড়া যায়, পড়লুম৷ লেখা আছে: ‘মোহন পারেখ আসছে৷ সে একজন সাংঘাতিক লম্পট৷ ওর সঙ্গে মিশলে বিপদে পড়বেন৷ সাবধান৷’ আমরা তো অবাক৷ শ্যামলী বরাবর নির্বিকার, নির্লিপ্ত থাকতে চায়৷ কিছু গ্রাহ্য করা ওর স্বভাব নয়৷ দলাপাকিয়ে কাগজটা ফেলে দিয়েছিল৷ তারপর ও নিয়ে আমরা আর বিশেষ আলোচনা করিনি৷ ভুলেই গিয়েছিলুম৷

—আমাকে বললে জানি না কোন মহাভারত অশুদ্ধ হত!

—কর্নেল বুড়ো নিষেধ করেছিলেন বলতে৷ বলেছিলেন, জয়ন্তকে নিয়ে একটু মজা করতে চাই!

বলে জয়ন্তী আমার হাত ধরে টানল৷ —চলো৷ ঘরে যাওয়া যাক! কী বাতাস এখানটায়!

লন পেরিয়ে লাউঞ্জে ঢুকলুম৷ দেখলুম, কর্নেল, ডঃ পট্টনায়ক আর ব্রিজেশ সিং কোণের দিকে বসে গম্ভীর হয়ে কী সব আলোচনা করছেন৷ আমরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেলুম৷ ওপরের করিডোরে অধ্যাপক দ্বিবেদীর সঙ্গে দেখা হল৷ ভদ্রলোককে খুব মনমরা মনে হচ্ছিল৷ আমাদের দেখে একটু হাসলেন৷ কিন্তু কিছু বললেন না৷ আস্তে-আস্তে পাশ কাটিয়ে নেমে গেলেন৷ জয়ন্তী মুখ টিপে হাসল৷ সিঁড়ির দিকে ভদ্রলোক অদৃশ্য হলে সে বলল, —ভদ্রলোক ওপরে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছিলেন কেন, বুঝতে পারছ? সেই খামটার জন্যে৷

ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলুম৷ তারপর বললুম, —খামের মধ্যে একটা নেগেটিভ ছবি আছে, কর্নেল বলছিলেন৷ তুমি জানো ছবিটা কীসের বা কার?

জয়ন্তী মাথা দোলাল৷

—জানলেও তো বলবে না৷ ঠিক আছে, বোলো না! তুমি তো এখন গোয়েন্দাপ্রবরের প্রধান শিষ্যা৷ আমি কোথাকার কে!

জয়ন্তী তেড়ে এল৷ —এই! আর ঝগড়া নয়৷ এবার কিছুক্ষণ দিবানিদ্রার ব্যাপার আছে৷

—তা তুমি নিজের ঘরে যাও না!

জয়ন্তী গাল ফুলিয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো বলল, —তাড়িয়ে দিচ্ছ?

ওর দু-কাঁধ ধরে মুখের ওপর ঝুঁকে বললুম, —তা কি পারি? কিন্তু একটা কথা—তুমি যেভাবে দিবানিদ্রার প্রতি আসক্ত, তোমার যে ভুঁড়ি ও চর্বি হয়ে যাবে জয়া৷ তখন আর পাহাড়ে চড়তে পারবে?

জয়ন্তী ক্লান্ত ও বিষণ্ণভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —শ্যামলী নেই৷ আর আমার পাহাড়ে চড়া হবে না, জয়ন্ত৷ ওর টানেই আমি মাউন্টেনিয়ারিংয়ের নেশায় পড়েছিলুম৷

এতক্ষণে ওকে সত্যিকার আদর করতে-করতে বললুম, —ঠিক আছে৷ এবার লক্ষ্মী মেয়েদের মতো—বনেদি বাঙালি মেয়েদের ভঙ্গিতে স্রেফ কুলবধূ হয়ে যাওয়ার চেষ্টা কোরো৷ কেমন?

ও মৃদু ধাক্কা দিয়ে একটু সরে বলল, —বধূ হই আর যা হই, তুমি কিন্তু বিশেষ আশা করে বোসো না৷ কারণ, আশা অনেক সময় শুধু ছলনায় ফুরিয়ে যায়!

আবার অশরীরী আত্মার আবির্ভাব

কর্নেলের আর পাত্তা নেই সে-বেলার মতো৷ বিকেলে অগত্যা জয়ন্তী আর আমি বেড়াতে বেরোলুম৷ মোল্লার দৌড় মসজিদ—আমাদের ওই ভূতের পাহাড়৷ স্বীকার না করে উপায় নেই, অত সুন্দর পাহাড় আর এলাকায় দুটি নেই৷ তা ছাড়া কী এক গভীর রহস্যময় আকর্ষণ আছে যেন ওটার, বারবার যেতে ইচ্ছে করে৷ ভয় পেলেও ভালো লাগে ওখানে গিয়ে বসে থাকতে৷ চারদিকের দৃশ্যাবলীর তো তুলনাই নেই!

আমরা আজ প্রস্রবণটা আবিষ্কার করে ফেললুম৷ তারপর অনেকটা ঘুরপথে চুড়োর দিকে উঠতে শুরু করলুম৷ উত্তরে খাড়াই ভেঙে ওঠা সম্ভব ছিল না৷ কিন্তু অভিজ্ঞা জয়ন্তী কর্নেলের আবিষ্কৃত পথটা খুঁজে বের করল৷ আমার একটু কষ্ট হচ্ছিল৷ কিন্তু জয়ন্তী অক্লেশে উঠে যাচ্ছিল আর আমার অসহায় দশা উপভোগ করছিল৷

এক জায়গায় খানিকটা ঢালু চাতাল টালি বা করোগেট শিটের চালের মতো নেমে গেছে৷ আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে জয়ন্তী তরতর করে সেখানে চলে গেল৷ তারপর ঘুরে-ফিরে এদিক-ওদিক দেখে হাত-ইশারায় ডাকল৷ খুব সাবধানে গেলুম ওর কাছে৷ গিয়ে দেখি, চাতালটার সব জায়গায় ছোটো-বড়ো অনেক গর্ত আছে৷ গর্তগুলোর ব্যাস কমপক্ষে এক ফুট থেকে দেড় ফুট৷ গভীরতা আন্দাজ তিন থেকে চার ফুটের কম নয়৷ মনে হল, কারা যেন শামিয়ানা খাটাবার জন্যে প্রকাণ্ড সব খুঁটি পুঁতেছিল—কিংবা ইঞ্জিনিয়াররা এখানে কোনও কারখানা বানাবার জন্যে কংক্রিট থাম তৈরি করতে চেয়েছিল—অর্থাৎ একটা বাড়ির আয়রন স্ট্রাকচারের আয়োজন করা হয়েছিল৷ পরে যেন কোনও কারণে তা বাতিল করা হয়েছে, কিন্তু গর্তগুলো রয়ে গেছে৷

অবাক হয়ে বললুম—এ-গর্তগুলো কীসের হতে পারে? ভারী অদ্ভুত তো!

জয়ন্তী বলল—ভূতের পাহাড়ে সবই অদ্ভুত হবে, এতে আশ্চর্য কিছু নেই৷... বলে সে হাঁটু দুমড়ে একটা গর্তের কিনারায় বসল৷ তারপর মাথা নামিয়ে গর্তের ধারে কান পাতল৷

আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি৷ জয়ন্তীর বালিকাপনা দেখছি৷

সে হাত তুলে ডাকল—এই, শোনো৷ এখানে কান পাতো!

—কেন? বলে ওর কথামতো বসে পড়লুম৷ তারপর কান পাততেই একটা অদ্ভুত চাপা আওয়াজ পেলুম৷ টেলিগ্রাফের খুঁটিতে কান পাতলে একধরনের শোঁ-শোঁ আওয়াজ শোনা যায়৷ কিন্তু এই গর্তের আওয়াজ একেবারে অন্যরকম৷ ভূতুড়েই বলা যায় বরং৷ মনে পড়ে গেল সন্ধ্যায় ঝড়ের সময় যে বিকট আঁ-উ-উ-উ শুনেছিলুম, অবিকল তারই একটা খুদে নমুনা৷ মনে হল, পাহাড়ের ভেতরে গভীর কোনও জায়গায় কোনও প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী আটকে পড়ে একটানা গর্জন করছে৷

জয়ন্তী বলল—তা হলে একটা রহস্যের সমাধান হল৷ আওয়াজটা কোত্থেকে আসছিল বোঝা গেল৷ এখন বাতাস কম, তাই গর্তে কান না লাগালে শোনা যায় না৷ কিন্তু বাতাস বাড়লে আওয়াজও বাড়ে৷ আর ঝড়ের সময় কী ঘটে, তা তো কাল সন্ধ্যায় শুনেছি আমরা৷ প্রচণ্ড বাতাসের স্রোত গর্তের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ভয়ংকর হুইসিল হয়ে বেজে ওঠে৷

বললুম—হ্যাঁ, তাই বটে৷ কিন্তু গর্তগুলো কীসের বলো তো?

জয়ন্তী কিনারায় পাথর খামচানোর চেষ্টা করতেই তা সুরকির মতো গুঁড়ো হয়ে গেল৷ অমনি হেসে উঠল সে৷ আরে, এই পাথর আসলে মুচমুচে হয়ে রয়েছে৷ বেলেপাথর আছে একধরনের৷ সহজেই গুঁড়ো করা যায়৷ এই চাতালটা স্রেফ সেই জাতের পাথরের, বুঝেছ? সম্ভবত সারা শীতকাল উত্তরের প্রচণ্ড বাতাসের ধাক্কায় এইসব গর্তের সৃষ্টি হয়েছে৷ কিন্তু এলাকার লোকেরা বড্ড বোকা তো! এসে কেউ ব্যাপারটা বোঝবার চেষ্টা করেনি কখনও!

বললুম—সব কিংবদন্তিরই উদ্ভব প্রাচীন যুগে৷ সময় এগিয়ে যায়, কিন্তু কিংবদন্তি টিকে থাকে৷ যাক গে, চলো—ওপরে গিয়ে বসি৷

একটু পরেই সেই রিঙ্গেল ঝোপগুলো পেরিয়ে আমরা চুড়োয় উঠলুম৷ আজ কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে জনপ্রাণীটি দেখতে পেলুম না৷

হঠাৎ জয়ন্তী বলল—বাঃ! হেলিকপ্টার যে! দেখো, দেখো!

উত্তরপূর্ব দিকে একটা হেলিকপ্টার দেখলুম৷ সেটা একটু পরেই একটা উঁচু পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হল৷ বললুম—প্যাড তৈরি হয়ে গেছে তা হলে৷ নেমে পড়ল মনে হচ্ছে৷

জয়ন্তী অন্যমনস্কভাবে বলল—তা হলে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ এতক্ষণে চালু হল বলা যায়৷ কিন্তু এবার আমার সামনে ভয়ংকর এক সময় আসছে৷ শ্যামলীর বাড়িতে খবর দিতে হবে৷ কেমন করে মুখ দেখাব ওঁদের কাছে! ওর বডিটারই বা কী হবে?

ওর চোখদুটো জলে ভরে উঠল৷ ওকে সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত হলুম৷

কিছুক্ষণ পরে পশ্চিম আকাশে আজও মেঘের আভাস লক্ষ্য করে নীচে নামলুম৷ পথে যেতে-যেতে বাতাস বেড়ে গেল হঠাৎ৷ হোটেলে পৌঁছে দেখি, কর্নেল ব্যস্তভাবে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন৷ বললেন—এখন ঘরে নয়৷ আমরা শ্রীমতী মালহোত্রার বাড়িতে যাব৷ আর সবাই চলে গিয়েছেন৷ আমি তোমাদের নিয়ে যাব বলে দাঁড়িয়ে আছি৷

জয়ন্তী বলল—কিন্তু এই ঝড়ের মধ্যে!

—ঝড় কোথায়? এমন আবহাওয়া এখানে এখন প্রতিদিনই পাবে৷ চলো, দেরি করা যাবে না৷

তিনজন পথে নামলুম যখন, তখন আকাশের অবস্থা ভয়াবহ৷ ঘড়িতে সময় সবে ছ’টা কুড়ি৷ শ্রীমতী মালহোত্রার বাড়ির গেটে ঢোকার সময় প্রচণ্ড শব্দে কোথায় বাজ পড়ল৷ তারপর শুরু হল মেঘগর্জন৷ বাতাসও খেপে গেল৷ আমরা সোজা গিয়ে ডাইনিং হলে ঢুকে পড়লুম৷

ভেতরে চাপা আলো জ্বলছে৷ কোনার সোফায় বসে আছেন ডঃ পট্টনায়ক, আর এক অচেনা ভদ্রলোক৷ মাঝামাঝি জায়গায় একটা চেয়ারে চুপচাপ গম্ভীর মুখে বসে রয়েছেন রঘুবীর জয়সোয়াল৷ আর অধ্যাপক দ্বিবেদী ও শ্রীমতী মালহোত্রা ডাইনিং টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে চাপাস্বরে কী সব আলোচনা করছেন৷

আমাদের দেখে শ্রীমতী মালহোত্রা মৃদু হেসে আপ্যায়ন জানালেন৷ আমরা তিনজনে গিয়ে বসলুম ডঃ পট্টনায়কের কাছে৷ অচেনা ভদ্রলোকটির বয়স সত্তরের কম নয়৷ সাদা চুল, আর মস্ত গোঁফ৷ তিনি কর্নেলের দিকে বাও করে বললেন—হ্যাল্লো৷

কর্নেলও বললেন—হ্যাল্লো!

কিন্তু আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন না ভদ্রলোকের৷ এই সময় শ্রীমতী মালহোত্রাকে কিচেনের দরজায় ঢুকতে দেখলুম৷ অধ্যাপক পায়চারি শুরু করলেন৷ ঘরে অস্বাভাবিক স্তব্ধতা৷ ব্যাপারটা কী?

বাইরে যথারীতি প্রচণ্ড ঝড় আর মেঘের তাণ্ডব চলেছে৷ অস্বস্তিতে মনে-মনে অস্থির হচ্ছিলুম৷ জয়ন্তীর মুখে একটা উৎকণ্ঠা জড়িয়ে আছে মনে হল৷ সে মুখ নিচু করে নিজের কড়ে আঙুলে কিছু দেখছে৷

কিচেন থেকে গৃহকর্ত্রী বেরিয়ে এলেন৷ সঙ্গে লছমন আর সরযূ৷ ওদের হাতে ট্রে৷ নিঃশব্দে সকলের সামনে ট্রে ধরলে প্রত্যেকে কাপ তুলে নিলেন৷ সরযূ চমৎকার কফি করে৷

যতক্ষণ কফি খাওয়া হল, কেউ কোনও কথা বললেন না৷ এই সময় দরজায় কে ধাক্কা দিচ্ছে মনে হল৷ লছমন এগিয়ে যাচ্ছিল, শ্রীমতী মালহোত্রা কড়া স্বরে বলে উঠলেন—লছমন৷ বরাবর বলেছি না, রাত্রিবেলা ওভাবে কক্ষনো ঝোঁকের মাথায় দরজা খুলবে না! চলে এসো৷ ও কেউ না—এমনি আওয়াজ! ও কিছু না৷

ডঃ পট্টনায়ক বললেন—এমনি আওয়াজ৷ বলেন কী মিসেস মালহোত্রা!

—হ্যাঁ৷ বিশ্বাস না হলে দরজা খুলে দেখতে পারেন আপনারা৷ ঝড়ের রাত্রে বরাবর এমন হয়৷ সে রাতে বদ্রী যদি নিষেধ মেনে দরজা না খুলত, কোনও বিপদ ঘটত না৷

কর্নেল একটু হেসে বললেন—আমার মনে হয় ম্যাডাম, আপনার ও-দরজার কপাটের গঠনে ত্রুটি আছে৷ আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি৷ জোরে বাতাস বইলে অমন শব্দ হওয়া খুবই স্বাভাবিক৷

শ্রীমতী মালহোত্রা গম্ভীর হয়ে গেলেন৷ —আপনি অভিজ্ঞ মানুষ কর্নেল৷ অনেক ব্যাপারে আপনার মতামতের মূল্য আছে নিশ্চয়ই৷ কিন্তু মনে রাখবেন, অপ্রাকৃত শক্তির অস্তিত্ব সহজে উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ যাক গে, প্রায় সাতটা বাজে৷ এবার আমরা আসরে গিয়ে বসতে পারি৷

আসর! আমি জয়ন্তীর দিকে সপ্রশ্ন তাকালুম৷ জয়ন্তী চোখ নামাল৷ মুখটা উৎকণ্ঠায় ভরে আছে এখনও৷

শ্রীমতী মালহোত্রা পা বাড়িয়ে বললেন—প্লিজ, আপনারা আর দেরি করবেন না৷ এমন সময় তো প্রতিদিন পাওয়া যাবে না৷ প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই চমৎকার সুযোগ আমাদের ব্যর্থ হতে দেওয়া উচিত নয়৷

তা হলে আবার অশরীরী আত্মার কারবার! অস্বস্তিটা বেড়ে গেল৷ এসব হচ্ছেটা কী! কর্নেলের দিকে তাকালুম৷ উনি বললেন—চলো জয়ন্ত৷ জয়ন্তী, ওঠো৷ ডঃ পট্টনায়ক! আপনার মাননীয় বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আসুন তাহলে৷

স্টাডির চাবি আজ শ্রীমতী মালহোত্রার কাছে৷ তিনি দরজা খুলে দিলেন এবং একধারে দাঁড়িয়ে কপাটটা আটকে থাকলেন৷ সেদিনকার মতো৷ আমরা একে-একে ঢুকে পড়লুম৷

সেই মারাত্মক ঘর আর সেই আটটা চেয়ার, মধ্যে সেই গোলটেবিলটা৷ পকেটে হাত ভরে রিভলভারটার অস্তিত্ব অনুভব করলুম৷ কিন্তু যদি সত্যি আজও কোনও মারাত্মক ঘটনা ঘটে, আমি কি এই অস্ত্রটা দিয়ে তা আটকাতে পারব?

অবিকল সেদিনকার মতো বসে পড়লুম সবাই৷ আমার ডাইনে রইল জয়ন্তী, বাঁ-দিকে কর্নেল৷ আর শ্যামলীর চেয়ারে বসলেন সেই আগন্তুক ভদ্রলোক৷ ওই বুড়োই কি আজকের আসরের মিডিয়াম?

উজ্জ্বল আলোটা নিভিয়ে তক্ষুনি হালকা নীল আলো জ্বাললেন শ্রীমতী মালহোত্রা৷ তারপর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে সেদিনকার মতো বক্তৃতা শুরু করলেন৷ —বন্ধুগণ! আজ আমার দীর্ঘ সারগর্ভ বক্তৃতার প্রয়োজন আশা করি হবে না৷ আজকের আসরে যিনি মিডিয়াম হতে চান, তিনি ডঃ সীতানাথ পট্টনায়কের বন্ধু—অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল হরগোবিন্দ সিং৷ উনি আজ বিকেলেই হেলিকপ্টারে সরকারি ত্রাণ দফতরের প্রতিনিধি হিসেবে বাণেশ্বরে এসে পড়েছেন৷ আমার মতোই ওঁর প্রেতচর্চার আগ্রহ খুব প্রবল, তা আমি ডঃ পট্টনায়কের কাছেই শুনেছি৷ শোনামাত্র আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে৷ আপনারা জানেন, খুব সূক্ষ্ম সংবেদনশীল মন ও অনুভূতির প্রখরতা যাঁদের আছে, একমাত্র তাঁরাই মিডিয়াম হওয়ার উপযুক্ত৷ স্থূল মন, অনুভূতির বালাই নেই, সূক্ষ্ম গভীর ভাবনা ভাবতে অপটু, এমন কোনও মানুষের পক্ষে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বস্তুপ্রবাহে ভাসমান সেই বিমূর্ত চিন্তাতরঙ্গ ও চেতনা—যা বস্তুর নিয়ম মেনে চলে না, তা ধরা সম্ভবই নয়৷ আনন্দ ও আশার কথা, আমাদের নবাগত বন্ধু মিঃ সিং একজন শৌখিন মিডিয়াম হিসেবে অনেকখানি অভিজ্ঞতা রাখেন৷ জানি না, এই আকস্মিক যোগাযোগের পিছনে আমাদের বিপরীত জগতের সেই অশরীরী বাসিন্দাদের কতখানি হাত আছে—তবে ডঃ পট্টনায়কের কাছে ওঁর পরিচয় পেয়েই আমি সঙ্গে-সঙ্গে এই আসরের প্রস্তাব দিয়েছিলুম৷ এখন কথা হচ্ছে, আজ এই আসরের মুখ্য উদ্যোক্তা হিসেবে আমি প্রস্তাব করছি, হতভাগিনী শ্যামলী সেনের আত্মাকে উনি আজ আহ্বান করুন৷

অধ্যাপক দ্বিবেদী বলে উঠলেন—কিন্তু উনি তো চিনতেনই না শ্যামলীকে!

জয়সোয়ালজি ঘোঁতঘোঁত করে হাসলেন শুধু৷

কর্নেল বললেন—তাও তো বটে!

শ্রীমতী মালহোত্রা কী বলতে যাচ্ছিলেন, মেজর জেনারেল ভদ্রলোক একটু কেশে বিনীতভাবে বললেন—শ্যামলী সেন আমার সুপরিচিতা৷ মানালি অভিযানের সময় আমি ওঁর দলকে ট্রান্সপোর্টের ব্যাপারে সাহায্য করেছিলুম৷ জয়ন্তীদেবীর আশা করি মনে আছে?

জয়ন্তী কিছু বলতে ব্যস্ত হওয়ামাত্র কর্নেল আমার পায়ের ওপর দিয়ে একটা পা বাড়িয়ে জয়ন্তীর পায়ে মৃদু ধাক্কা দিলেন—ব্যাপারটা আমি আর জয়ন্তী ছাড়া কেউ টের পেল না৷ জয়ন্তী অমনি আমতা-আমতা করে বলে উঠল—হ্যাঁ, হ্যাঁ—আপনিই তো! মনে আছে বইকী৷ খুব মনে আছে৷

কিন্তু জয়ন্তীর চোখের বিস্ময়টুকু আমার চোখ এড়িয়ে গেল না৷

শ্রীমতী মালহোত্রা বললেন—তা হলে এবার আলো নেভাই৷ অনুগ্রহ করে কেউ যেন কোনও শব্দ করবেন না৷ রেডি—ওয়ান... টু...প্রি...৷

আলো নিভে যাওয়ার মুহূর্তে জয়সোয়ালজিকে অস্ফুটস্বরে বলতে শোনা গেল—পাগলামি!

ঘন অন্ধকারে চুপচাপ বসে আছি তো আছি৷ কোনও শব্দ নেই ঘরে৷ কিন্তু বাইরে ঝড় ও মেঘের হাঁকডাক সমানে চলেছে৷ ভয়ে বুক ঢিপঢিপ করছিল৷ আজও কোনও অঘটন ঘটবে না তো? কর্নেল কেন এসব ঘটতে দিচ্ছেন? আমার অস্বস্তিটা বেড়ে যেতে লাগল ক্রমশ৷ কিন্তু না—এখন অন্য কোনও ভাবনা নয়, শ্যামলীর কথা ভাবা উচিত৷ তার আত্মাকেই আজ আনা হবে৷ কাজেই স্থির মনে তার কথা ভাবা যাক৷

ভাবতে গিয়ে সে রাতের সব ঘটনা আগাগোড়া মনে পড়তে লাগল৷ হ্যাঁ, আমি এত অবাক হয়েছিলুম যে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিলুম ঝোঁকের বশে৷ ভূতপ্রেতে একতিল বিশ্বাস আমার নেই৷ তাই পরীক্ষা করে দেখতে যাচ্ছিলুম, যদি সত্যি ভূতপ্রেত শ্যামলীকে ভর করে থাকে তা হলে আমার এই গতিবিধি টের পাবে এবং অবশ্যই এর একটা প্রতিক্রিয়া ঘটবে৷ কিন্তু ধুরন্ধর কর্নেলের জন্যে সেটায় বাধা পড়েছিল৷ আমার কোটে টান পড়া মাত্র ছিটকে নিঃশব্দে চেয়ারে এসে বসেছিলুম৷ আজ কিন্তু সে ঝোঁক আর আমার নেই৷... আচ্ছা, একটা কথা—আমার বাঁ-দিকে ছিলেন কর্নেল, তাঁর বাঁ-দিকে ডঃ পট্টনায়ক৷ তা হলে ডঃ পট্টনায়ককে ডিঙিয়ে কীভাবে কর্নেল টের পেলেন যে জয়সোয়ালজির চেয়ার খালি?... হ্যাঁ, কর্নেলও চেয়ার ছেড়ে উঠেছিলেন তা হলে৷ কেন উঠেছিলেন? আমি যেজন্যে কৌতূহলী হয়েছিলুম, উনিও কি সেজন্যেই?... আর একটা কথা, শ্যামলী কি ইচ্ছে করেই অমন বিকৃত দুর্বল স্বরে কথা বলছিল?

আমার চিন্তাসূত্রকে মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন করে দিল একটা ভাঙা খ্যানখেনে স্বর৷ সেই মুহূর্তে বাজ পড়ল বাইরে কোথাও৷ ঘরটা জোরে কেঁপে উঠল৷ টেবিলটাও একবারের জন্যে নড়ে গেল যেন৷—আমি আছি...আমি আছি... আমি আছি!...এই ঘরে আছি৷ এই বাড়িতে আছি৷ এই পাহাড়ে আছি৷ জঙ্গলে আছি৷ রাস্তায় আছি...৷ আছি... আছি... আছি...৷

ও কি মেজর জেনারেল হরগোবিন্দ সিংয়ের কণ্ঠস্বর? অসম্ভব৷ ‘আছি’ শব্দটা ক্রমাগত শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে উচ্চারিত হতে থাকল৷ মনে হল, সারা অন্ধকার ঘরে আটকে-পড়া কী একটা শক্তি পাখির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে৷ আই একজিস্ট... আই একজিস্ট৷

(এখানে একটা কথা বলা দরকার, বাণেশ্বরে অন্য লোকের সঙ্গে কিংবা শ্রীমতী মালহোত্রার বাড়িতে আমরা সবাই ইংরেজিতে কথা বলেছি বা বলি৷ মিডিয়ামও তাই ইংরেজিতেই কথা বলবে, এটা স্বাভাবিক৷ শ্যামলীও বলেছিল৷)

এবার ভেসে উঠল শ্রীমতী মালহোত্রার কণ্ঠস্বর৷...হু আর ইউ? কে তুমি?

অন্তত তিনবার প্রশ্নের পর জবাব শোনা গেল—আমি শ্যামলী, আমি শ্যামলী, আমি শ্যামলী...৷

বোঝা যাচ্ছিল প্রশ্ন না করলে অশরীরীর কথা কিছুতেই থামবে না৷ প্রশ্ন করতে শুনলুম জয়ন্তীকে৷ —শ্যামলী, শ্যামলী৷ তোকে কে মেরেছে রে?

—তুই কি জয়ন্তী, তুই (ইউ) জয়ন্তী, তুই কি জয়ন্তী?

—হ্যাঁ, আমি জয়ন্তী৷ তোকে কি মোহন পারেখের আত্মা খুন করেছিল সে রাতে?

—বলব না, বলব না, বলব না...৷

—শ্যামলী, বল, তাকে আমরা শাস্তি দেব!

জয়ন্তীর এই কথার সঙ্গে-সঙ্গে শ্রীমতী মালহোত্রাও প্রশ্ন করলেন—কে মেরেছিল মোহন পারেখকে? তার সঙ্গে অধ্যাপক দ্বিবেদীর ভীতু গলার প্রশ্ন যোগ দিল—বলুন, বলুন, মোহন পারেখ কাকে চিনতে পেরেছিল? কে সে?

শ্রীমতী মালহোত্রা অমনি চাপা গলায় গর্জালেন—চুপ! কেউ কোনও প্রশ্ন নয়৷ শুধু আমাকে প্রশ্ন করতে দিন৷

ওদিকে এইসব হট্টগোলের মধ্যে কিন্তু সমানে সেই খ্যানখেনে স্বরের আওয়াজটা একটানা শোনা যাচ্ছে—বলব না, বলব না, বলব না... ৷

শ্রীমতী মালহোত্রা তীক্ষ্ণস্বরে বললেন—শ্যামলী, মোহন পারেখ কাকে চিনতে পেরেছিল?

—মহাবীর সিংকে... মহাবীর সিংকে... মহাবীর সিংকে...৷

—কীভাবে মোহনের মৃত্যু হল?

—ফোনে ডেকেছিল৷ ভূতের পাহাড়ে যেতে বলেছিল৷

—কেন?

—নিষ্পত্তি করতে চেয়েছিল৷ টাকা দেবে বলেছিল৷ ফোটো চেয়েছিল৷

—বোঝা যাচ্ছে না৷ খুলে বলো!

—বলব না, আর বলব না৷

—প্লিজ, শ্যামলী!

—পারেখ সাহস করে ফোটো নিয়ে যায়নি সঙ্গে৷ আমার কাছে রাখতে দিয়েছিল৷

—কার ফোটো, শ্যামলী? কার ফোটো?

সে-কথার জবাব নেই৷ শ্যামলীর আত্মা বলে উঠল—ভূতের পাহাড়ে পারেখ গেল৷ আমাকে জানিয়ে গেল৷ আপনাকে জানাতে বললুম—সে আপনার বাড়ি হয়ে গেল৷ আপনি ছিলেন না৷ সুমিত্রাজির বাড়ি গিয়েছিলেন৷ তখন আমি চুপিচুপি ওকে অনুসরণ করে ব্যাপারটা দেখতে গেলুম৷ পাথরের আড়ালে বসে দেখলুম, মহাবীর সিং ধাক্কা মেরে পারেখকে ফেলে দিল৷ আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে এলুম৷ জয়ন্তীকে বললুম না—ও আমাকে খুব বকবে বলে ভয় হল৷ জয়ন্তীকে আমার গার্জেন বলে সমীহ করতুম৷...তারপর...৷

আচমকা জোরালো টর্চ জ্বলে উঠল, সেইসঙ্গে কর্নেলের গর্জন শোনা গেল—খবরদার মহাবীর সিং!

টর্চের আলোয় দেখা গেল, মেজর জেনারেল সেই মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁর ডাইনের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন রঘুবীর জয়সোয়াল—আর মেজর জেনারেল চোখের পলকে তাঁর বুকে ঘুষি মারলেন৷ জয়সোয়ালজি চেয়ারসুদ্ধ পড়ে গেলেন সশব্দে৷ অমনি উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠল ঘরে৷

তারপর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দেখি, বুকসেলফ আর উঁচু আলমারির পিছন থেকে একটি করে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলেন মিঃ খান্না আর ব্রিজেশ সিং৷ দু’জনের হাতেই রিভলভার৷ খান্না জয়সোয়ালজির জামার কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করালেন৷

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এসব ঘটে গেল!

এবার দেখলুম, কর্নেল আর ডঃ পট্টনায়ক মেঝেয় কী খুঁজে বেড়াচ্ছেন ব্যস্তভাবে৷ জয়ন্তী আর আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি—চেয়ার থেকে ওঠার কথা ভুলেই গেছি৷ ওদিকে শ্রীমতী মালহোত্রা এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন৷ তখন চার-পাঁচজন পুলিশ এসে ঢুকে পড়ল৷ তারপর জয়সোয়ালজিকে ধরল৷ তখন খান্না ওঁর হাতে একটা হাতকড়া পরিয়ে দিলেন৷ জয়সোয়ালজি একটা কথাও বললেন না৷

তা হলে জাঁদরেল রিটায়ার্ড পুলিশ সুপার রঘুবীর জয়সোয়ালই হত্যাকারী! আমি সন্দিগ্ধদৃষ্টিতে জয়ন্তীর দিকে তাকালুম৷ আর এতক্ষণে জয়ন্তীর যেন সংবিত ফিরল৷ সে উঠে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল—চলো জয়ন্ত, আমরা বেরিয়ে ওঘরে যাই৷ আমার বুক কাঁপছে৷

দু’জনে বেরিয়ে ডাইনিং হলের কোনায় সোফায় গিয়ে বসে পড়লুম৷ কী বলব পরস্পর, ভেবেই পাচ্ছিলুম না৷ আমি চুপচাপ সিগারেট টানতে থাকলুম, জয়ন্তী একবার অস্ফুটম্বরে বলল—ভীষণ মাথা ধরেছে, তারপর মাথাটা হেলিয়ে বসে রইল৷ বাইরে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, শুনতে পাচ্ছিলুম৷ মাঝে-মাঝে মেঘ ডেকে উঠছে৷

একটু পরে স্টাডির দরজা খুলে গেল৷ প্রথমে ব্রিজেশ সিং ও সেই পুলিশবাহিনী জয়সোয়ালজিকে নিয়ে বেরোলেন৷ ডাইনিং হল পেরিয়ে সদর দরজা খুলে ওঁরা বৃষ্টির মধ্যেই অদৃশ্য হলেন৷ পরক্ষণে গাড়ির শব্দ শোনা গেল৷ আসামি নিয়ে ওঁরা থানায় চলেছেন৷

এবার বেরোলেন হাসিখুশি মুখে অধ্যাপক অরিন্দম দ্বিবেদী৷ খুব চঞ্চল দেখাচ্ছিল ভদ্রলোককে৷ হনহন করে এসে আমাদের পাশে বসে পড়লেন৷ তারপর একটু কেশে বললেন—কথাটা হচ্ছে, আমি সব টের পেয়েছিলুম, জানেন? কিন্তু প্রাণের ভয়ে বলিনি৷ বললেই বা কে বিশ্বাস করত বলুন? ওবে বাবা, বিটায়ার্ড পুলিশ-সুপার—অত দাপট আছে নামের! থানা আমাকে পাত্তা দিত ভাবছেন? উলটে আমাকেই খুনি সাব্যস্ত করে কেস সাজাত৷ বাপস! রক্ষে করো বাবা৷

জয়ন্তী হঠাৎ উঠল৷ —এই, কফি বলে আসি সরযূকে৷ আর দেখি ট্যাবলেট পাই নাকি৷

সে কিচেনের দিকে চলে গেলে অধ্যাপক ফিসফিস করে বললেন—জয়ন্তী দেবী কিন্তু আমার ব্যাপারটা টের পেয়েছিলেন, জানেন?

তাকালুম ভদ্রলোকের দিকে৷ তাতে যেন উনি ঘাবড়ে গেলেন৷ থতমত খেয়ে ফের বললেন—বরাবর মিঃ চাউড্রি, শিক্ষক হিসেবে আমার একটা কঠোর আদর্শ আছে৷ সেটা মেনে চলি৷ দুর্নীতি বা অন্যায় দেখলেই সাধ্যমতো বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি৷ কিন্তু বুঝতেই পারছেন, আমার শারীরিক সামর্থ্য ততটা নেই৷ তাই অনেক সময় পিছিয়ে আসতে হয়৷ যেমন ধরুন, মোহন পারেখের ব্যাপারটা...৷

বললুম, —মোহন পারেখকে আপনি চিনতেন নাকি?

—আলবাত চিনতুম৷ ও তো মাস্তানটাইপ ছোকরা, মশাই৷ দিল্লিতে এসে গত বছর যা সব কাণ্ড করেছিল, ভাবতে পারবেন না৷ আর আজকালকার মেয়েগুলোর কী ব্যাপার দেখুন! ছ্যা ছ্যা ছ্যা! পারেখকে দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে তক্ষুনি৷ তা বুঝলেন মিঃ চাউড্রি? মিসেস মালহোত্রা যখন কথায়-কথায় সেদিন আমাকে বললেন, এবারও প্ল্যানচেটের আসর করব এবং মোহন পারেখ মিডিয়াম হবে—তাকে আনতে টেলি করেছি, আমার খুব রাগ হল৷ খবর নিলুম, গ্রিন ভিউয়ে ওর জন্যে ঘর বুক করা হয়েছে৷ জয়ন্তী দেবী আর শ্যামলী দেবীর মতো দুটি ফুলের মতো মেয়েকে পারেখ সামনে পেলে কী ঘটবে, ভাবতে বুক কেঁপে উঠল৷ ভাবলুম, ওঁদের সতর্ক করে দেওয়া দরকার৷ সোজাসুজি সামনাসামনি বললে তো অপমানিত হওয়ার ভয়৷ তাই লাধিয়া নদীর ধারে একটা গুহার মধ্যে সুযোগ পেয়ে একটা চিরকুট লিখে দিলুম৷

বাধা দিয়ে বললুম—জানি৷ আরও জানি, আজ ওই গুহার অন্ধকারে আমার পকেটে হাত ঢুকিয়েছিলেন৷ চিরকুটটা আবার কী হাঙ্গামায় ফেলে ভেবে ওটা খুঁজতে গিয়েছিলেন!

অধ্যাপক হাসলেন৷ —জানেন? তা কাণ্ড দেখুন৷ একালের মেয়েদের সত্যি বোঝা যায় না, মশাই৷ সেদিন ওটা পেয়ে ওরা মোটেও চমকালেন না, ভয় পেলেন না৷ বরং উলটে আমাকে দেখিয়ে-দেখিয়ে পারেখের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করলেন! আমার আবার ওই এক বাতিক৷ যাঃ, বেটাচ্ছেলে কখন নিষ্পাপ মেয়ে দুটোর সর্বনাশ করবে, কে জানে৷ খুব তক্কে-তক্কে রইলুম৷ দেখলুম, পারেখের সঙ্গে শ্যামলী দেবীরই জমে উঠেছে৷ জয়ন্তী দেবী যেন অভিমানে দূরে-দূরে ঘুরছেন৷ ৭ তারিখ বেলা এগারোটা নাগাদ পারেখের ঘরের দিকে নজর রেখেছি, দেখলুম বেটা বেরিয়ে এসে লাউঞ্জে গিয়ে দাঁড়াল—তারপর শ্যামলী এল নেমে৷ আমি ওঁদের ঢলাঢলি দেখেই বুঝলুম, আজই সর্বনাশটা ঘটবে৷ তাই অমনি পারেখের ঘরে ঢুকে ওয়ার্ডরোবের পিছনে লুকিয়ে থাকলুম৷ যদি সত্যি দেখি, বেটা মেয়েটির সর্বনাশ করতে যাচ্ছে—তা হলে আমার একদিন কী ওর একদিন! কান পেতে অপেক্ষা করছি, এমন সময় দু’জন ঢুকল৷ তারপর চাপা গলায় বলা শুরু হল৷ শুনেই পিলে চমকে গেল আমার৷ এ যে সম্পূর্ণ অন্য একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা চলছে! পারেখ বলছে, মহাবীর সিং নামে একজনের সঙ্গে ও ভূতের পাহাড়ে দেখা করতে যাচ্ছে—খুব গোপনীয় ব্যাপার৷ আর এই খামটা ওঁকে দেয়৷ খামটা খুব দামি৷ লুকিয়ে রাখতে হবে৷ ফোনে পারেখ জেনেছে, মিসেস মালহোত্রা এখন বাড়ি নেই৷ তা হলে তাঁকেই দিত৷ শ্যামলী বলল—সকালে তো উনি এসেছিলেন, তখন দিলেন না কেন খামটা? পারেখ বলল—তখন দেওয়ার কোনও প্রশ্ন ওঠেনি৷ তা ছাড়া ওটা বিশেষ করে শ্রীমতী মালহোত্রাকে সে দেওয়ার কথা ভাবতেও পারে না! যাই হোক, শ্যামলীকে তার ভালো লেগেছে৷ তাকে সে বিশ্বাস করে বলেই রাখতে দিচ্ছে৷ শ্যামলী খামটা বুকে ভরে ফেলল দেখলুম৷ তারপর দু’জনে বেরিয়ে গেল৷ এবার আমার অবস্থা বুঝুন! বেরোব কীভাবে? দরজা তো লক করে দিয়ে গেল৷ মনে পড়ল, ঠিক তিনটেয় সুইপার আসে ঘর সাফ করতে৷ সর্বনাশ!

—তা হলে ওইদিন আপনি তিনটে অবধি পারেখের ঘরে বন্দি থাকলেন?

—হ্যাঁ৷ কী দুরবস্থা বুঝুন! কর্নেলকে মিথ্যে বলতে হল যে জলপ্রপাত দেখতে গিয়েছিলুম৷

—বেরোলেন কীভাবে?

—পারেখের বিছানায় শুয়ে সময় কাটাচ্ছিলুম৷ (মশাই, বেটাচ্ছেলে মরে নরকেই গেছে!) সেই সময় ওর বিছানার তলায় যা-সব ছবি পেয়েছিলুম, ছ্যা-ছ্যা৷ খিদে ভুলিয়ে দিয়েছিল৷

—আহা, বেরোলেন কী করে?

—দরজা দিয়ে৷ সুইপার ঢুকল হোটেলের চাবিতে দরজা খুলে৷ আমি বেরিয়ে গেলুম৷ ব্যাটা হাঁ করে তাকিয়ে রইল৷ ভাবল, পারেখের কুটুম্ব হবেন! যাক গে, খুনি ধরা পড়ল৷ এখন দেখা যাক, বিচারে কী হয়৷ দেখবেন—প্রমাণাভাবে বেকসুর খালাস হয়ে যাবে৷ আজকাল তো বিচার নয়—প্রহসন! প্রহসন!

এতক্ষণে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, মেজর জেনারেল হরগোবিন্দ সিং, ডঃ সীতানাথ পট্টনায়ক, শ্রীমতী সরোজিনী মালহোত্রা আর খান্না সায়েব বেরোলেন৷ ডঃ পট্টনায়কের হাতে একটা কাগজের মোড়ক৷

তারপর জয়ন্তী আর সরযূ বেরিয়ে এল কিচেন থেকে— দু’জনেরই হাতে ট্রে৷ সরযূ চলে গেল৷ জয়ন্তী কফি তৈরি করতে থাকল৷ কর্নেলরা এসে ভিড় জমালেন৷

আমি কর্নেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলুম৷ প্রথামতো তাঁর এবার একটি দীর্ঘ ভাষণ দেওয়ার কথা৷ রহস্যের সমাধান ও চুলচেরা বিশ্লেষণ থাকবে তাতে৷

একটু পরেই কফিতে চুমুক দিতে-দিতে কর্নেল বললেন—জয়ন্ত উসখুস করছে৷ ওর দু-চোখে কৌতূহল ক্রমশ তীব্র হচ্ছে৷ কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই হত্যাকাণ্ডে বিশেষ কোনও রহস্য নেই৷ এত প্রাঞ্জল ব্যাপার আমার অভিজ্ঞতায় এই প্রথম৷

তা হলে একেই বলে সাতকাণ্ড রামায়ণ পড়ে সীতা কি রামের মাসি? প্রাঞ্জল ব্যাপার মানে? এমন জটিল গোলমেলে ধাঁধায় ভরা হত্যাকাণ্ড কে কোথায় শুনেছে? আমি অবাক হয়ে তাকালুম ওঁর দিকে৷

কর্নেল বললেন—প্রথম কথা, শ্রীমতী মালহোত্রার বিশ্বাসে আমি আঘাত করতে চাইনে—যা ঘটেছে, উনিও জানেন৷ আমি শুধু সংক্ষেপে তথ্যগুলো সাজিয়ে দিতে চাই৷ আমাদের দ্বিতীয় মিডিয়াম যে উদ্দেশ্যে অভিনয় করেছেন, শ্যামলীও তা করেছিল৷ উদ্দেশ্য, প্রেতাত্মার অছিলায় একটি হত্যাকাণ্ড ফাঁস করে দেওয়া৷ শ্যামলী সম্ভবত হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল৷ প্রচণ্ড ভয়ও পেয়েছিল৷ এই বিদেশে তারা দুটি মাত্র মেয়ে, চারপাশে অনাত্মীয়, সদ্য চেনা মানুষ৷ আজকাল পুলিশেও লোকের বিশ্বাস নেই৷ তাই তার পক্ষে এই বিভ্রান্তি খুবই স্বাভাবিক৷ অবশ্য জয়ন্তীকে সে বলতে পারত৷ বলেনি, পাছে জয়ন্তীর যা অতি-সাহসী চালচলন এবং বেপরোয়া মনোভাব—সে হইচই বাধিয়ে বসে এবং পরিণামে মহাবীরের হাতে তারা বিপদগ্রস্ত হয়৷ আবার, শ্রীমতী মালহোত্রাকেও সে বলেনি৷ সেও একই কারণে সম্ভবত৷ আমার ধারণা, মোহন পারেখ বিস্তারিত তথ্য তাকে জানায়নি৷ তাই শ্যামলী ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, কী করা উচিত৷ সে সময় নিচ্ছিল ভাবতে—অথবা এড়িয়ে যেতে চাইছিল৷ ভেবেছিল, থাক, নাক গলিয়ে লাভ নেই৷

জয়ন্তী বলে উঠল—ঠিক তাই৷ সেদিন আপনাদের সঙ্গে আসতে-আসতে সে বলেছিল, পরদিনই ভোরের বাসে চলে যাবে৷ জায়গাটা অসহ্য লাগছে৷ আমি অবাক হয়েছিলুম৷ কিন্তু ও যা অভিমানী আর জেদী, তাই হ্যাঁ না কিচ্ছু বলিনি৷

কর্নেল বললেন—ঘটনাচক্রে শ্রীমতী মালহোত্রার প্ল্যানচেটের আসরে উপস্থিত থাকার সুযোগ পেল৷ তখন সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইল৷ ভাবল, প্রেতের ঘাড়েই দায়টা চাপাবে৷ খুবই স্বাভাবিক শোনাবে হত্যাকাণ্ডের খবর৷ সে যদি নিপুণ অভিনয় করতে পারে, হত্যাকারীও ভয় পেয়ে ভাববে, প্রেতেরই কীর্তি! এ সবই অনভিজ্ঞ শ্যামলীর বালিকাসুলভ আচরণের পরিচয়৷ সে ভাবল—এমনিভাবে বিবেকদংশনের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবে, আবার মাথাও বাঁচাতে পারবে৷ কী বলেন ডঃ পট্টনায়ক?

ডঃ পট্টনায়ক বললেন—আপনার হাইপোথিসিস যুক্তিসিদ্ধ কর্নেল৷

—আমার ধারণা, হত্যাকারীর নামটা সে হয়তো বলত না৷ অতটা সাহস তার ছিল না৷ সে বারবার ‘বলব না’ বলছিল মনে পড়ছে? কিন্তু হত্যাকারী তো অন্তর্যামী নয়৷ সে আর এক সেকেন্ডও রিস্ক নিতে চাইল না৷ ভাবল, আর এক মুহূর্তে নামটা বলে ফেলবে শ্যামলী৷ তাই সে জিভারোদের প্রথায় বিষাক্ত হুল ওর মাথায় বিঁধিয়ে দিল৷ হত্যাকারীও ভাবল, বাঃ! চমৎকার হল৷ প্রেতের ঘাড়েই চলে যাবে হত্যাকাণ্ডটা৷ কারণ, এই অদ্ভুত বিষের কথা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান জানবে কেমন করে? বিশেষ করে শ্যামলীর মুখের বীভৎসতা আশা করি মনে পড়ছে আপনাদের৷ মৃতের মুখের অমন চেহারা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে একেবারে অপরিচিত সিম্পটম! কাজেই ডাক্তাররা হাল ছেড়ে বলবেন, মৃত্যুর কারণ দুর্জ্ঞেয়৷ তার মানে—প্রেতের হত্যাকাণ্ড বলে বিশ্বাস করানো তখন বেশ সহজ হয়ে উঠবে!

ডঃ পট্টনায়ক বললেন— দেখুন না, অজ্ঞাত কিছু ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়েছে বুঝতে পেরেছিলুম৷ অথচ সেই চিহ্ন খুঁজতে স্বভাবত আমরা দেহের অন্যান্য অংশে খুঁজেছি৷ মাথা খুঁজিইনি৷ যখন কর্নেল বললেন, প্যাথোজেনের প্রথম পর্যায়ের কলোনি কোথায় রয়েছে—তখনই মাথায় সূচের সূক্ষ্ম দাগ চোখে পড়ল৷ কারণ মাথাতেই সেই কলোনির খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলুম৷

কর্নেল বললেন—এই মহাবীর সিং ওরফে জাল পুলিশ সুপার রঘুবীর জয়সোয়াল উদয়চাঁদ ঝুনঝুনওয়ালা—যে ছিল ‘হরিপ্রসাদ মালহোত্রার ব্যবসায়ের পার্টনার, সে একসময় দক্ষিণ আমেরিকায় ছিল৷ ওর আদি কীর্তির কথা কাস্টমস, সি-বি-আই, আর বোম্বে পুলিশের নথিভুক্ত হয়ে রয়েছে৷ শ্রীমতী মালহোত্রার কাছে এসব তথ্য আমরা জানতে পেরেছি৷ ওর খপ্পরে পড়ে দেনায় ডুবে যেতে থাকেন হরিহরজি৷ তখন ওরই পরামর্শে নির্বোধের মতো বিস্তর বেআইনি পথে টাকা রোজগারের চেষ্টা করেন৷ এর ফল হল আরও গুরুতর৷ উলটে মহাবীর সিং তাঁকে ব্ল্যাকমেল শুরু করল৷ তখন হরিহরজি একদিন ঝোঁকের মাথায় আত্মহত্যা করলেন৷ জিপসুদ্ধ ঝাঁপ দিলেন দিল্লি থেকে নৈনিতাল আসার পথে এক পাহাড়ি খাদে৷

...এবার এখানে একটা কথা উল্লেখ করা দরকার৷ সরোজিনী দেবী উচ্চশিক্ষিতা মহিলা— নৈনিতাল গার্লস কলেজের অধ্যক্ষা৷ কিন্তু স্বামীর সঙ্গে বরাবর তাঁর বনিবনা ছিল না৷ স্বামীর কারবার এবং চালচলন মোটেও পছন্দ করতেন না৷ তিনি থাকেন নৈনিতালে, হরিহরজি দিল্লিতে৷ তিনি ভুলেও আনকালচার্ড স্বামীর কাছে যেতেন না৷ স্বামী আসতেন কদাচিৎ৷ তাই স্বামীর পার্টনারটিকে তিনি জানতেন না—চিনতেনও না৷ এমনকী স্বামীর ব্যবসায়ে অত সব গুরুতর কাণ্ডেরও খবর রাখতেন না৷

....এবার আসি মোহন পারেখের প্রসঙ্গে৷ মোহন হরিহরজির বাল্যবন্ধুর ছেলে৷ আজীবন মালহোত্রা পরিবারে তার যাতায়াত ছিল৷ নিঃসন্তান স্বামী ও স্ত্রী দু’জনের কাছেই সে স্নেহাস্পদ হয়ে উঠেছিল৷ বোম্বেতে ভাগ্যান্বেষণে গেলে মোহনকে বরাবর হরিহরজি টাকা পাঠাতেন৷ সরোজিনীও কখনও-সখনও পাঠাতেন৷ হরিহরজি যখন ক্রমাগত উদয়চাঁদ বা মহাবীরের হাতে শোষিত হচ্ছেন, তখন স্ত্রীকে ভয়ে বা সংকোচে সব জানাতে না পেরে পুত্রাধিক প্রিয় মোহন পারেখকে এক দীর্ঘ চিঠিতে তা জানিয়ে দিলেন এবং আত্মহত্যার সঙ্কল্পটাও গোপন রাখলেন না৷ সে চিঠি আমরা পেয়েছি সরোজিনী দেবীর কাছে৷ যাই হোক, চিঠি পেয়ে তক্ষুনি প্লেনে দিল্লি এল মোহন৷ এসে শুনল, হরিহরজি নৈনিতাল রওনা হয়ে গেছেন৷ ঊর্ধ্বশ্বাসে মোহনও রওনা হল৷ তখন দেরি হয়ে গেছে৷ পথে জিপ দুর্ঘটনা দেখতে পেল সে৷ নৈনিতাল পৌঁছে সরোজিনীকে সব জানাল৷ তারপর বলল, পিতাজির এই অসহায় মৃত্যুর প্রতিশোধ সে নেবেই৷ কিন্তু তখন কোথায় সেই উদয়চাঁদ ঝুনঝুনওয়ালা? দিল্লি থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে গেছে...৷

...অবশেষে মোহন শরণাপন্ন হল বোম্বের এক প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির৷ দিনে দিনে এজেন্সি তাকে উদয়চাঁদের তথ্য জানাল৷ তখন সে দিল্লিতেই জয়পুরের রিটায়ার্ড পুলিশ সুপার রঘুবীর জয়সোয়াল সেজে বাস করছে৷ কিন্তু তার আদি অকৃত্রিম নাম মহাবীর সিং৷ অনেক বছর আগে আন্তর্জাতিক চোরাকারবার-চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকায় বোম্বেতে তার জেল হয়৷ কয়েদি হিসেবে থাকার সময় জেলের পোশাকপরা তার একটা ছবি জেলকর্তৃপক্ষ সরকারি প্রয়োজনে তুলে রেখেছিলেন৷ ডিটেকটিভ এজেন্সি সেই ছবির নেগেটিভ ঘুষ দিযে কীভাবে হাতায় এবং মোহনকে দেয়৷ সেই সঙ্গে মোহনকে এজেন্সি জানাল, মহাবীর সিং জেল থেকে পালিয়ে গিয়েছিল৷ পুলিশ তাকে খুঁজছে—পাত্তা পায়নি৷ যাই হোক, এতদিনে সে দিল্লিতে নিজেকে জয়পুরের রিটায়ার্ড পুলিশ সুপার বলে পরিচয় দিয়ে বাস করছিল৷ আসল রঘুবীর জয়সোয়াল কবে মারা গেছেন৷

এবার শ্রীমতী মালহোত্রা চোখের জল মুছে বললেন, —আমার স্বামীর পার্টনারকে কখনও আমি দেখিনি৷ ওর ওই জাল নামগুলো মোহন আমাকে পরে সব জানিয়েছিল৷ কিন্তু বেচারা মোহন নিজেই এক লোভে পড়ে গেল৷ ওর মাথায় ফিল্ম প্রোডিউস করার ঝোঁক চেপেছিল৷ তাই মালহোত্রাজির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার ছলে শুরু করল রঘুবীর জয়সোয়ালকে ব্ল্যাকমেলিং৷

জয়ন্তী বলল, —ব্ল্যাকমেলিং?

অধ্যাপকও বললেন, —কী কাণ্ড!

কর্নেল বললেন, —হ্যাঁ, মোহন ওর কাছে টাকা আদায় শুরু করল৷ সেই নেগেটিভ থেকে পজিটিভ প্রিন্ট দেখিয়ে সহজেই কাবু করল তাকে৷

জয়ন্তী বলল, —৭ জুন দুপুরে ভূতের পাহাড়ে তা হলে মোহন পারেখ টাকা আনতে গিয়েছিল?

—হ্যাঁ৷ টাকা আনতে তো বটেই, হয়তো আরও কোনও প্রলোভন দেখিয়েছিল মহাবীর৷ একটু বেশি সাহস দেখিয়ে ফেলেছিল মোহন পারেখ৷ ফলে প্রাণ হারাতে হল৷ মহাবীর মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবার৷

মেজর জেনারেল হরগোবিন্দ সিং বললেন, —মিসেস মালহোত্রা, আপনি তো উদয়চাঁদ ওরফে মহাবীরকে কখনও দেখেননি৷ কিন্তু এখানে কেমন করে চিনেছিলেন ওকে? মোহনকেই বা তার আসার অত আগে টেলিগ্রাম করেছিলেন কেন? কেমন করে জানলেন মহাবীর ওরফে জয়সোয়াল এখানে আসবে?

শ্রীমতী মালহোত্রা বললেন, —এখানকার সবক’টা হোটেলে বাইরের লোক সিজনে বেড়াতে এলেই আমি যেচে গিয়ে আলাপ করি৷ আমন্ত্রণ করে আসি৷ এ আমার বরাবরকার অভ্যাস৷ সোসাইটি ছাড়া আমার দম আটকে যায়৷ এমনকী কারা-কারা আসবেন, অগ্রিম কারা ঘর বুক করেছেন—সে খোঁজও নিই৷ গ্রিন ভিউ হোটেলে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখি, এক রিটায়ার্ড পুলিশ সুপার রঘুবীর জয়সোয়াল অগ্রিম বুক করেছেন দিল্লি থেকে৷ অমনি চমকে উঠি৷ মোহনকে টেলি করে দিই তক্ষুনি৷ মোহন এসে পৌঁছায় ৬ জুন রাত্রে৷ ৭ জুন সকালে ওর সঙ্গে পরামর্শ করি৷ ঠিক হয় যে প্ল্যানচেটের আসর বসাব এবং মোহনকে মিডিয়াম করে ওর মুখ দিয়ে মহাবীর সিংয়ের কীর্তি ফাঁস করে দেব৷ ডিটেলস সব বলে যাবে মোহন৷ আমার স্বামীর আত্মা যেন কথা বলছেন মিডিয়ামের মুখ দিয়ে—এভাবেই সব আয়োজন করেছিলুম৷ কিন্তু মোহন—বেচারা মোহন! বেটা আমার!

বলতে-বলতে হঠাৎ কেমন অস্বাভাবিক হয়ে গেল শ্রীমতী মালহোত্রার দৃষ্টি৷ নাসারন্ধ্র কাঁপতে থাকল৷ তারপর দু-হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন৷ তারপরই উঠে দাঁড়ালেন৷ বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, —আমি ওর কলজে উপড়ে খাব৷ ওর চোখ দুটো গেলে দেব৷ ওর নাড়িভুঁড়ি টেনে বের করে ফেলব৷

জয়ন্তী ওঁকে ধরতে যাচ্ছিল, তার আগেই উনি আমাকে সোফাসুদ্ধ উলটে ফেলে দিলেন৷ তারপর ঘরময় ছোটাছুটি শুরু করলেন৷ দমাদ্দম সব ভাঙচুর করতে থাকলেন৷

কয়েকটি সেকেন্ডে এই উপদ্রব ঘটে গেল৷ তখন লছমন আর সরযূ দৌড়ে এসে ওঁকে ধরল৷ অধ্যাপক, মেজর জেনারেল আর আমিও গিয়ে যোগ দিলুম৷ শ্রীমতী মালহোত্রা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন৷ সরযূ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল৷

ওঁকে ধরাধরি করে সবাই ওঁর শোওয়ার ঘরে নিয়ে গেলুম৷ ডঃ পট্টনায়ক শুশ্রূষা করতে ব্যস্ত হলেন৷

বাইরে বেরিয়ে কর্নেল বললেন, —মানুষের জীবনে এমন কত ট্র্যাজেডি যে ঘটে! হতভাগিনী শ্রীমতী মালহোত্রার পরিণতি ভাবতে আমি শিউরে উঠছি৷ আমি ডাক্তার নই জয়ন্ত, কিন্তু অভিজ্ঞতার বিচারে টের পেয়ে গেছি, ভদ্রমহিলা বাকি জীবন এভাবেই বেঁচে থাকবেন৷ সারাজীবন স্বামীর সঙ্গে বনিবনা ছিল না—বুঝতে পারেননি কী হারাচ্ছেন৷ একদা স্বামীর ওই নিষ্ঠুর আত্মহত্যার ঘটনা তাঁর অবচেতনে তীব্র আঘাত দিল৷ তারপর এই বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতায় ক্রমশ টের পেলেন, কী থেকে বঞ্চিত হয়েছেন৷ তখন ধীরে-ধীরে দীর্ঘসঞ্চিত অতৃপ্তি, আত্মগ্লানি, অনুশোচনা আর ক্রোধ একসঙ্গে বিষাক্ত স্ফোটকের সৃষ্টি করল অবচেতনে৷ আমরা যা দেখছি, তা তারই কিছু প্রকাশ মাত্র৷ কিন্তু না—এর জন্যে উনি নিজেও হয়তো দায়ী নন৷ কিছুটা দায়ী মহাবীর সিংও বটে৷ আর কিছুটা দায়ী অন্য একজন—তাকে, আমি এক অলৌকিক শক্তিই বলব৷ এই প্রচ্ছন্ন গভীরতর নেপথ্যচারী শক্তি যেন মানুষের প্রকৃত গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করছে আবহমানকাল৷ তার হাত থেকে মানুষের মুক্তি নেই৷ হ্যাঁ জয়ন্ত, কিছু অলৌকিক আছেই আড়ালে৷

কর্নেল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ আমি ও জয়ন্তী কোনও কথা বললুম না৷ একটু পরে গ্রিন ভিউয়ের লনে পৌঁছে কর্নেল জয়ন্তীর দিকে ঘুরে বললেন, —ইয়ে জয়ন্তী ডার্লিং, শুনে খুশি হবে যে, মেজর জেনারেল হরগোবিন্দজি তাঁর হেলিকপ্টারে শ্যামলীর বডিটা দিল্লি পৌঁছে দিতে রাজি হয়েছেন৷ বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় বডিটা এখন ডাঃ প্রসাদের জিম্মায় রয়েছে৷ তা ডার্লিং, আমার এই তরুণ বন্ধুটির মনে কষ্ট হলেও উপায় নেই, কাল সকালেই তোমাকে শ্যামলীর বডি নিয়ে মেজর জেনারেলের সঙ্গে হেলিকপ্টারে রওনা হতে হবে৷ তৈরি হয়ে থেকো৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%