রামপুরের মানুষ-খেকো

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

সেই ছোট্ট, অথচ রীতিমতো রোমাঞ্চকর ঘটনাটা আমি ভুলেই গিয়েছিলুম এবং ভুলেই থাকতুম, যদি না গত রবিবার আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের হাতে রাইফেলটা দেখতে পেতুম৷

রাইফেলটা খুলে উনি লোশন দিয়ে পরিষ্কার করছিলেন৷ সামরিক জীবনে তো উনি সাংঘাতিক সব আগ্নেয়াস্ত্র ঘেঁটেছেন৷ কিন্তু অবসর জীবনে একসময় ওঁর শিকারের নেশা ছিল এবং এই রাইফেলটা তারই নিদর্শন৷ আমার সঙ্গে পরিচয়ের পর যে-কর্নেলকে দেখেছিলুম, তিনি তখন শিকারি নন৷ প্রকৃতিবিজ্ঞানী হয়ে উঠেছেন৷ বিরল প্রজাতির পাখি-প্রজাপতি-অর্কিডের খোঁজে বনজঙ্গল পাহাড়-পর্বত—যত রকমের দুর্গম জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ তবে—নাঃ! শিকারি নন বলাটা ঠিক হবে না৷ কর্নেল তখন অপরাধীদের শিকার করার সুযোগ পেলেই তাদের পিছনে ছোটাছুটি করেন৷

তো সেদিন কর্নেলকে রাইফেলটা পরিষ্কার করতে দেখে বললুম—কী ব্যাপার? আবার কি বন্যজন্তু শিকার করতে বেরুবেন নাকি? আপনার জানা উচিত, এখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের আইন খুব কড়া৷

কর্নেল হাসলেন—জয়ন্ত! এই রাইফেলটা দেখে তোমার কি মনে পড়ছে না রামপুরের জঙ্গলে সেই অদ্ভুত মানুষ-খেকো বাঘটার কথা?

অমনি ঘটনাটা আমার মনে পড়ে গেল৷

অনেক বছর আগের কথা৷ সে-বার ডিসেম্বর মাসে প্রচণ্ড শীতের সময় কর্নেলের সঙ্গে রামপুরের জঙ্গলে ফরেস্ট বাংলোয় উঠেছিলুম৷ তখনই একটা মানুষ-খেকো বাঘের কথা চৌকিদারের মুখে শুনেছিলুম৷

পরদিন সকালে হঠাৎ দেখি পুলিশের জিপে চেপে একজন পুলিশ অফিসার কর্নেলের সঙ্গে দেখা করতে এলেন৷ কর্নেল আমার সঙ্গে তাঁর আলাপ করিয়ে দিলেন৷ ইনি রামপুর এলাকার পুলিশ সুপার৷ তাঁর নাম রাজাধিরাজ সিংহ৷

মিঃ সিংহের কাছে কর্নেল মানুষ-খেকো বাঘটার খবরাখবর নিলেন৷ মিঃ সিংহ যা জানালেন, তা সংক্ষেপে এরকম:

ক’দিন আগে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যে-হাইওয়ে গেছে, তিনজন লোক সাইকেল চেপে আসছিল, একের পর এক—কেউ পাশাপাশি ছিল না৷ প্রথম সাইকেলটা বাঁকের দশ গজ দূরে যখন, তখন হঠাৎ বাঁ-দিকের পাথরের পাঁচিলে একটা বাঘ উঠে আসে৷ ব্রেক কষবার আগেই সে রাস্তার মাঝখানে লাফিয়ে পড়ে৷ তার ফলে সাইকেলের সঙ্গে তার ধাক্কা লাগে৷ অমনি সে গর্জন করে ওঠে৷ এদিকে লোকটা সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে ছিটকে সরে আসে, সাইকেলটা পড়ে যায় এবং চাকা ঘুরতে থাকে৷ পিছনের লোকদুটো কিছু লক্ষ্য করেনি৷ তাই তারাও এসে প্রথম সাইকেলটার ওপর একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এবং সামনে বাঘ দেখে লাফ দিয়ে সরে আসে৷ তিনটে সাইকেলের চাকা বোঁ-বোঁ করে তখন ঘুরছে এবং একটা বাঘ ক্ষেপে গিয়ে থাবা মারছে একবার এটায়, একবার অন্যটায় আর প্রচণ্ড গর্জাচ্ছে৷

অন্যদিকে পাথরের গায়ে সেঁটে তিনটে ভয়-পাওয়া মানুষ কাঠ হয়ে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে! তাদের পালাবার ক্ষমতাও নেই৷

বাঘটা কিছুক্ষণ সাইকেল তিনটের সঙ্গে লড়াই করার পর বিরক্ত হয়েই যেন শেষ ডাক ছেড়ে ডান-দিকের পাঁচিলে লাফিয়ে ওঠে এবং অদৃশ্য হয়৷ তখন লোক তিনটে ধীরেসুস্থে সাইকেলের কাছে আসে৷ আশ্চর্য, সাইকেলের কোনো ক্ষতিই হয়নি৷

তারা এরপর কী করেছিল, বোঝাই যায়৷ ঘণ্টায় কমপক্ষে পঞ্চাশ-ষাট মাইল বেগে পালিয়ে যাওয়া এক্ষেত্রে স্বাভাবিক৷ প্রথমেই যে-বসতিতে তারা পৌঁছয়, সেখানে হুলুস্থুল শুরু হয়েছিল৷ কারণ লোকেরা দেখে, তিনটে সাইকেলওয়ালা আচমকা ঝড়ের মতো এসে সাইকেল থেকে লাফ দিয়ে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়৷ সাইকেলগুলো আবার চারদিকে ছিটকে পড়ে৷

জ্ঞান হলে তাদের মুখে সব জানা যায়৷ কিন্তু ঘটনার শেষ এখানে নয়৷ পরদিন সকালে দেখা গেল, সেই বসতির এক বুড়ি উঠোনে পড়ে আছে৷ ক্ষতবিক্ষত শরীর৷ বোঝা যায় বাঘটা টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল বুড়িকে—পারেনি৷ কেন পারেনি কে জানে৷ কিন্তু পায়ের খানিকটা মাংস খুবলে খেয়ে গেছে৷

এরপর দ্বিতীয় শিকারের খবর পাওয়া গেল মাঠের ক্ষেতে৷ একটা বুড়ো ঘাস কাটতে গিয়েছিল বিকেলে৷ কিন্তু রাতেও সে ফিরল না৷ ব্যাপারটা অনুমান করে গাঁয়ের লোক পরামর্শে বসল৷ কিন্তু রাতের বেলায় সাহস করে কেউ খুঁজতে বের হল না৷ পরদিন সকালে দেখা গেল একই দৃশ্য৷ এবারেও বাঘটা বুকের কিছুটা খেয়েছে—টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে৷ পারেনি৷

আজ সকালে ঘটেছে আরেক বীভৎস কাণ্ড৷ সেই গাঁয়ের মোড়লকে বাঘটা একইভাবে মেরে রেখে গেছে৷ মোড়লের বাড়ির পিছনে জঙ্গল আছে৷ তার নিচে ধাপবন্দি পাহাড়ি ক্ষেত৷ মোড়লকে সম্ভবত শেষরাতে আক্রমণ করেছিল৷ কিন্তু এবার বাঘটা ঘরে ঢুকেছিল৷ ঘর থেকে তাকে টেনে উঠোন পার করে ক্ষেতে নিয়ে যায়, তারপর একইভাবে বুকের খানিকটা খেয়ে রেখে যায়৷ লাশটা এখনও রয়েছে৷ কাছেই দু’টো গাছে দু’টো মাচান বাঁধা হয়েছে৷ কর্নেল এবং মিঃ সিংহ সেখানে বাঘটার আশায় বন্দুক-হাতে অপেক্ষা করবেন৷

কর্নেল আরও জানালেন, প্রথম ঘটনার পরই সরকারী শিকারিরা লাশের কাছে ওঁৎ পেতে রাত জাগেন৷ কিন্তু বাঘটা আর আসেনি৷ দ্বিতীয় লাশের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে! এ থেকে মনে হচ্ছে, মোড়লের লাশের কাছেও সে আসবে কিনা সন্দেহ৷ তবে...

ওঁকে চুপ করতে দেখে মিঃ সিংহ বললেন—তবে কী কর্নেল?

কর্নেল কেমন হেসে বললেন—আমার ধারণা এবার বাঘটা আসার চান্স আছে৷ অন্তত যদি বুদ্ধিমান বাঘ হয়, তাহলে তো আসা একান্ত উচিত৷ না এলেই যে সে প্রাণে মারা পড়বে!

আমরা দু’জনেই হতভম্ব হয়ে গেলুম৷ বলেন কী! বাঘটা মড়ির কাছে না এলে মারা পড়বে! এ কী উদ্ভট কথা! মড়ির কাছে এলে তবে না গুলি খেয়ে বাঘ মারা পড়ে৷ মিঃ সিংহ অবাক হয়ে বললেন—এ হেঁয়ালির মানে কী কর্নেল?

হেঁয়ালি? মোটেও না! বলে কর্নেল ঘনঘন মাথা নাড়তে থাকলেন৷ একটু পরে বললেন—বুঝলেন না? বাঘ মানুষ-খেকো হয় কেন? যখন শিকার ধরবার স্বাভাবিক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, তখন বাঘ সবচেয়ে সহজে ধরার মতো শিকার মানুষের ওপর হামলা করে৷ এই বাঘটার ব্যাপার-স্যাপারগুলো দেখুন৷ প্রথম ঘটনা সেই সাইকেল পর্ব৷ ওই অবস্থায় বাঘ বিরক্ত হয়ে ওদের আক্রমণ করাটা স্বাভাবিক ছিল৷ কিন্তু তা করেনি৷ বোঝা যায়, বাঘটার মধ্যে সুস্থতার লেশমাত্র নেই৷ অর্থাৎ সে ভীতু, কিম্বা স্বাভাবিক প্রবৃত্তিজাত ক্ষমতা তার মধ্যে নেই৷ এ অবস্থা বাঘের কখন হয়? যখন কোনো কারণে সে শারীরিক কিছু দরকারী ক্ষমতা হারায়৷ এটা নিছক বার্ধক্যের দরুন না হতেও পারে৷ বরং কোনো শিকারির গুলিতে সে স্বাভাবিক তৎপরতা হারিয়ে অক্ষম হয়ে গেছে, কিম্বা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী জন্তুর সঙ্গে যুদ্ধে তা হারিয়েছে৷ এই বাঘটার প্রথম একটা বৈশিষ্ট্য দেখুন—সে তার মড়ি টেনে নিয়ে গিয়ে নিরাপদ জায়গায় লুকোতে পারে না৷ অর্থাৎ তার শিকার বইবার ক্ষমতা নেই৷ দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য—সে আর মড়ির কাছে ফেরে না৷ তার মানে, নিশ্চয় কোথাও মড়ির ওপর বসা অবস্থায় গুলি খেয়েছিল৷

মিঃ সিংহ বললেন—তাহলে বলছেন কেন সে মোড়লের মড়ির কাছে এবার ফিরবেই?

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন—না এলে যে খিদের জ্বালায় মরতে হবে ওকে! প্রতি বার মড়ি পেট পুরে না খেয়ে পালাবে নাকি? খিদের জ্বালা বড়ো জ্বালা৷ এবার হয় তো সে একটা রিস্ক নেবে৷

এই ব্যাখ্যায় মিঃ সিংহ সন্তুষ্ট হলেন কিন্তু আমি হলুম না৷ এই বুড়ো ঘুঘুকে তো হাড়ে হাড়ে চিনি৷ ওঁর হেঁয়ালি বোঝার ক্ষমতা কারও নেই৷

কথা হল, আমরা ঠিক সূর্যাস্তের আগে সেই গাঁয়ে যাব এবং মড়ির কাছে মাচানে উঠব৷ তখনও ঘণ্টা দুই দেরি৷ আমি গড়িয়ে নিতে গেলুম ততক্ষণ৷ মিঃ সিংহ সেই ফাঁকে তাঁর জরুরি কয়েকটা ফাইল নিয়ে বসলেন—থানা থেকে লোক এসেছিল৷ আর কর্নেল বেরোলেন৷ বলে গেলেন—গ্রামেই অপেক্ষা করব আপনাদের জন্যে৷ আপনারা টাইমলি চলে যাবেন৷

রাইফেল হাতে কর্নেল বেরিয়ে গেলেন৷ এটা ওঁর পক্ষে স্বাভাবিক৷ সব কাজ ভালোভাবে খুঁটিয়ে না দেখে এগোবেন না৷ গ্রামে গিয়ে হয়তো বাঘটার সম্পর্কে আরও খবর জেনে নেবেন৷

সূর্য ডুবতে-ডুবতে আমি আর মিঃ সিংহ জিপে করে যথাস্থানে গেলুম৷ জিপটা গাঁয়ের কাছারির সামনে রেখে পায়ে হেঁটে আমরা ধাপবন্দি পাহাড়ি ক্ষেত ধরে এগোচ্ছি, হঠাৎ দেখি কর্নেল একটা কাঁটাঝোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন৷

কাছে গেলে বললেন—আসুন মিঃ সিংহ৷ এসো জয়ন্ত ডার্লিং৷ গুড ইভনিং!

মিঃ সিংহ বললেন—এখানে কী করছেন কর্নেল?

কর্নেল ঝোপে আটকানো একটা কাপড় দেখিয়ে বললেন—এটা পরীক্ষা করছিলুম৷ মোড়লের জামাটা আটকে আছে৷ চলুন, মাচানে ওঠার সময় হয়ে গেছে৷

লাশটা দেখে আমি শিউরে উঠলুম৷ আর দ্বিতীয়বার তাকাবার সাহস হল না৷ দশ গজ চওড়া পনেরো গজ লম্বা ছোট্ট ক্ষেতের মধ্যিখানে সেটা পড়ে আছে এক-পাশে কাত হয়ে৷ বীভৎস! তার পশ্চিমে একটা মস্ত নিমগাছ—সেখানে বিশ ফুট উঁচুতে মাচান দেখলুম৷

কর্নেল বললেন—মিঃ সিংহ, আপনি ওই মাচানে উঠুন৷ একটা কথা বলে রাখি৷ আমি শিস না দিলে কিন্তু কোনো প্রলোভনেও গুলি করবেন না—প্লীজ, কথা দিন৷

মিঃ সিংহ বললেন—অবশ্যই৷ কথা দিচ্ছি৷

কর্নেল আমার দিকে ঘুরে বললেন—ডার্লিং, তোমাকেই গুলি করার সুযোগটা দিতে চাই৷ এই নাও রাইফেল৷ এবার দেখব, তোমার হাতের টিপ কেমন! কিন্তু মনে রেখো, আমি শিস না দিলে তুমিও গুলি ছুঁড়বে না৷ কথা দাও!

এরপরে তাঁর সঙ্গে আমি পুবদিকের একটা গাছের মাচানে উঠলুম৷

কোনোরকম নড়াচড়া চলবে না৷ চুপচাপ বসে রইলুম৷ দেখতে-দেখতে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠল৷ সময় কাটতেই চায় না৷ তারপর আমাদের পিছনে চাঁদ উঠলে স্বস্তি পেলুম৷ হালকা জ্যোৎস্না গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মড়ির ওপর পড়ল৷ অরও কিছুক্ষণ পরে মড়িটা জ্যোৎস্নায় স্পষ্ট হয়ে উঠল৷ কিন্তু বাঘের কোনো লক্ষণ নেই৷ ঝিঁঝি ডাকছে একটানা৷ অনেক দূরে একবার শেয়াল ডাকল৷ তারপর আবার সব স্তব্ধ হয়ে গেল৷ গ্রামের দিকে শেষ আলোটিও নিভে গেল৷ চোখ জ্বালা করতে লাগল—একদৃষ্টে কতক্ষণ আর তাকিয়ে থাকা যায়! আস্তে-আস্তে উত্তেজনা থিতিয়ে একটা ঝিমধরা ভাব জাগল শরীরে৷ রাইফেলটা অসম্ভব ভারী লাগছিল৷ একবার হাত-পা ছড়াতে পারলে আরাম পাওয়া যেত৷ কিন্তু নড়াচড়া করা বারণ৷

গ্রামের দিকে সেই সময় কুকুরের ডাক শোনা গেল৷ কুকুরগুলোর বোকামি দেখে রাগ হচ্ছিল—কারণ ওরা ডাকতে-ডাকতে এদিকেই আসছে মনে হচ্ছিল—সাবধানে কর্নেলের দিকে ঘুরলুম৷ দেখি, তাঁর চোখ দুটো যেন জ্বলছে এবং কখন হুমড়ি খেয়ে বসে কিছু দেখছেন, লক্ষ্য করিনি৷ কুকুরের ডাক থেমে গেলে কর্নেল নড়ে বসলেন৷ এটা কি ঠিক হল? বাঘের চোখ খুব তীক্ষ্ণ৷ বিন্দুমাত্র নড়াচড়া সে টের পেয়ে যায়৷ কিন্তু কী আশ্চর্য, আমাকে আরও অবাক করে কর্নেল দেখলুম পা বাড়াচ্ছেন৷ এক পা নামিয়েছেন, যেন নামতে যাচ্ছেন৷ ফিসফিস করে ওঠার আগেই উনি আমার হাঁটুতে চাপ দিয়ে চুপ করার ইঙ্গিত দিলেন৷ তখন হতভম্ব হয়ে বসে ওঁর কাণ্ড দেখতে থাকলুম৷

কর্নেল নিঃশব্দে গাছ থেকে নেমে গেলেন৷ তারপর আর ওঁকে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও দেখতে পেলুম না৷ ব্যাপারটা কী? যেচে বিপদের মুখে পড়তে গেলেন কেন?

হঠাৎ আমার চোখ গেল মড়ির দিকে৷ কী একটা কালো বস্তু নড়াচড়া করছে ওখানে? তাহলে বাঘটা এসে গেছে৷ কিন্তু কর্নেলের শিস না শুনলে গুলি করা বারণ৷ হাত নিশপিশ করতে থাকল৷ কালো জন্তুটা কিন্তু মড়িতে বসল না! আশেপাশে ঘুরঘুর করছে৷ তখন মনে হল, ওটা তাহলে বাঘ নয়! সম্ভবত হায়েনা অথবা ভালুক৷ তা যদি হয়, তাহলে বোঝা যাচ্ছে বাঘটার আসা এখন অনিশ্চিত হয়ে গেল৷

আমার চোখ ছিল জন্তুটার দিকে৷ একটু পরে সেটা মড়ির কাছে স্থির হয়ে বসতেই দেখলুম, আমাদের মাচানের তলা থেকে আরেকটা জন্তু হামাগুড়ি দেওয়া মানুষের মতো এগোচ্ছে৷ চাঁদের আলো এই জায়গায় স্পষ্ট নয়—ছায়া আছে৷ কিন্তু জন্তুটা যে মড়ির দিকে এগোচ্ছে, তা ঠিক৷ উত্তেজনায় অস্থির হয়ে দেখতে থাকলুম৷

দ্বিতীয় জন্তুটা মড়ির কাছাকাছি যেতেই প্রথম জন্তুটা যেন লাফ দিয়ে উঠল৷ সে পালিয়ে যাবার তালে—তার ভঙ্গি দেখেই সেটা বোঝা গেল৷ কিন্তু অমনি দ্বিতীয় জন্তুটা তার ওপর ঝাঁপ দিল৷ নির্ঘাৎ মড়ি নিয়ে হায়েনা আর ভালুকে লড়াই বাধল৷

কিন্তু সেই মুহূর্তে কর্নেলের চিৎকার শুনলাম, আর টর্চও জ্বলে উঠল৷ কর্নেল ডাকছিলেন—মিঃ সিংহ৷ জয়ন্ত৷ চলে এসো৷ বাঘ ধরেছি!

বাঘ ধরেছেন৷ আমি মাচান থেকে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নেমে গেলুম৷ মিঃ সিংহও ততক্ষণে এসে পড়েছেন৷ হাতে টর্চ৷ গিয়ে দেখি, যে দুটো কালো জিনিসকে জন্তু ভেবেছিলুম—তা মানুষ এবং প্রথম জন্তুটা একজন অচেনা মানুষ, দ্বিতীয় জন্তুটা স্বয়ং কর্নেল নীলাদ্রি সরকার! লোকটাকে উনি জাপটে ধরে আছেন—লোকটার হাতে একটা বড়ো ছোরা৷ হাতদুটোসুদ্ধ ধরে কর্নেল ওকে বেকায়দায় ফেলেছেন৷

মিঃ সিংহ ছোরাটা কেড়ে নিয়ে হুইসেল বাজিয়ে দিলেন৷ অমনি গাঁয়ের দিক থেকে টর্চ জ্বেলে কারা সব দৌড়ে এল৷ ধুপধাপ শব্দ শুনে বুঝলুম, সবাই পুলিশ!

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম৷ কোথায় ম্যান-ইটার? এ যে নিতান্ত মানুষ!

বাংলোয় ফিরতে রাত একটা বেজেছে৷ ফেরার পর কর্নেল বললেন—জয়ন্ত কী খুব হতাশ হলে? বাঘের বদলে মানুষ! আই অ্যাসিওর ইউ ডার্লিং, এরপর তোমাকে সত্যিকারের মানুষ-খেকো বাঘ মারার চাল দেব৷ প্লীজ, রাগ কোরো না৷

আমি গুম হয়ে থেকেছি সারাক্ষণ৷ এবার বললুম—কিন্তু ব্যাপারটা কী?

কর্নেল বললেন—সামান্য৷ এ আমার বরাত জয়ন্ত৷ যেখানে যাব, খুন আর খুনি এসে আমার ঘাড়ে পড়বেই৷ এই দেখো না—ম্যান-ইটার মারব বলে আসর জাঁকিয়ে বসলুম এখানে অথচ এখানেও সেই খুন আর খুনি৷

এই বলে কর্নেল সব হেঁয়ালির সমাধান করলেন৷ সংক্ষেপে তা বর্ণনা করছি৷

তিনটি সাইকেলের সঙ্গে একটা খেয়ালি বাঘের সংঘর্ষ থেকেই এই খুনি লোকটার মাথায় মতলব খেলেছিল৷ সে হতভাগ্য মোড়লের একজন পুরনো শত্রু৷ জমিজমা নিয়ে বিবাদ ছিল৷ মামলায় হেরে সে ভূত হয়েছিল৷ কিন্তু মোড়লকে খুন করার সুযোগ পাচ্ছিল না, কারণ মোড়ল খুন হলেই তার ওপর স্বাভাবিক দায় পড়বে খুনের৷ সবাই জানে এই শত্রুতার কথা৷ অতএব সে সাইকেল ও বাঘের সংঘর্ষ থেকে মতলব আঁটল৷ কিন্তু প্রথমেই মোড়লকে খুন করলে পাছে কেউ কিছু সন্দেহ করে বসে—তাই সে অন্য রাস্তা নিল৷ এই ধূর্ততার কোনো তুলনা হয় না৷

প্রথমে খুন করল এক নিরীহ বুড়িকে৷ ঠিক বাঘে ধরার মতো চিহ্ন রাখল৷ ছুরি দিয়ে এমনভাবে খুনটা করল যে বাঘের নখ ও দাঁতের দাগ বলে সবার মনে হবে৷ মড়ি টেনে নিয়ে যাবার চিহ্নও রাখল৷ দ্বিতীয়বার খুন করল একই ভঙ্গিতে৷ তারপর তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য মোড়লকে খুন করতে আর অসুবিধে হল না৷ কারণ ততদিনে মানুষ-খেকো বাঘের খবর রটে গেছে৷ শিকারিরা এসেছে৷ মাচানে বসেছে৷ আবহাওয়া তৈরি হয়ে গেছে৷ অতএব মোড়লকে মারতে আর অসুবিধে নেই৷

কিন্তু কর্নেলের চোখ তীক্ষ্ণ৷ প্রথমেই তিনি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে অবাক হলেন৷ কোনো মড়ির আশেপাশে বাঘের পায়ের দাগ নেই কেন? মোড়লের মড়িটা তিনি হাতেনাতে দেখলেন, অন্য দুটো দেখার সুযোগ পাননি৷ মড়ি পরীক্ষা করেই ওঁর সন্দেহ বেড়ে গেল৷ মাথার খুলি দু-ফাঁক হয়েছে৷ এটা বাঘের থাবায় হতে পারে না৷ চুলে রক্ত জমাট হয়ে আছে৷ কিন্তু বুকে বা পেটে যেসব জায়গায় আঘাত আছে, তার কাছে কোথাও রক্ত নেই৷ আঘাতের মধ্যেও রক্ত নেই৷ তার মানে মড়ার ওপর ছুরি চালানো হয়েছে৷ আর জামা বা ধুতি যেভাবে ঝোপে আটকানো আছে, বাঘ টেনে নিয়ে গেলে অমনভাবে থাকতেই পারে না৷ সবচেয়ে অদ্ভুত কাণ্ড, মোড়লের লাশের নিচে মাটিতে একটা ফাটল আছে—ফাটলের মধ্যে একটা মোটা হাতুড়ির মাথা কর্নেলের চোখে পড়েছিল৷ হাতল থেকে খুলেই গিয়েছিল মাথাটা৷ সম্ভবত খুনির হাতে হাতুড়িটা ছিল৷ ওই অবস্থায় টেনে এনেছিল মড়িটা—তারপর কীভাবে খুলে ওখানে ঢুকে যায়৷ বাঘের মড়ি বলে লাশ কেউ ঘাঁটাঘাঁটি করেনি৷ তাই চোখে পড়েনি৷ কিন্তু কর্নেল তা দেখেছিলেন৷ তারপর কৌশলে গাঁয়ে রটিয়ে দিয়েছিলেন, গাঁয়ের কারও একটা হাতুড়ির মাথা হারিয়ে গেছে কিনা৷ এর ফলে খুনি সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে এবং ফাঁদে পা দেয়৷ সে এসেছিল হাতুড়ির মাথাটা নিয়ে যেতে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%