সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে করজোড়ে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন, ‘গতকাল সকালে আমিই ফোন করেছিলাম৷ আমার নাম শিবকালী রায়৷’
কর্নেল হাতের ইশারায় তাঁকে বসতে বললেন৷ ভদ্রলোক শীর্ণকায়৷ গায়ের রঙ কালো৷ খাড়া নাকের নীচে সরু গোঁফ৷ তাঁর পরনে ছাইরঙের পাঞ্জাবি এবং ধুতি৷ আমাকে তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টে লক্ষ্য করছিলেন৷
কর্নেল বললেন, ‘আলাপ করিয়ে দিই—জয়ন্ত চৌধুরী, দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার সাংবাদিক৷ আপনার সব কথা জয়ন্তের সামনেই বলতে পারেন৷ কারণ সে আমার সহকারী৷’
শিবকালীবাবু আমাকে নমস্কার করে বললেন, ‘হ্যাঁ, মনে পড়েছে বটে৷ ব্রজেনবাবু আপনার কথাও বলেছেন৷’
বলে তিনি কর্নেলের দিকে ঘুরে বসলেন৷ বললেন, ‘আপনাকে তো বলেছি কর্নেল সাহেব, বেজো মানে আমার পিসতুতো দাদা ব্রজেন পুলিশে চাকরি করত৷’
এই সময় যষ্ঠীচরণ ট্রে-তে তিন কাপ কফি নিয়ে এল৷ কর্নেল বললেন, ‘কফি খান, শিবকালীবাবু৷ আপনাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে৷ কফি নার্ভ চাঙ্গা করে৷’
তাঁকে কফি খেতে অভ্যস্ত নন বলেই মনে হচ্ছিল৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ কফি খাওয়ার পর তিনি বললেন, ‘এবার কথাটা আরম্ভ করি তাহলে৷’
কর্নেল বললেন, ‘হ্যাঁ৷ আপনার গুপ্তকথা এবার শোনা যাক৷’
শিবকালীবাবু কেন কে জানে, কর্নেলের কথা শুনে হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ‘গুপ্তকথাই বটে! তবে এখন আর গুপ্তকথা হয়ে নেই৷ সারা কাঞ্চনপুরে সাড়া পড়ে গেছে৷’
কর্নেল বললেন, ‘হ্যাঁ, গুপ্তকথা ফাঁস হলে এমনটা হয়৷ যাই হোক, এবার কথাটা বলুন৷’
শিবকালীবাবু অর্ধেক-খাওয়া কফির পেয়ালা ট্রে-তে রেখে প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন৷ তারপর চাপা গলায় বললেন, ‘একদিন নয়, পরপর তিনদিন একইরকম ঘটনা৷ রাত একটা বাজলেই প্রথমে আমার দাদা রক্ষাকালীর জানলার কাছে তারপর আমার ঘরের জানলার কাছে ফিসফিস করে কে বলে ওঠে—সুদে-আসলে এক লাখ৷ বার তিনেক একই স্বরে কথাটা বলার পর কেমন একটা শনশন শব্দ হয়৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘আপনাদের তো একসময় জমিদারি ছিল বলছিলেন৷ সেই আমলে আপনাদের বংশের কেউ কারও কাছে টাকা ধার করেননি তো?’
শিবকালীবাবু জোরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না৷ জমিদারি ছিল আমার ঠাকুরদার আমলে৷ তাঁর আমলেই দেশ থেকে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়৷ ঠাকুরদার সঙ্গে অনেক উঁচুতলার লোকের ভাব ছিল৷ তাই জমিদারির ক্ষতিপূরণ শিগগিরই পেয়ে গিয়েছিলেন৷ তারপর আমার বাবা তো ভোটে দাঁড়িয়ে এম এল এ হয়েছিলেন৷’
‘আপনার বাবার নাম কী ছিল?’
‘কালীপ্রসাদ রায়৷’
আমি বললুম, ‘তাই বুঝি আপনার আর আপনার দাদার নামে কালী বসেছে!’
শিবকালীবাবু আগের মতো হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ‘ভালোভাবে বসেনি৷ তবে আমাদের দু’ভাইয়ের এই নাম নাকি আমার ঠাকুমা স্বপ্নাদেশ পেয়ে রেখেছিলেন৷’
কর্নেল বললেন, ‘আপনাদের গৃহদেবতা তাহলে নিশ্চয়ই মা কালী?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ তা যা বলছিলুম—পরপর তিন রাত্তির এরকম অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে আর আমরাও যে চুপচাপ বসে ছিলুম, তা নয়৷ দ্বিতীয় রাত্রির পর রাত বারোটায় বাড়ির আলো নিভিয়ে ওঁত পেতে পিছনের দিকে ঝোপের আড়ালে বসে ছিলুম৷ হাতে টর্চ৷ আর দাদার হাতে তো দোনলা বন্দুক৷ আমাদের সঙ্গে ছিল বাড়ির পুরনো কাজের লোক ভোলা৷’
‘তারপর?’
‘মশার কামড়ে অস্থির হয়ে আমরা এক’টা বাজার মিনিট পাঁচেক আগে টর্চ জ্বেলে তন্ন তন্ন করে সবখানে খুঁজলুম, যদি কোনো বজ্জাত মানুষ ওইভাবে আমাদের ভয় দেখাতে আসে তাহলে সে এক’টা বাজার একটু আগেই আসবে৷ তা ছাড়া তাকে দোতলার জানলার কাছে উঠতে হবে৷ উঠবে কী করে? জলের পাইপ জানলার কাছাকাছি নেই৷’
এই বলে শিবকালীবাবু হঠাৎ খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন৷ তারপর চোখ বড়ো করে বললেন, ‘আশ্চর্য ব্যাপার কর্নেল সাহেব, আমরা যে-যার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছি, তারপর অন্য রাতের মতোই নীচের বসার ঘরে প্রকাণ্ড দেওয়াল ঘড়িতে ঢং করে এক’টা বাজল৷ আর সঙ্গে-সঙ্গে পাশের ঘর থেকে দাদা চিৎকার করে উঠলেন—শিবু, শিবু, সে ব্যাটা এসেছে৷ তারপরই শুনলুম বন্দুকের গুলির শব্দ৷ দাদা পরপর দুটো গুলি করার পরই আমি মশারির ভিতর থেকে বেরিয়ে টর্চ হাতে জানলা খুলতে যাচ্ছি, হঠাৎ শুনি সেই ফিসফিসে অদ্ভুত কণ্ঠস্বর—সুদে-আসলে এক লাখ৷ তারপই শনশন শব্দ উঠল৷ অমনি প্রচণ্ড ভয়ে রক্ত যেন হিম হয়ে গেল! মনে পড়ল ঠাকুমা বলতেন এই বাড়িতে মা কালীর বাস৷ তাই শিবের চ্যালারা নাকি গোপন খবর মা কালীকে দিতে আসে৷’
কর্নেল ততক্ষণে চুরুট ধরিয়েছিলেন৷ বললেন, ‘বাবা মহাদেবের চ্যালারা মা কালীর কাছে খবরাখবর দিতে আসতেই পারে৷ কিন্তু তাদের কেউ আপনাদের দুই ভায়ের জানলার কাছে ওই সুদের অঙ্কের কথা বলতে আসবে কেন?’
শিবকালীবাবু সায় দিয়ে বললেন, ‘ঠিক বলেছেন, কর্নেল সাহেব৷ আমারও তাই মত৷ কিন্তু দাদা বলেন, এই কথাগুলো নাকি রায় পরিবারের গুপ্তকথা৷ কোন পুরুষে কেউ কারও কাছে কিছু টাকা ধার করেছিলেন, সেই টাকা শোধ দেওয়া হয়নি৷ এদিকে যে টাকা দিয়েছিল, সে মরে গেছে৷ তার প্রেতাত্মা বাবা মহাদেবের কাছে নালিশ করেছে৷ তাই কথাটা—’
কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, ‘বুঝেছি৷ এবার তৃতীয় রাতের কথা বলুন৷ বাই দ্য বাই, আপনারা কি ওই ঘটনার পর বাড়ির চারদিকের আলো জ্বেলে রাখেন না? আপনি ফোনে বলেছিলেন কাঞ্চনপুর এখন শহর হয়ে গেছে৷ কাজেই বিদ্যুৎ থাকার কথা৷’
শিবকালীবাবু বিরস মুখে বললেন, ‘বিদ্যুতের কথা আর বলবেন না৷ এই আছে এই নেই৷ আমাদের বাড়িটা একেবারে শেষ প্রান্তে৷ কিন্তু আলো প্রায়-রাতেই থাকে না৷ তৃতীয় রাত্রেও আলো জ্বালা ছিল৷ কিন্তু রাত সাড়ে বারোটায় অন্য রাতের মতো আলো নিভে গিয়েছিল৷ সেই লোডশেডিং৷ তারপর নীচের দেওয়ালঘড়িতে একটা বাজা অব্দি আমরা পাহারা দিচ্ছিলুম৷ কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার কর্নেল, ঘড়ি বাজলই না! আমার হাতের এই ঘড়িতে রেডিয়াম দেওয়া থাকায় দেখে নিলুম, একটা দশ বাজে৷ তাহলে কি আজ আর সেই ব্যাটাচ্ছেলে আসবে না? একসময় মশার কামড়ে অস্থির হয়ে আমরা ঘরে ফিরে এলুম৷ তারপর শুয়ে পড়লুম৷ একটু পরেই অদ্ভুত ব্যাপার৷ নীচের ঘরের দেওয়ালঘড়িতে ঢং করে একটা বাজল৷ তারপর আবার সেই উৎপাত৷ যাই হোক, থানায় গিয়েছিলুম৷ পুলিশকে সব বলেছি৷ পরপর কয়েকটা রাত পুলিশ পাহারাও দিয়েছে৷ কিন্তু তারপর সেই উৎপাত আর হয়নি৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘বাবা মহাদেবের এই চ্যালা তাহলে দেখছি পুলিশকে ভয় পায়৷ যাই হোক, তারপর?’
শিবকালীবাবু একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘আজ রবিবার৷ গত শুক্রবার রাত্রে পুলিশ ছিল না৷ থানার বড়োবাবু তো আমাদের উপর রেগে কাঁই৷ আমরা নাকি পুলিশকে মিথ্যে হয়রান করছি৷ তাঁকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে শান্ত করতে হয়েছে৷ আর অদ্ভুত কথা; গত পরশু শুক্রবার রাত একটায় আবার সেই সুদে-আসলে লাখ টাকার কথা!’
কর্নেল বললেন, ‘তাহলে এই গুপ্তকথা কি পুলিশই রটিয়েছে?’
‘না, কর্নেল সাহেব৷ পুলিশ আমাদেরই সতর্ক করে দিয়েছিল এসব কথা যেন কেউ টের না পায়৷ কাজেই পুলিশ রটায়নি৷ রটিয়েছে আমাদের ভোলা৷ আসলে ভোলার বুদ্ধিশুদ্ধি কম৷ ওর কোনো প্রাণের বন্ধুকে নিশ্চয় কথাটা বলেছে৷ তা না হলে কাল শনিবার আমাদের বাড়িতে দলে-দলে লোকজন এসে ভূতের উৎপাতের কথা জিগ্যেস করবে কেন? এই আরেক উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ির দরজা ভেতর থেকে এঁটে দিয়েছিলুম৷ আর বাইরের কপাটে একটা বড়ো কাগজ সেঁটে তাতে ইংরেজিতে লিখেছি—Don’t Disturb. এটা আমার লেখা৷ আর দাদা লিখেছেন—Trespassers will be prosecuted!
‘বাঃ!’ কর্নেল সহাস্যে বললেন৷ ‘ভালো করেছেন৷’
শিবকালীবাবু এবার উত্তেজিতভাবে বললেন, ‘রিটায়ার্ড পুলিশ-অফিসার ব্রজেন ঘোষ আমাদের আত্মীয়৷ উনি থাকেন কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিটে৷ একসময় উনি আমাদের কাঞ্চনপুর থানায়ও ছিলেন৷ তাই দাদা আমাকে পরামর্শ দিলেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ দিয়ে এই রহস্য ফাঁস করতে হবে৷ ব্রজেনবাবুর কাছে গেলে উনি ভালো প্রাইভেট ডিটেকটিভের খোঁজ দিতে পারবেন৷’
আমি জানি কর্নেলকে কেউ ডিটেকটিভ বললে উনি খুব খাপ্পা হয়ে যান৷ বাংলা স্ল্যাং টিকটিকি কথাটা নাকি ডিটেকটিভ থেকে এসেছে৷ আমি কর্নেলের দিকে তাকিয়েই বুঝলুম, শিবকালীবাবু এবার কর্নেলের কাছে হয়তো গলাধাক্কা খাবেন৷ তাই দ্রুত বললুম, ‘শিবকালীবাবু, কর্নেল ডিটেকটিভ নন৷ উনি একজন নেচারোলজিস্ট৷ অর্থাৎ কিনা প্রকৃতি-বিজ্ঞানী৷’
এবার দেখলুম, শিবকালীবাবুর মুখে গাঢ় হতাশার ছাপ৷ তিনি ভাঙা গলায় বললেন, ‘তবে যে ব্রজেনবাবু বললেন কর্নেল নীলাদ্রি সরকার—’
তাঁর কথার ওপরে কর্নেল সহাস্যে বললেন, ‘আপনার দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই, শিবকালীবাবু৷ আমার এই কার্ডটা রাখুন৷’ বলে তিনি তাঁর একটা নেমকার্ড শিবকালীবাবুকে দিলেন৷
ভদ্রলোক বিড়বিড় করে সেটা পড়তে লাগলেন৷ সেই সময় ঘড়ি দেখে কর্নেল বললেন, ‘রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার ব্রজেন ঘোষকে আমি স্মরণ করতে পারছি না৷ তবে দেখলে নিশ্চয়ই চিনতে পারব৷ যাই হোক, তাঁর সম্মান রাখতে আমি কাল আপনার ফোন পাওয়ার পরই একটা ব্যবস্থা করে রেখেছি৷ হ্যাঁ, আপনি প্রাইভেট ডিটেকটিভের কথা বলছিলেন৷ এক মিনিট, টের পাচ্ছি তিনি আসছেন৷’
শিবকালীবাবু করুণ মুখে বললেন, ‘কিন্তু ব্রজেনবাবুর কাছে শুনেছি রহস্যের গন্ধ পেলেই সেখানে আপনি ঝাঁপিয়ে পড়েন৷’
কর্নেল সাদা দাড়ি থেকে চুরুটের ছাই ঝেড়ে ফেলে চকচকে প্রশস্ত টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, রহস্যের গন্ধ পেলে আমি চুপচাপ বসে থাকি না, তবে সেটা বিশেষ একটা সময়ে৷ আগে ব্রজেনবাবুর কথামতো আপনাকে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ দিচ্ছি৷ আপনার পুরনো বন্ধু, এই পরিচয় দিয়ে বাড়িতে রাখবেন৷’
‘আর আপনি? আপনি যাবেন না স্যার?’
‘যাব৷ আগে প্রাইভেট ডিটেকটিভ৷’
কর্নেলের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ডোরবেল বাজল৷ কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন ‘ষষ্ঠী, তোর টিকটিকি বাবুকে নিয়ে আয়৷’
আমি অবাক হয়ে দেখলুম, কর্নেলের জাদুঘর সদৃশ এই বিশাল ড্রয়িংরুমের দরজা ঠেলে সবেগে প্রবেশ করলেন—আবার কে, স্বনামধন্য প্রাইভেট ডিটেকটিভ কে.কে. হালদার, মানে আমাদের প্রিয় ‘হালদারমশাই’৷
বুঝতে পারলুম, কর্নেল শিবকালীবাবুর ফোন পাওয়ার পরই আজ আসতে বলেছিলেন৷ তিনি সোফার একপাশে ধপাস করে বসে বললেন, ‘বেশি দেরি করি নাই৷ কী কন কর্নেল স্যার?’
কর্নেল সহাস্যে বললেন, —‘হালদারমশাই, আগে আপনার ক্লায়েন্ট অর্থাৎ মক্কেলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই৷’
গোয়েন্দাপ্রবর গুলি-গুলি চোখে শিবকালীবাবুকে দেখছিলেন৷ তারপর বললেন, ‘ক্যাসটা কী?’
কর্নেল বললেন, ‘আপনার ক্লায়েন্টের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই৷ তারপর তাঁর মুখেই সব শুনবেন৷’
এরপর যথারীতি হালদারমশায়ের জন্য স্পেশাল কফি আনল যষ্ঠী৷ কর্নেল তাকে বললেন, ‘যষ্ঠী, এবার আমাদের গেস্টের জন্য এককাপ চা৷ আমার আর জয়ন্তর জন্য কফি৷’
হালদারমশাই চোখে ঝিলিক তুলে বললেন, ‘জয়ন্তবাবু, এটা ক’রাউন্ড কফি?’
বললুম, ‘ফোর্থ রাউন্ড৷’
কফি পানের পর কর্নেল হালদারমশাইকে কাঞ্চনপুর জমিদারবাড়ির ভূতুড়ে ঘটনা সংক্ষেপে শুনিয়ে দিলেন৷ সেই সঙ্গে শিবকালীবাবুও কিছু-কিছু বিবরণ জুড়ে দিলেন৷ এরপর হালদারমশাই শিবকালীবাবুকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে জেরা করে বললেন, ‘দেখুন মশায়, আমি চৌত্রিশ বৎসর পুলিশে চাকরি করছি৷ রিটায়ার করার পর একখান প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলছি৷ কাজেই আপনার ক্যাস আমি লইলাম৷ আর কর্নেল স্যার যখন আমারে আপনাগো হেভি মিস্ট্রি সলভ করণের দায়িত্ব দিছেন, তখন আমি নিজেরে লড়াইয়া দিমু৷ আপনি চিন্তা করবেন না৷’
শিবকালীবাবুকে একটু বিব্রত দেখাচ্ছিল৷ বুঝতে পারছিলুম, তিনি কর্নেলকেই মনে-মনে চাইছিলেন৷ আমি তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে বললুম, ‘শিবকালীবাবু, কর্নেল সব রহস্যময় ঘটনার সরেজমিন ব্যাকগ্রাউন্ড আগে সংগ্রহ করেন৷ তাই সবক্ষেত্রেই তিনি আমাদের হালদারমশাইকে আগে পাঠিয়ে দেন৷’
শিবকালীবাবু বললেন, ‘কিন্তু উনি কি আমাদের পশ্চিমবঙ্গের ভাষায় কথা বলতে পারেন না?’
কর্নেল বললেন, ‘খুবই পারেন৷ কিন্তু হালদারমশায়ের একটা জেদ আছে৷’
হালদারমশাই খি-খি করে হেসে বললেন, ‘আমাগো মাতৃভাষা ছাডুম ক্যান? মাতৃভাষার লাইগ্যা ঢাকায় আমাগো পোলারা প্রাণ দিছে না? দেশ ছাড়লে কী হইব, রক্তের টান৷’
শিবকালীবাবু সায় দিয়ে বললেন, ‘ঠিক বলেছেন৷ তাহলে আপনি আমার বন্ধু হিসাবে কাঞ্চনপুরে বেড়াতে যাচ্ছেন৷ আমাদের বাড়িতেই থাকছেন৷ কেমন তো?’
হালদারমশাই বললেন, ‘কর্নেল সাহেবের কথায় আমি রেডি হইয়াই আইছি৷’
বলে তিনি তাঁর ব্যাগটা কাঁধে ঝোলালেন৷ তারপর শিবকালীবাবুর সঙ্গে বেরিয়ে গেলেন৷
কর্নেল চুপচাপ চুরুট টানছিলেন৷ বললুম, ‘হালদারমশাইকে বাঘের মুখে ঠেলে দেওয়া কি ঠিক হল?’
কর্নেল বললেন, ‘বাঘ কথাটা তোমার মাথায় কেন এল, জয়ন্ত?’
বললুম, ‘যা বুঝেছি, তাতে মনে হচ্ছে এটা টাকাকড়ি দেনা-পাওনার ব্যাপার৷ পাওনাদাররা কিন্তু আসলে এক-একটি রক্তখেকো বাঘ৷’
কর্নেল এবার তাঁর বিখ্যাত অট্টহাসি হাসলেন৷
পরদিন বিকেলে দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার নিউজ-রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় চিফ অফ দি নিউজ ব্যুরো সত্যদা হাঁক দিলেন—‘জয়ন্ত, তোমার ফোন৷’
একটু অবাক হয়েই সত্যদার টেবিলে গেলাম৷ আমার নিজের টেবিলে তো ফোন আছে অথচ সত্যদার ফোনে কে আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়? কাছে যেতেই সত্যদা মুচকি হেসে চাপা স্বরে বললেন, ‘তোমার ফ্রেন্ড-ফিলজফার-গাইড আমাকে জিগ্যেস করছিলেন, জয়ন্তকে একা পাওয়া যাবে কিনা? বললুম, না৷ কারণ, তোমার চারপাশে কচিকাঁচা ছেলেমেয়ে রিপোর্টাররা মাছির মতো ভনভন করছে৷’
হাসতে-হাসতে রিসিভার তুলে বললুম, ‘হাই বস, আমাকে একা পেতে চান, কিন্তু এখানেও তো আমি একা নই৷’
কর্নেলের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘তোমাকে কলকাতা ছেড়ে আমার সঙ্গে পাড়ি জমাতে হবে৷ কাজেই তোমার অফিসিয়াল অনুমতির দরকার৷’
‘হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি৷ সত্যদা জানলে আমার অবাধ ছুটি৷’
‘রিসিভারটা তোমার সত্যদাকে দাও, তারপর আশা করছি তুমি এখনই খাঁচা খুলে উড়ে আসতে পারবে৷’
ব্যাপারটা বোঝা গেল না৷ কর্নেলের কথামতো রিসিভার সত্যদাকে দিলুম৷ তারপর দেখলুম সত্যদা খুব মন দিয়ে কর্নেলের কথা শুনছেন আর মাঝে-মাঝে বলে উঠছেন—‘দারুণ৷’ ‘ওরে বাবা’, ‘বলেন কী!’ ‘কী সর্বনাশ!’ শেষে বললেন, ‘জয়ন্ত যাচ্ছে৷ আমাদের নিউজ পেপার এবার একখানা দুর্ধর্ষ স্টোরি ছেপে হৈচৈ ফেলে দেবে৷’
সত্যদা রিসিভার রেখে একগাল হেসে বললেন, ‘উইশ য়ু গুডলাক, জয়ন্ত৷ কর্নেল বুড়োর কথা শুনে মনে হল, একেবারে রাঘব বোয়ালের কেস৷’
‘সত্যসেবক’ পত্রিকার অফিসের গ্যারেজ থেকে আমার ফিয়াট গাড়িটা বের করে নিয়ে যখন এগোচ্ছি, তখনও আমার মাথায় ঢোকেনি কর্নেল কেন এমন করে ডাক দিলেন৷
অফিস-প্রাঙ্গণ পেরিয়ে গিয়ে তবে মনে পড়ল কাঞ্চনপুরের জমিদারবাড়ির ঘটনা৷ গোয়েন্দাপ্রবর হালদারমশায়ের কোনো বিপদ হয়নি তো!
ফ্রি-স্কুল স্ট্রিট হয়ে ইলিয়ট রোডে পৌঁছে একটা গলিরাস্তার পরই কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্ট হাউস৷ গেট দিয়ে ঢুকে লনের একপাশে গাড়ি রাখলুম৷ তারপর তিনতলায় চলে গেলুম৷
ডোরবেলের স্যুইচে আঙুল পড়তেই তক্ষুনি দরজা খুলে গেল৷ দেখলুম ষষ্ঠীচরণ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে৷ সে ফিসফিস করে বলল, ‘বাবামশাইকে খুব ব্যস্ত দেখাচ্ছে৷ আমাকে বলছিলেন তুই লক্ষ্য রাখবি তোর কাগজের দাদাবাবু আসছেন কিনা৷’
কথাগুলো বলে যষ্ঠী পাশের করিডর দিয়ে ভেতরে চলে গেল৷ আমি ছোট্ট ওয়েটিং রুমটার ভেতর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলুম৷ দেখলুম কর্নেল ইজিচেয়ারে বসে এক টুকরো কাগজে চোখ রেখেছেন৷ আমাকে দেখে তিনি নড়ে বসলেন৷
‘এই যে জয়ন্ত, আজ সকালেই ভাবছিলুম তোমাকে সোজা আমার কাছে চলে আসতে বলব৷ কারণ, কাঞ্চনপুরের ঘটনাটা যে ছোটোখাটো নয় তা গতরাতেই টের পেয়েছিলুম৷’ বলে তিনি হাঁক দিলেন, ‘যষ্ঠী, আমার জন্যও কফি আনবি৷’
সোফায় বসে এবার লক্ষ্য করলুম, কর্নেলের মুখে উদ্বেগের ছাপ৷ চাপা স্বরে বললুম, ‘আমাদের হালদারমশায়ের কোনো বিপদ হয়নি তো?’
কর্নেল অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, ‘না৷ গত রাত্রে কাঞ্চনপুর থেকে হালদারমশাই আমাকে ফোন করেছিলেন৷ জমিদার বাড়িতে ফোন নেই৷ তাই উনি বাজারের একটা ফার্মেসি থেকে ফোন করেছিলেন৷’
‘আহা-হা, ফোনে উনি কী বললেন তাই বলুন৷’
কর্নেল বললেন, ‘হালদারমশায়ের মতে ব্যাপারটা খুব সহজ নয়৷ রাত একটায় যে-ভূতুড়ে কাণ্ডটা হয়, তার পেছনে বাড়ির লোকেরই কারও হাত আছে৷ এদিকে হালদারমশায়ের ওখানে পৌঁছানোর পরে লেটার-বক্সে একটা উড়ো চিঠি পাওয়া গেছে৷ তাতে কেউ লাল কালিতে লিখেছে—কলকাতা থেকে গোয়েন্দা এনেছ৷ গোয়েন্দার মাথায় দা চালিয়ে দেব৷ কথামতো কাজ না করলে তোমারও ধড়-মুন্ডু আলাদা হয়ে যাবে৷
ষষ্ঠী ট্রে-তে দু’পেয়ালা কফি আর স্ন্যাক্স রেখে গেল৷ কর্নেলের মুখে তখনও উদ্বেগের ছাপ৷
কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে চুমুক দিয়ে বললুম, ‘এই সামান্য ব্যাপারে আপনি এত বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন কেন? বরাবর তো দেখা গেছে, যত গর্জায় তত বর্ষায় না৷’
কর্নেল কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে তাঁর হাতের সেই টুকরো কাগজটা আমাকে দিলেন৷ যেমন-তেমনভাবে ছেঁড়া কাগজটায় লাল কালিতে লেখা আছে—ব্যাটাচ্ছেলে এই বুড়ো বয়সেও বাঘের গুহায় মুখ ঢোকাতে আসছে! সাবধান! কাঞ্চনপুরের মাটিতে পা পড়লেই ঠেলাটা বুঝতে পারবে৷
আমি না হেসে পারলুম না৷ বললুম, ‘আমার খুব অবাক লাগছে কর্নেল৷ জীবনে কখনো এইসব তুচ্ছ ব্যাপারকে আপনি পাত্তা দেননি৷ এই হাস্যকর চিঠিটা নিশ্চয়ই আপনার লেটার বক্সে কেউ দিয়ে গিয়েছিল৷’
কর্নেল আস্তে ‘হুঁ’ বলে কফিপানে মন দিলেন৷ এই সময় ড্রয়িংরুমের দেওয়ালঘড়িতে বিকেল চারটে বাজল৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কর্নেল বললেন, ‘জয়ন্ত, এ চিঠি বা হালদারমশায়ের ফোন পেয়ে আমি উদ্বিগ্ন হইনি৷ হয়েছি অন্য একটা কারণে৷ কাঞ্চনপুর জমিদারবাড়ির এই অদ্ভুত ঘটনা আমাকে উদ্বিগ্ন করেছে একটা কারণে৷’
কর্নেল গম্ভীর মুখে চুরুট ধরালেন৷ বললুম, ‘কারণটা কী, তা বলতে আপত্তি আছে?’
কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার টেনে খবরের কাগজের একগোছা কাটিং আমার হাতে তুলে দিলেন৷ খবরগুলো পুরোনো৷ তারিখ অনুযায়ী সাজানো আছে৷ শেষেরটার তারিখ বছর পাঁচেক আগেকার৷ সেইটার হেডিং-এ ছাপা হয়েছে—কাঞ্চনপুর এস্টেটের নিরুদ্দিষ্ট ছোটো শরিক হরকালী রায়ের মৃত্যু হয়েছিল৷ কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার, তিনি একেবারে সশরীরে দিবালোকে আবির্ভূত হয়ে বলেছেন; যে-মিথ্যুকেরা তাঁর নামে মিথ্যা খবর রটিয়েছিল, তাদের তিনি শায়েস্তা করবেন৷ কাঞ্চনপুরে হরকালীবাবু খুব জনপ্রিয় ছিলেন৷ তাই সেখানকার লোকেরা তাঁকে জোর করে তাঁর বাড়ির অংশের দখল নিতে সাহায্য করেছিল৷ তারপরই কিন্তু একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে৷ হরকালীবাবুকে আর দেখা যাচ্ছে না৷ তাঁর বাড়ির দরজায় তালা দেওয়া নেই৷ তিনি যেমন আশ্চর্যভাবে এসেছিলেন, তেমনই আশ্চর্যভাবে উধাও হয়ে গেছেন৷ পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে৷ কিছু বৃদ্ধ লোকের মতে জমিদারবাড়ির উপাস্য দেবী কালিকার মন্দিরে নাকি বহু ধনরত্ন লুকানো আছে৷ হরকালীবাবুর মতো অবিকল দেখতে কোনো লোক সেই ধনরত্ন চুরি করতে এসেছিল৷ তার পেছনে অবশ্যই কোনো পাকাপোক্ত লোক আছে৷ তবে পুলিশ এইসব বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না৷
এই খবরটা পড়ার পর বললুম, ‘স্থানীয় সংবাদদাতারা কলকাতার কাগজে জায়গা পাবার লোভে অনেক উদ্ভট খবর লিখে পাঠায় এবং তা ছাপাও হয়৷’
কর্নেল বললেন, ‘তুমি ধৈর্য ধরে সবগুলো কাটিং যদি পড়ো তাহলে বুঝতে পারবে কাঞ্চনপুর জমিদার বাড়িতে সত্যিই একটা জটিল রহস্যময় ইতিহাস এখনও কাজ করে যাচ্ছে৷ গৃহদেবতার ধনরত্ন এসবের মূলে৷ বোঝা যাচ্ছে, সেই ধনরত্ন কোথায় আছে, তার সন্ধান এখনও মেলেনি৷ জয়ন্ত, মানুষের সবচেয়ে লোভ গুপ্তধনে৷ গুপ্তধনের জন্য এ-যাবৎকাল সারা পৃথিবীতে মানুষ কীসব জঘন্যতম কাজ করেছে, সে বিষয়ে আমার কাছে একটা বই আছে৷’
বললুম, ‘ওঃ কর্নেল! এটুকু শুনেই আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে৷ এবার শুধু বলুন, আপনি কী করতে চান?’
কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে চুরুট টানতে থাকলেন৷ তারপর হঠাৎ চোখ খুলে চাপা স্বরে বললেন, ‘তুমি আর আমি আজ রাতের ট্রেনেই কাঞ্চনপুর যেতে চাই৷ তত বেশি দূর নয়৷ শেয়ালদা থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার জার্নি৷ আমি ট্যুরিস্ট ডিপার্টমেন্টের সুকুমারকে বলে সেখানকার ট্যুরিস্ট লজে একটা ডাবলরুমের ব্যবস্থা করতে পারি৷’
আমার মাথায় কর্নেলের মতোই জেদ চেপে গেল৷ বললুম, ‘ঠিক আছে৷ আমি সল্টলেকে আমার ফ্ল্যাটে গিয়ে রেডি হয়ে আসছি৷ আমার গাড়িটা আপনার খালি গ্যারাজেই রেখে দেব৷’
কর্নেল সোৎসাহে বললেন, ‘বাঃ৷ আমি জানতুম, তুমি আমার সঙ্গ ধরতে দ্বিধা করবে না৷ আমরা রাতে ডিনার খেয়ে বেরুব৷ ট্রেন ছাড়বে সোয়া এগারোটায়৷ শেষ রাতে পৌঁছনোই ভালো৷’
উঠে দাঁড়িয়ে বললুম, ‘কিন্তু একটা কথা৷ আপনি কাঞ্চনপুর জমিদার বাড়ির খবরের কাটিংগুলো এত বছর ধরে কেন রেখেছিলেন?’
কর্নেল মৃদু হেসে বললেন, ‘কাঞ্চনপুর গঙ্গার ধারেই৷ ওদিকে একটা বিশাল জলা আছে৷ একসময় ওখানে পাখি দেখতে যেতুম৷ শিবকালীবাবু, হরকালীবাবু জানেন না আমার বন্ধু ছিলেন ওঁদের বড়ো তরফ কালীরঞ্জন রায়৷ সম্পর্কে শিবকালীবাবুর জ্যাঠা৷ ওঁদের তিন শরিকের বাড়ি কালীমন্দিরকে কেন্দ্র করে তিনদিকে৷ অবশ্য সে প্রায় পনেরো বছর আগের কথা৷ কালীরঞ্জনবাবু বিয়ে করেননি৷ তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়েছিলুম খবরের কাগজে৷ কারণ, উনি এলাকার একজন গণ্যমান্য লোক ছিলেন৷ তা ছাড়া কলকাতার একটা রাইফেল শ্যুটিং ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন৷ রাইফেল শ্যুটার হিসেবে সারা দেশে তাঁর খ্যাতি ছিল৷ যাই হোক, ওসব কথা পরে শুনবে৷ এখন তুমি তোমার ফ্ল্যাটে গিয়ে রেডি হয়ে এসো৷ হ্যাঁ, সঙ্গে কিন্তু গরম পোশাক নেবে৷ কলকাতায় এই নভেম্বরে শীত পড়েনি৷ কিন্তু কাঞ্চনপুর এখন শীতে কাঁপছে৷ আর-একটা কথা৷ তোমার আগ্নেয়াস্ত্রটা সঙ্গে নিতে ভুলো না৷’
বললুম, ‘সর্বনাশ! খুনোখুনির পাল্লায় পড়তে হবে নাকি?’
‘হতেও পারে৷’ বলে কর্নেল খবরের কাটিংগুলো গুছিয়ে রাখতে ব্যস্ত হলেন৷
আমি তখনই বেরিয়ে এলুম৷ পার্কসার্কাস ধরে ই. এম. বাইপাসে পৌঁছে এবার হঠাৎ কেন যেন একট গোপন আতঙ্কের শিহরন জাগল শরীরে৷ কর্নেলকে কোনো ঘটনা এতবেশি গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করতে দেখিনি৷ তাঁর সঙ্গে এ-যাবৎকাল ঘুরে এ-ধরনের বহু পরিবারে গৃহদেবতার গুপ্তধনের রহস্যে জড়িয়ে পড়েছি৷ কিন্তু কখনও কর্নেলকে তা নিয়ে এত ব্যস্ত হতে দেখিনি৷ কাজেই মনে হচ্ছে কাঞ্চনপুরের জমিদারবাড়িতে পূজ্যা মা কালীর ধনরত্ন নেহাত গুজব নয়৷ তা ছাড়া কর্নেলকে এর মধ্যেই কেউ উড়ো চিঠিতে ভয় দেখিয়েছে৷
আবার মনে আতঙ্ক জাগল৷ আমি সতর্কভাবে গাড়ি ড্রাইভ করছিলুম৷
এ-যাবৎকাল যেখানে গেছি, লক্ষ্য করেছি কর্নেল লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আগে থেকেই সব আয়োজন করে রাখেন৷ রাতের ট্রেন কিছুটা লেট করেছিল কিন্তু কাঞ্চনপুর স্টেশনে পৌঁছে দেখি পুলিশ পোস্ট থেকে আমাদের জন্য গাড়ি পাঠানো হয়েছে৷
আর কর্নেল যা বলেছিলেন তার সত্যতাও হাড়ে-হাড়ে টের পেয়েছিলুম, সেই শেষ রাত্রে ঘন কুয়াশা আর হিম করা শীত৷ ড্রাইভারের নাম কালীপদ শুনে জানতে চেয়েছিলুম সে কাঞ্চনপুর জমিদার বাড়ির কেউ কিনা৷ লোকটি খুব বিনয়ী৷ মাথা নেড়ে বলেছিল, ‘আজ্ঞে না স্যার৷ ওঁরা বামুন আর আমি হলুম শুদ্দুরের ছেলে৷ তবে আমাদের ওখানে জমিদারবাবুদের গৃহদেবতা কালীর ওপর সারা এলাকার লোকের খুব ভক্তি আছে৷ তাই এখানে কালী নামের খুব ছড়াছড়ি৷ তবে হ্যাঁ৷ সাক্ষাৎ জাগ্রত দেবী, স্যার৷’
স্টেশন এলাকা ছাড়িয়ে গিয়ে গাঢ় অন্ধকার৷ ঘন কুয়াশাও লক্ষ্য করলুম৷ কর্নেলকে বললুম, ‘ট্যুরিস্ট লজ অবধি আলো থাকা উচিত ছিল৷’
কালীপদ বলল, ‘আলো পরে হবে স্যার, শুনেছি৷ আমাদের লজ কাঞ্চনপুর থেকে একটুখানি দূরে৷ একটা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলে ডাইনে পড়বে শঙ্খদহ ঝিল৷ বিশাল ঝিল৷ এই শীতে নানারকম পাখি আসে৷ এই পাখি দেখতে ট্যুরিস্টরা আসে৷ তাই ট্যুরিস্ট-লজ করা হয়েছে গঙ্গার ধারে৷’
এই ড্রাইভারটি বিনয়ী হলেও বড়ো বেশি কথা বলে৷ হেডলাইটের আলোয় লক্ষ্য করছিলুম, মোরাম বিছানো রাস্তার দু’ধারে কুয়াশা-ঢাকা ঘন জঙ্গল৷
কর্নেল এতক্ষণ চুপচাপ চুরুট টানছিলেন৷ চুরুটের ধোঁয়ায় গাড়ির ভেতরটা পাছে কটু হয়ে ওঠে, তাই তিনি তাঁর দিকের জানলা নামিয়ে দিয়েছিলেন৷ এবার তিনি বললেন, ‘আচ্ছা কালীপদ, জমিদার বাড়ির এক শরিক নাকি মরে যাওয়ার পর জ্যান্ত হয়ে ফিরে এসেছিল?’
কালীপদ বলল, ‘হ্যাঁ স্যার৷ আমি তাঁকে চোখে দেখিনি, তবে ঘটনা সত্যি৷ ইদানীং শুনছি, তিনিই নাকি আবার মরে গিয়ে দুই ভাইপোকে ভূত হয়ে ভয় দেখাচ্ছেন৷’
কালীপদ কথাটা বলে হেসে উঠল৷ জিগ্যেস করলুম, ‘তাহলে এবার তিনি আগের মতো জ্যান্ত হয়ে ফিরতে পারেননি?’
কালীপদ তখনই গম্ভীর হয়ে গেল৷ গাড়ির ড্যাশবোর্ডের আলোয় লক্ষ্য করলুম, তার মুখে যেন আচমকা ভয়ের ছাপ ফুটে উঠেছে৷
সে চাপা স্বরে বলল, ‘জমিদারবাড়িতে সত্যি এবার ছোটো শরিক হরকালীবাবুর প্রেতাত্মা হানা দিয়েছে৷ শুনেছি, ও তল্লাটে দিনদুপুরেও একলা যেতে লোকে ভয় পাচ্ছে৷’
কথাটা বলেই সে চুপ করে গেল৷ একটু পরেই সামনে একটা উঁচু জায়গার ওপর আলোর ছটা দেখতে পেলুম৷ জঙ্গল পেরিয়েই দেখলুম, রাস্তাটা উঁচু হতে হতে বাংলোর গেটে পৌঁছেছে৷
এতক্ষণ পরে আলো দেখে অস্বস্তি কেটে গেল৷ কালীপদ একবার হর্ন দিতেই কম্বল মুড়ি দিয়ে একটা লোক বেরোল৷ গেটের পাশের ছোট্ট একটা ঘর৷ বুঝতে পারলুম, ওখানেই লোকটা থাকে৷ সে গেট খুলে দিলে আমাদের গাড়ি বাংলোর সামনে পৌঁছল৷
চওড়া বারান্দায় প্যান্ট-কোট পরে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ গাড়ি থেকে আমাদের নামতে দেখে তিনি করজোড়ে নমস্কার করে বললেন, ‘কোনো অসুবিধা হয়নি তো, স্যার?’
কর্নেল বললেন, ‘না৷ ট্রেন একটু লেট ছিল, এই যা৷ আপনার নাম সুরঞ্জন চক্রবর্তী?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার৷ আমি বাংলোর কেয়ারটেকার৷ আপনাদের জন্যে দোতলায় দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটা স্যুইট খালি রেখেছি৷ বাকি সব ভর্তি৷’
সুরঞ্জনবাবুর সঙ্গে আমরা দোতলায় গেলুম৷ একটা ঘরের দরজা খুলে দিয়ে তিনি বললেন, ‘কলকাতা থেকে আমাদের সাহেব বলে পাঠিয়েছেন, আমি যেন কফির ব্যবস্থা রাখি৷’
কর্নেল হাসিমুখে বললেন, ‘রাত সাড়ে তিনটেয় এক কাপ কফি পেলে মন্দ হত না, কিন্তু—’
সুরঞ্জনবাবু ব্যস্তভাবে বললেন, ‘কোনো কিন্তু নয় স্যার৷ সব ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি, কোনো অসুবিধা হবে না৷’
ইতিমধ্যেই ঘরের আলো তিনি জ্বেলে দিয়েছিলেন৷ বেশ চওড়া ঘর৷ দু’দিকে দুটো সিঙ্গল খাট৷ খাটে মশারি গোঁজা আছে৷ কর্নেল তাঁর কাঁধের বোঁচকা কোণের একটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন৷ তারপর পিঠে আঁটা কিটব্যাগটাও খুলে ফেললেন৷
আমি উল্টো দিকের খাটের পাশের টেবিলে আমার ব্যাগটা রেখে বললুম, ‘গঙ্গা কোন দিকে?’
কর্নেল মুচকে হেসে বললেন, ‘মা গঙ্গার দর্শন এখন পাবে না৷ তিনি কুয়াশার আড়ালে ঘুমোচ্ছেন৷’
কিছুক্ষণের মধ্যেই সুরঞ্জনবাবু একজন পরিচারকের সঙ্গে ঘরে ঢুকলেন৷ পরিচারকের হাতে একটা ট্রে, তাতে দু’পেয়ালা কফি আর পোটাটো চিপস৷
কর্নেল বললেন, ‘ধন্যবাদ সুরঞ্জনবাবু৷ আর আপনাদের জ্বালাতন করছি না৷’
সুরঞ্জনবাবু করজোড়ে বললেন, ‘বড়ো সাহেব বলে দিয়েছেন, কর্নেল সাহেবের যেন এতটুকু অসুবিধা না হয়৷ আচ্ছা, গুড নাইট স্যার৷’
ওঁরা চলে গেলেন৷ কর্নেল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে কয়েকটা জানলা খুলে দিলেন৷ তারপর একটা জানলার পর্দা সরিয়ে বললেন, ‘আশা করি এই জানলা দিয়ে হরকালীবাবুর ভূত সুদে-আসলে লাখ টাকা চাইতে আসবেন না৷’
জিগ্যেস করলুম, ‘কেন?’
‘এদিকটায় মা গঙ্গা৷ ভূতেরা গঙ্গাপ্রাপ্তি পছন্দ করে না৷ তারা ভূত হয়েই থাকতে চায়৷ যাকগে, আগে কফি খেয়ে নিই, তারপর শুয়ে পড়া যাবে৷’
সত্যি বলতে কি টানা প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ট্রেন-জার্নির পর প্রচণ্ড শীতে এখানে পৌঁছে কফির উষ্ণতা খুব আনন্দ দিচ্ছিল৷
কর্নেলের সঙ্গে যেখানেই গেছি, দেখেছি তাঁর সব আয়োজনই নিখুঁত থাকে৷ সামরিক জীবনের শৃঙ্খলাবোধই বোধহয় এর কারণ৷ কফি খেয়ে পোশাক বদলে মশারির ভেতর শুয়ে পড়েছিলুম৷ কর্নেলের কথামতো আমার রিভলবারটা বালিশের পাশে রাখতে ভুলিনি৷ তারপর কর্নেলের নাকডাকা শুনতে-শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম জানি না৷ হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল৷ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ চাপা গলায় বলছে, ‘আটটা বাজে, স্যার৷ বেড-টি এনেছি৷’ তখনই উঠে বসলুম৷ বুঝতে পারলুম ওপাশের মশারির ভেতর কর্নেল নেই৷ প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন এবং আমার জন্য বেড-টির কথা বলে গেছেন৷
বললুম, ‘দরজা খোলা আছে, চলে এসো৷’
পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখলুম, বাইরে প্রিয়মাণ রোদ৷ তখনও কুয়াশা মুছে যায়নি৷ পরিচারকটি বিছানার পাশে চা রেখে বিনীতভাবে বলল, ‘আপনার মশারি তুলে দিই, স্যার৷ তাহলে চা খেতে সুবিধা হবে৷’
সে আমার বলার অপেক্ষা না করেই মশারি তুলে ওপরে রেখে দিল৷ কম্বলের মধ্যে কোমর ডুবিয়ে বসে বেড-টিতে চুমুক দিলুম৷
লোকটি বলল, ‘আমার নাম স্যার, পঞ্চানন৷ তবে লোকে আমাকে পাঁচু বলেই ডাকে৷ ম্যানেজারবাবু আপনাদের সেবার জন্য আমাকে ঠিক করেছেন৷ এই যে স্যুইচটা দেখছেন, এটা টিপলে আমি তক্ষুনি এসে হাজির হব৷’
বলে সে বেরিয়ে গেল৷ তারপরই আমার চোখ গেল বালিশের পাশে আমার আগ্নেয়াস্ত্রটার দিকে৷ সর্বনাশ! অস্ত্রটা তো পাঁচু নিশ্চয়ই দেখে ফেলেছে৷ সে মশারি ওঠানোর সময় অস্ত্রটা একটু সরে গেছে৷ অবশ্য এতে উদ্বেগের কিছু নেই৷ বরং এখানকার অন্তত একটা লোক যখন দেখেছে আমার কাছে কী সাংঘাতিক অস্ত্র আছে, তখন যদি সে দৈবাৎ শত্রুপক্ষের লোকও হয়, ভয় পাবে৷
কর্নেল ফিরলেন আধঘণ্টা পর৷ ততক্ষণে আমি পোশাক বদলে পশ্চিমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গঙ্গাদর্শন করছিলুম৷ কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন, ‘ওই দরজাটা বন্ধ করে ভেতরে এসো জয়ন্ত৷’
ওঁর নির্দেশ পালন করে বললুম, ‘আপনার দাড়িতে মাকড়সার জাল লেগে আছে৷ আর টুপিতে কী সব বিশ্রী জিনিস৷ আপনি কি প্রজাপতি ধরতে ঝোপে ঢুকেছিলেন?’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘নাহ! জঙ্গলের ভেতরে এখানে একটা শিবমন্দির আছে৷ ভাঙাচোরা মন্দির৷ সেখানে কেউ বসে ছিল৷ দূর থেকে বাইনোকুলারে লক্ষ্য করেই আমি তার কাছে যেতে চেয়েছিলুম৷ কিন্তু লোকটার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ৷ আমাকে চুপিচুপি আসতে দেখেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল৷’
চমকে উঠেছিলুম৷ বললুম, ‘ব্যাপারটা তাহলে সন্দেহজনক৷ তা না হলে সে পালাবে কেন?’
কর্নেল মাথার টুপি খুলে চাপা স্বরে বললেন, ‘লোকটা একজন সাধুবাবা৷ আমি ভেবেছিলুম, আমাদের হালদারমশাই কোনো কারণে সাধুর ছদ্মবেশে ওখানে বসে আছেন৷ কিন্তু দেখা গেল লোকটা হালদারমশাই নয়৷ যাই হোক, ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই৷ আমি পোশাক বদলে নিই৷ এখনই ব্রেকফাস্ট এসে যাবে৷’
বলে পিঠের কিটব্যাগ খুলে রেখে টুপি ঝাড়তে-ঝাড়তে কর্নেল বাথরুমে ঢুকলেন৷ একটু পরেই সেই পাঁচু ট্রে-তে ব্রেকফাস্টের খাদ্য নিয়ে এল৷ মাঝের টেবিলে রেখে সে বলল, ‘কফি রেডি আছে স্যার, ঠিক সময়ে নিয়ে আসব৷’
কথাটা বলে সে গোঁফের একটা পাশ চুলকে নিল৷ তারপর দাঁত বের করে নিঃশব্দে হেসে বলল, ‘একটা কথা জিগ্যেস করব, দয়া করে অপরাধ নেবেন না, স্যার৷’
গম্ভীর মুখে বললুম, ‘বলো!’
‘আপনার বালিশের কাছে যে অস্তরটা দেখলুম, তা স্যার আমাদের কাঞ্চনপুরে রক্ষাকালীবাবুর কাছেও আছে৷ ওনারা জমিদার ছিলেন, স্যার৷ আমি একসময় ওনার বাড়িতে কাজ করতুম, তাই দেখেছিলুম৷’
এই সময় কর্নেলকে বেরিয়ে আসতে দেখে জিভ কেটে তাঁকে সেলাম ঠুকে বেরিয়ে গেল৷
কর্নেল দাড়িতে চিরুনি চালিয়ে চেয়ারে বসলেন৷ তারপর বললেন, ‘শ্রীমান পঞ্চানন ওরফে পাঁচু তোমাকে কী যেন বলছিল?’
অগত্যা কর্নেলকে ব্যাপারটা খুলে বলতেই হল৷ কর্নেল ব্রেকফাস্ট করতে-করতে বললেন, ‘যা ঘটে, অনেক সময় তা ভালোর জন্যই ঘটে৷ শিবকালীবাবু আমাদের বলেছেন তাঁর দাদা রক্ষাকালীবাবুর একটা বন্দুক আছে৷ কিন্তু তাঁর একটা পিস্তল বা রিভলবারও যে আছে সেটা পাঁচুর মুখে জানা গেল৷’
কর্নেল একটু পরে আবার বললেন, ‘একজন লোকের কাছে সরকারের পক্ষে পুলিশ একটা আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দিতে পারে৷ সচরাচর বন্দুকের লাইসেন্সই দেওয়া হয়৷ বিশেষ-বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাউকে রিভলবার বা রাইফেলের লাইসেন্স দেওয়া হয়৷ এখন দেখা যাচ্ছে রক্ষাকালীবাবুর কাছে দু’রকম অস্ত্রই আছে৷ আমার ধারণা জয়ন্ত, পাঁচু তাঁর কাছে যে-অস্ত্রটা দেখেছে সেটার কোনো লাইসেন্স নেই৷ কারণ, রক্ষাকালীবাবু এ অঞ্চলে তেমন কোনো গণ্যমান্য লোক নন৷ বন্দুকটা ছিল তাঁর বাবার৷ তিনি সেই সূত্রে সেটা রাখতে পেরেছেন৷’
বললুম, ‘শিবকালীবাবুকে জিগ্যেস করে দেখবেন৷’
কর্নেল ঠোঁটে আঙুল রেখে বললেন, ‘চুপ৷ সবসময় মুখটি বুজে থাকবে৷’
এই সময় পাঁচুর সাড়া পাওয়া গেল৷ সে কফি নিয়ে ঘরে ঢুকল৷ তারপর সেলাম দিয়ে বলল, ‘সব ঠিক আছে তো, স্যার?’
কর্নেল তার দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা পাঁচু, জঙ্গলের মধ্যে একটা ভাঙা শিবমন্দিরে একজন সাধুবাবাকে দেখলুম৷’
পাঁচু নিঃশব্দ হেসে বলল, ‘উনি এক পাগলাবাবা, স্যার৷ কিছুদিন থেকে এই জঙ্গলে অনেকে ওঁকে দেখতে পেয়েছে৷ আমিও একদিন দেখেছিলুম৷ কিন্তু ওনার এক অদ্ভুত স্বভাব, কেউ কাছে গেলে অমনই জঙ্গলের মথে লুকিয়ে পড়েন৷ আপনি কি তাঁকে দেখতে পেয়েছেন, স্যার?’
কর্নেল বললেন, ‘হ্যাঁ৷ আমাকে দেখেই সাধুবাবা যেন অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷’
পাঁচু দরজার বাইরে উঁকি মেরে দেখে এল৷ তারপর চাপা স্বরে বলল, ‘স্যার, আমার সন্দেহ উনি জমিদারবাড়ির সেই ছোটো শরিক হরকালীবাবু৷ একবার উনি নাকি মারা গিয়েছিলেন৷ তারপর নাকি জ্যান্ত হয়ে—’
কর্নেল শুধু বললেন, ‘জানি৷’
সেই সাধুবাবা যে হরকালীবাবু, কর্নেল তা কেমন করে জানলেন—এই প্রশ্নটার জবাব কর্নেল আমাকে স্পষ্ট করে দেননি৷ শুধু বলেছিলেন, ‘পাঁচুর যেমন সন্দেহ, আমারও তা সন্দেহ৷ তবে তিনি সত্যি হরকালীবাবু হলে আমাদের একটু সাবধানে চলাফেরা করতে হবে৷ কারণ, আমার বিবেচনায় পাগলদের কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো৷’
কফি খাওয়া শেষ করে কর্নেল কিছুক্ষণ চুরুট টানলেন৷ তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘চলো, এবার বেরুনো যাক৷’
তিনি স্যুইচ টিপে পাঁচুকে ডাকলেন৷ তারপর পাঁচু এসে ব্রেকফাস্টের ট্রে এবং কফির পেয়ালা গুছিয়ে নিল৷
কর্নেল বললেন, ‘আমরা কিছুক্ষণের জন্য বেরুবো৷’
পাঁচু হাসিমুখে জিগ্যেস করলে, ‘পাখি দেখতে যাবেন নাকি স্যার?’
কর্নেল বললেন, ‘পাখি দেখতে ও-বেলা যাব৷ এ-বেলায় আমরা তোমাদের কাঞ্চনপুর দেখতে বেরুচ্ছি৷’
পাঁচুর মুখে মনে হল কোনো প্রশ্নের ছাপ আছে৷ কিন্তু সে চুপচাপ বেরিয়ে গেল৷
কর্নেল পিঠে তাঁর কিটব্যাগ আটকে নিয়ে গলায় ক্যামেরা আর বাইনাকুলার ঝুলিয়ে নিলেন৷ তারপর দু’জনে বেরিয়ে গেলুম৷ দরজায় তালা এঁটে কর্নেল বললেন, ‘এই পাঁচু লোকটির দিকে আমাদের লক্ষ্য রেখে চলতে হবে৷’
বললুম, ‘কেন? লোকটি তো খুব কাজের বলেই মনে হয়৷ কারণ, তার কাছে রক্ষাকালীবাবুদের অনেকরকম খবর পাওয়ার চান্স আছে৷ তাকে বরং বখশিস দিয়ে কথাচ্ছলে নানা প্রশ্নের উত্তর জেনে নেওয়া যাবে৷’
কর্নেল টানা বারান্দায় হাঁটতে-হাঁটতে বললেন, ‘জয়ন্ত, আমরা কলকাতা থেকেই পিছনে শত্রু নিয়ে এখানে এসেছি৷ কাজেই আমাদের সারাক্ষণ সাবধানে এবং হিসেব করে পা ফেলতে হবে৷ আশা করি আমার কথার অর্থ বুঝতে পেরেছ৷’
আমরা সিঁড়ি বেয়ে নীচে যেতেই সুরঞ্জনবাবু নমস্কার করে বললেন, ‘এবার নিশ্চয়ই আপনার গাড়ির দরকার হবে, স্যার?’
কর্নেল বললেন, ‘না৷ পায়ে হেঁটে বেরোলে অনেক কিছু দেখা যায়৷ আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি৷ কাজেই পায়ে হেঁটে বেড়ানোর চেয়ে আনন্দ আর কিছুতে নেই৷’
গেট পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে এলেন ভদ্রলোক৷ তারপর চাপা স্বরে বললেন, ‘যদি পাখি দেখতে চান তাহলে জঙ্গলের পথে একটু লক্ষ্য রেখে যাবেন৷ কারণ কয়েকজন ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক বলছিলেন, জঙ্গলে নাকি এক পাগলা ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ আর আচমকা ঢিল ছুড়ে উধাও হয়ে যাচ্ছে৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘আমরা পাখি দেখতে যাচ্ছি না৷ কাঞ্চনপুরে এক বন্ধুর বাড়ি, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি৷ তাঁকে আপনি চিনবেন না৷ কারণ তিনি বাইরের লোক৷ সদ্য এখানে সরকারি চাকরিতে বদলি হয়ে এসেছেন৷’
বাংলোটা উঁচু মাটির ওপর তৈরি৷ মরশুমি ফুলে এবং দেশি-বিদেশি গাছপালায় সুন্দরভাবে সাজানো৷ গেট থেকে নেমে মোরাম-রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল চাপা স্বরে বললেন, ‘জয়ন্ত, এই বাংলোর কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার ভদ্রলোকও পাঁচুর মতো কৌতূহলী৷’
বলে তিনি মোরাম-রাস্তার ডানদিকে হাঁটতে থাকলেন৷ আমরা গত রাত্রে স্টেশন থেকে এসেছিলুম এই রাস্তার বাঁ-দিক থেকে৷ রাস্তাটা বাংলোর সামনে একটা কোণ রচনা করেছে৷ বুঝতে পারলুম, আমরা চলেছি কাঞ্চনপুরের দিকে৷ দু’ধারে লাল ধুলোয় ভরা ঝোপঝাড় আর উঁচু গাছপালা৷
কিছুক্ষণ হাঁটার পর কর্নেল বললেন, ‘ডানদিকে ওই যে বাঁধ দেখতে পাচ্ছ, ওটার নীচেই গঙ্গা৷ তবে আমরা এখন গঙ্গাদর্শনে যাচ্ছি না৷’
এতক্ষণে বাঁ-দিকে একটা আমবাগান দেখতে পেলুম৷ কর্নেল রাস্তা ছেড়ে সেই আমবাগানের ভিতর দিয়ে হাঁটতে থাকলেন৷ জিগ্যেস করলুম, ‘আমরা এদিকে কোথায় যাচ্ছি?’
কর্নেল বললেন, ‘শর্টকাটে এবং অন্যের অলক্ষ্যে জমিদারবাড়িতে পৌঁছতে চাই৷’
আমবাগান পেরিয়ে গিয়ে দেখলুম বিশাল সব দালানবাড়ির ধ্বংসস্তূপ৷ একখানি পায়ে চলা পথ দেখা গেল৷ সেই পথে হাঁটতে-হাঁটতে উঁচু পাঁচিলে ঘেরা একটা দোতলা বাড়ি গাছপালার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল৷
কর্নেল পাঁচিলের ধারে-ধারে পায়ে চলা পথটা ধরে এগিয়ে গেলেন৷ মাঝে-মাঝে তিনি বাইনাকুলারে এপাশ-ওপাশ দেখে নিচ্ছিলেন৷ একটু পরেই পাঁচিলটা শেষ হল৷ সেখানে একটা ভাঙাচোরা দেউড়িতে গরাদ দেওয়া কপাট আটকানো ছিল৷ গেটের কাছে পৌঁছুতেই ভিতর থেকে হেঁড়ে গলায় কেউ বলল, ‘শিবু,—ও শিবু—আমাদের গেস্ট এসে গিয়েছেন মনে হচ্ছে৷’
এতক্ষণে দেখলুম দোতলার জানলায় একটা গুঁফো মুখ৷ নাকটা বেজায় খাড়া৷ চোখ দুটো কেমন যেন অস্বাভাবিক লাল৷ গলাবন্ধ কোট পরে ভদ্রলোক সম্ভবত কারুর প্রতীক্ষা করছিলেন৷
এই সময় শিবকালীবাবুকে দেখতে পেলুম৷ তিনি হাসিমুখে আমাদের নমস্কার করে গেটের তালা খুলে দিলেন৷ তারপর বললেন, ‘মিস্টার হালদারের কাছে খবর পেয়েছি আপনি আজকে আসবেন৷’
আমরা ভেতরে ঢুকলে তিনি গেটে ফের তালা এঁটে দিলেন৷ তারপর আমাদের সঙ্গে নিয়ে দোতলার নীচের একটা ঘরে উঠলেন৷ ঘরে সেকেলে আসবাব৷ জমিদার বাড়ির তেমন কোনো চিহ্ন চোখে পড়ল না৷ তবে সামনের দিকে একটা বিশাল দালানের ধ্বংসস্তূপ চোখে পড়ল৷ আমার অবাক লাগছিল, এই ধ্বংসপুরীর মধ্যে এঁরা দুই ভাই বাস করেন কীভাবে!
শিবকালীবাবু বললেন, ‘ভোলা এখনই এসে পড়বে৷ তাকে বাজারে পাঠিয়েছি৷ সে এলে আপনাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা হবে৷’
কর্নেল সোফায় বসে বললেন, ‘আমাদের হালদারমশাই কোথায়?’
শিবকালীবাবু নীরস মুখে বললেন, ‘ভদ্রলোককে নিয়ে এক ঝামেলায় পড়েছি৷ উনি সব সময়ই এই ধ্বংসপুরীর সবখানে ওত পেতে বেড়াচ্ছেন৷ একবার ঠাকুরবাড়িতেও ঢুকেছিলেন৷ তবে পাঁচিল ডিঙিয়ে৷’
কর্নেল হাসলেন, ‘প্রাইভেট ডিটেকটিভদের কাজকর্ম দেখে আপনাদের অবাকই লাগবে৷ কিন্তু তিনি এখন কোথায়?’
শিবকালীবাবু বললেন, ‘ভোরে একবার বেরিয়েছিলেন৷ কিছুক্ষণ আগে ব্রেকফাস্ট করে আবার বেরিয়ে গেলেন৷ গেট দিয়ে বেরোননি৷ ওই ধ্বংসপুরীর ভেতর দিয়ে কীভাবে বেরুলেন কে জানে!’
এই সময় উপর থেকে সেই ভদ্রলোক নেমে এলেন৷ তাঁর হাতে একটা বন্দুক৷ কাছাকাছি দেখে এবার মনে হল ভদ্রলোক সম্ভবত নেশাভাঙ করেন এবং মাথায় একটু ছিটও আছে৷ তিনি হাত বাড়িয়ে কর্নেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার পর আমার সঙ্গেও হ্যান্ডশেক করলেন৷ টের পেলাম, দেখতে বৃদ্ধ হলেও ওঁর গায়ের জোর আছে৷ এবার উনি কর্নেলের কাছাকাছি ধপাস করে বসে বন্দুকটা পাশে দাঁড় করিয়ে রাখলেন৷ তারপর চাপা স্বরে বললেন, ‘আপনি যে-প্রাইভেট গোয়েন্দাকে পাঠিয়েছেন, তাঁকে নাকি কেউ উড়ো চিঠি দেখিয়ে ভয় দেখিয়েছে৷ একটু টের পেলেই তাকে আমি কুকুরের মতো গুলি করে মারতুম৷’
শিবকালীবাবু বললেন, ‘দাদা, তোমরা কথা বলো৷ আমি দেখি ভোলা এত দেরি করছে কেন৷’
শিবকালীবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁর দাদা রক্ষাকালীবাবু আত্মপরিচয় ঘোষণা করলেন, ‘কর্নেল সাহেব৷ আমি সেই রক্ষাকালী রায়৷ এই এলাকার লোক একসময় আমার দাপটে তটস্থ থাকত৷ এই যে আমার হাতে বন্দুক দেখছেন, এই বন্দুক কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না৷ কিন্তু এই কিছুদিন থেকে কোন ব্যাটা আমার শোবার ঘরের জানলার কাছে এসে ভয় দেখাচ্ছে৷ আশ্চর্য ব্যাপার, তার গায়ে গুলি লাগে না!’
কর্নেল নিবে যাওয়া চুরুটটা লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে বললেন, ‘বাড়িতে কি আপনাদের ফ্যামিলি নেই?’
রক্ষাকালীবাবু রুষ্ট মুখে বললেন, ‘আমি বিয়ে করেছিলুম৷ রোগে ভুগে আমার স্ত্রী মারা পড়লেন৷ তারপর আর বিয়ে করিনি৷ সংসারের অনেক ঝামেলা৷ তবে শিবুর স্ত্রী-পুত্র-কন্যা আছে৷ তারা থাকে কাঞ্চনপুরের ভিতরে৷ শিবুর শ্বশুর পয়সাওয়ালা লোক৷ মেয়ে আর নাতিপুতিদের নিজের কাছেই রেখেছেন৷ শিবু মাঝে-মাঝে গিয়ে সেখানে থাকে, আবার এখানেও কিছুদিন কাটিয়ে যায়৷ আসল ব্যাপারটা খুলে বলি৷ আমাদের এই পূর্বপুরুষের ভিটে যাতে বেদখল না হয়ে যায়, তাই আমরা এখানে পাহারা দিচ্ছি৷ আর ওই গৃহদেবতা মা কালী৷ আমরা সরে গেলে তাঁর কী হবে? একজন সেবাইত রেখেছি৷ সে সকাল-সন্ধ্যায় এসে পুজো-আচ্চা করে যায়৷ একটু অপেক্ষা করুন৷ মা-কে দর্শন করাব৷’
কর্নেল বললেন, ‘রক্ষাকালীবাবু, আমার হাতে সময় কম৷ আমি এই বাড়িটার পেছন দিকটা একবার দেখে আসতে চাই৷’
রক্ষাকালীবাবু বললেন, ‘তা যান৷ গোয়েন্দাবাবুও তন্ন তন্ন দেখেছেন৷ আপনিও দেখে আসুন৷ আমি এই বারান্দায় রোদ্দুরে চেয়ার পেতে বসছি৷ চারিদিকে শত্রু ওত পেতে আছে কিনা, তাই আমাকে তক্কে-তক্কে থাকতে হয়৷’
কর্নেল বেরিয়ে গিয়ে উঁচু বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে উঠোনে নামলেন, তারপর বাড়ির পেছন দিকে এগিয়ে গেলেন৷ আমি তাঁকে অনুসরণ করলুম৷
পেছন দিকটা একসময় যে ঝোপ-ঝাড়ে ভর্তি ছিল, তা বোঝা গেল৷ ভৌতিক উপদ্রবের পর সম্ভবত সেগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে৷ কিন্তু পাঁচিলের ধারে প্রকাণ্ড সব গাছ৷ সেই গাছগুলোর ডাল দোতলার জানলার কাছে পৌঁছে গেছে৷ কাজেই সেই ডাল বেয়ে কেউ এসে ভূতুড়ে উৎপাত করতেই পারে৷
কর্নেলের এক বদ অভ্যাস, কিছু দেখতে হলে সবসময়ই বাইনাকুলারে চোখ রাখা চাই৷ গাছের ডাল বেয়ে এসে ফিসফিস করে ‘সুদে-আসলে এক লাখ’ কথা কেউ বলতে পারে, এই শুনে কর্নেল বাইনাকুলার নামালেন৷ তারপর মুচকে হেসে বললেন, ‘তা পারে৷ তবে তার রক্ষাকালীবাবুর বন্দুকের গুলিতে মারা পড়ার চান্স আছে৷’
বলে তিনি দেওয়ালের কাছে গিয়ে আবার বাইনাকুলারে দোতলার দিকটা দেখতে থাকলেন৷
এই সময় শিবকালীবাবু হন্তদন্ত এসে বললেন, ‘কিছু বুঝতে পারলেন কর্নেল সাহেব?’
কর্নেল বললেন, ‘নাহ! আপনার ভোলাকে পেলেন?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আপনার জন্য চা-টা করতে বলেছি৷ আপনার কফি খাওয়ার অভ্যাস আছে৷ কিন্তু ভোলা কফি করতে পারে না৷ আর আমি তো একেবারে নিষ্কর্মা৷’
কর্নেল বললেন, ‘আমরা উঠেছি ট্যুরিস্ট বাংলোতে৷ যদি যোগাযোগ করতে হয়, সেখানেই করবেন৷ আর আমরা পেটপুরে ব্রেকফাস্ট করেই বেরিয়েছি৷’
নীচের তলার একটা ঘরে ভোলা কেরোসিন কুকার ধরাচ্ছিল৷ চায়ের কেটলি চাপিয়ে সে বারান্দায় এল এবং আমাদের করজোড়ে নমস্কার করল৷ লোকটার চেহারা দৈত্যের মতো কিংবা গরিলা বলাই ভালো৷ কারণ, গায়ের রঙ কুচকুচে কালো৷ এ বাড়িতে গোঁফের ছড়াছড়ি৷ তার গোঁফও দেখার মতো৷ মাথার চুল খুঁটিয়ে কাটা৷
শিবকালীবাবু বললেন, ‘ভোলা, তুই চা-ফা করে নিয়ে আয়৷ আমরা বসার ঘরে যাচ্ছি৷ দাদা কোথায় গেল?’
ভোলা বলল, ‘ওনার বাতিক৷ বসেই ছিলেন, হঠাৎ ঠাকুরবাড়ির দিকে দৌড়ে গেলেন৷’
শিবকালীবাবু কথাটা শুনেই বললেন, ‘আপনারা ওই ঘরে বসুন, স্যার৷ আমি দেখি দাদা ওদিকে কেন গেল৷’
বাড়িটা দক্ষিণদুয়ারি৷ বারান্দা থেকে দক্ষিণে ঠাকুরবাড়ির মন্দিরের চূড়া দেখা যায়৷ কিন্তু ওদিকের দেওয়ালের পাশে ঘন ঝোপ-জঙ্গল৷ তাই কোনো দরজা দেখা যায় না৷
কর্নেল সেদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এসো তো জয়ন্ত, গিয়ে দেখি রক্ষাকালীবাবু কাকে গালাগালি করছেন৷’
ভোলা বাঁকা মুখে বলল, ‘রায়বংশের পাগলের অভাব নাই, স্যার৷’
কিন্তু কর্নেল হন্তদন্ত এগিয়ে গেলেন৷ আমি তাঁর পিছনে৷
দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে দেখি, সামনে একটা মন্দির আর তার ওধারে একটা পুকুর৷ পুকুরের তিন পাড়ে ধ্বংসাবশেষ আর ঝোপ-জঙ্গল৷ মন্দিরের নীচের চত্বরে দাঁড়িয়ে বন্দুকের নল তুলে রক্ষাকালীবাবু কাকে শাসাচ্ছিলেন—আবার যদি তোকে এখানে উঁকিঝুঁকি মারতে দেখি, বন্দুকের গুলিতে তোর মাথা ফুটো করে দোব৷
শিবকালীবাবু তাঁর দাদাকে ধরে টানাটানি করছিলেন—‘আঃ৷ দিনদুপুরে খামোকা হৈচৈ বাধিও না তো৷ তোমার চোখের ভুল৷’
রক্ষাকালীবাবু আমাদের দেখতে পেয়ে ঘুরে দাঁড়ালেন৷ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, ‘বুঝলেন কর্নেল স্যার, কিছুদিন থেকে এখানে এক পাগলা সাধুর উৎপাত শুরু হয়েছে৷ ট্যুরিস্ট লজের পাঁচু একসময় আমার এখানে কাজ করত৷ সেদিন সে বলে গেল, ওদের ওখানে এক পাগলা সাধু উৎপাত করে বেড়াচ্ছে৷ আমাকে সে সাবধান করে দিতে এসেছিল৷ পাগলার কাজই হল আড়াল থেকে ঢিল ছোঁড়া৷’
কর্নেল বললেন, ‘এখন তাকে দেখলেন কোথায়?’
রক্ষাকালীবাবু বললেন, ‘ওই দরজায় কে এসে ধাক্কা দিচ্ছিল৷ আমি দৌড়ে এসে দরজা খুলতেই বজ্জাতটা পালিয়ে গেল৷ তারপর পুকুরের ও-পাড় থেকে ঢিল-ছুড়তে শুরু করল৷ ওই দেখুন কত ঢিল পড়ে আছে৷’
শিবকালীবাবু বললেন, ‘ঢিল কী বলছ, এসব ইটের টুকরো৷ ওই দিকটায় আমার বড়ো জেঠা কালীরঞ্জনবাবুর বাড়ি ছিল৷’
কর্নেল বাইনাকুলারে এদিকটা দেখে নিয়ে বললেন, ‘চলুন৷ আপনার বন্দুক দেখেছে, কাজেই পাগলাবাবা আর এদিকে আসবে না৷’
আমরা বাড়ির ভিতরে ঢুকলুম৷ ভোলা বলল, ‘সেই পাগলা সাধু আমাদের এ তল্লাটেও উৎপাত করতে আসছে বুঝি? ওকে দেখতে পেলে পাগলামি ঘুচিয়ে দোব৷ আসুন স্যার, চা রেডি করে ফেলেছি৷’
সেই বসার ঘরে ঢুকে দেখি, চার কাপ চা আর সম্ভবত আমাদের জন্য দুটো প্লেটে সন্দেশ রাখা আছে৷ আমরা সন্দেশ খেলুম না তবে হাঁটাহাঁটি এবং উত্তেজনার পর এই ঠান্ডার দিনে গরম চা তারিয়ে-তারিয়ে খেতে থাকলুম৷
শিবকালীবাবু বললেন, ‘বাড়ির পেছনে কি তেমন সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ল কর্নেল স্যার?’
কর্নেল বললেন, ‘না৷ দোতলার অত উঁচু জানলার কাছে জলজ্যান্ত মানুষ রাতদুপুরে উৎপাত বাধাবে, এটা অসম্ভব মনে হল৷’
রক্ষাকালীবাবু ফুঁ দিয়ে দিয়ে চা খাচ্ছিলেন৷ তিনি বললেন, ‘শিবুকে আমি বলেছিলুম, একটা ইলেকট্রিক তার জানলার পেছন দিকে টাঙিয়ে রাখতে৷ ভোলা ইলেকট্রিকের কাজ শিখে ফেলেছে৷ সে রাত্তিরে স্যুইচ টিপে তারটায় কারেন্ট চালু রাখবে আর যে-ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে ভয় দেখাতে আসে, সে শক খেয়ে ধপাস করে পড়ে যাবে৷’
শিবকালীবাবু বললেন, ‘কিন্তু তাতে যে আমরা মানুষ খুনের দায়ে পড়ব, তাই আমি রাজি হইনি৷’
কর্নেল বললেন, ‘তাহলে আপনার ধারণা রাত একটায় যে ফিসফিস করে ‘সুদে-আসলে এক লাখ’ বলতে আসে, তাকে আপনি মানুষ ভাবছেন?’
শিবকালীবাবু বললেন, ‘প্রথম প্রথম তাই ভেবেছিলুম কিন্তু আপনার যেমন মনে হয়েছে এটা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, তেমনি আমারও মনে হয়েছে৷’
রক্ষাকালীবাবু লাল চোখ কটমট করে বললেন, ‘মানুষ নয় যদি তাহলে কি ভূত? আমি কিন্তু ভূতপ্রেতে বিশ্বাস করি না৷ এখন মনে হচ্ছে এই কাজটা ওই পাগলা সাধুর৷’
ভোলা বলল, ‘আমারও তাই সন্দেহ, বড়োবাবু৷ অ্যাদ্দিন আপনাদের বলিনি, এখন না বলে পারলাম না৷’
শিবকালীবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, ‘ওই পাগলা সাধু অত উঁচুতে উঠবে কি মন্ত্রবলে?’
রক্ষাকালীবাবু তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা ভোলা, আমাদের বাড়িতে গাছের ডাল কাটার জন্যে একটা উঁচু মই ছিল না? সেটা তো দেখতে পাচ্ছি না কিছুদিন থেকে৷’
শিবকালীবাবু নড়ে বসলেন, ‘তাই তো! মইটার কথা আমার একেবারেই মনে ছিল না৷ তুমি হয়তো ঠিকই ধরেছ, দাদা৷ ওই মই-এ চেপে পাগলা সাধুই আমাদের ভয় দেখিয়ে নেমে যায়৷ তারপর মইটা যেখানে ছিল সেখানে রেখে চলে যায়৷ পুলিশ আসার পর বোধহয় সে মইটা দালানবাড়ির জঙ্গলে কোথাও লুকিয়ে রেখেছে৷’
কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, ‘আমরা উঠব৷ আপনারা বরং ভোলাকে দিয়ে মইটা খুঁজে দেখুন৷ হ্যাঁ, আর একটা কথা৷ ‘সুদে-আসলে এক লাখ’-এই কথাটাই বা পাগলা সাধুবাবা বলে কেন? আপনারা কি এটা নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা করেছেন?’
রক্ষাকালীবাবু বললেন, ‘শিবু কী ভেবেছে জানি না, আমি ভেবেছি৷ কথাটা কাকেও বলব না ভেবেছিলুম কিন্তু এবার মনে হচ্ছে বলে ফেলা উচিত৷’
শিবকালীবাবু ব্যস্তভাবে বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, কথাটা বলো৷’
রক্ষাকালীবাবু চাপা স্বরে বললেন, ‘মায়ের কাছে শুনেছিলুম, ছোটোকাকা হরকালী রায়ের কাছে বাবা নাকি কিছু টাকা ধার করেছিলেন৷ তারপর তো ছোটোকাকা মারা পড়লেন৷ ক’দিন ধরে প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি চলছিল, তাই তাঁকে দাহ করতে পারা যায়নি৷ গঙ্গায় লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছিল৷’
কর্নেল বললেন, ‘হ্যাঁ৷ সে কথাও শুনেছি৷ তারপর নাকি তিনি দিব্যি জ্যান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন৷ তারপর কিছুকাল কাটিয়ে তিনি নাকি হঠাৎ একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে যান৷’
ভোলা কেন যেন চমকে উঠে বলল, ‘আচ্ছা বড়োবাবু, এই পাগলা সাধু আপনাদের সেই ছোটোকাকা নন তো? আমি তাঁকে দেখিনি কিন্তু কাল ট্যুরিস্ট লজে পাঁচুর সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়েছিল৷ সে আমাকে চুপিচুপি বলছিল৷ জমিদারবাড়ির ছোটো শরিক হরকালী রায় সাধুবাবা হয়ে ফিরে এসেছেন বলে তার সন্দেহ৷ মাথাটা কোনো কারণে বিগড়ে গেছে৷ কিন্তু পাঁচু তাঁর চেহারা দেখে অবাক হয়েছে৷’
রক্ষাকালীবাবু হঠাৎ খাপ্পা হয়ে বললেন, ‘একেবারে বাজে কথা৷ কর্নেল স্যার, আপনার পাঠানো গোয়েন্দা ভদ্রলোক ফিরে এলে বলব, ওই পাগলাটাকে যেভাবে হোক যেন ধরে ফেলেন৷ ভোলা তাঁকে সাহায্য করবে৷ তারপর কাঞ্চনপুরের বৃদ্ধ লোকেরা তাকে দেখলে নিশ্চয়ই চিনতে পারবেন৷ তারপর তাকে পাগলা গারদে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে৷’
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে একটু হেসে বললেন, ‘আপনার প্ল্যানটা মন্দ নয়৷ আমাদের হালদারমশাই একসময় পুলিশ ইনসপেক্টর ছিলেন৷ অনেক বাঘা বাঘা আসামিকে ধরে ফেলার অভ্যাস তাঁর আছে৷ শুধু চাই কিছু মোটা মোটা দড়ি৷’
ভোলা উৎসাহ দেখিয়ে বলল, ‘দড়ি আছে, স্যার৷ কলকাতার হালদারবাবু যদি আমাকে সঙ্গে নিতে চান, আমি রেডি আছি৷’
এরপর কর্নেল ও আমি বেরিয়ে এলুম৷ শিবকালীবাবু আমাদের বেরুনোর জন্য দাদার কাছ থেরে গেটের তালার চাবি চেয়ে নিলেন৷ গেট খুলে দিয়ে তিনি চাপা স্বরে বললেন, ‘ব্যাপারটা সেরকম মনে হচ্ছে না, কর্নেল সাহেব৷ আপনাকে বলেছি, সে রাতে আমাদের ঘড়িতে যখন একটা দশ, তখন কিন্তু বৈঠকখানার দেওয়ালঘড়িতে একটা বাজতে দুই মিনিট৷ তারপর শুয়ে পড়ার পর দেওয়ালঘড়িতে একটা বেজেছিল৷ তারপর ওই উৎপাত৷ এই ঘড়ির ব্যাপারটা সন্দেহজনক, তাই না?’
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ৷ এই ব্যাপারটা সত্যি রহস্যময়৷ তবে আপনাকে এই সময় একটা গোপন প্রশ্ন করছি৷ আশা করি সঠিক উত্তর দেবেন৷ কারণ, আপনার উত্তরের উপরই আমার পরবর্তী কাজকর্ম নির্ভর করবে৷’
শিবকালীবাবু ঘরের পিছনটা দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘ওই ভোলাকে দেখলেন, ব্যাটাচ্ছেলে দাদার চর৷ খুলেই বলি৷ দাদা আজকাল আমাকেও বিশ্বাস করেন না৷’
কর্নেল বললেন, ‘খুলে বলুন৷’
শিবকালীবাবু চুপি চুপি বললেন, ‘আমাদের গৃহদেবতা কালীমাতার নাকি অনেক গয়নাগাঁটি ছিল৷ হিরে বসানো সোনার মুকুটও ছিল৷ তার একটা ফোটো দাদার ঘরে আছে৷ জমিদারি উঠে গেলে সেইসব দামি গয়নাগাঁটি রাতারাতি চুরি হয়ে যায়৷ তা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ পুলিশকে জানানো হয়েছিল, তাতেও কোনো ফল হয়নি৷ কিন্তু দাদা নাকি সন্দেহ করেন আমাদের বাবা সেগুলো লুকিয়ে ফেলেছিলেন পাছে অন্য শরিকরা তা হাতিয়ে নেয়৷
‘খুলেই বলি, পাঁচুর কাছে শুনেছি দাদার সন্দেহ সেগুলো কোথায় লুকিয়ে রাখা আছে, তা মৃত্যুর আগে মা আমাকে বলে গিয়েছেন৷ কিন্তু আমার সন্দেহ দাদাই সেগুলো সিন্দুক থেকে চুরি করে লুকিয়ে রেখেছেন৷ এইজন্যই আমি শ্বশুরবাড়িতে না থেকে দাদার কাছে এসে থাকি৷’
আমরা যে-পথে এসেছিলুম, সেই পথে ফিরে চললুম৷ আমবাগানের কাছে গিয়ে কর্নেল বললেন, ‘কী বুঝলে, জয়ন্ত?’
বললুম, ‘শেষ অবধি ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে গুপ্তধনে৷ এই গুপ্তধন নিয়েই যত সন্দেহ আর পরস্পরকে অবিশ্বাস আর ওই ভূতুড়ে উৎপাত৷’
কর্নেল কিছু বললেন না৷ এতক্ষণে একটা চুরুট ধরালেন৷ তারপর বাইনাকুলারে দক্ষিণ দিকে দালানবাড়ির ধ্বংসস্তূপে কিছু দেখতে থাকলেন৷
জিগ্যেস করলুম, ‘পাগলাবাবাকে দেখতে পাচ্ছেন নাকি?’
কর্নেল বললেন, ‘নাহ৷ আমি আমার বন্ধু কালীরঞ্জন রায়ের বাড়িটা খুঁজছিলুম৷ পনেরো বছর আগের কথা৷ ইতিমধ্যে সব ধ্বংসস্তূপ হয়ে গেল কেন তাই ভাবছি৷ অবশ্য আমি যখন এসেছিলুম, তখন তার বাড়িটার অবস্থা ছিল জরাজীর্ণ৷ কাজেই বাড়িটা ভেঙে পড়তেই পারে৷ চলো, ট্যুরিস্ট লজে ফেরা যাক৷’
ট্যুরিস্ট লজে ফিরে আমরা পোশাক বদলে নিলাম৷ তখন প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে৷ বাথরুমে গরম জলের ব্যবস্থা ছিল৷ কিন্তু এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় স্নানের ইচ্ছে হল না৷ আর কর্নেল তো শীতকালে মাসে একদিন স্নান করেন৷ এটা নাকি ওঁর সামরিক জীবনের অভ্যাস৷
বেলা একটায় লাঞ্চ করে নিয়ে আমি বিছানায় গড়িয়ে পড়লুম৷ কর্নেল দক্ষিণের বারান্দায় রোদে চেয়ার পেতে বসলেন৷ তারপর দেখলুম, পাঁচু এঁটো থালা-বাটি সাজিয়ে ট্রে-হাতে বেরুল এবং কর্নেলের সঙ্গে চাপা গলায় কথা বলতে লাগল৷ আমার চোখে তখন ভাতঘুমের টান৷
ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, কিন্তু কর্নেলের হাতের খোঁচা খেয়ে ঘুম ভেঙে গেল৷ তিনি বললেন, ‘আড়াইটা বাজে৷ উঠে পড়ো৷ রেডি হয়ে নাও৷ এখনই বেরুতে হবে৷’
শীতের পোশাক চড়িয়ে এবং কর্নেলের নির্দেশমতো গুলিভরা রিভলভার প্যান্টের পকেটে রেখে বেরিয়ে পড়লুম৷ দরজায় তালা এঁটে কর্নেল বললেন, ‘শিবকালীবাবু ট্যুরিস্ট লজে ফোন করেছিলেন৷ সুরঞ্জনবাবুকে তিনি আমাকে খবর দিতে বলেন৷
‘নীচে গিয়ে ফোনের সাড়া পেয়েই শিবকালীবাবু বললেন, ফোনটা শ্বশুরবাড়ি থেকে করছেন—প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ হালদার এখনও বাড়ি ফেরেননি৷ তাই দাদা কথাটা আপনাকে জানাতে বললেন৷’
বললুম, ‘হালদারমশায়ের ব্যাপার৷ হয়তো পাগলাবাবাকে অনুসরণ করে বনেজঙ্গলে ঘোরাঘুরি করছেন৷’
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, ‘শিবকালীবাবু আমাকে জানিয়েছেন, তাঁদের বাড়ির গেটে একটা কাগজ আটকানো ছিল৷ তাতে কেউ লাল কালিতে লিখেছে—তোমাদের টিকটিকিকে ফাঁদে ফেলেছি৷ তার লেজ কাটার আগেই দাড়িওয়ালা বুড়োকে খবর দাও৷’
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘সর্বনাশ!’
কর্নেল বললেন, ‘লেজ কাটার আগেই হয়তো আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাব৷’
চমকে উঠে বললুম, ‘হালদারমশাই কোথায় আছেন, আপনি কী করে জানলেন?’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘ধ্যানবলে নয়৷ আমার মাথায় একটা অঙ্ক কষার কাজ চলছে৷ সেই অঙ্ক থেকেই ঘটনাস্থলের সম্ভাবনা মাথায় এসেছে৷’
ট্যুরিস্ট লজ থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর্নেল কাঞ্চনপুরের দিকে এগিয়ে চললেন৷ তারপর সেই আমবাগানের ভিতর দিয়ে হেঁটে জমিদারবাড়ির ধ্বংসস্তূপের সামনে পৌঁছলেন৷ সেখানে একটু দাঁড়িয়ে বাইনাকুলারে কিছুক্ষণ সামনেটা দেখে নিয়ে চাপা স্বরে বললেন, ‘সাবধানে চারদিক লক্ষ্য রেখে গুড়ি মেরে এগোতে হবে৷ অস্ত্রটা বরং হাতেই রাখো৷’
তাঁর কথা শুনে প্রথমে একটা আতঙ্কের শিহরন জাগল৷ কিন্তু অস্ত্রটা হাতে নিতেই মরিয়া হয়ে উঠলুম৷
কর্নেলের আচরণ আমাকে বিস্মিত করেছিল৷ ধ্বংসস্তূপের ভেতরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে গুড়ি মেরে খুব সতর্কভাবে তাঁকে অনুসরণ করছিলুম৷ কিছুক্ষণ চলার পর কর্নেল চাপা স্বরে বললেন, ‘সামনে একটা থাম দেখা যাচ্ছে৷ বাদবাকিটা ভেঙে পড়া ছাদ আর ইটের দেওয়াল৷’
আমি তাঁর পাশ দিয়ে উঁকি মেরে সেটা দেখে নিলুম৷ ওটা একটা থামওয়ালা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, কিন্তু এখনও পুরো গুঁড়িয়ে যায়নি৷ পাশে একটা বটগাছ চোখে পড়ল৷ তারপরই দেখলুম, একটা ষণ্ডামার্কা লোক বটগাছের গুঁড়ির পাশে এসে দাঁড়াল৷ তার পরনে ফুলহাতা সোয়েটার এবং প্যান্ট৷ মাথা থেকে কান ঢেকে সে মাফলার জড়িয়েছে৷ তাই মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না৷
আমি কর্নেলের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে তার কথা বলতে যাচ্ছিলুম৷ কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিলেন তারপর জ্যাকেটের ভিতর হাত ঢুকিয়ে তাঁর রিভলভারটা বের করলেন৷
শীতের বিকেল৷ তাতে ওই ধ্বংসস্তূপ ও ঝোপঝাড়৷ মনে হচ্ছিল দ্রুত দিনের আলো কমে আসছে৷
একটু পরে লোকটা সামনের দিকে ইশারা করে কাকে ডাকল৷ তারপর যাকে দেখলুম, আমার আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল৷ লোকটা আর কেউ নয়, সেই ভোলা৷ তার হাতে একটা কাটারি৷ এবার দু’জনে বটগাছটার আড়ালে চলে গেল৷
একটু অপেক্ষা করার পর কর্নেল আমাকে চোখের ইশারায় সতর্ক করে দিলেন, যেন বিন্দুমাত্র শব্দ না করি৷ কিন্তু সবখানে ঝোপঝাড়ের শুকনো পাতা পড়ে আছে৷ একটু-আধটু শব্দ চলাফেরা করলেই শোনা যাবে৷ তবু যতটা সম্ভব সাবধানে গুড়ি মেরে কর্নেলের পিছনে এগিয়ে গেলুম৷ থামের কাছাকাছি গিয়ে কর্নেল আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘ভোলা তার সঙ্গীর সঙ্গে ওদিকে কোথায় গেল কে জানে৷ কিন্তু আবার ওরা এদিকে আসতে পারে কিনা বুঝতে পারছি না৷ কাজেই একটু অপেক্ষা করা যাক৷’
দীর্ঘ প্রায় পাঁচমিনিট অপেক্ষা করার পর কর্নেল প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ভেঙে পড়া ঘরটার ভিতর উঁকি দিলেন৷ তারপর দেখলুম, তিনি তাঁর খুদে জোরালো আলোর টর্চটা বের করে ভিতরে আলো ফেললেন৷ কারণ বটগাছের ঘন ডালপালা ভাঙা ঘরটার ভিতর এগিয়ে এসে ভিতরটা আঁধার করে রেখেছে৷
আলো জ্বালার পরই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘কী সর্বনাশ!’
আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কর্নেল ভিতরে ঢুকে গেলেন৷
আমি ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছিলুম কিন্তু কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, ‘তুমি লক্ষ্য রাখো বটগাছের গুঁড়ির দিকে৷ ওরা ফিরে এলেই ভেতরে ঢুকে পড়বে এবং আমাকে জানাবে৷’
তারপরই কানে এল, ভাঙা ঘরের ভিতরে ঝোপঝাড়ের আড়ালে ফোঁস ফোঁস শব্দ হচ্ছে৷ চমকে উঠেছিলুম৷ সাপ নয় তো! তারপরই মনে পড়ে গেল এই শীতে সাপেরা গর্তে ঘুমোতে গেছে৷ আমার দৃষ্টি বটগাছটার গুঁড়ির দিকে, কিন্তু কান ঘরের ভেতরে কী ঘটছে তাই শুনছি৷ একবার চাপা স্বরে কর্নেলের ধমক শুনতে পেলুম, ‘চুপ! ছেলেমানুষি করবেন না৷ আপনাকে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে৷ দড়িগুলো আগে কেটে ফেলি৷’
একটু পরে কানে এল গোয়েন্দাপ্রবর হালদারমশায়ের গলা, ‘আচমকা পিছন থিইক্যা আমারে ফ্যালাইয়া দিল৷’
কর্নেল আবার বললেন, ‘চুপ, চুপ৷ শিগগির আমার সঙ্গে এখান থেকে বেরিয়ে আসুন৷’
তারপর দেখলুম ভোলা যেখান দিয়ে বেরিয়েছিল, সেখান থেকে গুড়ি মেরে কর্নেল আর তাঁর পিছনে হালদারমশাই বেরুচ্ছেন৷ আমি কিছু বলার আগেই কর্নেল বললেন, ‘জয়ন্ত, আমরা যেদিক থেকে এসেছি, সেই দিকে ফিরে চলো৷’
আগের মতো গুড়ি মেরে ধ্বংসস্তূপ আর ঝোপঝাড় পেরিয়ে সেই আমবাগানে পৌঁছলুম৷ হালদারমশায়ের মুখে ইটের গুঁড়োমাখা লাল ধুলো এবং তাঁর সোয়েটারের অবস্থা তেমনই নোংরা৷ তিনি হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ‘আমি এক-জনারে ফলো কইর্যা আসছিলাম৷ তারপর আচমকা পিছন থিইক্যা কে আমার উপর ঝাঁপ দিল আর আমারে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁইধ্যা ফেলল৷ উপুড় হইয়া পড়ছিলাম তাই তাদের দেখি নাই৷ দুইজন ছিল৷ আমারে উপুড় কইর্যা দুইজনে ওই ভাঙা ঘরের ভিতরে শোয়াইয়া রাখিল৷ চিৎকার করার সুযোগ দেয় নাই৷ মুখে তখনই টেপ সাঁইট্যা দিয়া—’
কর্নেল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনার ফায়ার আর্মস সঙ্গে ছিল না?’
হালদারমশাই প্যান্টের পকেটে হাত ভরে তাঁর রিভলবার বের করে দেখালেন৷ বললেন, ‘ওই অবস্থায় এটা ইয়ুজ করব ক্যামনে?’
আমি বললুম, ‘ভাগ্যিস ওরা আপনার পকেট হাতড়ে দেখেনি৷’
কর্নেল বললেন, ‘আপনি কাকে ফলো করে আসছিলেন?’
হালদারমশাই প্যান্টের পকেট থেকে নস্যির কৌটো বের করে এক টিপ নস্যি নিলেন৷ তারপর নোংরা রুমালে নাক মুছে বললেন, ‘লোকটারে এখানে আইয়াই বড়োবাবুর লগে মিট করতে দেখছি৷ দুইজনে আড়ালে গিয়া কথা কইতেছিল৷ লোকটারে দেইখ্যা আমার সন্দেহ হইতাছিল৷’
কর্নেল বললেন, ‘তখন ছোটোবাবু মানে শিবকালী রায় বাড়িতে ছিলেন না?’
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, ‘না৷ লোকটাকে তিনবার আইতে দেখছি৷ ওই তিনবারই শিবকালীবাবু বাড়িতে ছিলেন না৷ হ্যাঁ, একটা কথা বলা দরকার—ভোলারে দিয়া বড়োবাবু অরে হয়তো ডাইক্যা আনছিলেন৷’
আমি বললুম, ‘লোকটা কে, আপনি তা জিগ্যেস করেননি বড়োবাবুকে?’
হালদারমশাই বললেন, ‘করছিলাম৷ বড়োবাবু কইলেন, ভদ্রলোক একজন অ্যাডভোকেট৷ সম্পত্তি লইয়া মামলা-মোকদ্দমায় উনি আমাগো কাম করেন৷ কিন্তু মিঃ হালদার৷ এই কথাটা যেন শিবুরে জানাইবেন না৷ ক্যান কী, শিবুর শ্বশুরের লগে অ্যাডভোকেট হাজরাবাবুর বিবাদ আছে৷ আইজ কী খেয়াল হইল, ছোটোবাবু না থাকার সময় হাজরাবাবুকে ফলো করছিলাম৷ তারপর ওই কাণ্ড৷’
কর্নেল জিগ্যেস করলেন, ‘হাজরাবাবুর পুরো নাম কী, জানেন?’
‘উপেন হাজরা৷’ বলে গোয়েন্দা-প্রবর তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে হাত এবং পা ছোঁড়াছুড়ি করে আড়ষ্টতা কাটিয়ে নিলেন৷ তারপর বললেন, ‘এখন কী করি কন তো কর্নেল স্যার৷ হেভি ক্ষুধা পাইছে আর ব্যাগখানও ওনাদের বাড়িতে আছে৷ আমার আর বড়োবাবুরে বিশ্বাস হয় না৷’
কর্নেল বললেন, ‘আপনি এক কাজ করুন৷ জয়ন্তের সঙ্গে ট্যুরিস্ট লজে চলে যান৷ আমি ওদের বাড়ি থেকে শিবকালীবাবুর সাহায্যে আপনার ব্যাগটা উদ্ধার করে নিয়ে যাব৷’
আমি বললাম, ‘কিন্তু ভোলা আর উপেন হাজরা ওদিকে কোথায় গেল, জানা উচিত ছিল৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘সে-দায়িত্বটা আমি নিচ্ছি৷ আমি তো একজন ন্যাচারোলজিস্ট৷ কাজেই প্রকাশ্যে ওই বটগাছের কাছে উপেন হাজরার সঙ্গে আলাপ করার অসুবিধা নেই৷ আর ভোলা তো আমাকে চেনে৷’
অগত্যা হালদারমশাইকে সঙ্গে নিয়ে আমি আমবাগানের ভিতর দিয়ে এগিয়ে গেলুম৷ যেতে যেতে বললুম, ‘হালদারমশাই, আপনার মুখটা মুছে পরিষ্কার করা দরকার৷ সোয়েটারটা খুলে ভালো করে ঝেড়ে ফেলুন৷’
আমার কথা শুনে হালদারমশাই তাঁর নোংরা রুমাল দিয়েই মুখটা যথাসাধ্য মুছে পরিষ্কার করলেন৷ তারপর সোয়েটার খুলে ঝেড়ে ধুলোবালি সাফ করে নিলেন৷ সোয়েটার পরতে-পরতে তিনি চাপা স্বরে বললেন, ‘এই দুই দিনে একটা কথা ভালো বুঝছি, জয়ন্তবাবু৷ বড়োবাবু ছোটোবাবুর চোখের আড়ালে সম্ভবত অনেক কিছু করেন৷’
‘অনেককিছু মানে?’
‘আমার সন্দেহ ওনাদের গৃহদেবতা কালীমাতার হারানো গয়নাগাঁটির খোঁজ বড়োবাবুর জানা৷ কিন্তু ছোটোবাবুরে তিনি তাঁর ভাগ দিতে চান না৷’
হাঁটতে-হাঁটতে বললুম, ‘বুঝলুম৷ কিন্তু রাতদুপুরে ওই ভূতুড়ে উৎপাতের কি কোনো কিনারা করতে পেরেছেন?’
হালদারমশাই বললেন, ‘পারিনি, তবে আমার সন্দেহ ওটা বড়োবাবুরই কারসাজি৷ আর ভোলা ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট৷’
হাসতে-হাসতে বললুম, ‘কিন্তু ভোলা বাড়ির পেছন দিকে দোতলায় জানলার কাছে ওঠে কী করে?’
হালদারমশাই থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর চাপা স্বরে বললেন, ‘পুকুরপাড়ে ঝোপের ভিতর একখানা মই দেখছিলাম৷’
আমি শিবকালীবাবুদের বাড়ি থেকে মই হারানোর কথাটা ফাঁস করলুম না৷ তবে আমার মনে হল, ভূতের উৎপাতের রহস্য এতেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে৷ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে হালদারমশায়ের সিদ্ধান্ত ঠিক৷ ছোটোভাইকে গুপ্তধন থেকে বঞ্চিত করতেই রক্ষাকালীবাবু ভোলার সাহায্যে সেই ভূতুড়ে উৎপাত শুরু করেছেন৷ এতদিন করেননি কিন্তু ইদানীং হঠাৎ তাঁর এই চক্রান্তের একটা কারণ থাকতে পারে৷ মা কালীর চুরি যাওয়া গয়নাগাঁটির খোঁজ দৈবাৎ তিনি পেয়ে গেছেন৷ কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, শিবকালীবাবু এসে বাড়িতে থাকার জন্য তিনি তা পাচার করতে পারছেন না৷
ট্যুরিস্ট লজে পৌঁছনোর পর সুরঞ্জনবাবুকে ডেকে বললুম, ‘আমাদের এই গেস্ট ভদ্রলোক হঠাৎ এসে পড়েছেন৷ আমাদের ঘরে একটা ক্যাম্প খাটের ব্যবস্থা করতে পারলেই আর কোনো অসুবিধা হবে না৷ আর এখনই যদি কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা করতে পারেন, ভালো হয়৷’
বলে আলাপ করিয়ে দিলুম, ‘ইনি মিস্টার কে. কে. হালদার৷ ইনি কলকাতার স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ ইনস্পেক্টর৷ কথাটা যেন চাপা থাকে, সুরঞ্জনবাবু৷ মিঃ হালদার বিশেষ কাজে এখানে এসেছেন৷’
সুরঞ্জনবাবু সঙ্গে-সঙ্গে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন৷ হালদারমশাইকে নমস্কার করে বললেন, ‘ওপরে যান, স্যার৷ আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলছি৷’
হালদারমশাই বললেন, ‘আই অ্যাম হাংরি৷’
এমন ভঙ্গিতে বললেন, মনে হল হালদারমশাই তাঁর আগের পুলিশ জীবনে ফিরে গেছেন৷
কর্নেল আমাকে ঘরের চাবি দিয়েছিলেন৷ দরজা খোলার পর হালদারমশাই সোফায় হাত-পা ছড়িয়ে বসলেন৷ বললুম, ‘আপনি আগে বাথরুম গিয়ে মুখহাত ভালো করে ধুয়ে নিন৷’
হালদারমশাই সহাস্যে বললেন, ‘বুদ্ধি কইর্যা বুটজুতা পরছিলাম৷ নয় তো আবার একজোড়া জুতা কিনতে হইত৷’
বলে তিনি বাথরুমে ঢুকে গেলেন৷
মিনিট পনেরোর মধ্যেই পাঁচু ট্রে-তে দু’প্লেট আলুকাবলি আর দু’কাপ চা রেখে গেল৷
পাঁচু কোনো কথা বলল না দেখে বুঝতে পারলুম, হালদারমশাইকে সে কলকাতার পুলিশ ভেবে যেন একটু ভয় পেয়েছে৷ তার ভয় ভাঙানোটা উচিত মনে করলুম না৷
মিনিট পাঁচেক পরে পাঁচু আবার এল, একটা ভাঁজ করা ক্যাম্পখাট আর বগলদাবা করে বিছানা-কম্বল-বালিশ নিয়ে৷
বললুম, ‘ওখানেই রেখে দাও৷ সময়মতো আমরা নিজেরাই বিছানা পেতে নেব৷’
কর্নেলের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলুম৷ তিনি ফিরলেন তখন সাড়ে পাঁচটা বাজে৷ ঘরে আলো জ্বলছে, বাইরে অন্ধকার এখনই ঘন হয়েছে৷
কর্নেলের হাতে হালদারমশায়ের ব্যাগ৷ কর্নেলকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল৷ হালদারমশাই ব্যস্তভাবে জিগ্যেস করলেন, ‘আমি শুইতাম ছোটোবাবুর ঘরে৷ লক্ষ্য করছি, উনি বাহির হইলে নিজের ঘরে তালা দিতেন৷ আপনারে তিনি কী কইলেন?’
কর্নেল তেমনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘শিবকালীবাবুকে বলেছি, আপনি আমাদের সঙ্গে ট্যুরিস্ট লজে থাকবেন৷ তাই উনি ব্যাগটা আমাকে দিতে দ্বিধা করেননি৷ কিন্তু আমার মনে একটু ভয় জেগেছে৷ আজ রাতে হাজরাবাবু কিংবা ভোলা তাঁকে হয়তো মেরে ফেলার চেষ্টা করবে৷ সব কথা পরে খুলে বলব৷ আগে কফি খেয়ে নিই৷’
বললুম, ‘শিবকালীবাবুকে আপনি সাবধান করে দিয়ে এলেন না কেন?’
কর্নেল বললেন, ‘দিয়েছি৷ আজ রাতে উনি শ্বশুরবাড়িতে থাকবেন৷ তবে আমাদের সঙ্গে সময় মতো ওঁর দেখা হবে৷’
বললুম, ‘হাজরাবাবু আর ভোলা বটগাছের ওদিকে পিছনে কোথায় গিয়েছিল, জানতে পেরেছেন?’
কর্নেল বললেন, ‘পেরেছি৷ ওরা গিয়েছিল একটা বিশেষ ধ্বংসস্তূপের কাছে৷’
বলে কর্নেল ক্লান্তভাবে চুপ করে গেলেন৷
রাত্রে আমাদের ঘরে বসে খাওয়াদাওয়া হয়ে গেল৷ পাঁচুকে বলা ছিল, সে যেন এঁটো থালা-বাটিগুলো নিয়ে যায় এবং কর্নেলের জন্য এক কাপ কফি দিয়ে যায়৷
তখন রাত সাড়ে ন’টা বাজে৷ চারদিক একেবারে স্তব্ধ৷ দরজা বন্ধ করতে গিয়ে বাইরের বারান্দাটা দেখে নিলুম৷ জনপ্রাণীটি নেই৷ কর্নেল চেয়ারে বসে কফি খাচ্ছিলেন৷ মাঝখানে একপাশে ক্যাম্প খাটটা পেতে হালদারমশায়ের বিছানা তৈরি হয়ে গেছে৷ তিনি বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে বললেন, ‘এখানে শীতটা বড্ড বেশি৷’
বললুম, ‘মা গঙ্গার কারণেই শীতের এত বেশি উপদ্রব৷’
‘ঠিক কইছেন৷’ বলে হালদারমশাই এক টিপ নস্যি নিলেন৷ ইতিমধ্যে তিনি কর্নেলের মুখে শুনে নিয়েছেন কীভাবে দৈবাৎ তাঁকে আমরা উদ্ধার করেছি৷ সেই কথার জের টেনে এবার তিনি বললেন, ‘কর্নেল স্যার, ওই ভোলারে আমি ছাড়ুম না৷ ওর একখান ঠ্যাং-এ একখান গুলি মাইর্যা খোঁড়া কইর্যা দিমু৷’
কর্নেল বললেন, ‘আপনাকে গুলি করতে হবে না৷ পুলিশই ওর সৎগতি করবে৷ আমি ট্যুরিস্ট লজে ফিরে টেলিফোনে থানায় যোগাযোগ করেছি৷ আমার অভ্যাস তো জানেন, কোথাও বেরোনোর আগে এলাকার পুলিশ-কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারপর বেরোই৷ কারণ, শেষ কাজটা পুলিশকেই করতে হয়৷’
জিগ্যেস করলুম, ‘এই ঠান্ডা কনকনে রাতে আবার বেরুবেন নাকি?’
কর্নেল বললেন, ‘না৷ হালদারমশাইকে দড়ি বাঁধা অবস্থায় দেখতে না পেয়ে ভোলা আর তার গার্জেনরা সতর্ক হয়ে গেছে৷ ওরা নিশ্চিত টের পেয়েছে আমরাই হালদারমশাইকে দড়ির বাঁধন কেটে মুক্ত করেছি৷ তা ছাড়া শিবকালীবাবুকে আমি বলেছি তিনি যেন অন্তত আজ রাতের মতো ও বাড়িতে না থাকেন৷’
বললুম, ‘ভোলা বা রক্ষাকালীবাবু আপনাকে হালদারমশায়ের ব্যাগ আনতে দেখেনি?’
কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, ‘ভোলা দেখেছে৷ তবে রক্ষাকালীবাবু তখন কালীবাড়িতে ছিলেন৷ ওঁদের সেবাইত এসেছিল সন্ধ্যা-আরতি দিতে৷ যাই হোক, আজ রাত্রে বেরুনোর কোনো প্রয়োজন দেখছি না৷ থানার অফিসার-ইনচার্জ মহেন্দ্রবাবু জমিদার বাড়ির আনাচে-কানাচে পুলিশ ফোর্স গোপনে মোতায়েন রাখবেন৷’
পাঁচু বিছানার সঙ্গে হালদারমশায়ের জন্য একটা মশারিও এনে দিয়েছিল৷ হালদারমশাইকে কর্নেল মশারিটা খাটাতে সাহায্য করলেন৷ কারণ, পাঁচু কোনো পেরেক বা হাতুড়ি দিয়ে যায়নি৷ এসব জিনিস স্বভাবত মজুত থাকে কর্নেলের কিটব্যাগে৷
এ রাতে ঘুমটা গাঢ় হয়েছিল৷ ঘুম ভেঙেছিল কালকের মতো পাঁচুর ডাকে৷ সে ঘরে ঢুকে টেবিলে চায়ের কাপ রেখে কালকের মতোই আমার মশারিটা গুটিয়ে দিল৷ উঠে বসে দেখলুম হালদারমশাই এবং কর্নেলের মশারি গোটানো রয়েছে এবং তাঁরা দুজনেই বিছানায় নেই৷
পাঁচু আমার হাতে চায়ের কাপটা দিয়ে চাপা স্বরে বলল, ‘বুড়ো সাহেবের সঙ্গে পুলিশের সেই অফিসার ভোরবেলায় বেরিয়ে গেছেন৷ আমার একটা খটকা লাগছে, স্যার৷’
বললুম, ‘বলো৷’
পাঁচু বলল, ‘জমিদার বাড়িতে ভূতের উৎপাত হয়েছে, একথা সবাই জানে৷ ওই পুলিশ অফিসার কি সেই তদন্তে এসেছেন, স্যার?
বললুম, ‘হ্যাঁ৷ উনি কর্নেল সাহেবের বন্ধু৷’
পাঁচু তখনই দরজার পর্দা তুলে বারান্দাটা দেখে এসে চাপা স্বরে বলল, ‘আমার একটা সন্দেহ হয়, স্যার৷ রাতবিরেতে ফিসফিস করে বড়োবাবু-ছোটোবাবুর কাছে কে নাকি টাকা চায়৷ সে অন্য কেউ নয়, ওই পাগলাবাবা৷ জমিদারবাড়িতে বড়োবাবুর কাছে থাকার সময় কথায়-কথায় ভোলা বলে ফেলেছিল মা-কালীর লক্ষ-লক্ষ টাকা দামের গয়নাগাঁটি হাতিয়ে বড়োবাবু-ছোটোবাবুর বাবা কালীপ্রসাদবাবু কলকাতায় ব্যবসা ফেঁদেছিলেন৷ সেই ব্যবসায়ে লোকসান খেয়ে তিনি চলে এসেছিলেন৷ শেষ বয়সে খুব কষ্ট পেয়ে মারা যান৷ মা কালীর অভিশাপ স্যার, বুঝলেন তো!’
বললুম, ‘বুঝেছি৷’
এই সময় বাইরে থেকে ম্যানেজার সুরঞ্জনবাবুর গলা শোনা গেল৷ ‘এই পাঁচু, ছোটোসাহেব কি ঘুম থেকে উঠেছেন?’
বলে তিনি পর্দা ফাঁক করে একটু হাসলেন—‘আজ একটু সকাল-সকাল উঠতে পেরেছেন৷ তো কর্নেল সাহেব ফোন করে আমাকে বললেন, আপনাকে যেন একটা খবর দিই৷’
জিগ্যেস করলুম, ‘কী খবর?’
ততক্ষণে পাঁচু ঘর থেকে কেটে পড়েছে৷ সুরঞ্জনবাবু বললেন, ‘কর্নেল সাহেব জমিদার বাড়িতে অপেক্ষা করছেন৷ আপনাকে তিনি শিগগির সেখানে যেতে বললেন৷’
কথাটা বলেই তিনি চলে গেলেন৷
আমি তাড়াতাড়ি বাথরুম সেরে পোশাক বদলে তৈরি হয়ে নিলুম৷ আজ পাঁচু আমার অস্ত্রটা দেখতে পায়নি৷ কারণ ওটা আমি তোশকের তলায় ম্যাট্রেসের উপর রেখেছিলুম৷ সিক্স রাউন্ডার .২২ ক্যালিবারের অস্ত্রটি প্যান্টের ডান পকেটে ঢুকিয়ে বেরিয়ে এলুম৷ তারপর দরজায় তালা এঁটে হন্তদন্ত সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলুম৷
সোয়া আটটা বাজে৷ চারপাশে গাঢ় কুয়াশা৷ সতর্কতার জন্য প্যান্টের দুই পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে হাঁটতে থাকলুম৷ ডান হাতের আঙুল রিভলবারের ট্রিগারে রাখা, যেন হঠাৎ আক্রান্ত হলে পাল্টা আক্রমণ করতে পারি৷ যেতে-যেতে বারবার মনে হচ্ছিল, কর্নেল জমিদারবাড়িতে এখন কী করছেন? আমাকেই বা তিনি ডাকলেন কেন? কোনো ঘটনা ঘটেনি তো!
সেই আমবাগানের ভিতর দিয়ে শটকার্ট করে জমিদার বাড়িতে গিয়ে দেখি, বাইরে পুলিশের জিপ আর একটা অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে৷ একদঙ্গল সশস্ত্র কনস্টেবল আর কয়েকজন অফিসার মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে৷
খোলা গেট দিয়ে আমি ভেতরে ঢুকেই দেখলুম, কর্নেল আর হালদারমশাই রক্ষাকালীবাবুর সঙ্গে কথা বলছেন৷ আমাকে দেখে কর্নেল বললেন, ‘এসো জয়ন্ত৷ একটা অভাবিত ঘটনা ঘটে গেছে৷’
জিগ্যেস করলুম, ‘শিবকালীবাবুর কোনো বিপদ হয়নি তো?’
রক্ষাকালীবাবু বললেন, ‘শিবু লাশ আনতে গেছে৷’
চমকে উঠে বললুম, ‘কার লাশ?’
হালদারমশাই বলে উঠলেন, ‘পাগলাবাবার৷ এখানে আইয়্যা শুনছি, সক্কলে পাগলাবাবার ভয়ে তটস্থ৷ একলা-দোকলা দেখলেই সে নাকি ঢিল ছোঁড়ে৷’
কর্নেল তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হালদারমশাই, আপনি বড়োবাবুর সঙ্গে কথা বলুন৷ এসো জয়ন্ত৷’
ঠাকুরবাড়ির দরজা খোলা ছিল৷ সেদিকে বেরিয়ে দেখি, পুকুরের পূর্ব পাড়ে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে দু’জন কনস্টেবল আর চারটে লোক একটা স্ট্রেচারে চাপিয়ে লাশ আনছে৷ তারা এদিকে না এসে পুকুরের দক্ষিণ পাড় দিয়ে ঘুরে ঠাকুরবাড়ির পিছনে অদৃশ্য হল৷
কর্নেল বললেন, ‘চলো, তোমাকে জায়গাটা দেখিয়ে আনি৷ তুমি কাল আমাকে জিগ্যেস করছিলে, অ্যাডভোকেট হাজরাবাবু আর ভোলা বটগাছের ওদিকে কোথায় গিয়েছিল! চলো দেখবে!’
পুকুরের উত্তর পাড় হয়ে কর্নেলকে অনুসরণ করে ধ্বংসস্তূপে ঢুকতে হল৷ তারপর ডানদিকে ঘুরে ফাঁকা জায়গা দিয়ে এগিয়ে সামনে সেই বটগাছটা দেখতে পেলুম৷ বটগাছটার ওপাশে একটা ঢিবি দেখা যাচ্ছিল৷ তারপরই চোখে পড়ল, ওই জায়গায় কেউ বা কারা মাটি খুঁড়েছে এবং সেই মাটি ঢিবির আকার নিয়েছে৷ গর্তটা প্রায় ফুট ছয়েক গভীর৷ সেই গর্তের ভেতর থেকে আমাদের পায়ের কাছ অবধি চাপ-চাপ টাটকা রক্ত৷ রক্তগুলো জমাট বেঁধে গেছে৷ উত্তেজনায় আমার শরীর যেন গরম হয়ে উঠেছিল৷ বললুম, ‘এখানে সেই পাগলা সাধুর লাশ পড়ে ছিল মনে হচ্ছে৷ প্রথমে কার চোখে পড়েছিল এটা?’
কর্নেল বললেন, ‘আমার দুর্ভাগ্য জয়ন্ত, তুমি তো দেখে আসছ, যেখানেই যাই চিরকালের অদৃশ্য এক আততায়ী আমার সামনে একটা করে রক্তাক্ত লাশ ছুঁড়ে ফেলে আমাকে চ্যালেঞ্জ করে৷’
বললুম, ‘আচ্ছা, লাশটা কি আপনারাই আবিষ্কার করেছিলেন?’
কর্নেল বললেন, ‘কাল এদিকটা দেখার সময় পাইনি৷ তাই হালদারমশাইকে সঙ্গে নিয়ে এখানে এসেছিলুম৷ পাগলাবাবাকে মাথা আর বুকে কেউ গুলি করে মেরেছে৷ হ্যাঁ, এখানেই মেরেছে৷ তারপর গর্ত খুঁড়ে তার লাশটা পুঁতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল৷ নিশ্চয়ই বটগাছের ওদিকে কেউ পাহারা দিচ্ছিল৷ আমাদের সাড়া পেয়েই লাশটা গর্তে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়৷ আমি হালদারমশাইকে এখানে পাহারায় রেখে থানায় গিয়েছিলুম৷ হালদারমশায়ের হাতে রিভলবার দেখে খুনিরা এসে পড়লে নিশ্চয়ই ভয় পেত৷’
বললুম, ‘কাল বিকেলে ভোলা আর হাজরাবাবু এখানে কোথায় এসেছিল?’
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুটটা জ্বেলে বললেন, ‘আমার অঙ্কের হিসেবে বলা যায়, ওরা দু’জনে এখানে পাগলাবাবাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল৷ জয়ন্ত, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পাঁচুর ধারণা সত্য৷ এই পাগলাবাবাই জমিদার বাড়ির ছোটো শরিক হরকালীবাবু! তিনি সম্ভবত ছিটগ্রস্ত ছিলেন৷ কিন্তু গোপনে এই এলাকায় তাঁর ঘোরাঘুরির একটাই কারণ থাকা সম্ভব৷ মা কালীর চুরি যাওয়া গয়নাগাঁটির খোঁজ সম্ভবত তিনি রাখতেন৷ তাই সন্ন্যাসী হয়েও এখানে ফিরে এসেছিলেন৷’
কর্নেল হঠাৎ থেমে গেলেন৷ তারপর কারো উদ্দেশে বলে উঠলেন, ‘আসুন মিঃ চ্যাটার্জি৷ জয়ন্তের কথা আপনাকে বলেছি৷ আর জয়ন্ত, ইনি কাঞ্চনপুর থানার ওসি মিঃ মহেন্দ্র চ্যাটার্জি৷’
মিঃ চ্যাটার্জি কাছে এসে বললেন, ‘রক্ষাকালীবাবু পাগলাবাবার লাশ দেখে বললেন, তিনি তাকে চেনেন না৷ কিন্তু শিবকালীবাবু জোর দিয়ে বললেন, তিনি মুখ দেখে চিনতে পেরেছেন৷ এটা তাঁর ছোটোকাকা হরকালী রায়ের লাশ৷ তিনি বরাবরই ছিটগ্রস্ত ছিলেন৷ কিন্তু এমন মানুষকে কে গুলি করে মারবে, তিনি কিছুতেই বুঝতে পারছেন না৷’
কর্নেল বললেন, ‘এই গর্তটা গতরাতেই খুঁড়ে রাখা হয়েছিল৷ কারণ খুনিরা জানত পাগলাবাবা প্রায় বটতলায় এসে বসে থাকেন৷ অবশ্য এটা আমার একটা ধারণা৷’
মিঃ চ্যাটার্জি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি হরকালী রায় সম্পর্কে সব খবর এই থানায় এসেই পেয়ে গিয়েছিলুম৷ ঠিক যেন সেই ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলা৷ মৃত্যুর পর সেই লোক জীবিত হয়ে কী করে বাড়ি ফিরতে পারে, প্রথমে বুঝতে পারিনি৷ পরে বুঝেছিলুম ঝড়বৃষ্টির রাতে অর্ধমৃত হরকালীবাবুকে ভুল করে মৃত ভেবে নাকি গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল৷ তারপর যেভাবেই হোক, তিনি কারো সাহায্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন৷ কিন্তু ওইভাবে বিপর্যস্ত হবার ফলে তাঁর স্নায়ুবিকৃতি ঘটে যায়৷’
কর্নেল বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন৷ আমারও একই ধারণা৷ কিন্তু প্রশ্ন হল ওঁকে এভাবে খুন করল কে এবং খুনের উদ্দেশ্যই বা কী?’
মিঃ চ্যাটার্জি মুচকে হেসে বললেন, ‘ভোলাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে৷ কারণ আমরা এসেই লক্ষ্য করেছিলাম, তার পায়ে এবং হাতে একটু-আধটু কাদা লেগে আছে৷ সে ভালো করে কাদা ধোয়ার সময় পায়নি৷ জেরার চোটে তার পেট থেকে কথা বের করতে অসুবিধা হবে না৷ চলুন, জমিদারবাড়ির আর-এক পাগলা রক্ষাকালী রায় কী বলছেন দেখা যাক৷’
কর্নেল বললেন, ‘রক্ষাকালীবাবুর একটা বন্দুক আছে৷ কিন্তু আমার মতে পাগলাবাবাকে বন্দুকে নয়, পিস্তল বা রিভলবারের গুলিতে প্রায় পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি ছুঁড়ে মারা হয়েছে৷’
ওসি বললেন, ‘কিন্তু খুনের মোটিভটা কী? আপনার মতটা শোনা যাক৷’
কর্নেল হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘জমিদারবাড়ির গৃহদেবতার বহু লক্ষ টাকা দামের গয়নাগাঁটি চুরি গিয়েছিল৷’
ওসি বললেন, ‘জানি৷ এখানকার সবাই জানে সে-কথা৷’
কর্নেল বললেন, ‘আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, সেই গয়নাগাঁটি জমিদারবাড়ির কোনো শরিকই চুরি করেছিল এবং তা এখনও এখানেই কোথাও লুকানো আছে৷ পাগলাবাবা হরকালী রায় যেভাবেই হোক, তার খোঁজ পেয়েছিলেন৷ তাঁর কাছ থেকে সে-কথা জানার জন্যই সম্ভবত তাঁর উপর বরাবর অত্যাচার হত এবং এবার তাঁকে রাগের বশে খুন করা হয়েছে৷’
মিঃ চ্যাটার্জি বললেন, ‘কর্নেল সাহেব, আপনি ঠিক বলেছেন৷ আমরা এ-পথেই এগুব৷’
পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে ঝোপ-জঙ্গলের ভিতর হাঁটতে-হাঁটতে কর্নেল এবং ওসি মিঃ চ্যাটার্জি চাপা গলায় কিছু আলোচনা করছিলেন৷ মন্দিরের কাছাকাছি আসার পর এক পলকের জন্য আমার চোখে পড়ল, কেউ যেন এইমাত্র মন্দিরের আড়ালে চলে গেল৷ আমি চাপা স্বরে কথাটা বলতেই কর্নেল একদিকে এবং মিঃ চ্যাটার্জি অন্যদিকে মন্দিরের পেছনে অদৃশ্য হলেন৷ পরক্ষণেই একটা ধস্তাধস্তির শব্দ কানে এল৷ এক লাফে এগিয়ে গিয়ে দেখি, একটা ষন্ডামার্কা গুঁফো লোককে দুজনেই ধরে আছেন৷ লোকটা এবার গর্জে উঠল, ‘আমি একজন অ্যাডভোকেট৷ আমার নাম এইচ. পি. হাজরা৷ রক্ষাকালীবাবু আমার মক্কেল৷’
মিঃ চ্যাটার্জি পুলিশের লোক৷ তিনি তাঁর সোয়েটারের গলার দিকটা খামচে ধরে বেটন দিয়ে পিঠের দিকটায় আঘাত করলেন৷ তারপর হাসতে হাসতে বললেন, ‘বুঝলেন কর্নেল সাহেব, কৃষ্ণনগরের অ্যাডভোকেট শচীন্দ্র চৌধুরীর পালিয়ে যাওয়া সেই মুহুরি এই হাজরাবাবু৷ অনেক টাকা চুরি করে এখানে এসে হাজরাবাবু গা-ঢাকা দিয়ে আছে৷ ওকে আমরা খুঁজছিলুম৷’
কর্নেল বললেন, ‘আসামিকে নিয়ে চলুন, মিঃ চ্যাটার্জি৷ ব্যাপারটা জমে উঠবে৷ কারণ রক্ষাকালীবাবু এই লোকটাকে অ্যাডভোকেট বলে আমাদের মিঃ হালদারকে এবং তাঁর ভাই শিবকালীবাবুকেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন৷’
ইতিমধ্যে একজন পুলিশ অফিসার এবং কয়েকজন সশস্ত্র কনস্টেবল ওই দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন৷ অফিসারটি অবাক হয়ে বললেন, ‘এটাকে যেন চিনি-চিনি মনে হচ্ছে, স্যার?’
ওসি বললেন, ‘এই সেই হরিপদ হাজরা৷ মনে হচ্ছে জমিদারবাড়ির একটা চক্রান্তে লোভের বশে হরিপদ হাজরাও জড়িয়ে গিয়েছিল৷’
জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণে ঢোকার পর রক্ষাকালীবাবু হাঁউমাউ করে বললেন, ‘আমাদের অ্যাডভোকেটকে কেন ধরেছেন আপনারা?’
কর্নেল বললেন, ‘এ একজন মুহুরি৷ তার অ্যাডভোকেটের টাকা চুরি করে এখানে গা-ঢাকা দিয়ে আছে৷’
শিবকালীবাবু অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘এতক্ষণে বুঝতে পারছি, দাদা ভোলা আর এই লোকটাকে সঙ্গে করে মা কালীর হারানো গয়নাগাঁটির খোঁজে চক্রান্ত করেছিল৷’
কর্নেল বললেন, ‘রক্ষাকালীবাবু, আপনার বন্দুকটা ছাড়া কি আর কোনো আগ্নেয়াস্ত্র আছে?’
রক্ষাকালীবাবু ভাঙা গলায় বললেন, ‘নাহ! কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না এসব কী হচ্ছে?’
মিঃ চ্যাটার্জি বললেন, ‘এই হরিপদ হাজরাকে প্রিজন ভ্যানে নিয়ে যান, মিঃ বোস৷’
সেই পুলিশ অফিসারটির ইঙ্গিতে দু’জন তাগড়াই চেহারার কনস্টেবল তাকে বাইরে নিয়ে গেল৷
হালদারমশাই এতক্ষণ চুপচাপ সব দেখছিলেন৷ এবার বললেন, ‘ওসি সাহেব, এবার আগে রক্ষাকালীবাবুর ঘরখান সার্চ করা উচিত৷’
মিঃ চ্যাটার্জি একটু হেসে বললেন, ‘আমাদের প্ল্যান তৈরি৷ চলুন রক্ষাকালীবাবু, আগে আপনার ঘরটা দেখা যাক৷’
দোতলায় ওই ঘরে তালা দেওয়া ছিল৷ পাশে শিবকালীবাবুর ঘরেও লক্ষ্য করলুম, তালা আঁটা আছে৷ রক্ষাকালীবাবু তাঁর পাঞ্জাবির পকেট থেকে চাবি বের করে ঘরের তালা খুললেন৷
কর্নেলের ইঙ্গিতে হালদারমশাই এবং একজন কনস্টেবল জানলাগুলো খুলে দিল, তারপর সুইচ টিপে আলো জ্বালল৷ রক্ষাকালীবাবু একটা চেয়ারে বসে বিকৃতমুখে বললেন, ‘সারা রাত অন্ধকারে রেখে এতক্ষণে আলো!’
লক্ষ্য করলুম, কর্নেল আচমকা তাঁর হাতের বন্দুকটা কেড়ে নিয়ে তাঁর গায়ের আলোয়ান খুলে ফেললেন৷ এবার চমকে উঠে দেখলুম, আলোয়ানের তলায় ফুলহাতা সোয়েটারের বুকে কয়েক জায়গায় রক্তের ছাপ৷ তারপর তাঁর পরনের পাজামার খানিকটা তুলে ধরে কর্নেল বললেন, ‘এই দেখুন, সেই গর্তটার কালো কাদা লেগে আছে এই পায়ে৷ শুধু পায়ের পাতা ধুয়ে এসেছেন৷’
রক্ষাকালীবাবু কর্নেলের কাজে বাধা দিতে সাহস পাননি৷ এবার কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, ‘আমি ছোটোকাকাকে খুন করিনি৷ ওই বজ্জাত হরিপদ হাজরা কাকার ওপর অত্যাচার করতে-করতে গুলি চালিয়ে দিল৷ আমি তখন কাকাকে দু’হাতে চেপে ধরে ছিলাম৷’
ওসি বললেন, ‘তাহলে গুলি করে খুন করেছে আপনার স্যাঙাত ওই হাজরা?’
রক্ষাকালীবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ৷ রিভলবার না পিস্তল, তা জানি না৷ আমার কাছে হাজরাবাবুই লুকিয়ে রেখেছিল৷’
কর্নেল বললেন, ‘হাজরাবাবুর কাছে তো সেটা নেই৷ কোথায় সেটা?’
‘আমি তা জানি না৷’
এতক্ষণ শিবকালীবাবু বড়ো চোখে তাকিয়ে সব দেখছিলেন এবং শুনছিলেন৷ এবার রাগে খাপ্পা হয়ে বললেন, ‘আমি সব বুঝতে পেরেছি৷ আমাকে লুকিয়ে তুমি, ভোলা আর হাজরাবাবু গুপ্তধন খুঁজে বের করার চক্রান্ত করেছিলে৷ আমাকে তার ভাগ দিতে চাওনি বলেই আমি এ বাড়িতে এলে তুমি ভূতের ভয় দেখাতে৷’
এই সময় বারান্দায় এক ভদ্রলোককে দেখা গেল৷ তাঁকে দেখে শিবকালীবাবু বললেন, ‘আমার শ্বশুরমশাই এসে গেছেন৷ উনি আমাকে নিষেধ করতেন এদের চক্রান্তের পিছনে ওত পাততে৷’
ভদ্রলোক হাসিমুখে বললেন, ‘কথাটা তুমি ভুলে গেছ, বাবাজি৷ শাহবাজ খান কাবুলিওয়ালার কথা তোমার মনে নেই৷ সে এই এলাকায় টাকা ধার দেওয়ার কারবার করত৷ তারপর সে ডাকাতের হাতে মারা পড়েছিল৷ বেশিদিনের নয়, দশ/বারো বছর আগের কথা৷ এরপর যারা তার টাকা ধার নিয়েছিল, রাতদুপুরে তাদের বাড়ির আনাচে-কানাচে তার ভূত ফিসফিস করে দেনার পরিমাণ জানিয়ে যেত৷ এ নিয়ে কাঞ্চনপুর একেবারে ভয়ে তটস্থ হয়ে গিয়েছিল৷’
শিবকালীবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো৷ মনে পড়ে গেছে সেই কাবুলি ভূতের কথা৷ কিন্তু আমি যে স্পষ্ট শুনেছি, নীচের ঘরের দেওয়ালঘড়িতে এক’টা বাজলেই দাদা চেঁচামেচি করে বন্দুক ছুঁড়তেন৷ আর আমার ঘরের জানলার কাছে কাবুলি ভূতটা বলত, সুদে-আসলে এক লাখ৷’
হালদারমশাই বললেন, ‘আপনারে ভয় দেখাইত আপনার দাদা, যাতে আপনি এখানে না এসে শ্বশুরবাড়িতে থাইক্যা যান৷’
শিবকালীবাবু বললেন, ‘আমার কিন্তু মনের মধ্যে একটা সন্দেহ হয়েছিল৷ তাই মাঝে-মাঝে পৈত্রিক বাড়িতে এসে রাত কাটাতুম৷’
কর্নেল দেওয়ালে টাঙানো বড়ো-বড়ো অয়েল পেন্টিং দেখছিলেন৷ হঠাৎ জানলার পাশে একটা অয়েল পেন্টিং দেওয়াল থেকে একটু সরাতেই কী একটা চৌকো জিনিস মেঝেতে পড়ল৷
ওসি মিঃ চ্যাটার্জি বললেন, ‘ওটা কী, টেপরেকর্ডার মনে হচ্ছে!’
কর্নেল বললেন, ‘হ্যাঁ৷ কিন্তু এটার পাশে তার জড়িয়ে হুক তৈরি করা হয়েছে৷ এক মিনিট৷’
বলে তিনি খাটের তলায় টর্চের আলো ফেললেন৷ তারপর একটা লম্বা কঞ্চি বের করে বললেন, ‘প্ল্যানটা আশা করি বুঝতে পারছেন মিস্টার চ্যাটার্জি৷’
কর্নেল হুকের ভিতর কঞ্চিটা ঢুকিয়ে স্যুইচ টিপে দিলেন৷ প্রথমে ঘসঘস করে কিছুটা শব্দ, তারপর স্পষ্ট জোরালো গলায় বেজে উঠল—সুদে-আসলে এক লাখ৷
ওসির নির্দেশে একজন পুলিশ অফিসার কঞ্চি আর টেপরেকর্ডারটা নিয়ে গেলেন৷ এবার শিবকালীবাবু দাদার দিকে আঙুল তুলে গর্জন করলেন, ‘ঠক, জোচ্চোর! তোমার পেটে-পেটে এই বুদ্ধি ছিল? তুমি তোমার নিজের ছোটোভাইকে ভয় দেখিয়ে তোমার চক্রান্ত থেকে দূরে সরাতে চেয়েছিলে? ধর্মের কল বাতাসে নড়ে!’
এবার কর্নেল আরও একটা ছবির কাছে গেলেন৷ বললেন, ‘বাঁধানো ছবি একইভাবে অনেকদিন টাঙানো থাকলে তার নীচের দাগটা দেখা যায় না৷ এটাকেও দেখছি নড়ানো হয়েছিল৷ দেখি কী বেরোয় এটার পিছন থেকে৷’
পিছন থেকে এবার বেরোল একটা লাল ছেঁড়া-কাপড়ে বাঁধা পুঁটলি৷ কর্নেল সেটা খুলে দেখেই বললেন, ‘হ্যাঁ, এটা হচ্ছে গৃহদেবতার লক্ষ-লক্ষ টাকার দামি জিনিস কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারই একটা নকশা৷ কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সারা এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপ৷ তাই ওই গুপ্তধন উদ্ধার করা খুবই কঠিন৷’
ওসির নির্দেশে একজন অফিসার বারান্দা থেকে রক্ষাকালীবাবুর কাছে এসে বললেন, ‘চলুন, আপনাকে গ্রেপ্তার করা হল৷’
রক্ষাকালীবাবু ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে বললেন, ‘আমি ছোটোকাকাবাবুর কাছ থেকে এই নকশাটা কেড়ে নিইনি৷ হাজরাবাবু তাঁকে গুলি করার জন্য পিস্তল তুলেছে দেখে ছোটোকাকা এটা আমার দিকে ছুঁড়ে দেন৷ তারপর হাজরা পর-পর তিনটে গুলি করার পর তিনি আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ আমি জানতুম না হাজরাবাবু আর ওই বদমাশ ভোলা তাঁকে এভাবে মেরে ফেলবে৷ এই নকশাটা আমি হাজরাকে দিইনি৷ বলেছিলাম বাড়িতে এসো, তারপর কথা হবে৷’
পুলিশ অফিসার তাঁকে টানতে-টানতে নিয়ে গেলেন৷ এরপর আমরা নীচের তলায় ভোলার ঘরে গেলুম৷ পুলিশ ঘরটা তন্ন-তন্ন করে খুঁজেও সেই আগ্নেয়াস্ত্রটা পেল না৷ এই সময় কর্নেল চুরুট ধরিয়ে উঠোনে নেমে কী যেন ভাবছিলেন৷ তাঁর হাতে তখনও সেই লাল ন্যাকড়ায় বাঁধা নকশাটা৷ তিনি সেটা আমাকে ধরতে দিয়ে ডাকলেন, ‘মিঃ চ্যাটার্জি, আমি নিশ্চিত নই৷ তবে আমার ধারণা হরিপদ হাজরা মন্দিরের পেছনে লুকিয়ে নিশ্চয়ই কোনো একটা কাজ করছিল৷ তার তো ঘটনার পরই গা-ঢাকা দেওয়ার কথা৷ কাজেই আসুন, দেখি হাজরা কী করছিল৷’
কর্নেলের পিছনে আমি ও হালদারমশাই এবং কর্নেলের আগে ওসি মিঃ চ্যাটার্জি সেই দরজা দিয়ে ঠাকুরবাড়িতে গেলুম৷ মন্দিরের পিছনে কিছু ঝোপঝাড় আছে৷ কর্নেল একটা ঝোপের সামনে থমকে দাঁড়ালেন৷ দেখলুম ঝোপটা কাত হয়ে আছে৷ নীচের মাটিটাও যেন পায়ে চেপে বসানো৷ কর্নেল ঝোপটা দু’হাতে টেনে শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেললেন৷ তারপরই রুমালে জড়ানো একটা জিনিস দেখা গেল৷ কর্নেল সেটা তুলে নিয়ে বললেন, ‘মাই গুডনেস, এটা তো দেখছি সিক্স রাউন্ডার রিভলবার!’
মিঃ চ্যাটার্জি রুমালে জড়িয়ে রিভলবারটা নিয়ে একটু হেসে বললেন, ‘কর্নেল সাহেবের সম্পর্কে যা শুনেছিলাম, তার প্রমাণ আজ বারবার পেয়েছি৷’
হালদারমশাই বললেন, ‘কর্নেল স্যার, এই ম্যাপখান পাইলে মা কালীর গয়নাগাঁটি উদ্ধার করতে পারবেন৷’
কর্নেল একটু হেসে বললেন, ‘আগে মামলাটা শেষ হোক, দোষীরা সাজা পাক৷ তারপর আবার একবার কাঞ্চনপুরে এসে হানা দেওয়া যাবে!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন