অঙ্ক বই হারিয়ে গেছে

চঞ্চলকুমার ঘোষ

ববিতাদিদি গম্ভীর মুখে রাহুলের দিকে তাকালেন, তোমার অঙ্ক বই কোথায়? মাথা নীচু করে খুব আস্তে জবাব দিল রাহুল, হারিয়ে গেছে।

ববিতাদিদি এগিয়ে গেলেন রাহুলের কাছে। বললেন, তোমার আর কী কী বই হারিয়ে গেছে?

একটু ইতস্তত করে রাহুল বলল, আর কোনো বই হারায়নি।

অবাক কান্ড। তোমার সব বই ঠিক রইল শুধু অঙ্ক বইটা হারিয়ে গেল। এক কোনায় বসে ফিক ফিক করে হাসে অরূপ।

অঙ্ক বই পাখির মতো পাখা মেলে উড়ে গেল।

ক্লাসের সবাই হেসে ওঠে। ববিতাদিদি বললেন, ঠিক আছে তোমার বই নেই, আমি বোর্ডে অঙ্ক লিখে দিচ্ছি, তুমি দেখে দেখে করো।

মুখটা গম্ভীর হয়ে যায় রাহুলের। বাড়িতে অঙ্ক বই কোথায় রেখেছে খুঁজে পায়নি। মাকেও কিছু বলেনি। তাহলে মা বই খুঁজে দিত। আসলে অঙ্ক না করতে পারলেই ও বেঁচে যায়। রাতের বেলায় ভূতের গল্প শুনলে যেমন ভয় লাগে, অঙ্ক বইটা দেখলেই তেমন ভয় করে।

পাঁচটা অঙ্ক দেন ববিতা। সবাই অঙ্ক করে খাতা জমা দেয়। সবার শেষে রাহুল। তার খাতাটাই আগেদেখেন ববিতা। পাঁচটা অঙ্কই ভুল। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে রাহুল। আগের স্কুলে অঙ্ক ভুল করলে দিদিমণিরা কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখত। এক মাস হল সবুজ পাখি স্কুলে ভরতি হয়েছে রাহুল। কোনো দিদিমণিই তাদের শাস্তি দেন না। কেউ খুব বেশি দুষ্টুমি করলে ক্লাসের মধ্যেই তাদের দাঁড় করিয়ে রাখেন।

ববিতা কাছে ডাকলেন রাহুলকে। বললেন, তুমি একটাও অঙ্ক পারলে না কেন?

অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে রাহুল বলল, খুব কঠিন অঙ্ক।

আমি তো কঠিন অঙ্ক দিইনি। তাহলে ক্লাসের কেউ পারত না।

কোনো কথা বলে না রাহুল। ববিতা বুঝতে পারেন রাহুলের মধ্যে অঙ্কের প্রবল ভয় রয়ে গিয়েছে। যতদিন-না এই ভয়কে কাটাতে পারছে ততদিন ও কিছুতেই অঙ্ক করতে পারবে না। বুঝে উঠতে পারেন না কী করবেন।

ক্লাস শেষ হতেই বেরিয়ে এলেন। এর পরের ক্লাসটা তাঁর ছুটি। সোজা অমলবাবুর ঘরে এলেন। কিছু লিখছিলেন অমলবাবু। ববিতা বললেন, স্যার একটা দরকারে এলাম।

সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে অমলবাবু বললেন, কী দরকার বলো।

স্যার রাহুলকে নিয়ে সমস্যায় পড়ে গিয়েছি।

হাতের কলমটা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলেন অমলবাবু। কী করছে রাহুল?

কিছু করেনি রাহুল। এমনিতে ভালো ছেলে। এক মাস হল আমাদের কাছে রয়েছে। সব বিষয়েই উন্নতি করেছে। প্রথম যখন এসেছিল তার থেকে ভালো পড়াশোনা করছে।

অমলবাবু বললেন, সেটা আমিও লক্ষ করেছি। আমার মনে হয় ও আর দু-এক মাসের মধ্যেই আরও ভালো করবে।

শুধু একটা বিষয় নিয়ে খুব সমস্যা হচ্ছে, সেটা অঙ্ক। আজ ক্লাসে পাঁচটা অঙ্ক দিয়েছিলাম সব ক-টা ভুল করল, আর এটা প্রতিদিনের ঘটনা। অঙ্কটাকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। আজ অঙ্ক বই নিয়ে আসেনি। বলল হারিয়ে ফেলেছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন অমলবাবু। জানেন সামান্য দু-এক জন বাদ দিয়ে প্রায় সব ছেলে-মেয়েই অঙ্কের সমস্যায় ভোগে। প্রথম থেকেই অঙ্কের এমন ভয় তাদের মনে ঢুকে যায়, গোটা জীবন সেই ভয়টাকে কাটাতে পারে না। পরবর্তীকালে সেই ভয়টা তাদের ছেলে-মেয়েদের উপর গিয়ে পড়ে। ববিতার দিকে তাকালেন। বললেন, তুমি ওকে কীভাবে পড়াতে চাইছ?

আলাদা করে কিছু পড়াইনি। তবে ওর খাতাটা আগে দেখি। ভুলগুলো বুঝিয়ে দিই।

মাথা নাড়লেন অমলবাবু, ওভাবে হবে না ববিতা। তোমার মনে আছে প্রথম দিন এসে রাহুল একটা গল্প বলেছিল। রাজার অসুখের গল্প। চোখের জন্যে রাজা চারপাশের সব সবুজ করে দিলেন। পরে সাধু এসে কী বললেন বাইরেটা পালটালে হবে না নিজেকে পালটাও।

ববিতা ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না কীভাবে রাহুলকে পালটাবেন। কিছুক্ষণ চুপ করে ভাবলেন। তারপর বললেন, ওকে যদি আলাদা করে পড়াই।

হাসলেন অমলবাবু। তাহলে ও সবার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। ওকে ওর মতো করেই অঙ্ক শেখাতে হবে। একদিন ও আমাকে বলেছিল বড়ো হয়ে মাস্টার হবে।

হ্যাঁ স্যার আমাকেও তাই বলেছে।

তুমি ওকে ওই কাজটা দাও। আমি যখন জাপানে ছিলাম, ওখানকার এক স্কুলমাস্টারের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। তিনি আমাকে একটা কথা বলেছিলেন কোনো বাচ্চা যখন আর সকলের চেয়ে আলাদা হয়, তখন তাকে তার মতো করেই বিচার করতে হবে। বাইরে থেকে কিছু চাপিয়ে না দিয়ে তার পছন্দের বিষয়টা নিয়ে এসো। আমরা কিছু তাকে শেখাব না। সেনিজে শিখবে। তাহলে আমরা কী করব? আমরা শুধু তার ভেতরে জানার, শেখার ইচ্ছেটাকে জাগিয়ে দেব। তার মধ্যে দিয়েই বাচ্চার মানসিক পরিবর্তন করতে হবে। একটু দাঁড়াও রাহুলকে ডাকি।

উঠে দাঁড়ালেন ববিতা। আমি ডেকে নিয়ে আসছি স্যার।

একটু পরেই রাহুলকে নিয়ে আসেন ববিতা। অমলবাবু বললেন, রাহুল তোমাকে একটা কাজ করতে দেব, পারবে?

তাড়াতাড়ি রাহুল বলল, পারব মামা।

ড্রয়ার থেকে একটা বই বার করলেন অমলবাবু। এটা ক্লাস টু-এর অঙ্ক বই। তুমি তো আগেই এই অঙ্ক করেছ। বাড়ি গিয়ে মায়ের কাছে বসে আবার অঙ্কগুলো দেখে নেবে। এক সপ্তাহ সময়, তারপর তুমি ক্লাস টুয়ে গিয়ে অঙ্ক করাবে।

কেমন অবাক লাগে রাহুলের। বড়ো বড়ো চোখ করে বলল, আমি অঙ্ক শেখাব?

অমলবাবু বললেন, হ্যাঁ তুমি অঙ্ক শেখাবে। আমরা যখন স্কুলে উঁচু ক্লাসে পড়তাম, আমাদের মাস্টারমশাইরা বলতেন তোমরা বড়ো হয়ে গিয়েছ এবার থেকে ছোটোদের পড়াবে। তোমরা হবে ছোটোদের মাস্টার।

গোটা ব্যাপারটাই কেমন অদ্ভুত লাগছিল রাহুলের। আমতা আমতা করে বলল, আমি তো অঙ্ক পারি না।

কে বলেছে তুমি অঙ্ক পার না। আসলে তুমি চেষ্টা কর না। চেষ্টা করলেই পারবে।

কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল অমলমামা প্রথম দিন বলেছিল অঙ্কের ম্যাজিক জানে। সঙ্গে সঙ্গে বলল, মামা তুমি আমাকে বলেছিলে অঙ্কের ম্যাজিক শিখিয়ে দেবে। তাহলে আমি সব অঙ্ক পারব।

অমলবাবু বললেন সেইজন্যেই তো তোমাকে ডাকলাম। ম্যাজিক শিখতে গেলে আগে মাস্টারি শিখতে হবে।

উৎসাহে প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে রাহুল, আমি শিখব।

ববিতাদিদি বললেন, তবে আমি যেমন করে তোমাদের পড়াই তেমনি করে পড়াতে হবে। নাহলে ছোটোরা বলবে খুব খারাপ মাস্টার। কিছু জানে না। তখন তোমার জায়গায় অরূপ নয়তো সরস্বতী মাস্টার হয়ে যাবে। ওরাই ম্যাজিক শিখে নেবে।

কোনো কথা বলে না রাহুল। চুপ করে ভাবে। সেববিতাদিদির মতো মাস্টার হয়ে গিয়েছে। ক্লাসে পড়াচ্ছে। আর সকলে চুপ করে তার পড়া শুনছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%