চঞ্চলকুমার ঘোষ

একমনে টিভিতে সিনেমা দেখছিল রাহুল। সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’। আগেও দেখেছে তবু ভালো লাগে। মুকুলের সঙ্গে মন ভেসে চলে। কত পাহাড়, মরুভূমি, কেল্লা, ময়ূর, উট! বড়ো হলে সেসব জায়গায় ঘুরে বেড়াবে।
কেউ পিঠে হাত রাখে। মুখ ফেরাল রাহুল। মা এসেছে।
তুমি সোনার কেল্লা দেখবে মা?
রাহুলের পাশে বসেন মণিদীপা।
আমি দেখেছি। তুই দ্যাখ।
টিভির আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে রাহুল বলল, মা জাতিস্মর কী?
জাতিস্মর হচ্ছে যে আগের জীবনের কথা মনে রাখে।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রাহুল বলল, মা আমি যদি জাতিস্মর হতাম?
হাসিমুখে মণিদীপা বললেন, তাহলে ওই গুণ্ডার মতো লোকেরা তোকে ধরে নিয়ে যেত। তখন কী করতিস?
তখন ফেলুদা এসে আমাকে বাঁচাত।
ততক্ষণ যে আমি কাঁদতাম।
কারও কান্নার কথা শুনলে মনটা বড়ো খারাপ হয়ে যায় রাহুলের। তাড়াতাড়ি বলল, তাহলে আমি জাতিস্মর হব না। বড়ো হলে ডাক্তার হব।
টিভিটা বন্ধ করে ছেলেকে কাছে টেনে নিলেন মণিদীপা।
আমরাও চাই তুই বড়ো ডাক্তার হবি। তোর জেঠু ছাড়া তো এবাড়িতে আর কেউ ডাক্তার হল না। তোর দাদা বলেই দিয়েছে ইঞ্জিনিয়ার হবে।
ডাক্তার হলে কী হবে মা?
আমরা যখন বুড়ো হব, তুই দেখবি।
চুপ করে ভাবে রাহুল। আস্তে আস্তে বলল, আচ্ছা মা, মানুষ কেন বুড়ো হয়?
এটাই পৃথিবীর নিয়ম। সবাই ছোটো থাকে। তারপর বড়ো হয়। আস্তে আস্তে বুড়ো হয়। একদিন টুক করে মরে যায়।
দু-হাতে মায়ের গলাটা জড়িয়ে ধরে রাহুল।
তুমি কখনো মরবে না মা।
ছেলের এই আদরটুকু উপভোগ করেন মণিদীপা। বড়োছেলে ছোটোবেলা থেকেই একটু অন্য প্রকৃতির। নিজের পড়াশোনার বাইরে আর কিছু জানে না। সব সময়েই গম্ভীর। দরকার ছাড়া বড়ো-একটা কথা বলে না। রাহুলকে কোলের কাছে নিয়ে বললেন, তুই যদি পড়াশোনা করিস তাহলে আমি আর মরব না।
আমি তো পড়শোনা করি।
শুধু পড়াশোনা করলেই হবে না। সবাই বলে দাদার মতো ভালো রেজাল্ট করতে হবে। আমি বলি দাদার চেয়ে আরও ভালো রেজাল্ট চাই।
রাহুল কোনোদিনই দাদার মতো ভালো রেজাল্ট করতে পারবে না।
চমকে ওঠে রাহুল। কখন দরজার সামনে বাবা এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি। তাড়াতাড়ি মাকে ছেড়ে উঠে পড়ল। এখন পড়ার সময় মায়ের সঙ্গে গল্প করছে দেখলে বাবা ভীষণ রাগ করবে। পাশেই রাহুলের পড়ার ঘর। দাদার পড়ার ঘর আলাদা। সবসময় দরজা বন্ধ থাকে। দরজার সামনে আসতেই বাবার কথা শুনতে পেল রাহুল।
ওর কিছু হবে না। আমার এত বড়ো বয়েসে কোনোদিন শুনিনি ক্লাস ফোরে উঠবার মধ্যে একটা ছেলেকে তিন বার স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিল।
মণিদীপা আমতা আমতা করে বলল, এবার অমলদার স্কুলে ভরতি করলাম, দেখা যাক কী হয়।
ছোটোছেলের সম্পর্কে সব আশা-ভরসা হারিয়ে ফেলেছেন পার্থবাবু। বিরক্তভাবে বললেন, কোথাও গেলে ওর কিছু হবে না, মাঝখান থেকে মেজোবউদির সঙ্গে ওঁর দাদার সম্পর্কটাই হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে।
এসব কথা শুনতে ভালো লাগে না রাহুলের। চুপ করে পড়ার ঘরে এসে বসে। দাদার মতো যদি দরজা বন্ধ করে, মা এসে কড়া নাড়বে। রাগ হয় রাহুলের। দাদা সারাদিন দরজা বন্ধ করে থাকে, কেউ কিছু বলে না, আর সেবন্ধ করলেই সবাই বারণ করে।
ছোটো ঘর। একদিকে ছোটো একটা খাট। পাশে পড়ার টেবিল-চেয়ার। দেওয়ালের একদিকে কাঠের তাকে বই সাজানো। পাশে কাচের আলমারিতে সাজানো কত খেলনা। জানলার পাশে চেয়ারটা টেনে নিয়ে আসে। অনেক আগেই সন্ধে হয়েছে। তাদের বাড়ির সামনে বড়ো পার্ক। পার্কে এখন কোনো মানুষজন নেই। অল্প কয়েকটা আলো জ্বলছে। শান্ত নিস্তব্ধ।
রোজ বিকেল বেলায় পেছনের পাড়ার কয়েকটা ছেলে এসে বল খেলে। মাঝে মাঝে মনে হয় ওদের সঙ্গে গিয়ে যদি বল খেলতে পারত তাহলে খুব ভালো হত। একদিন মাকে বলেছিল। মা বলেছিল ওরা ছোটোলোকের ঘরের ছেলে, পড়াশোনা করে না। সারাদিন বল পেটায়।
রাহুল বুঝে উঠতে পারেনি ছোটোলোক কাদের বলে। মাকে জিজ্ঞেস করেছিল। মা বলেছিল ছোটোলোক মানে যারা ভালো লোক নয়। ছেলেগুলোকে দেখে কখনো রাহুলের খারাপ মনে হয়নি। ওরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে, ঝগড়া করে, আবার খেলা শেষ হলে হাতে হাত ধরে বাড়ি ফেরে।
টেবিলের ওপর বইপত্র ছড়ানো। এক পলক দেখে নিল রাহুল। আগের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে দেওয়ার পর সব কীরকম এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। নতুন স্কুলে কী পড়াশোনা হবে জানে না। যদিও অমলমামা বলেছেন সব স্কুলে একই রকমের বই পড়ানো হয়। দুপুরে মা খানিকক্ষণ পড়িয়েছিল। টেবিলের ওপর ইংরেজি বই খোলা। আস্তে আস্তে বইটা বন্ধ করল রাহুল। এখন আর পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করছে না। চুপ করে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবার কথাগুলো খুব খারাপ লাগছিল। তিনটে স্কুল থেকে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো স্কুলেই সেদুষ্টুমি করেনি। প্রথম স্কুলটা একদম ভালো লাগত না। আন্টিরা সবসময় বকত। কত ছেলে-মেয়ে, সবাই তাকে পেছনের দিকে ঠেলে দিত। দিদিমণি কী বলত বুঝতে পারত না। তাই জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকত। জানলার পাশেই রাস্তা। হাত বাড়ালেই রাস্তার লোককে ছোঁয়া যায়। একদিন একটা লোক সুন্দর কাগজের ফুল নিয়ে যাচ্ছিল। দিদিমণি ছিল না। ফুলওয়ালাকে ডেকেছিল। মানুষটা খুব ভালো। ওর সঙ্গে কথা বলছিল। কখন দিদিমণি ক্লাসে এসে গিয়েছিল দেখতেই পায়নি। পাশ থেকে একজন খোঁচা মারতেই দিদিমণিকে দেখতে পায়।
কয়েক দিন পর আবার সেই ফুলওয়ালাকে দেখতে পায়। তাকে দেখেই খুশিতে ডেকে উঠেছিল। দিদিমণি কান ধরে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। আরেক দিন স্কুলের ছাদে একটা ঘুড়ি এসে পড়েছিল। রাহুল জানলা দিয়ে দেখেছিল। ঘুড়িটা ভাসতে ভাসতে তাদের স্কুলের দিকে আসছিল। টিফিন বেলায় চুপি চুপি ছাদে উঠে এসেছিল। ছাদের দরজাটা বন্ধ থাকে। সেদিন হয়তো দারোয়ান বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিল। কী বড়ো ছাদ! ঠিক মাঠের মতন! খুব ভালো লাগছিল রাহুলের। ইচ্ছে করছিল সারাটা ছাদজুড়ে ছুটে বেড়ায়। একদিকে বড়ো ট্যাঙ্ক, কাছে যেতেই চোখে পড়ল পাশে দুটো ঘুড়ি পড়ে আছে। এই প্রথম সেঘুড়ি পেল। ঘুড়ি দুটো পেয়ে আনন্দে নাচতে নাচতে নীচে নেমে আসতেই একেবারে হেডমিস্ট্রেসের সামনে।
ঘুড়ি কোথায় পেলি?
সহজভাবেই রাহুল বলল, ছাদে গিয়েছিলাম। ওখানে ঘুড়ি পড়েছিল।
তুই ছাদে গিয়েছিলি? সপাটে একটা চড় কষিয়ে দিলেন হেডমিস্ট্রেস।
ছাদে যাওয়া অন্যায় কীসের বুঝে উঠতে পারে না রাহুল। বাড়িতে খবর পাঠায় হেডমিস্ট্রেস। মা আর বড়দি আসে।
আপনার ছেলেকে আমার স্কুলে রাখা যাবে না। একটা কোনো বিপদ হয়ে গেলে কে সামলাবে বলুন? তখন সব দোষ হবে আমাদের।
হেডমিস্ট্রেসের কথার ওপর কোনো কথা বলতে পারেনি মণিদীপা। পরের স্কুলে একটা ছেলের চোখে পেনের খোঁচা লেগেছিল। ছেলেটা কোনো মন্ত্রীর ছেলে। ও ইচ্ছে করে করেনি, তবু কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি। আসলে পেনের কালি ফুরিয়ে গিয়েছিল। জানলা দিয়ে বাইরে ছুড়ে দিয়েছিল পেনটা। সেই ছেলেটা যে সামনে এসে যাবে বুঝতে পারেনি রাহুল। ঠিক চোখের কোনায় গিয়ে লেগেছিল। খুব কষ্ট হচ্ছিল। রাতে বিছানায় শুয়ে কত বার ঠাকুরকে বলেছে ছেলেটাকে ভালো করে দাও। ছেলেটা দু-দিনেই ঠিক হয়ে গেল। শুধু রাহুলকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল।
পুরোনো স্কুলের কথা ভাবতে ভাবতে মনটা কেমন খারাপ হয়ে যায়। অমলমামার স্কুল থেকেও যদি তাকে তাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ দু-হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন