চঞ্চলকুমার ঘোষ

আজ অঙ্ক পরীক্ষা। রোজ ড্রাইভার কাকু তাকে একাই নিয়ে আসে। আজ মণিদীপা সঙ্গে এসেছেন। আগের দিন সন্ধে থেকে রাত পর্যন্ত অঙ্ক করিয়েছেন মণিদীপা। সকালেও অঙ্ক করিয়েছেন। গাড়ির গোটা রাস্তাটাই অঙ্ক বোঝান। রাহুলের মাথার ভেতরটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। স্কুলের গেটের সামনে আসতেই মণিদীপা বললেন, সব দেখে-শুনে ভালো করে পরীক্ষা দিবি। একটা অঙ্কও ছাড়বি না। একশো-র মধ্যে একশো পেতেই হবে।
কোনো জবাব দিল না রাহুল। মণিদীপা রাহুলকে নামিয়ে দিয়ে চলে যান। রাহুল আস্তে আস্তে ক্লাসের দিকে এগোয়। সবাই এসে গিয়েছে। অন্য দিন সকলেই বেশ হাসিখুশি থাকে। আজ সকলেই বেশ গম্ভীর।
অরূপ এক পলক রাহুলের দিকে তাকাল। তারপরই মুচকি হাসল।
সরস্বতী মাথা নীচু করে অঙ্কের খাতা দেখছে। অন্য দিন রাহুলকে দেখলেই হাসে। আজ মুখ তুলেও তাকাল না। একটু পরেই ঘণ্টা পড়ে। ববিতাদিদি ক্লাসে আসেন। সবাই উঠে দাঁড়ায়।
বোসো। আজ তোমাদের অঙ্ক পরীক্ষা। সবাই মন দিয়ে অঙ্ক করবে। কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না। যে-যা পারবে তাই করবে। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে বলবে।
সবাইকে খাতা দিলেন ববিতাদিদি। খাতার মধ্যেই অঙ্ক লেখা। দেখে দেখে শুধু উত্তর লিখতে হবে।
খাতাটা হাতে নিতেই রাহুলের মাথার মধ্যে কেমন সব ঝিমঝিম করে উঠল। পর পর অঙ্ক সাজানো। সব অঙ্কগুলো কীরকম অচেনা লাগছে। কী করতে হবে কিছুই মনে পড়ছে না।
কান্না পায় রাহুলের। সব অঙ্ক মা সকালেই করিয়ে দিয়েছে। দু-বার মাথা ঝাঁকাল। কান্নাটা ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। চারদিকে তাকায়। সবাই অঙ্ক শুরু করে দিয়েছে।
হঠাৎ ববিতাদিদির চোখ পড়ল রাহুলের দিকে।
কী হল রাহুল?
কী বলবে ভেবে পায় না রাহুল। মুখ নীচু করে, তারপরই কেঁদে ফ্যালে।
আমার কিছু মনে পড়ছে না দিদি।
কী মনে পড়ছে না? অবাক গলায় বললেন ববিতা।
অঙ্ক। সব ভুলে গিয়েছি।
একটু শান্ত হয়ে ভাবো, সব মনে পড়ে যাবে। যা অঙ্ক দিয়েছি সব তোর জানা। এক-শোয় একশো পাবিই।
কোনো জবাব দিল না রাহুল। ঘরের সবাই একমনে অঙ্ক করছে। শুধু রাহুল ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু ভাবলেন ববিতা, তারপর এগিয়ে এলেন। রাহুলের পিঠে হাত দিয়ে বললেন, খাতা নিয়ে আয়।
কোথায় দিদি?
গেলেই দেখতে পাবি।
ক্লাসের সবাই মুখ তুলে তাকাল। ববিতাদিদি রাহুলকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
ক্লাসের বাইরে একটা গাছের নীচে সিমেন্টের বাঁধানো চাতাল। গাছের পাতার ছায়া পড়েছে। একটা আসন নিয়ে আসেন ববিতা। সেটা পেতে দিয়ে বললেন, তুই এখানে বসো। দ্যাখ চারপাশে কী সুন্দর ফুল ফুটে আছে। ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। এই জায়গাটা আমার খুব পছন্দ। তোর কেমন লাগছে?
রাহুল মাথা নাড়ে, ভালো।
তুই এখানে বসে অঙ্ক কর। যা পারবি করবি, না পড়লে ছেড়ে দিবি। আমি দেখে আসি ক্লাসের সবাই কী করছে।
অল্পক্ষণ চুপ করে বসে থাকে রাহুল। কাছেই একটা পাখি ডাকছে। গুব গুব গুব। হাওয়ায় গাছের ফুলগুলো দুলছে। রোদ পড়ে কী সুন্দর লাগছে। মনটা ভালো লাগে। এবার অঙ্ক খাতাটা নেয়। আস্তে আস্তে অঙ্কগুলো দেখে। একটু একটু করে সব মনে পড়ছে।
মাথার ভেতরটা হালকা হয়ে আসে। অঙ্কের খাতাটা সামনে রেখে নিজের মনেই বলে ওঠে, আমি সব ক-টা অঙ্ক পারব।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন