চঞ্চলকুমার ঘোষ

পরশু আমরা বেড়াতে যাব।
সারা ক্লাসের সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, কোথায় যাব স্যার?
এক পলক গোটা ক্লাসের দিকে তাকালেন অমলবাবু। মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন স্কুলের চার দেওয়ালের মধ্যে যে-জ্ঞান সেঅসম্পূর্ণ জ্ঞান। প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধানের জন্যে পৃথিবীর সব কিছুর সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। বললেন, এবার তোমাদের একটা গ্রামে নিয়ে যাব। বেশি দূরে নয়। গ্রামের নাম বুড়ো রাজার গ্রাম। তোমরা সবাই সকাল ন-টার মধ্যে চলে আসবে। কেউ কামাই করবে না।
গোটা স্কুলে বাহান্ন জন ছেলে-মেয়ে। এক জন বাদে সকলেই বেড়াতে যাচ্ছে। স্কুলের সামনে বাস দাঁড়িয়ে। সবাই লাইন করে বাসে ওঠে। প্রথমে ক্লাস ওয়ান। তারপর একে একে ক্লাস টু, থ্রি, শেষে ফোর। প্রতি বার যাওয়ার আগে অমলবাবু বলেন, তোমরা বাইরে যাচ্ছ। সেখানে গিয়ে এমন কিছু করবে না যাতে তোমাদের কেউ নিন্দে করে। তোমরা এমনভাবে চলবে যেন সবাই তোমাদের দেখে শেখে।
স্যারের কথা কেউ অমান্য করে না। দু-এক জন একটু-আধটু দুষ্টুমি করলে বাকিরা তাদের সামলে দেয়। সবাই ওঠার পর দারোয়ান গেটে তালা দিয়ে উঠে আসে। বাস ছাড়তেই পুরবিদিদি গান ধরেন, কী আনন্দ আকাশে বাতাসে...।
সবাই তাঁর সঙ্গে গলা মেলায়। আজ আর পড়া নেই। শুধু আনন্দ।
শহর শেষ হয়। বাড়িঘরের ভিড় নেই। মাঠ বাগান, মাঝে মাঝে গ্রাম। কোথাও অল্প বাড়িঘর, দোকানপাট। প্রায় আধ ঘণ্টা গিয়ে বাস বড়ো রাস্তা থেকে বাঁক নেয়। দু-ধারে ধানখেত। ছোটো ছোটো ধান গাছ হাওয়াতে দুলছে। রাহুলের মনে হল সবুজ রং কেউ যেন বুলিয়ে দিয়েছে। কিছু দূর গিয়ে মাঠ শেষ হয়ে গ্রাম শুরু হয়েছে। গ্রামের মধ্যে বাস ঢোকে। কয়েকটা পুরোনো বাড়ি পেরিয়েই একটা নতুন দোতলা বাড়ি। লোহার গেটের গায়ে লেখা ‘বনবীথি’। গোটা বাড়ি ঘিরে কত গাছ। গেটের সামনে বাস দাঁড়ায়।
অমলবাবু বললেন, আমরা এসে গিয়েছি। এই গ্রামের নাম বুড়ো রাজার গ্রাম। আজ সারাদিন আমরা এই গ্রামে থাকব।
গাড়ির শব্দে এক জন লোক বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন। বাড়ির দারোয়ান। বাড়ির মালিক ডাক্তার। কলকাতায় থাকেন। মাঝে মাঝে এখানে বেড়াতে আসেন। দারোয়ান গেট খুলে এগিয়ে আসেন। আসুন বাবু। আমার নাম ভুবন দাস। ডাক্তারবাবু বলে দিয়েছেন আপনাদের দেখাশোনা করতে।
ছেলে-মেয়েরা সবাই হাতজোড় করে নমস্কার করে। বাড়ির একতলা খালি। মেঝেতে গালিচা পাতা। জিনিসপত্র নামিয়ে সবাই বসে পড়ে।
সন্ধ্যাদিদি বললেন, এখানে তোমরা কেউ একা একা কোথাও যাবে না। যখন যাবে দল বেঁধে যাবে। সঙ্গে বড়োরা কেউ থাকবেন। এখন টিফিন করে নাও তারপর গ্রাম দেখতে বার হব।
অনেকেই আগে কোনোদিন গ্রাম দেখেনি। সকলেরই খুব উৎসাহ। ছোটো গ্রাম। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাড়িঘর। বেশিরভাগই পাকা বাড়ি। অল্প কিছু কাঁচা বাড়িও চোখে পড়ছে। এত ছোটো ছেলে-মেয়ে দেখে সামনের ঘর থেকে এক জন বউ বেরিয়ে আসেন। জিজ্ঞেস করেন, তোমরা সবাই কোথা থেকে আসছ?
আমরা সবাই ‘সবুজ পাখি’ স্কুলে পড়ি। গ্রাম দেখতে এসেছি। ওটা কী জিনিস? উঠোনে রাখা একটা মোটা কাঠ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল অরূপ।
বউটা এগিয়ে এসে লম্বা কাঠের একদিকে চাপ দিল। কাঠটা ওঠে-নামে। সবাই তাকে ঘিরে ধরে।
একে বলে ঢেঁকি। এই দিয়ে ধান থেকে চাল বার করা হয়। আগে এতেই সব কাজ হত। এখন আর এতে বেশি কিছু হয় না। দূরে ধানকল আছে সেখানে ধান থেকে চাল বার করা হয়। তোমরা সবাই বোসো, আমি আসছি।
চাতালে চাটাই পেতে দিয়ে ঘর থেকে খই আর মুড়কি নিয়ে আসে বউটা। দুটো বাটিতে করে সবাইকে দেয়। ববিতাদিদিকে একটা আলাদা বাটিতে দেয়। রাহুলের কেমন অবাক লাগে। কলকাতায় অচেনা কেউ এইরকম করে খেতে দেয় না।
একটু এগিয়ে পুরোনো জমিদারবাড়ি। ভাঙাচোরা চেহারা। দেয়ালের গায়ে বট গাছ হয়েছে। সৌরভ বলে ওঠে, এটা ভূতের বাড়ি।
পিনাকী বলল, ভূত বলে কিছু নেই।
রাহুল ববিতাদিদিকে জিজ্ঞাসা করে, তাহলে এখানে কে থাকে?
এক জন বয়স্ক ভদ্রলোক পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। রাহুলের কথা শুনে বললেন, এটা হচ্ছে বুড়ো রাজার বাড়ি।
বুড়ো রাজা কে?
ভদ্রোলোক বললেন, প্রায় আড়াই-শো বছর আগের কথা। নদিয়ায় এক জমিদার ছিলেন রাঘব রায়। খাজনা দিতে না-পারায় নবাব সিরাজ উদদৌল্লা তাঁর জমিদারি কেড়ে নেন। তখন রাঘব রায় প্রাণ বাঁচাতে এই গ্রামে পালিয়ে আসেন। বয়েস হলেও তাঁর চেহারা ছিল রাজার মতো। লোকে বলত বুড়ো রাজা। পলাশির যুদ্ধে রাঘব রায় ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দিলেন। পলাশির যুদ্ধের পর আবার নিজের জমিদারি ফিরে পেলেন। তবে তিনি আর নদিয়ায় ফিরে গেলেন না। এখানেই রয়ে গেলেন। এখানে মন্দির, ধর্মশালা, রাজবাড়ি, গঙ্গার ঘাট তৈরি করলেন। লোকের মুখে মুখে এই গ্রামের নাম হয়ে গেল বুড়ো রাজার গ্রাম।
এ তো ইতিহাসের গল্প।
সরস্বতীর কথা শুনে ববিতাদিদি বললেন, ঠিকই বলেছ, ইতিহাস তো আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। তাকে জানতে পারলে, চিনতে পারলে দেখবে কত আনন্দ।
বয়স্ক ভদ্রলোক চলে গেলেন। ছেলে-মেয়েরা সবাই এগিয়ে চলল। গ্রামের বাঁক পেরিয়ে যেতেই এবার চোখ পড়ল সামনে বিরাট নদী। এটা কোন নদী দিদি? জিজ্ঞেস করে সরস্বতী।
এই তো গঙ্গা।
ওরে বাবা কত চওড়া। তুই সাঁতার কাটতে পারবি রাহুল?
রাহুল দু-হাত তুলে বলে ওঠে, ওরে বাবা কেউ পারবে না।
সামনে ঘাট। পর পর নৌকা বাঁধা। মাঝি বসে আছে। ববিতা এগিয়ে যান। মাঝির কাছে বসেন। ছোটোরা মাঝির কাছে গল্প শোনে। মাঝি বলে গঙ্গার কথা, তার জীবনের কথা। গ্রামের কথা। সবাই মুগ্ধ হয়ে শোনে।
রাহুল ভাবে অমলমামা যদি তাদের এখানে না নিয়ে আসতেন তাহলে এত কিছু জানতেই পারত না। বেলা বাড়ে। সবাই ফিরে আসে ডাক্তারবাবুর বাড়ি। দুপুরের খাওয়ার সব ব্যবস্থা হয়েছে। চার ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা চার দিকে গিয়েছিল।
অমলবাবু বললেন, তোমরা কে কী দেখেছ বলো।
কে কী দেখেছে বলে। সবাই খুশিতে ঝলমল করে।
সন্ধ্যাদিদি বলেন, আজ বাড়ি ফিরে কেমন ঘুরলে, কী দেখলে, কী শিখলে সব লিখে নিয়ে আসবে।
সবার হাতে খাবারের প্যাকেট দেয় বংশী। সরস্বতী প্যাকেটটা নিতেই জানলা দিয়ে চোখে পড়ল গেটের সামনে তিনটে ছেলে। তাদেরই বয়েসি। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, তোরা কোথায় থাকিস?
একটা ছোটো ছেলে, খালি গা, ঝাঁকড়া চুল। বলে, ওই ওধারে।
কোন স্কুলে পড়িস?
পড়ি না। মাঠে কাজ করি। আজ কাজ নেই। কিছু খাইনি। খুব খিদে পেয়েছে।
খারাপ লাগে সরস্বতীর। তারা খাবে আর এই বাচ্চাগুলো না খেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে! কিছু ভাবে সরস্বতী। হাতের খাবারের প্যাকেটটা তার হাতে দিয়ে বলল, তোরা ভাগ করে খাস।
খাবার পেয়েই আর দাঁড়াল না কেউ। সবাই হল ঘরে বসে খাচ্ছে। একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সরস্বতী। অমলবাবু জিজ্ঞেস করেন, তোর খাবার কোথায় সরস্বতী?
বাইরে একটা ছোটো ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। বলল খুব খিদে পেয়েছে। আমি তাকে আমার খাবারটা দিয়ে দিলাম।
সৌভিক বলল, নিজের খাবার দিয়ে দিলি, এখন কী খাবি?
খাব না। বাড়ি গিয়ে খাব।
তাড়াতাড়ি রাহুল বলে, তুই আমার থেকে খাবার নে।
সঙ্গে সঙ্গে আরও কয়েক জন বলল, আমরাও দিচ্ছি।
অমলবাবু এগিয়ে আসেন। তোদের কাউকে খাবার দিতে হবে না। আমাদের আরও খাবার আছে। সরস্বতী আজ খুব ভালো কাজ করেছে। তোমরা সবাই ওকে দেখে শিখবে। আমার যা আছে সবার সঙ্গে তা ভাগ করে নেব। যখন সব কিছু ভাগ করে নেবে, দেখবে তার মতো আনন্দ আর কিছু নেই।
রাতে মায়ের পাশে শুয়ে রাহুল সারাদিনের কথা বলে। মা চুপ করে শোনেন। একসময় মা উঠে যান নিজের কাজে। রাহুল চোখ বোজে। সারাদিনের কত ছবি। একের-পর-এক সামনে ভেসে আসে গ্রাম মন্দির গঙ্গার ঘাট মাঝি রাজবাড়ি। কী সুন্দর একটা দিন!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন