পুরোনো স্কুল

চঞ্চলকুমার ঘোষ

মণিদীপার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় ত্রিদিববাবু বললেন, সত্যেনবাবু নিউ-হরাইজেন স্কুলের সেক্রেটারি এতদিন আমি জানতামই না! তোমরাও আমাকে কিছু বলনি।

মণিদীপা তাড়াতাড়ি বলল, আমরাও জানতাম না। নবনীতা বলে যে-মেয়েটা রাহুলকে পড়ায় সেআজ আমাকে বলল।

সত্যেনবাবুর সঙ্গে আমার চল্লিশ বছরের পরিচয়। ওর ছেলে তখন স্কুলে পড়ে। খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ডাক্তারি করতে গিয়ে সেই সময়ে চেনা। ওদের বাড়ির সবাই আমার কাছেই আসে। সত্যেনবাবু খুব নামকরা অঙ্কের অধ্যাপক ছিলেন।

মণিদীপা একটু ইতস্তত করে বলল, সত্যেনবাবুকে বলে রাহুলকে আবার পুরোনো স্কুলে ভরতি করা যায় না? সবাই বলছে নিউ-হরাইজেন নামি স্কুল। ওখানে পড়লে ছেলেটা মানুষ হবে।

একটু হাসলেন ত্রিদিববাবু। একটা কথা কী জান দীপা? ছেলে-মেয়েদের মানুষ হওয়া কিন্তু স্কুলের ওপর নির্ভর করে না। আমি গ্রামের স্কুলেই পড়াশোনা করেছি। পরীক্ষার ফল খারাপ করিনি। ডাক্তারিও পাস করেছি।

আসলে সময় অনেক পালটিয়ে গিয়েছে দাদা। সব জায়গায় কম্পিটিশন। বাচ্চাদের কষ্ট হয় বুঝি। কিছু করবার নেই।

ত্রিদিববাবু বললেন, তুমি কিছু চিন্তা কোরো না। আমি এখনই সত্যেনবাবুকে ফোন করছি।

পাশের ঘরে যান ত্রিদিববাবু। উৎকন্ঠায় অপেক্ষা করে মণিদীপা। ছেলেটার ব্যাপারে ওর বাবার আর কোনো আগ্রহ নেই। মোটামুটি তার সিদ্ধান্ত রাহুলের কিছু হবে না। এখন সব দায়িত্ব মণিদীপার।

একটু পরেই ফিরে আসেন ত্রিদিববাবু। তাড়াতাড়ি মণিদীপা জিজ্ঞাসা করেন, কথা হল দাদা?

হ্যাঁ সত্যেনবাবু তো অবাক। উনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না সামান্য দুষ্টুমি করেছে বলে একটা বাচ্চাকে স্কুল থেকে বার করে দিয়েছে। কাল এগারোটায় স্কুলে যাবেন। রাহুলকে নিয়ে আমাদের যেতে বললেন।

মণিদীপা আমতা আমতা করে বলল, আপনার ভাই যাবে না।

ঠিক আছে। তুমি গেলেই হবে। বাচ্চাদের ব্যাপারটা মা যত বোঝে আর কেউ তত বোঝে না। তা ছাড়া আমার মনে হয় একটা বাচ্চা নিজের মনের কথা মাকেই একমাত্র বলতে পারে। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়নি। ‘মা গো, আমায় ছুটি দিতে বল, সকাল থেকে পড়েছি যে মেলা। এখন আমি তোমার ঘরে ব’সে করব শুধু পড়া পড়া খেলা’।

এবার হেসে ফেলেন মণিদীপা।

যখন কলেজে পড়তাম তখন পড়েছি। তারপর পড়া হয়নি।

হঠাৎ কেমন আনমনা হয়ে গেলেন ত্রিদিববাবু। বললেন, আমার মা কোনো স্কুলে পড়েনি। রবীন্দ্রনাথের কত কবিতা মুখস্থ ছিল। আর গানের একটা লাইন বললেই মা পুরো গানটা গেয়ে দিত। সমস্ত গীতবিতান মায়ের কন্ঠস্থ ছিল। আমাদের ছোটোবেলার মনটা মা তৈরি করে দিয়েছিল। আজ যতটুকু যা হয়েছি সব মায়ের জন্যে। তুমি তো তবু রাহুলের কথা ভাবছ, চিন্তা করছ। আর আমার চেম্বারে অনেক মা আসে, সঙ্গে অসুস্থ বাচ্চা। মা চাকরি করে। কোনোরকমে বাচ্চাকে দেখিয়ে নিয়েই অফিস ছুটবে। সঙ্গে কাজের মেয়ে। সেবাচ্চাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে। আমি অনেক বাচ্চার সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, এখনই তাদের মধ্যে নি:সঙ্গতা, ক্ষোভ, যন্ত্রণা। মাঝে মাঝে মনে হয় সমাজ এগোচ্ছে তবে কোনদিকে এগোচ্ছে কে জানে!

আস্তে আস্তে নিজের ঘরে ফিরে আসেন মণিদীপা। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছবির বই দেখছিল রাহুল। পার্থবাবু পাশের ঘরে বসে অফিসের কাজ করছিলেন। মণিদীপা ছেলের পাশে বসে বললেন, কাল তোর স্কুলে যাব।

অমলমামার স্কুলে?

না, যে স্কুলে তুই পড়তিস। নিউ-হরাইজেন।

বই রেখে উঠে বসল রাহুল। মায়ের দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, পুরোনো স্কুলে তুমি যাবে?

আমার সঙ্গে বড়োজেঠু যাবে। তুইও যাবি।

রাহুল বুঝতে পারছিল না পুরোনো স্কুলে গিয়ে কী হবে। জিজ্ঞেস করল, আমি কেন যাব?

আবার তোকে ওই স্কুলে ভরতি করে দেব। জেঠু কথা বলে রেখেছেন।

প্রায় চিৎকার করে ওঠে রাহুল। আমি ওই পুরোনো স্কুলে পড়ব না। বড়ো আন্টি একদম ভালো না।

ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় মণিদীপা। ওকথা বলতে নেই। আন্টিরা তোমাদের ভালোর জন্যেই বকেন।

অমলমামা একদম বকেন না।

অমলমামার স্কুল খুব ছোটো। অল্প ছেলে-মেয়ে। তাই বকেন না।

কেমন গম্ভীর হয়ে যায় রাহুল। ভীষণ রাগ হয়। বড়োরা কেউ ছোটোদের কথা শোনে না।

গাড়িতে উঠেই এক পলক মা আর জেঠুর দিকে তাকাল রাহুল। আজ আর অমলমামার স্কুলে যাওয়া হল না। ড্রাইভার গাড়ি ছাড়তেই মণিদীপা রাহুলের দিকে ফিরে বললেন, বড়ো আন্টির কাছে গিয়ে বলবি আমি আর দুষ্টুমি করব না। মন দিয়ে পড়াশোনা করব।

ত্রিদিববাবু বললেন, ওকে জোর কোরো না। সত্যেনবাবু আছেন। একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হয়ে যাবে।

স্কুলের গেটের সামনে এসে গাড়ি দাঁড়ায়। সব ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে। চারদিক শান্ত।

ভয় লাগছিল রাহুলের। মায়ের পেছনে মাথা নীচু করে হাঁটছিল। উলটো দিকের বারান্দায় তাদের ক্লাস ঘরটা দেখা যাচ্ছে। একজন এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে, কোথায় যাবেন?

সত্যেনবাবুর কাছে।

ঘর দেখিয়ে দেয় লোকটা।

দু-জন টিচারের সঙ্গে কথা বলছিলেন সত্যেনবাবু। ফর্সা গোলগাল চেহারা। সাদা চুল। দু-জন টিচার চলে যেতেই ত্রিদিববাবু বললেন, রাহুলকে নিয়ে এলাম, এবার যা করবার আপনি করুন।

সত্যেনবাবু অল্পক্ষণ রাহুলের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, দেখে দুষ্টু বলে মনে হচ্ছে না। বরঞ্চ শান্তই লাগছে।

মাথা নাড়লেন মণিদীপা, অপনি ঠিকই বলেছেন দাদা। রাহুল খুব শান্ত। কখনো খুব-একটা জ্বালাতন করে না।

তাহলে ওকে নিয়ে সমস্যা কোথায়?

ত্রিদিববাবু রাহুলের পিঠে হাত রেখে বললেন, রাহুলের সমস্যাটা হল ও আর সকলের চেয়ে একেবারে আলাদা। অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয়ের প্রতি ওর কৌতূহল।

মণিদীপা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, শুধু পড়াশোনায় কোনো কৌতূহল নেই।

সত্যেনবাবু বললেন, বহু বিখ্যাত মানুষের ছোটোবেলায় পড়াশোনায় তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। পরে তাঁরা দেশবিখ্যাত হয়েছেন।

খানিকটা হতাশ গলায় মণিদীপা বলেন, আমার ছেলের কিছু হবে না।

একটু জোরেই হেসে ফেললেন সত্যেনবাবু।

ছোটোবেলায় আমার মা এই একই কথা বলত। আমার ছেলেও ছোটোবেলায় পড়াশোনায় একেবারে সাধারণ মানের ছিল। কোনো পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেনি। একবার তো অঙ্কে ফেলই করল। ওর মা মোটামুটি সিদ্ধান্তেই এসে গিয়েছিল ছেলের কিছু হবে না। মাধ্যমিকেও সেকেণ্ড ডিভিসনে পাস করল। খানিকটা জোর করেই সায়েন্স নিল। তারপর যত উপরে উঠতে আরম্ভ করল ততই ভালো রেজাল্ট হতে লাগল। এমএসসিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। এখন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে অঙ্কের অধ্যাপক। রাহুল, তুমি বলো তো, বড়ো হলে কী হবে?

সহজভাবেই রাহুল বলল, অমলমামার মতন ছবি আঁকব।

কে অমলমামা?

আমার মেজোভাইয়ের বউয়ের এক দাদা। ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। পরে শিল্পী। তিনিই স্কুল করেছেন। পড়াশোনাটা অন্যরকম। ছেলে-মেয়েদের নিজস্বতার ওপরেই বেশি জোর দেন।

কী নাম স্কুলের?

তাড়াতাড়ি রাহুল বলে ওঠে, সবুজ পাখি।

খুব সুন্দর নাম। ওই স্কুল তোমার ভালো লাগে?

খুব ভালো।

কেন ভালো লাগে তোমার?

উৎসাহের চোটে গড়গড় করে কত কথা বলে রাহুল। অস্বস্তি লাগে মণিদীপার। রাহুলকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ওর কথায় কান দেবেন না দাদা। কখন কী বলে তার ঠিক নেই। আপনি ওকে ভরতির ব্যবস্থা করুন।

সত্যেনবাবু অল্পক্ষণ চুপ করে মণিদীপার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর বললেন, আমার জীবনের পঞ্চাশটা বছর শিক্ষাজগতের সঙ্গে কেটে গেল। নিজের অভিজ্ঞতায় বলছি রাহুলকে ওর নিজের মতো করে বড়ো হতে দাও। আমি ওকে এই স্কুলে আবার নিয়ে নিতেই পারি। তাতে কোনো অসুবিধে নেই। এখানে সকলেই আমার কথা মানে। একটা ব্যাপার, ও এখানকার পরিবেশকে মন থেকে মেনে নিতে পারবে না। ভেতরে ভেতরে হাঁপিয়ে উঠবে। সেটা ওর ভালোর চেয়ে খারাপই হবে। সবুজ পাখি স্কুলে পড়লে ওর ভালোই হবে। ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমার নিজের নাতি এখানে থাকলে তাকেও ওই সবুজ পাখি স্কুলে ভরতি করতাম। আর একটা কথা বলি। জীবনের অভিজ্ঞতা তো কম হল না। সবসময় মনে রাখবে, ভালো রেজাল্ট মানে কিন্তু ভালো হওয়া নয়।

মণিদীপা কোনো কথা বলেন না।

ত্রিদিববাবু বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন সত্যেনবাবু। জোর করে পৃথিবীতে কিছু হয় না। যা সহজ স্বাভাবিক তাকে মেনে নেওয়াই ভালো।

রাহুলের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

মণিদীপা হাসতে গিয়েও হাসতে পারেন না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%