চঞ্চলকুমার ঘোষ

বিছানায় শুয়ে একমনে বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছিল রাহুল। পেছনে কখন মা এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি। হঠাৎ মায়ের ডাকে মুখ ফেরাল।
ওটা কী বই পড়ছিস?
মায়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে হেসে ফেলল রাহুল। এটা ক্লাস টু-এর অঙ্ক বই।
ছেলের পাশে বসে পড়লেন মণিদীপা। এক মাস হল অমলবাবুর স্কুলে যাচ্ছে রাহুল। এর মধ্যে বিরাট একটা পরিবর্তন হয়েছে রাহুলের। আগের মতো পড়ার জন্যে জোর করতে হয় না। নিজেই পড়তে বসে। মন দিয়ে কাজকর্ম করে। ক্লাস পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছে। সবচেয়ে ভালো লাগে আচার-ব্যবহারটাও পালটে গিয়েছে। মনের দিক থেকে ছোটো ছেলেটা হঠাৎ যেন বড়ো হয়ে গিয়েছে। বড়োছেলে রোহিত সারাদিন পড়াশোনা নিয়ে থাকে। রাহুল স্কুল থেকে ফিরে বাড়ির ছাদে একাই খেলা করে। সবাই ব্যস্ত, শুধু মেজোমা কখনো কখনো তার সঙ্গী হয়। রাতে পড়ার পর মায়ের কাছে বসে গল্প করে সারাদিনে স্কুলে কী হয়েছে। কী শিখেছে সব বলে। স্কুলের দিদিরা কত গল্প বলেন। এইসব গল্প রাহুলের মনকে ভীষণ নাড়া দেয়। ঘুমের মধ্যে গল্পের চরিত্ররা উঠে আসে ওর কাছে। নিজের মনে কথা বলে রাহুল। কতদিন দরজার আড়াল থেকে দেখেছেন মণিদীপা। মজা লাগে, আবার ভালোও লাগে। ওর মধ্যে একটা নিজের জগৎ তৈরি করে দিয়েছেন অমলবাবু।
রাহুলের হাত থেকে অঙ্কের বইটা নিয়ে মণিদীপা বললেন, এই বইটা তোকে কে দিল?
অমলমামা দিয়েছেন। বলেছেন সামনের সোমবার থেকে আমি ক্লাস টু-এর অঙ্ক ক্লাস নেব।
চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে মণিদীপা বললেন, তুই পড়াবি! তারপরই হেসে ফেললেন।
হাসির শব্দে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন রানু।
কী হল মায়ে-ছেলেতে এত হাসি কেন?
রাহুল সোমবার থেকে মাস্টারি করবে।
কোথায়?
ওদের স্কুলে। ক্লাস টু-এর ছেলেদের অঙ্ক করাবে। অমলদা বলেছেন।
রানু চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে বললেন, আমি আজই অমলদাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করব কত মাইনে দেবে?
রাহুল গম্ভীর মুখে বলল, মাইনে কেন দেবে। মামা বলেছে অন্যকে অঙ্ক শেখালে নিজে তাড়াতাড়ি অঙ্ক শেখা যায়।
রানু বললেন, তুই যেদিন অঙ্ক শেখাবি, আমি আর তোর মা ক্লাসে গিয়ে বসব। দেখি তুই কেমন করে অঙ্ক করাস।
রাহুল তাড়াতাড়ি বলে উঠল, তোমরা কেউ যাবে না। খবরদার না।
রাহুলের গালটা ধরে আদর করেন রানু। ঠিক আছে আমরা কেউ যাব না। রাতে অমলদাকে ফোন করে জানব তুই কেমন মাস্টারি করলি।
ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠেছিল রাহুল। কী করে পড়াবে। তিন দিন ধরে পড়ার ফাঁকে টু-এর অঙ্ক করে। যেটা বোঝে না মায়ের কাছে বুঝে নেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় সব অঙ্ক ভুলে যাচ্ছে। তখন আবার নতুন করে করে।
সোমবার সকালে গাড়িতে ওঠার আগে মণিদীপা বলেন, ঠিক করে পড়াতে পারবি তো?
বেশ জোরের সঙ্গে রাহুল জবাব দিল, পারব।
স্কুলে যেতেই ববিতাদিদি বললেন, মনে আছে তুই আজ ক্লাস টু-এর অঙ্কের মাস্টার?
রাহুল ছোট্ট করে জবাব দিল, মনে আছে দিদি।
টু-এর ক্লাসে ঢুকতেই রাহুলের মনে হল এতক্ষণের সব সাহস যেন ফুরিয়ে গিয়েছে। গলার কাছটায় কেমন শুকিয়ে আসছে। পাশে দাঁড়িয়ে ববিতাদিদি। ছেলে-মেয়েরা সবাই হইচই করছে। দিদিকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। ববিতা বললেন, সবাই বোসো। আজ তোমাদের অঙ্কের ক্লাস নেবে রাহুল। সবাই মন দিয়ে শুনবে। শুরু করো রাহুল।
তিন দিন ধরে টু-এর বই দেখেছে। সহজ যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ। তবুও আস্তে আস্তে বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ক্লাসের সবাই বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। একটু ভাবল রাহুল তারপর বই দেখে দুটো যোগ দিল।
তোমরা সবাই এই দুটো অঙ্ক করে আমায় দেখাও।
একটু পরেই খাতা নিয়ে আসে সবাই। দশ জনের মধ্যে আট জন সব ঠিক করেছে। দু-জন একটা করে অঙ্ক ভুল করেছে। এতক্ষণে আগের ভয়টুকু কেটে গিয়েছে। রাহুল উঠে গিয়ে বোর্ডে দুটো অঙ্ক করে দেয়। আরও ক-টা অঙ্ক দেয়। যারা পারে না তাদের বোঝায়। ঘণ্টা পড়ে। ক্লাসের বাইরে এসে ববিতা রাহুলের পিঠে হাত রাখেন, এই তো তুই কত ভালো অঙ্ক শিখে গিয়েছিস। মনে আছে প্রথম দিন তুই ক্লাসে এসে বলেছিলি অঙ্ক করতে ভালো লাগে না। ভয় লাগে।
হেসে ফেলল রাহুল। সহজভাবেই বলল, এখন আর অঙ্ক করতে ভয় করছে না।
অঙ্ক খুব মজার বিষয়। যত করবি, তত দেখবি ভালো লাগছে। আনন্দ পাচ্ছিস।
রাহুল মুখ তুলে বলল, এবার আমি ক্লাস থ্রি, ফোর সব ক্লাসেই অঙ্ক করাতে পারব।
জোরে হেসে ফেললেন ববিতা। বললেন, তুই যদি সব ক্লাসে অঙ্ক করাস তাহলে আমরা কী করব?
লজ্জা পায় রাহুল। সামনে তাদের ক্লাস। একছুটে ক্লাসে ঢুকে পড়ল।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন