চঞ্চলকুমার ঘোষ

সবুজ পাখি স্কুলের তিন জন অঙ্ক প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে— রাহুল, অরূপ, সরস্বতী।
অমলবাবু প্রথম দিনই সকলকে বলেছেন তোমরা প্রতিযোগিতায় নাম দিচ্ছ মানেই যে প্রতিযোগিতায় জিতবে এমন নয়। সবাই প্রতিযোগিতায় জেতে না। যারা নাম দেয় তাদের মধ্যে থেকে এক জন, যে সবচেয়ে ভালো পরীক্ষা দেয় সেজেতে। যারা জিততে পারল না, তারা খারাপ এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। ভাববে, আমি ভালো পরীক্ষা দিয়েছি, যে প্রথম হয়েছে, সেআমার চেয়ে আরও ভালো পরীক্ষা দিয়েছে। ঠিক আছে আমি চেষ্টা করব পরের বার আরও ভালো করার। কখনো প্রতিযোগিতার ফল নিয়ে ভাববে না। সেটা তোমার হাতে নয়। তোমার হাতে চেষ্টা, পরিশ্রম, সাধনা।
প্রতিদিন টিফিন খাওয়ার পর অমলবাবু কিছুক্ষণ তিন জনকে অঙ্ক করান। অঙ্ক হয়, তার চেয়েও বেশি হয় গল্প আর মজা। বাড়িতে মা পড়ায়। অঙ্ক প্রতিযোগিতার কথা শুধু মা আর রাহুল ছাড়া বাড়ির কেউ জানে না। বাড়ির কেউ বিশ্বাসই করতে পারে না, রাহুল কিছু করতে পারে। মাঝে মাঝে রাহুলের কেমন ভয় লাগে। অঙ্ক প্রতিযোগিতায় যদি কঠিন প্রশ্ন আসে। একটাও অঙ্ক না করতে পারে। কাউকে বলতে সাহস হয় না। অমলবাবুকে বলে।
অমলবাবু চুপ করে তাকিয়ে থাকেন রাহুলের দিকে। তারপর শান্তভাবে বললেন, তুমি যদি একটাও অঙ্ক না পারো তাহলে কী হবে বল?
রাহুল একটু ভেবে বলল, তাহলে আমি শূন্য পাব।
যদি তুমি শূন্য পাও তাহলে কি কেউ তোমাকে মেরে ফেলবে? তোমার পড়াশোনা কি বন্ধ হয়ে যাবে? পৃথিবীর সব কিছু পালটে যাবে?
মাথা নাড়ে রাহুল। কিছুই হবে না।
কোনো কিছুই যখন হবে না তাহলে এত ভাবছ কেন। ভগবান বুদ্ধ বলেছেন কাল কী হবে যখন আমরা জানি না, তাহলে শুধু শুধু তার কথা ভেবে মন খারাপ করব কেন। আজকের দিনটাকে আমরা ভালোভাবে কাজে লাগাব।
সরস্বতী, রাহুল অরূপ তিন জনের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অঙ্ক করে অরূপ। সরস্বতী বলে, তুই ফার্স্ট হবি।
অরূপ গম্ভীর গলায় বলে, স্যার বলেছেন ফার্স্ট হবার কথা কখনো ভাববি না। ভাববি ভালো পরীক্ষা দেওয়ার কথা।
পুজোর ছুটির আগে পরীক্ষা। কলকাতার সংস্কৃত কলেজে পরীক্ষা হবে।
পরীক্ষার আগের দিন বাড়ির সবাই জেনে যায়, রাহুল অঙ্ক প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে।
পার্থবাবু বিরক্তভাবে বললেন, অমলবাবুর স্কুলে কি আর কোনো ছেলে-মেয়ে ছিল না!
মণিদীপা কোনো কথা বলেন না। রাহুল মাথা নীচু করে থাকে।
মাকে একা পেয়েই রাহুল বলে, মা আমি পরীক্ষা দেব না।
কেন?
বাবা রাগ করবে।
মণিদীপা তাড়াতাড়ি বললেন, না না, বাবা রাগ করবেন কেন। তুমি আগে অঙ্কে ভালো ছিলে না, তাই বাবা বলল।
আজ আর স্কুল নয়। বড়োজেঠু গাড়ি নিয়ে কোথায় গিয়েছেন। মা ট্যাক্সি করে রাহুলকে নিয়ে যান। কলেজস্ট্রিট। আগে কোনোদিন এখানে আসেনি রাহুল। অবাক হয়ে চারদিকে তাকায়। কত বইয়ের দোকান, বড়ো বড়ো বাড়ি। লোকজনের ভিড় পেরিয়ে একটা গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকে। অনেক ছেলে-মেয়ে এসেছে, সঙ্গে বাড়ির লোকজন। মা রাহুলের হাতটা শক্ত করে ধরে থাকেন। আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে রাহুল, মা আমরা কোথায় এসেছি?
এই তো সংস্কৃত কলেজ। বারান্দায় ওই যে মূর্তিটা দেখছ, ওটা বিদ্যাসাগরের মূর্তি। একদিন তিনি এই কলেজে পড়াতেন। এত বড়ো মানুষ আমাদের দেশে কম জন্মেছেন।
হঠাৎ কেউ রাহুলের পিঠে চাপড় মারে। সরস্বতী আর অরূপ এসেছে, সঙ্গে ববিতাদিদি। পরীক্ষার এখনও আধ ঘণ্টা দেরি।
তাড়াতাড়ি রাহুল জিজ্ঞাসা করে, অমলমামা এলেন না?
ববিতাদিদি বললেন, না স্যার দরকারি কাজে এক জায়গায় গিয়েছেন। তোর ভয় লাগছে?
রাহুলের মুখটা হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। চাপা গলায় বলল, একটু ভয় করছে।
ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যা অঙ্ক দেবে মাথা ঠাণ্ডা করে করবি। আমি বলছি তুই সব অঙ্ক পারবি।
মণিদীপা হাসেন, আমার টেনশন হচ্ছে। কী করবে কে জানে।
ছেলে-মেয়েদের ভিড়ে ভরে গেছে। হঠাৎ কেউ একজন পাশ থেকে ডাক দেয়, রাহুল।
মুখ ফেরাল রাহুল। আগের স্কুলের অঙ্কের শোভা ম্যাম, পাশে বিকাশ, পিনাকী আরও তিনচার জন।
শোভা ম্যাম জিজ্ঞেস করলেন, তুই এখানে কী করছিস?
আমি অঙ্ক প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছি।
হো-হো করে হেসে ওঠে সকলে। শোভা ম্যাম বললেন, তুই তো ক্লাসে কোনোদিন অঙ্ক পারতিস না। থ্রি থেকে ফোরে ওঠার সময় অঙ্কে কত পেয়েছিলি?
ত্রিশ।
ত্রিশ পেয়ে অঙ্ক প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিস!
রাহুলের মুখটা কেমন অন্ধকার হয়ে আসে। ঠোঁটটা কেঁপে ওঠে। মায়ের দিকে তাকায়। মায়ের মুখেও কেমন লজ্জার আভা। পাশে দাঁড়িয়ে ববিতাদিদি সব শুনতে পান। এগিয়ে এসে রাহুলের কাঁধে হাত রাখেন।
রাহুল মনে আছে তোমাদের ক্লাসে একদিন রামানুজমের গল্প বলেছিলাম। স্কুলের পরীক্ষায় তিনি ভালো নম্বর পাননি। পরে তিনি হয়েছিলেন অঙ্কের শ্রেষ্ঠ পন্ডিত।
পরীক্ষার ঘণ্টা বাজে। সবাই ভেতরে যায়। মণিদীপা আর ববিতা বেরিয়ে আসেন। পাশেই শোভা ম্যাম। হঠাৎ ববিতা মুখ ফেরালেন তাঁর দিকে, তারপর খানিক উঁচু গলায় বললেন, একটা বাচ্চা খারাপ বা ভালো হয়ে জন্মায় না। যদি সেখারাপ হয়, তার জন্যে আমরা বাচ্চাদেরই সবসময় দোষ দিই। আমরা শিক্ষিকারা কখনো বলি না আমরা তাদের মানুষ করতে পারিনি। সে-দোষ আমাদের। আর একটা কথা, রাহুল আপনাদের কাছে খারাপ ছিল, এখন আর খারাপ নয়। আমরা তাকে ভালো করেছি।
আর দাঁড়ান না ববিতা। বেরিয়ে আসেন রাস্তায়।
পেছনে শোভা ম্যামের মুখটা হঠাৎ আলকাতরার মতো কালো হয়ে যায়।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন