চঞ্চলকুমার ঘোষ

পুজোর ছুটির আগের দিন। ‘সবুজ পাখি’ স্কুলে খেলা প্রতিযোগিতা। স্কুলের সব ছেলে-মেয়েরা এসেছে। তাদের সঙ্গে মায়েরাও এসেছেন।
মণিদীপা আসতে চাননি। পুজোর আগে ঘরে কত কাজ। অমলমামা শুধু বলেছেন ছেলে মানুষ করার চেয়ে বড়ো কোনো কাজ আছে?
রাহুলও জোর করছে। সবার মা আসবে তুমি কেন যাবে না। মণিদীপা আর না করেননি।
স্কুলের কাছেই খেলার মাঠ। সবাই সেখানে জড়ো হয়েছে। একদিকে খানিকটা কাপড় টাঙানো। সেখানে মায়েরা সবাই বসেছে। খানিক পরেই সন্ধ্যাদিদি সবাইকে ডাক দিলেন, সবাই আসুন।
মাঠের মাঝখানে জড়ো হয় সবাই। দিদিমণিরা আসেন। এবার সন্ধ্যাদিদি বললেন, আজ মা বদল হবে।
সব ছেলে-মেয়েরা হি-হি করে করে হেসে ওঠে।
মা কি বদল হয়!
হয়, হয়! সন্ধ্যাদিদি বলে ওঠেন, একদিকে সব ছেলে-মেয়েরা দাঁড়াও। আর এক দিকে সব মায়েরা। বাচ্চারা আজ নিজের মা ছাড়া অন্য কাউকে মা বলবে। সারাদিন তাঁর সঙ্গে থাকবে। আর মায়েদের বলছি আজ যে আপনাদের বাচ্চা হবে, তাকে ঠিক নিজের বাচ্চার মতো দেখবেন।
রাহুলের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সরস্বতী। তার দিকে ফিরে রাহুল বলল, তুই আমার মাকে আজ মা বলবি।
আর তুই আমার মাকে মা বলবি।
মাথা নাড়ল রাহুল। আমাদের আজ মা বদল হল। এবার খুব মজা হবে।
সন্ধ্যাদিদি বললেন, এবার সব বাচ্চারা নতুন মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াও।
সরস্বতী সবার আগে মণিদীপার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
আজ তুমি আমার মা।
মণিদীপা তার হাতটা ধরে বললেন, কী নাম তোমার?
সরস্বতী।
বুঝেছি। তুমি রাহুলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
সরস্বতী সঙ্গে সঙ্গে বলল, রাহুল খুব ভালো। আমাকে খুব সুন্দর একটা পুতুল দিয়েছিল।
আমি জানি। মণিদীপা জবাব দিলেন।
রাহুল আজ আমার মায়ের ছেলে হবে।
হেসে ফেলেলেন মণিদীপা, তোমরা দু-জনে ঠিক করে নিয়েছ।
সব বাচ্চাই কাউকে মা করে নেয়। কয়েক জনের মা আসতে পারেননি। তাদেরকে অনেকে ডেকে নেন। তাঁরা দুই বাচ্চার মা।
অমলবাবু মাঠে এসে গিয়েছেন। সব মায়েরা নতুন বাচ্চাদের নিয়ে লাইনে গিয়ে দাঁড়ান। খেলা শুরু হল। দৌড় প্রতিযোগিতা, চামচ-গুলি রেস, অঙ্ক রেস, হাঁড়ি ভাঙা। পর পর খেলা। সব বাচ্চারা খেলায় নামে। যে জেতে সেনম্বর পায়। শুধু কেউ ভুল করে নিজের মায়ের কাছে গেলে নম্বর কাটা যায়।
সরস্বতী চামচ-গুলি আর হাঁড়িভাঙায় ফার্স্ট, পঞ্চাশ মিটার আর এক-শো মিটার দৌড়ে সেকেণ্ড। রাহুলের খেলাধুলোয় বিশেষ অভ্যেস নেই। সব খেলাতেই পিছিয়ে পড়ে। অঙ্ক রেস-এর সময় সরস্বতীর মা কমলা চিৎকার করে ওঠেন, তাড়াতাড়ি রাহুল, তাড়াতাড়ি।
রাহুল একবার মায়ের কাছে যেতে গিয়েও ফিরে আসে। দৌড়োতে দৌড়োতে ঘেমে গিয়েছিল। সরস্বতীর মা কাপড়ের আঁচলে ঘাম মুছিয়ে দেন।
দুপুর বেলায় সবাই স্কুলে ফিরে আসেন। আজ সবার খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। এবার কিছুক্ষণ বিশ্রাম। আর মাঠে যাওয়া নয়। ঘরের মধ্যে প্রতিযোগিতা। কখনো কবিতা বলা, কখনো প্রশ্ন-উত্তর, ছবি দেখে বলা।
বাচ্চারা না পারলে মায়েরা সাহায্য করছেন।
রাহুল কিছু না পারলে কমলা চুপ করে থাকেন। মণিদীপা স্কুলে পড়াতেন। এখনও পড়াশোনা করেন। সরস্বতী যেটাই পারছে না সেটাই তিনি বলে দিচ্ছেন। রাহুল মাঝে মাঝে মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। সরস্বতীর মা কমলা কারখানায় কাজ করেন। বেশি পড়াশোনার সুযোগ পাননি। কেমন কষ্ট হয় তাঁর। রাহুলের পিঠে হাত রেখে বললেন, তোমার মা অনেক পড়াশোনা করেছেন তাই না?
হ্যাঁ, আমাদের বাড়িতে কত বই।
কমলার মুখটা কেমন অন্ধকার হয়ে যায়।
আমি বেশি পড়াশোনা শিখতে পারিনি। তাই কিছু জানি না।
তাড়াতাড়ি রাহুল বলল, সরস্বতী বলেছে, তুমি খুব ভালো গান করতে পার।
আমার মা গান করতেন। মায়ের কাছেই গান শিখেছি। এখন আর গান করার সময় পাই না।
তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল রাহুল।
আমার নতুন মা একটা গান শোনাবে।
সবাই হাততালি দেয়। সবচেয়ে বেশি হাততালি দেয় সরস্বতী।
উঠে দাঁড়িয়ে খালি গলায় গান ধরেন কমলা। ‘আজ ধানের খেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা।’
গোটা ক্লাসে গানের সুর ছড়িয়ে পড়ে। সকলে তার সুরে সুর মেলায়। গান শেষ হতেই গোটা ক্লাসে হাততালি।
সরস্বতী এগিয়ে আসে।
আমার মা কী সুন্দর গান করে।
তাড়াতাড়ি রাহুল কমলার হাতটা চেপে ধরে।
এবার তোর পয়েন্ট কাটা যাবে সরস্বতী। আমার মা ভালো গান করে।
সরস্বতী দু-হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, আমার মা ভালো গান করে।
আমার মা।
কমলা দু-হাতে দু-জনকে কাছে টেনে নিয়ে বলে ওঠেন, আমি সকলের মা।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন