চঞ্চলকুমার ঘোষ

গোটা বাড়ি থমথম করছে। আলিপুরের বোস বাড়ির মোটামুটি একটা পরিচিতি আছে। একসময়ের নামকরা উকিল গজেন বোসের তিন ছেলে, বড়ো ত্রিদিব বোস নাম করা ডাক্তার। মেজো গৌতম অর্থনীতির অধ্যাপক, ছোটো পার্থ ইঞ্জিনিয়ার। ত্রিদিববাবুর দুই মেয়ে। বড়োমেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছোটোমেয়ে সংগীতা ডাক্তারি পড়ছে। গৌতমের এক ছেলে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। পার্থবাবুর বড়োছেলে বারো ক্লাসে পড়ে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম দশ জনের মধ্যে ছিল।
বিরাট চারতলা বাড়ি। দোতলায় ত্রিদিববাবুর ঘরে গোলটেবিল বসেছে। সকলের মুখ গম্ভীর। বোস বাড়ির কোনো ছেলেকে বার বার স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে একথা ভাবতেই পারছিলেন না কেউ। গৌতমবাবু রাহুলকে একটু বেশি ভালোবাসেন। বললেন, বাচ্চারা স্কুলে একটু-আধটু দুষ্টুমি করবেই, তার জন্যে স্কুল থেকে বার করে দেওয়া আনজাস্টিফায়েড। আমি হেডমিস্ট্রেসের নামে কমপ্লেন করব।
একটু দূরে বসে ছিলেন পার্থবাবু। বললেন, এই নিয়ে তিনটে স্কুল থেকে রাহুলকে তাড়িয়ে দেওয়া হল। তাহলে তিন জন হেডমিস্ট্রেসের নামেই কমপ্লেন করতে হয়।
ত্রিদিববাবু বললেন, রাহুলের সমস্যাটা কোথায়?
পার্থবাবু কিছু বলবার আগেই মণিদীপা বললেন, অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যাপারে ওর আকর্ষণ। আগের স্কুলে, ক্লাসে টিচার পড়াচ্ছেন ও জানলা দিয়ে তখন দেখছে রাস্তায় কোন ফেরিওয়ালা যাচ্ছে। দু-দিন চিৎকার করে তাকে ডেকেছে। জানলার বাইরে গাছে পাখি বসে আছে, শিস দিয়ে তাকে ডাকছে। নয়তো কাগজের বল তৈরি করে ছুড়বে। সবাই যখন প্রেয়ারের লাইনে ও তখন ট্যাঙ্কের কল খুলে বাগানের গাছে জল দিচ্ছে। তারপর কল বন্ধ না করে চলে এল। ট্যাঙ্কের জল খালি। গোটা স্কুলের কী দুরবস্থা। আগের দিন টিকটিকির পেছনে তাড়া করতে গিয়ে ক্লাসের টিউব-লাইট ভেঙে দিল। অল্পের জন্যে একটা মেয়ে বেঁচে গিয়েছে।
পার্থবাবু বলেন, এত দুষ্টুমি মেনে নেওয়া যেত, যদি পড়াশোনায় ভালো হত। লাস্ট পরীক্ষায় অঙ্কে ত্রিশ, ইংরেজিতে ছত্রিশ পেয়েছে— এটা কোনো নাম্বার!
ত্রিদিববাবু বললেন, এখন এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই। কী করা যায় সেটাই ভাবো। দশ বছরের একটা ছেলেকে হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখা যাবে না। গৌতম তোর চেনা কোনো স্কুল আছে?
দুটো স্কুলের হেডমাস্টার আমার ক্লাসমেট। বললে হয়ে যাবে।
মণিদীপা আমতা আমতা করে বললেন, সেখানে গিয়েও আগের মতোই অসভ্যতা করবে। পড়াশোনা করবে না। তখন মেজদার মানসম্মান কোথায় যাবে?
ত্রিদিববাবুর মেয়ে সংগীতা বলল, ওকে যদি কোনো হোস্টেলে রাখা যায়?
পার্থ খানিকটা হতাশভাবে বললেন, কোথাও রাহুলের কিছু হবে না। ওর যা হওয়ার হয়ে গেছে। ও এবাড়ির নাম ডুবোবে।
খারাপ লাগছিল মণিদীপার। মায়ের প্রাণ, এভাবে হাল ছেড়ে দিতে মন চাইছিল না। বললেন, কিছু তো একটা করতে হবে।
গৌতমবাবুর স্ত্রী রানু খুব বেশি কথা বলেন না। তাঁরও খারাপ লাগছিল। রাহুল বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ছেলে। সকলেই তাকে ভালোবাসে। বললেন, আমি একটা কথা বলব। আমার মামাতো দাদা স্কুল করেছে বাটার কাছে। একেবারে আশ্রমের মতন। দাদা নিজে পড়ায়।
তুমি গিয়েছ দিদি? জিজ্ঞেস করেন মণিদীপা।
না যাইনি। তবে শুনেছি পড়াশোনাটা নাকি একেবারে অন্যরকম। যে যা চায়, তাকে সেইভাবে পড়ানো হয়।
সংগীতা বলল, তাহলে রাহুলের ওখানেই ভালো লাগবে।
ত্রিদিববাবু বললেন, রানু তুমি দাদার সঙ্গে কথা বলো। সেরকম হলে কাল-পরশুর মধ্যে ঘুরে আসতে পারো। বাটা এখান থেকে চল্লিশ মিনিটের রাস্তা। সারাদিন আমার গাড়ি পড়েই থাকে। ওকে পৌঁছে দিয়ে আসবে।
রানুর দিকে মুখ ফেরালেন পার্থ। বউদি, শিকারি বেড়ালের গোঁফ দেখলেই চেনা যায়। আমি লিখে দিতে পারি রাহুলের কিছু হবে না। সারাজীবন ওকে নিয়েই আমাদের ভুগতে হবে।
গৌতমবাবু পার্থর পিঠের ওপর হাত রাখলেন। বললেন, এখনই এত ভেঙে পড়িস না। সব ঠিক হয়ে যাবে। অনেকেই ছোটোবেলায় পড়াশোনায় ভালো হয় না। একটু বড়ো হলেই সব ঠিক হয়ে যায় ।
পার্থর চোখে-মুখে হতাশার ছায়া।
মেজদা তুমি চেষ্টা করে দ্যাখো। ও আমার ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছে।
গৌতমবাবু মণিদীপার দিকে তাকালেন, রাহুলকে এক বার আমার পড়ার ঘরে পাঠিয়ে দাও। আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলব।
একতলায় গৌতমবাবুর পড়ার ঘর। পাশেই লাইব্রেরি।
ঘরে ঢুকেই গৌতমবাবুর চোখে পড়ল ঘরের মেঝেতে বসে খবরের কাগজ ছিঁড়ে কিছু-একটা বানাচ্ছে রাহুল। স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, অথচ কোনো অনুভূতি নেই। কাছে গিয়ে বললেন, কী বানাচ্ছিস?
মুখ তুলে তাকাল রাহুল। বলল, ড্রাগন বানাচ্ছি। সেদিন টিভিতে দেখাচ্ছিল। কী বিরাট দেখতে! দেখে ভয় লাগে।
ভয় লাগলে বানাচ্ছিস কেন?
মেজোমা আর মাকে ভয় দেখাব বলে।
হেসে ফেললেন গৌতমবাবু। হঠাৎ তাঁর নজর পড়ল, খবরের কাগজ ছিঁড়ে ড্রাগন বানাচ্ছে রাহুল। তাড়াতাড়ি বললেন, খবরের কাগজ কোথায় পেলি?
তোমার টেবিলের ওপর ছিল।
ও তো আজকের কাগজ। তুই আজকের কাগজ ছিঁড়ে ফেললি? আমার এখনও পড়াই হয়নি।
মুচকি হাসল রাহুল। বড়োজেঠু বলে, এখন খবরের কাগজে কিছু পড়ার থাকে না।
গৌতমবাবু রাগতে গিয়েও রাগতে পারলেন না ভাইপোর ওপর। হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিলেন। তুই স্কুলে গিয়ে এত দুষ্টুমি করিস কেন বল তো?
চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে রাহুল বলল, আমি দুষ্টুমি করিনি জেঠু। প্রতাপ বলল স্কুলের পেছন দিকের একটা গাছে মৌচাক হয়েছে। আমি কোনোদিন মৌচাক দেখিনি তাই দেখতে গিয়েছিলাম।
ক্লাসের ম্যামকে না বলে কোথাও যাওয়া অন্যায় তুই জানতিস না?
ম্যামকে বললে আমায় যেতে দিত না।
না বলে গিয়েছিস সেইজন্যে তোকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
মুখটা বেঁকিয়ে রাহুল বলল, জেঠু এই স্কুলটা আমার একদম ভালো লাগে না। সবসময় বলবে, এটা কোরো না, ওটা কোরো না। সেদিন আমি জানলা দিয়ে দেখছি গাছের ডালে একটা সুন্দর পাখি বসে আছে। উঠে গিয়ে দেখতেই ম্যাম আমাকে কান ধরে বেঞ্চির ওপর দাঁড় করিয়ে দিল।
ঠিক আছে, তোর সব কথা মেনে নিচ্ছি। পরীক্ষায় এত খারাপ রেজাল্ট করছিস কেন?
মুখটা কাঁচুমাচু করে রাহুল বলল, পড়াশোনা করতে আমার একদম ভালো লাগে না জেঠু। অঙ্ক দেখলেই ভয় লাগে।
অঙ্ক তো বাঘ-ভাল্লুক নয় যে ভয় লাগবে। তুই মন দিয়ে করলেই দেখবি কত ভালো লাগছে। বাড়ির সবাই কী বলছে জানিস? তোকে হোস্টেলে রেখে দেবে। সেখানে বাড়ির কেউ থাকবে না। শুধু যারা তোর সঙ্গে পড়বে, তারা থাকবে।
হাততালি দিয়ে উঠল রাহুল। দারুণ মজা হবে। সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতে পারব।
কোনো কথা বললেন না গৌতমবাবু। মনে হল বয়েসের তুলনায় ছেলেটা একটু বেশি বাচ্চা রয়ে গিয়েছে। ওর বয়েসি অন্য ছেলে-মেয়েরা অনেক বেশি চালাকচতুর। তীব্র এই প্রতিযোগিতার যুগে সহজসরল ছেলে-মেয়েদের জন্যে কোথাও কোনো জায়গা নেই। কিছু বলতে গিয়ে চোখ পড়ল রানুর দিকে। জিজ্ঞেস করলেন, দাদার সঙ্গে কথা বললে?
হ্যাঁ রাহুলের ব্যাপারে সব বললাম।
কী বললেন?
দাদা বলল এইরকম ছেলে-মেয়েই আমি খুঁজছি। কালই আমাদের যেতে বলল।
একটু চুপ করে থেকে গৌতমবাবু বললেন, ক-জন ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ে?
এখন বাহান্ন জন। চারটে ক্লাস। ওয়ান থেকে ফোর।
রানুর এই দাদার বিষয়ে প্রায় কিছুই জানেন না গৌতমবাবু। বললেন, তোমার দাদা আগে কী করতেন?
অমলদা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে দু-বছর চাকরি করেছিল। তারপর হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিয়ে ছবি আঁকা শিখতে প্যারিস চলে গেল। ওখানে অনেক বছর ছিল। পরে দিল্লি আর্ট কলেজে মাস্টার হয়ে আসে। দু-বছর হল সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই স্কুল করেছে।
হেসে ফেললেন গৌতম। ইঞ্জিনিয়ার থেকে আর্টিস্ট, তার থেকে মাস্টার, তারপর স্কুল ফাউণ্ডার। মনে হচ্ছে রাহুলের সঙ্গে ভালোই খাপ খাবে। তা মানুষটি কেমন?
অমলদার সঙ্গে অনেক বছর দেখা হয়নি। বিয়ের আগে দেখেছি খুব মজার মানুষ। ছোটোবেলা থেকেই দাদার একটা জিনিস ছিল, নতুন কিছু করবার ভাবনা। সেইজন্যে মনে হচ্ছে স্কুল করেছে।
মুচকি হাসলেন গৌতম, আরেকটা শান্তিনিকেতন।
শান্তিনিকেতন কোথায় জেঠু? এতক্ষণ পর কথা বলে রাহুল।
মজার ভঙ্গিতে গৌতম বললেন, এ বোলপুরের শান্তিনিকেতন নয়। এ তোর মেজোমায়ের দাদার শান্তিনিকেতন। আমরা কাল সেখানে যাব।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন