স্বপ্ন

চঞ্চলকুমার ঘোষ

গোটা স্কুলজুড়ে আনন্দ।

বাড়িতেও খবর পৌঁছে যায়। রাহুল সারাবাংলায় প্রথম হয়েছে।

স্কুলে অমলমামা, বন্ধুরা সবাই এসে রাহুলকে গাড়িতে তুলে দেয়।

বাড়ি ফেরে রাহুল। গাড়ি থেকে নামতেই সকলের আগে ছুটে আসেন মা, মেজোমা। মেজোমায়ের চোখে জল।

আমি জানতাম রাহুল ভালো কিছু করবে।

মা-র মুখে হাসি।

তোর বাবাকে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি।

আর মেজোজেঠু?

মেজোমা বললেন, হ্যাঁ, তোর মেজোজেঠু, বড়োজেঠু দু-জনকেই খবর দিয়েছি।

একে একে সকলে বাড়ি ফেরে। প্রতিদিনের চেনা রাহুল হঠাৎ যেন অনেকটা বড়ো হয়ে গিয়েছে। সবাই কত কথা বলে। মেজোজেঠু দম দেওয়া বড়ো গাড়ি নিয়ে এসেছেন। বাবা কেক এনেছেন। দাদা-দিদিরা সবাই রাহুলকে আদর করে।

সংগীতাদিদি বলল, রাহুল এত কিছু পারে আমরা জানতামই না।

হাসে রাহুল।

বাবা বলেন, এতদিন ও চেষ্টা করেনি। চেষ্টা করলে ও সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হতে পারত।

দাদা বলে, আমি ইঞ্জিনিয়ার হব, রাহুল ডাক্তার হবে।

কোনো কথা বলে না রাহুল। সেকী হবে কিছুই জানে না। মেজোজেঠুর আনা গাড়িটা নিয়ে বারান্দায় খেলা করে।

হঠাৎ মা ডাক দিলেন, অমলমামা তোকে ফোন করেছেন।

ফোনটা নিয়ে আবার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় ভরে আছে চারদিক। সামনের পার্কটা এখন শান্ত নিস্তব্ধ।

রাহুল বলে, মামা একটু আগেই তোমার কথা মনে হচ্ছিল।

আমারও তোমার কথা মনে হচ্ছিল। তাই ফোন করলাম। সবাই কী বলছে?

খুব ভালো। মেজোজেঠু আমাকে একটা গাড়ি দিয়েছে।

একটু চুপ করে থাকেন অমলবাবু। তারপর বললেন, আমি তোমাকে তার চেয়েও সুন্দর একটা জিনিস দেব।

কী জিনিস মামা? খুশিতে উচ্ছল হয়ে ওঠে রাহুল।

সেটা এখন বলব না। তুমি যখন অনেক অনেক বড়ো হবে, তখন।

রাহুল বলল, বাবার মতো!

আস্তে আস্তে অমলমামা বললেন, না, সেই বড়ো হওয়াটা বাবার মতো নয়, জেঠুর মতো নয়। একেবারে নিজের মতন।

একটু ভাবল রাহুল, তারপর বলল, তখন আমি কী পাব মামা?

আনন্দ। ফার্স্ট হওয়া নয়। গাড়ি পাওয়া নয়। জীবনে আনন্দ পাওয়ার চেয়ে বড়ো কিছু পাওয়ার নেই। এই যে সূর্য প্রতিদিন আমাদের আলো দেয়, এত কিছু দিয়ে সেকী পায় জান?

জানি না মামা।

সূর্য পায় আনন্দ। কাজ করার আনন্দ। সকলকে আলো দেওয়ার আনন্দ। প্রতিদিন সেএগিয়ে চলেছে, এই চলার আনন্দ।

রাহুলের বুকের মধ্যে অদ্ভুত এক তৃপ্তি। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, তুমি ঠিক বলেছ মামা। যখন তুমি বললে আমি ফার্স্ট হয়েছি। আমার কী আনন্দ হচ্ছিল!

শুধু তোমার আনন্দ নয়। আমাদের সকলের আনন্দ হচ্ছিল। এমনি করেই তোমাকে এগিয়ে যেতে হবে। কোথাও থামা চলবে না। ওই সূর্যের মতো। একদিন তোমার আলোয় চারদিক আলো হয়ে উঠবে। তখনই তুমি সত্যিকারের বড়ো হবে।

আরও কত কথা বলেন অমলমামা। সব কথা বোঝে না রাহুল, চুপ করে বসে থাকে। একটু একটু করে ভাবনার আকাশে পাখা মেলে।

সেও ওই সূর্যের সাত ঘোড়ায় টানা রথের মতো এগিয়ে যাবে। এই বাড়ি, মাঠ, রাস্তা পার হয়ে আরও অনেক দূরে। কোথাও থামবে না। চলতে চলতে একদিন সেঠিক পৌঁছে যাবেই সূর্যের দেশে। তখনও সেথামবে না। এগিয়ে চলবে দূরে, আরও দূরে ওই তারার আলোর দেশে।

অধ্যায় ২২ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%