তুই কিছু পারিস না

চঞ্চলকুমার ঘোষ

পুজোর ছুটি শেষ। এবার পুজোয় ছ-খানা জামা পেয়েছে রাহুল। চার দিন ঠাকুর দেখেছে।

একদিন অমলবাবু এসেছিলেন তাদের বাড়ি। গোটা বাড়ি গমগম করছিল। কী হাসিখুশি আর মজার মানুষ। রাহুল ভাবে সবাই যদি এইরকম হত। সন্ধে বেলায় অমলমামা ফিরে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করে, অঙ্ক পরীক্ষার রেজাল্টB কবে বার হবে মামা?

পুজোর ছুটির পর। এখন ওসব নিয়ে ভাবিস না। পুজোর ছুটিতে ঠাকুর দ্যাখ আর আনন্দ কর। তারপরই নীচু গলায় বললেন, পুজোর পর সকালে দু-ঘণ্টা, সন্ধেবেলায় দু-ঘণ্টা করে পড়তে হবে। এটা অভ্যেস। ছাড়লে চলবে না।

মাথা নাড়ে রাহুল, আমি এখন আর পড়ায় ফাঁকি দিই না। যখন পড়া থাকে না তখন ছবি আঁকি, টিভি দেখি।

রাহুলের পিঠ চাপড়ে দেন অমলবাবু। এই তো তুই খুব ভালো ছেলে হয়ে গেছিস।

পুজোর ছুটি শেষ হয়। আবার স্কুল। সামনে পরীক্ষা। সবাই ক্লাস ফাইভে উঠবে। মাঝে মাঝে কেমন মনখারাপ লাগে রাহুলের। আবার তাদের নতুন কোনো স্কুলে যেতে হবে। সেখানে সরস্বতী, অরূপ, সৌভিকের মতো বন্ধু পাবে না। ববিতাদিদি, সন্ধ্যাদিদি, অর্পিতাদিদির মতো এত ভালো দিদি, আর অমলমামা, সেতো স্বর্গের মানুষ।

শনিবারের শেষ ক্লাস। বিজ্ঞান পড়াচ্ছিলেন অমলবাবু। পড়াতে পড়াতে পাশে রাখা কম্পিউটারে দেখাচ্ছিলেন নানান পাখির ছবি। একটা সবুজ পাখির ছবি আসতেই অরূপ বলল, স্যার ওটা কী পাখি?

টিয়া।

ওই টিয়া দেখেই কি এই স্কুলের নাম রেখেছিলেন সবুজ পাখি?

ঠিক বলেছ। একবার হিমালয়ে গিয়েছিলাম। যেতে যেতে একজায়গায় গাড়ি থেমেছে। হঠাৎ চোখে পড়ল রাস্তার উলটো দিকে একটা স্কুল। দশ-বারোটা ছেলে-মেয়ে একটা পাথরের চাতালে বসে পড়ছে। সামনে চেয়ারে বসে পড়াচ্ছেন একজন মাস্টার। চারদিকে খোলা। স্কুলের ছাদে এক ঝাঁক টিয়া বসে কিচিরমিচির করছে। ওদের সবুজ রং, চারপাশের সবুজ গাছ, মনে হল যদি কখনো কিছু করি, তার নাম দেব সবুজ পাখি। ওই সবুজ পাখির মতো ছোটোদের মনটাও সবুজ হয়ে আকাশে ভেসে বেড়াবে।

আর কিছু বলতে গিয়েই থেমে গেলেন অমলবাবু। পকেটে ফোন বাজছে। ফোনটা বার করলেন। গোটা ক্লাস নিস্তব্ধ। কথা বলতে বলতে হঠাৎ আকাশের দিকে হাত তুলে ছুড়ে দিলেন। তারপরই চিৎকার করে উঠলেন, দারুণ খবর! দারুণ খবর!

সবাই হইচই করে ওঠে, কী খবর স্যার?

বলছি, বলছি।

ক্লাসের বাইরে এসে বাচ্চাদের মতো চিৎকার শুরু করে দিলেন অমলবাবু।

এসো এসো সবাই। দারুণ খবর! দারুণ খবর!

সব ক্লাসের ছেলে-মেয়ে, দিদিমণি, বংশী, দারোয়ান সবাই ছুটে আসে।

কী খবর! কী খবর!

এক বার সবাইকে দেখে নিলেন অমলবাবু। তারপরই বলে উঠলেন, দারুণ খবর! অঙ্ক প্রতিযোগিতার খবর বেরিয়েছে।

এতক্ষণের হইচই, চিৎকার শান্ত হয়ে যায়। সবুজ পাখি স্কুল থেকে তিন জন পরীক্ষা দিয়েছিল। ববিতাদিদি জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের তিন জনের কী খবর?

অমলবাবু এক পলক সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলে উঠলেন, সারাবাংলায় প্রথম হয়েছে রাহুল।

একসঙ্গে সবাই চিৎকার করে ওঠে। চারদিক থেকে এসে জড়িয়ে ধরে রাহুলকে। ভিড়ের চাপে উলটে পড়ে সবাই।

ববিতাদিদি ছুটে আসেন, ওরে তোরা রাহুলকে ছেড়ে দে। চাপের চোটেই রাহুল শেষ হয়ে যাবে।

সন্ধ্যাদিদি দু-হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নেন রাহুলকে।

কে বলে তুই কিছু পারিস না। এই তো সবাইকে হারিয়ে দিলি।

মুখ তুলে তাকাল রাহুল। একমুখ হাসি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%