চঞ্চলকুমার ঘোষ

ঘুমোচ্ছিল রাহুল।
স্কুল থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিল। মায়ের ডাকে তাড়াতাড়ি উঠে বসল।
কী হয়েছে মা?
তোর মিস পড়াতে এসেছেন।
নবনীতা মিস সপ্তাহে চার দিন পড়ান। আগের স্কুলে গন্ডগোল, তারপর অমলমামার স্কুলে ভরতি। সব মিলিয়ে এক সপ্তাহ পড়াতে আসেননি নবনীতা। মিসের নাম শুনেই রাহুল বলল, কখন মিস এসেছেন?
একটু আগে?
তাড়াতাড়ি চোখে-মুখে জল দিয়ে পড়ার ঘরে আসে।
নবনীতা আগের বছর কলেজ থেকে পাস করেছে। রোগা চেহারা। বয়েসের তুলনায় একটু বেশি বয়স্ক লাগে।
রাহুল ঘরে ঢুকতেই নবনীতা বললেন, এ নিয়ে চারটে স্কুল হল।
রাহুল মাথা নীচু করে চেয়ারে এসে বসে। বুঝতে পারছিল মিস খুব রেগে রয়েছেন। কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারে না রাহুল।
এই নতুন স্কুল থেকে কবে তাড়িয়ে দিচ্ছে?
মিসের কথাগুলো ভালো লাগছিল না রাহুলের। বলল, অমলমামার স্কুল খুব ভালো। আগের স্কুলের মতন নয়।
আজ প্রথম দিন কী হল?
এবার একটু উৎসাহ পায় রাহুল। তাড়াতাড়ি বলল, এখানে দিদিরা অনেক গল্প বলল। অর্পিতাদিদি, অমলমামা ম্যাজিক জানে। দুপুরে পেট ঠাকুরের পুজো হল। তারপর আমি আর অরূপ বালি দিয়ে পাহাড়, বাড়ি তৈরি করলাম।
নবনীতা চোখ বড়ো বড়ো করে রাহুলের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
তোদের নতুন স্কুলে পড়াশোনা হয় না?
হয়। তার চেয়ে বেশি মজা হয়।
গোটা ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত লাগে নবনীতার। বললেন, তোর মাকে এক বার ডেকে দিবি?
রান্নাঘরে কাজ করছিলেন মণিদীপা। রাহুল ডাকতেই পড়ার ঘরে এলেন।
একটা কথা জিজ্ঞেস করব বউদি। রাহুলকে যে-স্কুলে ভরতি করেছেন, আপনি সেখানে গিয়েছেন?
একটু ইতস্তত করে মণিদীপা বললেন, ভরতির আগে এক দিন গিয়েছিলাম। আজ যাইনি।
একটু ইতস্তত করে নবনীতা বললেন, রাহুলের কাছে যা শুনলাম তাতে ওর নতুন স্কুল খুব ভালো লাগছে না?
মণিদীপা নিজেও যে মন থেকে চেয়েছিলেন রাহুল অমলবাবুর স্কুলে যাক, তা নয়। খানিকটা নিরুপায় হয়েই পাঠিয়েছেন।
কী করব নবনীতা। কোথাও তো ভরতি করতেই হবে। চুপচাপ ঘরে বসিয়ে তো রাখতে পারি না। রোজ গাড়ির তেল পুড়িয়ে এত দূর আসা-যাওয়া করা। তবে রাহুলের ভালো লেগেছে। দেখি এই একটা বছর যদি পড়াশোনায় মন বসে।
নবনীতা মন থেকে মণিদীপার কথা মানতে পারেন না। একটু জোরের সঙ্গেই বললেন, না বউদি, সময় পালটাচ্ছে। যুগ পালটাচ্ছে। এখন ওই শান্তিনিকেতন মার্কা স্কুলে পড়াশোনা করে কিছু হবে না। এখন সব জায়গায় কম্পিটিশন। আমার দু-জন ছাত্র নিউ-হরাইজেন স্কুলে এইটে পড়ে। আমি জানি কী টাফ পড়াশোনা। আজকের যুগে সব জায়গায় কম্পিটিশন। নব্বইয়ের নীচে নম্বর পেলে কোথাও কোনো চান্স নেই। ভালো স্কুলে পড়লেই শুধু রেজাল্টB ভালো হয় না, যুগের সঙ্গেও মানিয়ে নিয়ে এগিয়ে চলা যায়।
খারাপ লাগছিল মণিদীপার। বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। যে স্কুলে রাহুল ভরতি হয়েছে অনেকটা শান্তিনিকেতনের মতন।
এইসব স্কুল রবীন্দ্রনাথের যুগে ঠিক ছিল। একালে অচল। এখন সবাই চাইছে ভালো স্কুল, ভালো কেরিয়ার।
কেমন বিভ্রান্ত লাগে মণিদীপার। বড়োছেলেটা ভালো রেজাল্টB করে ভালো চাকরি পেয়ে যাবে। ছোটো ছেলেটার কিছু হবে না। কত কষ্ট করে ভালো স্কুলে ভরতি হল। সেখানেও পড়তে পারল না।
নবনীতা বললেন, একটা কথা বলব বউদি। আপনি একবার চেষ্টা করে দেখুন। নিউ-হরাইজেন স্কুলের সেক্রেটারি সত্যেনবাবু খুব ভালো লোক। এই পাড়াতেই থাকেন।
এ পাড়ায় থাকেন! কোথায়?
স্টেট ব্যাঙ্কের পাশে যে সাত-তলা ফ্লাটবাড়িটা আছে তার তিন-তলায়।
ঠিক আছে আমি দেখছি। বড়দার চেম্বার ওখানেই। হয়তো আলাপ থাকতে পারে।
এতক্ষণ চুপ করে মা আর মিসের কথা শুনছিল রাহুল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, মা অমলমামার স্কুল খুব ভালো।
নবনীতা রাহুলের দিকে ফিরে বললেন, তোমার পুরোনো স্কুল অনেক ভালো। ওখানে পড়াশোনা করলে তুমি অনেক বড়ো হতে পারবে।
কোনো কথা বলে না রাহুল। মিসের কথাগুলো কেমন আশ্চর্য লাগে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবে মা-বাবা, মেজোজেঠু, বড়োজেঠু সবাই তো একদিন ছোটো ছিল। এখন কত বড়ো হয়েছে। সবাই কি নিউ-হরাইজেন স্কুলে পড়েছে?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন