সাফাইয়ের দিন

চঞ্চলকুমার ঘোষ

গেট পেরিয়ে স্কুলে ঢুকতেই অবাক হল রাহুল। তাদের ক্লাসঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থ্রি আর ফোরের ছেলে-মেয়েরা। কেউ প্রতিদিনের পোশাক পরেনি। ঘরের জামাকাপড় পরেছে। সবচেয়ে মজা লাগছিল অরূপকে। লম্বা ঢোলা একটা গেঞ্জি পরেছে। গেঞ্জি হাঁটু ছাড়িয়ে নীচে নেমেছে। ভেতরে প্যান্ট পরেছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। সরস্বতীর দিকে চোখ পড়তেই হেসে ফেলল। পাজামা আর শার্ট পরেছে। বোঝা যাচ্ছে অনেক আগের। পাজামা হাঁটুর কাছে উঠেছে। একদিকে বালতি ঝাঁটা লাঠি সাজানো।

সঙ্গে সঙ্গে রাহুলের মনে পড়ল আগের দিন অর্পিতাদিদি বলেছিলেন, সবাই একটা করে পুরোনো জামাকাপড় নিয়ে আসবে। কাল সাফাইয়ের দিন। অফিসঘরের সামনে দাঁড়িয়ে অর্পিতাদিদি। রাহুলকে দেখেই বললেন, পুরোনো জামা-প্যান্ট নিয়ে এসেছ?

হ্যাঁ দিদি।

চটপট গিয়ে পালটে এসো।

ক্লাসঘরের টেবিলে ব্যাগ রেখে এক দৌড়ে বাথরুমে চলে গেল রাহুল। আজ স্কুল সাফাই করবে।

আগের দিন বাড়িতে সাফাই-এর কথা বলতেই দাদা আর বড়দির কী হাসি। এবার আর ঘরে কাজের লোক লাগবে না। রাহুলই সব পরিষ্কার করবে। লজ্জায় কিছু বলতে পারেনি রাহুল। শুধু মেজোমা তার হয়ে বলেছিল, আমরা যখন ছোটো ছিলাম সপ্তাহে এক দিন আমাদের স্কুল, গ্রাম পরিষ্কার করতে হত। মাস্টারমশাইরা সঙ্গে থাকতেন। পরিষ্কার যত হত, তার চেয়ে বেশি হইচই হত। খুব মজা লাগত।

জামাকাপড় পালটে বাথরুম থেকে আসতেই দেখল সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। অর্পিতাদিদি বললেন, আজ সাফাইয়ের দিন। আমাদের স্কুল বাগান এখানকার সব কিছু পরিষ্কার করব। তারপর যদি সময় হয় বাইরে গিয়ে একটা পাড়া পরিষ্কার করব। এখন থেকে যদি তোমরা সব কিছু পরিষ্কার করতে শেখো, বড়ো হলেও সেই অভ্যেস রয়ে যাবে। তোমাদের চারপাশে কখনো নোংরা হবে না।

কোন পাড়া পরিষ্কার করব দিদি? জিজ্ঞেস করল পল্টু।

আগে স্কুল পরিষ্কার হোক। তারপর ঠিক করা যাবে কোন পাড়ায় যাব।

সামনে থেকে বিকাশ বলল, আমাদের পাড়ার রাস্তা খুব নোংরা।

অর্পিতাদিদি বললেন, তোমরা পরিষ্কার করো না কেন?

মা বলে পাড়ার কেউ করে না, আমরা কেন করব।

অর্পিতাদিদি বিকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, এটা ঠিক কথা নয়। দ্যাখো কাউকে-না-কাউকে কাজ শুরু করতে হয়। তুমি যদি কাজ শুরু কর, দেখবে কত মানুষ তখন তোমার পাশে এগিয়ে এসেছে। তোমার বাড়ি কতদূর?

বেশিদূর নয়। বড়ো রাস্তার ওপর শিবমন্দির। তার পাশ দিয়ে একটুখানি গেলেই আমাদের বাড়ি।

একটু ভাবলেন অর্পিতা, ঠিক আছে আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলি, তারপর কোথায় যাব ঠিক হবে। এবার তোমরা সবাই চার জন করে দল হও। রাহুল সরস্বতী বিকাশ আর অরূপ চার জনে স্কুলঘর পরিষ্কার করবে। ঝ্যাঁটা ন্যাকড়া আর বালতি নিয়ে যাও।

সরস্বতীই এগিয়ে এসে সব কিছু নিয়ে সামনের ক্লাসে ঢুকে পড়ল। যেন সে-ই এই দলের নেতা। বাড়িতে কোনোদিন কিছু পরিষ্কার করেনি রাহুল। তার উৎসাহ খুব। একটা ঝাঁটা নিয়ে বলল, আমি কী করব?

সরস্বতী গম্ভীর গলায় বলল, আগে সব টেবিল-চেয়ার ঝাড়ব। তারপর জানলা-দরজা মুছব।

এমনিতেই পরিষ্কার ঘর। কোথাও কোনো নোংরা নেই। তবু জোর উদ্যমে কাজ শুরু হয়ে গেল। সবাই যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কে আগে কাজ শেষ করতে পারে। আড়চোখে সবাই সবাইকে দেখছিল আর হাসছিল। উৎসাহের চোটে ধাক্কা খেয়ে দু-বার উলটে পড়ল অরূপ আর বিকাশ।

বাকি দুটো দল বাগান পরিষ্কার করছে। গাছের তলায় কোথায় পাতা পড়ে আছে, কাগজ রয়েছে, সব তুলে একটা বড়ো ঝুড়িতে রাখছে। বংশী ঘুরে ঘুরে সব দেখছে। বেশি উৎসাহের চোটে কেউ যেন গাছই নষ্ট না করে দেয়।

অমলবাবু ঘুরে দেখেন। জানেন সব কিছুই পরিষ্কার। তবু একটা অভ্যেস, শিক্ষা, যা এইসব ছেলে-মেয়েদের জীবন গড়তে সাহায্য করবে। অথচ এমন সুন্দর শিক্ষা সব স্কুলে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একটা স্কুলে গিয়েছিলেন। হেডমাস্টার পরিচিত। স্কুলের বারান্দা, সিঁড়ি সব ধুলো ভরতি, ছেঁড়া কাগজ ছড়িয়ে আছে চারদিকে। ভীষণ অস্বস্তি লাগছিল। হেডমাস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন, স্কুলজুড়ে এত নোংরা কেন?

এতদিন যে-ঝাড়ুদার ছিল সেচলে গিয়েছে। নতুন লোক পাচ্ছি না।

আপনার স্কুলের ছেলে-মেয়েরাই তো স্কুল পরিষ্কার করতে পারে। নিজেদের স্কুল নিজেরা পরিষ্কার করবে। এতে স্কুলের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক আরও ভালো হবে। এটা স্বনির্ভরতার শিক্ষা।

হেডমাস্টারমশাই খানিকটা হতাশভাবে বললেন, সব বুঝি অমলবাবু। আমি গ্রামের স্কুলে পড়েছি। সপ্তাহে এক দিন করে গ্রাম পরিষ্কার করতাম। তাতে আমাদের কিছু ক্ষতি হয়নি, বরঞ্চ আমাদের শরীর-মন দুই ভালো হয়েছে। সব জেনেও আমরা অসহায়। নতুন সরকারি নিয়ম হয়েছে স্কুলের ছেলে-মেয়েদের দিয়ে কোনো কাজ করানো যাবে না। তাতে তাদের শরীর খারাপ হবে।

কোনো কথা বলতে পারেননি অমলবাবু। মনে হয়েছিল যে-শিক্ষা ব্যবস্থায় ছেলে-মেয়েদের স্বাবলম্বী হতে শেখায় না, তা কীসের শিক্ষা? নিজের স্কুলে তাই ছেলে-মেয়েদের মধ্যে নতুন অনেক ভাবনা নিয়ে এসেছেন। ঘুরতে ঘুরতে মূর্তি ঘরের সামনে এলেন। চারদিকে নতুন রেলিং দেওয়া হয়েছে। সেই রেলিং রং করা হচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলেন। নিজের হাতে দেখিয়ে দিলেন কী করে রং নিয়ে ব্রাশ টানতে হয়।

স্কুলঘরে এলেন। উৎসাহে রাহুল বলে ওঠে, মামা দ্যাখো আমরা সব পরিষ্কার করে দিয়েছি।

খুব ভালো। এবার থেকে শুধু স্কুল নয়, নিজের বাড়ি, চারপাশ সব পরিষ্কার রাখবে। কখনো কোথাও নোংরা করবে না।

অমলবাবু চলে যেতেই রাহুল বলল, আবার কবে স্কুল পরিষ্কার হবে?

সরস্বতী বলল, পনেরো দিন পরে। আগে আমি কিছু কাজ করতাম না। এখন ঘর পরিষ্কার করি। জামাকাপড় কাচি। মা না থাকলে খাওয়ার বাসন ধুই।

অবাক লাগে রাহুলের। এইসব কাজ তো বড়োরা করে। সরস্বতী কেন করে বুঝে উঠতে পারে না।

কেন তোর মা তোর জামা প্যান্ট কেচে দেয় না?

সরস্বতী একটু চুপ করে থাকে। তারপর বলল, মা রোজ সকালে কাজে যায়, ফিরতে রাত হয়ে যায়।

কোথায় কাজ করে তোর মা?

গেঞ্জির কারখানায়।

কেন তোর বাবা কাজ করেন না?

মাথা নাড়ে সরস্বতী। আমার বাবা নেই। আমি যখন ছোটো, বাবা মারা গিয়েছিল।

কেমন যেন কান্না পায় রাহুলের। তার বাবাকে ভীষণ ভয়। তবু বাবাকে ভালোবাসে। কষ্ট হয় সরস্বতীর জন্যে। এইটুকু মেয়েকে কত কাজ করতে হয়। এই স্কুলে ওর প্রথম বন্ধু।

অর্পিতাদিদি আসেন, তোমাদের কাজ হয়েছে?

হ্যাঁ দিদি। সব ঘর পরিষ্কার করে দিয়েছি।

তাহলে সবাই চলে এসো। নোংরা জামাকাপড় ছেড়ে ফেলবে।

চার জন বেরিয়ে আসে। স্কুলের পেছনে বাঁধানো চাতাল। বড়ো বালতিতে সাবান গোলা জল রয়েছে। সবাই পরিষ্কার হয়। স্কুলের ড্রেস পরে নোংরা জামাকাপড় নিজেরাই ধুয়ে নেয়। বংশী আর কাজের মাসি দড়িতে ঝুলিয়ে ক্লিপ এঁটে দেন। সব তদারক করেন অর্পিতাদিদি। বিকাশ বলে, দিদি আজ আমাদের পাড়ায় যাবেন না?

আজ অনেক দেরি হয়ে গেছে। সামনের সপ্তাহে যাব।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%