চঞ্চলকুমার ঘোষ

বড়োজেঠুর দরজার সামনে এসে উঁকি মারল রাহুল। কারও সঙ্গে কথা বলছেন জেঠু। পেছন থেকে তাঁর মুখটা দেখা যাছে না। জেঠু দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। রাহুলের দিকে চোখ পড়তেই বললেন, কী হল, ভেতরে আয়?
রাহুল জানে এবাড়ির সবাই বড়োজেঠুকে খুব ভয় পায়। জেঠু যা বলে কেউ তার ওপর কথা বলে না। গুটিগুটি পায়ে জেঠুর সামনে এসে দাঁড়াল। এবার সামনে চেয়ারে বসা মানুষটা মুখ ফেরালেন।
আরে রাহুলবাবু, কেমন আছ?
চিনতে পারে রাহুল। পুরোনো স্কুলে দেখেছিল, সত্যেনবাবু। তাড়াতাড়ি নীচু হয়ে প্রণাম করে বলে, ভালো আছি।
হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিলেন সত্যেনবাবু।
খুব ভালো ছেলে। এখন তো ছেলে-মেয়েরা প্রণাম করতেই ভুলে গিয়েছে?
ত্রিদিববাবু বললেন, আসলে আমরা সবাই সাহেব হয়ে গিয়েছি। বিদেশিদের খারাপ গুণগুলো নকল করি। ভালোগুলো নিই না।
আপনি ঠিকই বলেছেন ত্রিদিবদা। অন্যের কথা কী বলব। আমার স্কুলের কালচার যতটা ভারতীয় তার চেয়ে বেশি আমেরিকার। আমি দু-এক বার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু অভিভাবকরা চান না। দিমিমণিরাও চান না। বুঝলাম চেষ্টা করে লাভ নেই।
রাহুল চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। ত্রিদিববাবু তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। বললেন, মনে হচ্ছে কিছু দরকার। নয়তো এই সময়ে কেন জেঠুর কাছে আসা।
এতক্ষণে সাহস পায় রাহুল। খুব ভালো করে জানে জেঠু তাকে খুব ভালোবাসে। জেঠুর কাছে কিছু বললে, না বলে না জেঠু। একেবারে জেঠুর গায়ের কাছে এসে বলল, মা আমাকে যেতে দিচ্ছে না।
কোথায়?
অমলমামা বলেছে গঙ্গার ধারে গ্রাম দেখাতে নিয়ে যাবে। সবাই বাসে করে যাবে। বিকেল বেলায় ফিরবে।
খুব ভালো কথা। তা মা কী বলছে?
মা বলছে আমি দুষ্টুমি করব।
সত্যেনবাবু বললেন, তুমি কি এখন খুব দুষ্টুমি কর?
মাথা নেড়ে রাহুল বলে ওঠে, আমি এখন আর একদম দুষ্টুমি করি না।
তাহলে মা বারণ করছে কেন?
ত্রিদিববাবু বললেন, তুই মাকে বল বড়োজেঠু তোমাকে একটু ডাকছে।
আর দাঁড়াল না রাহুল। একছুটে নেমে এল। রান্নাঘরে কাজ করছে মা। জানে জেঠুর কাছে গিয়েছে শুনলেই রাগ করবে মা। দরজার সামনে এসে বলে উঠল, মা তোমাকে বড়োজেঠু এখনই ডাকছে।
মুখ ফেরালেন মণিদীপা। কিছু বুঝতে বাকি থাকে না।
তুই নিশ্চয়ই বড়োজেঠুর কাছে গিয়ে নালিশ করেছিস?
মুচকি হাসল রাহুল। তারপরই একছুটে সোজা মেজোজেঠুর ঘরে।
দোতলায় ত্রিদিববাবুর ঘর। মণিদীপা আসতেই সত্যেনবাবু বললেন, ছেলের পড়াশোনা কেমন হচ্ছে?
মণিদীপা বললেন, আগের চেয়ে ভালো। এখন নিজেই পড়তে বসে। পড়া করে। জানতে চায়।
খুব ভালো। আসলে কী জান, সব মানুষের ভেতরেই সম্ভাবনা থাকে, যিনি যোগ্য শিক্ষক তিনি সেই ভেতরের চাপাপড়া জিনিসটাকে বার করে নিয়ে আসতে পারেন।
মাথা নাড়েন মণিদীপা। হ্যাঁ দাদা, আপনি ঠিকই বলেছেন। অমলবাবুর স্কুলে গিয়ে রাহুলের অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
সত্যেনবাবু বললেন, আমি তোমাকে বলেছিলাম নিউ-হরাইজেন স্কুলে থাকলে ওর এই পরিবর্তন হত না। ভাবছি অমলবাবুর সঙ্গে একবার আলাপ করব। মানুষটাকে দেখবার লোভ হচ্ছে।
ত্রিদিববাবু বললেন, পার্থ বলছিল মানুষটা একেবারে অন্যরকম। অর্থের কোনো লোভ নেই। তিনি চাইছেন স্কুলের ছেলে-মেয়েদের সত্যিকারের মানুষ করতে।
সত্যেনবাবু একটু চুপ করে থেকে নিজের মনেই বললেন, আদর্শ শিক্ষক। আমার বাবা বলতেন একজন শিক্ষক ল্যাম্প-পোস্টের বাতির মতন। যিনি পথ দেখান। একজন ছাত্র খারাপ আচরণ করলে শুধু তার জীবনটা নষ্ট হয়, একজন শিক্ষক খারাপ হলে, অযোগ্য হলে, শত শত ছাত্রের জীবন নষ্ট হয়।
চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মণিদীপা। রান্নাঘরে অর্ধেক কাজ সেরে এসেছেন। বললেন, দাদা আমাকে ডেকেছেন?
ত্রিদিববাবু বললেন, হ্যাঁ, রাহুল বলছিল ওর স্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাবে।
হেসে ফেললেন মণিদীপা।
আসলে বাইরে গিয়ে কোথায় কী করে বসবে তখন সবাই বিব্রত হবে, তাই ওকে পাঠাতে চাইছি না।
সত্যেনবাবু বললেন, তুমি প্রথমেই কেন ভেবে নিচ্ছ ও বাইরে গেলে খারাপ কিছু করবে। সেখানে স্কুলের শিক্ষিকারা থাকবেন। তাঁরা দেখবেন। তা ছাড়া এই যে সকলে একসঙ্গে বেড়াতে যাবে, গ্রামের প্রকৃতিকে জানা চেনা এটাও একটা শিক্ষা। বইয়ের পড়ার থেকেও অনেক বড়ো শিক্ষা।
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন মণিদীপা।
ত্রিদিববাবু বললেন, ওকে যেতে বারণ কোরো না দীপা। দরকার মনে করলে অমলবাবুকে একবার ফোন করে বলে দিয়ো যেন ওর দিকে একটু নজর রাখেন।
সত্যেনবাবু বললেন, আমাদের স্কুল থেকে গতবছর ক্লাস ফাইভের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে গাদিয়াড়া গিয়েছিলাম। ওখানে রূপনারায়ণ নদী এসে মিশেছে গঙ্গায়। অল্প দূরে দামোদর। ভারি সুন্দর জায়গা। স্কুলের গাড়ি ছিল। বেশিরভাগ ছেলে-মেয়ে যে-যার মতো নিজের গাড়িতে চলে গেল। খাওয়াদাওয়া করল, আবার নিজের গাড়িতে ফিরে গেল। এতে ছেলে-মেয়েদের ঘোরা হল, কিছু শেখা হল না। জান বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর একটা গল্প পড়েছিলাম। তাতে তিনি লিখেছিলেন শুধু বইয়ের পড়া পড়লে মানুষ হবে না। বাইরের পৃথিবীকে দু-চোখ ভরে দেখতে হবে। তাতে চোখের দৃষ্টি ফুটবে। আর মানুষের দৃষ্টি যতই ফুটবে ততই সেঅমরত্বের সন্ধান পাবে। আর এই সন্ধানের মধ্যেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। আমি বলছি রাহুলকে পাঠাও। ওর ভালোই হবে।
মাথা নাড়েন মণিদীপা। ঠিক আছে দাদা।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন