প্রথম দিন

চঞ্চলকুমার ঘোষ

ক্লাসে ঢুকেই চারদিকটা এক পলক দেখে নিল রাহুল। অমলমামার স্কুলে আজ প্রথম দিন। সব কিছুই নতুন। আগের যে-তিনটে স্কুলে পড়েছে সবার চেয়ে এই স্কুলটা আলাদা। যদিও আগে এখানে এক বার এসেছে। সেদিন প্রায় কিছুই দেখা হয়নি। ঘরের চারদিকে জানলা। একদিকে বড়ো তাক। সেখানে বই-খাতা আর কী সব জিনিসপত্র রয়েছে। সামনের দেওয়ালে বড়ো ব্ল্যাকবোর্ড। দু-পাশে বড়ো দুটো ম্যাপ টাঙানো। একটা কাচের আলমারি, তাতে কত পুতুল। স্কুলে খেলার পুতুল! এরকম কখনো হয় জানাই ছিল না রাহুলের।

এতক্ষণ পর ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের দিকে তাকাল। দুটো মেয়ে, তিনটে ছেলে এসেছে। সকলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে। কোথায় বসবে কিছু ঠিক করবার আগেই রোগা চেহারার মেয়েটা বলল, তুমি নতুন এসেছ? কী নাম?

রাহুল।

আমার নাম সরস্বতী। তুমি কোথায় থাক?

কলকাতা।

সেতো অনেক দূর।

একটু হাসল রাহুল। দূর কোথায়, আমি তো জেঠুর গাড়িতে চলে এলাম। তুমি কোথায় থাক?

আমি মনসাতলার কাছে থাকি। তুমি বোসো। দাঁড়িয়ে আছ কেন?

মনে মনে ভেবে নিল রাহুল— মেয়েটা বেশ ভালো। ওর বন্ধু হবে। তার পাশের ডেস্কে গিয়ে বসল। রাহুল বসতেই চার জন ছেলে ঘরে ঢুকল। একজন মোটা, থপ থপ করে হাঁটছিল। তার দিকে চেয়ে হেসে ফেলল রাহুল।

ছেলেটা এক পলক রাহুলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, তুই হাসলি কেন?

রাহুল কিছু বলবার আগেই সরস্বতী বলল, তোকে দেখলে সবাই হাসবে।

মোটা ছেলেটা সরস্বতীর দিকে এগিয়ে আসতেই, পেছন থেকে কারও গলা পেল রাহুল। কী হচ্ছে?

তাড়াতাড়ি মুখ ফেরাল। দিদিমণি এসেছেন। অনেকটা সংগীতাদিদির মতন। সকলে উঠে দাঁড়াল। সরস্বতী ফিসফিস করে বলল, ববিতাদিদি।

দিদিমণি বসতেই সকলে বসে পড়ল।

তুমি রাহুল?

হ্যাঁ ম্যাম।

ববিতাদিদি বললেন, না, এখানে কেউ ম্যাম নয়। আমি তোমাদের সকলের দিদি। সবার সঙ্গে তোমার পরিচয় হয়েছে?

সরস্বতী বলল, আমার সঙ্গে হয়েছে।

সবার সঙ্গে পরিচয় করে নেবে রাহুল। এখানে সবাই তোমার বন্ধু। বন্ধুরা কেউ কখনো কারও সঙ্গে মারামারি করে না। সবাই একসঙ্গে থাকে। খেলা করে, আনন্দ করে। একজন আরেক জনকে সাহায্য করে। আমার কথা তোমাদের মনে থাকবে?

সকলে একসঙ্গে বলে উঠল, থাকবে।

আজ প্রথমে কী পড়া হবে?

পেছন থেকে রোগা চশমা-পরা সাত্যকি বলল, দিদি আজ পড়ব না, গল্প শুনব।

এক পলক গোটা ক্লাসের সবাইকে দেখে নিয়ে ববিতাদিদি বললেন, খুব ভালো কথা। তাহলে একটা গল্পই হোক।

ব্যাপারটা তো দারুণ। আগের স্কুলের ম্যামরা কোনোদিন গল্প বলত না। ক্লাসে ঢুকেই পড়া শুরু করে দিত। কিছু বললেই বলত পড়ার ক্লাসে পড়া ছাড়া আর কিছু নয়। না আগের চেয়ে এই স্কুলটা বেশ ভালো। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল রাহুল।

ববিতাদিদি গল্প শুরু করলেন। একটা ছোটো ছেলে, তার নাম কানু। কানু একদম পড়াশোনা করতে চাইত না। স্কুলে যাওয়ার কথা বললেই তার খুব কষ্ট হত। আন্টি বাড়িতে পড়াতে এলেই পেটব্যথা বলে শুয়ে পড়ত। সোম থেকে শনিবার তার কাছে ছিল ভয়ংকর কষ্টের দিন। প্রতিদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় ভাবত কাল দিনটা যদি সোমবার না হয়ে রবিবার হত তাহলে কী মজাই-না হত। রবিবার মানেই স্কুল ছুটি, আন্টির ছুটি। পড়াশোনা নেই। সারাদিন শুধু টিভি দেখা আর খেলা করা। একদিন রাতে স্বপ্ন দেখল— দূর এক পাহাড়ের ওপর এক বুড়ো দাদু বসে আছে। বড়ো বড়ো দাড়ি, কী সুন্দর দেখতে! একজনকে জিজ্ঞাসা করল কে ওই বুড়ো দাদু? সেবলল ওই তো রবিদাদু। কানু জিজ্ঞেস করল, রবিদাদু কী করে?

লোকটা বলল, রবিদাদু কিছু করে না। সেখানে সবসময় ছুটি।

লাফিয়ে উঠল কানু। তাহলে আমি রবিদাদুর কাছেই যাব। সেখানেই থাকব। আমাকে আর পড়াশোনা করতে হবে না।

পরদিন সকাল হতেই বেরিয়ে পড়ল কানু। খানিক দূর যেতেই চোখে পড়ল— বড়ো একটা মাঠের মধ্যে একজন লোক আপনমনে মাটি কাটছে। তার কপাল দিয়ে ঘাম ঝরছে। তবু কাজ করছে। কানুকে দেখেই বলল, তুমি কোথায় যাচ্ছ?

কানু বলল, আমি রবিদাদুর কাছে যাচ্ছি।

লোকটা বলল তুমি আমার কাছে একটু বোসো, তারপর যেয়ো।

কানু মাথা নেড়ে বলল, তুমি কে?

লোকটা বলল, আমি হচ্ছি সোমবার, তোমার সোমমামা।

কানু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, তোমাকে আমি পছন্দ করি না। আমাকে অনেক দূর যেতে হবে। তোমার কাছে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করব না। আবার এগিয়ে চলল কানু । এবার দেখা হল মঙ্গলবারের সঙ্গে। সেতখন ঘরের কাজ করছে। সেখানেও দাঁড়াল না কানু । এইরকম করে কানুর সঙ্গে দেখা হল বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনিবারের। তারা সকলেই কাজ করছিল। তাদের দিকে ফিরেও তাকাল না কানু । রবিবার ছাড়া কাউকে তার প্রয়োজন নেই।

হঠাৎ চুপ করে গেলেন ববিতাদিদি।

....তারপর কী হল দিদি? ....তারপর কী হল? চারদিক থেকে হইচই ওঠে।

ববিতাদিদি মাথা নেড়ে বললেন, আর মনে পড়ছে না।

সবাই মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, তাহলে কী হবে দিদি?

ববিতাদিদি বললেন, আমি একটু ভেবে নিই। ততক্ষণ, বোর্ডে চারটে অঙ্ক দিচ্ছি তোমরা চটপট করে ফ্যালো।

অঙ্কের কথা শুনলেই এতদিন কেমন রাগ হত রাহুলের, আজ আর রাগ হল না। তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে খাতা বার করে অঙ্ক শুরু করে দিল। গোটা ক্লাসের সবাই খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ে অঙ্ক শুরু করে দেয়। সবাই জানে অঙ্ক শেষ হলেই গল্প শুরু হবে। সবার আগে মোটা ছেলেটা অঙ্ক শেষ করে। সবার শেষে রাহুল। ববিতাদিদি সকলের আগে রাহুলের খাতা নিলেন। সব অঙ্কই ভুল। লজ্জা পায় রাহুল। মুখ নীচু করে বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।

রাহুলের পিঠ চাপড়ে ববিতাদিদি বললেন, ঠিক আছে, কোনো চিন্তা কোরো না। আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি। এক বার বুঝতে পারলে দেখবে আর ভুল হবে না।

ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক করেন দিদি। একটু করে অঙ্ক করেন আর বোঝান। এই প্রথম রাহুলের মনে হল অঙ্ক যত কঠিন মনে হত, ততটা কঠিন নয়।

সকলের অঙ্ক খাতা দেখা হতেই সরস্বতী বলল, দিদি কানুর কী হল?

ববিতাদিদি আবার তাঁর গল্প শুরু করলেন, কানু চলতে চলতে একসময় এসে পৌঁছোল সেই পাহাড়ের কাছে, যেখানে থাকেন রবিদাদু। কানুর কী আনন্দ! আর তাকে পড়াশোনা করতে হবে না। এবার রোজ শুধু রবিবারের ছুটি। সামনে যেতেই কোথা থেকে এক দারোয়ান এসে তার পথ আটকে দাঁড়াল। গম্ভীর গলায় বলল, কোথায় যাবে তুমি?

কানু বলল, রবিদাদুর কাছে।

দারোয়ান বলল, তুমি সোমবার থেকে শনিবার কী কী করেছ বলো।

মুখ কাঁচুমাচু করে কানু বলল, আমি কিছু করিনি।

দারোয়ান গম্ভীর গলায় বলল, তাহলে তুমি রবিদাদুর কাছে যেতে পারবে না। যারা সারাসপ্তাহ কাজ করে তারাই শুধু রবিবারের আনন্দ পায়। তুমি কাজ করো, পড়াশোনা করো, তবেই রবিদাদুর কাছে গিয়ে আনন্দ করতে পারবে।

কানু বলল, বেশ, এবার থেকে আমি রোজ পড়াশোনা করব। মন দিয়ে সব কাজ করব।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%