সরস্বতী

চঞ্চলকুমার ঘোষ

চার দিন হল স্কুলে আসছে না সরস্বতী। সন্ধ্যাদিদি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কেউ জান সরস্বতী কেন স্কুলে আসছে না?

কেউ কিছু বলতে পারে না। রাহুলের খারাপ লাগছিল। ক্লাসে সরস্বতী ওর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, দিদি আজ সরস্বতীর বাড়ি যাব?

মাথা নাড়লেন সন্ধ্যাদিদি। নিশ্চয়ই যাব। তোমাদের এক জন বন্ধু কেন স্কুলে আসছে না, জানা দরকার। মনে রাখবে একজন ভালো বন্ধু সবসময়ে অন্য বন্ধুদের পাশে থাকে। তাকে প্রয়োজনে সাহায্য করে। তোমাদের মধ্যে কেউ সরস্বতীর বাড়ি চেন?

পেছন থেকে সৌভিক বলল, আমি ওর বাড়ি চিনি না, তবে ও কোথায় থাকে জানি। মনসাতলা পার হয়ে যে খেলার মাঠটা আছে সেই মাঠের পেছনে।

ঠিক আছে আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলছি। টিফিনবেলায় যাব।

রাহুল তাড়াতাড়ি বলল, আমিও যাব।

সন্ধ্যাদিদি, রাহুল, অরূপ আর সৌভিক। সৌভিক রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। স্কুল থেকে বেশ কিছুটা দূর। মনসাতলা পেরিয়ে আসতেই চোখে পড়ল একটা বস্তি, দু-ধারে নীচু নীচু ঘর। মাঝখানে সরু রাস্তা। কেমন নোংরা অন্ধকার ভাব। ছোটো ছোটো বারান্দায় মেয়েরা বসে গল্প করছে। কীরকম পচা গন্ধ আসছিল। অস্বস্তি লাগছিল রাহুলের। কোনোদিন সেএইরকম জায়গায় আসেনি। বুঝতে পারছিল এখানে যারা থাকে সকলেই খুব গরিব। ঘর থেকে সবাই তাদের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল।

কোন ঘরটা সরস্বতীর? একটা মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন সন্ধ্যাদিদি।

মেয়েটা বলল, সরস্বতীর শরীর খারাপ। ওর খুব জ্বর। কমছিল না, তাই পরশু হাসপাতালে ভরতি করেছে।

সরস্বতী হাসপাতালে ভরতি, আমরা তো কিছু জানি না। ও এখন কেমন আছে?

ভালো। ওকে ছেড়ে দিয়েছে। ওর মা হাসপাতালে গিয়েছে নিয়ে আসতে। কাল এলে ওর সঙ্গে দেখা হবে।

একটু ভাবলেন সন্ধ্যাদিদি। বললেন, ঠিক আছে আমরা কাল আবার আসব। সরস্বতী এলে বলবেন আমরা স্কুল থেকে ওর খোঁজ নিতে এসেছিলাম।

সবাই স্কুলে ফিরে আসে। অমলবাবু বললেন, কাল তোমরা যখন যাবে সবাই কিছু উপহার নিয়ে যাবে। বাড়িতে মা-বাবাকে বলবে তাঁরা কিনে দেবেন।

রাহুল ভেবে পায় না কী দেবে। বাড়ি ফিরে মাকে বলতেই মণিদীপা বললেন, তোকে কিছু চিন্তা করতে হবে না। আমি বাজার থেকে নিয়ে আসব।

হরলিকস আর সুন্দর একটা পুতুল নিয়ে আসেন মা।

স্কুলে আসতেই অরূপ বলল, তুই কী নিয়ে এসেছিস?

নিজের জিনিস দেখায় রাহুল। অরূপ একটা ছবির বই নিয়ে এসেছে। সৌভিক খেজুর আর আপেল নিয়ে এসেছে। টিফিনের পেট ঠাকুরের পুজো হতেই অমলবাবুও বললেন, চলো সবাই। সরস্বতীকে দেখে আসি।

আগের দিন যারা গিয়েছিল তারাই সকলে যায়। সন্ধ্যাদিদির হাতে একটা প্যাকেট।

আগের দিনের সেই বস্তি-ঘর। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সন্ধ্যাদিদি দরজার বাইরে থেকে ডাকলেন, সরস্বতী।

দু-বার ডাকতেই ভেতর থেকে রোগা চেহারার এক জন বউ বেরিয়ে আসেন। রাহুল চিনতে পারে সরস্বতীর মা। একদিন স্কুলে দেখেছিল। স্কুলের সবাইকে দেখেই বলল, আসুন আসুন। সরস্বতী সকাল থেকে আপনাদের কথা বলছে।

খুব ছোটো একখানা ঘর। একটা খাট পাতা আর কয়েক হাত খালি জায়গা। সবাই গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়ায়। বিছানায় শুয়ে সরস্বতী। অমলবাবু বললেন, আমরা তোমাকে দেখতে এসেছি।

সরস্বতীর চোখের কোনায় জল টলটল করে। হয়তো ভাবেনি এত জন তাকে দেখতে আসবে। অমলবাবু বললেন, তোমরা যা এনেছ দাও।

হাত বাড়িয়ে সব কিছু নেয় সরস্বতী। রাহুলের কাছ থেকে পুতুলটা নিয়ে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। অরূপ বইটা দিয়ে বলল, তুই কবে স্কুল যাবি?

ডাক্তার বলেছে দু-তিন দিন পরেই আমি স্কুল যেতে পারব।

সন্ধ্যাদিদি বললেন, ততদিন তুমি ঘরে শুয়ে শুয়ে পড়াশোনা কোরো। আর স্কুলে গেলে এই ক-দিন যা পড়া হয়েছে কারও কাছে জেনে নেবে। আর যেটা বুঝতে পারবে না বুঝিয়ে দেব।

সরস্বতীর হঠাৎ কিছু মনে পড়তেই বলল, দিদি আমাদের খাতা বার হয়েছে?

অমলবাবু বললেন, ক্লাস ফোরের শুধু অঙ্ক খাতা বার হয়েছে। অরূপ আর তুমি এক-শোয় এক-শো পেয়েছ।

রাহুল কত পেয়েছিস?

ফিক করে হেসে ফেলল রাহুল, আমি নব্বই পেয়েছি।

ভালোই তো পেয়েছিস। তাহলে সেদিন কাyদছিলি কেন?

লজ্জা পায় রাহুল। মুখ নীচু করে বলে, এবার আমিও অঙ্কে এক-শো পাব।

অমলবাবু তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, নিশ্চয় পারবে। মানুষ চেষ্টা করলে সব পারে। ভালো কথা, এবার সারাবাংলায় অঙ্ক প্রতিযোগিতা হচ্ছে। কাল আমার কাছে চিঠি এসেছে। শুধু ক্লাস ফোরের ছেলে-মেয়েরা এতে অংশ নিতে পারবে। তোমরা কেউ নাম দিতে চাও?

সন্ধ্যাদিদি বললেন, সরস্বতী আর অরূপ অঙ্কে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছ। তোমরা নাম দিতে পারো।

কোথায় অঙ্ক প্রতিযোগিতা হবে দিদি? জিজ্ঞেস করল সরস্বতী।

অমলবাবু বললেন, কলকাতাতেই প্রতিযোগিতা হবে। প্রথম দশ জন পুরস্কার পাবে।

সরস্বতী বলল, আমি নাম দেব। রাহুল তুই নাম দিবি?

রাহুল একটু ইতস্তত করে, আমি ভালো অঙ্ক পারি না।

সন্ধ্যাদিদি বললেন, তুমি আগে অঙ্ক পারতে না। এখন পারো। দু-মাস পর প্রতিযোগিতা। ততদিনে তুমি আরও ভালো অঙ্ক শিখে যাবে।

কিছু ভাবল রাহুল। তারপর বলল, আমি নাম দেব।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%