চঞ্চলকুমার ঘোষ

অঙ্কের পর ইংরেজি ক্লাস। ববিতাদিদি চলে যেতেই মোটাসোটা চেহারার এক জন দিদিমণি ক্লাসে ঢুকলেন— সন্ধ্যাদিদি। অনেকটা মেজোমায়ের মতন, তবে একটু লম্বা। মেজোমা পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি।একদিন ফিতে দিয়ে মেপেছিল। এই দিদি ছয় থেকে সাত ইঞ্চি হবে। ফিসফিস করে সরস্বতীকে জিজ্ঞেস করল, এই দিদি কী পড়াবে?
ইংরেজি।
মুখ বেঁকাল রাহুল। আস্তে আস্তে বলল, আমার একদম ইংরেজি পড়তে ভালো লাগে না।
রাহুলের কথা শুনতে পেয়েছিলেন দিদি। বললেন, ছোটোবেলায় আমারও ইংরেজি পড়তে ভালো লাগত না, কী ভীষণ কঠিন লাগত। একদিন বাবার এক বন্ধু এল, সেই আঙ্কেল দারুণ একটা ম্যাজিক শিখিয়ে দিল। আর তারপরই ইংরেজি জলের মতন সোজা হয়ে গেল।
অবাক কান্ড! অমলমামা বলল অঙ্কের ম্যাজিক জানেন। এই দিদি বলছে ইংরেজির ম্যাজিক জানেন। এটা কি হ্যারি-পটারের ম্যাজিকের স্কুল। তাড়াতাড়ি রাহুল বলল, দিদি আমাকে ম্যাজিক শিখিয়ে দেবেন?
নিশ্চয়ই দেব। তার আগে যে, কয়েকটা জিনিস শিখতে হবে। সেটা না শিখলে ম্যাজিক শিখতে পারবে না।
সবাই একসঙ্গে হাত তোলে। আমরা শিখব দিদি।
সন্ধ্যাদিদি ইংরেজি পড়ান আর মজার মজার কথা বলেন। তার মাঝে মাঝেই সবাইকে পড়া জিজ্ঞেস করেন। না পারলে সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করেন। ক্লাসেই সব পড়া শেখা হয়ে যায়।
ঢং ঢং ঢং। ক্লাস শেষ। সবাই হইহই করে উঠে দাঁড়াল।
এখন কী হবে? জিজ্ঞেস করল রাহুল।
মোটা ছেলেটা, যার নাম অরূপ, সেবলল, এখন পেট ঠাকুরের পুজো হবে।
পেট ঠাকুরের পুজো! সেআবার কী?
হো-হো করে হেসে উঠল অরূপ। চলো গেলেই দেখতে পাবে।
বড়োবাড়ির একতলার ঘরে জড়ো হয়েছে সবাই। রাহুল বুঝতে পারছিল গোটা স্কুলটাই অমলমামার। তবু তাকে আলাদা করে কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। সবাই একসঙ্গে লাইনে গিয়ে দাঁড়াল। বংশীদাদা আর অঙ্কের ববিতাদিদি দাঁড়িয়ে। একদিকে মামাকে দেখতে পেল রাহুল। হাতে একটা বড়ো প্যাকেট। সবাই লাইন করে দাঁড়াতেই অমলমামা হাতের প্যাকেটটা তুলে বললেন, বলো তো এতে কী আছে?
সবাই এদিক-ওদিক তাকায়। কেউ বলতে পারে না। একজন পেছন থেকে বলল, কেক।
অমলবাবু মাথা নাড়লেন, হল না।
তাহলে লাড্ডু, আরেক জন বলল।
এবারও মাথা নাড়লেন অমলবাবু। এবার ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বার করলেন। সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে, খেজুর।
খেজুর কোথায় পাওয়া যায়?
সবাই চুপ। কারও মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ রাহুলের মনে পড়ল আগের বছর যখন রাজস্থানে গিয়েছিল বাবা বলেছিল রাজস্থানে অনেক খেজুর হয়। সঙ্গে সঙ্গে বলল, রাজস্থান।
ববিতাদিদি বললেন, একদম ঠিক। সবাই হাততালি দাও রাহুলের জন্যে।
গোটা ঘরের সকলে হাততালি দেয়। ভালো লাগছিল রাহুলের। এই প্রথম কেউ তার জন্যে হাততালি দিল। বাড়ি গিয়েই মাকে বলতে হবে।
ববিতাদিদি বললেন, এবার সকলে হাত ধুয়ে এসো। পেট ঠাকুরের পুজো হবে।
পেট ঠাকুরের পুজো কী?
সামনে এগিয়ে আসেন অমলবাবু। বললেন, আমাদের এই শরীরটা হচ্ছে মন্দিরের মতন। এই শরীর দিয়ে আমরা সব কাজ করি। কাজ করতে গেলে কী দরকার?
সবাই চুপ করে থাকে। অমলবাবু নিজেই উত্তর দেন, শক্তি। এই শক্তি পাই খাবার থেকে। আমরা যা খাই সব খাবার পেটে যায়। পেট কী করে। সেই খাবার হজম করে আমাদের সারাশরীরে শক্তি ছড়িয়ে দেয়। তাহলে বুঝতে পারছ পেট কত দরকারি। মন্দিরের মধ্যে যেমন ঠাকুর থাকে, শরীরের মধ্যে পেট। আমরা যেমন হাত ধুয়ে, পরিষ্কার হয়ে, ভক্তি করে পুজো করি, নাহলে ঠাকুর রাগ করবে। পেটও তাই। তাকে যদি ঠিকমতো খাবার না দাও, সেরাগ করবে। আর কাজ করবে না।
সবাই হাত ধুয়ে সার দিয়ে দাঁড়াল। সবার হাতে একটা করে প্যাকেট দেন ববিতাদিদি। প্যাকেট খুলতেই খুশি রাহুল। তার পছন্দের খাবার, কেক ডিম কলা আর খেজুর। খাওয়ার পর এখন আর পড়া নেই। ছেলে-মেয়েরা যে-যার খুশিমতো হাসি-গল্প-মজা করবে।
সরস্বতী বলল, আজ রাহুল বলবে।
উঠে দাঁড়াল রাহুল। আরও দু-জন দিদি এসে গিয়েছেন। এত লোকের সামনে কী বলবে ভেবে পেল না রাহুল। কোনোদিন কিছু বলেনি। খারাপ বলে আগের সব স্কুলে কেউ তাকে কখনো কিছু করতে দিত না। আস্তে আস্তে বলল, আমি কী বলব?
তুমি যা পারো। কবিতা, গান।
একটু ভাবল রাহুল। কী বলবে সে। হঠাৎ মনে পড়ল মেজোজেঠু খুব সুন্দর সুন্দর গল্প বলে। সব গল্প মনে আছে। বলল, আমি গল্প জানি।
ববিতাদিদি বললেন, ঠিক আছে তুমি গল্পই বলো।
আস্তে আস্তে গল্প শুরু করল রাহুল। ঠিক মেজোজেঠুর মতো করে বলতে থাকে। এক রাজার সব সময় মাথায় যন্ত্রণা করত। দেশ বিদেশ থেকে কত ডাক্তার আসে। কেউ বলে রাজার মাথার মধ্যে বড়ো বড়ো পোকা হয়েছে। সেই পোকা না মারলে যন্ত্রণা কমবে না। আমি ওষুধ দিচ্ছি। এই ওষুধ খেলেই পোকা মরে যাবে। আবার কেউ বলে সকালে বিকেলে নিমপাতার রস খেতে হবে। কেউ আবার বলে সূর্যের দিকে মুখ করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। যে ডাক্তার যা বলে তাই করেন রাজা। শেষে এক সাধু এসে রাজাকে পরীক্ষা করে বললেন চোখের অসুখের জন্যে আপনার মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে। চারদিকে কত রং, লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কালো। আপনার চোখ সেই রং সহ্য করতে পারছে না।
মহা ভাবনায় পড়ে গেলেন রাজা। বললেন, তাহলে কি আমি সব সময় চোখ বন্ধ করে থাকব?
সাধু বললেন, না না মহারাজ আপনি চোখ খুলেই রাখবেন। সবুজ রং দেখলে আপনার কোনো কষ্ট হবে না। সব সময় সবুজ রং দেখবেন। তাহলে আপনার মাথার যন্ত্রণা হবে না। রাজা বললেন, তাই হবে সাধুবাবা। রাজা তখনই মন্ত্রীকে ডেকে বললেন আমার এই প্রাসাদ, প্রাসাদের মধ্যে ঘর, ঘরের মধ্যে সব কিছু সবুজ রং করে দাও।
যেমন কথা তেমনি কাজ। এমনকী লোকজনের পোশাকও সবুজ হয়ে গেল। রাজার চোখের যন্ত্রণাও কমে গেল। কয়েকদিন পর রাজার খোঁজ নিতে আবার এলেন সাধু। প্রাসাদের সামনে আসতেই একজন রাজার লোক সাধুর গায়ে সবুজ রং ঢেলে দিল। সাধু বললেন, তুমি এ কী করলে? লোকটা বলল, আপনি মহারাজকে বলেছিলেন সব সবুজ রং দেখতে। আপনি সাদা কাপড় পরে আছেন তাই সবুজ করে দিলাম। সাধু তখন মহারাজের কাছে গিয়ে বললেন, তুমি কী বোকা। আকাশ মাটি গাছপালা বাইরের মানুষজন কত রং তাদের। তুমি কি তাদের সব কিছুকে সবুজ করে দিতে পারবে? রাজা তখন মাথা নেড়ে বললেন, তা তো পারব না। তাহলে কী হবে?
সাধু বললেন, বাইরের পৃথিবীর সব রং যখন পালটাতে পারবে না তখন নিজেকে পালটাও। তুমি একটা সবুজ চশমা বানাও। সেই চশমা চোখে পরলে তোমার চারপাশের সব কিছুকে সবুজ দেখবে। তখন আর কোনো কিছু সবুজ রং করতে হবে না।
সবাই চুপ। কেমন অবাক লাগছিল। সেএইরকম গল্প বলতে পারে নিজেই জানত না। গল্প শেষ হতেই জোরে হাততালি দিয়ে ওঠে সবাই। সবচেয়ে খুশি সরস্বতী। তুমি খুব সুন্দর বলেছ।
লজ্জা পায় রাহুল। মুখ নীচু করে বলল, আমি আরও গল্প জানি।
ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে। সবাই যে-যার ক্লাসে চলে যায়। এবার বিজ্ঞানের ক্লাস। অমলবাবু বড়ো একটা বাক্স নিয়ে ক্লাসে ঢুকলেন। সবাই উৎসুক হয়ে থাকে। এটাও কি ম্যাজিকের বাক্স! বিড়বিড় করে রাহুল। ততক্ষণে অমলবাবু বাক্স থেকে টেবিলের ওপর একটা একটা করে জিনিস বার করতে আরম্ভ করেছেন। মানুষের মাথার খুলি, হাড়, কতগুলো ছবি, আরও কত কী। সবাই উঠে এসে চেয়ারে বসে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে মামা একটা একটা করে জিনিস তোলেন আর বোঝান। তারপর বলেন, এবার তোমরা বলো।
এক-এক জন করে কে কী বুঝল বলে। ভুল হলে শুধু অমলবাবু ঠিক করে দেন।
পরের পিরিয়ড ছবি আঁকার। সবাই ক্লাস ঘর থেকে হই হই করে বেরিয়ে আসে। প্রায় সকলের হাতেই রং-তুলি-কাগজ। কেউ গাছের তলায়, কেউ পাঁচিলের পাশে, কেউ স্কুলের বারান্দায়। একদিকে লম্বা টিনের শেড, বাঁধানো চাতাল। সেখানে ছোটো-বড়ো মূর্তি সাজানো। অরূপ রাহুলের হাত ধরে সেখানে নিয়ে আসে।
তুই ছবি আঁকবি? জিজ্ঞেস করল রাহুল।
মাথা নাড়ল অরূপ। আমার ছবি আঁকতে ভালো লাগে না। এখানে অনেক বালি আছে। বালি দিয়ে ঘর বানাব। পুরীতে দেখেছিলাম। সমুদ্রের ধারে একটা লোক বালি দিয়ে কত কিছু তৈরি করছিল। কী সুন্দর!
ঘর তৈরির সময় বেশ কিছুটা বালি বেঁচে গিয়েছিল। একপাশে ইটচাপা ছিল। অরূপ ইট সরায়। রাহুল একটু ইতস্তত করে, যদি কেউ বকে।
কেন বকবে? আমরা তো মূর্তি তৈরি করছি।
আগের স্কুলে গাছে জল দিতে গিয়ে জামায় কাদা লেগেছিল। ম্যাম খুব বকেছিল। ফোন করে মাকে বলে দিয়েছিল।
অরূপ বলল, যদি বকে আর কোনোদিন করব না।
প্রবল উৎসাহে দু-জন বালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দু-হাতে বালি সরিয়ে সমান করে ঘর তৈরি করতে আরম্ভ করল। অরূপ বলল, এটা আমার ঘর। তুই আরেকটা ঘর তৈরি কর।
রাহুল দেখছিল অরূপ কেমন করে ঘর তৈরি করে। তার পছন্দ হল না। বলল, আমি পাহাড় তৈরি করব।
পাহাড় আর ঘর। একবার তৈরি হয় তারপরই ভাঙা হয়। কারোই পছন্দ হয় না।
কী হচ্ছে?
তাড়াতাড়ি মুখ ফেরাল দু-জন। অমলবাবু কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়ালই করেনি। রাহুল কিছু বলবার আগেই অরূপ বলল, বালি দিয়ে ঘর তৈরি করছি। পুরীতে দেখেছি।
রাহুল বলল, আমি পাহাড় তৈরি করছি।
এক পলক দেখে নিয়ে অমলবাবু বললেন, ঠিক আছে বাড়ি আর পাহাড় তৈরি হয়ে গেলে আগে যেমন করে বালি রাখা ছিল তেমনি করে রাখবে।
আর দাঁড়ালেন না অমলবাবু। অফিসঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।
দারুণ! নিজের মনেই বলল রাহুল। আগে কেউ কোনোদিন তাদের এত স্বাধীনতা দেয়নি।
খানিক পরে ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে। তাড়াতাড়ি ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল দু-জন। অরূপ এক দৌড়ে গিয়ে একটা ঝাঁটা নিয়ে আসে। চটপট ঝাঁট দিয়ে বালি গুছিয়ে রেখে ইট চাপা দিয়ে ছুটতে আরম্ভ করল।
ক্লাস আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। অর্পিতাদিদি ক্লাস নিচ্ছিলেন। অল্পবয়েসি সুন্দর চেহারা। বললেন, তোমরা কোথায় ছিলে?
রাহুল কিছু বলবার আগেই অরূপ বলল, বালি দিয়ে ঘর বানাচ্ছিলাম।
অনেকক্ষণ ঘণ্টা পড়ে গিয়েছে। এতক্ষণ কী করছিলে?
সব পরিষ্কার করে গুছিয়ে রেখে এলাম।
ঠিক আছে বোসো। তুমি নতুন এসেছ রাহুল। আমি ভূগোল পড়াই। সারাসপ্তাহে যা পড়াব শনিবার তার পরীক্ষা নেব। যে সবচেয়ে ভালো করবে, সেহবে ক্লাসের মনিটর।
পেছন থেকে ছোটো চেহারার কান খাড়া চুলের সৌভিক বলে উঠল, আমি মনিটর হব।
অর্পিতা বললেন, তুমি হতেই পারো। তার জন্যে তোমাকে আরও বেশি পড়াশোনা করতে হবে। রাহুল তোমার ভূগোল কেমন লাগে?
একটু ইতস্তত করে রাহুল। আমার ভূগোল পড়তে ভালো লাগে না।
অর্পিতাদিদি চেয়ার থেকে উঠে আসেন রাহুলের কাছে। তার মুখোমুখি বসে বললেন, তাহলে তুমি বলছ ভূগোল পড়তে তোমার ভালো লাগে না।
মাথা নীচু করে রাহুল বলে, একদম না ।
কেন ভালো লাগে না?
আমার আগের স্কুলের ম্যাম বলতেন, ভুগোলে সব মুখস্থ করতে হবে।
তুমি মুখস্থ করতে?
করতাম। আবার ভুলে যেতাম।
অর্পিতাদিদি আস্তে আস্তে বললেন, তোমার আগের স্কুলে তোমার সঙ্গে যারা পড়ত তাদের সবার নাম জান?
একটু ভাবল রাহুল, তারপর বলল, ফার্স্ট বেঞ্চে বিকাশ আর পিনাকী। তাদের ডান দিকে মধুশ্রী আর সোমা। পরের বেঞ্চে শৌনক আর দেবজয়, ওপাশে সীমা আর মহুয়া। তার পরের বেঞ্চে বনি, পলাশ আর সোমনাথ। তার পাশে দোলা আর পিয়াসা।
হাসিমুখে অর্পিতাদিদি বললেন, এই তো পুরোনো ক্লাসের অনেক নাম তোমার মনে আছে। তুমি কি এদের সবার নাম মুখস্থ করে রেখেছিলে?
তাড়াতাড়ি রাহুল বলল, মুখস্থ করব কেন। ওদের রোজ দেখি, ওদের নাম শুনি, তাতেই মুখস্থ হয়ে গিয়েছে।
অর্পিতাদিদি টেবিলের ওপর আলতো করে চাপড় দিলেন। তুমি রোজ ওদের দেখতে দেখতে চিনে গিয়েছিলে। সব নাম আপনা থেকেই মুখস্থ হয়ে গেল। বই পড়াও তাই। রোজ তুমি পড়বে, দেখবে। আর যেগুলো মনে রাখতেই হবে, কাগজে বড়ো বড়ো করে লিখে দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখবে। যখন তুমি ঘুরবে-ফিরবে, ক্লাসের বন্ধুদের মতো ওদের দিকে তাকাবে আর দেখতে দেখতেই চেনা হয়ে যাবে— তখন আর ভুলবে না। এর সঙ্গে আর একটা ম্যাজিকও আছে।
আপনারও ম্যাজিক? হেসে ফেলল রাহুল।
আমার ম্যাজিকটাও তোমাকে শিখিয়ে দেব। তবে দু-সপ্তাহ মনিটর হতে হবে। ঠিক আছে এবার পড়ার কথা হোক। আজ তোমাদের পরিবেশ দূষণের কথা পড়াব। পরিবেশ কাকে বলে জান? আমাদের চারপাশের জল, হাওয়া, মাটি, জীব, মানুষজন সবাইকে নিয়ে আমাদের পরিবেশ। এই পরিবেশের মধ্যেই আমাদের বাঁচতে হয়।
আবার পরিবেশ। হঠাৎ কেমন আনমনা হয়ে যায় রাহুল। পরিবেশের কথা আগের স্কুলের ম্যামও বলত। ভালো লাগত না। পাশেই খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। একটা জবা ফুলের গাছ। দুটো ফুল ফুটে আছে। হাওয়ায় দুলছে। পাতার ফাঁকে একটা পাখি। বইতে এইরকম একটা পাখির ছবি দেখেছিল। ভালো করে দেখবার জন্যে মাটি ঘেঁষে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। এবার ভালো করে পাখিটাকে দেখতে পেল। মাথায় লালঝুঁটি। একমনে পাখিটাকে দেখছে, হঠাৎ কেউ তার পিঠের ওপর হাত রাখল। তাড়াতাড়ি মুখ ফেরাতেই চমকে উঠল। অর্পিতাদিদি কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়ালই করেনি। ভয়ে ভয়ে বলল, আমি আর দেখব না দিদি।
কী দেখছিলে তুমি?
পাখি। জবা গাছে বসে ছিল।
আমি পড়াচ্ছিলাম, তুমি পড়া না শুনে বাইরে পাখি দেখছিলে কেন? আমার পড়ানো কি তোমার ভালো লাগছিল না?
চুপ করে থাকে রাহুল। কী বলবে ভেবে পায় না। এবার যদি মাকে ফোন করেন দিদি।
আবার জিজ্ঞেস করলেন অর্পিতাদিদি, কোনো ভয় নেই। পড়া শুনতে কি ভালো লাগছিল না?
এবার একটু সাহস পায় রাহুল। মুখ তুলে বলল, পরিবেশ পড়তে ভালো লাগে না। কিছু বুঝতে পারি না।
সঙ্গে সঙ্গে অর্পিতা বললেন, খুব ভালো কথা। রাহুলের পরিবেশ পড়তে ভালো লাগে না, আমরা পড়ব না। রাহুলের পাখি দেখতে ভালো লাগে, আমরা পাখির কথা বলব।
অবাক লাগে রাহুলের। কী ভালো দিদিমণি। এমন যদি আগের স্কুলের সব ম্যামরা হত। নিজের জায়গায় এসে বসে।
পাখির গল্প শুরু করলেন অর্পিতাদিদি। মস্তবড়ো একটা বন। সেই বনে থাকত হাজার হাজার পাখি। একদিন একটা পাখি উড়তে উড়তে রাতের অন্ধকারে পথ ভুল করে এসে পড়ল এক শহরে। আগে কোনোদিন সেশহরে আসেনি। একটা বাড়ির বারান্দায় চুপ করে বসে রইল। সকাল হতেই পাখির মনে হল তার বুকের মধ্যে কেমন কষ্ট হচ্ছে। এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখতে পেল একটা ছোটো ছেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। তার চোখে-মুখেও কেমন কষ্ট কষ্ট ভাব। আমার মতো ওরও কষ্ট হচ্ছে। ভাবল পাখিটা। সামনে এসে বলল, কীসের কষ্ট হচ্ছে বলোতো। ছেলেটা হাত তুলে সামনের দিকে দেখাল। একটা উঁচু চিমনি। তার থেকে গলগল করে কালো ধোঁয়া বার হচ্ছে। ছেলেটা বলল, এই ধোঁয়া খুব খারাপ তাই আমাদের এত কষ্ট। পাখি বলল, তাহলে ধোঁয়া কেন বন্ধ হয় না? ছেলেটা বলল, ধোঁয়া বন্ধ হলে কারখানার কাজ হবে না। কাজ না হলে লোকে খাবার পাবে না। পাখি বলল, তাহলে তোমাদের সবসময় কষ্ট হবে। ছেলেটা বলল, বাবা বলে যদি অনেক গাছ লাগানো যেত, তাহলে গাছ সব ধোঁয়া খেয়ে নিত। আমাদের আর কষ্ট হত না। পাখি বলল, আমি এখানে গাছ লাগাব। পাখি তখন উড়ে গেল জঙ্গলে। সেখানে সব পাখিকে ডেকে বলল, আমার বন্ধুর খুব কষ্ট। তোমরা চলো। শহরে গাছ লাগাব। তখন পাখিরা মুখে করে বীজ নিয়ে উড়ে চলল শহরে। সেই বীজ ছড়িয়ে দিল শহরের সব জায়গায়। বৃষ্টি পড়তেই সেই বীজ থেকে গাছ হল। সারাটা শহর গাছে ভরে গেল। সেই ছোটো ছেলেটার আর কোনো কষ্ট থাকল না। কেমন লাগল আমার গল্প? রাহুলের দিকে তাকালেন অর্পিতাদিদি।
খুব ভালো।
এবার তাহলে বলো এই গল্প থেকে তুমি কী শিখলে?
কোনো কিছু ভাবল না রাহুল। সহজভাবেই বলল, কালো ধোঁয়া থেকে পরিবেশ দূষণ হয়। পরিবেশ দূষণ হলে লোকের কষ্ট হয়। গাছ লাগালে কারও কষ্ট থাকে না।
আর কী শিখলে? ক্লাসের সবার দিকে তাকালেন অর্পিতাদিদি।
কেউ কোনো কথা বলে না। সরস্বতী উঠে দাঁড়াল। বলল, পাখিটা ছেলেটার কষ্ট দেখে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল।
হ্যাঁ একদম ঠিক। তোমরাও পাখির মতো হও। সবাইকে ভালোবাসো। দুঃখী মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াও। তাহলেই দেখবে পৃথিবীটা কত সুন্দর হয়ে উঠেছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন