কুকুরছানা

চঞ্চলকুমার ঘোষ

সবুজ পাখি স্কুলে রাহুলের আজ এক মাস হল।

সত্যেনবাবু বলবার পর থেকে মণিদীপা, পার্থবাবু, নবনীতা মিস কেউ আর পুরোনো স্কুলের কথা বলেননি। খানিকটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও সকলে সব কিছু মেনে নিয়েছেন।

রাহুল খুব খুশি। অমলমামার স্কুলটা একেবারে তার মনের মতন। এখন আর পড়াশোনা করতে বিরক্ত লাগে না। সব কিছু কেমন সহজ হয়ে গিয়েছে। সবুজ পাখি স্কুলে সবাই যত পড়ায় তার চেয়ে বেশি গল্প বলে। গল্পটা মনে পড়লে পড়াটাও মনে পড়ে যায়।

ড্রাইভার কাকু রোজ ওকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসে। তারপর বাড়ি ফিরে অন্য কাজ করে। বিকেলে এসে রাহুলকে বাড়ি নিয়ে যায়। যেদিন কোনো কারণে গাড়ি আসতে দেরি হয়ে যায় রাহুল মামার ঘরে গিয়ে খেলা করে। মামা ছবি আঁকেন। মামার সঙ্গে ও ছবি আঁকে।

আজ স্কুলের খানিক আগে এসেই গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। রাস্তার আর্ধেকটা জুড়ে কাজ হচ্ছে। গাড়ি আর এগোতে পারবে না। ড্রাইভার কাকু রাহুলের দিকে ফিরে বললেন, গাড়ি তোমার স্কুল অবধি যাবে না।

তাড়াতাড়ি রাহুল বলল, আমি এখান থেকে এক ছুটে স্কুল চলে যাব।

পারবে তো?

রাহুল কাঁধে ব্যাগটা তুলে নিয়ে বলল, এইটুকু রাস্তা আমি যেতে পারব না?

ইতস্তত করে ড্রাইভার। একটুখানি রাস্তা। তবু একা রাহুলকে ছেড়ে দিতে ভরসা পায় না।

চলো আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।

গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে নামতে যেতেই পেছন থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে ওঠে, গাড়ি সরান দাদা।

আর্ধেক রাস্তা খোলা, সেখান দিয়ে রিকশা, সাইকেল যাচ্ছে। গাড়ির জন্যে পেছনে অনেকেই সার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তারা প্যাঁক প্যাঁক করে হর্ন দিচ্ছে।

ড্রাইভার বুঝতে পারছিল গাড়ি এখানে রেখে রাহুলের সঙ্গে যেতে পারবে না। বলল, তুমি সাবধানে যাও। কোথাও দাঁড়াবে না। সোজা স্কুলে ঢুকে যাবে।

মাথা নাড়ল রাহুল। তুমি চলে যাও কাকু। আমি যাচ্ছি।

পাছে ড্রাইভার কাকু আর-কিছু বলে, তাড়াতাড়ি হাঁটতে আরম্ভ করল। একটুখানি গিয়ে মুখ ফিরিয়ে দেখে নিল। ড্রাইভার কাকু গাড়ি নিয়ে চলে গিয়েছে।

রাস্তার পাশে কয়েক জন লোক বসে কাজ করছে। কতগুলো বউ ছোটো ব্রাশ নিয়ে রাস্তার ধুলো পরিষ্কার করছে। দাঁড়িয়ে পড়ল রাহুল। সব বউদের মাথায় কাপড় বাঁধা। একটা অল্পবয়েসি বউ রাহুলের দিকে চেয়ে হাসল। রাহুলও হাসল।

আর একটু গিয়েই বড়ো রাস্তা বাঁক নিয়েছে। পাশ দিয়ে স্কুলের রাস্তা। কয়েকটা বাড়ি, একটা মাঠ আর একটা বন্ধ কারখানা পার হতে স্কুল। রোজ গাড়ি চেপে আসে। কিছুই দেখতে পায় না। কারখানার পাশে এসেই থমকে গেল। একটা চাপা শব্দ ভেসে আসছে। এদিক-ওদিক তাকাল। কোথাও কিছু চোখে পড়ছে না। ভালো করে কান পাতল। কারখানার পাঁচিলের পাশ থেকে শব্দটা আসছে। আশপাশে কেউ নেই। রাস্তা থেকে নীচে নেমে গেল। একটা বড়ো গর্ত। কাছে যেতেই বুঝতে পারল গর্ত থেকেই শব্দটা আসছে। এক লাফ দিয়ে নেমে এল। হাত খানিক গর্ত। তার মধ্যে একটা কুকুরছানা। গায়ের রংটা সাদা আর খয়েরি।

রাহুল কোনোদিন এত কাছ থেকে কুকুরছানা দেখেনি। একদিন মায়ের সঙ্গে বাজার যাওয়ার সময়ে দেখেছিল। কাছে যাওয়ার আগেই মা হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।

গর্তটার ওপর ঝুঁকে পড়ে হাতটা বাড়িয়ে দিতে গিয়েই থমকে গেল। যদি বাচ্চাটা কামড়ায়। না এইটুকু বাচ্চা কী কামড়াবে? তবু ভয় হচ্ছিল যদি ওর মা থাকে। ভালো করে তাকাল। আশপাশে কোনো কুকুর নেই। এবার নীচু হয়ে কুকুরছানার গায়ে হাত দিল। কী নরম তুলতুল করছে। হাত বাড়িয়ে কুকুছানাটাকে তুলে নিল। মানুষের কোল পেয়েই শান্ত হয়ে গেল কুকুরছানাটা। যদি কেউ এসে কুকুরছানাটাকে নিয়ে যায়। তাড়াতাড়ি স্কুলের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করল। একটুখানি গিয়ে ভাবনা শুরু হয়ে গেল কুকুরছানা নিয়ে স্কুলে ঢুকতে দেবে না দারোয়ান কাকু। তখন বাচ্চাটাকে কোথায় রাখবে। দারোয়ান কাকু দেখতে পেলেই কেড়ে নেবে, তারপর রাস্তায় ফেলে দেবে। এইটুকু ছোটো বাচ্চা কী খাবে। মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল।

হঠাৎ মনে হল যদি দারোয়ান কাকু বাচ্চাটাকে দেখতে না পায় স্কুলে গিয়ে কোথাও লুকিয়ে রাখবে। ছুটি হলে বাড়ি নিয়ে যাবে। বাড়িতে মা রাখতে দেবে না। মেজোমাকে বলে ছাদের ঘরে রাখবে। ব্যাগটা খুলে তার মধ্যে কুকুরছানাটাকে ভরে নিল। বাইরে থেকে কেউ কিছু বুঝতে পারবে না।

স্কুলের ছোটো গেট দিয়ে চট করে ভেতরে ঢুকে পড়ল রাহুল। টুলে বসে আছে দারোয়ান। তার দিকে খেয়াল করল না। ক্লাসের ঘণ্টা বাজছে। অর্পিতাদিদি ক্লাসের দিকে যাচ্ছেন। রাহুলকে দেখেই বললেন, এত দেরি কেন?

রাস্তায় গাড়ি আটকে গিয়েছিল।

অস্বস্তি লাগছিল রাহুলের। এখন আর কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। ক্লাসে ঢুকে অন্যদিন একেবারে সামনে বসে। আজ সকলের পেছনে গিয়ে বসল।

অর্পিতাদিদি বোর্ডে অঙ্ক করান। আস্তে আস্তে ব্যাগ থেকে খাতা বার করে রাহুল। ব্যাগের মধ্যে কুঁকড়ে ছিল কুকুরছানাটা। একটু জায়গা পেতেই কুঁই কুঁই করে উঠল বাচ্চাটা। ঠিক সামনে বসে ছিল বিকাশ। তাড়াতাড়ি মুখ ফেরাল।

কী ডাকছে রে রাহুল?

ব্যাগের মুখটা চেপে ধরল রাহুল। তার ফাঁক দিয়ে কুকুরছানার ডাক ভেসে আসে।

অর্পিতাদিদি মুখ ফেরালেন, কী হয়েছে?

রাহুল বুঝতে পারে আর লুকিয়ে রেখে লাভ নেই। ব্যাগ থেকে কুকুরছানাটাকে বার করে ভয়ে ভয়ে বলল, স্কুলের সামনে একটা গর্তের মধ্যে পড়ে কাঁদছিল।

সবাই উঠে আসে বাচ্চাটার কাছে।

কী সুন্দর বাচ্চা। বলে ওঠে অরূপ।

সরস্বতী নীচু হয়ে বাচ্চাটার গায়ে হাত বোলায়। অর্পিতাদিদি উঠে আসেন।

ক্লাসের মধ্যে কুকুরবাচ্চা।

অমলমামা বারান্দা দিয়ে অফিস ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। ভেতরে নজর পড়তেই দরজার সামনে এসে বললেন, কী হল?

সবার আগে সরস্বতী বলে ওঠে, রাহুল একটা কুকুরের বাচ্চা নিয়ে এসেছে।

কোথা থেকে?

রাহুল মাথা নীচু করে বলল, স্কুলের রাস্তায় একটা গর্তের মধ্যে পড়ে কাঁদছিল। কেউ ছিল না। ভাবলাম বাচ্চাটা মরে যাবে তাই নিয়ে এলাম।

অমলবাবু এসে বাচ্চাটাকে তুলে নিয়ে বললেন, এ তো একেবারে বাচ্চা। এখানে থাকলে মরে যাবে।

রাহুলের চোখটা ছলছল করে ওঠে।

তাহলে কী হবে মামা?

আমি বংশীকে বলছি। নরম কিছুর মধ্যে বাচ্চাটকে রেখে দিতে। ওকে এখন তুলোয় করে দুখ খাওয়াতে হবে। কয়েক দিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।

রাহুলের মুখে হাসি ফোটে। তাহলে বাচ্চাটা বেঁচে যাবে মামা?

রাহুলের পিঠে আলতো চাপড় মারলেন অমলবাবু।

নিশ্চয়ই বাঁচবে। ও বড়ো হলে তোমাদের সকলের বন্ধু হবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%