দশচক্রে ভগবান ভূত

সমর পাল

এখানে দশজন অর্থ অনেকজন। চক্র অর্থ চক্রান্ত, কূট অভিসন্ধি। বহুলোকের চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্রে আসলকে নকল, নকলকে আসল, সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্রতিপন্ন করা সম্ভব। দশে লাগে ভূত ভাগে—এ ধরনের প্রবাদে যেমন দশজনে মিলে অতি দুঃসাধ্য কাজও সুসাধ্য হয় তেমনি দশজনের ষড়যন্ত্রে ভগবান নামক জনৈক পণ্ডিত ভূত হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন বলে এই প্রবাদ।

ভগবান নামে এক বিদ্বান পণ্ডিত ছিলেন রাজদরবারের মুকুটমণি। অন্যান্য অমাত্য ও গণ্যমান্য সভাসদগণ ভগবানের নামডাক ও প্রশংসা সহ্য করতে পারছিলেন না। সবাই মিলে ভগবানকে দরবার-ছাড়া করার মতলব আঁটলেন। একদিন ষড়যন্ত্রকারী সভাসদগণ বুদ্ধি করে দারোয়ানকে বলে দিলেন যে, পণ্ডিত ভগবানকে যেন রাজদরবারে প্রবেশ করতে না দেয়া হয়—এটি রাজার নির্দেশ। বেচারা দারোয়ান ভগবানকে আর ঢুকতে দিলো না দরবারে।

ভগবানের প্রতি রাজা খুব দুর্বল ছিলেন বলে দরবারে এসেই তিনি তার খোঁজ করলেন। অন্যান্য সভাসদ রাজাকে জানালেন যে, ভগবান পণ্ডিত মারা গেছেন। রাজ-চিকিৎসকও ষড়যন্ত্রকারীদের হয়ে সাক্ষ্য দিলেন, সত্যিই পণ্ডিতের মৃত্যু হয়েছে। রাজসভায় যথারীতি শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হলো—ভগবানের আত্মার শান্তি কামনা করে রীতিমতো শোকসভাও হয়ে গেল।

কিছুদিন পর রাজা বের হয়েছেন নগরভ্রমণে। ভগবান তার সাথে দেখা করার জন্য ছুটে এলেও জনতার ভিড়ে ও কড়াকড়িতে তার পক্ষে রাজার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হলো না। এদিকে রাজসভাতেও তার প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ হয়েছে অমাত্য-সভাসদদের কৌশলে। নিরুপায় ভগবান রাজদর্শনে বেপরোয়া হয়ে উঠলেন। রাজপথের ধারে এক গাছে চড়লেন তিনি। রাজার উদ্দেশে গাছের ওপর থেকে চিৎকার করে ভগবান পণ্ডিত তার উপস্থিতি জানালেন। রাজা সেদিকে দৃষ্টিপাত করতেই চক্রান্তকারী পারিষদগণ তাকে বললেন, “মহরাজ! ভগবান পণ্ডিত মরে গিয়ে ভূত হয়েছে। গাছের ওপর থেকে তার আত্মা তার রূপ ধরে আপনাকে ডাকছে। ঐদিকে আর তাকানো যাবে না। বরং অন্যপথে চলুন। পারিষদগণের কথায় রাজার বিশ্বাস হলো। অমঙ্গলের ভয়ে তিনি অন্যপথে যাবার আদেশ দিলেন সবাইকে। ভগবান পণ্ডিতের মতো সজ্জন ব্যক্তিও পাত্রমিত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ভূত হিসেবে গণ্য হলেন এবং সবার কাছে তা সত্য বলে প্রতিপন্ন হলো। প্রবাদটির সংস্কৃতরূপ হলো—

চক্রং সেব্যং নৃপঃ সেব্যো
ন সেব্যঃ কেবলং নৃপঃ।
অহো চক্রস্য মাহাত্ম্যাৎ
ভগবান্ ভূততাং গতঃ ॥

অর্থাৎ—কেবল রাজার সেবা করলেই চলে না, তার সাথে চক্র অর্থাৎ জনমণ্ডলীর সেবাও প্রয়োজন। চক্রের মাহাত্ম্যে বা দশচক্রে পড়ে আজ ভগবানকেও ভূত হতে হলো।

সকল অধ্যায়
১.
অকাল কুষ্মাণ্ড
২.
অগস্ত্যযাত্রা
৩.
অজার যুদ্ধে আঁটুনি সার
৪.
অতি দর্পে হত লঙ্কা
৫.
অতি দানে বলির পাতালে হলো ঠাঁই
৬.
অতি মন্থনে বিষ ওঠে
৭.
অতি লোভে তাঁতি নষ্ট
৮.
অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট
৯.
অন্ধের হাতি দেখা
১০.
অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী
১১.
অশ্বত্থামা হত ইতি গজ
১২.
আগ নাংলা যে দিকে যায় পাছ নাংলা সে দিকে যায়
১৩.
আষাঢ়ে গল্প
১৪.
আসলে মুষল নাই ঢেঁকিঘরে চাঁদোয়া
১৫.
ইল্লত যায় না ধুলে খাসলত যায় না মলে
১৬.
ওঝার ব্যাটা বনগরু
১৭.
কংসমামা
১৮.
কাকতালীয় ব্যাপার
১৯.
কালনেমির লঙ্কাভাগ
২০.
কুম্ভকর্ণের ঘুম
২১.
কুরুক্ষেত্র কাণ্ড
২২.
কড়ায় গণ্ডায়
২৩.
খর দজ্জাল
২৪.
খাঞ্জা খাঁ
২৫.
খয়ের খাঁ
২৬.
গজকচ্ছপের লড়াই
২৭.
গজকপিত্থবৎ
২৮.
গদাই লশকরি চাল
২৯.
গন্ধমাদন বয়ে আনা
৩০.
গোঁফ খেজুরে
৩১.
গোকুলের ষাঁড়
৩২.
গৌরচন্দ্রিকা
৩৩.
ঘরভেদী বিভীষণ
৩৪.
ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে
৩৫.
ঘুঁটো জগন্নাথ
৩৬.
চিত্রগুপ্তের খাতা
৩৭.
চেনা বামুনের পৈতা লাগে না
৩৮.
চোরে চোরে মাসতুতো ভাই
৩৯.
ছকড়া নকড়া
৪০.
জগা খিচুড়ি
৪১.
জড়ভরত
৪২.
ঢাক পেটানো
৪৩.
ঢাকের বাঁয়া
৪৪.
ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার
৪৫.
ত্রিশঙ্কু অবস্থা
৪৬.
দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার
৪৭.
দশচক্রে ভগবান ভূত
৪৮.
দেবতার বেলা লীলাখেলা পাপ লিখেছে মানুষের বেলা
৪৯.
দৈত্যকুলে প্ৰহ্লাদ
৫০.
ধনুর্ভঙ্গ পণ
৫১.
ধন্বন্তরি
৫২.
ধর লক্ষ্মণ
৫৩.
ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির
৫৪.
ধর্মের ষাঁড়
৫৫.
ধান ভানতে শিবের গীত
৫৬.
ধুন্ধুমার কাণ্ড
৫৭.
নরাণাং মাতুলক্রমঃ
৫৮.
পরশুরামের কুঠার
৫৯.
পরের ধনে পোদ্দারি
৬০.
পাততাড়ি গুটানো
৬১.
পান্তা ভাতে ঘি নষ্ট বাপের বাড়ি ঝি নষ্ট
৬২.
পিপুফিশু
৬৩.
পোয়া বারো
৬৪.
ফতো নবাব
৬৫.
ফপর দালালি
৬৬.
ফেউ লাগা
৬৭.
বাজখাঁই আওয়াজ
৬৮.
বিদুরের খুদ
৬৯.
বিন্দেদূতী
৭০.
ভবতি বিজ্ঞতমঃ ক্রমশো জনঃ
৭১.
ভস্মে ঘি ঢালা
৭২.
ভাগের মা গঙ্গা পায় না
৭৩.
ভানুমতির খেল
৭৪.
ভিজা বিড়াল
৭৫.
ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা
৭৬.
ভুশুণ্ডি কাক
৭৭.
ভেড়াকান্ত
৭৮.
ভেড়ার পাল
৭৯.
মগের মুলুক
৮০.
মরার সময় মকরধ্বজ
৮১.
মাছি মারা কেরানি
৮২.
মাছের মায়ের পুত্রশোক
৮৩.
মান্ধাতার আমল
৮৪.
মারের ওপর ওষুধ নাই
৮৫.
মাৎস্যন্যায় অবস্থা
৮৬.
যক্ষের ধন বা কুবেরের ধন
৮৭.
যণ্ডামার্ক বা যণ্ডামার্কা
৮৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
৮৯.
যে দামে কেনা সেই দামে বিক্রি
৯০.
রথ দেখা ও কলাবেচা
৯১.
রাবণের চিতা
৯২.
লঙ্কাকাণ্ড
৯৩.
লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন
৯৪.
লেফাফাদুরস্ত
৯৫.
শকুনিমামা
৯৬.
শনির দশা
৯৭.
শাঁখের করাত
৯৮.
শাপে বর
৯৯.
শিখণ্ডী খাড়া করা
১০০.
শিবরাত্রির সলতে
১০১.
শুভঙ্করের ফাঁকি
১০২.
শ্যাম রাখি কি কুল রাখি
১০৩.
ষাঁড়ের গোবর
১০৪.
সরফরাজি চাল
১০৫.
সস্তার তিন অবস্থা
১০৬.
সাক্ষীগোপাল
১০৭.
সাত নকলে আসল খাস্তা
১০৮.
হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রী
১০৯.
হরি ঘোষের গোয়াল
১১০.
হরিহর আত্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%