সমর পাল
মগের মুলুক বা মগের মুল্লুক বলতে সাধারণ অর্থে বার্মা (মায়ানমার), আরাকান রাজ্য বুঝালেও বাংলা প্রবাদে এর অর্থ হলো অরাজক দেশ, যেখানে জোর যার মুলুক তার বা যথেচ্ছাচারের দেশকে মগের মুলুক নামে অভিহিত করা হয়। তবে মূলত আরাকান তথা বার্মিজ জলদস্যু ও মগ অধিবাসীদের পূর্বকালের অত্যাচারের সাথে প্রবাদটি সম্পর্কযুক্ত।
মগদের মধ্যে মার মরি, ভূঁইয়া মগ, বরুয়া মগ, রাজবংশী মগ, মার্মা বা ম্যাম্-মা মগ, রোয়াঙ্গ মগ ও থোঙ্গথা বা জুমিয়া মগ নামে কয়েকটি শ্রেণী রয়েছে। বর্তমানকালে শ্রেণীগুলো তিনটি পৃথক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে। যেমন : ১. জুমিয়া, ২. মার্মা ম্যামা, রোয়াঙ্গ বা রাখিয়াঙ্গ এবং ৩. মার মরি বা রাজবংশী, বরুয়া ও ভূঁইয়া মগ। বিভিন্ন এলাকায় বসবাসের কারণে বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে আচার-ব্যবহারে পার্থক্য লক্ষ করা যায় বর্তমানে। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এখানে করা হলো না।
আমরা জানি যে, ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে আরাকানের মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা পূর্ব ও নিম্নবঙ্গের অনেক স্থান লুটপাট করে এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে সর্বত্র। তারা ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। সে সময় ঢাকার দুর্বলচিত্ত সুবেদার খান-ই-দুরান ভীত হয়ে রাজমহলে পালিয়ে যান। মোগলরা স্থলযুদ্ধে প্রতিপত্তিশালী হলেও জলযুদ্ধে তারা অনভ্যস্ত ছিল। আগ্নেয়াস্ত্র সজ্জিত মগ ও পর্তুগিজরা জনপদ লুণ্ঠন ও আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে অধিবাসীদের বন্দী করে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিতো। সুলতানি আমলেও মগদের অত্যাচারের কথা আমরা জানি। প্রায় প্রতিকারহীন এসব অত্যাচার-পীড়নে বাংলার মানুষ ভয়ঙ্করভাবে পীড়িত হয়।
আবার আসাম দখল করেও বার্মার মগদের বিপুল অত্যাচার, অনাচার ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ সে দেশে অরাজকতার চরম পর্যায় সৃষ্টি করে ১৮২৪ এর আগে। তবে ১৮২৪, ১৮৫২ ও ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধে মগদের ক্ষমতা ও অত্যাচার বেশ স্তিমিত হয়ে আসে।
মগদের চরম অত্যাচারে অতিষ্ঠ বঙ্গবাসী কোনো উপযুক্ত প্রতিকার পায়নি কখনোই। তাই এদেশে আমাদের সমাজে অত্যাচার, অপশাসন, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বেচ্ছাচার ও দুর্বলের প্রতি পীড়ন ঘটলে সে অবস্থায় মগের মুলুক প্রবাদটি প্রযোজ্য হয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন