বিদুরের খুদ

সমর পাল

যে কোনো শস্যের ক্ষুদ্র অংশ বা কণাকে বলা হয় খুদ। এদেশে সাধারণত চালের ক্ষুদ্র অংশকে খুদ বলি আমরা। দীনজনের বা গরিব মানুষের শ্রদ্ধাসহকারে নিবেদন করা সামান্য উপহারকে বিদুরের খুদ আখ্যায়িত করা হয় সাধারণভাবে।

মহাভারতের এক বিশিষ্ট চরিত্র বিদুর। চন্দ্রবংশীয় মহারাজ শান্তনুর পুত্র ভীষ্ম, চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য। ভীষ্ম ছিলেন চিরকুমার। শান্তনুর প্রথম স্ত্রী গঙ্গার গর্ভে ভীষ্ম এবং দ্বিতীয় স্ত্রী দাসরাজকন্যা সত্যবতীর গর্ভ চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্যের জন্ম হয়। চিত্রাঙ্গদ অল্প বয়সে যুদ্ধে নিহত হন। কাশীরাজের কন্যা অম্বিকা ও অম্বালিকা ছিলেন বিচিত্রবীর্যের স্ত্রী। বিয়ের সাত বছরের মধ্যে মহারাজ বিচিত্রবীর্যের মৃত্যু হয় যক্ষ্মারোগে। তৎকালীন রেওয়াজ অনুযায়ী বিচিত্রবীর্যের বৈপিত্রেয় ভাই (সত্যবতীর কুমারী অবস্থায় পরাশর মুনির ঔরসে জন্ম) কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস অম্বিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র এবং অম্বালিকার গর্ভে পাণ্ডুর জন্ম দেন।

বিচিত্রবীর্যের প্রথম স্ত্রী অম্বিকার রূপবতী শূদ্র দাসীর গর্ভে ব্যাসদের বিদুরের জন্ম দেন। বিদুর ধার্মিক ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। বিদর্ভরাজ আহুকের পুত্র দেবকের এক শূদ্রা স্ত্রীর গর্ভে ব্রাহ্মণের ঔরসজাত এক সুন্দরী কন্যার সাথে বিদুরের বিয়ে হয়। উল্লেখ্য যে, দেবকের অন্য সাত কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণের বাবা বসুদেব। দেবকী ঐ দেবকের কন্যা। বলা যেতে পারে যে, বসুদেব ও বিদুর পরস্পর ভায়রা। অর্থাৎ বিদুর হলেন শ্রীকৃষ্ণের মেশোমশাই বা খালু। ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডুর সৎভাই বিদুর। ধর্ম ও আইন বিষয়ে বিদুর ছিলেন অত্যন্ত প্রাজ্ঞ। তার অনেক পুত্র ছিল। কৌরবদের মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাদের অন্যায় আচরণ ও লোভ বিষয়ে বিদুর বরাবর তাদের সতর্ক করেছেন এবং শান্তি স্থাপনের জন্য চেষ্টা করেছেন বারবার।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ চলাকালে একবার শ্রীকৃষ্ণ হস্তিনাপুরে (দিল্লির পূর্বে মিরাটের কাছে গঙ্গার দক্ষিণ তীরে) এলেন যুধিষ্ঠিরের দূত হয়ে। ঐ সময় দুর্যোধন তাকে অভ্যর্থনা করে নেমন্তন্ন করেন। শ্রীকৃষ্ণ তার আতিথ্য গ্রহণে রাজি না হয়ে বললেন, ‘দূতগণ কাজ সমাধা হবার পরই ভোজন ও সেবা গ্রহণ করে থাকেন। অথবা লোকে বিপন্ন হয়ে বা কেউ প্রীতিপূর্বক দিলে অন্যের অন্ন ভোজন করে থাকে। আমার কাজ শেষ হয়নি। আমি বিপন্নও নই কিংবা আপনি আমাকে প্রীতিপূর্বক দিচ্ছেন না। সুতরাং নিরপেক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ মহাত্মা বিদুরের ভবন ছাড়া অন্য কোথাও আতিথ্য গ্রহণ করা আমার কাছে উপযুক্ত মনে হচ্ছে না।’

অতএব শ্রীকৃষ্ণ রওনা হলেন বিদুর-ভবনের উদ্দেশে। একজন মন্ত্ৰী হওয়া সত্ত্বেও সততা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে বিদুর যাপন করতেন সাধারণ জীবন। তার বাড়িতে সবসময় দারিদ্র্যের চিহ্ন থাকতো। এমনকি দু’বেলা ভালোভাবে খাবার জোটানোও তার পক্ষে কষ্টসাধ্য ছিল। এমন নানা কিংবদন্তির কথা শাস্ত্রকাহিনীতে পাওয়া যায়।

একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ বিদুর-ভবনে উপস্থিত হলে গরিব বিদুর দরিদ্রতাবশত অন্য বড় ধরনের খানার যোগাড় করতে না পেরে ঘরে থাকা চালের খুদ দিয়েই অতিথির ভোজন-আয়োজন করেন। শ্রীকৃষ্ণও পরম তৃপ্তি-সহকারে সেই খুদ খান।

বিদুর কর্তৃক সামান্য আহার্যে শ্রীকৃষ্ণকে আপ্যায়ন করার এই কাহিনী অনুসারে বিদুরের খুদ প্রবাদের উদ্ভব। এজন্য ভক্তি সহকারে সামান্য বস্তু প্রদত্ত হলে তাকে বিদুরের খুদ বলে। যেমন কেউ কাউকে স্বাভাবিক আপ্যায়ন করার পর বলে, ‘এ আমার বিদুরের খুদ।’

সকল অধ্যায়
১.
অকাল কুষ্মাণ্ড
২.
অগস্ত্যযাত্রা
৩.
অজার যুদ্ধে আঁটুনি সার
৪.
অতি দর্পে হত লঙ্কা
৫.
অতি দানে বলির পাতালে হলো ঠাঁই
৬.
অতি মন্থনে বিষ ওঠে
৭.
অতি লোভে তাঁতি নষ্ট
৮.
অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট
৯.
অন্ধের হাতি দেখা
১০.
অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী
১১.
অশ্বত্থামা হত ইতি গজ
১২.
আগ নাংলা যে দিকে যায় পাছ নাংলা সে দিকে যায়
১৩.
আষাঢ়ে গল্প
১৪.
আসলে মুষল নাই ঢেঁকিঘরে চাঁদোয়া
১৫.
ইল্লত যায় না ধুলে খাসলত যায় না মলে
১৬.
ওঝার ব্যাটা বনগরু
১৭.
কংসমামা
১৮.
কাকতালীয় ব্যাপার
১৯.
কালনেমির লঙ্কাভাগ
২০.
কুম্ভকর্ণের ঘুম
২১.
কুরুক্ষেত্র কাণ্ড
২২.
কড়ায় গণ্ডায়
২৩.
খর দজ্জাল
২৪.
খাঞ্জা খাঁ
২৫.
খয়ের খাঁ
২৬.
গজকচ্ছপের লড়াই
২৭.
গজকপিত্থবৎ
২৮.
গদাই লশকরি চাল
২৯.
গন্ধমাদন বয়ে আনা
৩০.
গোঁফ খেজুরে
৩১.
গোকুলের ষাঁড়
৩২.
গৌরচন্দ্রিকা
৩৩.
ঘরভেদী বিভীষণ
৩৪.
ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে
৩৫.
ঘুঁটো জগন্নাথ
৩৬.
চিত্রগুপ্তের খাতা
৩৭.
চেনা বামুনের পৈতা লাগে না
৩৮.
চোরে চোরে মাসতুতো ভাই
৩৯.
ছকড়া নকড়া
৪০.
জগা খিচুড়ি
৪১.
জড়ভরত
৪২.
ঢাক পেটানো
৪৩.
ঢাকের বাঁয়া
৪৪.
ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার
৪৫.
ত্রিশঙ্কু অবস্থা
৪৬.
দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার
৪৭.
দশচক্রে ভগবান ভূত
৪৮.
দেবতার বেলা লীলাখেলা পাপ লিখেছে মানুষের বেলা
৪৯.
দৈত্যকুলে প্ৰহ্লাদ
৫০.
ধনুর্ভঙ্গ পণ
৫১.
ধন্বন্তরি
৫২.
ধর লক্ষ্মণ
৫৩.
ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির
৫৪.
ধর্মের ষাঁড়
৫৫.
ধান ভানতে শিবের গীত
৫৬.
ধুন্ধুমার কাণ্ড
৫৭.
নরাণাং মাতুলক্রমঃ
৫৮.
পরশুরামের কুঠার
৫৯.
পরের ধনে পোদ্দারি
৬০.
পাততাড়ি গুটানো
৬১.
পান্তা ভাতে ঘি নষ্ট বাপের বাড়ি ঝি নষ্ট
৬২.
পিপুফিশু
৬৩.
পোয়া বারো
৬৪.
ফতো নবাব
৬৫.
ফপর দালালি
৬৬.
ফেউ লাগা
৬৭.
বাজখাঁই আওয়াজ
৬৮.
বিদুরের খুদ
৬৯.
বিন্দেদূতী
৭০.
ভবতি বিজ্ঞতমঃ ক্রমশো জনঃ
৭১.
ভস্মে ঘি ঢালা
৭২.
ভাগের মা গঙ্গা পায় না
৭৩.
ভানুমতির খেল
৭৪.
ভিজা বিড়াল
৭৫.
ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা
৭৬.
ভুশুণ্ডি কাক
৭৭.
ভেড়াকান্ত
৭৮.
ভেড়ার পাল
৭৯.
মগের মুলুক
৮০.
মরার সময় মকরধ্বজ
৮১.
মাছি মারা কেরানি
৮২.
মাছের মায়ের পুত্রশোক
৮৩.
মান্ধাতার আমল
৮৪.
মারের ওপর ওষুধ নাই
৮৫.
মাৎস্যন্যায় অবস্থা
৮৬.
যক্ষের ধন বা কুবেরের ধন
৮৭.
যণ্ডামার্ক বা যণ্ডামার্কা
৮৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
৮৯.
যে দামে কেনা সেই দামে বিক্রি
৯০.
রথ দেখা ও কলাবেচা
৯১.
রাবণের চিতা
৯২.
লঙ্কাকাণ্ড
৯৩.
লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন
৯৪.
লেফাফাদুরস্ত
৯৫.
শকুনিমামা
৯৬.
শনির দশা
৯৭.
শাঁখের করাত
৯৮.
শাপে বর
৯৯.
শিখণ্ডী খাড়া করা
১০০.
শিবরাত্রির সলতে
১০১.
শুভঙ্করের ফাঁকি
১০২.
শ্যাম রাখি কি কুল রাখি
১০৩.
ষাঁড়ের গোবর
১০৪.
সরফরাজি চাল
১০৫.
সস্তার তিন অবস্থা
১০৬.
সাক্ষীগোপাল
১০৭.
সাত নকলে আসল খাস্তা
১০৮.
হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রী
১০৯.
হরি ঘোষের গোয়াল
১১০.
হরিহর আত্মা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%