শুশুক-মানুষের রহস্য

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

এক

গোয়ার মারগাঁও থেকে বিমানবাহিনীর একটি ডাকোটা বিমান আমাদের পাঁচজন সাংবাদিকের একটি দল নিয়ে যখন আকাশে উড়ল, তখন বিকেল চারটে৷ আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জের কোরাডিভি দ্বীপে৷ ভারত সরকারের সমুদ্র-বিজ্ঞান দফতরের একটি গবেষণাগার রয়েছে সেখানে৷ সেটি আমাদের দেখাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷ সরকার আশা করেন, সব দেখেশুনে ফিরে গিয়ে আমরা নিজেদের কাগজে চমৎকার রিপোর্ট লিখব৷ কোরাডিভি জাহাজে অথবা স্টিমারেও পৌঁছনো যায়৷ কিন্তু তাতে অনেক বেশি সময় লেগে যাবে৷ এখানে বিমানবাহিনীর একটি বিমানঘাঁটি আছে৷ তাই ওইভাবে নিয়ে যাওয়ার আয়োজন হয়েছে৷ পৌঁছতে মোটে দু-ঘণ্টা লাগবে৷ আরব সাগরের সৌন্দর্য নাকি বিমান থেকে দেখলে মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না...৷

সত্যি তাই৷ আমাদের বিমানটি নাক বরাবর দক্ষিণ-পশ্চিমে এগিয়ে ঠিক ছ’টায় দ্বীপের বিমানঘাঁটিতে মাটি ছুঁল৷ সেখানে একদফা বিমানবাহিনীর আতিথ্যে কফি পান করে এবার আমরা একটা স্টেশন-ওয়াগনে উঠলুম৷

কোরাডিভি আসলে একটি প্রবালদ্বীপ৷ শেষ-বেলায় চারদিকে তাকিয়ে বুঝলুম, এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসামান্য৷ মাটি অসমতল৷ কোথাও-কোথাও ন্যাড়া টিলা মাথা তুলে আছে গাছপালার মধ্যে৷ গ্রীষ্মকালে সাড়ে ছ’টায় বঙ্গদেশে যখন গোধূলিকাল, এখানে তখনও দেখছি সূর্য অস্ত যায়নি৷

আমরা তিন কিলোমিটার পশ্চিমে এগিয়ে যেখানে পৌঁছলুম, সেখানেই সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণাগার৷ যিনি আমাদের অভ্যর্থনা করে গাড়িতে তুলেছেন, তাঁর নাম ডক্টর রাজগোপাল৷ স্বয়ং ডিরেক্টর৷

ডক্টর গোপাল বললেন, ‘আজ রাতের মতো আপনাদের কষ্ট দেব না৷ বিশ্রাম করুন৷ আগামী সকালে প্রোগ্রাম অনুসারে দেখাশোনার ব্যবস্থা করব৷’

একটা টিলার গায়ে গবেষণাগার৷ তার পিছনে পঞ্চাশ-ষাট ফুট নীচেই সমুদ্র৷ অর্থাৎ আরব সাগর৷ সর্দার শোভন সিং নামে এক সাংবাদিক বললেন, ‘পশ্চিমদিকটা খাড়াই৷ পূর্ব এবং দক্ষিণে কিন্তু চমৎকার বিচ আছে৷ দু-দিকেই এক কিলোমিটার করে চওড়া৷ বালির ওপর গাড়ি চালিয়ে ছোটা যায়৷ আমি বছর-তিন আগে একবার এসেছিলুম৷ প্রচুর নারকেল গাছ আছে ওদিকে৷ ট্যুরিস্ট লজ আছে৷ দুটো প্রাইভেট হোটেল আছে৷ তবে কোনও বসতি নেই৷ সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি থাকার দরুন স্থায়ীভাবে কাকেও বাস করতে দেওয়া হয় না৷ যারা বাইরে থেকে এখানে বেড়াতে আসে, তাদের বিশেষ অনুমতি নিতে হয়৷’

জিগ্যেস করলুম, ‘পাশাপাশি আর-সব দ্বীপে নিশ্চয় বসতি আছে?’

জবাব দিলেন ডক্টর রাজগোপাল, ‘আছে৷ তবে বেশিরভাগই কেরল এলাকার জেলে৷ কিছু আরবও মাঝে-মাঝে এসে কিছু সময় থেকে যায়৷ তারা শাঁখ আর কড়ির ব্যাবসা করে৷ কোনও-কোনও দ্বীপে স্থায়ী বাসিন্দাও কাছে৷ স্কুল-ডাকঘর-হাসপাতালও আছে৷’

কথা বলতে-বলতে আমরা পৌঁছলুম দক্ষিণে রাস্তার ওপারে আরেকটা টিলার ওপর অবস্থিত রেস্টহাউসে৷ দোতলায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে৷ সেখানে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলুম৷ একটা ছোট্ট হ্রদও রয়েছে পিছনে৷ ততক্ষণে সূর্য ডুবেছে৷ কিন্তু যথেষ্ট আলো আছে৷ বাড়িটার নীচে দক্ষিণে ঢালু হয়ে নেমেছে টিলা৷ তার নীচে খানিকটা সমতল জমি সবুজ ঘাসে ভরা৷ হ্রদের জল সেই জমিকে ছুঁয়ে আছে৷ হ্রদের ধারে কোথাও শর জাতীয় ঝোপঝাড় এবং ঝোপের পাশে একটা পাথরের ওপর বসে কে যেন তন্ময় হয়ে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে৷ তার পেছনটা দেখতে পাচ্ছি৷ মাথায় টাক আছে৷ টাকে সূর্যাস্তের লালচে ছটা পড়েছে৷ সে ছিপে খ্যাঁচ মেরে একটা মাছ টেনে তুলল এবং আমাদের দিকে ঘুরল৷ তখন দেখলুম, লোকটার মুখে দাড়িও আছে৷ সাদা ঝকমকে দাড়ি৷ খাড়া নাক৷ কোনও আমেরিকান হওয়াই সম্ভব৷ কিন্তু এ-দ্বীপে বিদেশিদের নাকি আসা বারণ...৷

কিন্তু ওই বাদামি রঙের বিদঘুটে জ্যাকেট এবং ধূসর পাতলুন, পাথরের ওপর সযত্নে রাখা টুপি ও ছড়ি, এমনকী মাছ ধরতে বসেও যার গলা থেকে বাইনোকুলার এবং ক্যামেরা ঝোলে, সে পৃথিবীতে একজনই৷

তারপর দেখলুম, মাছটা কিটব্যাগে রেখে বুড়ো টাক-দাড়িওলা লোকটা পকেট থেকে চুরুট বের করে ধরাল৷ হাওয়া বাঁচিয়ে চুরুট ধরানোর ভঙ্গিটি তো আমার চোখস্থ হয়ে আছে৷ এই সময় সে আচমকা ঘাসের ওপর থেকে কী একটা তুলে নিল৷ একটা অদ্ভুত ছোটো জাল—দু-দিকে দুটো দু-হাত, আড়াই হাত লম্বা সরু কাঠিতে আটকানো৷ জালটা নিয়ে সে ঝোপের দিকে পা টিপে-টিপে এগোল৷ হুঁ, প্রজাপতি ধরতে যাচ্ছে৷

ব্যস৷ সবাইকে হতবাক করে আমি সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ি টাট্টুর মতো দৌড়লুম৷ নীচে লনে পৌঁছে দেখি বাঁ-দিকে পাঁচিল৷ পাঁচিলটা ফুটতিনেক উঁচু মোটে৷ সেই পাঁচিল ডিঙিয়ে ওপারে পড়লুম৷ পেছনে দোতলায় হতবাক লোকগুলো এতক্ষণ পরে চেঁচাতে শুরু করেছে, ‘মিস্টার চৌধুরী! মিস্টার চৌধুরী! হল কী? ব্যাপারটা কী?’

কে যেন ভাঙা বাংলায় বিকট ডাক ছাড়ছে, ‘জয়োন্তাোবাবু৷ জয়োন্তাোবাবু! কী হোয়েসে— কী হোয়েসে?’

ততক্ষণে ঢালু জমি দিয়ে প্রায় গড়াতে-গড়াতে ঘাসের জমিটায় পড়েছি এবং পড়া মানে একেবারে চিৎপাত৷ ব্যথা অবশ্য পেলুম না৷ কিন্তু উঠতে দেরি হল৷

ঝোপের কাছে লোকটা প্রজাপতি ধরার তালে এত তন্ময়, যেন পেছনে কী ঘটছে—তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই৷ ধীরে-সুস্থে প্রজাপতিটা একটা সচ্ছিদ্র ছিপি-আঁটা মোটা কাচের জারে ভরে সে জালটা ভাঁজ করল৷ কিটব্যাগে ভরল৷ আলো অনেকটা কমে গেছে ততক্ষণে৷

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি৷ এবার রীতিমতো অপমানিত বোধ করছি৷ অভিমানের বাষ্পে মন গুমোট৷ কোথায় আশা করেছিলুম— ‘হ্যালো ডার্লিং’ বলে একটি চিৎকার, কোথায় এই নির্বিকার অমনোযোগ৷

নাকি আমার সত্যি ভুল হচ্ছে? ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একটু ঘুরে টিলার ওপর রেস্টহাউসের দোতলার বারান্দা থেকে লোকেরা দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখছে৷ বুদ্ধির দোষে কী হাস্যকর কাণ্ড না করে ফেললুম! এরপর ওরা হাসাহাসি করবে আমাকে নিয়ে৷ বলবে, এই হল কিনা বাঙালি বুদ্ধু!

আর চুপ করে না থেকে বললুম, ‘মহাশয় কি অন্ধ এবং বধির?’

নির্বিকার বৃদ্ধ লোকটি ছিপ গোটাতে-গোটাতে চাপা গলায় বলে উঠলেন, ‘ওদের গিয়ে বলো, ভুল করে চেনা লোক ভেবেছিলে৷ ঘণ্টাখানেক পরে যে-কোনও ছলে পূর্বদিকের বিচে ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁয় যাবে৷ খুব সাবধান, একা যাবে৷ কেউ যেন জানতে না পারে৷ এই রাস্তা ধরে গেলেই পেয়ে যাবে৷’

‘কিন্তু ব্যাপারটা কী?’

‘ছেলেমানুষি কোরো না৷ চলে যাও এখান থেকে৷ ওদের এ-কথাও বোলো না যে ভুল করে আমাকেই ভেবেছিলে৷’

হতভম্ব হয়ে টিলা বেয়ে উঠতে শুরু করলুম৷ রেস্টহাউসের পাঁচিলের কাছে গিয়ে দেখি এদিক থেকে অন্তত ছ’ফুট উঁচু৷ ওপরের বারান্দা থেকে ডক্টর রাজগোপাল বললেন, ‘পশ্চিমদিকে ঘুরে গেট দিয়ে আসুন৷’

ক্লান্ত শরীরে রেস্টহাউসের দোতলায় উঠতেই ঝাঁকে-ঝাঁকে প্রশ্ন ছুড়ে মারতে থাকলেন ওঁরা৷ কাঁচুমাচু হেসে বললুম, আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক ভেবেছিলুম৷ কিন্তু তিনি না৷ চোখের ভুল৷

বোম্বের ‘ডেকান টাইমস’ এর রিপোর্টার রবি ভার্মা হাসতে-হাসতে বলল, ‘চেনা লোক দেখে মানুষ যে পাগলা টাট্টুর মতো পাহাড় ডিঙিয়ে ছোটে, এ-দৃশ্য কখনও দেখিনি৷ হরিবল৷’

মাদ্রাজের ‘প্যাট্রিয়ট’-এর রাঘবন বলল, ‘জয়ন্তবাবুর হবু শ্বশুর নন তো ভদ্রলোক?’

খুব হাসাহাসি চলতে থাকল৷ আমি আমতা-আমতা করে নানারকম কৈফিয়ত দিতে থাকলুম৷

একটু পরে আমাদের ঘর দেখিয়ে দেওয়া হল৷ দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের শেষ ঘরটায় আমার এবং রবি ভার্মার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে৷ আবার কফি এবং স্ন্যাকসের প্যাকেট এল৷ রাত সাড়ে আটটায় নীচের ডাইনিং হলে ডিনার পরিবেশন করা হবে৷ বিছানায় বসে সিগারেট ধরিয়ে ব্যাপারটা ভাবতে ব্যস্ত হলুম৷ ভার্মা অন্ধকারে সমুদ্রশোভা দেখতে বারান্দায় চলে গেল৷

অচেনা জায়গা৷ পুবের বিচে কোথায় সেই মুক্তাঙ্গন রেস্তোরাঁ কে জানে! অথচ রহস্যময় বুড়ো আমাকে সেখানে যেতে বলল৷ একবার ভাবলুম, চুলোয় যাক৷ আমি যা করতে এসেছি, তাই নিয়ে থাকি৷ আবার ভাবলুম, রথ দেখতে এসে কলা বেচে পয়সা উসুল করার মতো তেমন কোনও চমকপ্রদ খবর পেয়ে যেতেও তো পারি! তাতে দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকার প্রচার বেড়ে যেতে পারে৷ আমার বেতনবৃদ্ধি হতে পারে৷

কিন্তু তার চেয়ে আদত কথা, বুড়োর সঙ্গে যেন আমার রক্তের সম্পর্ক৷ তা না হলে দেখামাত্র অমন করে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে কি কেউ দৌড়ে যায়?

কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ডাকে আমি এভারেস্ট ডিঙিয়ে যেতেও পারি৷

কিন্তু উনি দেখছি সর্ব ঘটে বিরাজমান৷ ভাবতেও পারিনি, এই কোরাডিভিতে ওঁকে দেখতে পাব৷ এবং তার চেয়েও আশ্চর্য ব্যাপার, চির-রহস্যময় এবং রহস্য-সন্ধানী বৃদ্ধ এই কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এখানে আত্মগোপন করে রয়েছেন! ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতেই হয়৷

দুই

ক’জন সাংবাদিক এক জায়গায় জড়ো হলে যা হয়৷ রাজনীতির হাঁড়ির খবর নিয়ে তর্কাতর্কি, হুল্লোড়, এবং কখনও খিস্তি, কখনও বিপুল অট্টহাসি৷ দিল্লির দৈনিক ‘আর্যাবর্ত’-এর ব্রজলাল শর্মা খুব জমিয়ে তুলতে পারেন৷ আড্ডাটা তাঁর ঘরেই বসেছে৷ তখন সাড়ে সাতটা বাজে৷ আর দেরি করা যায় না৷ এক ফাঁকে বেরিয়ে এলুম৷

লনে একজন কর্মীর সঙ্গে দেখা হল৷ শশব্যস্তে বলল, ‘সঙ্গে যাব, স্যার?’

বললুম, ‘না৷ একটু ঘুরে আসি৷’

‘সঙ্গে টর্চ আছে তো, স্যার? একটু সাবধানে দেখে-শুনে ঘুরবেন৷’

‘কেন বলুন তো?’

‘অন্য কিছু না৷ সাপটাপ থাকতে পারে৷’

হাসতে-হাসতে বললুম, ‘বাঘ-ভাল্লুক নয় তো?’

‘না, স্যার৷ বাঘ-ভাল্লুক এখানে কোথায়!’

গেট দিয়ে বেরিয়ে রাস্তায় পড়লুম৷ গবেষণাগার ডাইনে রেখে হ্রদের ধারে গিয়ে সোজা পুবে এগোলুম৷ রাস্তাটা সংকীর্ণ হলেও সুন্দর পিচ-বাঁধানো এবং পরিষ্কার৷ দু-ধারে একটু দূরে-দূরে লাইটপোস্ট রয়েছে৷ কাজেই একটুও অন্ধকার নেই৷

কিন্তু অজানা জায়গার নির্জন রাস্তায় হাঁটলে গা-ছমছম করবেই৷ আমার ডাইনে হ্রদটা যেখানে শেষ হল, সেখানে রাস্তাটা একটু বাঁয়ে মোড় নিয়েছে৷ সামনে সমুদ্র৷ দু-ধারে ন্যাড়া পাঁচিলের মতো পাথরের পাহাড়৷ সমুদ্রের ধারে গিয়ে রাস্তাটা ঘুরে উত্তরে চলে গেছে বিমানঘাঁটির দিকে৷

আমি রাস্তা থেকে বালির বিচে নামলুম৷ বিচে আলো রয়েছে৷ উঁচু লাইটপোস্ট আছে এখানে-ওখানে৷ এবার দু-চারজন করে লোক দেখা যাচ্ছিল৷ কেউ বালিতে বসে আছে, কেউ বেঞ্চে বসেছে৷ চাপা গলায় কথা বলছে৷ সামনে ট্যুরিস্ট লজ ও হোটেলের আলো দেখা গেল৷ আমার বাঁ-দিকে নারকেল গাছের জটলা, ডাইনে সমুদ্র৷ সেখানে দেখলুম, নারকেল গাছের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় বিশাল কয়েকটা ডোরাকাটা ছাতা এবং তার তলায় লোকেরা বসে আছে৷ এটাই তাহলে ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁ৷ হালকা নিচু বেতের চেয়ারে বসে নানা বয়সের পুরুষ ও মহিলা আড্ডা দিচ্ছে৷

সেখানে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমার বৃদ্ধ বন্ধুকে খুঁজছি, ডানপাশ থেকে চাপা গলায় আওয়াজ এল: ‘হ্যালো ডার্লিং!’

আহা, এই সেই স্নেহভরা মিঠে ডাক! এই সেই প্রাণমাতানো আপনকরা সম্ভাষণ৷ ঘুরে দেখি, উনি ফাঁকায় একটি টেবিলের পাশে বসে আছেন৷ শুধু মুন্ডুটা টেবিলের ওপর দেখা যাচ্ছে৷ গিয়ে সামনাসামনি বসে পড়লুম৷

‘তুমি রাগ না করে চলে এসেছ, খুব খুশি হয়েছি, ডার্লিং৷ এখন চুপচাপ বসো৷ কফি খেয়ে ক্লান্তি দূর করো৷’

‘আর কফি নয়৷ চা খাব৷’

একটু তফাতে একটা গ্যারেজের মতো ঘরে চা ও কফি বানানো হচ্ছে৷ ঘরটা যে গাড়ি, তা চাকা দেখে মালুম হল৷ ভ্রাম্যমাণ রেস্তোরাঁ আর কী! ইশারা করতেই একজন বয় এসে সেলাম দিল৷ কর্নেল চায়ের অর্ডার দিলেন৷ সে চলে গেল৷

তখন বললুম, ‘আপনি কি কারও ভয়ে এখানে এসে লুকিয়ে আছেন?’

বুড়ো হাসলেন, ‘তা যা বলেছ! সেইরকমই অবস্থা৷’

‘গুড৷ ঝাড়ুন, কী মালকড়ি আছে!’

হাত তুলে কর্নেল বললেন, ‘সবুর বৎস, সবুর৷ চা খেয়ে আগে ক্লান্তি দূর করো৷’

‘কবে এসেছেন এখানে? উঠেছেন কোথায়?’

‘গতকাল সকালে৷ উঠেছি ওই সি-ভিউ হোটেলে৷’

‘আমরা আসব জানতেন কি? মানে—আমি আসছি কি না, জানতেন?’

‘অবশ্যই৷’

বয় ট্রে রেখে গেল৷ কর্নেল পট থেকে চা ঢালতে-ঢালতে বললেন, ‘দেখছ, কত কুইক সার্ভিস করে এরা? পৃথিবীর কোথাও এরকম সার্ভিস পাবে না, জয়ন্ত৷ গতকাল থেকে লক্ষ্য করছি৷ এর মালিক ভদ্রলোক মাদ্রাজি৷ অতি অমায়িক সজ্জন মানুষ৷’

এরপর চা খেতে-খেতে আমাদের এইসব কথাবার্তা হল৷

‘এবার বলুন, এখানে আগমনের উদ্দেশ্য কী আপনার?’

‘তোমাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি৷’

‘চালাকি রাখুন৷ সাংবাদিকদের ওপর গোয়েন্দাগিরি! সরকারের আর কাজ নেই? তার ওপর কি না সে-জন্যে বেছে-বেছে এক বেসরকারি বুড়ো ঘুঘুকে পাঠিয়েছেন! বিশ্বাসই করি না৷’

‘ডার্লিং, আস্তে! সমুদ্রবায়ু খুব জোরালো৷’

‘কিন্তু ব্যাপারটা কী?’

‘বললুম তো৷’

‘অসম্ভব৷ আপনি এক কিলোমিটার দূরে বসে গোয়েন্দাগিরি করছেন? ভ্যাট!’

‘শোনো জয়ন্ত, দিল্লিতে সাংবাদিকদের লিস্টে তোমার নাম আমিই ঢুকিয়েছি৷ দিস ইজ সিরিয়াস৷ হাতে সময় ছিল না তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করার৷ ট্রাঙ্ককল করাটা ভালো মনে করিনি৷ ভেবেছিলুম, যে-কোনওভাবে যোগাযোগ করে ফেলব এখানে এসে৷ সেই উদ্দেশ্যে রেস্টহাউসের পেছনের হ্রদে মাছ ধরতে গিয়েছিলুম৷ তুমি যে বোকার মতো অমন করে দৌড়ে যাবে, ভাবতে পারিনি!’

‘ভাবা উচিত ছিল আপনার৷’

‘প্লিজ জয়ন্ত! এবার থেকে এটা ভেবে নিয়েই কাজ করব৷’

‘যাক গে, বলুন কী ব্যাপার?’

‘তোমার সাহায্য আমার খুবই দরকার৷ যা বলছি মন দিয়ে শোনো৷’

‘শুনছি তো৷ বলুন!’

‘তোমাকে কেউ ফলো করেনি, আর ইউ শিয়োর?’

‘না৷ সারা রাস্তা ভয়ে-ভয়ে এসেছি৷ আলোও ছিল৷ বারবার পেছনে ঘুরেছি, কাকেও দেখিনি৷’

‘খাসা! এবার শোনো—তোমাদের দলে কোনও বিদেশি এজেন্ট থাকার সম্ভাবনা আছে৷ এখানে সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা-সংস্থার একটি মূল্যবান আবিষ্কারের ফরমুলা তার হাতে পাচার হতে পারে৷ কোনও এক সূত্রে সরকার এটা আঁচ করেছেন৷ এখন...৷’

‘কী কাণ্ড! তাহলে সাংবাদিকদের অত ঘটা করে না নিয়ে এলেই তো ল্যাঠা চুকে যেত! এত রিস্ক নেওয়ার কী দরকার ছিল সরকারের?’

‘প্লিজ, জয়ন্ত, ধৈর্য ধরে শোনো৷ সরকার এ-ব্যাপারে নিঃসংশয় হতে চান বলেই গোপন সূত্রে খবর জেনেও প্রোগ্রাম ক্যানসেল করেননি৷ অর্থাৎ সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা-সংস্থার কোন লোকটি ওই চক্রে জড়িত, তা আবিষ্কার করাই উদ্দেশ্য৷ এটা একটা ফাঁদ বলতে পারো৷’

‘বুঝলুম৷ তা আপনি বুড়ো বয়েসে এতে নাক গলালেন কেন? খুন-খারাপি নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করেন, এসব স্পাই রিং-এর ব্যাপার৷ এ তো মারাত্মক!’

‘ডার্লিং, এই দ্বীপে এক বিরল প্রজাপতি আছে শুনেছিলুম৷’

‘বেশ তো৷ প্রজাপতি ধরতে আপনার অসুবিধে ছিল নাকি? এই তো, কত সব ট্যুরিস্ট এসেছে মেনল্যান্ড থেকে৷ তেমনিভাবে এলেও পারতেন৷’

‘জয়ন্ত, জয়ন্ত, প্লিজ৷ উত্তেজিত হয়ো না৷ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের বিশেষ অনুরোধে এ-কাজ না নিয়ে পারিনি৷’

‘ভালো৷ আপনি দেশের সেবায় নেমেছেন৷ কিন্তু...৷’

‘তুমি কি ভয় পাচ্ছ, ডার্লিং?’

‘ভয়? আপনি বললে কী না পারি? বলুন না, সাগরে ঝাঁপ দেব?’

‘হাঃ হাঃ হাঃ! বেশ, বেশ৷ এবার শোনো, তুমি বাকি চারজন সাংবাদিকের ওপর নজর রাখবে৷ আর...৷’

‘এতক্ষণে হয়তো ফরমুলা পাচার হয়ে গেছে! কী আপনার বুদ্ধি!’

‘সম্ভবত হয়নি৷ কারণ ওখানে নজর রাখার লোক আছে৷ গবেষণাগারেরই লোক৷ সে সরকারি গোয়েন্দা৷ তবে সাংবাদিকদের মধ্যে কোন ভদ্রলোক এ-ব্যাপারে লিপ্ত সেটা জানা তোমার পক্ষে যতটা সোজা, তার পক্ষে নয়৷ তুমি তাদের সঙ্গেই রয়েছ এবং তোমার চোখ এড়িয়ে কিছু করা কঠিন৷ তা ছাড়া, এখনও ফরমুলা পাচার হয়নি, বলার কারণ আছে৷ পরে জানতে পারবে৷’

‘কিন্তু ফরমুলাটা কীসের?’

‘তুমি মলিকিউলার বায়োলজি, অর্থাৎ আণবিক জীববিদ্যা কিংবা আধুনিক প্রজননবিদ্যার খবরাখবর কি রাখো? তাহলে বলতে পারি৷’

‘অত অশিক্ষিত ভাববেন না, মাই ডিয়ার ওল্ডম্যান৷’

‘আধুনিক জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ প্রাণী ও উদ্ভিদের দেহ-কোষ নিয়ে ক্রোমোজোমের মধ্যে জিনের হেরফের ঘটিয়ে নতুন সজীব পদার্থ সৃষ্টি করা হয়েছে৷ ডি এন এ-র কথা তো জানো৷ জিনের হেরফের ঘটাতে ওই জিনিসটি মোক্ষম৷ খোদার ওপর খোদকারি৷ সংক্ষেপে বলছি৷ আমাদের প্রজননবিদরা সামুদ্রিক প্রাণী শুশুকের দেহে ওইভাবে জিনের হেরফের ঘটিয়ে তাকে বুদ্ধিমান প্রাণীতে পরিণত করতে পেরেছেন৷ সমুদ্রের তলায় গিয়ে তারা অনায়াসে শত্রুর জাহাজের তলা ফাঁসিয়ে আসতে পারবে৷ এমনকী, শত্রুর জাহাজের অবস্থিতি, অস্ত্রশস্ত্র, সরঞ্জাম, পরিকল্পনা—সবকিছুর হদিশ করে আসতে পারবে৷ শত্রুদের সন্দেহই হবে না৷ অর্থাৎ, সেই শুশুক একইসঙ্গে কম্পিউটারের এবং মানুষের কাজ করতে পারবে৷ বুঝলে তো এবার? কিন্তু সাবধান—এ-খবর তোমার দৈনিক ‘সত্যসেবক’ পত্রিকায় ছাপবার জন্যে নয়৷ ছাপলে সরকার অস্বীকার করবেন এবং তোমাদেরও ঝামেলা বাড়বে৷’

‘ফরমুলাটার আবিষ্কারক কে?’

‘ডক্টর রাজগোপাল৷’

এরপর কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, ‘তোমায় আর আটকে রাখব না, জয়ন্ত৷ তুমি এসো৷ আমি হোটেলে গিয়ে কতকগুলি কাজ সেরে নিই৷ দুঃখিত যে, তোমায় এগিয়ে দিতে পারছি না৷ কিন্তু তুমি খুব সতর্ক হয়ে ফিরে যাও৷ বাই দা বাই, সঙ্গে কি তোমার সেই খুদে যন্ত্রটি আছে?’

‘আছে৷ ভাববেন না৷’—বলে আমি উঠে দাঁড়ালুম৷

খুদে যন্ত্রটি একটি পয়েন্ট বত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভার৷ ক’বছর আগে কলকাতার ডক এলাকায় একটা চোরাচালান চক্রের খবর দিয়ে কাস্টমসকে সাহায্য করার পুরস্কারস্বরূপ রাজ্য সরকার আমাকে এই অস্ত্রটির লাইসেন্স মঞ্জুর করেন৷ সে-বার ওই চক্রের মধ্যে নাক গলাতে গিয়ে একটুর জন্যে প্রাণে বেঁচে যাই৷

বিচ থেকে রাস্তায় পৌঁছে এবার কিন্তু বুক কেঁপে উঠল৷ চারদিকে কড়া নজর রেখে হাঁটতে থাকলুম৷ কিন্তু ফেরার পথেও কোনও লোক দেখলুম না৷

অবশ্য মনটা খারাপ হয়ে গেল৷ কর্নেলের উপভোগ্য সঙ্গলাভের জন্যে তীব্র ইচ্ছে দমন করাটা আমার পক্ষে ভারি কঠিন৷ নিরন্তর সদালাপী এবং কৌতুকপরায়ণ ওই বৃদ্ধের সংসর্গে কী জাদু আছে, সে আমিই জানি৷

হ্রদের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালুম৷ কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আবছা আলোয়৷ সে এদিকে ঘুরলে দেখি, দৈনিক ‘পাঞ্জাব নিউজ’-এর সর্দার শোভন সিং৷ আমায় দেখে সর্দারজি বললেন, ‘হ্যাল্লো৷’

আমিও সন্দিগ্ধভাবে বললুম, ‘হ্যাল্লো৷’

সর্দারজি বললেন, ‘ঘুরতে বেরিয়েছিলেন, জয়ন্তবাবু?’

‘হ্যাঁ, সর্দারজি৷’

‘আমিও ঘুরতে বেরিয়েছি৷ হল্লা আমার ভালো লাগে না৷’

তিন

‘ডেকান টাইমস’-এর রবি ভার্মা আমার অনেকদিনের পরিচিত এবং বন্ধু মানুষ৷ ‘প্যাট্রিয়ট’-এর রাঘবনের সঙ্গে বেশিদিনের আলাপ নয়৷ কিন্তু সে-ও এখন আমার বন্ধু হয়ে উঠেছে৷ এরা দুজনেই আমার প্রায় সমবয়েসি৷ ‘আর্যাবর্ত’-এর ব্রজলাল শর্মার সঙ্গে এবারই পথে আলাপ৷ ভদ্রলোকের বয়স পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ হবে৷ নাদুসনুদুস গড়ন, ভুঁড়ি আছে এবং তুখোড় রসিক লোক৷ জমিয়ে তুলতে ওস্তাদ৷ দৈনিক ‘পাঞ্জাব নিউজ’ এর সর্দারজি পাকা প্রৌঢ়৷ একটু গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ৷ কম কথা বলেন৷ দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিশাল আকারের সর্দারজিকে নিয়ে আড়ালে ঠাট্টা-তামাসা চলে৷ ওঁর সঙ্গে গতবছর বোম্বাইয়ে আলাপ হয়েছিল৷ মাঝে-মাঝে কলকাতা যান৷ ‘সত্যসেবক’ পত্রিকা অফিসে ফোন করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন৷ ওঁর প্রতি আমার যেভাবেই হোক, প্রচুর শ্রদ্ধা জন্মেছে৷

হ্রদের ধারে নির্জনে দাঁড়িয়ে উনি কী করছিলেন? একটু সন্দেহ দানা বেঁধেছিল মনে৷ আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই শব্দটুকুর প্রশ্রয় না দিয়ে পারিনি৷ দু’জনে পাশাপাশি দু-চারটে ছোটো বাক্যে দ্বীপের ভালোমন্দ নিয়ে মতামত দিতে-দিতে আমরা রেস্টহাউসে ফিরেছিলুম৷ তখনও শর্মার ঘরে তুখোড় আড্ডা চলেছে৷ আমাদের দেখে শর্মা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘পাওয়া গেছে৷ পাওয়া গেছে৷ জোড়া লাশের খোঁজ মিলেছে৷’

এতে খুব হাসাহাসি পড়ে গেল৷ এইসময় নীচের ডাইনিং হলে ডিনার খাওয়ার ডাক এল৷

খাওয়াদাওয়া শেষ হতে সাড়ে ন’টা বেজে গেল৷ তারপর শর্মা প্রস্তাব দিলেন: ‘এবার কিছুক্ষণ নৈশভ্রমণ না করলে নির্ঘাত পেটের গোলমাল হবে৷ অতএব ভদ্রমহোদয়গণ, চলুন, বেরিয়ে পড়া যাক৷’

ভার্মা বলল, ‘শিয়োর৷ পঞ্চপাণ্ডব মিলে দ্বীপটা জয় করে ফেলি৷ চলুন৷’

রাঘবন চাপা গলায় বলল, ‘কিন্তু দ্রৌপদী কোথায়? একজন দ্রৌপদী চাই৷’

শর্মা বললেন, ‘মাই গুডনেস! সর্দারজি কেমন কটমট করে তাকাচ্ছেন৷’

সর্দারজি হেসে ফেললেন৷ বললেন, ‘কিন্তু দোস্ত, দুঃখের বিষয় এ-দ্বীপে শুনেছি একজনও স্ত্রীলোক নেই৷’

বলতে যাচ্ছিলুম, ‘আছে’; কিন্তু সংযত হলুম৷ ট্যুরিস্টদের দলে বিচে কয়েকজন স্ত্রীলোক দেখেছি৷

পাঁচজনে বেরিয়ে পড়লুম৷ গেটে যেতেই দেখা হল ডক্টর রাজগোপালের সঙ্গে৷ রাস্তায় ওঁর গাড়ি৷ সবিনয়ে জানালেন, খুবই লজ্জিত এবং দুঃখিত যে, ডিনার টেবিলে উপস্থিত থাকতে পারেননি৷ একটা কাজে আটকে গিয়ে দেরি হয়ে গেল৷

আমরা সে-জন্যে যে কিছু মনে করিনি, পঞ্চমুখে বাক্যসহযোগে সে-বিষয়ে ওঁকে আশ্বস্ত করলুম৷ তারপর উনি বিদায় নিয়ে চলে গেলেন৷ ভার্মা বলল, ‘ডক্টর রাজগোপালের কোয়ার্টার কোনটা?’

সর্দারজি বললেন, ‘ল্যাবরেটরির ওপরতলায়৷’

শর্মা বললেন, ‘সর্দারজির সবতাতেই চোখ৷ এ রিয়্যাল অবজার্ভার৷’

কথা বলতে-বলতে আমরা দক্ষিণে সেই হ্রদের ধারে পৌঁছলুম৷ সর্দারজি জলের ধারে একটা চ্যাটালো পাথরের ওপর উঠে বসলেন৷ ওই পাথরে বসেই কর্নেল মাছ ধরছিলেন৷

শর্মা আর রাঘবন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে পূর্বে এগিয়ে গেলেন৷ আমি আর ভার্মা ঘাসের ওপর বসলুম৷ সর্দারজির কাছ থেকে আমাদের দূরত্ব দশ গজের বেশি নয়৷ তাঁর সামনে দক্ষিণে হ্রদ, বাঁ-দিকে উঁচু শর এবং নলখাগড়ার ঝোপ, ডানদিকে হ্রদের কিনারা বরাবর আস্তে ঢালু হয়ে নেমে এসেছে একটা টিলা—প্রচুর ঝোপঝাড়ে ভরা৷

হঠাৎ জলে একটা শব্দ হল৷ ভার্মা ও আমি মুখ তুলেছি, আবার শব্দ হল৷ জলে কিছু একটা পড়ল৷ ঢিল নয়, পাথরের চাঙড় পড়ার মতো চবাং করে শব্দ৷ তারপর আবিষ্কার করলুম, রাশভারি সর্দারজি পাথরের ওপর বসে কী ছুঁড়ে মারছেন জলে৷

ভার্মা হাসতে-হাসতে বলল, ‘ও কী, সর্দারজি! ব্যাঙ মারছেন নাকি?’

সর্দারজি একবারে ঘুরে হেসে বললেন, ‘স্রেফ খেয়াল!’

কখন রাস্তার ধার থেকে নুড়ির মতো পাথর কুড়িয়ে নিয়েছেন—সম্ভবত আসার সময়, এবং জলে ছুঁড়ে খেলা করছেন—এর প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার মানে হয় না৷ অনেক প্রবীণকে অনেক হাস্যকর কাজ করতে দেখা যায়৷

সর্দারজি ফের আপনমনে জলে নুড়ি ফেলতে থাকলেন৷ এবার নুড়িগুলো ছোটো বলেই মনে হল৷ আমরা ওদিকে আর মন দিলুম না৷ চাপা গলায় নানান গল্পগাছা করতে থাকলুম৷ ভার্মা পা ছড়িয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় কথা বলছিল৷ একটু পরে ঘড়ি দেখে সে উঠে বসল৷ বলল, ‘চলো চৌধুরী, একটু পায়চারি করে আসি৷ পেটটা ফুলে উঠেছে৷’

ডাকলুম, ‘সর্দারজি! হাঁটবেন নাকি কিছুক্ষণ?’

সর্দারজি জবাব দিলেন, ‘না ভাই৷ আপনারা হাঁটুন৷’

ভার্মা আর আমি হাঁটতে-হাঁটতে রাস্তা ধরে পূর্বে এগোলুম৷ কিছুদূর গিয়েই দেখি, শর্মা আর রাঘবন ফিরে আসছে৷ চারজনে রাস্তার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আবার একদফা কথাবার্তা এবং হাসাহাসি হল৷ তারপর শর্মা বলল, ‘চলো, রাত হয়েছে৷ ফেরা যাক৷’

চারজনে ফিরে এসে সেই ঘাসের জমির কাছে পৌঁছেছি, হঠাৎ বাঁয়ে সেই পাথরটার দিকে চোখ গেল৷ সর্দারজি জলে নেমেছিলেন—তখনই দু-হাতে পাথরটা ভর করে উঠে বসলেন৷ চপ্পল দুটো পাথরের ওপর রাখা আছে৷

শর্মা বললেন, ‘সর্দারজি! আসুন, শুয়ে পড়া যাক৷’

সর্দারজি উঠে পায়ে চপ্পল গলিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, চলুন৷’

জলে নেমেছিলেন—এটা কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়৷ এ-স্বভাব অনেকেরই থাকে৷ জল দেখে পা ধুয়ে নেওয়ার বাতিকও দেখেছি অনেকের৷

আমরা রেস্টহাউসে ফিরে এলুম৷ রাঘবন ও শর্মা এক ঘরে, আমি এবং ভার্মা তার পাশে শেষদিকের ঘরে; আর সর্দারজি একা একটা ঘরে শুতে গেলেন—রাঘবন ও শর্মার ঘরের ওপাশের ঘরটায়৷

ভার্মা বলল, ‘আলো না নেভালে আমার ঘুম হয় না, জয়ন্ত৷’

বললুম, ‘আমারও৷’

আলো নিভিয়ে ঘুমোবার চেষ্টা করলুম৷ কিন্তু নতুন জায়গায় ঘুম আসে না৷ চোখ বুজে এপাশ-ওপাশ করতে-করতে রাত একটা বেজে গেল৷ রেডিয়াম দেওয়া ঘড়ির কাঁটা সময় বলে দিল৷ ভার্মার নাক ডাকছে সমানে৷

সবে একটু তন্দ্রামতো এসেছে, কী একটা শব্দে সেটা কেটে গেল৷ চোখ খুলে দেখি, ভার্মা উঠে বসেছে৷ বাইরের আলোর সামান্য ছটা ঘরে প্রতিফলিত হয়েছে৷ তাই তাকে দেখতে পাচ্ছিলুম৷ সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে সম্ভবত৷ আবছাভাবে তার আউটলাইন নজরে পড়ছে৷

আমি শ্বাসপ্রশ্বাস ঘুমন্ত মানুষের মতো তালে-তালে নিচ্ছি৷ কর্নেলের সঙ্গে এ-দ্বীপে দেখা না হলে তো তখুনি কথা বলে উঠতুম, ‘কী হল, ভার্মা?’

ভার্মা পা টিপে-টিপে দরজার দিকে এগোল, তারপর সাবধানে দরজা খুলে বেরুল এবং বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল৷ আমার তখন উত্তেজনায় বুক কাঁপছে৷ তাহলে কি ভার্মাই সেই বিদেশি গুপ্তচক্রের এজেন্ট? এভাবে কোথায় গেল সে? ঘড়ি দেখলুম৷ রাত একটা ঊনষাট৷

দীর্ঘ দু-মিনিট পরে ভার্মা যেমন গিয়েছিল, তেমনই পা টিপে-টিপে ফিরে এল৷ শুয়ে পড়ল৷ উত্তেজনায় বাকি রাতটা আর ঘুমই এল না৷ দেখতে-দেখতে ভোরের আলোয় ঘর ভরে গেল৷ তখন আবার সেই তন্দ্রার ঘোরটা ফিরে এল৷ তারপর কখন সত্যি-সত্যি ঘুমিয়ে গেছি৷

সেই ঘুম ভাঙল বাইরে কী একটা চাপা গোলমাল শুনে৷ তাকিয়ে দেখি ঘরে রোদ ঢুকেছে৷ বিছানায় ভার্মা নেই৷ বাইরে কারা ব্যস্তভাবে চলাফেরা করছে৷ চাপা উত্তেজিত স্বরে কথা বলছে কারা৷ নীচের সিঁড়িতে বারবার কারা উঠছে এবং নেমে যাচ্ছে— সেইসব জুতোর শব্দ৷ লক্ষণটা ভালো নয়৷ উঠে বসলুম তক্ষুনি৷

দরজায় গিয়ে পরদা তুলে দেখি বারান্দায় ভার্মা, শর্মা এবং রাঘবন কথা বলছে৷ তাদের মুখে উত্তেজনার ছাপ৷ বললুম, ‘কী ব্যাপার, মিস্টার শর্মা?’

শর্মা গম্ভীর মুখে বললেন, ‘সাংঘাতিক কাণ্ড হয়ে গেছে, জয়ন্তবাবু৷ সর্দারজি ইজ ডেড৷’

চমকে উঠলুম৷ ‘সর্দারজি মারা গেছেন! সে কী?’

‘বোধহয় হার্ট অ্যাটাকে৷’— শর্মা বললেন, ‘রাতে দরজা খুলে বেরিয়েছিলেন—মানে বেরুতে যাচ্ছিলেন, তখনই পড়ে যান সম্ভবত৷ বডি অর্ধেক ঘরে অর্ধেক বাইরে পড়ে রয়েছে৷ দেখে আসুন না৷’

সর্দারজির ঘরের সামনে কর্মীদের ভিড়৷ গিয়ে উঁকি মেরে দেখলুম, উপুড় হয়ে পড়ে আছেন সর্দারজি৷ মুখটা কাত হয়ে আছে৷ নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে জমাট বেঁধে আছে৷ আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল!

চার

সামরিক হাসপাতালে সর্দারজির মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হল, তখন বেলা সাড়ে আটটা৷ ডাক্তার ভদ্রলোক সমর বিভাগের৷ নাম মেজর টি. আর. আনতুলে৷ তিনি এসে পরীক্ষা করে রায় দিয়েছেন, হ্যাঁ— হার্ট অ্যাটাকই বটে, তবু আইনত লাশের পোস্টমর্টেম করতে হবে৷ তাই লাশ সামরিক হাসপাতালের মর্গে গেল৷

দ্বীপে ছোট্ট একটা পুলিশ বিট আছে৷ সেটা বিচের ওদিকে৷ নেহাত ট্যুরিস্টদের রক্ষণাবেক্ষণে৷ অফিসার-ইন-চার্জ এসে রুটিনমাফিক সর্দারজির কিটব্যাগ হাতড়ে অনেক প্রেসক্রিপশান, হার্টের রোগের ওষুধ, রিপোর্টিং নোটবুক ইত্যাদি পরীক্ষা করেছেন৷

ডক্টর রাজগোপাল রেডিও-মেসেজ পাঠিয়েছেন ‘ডেলি পাঞ্জাব নিউজ’ পত্রিকার অফিসে৷ স্বরাষ্ট্র দফতরকেও খবর জানিয়েছেন৷ স্বরাষ্ট্র দফতরকে অনুরোধ করেছেন, এই ট্যুর প্রোগ্রাম উদ্যোক্তা বিজ্ঞান ও গবেষণা দফতরকে খবরটা পৌঁছে দিতে৷ শর্মার কাছে এসব জানতে পারলুম৷

তারপর একফাঁকে অধৈর্য হয়ে বেরিয়ে পড়লুম বিচের দিকে৷ হাঁটতে-হাঁটতেই গেলুম৷ সি-ভিউ হোটেলের বোর্ডারদের তালিকা দেখে দোতলায় কর্নেলের ঘরের দরজায় বোতাম টিপলে সাড়া এল, ‘এসো, জয়ন্ত৷’

বুড়ো ম্যাজিক জানেন সম্ভবত৷ ঢুকে দেখি, টেবিলে একগাদা ফটো নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন৷ পাশের সোফায় বসে বললুম, ‘আমিই বেল বাজিয়েছি, বুঝলেন কীভাবে?’

‘তোমার বোতাম টেপার ভঙ্গি আমার সুপরিচিত৷ তা ছাড়া, রেস্টহাউসে অমন একটা ঘটনার পর তোমার দৌড়ে আসাটা অনিবার্য ছিল৷ যাকগে, সংক্ষেপে বলো৷’

সর্দারজির নির্জনে হ্রদের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা, দ্বিতীয়বার সেখানে গিয়ে পাথরে বসে জলে নুড়ি ছুড়ে খেলা, জলে নামা, তারপর ভার্মার এত রাতে চুপিচুপি বেরুনো—সবটা উত্তেজিতভাবে বর্ণনা করলুম৷

শোনার পর কর্নেল বললেন, ‘হুম৷ আশা করি, এসব যা লক্ষ্য করেছ, আর কাকেও বলোনি?’

‘মোটেও না৷’

‘তোমার কি মনে হচ্ছে, সর্দারজির হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর ব্যাপারটা গোলমেলে?’

‘নিশ্চয়ই গোলমেলে৷’

‘কিন্তু ওঁর তো হার্টের অসুখ ছিল৷’

‘ছিল৷ তবু অত রাতে ভার্মার অমন করে চুপিচুপি বেরুনো...’

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘ওতে কিছু প্রমাণ হয় না৷ যাকগে, পোস্টমর্টেম রিপোর্টের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে৷ আপাতত তুমি আমার অতিথি৷ তোমার যথাবিহিত সৎকার করা আমার কর্তব্য৷ নিশ্চয়ই পেটপুরে ব্রেকফাস্ট খেতে পারোনি৷ তোমার মুখ দেখেই টের পাচ্ছি৷’

... বলে মৃদু হেসে কর্নেল ফোন তুললেন৷ ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিয়ে ছবিগুলো গোছাতে ব্যস্ত হলেন৷ কৌতূহলী হয়ে একটা ছবি তুলে নিলুম৷ নিছক প্রাকৃতিক দৃশ্য৷

কর্নেল ছবি ড্রয়ারে খামের মধ্যে রেখে বললেন, ‘এখনই যে-কোনও মুহূর্তে ডক্টর রাজগোপাল আসার কথা৷ তোমাকে আমার এখানে দেখে অবাক হয়ে যাবেন৷ তোমার-আমার সম্পর্কটা ওঁর কাছে এবার স্পষ্ট হওয়া ভালো৷’

‘ভালো৷’

একটু পরে ব্রেকফাস্ট এল৷ খেতে-খেতে দরজার ঘণ্টা বাজল৷ কর্নেল উঠে গিয়ে দরজা খুললেন৷ হ্যাঁ, ডক্টর রাজগোপালই৷ এবং আমাকে দেখে সত্যি অবাক চোখে তাকালেন৷ তখন কর্নেল সহাস্যে আমার এবং তাঁর সম্পর্কও ব্যাখ্যা করে দিলেন৷ ডক্টর রাজগোপাল অন্তরঙ্গভাবে আমার একটা হাত নিয়ে বললেন, ‘তাহলে তো খুবই সুখের কথা৷ জয়ন্তবাবুর সঙ্গে আলাপ হয়ে আশ্বস্ত বোধ করছি৷’

কর্নেল বললেন, ‘জয়ন্ত আমার দক্ষিণহস্তই বলতে পারেন৷ অতএব নির্দ্বিধায় আমরা ওর সামনে খোলাখুলি কথা বলতে পারি৷’

ডক্টর রাজগোপাল পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা কাগজ বের করে বললেন, ‘নকশাটা এনেছি৷ আপনাকে বুঝিয়ে দিই৷’

নিচু টেবিলে কাগজটা ছড়িয়ে রেখে ডক্টর রাজগোপাল বোঝাতে শুরু করলেন৷

‘ল্যাবরেটরির দুটো ব্লক৷ এ আর বি৷ বি-এর ওপরতলায় আমার কোয়ার্টার৷ বেডরুমের পাশের এই ছোটো ঘরটা দেখছেন, এটাই সেই লিফট৷ কিন্তু কিছুতেই বোঝা যাবে না৷ ঘরটা চমৎকার সাজানো৷ এখানে টেবিল, টেবিলে বোতাম টিপলে সামনের চেয়ারে বসা লোকেরা কিছু টের পাবে না৷ লিফটটা নিঃশব্দে নেমে যাবে একশো ফুট নীচে৷ এই দেখুন, দরজার বাইরে প্যাসেজ এবং প্যাসেজটা রাস্তার তলা দিয়ে হ্রদের তলায় গিয়ে পৌঁছেছে৷ প্যাসেজের শেষে একটা ঘর দেখছেন৷ এটাই সেই গোপন ল্যাবরেটরি৷ শুশুক-মানুষের ফরমুলা এখানে এই আলমারিতে রয়েছে৷ এ-দেওয়ালটা কাচের৷ ওপাশে হ্রদের জল৷ দৈবাৎ কাচের দেওয়াল ফেটে গেলে জলে সব ডুবে যাবে— প্যাসেজ এবং বি ব্লকের তলার ঘর অব্দি জল ঢুকে পড়বে৷ এই কাচের দেওয়ালে যন্ত্র ফিট করা রয়েছে৷ ওপাশে শুশুক-মানুষগুলো দেখা যাবে৷ দেওয়ালের যন্ত্রে বোতাম টিপে ওদের সঙ্গে সংকেতে যোগাযোগ করা যায়৷ হ্রদের কোনও তথ্য আনতে বললে তক্ষুনি ওরা চলে যায় এবং যথাসময়ে এসে দেওয়ালের ও-পিঠের নির্দিষ্ট বোতামটি টেপে৷ এ-পাশের কম্পিউটারে ডেটাগুলো সঙ্গে-সঙ্গে বিশ্লেষিত হয়ে তথ্যটি আমরা পেয়ে যাই৷’

শোনার পর কর্নেল বললেন, ‘হ্রদটার সঙ্গে তো সমুদ্রের যোগ আছে?’

‘আছে৷ দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে৷ একটা খাঁড়ি এসে ঢুকেছে হ্রদে৷ দু-ধারে উচু প্রবাল-পাঁচিল৷’

‘জল লোনা দেখেই সেটা টের পেয়েছিলুম৷’

আমি হতভম্ব হয়ে গেছি৷ এবার বললুম, ‘তা হলে তো দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে সেই দিয়াগো গার্সিয়ার মার্কিন ঘাঁটির খবর আনাও সম্ভব৷’

ডক্টর রাজগোপাল সগর্বে বললেন, ‘ভারতীয় বিজ্ঞানীরা তা সম্ভব করেছেন৷ ওই ঘাঁটির তাবৎ তথ্য আমরা নিয়মিত পাচ্ছি৷ শুশুক-মানুষরা এনে দিচ্ছে৷ এবং এ-জন্যেই এত সতর্কতা৷ আমেরিকা ব্যাপারটা টের পেলে আমাদের এই ল্যাবরেটরি ধ্বংস করতে এজেন্ট পাঠাবেই৷ তবে আপাতত সেরকম কোনও আশঙ্কার কারণ নেই৷ শুধু শুশুক-মানুষের গবেষণার খবর বিশেষ একটি দেশ কীভাবে পেয়ে গেছে, জানি না৷ ওরা আমাদের ফরমুলাটা হাতাতে চায়৷’

বললুম, ‘আপনি নিশ্চয়ই সাংবাদিকদের ওই পাতাল ল্যাবরেটরিতে নিয়ে যেতেন না?’

হাসলেন ডক্টর রাজগোপাল৷ ‘না৷ মোটামুটি ওপরের গবেষণাঘরে সব দেখিয়ে একটা আভাস দিতুম, এইমাত্র৷ আমার আবিষ্কারের মূল কথাটা গোপন রেখে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ সাফল্য সম্পর্কে বিবরণ দেওয়াই সরকারের প্রোগ্রাম৷ অবশ্য ব্যাপারটা হাইলি টেকনিকাল৷’

কর্নেল বললেন, ‘যাক গে৷ নকশাটা আমার কাছে রইল৷ এবার বলুন, গতরাতে কী ঘটেছে?’

ডক্টর রাজগোপাল গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ফোনে একটুখানি আভাস দিয়েছিলুম আপনাকে৷ কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি অদ্ভুত৷’

কর্নেল সোফায় শরীর এলিয়ে চুরুট ধরালেন৷ চোখ বুজে বললেন, ‘হ্যাঁ৷ বলুন৷’

‘তখন রাত প্রায় দুটো৷ হঠাৎ কেন কে জানে, ঘুম ভেঙে গেল৷ উঠে বসলুম৷ আপনি তো জানেন, এখানে ফ্যামিলি রাখার নিয়ম নেই৷ একা থাকি৷ তো ঘুম ভাঙার পর পশ্চিমের জানলায় গিয়ে দাঁড়ালুম৷ ওদিকে সমুদ্র৷ কয়েকটা আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছিল৷ জেলে নৌকো মনে হল৷ কিন্তু একটু পরেই একটা নৌকো থেকে জোরালো একঝলক আলো একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে ছড়িয়ে তারপর নিভে গেল৷ সংকেত দেখাচ্ছে নিশ্চয়৷ দ্রুত দক্ষিণের জানলায় গেলুম৷ ওদিকে হ্রদের পশ্চিমপাড়ের পাহাড়৷ পাহাড় না বলে টিলা বলাই উচিত৷ ঝোপে ভরতি৷’

‘হ্যাঁ৷ দেখেছি৷ একদৌড়ে ওঠা যায়৷’

‘অবাক হয়ে দেখলুম, টিলার ওপর থেকেও ঠিক ওইরকম আলো একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে সঞ্চালিত হল৷ তারপর নিভে গেল৷ আলোটা কিন্তু সমুদ্রের দিকে নয়৷ রেস্টহাউসের দিকে৷ একটা কিছু অনুমান করে পুবের জানলায় গেলুম৷ আশ্চর্য, রেস্টহাউসের দোতলার বারান্দা থেকে কে টর্চ জ্বেলে ঠিক অমনি দু’বার আলো ফেলল৷’

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘ভার্মা৷ নিশ্চয়ই ভার্মা!’

ডক্টর রাজগোপাল আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘ভার্মা! তার মানে?’

কর্নেল হো-হো করে হেসে বললেন, ‘ভার্মাই যে আলোর সংকেত করল, তুমি কি দেখেছ জয়ন্ত?’

অপ্রস্তুত হয়ে বললুম, ‘না৷ তা দেখিনি৷ তবে ঠিক ওই সময় সে...’

হাত তুলে কর্নেল বললেন, ‘তা না দেখলে ওই সময় সে কী করতে বেরিয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করে কোনও সিদ্ধান্তে আসা যায় না৷ ও-কথা থাক৷ ডক্টর রাজগোপাল কি নৌবাহিনীর কাছে ব্যাপারটা জানিয়েছেন?’

ডক্টর রাজগোপাল বললেন, ‘তখনই জানিয়েছিলুম৷ স্টিমবোট নিয়ে ওরা ওত পেতেছিল ওদিকটায়৷ এখনও অব্দি কোনও খবর নেই৷’

কর্নেল বললেন, ‘ওটা চোরাচালানিদের সংকেত হতেও পারে৷ রেস্টহাউসের কোনও কর্মী যে চোরাচালান-চক্রে জড়িত নয়, কে বলতে পারে?’

ডক্টর গোপাল বললেন, ‘হ্যাঁ৷ তা-ও ঠিক৷ একবার তো ধরা পড়েছিল একজন৷ এখনও সে জেল খাটছে৷’

পাঁচ

রেস্টহাউসে ফিরে দেখি ততক্ষণে কড়া পাহারা বসে গেছে৷ সমুদ্র-বিজ্ঞান ভবন ঘিরে সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে৷ রেস্টহাউসের গেটে পরিচয়পত্র দেখিয়ে তবে ঢুকতে পেলুম৷ ওপরে বারান্দায় ভার্মা, রাঘবন এবং শর্মার সঙ্গে দেখা হল৷ তিনজনেই গম্ভীর মুখে কীসব আলোচনা করছিল৷ আমাকে দেখে শর্মা বললেন, ‘খুব তালে আছ, ব্রাদার৷ লম্বাচওড়া একখানা ডেসপ্যাচ ঝেড়ে এলে তোমার কাগজের জন্যে৷ তাই না?’

মুচকি হেসে মাথা দোলালুম৷ রাঘবন বলল, ‘আর আমাদের বরাত দ্যাখো! বেরুতে দিচ্ছে না৷’

ভার্মা বলল, ‘জয়ন্ত খুব স্বার্থপর৷ যাওয়ার সময় আমাকে ডেকে গেল না৷’

অবাক হয়ে বললুম, ‘বেরুতে দিচ্ছে না মানে?’

শর্মা বললেন, ‘চারদিকে তাকিয়ে টের পাচ্ছ না?’

ভার্মা উত্তেজিতভাবে বলল, ‘খুব অপমানজনক ব্যাপার কিন্তু৷ সাংবাদিকদের হয়রান করার ঠেলাটা কী জানে না৷ ফিরে গিয়ে যা কাণ্ড করব৷’

বললুম, ‘কিন্তু হঠাৎ এমন কী ঘটল যে...’

বাধা দিয়ে রাঘবন বলল, ‘সর্দারজির পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নাকি কী গোলমেলে ব্যাপার আছে৷ মার্ডার বলে সন্দেহ করা হচ্ছে৷ স্টমাকে বিষ পাওয়া গেছে৷’

শর্মা বললেন, ‘হাতি পাওয়া গেছে! ছাড়ো তো৷’

ভার্মা বলল, ‘খামোকা হয়রানি৷ কখন বোম্বে থেকে ফরেনসিক এক্সপার্ট টিম আসবে, ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের অফিসাররা আসবে, আমাদের জেরা করবে—তারপর আমাদের মুক্তি৷’

শর্মা রসিকতা করলেন, ‘মুক্তি না হাজত, কে বলতে পারে, ব্রাদার? জয়ন্ত, তুমি বোকার মতো ফিরে এলে কেন, বলো তো? দিব্যি কেটে পড়তে পারতে৷’

আমরা শর্মার ঘরে গিয়ে বসলুম৷ একটু পরে লাঞ্চের ডাক এল৷ নীচে ডাইনিং হলে গিয়ে খেয়ে এলুম৷ তারপর শর্মার ঘরে আবার কিছুক্ষণ কথাবার্তা হল৷ আমার ঘুম পাচ্ছিল৷ নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়লুম৷

ভার্মা আমাকে ওঠাল যখন, তখন বিকেল সাড়ে চারটে৷ সে চাপা গলায় বলল, ‘উঠে বসো, জয়ন্ত৷ কাঠগড়ায় যাওয়ার জন্যে তৈরি হও৷ এক্সপার্ট ব্যাটারা এসে গেছে৷’

সেই সময় চায়ের ট্রে আনল একজন বেয়ারা৷ এতক্ষণে ডক্টর রাজগোপালও এলেন৷ ঘরে ঢুকে বিনীতভাবে বললেন, ‘আপনাদের নিশ্চয়ই খুব অস্বস্তি এবং অসুবিধের মধ্যে কাটাতে হচ্ছে৷ সে-জন্যে আমি খুবই দুঃখিত৷ ক্ষমা চাইছি৷ এমন পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিত ছিল৷ যাই হোক, রুটিন তদন্ত হয়ে গেলেই আপনাদের ফেরার ব্যবস্থা হয়ে যাবে৷ তবে সেটা আজ রাতে সম্ভব নয়৷ আগামীকাল সকাল সাতটায় বিমানবাহিনীর প্লেনে আপনারা ফিরতে পারবেন৷’

ভার্মা বলল, ‘খুব ভালো খবর৷ কিন্তু ডক্টর রাজগোপাল, আমাদের কাগজে ডেসপ্যাচ পাঠাতে দেওয়া হচ্ছে না৷ দিস ইজ সিরিয়াস৷’

ডক্টর রাজগোপাল বললেন, ‘প্লিজ৷ বলেছি, অপ্রত্যাশিত অবস্থা৷ ক্ষমা করবেন—উপায় নেই৷’

আমি বললুম, ‘আপনাদের ল্যাবরেটরি দেখাবার প্রোগ্রাম?’

‘দুঃখিত, মিস্টার চৌধুরী৷ সব প্রোগ্রাম বাতিল হয়েছে৷ যে-জন্যে আপনাদের আনা হল, বর্তমান অবস্থায় সেটা আর কার্যকর করা যাচ্ছে না৷ সরকারের কঠোর নির্দেশ৷’

উনি শর্মাদের ঘরে গেলেন৷ ভার্মা এবং আমি চা খেতে-খেতে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছিলুম৷ হঠাৎ ভার্মা উঠে দক্ষিণের জানলায় গিয়ে বলল, ‘দেখে যাও, জয়ন্ত৷ হ্রদে লঞ্চ ঢুকিয়েছে৷ আরে! ডুবুরি নামিয়েছে যে! ব্যাপার কী?’

জানলার কাছে গিয়ে দেখি, নৌবাহিনীর লঞ্চ হ্রদের মাঝখানে ভেসে রয়েছে এবং সত্যি ডুবুরি নেমেছে৷ কতকটা অনুমান করতে পারছি, অনেকটাই পারছি না৷ নিশ্চয়ই জলের তলার সেই গোপন ল্যাবরেটরিতে কোনও গণ্ডগোল বেধেছে৷

একটু পরে আমাদের ডাক এল নীচে৷

রেস্টহাউসের ড্রয়িংরুমে আমাদের চারজন সাংবাদিককে বসতে বলা হল৷ বুঝলুম, অফিসের মধ্যে কাদের জেরা করা হচ্ছে৷ মিনিট-দশেক পরে প্রথম ডাক এল শর্মার৷ পাঁচ মিনিট পরে রাঘবনের৷ কিন্তু ওরা কেউ বেরুল না৷

এর পর আমার ডাক এল৷ ভেতরে গিয়ে দেখি, বিরাট টেবিলের ওপাশে গোমড়ামুখো চারজন লোক বসে রয়েছেন৷ সবাই সিভিলিয়ান পোশাক পরা৷ এবং তাঁদের মধ্যিখানে বসে আছেন আমার বৃদ্ধ বন্ধু ও প্রখ্যাত ঘুঘু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার৷

প্রশ্ন প্রত্যেকেই করলেন৷ আমি এখানে এসে যা-যা দেখেছি, সব বললুম৷ তারপর আমাকে পেছনের দিকে একটা সোফায় বসতে বলা হল৷ সেখানে শর্মা আর রাঘবন বসে আছে৷ অন্য পাশে কয়েকটা চেয়ার৷ সেখানে রেস্টহাউসের কয়েকজন কর্মী বসে আছে৷ শর্মা মুচকি হাসলেন৷ আমিও হাসলুম৷

এবার ভার্মা এল৷ তার নামধাম পরিচয়পত্র ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক ব্যাপার যথারীতি চুকে গেল৷ তারপর কর্নেল বললেন, ‘মিস্টার ভার্মা, আপনি গত রাতে আন্দাজ দুটোর সময় কি বাইরে বেরিয়েছিলেন?’

ভার্মা চমকে উঠল৷ তারপর একটু হেসে বলল, ‘হ্যাঁ৷ বেরিয়েছিলুম৷’

‘কেন বেরিয়েছিলেন, তার সদুত্তর নিশ্চয়ই পাব আশা করছি৷’

‘পাবেন৷ আমার বিছানা থেকে পশ্চিমের জানলার বাইরে দেওয়ালের খানিকটা অংশ দেখা যায়৷ নতুন জায়গায় ঘুম ডিস্টার্বড হয়৷ রাত দুটো নাগাদ হঠাৎ ঘুম ভেঙে তাকাতেই দেওয়ালের ওই জায়গায় দেখলুম, আলো পড়ল এবং নিভে গেল৷ আমি একজন সাংবাদিক৷ সব ব্যাপারে আমার কৌতূহল আছে৷ গাড়ির শব্দ নেই— অথচ অমন জোরালো আলো পড়ার কারণ কী? তাই বেরিয়ে গেলুম৷ কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিন্তু বাইরে তেমন কিছু দেখলুম না৷ তখন ঘরে এসে শুয়ে পড়লুম৷’

‘তখন বারান্দা নিশ্চয়ই অন্ধকার ছিল না?’

‘ছিল৷ তাই একটু অবাকও হয়েছিলুম৷’

‘সর্দারজির ঘরের দিকে তাকিয়েছিলেন কি?’

‘না৷ তবে...’

‘তবে?’

‘ওদিকে দরজা খোলার শব্দ—মানে আবছা শব্দ শুনেছিলুম, মনে পড়ছে৷ তবে অতটা খেয়াল করিনি৷ ভীষণ জোরে বাতাস বইছিল৷ আর হ্যাঁ, শুয়ে পড়ার পর বাইরে সিঁড়িতে কে নেমে গেল মনে হচ্ছিল৷’

‘আপনি সমুদ্রবিজ্ঞান ভবনে কীসব কাজকর্ম হচ্ছে, জানেন নিশ্চয়ই?’

‘জানি না৷ অনুমান করি, নিশ্চয়ই সাংঘাতিক কিছু হচ্ছে৷ তা না হলে আমাদের আনা হল কেন?’

‘আপনার অনুমান সম্পর্কে কিছু জানাবেন কি?’

ভার্মা একটু চুপ করে কী যেন ভাবল৷ তারপর বলল, ‘শুনেছি, শুশুকের ওপর কী সব পরীক্ষা করে ডক্টর রাজগোপাল সফল হয়েছেন৷ জাস্ট শোনা কথা৷’

‘কোথায় শুনলেন?’

‘কিছুদিন আগে বোম্বাই সমুদ্র-বিজ্ঞান ভবনে গিয়েছিলুম৷ সেখানেই ডক্টর কার্নিকার কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন৷ অবশ্য উনিও স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি৷’

‘সর্দারজির সঙ্গে আপনার কতদিনের আলাপ?’

‘মাত্র গতকাল৷ মারগাঁও বিমানঘাঁটিতে৷ তবে ওঁর নাম শুনেছিলুম আগে৷’

কর্নেল একটা ছবি এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এঁকে চেনেন নাকি দেখুন তো?’

ভার্মা বলল, ‘না৷ কে ইনি?’

সে-কথার জবাব না দিয়ে কর্নেল বললেন, ‘ঠিক আছে৷ আপনি প্লিজ আপনার বন্ধুদের কাছে গিয়ে বসুন৷’

ভার্মা গম্ভীর মুখে আমাদের কাছে এসে বসে পড়ল৷ ওখানে ডাক পড়ল আবার কার৷ একটু পরে দেখলুম, এক বেঁটে ভদ্রলোক, কালো কুচকুচে, প্রকাণ্ড শরীর—হাসিমুখে ঢুকে নমস্কার করে বসলেন৷

কর্নেল বললেন, ‘আপনার নাম ডক্টর সত্যকাম আচার্য? অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’

‘আপনি গতকাল এখানে ছিলেন না শুনলুম৷’

‘হ্যাঁ৷ বোম্বে গিয়েছিলুম পরশু বিকেলে৷ ফিরেছি একটু আগে৷ তারপর...’

‘কিন্তু আমার যদি চোখের ভুল না হয়, তাহলে বলব, গতকাল সন্ধ্যায় আপনি সি-বিচে ওপেন এয়ার রেস্তোরাঁয় বসে একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন৷’

মিস্টার আচার্য লাফিয়ে উঠে বললেন, ‘অসম্ভব! আপনি ভুলই দেখেছেন৷’

কর্নেল টেবিলে রাখা খাম থেকে একটা ছবি বের করে বললেন, ‘তাহলে এ-ছবি কার?’

মিস্টার আচার্যের চেহারা আরও কালো হয়ে গেল৷ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন৷

কর্নেল বললেন, ‘আমার একটা বিচিত্র ধরনের ক্যামেরা আছে৷ অন্ধকার বা আলোর ধার ধারে না৷ এর ইলেকট্রনিক সিস্টেম অদ্ভুত৷ দরকার মতো অদৃশ্য আলো কোনও জিনিসের ওপর ফেলে তার ছবি তোলা যায়৷ গতকাল আমি আপনার কাছাকাছি বসেছিলুম, মিস্টার আচার্য৷’

ভদ্রলোক একটি কথাও বললেন না৷ কর্নেলের ডানপাশের ভদ্রলোক টেবিলের একটা বোতাম টিপলেন৷ একজন পুলিশ অফিসার ঢুকলেন৷

‘ডক্টর আচার্য, আপনাকে আমরা গ্রেফতার করলুম৷ আপনার বিরুদ্ধে সরকারের অভিযোগ, আপনি বিজ্ঞান-ভবনের ল্যাবরেটরি ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন৷ সেইসঙ্গে একটি দেশকে আমাদের মূল্যবান একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফরমুলা পাচারের ষড়যন্ত্র করেছিলেন৷ ‘দৈনিক পাঞ্জাব নিউজ’-এর সাংবাদিক সর্দার শোভন সিংকে বেআইনিভাবে বোম্বেতে আটকে রেখে একজন জাল সাংবাদিক পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন৷ এই জাল সাংবাদিক আর কেউ নয়— কুখ্যাত অপরাধী সুন্দরলাল৷’

এবার ডক্টর আচার্য বিকট হেসে উঠলেন৷ বললেন, ‘কিস্যু প্রমাণ করতে পারবেন না৷’

কর্নেল বললেন, ‘প্রমাণ জেলে-বস্তির ডুবুরি রঘুরাম৷ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে৷ হ্রদের তলায় ল্যাবরেটরির দেওয়ালে ডিনামাইট বেঁধে রেখে এসেছিল সে—আপনার নির্দেশে৷ সর্দারজি-বেশী সুন্দরলালের ওপর দায়িত্ব ছিল, সে হ্রদের ধারে পাথরের তলা থেকে তারদুটো খুঁজে বের করবে এবং সুযোগমতো নেগেটিভ-পজিটিভ জুড়ে দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটাবে৷ কিন্তু আমি মাছ ধরতে গিয়ে তারদুটো দেখতে পেয়েছিলুম৷ তারদুটো অন্য জায়গায় সরিয়ে রাখার ফলে সুন্দরলাল গত রাত্রে খুঁজে পায়নি৷ এই খবর সে আপনাকে পাঠায় রেস্টহাউসের বেয়ারা সুলতানের মারফত৷ সুলতান কবুল করেছে সে-কথা৷ যখন আপনি খবর পেলেন, তার ঠিক জায়গায় নেই—তখনই টের পেলেন, যেভাবে হোক, ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে গেছে৷ সুলতানের হাতে বিষবড়ি পাঠালেন৷ সুন্দরলাল ইদানীং হার্টের অসুখে ভুগছিল৷ সুলতান সুন্দরলালের জলের গেলাসে বিষবড়িটি ফেলে দিয়েছিল৷ আরও বলব? ডুবুরি রঘুরামকেও আপনি হত্যা করতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু সে ভাগ্যক্রমে গভীর সমুদ্রে জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়েছিল৷ আরও জানতে চান?’

সি-ভিউ হোটেলে ফেরার পথে কর্নেল বললেন, ‘তোমার বন্ধুরা চলে যাক, জয়ন্ত৷ তুমি এই বুড়োকে সঙ্গ দাও৷ আমরা দু’জনে এই দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করি৷ হ্রদের জলে প্রচুর মাছ৷ মাছ ধরি৷ কী? রাজি তো?’

বললুম, ‘আপনি সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বললেও রাজি!’

অধ্যায় ১ / ২৩
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%