হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
ভীষণ অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। জোরে পা চালিয়ে হাঁটতে গিয়ে কিছু একটার সঙ্গে ধাক্কা খেলেন পিলেকান্ত গলুই। দু’পক্ষ থেকেই ‘অ্যাঁক’ গোছের দুটো শব্দ বেরোল। ও পক্ষ জিজ্ঞেস করল, ‘কে গা, আমাদের ন্যাঁলা নাঁকি? আঁর বোঁলো নাঁ। এঁই বেঁদ্ধ বয়সে চোকে ভাল দেঁখতেও পাইনে। একে অঁমবস্যা তাঁয় লোঁডশেডিং। যাচ্ছিলাম খেঁদির ঠাকমার ঘাঁড় মটকাতে। গিয়ে দেঁখি আমার চে’ বুড়ির গায়ে জোর বেশি। দাঁওয়ায় গিয়ে ডাঁড়িয়েচি কি ঘাড়ে এসে পড়ল আধমনি এক ঘুঁটের বস্তা। এখনও ঘাঁড়টা টনটন কঁরচে। তা আমাদের ন্যাঁলা বুঁঝি?’
চোখে দেখতে না পেলেও পিলেকান্ত সানুনাসিক কন্ঠ শুনে বুঝতে পারলেন কার খপ্পরে পড়েছেন। ঘাড় মটকানোর কথা শুনে তো তাঁর মাথায় হাত। না, ঘাড়ে হাত। শিরা-উপশিরা দিয়ে বরফের স্রোত বয়ে গেল যেন। ‘হ্যাঁ কি ‘না’ বলবেন ভেবে পেলেন না তিনি। হ্যাঁ বললে হয়তো ন্যালা ভেবে গায়ে হাত দেবে না। কারণ ভূত ভূতের ঘাড় মটকায় না। যদিও ‘হ্যাঁ’ বললে অন্যান্য বিপদ আছে। রাস্তায় এগিয়ে দিতে বলবে বা বাড়ি নিয়ে যেতে চাইবে। আবার না বললেও বিপদ। ঘাড় মটকে দেবে। কী করবেন ভাবতে থাকেন পিলেকান্ত। হাতে সময় বড্ড কম। এই উভয় সঙ্কটে উপস্থিত বুদ্ধিই সম্বল।
নাকিসুরে কোনওমতে হ্যাঁ বলে তিনি এক দৌড়ে পগার পার হলেন। কিন্তু এ বড় সহজ কাজ নয়। ভুতেরা তো হাওয়ার বেগে দৌড়য়। পিলেকান্ত অন্ধকারের মধ্যেই শোনেন সেই নাকিসুরটা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হেসে বলছে, ‘‘আমার চোখকে ফাঁকি? আগে আমি ডিটেকটিভ ছিলাম, সত্যি কথা বলতে কী, গায়ে ফোসকা পড়ে? বাড়িতে বাপ-মায়ে বুঝি এই শিক্ষে দেয়? আমাদের ন্যালা কথাই বলতে পারে না। আর তুমি কিনা দিব্যি ‘হ্যাঁ’ বলে দৌড় মারলে? দাঁড়াও, দেকাচ্চি মজা।’’
ন্যালা নামে অপোগন্ডটি যে কথা বলতে পারে না তা কে জানত? এই প্রথম পিলেকান্তর উপস্থিত বুদ্ধি ব্যর্থ হল। পিলেকান্ত ভাবতে লাগলেন অন্য কায়দার কথা। মাথা খাটালে নতুন কায়দা আসতে বাধ্য।
পিলেকান্ত মামার বাড়ি থেকে ফেরবার পথে হাতে করে আনছিলেন সাইকেলের পাম্প। ওটাকে ঘিরেই ভাবতে লাগলেন নতুন কায়দা। পিলের ভাবনাচিন্তার মধ্যেই লিকলিকে ঠান্ডা হাতটা এগিয়ে এসেছে তাঁর ঘাড়ের দিকে। অন্য উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োগ করলেন তিনি, ‘যেখানে হাত দিয়েছ ওটা আমার ঘাড়ই নয়। ড্রাগনদের বুঝি এখানে ঘাড় থাকে? পড়াশোনা কিসসু করোনি মনে হচ্ছে?’ বললেন-পিলেকান্ত। অট্টহাসি হেসে। পড়াশোনার কথা শুনে বৃদ্ধ ভূচটার সম্মানে লাগল। সেদিনের ছেলে, সে কিনা পড়াশোনার কথা তুলছে? তিনি রাগত স্বরে বললেন, ‘তুমি লেখাপড়ার কী বোঝো হে ছোকরা? তুমি কি ভাবছ আমি তোমার ঘাড়ে হাত দিতে চেয়েছি? বড় অল্প বয়সে এঁচড়ে পেকেছ দেখছি।’

বাবাজীবন আমার পেটটা যে ফুলে উঠেছে....
পিলেকান্ত বললেন, ‘যেখানেই হাত দাও না কেন, ড্রাগনের মৃত্যু নেই। যেখানে একফোঁটা রক্ত পড়ে সেখান থেকে দশটা ড্রাগন গজায়। বাঁচতে চাও তো ভালয়-ভালয় কেটে পড়ো। খেঁদির মা’রই ঘাড় মটকাতে পারোনি, তোমার ভাগ্যে আজ কাঁচকলাই জুটবে।’
বৃদ্ধ ভূতটা বেদম রেগে বলল, ‘ওসব খোকাভোলানো গল্প আমাকে শুনিয়ে লাভ নেই। ড্রাগন-ফ্রাগন সব ভাঁওতা, বুজরুকি। ওসব শুনিয়ে সুবিধে হবে না। ড্রাগন বিশ্বাসই করি না!’
পিলেকান্ত ঝটপট বললেন, ‘ভূতকেও তো মানুষ বিশ্বাস করে না। তাই বলে কি ভূত নেই? তুমি নেই? এভাবে কাউকে ‘‘ইনসাল্ট’’ করা মানে নিজেকেই ছোট করা। তা ছাড়া তুমি ভূত, তারই বা সুস্পষ্ট প্রমাণ কই? তোমার চোখ ভাঁটার মতো জ্বলছে কই? তোমার পা কি হাঁসের পায়ের মতো ওলটানো? প্রমাণ ছাড়া আজকের যুগে কোনও কিছু অচল। আমি ‘চ্যালেঞ্জ’ করতে পারি তুমি ভূত না। ভূতের নাম ভাঙিয়ে খাচ্ছ।’
ভূতটা কিছুটা হতাশ হয়ে ঘাড় ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘এ তো আচ্ছা বেল্লিকের পাল্লায় পড়া গেছে দেখছি। তুমি আমাকে জোচ্চোর বললে এত বড় আস্পদ্দা? আমি জাল? মার্কশিট, রেশনকার্ড, সই, দলিল এইসব জাল হয় শুনেছি। তুমি বলতে চাও ভূতেরও জাল বেরিয়েছে? ভূতেও ভেজাল?’
এভাবে তুমুল তর্ক বেধে গেল ভূত বনাম পিলেকান্তর। এক ঘন্টা যায়, দু’ ঘন্টা যায়, তবু তর্কের শেষ নেই। কেউ কারও চেয়ে কম যায় না। কে মানুষ কে ভূত, এটা ভুলে গিয়ে তর্কটাই ওদের কাছে আসল হয়ে ওঠে। খিদেতেষ্টা ভুলে ওরা শুধু তর্কই করে যায়। আসলে ‘প্রেস্টিজ ফাইট’। কে কার চেয়ে বেশি জ্ঞানী এটা প্রমাণ করার জন্য ওরা আদাজল খেয়ে লাগে।
ভুতটা বলে, ‘আমাদেরও কি ‘আইডেন্টিটি কার্ড’ নিয়ে ঘুরতে হবে না কি?’
পিলেকান্ত বলে, ‘একটু সরে দাঁড়াও। গায়ে বড্ড দুর্গন্ধ। সাতজন্মে দাঁত মাজো না বোধহচ্ছে।’ ভূতটা খেপে উঠে বলে, ‘আমার নয় গায়ে, আর তোমাদের গোটা শহর জুড়ে যে দুর্গন্ধ। তার বেলা আঁটিসুঁটি? ভূতেদের ‘সিভিক সেন্স’ মানুষদের চেয়ে বেশি। ভূতেরা কলার খোসা রাস্তায় ফেলে না, বাড়ির পাশে আবর্জনা ফেলে না, ভূতেরা হিংসে করে না কাউকে।’
পিলেকান্ত দমবার নন। বলেন, ‘বাজে কথা রাখো। মানুষেরা হিংসুটে, এ-কথা ভূতের মুখে শুনতে হবে? মুখ সামালকে বাত বোলো।’
রাত তিনটের সময় গলদঘর্ম ভূতটা বলে ওঠে, ‘এই যে বাবা, এতক্ষণ ড্রাগনের হয়ে ওকালতি করছিলে, এখন মানুষের কথা তুলতেই যে গায়ে বড় ছ্যাঁকা পড়ল? আমাকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে? আসলে তুমি মানুষ, এ-কথা স্বীকার করলেই তো গোল চুকে যেত।’
পিলে অন্ধকারে জিভ কাটলেন, সত্যিই তো। তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে ভুলে গিয়েছিলেন যে, তিনি মানুষ তা বুঝতে দেওয়া চলবে না। মুখে বললেন, ‘ছি:! নিশাচরবাবু ছি:। ড্রাগন বলে কি মানুষ নয়? তার কি মায়া দয়া, সাধ-আহ্লাদ, ভাব-ভালবাসা কিছুই থাকতে নেই? ছি:! আপনার প্রতি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল। সে শ্রদ্ধা আপনিই নষ্ট করে ফেলছেন। কেন এই সন্দেহ বাতিক? আপনার তো বুদ্ধি আছে। যুক্তিই হল সভ্যতার এগিয়ে চলবার হাতিয়ার। সেই যুক্তি দিয়ে আপনি প্রমাণ করতে পারেন, আমি মানুষ? ছেলেবেলায় পড়া করতাম না বলে আমার বাবা মা’কে বলতেন, এই ছেলেটা মানুষ হবে না। বাবার কথা রেখেছি। আমি সত্যিই মানুষ হইনি। মানুষ হতে আমার বয়েই গেছে। মানুষের চেয়ে অনেক ভাল কিছু হওয়ার আছে। গায়ে হাত না দিয়ে আপনি বুদ্ধির সাহায্যে প্রমাণ করুন, আমি মানুষ না ড্রাগন। যদি প্রমাণ হয় আমি মানুষ, তবে এমন একটি জিনিস আপনাকে উপহার দেব যাতে আপনি সশরীরে স্বর্গে যেতে পারবেন অথবা যা চাইবেন তাই পাবেন। আর আপনি যদি হেরে যান তা হলে আমাকে কিছু দিতে হবে না। প্রতিজ্ঞা করতে হবে কোনওদিন আমার ছায়া মাড়াবেন না।’
ভূতটা মেনে নিল ওই শর্ত এবং বলল, ‘দু’ মিনিটের মধ্যে আমি প্রমাণ করে দেব তুমি মানুষ। প্রথমত, তুমি নাকিসরে কথা বলছ, মাঝেমধ্যে বলছ না, এতে প্রমাণ হয়...’
পিলেকান্ত হাত নেড়ে সর্দির অজুহাত তুলে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলেন। ভূতটা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘লেট মি ফিনিশ—এতে প্রমাণ হয় তুমি মানুষ। দ্বিতীয়ত, ড্রাগনের থাকে লেজ, নাক-মুখ দিয়ে আগুনের হলকা বের হয়। তোমার এসব নেই।’
পিলেকান্ত বলতে যাচ্ছিলেন, ‘আমার লেজ নেই তুমি অন্ধকারে বুঝছ কী করে?’ কিন্তু কথা না বাড়িয়ে চেপে গেলেন।
ভূতটা বলে চলেছে, ‘তৃতীয়ত, তুমি প্রচন্ড মিথ্যুক। মানুষেরাই মিথ্যেবাদী হয়, ড্রাগন বা ভূতেরা মিথ্যের পরোয়া করে না। চতুর্থত, এর মধ্যে একবার খৈনি ডলে খেয়েছ, ভেবেছ আমি খেয়াল করিনি। এতটুকু বয়সে এসব ভাল নয় বাবাজীবন, পঞ্চমত...’
পিলেকান্ত দেখলেন আর একটু পরেই আকাশ ফরসা হয়ে যাবে। তার আগেই যা করার করে ফেলতে হবে। না হলে আলো ফুটলে ভূতটা ঘাড় মটকে দিতে পারে। নয়তো সারাজীবন ফেউয়ের মতো পেছনে লেগে থেকে ‘ব্ল্যাকমেল’ করবে। তা ছাড়া হেরে গেলে পাড়াপড়শির কাছে মান-ইজ্জত কিচ্ছু অবশিষ্ট থাকবে না। সুতরাং...
ভূতটা সতেরো নম্বর কারণটা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। পিলের গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘কী হে, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’
পিলে বললেন, ‘না, না, ঘুমোব কেন?’ আপনার বিশ্লেষণী শক্তির কেমন করে তারিফ করব তাই ভাবছি। তবে মাত্র ১০ নম্বরের জন্য এত ‘পয়েন্ট’ লেখার কোনও মানে হয় না। আমরা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ মুখস্থ করতে গিয়ে ঝঞ্ঝাটে পড়ে যেতাম। মোট আঠারোটা কারণ ছিল। আমরা করতাম কী, মোট আটটা কারণ মুখস্থ করে সেগুলোকেই উলটেপালটে ভেঙেচুরে, এদিক-ওদিক করে, একই কারণ তিনবার লিখে আঠারোটা বানিয়ে দিতাম। কিন্তু আপনি দেখছি প্রত্যেকটা আলাদা-আলাদা বললেন। আপনাকে এতক্ষণ তুমি বলেছি বলে কিছু মনে করেননি তো? ঠিক আছে। মেনে নিচ্ছি আমি মানুষ। প্রমাণ না হলেও আপনার যুক্তির খাতিরে আমার মানুষ হতে ইচ্ছে করছে।’
ভূতটা আহ্লাদে দাঁত বের করে হাসল। যদিও অন্ধকারে তা দেখা গেল না। হেসে বলল, ‘বাবাজীবন, বড় ভাল লাগল তোমার সঙ্গে আলাপ করে। তুমিই স্বীকার করলে আমার বুদ্ধির ধার আছে। আজকালকার ছেলেছোকরারা তো আমায় মানতেই চায় না। যৌবনে বড় বাগ্মী ছিলাম। বাপধন, তোমার বদনখানা ভারী দেখতে ইচ্ছে করছে। কী যেন পুরস্কার টুরস্কার দেবে বলছিলে না? বাপধন লম্বা নলের মতো এটা কী? হাতে ঠেকল? নলেন গুড় নাকি?’
পিলেকান্ত সাইকেলের পাম্পটা বাগিয়ে ধরে বললেন, ‘এ হল আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো পিলেকান্তর আশ্চর্য পাম্প। এ দিয়ে সাইকেল পাম্প করলে সে সাইকেল আকাশে উড়তে থাকে। বিজ্ঞানীরা যুগ-যুগ ধরে গবেষণায় বের করেছেন এ জিনিস। এর মধ্যে আছে মন্ত্রপূত হাওয়া। এ হাওয়া খেলে মনপ্রাণ ঠান্ডা হয়। চোখ বুজে যে-কোনও দেশ কল্পনা করলে সেখানে যাওয়া যায়। এমন কী স্বর্গেও। তবে দোহাই আপনার। এটা বাদে যে কোনও জিনিস চাইলে আপনি পাবেন। অনেক কষ্টে এনেছি এটা হলিউডের গবেষণাগার থেকে। লোকে জানলে আমায় শূলে চড়াবে। আগে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে স্বর্গে যাব, তারপর ছাড়ব এটা। দোহাই নিশাচরবাবু, মাপ চাই, এটার প্রতি লোভ দেবেন না। চান তো আমার আট বিঘা ধানি জমি আপনার নামে লিখে দিই। কিন্তু এ জিনিস আমাকে মেরে ফেললেও দেব না।’
ভূতটা বলল, ‘এই বুড়ো বয়সে ধানি জমি নিয়ে কী করব? স্বর্গে যাওয়াটাই আমার জরুরি। ভালয়-ভালয় দিয়ে দাও। নইলে সব ভূত ডেকে নিয়ে তোমায় বাড়ির চারপাশে দিনদুপুরে এমন নৃত্য জুড়ব, তখন মজাটা বুঝবে।’
পিলেকান্ত মনে-মনে মুচকি হাসলেন। ওষুধ ধরেছে। মুখে বললেন, ‘দেখুন, আপনাকে দিতে পারি, তবে একটা শর্তে। কাউকে বলতে পারবেন না। এমনকী স্বর্গে গিয়েও না। তা হলে আমার জেল হয়ে যাবে।’
ভূতটা বলল, ‘ঠিক আছে বাবা, ঠিক আছে। কাউকে বলব না। দাও দিকিনি ওটা।’
পিলে বললেন, ‘ঠিক আছে। মুখের মধ্যে নলটা ঢুকিয়ে নিন।’
ভূতটা সাততাড়াতাড়ি নলটা মুখে ভরে নিল। পিলেকান্ত সজোরে পাম্প দিতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে ভূতটা বলে উঠল, ‘বাবাজীবন, আমার যে পেটটা ফুলে উঠছে। মাথাটা যে কেমন ঘোরাচ্ছে।’
পিলেকান্ত আধা ধমকের সুরে বললেন, ‘আরে ঘাবড়াচ্ছেন কেন? একটু কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে?’
ভূতটা বলল, ‘না, না, ঘাবড়াইনি তো! সত্যি বলছি, ঘাবড়াইনি। শুধু মাথাটা কেমন করছে এই যা। এই তিন সত্যি করচি...পিলেকান্ত মনে-মনে ভাবলেন, আমার সঙ্গে ভুতোমি? দ্যাখো তোমার কী হাল করি। কাল সকালে বাজার যাওয়ার পথে লোকে দেখবে একটা ভূত আকাশে ঘুড়ির মতো উড়ছে। পিলেকান্ত’র নামে জয়ধ্বনি দেবে বাচ্চা, বুড়ো সকলে।
পাম্প দিতে-দিতে পিলেকান্ত বলেন, ‘আপনি আকাশে উড়তে থাকলে পুষ্পকরথ এসে আপনাকে নিয়ে যাবে।’
ফাঁপা ভূতটা হাওয়া খেয়ে বিশাল হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে, ‘কই বাবা, পুষ্পকরথ?’
পিলে ভূতটার মুখের সেলোটেপ লাগাতে-লাগাতে বলেন, ‘আসবে, আসবে, সবুরে মেওয়া ফলে। এই এল বলে! আপনি ততক্ষণে চোখ বুজে থাকুন।’ এই বলে পিলেকান্ত ভূতটাকে উড়িয়ে দিয়ে দৌড়াতে থাকেন। অনেকদূর দৌড়ে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন, উড়ন্ত ভূত আকাশে কাটা ঘুড়ির মতো লাটখাচ্ছে। আর রাজ্যের শেয়াল মনোযোগ দিয়ে এই অদ্ভূত দৃশ্য দেখছে।
আকাশ পরিষ্কার হয়ে আসছে। পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে গাঁ-গঞ্জ। পিলেকান্ত সোজা এসে পৌঁছলেন বিজ্ঞানসাধক কে বি পি’র ঘরের জানলায়।
দেখলেন বিজ্ঞানী মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। টিমটিম করে লন্ঠন জ্বলছে সামনে। দরজায় কড়া নাড়তেই কে বি পি বেরিয়ে এলেন গায়ে চিনির বস্তা জড়িয়ে। পিলেকান্ত হাতজোড় করে বললেন, ‘সুপ্রভাত।’ তারপর বললেন, ‘আপনার গায়ে ওটা কী?’
কে বি পি বললেন, ‘কেন, নিশিপুরী শাল। ভূতেরা আমার জন্মদিনে প্রেজেন্ট করেছে। কিন্তু এত সকালে তুমি কী মনে করে?’
পিলেকান্ত বললেন, ‘কী একখানা রাতই না কাটল! ফিরছিলাম লাস্ট লোকালে মামার বাড়ি থেকে। এই পাম্পটা কিনতেই গিয়েছিলাম। তারপর...’ অদ্যোপান্ত বিবৃতি দিলেন পিলেকান্ত। বিবরণ শুনে মুচকি হাসলেন কে বি পি। পিলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাসলেন যে?’
কে বি পি হাতে ধরে থাকা কাগজটা দেখিয়ে বললেন, ‘ওদের প্রভাতী দৈনিক, ভূত-ভবিষ্যৎ দেখেছ আজকের?’
পিলেকান্ত বোকার মতো ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘না তো। ওদের আবার নিউজপেপার আছে নাকি?’
...কে বি পি তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, ‘তাও জানো না? এটা দ্যাখো।’ কাগজের হেডলাইন দেখে পিলেকান্তর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। বিস্ফারিত চোখে তিনি পড়তে লাগলেন বাহাত্তর পয়েন্টে ছাপা ‘হেডলাইন’ ও নীচের খবর।
ড্রাগনের কবলে বৃদ্ধ ভূত
জি. এন. বি. ৫ অগস্ট: গতকাল মধ্যরাত্রে ড্রাগনের দ্বারা আক্রান্ত হন এক প্রবীণ ভূত। তিনি এখন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তাঁর অসংলগ্ন প্রলাপ থেকে যা জানা গেছে তা হল: এক চতুর ড্রাগন তাঁকে স্বর্গে পাঠাবার লোভ দেখিয়ে অসুস্থ করে ফেলে। প্রবীণ ভূত আকাশে উড়তে থাকেন। আকাশের কোনও এক দুষ্টু পাখি তাঁর গায়ে ঠোক্কর মারতে থাকে। ফলে তিনি ছেঁড়া ঘুড়ির মতো আছড়ে পড়েন মাটিতে। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। ১৪৫ ঘণ্টা না কাটলে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে বিশদভাবে কিছু বলা যাবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন