হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
জমি-জিরেত বলতে পাঁচকড়ি সাঁপুইয়ের বিশেষ কিছু নেই। বাপ সাতকড়ি মাত্র আঠাশ শতক জমি রেখে পরলোকগমন করেন। সেই জমির ওপরই বেঁচেবর্তে আছে পাঁচকড়ির নাতিবৃহৎ সংসার। বুড়ি মা, বউ কল্পলতা, ছোট্ট ছেলে তিনকড়ি আর দুটো বলদ—এই নিয়ে পাঁচকড়ির টানা-পোড়েনের সংসার।
মাঝে মাঝে যখন পাঁচকড়ি আর কল্পলতার ভাব-ভালোবাসা নলেন গুড়ের মতো বাস ছাড়ে তখন ওরা জেগে-জেগে স্বপ্ন দ্যাখে। কী করে রাতারাতি দালানকোঠা বানানো যায়, শহরের বাবুদের মতো ট্রেনে চড়ে ফস ফস করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চাকরি করতে যাওয়া যায় এইসব। হাল-বলদ নিয়ে মাঠে নামতে আর মন চায় না। কল্পলতার অনেকদিনের সাধ একজোড়া রুপোর বাউটি, একটা অর্গাণ্ডি শাড়ি আর সারাদিন পান খেয়ে মুখার্জি গিন্নির মতো পিক ফেলতে ফেলতে সিনেমার গল্প করা। কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই। ভগমান কোনোদিন বুঝি গরিবগুর্বোদের পানে মুখ তুলে চায়তে জানে না।
সেদিন সকালে পোস্তবাটা দিয়ে পান্তাভাত খেতে গিয়ে তুমুল ঝগড়া বেঁধে গেল পাঁচকড়ি আর কল্পলতার মধ্যে। পোস্তবাটার মধ্যে আরশোলার নাদির গন্ধ পেয়ে চিৎকার করে উঠল পাঁচকড়ি। ‘খেয়ে শান্তি নেই দু-দন্ড বসে শান্তিতে নেই, এভাবে মানুষ বাঁচে? আজ তবে মাঠেই যাব না। চন্ডীমন্ডপের চাতালে বসে মদনাদের সঙ্গে তাস খেলব। দেখি তোরা ঠেকাস ক্যামনে।’
বোঝো ঠ্যালা। পোস্তবাঁটায় গন্ধ তাতে কল্পলতার কী দোষ? একে বলে কপাল। বিনাদোষে শাস্তিভোগ। কল্পলতা আত্মপক্ষ সমর্থনে কী বলেছিল তা আর জেনে কাজ নেই, খুব সুখের কথা তার মুখবিবর থেকে নি:সৃত হয়নি। যদিও কিছুক্ষণ বাদেই পাঁচকড়ির রাগ পড়ে গেল বেলুনের হাওয়া বেরিয়ে যাবার মতো। মনটা আকুপাঁকু করে উঠল মাঠে যাবার জন্য। নদুবাবুর জমিটা চষে দিতে পারলে ক-টা টাকা পাওয়া যাবে এই ভেবে কাঁধে লাঙল নিয়ে পাঁচু মাঠে চলল।
একমনে লাঙল চালাচ্ছে পাঁচু। হঠাৎ ঠনাৎ করে একটা শব্দ হল। লাঙলের ফালে কী একটা ঠেকছে না? বুকের ভিতর গুড়গুড় করে উঠল পাঁচুর। মাঠের চারপাশে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই। লাঙল দিয়ে মাটি তুলে পাঁচু একটা কলসি পেল, এক মিনিটের মধ্যে পাঁচু যে কত কিছু ভেবে ফেললো আর কতগুলো শ্বাস টানলো তার হিসাব কে রাখে?

যখের ধন ভেতরে নাগিনী বসে আগলাচ্ছে ....
কলসিটা বগলের তলায় নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে বাড়ির দিকে দৌড়াল পাঁচু। লাঙল বলদ মাঠেই পড়ে রইলো।
কলসিটা রেখে দাওয়াতে মা আর বৌ-এর পাশে গালে হাত দিয়ে বসে পাঁচু ভাবছে, সৌভাগ্য বুঝি এমন ভাবেই আসে। কল্পর ওপর রেগে যদি মাঠে না যেতাম তবে জিনিসটা পেতাম না। কে না কে জমি চষতো তার খপ্পরে গিয়ে পড়তো কলসিটা, যাক, এখন কি করা যায়?’
কল্পলতা বললো, ‘শোন, কাউকে না জানিয়ে কলসের মুখটা খোল।
তোমার লাঙলের মুখে উঠে এয়েচে সুতরাং সিটা তোমার। ওর মদ্যি গুপ্তধন না থেকে যায় না।’
পাঁচকড়ি গম্ভীরভাবে বললো, ‘কল্প আমরা যদি বড়োলোক হয়ে যাই?’
কল্প বললো, সিটা কি খুব খারাপ হবে? আমাদের বাড়ি হবে। বাড়িতে কাজের লোক রাখবো, ছেলে ইনজিরি ইস্কুলে পড়বে। কারু মুখনাড়া হজম কত্তি হবে না।’
পাঁচকড়ির বুঁড়ো মা বললো, সেবারে হাঁদু মিস্তিরি সোনার তাল পেয়েলো কুয়ো কাটতে গিয়ে। সিটা বিক্কিরি করতে...গিয়ে হাঁদুরে থানা পুলিশে গেল। গবরমেন্টের বাবুরা এসব কাউরি ভোগ কত্তি দেয় না, কেড়ে নেয়।’
অনেক শলা পরামর্শের পর স্থির হল, সবার সামনেই কলসির মুখ খোলা হবে। গ্রামের মান্যগণ্য লোক উপস্থিত থাকবে। তারপর যা থাকে কপালে, খবর পেতেই বাল-বৃদ্ধবণিতা সকলে হাজির হল সদলবলে। মান্যগণ্য লোকেদের মধ্যে রয়েছেন অঞ্চল প্রধান, মাস্টারমশায়, কবিরাজ নরহরি বাঁড়ুজ্জ্যে ও তার দুটো পাস দেওয়া ছেলে থরহরি বাঁড়ুজ্জ্যে ।
যাকে কেন্দ্র করে এত জমায়েত সেই বস্তুটি রয়েছে লাউমাচার নীচে সকলের নজরবন্দি। তার দুদিকে পাড়ায় উঠতি কামু আর শামু। তাদের সশস্ত্র সতর্কতা দেখে মনে হচ্ছে কলসিটার ডানা আছে, উড়ে পালাতে পারে। নট নড়নচড়ন কলসিটাকে একবার অতি সাবধানতার সঙ্গে প্রদক্ষিণ করলেন অঞ্চল প্রধান। তারপর একে একে মাস্টারমশায়, নরহরি কবিরাজ ও তার ছেলে থরহরি।
অঞ্চল প্রধান বললেন, ‘যদি ট্রামে বাসে পাওয়া যেত তাহলে নয় বুঝতাম এর মধ্যে টাইমবোমা আছে। মাঠে যখন পাওয়া গেছে তখন নির্ঘাৎ গুপ্তধন।’
নরহরি কবিরাজ বললেন, ‘এ যখের ধন, কোনো নাগিনী ভেতরে বসে আগলাচ্ছে। দেখছ না কেমন ফোঁস ফোঁস শব্দ হচ্ছে। খুলে কাজ নেই বাপু অমঙ্গল হবে।’ মাস্টারমশাই বললেন, ‘হয়তো এর মধ্যে গুপ্ত যুগের কি তারও আগের মহাভারতের আমলের মোহর মুদ্রা পাওয়া যেতে পারে, ইতিহাস এভাবেই আত্মগোপন করে থাকে।’ থরহরি মুরুব্বি চালে বলল, ‘গুপ্তধনটন বাজে কথা। এর মধ্যে বিষাক্ত গ্যাস আছে। দেখছ না কেমন সালফিউরিক অ্যাসিডের মতো গন্ধ ছাড়চে। পুলিশ ডাকা হোক।’
কৌতূহলী মানুষগুলো উঠোনে উৎকন্ঠায় ছটফট করছে। কখন কলসি খোলা হবে। কী না আশ্চর্য জিনিস দেখা যাবে কে জানে।
বজ্রগম্ভীর গলায় অঞ্চল প্রধান নির্দেশ দিলেন, ‘কলসি খোলা হোক। ভিতরে কালনাগিনীই থাকুক আর গ্যাসই থাকুক মরলে আমরা সকলে একসাথেই মরব।’ তারপর জনগণের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনারা কী বলেন?’
জনগণ হাঁ, হাঁ করে সায় দিয়ে উঠল। উঠোনের চারকোণে চারজন লেঠেল মোতায়েন করে দা হাতে দু-জন ষন্ডাগন্ডা বলিষ্ঠ খনা আর মনাকে কলসির মুখ খুলতে পাঠানো হল। বাচ্চা-কাচ্চাদের সরিয়ে দেওয়া হল। খনা সন্তর্পণে কলসিটাকে চেপে ধরল, মনা কলসির মুখে দা দিয়ে মারল একটা ঘা। ছিটকে গেল একটা ধাতব চাকতি। অঞ্চল প্রধান, মাস্টারমশায়, কবিরাজ সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লেন কলসির মুখের কাছে। ওদের মাথায় মাথায় ঠোকাঠুকি লেগে গেল, কোনো সাপ নয়, বোম নয়, বিষাক্ত গ্যাসও নয় কলসির মধ্যে থেকে সোজা অঞ্চল প্রধানের মুখে লাফিয়ে উঠল একটা গোদা কোলা ব্যাং। শূন্য কলসিটা গড়াগড়ি খেতে লাগল।
অঞ্চল প্রধান রেগে-মেগে মাস্টারমশায়কে বললেন, ‘বুঝলেন এ হল আপনার গুপ্তযুগের গুপ্ত ব্যাং। ইতিহাসের ছাত্রদের বাঁচাবার জন্য দামড়ালের মাঠে লুকিয়ে ছিল। যত্তোসব।’ সবাই হতাশ মুখে ফিরতে লাগল। পাঁচকড়ির বউ কল্পলতা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে অদৃষ্টকে গালাগাল দিতে লাগল। নীরব দর্শক পাঁচুর বৃদ্ধা মা ঘ্যানঘেনে গলায় বলে উঠল, ‘ও পাঁচু, মাঠের মদ্যি পড়ে আচে হাল-বলদ ওগুলো আনবে কিডা?’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন