ভবিষ্যতের ভূত

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

তেলেভাজা খেতে একটু বেশিই ভালবাসে সে। নিবারনের কথা হচ্ছে। তার মতো হাড় জিরজিরে মানুষ এ তল্লাটে আর দ্বিতীয়টা নেই। প্রথম বলো, দ্বিতীয় বলো ঐ নিবারন একাই। প্যাকাটির মতো রোগা চেহারা তার। স্বপ্নপ্রদত্ত মাদুলি, বলবর্দ্ধক সালসা, হেকিমি টোটকা—কিছুই বাদ রাখেনি সে। তবু শরীরে যদি একটু গত্তি লাগে। পরিস্থিতি যে কে সেই। যদিও সে কানাঘুঁষোয় শুনেছে, রোগাদের নাকি এখন বাজার ভাল। কিন্তু সেই আধুনিক খবরটা নলডাঙ্গা গ্রামে এসে এখনো পৌঁছায়নি। নাহলে লোকে তাকে ‘ফড়িং’ বলে টিটকিরি মারে?

একজন শুভাকাঙ্খী পরামর্শ দিলেন তাকে, ‘সকালবেলায় হাঁটাহাটি করলে খুব ক্ষিদে পায়। যাকে সাধুভাষায় বলা হয় মর্ণিং ওয়াক। ওতে রোগা মোটা হয়, মোটা রোগা হয়।’

কথাটা বেশ মনে ধরল নিবারনের। পরদিন উত্তেজনার বশে ভোরের অনেক আগেই বেরিয়ে পড়ল সে। হাঁটতে হাঁটতে খলসেমারির বিলের কাছে পৌঁছে গেল। খেয়াল ছিলনা এই জায়গাটা ভাল নয়। তেনাদের বাস। তবে মোটা হতে গেলে ভূতের ভয় পেলে চলে না। সবেমাত্র ভাটাম গাছটার পাশে দু’দণ্ড জিরিয়ে নেবার জন্যে দাঁড়িয়েছে নিবারন—আর তখনই নাকিস্বরে উচ্চারিত একটা বাক্য তার কানে ভেসে এল। —কে ওখানে? দেখে যে ভয় লাগে।

প্রথমটায় হকচকিয়ে গেল নিবারন। এতদিন ‘ভয়’ ব্যাপারটা তারই একচেটিয়া ছিল। এমনকি কলাগাছের ছায়া দেখেও সে ভয় পেয়ে এসেছে। আজ তাকেই কিনা ভয় পাচ্ছে কেউ?

বেশ! খুশি হল সে।

বেশ বীরত্বব্যঞ্জক সুরে নিবারন কথা বলে উঠল।

—কে ভয় পায়? এদিকে এসো, চাঁদবদনখানা দেখি একবার।

কাঁপতে কাঁপতে এসে দাঁড়াল একজন। ছায়া-ছায়া শরীর, ওল্টানো পা। হাতপায়ের গড়ন কাঠি-কাঠি। যেন কাটুমকুটুম শিল্পকর্মের একটি নমুনা।

নিবারন বলল, ‘ভয় পাও কেন?’

সে উত্তর দিল, ‘আঁজ্ঞে আপনার ফিগার দেখে।’

মোটা তো লাগবেই ওষুধ খেয়েছি যে...

—কেন ফিগারে কি হয়েছে ?

—বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন একেবারে।

নিবারন রাগল না। অপমানিতও হলনা। তাকে মোটা হতে হবে। এসব ধৈর্যের পথ। একটা রাস্তার ভূতোর কথায় টেম্পার খাপ্পা হলে চলবে না। ও যখন ভয়টা পাচ্ছে তখন তাকে সেটা পেতে দেওয়াই ভাল। তাও তো জীবনে কেউ তাকে ভয় পেল। আর তো সবাই হেলাছেদ্দা করে। মানুষ বলেই গেরাহ্যি করেনা।

—তা ভয় কি লাগছে এখনো?

—একটু কমেছে। সামান্য।

—কমল কি করে?

—যদি কিছু না মনে করেন, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

নিবারন ভূতটাকে ভাল করে দেখে নিয়ে বুঝতে পারল, ভদ্র ভূত। কথাবার্তা ভাল।

—করো।

—আপনার ডায়েট তালিকাটা জানতে পারি?

এবার নিবারনের মনে হল ফাজিল ভূত। খাদ্যতালিকা জানতে চাইছে।

—কি হবে ডায়েট জেনে?

—আঁজ্ঞে আপনার প্রতি একটা বিনীত নিবেদন আছে।

—কি নিবেদন? বলে ফ্যালো চটপট। টাইম নেই হাতে।

—আগামী শুক্রুবার অমাবস্যার শুভক্ষণে আমাদের প্রাচীন আশশ্যাওড়া রোডের স্টেডিয়ামে দেহসৌষ্টব প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি। উক্ত অনুষ্ঠানে আপনার সানুগ্রহ উপস্থিতি একান্ত কাম্য। আমাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ। পঃ বঃ সরকারের অতিথি নিয়ন্ত্রন বিধি প্রযোজ্য।

ওমা! ভূতটা যে সাধুগদ্যে কথা বলছে। সাবধানে কথা বলতে হবে এর সাথে।

—আপনাকে আমরা যথোচিত সন্মাননার সহিত বিচারক হিসাবে পাইতে আগ্রহী।

—পাইতে?

—বটে।

নিবারন মওকা বুঝে নিজে একটু দাম বাড়াতে চাইল। কে না বাড়ায়?

—এখনই কথা দিতে পারছিনা।

—কবে দিতে পারবেন?

—বলা মুস্কিল। আমি খুব ব্যস্ত।

—তাহলে বিকল্প উপায়?

—আপনারা অন্য বিচারক দেখুন।

—তা হয়না। যেখানে যাকে মানায়। আপনি রাজি না হলে আমাদের অন্য পন্থা নিতে হবে।

—কি করবেন?

—সবাই মিলে আপনার ঘাড় মটকে দেব।

—আচ্ছা, আচ্ছা, আমি রাজি। এ কথাই রইল। কাল আবার এইসময় এখানেই হাজির থাকব।

এইভাবে প্রাতঃভ্রমনের পথও বন্ধ হয়ে গেল নিবারনের। ফিরতি পথে হাঁটতে হাঁটতে অন্য উপায়ের কথা ভাবতে লাগল সে।

ওলাইতলা গ্রামে একমাত্র মোটা মানুষ হারাধন। এত মোটা যে তার সঙ্গে কেউ বন্ধু পাতাতে চায়না। ক্যালরি মেপে খাবার খাচ্ছে, তবু ছিটেফোঁটা ওজনও কমার কোন লক্ষণ নেই। চর্ব্বি জাতীয় খাবার একেবারে বন্ধ। তবু সুরাহা হচ্ছে কই? অগত্যে সেও মর্নিং ওয়াক করবার মনন্থ করল। অন্ধকার ভাল করে না কাটতেই বেরিয়ে পড়ল সে। বহু তত্ত্বতালাশ করেও রোগা হবার সুলুক সন্ধান করতে পারেনি। হাতে পড়ে আছে শুধু প্রাতঃভ্রমন। দেখা যাক। জীবনে প্রথমবার মাইল তিনেক হেঁটে ফেলল হারাধন। এখনো আকাশ ফর্সা হয়নি। তাতে কি! রোগা হতে গেলে লোকজন উঠে পড়ার আগেই চুপি চুপি কাজ সেরে ফেলতে হবে। একমাস পরে সবাইকে চমকে দেবে সে। মনের উত্তেজনায় আর প্রতিজ্ঞার কাঠিন্যে দ্রুত হাঁটছিল নিবারন। কিন্তু ধাক্কা খেতে হল আচমকা।

—কে?

—আমি রোগা হারাধন। আপনি কে?

—আমি মোটা নিবারন।

—আপনার নাম শুনেছি বটে।

—আমিও আপনার নাম শুনেছি।

—তাহলে তো ভালই হল, আমরা দুজন বন্ধু হতে পারি।

—নিশ্চয় পারি। হোয়াই নট?

নিবারন বলল, ‘সকালে হেঁটে কি কিছু ফল পাওয়া যাবে?’ হারাধন বলল, ‘আমিও তাই ভাবছি। আপনি কবে থেকে?’

—আজই প্রথম, নিবারন বলল। আপনি?

—আমিও।

—কোন তান্ত্রিক, কবিরাজ, জড়িবুটির সন্ধান মিলল না?

—সন্ধান আছে, যাবেন?

—আছে নাকি! কোথায়?

—দু’পুরে বনবিবির মেলা চলছে। ওখানে এক ধন্বন্তরি কোবরেজের আসার কথা আজ। তার ওষুধ খেলে নাকি ছাগল বাঘ হয়ে যায়।

—আর বাঘ?

—সেটা তো শোনা হয়নি।

কথায় কথায় খুব মিল হয়ে গেল দুজনের। আর কিছুদিন গেলেই তাদের হরিহর আত্মা বলা যাবে হয়ত। বিকেল বিকেল সদ্য পাটভাঙা জামাপ্যান্ট পরে তারা বেরিয়ে পড়ল দু’পুরের উদ্দেশ্যে।

মেলা জমে গেছে। মস্তবড় একটা মাঠে মেলা হয়। সাকার্সের তাঁবু, নাগরদোলা, সার সার খাবারের দোকান, চুড়িমালার দোকান সব আছে। জিলিপি ঘুগনী, পাঁপড় কি নেই? ওরা খুব সহজেই খুঁজে পেল ধন্বন্তরি কোবরেজকে। একটা ব্যানার টাঙান আছে। তাতে লেখা ‘কবিরাজের সেরা মুচকুন্দ কবিরাজ।’ মাত্র একবার দেখান। বিফলে ভিজিট ফেরৎ।’

বুকে নতুন বল এসে গেল হারাধন আর নিবারনের। এতদিন পরে তারা প্রকৃত পথের সন্ধান পেয়েছে। কবিরাজের সামনে অনেকরকম জিনিস। লম্বা গলার রঙিন বোতল সার-সার সাজানো। পশুপাখির হাড়গোড়। মলম, লোশন সব আছে। গাছের শিকড়ও বাদ নেই। উঁনি যে জবরদস্ত লোক দাড়ি দেখেই আন্দাজ করা যাচ্ছে। গ্রাম্য একজন পাঁকুই সারাবার মলম নিয়ে হাসিমুখে চলে গেল।

—কি সমস্যা আপনাদের?

—আজ্ঞে দেখেই বুঝতে পাচ্ছেন। নিবারন বলল।

—তা পাচ্ছি। একজনের কাছে যেটা বিষ অন্যের কাছে সেটা অমৃত। কবিরাজ বললেন।

—আপনার হাতে তো সব উপায় আছে স্যার? হাত কচলে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল হারাধন।

—তা আছে। একজনের জোলাপ অন্যজনের পাঁচন।

—জোলাপ তো শুনিচি অন্যরকম বেগতিক হলে...হারাধন ইনিয়ে বিনিয়ে বলল।

—শাটাপ! আবার মুখের ওপর কথা। কত রাজা বাহাদুর বলে আমার কথার নড়চড় করেনা। একেই বলে অর্বাচীন।

নিবারন বলল, ‘ওর কথায় কিছু মনে করবেন না। আপনার কথাই সই। কি করতে হবে বলুন। আমরা রাজি।’

—কিছু করতে হবে না। মুচকুন্দ কোবরেজ আছেন কি করতে।

কবিরাজ বস্তার ভেতর থেকে একটা অ্যালবাম বের করলেন। তাতে বত্রিশ ইঞ্চি থেকে বাহান্ন ইঞ্চি পর্যন্ত বুকওলা তাগড়া মানুষের ছবি সাঁটা। দ্বিতীয় অ্যালবামটায় চারফুট দশ থেকে ছ’ফুট দশ পর্যন্ত বিভিন্ন উচ্চতার মানুষের ছবি।

—এর মধ্যে কোনটা পছন্দ হয় দেখিয়ে দাও।

হারাধন, নিবারন উভয়েই হামলে পড়ল ছবির উপর। দারুন ব্যবস্থা। একদম পাকাপোক্ত কাজ। বোঝাই যাচ্ছে কবিরাজ মশাই জেনুইন ওস্তাদ। দু’জনের হাতই একটা ছবির কাছে এসে থামল। আটত্রিশ ইঞ্চি বুক, পাঁচফুট দশ উচ্চতা। দু‘জনেরই পছন্দ এক।

কবিরাজ একটা নতুন পান মুখে পুড়লেন। দু’বার চিবিয়ে পাশে রাখা পাথরের পিকদানিটা হাতে তুলে পিচ করে পিক ফেললেন।

—উঁহু, সেটি হবার জো নেই। ওরকম নিয়ম নেই।

—তার মানে? এই যে বললেন...নিবারন বলল।

—দু’জনের চেহারাই আমি বদলে দিতে পারি। তবে কিনা এর মাঝেও একটা কথা আছে।

—কি কথা? হারাধন জানতে চাইল।

—কথাটা হল রোগাকে মোটা করতে পারি, মোটাকে রোগা।

—ভেঙে বলুন। নিবারন জানতে চাইল।

—আপনাকে ঐ ভদ্রলোকের মত মোটা আর ওকে আপনার মত রোগা বানানো আমার বাঁ হাতের খেল।

—রাখুন আপনার খেল। ধমকে উঠল হারাধন। তাহলে দু’জনকেই তো সেই মর্নিং ওয়াকেরই দ্বারস্থ হতে হবে। লাভ কি?

—লাভ আছে। কবিরাজ আবার পানের পিক ফেললেন।

—আছে? জানতে চাইল নিবারন।

—কার? দ্বিতীয় প্রশ্নটা হারাধনের।

—আমার। তিন দুকুনে ছয় টাকা নেট লাভ।

—আপনি লোক ভাল না মোটেই। বলল নিবারন।

—ভাল না? জানতে চাইলেন কবিরাজ।

হারাধন বলল, ‘ভাল লোক এরকম ধোঁকা দেয়না কাউকে।’

—ঠিক বলেছেন। তৃতীয়বার পিকদানিটা হাতে নিলেন তিনি। ‘আমার বক্তব্যটা আপনারা ধরতে পারেননি।’

—কি বক্তব্য আপনার? যুগ্ম প্রশ্ন নিবারন ও হারাধনের।

—বলতে চেয়েছি ওরা কেউ আমার ওষুধ খেয়ে ঐ রকম শরীর স্বাস্থ্য পায়নি। ওষুধ আমি আদৌ দিইনে।

—তবে? নিবারন জানতে চাইল। সবিস্ময়ে।

—লাগাতার প্রাতঃভ্রমন আর সঠিক খাওয়াদাওয়াই ওদের সাফল্যের চাবিকাঠি।

—তাহলে আপনার কেরামতি কোথায়?

—ঠিক সময়ে, ঠিক লোককে, ঠিক পরামর্শ বিতরন করাই আমার কৃতিত্ব। ওরা সবাই আমার পরামর্শ মেনেছিল। একটা ঠিক পরামর্শের দাম নিই তিনটে টাকা। ছাড়বেন না। লেগে থাকুন। বর্ষার দিনেও ছাতি মাথায় হাঁটতে বেরিয়ে পড়ুন। আশাকরি একবছর পর যখন এই মেলায় আবার দেখা হবে, আপনাদের দেখে নিশ্চয় চিনতে পারব না।

পরদিন নিবারন প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে হারাধনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভূতে ভয় পাও?’

—ভূত? তা লাগে বৈকি?

—দেখেছ কখনো?

—না।

—দেখতে চাও?

—তার মানে?

সবিস্তারে খুলে বলল নিবারন। বেশ মজা পেল হারাধন সব শুনে। ভাটাম গাছটার তলায় দু’জনে পৌঁছাল। নিবারন গাছটার আড়ালে লুকিয়ে থাকল। গতদিনের সময়মতোই হাজির হল ভূতটা। টাইম জ্ঞান তার পাকা।

—ওমা! এ কে?

—আমি নিবারন। দেহসৌষ্ঠব প্রতিযোগিতার জাজ।

—মোটা লাগছে যে?

—তা তো লাগবেই। ওষুধ খেয়েছি যে।

—কি ওষুধ?

—বিদেশী ওষুধ। চলবে?

—পেলে মন্দ হতনা।

—তবে এই ওষুধের কিন্তু একটা সাইড এফেক্ট আছে।

—কি?

—মাঝে-মাঝে অতীতের চেহারাটা চোখের সামনে ফুটে ওঠে।

গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল নিবারন। তাকে দেখিয়ে হারাধন বলল। ঐ যে আমার অতীত। ভূত আর ভবিষ্যৎকে একসঙ্গে দেখে হরিনের চেয়েও দ্রুত গতিতে দৌড় দিল ভূতটা। আর কস্মিনকালেও সে এ তল্লাট মারাবে না নিশ্চিত।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%