সম্রাট নীরোর বেহালা

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

পটাদা বলল, ‘আজ তোদের এমন একটা কাহিনী বলব শুনলে গায়ের রোম খাড়া হয়ে যাবে।’

রুবি বলল, ‘যখন রোম শহরটা পুড়ছিল তখন তো নীরো ভায়োলিন প্লে করছিলেন। একজন রাজা এমন উদাসীন হন কি করে?’

পটাদা বলল, ‘রুবির ঘটের মালমশলা কিছুটা ডেভালপ করেছে দেখা যাচ্ছে। যাই হোক, যে বেহালাটা নীরো বাজাচ্ছিলেন, সেটাই আজকের কাহিনীর কেন্দ্রীয় চরিত্র।’

রুবি বলল, ‘পটাদা, আজ কি খাওয়া হবে মা জিজ্ঞাসা করতে বলল।’

পটাদা বলল, ‘আজ আমার অম্বুবাচীর উপোষ ছিল। উপোষটা ভেঙে ফেলি কি বল? অনশন করে কে কবে গাঁধিজী হয়েছে?’

‘ভেঙেই ফেলো’ আমরা সমস্বরে বললাম। পটাদা বলল, ‘চিলি চিকেন বাদে সব চলবে। গিয়ে বলে আয়।’ তাহলে শোন। পটাদা সোফার ওপর গুছিয়ে বসল। তাঁর আজকের বসার ভঙ্গিটা বোধহয় পঞ্চম জর্জের মতো।

‘সেদিন প্রবল শীতের রাত। টেম্পারেচার মাইনাসে নেমে গেছে। এইরকম একটা রাতে ঘুম স্টেশনে বসে আছি ট্রেনের অপেক্ষায়। গায়ে একটা কম্বল জড়িয়ে বেশ মৌজ করে বসে চা পান করছি। এমতাবস্থায় একজন উঁচুলম্বা সুদর্শন পুরুষ সামনে এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞাসা করল, ‘ডিয়ার মিস্টার। উড ইউ লাইক টু গিভ মি ইয়োর মাচিস?’

আমি বললাম, ‘দেশলাই নেই। লাইটার দিতে পারি।’

লোকটা বলল, ‘লাইটার দিয়ে কান খোচান যায় না।’

যাই হোক, ওকে পেয়ে আমার ভালোই লাগল। ডাউন ট্রেন আসতে-আসতে ভোর হয়ে যাবে। বসে বসে বোর হওয়ার চেয়ে গল্পে গল্পে ভোর হওয়া ভালো। একজন গল্প করার সঙ্গী পাব ভেবে খুশিই হলাম। তাঁর নাম জন ফার্নাণ্ডেজ। একজন গোয়ানিজ। কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি করেন?’

সে বলল, ‘আমি একজন অ্যান্টিক বস্তুর সংগ্রাহক। এই উপলক্ষে সারা বিশ্ব চড়কি পাক দিয়ে বেড়াই। আমার সংগ্রহশালা দেখলে যে কোনো লোক ভিরমি খেয়ে যাবে। আমার কাছে অর্জুনের ‘গাণ্ডীব’ নামক তিরটা এবং ‘পাঞ্চজন্য’ নামক শঙ্খটা পর্যন্ত ছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয়...কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারল না জন। তার চোখ বেয়ে টসটস করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আহা রে!’

এই পর্যন্ত শুনে রুবি বলল, ‘শুরু হয়ে গেল...।

বেহালাটা ন্যায্যমূল্যে কিনে নেব...

রনেন তাকে ইশারায় চুপ করতে বলল। ইশারাটা অবশ্য নজর এড়াল না পটাদার। তবু কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে গল্পটাই বলে যেতে লাগল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আর কি কি ছিল আপনার সংগ্রহে?’ জন বলল, ‘বহু জিনিস। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল চেঙ্গিস খাঁর নস্যির ডিবে, নেপোলিয়ন টুর টুপি, হিটলারের পাইপ, কুতবুদ্দিন আইবকের গড়গড়া, ট্রয়ের হেলেনের আংটি, নাদির শাহের ঘোড়ার ক্ষুরের নাল, সুলতান মামুদের আলখাল্লার বোতাম, মেহেরুন্নিসার রুপোর টিকলি ইত্যাদি।’

জানতে চাইলাম, ‘এখন কি কি আছে?’

জন বলল, ‘কিচ্ছু নেই।’

আমি বললাম, ‘তাহলে?’

জন বলল, ‘আবার নতুন করে গড়ে তুলবো। আমি দমে যাবার পাত্র নই। আলাউদ্দিন খিলজি যে জামবাটিতে চামচ ডুবিয়ে ক্ষীর খেতেন সেটার সন্ধান পেয়েছি। আর যেটার ব্যাপারে আমি আপনার সাহায্যের প্রত্যাশী সেটা হল নীরোর বেহালা।’

এই প্রসঙ্গে তোদের বলি তোরা শুধু রোমান আলফাবেট-এর কথাই জানিস। রোম সভ্যতা একসময় শীর্ষে উঠেছিল। রোম সম্পর্কে আর কি জানিস?’

রনেন বলল, ‘রোমের নাইটদের কথা জানি, দু-দিক ধারাল তলোয়ারের কথা জানি, ক্রিতদাসদের কথা জানি।’

‘গুড! বলা হয় ‘অল রোডস লিডস টু রোম’। অর্থাৎ সেই সময় রোম এতই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল সে সব রাস্তাই রোমের দিকে ধাবিত হয়েছিল। আরো বলা হত ‘ডু ইন রোম অ্যাজ দ্য রোমানস ডু।’ এতেই বোঝা যায় সম্রাট নীরোর রাজত্বকাল পর্যন্ত রোমের খুব রমরমা ছিল।’

রুবি প্রশ্ন করল, ‘রাজা নীরো কি খুব বড়ো বেহালাবাদক ছিলেন?’

পটাদা বলল, ‘মনে হয় না। একজন অ্যামেচারিস্ট হওয়াই সম্ভব। ‘হিস্ট্রি অফ রোমান এমপায়ার’ বইটা এককালে খুব জনপ্রিয় ছিগ। ওখানে বেহালার কথা পড়েছি বলে মনে হয়না।’

আমি বললাম, ‘পটাদা তাহলে গল্পটা শুরু হোক।’

পটাদা বলল, ‘হ্যাঁ, তারপর জনকে জিজ্ঞাসা করলাম আমি ঐ ব্যাপারে কি সাহায্য করতে পারি? আপনি আমার সাহায্যই বা কেন চাইছেন বিশেষতঃ আমি তো আপনার কাছে একজন অচেনা লোক।’

জন বলল, ‘মানুষ চেনার ব্যাপারে আমার ষষ্ট ইন্দ্রিয় খুব সজাগ। আমি পায়ের শব্দ শুনে বলে দিতে পারি লোকটা কেমন আর হাঁচি শুনে বলতে পারি তার স্বাস্থ্যের অবস্থা কোন জায়গায় আছে।’

আমি বললাম, ‘আমি তো আপনার সামনে হাঁটিওনি, হাঁচিও দিইনি। তাছাড়া রোম যাবার মতো আমার অবস্থাও নেই।’

জন বলল, ‘বাট ইউ ডু ইওনিং।’

আমি বললাম, ‘হাই তোলা দেখে একটা মানুষের ঘুম পাওয়া ছাড়া আর কি বোঝা যেতে পারে?’

জন বলল, ‘অনেক কিছু। যেমন বোঝা যাচ্ছে আপনি একজন ইতিহাসজ্ঞানসম্পন্ন ভদ্র ব্যক্তি এবং কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্নও বটে।’

আমি বললাম, ‘আমার ইতিহাসজ্ঞান আপনার কি কাজে লাগবে? বললাম তো আমি রোমও যেতে পারব না।’

জন বলল, ‘লাগবে। আপনার ইতিহাসজ্ঞানই এক্ষেত্রে আমার মূল হাতিয়ার। দ্বিতীয়তঃ রোম আপনাকে যেতে হবে না। আপনি এখানে বসে থেকে শুধু আমার কাহিনী শুনবেন। ভোরবেলা যথা সময় ট্রেন এলে উঠেও পড়বেন। আশা করি এতেই আমার কাজ হাঁসিল হবে।’

বলতে শুরু করল জন তার ইওরোপ অভিযানের কাহিনী।

‘নেফারতিতি-র কানের দুল খুঁজে বেড়াচ্ছিল আমার এক ঘনিষ্ট ইতালীয়ান বন্ধু মিশরে। তার কাছেই খবর পেলাম একদল স্পেনীয় নাবিক সম্প্রতি ইস্তাম্বুলের কোনো এক কিউরিও শপে একটা ভায়োলিন বিক্রি করেছে অতি সামান্য মূল্যে। কেননা তাদের ইতিহাসজ্ঞান নেই। বেহালাটা আসলে রোম সম্রাট নীরোর। ঐ বেহালাটা কেনার জন্য দশ লক্ষ ইতালীয়ান মুদ্রা লিরা নিয়ে বসে আছেন এক ফরাসী ভদ্রমহিলা। তিনি আমার বন্ধু আত্তিলিও-কে ক্রমাগত তাগাদা পাঠিয়ে যাচ্ছেন। ফরাসী বিদূষিনীর নাম জাঁ দু ভাল। বন্ধুটি আমাকে বলল, পাঁচ হাজার পাউণ্ড যোগাড় করো ওটাকে আমি দিনারে ট্র্যান্সফার করে নিচ্ছি। যদি জিসিনটা হস্তগত করতে পারি, লভ্যাংশ ফিফটি-ফিফটি। ডান? আমি আত্তিলিওকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বললাম, ‘ডান।’ পাঁচ লক্ষ লিরার প্রলোভন সম্বরন করা খুব কঠিন কাজ।’

পটাদা মাঝপথে গল্প থামিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ জলযোগের ব্যাপারটা মীমাংসা হয়ে যাক। রুবি নিচে গিয়ে বলে আয় খাবার ব্যাপারে আমার বিশেষ কোনো পছন্দ নেই। যা জুটবে তাই সই। কেননা গোবি মরুভূমিতে একবার স্রেফ গাছের পাতা সেদ্ধ খেয়ে টিকে ছিলাম। এবং আলতামিরার গুহাচিত্র সেই বিখ্যাত বাইসনের ছবি দেখতে যাবার পথে পকেট ছিল একদম ফার্দিং লেস। লোকে ভবঘুরে ভিখারি মনে করে যা দিত তাই খেতাম। সেই থেকে খাওয়ার ব্যাপারে কোনো বায়নাক্কা আমার না-পসন্দ।’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, এবার গল্পটা শুরু হোক।’ পটাদা বলল, ‘রুবি ফিরে আসা পর্যন্ত একটু ধৈর্য ধর না।’ রুবি ফিরে এলে গল্প শুরু হল পটাদার। রুবির সঙ্গে এল তার পিসতুতো বোন কিঙ্কিনী। সে অনিয়মিত গ্রাহক আমাদের এই আসরের। বয়সে রুবির চেয়েও দু-বছরের ছোটো। কিন্তু শানিত বুদ্ধি। ওর চোখদুটো বড়ো-বড়ো।

তারপর শোন। জন শুরু করল তার কাহিনী। ‘আমি আর আত্তিলিওর মাঝে এসে পড়ল এক পালোয়ানের মতো চেহারার নিগ্রো। তার নাম ম্যাক। অসাধারন তার খাবার ক্ষমতা। দু-কিলো মাংস আর বত্রিশটা রুটি দিয়ে সে ব্রেকফাস্ট সারে। তারপর সাত-আট বোতল ঠাণ্ডা পানীয় গেলে ঢকঢক করে। তার মুখটা যেন পাথরে খোদাই করা। আর হাতের পেশীগুলো লোহার মতো শক্ত। পা দুটো যেন শক্ত দুটো থাম। তবে তার বুদ্ধিটা একদম ছেলেমানুষের মতো। জোঁক দেখলে ভয় পায়। কিন্তু ওর বন্দুকের নিশানা অব্যর্থ। ম্যাক-এর বাবার ছাতুর ব্যবসা। উনি ছোলা কিনে তার ওপর ম্যাককে গড়াগড়ি দিতে বলেন তাতে বস্তা বস্তা ছোলা ছাতুতে পরিণত হয়।

কিউরিও শপ থেকে আমরা নিশ্চিন্তে হেঁটে আসছি দামাস্কাসের পথে। সঙ্গে রয়েছে বেহালাটা। এই অবস্থায় একটা মোটরবাইকে চেপে এহেন ম্যাক আমাদের পথরোধ করে দাঁড়াল। তার দাবি হল, ‘বেহালাটা আমাকে দাও, আমি ন্যায্যমূলে কিনে নেব।’ আমি বললাম, ‘দুনিয়ায় কি আর বেহালা নেই? দোকানে কিনলে এর চেয়ে অনেক সস্তায় অন্য বেহালা পাবে।’

ম্যাক বলল, ‘বেশি কথা আমি পছন্দ করিনা। লাস ভেগাসে আমার জুয়াড়ি বন্ধুরা জানে, আমার একটা ঘুঁষিতে তিনটে মুণ্ডু ছাতু হয়। তোমাদের মতো পিঁপড়ে মারার জন্যে আমাকে কখনো বন্দুকের গুলি খরচ করতে হয়নি। তিন গোনার আগে ওটা আমায় হ্যাণ্ডওভার করে দাও। নতুবা তোমাদের ঠিকানা বদলে দেব।’

আমার বন্ধু আত্তিলিও পকেটে ক্লোরোফর্মের শিশি রাখত। সে আমাকে চোখ টিপে ম্যাককে বলল, ‘চলো আগে তিন বন্ধু মিলে একটু খানাপিনা করা যাক। তারপর নয় রয়ে সয়ে বেহালাটা ন্যায্যদামেই নিও।’

খাওয়ার কথা শুনে ম্যাকের চোখ চকচক করে উঠল। সে বলল, ‘কি খাওয়াবে আমায়?’

আত্তিলিও বলল, ‘কি খেতে চাও বলো?’

ম্যাক বলল, ‘কিলো দুই পর্ক তৎসহ গুটি দশেক কোক-এর বোতল পেলে মন্দ হয় না। তোমরা দেখছি বেশ ভালো লোক।’

আত্তিলিও বলল, ‘দুনিয়ায় ভালো লোক না থাকলে চন্দ্র-সূর্য উঠবে কেমন করে। ওদেরও তো বাপু ঘেন্না-পিত্তি বলে একটা ব্যাপার আছে।’

ম্যাক বলল, ‘উঠে পড়ো আমার বাইকের পেছনে। জলদি।’

আমি বললাম, ‘একে তোমার মাথায় হেলমেট নেই। তার ওপর আবার সঙ্গে দুজন আরোহী। পিস কিপাররা ধরবে না?’

ম্যাক বলল, ‘পুলিশ আমার মেশোমশায়। না, ঠিক বললাম না। প্রথম দুটো অক্ষর আর শেষের অক্ষরটা বাদ দিলে যা পড়ে থাকে, পুলিশ আমার তাই হয়। বেশি কথা বোলো না।’

দেখলাম, ম্যাক মাটির ওপর দিয়ে মোটরবাইক চালানো একদম পছন্দ করেনা। মাটির হাতখানেক ওপর দিয়েই গাড়িটা চলতে লাগল। বাইকে বসে ও বোধহয় ভাবে ও প্লেন চালাচ্ছে।

আত্তিলিও বলল, ‘ম্যাক, তুমি বুঝি বেহালা বাজাতে খুব ভালোবাস?’

ম্যাক জবাব দিল, ‘মোটেই না।’

—তাহলে এটা নিয়ে তুমি কি করতে চাও?

ম্যাক বলল, ‘বেহালা দিয়ে দমাদম পিটাই করতে আমি খুব ভালোবাসি। পুরনো চাল যেমন ভাতে বাড়ে, পুরনো বেহালাও তেমন মানুষের হাল বেহাল করে দিতে পারে।’

ম্যাকের যুক্তি শুনে আমরা থ’ মেরে গেলাম। মারকূটে লোকেরা দুনিয়ার সব জিনিসকেই মারপিটের সরঞ্জাম মনে করে। বাল্যকালে যেমন মনে হয়, সব জিনিসই আসলে ভেঙে ফেলার বস্তু। বাল্যদশার হ্যাংওভার বড়ো হয়েও থেকে যায় অনেকের। বুঝতে পারলাম ম্যাক আসলে একজন বড়ো হয়ে যাওয়া শিশু। কোনো যুক্তিবুদ্ধির পরোয়া করা ওর ধাতে নেই।

রেস্টুরেন্টে খেতে বসা হল। অর্ডার দেওয়া হল ম্যাকের পছন্দ মতোই।

খেতে বসে আত্তিলিও বলল, ‘ম্যাক, তুমি কখনো খেতে-খেতে ইনহেলার নাকে টেনে দেখেছো?’

ম্যাক বলল, ‘না, কি হয় ওতে?’

আত্তিলিও বলল, ‘খুব চনমনে ক্ষিদে হয়। দু-কেজির জায়গায় পাঁচ কেজি পর্ক খাওয়া যায়। আমি তো ঐভাবেই ক্ষিদে বাড়াই। তাই সঙ্গে ইনহেলার রাখতে হয়। তোমার নাকের গর্তে দেব নাকি দুটো ড্রপ? ইচ্ছা হলে তুমি নিজের হাতে ধরেও অবিশ্যি টানতেও পারো। অ্যাজ ইউ উইশ।’

ম্যাক বলল, ‘আইডিয়াটা ভালো। দু-দিন ধরে আমারো তেমন ক্ষিদে হচ্ছে না। সারাদিনে কেজি পাঁচেক মাংস আমাদের গ্রামের শিশুরা খায়। দ্যাখো, কেমন রোগা আর বেঁটে হয়ে যাচ্ছি। বুকের ছাতি মাত্র ছাপান্ন ইঞ্চি, হাইট সাকুল্যে ছয় এগারো। ওজনও কমতির দিকেই। মাত্র দুই কুইন্টাল দশ কেজি। এভাবে বাঁচার কোনো মানে হয় বলো? দাও দিকি দু-ফোঁটা ক্ষিদে বাড়ানোর দাওয়াই।’

আত্তিলিও বলল, ‘গুড বয়! তোমার নাকখানা বেশ সুন্দর! গণ্ডারদের ঈর্ষা পাবার মতো। তোমার আই কিউও বেশ চমৎকার খোকন। কোন ইস্কুলে পড়েছিলে?’

ম্যাক খেতে-খেতে ঘুমিয়ে পড়ল। আমরা বিল মিটিয়ে দিয়ে কেটে পড়লাম। ওর ঘুম ভাঙতে-ভাঙতে আমরা সিরিয়া থেকে ফ্লাইটে প্যারিস পৌঁছে যাব। আত্তিলিও বহু বছর এই কারবারে আছে। বছর ভর পাকা চোর-বাটপাড়দের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে অভ্যস্ত। চোরেদের নাড়ি-নক্ষত্র, স্বভাব-সহবৎ ওর নখদর্পনে। ম্যাকের মতো ছেলে ওঁর কাছে নিতান্ত দুগ্ধপোষ্য শিশু।

কিন্তু মুশকিলটা বাঁধলো প্যারিস পৌঁছে। লুঁভর মিউজিয়ামের সামনে যেখানে আমাদের দাঁড়াবার কথা ছিল সেখানে পৌঁছে দেখলাম জাঁ দু ভালের সহকারী বিষন্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আত্তিলিও বলল, ‘ফ্রান্স প্রত্যেক শিল্পীর দ্বিতীয় স্বদেশ। এটাকে তুমিও তোমার স্বদেশ ভাবতে পারো বৈকি। তবে পুলিশদের বাদ দিয়ে। ওদের স্বদেশী পুলিশ ভেবনা মোটেই। ঘুঁষ অফার করলে বিপাকে পড়তে হবে।’

জাঁ দু ভালের সেক্রেটারি বলল, ‘ম্যাডামকে কারা কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে। আপনারা যত দ্রুত সম্ভব ফ্রান্সের ভৌগোলিক সীমা টপকে যান।’

আত্তিলিও বলল, ‘এই নামে একজন প্রসিদ্ধ কবির স্ত্রী ছিলেন। নামটা শুনেই আমার মনে হয়েছিল বেহালাটা ওনার হাত অবধি পৌঁছাবে না। চলো, চিন্তা নেই। সারা বিশ্বজুড়ে এই বেহালার বিস্তর ক্রেতা পাওয়া যাবে। তবে ম্যাডামের জন্য আমরা অপেক্ষা করব, যেহেতু কথা দেওয়া আছে। আশা করা যায়, মহিলাকে কিডন্যাপররা ছেড়ে দেবে, যখন বুঝতে পারবে ওকে আঁটকে রেখে কোনো ফায়দা নেই। হোয়েন রোম বার্নট, নীরো ফিডলড। বোঝা যাচ্ছে, সেই আগুন কবর থেকে উঠে এসে আবার ছড়িয়ে পড়েছে। সাবধান! চেরিফলে বোঝাই এই বাক্সটা দেখে যেন কাকপক্ষীও টের না পায়, এর মধ্যে কি বস্তু রয়েছে।’

তারপর আমরা লুইফানসা নামে একটা প্লেন ধরলাম বেলজিয়াম থেকে। আমাদের পাশের সীটটা ব্রিটিশ রয়্যাল মিউজিয়ামের এক কর্মচারীর। সে খবর দিল, ‘প্লেনে একদল হাইজ্যাকার উঠেছে। কি তাদের উদ্দেশ্য বোঝা যাচ্ছেনা।’ শুনে তো আমাদের চক্ষুস্থির। শরীর কাঠ। আরো শুনলাম প্লেনটা নাকি এখন তাদেরই হাতে। সর্বনাশ! তারা আবার প্লেনটাকে সৎকার সমিতির গাড়ি মনে করবে না তো? কিম্বা যদি প্লেনটাকে কর্পোরেশনের গাড়ি মনে করে আর যাত্রীদেরকে জঞ্জাল?

একজন এয়ার হোস্টেস বলল, ‘ওরা ডায়মণ্ড পাইরেট। ভুল খবর পেয়ে প্লেনে উঠেছে। আর ভুলভাল প্লেন চালাবার জন্য ককপিটে আগুন ধরে গেছে।’ কিছুক্ষন পর ঘোষকের কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম: ‘লুইফানসা এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে যাত্রীদের ধন্যবাদ জানাই। যারা বাঁচতে চান, বা ন্যূনতম সদিচ্ছা পোষণ করেন তাদের অনুরোধ করা হচ্ছে প্লেন থেকে ঝাঁপ মারুন। যারা তা পারবেন না, তারা কি করবেন সেটা তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমাদের পরিষেবা গ্রহনের জন্য লুইফানসা এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে পুনরায় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হচ্ছে। আপনাদের সুবিধার জন্য জানাই আটলান্টিক মহাসাগর থেকে মাত্র হাজার ফুট ওপরে আমরা অবস্থান করছি। বেস্ট অফ লাক!’

এত কিছুর মধ্যেও আমরা আশ্বস্ত হলাম এই ভেবে যে বেহালাটার সুলুক-সন্ধান জেনে ওরা হামলা চালায়নি। প্যাকিং বাক্সটা মাথায় নিয়ে আত্তিলিও মারল এক পেল্লায় লাফ। আর আমিও তার পদাঙ্ক অনুসরন করলাম। আমি জানি, আত্তিলিওকে অনুসরন করলে পথ হারিয়ে ফেলার কোনো চান্সই নেই। জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে ও হচ্ছে অপারাজেয়। সলিল সমাধি লাভ করার এই সুবর্ন সুযোগ। বিপদকালে দেশী-বিদেশী বহুজাতিক কোনো দেবতার নামই স্মরণে এলনা। জপ না করে ঝপ করে জলে পড়লাম। বিমান কতৃপক্ষ যদি অগ্রিম শারদ শুভেচ্ছাটা আমাদের জানিয়ে দিত তাহলে বেশ লাভবান হতাম। তবে, শুভেচ্ছা পেতে বেশ ভালোই লাগে, কি বলুন? মরার প্রাক্কালে গুচ্ছের শুভেচ্ছা পেয়ে কার কতটা আক্কেল গুড়ুম হলো এটা একটা ফ্যাক্টর।

যাই হোক, দেখলাম প্যাকিং বাক্সটা সাধারন কোনো বাক্স নয়। একদম সামুদ্রিক বাজপাখির মতো দেখতে হয়ে গেল ওটা। আত্তিলিও আমায় লুফে নিয়ে বাক্সটার ওপর বসিয়ে দিল। আরব্য রজনীর কাহিনীতে উড়ন্ত কার্পেটের কথা পড়েছিলাম। এবারে চাক্ষুষ করলাম, উড়ন্ত প্যাকিং বক্স। আত্তিলিও মিছিমিছি কেন প্লেনের টিকিট কাটে জানতে চাইলাম। ও বলল, ‘বিপদের সময় ছাড়া এ নিস্ক্রিয়।’ ওর এক বৈজ্ঞানিক বন্ধু গ্যাব্রিয়েল ওকে ওটা বানিয়ে দিয়েছে। শুধু বাক্সই নয়, ওটা আরো অনেকগুলো আকার ধরতে পারে। জলের মধ্যে গেলে ওটা টু সীটার সাবমেরিন হয়ে যায়। তবে পাকা রাস্তায় ও খোঁড়া। মানুষের ঘাড়ে চেপে ছাড়া যেতে পারে না। এই একটা খামতি ছাড়া ও প্রায় অল-ইন-ওয়ান। গ্যাব্রিয়েল জিনিসটা ফুল প্রুফ করার জন্যই আত্তিলিওকে ব্যবহার করতে দিয়েছে। বাজারে ছাড়ার আগে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার। যাই হোক, আপাততঃ ভারতবর্ষে গা ঢাকা দেবার সিদ্ধান্তই নিলাম আমরা। এদেশে পৌঁছে জানতে পারলাম জাঁ দু ভাল মুক্তিপন ছাড়াই মুক্ত হয়েছেন। এখন তিনি বেহালাটা পাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি অন্য বিপত্তি দেখা দিয়েছে। মা বিপত্তারিনীর পুজো করেও ফল পাচ্ছি না কিছু। এই পর্যন্ত বলে থামল জন।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম—‘কি বিপদ?’

জন বলল, ‘বেহালাটা বাজাতে গেলেই একটা ভূত কোথা থেকে এসে নৃত্য জুড়ে দিচ্ছে।’

আমি জানতে চাইলাম—‘ইউরোপিয়ান ভূত?’

জন বলল, ‘না, বাঙালী ভূত। বলছে বেহালাটা আমার। আমার নাম নাড়ুগোপাল। বেহালার ওপর কায়দা করে আমার নামটা খোদাই করেছিলাম। তাই ‘নাড়ু’ শব্দটা পড়ে মনে হচ্ছে নীরো। একটু ওয়েস্টার্ন আমেজ আনার জন্যে নামটাকে একটু টুইস্ট করে আমি ওভাবেই লিখতাম।’

‘বাঙালী’ শব্দটা গোটা উত্তেজক গল্পটাতে একদম ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিল।

আমি জনকে বললাম, ‘এমতাবস্থায় আমার ঐতিহাসিক জ্ঞানের প্রয়োজনটা হচ্ছে কোনখানে?’

জন বলল, ‘পাঁচপোতা গ্রামে শুনেছি একজন নামজাদা গুনীন আছে। ঐ গ্রামের কাদায় নাকি পঞ্চপাণ্ডবের পা ঢুকে গিয়েছিল। এই ব্যাপারে আপনি একটু আলোকপাত করুন।’

রুবি জানতে চাইল, ‘তারপর?’

পটাদা বলল, ‘আর কথা বলার অবকাশ মেলেনি। তখনই আমার ট্রেন এসে গেল কিনা।

অধ্যায় ২৫ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%