চুরি ছাড়ল কানাইপদ

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

চুরিটা শেষ পর্যন্ত করতে চাইল না কানাইপদ। বর্ষার রাত। পাঁচিল টপকে বাড়ির মধ্যে ঢুকেও পা হড়কে সে পড়ে গেল গোবরের গর্তে। ছ্যা:, শেষ পর্যন্ত এই ছিল কপালে। অবশ্য বৃষ্টির নাগাড়ে ঝমঝম শব্দ তার পতনের শব্দকে চাপা দিয়ে দিয়েছে। ভাগ্যিস। নতুবা চৌধুরিবাবুদের দোনলা বন্দুক আছে। কানাইপদ আর চেষ্টা করল না। ক্ষান্ত দিল। বাধা পড়লে কর্মনাশ হয়। তাদের শাস্ত্রে নিষিদ্ধ আছে। পাঁচিল বেয়ে চুপিচুপি রাস্তার দিকে নেমে পড়ল কানু। ভিজে চুব্বুড়ি হয়ে গিয়েছে। এক দৌড়ে শেতলা মন্দিরের ছাদ দেওয়া বারান্দায় এসে মাথা বাঁচাল। কোমর থেকে গামছাটা খুলে ভাল করে চিপে জল নিংড়ে নিল আগে। তারপর গা-মাথা ভাল করে পুঁছল। বিড়িগুলো ভেজেনি তো? ট্যাঁকে হাত দিয়ে দেখল কানাই। না:, ঠিকই আছে। এই বার একটা ধরাতে পারলে সর্বশান্তি। কিন্তু কোমরে হাত দিয়ে মনে পড়ল কানুর, দেশলাই নেই। তাড়াহুড়োর মাথায় বাড়ি থেকে আনা হয়নি। বউটা এমন ঘুমকাতুরে হয়েছে যে, ডিউটি ভুলে যায়। এখন উপায়? হে ভগমান! একটা বিড়ি খেতেও দেবা না দেকচি।

তাঁর নাম স্মরণ হওয়া মাত্র হাতেনাতে ফল। কে বলে কলিকাল? কানু নাকে টাটকা বিড়ির গন্ধ পেল। মন্দিরের ও-পাশে বারান্দায় বসে কেউ পুকপুক করে টানছে। জোনাকির মতো আলো মিটমিট করছে। কিন্তু নিকষ অন্ধকারে ঠাহর পাওয়া যাচ্ছে না লোকটাকে। বিদ্যুৎচমকের আলোয় এক বার একটা ফোটানো ছাতা দেখা গেল বটে। কিন্তু কোনও মানুষের টিকিও নেই। আবার অন্ধকার হতেই বিড়ির আগুনটা কিন্তু দেখা যাচ্ছে। দু’তিন বার বিদ্যুৎ ঝলকের পরেও কোনও মানুষ দেখতে পেল না কানাইপদ। ছাতা আছে অথচ জনমনিষ্যি নেই। তা হলে বিড়িটা ফুঁকছে কে? ভূতে?

কিন্তু অত সহজে ঘাবড়ে যাওয়ার মতো ভদ্রলোক কানু নয়। গড়নপেটনের দিক দিয়ে সে এলাকার পয়লা নম্বর। পাঁকাল মাছের মতো ক্ষিপ্রতা। তার হাত-পাগুলো ছ্যাতলা পড়া উঠোনের মতোই পিচ্ছিল। আর সাহস না থাকলে এই পেশাতে শাইন করা যায় না।

হেঁড়ে গলাটাকে আংশিক মিহি করে কানু বলল, ‘কে ও?’ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল ও প্রান্ত থেকে। বেশ বিনয়ী কন্ঠ।

—আঁজ্ঞে কানুবাবু, আমি পাঁচু।

—ছিঁচকে পাঁচু না, লগা পাঁচু?

—আঁজ্ঞে ছিঁচকে।

তাদের কথাও তো একটু ভাবা দরকার....

নিশ্চিন্ত হল কানাইপদ। লোকটা তাকে টেক্কা দেওয়ার মতো কেউ নয়।

—কিন্তু তোকে দেখতে পাচ্চিনে কেন?

—আঁজ্ঞে আপনাদের ছিরণের আর্শীবাদ।

—অ্যাঁ? খুলে বল দিকি কীসের আর্শীবাদ?

—আঁজ্ঞে দেবতার।

—আগে বিড়িটা দে ধরাই।

পাঁচু সবিস্তারে বলতে শুরু করে।

—আঁজ্ঞে গত পৌষে বসুমল্লিক বাড়ি সিঁদ দিতে গিয়ে সেই যে পিটুনি খেলাম মনে আছে?

—থাকবে না, কেন? ধরা পড়েছিলি। লজ্জাস্কর ব্যাপার।

—কিন্তু এটাই আমার জেবনের টার্নিং পয়েন্ট।

—খুলে বল। মন লাগিয়ে শুনি।

—কানে খোল জমেনি তো ?

—মস্করা করিস নে পাঁচু...

—তা, আপনারা হলেন গিয়ে বড় বড় সিঁদেল, আমি নেহাত ছিঁচকে। আপনাদের বড় বড় ডিগ্রি আর আমি হাতুড়ে। আপনারা মিটিং করে আমায় একঘরে করে দিলেন মনে আছে?

—তুই আমাদের কলঙ্ক। যাক, ভেঙে বল।

—তার পর আমার জেবনের প্রতি ঘেন্না এসে গেল। দেবতার মন্দিরে অন্নজল টাচ না করে তিনি দিন ঠাঁই পড়ে রইলাম। দেবতার আসন টলে গেল। আমায় এসে বললেন, ‘কী বর চাস, বল?’ আমি বললাম, ‘হে ভগমান, কিরপা করেন, যেন ধরা না পড়ি।’ উনি বললেন, ‘ঠিক আছে। তুই রাতের বেলায় অদৃশ্য হয়ে যাবি। দিনমানে যেমনকার তেমনই থাকবি। তবে একটা কণ্ডিশন আছে। যতটুকু দরকার ততটুকুই চুরি করবি। নচেৎ বর ফিরিয়ে নেব, মনে থাকে যেন।’ এই দ্যাখেন স্যর, গুনে গুনে দুটো থালা, তিনটে বাটি, একটি পিতলের প্রদীপ, খান দুই কাঁসার গেলাস আরে এই একটা তোবড়ানো ডেকচি। সোনাদানায় হাত দিইনি, টাকার বাণ্ডিল ঢেলার সমান জ্ঞান করেচি। ও সব হল গে আপনাদের জন্যে। আপনারা এ লাইনের রাজাগজা লোক। দেশের-দশের বড় বড় কাজ আপনাদের জন্য বরাদ্দ। খুচরো মালের জন্য এত হুজ্জোত-হ্যাঙ্গাম আপনাদের পোষাবে কেন?

পাঁচুর মুখে ‘স্যর’ শুনে খুব খুশি হল কানাইপদ। তবে পাঁচুর সব কথা বিশ্বাস হল না।

—চোখটা আমার দেখানো দরকার বুঝলি পাঁচু। ভবেন ডাক্তারকে দেখালে হবে? ও কোন দরের ডাক্তার?

—ওমা। চোখ খারাপ হল নাকি? এ তো ভাল কতা নয়। এই লাইনে চোখ-কানই তো আসল। তারপর হাত-পা। তারপর ব্রেন, মাথা ইত্যাদি। চোখ যে খারাপ হইচে কী করে বুইলেন?

—তা হলে তোকে দেখতে পাচ্চিনে কেন? চোখে ঠুলিও নেই, তুইও গায়ে ভুষোকালি মাখিস না। ও সব সেকেলে ব্যবস্থা। এই ফাস্ট যুগে চলে না। কিন্তু আমি যে তোর তুলনায় ব্যাকডেটেড হয়ে গেলাম। কায়দাটা কী ধরলি, একটু খুলে বলবি ভাই? আমিও তোকে দু’চারটে নতুন জিনিস শিখিয়ে-পড়িয়ে দেব। পা দুটো বের কর তো ধুলো নিই।

—বললাম সে উপায় নেই। সকাল না হলে হচ্চে না।

—তুই মরে ভূতও হসনি। কারণ, ভূতের ছাতির দরকার হয় না। ভূত বিড়িও খায় না। আবার থালাবাটিগুলোও ডুপ্লিকেট নয়। বাজারে কোনও মলমটলম বেরিয়েছে নাকি, যা মাখলে লোকের চোখে ধুলো দেওয়া যায়?

—বেরিয়েছে একটা জিনিস তবে মেয়েদের জন্য।

—কী জিনিস?

—কিরিম। মুখে মাখলে গায়ে রোদ লাগে না। আমার বউ মাখে। মুখটা চুনসাদা হয়ে যায়, যেন মেমসায়েব।

—ধুর, রোদের টাইমে তো ঘুমোই। আচ্ছা, তুই তো অদৃশ্য, ছাতা নিয়ে বেরোলি কেন?

—অব্যেস। বহু পুরনো অব্যেস কিনা।

—ছাতা, টর্চ, এ সব চোরেদের রাখা চলে না জানিস না? মাল টানবি না ছাতা সামলাবি?

—দ্যাখেন কানুদা, আপনি ওস্তাদ হতি পারেন মানছি, কিন্তুক এইখানে আমার একটা কথা আছে। ভরসা দেন তো বলি। শুধু ছাতা না। আমি কোমরে বেল্টও বাঁধি। চোখে সানগ্লাসও আঁটি চুরি করার সময়। আবার সময়-সময় শ্যাম্পুও করে বেরোই।

—তাই নাকি?

—বেরোবার সময় বউয়ের কৌটো থেকে চুরি করে আমিও একটু সানস্ক্রিন লোশন মেখে নিইচি। আর দাঁতেরও যত্ন নেওয়া দরকার। ধরে ফেললে যাতে কামড় দিয়ে পালানো যায়। তাই আমি মাউথওয়াশ দিয়ে কুলকুচো করি। যাতে কামড় বসাবার সময় মুখের দূর্গন্ধ না পায়।

—সে কী রে! আমি তো তোর নখের যুগ্যিও নই দেখা যাচ্ছে। ঠ্যাঙের ধুলো খানিক দে না ভাই, কাইণ্ডলি।

—দেব না বলেছি? ভোর হোক। তা, আজ নজর কোন বাড়ি পড়ল, যাচ্ছেন কোন দিকে?

—যাচ্ছি না, গিয়েছিলাম।

—সে কী, তবে যে খালি হাত। এ যে জলে ভাসে শিলা।

—আজ গতিক সুবিধের নয়। বড় বড় রথী-মহারথীরও দুর্দিন আসে, জানিস তো?

—তা বটে। ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে...

—তুই কি আমায় ঠেস দিয়ে কথা বললি, পাঁচু?

—তা একটু দিলাম বোধহয়।

—জানি হাতি হাবড়ে পড়লে ব্যাঙেও লাথি মারে। যা, আমি আজ এই দন্ডে লাইন ছেড়ে দিলাম। কথা ইজ কথা।

—সত্যি নাকি? কিন্তু জাতব্যবসা ছাড়া কি উচিত কর্ম হবে? ধর্মে সইবে? বাপ-পিতেমোরা ওপর থেকে অসন্তুষ্ট হবেন না তো?

—না:, ছেড়েই দেব। তুই কিনা দেবতার বর পেলি, আর আমি ঠ্যাং হড়কে পচা গোবরের গর্তে পড়লাম। এ লজ্জা রাখার জায়গা নেই রে ভাই। তুই বুঝবি না।

—এ যে বেড়াল বলে দুধ খাব না।

—পেট ফাঁপলে বেড়ালেরও দুধে অরুচি হয়। থম মেরে বসে থাকে দেখিসনি?

—ছেড়ো না দাদা। আপনার মতো উঁচু দরের শিল্লী কাজ ত্যাগ দিলে যারা নতুন, লাইনে সবে ঢুকচে, তেনারা হতাশ হবে যে। তাদের কথাও তো একটু ভাবা দরকার। তাদের পেরণা দরকার।

—জগতে কোথাও কোনও পোস্ট খালি থাকে না রে পাঁচু। এক জনের স্থলে আর এক জন আসে, খেলা চলতেই থাকে। তলে তলে যোগ্য লোক ঠিক তৈরি হতে থাকে। এই যেমন তোকে, কী দেখেছিলাম আর কী দেখচি। ছিলি ব্যাঙ হয়ে গেলি সাপ!

ফোঁস করে একটা বড় নিশ্বাস ছাড়ল কানাইপদ, কথা ক’টা বলার পর।

—তা হলে কী করবেন ভাবচেন, কর্ম তো একটা দরকার?

—ভাবচি রেলের জমিতে একটা পানবিড়ির দোকান দেব।

কথা বলতে বলতে ভোর হয়ে গেল। কানাইপদ দেখল সিনেমার পর্দার যেমন হয়, ঠিক তেমন ভাবে পাঁচুর চেহারাটা একটু একটু করে স্পষ্ট হচ্ছে। ঠিক সেই বিগত দিনের দন্তবহুল পাঁচু।

পাঁচু এক গাল হেসে বলল, চলেন, ‘আপনার নতুন দোকানের স্পটটা ভিজিট করে আসি।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%