হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
যদি কেউ গভীর মনযোগ সহকারে আতসকাঁচ হাতে একটি মামুলি কাঠের টুকরোকে পর্যবেক্ষণ করেন তবে তাঁকে কি বলা যাবে—মাস্টারমশাই না উকিল? ঠিক ধরেছো, দুটোর কোনোটাই না। তাঁকে গোয়েন্দা ছাড়া আর কিছু বলাই যাবে না।
চাণক্য চাকলাদার এরকম একজন পেশাদার ডিটেকটিভ। তাঁর নাম অনেকের অজানা থাকতেই পারে। বন্যার জল যেমন ধীরে ধীরে বাড়ে, গোয়েন্দাদের নামডাকও তেমনি। একজন সহকারী তাঁর থাকবে না তাই হয়? নচেৎ টুকিটাকি কাজগুলো সারবে কে?
তাঁর সহকারীর নাম বটুকেশ্বর চাকি। প্রথমজন সংক্ষেপে চাচা, দ্বিতীয়জন বলাই বাহুল্য—বোঁচা।
সম্প্রতি চাঁদপাড়া গ্রামের একটি ছাগল চুরির কেস তাঁর হাতে এসেছে। ‘গুপ্তধন’ বা ‘খুন’ নয় শুনে কেউ যেন ছ্যা: ছ্যা: না করে। এরকম একটা জটিল কেসের তদন্ত করতে অনেকেই হিমশিম খেয়ে যাবেন। চাচা-বোঁচার কাছে এই রহস্যের তদন্ত করাটা একটা চ্যালেঞ্জ। ছাগলটাও যে-সে ছাগল নয়। রবার্ট ক্লাইভ একদা বিলেত থেকে এর পূর্বপুরুষদের আনিয়েছিলেন। ফলে কেসটা যতখানি লঘু ভাবা হচ্ছে আদৌ তা নয়। চাচা হাতে যে বস্তুটি নাড়িয়ে-চাড়িয়ে পরীক্ষা করছেন সেটা হল ছাগলটি যে খোঁটায় বাঁধা ছিল। সাধুগদ্যে তাকে বলা যেতে পারে কীলক।
বিষয়টা খুলে বলা যাক। হলধর দাসের সর্বমোট আঠাশটি ছাগল। বিগত আটচল্লিশ ঘন্টা যাবৎ একটি তার মধ্যে মিসিং। থানার দারোগাবাবু ডায়েরি নিতে অস্বীকার করায় হলধর অগত্যে চাচার দ্বারস্থ হলেন। চাচা তখন সদ্য শরীরচর্চা সেরে উঠে সেঁকা পাউরুটির সঙ্গে ঢ্যাঁড়শের স্যুপ খাচ্ছিলেন বীট লবণ ছড়িয়ে। কালবোশেখি ঝড়ের দমকা হাওয়ার মতো তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন হলধর। ছাগলটার শোকে কাটা কলাগাছের মতো আছড়ে পড়লেন ঘরের মেঝের ওপর। চাচা উঠে দাঁড়িয়ে বরাভয় মুদ্রা দেখিয়ে বললেন, ‘অপরাধ বিজ্ঞান বলছে, অপরাধী ক্লু রেখে যাবেই। আপনার ছাগল পাওয়া যাক না যাক অপরাধীকে পাওয়া যাবেই। আপনি শান্ত হোন।’ হলধর ককিয়ে কেঁদে উঠে বললেন, ‘অপরাধী নিয়ে আমি কি করব? আমার ছাগল খুঁজে দেবার ব্যবস্থা করুন। ও যে দেড় কিলো দুধ দেয়। ছাগলের দুধ হজম করা শক্ত। কিন্তু হার্ট ভালো করে জানেন?’

আমার ছাগল খুঁজে দেবার ব্যবস্থা করুন।
‘কিন্তু যদি কেউ ওটাকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে অলরেডি জবাই করে ফ্যালে তার দায় গোয়েন্দা নিতে পারে না। আপনি বড্ড দেরি করে ফেলেচেন।’
‘আমি অপেক্ষা করছিলাম ওটা নিজে থেকে ফিরে আসে কিনা। কেননা, এর আগে একবার পায়ে লতা-পাতা জড়িয়ে সারারাত মাঠের মধ্যে আটকে ছিল। তারপর নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে জট ছাড়িয়ে ফিরে এসেছিল। শত হলেও অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান ছাগল। তার বুদ্ধি আমাদের চেয়ে বেশি।’
‘যা জিজ্ঞেস করছি ঠিক-ঠিক জবাব দেবেন। কোনো কথা গোপন করবেন না।’
‘আচ্ছা।’
‘ছাগলটার কোনো ফটো আছে?’
‘না।’
‘কোনো পাশপোর্ট সাইজের ছবিও নেই?’
‘না। ওর তো বিদেশ ভ্রমণের কোনো পরিকল্পনা ছিল না।’
‘আপনি কাকে সন্দেহ করেন?’
‘ঠিক বুঝতে পারছি না, কাকে সন্দেহ করা উচিৎ।’
‘ছাগলটার প্রতি কারো লোভ ছিল?’
‘ছিল। নাম বলব না। শুধু একটা কথা বলতে পারি তার কথায়-কথায় ‘বুঝলে কিনা’ বলার মুদ্রাদোষ আছে।’
‘ছাগলটার দেহে কোনো আইডেনটিফিকেশন মার্ক—আই মিন কোনো কাটা দাগ অথবা জড়ুল-টড়ুল আছে?’
‘আছে। ওর কানের দু-পাশে সাদা আছে।’
‘হুমম। ও কি খেতে ভালোবাসত?’
‘ঘাসই ওর প্রিয় খাদ্য। না পেলে কাঁঠাল পাতা।’
‘এখান থেকে পশুহাট কতদূর?’
‘তা মাইল দুয়েক।’
‘শেষ কবে হাটবার গিয়েছে?’
‘গত বিষ্যুদবার।’
‘খাসির মাংস কারা বিক্রি করে?’
‘নিরাপদ আর বল্টু।’
‘গ্রামে এর আগে কখনো ছাগল চুরি হয়েছিল?’
‘বহু বছর আগে। তখন আপনি হামাগুড়ি দিতেন।’
‘আপনার বয়স কত?’
‘তেরোশ আশি সালে জন্ম হলে এখনো দুই কুড়ি পোরেনি। ও-পারে কুড়ি আর এ-পারে সতেরো। মোট হল গিয়ে তেত্রিশ।’
‘ছয়ের সঙ্গে দুই গুণ করলে কত হয়?’
‘বারো।’
‘বিয়াল্লিশ থেকে তিরিশ বিয়োগ করলে?’
‘আজ্ঞে এটাও বারো।’
‘ছত্রিশকে তিন দিয়ে ভাগ করলে কত হয়?’
‘এটাও তো বারো।’
‘বারোর সঙ্গে ষোলো যোগ করলে?’
‘আঁজ্ঞে সাতাশ।’
‘আপনার চশমায় পাওয়ার কত?’
‘দুটোতেই মাইনাস দশ।’
‘সম্প্রতি কার সাথে মন-কষাকষি হয়েছে আপনার?’
‘আপনি কি করে জানলেন?’
‘কিছু লুকোবেন না, সত্যি কথা বলুন।’
‘আঁজ্ঞে ভজহরির।’
‘ভজকট ব্যাপার দেখছি! ছাগল চুরির আগের দিন তো?’
‘কি করে বুঝলেন?’
‘প্রশ্ন আমি করব, উত্তর আপনি দেবেন। ভজহরির একটা মুদ্রাদোষ আছে। সে কথায়-কথায় ‘বুঝলে কিনা’ বলে।’
‘বলে বটে।’
‘ভজহরির কি হার্টের দোষ আছে?’
‘আঁজ্ঞে, একটু একটু আছে।’
‘ভজহরি ছাগল পোষে?’
‘না।’
‘আপনার বাড়িতে জানে ছাগল হারাবার কথা?’
‘বাড়িতে আমি সাতদিন যাবৎ একা। পরিবার গিয়েছে ছেলেমেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি।’
‘ছাগল নিয়ে আপনি সবসময় দুশ্চিন্তায় ভোগেন তাই না?’
‘তা তো ভুগিই। উঠতি বয়স ওদের। দিনকাল খারাপ।’
‘আপনি বাড়ি যান। ছাগল হারায়নি।’
‘হারায় নি?’
‘না। আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বলে দেবে সমস্যাটা কি। বোঁচা, এক্সপ্লেইন করো তো। দেখি, কেমন কাজকর্ম শিখলি?’
বোঁচা বলল, ‘গুনতিতে ভুল হয়েছে। হলধরকাকা গুণ-বিয়োগ-ভাগ সব পারে। শুধু যোগ অঙ্কে একটু কাঁচা।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন