হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
ইতিহাসে অষ্টআশি পেয়েও পুচু এইট থেকে নাইনে ওঠার সময় ফার্স্ট হতে পারল না। ইংরেজিতে টেনেটুনে পাশমার্ক উঠেছে তার। আর ইংরেজি সাবজেক্টে সেরা নম্বর প্রাপ্তির জন্য এ বছর থেকেই মোহনকালী বিদ্যাপীঠে চালু হয়েছে নিস্তারিনী দেবী রৌপ্য পদক।
পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের দিন বুদো’র উঁচু বুকটা দেখে খুব মুষড়ে পড়ল পুচু। সকাল থেকেই বুদো ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করেছে। একত্রিশ পাবার দরুন পুচুকে বাংলা ভাষাতেই উত্তর দিতে হচ্ছে। এমন কি শোনা গেল, বুদো তার মা’র সঙ্গেও ইংরেজিতেই কথাবার্তা সারছে। ‘গিভ মি মোর রাইস’, ‘আই ডোন্ট লাইক পোটেটো’ ইত্যাদি। বুদো’র মা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এই বুদো ‘খুন্তি’ ইংরিজি কি রে?’
বুদো আর কথা বাড়ায়নি। দ্রুত খেয়ে উঠে পড়েছিল।
পুরস্কার পাবার আগ মুহুর্ত্তে দেখা হয়ে গেল পুচু’র সঙ্গে বুদো’র। বুদো ডাকল তাকে।
—এই পুচু কাম হিয়ার।
পুচু বলল, ‘বল কি বলছিস’।
—ডু ইউ নো, জুনিয়র স্টুডেন্টস ক্রিয়েট মাচ মোর নয়েজ হিয়ার এন্ড দেয়ার?
পুচু বলল, ‘আমি কি করব বল।’
—ইউ শুড প্রোটেস্ট।
—কেন, তুইই তো প্রতিবাদ জানাতে পারিস।
বুদো বলল, ‘ওকে। আই ক্যান ডু ইট।’
এমন কি মঞ্চে উঠে পদকটা নেবার সময়ও বুদো পাঁচ লাইন মুখস্থ করা ইংরেজি বলল। ‘দিস ইজ বেস্ট আওয়ার্ড অফ মাই লাইফ। আই অ্যাম প্রাউড অফ ইট।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ঘ্যানা পুচু’র কানে-কানে বলল, ‘আর সহ্য করা যায় না রে। এবার একটা কিছু ব্যবস্থা নিতে হয়। তুই ইংরিজিতে এত কাঁচা জানতাম না তো।’
পুচু বলল, ‘সবই গ্রহের ফের রে ঘ্যানা। লেটার, প্যারাগ্রাফ, কমপ্রিহেনসন টেস্ট, ট্র্যানশ্লেশন, বুদো সব কমন পেয়েছে। তার ওপর রবিস্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ত।’
ঘ্যানা বলল, ‘কিন্তু এই দুটো বছর আমরা টিঁকবো কি করে? তুই একটা কিছু ব্যবস্থা কর ভাই।’

আমার উত্তমরূপে বাংলা শিখাইটে হইবে
পরের বছর এখনো তিনশো পঁয়ষট্টিটা দিন। সেদিন রাতে ঘুম হলনা পুচুর। পরদিন টিচার্স কর্ণার থেকে একটা স্পোকেন ইংলিশের বই কিনে ফেলল। পরের সপ্তাহে স্পোকেন ইংলিশের ক্লাসেও ভর্তি হয়ে গেল। রোববার ক্লাস। ক্রিকেট কোচিংটা স্থগিত রাখতে হল তাকে। সচিন তেণ্ডুলকর তো জানেননা বুদোর অত্যাচার কি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। মনে-মনে ক্রিকেটের ভগবানের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল সে।
দু’মাসের মাথায় বিষয়টা তার বাতিকে পরিণত হল। স্বপ্নের মধ্যেও সে ফুটফাট করে বোম-পটকার মতো ইংরেজি বলতে শুরু করল। তার মা ভাবলেন, ছেলের বুঝি পেট গরম হয়েছে। গাঁদাল পাতার ঝোল খাইয়ে তিনি অসুখটা নিরাময় করতে চাইলেন। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হলনা। কঠিন কঠিন ইংরেজি শব্দগুলো সে কোথা থেকে পাচ্ছে কে জানে।
পুচু ঘ্যানাকে বলল, ‘ইংলিশ ভাষাটাকে কব্জায় আনতে গেলে সাহেবদের মতো হালচাল হওয়া দরকার। হেঁটো ধুতি পরে মুখে ইংরেজির বোল ফোটেনা। হ্যাট-কোট চাই। চল আমার সাথে। ধর্মতলা থেকে সেকেণ্ড হ্যাণ্ড কোট কিনবো। নতুনের অনেক খরচ।’ পুচুর ইংরিজির অগ্রগতি দেখে ঘ্যানা খুশীই হল।
এসপ্ল্যানেডে গিয়ে বাছাবাছি করে একটা কালো কোট কিনেই ফেলল পুচু। ঘ্যানাকে পেটভরে চিকেন চাউমিন খাওয়ালো। সামনেই স্কুলের স্পোর্টস। কোট পরার বিরাট সুযোগ। নবম-দশম শ্রেণীর কিছু ছাত্র ভল্যানটিয়ার হবার সুযোগ পাচ্ছে। পুচু’র নামও আছে তার মধ্যে। লন্ড্রি থেকে কোটটা কাচিয়ে নিয়ে এল পুচু। লন্ড্রিঅলা বলছিল, ‘মরা সাহেবের কোট নাকি?’ কথাটায় আমল দেয়নি পুচু। লোকের কথায় গা করলে জীবনের কোন উদ্দেশ্যেই সিদ্ধ হবে না। কোটটা অবশ্য বাড়িতে লুকিয়েই রাখতে হবে।
লজ্জা-টজ্জা দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে স্পোর্টসের দিন যথারীতি কালো কোটটা পরে ময়দানে নামলো পুচু। এনসিসি’র শিক্ষক নারায়ন বাবুও পরেছেন নস্যি রঙের ব্লেজার। কোটটা গায়ে দিয়ে বেশ একটা চনমনে ভাব টের পেল পুচু। তার চোখ দুটো খুঁজে বেড়াচ্ছে বুদো’কে। বুদো বাংলার শিক্ষক দেবাশীষবাবু’র সাথে কমলালেবু বিতরন করে বেড়াচ্ছে। বুদোও আড়চোখে দেখে নিয়েছে কোট পরা পুচু’কে। পুচুও সুযোগ খুঁজছে বুদোকে এক হাত নেবার। ইংরেজিতে সাতাত্তর না পেয়েও যে ভাষাটা কপচানো যায় সেটাই সে প্রমান করে দেখাতে চায়। রোজ তার ভকাবুলারিতে নতুন-নতুন চার পাঁচটা শব্দ জমা পড়ছে।
ক্লাস সেভেনের ক’য়েকটা গোবেচারা ছেলেকে হাতের কাছে পেয়ে পুচু বলল, ‘হাই গাইজ! ডু ইউ নো হ্যোয়ার মি: বুদো ইজ? গো দেয়ার এণ্ড কল হিম।’ ছেলেগুলো চোখ বড়-বড় করে তাকিয়ে রইল। বুদো অনতিদূরেই দাঁড়িয়ে আছে পুচু সেটা জানে। জেনে শুনেই বলা। যাতে বুদো শুনতে পায়।
কথাটা শুনতে পেয়ে বুদো এগিয়ে এল।
—কি হয়েছে রে? কি দরকার?
পুচু বলল, ‘নাথিং পার্সনাল। জাস্ট ফর কনভারশেসন।’
বুদো কিঞ্চিৎ অবাক হল পুচু’র ইংরাজি শুনে।
—বল, কি কথা বলবি?
—আই হ্যাভ সিন, ইউ ডিসট্রিবিউটেড অরেঞ্জ টু কম্পিটিটরস।
—হ্যাঁ তাতে কি হয়েছে? তোর খাবার ইচ্ছা?
—নো, নো, নট এ্যাট অল। ইউ আর আ ফানি গাই।
—তাহলে তোর বক্তব্য কি বলে ফ্যাল।
—আই ওয়ান্ট টু সে-ইট টেকস টু টু মেক এ কোয়ার্ল।
—তুই কি আমার সাথে ঝগড়া করতে চাস?
—নো ব্রাদার! ডোন্ট অ্যাফ্রেড। জাস্ট জোকিং। রিল্যাক্স!
—তোর মাথাটা গেছে পুচু। ভাল ডাক্তার দেখা।
—স্পিক ইন ইংলিশ প্লিজ!
—হোয়াই? কেন আমি খামোকা ইংরেজিতে কথা বলব?
সেই সময় ওদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন বাংলার শিক্ষক দেবাশীষ বাবু। তিনি দু’জনের মুখে ইংরেজি বুলি এবং হাতাহাতি হবার উপক্রম দেখে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, ‘বৎস! বিদেশী ভাষাশিক্ষা আদরণীয় সন্দেহ নেই। তবে তা পারস্পরিক কোন্দলে মত্ত হইবার উদ্দেশ্যে নহে।’
পুচু বলল, ‘স্যার ও আগে আমায় ইংরেজি বলেছে।’
বুদো বলল, ‘না স্যার ও আগে বলেছে।’
পুচু বলল, ‘স্যার ঘ্যানা সাক্ষী আছে, বাৎসরিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের দিন ও আমায় ইংরেজি বলেছিল।’
বুদো বলল, ‘কিন্তু আজ ও আমাকে খামোকা মস্করা করছে।’
দেবাশীষ বাবু বললেন, ‘যাও, শোধবোধ। আর কখনো এরকম কোরনা। যদি করতে শুনি তাহলে কিন্তু কঠিন কঠিন ট্রানশ্লেশন করতে দেব। না পারলে নিলডাউন করিয়ে রাখবো বলে রাখলাম।’
দেবু স্যারের কড়কানি খেয়ে দু’জনেই চুপ করে গেল। কোটটা খুলে ফেলল পুচু। খুব গরম লাগছিল তার। মাঠে অনেকেই তার কোট পরা দেখে কটুকাটব্য করল। তবে পুচু গায়ে মাখল না সেসব। সে জানে, খেলার মাঠে কোট পরে নামার সাহস থাকা চাই সেটা সে দেখাতে পেরেছে। আসলে ঘটনাটা ঘটল সেইদিন রাতে। পুচু ঘুমিয়ে পড়ার পর। তার স্বপ্নে হানা দিলেন এক সাহেব। তার পরনে ঐ কালো কোটটা।
পুচু বলল, ‘এ কি! আপনি আমার কোট পরেছেন কেন?’
সাহেব বলল, ‘বললেই হবে তোমার? এটা আমার কোট।’
পুচু বলল, ‘কিন্তু আমি যে ওটা কিনেছি।’
সাহেব বলল, ‘কিনেছো কেন?’
পুচু বলল, ‘ইংরেজি শিখবো বলে।’
সাহেব বলল, ‘তা ভাল। তবে তোমার ভাষাটাও আমার শিখবার ভারি সাধ। তুমি আমাকে যডি বেঙ্গলী শেখাও হামিও তোমাকে উট্টমরূপে ইংরাজি শিখাইয়া ডিব।’
পুচু বলল, ‘কিন্তু কি করে বাংলা শেখাতে হয় আমি জানিনা।’
সাহেব বলল, ‘টোমাডের ডেশে যে সকল উট্টম সাহেব আসিয়াছিলেন, উইলিয়াম কেরী, উইলিয়াম জোনস উহারা সকলে বঙ্গ সংস্কৃটির প্রতি শ্রঢাশীল ছিলেন। এই ভাষা অটিব মঢুর। আমাকে ইহা শিক্ষা করিটে হইবে।’
পুচু বলল, ‘মরেচে! আমি তো এসবের কিছুই জানিনে। তোমার কোট তুমি নিয়ে যাও। আমি বাংলা শেখাতে পারবো না।’
সাহেব বলল, ‘ড্যাম ইওর কোট। আমি বঙ্গভাষা উট্টমরূপে শিক্ষা করিটে চাই। টুমি বলিটে পার বাবু, এই ভাষায় কেন একটি অক্ষরের ঘাড়ে অপর একটি অক্ষর চাপিয়া থাকে? ইহা কোনডেশী ভড্রটা?’
পুচু বলল, ‘আমি জানিনে। বিদ্যাসাগর মহাশয়কে জিজ্ঞেস করগে যাও।’
সাহেব বলল, ‘যদি আমার, কোট পরিটে হয়, টবে আমাকে বাংলা শিখাইটে হইবে। নটুবা স্বপ্নের ভিটর ঢুকিয়া উপড্রব করিব।’
তারপরেই ঘুমটা ভেঙে গেল পুচু’র। মাঝরাতে, আর ঘুম এলনা তার। সারারাত এপাশ-ওপাশ করে ভোরের দিকে আবার ঘুমিয়ে পড়ল সে। সকালে যখন ঘুম ভাঙল বাইরে তখন চড়া রোদ। ঘুম ভেঙেই প্রথমে তার স্বপ্নটার কথা মনে পড়ল। লন্ড্রির মালিকের কথাটাও মনে পড়ল। লোকটা বলেছিল, ‘মরা সাহেবের কোট নাকি?’
ইস্কুলে গিয়ে ঘ্যানাকে বলল সে কথাটা। ঘ্যানা মন দিয়ে সবটা শুনে বলল, ‘স্বপ্নের কোন মানে হয় নাকি তাই? এসব মোটেই পাত্তা দিস না। তাহলে কিন্তু ইংরাজি শেখা লাটে উঠবে।’
কিন্তু পরদিনও একই অভিজ্ঞতা হল পুচু’র। রাতে তার স্বপ্নে হানা দিলেন সাহেব। সেই একই আর্জি নিয়ে। ‘উট্টমরূপে বাংলা শিখিটে হইবে।’ পরন্তু সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘টুমি কি’ ‘অলাবু’ মানে জানো? ইহার মানে হইল লাউ অথবা কদু। যখন ইহা ঝোলে থাকে তখন লাউ। অম্বলে থাকিবার সময় উহা কদু। তুমি দ্রুত উচ্চারণ করিতে পারিবে - ‘বাবলা গাছে বাঘ ঝুলছে?’ কিম্বা ‘পাখি পাকা পেঁপে খায়’? পরদিন ঘ্যানাকে বলল পুচু, ‘এ তো মহা আপদ জুটলো রে। বাংলা শেখার প্রতি একজন ইংরেজের এইরকম আগ্রহ দেখে অবাক লাগছে।’
ঘ্যানা বলল, ‘ওসব স্বপ্নেই সম্ভব। বাংলা কেউ শিখতে চায় না কি? তাহলে লণ্ডনে স্পোকেন বাংলার ইস্কুল খুলতো। বাংলা ভুলে যাওয়াটাই দস্তুর। তুই এক কাজ কর, কোটটা দিন কতক আমায় দে। বিয়ের একটা নেমন্তন্ন আছে ওটা পরে সেরে আসি। সরস্বতী পূজোর দিন আবার তুই পরিস।’
পুচু বলল, ‘ঠিক আছে পর। যদি আমার স্বপ্নের জন্য কোটটাই দায়ী হয়ে থাকে তাহলে তুইও স্বপ্ন দেখবি। একটা পরীক্ষা হয়ে যাক।’
সপ্তাহখানেক পর সকালের জলখাবার খেয়ে সবে পড়তে বসেছে পুচু এমন সময় সাইকেল চালিয়ে ঘ্যানা এসে হাজির। এত জোরে সাইকেল চালিয়েছে যে গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। পুচু অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে। স্কুলে তো দেখা হতোই। এত সকালে ঘ্যানার আবির্ভাবের কারণ কি? তাকে বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে। কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম।
—কিরে এই সাতসকালে কি ব্যাপার?
বিয়ের নিমন্ত্রন কেমন খেলি?
ঘ্যানা বলল, ‘নিমন্ত্রন যেমন হয় তেমনই হয়েছে। কিন্তু তোর জিনিস তুই রাখ ভাই।’
কথাটা বলে সাইকেলের কেরিয়ার থেকে পলিথিনের ব্যাগটা পুচু’র হাতে দিল ঘ্যানা। ব্যাগের মধ্যে কোটটা আছে।
—কিন্তু দু’দিন পরে ফেরৎ দিলেও তো হতো। তোর কি গা কূটকূট করছিল নাকি?
ঘ্যানা বলল, ‘তোর কথা সত্যি। সাহেবের নাম উইলিয়াম কেট।’
পুচু বলল, ‘সত্যি-সত্যি স্বপ্ন দেখেছিস তুইও?’
ঘ্যানা বলল, ‘শুধু তাই? সাহেব আমার বাংলার ক্লাস নিতে বসেছিলেন। নত্ববিধান, ষত্ববিধান, সমাস, কারক এইসব। বাংলায় যে আমি এত কাঁচা সেটা সাহেবের মারফৎ জানতে পারলাম। পড়াশোনার জ্বালায় ইস্কুল ছেড়ে দেব কিনা ভাবছি তার ওপর স্বপ্নের মধ্যেও এই অত্যাচার। তবে সাহেব লোকটা ভাল।’
পুচু বলল, ‘দ্যাখ, আমাদের কথা কিন্তু কেউ বিশ্বাস করবে না।’
ঘ্যানা বলল, ‘চলি রে, স্কুলে গিয়ে দেখা হবে।’
পড়াশোনা তখনকার মতো লাটে উঠল পুচুর। উড পেন্সিল বের করে সাহেবের একটা প্রতিকৃতি আঁকার চেষ্টা করতে লাগল সে স্মৃতি থেকে। ঘ্যানাকে দিয়েও একটা ছবি আঁকাতে হবে। ঘ্যানা কি পারবে? স্বপ্নের কথা শুনে স্কুলে সোরগোল পড়ে গেল। কথাটা ফাঁস করতে চায়নি পুচু। কিন্তু ঘ্যানা সাত তাড়াতাড়ি স্কুলে ঢুকে জনে-জনে গেয়ে বেড়িয়েছে ঘটনাটা। পুচু স্কুলে ঢুকতেই সবাই ছেঁকে ধরল তাকে।
বুদো অবশ্য বসে রইল দূরে। দেখা গেল এ ব্যাপারে তার মতামতটা জানতে সবাই আগ্রহী।
বুদো বলল, ‘থ্রিলার কাহিনী পড়া ভাল। তবে ঢপ দিতে গেলে অনেক বুঝে-শুনে ‘গপ্পো’ বানাতে হয়।’
‘গপ্পো, শব্দটা বলার ভঙ্গি দেখে গা জ্বলে গেল পুচুর। সে বলল, ‘তাহলে তোর যদি সাহস থাকে তবে তুই কোটটা পর।’
ইন্দ্রনাথ-শ্রীকান্তের আখ্যান পড়া হয়ে যাবার পর ক্লাস নাইনের ছেলেদের কাছে ‘সাহস’ শব্দটা স্পর্শকাতর। বুদো বলল, ‘নিয়ে আয় তোর কোট। ওটা পরে আমি সারারাত ঘুমিয়ে থাকব। কিস্যু হবে না। যত্তোসব উদ্ভট গাঁজাখুরি আষাঢ়ে ব্যাপার।
‘কিস্যু’ শব্দটাও গা জ্বলিয়ে দিল পুচুর। সে বলল, ‘ছুটির পর তোর বাড়ি গিয়ে আমি কোটটা দিয়ে আসব।’
কোটটা সত্যি-সত্যিই রাতে পরে শুলো বুদ্ধদেব ওরফে বুদো। ঠিক রাত বারোটায় একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করল সে। স্বপ্নে ইংরেজ সাহেবটা তাকে বলছেন, ‘টোমার ডুই বনঢু আমাকে বাংলা শিখাইটে অস্বীকার করিয়াছে। আশা করি টুমি রাজি হইবে। বাংলা ভাষা শিখিয়া হামি বাংলায় রবীন্দ্রনাথ পড়িটে চাই। সত্যজিত রায়ের ফিল্ম ডেখিটে চাই। বেঙ্গলী ল্যাংগুয়েজ ইজ ভেরি সুইট লাইক ন্যাচারাল বিউটি অফ ইওর কান্ট্রি’।
ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল বুদ্ধদেব। মা বললেন, ‘কি হয়েছে রে? উঠে বসলি কেন? বাথরুম যাবি?’
বুদো বলল, ‘না’।
মা বললেন, ‘ঘুমো।’
আবার পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল বুদো। গা থেকে অবশ্যই কোটটা খুলে রেখে। মা অনেক নিষেধ করেছিলেন। তবু কোটটা পরে সে এক্সপেরিমেন্ট করার কথা মা’কে জানিয়েছিল।
পরদিন সকাল হতে-না-হতেই বুদো পুচু’র বাড়ি গিয়ে হাজির।
—ভাই তোর কোট রাখ। আমি চ্যালেঞ্জ হেরেছি। কি খেতে চাস বল?
পুচু বলল, ‘চল, কোটটাকে নদীর জলে ফেলে দিয়ে আসি।’
বুদো বলল, ‘চল, সেই ভালো, তবে একটা কথা পুচু—’
পুচু বলল, ‘কি?’
বুদ্ধদেব বলল, ‘সাহেব কিন্তু একটা শিক্ষা দিয়ে গেছেন আমাদের।’
পুচু বলল, ‘তুই কি বলবি আমি জানি।’
বুদ্ধদেব বলল, ‘জানবিই তো। নিজের ভাষাটাকেও আমাদের ভালবাসা উচিৎ তাইনা?’
পুচু বলল, ‘বটেই তো।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন