সর্বমনস্কামনা সিদ্ধি আরক

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

ঝাঁ-ঝাঁ রোদের মধ্যে, দুপুর বেলায় মস্ত একটা ঝোলা কাঁধে লোকটার মতলবখানা কি? ছাতিম তলায় অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিউতি চাহনি। সন্দেহ হল রবিনের।

জানলা দিয়ে তাকিয়ে সোজাসুজি রাস্তার ওপারে লোকটাকে দেখা যাচ্ছিল। পূবের জানলাটা রবিনের কাছে একটা টিভি স্ক্রিনের চেয়েও বেশি আকর্ষক। সব সময় লাইভ প্রোগ্রাম। কিন্তু ঐ লোকটার ভাবগতিক অন্যরকম। যেন একটা ডিটেকটিভ গল্পের চরিত্র। লোকটার দেহভঙ্গিতে কেমন একটা দোনামনা ভাব ফুটে উঠেছে।

‘অ্যাই খোকা, শোনো।’

লোকটাই ডাকল রবিনকে। পেছনে দুটো চোখ আছে নাকি ওঁর ?

এবার ক্লাস নাইনে উঠল রবিন, এখনো ‘খোকা’ বলে তাকে সম্বোধন?

রাগ হয়ে গেল রবিনের। তবু ভদ্রতার খাতিরে লোকটার ডাক উপেক্ষা করতে পারল না সে।

‘কি বলছেন?’

বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল রবিন, ঘরের টিভিটা মিউট করে দিয়ে।

লোকটা বলল, ‘আমি একজনকে খুঁজছি।’

রবিন বলল, ‘ভদ্রলোকের নাম কি?’

লোকটা খচর-মচর করে খানিক মাথা চুলকে বলল, ‘নামটা ঠিক মনে পড়ছেনা। মদনও হতে পারে, বলাইও হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আবার যদি বলো হারান, সেটাও ফেলে দেওয়া অনুচিত হবে।’ রবিন জানতে চাইল, ‘ঠিকানা কি বলেছে ?’ লোকটা একবার দাঁতে ঠোঁট কামড়াল। খানিক ভেবে নিয়ে বলল, ‘নামটা মনে পড়লেই ঠিকানাটা মনে পড়ে যাবে।’

রবিন বলল, ‘আপনি তাহলে নাম-ঠিকানা মনে করতে থাকুন, আমি ততক্ষণে সৌরভের ব্যাটে ছক্কা-চার দেখি গিয়ে’

লোকটা বলল, ‘এই দাঁড়াও না, প্লিজ!’

সবটা ভালো করে শুনলে তবে বুঝবে...

রবিন বলল, ‘নাম-ঠিকানা কিছুই নেই তবু কেন ডাকাডাকি করছেন?’

‘চেহারার বিবরণ দিলে যদি চিনতে পার।’

রবিন বলল, ‘বলুন, বিবরণ দিন।’

‘লোকটা খাটো মতো। এই ধরো তোমার চে’ হাতখানেক বেশি লম্বা হবে।’

রবিন বলল, ‘আমি এখন পাঁচ ফুট তিন। তার মানে সেই লোকটা ‘ছ ফুটের ওপর। তাকে আপনার বেঁটে মনে হয়?’

লোকটা বলল, ‘তা আমার বলায় একটু ভুল থাকলেও থাকতে পারে। তাই বলে রেগে যাচ্ছো যে বড়!’

রবিন বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে তারপর বলুন।’

আগন্তুক ব্যক্তি বলল, ‘লোকটার চারখানা হাত। অবশ্য দেখা যায় মাত্র দুটো।’

রবিন এবার সত্যি-সত্যি রেগে, গেল।

সে বলল, ‘না: আপনার নির্ঘাৎ মাথার গণ্ডগোল হয়েছে। চারখানা হাত কখনো হয় নাকি?’

লোকটি বলল,’ ‘দুনিয়ায় সব হয়। দেবতাদের বেলায় চারখানা হাত মেনে নিতে দোষ নেই আর মানুষের হলেই যতো দোষ?’

রবিন বলল, ‘আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল দেখছি।’

লোকটি বলল, ‘কিছু মুশকিল হয়নি। সবটা ভাল করে শুনলে তবে বুঝবে।’

রবিন বলল, ‘আমি কি খারাপ করে শুনছি?’

দাঁতখোলা হাসি দিয়ে লোকটি রবিনকে বলল,

‘তোমাদের ধৈর্য বড় কম।’

রবিন বলল, ‘আচ্ছা, দেখা যাক ধৈর্য আছে কিনা। বলুন ভাল করে শুনি।’

লোকটি বলল, ‘আমি যাকে খুঁজছি সে হল একজন ওস্তাদ লোক। সে একটা বৈজ্ঞানিক আবিস্কার করেছে। আবিস্কারটার নাম সর্বমনস্কামনা সিদ্ধি পাঁচন বা সালসা, যেটা খুশি বলতে পার। ঐ পাঁচন এক আউন্স গিললে, অতীতের সব স্মৃতি স্মরনে আসে। যদি দুই ফোঁটা খাও তাহলে সর্দিজ্বর সেরে যাবে। যদি অমাবস্যার রাত্রে উত্তরদিকে মুখ করে পাঁচ ফোঁটা খাও তাহলে ভূত দেখতে পাবে। সোমবার খেলে যে ফল শনিবার খেলে তার উল্টো ফল। এইভাবে ঔষধ সেবনের এক ফোঁটা থেকে এক ফাইল পর্যন্ত বহুবিধ নিয়মাবলী আছে। প্রতিপদ থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত, সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত আলাদা আলাদা নিয়ম। ওষুধের শিশিটা আমার ঝোলায় আছে। কিন্তু নিয়মাবলী লেখা পুস্তিকাটা হারিয়ে ফেলেছি। তাই খুঁজে বেড়াচ্ছি ওনাকে। খুঁজে পেতেই হবে। নাহলে সব মাটি।

রবিন বলল, ‘ঐ রকম ওষুধ বেরিয়েছে নাকি? কই তেমন কোথাও শুনিনি তো।’

লোকটি বলল, ‘শুনবে কোত্থেকে? না দিয়েছে কাগজে বিজ্ঞাপন, না টিভিতে। এমন গুপ্ত গবেষণার ব্যাপার।’

রবিন বলল, ‘আচ্ছা তাহলে কিভাবে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায় সেই চেষ্টা করুন।’

লোকটি বলল, ‘তাহলে শোনো। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এই এলাকায় একটা পুকুর ছিল। সেই পুকুরের পূর্ব পাড়ে ছিল দোলগোবিন্দ বসাকের বাড়ি। এখন পুকুর বুঁজে চারদিকে বাড়ি গজিয়ে উঠেছে দেখতেই পাচ্ছো। ঐ দোলগোবিন্দের ভাইপোর সাথে মন কষাকষি ছিল নিতাই দাসের। গাধার অতীতকালে ডানা ছিল, বিবর্তনের ফলে তা খসে পড়েছে এই ছিল নিতাই দাসের বক্তব্য। অপরদিকে দোলগোবিন্দের ভাইপো তা মানতে নারাজ। সে যাই হোক, নিতাই দাসের মামা’র কাছে শ্রীখোল বাজান শিখতো কেষ্ট পাল। ঐ কেষ্ট পাল ছিল, নাম্বার ওয়ান কুঁড়ের বাদশা। একটা টিউকলের নাট টাইট করতে ওর এক হপ্তা সময় লেগেছিল। তবে তার পিসেমশাই ছিলেন, একজন সাধুসজ্জন ব্যক্তি। রেগুলার তুলসীগাছে এক ঘটি জল ঢালতেন। ঐ জল দেওয়া দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতো একরত্তি নাতি কাত্তিক। ফলে তার স্কুলে যেতে লেট হয়ে যেত রোজ। ইস্কুলে যেয়ে মাস্টারের কাছে কানমলা খেত। অঙ্ক একেবারেই কষতে পারতনা। বলত, দুই দু’কুনে বাইশ। ওর বাবার নাম মাতন সাহা আর তার প্রাণের বন্ধুর নাম ননী বিশ্বাস...।’

রবিন বিরক্তিভরে বলল, ‘উ: মশায়! চুপ করবেন? আমার মাথায় গোল লেগে যাচ্ছে। কানের ভিতর ঝাঁ-ঝাঁ করছে।’

লোকটা বলল, ‘চুপ করব? তাহলে আমার ঠিকানাটা কে খুঁজে দেবে শুনি? দিলে তো খেই হারিয়ে? কত মনসংযোগ বলে ঠিকানাটা বাগিয়ে এনেছিলাম। একেবারে ভেস্তে দিলে। আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে।’

রবিন আঁতকে উঠে বলল, ‘খবর্দার না! আমাকে মাফ করবেন। আমি, আপনার ঠিকানা খুঁজে দিতে পারবো না। সরি!’ লোকটা বলল, ‘ না, না। বিষয়টা তুমি আদপে বুঝতেই পারনি। ঠিকানাটা গোয়েন্দা গল্পের প্যাঁচের মতো। সোজা হলে তো খুঁজেই পেয়ে গেলাম। তাহলে আর মজা রইল কোথায়?’

রবিন বলল, ‘‘আপনি মজা চাইছেন না বৈজ্ঞানীক ভদ্রলোককে চাইছেন?’

লোকটা বলল, ‘দুটোই। ঠিকানার সঙ্গে মজা ফ্রী।’

রবিন বলল, ‘খুব দরকার থাকলে আপনি কাগজে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন না কেন?’

লোকটা বলল, ‘কাগজে বিজ্ঞাপন দিলে তার গা ঢাকা দেবার সুবিধে হয়ে যাবে রতন দলুইয়ের মতো।’

রবিন বলল, ‘রতন দলুই কে?’

আবার বিবৃতি শুরু করল আগন্তুক লোকটা।

‘আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এখান থেকে সিকি মাইল দক্ষিণে একটা ঝাঁকালো পাকুড় গাছ ছিল। তার বাঁ দিকে, ছিল এক মহা ধাপ্পাবাজ লোকের বসত ভিটে। সেই বাড়িতে যে শনিবার অমাবস্যা পড়ত সেই দিন সাতসকালে বাসিপেটে একটা কিপটে লোক তার বাড়িতে হাজির হতো। তার নাম তেলী বাবু। তেলী বাবুর টেরিকাটা জামাই ছিলেন পাটকলের কেরানী বাবু। তার বাল্যবন্ধুর নাম হল বঙ্কু। কিন্তু বঙ্কুর সাথে তার বাক্যালাপ বন্ধ ছিল। নো স্পিকিং টার্মস।’

রবিন বলল, ‘আপনি ভুলভাল বকছেন। পথ ছাড়ুন তো। খেলা দেখি গিয়ে। মিছিমিছি সময় নষ্ট হচ্ছে।’

—এই শোনো না, ওরকম ছটফট করো কেন সবসময়?

—না, আর শুনবো না। আমার ভাল্লাগছে না।

—আমার বুঝি খুব ভাল লাগছে?

—তা, আমি কি করব?

—তুমি তো ভারি স্বার্থপর হে। দুষ্টু লোকের মতো একটা অসহায় মানুষকে গাছতলায় ফেলে রেখে পালাচ্ছে।

—আমি পালাইনি মোটেই। বাড়ি যাচ্ছি। আপনিই গায়ে পড়ে তখন থেকে হিজিবিজি বকছেন।

—তা আমি এখন একা-একা কি করে হিসেব মেলাই?

—কোনদিন হিসেব মিলবে না। জানা কথা।

—ধন্যবাদ! মনে পড়েছে। ওনার টাইটেল হল ‘জানা’। আর নাম হল ‘উত্তর’। পুরো নাম উত্তর জানা। পেয়ে গেছি। যাও তোমার ছুটি।

কথা ক’টা বলেই লোকটা ভূতের মতো গায়েব হয়ে গেল।

মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙলো রবিনের। পূবের জানলা দিয়ে রোদ ঢুকে বিছানায় গড়াগড়ি যাচ্ছে। মাথার বালিশটা মেঝেতে পড়ে আছে। বিছানায় উঠে বসে জানলার দিকে তাকালো রবিন। রাস্তার ওপারে ছাতিম গাছটার তলায় ঝোলা কাঁধে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে না?

ভাল করে চোখ কচলে আবার তাকিয়ে দেখল রবিন, না:, কেউ নেই তো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%